‘বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর তুলনা নেই’: আহমদ ছফা

ভূমিকা: সলিমুল্লাহ খান

মহাত্মা আহমদ ছফার সম্প্রতি পুনঃপ্রকাশিত কয়েকটি সাক্ষাৎকারের মত বর্তমান সাক্ষাৎকারটিও আমাদের হাতে পড়িয়াছে আমাদের পরম বন্ধু সৈয়দ মনজুর মোরশেদের দয়ায়। তাঁহার সংগ্রহশালা হইতে তিনি আজ পর্যন্ত আমাদিগকে আহমদ ছফা বিষয়ে অনেকগুলি লেখা অকৃপণহস্তে দান করিয়া যাইতেছেন। তাঁহার স্পৃহা না হইলে হয়তো এই লেখাগুলি হইতে জাতি বঞ্চিতই থাকিত।

মহাত্মা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ছায়া সৈয়দ মনজুর মোরশেদের গায়ে কিছু পরিমাণে পড়ে নাই এ কথা কে হলপ করিয়া বলিবে! তিনিও থাকেন মফস্বলে, শহর চট্টগ্রামের যৎসামান্য উত্তরে। তিনি বড় চাকুরির উমেদারি করেন না। অল্প পারিশ্রমিকের নগণ্য চাকরি করিয়াও কিভাবে তিনি সংসারজীবন ও সাহিত্যচর্চা এমন একত্রে যাপন করেন তাহা তাঁহাকে না চিনিলে বিশ্বাস করা কঠিন হইবে।

বর্তমান সাক্ষাৎকারটির প্রকাশ খুব সম্ভব ১৯৯১ সালে। আমাদের হাতে যে কপিটি পৌঁছিয়াছে তাহাতে লেখা আছে প্রকাশকাল ২৯ জুলাই, সোমবার। সাক্ষাৎকারের ভিতরে যে আলোচনা তাহাতেও প্রতীয়মান সময়টা ১৯৯১ সালই হইবে। ‘পূর্বাভাস’ নামক যে সাপ্তাহিকটি এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা এতদিনে আর প্রকাশিত হয় কিনা জানি না। তবে সাক্ষাৎপ্রার্থী মারুফ রায়হান যতদূর জানি আজও দিব্য আছেন।

এখানে আমরা একটু আধটু সম্পাদনা করিয়া ইহার পুনর্মুদ্রণ করিতেছি। সম্পাদনার মধ্যে আছে মোটের উপর কয়েকটি বানান আর দুই চারিটি যতিচিহ্ন। কয়েকটি শব্দও আমরা পরিবর্তন করিয়াছি। যথা: একটি শব্দ ছিল ‘বাহ্যিক’ — উহা আসলে হইবে ‘কাব্যিক’; আর আমরা তাহাই করিয়াছি। আরো একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। আহমদ ছফার একটি উপন্যাস বইয়ের নাম ‘অলাতচক্র’; পূর্বাভাস পত্রিকায় তাহা ছাপা হইয়াছিল ‘অনাথ চক্র’। ইহাতেই বুঝা যায় মারুফ রায়হান আহমদ ছফার রচনার সহিত যতটা পরিচয় রাখিলে নয় ততটা পরিচয়ও রাখিতেন না। আমাদের দেশে পড়াশোনা করিলে সাংবাদিকতা পেশার অগৌরব হয় কিনা জানি না। তবে মারুফ রায়হান হয়তো এই পথে সাংবাদিকতার গৌরবই বৃদ্ধি করিতেছিলেন। তিনি প্রমাণ করিয়াছিলেন ‘রিয়ালপলিটিক’ নামক জার্মান লব্জটির খোঁজই তিনি রাখিতেন না। উহার পরিবর্তে ‘রিয়্যাল পলিটিক্স’ ছাপাইয়া তিনি তাহার প্রমাণ দিয়াছিলেন।

আমরা যদি সেইসব প্রমাদ শুদ্ধ করিয়া না ছাপাইতাম তাহা হইলে কাজটা বড় অন্যায় হইত।

মারুফ রায়হান আহমদ ছফার সাক্ষাৎকারটির প্রকাশ উপলক্ষে একটি দীর্ঘ টীকাও লিখিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি নিজের সামান্য বিদ্যার সহিত বিশেষ বিদ্বেষটাও লুকাইয়া রাখিতে পারেন নাই। ঘৃণাব্যবসায়ীদের দোহাই পাড়িয়া তিনিই লিখিয়াছিলেন, ‘… অনেকেই আছেন যারা মনে করেন — আহমদ ছফা সিনিক, পাক্কা স্টান্টবাজ। তিনি যেসব কথাবার্তা বলে থাকেন বা লেখেন তা সংবাদ শিরোনাম হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই।’

মারুফ রায়হান — বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নহে — এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করিয়াছিলেন নিজের ইচ্ছায় নহে, তাঁহার সিদ্ধিদাতা গণেশের নির্দেশে। নিজের ঘৃণা অবশ্য তিনি প্রচ্ছন্ন রাখেন নাই। আমরা আর একটুখানি উদ্ধৃতি দিয়া ঘৃণা কাহাকে বলে দেখাইতেছি।

পূর্বাভাসের নির্দেশে আহমদ ছফার সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হয় মাসতিনেক আগে। কবি সোহরাব হাসানের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে রাখা হয় সাক্ষাৎকার নেয়ার কথাটি। তারা উভয়েই একই ফ্লাটে বাস করেন।… ২২ জুলাই সোমবার বিকেলে আহমদ ছফার ঘরে অভ্যাগত ছিল বেশ কজন। ‘আমার আবার সাক্ষাৎকার কেন?’ — এই ছিল তার প্রথম প্রতিক্রিয়া। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে তার আপাতঃ অনিচ্ছাকে ইচ্ছার অনুকূলে আনতে দু’টি বাক্যের বেশি ব্যয় করতে হয়নি। তবে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত হয় ২৪ ঘণ্টা বাদে।

আমরা মারুফ রায়হানের শীর্ষটীকাটি হুবহু ছাপাইয়া দিলাম। তাহার স্থান শীর্ষ হইতে পাদটীকায় সরাইয়া দেওয়া ছাড়া অধিক হস্তক্ষেপ করিলাম না। পড়ার সুবিধার জন্য খোদ সাক্ষাৎকারটিতে কয়েকটি অধ্যায় নির্দেশ আমরা করিয়াছি। আরো একটি কথা। শিরোনামায় পূর্বাভাস পত্রিকার যোগান দেওয়া ‘মুজিবের তুলনা’ কথাটি বিয়োগ করিয়া আমরা ‘তাঁর তুলনা’ কথাটি যোগাইয়াছি। আহমদ ছফার আদি জবানবন্দিতে যাহা আছে তাহাই হুবহু থাকা উচিত। আমরা মনে করিয়াছি ইহাই বিধেয়। তথাস্তু!

ঢাকা \ ৭ অক্টোবর ২০১৩

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩ - ২৮ জুলাই ২০০১)

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩ – ২৮ জুলাই ২০০১)

মারুফ রায়হান: বর্তমানে আপনার পেশা কি?

আহমদ ছফা: সেটা আমি নিজেও জানি না।

মা. রা.: জীবনধারণের খরচ যোগাচ্ছেন কিভাবে?

আ. ছ.: আমার একটি বাড়ি ছিল। বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলাম তার সবটা এখনো ফুরোয়নি। ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’ থেকে শুধু কনভেয়েন্সটা নিই। মাঝে মধ্যে প্রকাশক চিত্তবাবুর কাছে হামলা দিয়ে টাকা আনি। আমার খরচ খুব কম। কিনে মদ খাই না। সিগ্রেটটা খাই। এই ঘরভাড়া খাওয়া-দাওয়া কত আর খরচ — ২/৩ হাজার আর কি! ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি মনে করে আমার জার্মান বান্ধবী ১২০০ ডলার পাঠিয়েছে। যদিও আমি তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইনি। এভাবেই চলে যাচ্ছে।

মা. রা.: এমনিতে শিল্প-সাহিত্যের কাজ ছাড়া অন্য কিছু করছেন?

আ. ছ.: ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাড়িঘর তৈরি করে দিচ্ছি কক্সবাজার ও মহেশখালিতে। এই কাজ করতে গিয়ে নানান ঝামেলা হচ্ছে। সরকারী অনুমতি যোগাড় করতে হচ্ছে পদে পদে।

মা. রা.: গৃহনির্মাণ প্রজেক্টের টাকা যোগান দিচ্ছে কে?

আ. ছ.: ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র কাছ থেকে বেশ কিছু সংগ্রহ করা গেছে। আর আমরা নিজেরাও কন্ট্রিবিউট করছি। শুধু অন্যের টাকার উপর নির্ভর করে কাজ করব, নিজেরা কিছু দেব না — সেটা হয় না। মাঝখানে রুদ্রটা মরে ঝামেলা করে গেল। ও ছিল প্রাণবন্ত মানুষ। জ্যান্ত কবি। আমরা ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’ থেকে ওর যাবতীয় বই প্রকাশের ব্যবস্থা নিয়েছি। কবীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, অসীম সাহাদের নিয়ে সাবকমিটিও করা হয়েছে। কবীর চৌধুরী রুদ্রর বেশ কটি কবিতা অনুবাদের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ডাক্তার তপন চক্রবর্তী একটা ভালো প্রস্তাব এনেছে। সেটা হলো ‘রুদ্রমেলা’ করা হবে। ওঁর মৃত্যু বা জন্মবার্ষিকীতে এই মেলা হবে। উৎসব হবে। রুদ্র যেমন হৈচৈ করতো সে রকম কিছু করব সবাই মিলে।

মা. রা.: মদ্যপানের ব্যবস্থা থাকবে? রুদ্র মদ খুব পছন্দ করতো।

আ. ছ.: সে রকম কিছু করা হয়তো সম্ভব হবে না। সামাজিকভাবে বিষয়টা তো সেরকম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

মা. রা.: সাম্প্রতিককালের সাহিত্যের অবস্থা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

আ. ছ.: লেখকদের ভূমিকা সবসময় রাজনৈতিক নেতাদের চাইতে কিছু বেশি। দর্শন বিজ্ঞান সম্পর্কিত মানুষের চিন্তাকল্পনা অনুভবশক্তি বৃদ্ধি করার, জগতসংসারের কাছে এসব বিষয় পরিচিত করানোর ভূমিকা লেখককে নিতে হয়। অথচ অনেক লেখকই সাংস্কৃতিক পণ্যের যোগানদার হয়ে গেছে। শারদীয়া/ঈদ সংখ্যা বলে যা চালু আছে তা পৃথিবীর অন্য কোন সংস্কৃতিতে নেই। এসব সংখ্যার লেখকদের ভেতর অর্থ-উপার্জনের আকাক্সক্ষা ছাড়া আর কিছুই কাজ করে না।

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

মরণচাঁদের মিষ্টিবিক্রেতার মতো লেখা বিক্রি করাটা অর্থহীন। লেখার চরিত্র বা মেরুদণ্ড না থাকলে সেটা এক ধরনের পানসে বস্তুতে পরিণত হয়। তা কোনো কাজে আসে না। মার্কেস লিখেছিল ৬টি বই, হেমিংওয়ে ৯টি অথচ দেখুন সুনীলের ৪০০ বই, হুমায়ূনের গণ্ডায় গণ্ডায়। চুতিয়া আর কাকে বলে! আর যে দেশে পাঠযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা তৈরি হয় না সেখানে গণতন্ত্র বা অন্য কোনো দাবি অর্থহীন মনে হয়।

মা. রা.: দেশে বর্তমানে যে গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

আ. ছ.: একটুখানি পজিটিব মনে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে দেশে। সকলকে সহ্য করার বাস্তব অবস্থান তৈরি হচ্ছে। এই সহনশীলতার ক্ষেত্রটা যত বাড়বে, গণতন্ত্র তত প্রসারিত হবে। ভুট্টো একটি রাজনৈতিক উপলব্ধি ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতীয় রাজনীতির শোরগোলই ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করছে।’ গণতন্ত্রচর্চার জন্য কথা বলা প্রয়োজন। সংসদে সেটা খুব হচ্ছে। কিন্তু সংসদের প্রশ্নোত্তরে যা দেখছি না সেটা হলো মনীষা বা প্রতিভার ঝলক।

খালেদা জিয়ার সরকার সম্পর্কে আমার একটা নালিশ আছে। তাঁর মন্ত্রিসভার মধ্যে একজনও মাথাওয়ালা মানুষ নেই যিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থাটা সামাল দিতে পারেন। যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের ভেতরে দূরদর্শিতার, জাতিগঠনমূলক চিন্তার অভাব আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও দৃষ্টিহীনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় এক দিন বন্ধ থাকলে জাতি যেখানে এক বছর দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতার ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হলে বৃহত্তর মানবিক আকাক্সক্ষা অপমানিত হয়।

মা. রা.: ‘ওঙ্কার’ এর তীব্র তীক্ষè রাজনৈতিক বক্তব্য আপনার আর কোন উপন্যাসে পাওয়া যায়নি, কেন?

আ. ছ.: না। এটা ঠিক নয়। ‘সূর্য তুমি সাথী’ বাংলাদেশের একমাত্র উপন্যাস যেখানে ভূমি হারিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের শহরে আসার প্রেক্ষাপট এবং সাম্প্রদায়িক অবস্থা ব্যক্ত হয়েছে। এটা জার্মানে অনূদিত হয়েছে। এ বছর এটার [নতুন সংস্করণ] ছাপার জন্য বলি ‘মুক্তধারা’কে। কিন্তু চিত্তবাবু সাহিত্যের জন্য নয়, ব্যবসার জন্য বই করেন। তিনি ছাপেননি এর নতুন সংস্করণ। আমি দেখেছি আমাদের দেশে পুরো শ্লোগান না হয়ে উঠলে কোনো রচনা লোকে সেভাবে গ্রহণ করতে চায় না।

তারপর ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসের কথা বলবো। এটার শেষ ৩০ পাতা লিখতে পারিনি। কারণ বাঙালি জাতি সম্পর্কে আরও কিছু ইনকোয়ারি বাকি আছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বই হয়েছে প্রচুর। কিন্তু সব লেখকই একটা জিনিস মিস করে যাচ্ছেন। এই জনগোষ্ঠীর একটা অতীত আছে, দীর্ঘ হাজার বছরের মননমানস চিন্তাপদ্ধতি আছে। এসব আসেনি কোনো লেখায়। সবাই পাকিস্তান আর্মির ধর্ষণ দেখাতে ব্যস্ত। কিন্তু সেটা তো যুদ্ধের একটি দিক। জাতি যখন যুদ্ধ করতে যায় তখন তার যে ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটে সেটাও কোন লেখায় আসেনি।

কামরুল হাসান

কামরুল হাসান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় কংগ্রেসীরা এভাবে ব্যাখ্যা করতে চায় যে ভারতবর্ষের [বিভক্তির পেছনে] দ্বিজাতিতত্ত্বের ভুল ছিলো, তাই তারা পাকিস্তান ভেঙ্গেছে। এ ব্যাপারে আমি একমত নই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রমসংশোধন বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশে যেমনটা হয়েছে [তেমনই] কাশ্মীর পাঞ্জাব সিন্ধু আসামেও স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের সংগ্রাম হচ্ছে। ভারত বহুজাতিক বহুভাষিক দেশ। সেখানে আসামে ও অন্ধ্রে ভাষা আন্দোলন হয়েছে আমাদের ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর। সমগ্র [পরি]প্রেক্ষিত বিবেচনায় ১৯৭১ একটি নতুন স্তর। ‘অলাতচক্র’ বইটিতে আমি [এই] সমস্ত নতুন কথা বলতে চাই। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন করার আছে — সে ব্যাপারে একটু ভয় পাচ্ছি। আমি কোনো রসালো গল্প বলতে চাই না। ‘রিয়ালপলিটিক’ বলে একটা কথা আছে। আমি রিয়ালপলিটিককে চ্যালেঞ্জ করে লিখতে চাই।

মা. রা.: বাংলাদেশের চিত্রকলা সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?

আ. ছ.: বাংলাদেশের চিত্রকলা খুবই উজ্জ্বল। যদিও ঢাকা আর্ট কলেজ কোটারিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, এর অনুভবশক্তি ভোঁতা, তবু বাংলাদেশের চিত্রকলা গর্ব করার মতো বিষয়।

মা. রা.: আর বাংলাদেশের কবিতা?

আ. ছ.: কবিতাকে স্বচ্ছন্দ স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়। এতে চিন্তামননের ছাপ নেই। বাংলাদেশের কবিতা বাংলাদেশের চিত্রকলার পাশে দাঁড়াতে পারবে না।

মা. রা.: আপনি তো ছবিও এঁকেছেন। সংখ্যায় কত হবে?

আ. ছ.: একশর মতো হবে। ঈদের আগের দিন রঙ তুলি কাগজ কিনেছি, কিন্তু ছবি আঁকতে বসা হয়নি। আসলে সুলতানের ছবি ইন্টারপ্রেট করার জন্যেই আমার ছবি আঁকার সূচনা। তবে একটি দুটি ছবি বাদে সুলতানের ছবি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে টানে না। যখন বাঙালি জাতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তখন সুলতানের দক্ষতা ও ক্ষমতার তারিফ করি। আমি গাবার্ডিনের তারিফ করি, কিন্তু পরি জিনস। যেসব ছবি আমাকে আনন্দ দেয় সেগুলো নিশ্চয়ই সুলতানের নয়।

মা. রা.: তবে কার?

আ. ছ.: শাহাবুদ্দিনের ছবি ভালো লাগে। মারুফের ছবিও ভালো লাগে।

মা. রা.: কোন মারুফ? সংবাদ পাঠিকা আসমা যার বোন সেই মারুফ আহমদ?

আ. ছ.: আসমার ভাই নাকি সে! মারুফ জার্মানিতে থাকে। এই দেখুন তার এক্সিবিশনের কাগজপত্র। কিন্তু শাহাবুদ্দিন আর মারুফ দেশের মাটিতে কাজ না করলে কৃত্রিমতা ও টেকনিক সর্বস্বতাপ্রবণ হয়ে দাঁড়াবে। ভারতের ফিদা হুসেন, পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত ডি সুজা আর গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য সমসাময়িক একই মাপের শিল্পী ছিল। ডি সুজা ফ্রান্সে আর গৌরীশ্বর জার্মানিতে চলে গেল। ফিদা হুসেনই এগিয়ে গেল দেশে থাকার কারণে। স্বদেশের মূল উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয় শিল্পীকে।

মা. রা.: কামরুল হাসানকে কেমন লাগে?

আ. ছ.: কামরুল হাসান আধুনিক সংবেদনের পেইন্টার নন। তাঁকে আমি বড় শিল্পী মনে করি না। তাঁর অনেক ছবি আছে যা বিদেশী ছবির নকল। মেম সাহেবদের তিনি শাড়ি পরিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

মা. রা.: আর কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী — এদের সম্পর্কে কি ধারণা?

আ. ছ.: কাইয়ুমের বিরাট সম্ভাবনা ছিল। তিনি আমাদের প্রথম মডার্ন পেইন্টার। কিন্তু কিছু স্টুপিড লোকের পাল্লায় পড়ে বুককভার করে নিজেকে নষ্ট করেছেন। তিনি আর গ্রো করলেন না, ছবি আঁকলেন না। প্রচণ্ড বেদনা হয় আরেক তরুণ শিল্পী চন্দ্রশেখরের জন্যে। তার মত রঙের বাহাদুরি আর কেউ দেখাতে পারেনি। কিন্তু সে ছবি আঁকছে না। রফিকুন নবীর ছবিতে  গিন্নীপনাটা আছে। ফিগার টোন রঙ চমৎকার। ডিটেল অসাধারণ। কিন্তু নবী তাঁর ক্ষেত্র খুঁজে পাননি কিংবা খুঁজে নিচ্ছেন না। কার্টুন করে নিজের বিরাট ক্ষতি করেছেন। তাঁর প্রতিভা কার্টুনিস্টের নয়।

মা. রা.: কবিতা লিখছেন না?

আ. ছ.: ‘কবি ও সম্রাট’ নামে একটি কাব্যনাটক লিখেছি। অন্য কোনো লেখা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা নেই। কবিতা নিয়ে আছে। শিল্পের ক্ষমতার সর্বোচ্চ বিকাশ হয় কাব্যে। কবিতা সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। যৌনক্ষমতার মতো কবিদের কবিতা রচনার ক্ষমতা থাকে। যৌনক্ষমতা থাকলেই যেমন ভালো বাচ্চা পয়দা হয় না তেমনি অনেক কবিকে দিয়েও উৎকৃষ্ট কাব্য তৈরি হয় না। আসলে আমাদের কবিতায় মনীষার চর্চা নেই। [আছে] শুধু তাৎক্ষণিক আবেগ।

মা. রা.: শামসুর রাহমানের কবিতা কেমন লাগে?

শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান

আ. ছ.: শামসুর রাহমান সম্পর্কে আমার মতামত খানিকটা জটিল। আমার কাছে আমাদের সংস্কৃতির প্রিয়তম ব্যক্তিত্ব জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর পরেই রয়েছেন শামসুর রাহমান। উদারতা প্রসন্নতা গ্রহণশীলতায় তিনি তাঁর প্রজন্মের ব্যতিক্রম। তাঁর সম্পর্কে অপ্রিয় ও নিষ্ঠুর কথা বলতে কষ্ট লাগে। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো — ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘নিজ বাসভূমে’ [প্রভৃতি] কাব্যগ্রন্থ। এর পরের কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁর কাব্যিক ব্যক্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে [এ কথা] আমি বলবো না — আবার এগুলো না লিখলে তার কাব্যিক ব্যক্তিত্ব ম্লান হতো তাও মনে করি না। আমাদের আধুনিক কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি। কিন্তু আবহমান বাঙালি মানসের সঙ্গে তাঁর দূরত্ববোধ কোথায় যেন রয়েছে। এটা একসময় তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দিয়েছে আবার অন্যসময় আড়ষ্ট করেছে।

মা. রা.: ‘বৈশিষ্ট্য দেয়া’ এবং ‘আড়ষ্ট করা’ প্রসঙ্গে একটু ব্যাখ্যা দেবেন?

আ. ছ.: প্রথম দিকে বুদ্ধিস্নিগ্ধ কবিতা লিখেছেন তিনি। যেমন ধরুন —

এই সেই পৃথিবী অপার মাঠ যার এতকাল

সুপুষ্ট স্তনের মতো ফল আর ফাল্গুনের ফুল

করেছে উৎসর্গ নিত্য সন্তানের শ্রম প্রজ্ঞা প্রেমে

পূর্ণ হয়ে দীর্ণ হয়ে? এই সেই পৃথিবী সাবেকী?

এরকম কবিতা লিখে চিন্তাকল্পনার জগতে মুক্ত বাতাস তিনি এনে দিয়েছিলেন। এটা তাঁর বৈশিষ্ট্যের দিক। কিন্তু বাংলা পুঁথিসাহিত্য ও লোকসাহিত্য নবায়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেননি তিনি। বাংলা কবিতার বাসভূমে তিনি নিজেই পরবাসী। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর গদ্যরচনায় মৌলিক চিন্তা কাজ করতে দেখা যায় না। ব্যক্তিগত অনুভূতিই তিনি প্রকাশ করেছেন।

মা. রা.: শামসুর রাহমান ছাড়া কবিতায় আর কাকে কাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?

আ. ছ.: শহীদ কাদরী। আল মাহমুদ। নির্মলেন্দু গুণ। গুণের তিনচারটি কাব্যগ্রন্থ ভালো। আর হেলাল হাফিজ [নামক] তরুণটির কবিতা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কিন্তু সে তো লিখছে না। অন্যদিকে পঁচাত্তরের পর আবার মুজিবের পক্ষেবিপক্ষে কবিতা লেখা শুরু হয়েছে।

মা. রা.: ‘জাতির পিতা’ কনসেপ্টে বিশ্বাস আছে?

আ. ছ.: এটা কল্পনা করতে খারাপ লাগে। ‘জাতির পিতা’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ বললে যে শেখ মুজিবকে অধিক সম্মান দিয়ে ফেলব এটা ঠিক নয়। বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর তুলনা নেই।

মা. রা.: কিভাবে?

আ. ছ.: হেগেলের একটা কথা আছে। কোন জাতির সবচেয়ে বড় সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে রাষ্ট্র। শেখকে আশ্রয় করে এ অঞ্চলের লোক একটি রাষ্ট্র পেয়েছে। এটা অস্বীকার করলে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘জাতির পিতা’ ইত্যাদি বলে অতিশয়োক্তি করতে বিরক্ত লাগে।

মা. রা.: ‘ফাউস্ট’ শেষ করছেন না কেন?

আ. ছ.: সে ক্ষমতা আমার নেই। প্রথম পার্টটি যখন শেষ করেছিলাম তখন সেই অনুবাদ শোনানোর মত লোক পাইনি। মঞ্জুরে মওলার আমলে বাংলা একাডেমীকে পাণ্ডুলিপি [দিয়েছিলাম]। মাত্র দুহাজার টাকার বিনিময়েও তাঁরা ছাপতে রাজি হয়নি।

মা. রা.: কি লিখছেন এখন?

আ. ছ.: অর্থনীতির বই। রাজনৈতিক ও উন্নয়ন প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘উন্নয়ন স্ট্রাটেজি’ নামে বই লিখছি। আর লিখছি গান। শ দুয়ের মতো লিখেছি। বাংলা লিরিকের ক্ষেত্রে খুব অল্প হলেও মেজর কন্ট্রিবিউশন হবে এই গানগুলো। সুরের ক্ষেত্রেও আমার কিছু বলার আছে। এই সময়ের সংবেদনা আমার গানের সম্পদ।

মা. রা.: গানগুলো প্রচারের ব্যবস্থা নিচ্ছেন না?

আ. ছ.: আত্মার পবিত্রতা হলো সঙ্গীত। প্রচারটা বড় কথা নয়।

মা. রা.: কিন্তু গানকে তো গীত হতে হবে।

আ. ছ.: একটি গান তো গাইতে দিয়েছিলাম। বিট নষ্ট করে ফেলেছে।

মা. রা.: ‘ঘর করলাম নারে আমি সংসার করলাম না’ গানটির কথা বলছেন? সেটির সুর কি আপনি দিয়েছিলেন?

আ. ছ.: হ্যাঁ। বিটটা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ফকির আলমগীর নষ্ট করে ফেলেছে। কোথাও উল্লেখও করে না যে গানটি আমার। আমি মামলা করতে পারতাম। কিন্তু তাহলে রেডিও টিভিতে তাঁর গাইবার অধিকার চলে যেত। এটা করতে কষ্ট হলো।

মা. রা.: এত বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন আপনি। আসলে কি হতে চেয়েছিলেন?

আ. ছ.: ইচ্ছে ছিল লেখক, ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক হব। রাজনীতিক হওয়া সম্ভব না এটা বুঝেছি অল্পদিনেই। কারণ রাজনীতি করতে গেলে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। যে ধরনের কৌশল গ্রহণ করতে হয় সে সবের যোগ্য আমি নই।

মা. রা.: মাঝখানে ‘উত্তরণ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করছিলেন। ওটা করবেন না?

আ. ছ.: না। ‘উত্তরণ’ করবো না। যা কিছু দীর্ঘজীবী হয় তাই নষ্ট হয়ে যায়। একটি সাহিত্যপত্রিকা করব। এর আয়ুকাল হবে দু বছর।

মা. রা.: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

আ. ছ.: দেখুন, সমগ্র সংস্কৃতিকে নষ্ট করার পেছনে দুটো লোক দায়ী — হামিদুল হক চৌধুরী আর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। এঁরা যখন ‘চিত্রালী’-‘পূর্বাণী’ বের করেন তখনও এদেশে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠেনি। কিছু ধনীর টাকায় নটীদের ছবি ছাপিয়ে সস্তায় পণ্য বের করার পাইওনিয়ার এঁরাই। জনরুচিকে কলুষিত করার চেষ্টা নেয়া হয় [এঁদের সময়]। এটা ছিল পুরো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এই ধারাটি যতদিন না ভাঙ্গছে বিকল্প ভালো ছবি তৈরি হবে না।

মা. রা.: যে দুজনের কথা বললেন তাঁরা কি এতটাই পাওয়ারফুল যে সংস্কৃতিকে কলুষিত করতে পারেন?

আ. ছ.: নিশ্চয়ই। ‘চিত্রালী’-‘পূর্বাণী’ এ দুটো ক্রিমিনাল কাজ। ‘ইত্তেফাক’ কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ছাপে অথচ সাহিত্যের জন্য পাঁচ শত টাকা খরচ করতে বাধে। এরা মধ্যযুগ থেকে ১০০ বছর পিছিয়ে আছে। আর স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নয়, ছবির বাচ্চা [নয়]। করতে হলে ফুল লেন্থ ছবি করতে হবে। না হলে বেশিদূর এগুনো যাবে না। তবে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা।

মা. রা.: দেখেছেন ছবিটা?

আ. ছ.: না, দেখিনি। তবু ভালো ধারণা। এটা প্রমাণ করেছে রূপকথার ভিতরে কোথাও একটা জিয়নকাঠি আছে। বম্বের ছবির নকলবাজির যুগে এটা একটা ব্রেক থ্রু। যেমন ব্রেক থ্রু ছিল একাত্তরের আগে ‘রূপবান’, ‘বেহুলা’, ‘অরুণ বরুণ কিরণমালা’। সংস্কৃতির সংকট থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া আমাদের ঐতিহ্যের ভেতরেই আছে। অন্যদিকে অঞ্জুকে আমার হট নায়িকা মনে হয়েছে, পাকিস্তানের নিলোর বাংলা সংস্করণ।

মা. রা.: কিন্তু অঞ্জুকে তো আপনি দেখেননি।

আ. ছ.: কেন? টিভিতে, বিজ্ঞাপনে দেখেছি।

মা. রা.: তাহলে নায়কদের কেমন লাগে?

আ. ছ.: আমাদের হিরোরা সব টুথপেস্ট হিরো।

মা. রা.: আপনি কি কনফার্মড ব্যাচেলর?

আ. ছ.: আমি কোনো ব্যাপারেই কনফার্মড নই। কখনো কিছু ধরিনি। যখন যা এসেছে তাই করে গেছি। কলমা পড়ে বিয়ে করাটা বাঙালি মুসলমানের কাছে পরিচিত তরিকা। ওটা কারাগার। ওটা পারবো না।

মা. রা.: কারাগারটা কি নারীপুরুষ দুজনের জন্যেই?

আ. ছ.: ওঁদের কথা জানি না। মহিলারা হয়তো এই কারাগারের জন্য তৈরি হয়েই থাকে।

মা. রা.: নারীবাদীরা অন্য কথা বলে।

আ. ছ.: বাংলাদেশে ডা. রওনক জাহানই ছিলেন একমাত্র প্রকৃত নারীবাদী। নষ্ট মেয়েরা নষ্টামির ছাড়পত্র হিশেবে নিয়েছে নারীবাদকে। আসলে নারীবাদীরা পুরুষবিরোধী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সমকামীরাও বিপরীত লিঙ্গের প্রতি উদাসীন। এই বিষয়গুলো পৃথিবীকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে সে ব্যাপারে আমার একাডেমিক ইন্টারেস্ট আছে। আমি উত্তেজনা বোধ করি।

মা. রা.: সমকামিতাকে কি দৃষ্টিতে দেখেন?

আ. ছ.: চট্টগ্রামে হচ্ছে। জসীমউদ্দিন সমকামী ছিলেন। সমকামিতাকে বিবেকহীন মনে করি না। তবে আমার নিজের কথা বলি। আমি এস্তেমাল (ব্যবহার) করিনি।

মা. রা.: ঘর-সংসার করা বা না করার সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে কি মনে হয়?

আ. ছ.: সুবিধা অসুবিধা বা লাভক্ষতির হিশেবে কিন্তু দেখিনি। পূর্ণ মানুষের মতো বাঁচার প্রচণ্ড ইচ্ছা আছে। কবি লেখক শিল্পী এগুলো তো  মানুষ পরিচয়ের খণ্ডাংশ। আধুনিক মানুষের ভেতর নির্দিষ্ট বিশ্বাস নেই। দায়িত্ব পালন করতে পারে না। সংশয়ে ভোগে। মুসলিম সুফিদের ভূমিকায় যখন নিজেকে দেখি তখন আনন্দ লাগে। আল্লাহকে আমি ঘরের লোক হিশেবে দেখতে অভ্যস্ত। পৃথিবীর নির্মাতা হিশেবে নয়। আল্লাহকে নিয়ে আমার কোন কাজ নেই। রবীন্দ্রনাথ লালনেরা বুঝতেন এই ঘরের ব্যাপারটি। অন্যেরা সরাসরি নাস্তিক হয়েছেন। বৃহত্তর মানব সংসারের মধ্যে আমি বাস করছি। এখানে সবসময় আমার করার কিছু [না কিছু] আছে। মানুষকে কোনো সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। ঈশ্বরের মতো ভ্যারাইটি হচ্ছে মানুষ। মানুষের একটা না একটা বাতিক থাকবেই।

মা. রা.: আপনি তাহলে এখন রাগী চরিত্র থেকে মুসলিম সুফির প্রসন্ন ভূমিকায় নিজেকে দেখতে পছন্দ করছেন?

আ. ছ.: আম যখন কাঁচা থাকে তখন কিন্তু টক থাকে, পাকলে মিষ্টি হয়।

প্রথম প্রকাশ: সাতদিনের পূর্বাভাস, ২৯ জুলাই ১৯৯১

শীর্ষটীকা: মারুফ রায়হানের মন্তব্য


আহমদ ছফা সম্পর্কে বাজারে অজস্র কথা চালু আছে। একদলে আছেন তাঁর কাজেকর্মে মুগ্ধ বিস্মিত অনুরাগী — অপর দলে আছেন সন্দিগ্ধ সমালোচক। শেষোক্তদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা মনে করেন আহমদ ছফা সিনিক, পাকা স্টান্টবাজ। তিনি যেসব কথাবার্তা বলে থাকেন বা লেখেন তা সংবাদ শিরোনাম হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই। এসব মতামত থেকে স্পষ্টত বোঝাই যাচ্ছে যে মাঝ-চল্লিশের এই অবিবাহিত প্রাণবন্ত ব্যক্তিটি কতটা আলোচিত। বিতর্কিত। সারাদেশে আহমদ ছফা একজনই আছেন। তাঁর বিকল্প নেই। হয় না। সমাজের ব্যতিক্রমী চরিত্র বটে একখান। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের নামে আড্ডায় বা আলোচনায় বসাটাও ঝক্কির ব্যাপার। মজার ব্যাপারও।

আহমদ ছফার বই বাজারে তেমন সহজলভ্য নয়। যে উপন্যাস লিখে তিনি খ্যাতিমান হয়েছিলেন সেই ‘ওঙ্কার’ বইটি এখন পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার পর [প্রকাশিত] ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থটিও যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিল। লেখালিখিতে তাঁর আরো দুটো কীর্তি আছে। [চিত্রশিল্পী] এস এম সুলতান সম্পর্কে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন [তিনি]। এছাড়া মহাকবি গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ অনুবাদ করেছেন। উপন্যাস ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’ [আর] প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ও কমবেশি আলোচিত হয়েছিল। গত সপ্তাহে বেরিয়েছে ইংরেজিতে লেখা ভ্রমণকাহিনী ‘জার্মান পারস্পেকটিব’। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আহমদ ছফা সম্পর্কে তেমন জানতে পারেনি। পূর্বাভাসের নির্দেশে আহমদ ছফার সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হয় মাসতিনেক আগে। কবি সোহরাব হাসানের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে রাখা হয় সাক্ষাৎকার নেয়ার কথাটি। তারা উভয়েই একই ফ্লাটে বাস করেন।

২২ জুলাই সোমবার বিকেলে আহমদ ছফার ঘরে অভ্যাগত ছিল বেশ কজন। ‘আমার আবার সাক্ষাৎকার কেন?’ — এই ছিল তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে তাঁর আপাত অনিচ্ছাকে ইচ্ছার অনুকূলে আনতে দুটি বাক্যের বেশি ব্যয় করতে হয়নি। তবে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত হয় ২৪ ঘণ্টা বাদে। সময়মত গিয়ে দেখা যায় প্রায়ান্ধকার ঘরে বিছানায় পড়ে আছেন। খালি গা। কারেন্ট ফেল করাতে আলোর অভাব আর গরমের আধিক্যে ঘরের পরিবেশ আরো নির্জন। গায়ে জামা পরতে পরতে সিগারেট এগিয়ে দিয়ে মুখোমুখি বেতের চেয়ারে বসলেন।

ঘরখানি ছোট্ট। কিন্তু এক চিলতে ঘরের ভেতরেই স্বয়ংসম্পূর্ণ সংসার আহমদ ছফার। ডিজিটাল ফোনসেট বিছানার ওপরেই শোয়ানো। খাটের পায়ের কাছে স্টিলের আলমারী এবং একটি বড় টেবিল। টেবিলের ওপর বইপত্রের পাশে হারমোনিয়াম। দু দুটো আলনায় কাপড় ছড়ানো ছিটানো। খাটের মাঝবরাবর আরেকটি টেবিল, লেখালেখির সরঞ্জাম ছড়ানো। দরজার পাশে বেতের চেয়ার টেবিলের পেছনে বুকশেলফ বইয়ে ঠাসা। আরেকটি ছোট্ট টেবিলের ওপর টিভি রাখা।

দেয়ালে গ্যেটের বিশাল ছবি। অন্যপাশের দেয়ালে ক্যালেন্ডারের নিজের দিকটার টেপ দিয়ে সাঁটা পোস্টকার্ড সাইজ ছবি। একহাতে ফুল আর অন্যহাতে সিগ্রেট নিয়ে হাসছেন আহমদ ছফা। পাশে শিল্পী সুলতান ও কবি শামসুর রাহমান। ছবিটা ছাপার জন্যে চাইলে দিলেন না। বললেন নিজেকে ঐ ছবিতে নাকি [তাঁকে] কুত্তার বাচ্চার মতো লাগছে।

যা হোক কথা হলো সাকুল্যে দুঘণ্টা। মাঝে সোহরাব হাসান এসে ফোন করে গেলেন। বিদ্যুৎ চলে আসলো। কথার মাঝখানে বাদাম চিবোতে চিবোতে এলেন ‘আদমসুরত’ ছবির নির্মাতা তারেক মাসুদ। টিভিতে এশিয়ান ক্লাব কাপ ফুটবলে মোহামেডানের খেলা ছিল। টিভি অন হলে আলোচনা অফ করতে হলো। অফ দ্যা রেকর্ডেও কিছু কথা হলো। তা ছাপতে পারলে ভালোই হতো। আহমদ ছফার অনেক কথার সঙ্গেই হয়তো অনেকে একমত হতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর মতো অকপটে নিজের বিশ্বাসের কথা এই সুবিধাবাদের যুগে কজনাই বা বলতে পারেন!

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s