Monthly Archives: নভেম্বর 2013

‘বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর তুলনা নেই’: আহমদ ছফা

ভূমিকা: সলিমুল্লাহ খান

মহাত্মা আহমদ ছফার সম্প্রতি পুনঃপ্রকাশিত কয়েকটি সাক্ষাৎকারের মত বর্তমান সাক্ষাৎকারটিও আমাদের হাতে পড়িয়াছে আমাদের পরম বন্ধু সৈয়দ মনজুর মোরশেদের দয়ায়। তাঁহার সংগ্রহশালা হইতে তিনি আজ পর্যন্ত আমাদিগকে আহমদ ছফা বিষয়ে অনেকগুলি লেখা অকৃপণহস্তে দান করিয়া যাইতেছেন। তাঁহার স্পৃহা না হইলে হয়তো এই লেখাগুলি হইতে জাতি বঞ্চিতই থাকিত।

মহাত্মা আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ছায়া সৈয়দ মনজুর মোরশেদের গায়ে কিছু পরিমাণে পড়ে নাই এ কথা কে হলপ করিয়া বলিবে! তিনিও থাকেন মফস্বলে, শহর চট্টগ্রামের যৎসামান্য উত্তরে। তিনি বড় চাকুরির উমেদারি করেন না। অল্প পারিশ্রমিকের নগণ্য চাকরি করিয়াও কিভাবে তিনি সংসারজীবন ও সাহিত্যচর্চা এমন একত্রে যাপন করেন তাহা তাঁহাকে না চিনিলে বিশ্বাস করা কঠিন হইবে।

বর্তমান সাক্ষাৎকারটির প্রকাশ খুব সম্ভব ১৯৯১ সালে। আমাদের হাতে যে কপিটি পৌঁছিয়াছে তাহাতে লেখা আছে প্রকাশকাল ২৯ জুলাই, সোমবার। সাক্ষাৎকারের ভিতরে যে আলোচনা তাহাতেও প্রতীয়মান সময়টা ১৯৯১ সালই হইবে। ‘পূর্বাভাস’ নামক যে সাপ্তাহিকটি এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা এতদিনে আর প্রকাশিত হয় কিনা জানি না। তবে সাক্ষাৎপ্রার্থী মারুফ রায়হান যতদূর জানি আজও দিব্য আছেন।

এখানে আমরা একটু আধটু সম্পাদনা করিয়া ইহার পুনর্মুদ্রণ করিতেছি। সম্পাদনার মধ্যে আছে মোটের উপর কয়েকটি বানান আর দুই চারিটি যতিচিহ্ন। কয়েকটি শব্দও আমরা পরিবর্তন করিয়াছি। যথা: একটি শব্দ ছিল ‘বাহ্যিক’ — উহা আসলে হইবে ‘কাব্যিক’; আর আমরা তাহাই করিয়াছি। আরো একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। আহমদ ছফার একটি উপন্যাস বইয়ের নাম ‘অলাতচক্র’; পূর্বাভাস পত্রিকায় তাহা ছাপা হইয়াছিল ‘অনাথ চক্র’। ইহাতেই বুঝা যায় মারুফ রায়হান আহমদ ছফার রচনার সহিত যতটা পরিচয় রাখিলে নয় ততটা পরিচয়ও রাখিতেন না। আমাদের দেশে পড়াশোনা করিলে সাংবাদিকতা পেশার অগৌরব হয় কিনা জানি না। তবে মারুফ রায়হান হয়তো এই পথে সাংবাদিকতার গৌরবই বৃদ্ধি করিতেছিলেন। তিনি প্রমাণ করিয়াছিলেন ‘রিয়ালপলিটিক’ নামক জার্মান লব্জটির খোঁজই তিনি রাখিতেন না। উহার পরিবর্তে ‘রিয়্যাল পলিটিক্স’ ছাপাইয়া তিনি তাহার প্রমাণ দিয়াছিলেন।

আমরা যদি সেইসব প্রমাদ শুদ্ধ করিয়া না ছাপাইতাম তাহা হইলে কাজটা বড় অন্যায় হইত।

মারুফ রায়হান আহমদ ছফার সাক্ষাৎকারটির প্রকাশ উপলক্ষে একটি দীর্ঘ টীকাও লিখিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি নিজের সামান্য বিদ্যার সহিত বিশেষ বিদ্বেষটাও লুকাইয়া রাখিতে পারেন নাই। ঘৃণাব্যবসায়ীদের দোহাই পাড়িয়া তিনিই লিখিয়াছিলেন, ‘… অনেকেই আছেন যারা মনে করেন — আহমদ ছফা সিনিক, পাক্কা স্টান্টবাজ। তিনি যেসব কথাবার্তা বলে থাকেন বা লেখেন তা সংবাদ শিরোনাম হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই।’

মারুফ রায়হান — বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নহে — এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করিয়াছিলেন নিজের ইচ্ছায় নহে, তাঁহার সিদ্ধিদাতা গণেশের নির্দেশে। নিজের ঘৃণা অবশ্য তিনি প্রচ্ছন্ন রাখেন নাই। আমরা আর একটুখানি উদ্ধৃতি দিয়া ঘৃণা কাহাকে বলে দেখাইতেছি।

পূর্বাভাসের নির্দেশে আহমদ ছফার সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হয় মাসতিনেক আগে। কবি সোহরাব হাসানের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে রাখা হয় সাক্ষাৎকার নেয়ার কথাটি। তারা উভয়েই একই ফ্লাটে বাস করেন।… ২২ জুলাই সোমবার বিকেলে আহমদ ছফার ঘরে অভ্যাগত ছিল বেশ কজন। ‘আমার আবার সাক্ষাৎকার কেন?’ — এই ছিল তার প্রথম প্রতিক্রিয়া। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে তার আপাতঃ অনিচ্ছাকে ইচ্ছার অনুকূলে আনতে দু’টি বাক্যের বেশি ব্যয় করতে হয়নি। তবে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত হয় ২৪ ঘণ্টা বাদে।

আমরা মারুফ রায়হানের শীর্ষটীকাটি হুবহু ছাপাইয়া দিলাম। তাহার স্থান শীর্ষ হইতে পাদটীকায় সরাইয়া দেওয়া ছাড়া অধিক হস্তক্ষেপ করিলাম না। পড়ার সুবিধার জন্য খোদ সাক্ষাৎকারটিতে কয়েকটি অধ্যায় নির্দেশ আমরা করিয়াছি। আরো একটি কথা। শিরোনামায় পূর্বাভাস পত্রিকার যোগান দেওয়া ‘মুজিবের তুলনা’ কথাটি বিয়োগ করিয়া আমরা ‘তাঁর তুলনা’ কথাটি যোগাইয়াছি। আহমদ ছফার আদি জবানবন্দিতে যাহা আছে তাহাই হুবহু থাকা উচিত। আমরা মনে করিয়াছি ইহাই বিধেয়। তথাস্তু!

ঢাকা \ ৭ অক্টোবর ২০১৩

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩ - ২৮ জুলাই ২০০১)

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩ – ২৮ জুলাই ২০০১)

মারুফ রায়হান: বর্তমানে আপনার পেশা কি?

আহমদ ছফা: সেটা আমি নিজেও জানি না।

মা. রা.: জীবনধারণের খরচ যোগাচ্ছেন কিভাবে?

আ. ছ.: আমার একটি বাড়ি ছিল। বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছিলাম তার সবটা এখনো ফুরোয়নি। ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’ থেকে শুধু কনভেয়েন্সটা নিই। মাঝে মধ্যে প্রকাশক চিত্তবাবুর কাছে হামলা দিয়ে টাকা আনি। আমার খরচ খুব কম। কিনে মদ খাই না। সিগ্রেটটা খাই। এই ঘরভাড়া খাওয়া-দাওয়া কত আর খরচ — ২/৩ হাজার আর কি! ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি মনে করে আমার জার্মান বান্ধবী ১২০০ ডলার পাঠিয়েছে। যদিও আমি তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হইনি। এভাবেই চলে যাচ্ছে।

মা. রা.: এমনিতে শিল্প-সাহিত্যের কাজ ছাড়া অন্য কিছু করছেন?

আ. ছ.: ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাড়িঘর তৈরি করে দিচ্ছি কক্সবাজার ও মহেশখালিতে। এই কাজ করতে গিয়ে নানান ঝামেলা হচ্ছে। সরকারী অনুমতি যোগাড় করতে হচ্ছে পদে পদে।

মা. রা.: গৃহনির্মাণ প্রজেক্টের টাকা যোগান দিচ্ছে কে?

আ. ছ.: ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’র কাছ থেকে বেশ কিছু সংগ্রহ করা গেছে। আর আমরা নিজেরাও কন্ট্রিবিউট করছি। শুধু অন্যের টাকার উপর নির্ভর করে কাজ করব, নিজেরা কিছু দেব না — সেটা হয় না। মাঝখানে রুদ্রটা মরে ঝামেলা করে গেল। ও ছিল প্রাণবন্ত মানুষ। জ্যান্ত কবি। আমরা ‘বাংলা-জার্মান সম্প্রীতি’ থেকে ওর যাবতীয় বই প্রকাশের ব্যবস্থা নিয়েছি। কবীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, অসীম সাহাদের নিয়ে সাবকমিটিও করা হয়েছে। কবীর চৌধুরী রুদ্রর বেশ কটি কবিতা অনুবাদের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ডাক্তার তপন চক্রবর্তী একটা ভালো প্রস্তাব এনেছে। সেটা হলো ‘রুদ্রমেলা’ করা হবে। ওঁর মৃত্যু বা জন্মবার্ষিকীতে এই মেলা হবে। উৎসব হবে। রুদ্র যেমন হৈচৈ করতো সে রকম কিছু করব সবাই মিলে।

মা. রা.: মদ্যপানের ব্যবস্থা থাকবে? রুদ্র মদ খুব পছন্দ করতো।

আ. ছ.: সে রকম কিছু করা হয়তো সম্ভব হবে না। সামাজিকভাবে বিষয়টা তো সেরকম গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।

মা. রা.: সাম্প্রতিককালের সাহিত্যের অবস্থা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

আ. ছ.: লেখকদের ভূমিকা সবসময় রাজনৈতিক নেতাদের চাইতে কিছু বেশি। দর্শন বিজ্ঞান সম্পর্কিত মানুষের চিন্তাকল্পনা অনুভবশক্তি বৃদ্ধি করার, জগতসংসারের কাছে এসব বিষয় পরিচিত করানোর ভূমিকা লেখককে নিতে হয়। অথচ অনেক লেখকই সাংস্কৃতিক পণ্যের যোগানদার হয়ে গেছে। শারদীয়া/ঈদ সংখ্যা বলে যা চালু আছে তা পৃথিবীর অন্য কোন সংস্কৃতিতে নেই। এসব সংখ্যার লেখকদের ভেতর অর্থ-উপার্জনের আকাক্সক্ষা ছাড়া আর কিছুই কাজ করে না।

হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ

মরণচাঁদের মিষ্টিবিক্রেতার মতো লেখা বিক্রি করাটা অর্থহীন। লেখার চরিত্র বা মেরুদণ্ড না থাকলে সেটা এক ধরনের পানসে বস্তুতে পরিণত হয়। তা কোনো কাজে আসে না। মার্কেস লিখেছিল ৬টি বই, হেমিংওয়ে ৯টি অথচ দেখুন সুনীলের ৪০০ বই, হুমায়ূনের গণ্ডায় গণ্ডায়। চুতিয়া আর কাকে বলে! আর যে দেশে পাঠযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা তৈরি হয় না সেখানে গণতন্ত্র বা অন্য কোনো দাবি অর্থহীন মনে হয়।

মা. রা.: দেশে বর্তমানে যে গণতন্ত্র চর্চা হচ্ছে সে সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

আ. ছ.: একটুখানি পজিটিব মনে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে দেশে। সকলকে সহ্য করার বাস্তব অবস্থান তৈরি হচ্ছে। এই সহনশীলতার ক্ষেত্রটা যত বাড়বে, গণতন্ত্র তত প্রসারিত হবে। ভুট্টো একটি রাজনৈতিক উপলব্ধি ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতীয় রাজনীতির শোরগোলই ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করছে।’ গণতন্ত্রচর্চার জন্য কথা বলা প্রয়োজন। সংসদে সেটা খুব হচ্ছে। কিন্তু সংসদের প্রশ্নোত্তরে যা দেখছি না সেটা হলো মনীষা বা প্রতিভার ঝলক।

খালেদা জিয়ার সরকার সম্পর্কে আমার একটা নালিশ আছে। তাঁর মন্ত্রিসভার মধ্যে একজনও মাথাওয়ালা মানুষ নেই যিনি বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থাটা সামাল দিতে পারেন। যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের ভেতরে দূরদর্শিতার, জাতিগঠনমূলক চিন্তার অভাব আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও দৃষ্টিহীনতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয় এক দিন বন্ধ থাকলে জাতি যেখানে এক বছর দাঁড়িয়ে থাকে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষমতার ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হলে বৃহত্তর মানবিক আকাক্সক্ষা অপমানিত হয়।

মা. রা.: ‘ওঙ্কার’ এর তীব্র তীক্ষè রাজনৈতিক বক্তব্য আপনার আর কোন উপন্যাসে পাওয়া যায়নি, কেন?

আ. ছ.: না। এটা ঠিক নয়। ‘সূর্য তুমি সাথী’ বাংলাদেশের একমাত্র উপন্যাস যেখানে ভূমি হারিয়ে ভূমিহীন কৃষকদের শহরে আসার প্রেক্ষাপট এবং সাম্প্রদায়িক অবস্থা ব্যক্ত হয়েছে। এটা জার্মানে অনূদিত হয়েছে। এ বছর এটার [নতুন সংস্করণ] ছাপার জন্য বলি ‘মুক্তধারা’কে। কিন্তু চিত্তবাবু সাহিত্যের জন্য নয়, ব্যবসার জন্য বই করেন। তিনি ছাপেননি এর নতুন সংস্করণ। আমি দেখেছি আমাদের দেশে পুরো শ্লোগান না হয়ে উঠলে কোনো রচনা লোকে সেভাবে গ্রহণ করতে চায় না।

তারপর ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসের কথা বলবো। এটার শেষ ৩০ পাতা লিখতে পারিনি। কারণ বাঙালি জাতি সম্পর্কে আরও কিছু ইনকোয়ারি বাকি আছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বই হয়েছে প্রচুর। কিন্তু সব লেখকই একটা জিনিস মিস করে যাচ্ছেন। এই জনগোষ্ঠীর একটা অতীত আছে, দীর্ঘ হাজার বছরের মননমানস চিন্তাপদ্ধতি আছে। এসব আসেনি কোনো লেখায়। সবাই পাকিস্তান আর্মির ধর্ষণ দেখাতে ব্যস্ত। কিন্তু সেটা তো যুদ্ধের একটি দিক। জাতি যখন যুদ্ধ করতে যায় তখন তার যে ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটে সেটাও কোন লেখায় আসেনি।

কামরুল হাসান

কামরুল হাসান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় কংগ্রেসীরা এভাবে ব্যাখ্যা করতে চায় যে ভারতবর্ষের [বিভক্তির পেছনে] দ্বিজাতিতত্ত্বের ভুল ছিলো, তাই তারা পাকিস্তান ভেঙ্গেছে। এ ব্যাপারে আমি একমত নই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রমসংশোধন বাংলাদেশ নয়। বাংলাদেশে যেমনটা হয়েছে [তেমনই] কাশ্মীর পাঞ্জাব সিন্ধু আসামেও স্বায়ত্তশাসনের অধিকারের সংগ্রাম হচ্ছে। ভারত বহুজাতিক বহুভাষিক দেশ। সেখানে আসামে ও অন্ধ্রে ভাষা আন্দোলন হয়েছে আমাদের ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর। সমগ্র [পরি]প্রেক্ষিত বিবেচনায় ১৯৭১ একটি নতুন স্তর। ‘অলাতচক্র’ বইটিতে আমি [এই] সমস্ত নতুন কথা বলতে চাই। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন করার আছে — সে ব্যাপারে একটু ভয় পাচ্ছি। আমি কোনো রসালো গল্প বলতে চাই না। ‘রিয়ালপলিটিক’ বলে একটা কথা আছে। আমি রিয়ালপলিটিককে চ্যালেঞ্জ করে লিখতে চাই।

মা. রা.: বাংলাদেশের চিত্রকলা সম্পর্কে আপনার কি ধারণা?

আ. ছ.: বাংলাদেশের চিত্রকলা খুবই উজ্জ্বল। যদিও ঢাকা আর্ট কলেজ কোটারিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান, এর অনুভবশক্তি ভোঁতা, তবু বাংলাদেশের চিত্রকলা গর্ব করার মতো বিষয়।

মা. রা.: আর বাংলাদেশের কবিতা?

আ. ছ.: কবিতাকে স্বচ্ছন্দ স্বতঃস্ফূর্ত মনে হয়। এতে চিন্তামননের ছাপ নেই। বাংলাদেশের কবিতা বাংলাদেশের চিত্রকলার পাশে দাঁড়াতে পারবে না।

মা. রা.: আপনি তো ছবিও এঁকেছেন। সংখ্যায় কত হবে?

আ. ছ.: একশর মতো হবে। ঈদের আগের দিন রঙ তুলি কাগজ কিনেছি, কিন্তু ছবি আঁকতে বসা হয়নি। আসলে সুলতানের ছবি ইন্টারপ্রেট করার জন্যেই আমার ছবি আঁকার সূচনা। তবে একটি দুটি ছবি বাদে সুলতানের ছবি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে টানে না। যখন বাঙালি জাতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি তখন সুলতানের দক্ষতা ও ক্ষমতার তারিফ করি। আমি গাবার্ডিনের তারিফ করি, কিন্তু পরি জিনস। যেসব ছবি আমাকে আনন্দ দেয় সেগুলো নিশ্চয়ই সুলতানের নয়।

মা. রা.: তবে কার?

আ. ছ.: শাহাবুদ্দিনের ছবি ভালো লাগে। মারুফের ছবিও ভালো লাগে।

মা. রা.: কোন মারুফ? সংবাদ পাঠিকা আসমা যার বোন সেই মারুফ আহমদ?

আ. ছ.: আসমার ভাই নাকি সে! মারুফ জার্মানিতে থাকে। এই দেখুন তার এক্সিবিশনের কাগজপত্র। কিন্তু শাহাবুদ্দিন আর মারুফ দেশের মাটিতে কাজ না করলে কৃত্রিমতা ও টেকনিক সর্বস্বতাপ্রবণ হয়ে দাঁড়াবে। ভারতের ফিদা হুসেন, পর্তুগীজ বংশোদ্ভূত ডি সুজা আর গৌরীশ্বর ভট্টাচার্য সমসাময়িক একই মাপের শিল্পী ছিল। ডি সুজা ফ্রান্সে আর গৌরীশ্বর জার্মানিতে চলে গেল। ফিদা হুসেনই এগিয়ে গেল দেশে থাকার কারণে। স্বদেশের মূল উৎসের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয় শিল্পীকে।

মা. রা.: কামরুল হাসানকে কেমন লাগে?

আ. ছ.: কামরুল হাসান আধুনিক সংবেদনের পেইন্টার নন। তাঁকে আমি বড় শিল্পী মনে করি না। তাঁর অনেক ছবি আছে যা বিদেশী ছবির নকল। মেম সাহেবদের তিনি শাড়ি পরিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।

মা. রা.: আর কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী — এদের সম্পর্কে কি ধারণা?

আ. ছ.: কাইয়ুমের বিরাট সম্ভাবনা ছিল। তিনি আমাদের প্রথম মডার্ন পেইন্টার। কিন্তু কিছু স্টুপিড লোকের পাল্লায় পড়ে বুককভার করে নিজেকে নষ্ট করেছেন। তিনি আর গ্রো করলেন না, ছবি আঁকলেন না। প্রচণ্ড বেদনা হয় আরেক তরুণ শিল্পী চন্দ্রশেখরের জন্যে। তার মত রঙের বাহাদুরি আর কেউ দেখাতে পারেনি। কিন্তু সে ছবি আঁকছে না। রফিকুন নবীর ছবিতে  গিন্নীপনাটা আছে। ফিগার টোন রঙ চমৎকার। ডিটেল অসাধারণ। কিন্তু নবী তাঁর ক্ষেত্র খুঁজে পাননি কিংবা খুঁজে নিচ্ছেন না। কার্টুন করে নিজের বিরাট ক্ষতি করেছেন। তাঁর প্রতিভা কার্টুনিস্টের নয়।

মা. রা.: কবিতা লিখছেন না?

আ. ছ.: ‘কবি ও সম্রাট’ নামে একটি কাব্যনাটক লিখেছি। অন্য কোনো লেখা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা নেই। কবিতা নিয়ে আছে। শিল্পের ক্ষমতার সর্বোচ্চ বিকাশ হয় কাব্যে। কবিতা সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। যৌনক্ষমতার মতো কবিদের কবিতা রচনার ক্ষমতা থাকে। যৌনক্ষমতা থাকলেই যেমন ভালো বাচ্চা পয়দা হয় না তেমনি অনেক কবিকে দিয়েও উৎকৃষ্ট কাব্য তৈরি হয় না। আসলে আমাদের কবিতায় মনীষার চর্চা নেই। [আছে] শুধু তাৎক্ষণিক আবেগ।

মা. রা.: শামসুর রাহমানের কবিতা কেমন লাগে?

শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান

আ. ছ.: শামসুর রাহমান সম্পর্কে আমার মতামত খানিকটা জটিল। আমার কাছে আমাদের সংস্কৃতির প্রিয়তম ব্যক্তিত্ব জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। তাঁর পরেই রয়েছেন শামসুর রাহমান। উদারতা প্রসন্নতা গ্রহণশীলতায় তিনি তাঁর প্রজন্মের ব্যতিক্রম। তাঁর সম্পর্কে অপ্রিয় ও নিষ্ঠুর কথা বলতে কষ্ট লাগে। তার উল্লেখযোগ্য কাজ হলো — ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র করোটিতে’, ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, ‘নিরালোকে দিব্যরথ’, ‘নিজ বাসভূমে’ [প্রভৃতি] কাব্যগ্রন্থ। এর পরের কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁর কাব্যিক ব্যক্তিত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে [এ কথা] আমি বলবো না — আবার এগুলো না লিখলে তার কাব্যিক ব্যক্তিত্ব ম্লান হতো তাও মনে করি না। আমাদের আধুনিক কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি। কিন্তু আবহমান বাঙালি মানসের সঙ্গে তাঁর দূরত্ববোধ কোথায় যেন রয়েছে। এটা একসময় তাঁর কবিতাকে বৈশিষ্ট্য দিয়েছে আবার অন্যসময় আড়ষ্ট করেছে।

মা. রা.: ‘বৈশিষ্ট্য দেয়া’ এবং ‘আড়ষ্ট করা’ প্রসঙ্গে একটু ব্যাখ্যা দেবেন?

আ. ছ.: প্রথম দিকে বুদ্ধিস্নিগ্ধ কবিতা লিখেছেন তিনি। যেমন ধরুন —

এই সেই পৃথিবী অপার মাঠ যার এতকাল

সুপুষ্ট স্তনের মতো ফল আর ফাল্গুনের ফুল

করেছে উৎসর্গ নিত্য সন্তানের শ্রম প্রজ্ঞা প্রেমে

পূর্ণ হয়ে দীর্ণ হয়ে? এই সেই পৃথিবী সাবেকী?

এরকম কবিতা লিখে চিন্তাকল্পনার জগতে মুক্ত বাতাস তিনি এনে দিয়েছিলেন। এটা তাঁর বৈশিষ্ট্যের দিক। কিন্তু বাংলা পুঁথিসাহিত্য ও লোকসাহিত্য নবায়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেননি তিনি। বাংলা কবিতার বাসভূমে তিনি নিজেই পরবাসী। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে। সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর গদ্যরচনায় মৌলিক চিন্তা কাজ করতে দেখা যায় না। ব্যক্তিগত অনুভূতিই তিনি প্রকাশ করেছেন।

মা. রা.: শামসুর রাহমান ছাড়া কবিতায় আর কাকে কাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়?

আ. ছ.: শহীদ কাদরী। আল মাহমুদ। নির্মলেন্দু গুণ। গুণের তিনচারটি কাব্যগ্রন্থ ভালো। আর হেলাল হাফিজ [নামক] তরুণটির কবিতা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কিন্তু সে তো লিখছে না। অন্যদিকে পঁচাত্তরের পর আবার মুজিবের পক্ষেবিপক্ষে কবিতা লেখা শুরু হয়েছে।

মা. রা.: ‘জাতির পিতা’ কনসেপ্টে বিশ্বাস আছে?

আ. ছ.: এটা কল্পনা করতে খারাপ লাগে। ‘জাতির পিতা’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ বললে যে শেখ মুজিবকে অধিক সম্মান দিয়ে ফেলব এটা ঠিক নয়। বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে তাঁর তুলনা নেই।

মা. রা.: কিভাবে?

আ. ছ.: হেগেলের একটা কথা আছে। কোন জাতির সবচেয়ে বড় সৃষ্টিকর্ম হচ্ছে রাষ্ট্র। শেখকে আশ্রয় করে এ অঞ্চলের লোক একটি রাষ্ট্র পেয়েছে। এটা অস্বীকার করলে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘জাতির পিতা’ ইত্যাদি বলে অতিশয়োক্তি করতে বিরক্ত লাগে।

মা. রা.: ‘ফাউস্ট’ শেষ করছেন না কেন?

আ. ছ.: সে ক্ষমতা আমার নেই। প্রথম পার্টটি যখন শেষ করেছিলাম তখন সেই অনুবাদ শোনানোর মত লোক পাইনি। মঞ্জুরে মওলার আমলে বাংলা একাডেমীকে পাণ্ডুলিপি [দিয়েছিলাম]। মাত্র দুহাজার টাকার বিনিময়েও তাঁরা ছাপতে রাজি হয়নি।

মা. রা.: কি লিখছেন এখন?

আ. ছ.: অর্থনীতির বই। রাজনৈতিক ও উন্নয়ন প্রেক্ষাপট নিয়ে ‘উন্নয়ন স্ট্রাটেজি’ নামে বই লিখছি। আর লিখছি গান। শ দুয়ের মতো লিখেছি। বাংলা লিরিকের ক্ষেত্রে খুব অল্প হলেও মেজর কন্ট্রিবিউশন হবে এই গানগুলো। সুরের ক্ষেত্রেও আমার কিছু বলার আছে। এই সময়ের সংবেদনা আমার গানের সম্পদ।

মা. রা.: গানগুলো প্রচারের ব্যবস্থা নিচ্ছেন না?

আ. ছ.: আত্মার পবিত্রতা হলো সঙ্গীত। প্রচারটা বড় কথা নয়।

মা. রা.: কিন্তু গানকে তো গীত হতে হবে।

আ. ছ.: একটি গান তো গাইতে দিয়েছিলাম। বিট নষ্ট করে ফেলেছে।

মা. রা.: ‘ঘর করলাম নারে আমি সংসার করলাম না’ গানটির কথা বলছেন? সেটির সুর কি আপনি দিয়েছিলেন?

আ. ছ.: হ্যাঁ। বিটটা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু ফকির আলমগীর নষ্ট করে ফেলেছে। কোথাও উল্লেখও করে না যে গানটি আমার। আমি মামলা করতে পারতাম। কিন্তু তাহলে রেডিও টিভিতে তাঁর গাইবার অধিকার চলে যেত। এটা করতে কষ্ট হলো।

মা. রা.: এত বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন আপনি। আসলে কি হতে চেয়েছিলেন?

আ. ছ.: ইচ্ছে ছিল লেখক, ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক হব। রাজনীতিক হওয়া সম্ভব না এটা বুঝেছি অল্পদিনেই। কারণ রাজনীতি করতে গেলে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। যে ধরনের কৌশল গ্রহণ করতে হয় সে সবের যোগ্য আমি নই।

মা. রা.: মাঝখানে ‘উত্তরণ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করছিলেন। ওটা করবেন না?

আ. ছ.: না। ‘উত্তরণ’ করবো না। যা কিছু দীর্ঘজীবী হয় তাই নষ্ট হয়ে যায়। একটি সাহিত্যপত্রিকা করব। এর আয়ুকাল হবে দু বছর।

মা. রা.: বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

আ. ছ.: দেখুন, সমগ্র সংস্কৃতিকে নষ্ট করার পেছনে দুটো লোক দায়ী — হামিদুল হক চৌধুরী আর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। এঁরা যখন ‘চিত্রালী’-‘পূর্বাণী’ বের করেন তখনও এদেশে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠেনি। কিছু ধনীর টাকায় নটীদের ছবি ছাপিয়ে সস্তায় পণ্য বের করার পাইওনিয়ার এঁরাই। জনরুচিকে কলুষিত করার চেষ্টা নেয়া হয় [এঁদের সময়]। এটা ছিল পুরো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এই ধারাটি যতদিন না ভাঙ্গছে বিকল্প ভালো ছবি তৈরি হবে না।

মা. রা.: যে দুজনের কথা বললেন তাঁরা কি এতটাই পাওয়ারফুল যে সংস্কৃতিকে কলুষিত করতে পারেন?

আ. ছ.: নিশ্চয়ই। ‘চিত্রালী’-‘পূর্বাণী’ এ দুটো ক্রিমিনাল কাজ। ‘ইত্তেফাক’ কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ছাপে অথচ সাহিত্যের জন্য পাঁচ শত টাকা খরচ করতে বাধে। এরা মধ্যযুগ থেকে ১০০ বছর পিছিয়ে আছে। আর স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নয়, ছবির বাচ্চা [নয়]। করতে হলে ফুল লেন্থ ছবি করতে হবে। না হলে বেশিদূর এগুনো যাবে না। তবে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা।

মা. রা.: দেখেছেন ছবিটা?

আ. ছ.: না, দেখিনি। তবু ভালো ধারণা। এটা প্রমাণ করেছে রূপকথার ভিতরে কোথাও একটা জিয়নকাঠি আছে। বম্বের ছবির নকলবাজির যুগে এটা একটা ব্রেক থ্রু। যেমন ব্রেক থ্রু ছিল একাত্তরের আগে ‘রূপবান’, ‘বেহুলা’, ‘অরুণ বরুণ কিরণমালা’। সংস্কৃতির সংকট থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া আমাদের ঐতিহ্যের ভেতরেই আছে। অন্যদিকে অঞ্জুকে আমার হট নায়িকা মনে হয়েছে, পাকিস্তানের নিলোর বাংলা সংস্করণ।

মা. রা.: কিন্তু অঞ্জুকে তো আপনি দেখেননি।

আ. ছ.: কেন? টিভিতে, বিজ্ঞাপনে দেখেছি।

মা. রা.: তাহলে নায়কদের কেমন লাগে?

আ. ছ.: আমাদের হিরোরা সব টুথপেস্ট হিরো।

মা. রা.: আপনি কি কনফার্মড ব্যাচেলর?

আ. ছ.: আমি কোনো ব্যাপারেই কনফার্মড নই। কখনো কিছু ধরিনি। যখন যা এসেছে তাই করে গেছি। কলমা পড়ে বিয়ে করাটা বাঙালি মুসলমানের কাছে পরিচিত তরিকা। ওটা কারাগার। ওটা পারবো না।

মা. রা.: কারাগারটা কি নারীপুরুষ দুজনের জন্যেই?

আ. ছ.: ওঁদের কথা জানি না। মহিলারা হয়তো এই কারাগারের জন্য তৈরি হয়েই থাকে।

মা. রা.: নারীবাদীরা অন্য কথা বলে।

আ. ছ.: বাংলাদেশে ডা. রওনক জাহানই ছিলেন একমাত্র প্রকৃত নারীবাদী। নষ্ট মেয়েরা নষ্টামির ছাড়পত্র হিশেবে নিয়েছে নারীবাদকে। আসলে নারীবাদীরা পুরুষবিরোধী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সমকামীরাও বিপরীত লিঙ্গের প্রতি উদাসীন। এই বিষয়গুলো পৃথিবীকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাবে সে ব্যাপারে আমার একাডেমিক ইন্টারেস্ট আছে। আমি উত্তেজনা বোধ করি।

মা. রা.: সমকামিতাকে কি দৃষ্টিতে দেখেন?

আ. ছ.: চট্টগ্রামে হচ্ছে। জসীমউদ্দিন সমকামী ছিলেন। সমকামিতাকে বিবেকহীন মনে করি না। তবে আমার নিজের কথা বলি। আমি এস্তেমাল (ব্যবহার) করিনি।

মা. রা.: ঘর-সংসার করা বা না করার সুবিধা অসুবিধা সম্পর্কে কি মনে হয়?

আ. ছ.: সুবিধা অসুবিধা বা লাভক্ষতির হিশেবে কিন্তু দেখিনি। পূর্ণ মানুষের মতো বাঁচার প্রচণ্ড ইচ্ছা আছে। কবি লেখক শিল্পী এগুলো তো  মানুষ পরিচয়ের খণ্ডাংশ। আধুনিক মানুষের ভেতর নির্দিষ্ট বিশ্বাস নেই। দায়িত্ব পালন করতে পারে না। সংশয়ে ভোগে। মুসলিম সুফিদের ভূমিকায় যখন নিজেকে দেখি তখন আনন্দ লাগে। আল্লাহকে আমি ঘরের লোক হিশেবে দেখতে অভ্যস্ত। পৃথিবীর নির্মাতা হিশেবে নয়। আল্লাহকে নিয়ে আমার কোন কাজ নেই। রবীন্দ্রনাথ লালনেরা বুঝতেন এই ঘরের ব্যাপারটি। অন্যেরা সরাসরি নাস্তিক হয়েছেন। বৃহত্তর মানব সংসারের মধ্যে আমি বাস করছি। এখানে সবসময় আমার করার কিছু [না কিছু] আছে। মানুষকে কোনো সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। ঈশ্বরের মতো ভ্যারাইটি হচ্ছে মানুষ। মানুষের একটা না একটা বাতিক থাকবেই।

মা. রা.: আপনি তাহলে এখন রাগী চরিত্র থেকে মুসলিম সুফির প্রসন্ন ভূমিকায় নিজেকে দেখতে পছন্দ করছেন?

আ. ছ.: আম যখন কাঁচা থাকে তখন কিন্তু টক থাকে, পাকলে মিষ্টি হয়।

প্রথম প্রকাশ: সাতদিনের পূর্বাভাস, ২৯ জুলাই ১৯৯১

শীর্ষটীকা: মারুফ রায়হানের মন্তব্য


আহমদ ছফা সম্পর্কে বাজারে অজস্র কথা চালু আছে। একদলে আছেন তাঁর কাজেকর্মে মুগ্ধ বিস্মিত অনুরাগী — অপর দলে আছেন সন্দিগ্ধ সমালোচক। শেষোক্তদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা মনে করেন আহমদ ছফা সিনিক, পাকা স্টান্টবাজ। তিনি যেসব কথাবার্তা বলে থাকেন বা লেখেন তা সংবাদ শিরোনাম হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই। এসব মতামত থেকে স্পষ্টত বোঝাই যাচ্ছে যে মাঝ-চল্লিশের এই অবিবাহিত প্রাণবন্ত ব্যক্তিটি কতটা আলোচিত। বিতর্কিত। সারাদেশে আহমদ ছফা একজনই আছেন। তাঁর বিকল্প নেই। হয় না। সমাজের ব্যতিক্রমী চরিত্র বটে একখান। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের নামে আড্ডায় বা আলোচনায় বসাটাও ঝক্কির ব্যাপার। মজার ব্যাপারও।

আহমদ ছফার বই বাজারে তেমন সহজলভ্য নয়। যে উপন্যাস লিখে তিনি খ্যাতিমান হয়েছিলেন সেই ‘ওঙ্কার’ বইটি এখন পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার পর [প্রকাশিত] ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ নামের প্রবন্ধগ্রন্থটিও যথেষ্ট আলোচিত হয়েছিল। লেখালিখিতে তাঁর আরো দুটো কীর্তি আছে। [চিত্রশিল্পী] এস এম সুলতান সম্পর্কে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন [তিনি]। এছাড়া মহাকবি গ্যেটের ‘ফাউস্ট’ অনুবাদ করেছেন। উপন্যাস ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’ [আর] প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ও কমবেশি আলোচিত হয়েছিল। গত সপ্তাহে বেরিয়েছে ইংরেজিতে লেখা ভ্রমণকাহিনী ‘জার্মান পারস্পেকটিব’। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আহমদ ছফা সম্পর্কে তেমন জানতে পারেনি। পূর্বাভাসের নির্দেশে আহমদ ছফার সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ হয় মাসতিনেক আগে। কবি সোহরাব হাসানের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে রাখা হয় সাক্ষাৎকার নেয়ার কথাটি। তারা উভয়েই একই ফ্লাটে বাস করেন।

২২ জুলাই সোমবার বিকেলে আহমদ ছফার ঘরে অভ্যাগত ছিল বেশ কজন। ‘আমার আবার সাক্ষাৎকার কেন?’ — এই ছিল তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে তাঁর আপাত অনিচ্ছাকে ইচ্ছার অনুকূলে আনতে দুটি বাক্যের বেশি ব্যয় করতে হয়নি। তবে সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত হয় ২৪ ঘণ্টা বাদে। সময়মত গিয়ে দেখা যায় প্রায়ান্ধকার ঘরে বিছানায় পড়ে আছেন। খালি গা। কারেন্ট ফেল করাতে আলোর অভাব আর গরমের আধিক্যে ঘরের পরিবেশ আরো নির্জন। গায়ে জামা পরতে পরতে সিগারেট এগিয়ে দিয়ে মুখোমুখি বেতের চেয়ারে বসলেন।

ঘরখানি ছোট্ট। কিন্তু এক চিলতে ঘরের ভেতরেই স্বয়ংসম্পূর্ণ সংসার আহমদ ছফার। ডিজিটাল ফোনসেট বিছানার ওপরেই শোয়ানো। খাটের পায়ের কাছে স্টিলের আলমারী এবং একটি বড় টেবিল। টেবিলের ওপর বইপত্রের পাশে হারমোনিয়াম। দু দুটো আলনায় কাপড় ছড়ানো ছিটানো। খাটের মাঝবরাবর আরেকটি টেবিল, লেখালেখির সরঞ্জাম ছড়ানো। দরজার পাশে বেতের চেয়ার টেবিলের পেছনে বুকশেলফ বইয়ে ঠাসা। আরেকটি ছোট্ট টেবিলের ওপর টিভি রাখা।

দেয়ালে গ্যেটের বিশাল ছবি। অন্যপাশের দেয়ালে ক্যালেন্ডারের নিজের দিকটার টেপ দিয়ে সাঁটা পোস্টকার্ড সাইজ ছবি। একহাতে ফুল আর অন্যহাতে সিগ্রেট নিয়ে হাসছেন আহমদ ছফা। পাশে শিল্পী সুলতান ও কবি শামসুর রাহমান। ছবিটা ছাপার জন্যে চাইলে দিলেন না। বললেন নিজেকে ঐ ছবিতে নাকি [তাঁকে] কুত্তার বাচ্চার মতো লাগছে।

যা হোক কথা হলো সাকুল্যে দুঘণ্টা। মাঝে সোহরাব হাসান এসে ফোন করে গেলেন। বিদ্যুৎ চলে আসলো। কথার মাঝখানে বাদাম চিবোতে চিবোতে এলেন ‘আদমসুরত’ ছবির নির্মাতা তারেক মাসুদ। টিভিতে এশিয়ান ক্লাব কাপ ফুটবলে মোহামেডানের খেলা ছিল। টিভি অন হলে আলোচনা অফ করতে হলো। অফ দ্যা রেকর্ডেও কিছু কথা হলো। তা ছাপতে পারলে ভালোই হতো। আহমদ ছফার অনেক কথার সঙ্গেই হয়তো অনেকে একমত হতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর মতো অকপটে নিজের বিশ্বাসের কথা এই সুবিধাবাদের যুগে কজনাই বা বলতে পারেন!

সাদা ধূসর জঙ্গলের দিনরাত্রি — অনন্ত ইউসুফ

অনন্ত ইউসুফ

অনন্ত ইউসুফ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ৫ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ভেড়ামাড়ায় বসে বাগেরহাটের রামপালের বহুল সমালোচিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘ডিজিটাল মোড়ক’ খুললেন। এই মোড়কের রঙ্গিন খামে ১,৩৪০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাথে আছে রামপালের ঠিক পাশের ইউনিয়ন বুড়িরডাঙ্গা থেকে শুরু করে মংলা পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পায়ন, জাহাজভাঙ্গা শিল্প এবং সরকারের ইচ্ছা মোতাবেক মংলা শিল্পনগরী। এরই মধ্যে প্রায় ৩০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে পশুর নদী, কুমারখালি, দাউদখালি, বিশনা, মাদারতোলা এবং বেতবুনিয়া খালপাড়ে। আর চোখের ধূসর পর্দায় ভাসছে সাদাটে প্রাণ-প্রাণীহীন সুন্দরবন।

‘আমার কিছুটা দেরী হয়ে যায়, জুতোয় পেরেক ছিল…।’ যদি ভুল না করে থাকি তবে নিশ্চিত সন্দীপন চট্টোপাধ্যয় এভাবেই লিখেছেন তাঁর ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’ উপন্যাসে। তিনি নিজেকে নিয়েই লিখেছেন। তবে মনে হয় তাঁর কথাটা আমাদের সম্বন্ধেই।

পেরেক আমার জুতোতেও আছে তাই রামপালে জমি অধিগ্রহণ শুরুর প্রায় আড়াই বছর পর লিখছি। পেরেক আমাদের জুতোতেও আছে। তাই পত্রিকাওয়ালা, কলমজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট যারা দাবি করছেন গত আড়াই বছর ধরে সোচ্চার ছিলেন, নিঃসন্দেহে তাদের সেইসব চিৎকারের ওজন ছিল ফিশফাশের মত। আর এই ফাঁকে দখল হয়েছে ১,৮০০ একর আবাদী জমি। চলছে দিন রাত পশুর নদীতে ড্রেজিং। মাটিতে ঢাকা পড়েছে ৫০০ একর জমি। অতিরিক্ত ড্রেজিংয়ের চাপে হুমকির মুখে ১২০ প্রজাতির জলজ প্রাণী। ২০১০ সালে নির্ধারিত জমির-দরে চলছে পুর্নবাসন কাজ। আর জমি ফেরত চেয়ে পথে নামা, শ্লোগান দেওয়া চাষিদের কপালে জুটছে ১৪৪ ধারা। জেল। জুলুম।

রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব এবং সুন্দরবন বিষয়ে মতামতগুলো প্রধানত দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এই দুই মতামত নির্মিত হয়েছে মূলত প্রবল ক্ষমতাধর সরকারের ‘পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না’ এবং পরিবেশ সচেতন শব্দজীবী মানুষের ‘ধ্বংসের মুখে সুন্দরবন’ এই দুই টেক্সেটের উপর।

দুই প্রান্তে এই দুই নির্মাণের মাঝে ‘ধ্বংসের মুখে সুন্দরবন’ দর্শক-পাঠককে সক্রিয় করে তুলেছে। তারা পঠিত তথ্য উপাত্ত নিয়ে বসে থাকেনি, পৌঁছে দিয়েছে অন্য মানুষের হাতে। এই প্রক্রিয়ায় গত কয়েক মাসে সুন্দরবন বাচাঁও আন্দোলন তার জন-রাজনৈতিক চরিত্র সুসংহত করেছে প্রবলভাবে।

ছবি: অনন্ত ইউসুফ

ছবি: অনন্ত ইউসুফ

তবে এও সত্যি জন-রাজনৈতিক চরিত্র নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতার ফাঁকতালে সরকার প্রকাশ করেছে বিতর্কিত ইএইএ রির্পোট। একদিনের জন্যও থেমে থাকেনি জমি অধিগ্রহণ কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। তদুপরি এগিয়ে এসেছে মোড়ক উন্মোচন।

গত তিন বছরে মংলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ২,০০০ বিঘা জমি পুঁজিপতিদের দখলে গেছে। অথচ এখনো এই আন্দোলনের এজেন্ডায় যোগ হয়নি মংলায় চলমান শিল্পায়ন। সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন এই জঙ্গলের দিনরাত্রি বার্ন ফটোগ্রাফের মতন সাদা ধূসর প্রান্তরে পরিণত হবে।

রাষ্ট্রের হৃদরোগ–সলিমুল্লাহ খান

বর্তমান নিবন্ধটি মূলত ভূমিকা — লেখা হইয়াছে বিধান রিবেরু রচিত ও প্রকাশিতব্য ‘শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা’ কিতাবের জন্য। ঐ ভূমিকাটি অত্র ‘রাষ্ট্রের হৃদরোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত হইতেছে

গত দশ বছরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে যে সকল তরুণ চিন্তাবিদের সহিত আমার পরিচয় ঘটিয়াছে তাঁহাদের মধ্যে বিধান রিবেরু সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল। গায়ের রঙ্গের কথা বলিতেছি না। বলিতেছি তাঁহার চিন্তাশক্তির কথা। আপনার হাতে ধরা এই প্রবন্ধ সংকলনেও তাহার সামান্য প্রমাণ পাওয়া যাইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

বর্তমানে যে প্রজাতন্ত্রে আমরা বসবাস করিতেছি তাহার প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল ১৯৭১ সালে। প্রজাতন্ত্রের বয়স সেই হিশাবে আজ বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রম করিতেছে। ক্ষুদ্র মানবশিশুর সহিত রাষ্ট্রের তুলনা করা কোনক্রমেই সঙ্গত নহে। হইলে এই রাষ্ট্রকেও এতদিনে প্রাপ্তবয়স্ক বলা যাইত। দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাদের এই রাষ্ট্র এখনো তাহার প্রাণের অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের সংকট কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে সামাজিক ন্যায়বিচারের জাতীয় দাবিতে পরিচালিত হইয়াছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাহার একাংশ পূর্ণ হইয়াছে — এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু দাবির আরেক অংশ অপূর্ণই থাকিয়া গিয়াছে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে শ্রমিকশ্রেণির তথা সর্বজন সাধারণের মুক্তি ঘটে নাই। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিতে পারেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিভা এমনই যে তাহাতে জনগণকে দেশশাসনের কঠোর কর্তব্য হইতে দূরে রাখাই নিয়ম হইয়া দাঁড়ায়। সর্বজনের মুক্তির শর্ত তাহার পরও এই প্রজাতন্ত্র — এ কথা ভুলিয়া যাওয়া ঠিক হইবে না। তবে ফ্যাসিতন্ত্রের নব্য প্রবর্তকরাই এই জাতীয় মনভোলানো প্রচারণা চালাইয়া থাকেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যাঁহারা গণহত্যা চালাইয়াছিলেন তাঁহারা ছাড়া পাইয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের বিচার হয় নাই। আর যাঁহারা ঐ গণহত্যার সহযোগী ছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মাত্র সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিচারের মুখোমুখি হইয়াছেন। এই বিচার না হওয়া (বিচারে বিলম্ব ঘটার মানেও প্রবাদ বাক্য অনুসারে বিচার না হওয়া বটে) মানে বিপ্লব বেহাত হওয়া।

তাহার পরও বলিতে হইবে বিপ্লব মানে ঘটনা বিশেষ নহে। বিপ্লব মানে যাহা ভাসিতে থাকে। প্লব হইতে প্লাবন তাই বিপ্লব চলিতেই থাকে। সেই বিচারে বিচার করিতে হইলে বলিতে হইবে ১৯৭১ সালে যে বিপ্লব শুরু হইয়াছিল তাহারও পর আছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসিত ও ব্রিটিশ প্রভাবিত ভারত ভাগ হইয়াছিল ধর্মভিত্তিক স¤প্রদায় পরিচয়কে বড় করিয়া। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠন করা হইয়াছে সেই পরিচয়কে নাকচ করিয়া। ভারতবর্ষের জাতি সমস্যা বলিতে যাহা একদা বুঝাইত — ১৯৪৭ সাল যাহার সত্য সমাধান বাতলাইতে পারে নাই — ১৯৭১ সাল তাহার সত্যকার সমাধান কিভাবে হইতে পারে তাহা একপ্রকার দেখাইয়া দিয়াছে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পথ সারা দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ভবিষ্যৎ পথের রূপরেখা মাত্র।

এ সত্যে যাঁহাদের সন্দেহ তাঁহারা ১৯৭১ সালের মর্মকথা ধরিতে পারেন নাই। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র গঠনের এই তাৎপর্য আন্তর্জাতিক। দক্ষিণ এশিয়ার সকল নিপীড়িত জাতির মুক্তির রাজনৈতিক পথ দেখাইতে পারে বাংলাদেশ। আজ অনেকেই এই সত্য ভুলিতে বসিয়াছেন।

3.1বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল বিভিন্ন ধর্ম-স¤প্রদায়ের অন্তর্গত ঐক্য ও মিলিত সংগ্রামের মধ্যে। তাই যাঁহারা এই নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ঠেকাইতে পারেন নাই তাঁহারা এখনো চেষ্টা করিতেছেন কি করিয়া ইহার সা¤প্রদায়িক ঐক্য বিনষ্ট করা যায়। এই চেষ্টা দুই দিক হইতেই হইতেছে। একদিকে আছেন তাঁহারা যাঁহারা এই দেশকে অভাগা পাকিস্তানের আদর্শে মুসলমান রাষ্ট্র বানাইতে চাহিতেছেন। আরদিকে আছেন ভারতে নতুন করিয়া প্রবল হওয়া হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীর দল। তাই বলিতেছিলাম বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো এই মহাদেশের রাজনৈতিক হৃদরোগ হইতে মুক্ত হয় নাই। এই হৃদরোগ কথাটি আমি আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে ধার করিয়াছি। ইংরেজি অনুবাদে এই রোগের নাম ‘অর্গানিক ক্রাইসিস’। এই রোগে প্রাণ কিন্তু বিপন্ন হইতে পারে।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রপাত ব্রিটিশ জাতির শাসনকালে। এখনো তাহারই জের এই দেশে চলিতেছে। এই হৃদরোগ হইতে মুক্তি পাইতে হইলে আমাদের হৃদয়বান চিন্তাবিদ দরকার। শুদ্ধ একজন নহে। সর্বজনের মধ্যে এই চিন্তাবিদরা যতদিন দেখা না দিবেন ততদিন আমাদের হৃদরোগ নিরাময় হইবে না। রাষ্ট্রকে যদি কোন জীবদেহের সহিত তুলনা করা যাইত তবে আমি যাহাকে হৃদরোগ বলিতেছি তাহার অর্থ অনুধাবন সহজ হইত।

আমার বন্ধু বিধান রিবেরু আমাদের দেশ ও জাতির এই দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগের একটা বিশেষ আলামত বিশ্লেষণের সামান্য চেষ্টা করিয়াছেন। এই সংকলনে তাহার কিছু প্রমাণ আপনি পাইবেন। আমিও পাইয়াছি।

বিধান রিবেরু দেখাইয়াছেন ১৯৭১ সালে যাঁহারা যুদ্ধাপরাধ করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ বিচারের সম্মুখীন হওয়ার পর দেশে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হইয়াছে। যাঁহারা যুদ্ধাপরাধীদের যথার্থ বিচার চাহিয়াছেন তাঁহারা প্রথম দল। গত ৪২ বছর ধরিয়াই এই দাবি জাগরুক। এই দাবির সর্বশেষ চিহ্ন শাহবাগে সংগঠিত প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ স্বাভাবিক নিয়মেই ১৯৭১ সালের স্মৃতিতে স্মার্ত হইয়াছে।

আর এই বিচারকে ব্যাহত করিবার জন্য যাঁহারা ছলে বলে কৌশলে লড়াই করিতেছেন তাঁহারা দ্বিতীয় দল। এই দলের শেষ হাতিয়ার হইয়া দাঁড়াইয়াছে ধর্ম-সা¤প্রদায়িক প্রচারণা। ইঁহারা এসলাম রক্ষার আওয়াজ তুলিতেছেন। কিন্তু এই আওয়াজের আশু লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যাহত করা বৈ নহে। বিধান রিবেরু বর্তমান সংকলনভুক্ত তাঁহার সকল লেখায় এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন।

আশা করি তিনি ভবিষ্যতে এই ধর্ম-সা¤প্রদায়িক রাজনীতির দূরবর্তী লক্ষ্য বিষয়েও মুখ খুলিবেন। শাহবাগে সমবেত প্রতিবাদ সমাবেশ হইতে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের হৃদরোগ কোন জায়গায় তাহার আলামত স্পষ্ট — নতুন করিয়া স্পষ্ট — হইয়াছে। যুদ্ধাপরাধীরা আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিশাবে পাল্টা হামলার কৌশল বাছাই করিয়াছেন। তাঁহারা প্রতিবাদকারী ও বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষকে ‘নাস্তিক’ বলিয়া আক্রমণ করিতেছেন। এই কৌশল নতুন নহে। বেগম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অন্যূন ২০ বছর আগে যে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হইয়াছিল তখনো এই কৌশল দেখা গিয়াছিল।

এইবারের নতুন দিক অনেক। তাহার শুদ্ধ একটির উপর বিধান এখানে মনোনিবেশ করিয়াছেন। কোন দিক এইটি? যুদ্ধাপরাধী মহলের সমর্থনে এইবার মুখোশ খুলিয়া আগাইয়া আসিয়াছেন সুপ্রসিদ্ধ কবি ও যশপ্রার্থী দার্শনিক ফরহাদ মজহার। বিধান একাধিক লেখায় এই নব্য ফ্যাসিবাদী প্রচারকের মুখোশ খুলিয়া দিয়াছেন।

সত্যের খাতিরে স্বীকার করিতে হইবে — বর্তমানে ফরহাদ মজহারের সমকক্ষ প্রচারক যুদ্ধাপরাধী মহলে দ্বিতীয়টি নাই। তিনি মহাত্মা আহমদ ছফার লেখা কিভাবে বিকৃত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতে পারেন তাহার একটি নমুনা এই সংকলনের ‘ঘুরিয়া দাঁড়াইব কোথায়’ প্রবন্ধে বিধান দেখাইয়াছেন। এই প্রবন্ধ লিখিয়া তিনি আমাদের ঋণী করিয়া রাখিলেন।

যাঁহারা কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ ও মাৎসর্য হইতে মুক্ত হইয়া এই সংকলনের রচনা পড়িবেন তাঁহারা দেখিবেন বিধান রিবেরু কিভাবে পদে পদে আমাদের নতুন যুগের সংগ্রামে নেতৃত্ব

দিবার যোগ্য হইয়া উঠিতেছেন। আমিও তাঁহার সংগ্রামে যোগ দিতে চাহি।

বিধানের বহিটা আমি যতদূর পারি আদ্যোপান্ত পড়িয়াছি। শুদ্ধ একটা জায়গায় আমার মনে হইল তিনি আরো একটু ভাবিলে ভাল করিতেন। ‘মদিনার সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি লেবাননী বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ফিলিপ হিট্টির কথা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হিট্টি বলিয়াছিলেন এই ‘মদিনার সনদ’ জিনিশটা এসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্বরূপ হইয়াছিল। ইহা লইয়া তর্ক চলিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে আড়াই হাজার বছর আগের রোম প্রজাতন্ত্র কয়েকশত বৎসর পর রোমান সাম্রাজ্যে পরিণত হইয়াছিল। তাই বলিয়া নিকোলো মেকিয়াবেলি ‘প্রজাতন্ত্র’ জিনিশটাকে খাট করিয়া দেখেন নাই। আমরাও বলিব প্রজাতন্ত্র বা জনসাধারণের কতৃত্বই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাভূমি।

‘মদিনার সনদ’ একটা রূপকথা। কিন্তু ইহার মর্মকথা কি? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। একাধিক ধর্মবিশ্বাসের মানুষ এক রাষ্ট্রে বসবাস করিতে পারেন কিনা তাহার নমুনা বলিয়া ইহাকে গ্রহণ করা যায়। বিধান প্রশ্ন তুলিয়াছেন এই রূপকথার তুলনীয় অন্য রূপকথা বিলাতের সনদ — ওরফে ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মহাসনদ — প্রসঙ্গ তোলা উচিত কিনা। মনে রাখিতে হইবে রূপকথা ভাষার মতন। তাহার বাসস্থান অজ্ঞানলোকে। ইহা পছন্দ বা অপছন্দের কথা নহে। গান্ধিজি রামরাজ্যের কথা তুলিয়াছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগের ভারত রামরাজ্য হইয়াছে কি?

বিধানের পরামর্শ আমরা গ্রহণ করি কি না করি তাহা বড় কথা নহে। তাঁহার প্রশ্নটা গুরুর প্রশ্ন, গুরুতর প্রশ্ন। আমরা এই প্রশ্ন কাঁথাচাপা দিতে পারিব না। ইহা জাগিয়া উঠিবেই।

তাঁহার প্রশ্ন আমার কাছে আরো এক কারণে তৎপর হইয়া উঠিয়াছে। বিধান বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম স¤প্রদায়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। এই ঘটনাটিকে ছোট করিয়া ভাবিবার কোন উপায় নাই। বাংলাদেশের জাতীয় সমাজে তাঁহার প্রতিভা যতই উজ্জ্বল হইবে এই দেশের জন্ম ততই সফল বলিয়া অভিনন্দিত হইবে। তিনি এই বই বাংলায় লিখিয়াছেন। একদিন এই বইও ‘ঢাকার সনদ’ বলিয়া বিখ্যাত হইবে কিনা কে জানে!

এই সামান্য ভূমিকা লিখিবার সম্মান আমাকে দান করিয়া বিধান রিবেরু আপনকার হৃদয়ের ঔদার্যেরই প্রমাণ দিয়াছেন। আমি ক্যাথলিক বলিতে ‘ঔদার্যের অধিকারী’ বলিয়াই ভাবিয়া থাকি। এই বই পড়িতে হইলেও সেই ঔদার্য আমাদের পক্ষে অপরিহার্য।

গ্রন্থ পরিচিতি: বিধান রিবেরু, শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা (ঢাকা: প্রকৃতি প্রকাশনী, প্রকাশিতব্য)

তত্ত্বাবধায়ক সরকার: ভ্রান্তির ফাঁদ ও বুর্জোয়া দলসমূহের অভিন্ন স্বার্থের জয় — মকবুল আহমেদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর পার করে দিতে পারল। বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে তৈরি ফাঁদ এবং বর্তমান বিরোধী দল ও তার মিত্রদের সচেতনভাবে সেই ফাঁদে পা ফেলে আন্দোলন-আন্দোলন খেলার বিষয়টি জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোন আন্দোলন নয়। রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক কোন বৈশিষ্ট্যবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন তো নয়ই। বর্তমান রচনায় এই বিষয়টিই আমি দেখাতে চেষ্টা করব। একই সাথে বলার চেষ্টা করব এ আন্দোলন বর্তমান সরকারের বা আওয়ামী লীগের মৌলিক কোন স্বার্থবিরোধী তো নয়ই বরং তা তার শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার সহায়ক বৈকি।

আমাদের মনে আছে, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এরশাদ-মওদুদদের পতন হলে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কোন পক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। হয়েছে তিন জোটের রূপরেখা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মারপ্যাচে জামায়াত আওয়ামী লীগ বিএনপি বামজোট প্রভৃতির আঁতাতের মাধ্যমে স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরই রক্ষক তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট। এরশাদ তার সরকারের প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট সেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র শ্রমিক পেশাজীবী সংগঠনগুলির নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক পরাজয় ঘটে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শরিক বুর্জোয়া পাতিবুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য যে ফর্মুলা তৈরি করেছিল (এবং পরে যেভাবে তিন জোটের রূপরেখা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল) তা ছিল পতিত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের গায়ে কোন আঁচড় না লাগানোর একটা আনুষ্ঠানিক আয়োজন।

বিএনপি আওয়ামী লীগ জামায়াতের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা থেকে শুধু এরশাদকেই হটিয়ে দিতে, কখনো স্বৈরাচারী রাষ্ট্রকে চূর্ণ করা নয়। সেজন্য তখন বলা হয়েছিল ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’ জাতীয় শ্লোগান। তিন জোটের রূপরেখা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার মাধ্যমেই সেই স্বৈরাচারী রাষ্ট্র (যে রাষ্ট্রে এরশাদের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সকল সুযোগ ছিল তা) অক্ষত ও অক্ষুণœ রাখার সকল আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল। বিএনপি আওয়ামী লীগ জামায়াত জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল এরশাদ-মওদুদ তাদের খেয়ালখুশিতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিল, তাই তাদের সরাতে হবে। তাদের হটিয়ে দিলেই সবকিছু ফয়সালা হয়ে যাবে। তারা তখন সফল হয়েছিল স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের সকল ক্ষোভ ও বিদ্রোহকে শুধুমাত্র ব্যক্তি এরশাদ-মওদুদের বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে। রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী চরিত্রের কাঠামো বা বৈশিষ্ট্যের জন্যই যে শাসকগণ (এরশাদ, খালেদা, হাসিনা সবাই) স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন এবং রাষ্ট্রের সেই স্বৈরাচারী চরিত্রের উপাদান নির্মূল করাই যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত তা সেদিন ভালভাবেই আড়াল করতে পেরেছিল লীগ বিএনপি জামায়াত।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দলগুলি এরশাদকে ও তৎকালীন রাষ্ট্রকে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট বলে অনেক গালমন্দ করেছিল। তারা সেদিন এরশাদকে হটিয়ে ২০১৩ সাল অবধি বহুবার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সিংহাসনে বসেছেন। তারাও প্রত্যেকে পরস্পরকে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট বলে গালমন্দ করেছেন এবং করে চলেছেন। এখন অবশ্য সেই কথিত স্বৈরাচারী এরশাদকেও গণতন্ত্র চর্চার প্রধান কেন্দ্র বলে কথিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সুবোধ গণতন্ত্রীর মত বসে থাকতে দেখা যায়।

2.1কি করে একজন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতা স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠে বা গণতন্ত্রী হয় তা বুঝব কিভাবে? ভোটে দাঁড়ালে বা ভোটে জিতলেই কি তারা গণতন্ত্রী হয়ে যায়? শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য থাকে। অথচ রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিকে আঙ্গুলিনির্দেশ না করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রতিটি ক্ষমতাসীন দল বা সরকার প্রধানকেই বিরোধীরা স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যায়িত করছেন।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে পরবর্তীকালে সংহত ও সাংবিধানিক রূপ দেওয়া তো দূরের কথা, বরং স্বৈরাচারী ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর ঘটানোর প্রক্রিয়াকেও বিসর্জন দিয়ে ফেলে তথাকথিত তিন জোট। আগেই বলেছি, তাদের রূপরেখা অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য নয়, এরশাদ আমলের স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে রক্ষার মাধ্যমে একজন স্বৈরাচারের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য। এ যাবৎ সকল তত্ত্বাবধায়ক সরকার একই কাজ করে চলেছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাষ্ট্রের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এরশাদ স্বৈরাচারী হয়েছিলেন, সেই একই চরিত্রের জন্য খালেদা বা হাসিনাও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছেন।

বিষয়টি পরিষ্কার যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে স্বয়ং গণতান্ত্রিক করতে পারে না। তার কাজ সাবেক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারা স্বৈরতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তার সরকার গঠনের জন্য একটি নির্বাচন তদারকি করা মাত্র। শাহাবুদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানগণ এ কাজটিই করেছিলেন। এখন যে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইছে তার সাথে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শাসনের কোন সম্পর্ক নেই। বিএনপি জামায়াত এখনো কোন ইশতেহারে বলেনি, যে যে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার যে যে বিষয়ে তাদের ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছিল তার সুরাহা বা তার গণতান্ত্রিক রূপান্তর তারা কিভাবে করবে। জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, কর্মসংস্থান সর্বোপরি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের নিমিত্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য কি কি পরিকল্পনা তাদের রয়েছে তার কোন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মসূচি দেখা যায় না। এছাড়া, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার কমতি নেই। ব্যর্থতাসমূহ চিহ্নিত করে সেসব ক্ষেত্রে তাদের বিকল্প কর্মসূচি বা গণতান্ত্রিক দিকনির্দেশনা কি হবে তা জনগণ এখন অবধি জানে না। কি স্থানীয় কি জাতীয় পর্যায়ে জনগণের জীবন-জীবিকার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে বিএনপি জামায়াতের সরকারবিরোধী কোন কর্মসূচি বর্তমান সরকারের আমলে বিশেষ দেখা যায়নি।

শুধু নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাওয়া কোন রাজনৈতিক দলের জন্য গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হতে পারে না যতক্ষণ না তারা জনগণের জন্য উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের কর্মসূচি তুলে ধরতে পারেন। সাবেক নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অক্ষত ও বহাল রেখে তার শাসক হবার বাসনা পূরণের ইচ্ছা এবং তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাওয়ার মধ্যে কোন গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার ছবি ফুটে ওঠে না।

2.2নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার জন্য জনহিতকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেয়ে মেয়াদ শেষে পরবর্তী নির্বাচনে কিভাবে জিততে পারবে তার হিশেব নিকেষ কষে তড়িঘড়ি করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নাকচ করলেন — যদিও ব্যবস্থাটা একরকম তাদেরই আমদানি এবং তারাই এর অন্যতম সুফলভোগী। এবং বলল এ সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে বর্তমান সরকারের অধীনে এবং নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী বিএনপির জন্য আওয়ামী লীগের এই ফাঁদ অনেকটাই ভ্রান্তিমূলক, কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কখনো বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্বার্থহরণকারী কোন ব্যবস্থা ছিল না। বরং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় বুর্জোয়া দলগুলোর নেতৃত্বের ও আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতায় এবং দুর্বল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় সক্ষমতার অভাবের কারণেই তত্ত্ববধায়ক সরকার টিকে ছিল। এ কথা স্পষ্ট যে নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা অর্জনে প্রধান অন্তরায় স্বয়ং সরকার। সেক্ষেত্রে মরিয়া হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অকার্যকর করা স্বয়ং ক্ষমতাসীন জোট সরকারের সমর্থকরাই সঠিক বলে মনে করেন না। আওয়ামী লীগের এ পদক্ষেপকে তাদের নিজেদের স্বার্থের দিক থেকেও একটি ভ্রান্ত পদক্ষেপ বলে রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। তা সত্ত্বেও সরকারের অন্য কোন নীতির বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিরোধীদল আন্দোলনে যাবার আগেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফাঁদটি পাতলেন এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ বিএনপি তাতেই পা ফেলল।

সরকারের অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রসার, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও অন্যন্য ক্ষেত্রে সরকারের দলীয় বাহিনীর সস্ত্রাস, সরকারের জনস্বার্থ বিরোধী নানা নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বোপরি জনগণের জীবনমানের অধোগতি প্রভৃতি বিষয়ে অন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার যথেষ্ট কারণ ও সুযোগ ছিল বিরোধীদলের। বিরোধী বিএনপি জামায়াত জোটকে তাদের নেতাদের দুই একটি ব্যক্তিগত ইস্যু ছাড়া বর্তমান সরকারের কোন অন্যায্য কাজ বা নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার কোন উদ্যোগ নিতে দেখা করা যায়নি।

সরকার দলীয় লোকদের অন্তর্বিরোধ দেখে এবং দেশের সর্বস্তরে দুর্নীতির ক্রমপ্রসার ও জনগণের অসহায় জীবনযাপন প্রভৃতির মধ্যে বিরোধীদলের সচেতন নীরবতা বিএনপিকে বরং বর্তমান সরকারের সকল কর্মকাণ্ডের বড় সমর্থক বলে প্রতীয়মান করেছে। বর্তমান সরকারের পাতা ফাঁদে পা ফেলে বিএনপি বরং আওয়ামী লীগকেই অনেক বেশি স্বস্তি দিয়েছে।

তত্ত্বাবধায় সরকার দাবির এ আন্দোলনে শ্রমিক কৃষক পেশাজীবীর কোন স্বার্থকে জড়িত করে মালিকশ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার কোন বিষয় নেই। এ আন্দোলনে দরিদ্র যাত্রী সাধারণের স্বার্থে বাস লঞ্চ ট্রেন মালিকের অতি মুনাফা ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন কথা বলার প্রয়োজন হচ্ছে না। এ আন্দোলনে গার্মেন্টস শ্রমিকের পক্ষে দাঁড়িয়ে গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য নেই। এ আন্দোলনের সাথে দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতির ফলে কৃষক শ্রমিকের অনাহার অর্ধাহারের বিষয়টিকে যুক্ত করা হয়নি। এ আন্দোলনে তাদেরই রাষ্ট্রের অপরাপর কালাকানুনের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিক জনতার পক্ষে কথা বলার মানেই হল কোন না কোন মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলা। বিএনপি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি জামায়াত সবাই নিজেরাই একপ্রকার মালিকপক্ষের কিংবা সেই পক্ষের হীনস্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তাই জনগণকে দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত ও নিষ্পেষিত করে এমন শোষণ ও নিপীড়নমূলক সমস্যা নিয়ে মালিকপক্ষ ও সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত না করতে পারার সুযোগ বিএনপি জামায়াতের জন্য যেমন সুখকর তেমনি বর্তমান জোট সরকারের জন্যও নিরাপদ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির আন্দোলন একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির একটি অংশকে কোটি টাকা ব্যয়ের নির্বাচনে হারিয়ে অন্য আরেকটি কোটিপতি অংশকে ক্ষমতাসীন করার এবং জনগণের উপর পীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করে চলার দাবি ছাড়া আর কিছুই নয়। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গণতান্ত্রিক ইস্যু বা কর্মসূচি ছাড়া শুধু কোটিপতিদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাবার এই দাবিকে গণতন্ত্রের সপক্ষে আন্দোলন বলার কোন যৌক্তিকতা নেই। বর্তমান বিএনপি শুধু নয়, আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের অতীতের আচরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সরকারের দুঃশাসনের প্রতি জনগণের ক্ষোভ ও রাষ্ট্রের দুর্নীতিপরায়ণ শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থার ফলে জনসাধারণের গতি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমাবেশের দিকে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিএনপির সমাবেশে জনগণের যে জমায়েত তাকে তাদের তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবির পক্ষে জনগণের সমর্থন বলার কোন সুযোগ নেই।

দীর্ঘ চার পাঁচ বছর ধরে বিএনপি যদি নিজেদের আন্দোলনকে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারে — এখন অবধি তাই হয়েছে — এবং জনগণের মধ্যে সচেতন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব হেতু বিএনপি যদি জনগণের একটি অংশকে তাদের পেছনে জমায়েত রাখতে সক্ষম হয়, তাতেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত রাজনৈতিক বুর্জোয়া দলের স্বার্থের জয় হল বলে ধরে নেওয়া যায়। তাদের জয় এ কারণে যে জনগণ কোন বুর্জোয়া শোষণ ও স্বার্থবিরোধী, দরিদ্র জনসাধারণের স্বার্থের পক্ষের কোন রাজনৈতিক শক্তির পেছনে জমায়েত হয়নি। সর্বোপরি, বলতে বাধা নেই, এই জয় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির অভিন্ন স্বার্থেরই জয়।

সম্পাদকীয়: বিরহির কত দশা, এক দুই তিন…

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থার জয়জয়কার দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর হইতেছে। সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য স্থানীয় জনগণ ও সারাদেশের সচেতন জনগণের বিপুল প্রতিবাদের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়া বিগত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুন্দরবনের অকুস্থলে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করিয়াছেন। তিনি এই কার্য সমাধা করিয়াছেন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সহিত পর্দায় কথা বলিয়া। প্রধানমন্ত্রী কহিয়াছেন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হইবে বলিয়া সুন্দরবনের কোন ক্ষতি হইবার সম্ভাবনা নাই বলিলেই চলে।

কিন্তু দেশের উদ্বিগ্ন জনগণ প্রধানমন্ত্রীর এই আশার বাণীতে নিশ্চিন্ত হইতে পারে নাই। ইতিমধ্যে সংবাদ আসিয়াছে ভারতের যে ভূখণ্ডে সুন্দরবনের খানিক অংশ পড়িয়াছে সেখানকার জনগণও বাংলাদেশ খণ্ডে সুন্দরবনের উপকূলে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে যার পর নাই উদ্বিগ্ন। কাজেই বিদ্যুৎ সংকটের আশু সমাধানের নামে ভারত-বাংলাদেশ এই যৌথ প্রযোজনা জনমনে কোন আশার সঞ্চার করিতে ব্যর্থ হইয়াছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে সস্তা জনপ্রিয়তা কুড়াইবার লক্ষ্যে কিংবা পরাশক্তি ভারতকে সন্তুষ্ট রাখিতে তড়িঘড়ি এই কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়া জনগণকে বড়সড় কাঁচকলা দেখাইয়াছে সরকার। এহেন পরিস্থিতিতে সকল গণতান্ত্রিক শক্তিকে একত্রিত হইবার মাধ্যমে প্রতিবাদে প্রতিরোধে কঠোর আন্দোলন গড়িয়া প্রকল্প বাতিলে সরকারকে বাধ্য করিবার বিকল্প রাস্তা নাই।

এদিকে গাইবন্ধায় পুলিশি হেফাজতে কিশোরী ধর্ষণের খবর আসিয়াছে। নির্বাচন লইয়া শাসকশ্রেণির আশু কুরুক্ষেত্রের যে প্রচারণা প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম চালাইতেছে তাহার মধ্যে এই খবর বিশেষ প্রচার লাভ করিতে পারে নাই। অভিযুক্ত পুলিশদের মাত্র ক্লোজড করিয়া ঘটনা ধামাচাপা দিবার চেষ্টা চলিতেছে। ন্যায়বিচার লাভের জন্য জনগণের ইয়াসমিন ধর্ষণের বিচারের দাবিতে আন্দোলনের শিক্ষা ভুলিবার সুযোগ নাই।

সমস্যার পাহাড়ে, নারায়ণগঞ্জের মানুষ একটি পরিবারের সর্বগ্রাসী জুলুম ও শোষণের বৃত্তে পড়িয়া তাহার নাগপাশ ছিন্ন করিতে প্রস্তুত হইতেছে। মেধাবী ছাত্র ত্বকী যে এই পরিবারের আক্রমণে খুন হইয়াছে ইহাতে ত্বকীর পরিবার সুদ্ধ নারায়ণগঞ্জের গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ দাবি করিতেছে। এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলন করিয়া যাইতেছেন। তাহাদের লক্ষ্য করিয়াই নারায়ণগঞ্জের শহর-বন্দর থানার সাংসদ নাসিম ওসমান বলিয়াছেন, যেসব পোকামাকড়, পিঁপড়া, তেলাপোকা এখন দাবড়াইয়া বেড়াইতেছে তাহাদের পা দিয়া পিষিয়া দিলেই মরিয়া যাইবে। এরা কেউ তাহাদের সঙ্গে টিকিয়া থাকিতে পারিবে না। ক্ষমতার লোভ ও দম্ভ কি পরিমাণে বৃদ্ধি পাইলে একজন সাংসদ এ রূপ কথা বলিতে পারেন?

এই দিকে চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামীর নেতা ও নেজামী ইসলামী পার্টির একাংশের প্রধান মুফতি ইজাহার পরিচালিত মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণে দুইজন নিহত হইয়াছেন। মুফতি সাহেব প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন ল্যাপটপ বিস্ফোরণে আগুন লাগিয়াছে মাত্র। কিন্তু যখন অনেক নিহত ও আহত হইল ও বোমা তৈয়ারির বিপুল সরঞ্জাম উদ্ধার হইল তখনি মুফতি সাহেব কিভাবে পলাইয়া গেলেন তাহা স্পষ্ট নয়। আইনশৃক্সক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী যে ঘটনার তাৎপর্য বুঝিতে পারিল না কিংবা অবহেলা করিল তাহা কোন শুভ লক্ষণ নহে।

এই দিকে গাজীপুরে আসওয়াদ গার্মেন্টসে ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগিয়া আবারও ১০ জনের অধিক শ্রমিক পুড়িয়া কয়লা হইয়াছে। শোষণের এই নিদর্শন পৃথিবীর অন্য কোন দেশে পাওয়া যাইবে কিনা সন্দেহ।

আসন্ন দুর্গাপূজা, ঈদ ও প্রবারণা পূর্ণিমার উৎসব উপলক্ষে আগামী সপ্তাহ সর্বজন বাহিরে আসিবে না।

সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা। ঈদ মুবারক। প্রবারণার প্রীতি।

মুক্তিযোদ্ধা: একাত্তর থেকে চুরাশি — কাজী নূর-উজ্জামান

 

স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পরিগঠনে আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১ সালের মতন বৃহৎ ঘটনা আর আসে নাই। জনগণ বুকের রক্ত স্বেচ্ছায় চালাইয়া দিয়াছিল একটি শোষণহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গঠনের কল্পনায়। কারণ দেশবাসীর মনে সদা জাগরুক ছিল হিন্দুত্ববাদী ভারত রাষ্ট্র ও এসলামি পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে পদে পদে উপস্থিত থাকা শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস। দুঃখের মধ্যে, ১৯৭১ সালে জনগণের দেখা সেই স্বপ্ন অক্ষুণœ রহিল না। একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী ছলে বলে কৌশলে জনতার আকক্সক্ষা ছিনাইয়া লইল। কিন্তু শোষণহীন, ধর্মনিরপেক্ষতার আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসেনানীরা কখনো ছাড়েন নাই। তাহারই নিদর্শন মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্ণেল কাজী নূর-উজ্জামান লিখিত বর্তমান রচনা

আমরা ১৯৭১ সালে সশস্ত্রভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ধ্যান-ধারণা যাই থাকুক না কেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন ছিল সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি এবং সেই মুক্তির লক্ষ্যেই জনসাধারণ স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং স্বীকার করেছেন সীমাহীন আত্মত্যাগ। পাক-ভারত বিভক্তির পরই এই অঞ্চলের জনসাধারণ পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাদীদের ষড়যন্ত্র ও শোষণের হাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর সেই আন্দোলন বিভিন্নভাবে দানা বেঁধে ষাটের দশকের শেষের দিকে একটা বিশিষ্ট পর্যায়ে উন্নীত হয়। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে এদেশে যেসব ঘেরাও আন্দোলন সংঘটিত হয় তার মাধ্যমে কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ লক্ষ্য করেন যে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় সম্ভব। বস্তুত ঘেরাও আন্দোলনের সাফল্যই পরবর্তীকালে গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত রচনা করে, যদিও সে আন্দোলন পরে বুর্জোয়া সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে চলে যায়। আওয়ামী লীগের ছয়দফাও ক্রমান¦য়ে পরিবর্তিত হয় এক দফায় — অর্থাৎ স্বাধীনতার দাবিতে।

কাজী নূর-উজ্জামান (২৪ মার্চ ১৯২৫ - ৬ মে ২০১১)

কাজী নূর-উজ্জামান (২৪ মার্চ ১৯২৫ – ৬ মে ২০১১)

সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধে বিজয়ের পর স্বাধীনতার অঙ্গীকার ও লক্ষ্য শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ ব্যর্থ আওয়ামী লীগ শাসকদের হাতে কিভাবে রুদ্ধ ও বিপথগামী হয় একথা আমরা সবাই জানি। আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা, দমননীতি, গণবিরোধী ভূমিকা দেশে নতুন করে সামরিক শাসনের পথকে প্রশস্ত করে।

বস্তুত জিয়ার আমল থেকেই দেশে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী রাজনীতির সূচনা ঘটে সংঘটিত আকারে। আজ আমরা অনেকে জিয়ার আমলকে স্থিতিশীল ও সঠিক সময় বলে ভ্রান্তভাবে চিহ্নিত করে থাকি। অথচ জিয়ার আমলে দেশ ও জাতির যে চরম সর্বনাশ ঘটেছে তার তুলনা বিরল এবং আজকে আমরা যে পরিস্থিতির জের বয়ে চলেছি তার সৃষ্টিকর্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদের সম্মুখীন করে গেছেন জিয়াউর রহমান। তাঁর ক্ষমতালিপ্সার হাতিয়ার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর আমলে তাঁরই ছত্রছায়ায় পুনর্গঠিত হয়ে শক্তি সঞ্চয় করেছে। জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরসহ শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে বিনা বিচারে কিংবা বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসি দিয়েছেন। ক্ষমতায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলে ঘোষণা করলেও মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জনগণকে তিনি চরম লাঞ্ছনার মুখে নিক্ষেপ করেছেন। তাঁর আমলেই পাকিস্তানীরা ফিরে পেয়েছে পরিত্যক্ত সম্পত্তি যা তারা বিক্রি করে দিয়ে আবার চলে গেছে পাকিস্তানে। জিয়ার আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন হয়েছে সবচেয়ে কম। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স করে যে টাকা খরচ করেছেন তা মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোন কাজেই আসেনি; পরন্তু সেই কমপ্লেক্সের কর্তা তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার ও মন্ত্রী হালিম চৌধুরী কমপ্লেক্সের টাকার সঠিক হিসেব আজও দিতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

জিয়া আত্মস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে স্থ’ূল রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেঙ্গে যে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন তার জের জাতি আজও বইছে এবং আজকের সামরিক সরকার ও ভবিষ্যৎ সামরিক সরকারের জন্য এ অপধারা অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। জিয়া নিজে দল গঠন করেছিলেন রাজনৈতিক টাউট, রাজাকার, আলবদর, সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভীদের নিয়ে এবং অন্য দলকে ভেঙ্গেছেন তাঁর ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে। জিয়ার পুরো অবস্থানটাই ছিল ভ্রান্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

জিয়ার আমলেই মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ এদেশে তাদের ভিতকে নবতর রূপে সংগঠিত করে স্বাধীনতার পক্ষের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পায়। প্রশাসনে পুনরায় মার্কিন সমর্থক আমলারা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বলতে গেলে সা¤্রাজ্যবাদীদের পুনঃশক্তিসঞ্চয়ই এদেশে স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ধর্ম-ব্যবসায়ীদের উত্থানে সাহায্য করে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে  জামাতে ইসলামীর নতুন কর্তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে, ‘একাত্তরে ভুল করিনি’ — বলে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে সারা জাতির স্বাধীনতার চেতনা ও মর্যাদাকে আঘাত করে।

দেশের অর্থনীতিকে জিয়াউর রহমান দেউলিয়ার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানী আমলের মডেলে তিনিও দেশে গড়ে তুলেছিলেন ভিত্তিহীন অবাধ লুণ্ঠনের অর্থনীতি।

জিয়ার আমলের প্রথম থেকে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত আওয়ামী লীগসহ কোন দলেরই কার্যকর কোন ভূমিকা ছিল না। জিয়াকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি ছিল না কারোই। জাতীয়ভাবে জিয়াকে প্রথম চ্যালেঞ্জ করেছিল একমাত্র  মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৮১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে সারাদেশের বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। উল্লেখ্য তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত দশ দলীয় জোট সন্ত্রাস কায়েম করেও কোন সফল হরতাল পালন করতে পারেনি। এ অবস্থায় দেশের জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন আন্দোলনে শরীক হয়েছেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন পরিচালনা করেছিল সাত দফা ঘোষণার ভিত্তিতে। তাঁদের ঘোষণাগুলো ছিল —

এক.   জামাতে ইসলামী ও তার সমস্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অঙ্গ সংগঠনসমূহকে নিষিদ্ধ  ঘোষণা করা হল। এবং এই সকল সংগঠনের সকল প্রকার তৎপরতা প্রতিহত ও বানচাল করার জন্য জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

দুই.    জাতির জানি দুশমন গোলাম আজমসহ সকল চিহ্নিত রাজাকার-আলবদর ও স্বাধীনতার শত্রু প্রশাসনের অভ্যন্তরে বা বাইরে যেখানেই অবস্থান করুন না কেন — দেশদ্রোহিতার অপরাধে শাস্তি প্রদান করতে হবে। অন্যথায় তাদেরকে গণআদালতে বিচারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিন.   মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা বিনাশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে।

চার.   পরিত্যক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি ও ব্যবসা স্বনামে বেনামে লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে এবং অর্থ ও সম্পত্তি পাচারকারী পাকিস্তানী অনুচরদের শাস্তি প্রদান করতে হবে।

পাঁচ.   প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও জনগণের সম্পত্তি আত্মসাৎকারীদের বরখাস্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। সমাজ থেকে টাউট, ফড়িয়া ও চোরাচালানীদের উচ্ছেদ করতে হবে।

ছয়.    দ্রব্যমূল্যকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য ভ্রান্ত অর্থনৈতিক পলিসিকে পাল্টিয়ে নতুন অর্থনৈতিক পলিসি গ্রহণ করতে হবে।

সাত.  বেরুবাড়ী, দক্ষিণ তালপট্টি (পূর্বাশা) ও গঙ্গার পানির ওপর আমাদের সার্বভৌম অধিকার যে কোন মূল্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বিদেশী আগ্রাসনকে প্রতিহত করার জন্য জনগণকে সামরিক দিক দিয়ে সংগঠিত, সজ্জিত ও প্রস্তুত করে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে পরিচালিত তৎকালীন আন্দোলনে দেশের সব মুক্তিযোদ্ধা দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিহার করে সাত দফার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আন্দোলনের বিশেষ পর্যায়ে দেশের রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক ও ছাত্র সমাজ অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় যা কোন সংগঠনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা থাকলেই সম্ভব। আন্দোলনের এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৮১ সালের ১৬ই মে সারা দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। এই হরতালের প্রতিও স্বাধীনতার পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন ও জনসাধারণ অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। জিয়াউর রহমান তখন পিছু হটতে বাধ্য হন। এই হরতাল প্রতিহত করার জন্য জিয়া তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ তথা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে করজোড়ে এক মাসের সময় চান। জিয়া তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি পরীক্ষাকরণ ও অন্যান্য বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ন্যাশনাল কমিটি গঠন করেন। এর চেয়ারম্যান করা হয় তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী মেজর জেনারেল মাজেদুল হককে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতৃবৃন্দ তখন হরতাল একমাস পিছিয়ে ১৬ই জুন তারিখ নির্ধারণ করেন। জিয়া তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে জামাতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা যাচাই করে দেখবেন। কিন্তু এর কিছু দিন পরই তিনি নিহত হন। শাসন ক্ষমতায় মুক্তিযোদ্ধা বিদ্বেষী ও স্বাধীনতারবিরোধী পক্ষের প্রাধান্য এরপর আরো বৃদ্ধি পায়।

১৯৮০-৮১ সালে আমরা যে সাত দফা উত্থাপন করেছিলাম তার মূল সুর ছিল সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন। সেই সাত দফা আজ এক দফা অর্থাৎ সমাজ পরিবর্তনের দফায় পরিণত হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে ২১ দফা উত্থাপন করেছে তার মূল সুরও সমাজ পরিবর্তন, অর্থাৎ ’৭১ সালের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন।

আমরা জানি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের চরম মুহূর্তেও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি ছিল না। কেউ কেউ অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে ট্যাংক-মেশিনগান ঠেকাবার অবাস্তব দম্ভও করেছেন। ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আঘাত করলে তারা যে যেভাবে পারেন ছিটকে দেশ থেকে বেরিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এমনকি ভারতে গিয়েও তারা নিরাপদ বোধ করছিলেন না। তারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনেও রাজী ছিলেন না। এপ্রিল মাসে যে সরকার গঠিত হয়েছিল তা মুক্তিযোদ্ধাদের হুমকীর জন্যই হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন আরো বলেছিল যে, আওয়ামী লীগাররা সরকার গঠন না করলে তারাই সামরিক সরকার গঠন করবেন। প্রগতিশীল বিদেশী সাংবাদিকরাও তখন অন্যান্য দেশের বিপ্লবী অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে আওয়ামী লীগারদের সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। পরন্তু দেশের মানুষের আর্তনাদ ছিল সরকার গঠনের পক্ষে যা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এরপর নেতারা সরকার গঠনে বাধ্য হলেও সরকারের নিজেদের নাম ঘোষণায় তারা অনিচ্ছুক ছিলেন এই যুক্তিতে যে এতে বাংলাদেশের ভেতরে তাদের পরিবার পরিজন বা আত্মীয়স্বজন পাকবাহিনীর অত্যাচারের মুখোমুখি হতে পারে। অথচ হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা তাদের পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা মোটেও ভাবেননি। সরকার গঠনের আগে অনেকে কান্নাকাটিও করেছিলেন সেদিন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল চাপে এবং তাজউদ্দীনের পরামর্শে তারা বাধ্য হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। অথচ স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগারদের হাতেই মুক্তিযোদ্ধারা নিগৃহীত হয়েছে, ফায়দা লুটেছে সেই সব ভীরু নেতা ও চেলা-চামুণ্ডারা। সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচেষ্টা একাত্ম ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল দলমত নির্বিশেষে।

স্বাধীনতার অঙ্গীকার বাস্তাবায়নে বা মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত অধ্যায় সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ১৯৮১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের সাত দফার আন্দোলনের মাধ্যমে যে ধারার সূচনা করেছিলেন ১৯৮৪ সালে এসে তা এক দফায় পরিণত হয়েছে, আর সেই এক দফা হচ্ছে সব ধরনের স্বৈরাচারী শাসক ও শোষকদের উৎখাত করে সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দেশের শতকরা ৯০ জন মানুষের মনে আজ চরম ক্ষোভ। কোটি কোটি মানুষের মনে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রত্যয় বিরাজ করছে। দেশের ছাত্র শ্রমিক ও কৃষকদের মনে আপোষহীন সংগ্রামের প্রস্তুতি। এই মুহূর্তে আমরা অভাব লক্ষ্য করছি শুধু সৎ ও সঠিক নেতৃত্বের। তবে আমরা আশাবাদী যে সময়ের নিরিখে বাস্তবতার প্রয়োজনে সঠিক রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে উঠবেই। ১৯৭১-এর শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভৌগোলিক স্বাধীনতার গণ্ডি পেরিয়ে অবশ্যই আরেক ধাপ অগ্রসর হবে। এবং এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অবলুপ্তির মাধ্যমে নির্বিশেষ মানুষের কল্যাণকামী শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম অব্যাহতভাবেই চলবে — কারণ এটাই ছিল ’৭১-এর রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপ্ন।

 

প্রথম প্রকাশ: বিচিত্রা, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮৪

উৎস: কাজী নূর-উজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতি (ঢাকা: ডানা প্রকাশনী, ১৯৮৫)

লংমার্চের ডায়েরি — রায়হান রাজু

3

বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনার প্রতিবাদে ঢাকা-সুন্দরবন লংমার্চ অনুষ্ঠিত হইল ২৪ হইতে ২৮ সেপ্টেম্বর তারিখে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই লংমার্চে সহস্ররাধিক লোক অংশ নেয়। এই রচনা লংমার্চে অংশগ্রহণকারী এক তরুণের দিনলিপি

২৪ সেপ্টেম্বর লংমার্চের প্রথম দিন। সকাল ১০টার আগেই প্রেসক্লাব চত্বরে লংমার্চের জমায়েত নদীর জোয়ারের মত ফুলতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে প্রায় ৩,০০০ লোকের বহর নিয়ে লংমার্চ শুরু হয়। লংমার্চের বহর যখন ঢাকার রাজপথ অতিক্রম করছে তখন রাস্তার দুই ধারে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যায়। লংমার্চ-যাত্রী বেশির ভাগের পরনে সাদা টিশার্ট, তাতে একটা কথাই লেখা: ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নাই’।

সাদা টিশার্ট আর মাথায় সবুজ ক্যাপ পরে পিচঢালা উত্তপ্ত রাজপথে পিঁপড়ার মত সারিবদ্ধ হয়ে পিলপিল করে এগিয়ে চলেছে লংমার্চ। গন্তব্য রামপালের দ্বিগরাজ। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। লুটপাটের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করা।

প্রেসক্লাব শাহবাগ ধানমণ্ডি কলাবাগান হয়ে সংসদ ভবনের সামনে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি। এরই মধ্যে প্রচণ্ড গরমে সকলে প্রায় অর্ধসিদ্ধ। তারপর বাসে উঠে যাত্রা শুরু। রানা প্লাজার সামনে পৌঁছতেই দেখা যায় রাস্তার দুই ধারে গার্মেন্টস শ্রমিকরা সারিবদ্ধ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যানারে ফ্যাস্টুনে প্রকটিত রানা প্লাজায় আহত নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ আর পোশাক শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৮,০০০ টাকা করার দাবি। এছাড়া জাতীয় সম্পদ সুন্দরবনকে রক্ষার আহ্বান আর লংমার্চকে অভিবাদন তো আছেই। রানা প্লাজার সামনে লংমার্চের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও নিহত শ্রমিকদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়।

এরপর যাত্রা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। সেখানের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা লংমার্চকে স্বাগত জানায় এবং দুপুরে সেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। খাওয়ার পর সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক সমাবেশ শেষে মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়। পুরো যাত্রাপথে সংস্কৃতি মঞ্চ, সমগীত, গায়েন, সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন ও চারণের বন্ধুরা সুন্দরবনকে নিয়ে রচিত গান সহ নানা ধরনের উদ্দীপনামূলক গান গেয়ে লংমার্চ মাতিয়ে রাখে। রাস্তার পাশের জনগণ সেই উদ্দীপনায় শরিক হন শ্লোগানে শ্লোগানে। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ লাইন। দীর্ঘক্ষণ ধরে তারা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে ফ্যাস্টুন আর ব্যানারে সজ্জিত হয়ে। অভিবাদন লংমার্চ।

সন্ধ্যার সময় মানিকগঞ্জ শহরে পৌঁছতেই চোখে পড়ে গাছের ডালে, রাস্তার ধারে লটকানো ব্যানার। তাতে মানিকগঞ্জবাসীর সুন্দরবন রক্ষার গণদাবি জ্বলজ্বল করছে। রাস্তার দুই ধারে সাধারণ জনগণের যে অভূতপূর্ব সাড়া ও উত্তেজনা তা লংমার্চের যাত্রীদের বহুগুণ উদ্দীপ্ত করে। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে সমাবেশস্থল বিজয়মেলার মাঠ অবধি বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণের যে উপস্থিতি তাতে মনে হয় মানিকগঞ্জ শহরে উৎসবের ঢল নেমেছে। বিজয়মেলার মাঠে জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের বক্তৃতার মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ হলে শুরু হয় গান ও নাটক। মানিকগঞ্জ টাউন হলে এই লংমার্চ বহরের জন্য রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

কোন রকমে খাওয়া শেষ হওয়ার পর সংকট বাঁধে রাতে থাকার জায়গা নিয়ে। অনেকেই ল কলেজের বারান্দায়, রাস্তার ধারে বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। অনেকে থাকার জায়গা না পেয়ে গোল হয়ে বসে সারা রাত গান গায়। আমরা কয়েকজন উপায়ান্তর না দেখে টাউন হলে খাওয়ার জায়গাটি পরিষ্কার করে সেখানেই শুয়ে পড়ি। থাকার জায়গা সংকট হলেও মানিকগঞ্জ জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের লংমার্চকে আপ্যায়নের চেষ্টার কমতি ছিল না।

কোন রকমে রাত কাটল বটে। কিন্তু ভোরে এত মানুষ টয়লেট করে কোথায়? কেউ ছুটে গেল হাসপাতালে, কেউ স্থানীয় লোকজনের বাড়িতে, আবার কেউ বা শহরের মার্কেটগুলোতে। পুরো লংমার্চ জুড়েই টয়লেট সংক্রান্ত এই সংকট প্রকট ছিল।

যাহোক, শুরু হল লংমার্চের দ্বিতীয় দিনের যাত্রা। গন্তব্য ফরিদপুর। মানিকগঞ্জ থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল। কিন্তু মুষলধারের বৃষ্টিও আমাদের যাত্রা থামাতে পারল না। ফেরির অপেক্ষায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের শত শত যাত্রী বাসের মধ্য থেকেই লংমার্চের শ্লোগান আর গান শুনে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায়। ফেরির অপেক্ষায় আটকে থাকা সমগীত আর গায়েনের পিকআপ থেকে একটার পর একটা গান ফেরিঘাটের সকলের মনযোগ কেড়ে নেয়। অবশেষে বর্ষার উত্তাল পদ্মা পার হয়ে রাজবাড়ি শহর প্রদক্ষিণ ও আজাদী ময়দানে সমাবেশ। তারপর দুপুরের খাওয়া।

লংমার্চের বহর এগিয়ে যায় ফরিদপুর শহরের দিকে। লংমার্চের সারি ফরিপুরের মুজিব সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফেলে। কিন্তু রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সারি আর শেষ হয় না। লংমার্চের যাত্রী কম বেশি আড়াই হাজার। কিন্তু তাদের মাথায় ফরিপুরের হাজার হাজার মানুষের সমর্থন শুধু নয়, তাদের মাথায় সারা দেশের কোটি মানুষের গণরায়। এই নিয়েই লংমার্চের যাত্রা। সন্ধ্যায় ফরিদপুরের অম্বিকাচরণ মেমোরিয়াল হলের মাঠে বিশাল এক সমাবেশ হয়। সমাবেশে জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। তারপর ওখানেই রাতের খাওয়া শেষ করে কেউ ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে কেউ বা অম্বিকাচরণ হলে আবার কেউ স্থানীয় লোকজনের বাড়িতে রাত্রিযাপন করে।

মধ্যরাতে আমরা কয়েকজন চা খেতে বের হই। আলাপ হয় এক চা দোকানির সাথে। সুন্দরবন রক্ষার যে লংমার্চ তা নিয়ে আপনারা কি ভাবছেন? আমরা তো হাজার হাজার লোক লংমার্চ করছি। আপনাদের মত কি? লোকটি তাকিয়ে থাকে। পান চিবুতে থাকে। আর একটার পর একটা চা বানাতে থাকে। কোন উত্তর দেয় না। বেশ কয়েক বার জিজ্ঞাস করার পর আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে দেয়ালের দিকে একটি পেপার কাটিং দেখাল। এক রিকশাওয়ালার সাক্ষাৎকার। পেপার থেকে কেটে দেয়ালে আঠা দিয়ে সেটে দিয়েছে। তাতে লেখা ‘আর যাই করি ভোটের সময় দুই নেত্রীর কাছে যামু না।’

পরদিন সকালে অম্বিকাচরণ হলেই সকালের খাওয়া শেষ করে লংমার্চ যাত্রা করে যশোরের  উদ্দেশ্যে। তৃতীয় দিনে মধুখালিতে মিছিল ও সমাবেশ শেষ হওয়ার পরপরই আবার বৃষ্টি নেমে আসে। বৃষ্টির মধ্যে আতির আলী সড়ক, এম আর রোড প্রদক্ষিণ করে মাগুরা পৌর ভবনের সামনে পৌঁছাই আমরা। সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষ করে মাগুরা শহর প্রদক্ষিণ করে লংমার্চ এগিয়ে যেতে থাকে।

সামনে ঝিনাইদহ। নবগঙ্গা নদীর ব্রিজ থেকে শুরু করে ঝিনাইদহ শহর প্রদক্ষিণ করে দুপুরে ঝিনাইদহ উজীরপুর হাই স্কুলে খাওয়ার ব্যবস্থা করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। দুপুরে খাওয়ার আগেই ঝিনাইদহ শহরে আরো দুইটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে সবাই যখন খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত তখন পূর্ব ঘটনার জের ধরে লংমার্চে অংশ নেওয়া দুইটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশের সামান্য লাঠিচার্জের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। ঝিনাইদহ থেকে লংমার্চ এগুতে থাকে। গন্তব্য যশোর। যশোর টাউন হল মাঠে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রাত্রিযাপন ও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হয় আবদুর রাজ্জাক মিউনিসিপাল কলেজে।

পরদিন লংমার্চের চতুর্থ দিন। পুরা যশোর শহর প্রদক্ষিণের পর নোয়াপাড়া ও অভয়নগরে সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ ঢুকে পড়ে খুলনা জেলায়। প্রথমে ফুলতলা, তারপর দৌলতপুরে সমাবেশ। দুপুরে খাওয়া শেষ করে খুলনার হাদিস পার্কের সমাবেশের উদ্দেশ্যে লংমার্চ এগুতে থাকে। রেলওয়ে স্ট্যান্ডে আরো একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। সাড়ে ৪টার দিকে লংমার্চের সকলেই যখন হাদিস পার্কের বিশাল সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে আবার বৃষ্টি এসে হানা দেয়। বৃষ্টিতে খুলনা শহরের রাস্তাগুলোতে গোড়ালি ডোবা পানি জমে গেল। আর হাদিস পার্কে জড় হওয়া হাজার হাজার খুলনাবাসী বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে জাতীয় কমিটি হাদিস পার্কের সমাবেশটি সন্ধ্যার পরিবর্তে পরদিন সকালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। খুলনার রূপসা নদীতে জোয়ারের মত উপচে পড়া মানুষগুলি পরদিন সকালে সমাবেশের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সকালেও শেষ রক্ষা হল না। সকালেও ছিল মুষলধারে বৃষ্টি।

লংমার্চের পঞ্চম দিন সকালে মিছিল শুরু হলে আকাশ গুমোট বেঁধে গর্জন করতে থাকে। এই বুঝি রাতের মত আবার বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিবে খুলনা নগরী। বলতে না বলতেই বল্লমের ফলার মত বৃষ্টির ফোটা আঘাত হানতে থাকে মিছিলে। মিছিল থামেনি। পুরা খুলনা শহর প্রদক্ষিণ করে হাদিস পার্কে তড়িঘড়ি সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ।

সেদিন ২৮ সেপ্টেম্বর। লংমার্চের শেষ দিন। সকল প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে দ্বিগরাজের মহাসমাবেশ, রামপালের মানুষ। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই লংমার্চ যাত্রা করল দ্বিগরাজের দিকে। তারপর বাগেরহাট জেলা শহর বিশেষ করে পৌরসভা রোড, রেল রোড, খান জাহান আলী রোড, কর্মকারপট্টি, ঘোষপট্টি, ফলপট্টি সড়কগুলি প্রদক্ষিণ করে বাগেরহাট পুরাতন কোর্ট সংলগ্ন মাঠে সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ যখন দ্বিগরাজ ছুঁই ছুঁই করছে তখন বিকালের ক্লান্ত সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। অন্যদিকে লংমার্চ বহরের উদ্দীপ্ত শ্লোগান আর রামপাল দ্বিগরাজের মানুষের রাস্তার ধারে বিপুল উৎসাহ করতালি আর অভ্যর্থনা লংমার্চকে তেজোদ্দীপ্ত করে তুলছে। লংমার্চ দ্বিগরাজে পৌঁছলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহ দেখা দেয়।

মহাসমাবেশে উপস্থিত দেবাশীষ নামে একজনের সাথে আলাপ করে জানতে পারি, সে পশুর নদীর ওপার থেকে এসেছে। কেন এসেছে জিজ্ঞাস করলে সে বলে, ‘এখানে তো শেখ হাসিনা বসবাস করবে না, আমাদের বসবাস করতি হবি। তাই আমাদের ভালমন্দ আমাদের দেখতি হবি। সামবেশের লোকজন কি বলে তাই জানতি আইছি।’

সব বাধাবিঘ্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে দ্বিগরাজে সুন্দরবন ঘোষণা ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের বক্তৃতার মধ্য দিয়ে লংমার্চের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ ‘সুন্দরবন ঘোষণা’য় বলেন, সরকারকে অবিলম্বে সুন্দরবন ধ্বংস করার চক্রান্ত বাদ দিতে হবে এবং সুন্দরবন রক্ষায় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ১১ অক্টোবরের মধ্যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা প্রত্যাহার না করলে ১২ অক্টোবর সুন্দরবন রক্ষায় নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে ঘাষণা করেন আনু মুহাম্মদ।