Monthly Archives: ডিসেম্বর 2013

ধর্মকেন্দ্রিক ডানপন্থী রাজনীতির গোড়ার কথা–একবাল আহমদ

হিন্দু ধর্ম, এয়াহুদি ধর্ম, নাসারা ধর্ম, ইসলাম ধর্ম ইতি আদি সকল ধর্মব্যবস্থা জুড়েই ডানপন্থী রাজনীতি বিস্তৃত। ধর্মব্যবস্থা হিসাবে এই সকল ধর্ম আলাদা আলাদা, এমন কি অনেক সময় পরস্পরবিরোধী। কিন্তু ভাবধারা ও কর্মধারার নিরিখে বিচার করলে আমরা দেখব সকল ধর্মের ডানপন্থার মধ্যেই আশ্চর্য আশ্চর্য সব মিল। ডানপন্থীরা ভারতে ইতিহাস প্রসিদ্ধ একটা মসজিদ ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। গির্জার পর গির্জা পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। ফিলিস্তিনে তারা আকছার মসজিদ গির্জা ইতি আদি পাকপবিত্র স্থান নাপাক করে চলছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান আর খ্রিষ্টান বাসিন্দাদের বাপদাদা পরদাদার আমলের জমিন হতে খেদিয়ে বিদায় করছে। সার্বিয়ায় ডানপন্থীরা চালিয়েছে রীতিমত গণহত্যা। নিয়ম করে ধর্ষণ করবার জন্য বসিয়েছে শিবির। পাকিস্তানে তারা হামলা চালাচ্ছে নাসারাদের উপর। মুসলমানদের ভেতর তাদের হামলার শিকার শিয়া ও আহমদিয়া স¤প্রদায়। আবার ডানপন্থিদের  ভেতরেই এক ডানগোষ্ঠীর সাথে আরেক ডানগোষ্ঠীর খুনাখুনি সম্পর্ক।

ডানপন্থীরা জেহাদের ডাক দিয়ে থাকেন। ধর্মের পুতপবিত্রতা রক্ষার  দোহাই দিয়ে ত্রাস সঞ্চার করেন। কিন্তু আদতে তাদের কাছে পূতপবিত্র বলে কিছু নাই। বাজারঘাট, ঘরবাড়ি, কোর্টকাছারি, মসজিদ, গির্জা যেখানেই পারেন সবখানে রক্তের বন্যা বইয়ে দেন। তাদের দাবি তারা আল্লাহর  সৈনিক। অতয়েব মনুষ্য সমাজের বিচারব্যবস্থা ও মনুষ্যরচিত আইন কানুনের অনেক উপরে তাদের অবস্থান।

লোকে তাদের সচরাচর ‘মৌলবাদী’ নামে  চেনে। অবশ্য ‘মৌলবাদী’তকমাটা পশ্চিমা খবরযন্ত্রের দৌলতে শুদ্ধ মুসলমান ডানপন্থীদের জন্যই বরাদ্দ। ডানপন্থীমুসলমান দেখলেই তারা বলবেন ‘ইসলামি মৌলবাদী’। আর আর ধর্মব্যবস্থায় ডানপন্থার যেসব প্রকার সেসবের নাম আরও নরম নিরামিষ। ফিলিস্তিনের এয়াহুদি ধর্মপাগলদের নাম সেটলার তথা দখলদার। কালেভদ্রে চরমপন্থী। হিন্দু জঙ্গিদের পরিচয় জাতীয়তাবাদী। আর খ্রিষ্টান ডানপন্থীদের নাম শুদ্ধ ডানপন্থী। কখনো কখনো মেসিয়ানিক তথা মসীহবাদী। শব্দ এস্তেমালে এই পক্ষপাতিত্ব কিন্তু একটা তাৎপর্যময় সত্য গোপন রাখে। নানান ধর্মের নানান ডানপন্থা যে কার্যত একই সংকটের নানান চেহারা মাত্র এই সত্য পক্ষপাতের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। আদতে সব ডানপন্থারই এক গোড়া। তাদের প্রকাশভঙ্গিও এক। কি রকম পরিবেশ পরিস্থিতিতে এসব ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন পয়দা হয় তা আগে এক ঝলক দেখে নেব। তারপর দেখব তারা যে চোখে দুনিয়া দেখে ও যে ভঙ্গিতে দুনিয়ার সামনে নিজেদের হাজির করে তার মধ্যে কোথায় কোথায় আসলে তারা সবাই এক।

একবাল আহমদ

একবাল আহমদ

যে ঘটনাকে আমরা ভুল করে ‘মৌলবাদী’ বলে ডাকি তা কিন্তু খুব বেশি দিন পুরানা নয়। আধুনিকতা ও আপন আপন নাম-সাকিন-নিশানের মাঝে যে ঠেকাঠেকি তারই একরূপ জবাব বটে এই ঘটনা। আধুনিকতা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আধুনিকতার সাধারণ অর্থ এক উৎপাদন প্রণালী হতে আরেক উৎপাদন প্রণালীতে সমাজের উত্তরণ। আমাদের জমানায় আধুনিকতা বলতে আমরা বুঝব চাষবাষভিত্তিক উৎপাদন প্রণালী অথবা পশুচারণভিত্তিক উৎপাদন প্রণালী হতে পুঁজিতান্ত্রিক তথা শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক উৎপাদন প্রণালীতে উত্তরণ। এক উৎপাদন প্রণালী হতে আরেক উৎপাদন প্রণালীতে উত্তরণ সমাজে কিছু আমূল বদল নিয়ে আসে। সমাজ ও আর্থনীতিক জীবনের নয়া নয়া ছক কেটে নেয়। বছরের পর বছর অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া জীবনযাপন পদ্ধতি হুমকির মুখে পড়ে যায়। এই সত্য নিত্য সত্য। নতুন সমাজ জমিজমা, শ্রম ও পুঁজির মধ্যকার সম্পর্কের রূপান্তর ত্বরান্বিত করে। নতুন সমাজের নতুন কিছু ‘হয়ে’ উঠবার ও নতুন কিছু করবার  মেজাজের সাথে মানুষকে খাপ খাওয়াতে পারতে হয়। মুল্যবোধে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে হয়। এসব সমাজ রূপান্তরের শর্ত। নারী-পুরুষ সম্পর্কে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে সম্পর্কে, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সম্পর্কে, এক স¤প্রদায়ের সাথে আরেক স¤প্রদায়ের সম্পর্কে আমূল পরিবর্তন আসতে হয়। নতুন নতুন কর্মকুশলতা রপ্ত করবার কৌশল, সমাজে কে কোন কায়দা রপ্ত করবে তার সূত্র আর মানুষ কি করে শাসনকার্য পরিচালনা করবে তাতেও পরিবর্তন নিয়ে আসে নতুন সমাজ।

পালাবদলের কর্মযজ্ঞ যখন শুরু হয় তখন নয়া জমানার সাথে খাপ খায় এমন নয়া মূল্যবোধ ও জীবনযাপনরীতির গোড়াপত্তন হবার আগেই পুরানা মূল্যবোধ ও পুরানা জীবনযাপন রীতির জরুরত জলদি ফুরিয়ে আসে। পুরানা রসম-রেওয়াজ দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। এভাবে সমাজ ও সংস্কৃতির দুনিয়ায় যে রদবদল ঘটে যায় তা মানুষের কাছে ‘অনেক কিছু’ হারিয়ে যাবার হুমকি আকারে হাজির হয়। হাজার হাজার বছর ধরে মানবজাতি এরকম তোলপাড় লাগানো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলে আসছে। মানুষ এক কালে পাথরের হাতিয়ার নির্ভর ছিল। কালে কালে তারা লোহার হাতিয়ার এস্তেমাল করতে শিখেছে। একদিন তারা আগুন আবিষ্কার করেছে। আরেকদিন জানোয়ার শিকার করে নগদে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে খাবার চল  ছেড়ে চাষবাষ শিখে নিয়েছে। উৎপাদন প্রণালীর এমন সব রূপান্তর সমাজের উত্তরণ ঘটিয়েছে। এই সত্যে কোন সন্দেহ নাই। তবে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী ও সবচেয়ে বিপ্লবী উত্তরণ ঘটিয়েছে শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন প্রণালী । এই প্রণালী সমাজে যেরকম  বৈপ্লবিক বদল নিয়ে এসেছে মানবসভ্যতার ইতিহাসে আর কোন উৎপাদন প্রণালী সেরকম বদল নিয়ে আসতে পারে নাই।

কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষ যে সকল মূল্যবোধ লালন করত ও যে সকল প্রথা-প্রতিষ্ঠান মানুষকে লালন করত তার প্রায় সবগুলোকেই হুমকির মুখে  ফেলে দিয়েছে শিল্পকারখানা কেন্দ্রিক উৎপাদন প্রণালী। দেহাত হতে মানুষকে ঝাঁকে ঝাঁকে শহরে ভিড় করতে বাধ্য করেছে এই প্রণালী। শ্রমের  কেন্দ্র খামার হতে কারখানায় সরিয়ে নিয়েছে। আগে যেখানে উৎপাদনের এককছিল পরিবার বা স¤প্রদায় সেখানে এখন একক ব্যক্তি। নারীজাতি এখন আরও আরও বেশি করে শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত। আগে সমাজের বিধিনিষেধের কেন্দ্র ছিল চালুরীতি তথা আচার। তার জায়গায় এখন কেন্দ্র আইন-কানুন। সরকারপদ্ধতির গড়নে এসেছে বদল। আগেকার সাম্রাজ্য গিয়ে জাতিরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। সর্বগামী বাজার যাতে সবখানে ঢুকে যেতে পারে সেই মতলবে যোগাযোগের দূরত্ব ঘুচিয়েদেওয়া হয়েছে। আগে যেখানে মানুষের অর্থনৈতিকজীবনের মৌলিক পরিচয় ছিল খেয়েপরে বেঁচে থাকার আঞ্জাম সেখানে পুঁজিতন্ত্র নিয়ে এসেছে উৎপাদনের এলাহি কারবার। মানুষের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে শুদ্ধ কেনার আনন্দেই কিনে বেড়াবার নেশা।

এক স¤প্রদায় হতে আরেক সম্প্রদায়ের দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে পরস্পরকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে শিল্পকারখানাকেন্দ্রিক উৎপাদন প্রণালী। নানান জাতের নানান পেশার নানান স্বভাবের মানুষকে নগরজীবনে কাছাকাছি নিয়ে এসে এককে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করেছে। শত শত বছর ধরে চলে আসা পুরুষতন্ত্রের গড়ন ও মূল্যবোধে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। সমাজের প্রথা-প্রতিষ্ঠানের পরম্পরা তথা ঐতিহ্যের জগত হতে আধুনিকতার জগতে উত্তরণের পথে মাঝখানে যে অনিশ্চিত ধোঁয়াশা জগত পড়ে সে জগতে ঠেলে দিচ্ছে লাখ লাখমানুষকে। এককথায় শিল্পকারখানা কেন্দ্রিক উৎপাদন প্রণালীতে উত্তরণের যে ‘ঘটনা’ তা যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রথাপ্রতিষ্ঠান, রসম-রেওয়াজ, মুল্যবোধ ও জীবনযাপনরীতি ইতি আদি ধীরে ধীরে অকেজো করে দিয়েছে। যদিও অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার জগত যত দ্রুত বদলে যায় সংস্কৃতির জগত ঠিক তত দ্রুত বদলায় না।

শিল্পকারখানা কেন্দ্রিক পুঁজিতান্ত্রিক বিপ্লবযাত্রা শুরু হয়েছিল ইয়ুরোপ হতে। সমাজের আগাপাশতলা বদলে যাবার এই সংকটকাল পশ্চিমা বলুন পূরবী বলুন সকল সমাজই পার করেছে। সবার যাত্রার ধরন এক। কিন্তু বৃত্তান্ত ভিন্ন ভিন্ন। তবু বলব তারা সবাই এ যাত্রায় সংকটের যেসব জবাব দিয়েছে সেসবে বেশ মিল খুজে পাওয়া যায়। জবাব দেবার কারবার মোট চার প্রকার। প্রকার সকলকে আমরা পুনর্বহালবাদি তথা রেস্টোরেশনিস্ট, সংস্কারবাদি তথা রিফরমিস্ট, যে কোন প্রকারে টিকে থাকা বাদি তথা এগসিস্টেনশিয়ালিস্ট এবং বিপ্লবী তথা রেবলুশ্যনারি ইতি আদি নামে বুলাতে পারি।

পুনর্বহালবাদিরা কোন না কোন ভাবে ফেলে আসা জীবনে ফিরে যেতে চায়। অতীত হয়ে যাওয়া সমাজে যে সকল আইন-কানুন-প্রথা ভালমন্দের মাপকাঠি চালু ছিল তা আবার বদলে যাওয়া সমাজে চালু করতে চায়। নতুন সমাজের উপর বসিয়ে দিতে চায় আপন আপন ভাবনার সোনালি অতীত। এই অতীতের নানান নাম। হিন্দুত্ব, রামরাজ্য, এরেজ ইজরায়েল তথা ইজরায়েলদেশ, নেজামে মোস্তফা। ইতি আদি। পুনর্বহালবাদিরা কখনই তাদের ‘অপর’কে সহ্য করতে পারে না। মুসলমান, আরব, হিন্দু, ইসায়ি, আহমদি ইতি আদি অপরের বিশেষ নাম। সদা সর্বদা ‘অপর’কে শুদ্ধ নাকচ করে করেই তারা আপন অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে। ‘অপর’কে নাকচ করা মানে যে সকল চিন দিয়ে ‘অপর’ চেনা যায় তা নাকচ করা। নারীজাতির পোশাক-আশাক হতে নিয়ে পুরুষজাতির দাড়ি, নাচ-গান হতে নিয়ে টেলিভিশন রেডিও ইতি আদি আধুনিক জীবনের নানান সম্বল ‘অপরের’ চিনের মধ্যে পড়ে।

পুনর্বহালবাদি ভাবধারা আর কর্মধারা নানান কিসিম। তাদের ভেতর তুলনামূলক নরম হতে নিয়ে পুরাদস্তুর গরম-চরম সকল ধারাই পাওয়া যাবে। যথা শ্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি হিন্দু পুনর্বহালবাদের নরম নমুনা আর বাবু বাল ঠাকরে চরম নমুনা। মহাশয় লালকৃষ্ণ আডবানি দুইয়ের জামাতে ইসলামি পাকিস্তানের আমির কাজি হোসেন আহমদকে ইসলামবাদের নরম নমুনা আর তালেবান নেতা মোল্লা ওমরকে চরম নমুনা ভাবা যেতে পারে।

সংস্কারবাদিরা আধুনিক জমানার চাহিদা বুঝে চলতে জানেন। আপন আপন ধর্মের প্রথাপ্রতিষ্ঠানের পরম্পরায় যা কিছু বাছা বাছা যা কিছু তাৎপর্যময় তা ধরে রাখতে তারা একান্ত যতœ করেন। শুদ্ধ ধরেই রাখেন না। আধুনিক জীবনের চলনের সাথে খাপও খাইয়ে দেন। উল্টাভাবেও বলা যায়। যে পুরানা সংস্কার ও সংস্কৃতি তারা আপনাদের সাথে বহন করে চলেন তার চলনের সাথে আধুনিক ভাবের নানান আকার-প্রকার মিশ খাইয়ে দেন। ভারতবর্ষে সংস্কারবাদি আদি পুরুষ রাজা রামমোহন রায়। তিনি ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। ভারতি মুসলমান সংস্কারবাদের প্রথম যুগের বড় পুরুষ স্যার সৈয়দ আহমদ খান। আর শেষ বড় সংস্কারবাদি মোহাম্মদ ইকবাল। তাঁর ‘ইসলামে ধর্মচিন্তার পুনর্গঠন’ আধুনিক ইসলামে সংস্কারবাদের সহি নমুনা হয়ে থাকবে। আরব জাহানের মশহুর সংস্কারবাদিদের মধ্যে আমরা মুফতি মোহাম্মদ আব্দুর নেতৃত্বাধীন আল মানার দলটির নাম নেব। মাগরেবজাহান তথা বায়ুকোণ আফ্রিকাখণ্ডের সংস্কারবাদিদের মধ্যে শেখ বিন বাদিস, তাহের আল হাজ্জাজ আর আব্দুল আজিজ তালবি গয়রহ। একদিকে মুসলমানরা ভাবছে মুসলমান জাহানের হাত হতে ক্ষমতা চলে যাচ্ছে আর দিকে সেই মুসলমান জাতিকে উপনিবাসিক পশ্চিমা শক্তির মোকাবেলা করতে হচ্ছে এরকম পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া হিসাবে পুনর্বহালবাদি আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সংস্কারবাদি ধারার প্রথম চলও একই সংকটের জবাব হিসাবে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ হতে এই ভাব মুসলমান জাহানের ভাবজগতে আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করেছে। বাজে উপনিবাস জমানায় এসে এই ভাবের বিকাশ স্থবির হয়ে পড়েছে।

সংস্কারবাদি ভাব প্রথম হোঁচট খায় ওসমানিয়া সাম্রাজ্যে এসে। একের পর এক দুর্বল সংস্কারপ্রয়াস বিফলে যাবার পর তুর্কিরা বিপ্লবী মোড় নিয়ে নেয়। তামাম মুসলমান জাহানে মোস্তফা কামালই একমাত্র পুরুষ যিনি সমাজ বদলে যাবার মুখে এমন বিপ্লবী সাড়া দিয়েছেন। কামাল খেলাফত বাতিল করে দিয়েছেন। ডানে বামে না তাকিয়ে সিধা সেকুলার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান দমন করেছেন। পর্দাপ্রথা আইন করে নিষিদ্ধ করেছেন। একসাথে একটার বেশি বিয়ে করা অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সম্পত্তির অধিকার নির্ধারণ ও নরনারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য সেকুলার আইন পাশ করিয়েছেন। কামাল আতাতুর্ক ইসলামকে রাষ্ট্রের এখতিয়ার হতে যেভাবে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন, চলে আসা প্রথা-প্রতিষ্ঠানের সিলসিলা তথা ঐতিহ্যের জগত হতে যত মৌলিকভাবে সরে এসেছেন আর কোন মুসলমান দেশে আজতক আর কেউ সেভাবে করতে পারেন নাই। তারপরও আমরা দেখলাম উনিশশো আশি নব্বইয়ের দিকে যখন আবার ইসলামবাদের হাওয়া জেগে উঠেছে তুরস্ক তার ধাক্কা এড়াতে পারল না।

ইরানে ১৯০৬ সালে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল তার প্রতিজ্ঞা ও প্রস্তাবনার ভাব ছিল সেকুলার। দেশের উলেমা মাশায়েখ সেই সংবিধান কবুল করে নিয়েছিলেন। সাংবিধানিক সরকারও তারা বৈধ বলে মেনে নিয়েছিলেন। এভাবে ইরানে যে প্রক্রিয়ার সূত্রপাত হচ্ছিল তা হতে পারত মুসলমান জাহানে গনতান্ত্রিক উপায়ে সংস্কার করবার সবচেয়ে সফল উদ্যোগ। কিন্তু হতে আর পারল না। কারণ দুইটা ক্যুদেতা। প্রথম ক্যুকর্তা রেজা শাহ পহলবি। দ্বিতীয় ক্যুর নকশাকার মার্কিন গোয়েন্দা কারবারি সি আই এ। সাল ১৯৫৩।

উপনিবাসিক শক্তি সশরীরে চলে যাবার পর থেকে, এক পাকিস্তান বাদ দিলে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশে দেশে বিকল্প ভাব হিসাবে সেকুলার ভাবই আধিপত্য বিস্তার করেছিল বলতে হবে। জবাহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারত একটা সেকুলার শাসনতন্ত্র বানিয়েছিল। আইন বানানোর জন্য আর ধর্মবিশ্বাসের তোয়াক্কা করতে হত না। কিন্তু তারপরও কথা থাকে। স্বাধীনতার পরপরই সরকার দায়িত্ব নিয়ে সোমনাথমন্দির আবার বানিয়ে দিল। এই ঘটনার পর বলতেই হবে ভারতের কংগ্রেস দলের সরকার সংখ্যাগুরু জনগণের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি বিশেষ সংবেদনা দেখিয়েছে। গত কয় বছরে ভারতের বেশ কয়টি রাজ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদিরা ক্ষমতায় এসেছে। হালফিল কেন্দ্রের মসনদেও তারা আসীন। আর ওদিকে পাকিস্তানে রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্কের বিষয়টা বরাবরের মত আজও এক প্রভূত ধোঁয়াশা আর অনিশ্চয়তাময় ঘটনা। এই ঘটনা রাজনীতিতে ইসলামের অপব্যবহারের পথ প্রশস্তকরে দিয়েছে। ১৯৭১ সালে যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেছে তার পেছনে এই ঘটনার অনেক লম্বা হাত।

উত্তর-উপনিবাসিক পর্বে প্রধান প্রবণতা টিকে থাকবার স্বার্থে ধর্মব্যবসায়। ধর্মের নাম করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটা। লুটেপুটে আপন আপন রাজনৈতিক ক্ষমতা পোক্ত করে সরকার ও সমাজের খানদানি সর্দারশ্রেণী মহাসুখী। সুখের আবেশ দিয়ে তারা এড়িয়ে যান ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক নির্ণয় করবার গুরুদায়িত্ব। আশি-নব্বইয়ের দশকে এসে এই প্রবণতা ইসলামের জঙ্গি চেহারার হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এই সময় দুনিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাদি তড়িৎগতিতে একক বিশ্বব্যবস্থার আকার নিচ্ছিল। একইসাথে বিশ্বজুড়ে হচ্ছিল জঙ্গি ইসলামের প্রসার। এর মাঝে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ইরান বিপ্লব ইসলামবাদীদের আরও এক কাঠি বেশি উদ্বুদ্ধ করল। তবে তাদের সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছে আফগান জিহাদ। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহানুভবতায় এই জিহাদ আজ এক আন্তর্জাতিক কারবার। মার্কিন সহায়তায় আফগানিস্তানে তালিম নেওয়া মুজাহিদবর্গের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু এখন মিশর আলজিরিয়া ইতি আদি দেশের মার্কিন সমর্থনধন্য সরকার। পরিহাস ইহাকেই কহে বটে!

আশির দশক নব্বইয়ের দশকের দিকে ডানপন্থী ধর্মান্দোলন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠে দুনিয়ার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্দোলন সবিশেষ সহিংস চেহারা নিয়েছে ইসরায়েলে। রাষ্ট্র স্বয়ং জায়নবাদি ধর্মান্ধদের হাতে হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। জুলুমের বিশেষ শিকার ফিলিস্তিনি আরব জনগণ। ভারতে হিন্দুত্ববাদিরা দীর্ঘদিন বাবরি মসজিদ বিরোধী প্রচার চালিয়ে গেছে। ধান্ধা আপন আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আদায় করবে। শেষমেশ আমরা দেখলাম সেই ষোল শতকের মসজিদটা ধুলিস্মাৎ হয়ে গেল। সা¤প্রদায়িক ত্রাস ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। আর ভারতীয় জনতা দল জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী দল হিসাবে হাজির হল। আফগানিস্তানে দেখলাম রুশ সেনা হাত গুটিয়ে নেবার পর থেকে শতধাবিভক্ত বিজয়ী আফগান মুজাহিদবর্গ নিজেরা নিজেরা খুনাখুনি করে করে দেশটা ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছে। সুদানে ইসলামি সরকার কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব। সরকার চালাবার চরম অদক্ষতা ডেকে এনেছে ভয়ানক দুর্ভিক্ষ। বসনিয়া-হার্জেগোবিনায় সার্ব জাতীয়তাবাদ, নাসারা মৌলবাদ আর মিলোসোবিচি জঘন্য সুবিধাবাদ মিলেমিশে জারি রাখছে তামাম অসার্বজাতিগোষ্ঠী খুন করে কিংবা জবরদস্তি খেদিয়ে দিয়ে শুদ্ধ সর্বসার্ব দেশ বানাবার কারবার।

সামান্য সংক্ষেপিত তর্জমা

মুল রচনার নাম: Roots of Religious Rights.

প্রথম প্রকাশ: পাকিস্তান হতে প্রকাশিত ডন পত্রিকা তারিখ ২৪ জানুয়ারি, ১৯৯৯

তর্জমা: আরস্তু লেনিন খান

গিয়াপচরিত্র: তৃতীয় পর্ব পরাধীন ভিয়েতনামের কথা–মোহাম্মদ হাবিব

রেলওয়েতে দেশীয় ভিয়েতনামীদের জন্য আলাদা কামরা

রেলওয়েতে দেশীয় ভিয়েতনামীদের জন্য আলাদা কামরা

দাঁও মারার নানান ফিকির:

বিশ শতকের শুরু। ভিয়েতনামে ফরাসিদের খুব সুবিধা হচ্ছে না। ১৯০৫ সালে এক অ-ফরাসি বিদেশী হাইফঙে এল। ঘুরেফিরে সে পত্রিকায় এক প্রবন্ধ লিখল:

হাইফঙে আমি বেশ অনেক ফরাসির সাথে কথা বললাম। তাদের মধ্যে দেখলাম এই দেশের উন্নতি নিয়ে হতাশা। ‘নাহ! দেশটা দেখতে ভাল, কিন্তু ঐটুকুই। এর আর হংকং হওয়া হল না’।

আমি ভাবলাম, হবে কেমনে, যতদিন ফরাসি বাণিজ্যকে লাই দেওয়া হবে। এদেশে বিদেশী (অ-ফরাসি) পণ্যের উপর শুল্ক চড়া। অর্ধেকের বেশি আমদানি আসে ফ্রান্স বা তার উপনিবেশ থেকে। এক-চতুর্থাংশ রপ্তানি যায় সেখানে। ফলে ইংরেজ, মার্কিন বা জার্মানের জন্য ইন্দোচীনে কোন সুযোগ নাই। ফরাসিরা নিজেদের বণিকদের একচেটিয়া চায় এখানে। … এভাবে কি পুঁজি আসে? পরিহাস এই যে এই ব্যবস্থায় ফরাসিদের লাভটা হচ্ছে শূন্য। দেখে বরং মনে হয় এই উপনিবেশের একমাত্র কাজ সরকারি চাকুরে প্রত্যাশীদের চাকুরির সংস্থান করা। অপিসবাবুতে বড় বড় শহরগুলা গিজগিজ করছে। … ফরাসিরাও মানে এদেশে ভিনদেশী বণিকদের সুযোগ সীমিত। কিন্তু তারা এর সাফাইস্বরূপ বলে এটা নতুন উপনিবেশ, উন্নয়নের খরচা আছে, ঋণ শোধের ঝক্কি আছে, তাই ভারি মাশুল বসিয়ে সেই অর্থ জোগাড় হচ্ছে। … ফরাসি বণিকও কিন্তু এদেশে খুব কম। তার কারণ ফ্রান্সে জনসংখ্যার চাপ কম। একটু টাকাপয়সা হলেই মফস্বলে জমিয়ে থাকা যায়। ইংলণ্ড বা জাপানে তার উল্টা। এত লোক যে প্রতিযোগিতার ঠেলায় ছেলেরা বিদেশে পাড়ি জমায়। (The Straits Times, 1905)

আদতেই ইন্দোচীন তখন ফরাসিদের হতাশার কারণ। গবর্নর দ্যুমার রাস্তাঘাট, খালবিল, রেল ইত্যাদি উন্নত করেছিলেন। কিন্তু লাভ যখন হচ্ছে না, তখন অবকাঠামো স্থাপনের পেছনে খরচ নিয়ে ফরাসি সরকার অনিচ্ছুক। তাছাড়া ফরাসি অর্থনীতি উপনিবেশে খরচ করার অবস্থায় নেই। ফরাসি সরকার খরচ কমানোর ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নিল। ফল দিল। ১৯২০ সালে গবর্নর লং বললেন: ‘ইন্দোচীনের জন্য ফ্রান্সের পকেট থেকে এক পয়সাও খরচা হচ্ছে না।’ (The Strait Times, 1920)

ইন্দোচীনে ফরাসি প্রশাসনের আয়ের উৎস দাঁড়াল মাথাপিছু কর বা মাথা কর (পোল ট্যাক্স), কৃষকের উপর খাজনা, ইত্যাদি। তা বাদে আরেকটি বড় দিক ছিল সরকারের তিনটি একচেটিয়া ব্যবসা: লবণ, আফিম ও মদের উপর সরকার একচেটিয়া কায়েম করেছিল। এ থেকেও সরকার মোটা আয় করত। এসকল দিয়ে উপনিবেশের প্রশাসনকে স্বনির্ভর করা হল, যদিও প্রজাদের জন্য তা বোঝা হয়ে দাঁড়াল।

খরচ নাহয় কমল, কিন্তু বাণিজ্য না বাড়ালে উপনিবেশের উদ্দেশ্য মাঠে মারা যাবে। ফরাসিরা দাঁও মারার নানান ফিকিরই করল। চাল রপ্তানির উপর ফরাসিরা প্রথমটা জোর দিল। কিন্তু ভিয়েতনামের চাল তত নাকি ভাল ছিল না। চাল দিয়ে অত মোটা লাভ হল না ফরাসিদের।

অবশেষে প্রথম মহাযুদ্ধের পর সুযোগ এল। বিশ্ববাজারে রাবারের খুব চাহিদা তখন। ফরাসিরা ভিয়েতনামে ব্যাপক হারে রাবারের চাষ শুরু করল। মজুরদের তিন থেকে পাঁচ বছরের বাঁধা চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হত। রাবার বাদে খনিতেও ফরাসি বিনিয়োগ হল। এভাবে একটা অর্থনৈতিক জোয়ার এল ফরাসি ভিয়েতনামে। কিছু শিল্পকারখানাও হল। অবশ্য তা নগণ্য। ফলে এসময় যে কুলিমজুর শ্রেণীটি গ্রামের কৃষক থেকে আলাদা হয়ে গঠিত হল তা মূলত খামার ও খনিতে কাজ করত। ভূসম্পত্তির কেন্দ্রীভবনের ফলে অনেক কৃষক বেকার হয়ে শহরে পাড়ি জমাল, তাদের কেউ বা মুটে, কেউবা পুসপুস কুলি (রিকশাওয়ালা), আর বিরাট অংশ বেকার। ফসল তোলার সময় তাদের অনেকে গ্রামে ফেরে। অবশ্য এইসকল সামাজিক বদল সত্ত্বেও ৯০ শতাংশ দেশবাসী কৃষকই রইল: দক্ষিণে মূলত কৃষিশ্রমিক (কেননা দক্ষিণে রপ্তানিমুখি প্ল্যান্টেশন অধিক), আর উত্তরে ক্ষুদ্রকৃষক।

ভিয়েতনামে ফরাসি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম ব্যাংক দ্য’ ইন্দোচীন। তা থেকে সেদেশে পিয়াস্ত্রে নামক মুদ্রা জারি হত। ভিয়েতনামে যে ফরাসি ব্যাংকিং ব্যবসা ছিল তা থেকে নতুন খাতগুলোতে নানা আর্থিক সুবিধা ও ঋণ দেওয়া হত।

আমদানি রপ্তানি বিনিয়োগ লগ্নি ইত্যাদির দ্বারা ঔপনিবেশিক ভিয়েতনাম তার অফরাসি প্রতিবেশী  দেশগুলোর সাথে যত না যুক্ত ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি যুক্ত ছিল ফরাসি দেশের সাথে। কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্ক বটে।

আফিম মদ ইত্যাদি ধুমসে বেচাবিক্রি চলল ফরাসি একচেটিয়ায়। ১৯০৬ সালে জনৈক ফরাসি লিখেছিলেন: আনামীরা খুব সংযত, মদ খাওয়ার অভ্যাস তাদের মধ্যে নাই বললেই চলে। (Deguet, 1906) কয়েক বছর পর জনৈক ইন্দোচীনা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন: (সাম্রাজ্যবাদীরা) আফিম, মদ প্রভৃতি বিষ খাওয়াইয়া আমাদের বিষাইয়া তুলিয়াছে। (Minh, Speech at Tours COngress, 1920)

ভিয়েতনামে অনেক চৈনিক বণিক, শ্রমিক ও চাষা পাড়ি জমাত। ফরাসিরা এই নিয়ে হট্টগোল বাঁধাল। তারা এর নাম দিল হলদে বিপদ। বলল এই চৈনিকদের মাথাপিছু (পোল) কর বসাও যাতে তাদের আগমন বন্ধ হয়। অবশ্য ফরাসিদের মধ্যে যারা প্ল্যান্টেশন করত তারা একে স্বাগত জানাত। চীনারা এলে কম খরচে মজুর খাটানো যাবে। তবে, তারা বলল, মজুর আসুক, কিন্তু চৈনিক বণিক কিন্তু আসা বন্ধ করা চাই। এরা এদেশে ব্যবসা করে অনেক ব্যবসায় ফরাসিদের হটিয়ে দিচ্ছে। এই প্রতিযোগিতা বন্ধ হোক। আদতেই চীনাদের উপর মোটা মাথাকর বসানো হল। (The straits times, 1890)

বর্ণবাদ:

বর্ণবাদের হরেক আকার, নানান পরিসর। ভিয়েতনামে বর্ণবাদ হাজির ছিল বিচারে, বিদ্যায়, বেসাতিতে। ভিয়েতনামের কৃষক বিদ্রোহীদের ফরাসিরা বলত দস্যু।  আর বিচারের বেলা বৈষম্য ছিল মৌলিক:

ইন্দোচীনা বিচার ব্যবস্থায় বিচারের পাল্লা ও বাটখারা দুইপ্রকারের। ভিয়েতনামী জনগণ কস্মিনকালেও এয়ুরোপীয় কিংবা এয়ুরোপীয়মনস্ক দেশীয় নাগরিকের সমান বিচার পায় না। (Minh, Speech at Tours COngress, 1920)

বর্ণবাদের চর্চা ও প্রসারে ফরাসি বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের একাংশ উজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ দগে বলে এক ছিলেন পদাতিক বাহিনীর কর্নেল, পাশাপাশি তিনি নৃতত্ত্ববিদ্যার চর্চা করতেন। ১৯০৬ সালে আনামীদের আচার নিয়ে তিনি একখানা নৃতাত্ত্বিক বই লিখলেন। বইয়ে দগে লিখলেন:

আনামী আকারে কৃশ। চিকন। বেড়ালের মত তার সুনিপুণ দ্রুত চলন। হলুদ চামড়া, তবে চীনাদের চেয়ে কাল। তার সরু বাঁকা চোখ, থ্যাবড়া নাক, মোটা ঠোঁট, সে ঠোঁট ফাক হয়ে থাকে কাল রং করা দাঁতের প্রদর্শন করতে। লম্বা তার কেশ। পাঠক নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন আনামীর রূপখানা খুব বাহারি নয় । যারা এই জাতের মানুষ দেখেন নি, তারা ভাববেন এরা দুনিয়ার কুশ্রীতম জাত। আসলেই ইউরোপীয় লোক যখন পয়লাবারের মত সায়গন নামে, তখন এই ক্ষুদ্রকায় নারী পুরুষ দেখে একপ্রকার ঘৃণা বোধ না করে পারে না। নারী পুরুষের মধ্যে প্রথম প্রথম তো আলাদাই করা যায় না, আস্তে আস্তে অবশ্য পোশাক ও চুলের পার্থক্যগুলা ধরতে পারা যায়। আস্তে আস্তে চোখ সয়ে আসে। একসময় হয়তো মেয়েদের দাঁত কাল না হলে আর মনে ধরে না। কথা এই: সৌন্দর্য চেতনাও অভ্যাসের ব্যাপার। (Deguet, 1906)

আনামীরা শুধু কুরূপ নয়, তারা আজব ও আদিমও বটে।

ফরাসি সরকার ভিয়েতনামে পর্যটন পুস্তিকা বের করত। সেখানে তারা লিখল, আনামে আসলে পাবেন বৈচিত্র্যের স্বাদ। প্রাচীন সভ্যতা এখানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মেলে। আসুন দেখে যান, সব পুরাতন। কিন্তু থাকবেন অত্যাধুনিক হোটেলের সুব্যবস্থায়। খাসা আবহাওয়া। আর মানুষজন?

‘এখানকার আদমিরা সেই আদ্যিকালের চালচলনই বহাল রেখেছে, তাদের বিচিত্র প্রথাপ্রতিষ্ঠান দেখবার জিনিশ।’ (Bureau officiel du Tourisme en Annam, 1926)

আজব মানুষদের রাজনৈতিক সত্তা ও স্বাতন্ত্র্য দলন করা সহজ।

বশ মানানোর নানান কায়দা:

পরাধীন জনগণকে বশ মানানোর পহেলা কায়দা অবশ্যই বলপ্রয়োগ। ১৮৭০-১৮৯৬ পর্যন্ত সেনাবাহিনী দিয়ে ফরাসিরা শায়েস্তাকরণ বা শান্তিপ্রতিষ্ঠার কর্মকাণ্ড চালাল: সে প্রক্রিয়ায় বহু আদমির কল্লা গেল, বহু গ্রাম বিরান হল। ফরাসিরা নানা পুলিশ বাহিনী গঠন করল, পাশাপাশি দেশীয় যুবাদের নিয়ে একটি মিলিশিয়া গঠন করল।

ফরাসিদের জবান একপ্রকারের নয়, নানাপ্রকারের, তার নানা শ্রোতা, নানা উদ্দেশ্য। তাদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হিসাবে ফরাসিরা প্রায়ই বলত তারা অসভ্য জাতিদের সভ্য করার মিশন নিয়েছে, যাকে বলে mission civilisatrice। ইন্দোচীনের বেলা যেমন ফরাসি উপনিবেশমন্ত্রী বললেন ফরাসি মিশন হল: দেশীয় কৃষ্টির প্রতি সম্মান, সভ্যতার প্রসার, সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশীয়দের বস্তুগত কল্যাণ ও নৈতিক উন্নতি। (The Strait Times, 1906)

সভ্যতা প্রসারের একটি কল হল শিক্ষা। ফরাসিরা পাঠ্যপুস্তকে বাচ্চাদের শেখাল তারা তাদের ‘ইন্দোচীনা প্রজাদের’ জন্য কি কি ভাল এনেছে:

  • নৈতিক উন্নতি: যথা খ্রিস্টানধর্ম।

  • ঐহিক/বস্তুগত উন্নতি: ব্যবসা শিল্প, রাস্তাঘাট,  রেল, খাল, টেলিগ্রাফ, পোস্টাপিস, কৃষি ইত্যাদি।

  • দৈহিক উন্নতি: হাসপাতাল, ঔষধালয়, কুইনিন, টীকা/প্রতিষেধক ইত্যাদি।

  • শিক্ষা: শিক্ষার স্কুল, বৃত্তি, ডাক্তারি স্কুল।

  • নিরাপত্তা: শক্তিশালী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী। নগর পুলিশ, গ্রামপুলিশ, নৌপুলিশ। ন্যায়বিচার।

ইন্দোচীনা প্রজাসাধারণের উচিত ফ্রান্সের এই শান্ত, বিজ্ঞ, সবল ও সদাশয় মুরুব্বিয়ানার ছত্রছায়ায় গর্বিত ও খুশি থাকা। (Precis d’Histoire d’Annam A la usage des ecoles primaires, 1918)

শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূমিকা উপনিবেশে ছিল বৈকি। নগ্ন বলপ্রয়োগের রাস্তা খুব বেশিদূর নিতে পারে না। চাই মনের ভেতর বশের যুক্তি। দগে মশায় লিখলেন:

আনামী খুব স্তুতিপ্রিয়… পদক জাঁক ইত্যাদি তাদের ভারি পছন্দ। … অবশ্য এটা আমাদের জন্য শাসক হিসাবে একটা সুবিধা । আমাদের পুলিশ ফৌজের সেপাইরা যে ঝুঁকি নিয়ে দস্যু দমন করে তার জন্য মেডাল দিলেই তারা খুশি। তেমনি ফরাসি ভাষা শেখার জন্য ডিগ্রি ইত্যাদি দিয়ে দেশীয়দের বশ করা সহজ হয়েছে। (Deguet, 1906)

ফরাসিরা শিক্ষার দ্বারা নতুন আদর্শে ভিয়েতনামি সমাজের একাংশকে দীক্ষিত করতে চাইল। ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের, লেখকদের সাহিত্য পাঠ্য করল। অবশ্য মন্তেস্কু রুসো প্রমুখ ১৮ শতকের মনীষী যাঁরা ফরাসি বিপ্লবের চিন্তানায়ক ছিলেন তাদের লেখা তারা মোটেই পাঠ্য করল না। এই খণ্ডিত আধুনিক উচ্চশিক্ষা অবশ্য খুব সীমিত অংশের জন্য বরাদ্দ রইল। ব্যাপক জনগণের জন্য শিক্ষার প্রসার ফরাসিদের বাজেট ও বাসনার বাইরে ছিল।

ফরাসিরা প্রশাসনের নিচু পদগুলোতে দেশীয়দের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশকে নিয়োগ দিত। এ তাদের খরচ কমানোরই একটা কায়দা: পুরা প্রশাসনে ফরাসি কর্মকর্তা রাখার খরচ বেশি। সেনাবাহিনীতেও দেশীয়দের বাড়ানো হল। (The Strait Times, 1912) (The Strait Times, 1906)

ফরাসিরা দেশীয় সামন্তব্যবস্থাকে অনেকটা অটুট রাখল। কৃষকের কাছ থেকে কর আদায়ের ভার ছিল স্থানীয় সামন্তের। (Vien)

ভিয়েতনামে নবযুগের চেতনা:

অতীত যা ছিল তা আমরা ধ্বংস করেছি, আর সে শূন্যস্থান এখনো কোনকিছু দিয়ে পূর্ণ হয় নি। আমাদের বিজয় অভিযানে সমাজে যে ওলটপালট শুরু হয়েছিল তা এখন এক বিরাট সামাজিক বিপ্লবে রূপ নিল বলে। (গবর্নর ল্য মিরে দ্য ভিলে)

১৮৯০-এর শেষ নাগাদ ফরাসিরা ভিয়েতনামীদের বিদ্রোহকে মোটামুটি সামাল দিতে সফল হয়। সমাজের উচ্চবর্গের একাংশকেও হাত করে ফেলে। তাছাড়া রাজা ও পুরাতন পণ্ডিতসমাজের প্রাসঙ্গিকতা নতুন পরিস্থিতিতে লয় পাচ্ছিল। ভিয়েতনামের সমাজে ধীরে ধীরে একটি বোধ গভীর হচ্ছিল যে চিরাচরিত পন্থায় পরাধীনতা থেকে মুুক্তি আসবে না। পুরাতন কনফুসীয় চিন্তা চেতনা দিয়েও আর চলবে না। তাঁরা বাইরের দিকে তাকালেন। নতুন আদর্শ চাই। তাঁরা তাকিয়ে দেখলেন: জাপান।

জাপানি:

১৮৬৮ সাল থেকে জাপানে তথাকথিত মেইজি পুনর্বহালের যুগ আরম্ভ হয়। জাপান ইউরোপের অনুসরণে দ্রুত শিল্পায়ন শুরু করে। সেই সাথে সামরিক দিক দিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে। তাদের এ নবলব্ধ শক্তিপ্রদর্শনের মওকা মিলল ১৯০৪ সালে। সেবছর কোরিয়া নিয়ে রুশ জাপান যুদ্ধ বাঁধল।

ফ্রান্স এ যুদ্ধে নিরপেক্ষ রইল। ফরাসিদের ভয় যুদ্ধ না ইন্দোচীনে ছড়ায়। রুশ নৌবাহিনী ইন্দোচীনের পানিতে নৌবহর নিয়ে হাজির হল বলে। ফ্রান্স রুশকে চটাতে চায় না কারণ রাশিয়ায় কয়েকশো মিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ তার। আবার রুশকে যুদ্ধকাণ্ডে ইন্দোচীনের পানি ব্যবহার করতে দিলে জাপান ভ্রুঁকুঞ্চন করবে। শেষে ফরাসিরা এযাত্রা রক্ষা পেল। রুশরা ইন্দোচীনে এল না। জাপানকেও ফ্রান্স খুব তোয়াজ করে ঠাণ্ডা করল। (Sydney Morning Herald, 1905)

যুদ্ধশুরুর একবছরের মাথায় ১৯০৫ সালে জাপান রুশদেশকে যুদ্ধে পরাস্ত করল।

সেকালের বর্ণবাদী জবানে এর অনুবাদ দাঁড়াল: পীতাঙ্গ বাহিনী শ্বেতাঙ্গ বাহিনীকে পরাস্ত করল। কিন্তু বর্ণবাদের বাইরে এর তাৎপর্য ছিল। জাপানি বিজয়ের খবর এশিয়ার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সংগ্রামের পন্থায় বিদেশী শাসনের অবসান করতে হবে — এই চিন্তা প্রসার লাভ করল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন:

এশিয়ার মধ্যে জাপানই এই কথাটি একদিন হঠাৎ অনুভব করলে যে, য়ুরোপ যে-শক্তিতে পৃথিবীতে সর্বজয়ী হয়ে উঠেছে একমাত্র সেই শক্তির দ্বারাই তাকে ঠেকানো যায়। নইলে তার চাকার নীচে পড়তেই হবে এবং একবার পড়লে কোনোকালে আর ওঠবার উপায় থাকবে না।

এই কথাটি যেমনি তার মাথায় ঢুকল অমনি সে আর এক মুহূর্ত দেরি করলে না। কয়েক বৎসরের মধ্যেই য়ুরোপের শক্তিকে আত্মসাৎ করে নিলে। য়ুরোপের কামান বন্দুক, কুচ-কাওয়াজ, কল-কারখানা, আপিস-আদালত, আইন-কানুন যেন কোন্ আলাদিনের প্রদীপের জাদুতে পশ্চিমলোক থেকে পূর্বলোকে একেবারে আস্ত উপড়ে এনে বসিয়ে দিলে।

পৃথিবীতে মোটামুটি দুরকম জাতের মন আছে–এক স্থাবর, আর-এক জঙ্গম। এই মানসিক স্থাবর-জঙ্গমতার মধ্যে একটা ঐকান্তিক ভেদ আছে, এমন কথা বলতে চাই নে। স্থাবরকেও দায়ে পড়ে চলতে হয়, জঙ্গমকেও দায়ে পড়ে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু, স্থাবরের লয় বিলম্বিত, আর জঙ্গমের লয় দ্রুত।

জাপানের মনটাই ছিল স্বভাবত জঙ্গম; লম্বা লম্বা দশকুশি তালের গাম্ভারি চাল তার নয়। এইজন্যে সে এক দৌড়ে দু-তিন শো বছর হু হু করে পেরিয়ে গেল!

জাপান য়ুরোপের কাছ থেকে কর্মের দীক্ষা আর অস্ত্রের দীক্ষা গ্রহণ করেছে। তার কাছ থেকে বিজ্ঞানের শিক্ষাও সে লাভ করতে বসেছে। (ঠাকুর, ১৯১৬)

ভিয়েতনামেও নবযুগেএই ‘স্থাবর বনাম জঙ্গম জাতি’র তত্ত্ব ভর করেছিল। ভিয়েতনামের নবযুগের দুই মনীষী: ফান বই চাউ আর ফান চু তৃণ (১৮৭২-১৯২৬)।

তৃণ ছিলেন সংস্কারপন্থি এবং শান্তিবাদী। তিনি ফরাসিদের নিকট থেকে শিখতে চান অনেককিছু। তিনি বললেন, আগে চাই নিজেকে শুদ্ধ করা, সংস্কার করা। আপাতত ঔপনিবেশিক শাসকের কাছে আরজি করে যতটুকু অধিকার আদায় করা যায়, সে পথেই আগানো আবশ্যক। আর স্বদেশে রাজতন্ত্র চাই না, সামন্ততন্ত্র হটাতে হবে, রিপাবলিকান বা প্রজাতন্ত্রী আদর্শ ও প্রথা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

তৃণ মন্তেস্কু রুসো প্রমুখের বই পড়েছিলেন। এঁদের বই চীনে অনুবাদ হয়েছিল। ভিয়েতনামের বুদ্ধিজীবীরা সে সূত্রে পড়তে পেরেছিলেন। তৃণ দেশীয় আদর্শে একটি উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান খুললেন। অবশ্য ফরাসিরা তা অচিরেই বন্ধ করে দিল।

ফান বই চাউ বৈপ্লবিক পন্থায় বিদেশী শাসন উচ্ছেদের পক্ষপাতী। চাউয়ের বড় আদর্শ জাপান। ১৯০৬ সালে চাউ জাপানে আসলেন। তাঁর আশা: এশিয়ার নায়ক জাপান পরাধীন এশীয়দের সহায় হবে।

চাউয়ের যুগ:

চাউ ভাবলেন, সামরিকভাবে বিদেশীদের খেদাতে হবে। কিন্তু অস্ত্র কই, সৈন্যবল কই?

তিনি চিন্তা করে জর্জ ওয়াশিংটনের উদাহরণ বের করলেন:

আমেরিকার বড় আদর্শ জর্জ ওয়াশিংটন। অল্পবয়সে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তখন আমেরিকা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে লাঞ্ছিত। ওয়াশিংটন ফন্দি আঁটলেন। তিনি অবশেষে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমেরিকাকে স্বাধীন করলেন। ওয়াশিংটন আমাদের জন্যও আদর্শস্বরূপ। (Young, 2002)

তিনি বললেন, আগে সহিংস পন্থায় ভিনদেশী শাসন উৎখাত করতে হবে। বিদেশীদের তাড়ালে দেশে রাজতন্ত্র থাকে থাকুক।

তবে চাউয়ের রাজনৈতিক বা সামরিক কৌশল ছিল গলদপূর্ণ। তিনি সন্ত্রাসবাদকেই রাজনীতির মোক্ষম পন্থা মনে করতেন। শহুরে শিক্ষিতরা যা করার করবে। বৃহত্তর কৃষক সমাজের গণরাজনীতি গণআন্দোলনের দিকে তিনি মনোযোগ দেন নি।

ভারতেও এ যুগে কংগ্রেসে লালা লাজপত, বিপিন পাল, প্রমুখ সশস্ত্র পন্থার ডাক দিয়েছিলেন। অনুশীলন, যুগান্তরের সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছিল। চাউ এরকম সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের ডাক দিলেন।

১৯০৫ সালে রাশিয়ায় গণতান্ত্রিক বিপ্লব হল। পারস্যে গঠনতান্ত্রিক বিপ্লব হল। ১৯০৮ সালে তুরস্কে তরুণ তুর্কি তথা গণতান্ত্রিক বিপ্লব হল। ১৯০৮ সালে ভিয়েতনামেও ফরাসিবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধল। চাউয়ের ডাকে সমাজের একাংশ সাড়া দিল। তা বাদেও কৃষক ও নাগরিক আন্দোলন শুরু হল।

তখন জাপান চাউকে খেদিয়ে দিল। সাধের জাপান! জাপানের সাথে ফরাসিদের একটি আঁতাত হয়েছিল। তাই ফরাসিবিরোধীদের জাপানে আর ঠাঁই হল না।

চাউ নানাপথ ঘুরে চীনের গুয়াংজুতে আস্তানা গাড়লেন। ১৯১১ সালে চীনে সান ইয়াত-সেন গণতান্ত্রিক বিপ্লব করলেন। চাউ দেখলেন, গগনে নতুন আদর্শ উদিত হয়েছে। ১৯১২ সালে তিনি এই আলোকে নতুন লক্ষ্য ও কর্মসূচি দিলেন: ফরাসিদের খেদালেই চলবে না। গণপ্রজাতন্ত্র গঠন করতে হবে ভিয়েতনামে।

চাউ চীনে থিতু হলেন। কিন্তু চীনে প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র থিতু হল না। ওয়ারলর্ড বা আঞ্চলিক বারভূঁইয়ার জবরদস্তি শাসন শুরু হল। ১৯১৪ সালে ফরাসি স্বীকৃত চৈনিক ওয়ারলর্ড ইউয়ান শি-কাই চাউকে কারারুদ্ধ করলেন। এদিকে দেশে যারা চাউয়ের পন্থায় কাজ করার চেষ্টা করছিল তাদের দমন করা হল।

তারপর প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হল। ৫০,০০০ ভিয়েতনামী সেনা ইউরোপ গেল। ৫০,০০০ মজুর ইউরোপ গেল। ১৯১৬ সালে ভিয়েতনামে সিপাহী বিদ্রোহ হল। তরুণ রাজা তাতে শামিল হলেন। কিন্তু ফরাসি তড়িৎ হস্তক্ষেপে বিদ্রোহ অঙ্কুরেই নষ্ট হল।

১৯১৭ সালে যুদ্ধ শেষ হল। চাউ ছাড়া পেলেন। কিন্তু যুগ তখন পাল্টেছে। নতুন যুগের নায়ক হবেন হো চি মিন।

হো চি মিন ও আন্তর্জাতিকতা:

১৮৯০ সালে হো চি মিনের জন্ম। তিনি অল্প বয়সেই পেকেছিলেন, রাজনৈতিক চিন্তা তাঁর ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল। ১৯০৮ সালের আন্দোলনে তরুণ হো চি মিন শামিল হয়েছিলেন।

১৯১১ সালে জাহাজে করে হো পাড়ি দিলেন ইউরোপে। গেলেন ইংলন্ডে। আমেরিকাতেও ঘুরে এলেন। তারপর প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে গেলেন ফ্রান্সে। সেখানে সমাজতন্ত্রী দলে যোগ দিলেন। তাঁর চিন্তার বিষয় হল: স্বদেশে স্বাধীনতা আসবে, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে — এমন রাজনীতি কিভাবে গঠন করা যায়। হো শুনেছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধের কালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলেছেন।

১৯১৯ সালে ভার্সাই নগরে জাতিসমূহের সম্মেলন। হো সেখানে হাজির। উইলসন বলেছেন জাতির অধিকার। হো চিঠি মুসাবিদা করলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট লানসিঙের বরাবর (তাঁর তখনকার ছদ্মনাম ছিল নগুয়েন আই কুয়ক):

মহাত্মন,

মৈত্রীশক্তির বিজয়ের এই ক্ষণে আমরা আনামী জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার্থে এই স্মারকলিপি পেশ করছি। …

মৈত্রীশক্তির বিজয়ের পর থেকেই সকল পরাধীন জাতি আশায় দিন গুণছে অধিকার ও সুবিচারের দিন এল বলে। বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার যে যুদ্ধ হয়েছে, তাতে তারাও শামিল হয়েছিল। সকল জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের পবিত্র অধিকার যতদিন স্বীকৃতি না পায়, ততদিনের জন্য প্রাচীন আনাম সাম্রাজ্য যা বর্তমানে ফরাসি ইন্দোচীন, সে জাতি আঁতাত শক্তির সদাশয় সকল সরকার সমীপে নিম্নলিখিত বিনীত দাবিসমূহ পেশ করছে:

১)     সকল রাজবন্দির সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হোক।

২)     ইন্দোচীনে ইউরোপীয়দের সমান সুবিচার পাওয়ার অধিকার দেশীয়দের জন্য স্বীকার করা হোক। আর যেসকল বিশেষ বিচার আদালতের দ্বারা আনামী জনগণের সবচেয়ে সচেতন অংশকে ত্রাস ও জুলুমের দ্বারা শায়েস্তা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেসব আদালত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হোক।

৩)     সংবাদপত্র ও বাকস্বাধীনতা।

৪)     সংগঠন ও সভার স্বাধীনতা।

৫)     বিদেশে অভিবাসন ও ভ্রমণের স্বাধীনতা।

৬)     শিক্ষার স্বাধীনতা, প্রদেশে প্রদেশে দেশীয় জনগণের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন।

৭)     ডিক্রিজারির শাসনের বদলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা।

৮)     ফরাসি সংসদে আনামী জনগণের স্থায়ী প্রতিনিধিদলের অংশগ্রহণ।

এসকল দাবী পেশের ক্ষেত্রে আনামী জনগণ সকল শক্তির বিশ্বজোড়া সুবিচারের উপর ভরসা করছে, বিশেষত যে মহান ফরাসি জাতি আমাদের ভাগ্যবিধাতা, যে প্রজাতন্ত্রী ফ্রান্স আমাদের সুরক্ষাধীন করেছে, তাদের সদিচ্ছার উপর ঈমান রাখছে। ফরাসিদের সুরক্ষা চেয়ে আমরা ছোট তো হইই নি, বরং এতে তাদেরই ইজ্জত করা হল, কারণ আমরা জানি ফরাসিরা স্বাধীনতা ও সুবিচারের ধ্বজাধারী, তারা কখনোই বিশ্ব মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ ত্যাগ করবে না। কাজেই মজলুমের কথা শুনলে ফরাসিরা স্বদেশ ও মানবতার প্রতিই তাদের কর্তব্য করবে মাত্র।

আনামী দেশপ্রেমীদের পক্ষে

নগুয়েন আই কুয়ক

(Young, 2002)

অর্থাৎ হো ফরাসিদের বললেন, তোমরা আমাদের ভাই। আমাদের মনুষ্যত্ব স্বীকার কর। ভাই, মানুষের দরবারে আমরা সমান।

ফরাসি শাসক শ্রেণীর ভাব ছিল: ভাই ব’লে ডাক যদি, দেব গলা টিপে। ভাই আবার কে? আনামীরা আমাদের ভাই বুঝি? ওরা তো সেই পুরাতন সভ্যতার আজব মানুষ। ভার্সাই সম্মেলনে মার্কিন বা ফরাসি কেউ হো চি মিনের আরজি কানেই তুলল না, জবাব দূরে থাক।

হো নতুন করে ভাবতে বাধ্য হলেন। তখন দেখলেন, দুনিয়ায় আরেকজন বড় নেতা আছেন জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা যিনি স্বীকার করেছেন। তাঁর নাম ভøাদিমির লেনিন। তিনি রুশ বিপ্লব সম্পন্ন করেছেন। হো লেনিনের ‘জাতীয় এবং উপনিবাস প্রসঙ্গে তত্ত্ব’ লেখাটি পড়লেন:

লেনিনের এই লেখায় কিছু রাজনৈতিক শব্দ ছিল যাহা আমি ঠিক বুঝিতে পারি নাই। তবুও ইহা আমি বারবার পড়িতে লাগিলাম এবং শেষে ইহার সারাংশ ধরিতে পারিলাম। তখন কি আবেগ, কি উদ্দীপনা, কি স্বচ্ছদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস আমায় ভর করিল! আনন্দে আমার চোখ জলে ভাসিয়া গেল। কামরায় আমি একাকী বসিয়া ছিলাম, তথাপি আমি চিৎকার দিয়া যেন জনতার উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিলাম  ‘হে স্বদেশবাসী, হে শহীদেরা! ইহাই তো আমাদের দরকার! ইহাই আমাদের মুক্তির পথ বাতলাইয়া দিবে।’ (হো চি মিন)

১৯২০ সালে হো চি মিন ফরাসি কমুনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেন।

প্রথম মহাযুদ্ধ ভারতের মতই ভিয়েতনামেও নতুন চেতনাপ্রবাহের দোর খুলেছিল। ফ্রান্স রক্ষায় যে বাহিনী ইউরোপ গেল তারা নতুন চেতনা নিয়ে দেশে ফিরল। এসময় ভিয়েতনামে একপ্রকার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হল। দেশীয় কুলীনবর্গ একটি দল করল যার নাম সাংবিধানিক দল; সরকার বাহাদুরের কাছে সুযোগ সুবিধা মাগা তার কাজ। বৃহত্তর জনসমাজে এ দলের গণভিত্তি ছিল না। তাছাড়া কিছু তুলনামূলক উদার গবর্নর বাদ দিলে মোটাদাগে ভিয়েতনামে ক্রমে ক্রমে সাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু হবে এমন কোন  ফরাসি নীতি ছিল না।

১৯২০-এর দশকের শেষে চীনা কুয়োমিন্টাং দলের অনুকরণে ভিয়েতনাম জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হয়। এই দল সাংগঠনিকভাবে তুলনামূলক মজবুত ছিল। কিন্তু তার দুর্বলতা হল তারা চাউয়ের কায়দা অর্থাৎ সন্ত্রাসী হামলাকেই তাদের একমাত্র কায়দা গণ্য করল। এছাড়া দেশীয় সেপাইদের সাথে সম্পর্ক করে সিপাহী বিদ্রোহের চেষ্টাও তারা করল। ১৯৩০ সালে তাদের একটি বিদ্রোহ সংঘটিত হল। কিন্তু সেপাই ও কর্মীদের বিদ্রোহ বৃহত্তর জনগণের মধ্যে সাড়া তুলল না। ফরাসিরা কঠিন হাতে বিদ্রোহ দমন করল। এভাবে জাতীয়তাবাদী দলও দুর্বল হয়ে পড়ল। তাদের এক অংশ চীনে চিয়াং কাই শেকের আশ্রয়ে থিতু হল।

ফরাসি প্রভুরা এই নতুন পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল কি নিল?

ব্রিটিশরা ভারতে জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ইত্যাদি মূলধারার জাতীয় বুর্জোয়া দলের গঠনে সহায়তা করেছিল এবং তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে একদম নিষিদ্ধ সেভাবে করে নি। ফরাসিরা কিন্তু ভিয়েতনামে সেরকম জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া দল যেগুলো হব হব করছিল সেগুলোকে কঠোরভাবে দমন করল; দমন না করলেও স্বীকার করল না।

হো চি মিন ব্রিটিশ নীতির সাথে ফরাসিদের নীতির পার্থক্য ইঙ্গিত করে লিখলেন:

ফরাসি উপনিবেশপ্রভুরা উপনিবেশে সম্পদবৃদ্ধি করতে জানে না, জানে খালি আদিম কায়দায় জুলুম করতে, খেয়ালখুশিমত বশ মানাতে। গান্ধী কিংবা দ্য ভালেরা যদি ফরাসি উপনিবেশে জন্মাতেন তবে বহুত আগেই তাঁরা বেহেস্তে নসীব হতেন। (Minh, Some Considerations on the Colonial Question, 1922)

আবার দেশীয় জাতীয়তাবাদীরাও গণআন্দোলনের পথে না গিয়ে সন্ত্রাসবাদ, অকাল বিদ্রোহ ইত্যাদি দ্বারা আলোচনা ও সমঝোতার দ্বারা জাতীয় আন্দোলন করার রাস্তা বন্ধ করে দেয়, অর্থাৎ তারাও ঠিক গান্ধীর লাইনে রাজনীতি করে নি। তো, এমতাবস্থায় ভিয়েতনামের মুক্তির রাজনীতির প্রধান ধারা হিসাবে উদয় হল কমিউনিস্ট আন্দোলন।

ফরাসি সৈন্যবাহিনীতে আনামী সৈনিক (১৮৯৫)

ফরাসি সৈন্যবাহিনীতে আনামী সৈনিক (১৮৯৫)

ভূতের ভবিষ্যত:

১৯২৩ সালে হো সোভিয়েত রাশিয়ায় গেলেন। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেন কিছুদিন।

এদিকে চীনে কমিনটার্ন ১৯২৩ সালে মিখাইল বরোদিনকে পাঠিয়েছিল। চীনের নেতা সান ইয়াত-সেন সোভিয়েতদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। বরোদিন কুয়োমিন্টাং ও কমুনিস্টদের মধ্যে রফা করলেন, কুয়োমিন্টাঙের সামরিক বাহিনী গঠনের ব্যবস্থা করলেন। ১৯২৪ সালে হো-কেও মিখাইল বরোদিনের সাথে চীনে পাঠানো হল। ১৯২৫ সালে সাংহাইয়ে হো চাউয়ের দেখা পেলেন। হো চাউয়ের সাথে আন্দোলন গঠন করতে চান। চাউও ততদিনে রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।

কিন্তু ফরাসিরা ততদিনে অতি সাবধান হয়ে গেছে। ১৯২৫ সালে চীনের সাংহাই শহরে ফরাসি গোয়েন্দারা চাউকে অপহরণ করল। ফরাসিরা চাউকে চীন থেকে হিউ নগরে এনে বন্দি করল। তারা তাকে প্রাণদণ্ড দিতে মনস্থ করল। এদিকে ১৯২৬ সালে আরেক নেতা তৃণ মারা গেলেন।

ভিয়েতনামের মানুষের হৃদয়ে চাউয়ের প্রাণদণ্ড ও তৃণকে হারানোর বেদনা বড় বাজল। তারা প্রতিবাদ বিক্ষোভে পথে নেমে এল।

তাদের মধ্যে ছিল একটি চতুর্দশবর্ষীয় স্কুলপড়–য়া বালক — তার নাম ভো নগুয়েন গিয়াপ। জন্ম তার ১৯১১ সালে মধ্য ভিয়েতনামে। বছরখানেক হল সে হিউতে এসেছে, জাতীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি মন দিয়ে সে চাউয়ের লেখাজোখা পড়ে থাকে। ছাত্ররা আরেকজনের কথা বলে থাকে: নগুয়েন আই কুয়ক।

আন্দোলন করতে গিয়ে গিয়াপ স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হল।

টীকা:

  • আনাম কথাটা প্রায়শ ভিয়েতনাম বোঝাতে ব্যবহৃত হত।

  • ভিয়েতনামের বড় শহর ছিল উত্তরে হ্যানয়, মাঝে হিউ, দক্ষিণে সায়গন। বড় বন্দর উত্তরে হাইফং। উত্তরে বড় নদী রেড নদী বা সং কই। দক্ষিণে মেকং।

  • সাংহাইয়ে ফ্রান্সের ১৮৪৯ সাল থেকে একাংশে কনসেশন ছিল।

  • আন্দোলনের মুখে চাউয়ের প্রাণদ- মকুফ হয়ে যাবজ্জীবন হয়। বন্দিদশাতেই তিনি ১৯৪০ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

সূত্র:

1.      Bureau officiel du Tourisme en Annam. (1926). Notice Touristique sur L’Annam. Hue.

2.      Deguet. (1906). Societe Annamite.

3.      Lawrence Journal World. (1937, Nov 18). Japanese Threat to Indo-China?

4.      Minh, H. C. (1922). Some Considerations on the Colonial Question.

৫.      হো চি মিন (১৯২০). তুর কংগ্রেসে ভাষণ (প্রিয়ম. পাল, অনুবাদ)।

6.      Panikkar, K. Asia and Western Dominance.

7.      Precis d’Histoire d’Annam A la usage des ecoles primaires. (1918). Saigon.

8.      Reid, T. (2010). 19th Century Origins of Counterinsurgency Doctrine.

9.      Sydney Morning Herald. (1905, May 10). Russians Leave French Waters.

10.  The Strait Times. (1906, August 18).

 11.    The Strait Times. (1920, Dec 17).

12.    The Strait Times. (1912, January 27). Drastic Report on Colony to French Chamber.

13.    The Strait Times. (1931, March 27). Village Elder Greased and Burnt to Death. 14.     The Straits Times. (1905, June 27). French Indo-China – A Traveller’s Impressions.

15.    The straits times. (1890, Feb 26). The Yellow Danger.

16.    Vien, N. K. Vietnam Studies: A Century of National Struggle.

১৭.    হো চি মিন। আমি কি করে লেনিনবাদী হইলাম (প্রিয়ম পাল, অনুবাদ)।

18.    Young. (2002). Vietnam War – a history in documents.

১৯.    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৬)। জাপানযাত্রী

সম্পাদকীয়: জাতীয় জীবনের প্রাথমিক শর্ত

দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হইবে কি হইবে না আর হইলেও তাহা কিরূপে হইবে ইত্যকার বাদ বিসংবাদের মধ্যে আবারও শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটিয়াছে। তৈরি পোশাক কারখানায় ৮২০০ টাকা নূন্যতম মূল মজুরির দাবিতে আন্দোলন চলাকালে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে বাদশা মিয়া (২৫) ও রুমা আক্তার (২২) নামে দুই জন শ্রমিক নিহত হইয়াছেন। আরও অনেকে আহত হইয়াছেন। গার্মেন্ট শিল্পে পুলিশ ও মালিক পক্ষের লোকজনের হামলা কিংবা তালাবদ্ধাবস্থায় আগুনে পুড়িয়া ও ভবন চাপা পড়িয়া শ্রমিক মরার ঘটনা বলা চলে এই তথাকথিত শিল্পের সমান বয়সি। আমরা লক্ষ করিতেছি এ শিল্পের রমরমা যত বাড়িতেছে তাহার সহিত তাল মিলাইয়া এভাবেই শ্রমিক মৃত্যুর সংখ্যাও দিন দিন বাড়িতেছে। একেকটা নিত্য নতুন মর্মান্তিক ঘটনা যেন পূর্বেরটিকে বহু গুণে ছাড়াইয়া যাইতেছে। গত এক বছরের মধ্যে তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড ও রানা প্লাজা ধসিয়া ১৫০০ এর অধিক শ্রমিক মৃত্যু বরণ করিয়াছে। নিখোঁজ অনেকর সন্ধান অদ্যবধি পাওয়া যাই নাই। যাহারা চিরতরে পঙ্গু হইয়াছেন তাহাদের অধিকাংশের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হয় নাই। ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের অবস্থাও তথৈবচ। এত কিছুর মধ্যেও এভাবে গুলি বর্ষণ ও লাঠি পেটা করিয়া শ্রমিক হত্যার ঘটনা এ দেশে শ্রমিকদের চরমতম দুর্দশার চিত্রই ফুটিয়া উঠে। শ্রমিকদের পক্ষ হইতে ৮২০০ টাকা নূন্যতম মজুরি দাবি করা কোন বিচারেই সামান্যতম বেশি বলা যাইবে না। বর্তমান বাজার দর বাঁচিয়া থাকিবার জন্য নূন্যতম প্রয়োজন ও তৈরি পোশাক রপ্তানি করিয়া থাকে এমন সব দেশের ন্যূনতম মজুরি প্রভৃতির বিচারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দাবি অতি সামান্যই। এমনকি তাহাকে প্রয়োজনের কমই বলা যায়।

আমরা দেখিতে পাইতেছি, মালিক পক্ষ শ্রমিকদের এই সামান্য দাবিও মানিয়া লইতে রাজি নয়। সরকার ও কারখানা মালিকেরা ৩২০০ টাকা মূল মজুরি ও অন্যান্য ভাতাসহ সাকুল্যে ৫৩০০ টাকা কেবল দিতে চাহিতেছে। বলা বাহুল্য মালিক শ্রেণির সহিত এই বিষয়ে দর কষাকষিতে শ্রমিকেরা কোন সুবিধাই করিতে পারে না। মালিকদিগের যে রকম সংগঠন আছে শ্রমিকদের তাহার কিছুই নাই। বর্তমানে কোন পোশাক কারখানতে শ্রমিকরা কোন ট্রেড ইউনিয়ন করিতে পারে না। দাবি দাওয়া আদায়ে শ্রমিকদের  সংঘটিত হইবার নূন্যতম অধিকার পর্যন্ত স্বীকার হইতেছে না।  কালের ফেরে পূর্বের মত শ্রমিক আন্দোলনও বর্তমানে অনুপস্থিত। অতি সম্প্রতি ২০০৬ সালে শ্রম আইনে কিছু পরিবর্তন আনা হইয়াছে। সেখানেও দেখা যাইতেছে শ্রমিকদের কোন দাবি দাওয়া ও অধিকারকে আমলে নেওয়া হয় নাই। ক্ষেত্র বিশেষে অধিকতর অগণতান্ত্রিক ও নিপীড়ন মূলক ধারা যুক্ত করা হইয়াছে। বর্তমান সংসদে অন্তত কয়েক ডজন তৈরি পোশাক কারখানার মালিক পাওয়া যাইবে। অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করিতে পারে এমত কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। এমতাবস্থায় কি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি কি মানবিক কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করিবার দাবি সকল ব্যাপারেই শ্রমিকদের মালিক পক্ষের ইচ্ছা ও অনিচ্ছার অধীন থাকিতে হয়। এখনও পর্যন্ত শ্রমিকেরা কেবল মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে বিক্ষোভ প্রতিবাদ করিয়াই ক্ষান্ত থাকিতেছে। এমন কি শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিক্ষোভ সমাবেশ ও প্রতিবাদ জানাইতে গেলেও শ্রমিক শ্রেণির উপর শিল্প পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি হামলা মামলা ও নির্যাতনের খড়গ চাপাইয়া দিতেছে। বিনা নোটিশে শ্রমিকদেরকে কর্মচ্যুত করা হইতেছে। কিন্তু যে সমস্ত দাবি দাওয়ার জন্য শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করিতেছে তাহার কোনটাই অন্যায্য নহে। অথচ রাষ্টের পক্ষ হইতে এই দাবিগুলো পূরণের কোন তাগিদ লক্ষ্য করা যাইতেছে না। আমরা সরকার ও মালিক পক্ষকে বলিব এইভাবে অত্যাচার ও নির্যাতনের পথ পরিহার করিয়া আপনারা শ্রমিকদের দাবি সমূহ মানিয়া লওন। দেশকে সত্যিকার অর্থে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য সমাজের সবচাইতে তলায় অবস্থান করা ৪০ লক্ষ পোশাক শ্রমিকের দাবি দাওয়া মানিয়া লওয়া জাতীয় জীবনের প্রাথমিক শর্ত।

তুর কংগ্রেসে হো চি মিনের ভাষণ

সভাপতি: কমরেড ইন্দোচীনা প্রতিনিধি, আপনি বলুন। (করতালি)

হো চি মিন (১৮৯০-১৯৬৯)

হো চি মিন (১৮৯০-১৯৬৯)

ইন্দোচীনা প্রতিনিধি (হো চি মিন) : কমরেডগণ! আপনাদের সহিত বিশ্ব বিপ্লবের কাজে শামিল হইবার মানসে আমি এই সভায় আসিয়াছিলাম। কিন্তু একজন সমাজতন্ত্রী হিসাবে গভীর বেদনা লইয়া আজ আমি আমার দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের ঘৃণ্য অপরাধের প্রতিবাদ করিতে চাহি। (সাধু সাধু!) পঞ্চাশ বছর পূর্বে যে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশে আসিয়া কায়েম হয় ইহা আপনারা সকলেই জানেন। তাহারা সঙ্গিন-বন্দুক ঠেকাইয়া, পুঁজিবাদের নাম করিয়া আমাদের দেশ জয় করিল। সেই হইতে আমরা শুধু নির্লজ্জ নিপীড়ন ও শোষণেরই শিকার হইতেছি না, আমাদের কপালে নির্দয় নির্যাতন ও বিষও জুটিতেছে। মোদ্দা কথায় বলিতে গেলে তাহারা আফিম, মদ প্রভৃতি বিষ খাওয়াইয়া আমাদের বিষাইয়া তুলিয়াছে। এই সাম্রাজ্যবাদী ডাকাতের দল ইন্দোচীনে ঢুকিয়া কি অত্যাচার চালাইয়াছে তাহা আমি এই কয়েক মিনিটে বলিয়া সারিতে পারিব না। স্কুল হইতে কয়েদখানার সংখ্যা বেশি, তথাপি কারাগারে কয়েদি এত বেশি যে আর জায়গা ধরে না। কোন দেশীয় ব্যক্তি সমাজতন্ত্রী ভাবধারার ধারক হইয়াছে শুনিলেই তাহাকে জেলে পুরিয়া দেওয়া হয়, কখনও কখনও বিনা বিচারে মারিয়াও ফেলা হয়। ইহার নাম ইন্দোচীনা বিচার ব্যবস্থা, কারণ তথায় বিচারের পাল্লা ও বাটখারা দুইপ্রকারের। ভিয়েতনামী জনগণ কস্মিনকালেও এয়ুরোপীয় কিংবা এয়ুরোপীয়মনস্ক দেশীয় নাগরিকের সমান বিচার পায় না। সংবাদপত্র কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের বেলায় নাই, নাই রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা সাধারণ সংগঠন করিবার অনুমতি। আমাদের ভিন দেশে পাড়ি জমাইবার কিংবা পর্যটক হইয়া আরেক দেশে যাইবার সুযোগও নাই। জীবন আমাদের মূর্খতা ও অজ্ঞতার তিমিরে ঢাকা, কারণ শিক্ষা লাভের কোন সুযোগ আমাদের নাই। আমাদের জবরদস্তি করিয়া আফিম সেবন ও মদ্যপান করাইয়া নেশায় বুদ করিয়া রাখা হয়। হাজার হাজার ভিয়েতনামবাসীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে অথবা অন্য লোকের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হত্যাকাণ্ডে ঠেলিয়া দেওয়া হয়।

কমরেডগণ, দুই কোটি ভিয়েতনামবাসীর (খোদ ফ্রান্সের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি) প্রতি ফরাসিদের ব্যবহার এইরূপই। ভিয়েতনাম ফরাসি সুরক্ষার অধীনই বটে (করতালি!)। সমাজতন্ত্রী দলকে ভিয়েতনামের নিপীড়িত জনগণের পক্ষে হাতেনাতে কাজে নামিতেই হইবে। (সাবাস! সাবাস!) …

জঁ লংগুয়ে: আমি নেটিভদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করিয়াছি বটে।

ইন্দোচীনা প্রতিনিধি: আমার বলার প্রথমেই আমি বলিয়াছি সবাইকে অবশ্যই নীরবতা পালন করিতে হইবে (হাস্য)। দলকে সকল উপনিবাসিক দেশে অবশ্যই সমাজতন্ত্র প্রচারের কাজে নামিতে হইবে। সমাজতন্ত্রী দলের তৃতীয় আন্তর্জাতিকে অংশ লইবার সিদ্ধান্ত হইতে আমরা ইহাই বুঝিলাম যে দলটি অবশেষে উপনিবাস প্রশ্নকে যথার্থ গুরুত্ব দিবার পাকা অঙ্গীকার করিল। একটি স্থায়ী প্রতিনিধিদলকে উত্তর আফ্রিকা প্রশ্ন অনুধাবন করার কাজে নিয়োজিত করা হইয়াছে শুনিয়া আমরা যারপরনাই আহ্লাদিত হইয়াছি, আর আমরা আরও খুশি হইব যদি দল কোন সমাজতন্ত্রী সদস্যকে ইন্দোচীনে পাঠায় দেশটি লইয়া সরেজমিন অনুসন্ধান, দেশের বিশেষ বিশেষ সমস্যা ও তাহার ভিত্তিতে যে কার্যক্রম গ্রহণ করিতে হইবে …

একজন (ডানপন্থি) প্রতিনিধি: আনোয়ার পাশার সহিত মিলাইয়া?

ইন্দোচীন প্রতিনিধি: চুপ রও! যতসব সংসদপন্থি! (করতালি!)

সভাপতি: এখন হইতে সব প্রতিনিধিকে অবশ্যই চুপ থাকিতে হইবে! সংসদপন্থি হইলেও, না হইলেও!

ইন্দোচীনা প্রতিনিধি: সমগ্র মানব জাতির দোহাই, সমাজতান্ত্রিক দলের ডান-বাম মত নির্বিশেষে সকল সভ্যের দোহাই দিয়া আমি আপনাদের আহ্বান জানাইতেছি! কমরেড: আমাদের বাঁচান! (বিপুল করতালি)

সভাপতি: এই বিপুল করতালি ও অভিবাদন হইতেই ইন্দোচীনা প্রতিনিধি বুঝিয়াছেন যে বুর্জোয়া শ্রেণি যে অপরাধ চালাইতেছে তাহার বিরুদ্ধে সমগ্র সমাজতান্ত্রিক দল আপনার পক্ষে রহিয়াছে।

বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান–জমিরউদ্দিন আহমদ বি.এ.

মুকাদ্দমা: বর্তমানে সারা দক্ষিণ উপমহাদেশে যেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতর জয় জয়কার চলিতেছে। সম্প্রতি ভারতের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও আসন্ন লোকসভার নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি প্রয়াত সর্দার বল্লবভাই পটেলের জন্মদিনে পটেলের এক মূর্তি নির্মাণ কার্য উদ্বোধন করিয়াছেন। এই স্থাপনা নাকি হইবে আমেরিকার স্টাচু অব লিবার্টির দ্বিগুণ এবং তাহার নাম হইবে স্টাচু অব ইউনিটি। মোদিজি সর্দার পটেলকেই ভারতীয় ঐক্যের প্রতীক করিতে প্রয়াস করিতেছেন। গুজরাট দাঙ্গার পর উত্তর প্রদেশের মুজ্জাফ্ফর নগরে এখন ক্ষণে ক্ষণে দাঙ্গা চলিতেছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে স্টাচু অব ইউনিটি লইয়া ভাবুক গোষ্ঠি নতুন করিয়া খাবিয়া খাইতেছে। আবার বাংলাদেশে বৌদ্ধরা এই প্রথম আক্রমণের শিকার হইয়াছে। যুদ্ধাপরাধের রায়ের ঘোষণার পরপরই সারা দেশে বিভিন্ন হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ হইয়াছে। তাহার সর্বশেষ নিদর্শন নজরে পড়িল পাবনার সাঁথিয়ায়। এদিকে শ্রীলঙ্কায় ও মায়ানমারের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা যথাক্রমে তামিল ও মুসলমান রোহিঙ্গাদের উপর তোপ চালাইতেছে। এই সকল কথা মাথায় রাখিয়া সাম্প্রদায়িক চিন্তা প্রতিরোধ করিতে বিগত দিনে ভাবুকেরা কিভাবে ভাবিয়া গিয়াছেন তাহার নমুনা স্বরূপ বর্তমান এই প্রবন্ধখানি পুনঃপ্রকাশ করিতেছি

অনেকে অনেক প্রবন্ধ লিখে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র আদৌ মুসলমানবিদ্বেষী নন — এবং আজ পর্যন্তও এ অসম্ভব চেষ্টার ত্রুটি হচ্ছে না। এ চেষ্টা যতই হাস্যাস্পদ হক — একে একেবারে উপেক্ষাও করা যায় না। আন্তর্জ্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিরাও যখন বঙ্কিমের অ-হিন্দু প্রীতি প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর হন, তখন সত্যি দেশের দুর্দ্দশা ভেবে ক্ষুণœ হতে হয়। স্যর যদুনাথ সরকার মহাশয় ১৩৪৫ সনের আষাঢ় সংখ্যা ‘ময়মনসিংহবাসী’তে প্রমাণ করতে প্রয়াস পেয়েছেন যে, বঙ্কিমকে মুসলমানবিদ্বেষী কিছুতেই বলা যায় না, বরং তিনি যে মুসলমান জাতের উপর কয়েক দফা হাত নিয়েছেন তা যুক্তিসঙ্গতই বটে!

এত বড় প্রতিভাবান মনীষী স্যর যদুনাথ সরকার মহাশয় কিছুতেই বুঝতে পারেননি যে, “বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার ‘আনন্দমঠে’ মুসলমান জাতি (যদিও ‘জাতি’ শব্দ ঠিক নহে, ‘ধর্ম্ম-সম্প্রদায়’ বলিলে অধিক সত্য হয়), এবং ইসলামধর্ম্মের উপর নিজের হৃদয়ের বিষ উদগার করিয়াছেন, অনর্থক তাঁহাদেও নিন্দা প্রচার ও তাঁহাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করিয়াছেন।” (ময়মনসিংহবাসী, আষাঢ়, ১৩৪৫)

আমরা একথা বলি না যে ‘বঙ্কিম ইসলাম ধর্ম্মের উপর নিজের হৃদয়ের বিষ উদগার করিয়াছেন।’ তবে ইহাও সত্য যে, তিনি শুধু ‘আনন্দমঠে’ নয়, তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলিতে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, ভারতের মুসলমানদের উপর একহাত নিয়ে ছেড়েছেন। আজ যে ভারতব্যাপী হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব চলছে তার মূল প্রেরণা যোগাচ্ছে বঙ্কিমের তথা কথিত ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো। মুসলমানদের ‘পাকিস্তান’ দাবীর মূলেও বঙ্কিমের মুসলমান বিদ্বেষ কাজ করছে বলেই আমার বিশ্বাস। পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান যে সম্প্রীতিতে বাস করছিল, বঙ্কিমের আমল হতেই সে সম্প্রীতি ভেঙ্গে — তাঁদের মধ্যে হানাহানি শুরু হয়ে গেল।

অধ্যাপক সরকার মহাশয় মুসলমানকে ‘ধর্ম্ম-সম্প্রদায়’ মনে করেন — ‘জাতি’ বলতে তাঁর সংস্কৃতিতে বাধে। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমরা তর্ক করতে চাই না — এখন ইহা অনস্বীকার্য্য যে, ভারতের ‘মুসলমান’ একটা ‘জাতি’ —  ‘ধর্ম্মসম্প্রদায়’ মাত্র নহে।

স্যর যদুনাথের প্রবন্ধ ঐতিহাসিক তথ্যের খনি। ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করেও কিন্তু কোন যুক্তি দিয়ে তিনি বঙ্কিমের মুসলমানবিদ্বেষ যুক্তিসঙ্গত বলে প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি যে-সব যুক্তির অবতারণা করেছেন, প্রাথমিক তর্কশাস্ত্রের ছাত্রেরাও এসব যুক্তিকে অনায়াসে ‘ভ্রান্তিমান যুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিতে পারে। প্রমাণস্বরূপ তিনি মরহুম মীর মোর্শারফ হোসেন সাহেবের এজিদ ও এজিদপন্থীদের গালির কথা এবং আধুনিক প্রতিভাবান লেখক আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের ‘আয়না’ নাকম গল্পের বইয়ের উল্লেখ করেছেন। সরকার মহাশয় লিখেছেন — ‘তিনি (আবুল মনসুর আহমদ) দেখাইয়াছেন যে যেমন আমারদের (হিন্দুদের) মধ্যে তারকেশ্বরের মোহন্ত আছে, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজকেও সেই শ্রেণীর জীব শোষণ করিতেছে।’

কিন্তু সারা ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বা ‘আয়না’ ঘেঁটেও আমরা পেলাম না যে মরহুম মোর্শারফ হোসেন সাহেব বা আবুল মনসুর আহমদ সাহেব কোথাও কোন একটা জাতিকে গালি দিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত শক্রকে আমি গালি দিতে পারি, সে অন্য কথা — কিন্তু সেজন্য ত আমি একটা জাতের মুণ্ডুপাত করতে পারি না। মুসলমান সমাজে যে তারকেশ্বরের মোহন্তের মত শোষণকারী জীব আছে, সে জীবকে সমালোচনা করে জাতির সামনে ধরলে জাতি অবহিত হবে। সমালোচনা আর গালি ত এক কথা নয়! এজিদ ও সীমারের দুষ্কার্য্যরে জন্য মরহুম মোর্শারফ হোসেন সাহেব কোথাও সমস্ত শিয়া সম্প্রদায়টাকে গালি পাড়েন নাই; এজিদকে এবং সীমারকেই বাক্যবাণে জর্জ্জরিত করেছেন মাত্র। কিন্তু রেজা খাঁ বা মীর জাফরের দোষে ভারতের ‘মুসলমান জাতি’ কেন গাল হজম করবে তা আমাদের বুদ্ধিতে কিছুতেই আসে না। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ও উমিচাঁদের দলকে এবং অত্যাচারী রেজা খাঁকে বঙ্কিম যা ইচ্ছা তা-ই বলুন — তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু তিনি যদি তাদের পাপের জন্য সমগ্র ভারতের ‘মুসলমান জাতি’কে কষাঘাত করতে আসেন তবে আমরা তা সহ্য করতে যাব কেন?

Grand master  (গ্রাণ্ড মাষ্টার) — ‘Back dog’ (দূর হ কুকুর) বলেছিল আইজাককে (lssak)  সমস্ত ইহূদী জাতিটাকে নয়। সরকার মহাশয় লিখেছেন — “নাট্যশাস্ত্রের নিয়মানুসারে খ্রীষ্টান জঙ্গী মোহন্তের মুখ হইতে এইরূপ রূঢ় কথাই বাহির হওয়া স্বাভাবিক। ‘আনন্দমঠে’র সন্তান ‘মহারাজেরা’ও বিপক্ষকে ঠিক সেইরূপ ভাষায় উল্লেখ করিতেছেন।” ‘আনন্দমঠ’ পড়েই যদি সরকার মহাশয়ের ধারণা হয় যে, বঙ্কিম শুধু বিপক্ষকে স্বাভাবিক উক্তি প্রয়োগ করেছেন, তবে তাঁকে কি দিয়ে বুঝাব, জানি না। আমরা যদি আনন্দমঠ হতে কিছু অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে দেই তবে হইা সহজেই প্রমাণিত হবে যে, বঙ্কিম শুধু বিপক্ষকে রূঢ় কথা বলেননি, বলেছেন মুসলমান জাতিকে। ‘সন্তান’ ‘মহারাজদের’ সঙ্গে যত যুদ্ধ হয়েছে সব যুদ্ধের বিপক্ষ কর্ণধার ছিলেন ইংরেজ আর ‘সন্তান’দের হাতে অনবরত অত্যাচার ভোগ করেছে মুসলমান জাতি। যুদ্ধের আরম্ভও ইংরেজের সঙ্গে এবং শেষও ইংরেজের সঙ্গে। ইংরেজরা বিদ্রোহী ‘সন্তান’দের দমন  করে দেশকে চুরি-ডাকাতি, অত্যাচার-অবিচার ও জেল-জুলুম হতে রক্ষা করলেন আর বঙ্কিমের বিষ উদগারের পাত্র হল মুসলমান জাতি এবং ‘ইংরেজ ভারতবর্ষের পরমোপকারী।’

জ্ঞানানন্দ বললেন — ‘কিছু গোলযোগ বোধ হইতেছে। কালিকার কাণ্ডটার জন্য নেড়েরা গেরুয়া কাপড় দেখিতেছে আর ধরিতেছে।’ (আনন্দমঠ, ১ম খণ্ড, ১৭শ পরিচ্ছেদ) জ্ঞানানন্দ — ‘এই যবনপুরী ছারখার করিয়া নদীর জলে ফেলিয়া দিব। এই শূয়ারের খোঁয়ার আগুনে পোড়াইয়া মাতা বসুমতীকে আবার পবিত্র করিব। ভাই আজ সেই দিন আসিয়াছে।’ ‘সেই শূয়রের নিবাস অগ্নিসংস্কৃত করিয়া নদীর জলে ফেলিয়া দিই।’ — ‘মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধামাধবের মন্দির গড়িব- — ‘মার মার নেড়ে মার।’ (৮ম পরিচ্ছেদ-৩য় খণ্ড)। — ‘উঠ, মুসলমানদের বুকে পিঠে চাপিয়া মার।’ এই সবকে কি আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা মুসলমানদের প্রতি সাদর সম্ভাষণ বলবেন? সন্তানদের যুদ্ধ হল ইংরেজের সঙ্গে — দেশে জুলুম করে খাজনা উঠাল রেজা খাঁ — তাও ইংরেজদের সাহার্য্য;ে কেননা ইংরেজরাই তখন দেশের কর্ত্তা, মুসলমান নামে মাত্র নবাব — আর মুসলমানেরা বঙ্কিমের বক্র চাহনিতে হয়ে গেল ‘নেড়ে’ ‘শূয়র’ ‘যবন’ ইত্যাদি। বঙ্কিমের ‘মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধামাধবের মন্দির’ গড়ার সংকল্পই কি আজকের দিনে হিন্দুদেরকে মসজিদ অপবিত্র ও মসজিদে অগ্নিসংযোগ অনুপ্রেরণা দিচ্ছে না? বঙ্কিমের মুসলমানের ‘বুকে পিঠে চাপিয়া মারাই’ কি আজ সাভারকর ও মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুদেরকে মুসলমানকে ভারতভূমি হতে তাড়াতে ষড়যন্ত্র করার মাল-মসল্লা যোগাচ্ছে না? সরকার মহাশয় কি এ সব প্রশ্নের উত্তর দিবেন?

সন্তানদের মহারাজা সত্যানন্দ বলেন, ‘আমরা রাজা চাহিনা — কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদেরে নিপাত সবংশে করিতে চাই।’ এই কি বঙ্কিমের হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ? এই শিক্ষাই কি জাতীয় কবির  শিক্ষা? এ-সব প্রশ্নের মীমাংসার অবসর এই প্রবন্ধে নাই। সুতরাং এই প্রশ্ন এখন নাই বা তুললাম। আমরা বলব বঙ্কিম সাহিত্য দেশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে — হিন্দুকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে — তাতে ভারতের হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতির একতায় এক অলক্ষ্য প্রাচীর সৃষ্টি হয়েছে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না যে — মুসলমান যখন রাজত্বহীন সুতরাং অসহায় তখন কেন বঙ্কিম ও তথাকথিত জাতীয় কবিরা মুসলমানকে গালি দিলেন আর ইংরেজের সাহায্যে হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখলেন।

‘বন্দেমাতরম’ গানটি সম্বন্ধে মন্তব্য করতেও অধ্যাপক মহাশয় ছাড়েননি — তিনি লিখেছেন “মন্দেমাতরম গানটিতে আপত্তি উঠিয়াছে যে উহা হিন্দু মূর্ত্তি পূজার স্তোত্র। সত্য বটে হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর বর্ণনা যে সব ‘সাধন’ গ্রন্থে আছে তাহা খুঁজিয়া এ পর্য্যন্ত একটিও ‘সুজলা সুফলা মলয়জ শীতলা শস্যশ্যামলা’ রূপধারিণী দেবী মূর্ত্তি পাওয়া গেল না।” অধ্যাপক মহাশয় এ গানটি মুসলমানের আপত্তির কিছুই পান নাই তাতে আমরা বিস্মিত নই। তিনি ঐতিহাসিক হতে পারেন কিন্তু পক্ষপাতশূণ্য নন বলে ‘আনন্দমঠে’ কোন দোষ পাননি। ‘বন্দেমাতরম’ আমাদের হিন্দু ভাইদের জাতীয় সঙ্গীত হতে যেয়ে  মুসলমান আপত্তি করবে, তাকে আমরা বিকৃত মস্তিষ্ক বলব। কিন্তু ‘মুসলমানেরা মাতাকে বন্দনা’ করে নাÑ তারা বন্দনা করে খোদাকেÑ আর কিছুকে বন্দনা করাই মুসলমানদের পাপ। সুতরাং গানের প্রথম শব্দটি গ্রহণেই আমাদের আপত্তি। তারপর মধ্যে আছে:

তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি, তুমি মর্ম্ম
তোমার প্রতিমা গড়ি
মন্দিরে মন্দিরে।

অধ্যাপক মহাশয় বিশেষ করে মুসলমান যুগের ইতিহাস বিশারদ, সুতরাং মুসলমান তমদ্দুনের সঙ্গেও পরিচিত। তিনি কি এই শ্লোকগুলোকে মুসলমানদের গ্রহণীয় বলতে চান? মুসলমান কি কোন দিন কারো প্রতিমা গড়ে মন্দিরে রেখে পূজা করতে পারে? তাই বলি আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা ‘বন্দেমাতরম’কে হিন্দু ও মুসলমান উভয় জাতির জাতীয় সঙ্গীত বলে চালাতে চান তখনই আমাদের আপত্তি। আশা করি এত শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মহাশয় বুঝেছেন কোথায় বঙ্কিম মুসলমানের উপর তাঁর হৃদয়ের বিষ উদগার করেছেন এবং ‘বন্দেমাতরম’ গান গ্রহণে কোথায় মুসলমানদের আপত্তি।

আর বিশেষ আলোচনা করে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। একজন আধুনিক উদারনৈতিক হিন্দু সমালোচকের উক্তি উদ্ধৃত করেই প্রবন্ধ শেষ করতে চাই। এ উদ্ধৃতি হতে পাঠক বঙ্কিম-সাহিত্যের স্বরূপ বুঝতে পারবেন। মিঃ নন্দগোপাল সেনগুপ্ত তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের ভূমিকা’ নামক গ্রন্থের ২৩০-৩১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

তবে বঙ্কিম প্রবর্ত্তিত জাতীয়তার স্বরূপটাও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। বঙ্কিমের সাহিত্যে অ-হিন্দু বিদ্বেষ আছে, এ কথা বঙ্কিম বেঁচে থাকলে নিজেই স্বীকার করতেন। অনুন্নত হিন্দু, এমনকি হীনবিত্ত হিন্দুও তাঁর সাহিত্যের ত্রিসীমায় ঘেঁষতে পারেন নি। রাজা, জমিদার, যোদ্ধা ও সন্ন্যাসী এবং তাঁদের সুখ-দুঃখ নিয়েই বঙ্কিম ব্যস্ত অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানে, উন্নত ও অনুন্নতে, ধনী ও দরিদ্রে, একটি স্থায়ি এবং অনড় বিভেদের গণ্ডি টেনে দিয়ে, তিনি কেবল সম্পন্ন বর্ণ-হিন্দুর সংহতি ও পরিপুষ্টিকেই দেশাত্মবোধ নামে প্রচার করে গেছেন। … পরকীয় শক্তির প্রভুত্বেও তিনি সবিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

আমি যে পথে লেনিনবাদী হইলাম–হো চি মিন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমি পারি নগরে থাকিতে শুরু করিলাম। কখনও আমি চিত্রগ্রাহকের সহযোগীর কাজ করিতাম, কখনও ‘চীনা পুরাতত্ত্ব’ আঁকিতাম (যদিও ইহা ফরাসি দেশে তৈয়ার হইত)। ফরাসি উপনিবাসবাদীরা ভিয়েতনামে কি পরিমাণ অপরাধ করিয়াছে তাহা আমি প্রচার পত্রাকারে বিলি করিতাম।

 

সেই সময়ে আমি সহজাতভাবেই অক্টোবর বিপ্লবকে সমর্থন করিয়াছিলাম। যদিও ইহার সকল ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়াছিলাম তাহা নহে। তখনও পর্যন্ত আমি লেনিনের কোন পুস্তক পাঠ করি নাই। তথাপি আমি লেনিনকে ভালবাসিয়াছিলাম, লেনিনের ভক্ত বনিয়াছিলাম। কারণ আমার বোধ হইত লেনিন এমন এক মহান দেশপ্রেমিক যিনি আপন স্বদেশবাসীকে মুক্ত করিয়াছেন।

 

ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে আমার যোগদানের রহস্য ছিল তাহার সভ্য কমরেডরা (যাঁহাদের আমি সেই সময়ে ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোক বলিয়া ডাকিতাম) আমার প্রতি আর তাবৎ নিপীড়িত জাতির সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। সেই কালে আমি কিন্তু দল, শ্রমিক সংঘ কিংবা সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ ইত্যাদি বিষয়ের কিছুই বুঝিতাম না।

 

সেইকালে সমাজতান্ত্রিক দলে বিভিন্ন শাখায় তুমুল তর্ক চলিত। তর্কের বিষয়: দল কি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেই থাকিবে, আড়াই আন্তর্জাতিক গঠন করা কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে নাকি লেনিনের তৃতীয় আন্তর্জাতিকেই য্ক্তু হওয়া কর্তব্য? সপ্তাহে দুই কি তিন দিন সভা হইত। সভায় আমি নিয়মিত উপস্থিত থাকিতাম এবং মন দিয়া সকল আলোচনা শুনিতাম। প্রথম প্রথম আমি পুরাপুরি বিষয়গুলি বুঝিয়া উঠিতে পারিতাম না। কি লইয়া এই তর্কগুলি এত গরম হইয়া উঠে? দ্বিতীয়, আড়াই কিংবা তৃতীয় আন্তর্জাতিক যাহাই হউক বিপ্লব হইলেই তো হইল? ইহা লইয়া এত তর্ক করিবার কি আছে? প্রথম আন্তর্জাতিকেরই বা কি গতি হইল?

 

যাহা জানিতে আমি একান্তই মুখিয়া থাকিতাম এবং যাহা এই সকল আলোচনায়  আসিত না বলিলেই চলে তাহা হইল কোন আন্তর্জাতিক উপনিবাসিক দেশের জনগণের পক্ষে?

 

এক মিটিংয়ে আমার মতে এই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তুলিলাম। কিছু কমরেড আমায় বলিল: দ্বিতীয় নহে, তৃতীয় আন্তর্জাতিকই উপনিবাসী জনগণের পক্ষে । তখন এক কমরেড আমায় ল্য’য়ুমানিটি পত্রিকায় প্রকাশিত লেনিনের ‘জাতীয় এবং উপনিবাস প্রসঙ্গে তত্ত্ব’ লেখাটি পড়িতে দিলেন।

 

লেনিনের এই লেখায় কিছু রাজনৈতিক শব্দ ছিল যাহা আমি ঠিক বুঝিতে পারি নাই। তবুও ইহা আমি বারবার পড়িতে লাগিলাম এবং শেষে ইহার সারাংশ ধরিতে পারিলাম। তখন কি আবেগ, কি উদ্দীপনা, কি স্বচ্ছদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস আমায় ভর করিল! আনন্দে আমার চোখ জলে ভাসিয়া গেল। কামরায় আমি একাকী বসিয়া ছিলাম, তথাপি আমি চিৎকার দিয়া যেন জনতার উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিলাম  ‘হে স্বদেশবাসী, হে শহীদেরা! ইহাই তো আমাদের দরকার! ইহাই আমাদের মুক্তির পথ বাতলাইয়া দিবে।’

 

তাহার পর হইতে লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আসিয়া গেল।

 

পূর্বে দলের শাখার মিটিংয়ে আমি আলোচনা শুধু শুনিয়াই যাইতাম; আমার আবছা আবছা মনে হইত সকলের কথাই বুঝি ঠিক; কাহারা আসলে ঠিক আর কাহারাই বা ঝুট তাহা ঠিক ধরিতে পারিতাম না। তখন অবশ্য ভাব প্রকাশের পর্যাপ্ত ফরাসি শব্দ আমার ভাণ্ডারে ছিল না, তথাপি লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর যে কোন অভিযোগ আমি দৃঢ়তার সহিত তছনছ করিয়া দিতাম। আমার একমাত্র যুক্তি ছিল: যদি তোমরা উপনিবাস ব্যবস্থার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করিতে না পার, যদি তোমরা উপনিবাসের জনগণের পক্ষ না লইতে পার তবে তোমরা এ  কেমনতর বিপ্লবে প্রবৃত্ত হইয়াছ?

 

আমি কেবলমাত্র আমার দলের শাখা সমূহে আলোচনায় অংশ লইয়া ক্ষান্ত থাকিতাম না, ‘আমার মত’ প্রতিষ্ঠায় অন্যান্য শাখা সমূহেও হাজির হইতাম। বলিতেই হইবে যে কমরেড মার্সেল কাশিন, ভাইলা কুতুরিয়ে, মুমুসে ও  আরও অনেকে আমায় জ্ঞান বিকাশে সাহায্য করিয়াছেন। পরিশেষে তুর কংগ্রেসে এই কমরেডদের সহিত তৃতীয় আন্তর্জাতিকে যোগদানের পক্ষে ভোট দিয়াছিলাম।

 

সাম্যবাদ নহে, দেশপ্রেমই আমায় সর্বপ্রথম লেনিনের উপর, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর ভরসা যোগাইয়াছিল। ক্রমে ক্রমে লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সহিত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ পাঠ করিতে করিতে আমি অচিরেই বুঝিতে পারিলাম, কেবলমাত্র সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই পারে সকল নিপীড়িত জাতি ও শ্রমজীবী জনগণকে দুনিয়ার সকল ধরনের দাসত্ব হইতে মুক্ত করিতে।

 

চীনসুদ্ধ আমাদের দেশে ‘জ্ঞানীর বহি’ নামা এক আশ্চর্য পুস্তকের কথা প্রবাদে আছে। কেহ যখন বড় বিপদের সম্মুখীন হয়, এই পুস্তক খুলিয়া দেখে এবং যে পাতা খুলিল তাহাতেই মুস্কিল আসানের উপায় পাইয়া যায়। ভিয়েতনামের সকল বিপ্লবী এবং জনগণের জন্য লেনিনবাদ কেবলমাত্র ‘জ্ঞানীর বহি’ ও দিকনির্দেশকই নহে, বলিতে হয় ইহা তেজোদীপ্ত সূর্যের সেই বিকীরণ যাহা আমাদের সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে লইয়া যাইবে।

 

 

অনুবাদকের টীকা:

 

তুর কংগ্রেস:

 

১৮৪৮ সালে ইউরোপে বিপ্লবের পর ১৮৬৪ সালে লন্ডনে গঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক । মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩), প্রুধোঁ (১৮০৯-১৮৬৫), বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬), এবং ফরাসি বিপ্লবী অগুস্ত ব্লাংকি (১৮০৫-১৮৮১) প্রমুখ ইহার নেতা ছিলেন। ১৮৭২ সালে আসিয়া ইহা দ্বিধাবিভক্ত হয়।

 

এদিকে ফরাসিদেশে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র হয় এবং পারি কমিউনকে দমন করা হয়। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দমনপীড়নের মুখে শতধাবিভক্ত ও দুর্বল হইয়া পড়ে। মার্কসবাদীদের মধ্যে জুলস গুয়েসদে, পল লাফার্গ প্রমুখ সংসদে নির্বাচিত হন, আন্দোলন চালাইয়া যান, জেলজুলুমেরও শিকার হন।

 

অবশেষে ১৯০৫ সালে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ধারা মিলিয়া ‘শ্রমিক আন্তর্জাতিকের ফরাসি শাখা’ নামে সমাজতন্ত্রী পার্টি হয়। জঁ জউরে (১৮৫৯-১৯১৪) ইহার নেতা ছিলেন। এই দল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে (১৮৮৯-) শরিক ছিল। ১৯০৬ ও ১৯১৪ সালের ফরাসি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের অনেক প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।

 

১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হইলে জার্মানি ফ্রান্স দখলে উদ্যত হয়। তখন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে দ্বিধা দেখা দেয়। একদল যুদ্ধে প্রজাতন্ত্রীদের সাথে একত্র হওয়ার পক্ষপাতী হয়, আরেক অংশ বিরোধিতা করে। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষলগ্নে ১৯১৭ সালে রুশদেশে লেনিন বিপ্লব করেন। তখন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে দ্বিধা আরো প্রকট হয়। ১৯১৯ সালে লেনিন ও অন্যান্যরা তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠন করেন।

 

১৯২০ সালের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ফরাসি পার্টির তুর কংগ্রেস সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় দ্বিতীয় বনাম তৃতীয় আন্তর্জাতিক (আড়াই আন্তর্জাতিক বাদ দিলে) এবং কমিউনিস্ট বনাম সমাজতন্ত্রী ভাগ হয়ে যায়। আলাদাভাবে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। হো চি মিন ইহার সদস্য ছিলেন।

 

ল্য’য়ুমানিটি শতাব্দীপ্রাচীন ফরাসি পত্রিকা। পুরাতন সমাজতন্ত্রী জঁ জউরে ১৯০৪ সালে এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। লেনিনের আমলে তুর কংগ্রেসে সমাজতন্ত্রী বনাম কমিউনিস্ট ভাগ হইলে এই পত্রিকা কমিউনিস্টদের ভাগে পড়ে।

 

কমরেড মার্সেল কাশিন, ভাইলা কুতুরিয়ে, মুমুসে — ইহারা ফরাসি সমাজতন্ত্রী দলের তৎকালীন সদস্য। অধিকাংশই কালে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষ লইয়াছিলেন।

 

জঁ লংগুয়ে সমাজতান্ত্রিক দলের আদিধারার গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি কার্লমাক্সের মেয়ে জেনির পুত্র।

 

উৎস: Ho Chi Minh on Revolution, Selected Writings, 1920-66, edited by Bernard B. Fall, printed from The Signet

গিয়াপচরিত্র: সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয় মুক্তির যুদ্ধ এবং লেনিনের এশিয়া দর্শন–মোহাম্মদ হাবিব

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)

ভ্লাদিমির লেনিন রুশদেশের প্রসিদ্ধ রাজনীতিবিশারদ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর জন্ম ১৮৭০ সালে।  ১৮৯০-এর দশক হতে তিনি পুরাদমে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে এশীয় মুক্তির লড়াইয়ে লেনিনের দৃষ্টি সদানিবদ্ধ ছিল। তাঁর চিন্তা উত্তরকালে ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের নেতা হো চি মিনের জন্য পথনির্দেশক হয়েছিল। গিয়াপ ও ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে জাতীয় মুক্তির লড়াই ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেনিনের বয়ান ও বিচার একনজর দেখা যেতে পারে।

জাতি প্রশ্নে লেনিন:

লেনিনের মোটাদাগে অবস্থান ছিল জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু জাতীয় মুক্তির আন্দোলন ও জাতীয় অসাম্য দূর করার পক্ষে তাঁর শপথ ছিল পাক্কা। লেনিন লিখেছেন তাঁর দল (সামাজিক-গণতন্ত্রী পার্টি) সকল জাতিসত্তার রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও পৃথক রাষ্ট্র গঠনের অধিকার স্বীকার করে।  (লেনিন, ১৯১৩) সেই সাথে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের বিষয়টি তাঁর লেখার একটি বড় বিষয় ছিল। রাষ্ট্রে ধর্ম, জাতি, ভাষা, লিঙ্গ ইত্যাদির ভিত্তিতে বৈষম্যের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। (লেনিন, ১৯১৩) রাষ্ট্রে সকল জাতির সম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যালঘু জাতি বা ধর্মের উপর পীড়ন বা বৈষম্য চলবে না। (লেনিন, ১৯১৩) ধর্ম, লিঙ্গ বা জাতি পরিচয়ের কারণে কারো অধিকার খর্ব করা চলবে না । (লেনিন, ১৯১৪)।

যুদ্ধ প্রসঙ্গে:

লেনিনকে যুদ্ধবিশারদ বলা যায় কিনা সে প্রশ্নের সমাধান আমরা করতে পারব না। উনিশ শতকে জার্মান সমরবিদ কার্ল ভন ক্লসভিৎস যুদ্ধকলায় প্রসিদ্ধ। ক্লসভিৎসের ‘যুদ্ধ রাজনীতিরই সম্প্রসারণ, তবে ভিন্নপন্থায়’ এই বাণী অন্যদের মধ্যে লেনিনও স্বীয় বিভিন্ন লেখায় উদ্ধার করেছেন। লেনিন রাজনীতিবিশারদ বটেন। যুদ্ধের রাজনীতি নিয়ে তাঁর শতেক আলোচনা পাওয়া যায়।

যুদ্ধের রাজনীতি আর যুদ্ধের নীতি বা নৈতিকতা — দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যুদ্ধ সকলে নৈতিকভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন। কেউ সকল যুদ্ধের বিরোধিতা করেন কোন নিক্তিতে তাদের না মেপেই, মানে সামান্যভাবে। কিন্তু লেনিন তাঁদের দলে নন। যুদ্ধের নৈতিকতা সম্পর্কে লেনিনজি লিখেছেন: ‘যুদ্ধমাত্রেরই কেউ বিরোধিতা করলে তাকে সমাজতন্ত্রী বলা অপলাপ হবে।’ (লেনিন, ১৯১৬) পুনরায়:

যুদ্ধমাত্রেরই বিরোধী আমরা নই। … যুদ্ধ নানান রকম। আমাদের দেখতে হবে কোন যুদ্ধ কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শুরু হল, কোন কোন শ্রেণী যুদ্ধে লড়াই করছে, এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের উদ্দেশ্য কি। … (লেনিন, ১৯১৬)

লেনিনের বিচারে বিপ্লবী বা প্রগতিশীল যুদ্ধ আর প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধের ভেদ মৌলিক:

ক্লসভিৎস নাপোলিয়নীয় আমলে যুদ্ধ সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই আজ জানেন, যুদ্ধ নীতি বা রাজনীতিরই সম্প্রসারণ। ফলে কোন যুদ্ধ বুঝতে তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানা চাই … আঠারো শতকের শেষে যখন বিপ্লবী ফরাসি শহুরে জনতা ও কৃষকসমাজ  বিপ্লবী কায়দায় রাজতন্ত্র উৎখাত করল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করল, রাজার নিপাত করল, সামন্তপ্রভুদের নিপাত করল, তখন তাদের এই রাজনীতি গোটা ইউরোপের স্বৈরাচারী, জারবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও আধা-সামন্তবাদী ভিত্তিমূল ধরে নাড়া দিল। সকল রাজতন্ত্রী ইউরোপীয় জাতি তাদের রাজনীতির ধারায় অনিবার্যভাবেই একটা জোট গঠন করে বিপ্লবী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবী যুদ্ধে শামিল হল। ফরাসিজাতি  নিজ দেশের মধ্যে যেমন পয়লাবারের মত এমন বিপুল বৈপ্লবিক উদ্ভাসিত হল যা তারা বহুশতাব্দী হয় নি, তেমনি আঠারো শতকের শেষে যে যুদ্ধে তারা নামল তাতে রণকৌশল বলে যে বিষয়টা আছে সে পুরা বিষয়টাই তারা বিপুল বৈপ্লবিক সৃজনশীলতায় ভেঙে নতুন করে গড়ল। যুদ্ধ নিয়ে আগের বাঁধিগৎ নিয়মকানুনও তারা উড়িয়ে দিল। পুরানা সৈনিকব্যবস্থা বদলিয়ে  বিপ্লবী গণবাহিনী গঠন করল। তারা যুদ্ধের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করল। (লেনিন, ১৯১৭)

রাজনীতি ও যুদ্ধের বিবর্তন:

সাম্রাজ্যবাদের যুগে কি নাপোলিয়েঁর আমলের মত যুদ্ধ সম্ভব? ইউরোপে বা ফ্রান্সে আর সম্ভব নয়। সেখানে এখন যুদ্ধের হাড়মজ্জা বলতে সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু এশিয়ায়? উপনিবেশে? লেনিন বলছেন:

আজকের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ দেখে আমাদের যেন দৃষ্টিশক্তি লোপ না পায়। বড় শক্তিগুলার মধ্যে এহেন যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদের যুগের বৈশিষ্ট্য। তাই বলে এই যুগে গণতান্ত্রিক যুদ্ধ বিদ্রোহ, যেমন বিদেশী শাসনের নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য নিপীড়িত জাতির যুদ্ধ হবে না এমন কথা কিন্তু নাই। আবার বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্র হাসিলের জন্য সর্বহারার গৃহযুদ্ধ এ যুগে অনিবার্য। তেমনি যে দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় হয়েছে তার সাথে অন্য অন্য বুর্জোয়া বা প্রতিক্রিয়াশীল দেশের যুদ্ধ হতে পারে। (লেনিন, ১৯১৬)

অন্যত্র লেনিন যুদ্ধের বিবর্তন নিয়ে আরও বিস্তারিত কথা বলেছেন:

আধুনিক যুগে যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রকারভেদ : মহান ফরাসি বিপ্লব মানবজাতির ইতিহাসে নোতুন যুগের সূচনা করে। তখন থেকে পারী কমিউন অবধি, মানে ১৭৮৯ থেকে ১৮৭১ অবধি এক প্রকার যুদ্ধ হয়েছে যাকে বলা চলে বুর্জোয়া-প্রগতিশীল, জাতীয়-মুক্তিকামী যুদ্ধ। অন্য কথায়, একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদ উচ্ছেদ, সামন্ত প্রথাপ্রতিষ্ঠানের নিকুচি, ও বিদেশী জালিম শাসনের উচ্ছেদই ছিল এসকল যুদ্ধের মূল উপাদান ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য। সেকারণে এসকল যুদ্ধ ছিল প্রগতিশীল, ফলে যুদ্ধ চলাকালে তাবৎ সাচ্চা বিপ্লবী গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী সমর্থন করত সেই দেশকে (অর্থাৎ সেই বুর্জোয়াকে), যে দেশ সামন্তবাদ, একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ও পরজাতিপীড়নের সবচাইতে শক্ত শক্ত খুঁটিকে উৎখাত বা দুর্বল করে আনছে। যেমন ফরাসি দেশ সেযুগে যেসকল বিপ্লবী যুদ্ধ করেছে তার মধ্যে পরদেশ লুট ও জয়ের একটা ব্যাপার ছিল বটে, কিন্তু তাতে এইসকল যুদ্ধের যে মূল ঐতিহাসিক গুরুত্ব — মানে এইসব যুদ্ধ যে সেকেলে ভূমিদাসপ্রথার ইউরোপে সামন্তবাদ ও নিরঙ্কুশ রাজত্ব ধসিয়ে খানখান করে দিয়েছে – সে গুরুত্ব এতটুকু ম্লান হয় নি। ফরাসি-প্রুশীয় যুদ্ধে জার্মানি ফ্রান্সে লুটতরাজ চালায়, তাতেও যুদ্ধের মূল ঐতিহাসিক মর্ম বদলায় নি। সে মর্ম এই: এ যুদ্ধ কোটিকোটি জার্মান জনগণকে সামন্ত অবক্ষয় থেকে এবং রুশ জার ও নাপোলিয়ঁ এ দুই স্বৈরাচারীর জুলুম থেকে রেহাই দিয়েছে।

আগ্রাসী ও রক্ষণাত্মক যুদ্ধের ভেদবিচার:

১৭৮৯-১৮৭১ যুগের ফল গভীর। তার বৈপ্লবিক স্মৃতি জাগ্রত। সামন্তবাদ, একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ও বিদেশী জালিম শাসনের উৎখাতের আগ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সর্বহারার লড়াইসংগ্রাম ছিল চিন্তার বাইরের ব্যাপার। সে যুগে ’রক্ষণাত্মক’ যুদ্ধের ন্যায্যতা বিচারের বেলা সমাজতন্ত্রীরা যেসব বিষয় মাথায় রাখত তার মোদ্দা কথা হল যুদ্ধ মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা ও ভূমিদাসপ্রথার বিরুদ্ধে কিনা। ঠিক এই অর্থে সমাজতন্ত্রীদের কাছে রক্ষণাত্মক যুদ্ধমাত্রই ন্যায্য, শুধু এই অর্থেই ’পিতৃভূমি রক্ষা’ বা ‘রক্ষণাত্মক’ যুদ্ধ ন্যায্য, প্রগতিশীল, ন্যায়সঙ্গত। এই বিচার সমাজতন্ত্রীদের তখন যেমন ছিল এখনো তেমনি। যেমন মরক্কো যদি কাল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, কিংবা ভারত ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে কিংবা পারস্য বা চীন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে  – তাইলে এগুলো হবে ন্যায্য, রক্ষণাত্মক যুদ্ধ, তা আক্রমণ আগে যে পক্ষই করুক না কেন; এবং সমাজতন্ত্রীমাত্রই নির্দ্বিধায় নিপীড়িত, পরাধীন, দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে এবং নিপীড়ক, দাসমালিক, পরমাংসলোভী ‘পরা’শক্তির বিপক্ষে দাঁড়াতে কসুর করবে না। (লেনিন, ১৯১৫)

লেনিনের যুদ্ধবিচারের সাথে তুলনীয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বড় ভাবুক জার্মান মনীষী কার্ল কাউৎস্কির বিচার। ১৯১১ সালে নবযুগের যুদ্ধ নিয়ে কাউৎস্কি লিখলেন। তিনি বললেন ক্লসভিৎস মহাশয় বলেছেন ১৮শতকে রাজায় রাজায় যুদ্ধের যুগ থেকে জাতিতে জাতিতে যুদ্ধের যুগে যুগান্তরের কথা । বিশ শতকের গোড়ায় এসে যুগ আরো বদলেছে:

আর সব সামাজিক বিষয়ের মতই যুদ্ধও ধ্রুব শাশ্বত কোন বিষয় না যা বরাবর একই রকম থাকবে বা যা নিয়ে একবার যা বলা হয়েছে তাই আপ্তবাক্য হয়ে থাকবে। যুদ্ধ খুবই পরিবর্তনশীল একটা বিষয়।

ক্লসভিৎস তার ’যুদ্ধ প্রসঙ্গে’ বইতে আঠারো শতকের রাজায় রাজায় যুদ্ধ তথা রাজবংশীয় যুদ্ধ বনাম ফরাসি বিপ্লবের পর শুরু হওয়া জাতীয় যুদ্ধ – এই দুইয়ের তুলনা করেছেন। নাপোলিয়ঁ যুদ্ধকৌশলের সরাসরি প্রভাবের মধ্যে ক্লসভিৎস লেখালেখি করেছেন।  সবচেয়ে তাঁর মনে যেটা দাগ কেটেছিল তা হল বিপ্লবী যুদ্ধের বিপুল বিক্রম ও উদ্দীপনা। বিপ্লবী যুদ্ধে লক্ষ্য হল শত্রুকে যথাশীঘ্র সম্ভব নিকেশ করা। এর পুরা বিপরীত ছিল পুরাতন একচ্ছত্র রাজত্বের সেনাপতিদের ধীরলয়ে রয়েসয়ে যুদ্ধ পরিচালনা। রাজবংশীয়  যুদ্ধের তুলনায় গণযুদ্ধ অনেক বেশি সাংঘাতিক রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের মামলা, কিন্তু তাতে কি! রক্ত ও ধ্বংস সত্ত্বেও বিপ্লবী আমলে জনগণ যে লক্ষ্যে সংগ্রাম করছিল তা তাদের কাছে ছিল অতি আরাধ্য। সে তুলনায় আঠারো শতকে একনায়কের পক্ষে লড়াই করা সেনাবাহিনীর সামনে থাকা লক্ষ্যের প্রেরণাদায়ী শক্তি নগণ্য বৈ নয়।

ক্লসভিৎস কেবল যুদ্ধ হলে কি হয় তার হিসাব করেছেন, শান্তিকালীন রণসজ্জার খবর নেন নি। নিলে তিনি কবুল করতেন শান্তির সময় একচ্ছত্র ক্ষমতার দরকার হয় স্থায়ী সেনাবাহিনীর। স্থায়ী সেনাবাহিনী শান্তির সময় জনগণের ঘাড়ে বোঝাস্বরূপ কায়েম থাকে। সে তুলনায় নাগরিক সেনাবাহিনী কিন্তু শান্তির সময় জনগণের উপর বোঝা হয়ে চাপে না।

নাপোলিয়ঁ যুগ গত হয়েছে। যুদ্ধকলা আরও বিকশিত হয়েছে। এই বিকাশে বুর্জোয়া শ্রেণীর কৃতিত্ব সিংহভাগ। এই বুর্জোয়া শ্রেণীই নাপোলিয়ঁ যুগের পর দিনে দিনে শাসকশ্রেণী হয়ে উঠেছে। এই শ্রেণীর রাজনৈতিক চরিত্র নানা বৈপরীত্যে ভরা। সামন্ত অভিজাত শ্রেণী ও একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুঝতে, পাল্লা দিতে বুর্জোয়ার জনতা ভিন্ন অন্য সহায় নাই। জনতার সহায়তা পেতে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে। কিন্তু আবার বুর্জোয়া চলে জনতাকে শোষণ করে, কাজেই জনগণকে সে ঠিক বিশ্বাস করে না, তাই পদে পদে তার গণতন্ত্রের সাথে বেইমানির ধাত প্রকাশ পায়। বুর্জোয়ার মধ্যে শিল্প পুঁজি ও বুদ্ধিজীবীর প্রভাব যত বাড়ে, জনতার মধ্যে বিশেষত পাতি বুর্জোয়া ও কৃষকের যত প্রাধান্য থাকে এবং যত তারা বুর্জোয়া নাটের গুরুদের হাতের পুতুল হয়, বুর্জোয়া ততদূর পর্যন্ত গণতান্ত্রিক। বুর্জোয়ার মধ্যে অর্থ পুঁজি ও তার চূডান্ত দশা অর্থাৎ লগ্নি পুঁজির প্রভাব যত বাড়ে, জনতার মধ্যে শ্রমিকশ্রেণী যতই বাড়বাড়ন্ত হয় এবং বুর্জোয়ার চিন্তা ও রাজনীতি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে, বুর্জোয়া তখনি অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।

বুর্জোয়ার এই স্ববিরোধী চরিত্রের ফলে স্বাধীনতা-ব্যবসায় বা লিবারালিজম জিনিসটার মধ্যে সবসময় একটা খাদ থেকে যায়। স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীর মধ্যে সবসময় একটা ইতস্ততভাব, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে ঠিক ভরসা করা যায় না তার উপর। যুদ্ধ নিয়ে তার এই ইতস্তত হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে মারাত্মক। নিজের বিপ্লবী দশায় বুর্জোয়া জাতীয় যুদ্ধের অবাধ আয়োজন করেছিল, নাগরিক সেনাবাহিনী গঠনের ডাক দিয়েছিল । আর নিজ প্রতিক্রিয়াশীল দশায় এসে সে স্থায়ী সেনাবাহিনীর প্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠে। শেষে যা দাঁড়ায় তা নাগরিক সেনাবাহিনী ও স্থায়ী সেনাবাহিনী দুইয়ের মিশেল, মানে স্থায়ী সেনাবাহিনীর আকার ফুলে নাগরিক সেনাবাহিনীর সমান হয়ে দাঁড়ায়। আঠারো শতকের তুলনামূলক ছোট সেনাবাহিনীর ব্যয়ভারই শান্তির সময় জনগণের কাঁধে মস্ত বোঝা হয়ে চেপেছিল। আজকের বিরাটকায়  স্থায়ী সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার জনগণের জন্য কি তা বলাই বাহুল্য।

কলাকৌশলের উন্নয়নে সমস্যা বেড়েছে বৈ কমে নি। প্রকৃতির উপর তাতে যেমন মানুষের কর্তৃত্ব বেড়েছে, তেমনি অন্য জাতির উপর পুঁজিবাদী জাতির কর্তৃত্ব বেড়েছে। …  বুর্জোয়া ক্রমেই অবলা পশ্চাতপদ জাতির ওপর শোষণের থাবা বিস্তার করেছে। আঠারো শতকে রাজা রাষ্ট্রকে স্রেফ রাজত্ব হিসাবে দেখত, রাজায় রাজায় যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরের সকল জাতিকে তাদের হালাল শিকার হিসাবে গণ্য করে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিবাদবিসম্বাদের লক্ষ্য কেবল রাজত্ব – তথা উপনিবেশ ও ‘প্রভাববলয়’ — বৃদ্ধি বা সম্পূর্ণ করা — ঠিক আঠারো শতকের রাজবংশীয় যুদ্ধের মত। ইউরোপের জনগণের কল্যাণের হিসাব দুইশো বছর আগেও ছিল না, আজও সেভাবে নাই।

তবে আঠারো শতকের তুলনায় যুদ্ধের ভয়াল ধ্বংসলীলা ও রণপ্রস্তুতির ব্যয়ভার শতগুণ বেড়েছে। দুইশো বছরে এইটুকু উন্নতি কম কি! (কাউৎস্কি, ১৯১১)

জাতীয় মুক্তির যুদ্ধের বিষয়ে:

লেনিনের আলোচনায় বোঝা যায় লেনিন এশিয়ায় বিপ্লবী বা প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে নি:সংশয়, এবং এহেন যুদ্ধের তিনি তরফদারও বটেন। জাতীয় মুক্তির যুদ্ধের রাজনীতি ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাঁর বিচার নিম্নরূপ:

সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের চূড়ান্ত দশা। পুঁজিবাদ বিশ শতকে এসে সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে। যে জাতীয় রাষ্ট্র দিয়ে পুঁজি একদা সামন্তবাদ উৎখাত করেছে, তা তার কাছে এখন পুরাতন হয়ে গেছে, জাতিরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র পরিধিতে তার হয় না, তার চাই বৃহত্তর পরিসর। … তাই গোটা দুনিয়াটাই পুঁজির মালিকরা ভাগাভাগি করে নিয়েছে, কোন দেশকে বানিয়েছে উপনিবেশ, কোন দেশকে আর্থিক শোষণের জালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধেছে। আগে তাদের দরকার ছিল মুক্ত বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতা, এখন একচেটিয়া, পুঁজি বিনিয়োগের জন্য জায়গা দখল, সেখান থেকে কাঁচামাল রপ্তানি ইত্যাদি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের লক্ষ্য। … বর্তমান যুদ্ধের বিচিত্র দিক এই যে উপনিবেশের ভাগ্য নিয়ে রফা করতে যুদ্ধ চলছে (ইউরোপ) মহাদেশে। দাসমালিকদের ভেতর লড়াই চলছে দাসত্বকে পাকাপাকি করতে। … অন্যদিকে চীন, পারস্য, ভারতসমেত পরাধীন দেশসমূহের বেলায় আমাদের বিচার স্বতন্ত্র। গত কয়েক দশকে এসকল দেশে প্রধান রাজনীতির প্রধান প্রবণতা হলো কোটিকোটি জনতাকে জাতীয় জীবনে শামিল করা, জাগানো, মহাশক্তিধর পরদেশের নিপীড়ন থেকে তাদের মুক্তি। এহেন ঐতিহাসিক পটভূমিতে বলা যায় এইসকল দেশে আজও  বুর্জোয়া-প্রগতিশীল, জাতীয়-মুক্তিকামী যুদ্ধ হতে পারে বটে। (লেনিন, ১৯১৫)

বিশ শতকে ’বল্গাহীন সাম্রাজ্যবাদে’র শতকে ইতিহাস উপনিবেশী যুদ্ধে ভরা। কিন্তু আমরা ইউরোপীয়রা, মানে দুনিয়ার সিংহভাগ মানুষের উপর সাম্রাজ্যবাদী পীড়নকরনেওয়ালারা আমাদের সহজাত ইউরোপীয় জাত্যাভিমানে বুঁদ হয়ে যাকে উপনিবেশী যুদ্ধ বলি তা আসলে প্রায়ই জাতীয় যুদ্ধ, বা নিপীড়িত জাতির জনগণের জাতীয় বিদ্রোহ। … সাম্রাজ্যবাদ জাতীয় যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। (লেনিন, ১৯১৬)

এশিয়ার মুক্তিযুদ্ধ ও ইউরোপে সংগ্রাম:

১৯০৫-এ রাশিয়ায় একটি বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান ঘটে। এর যে ফল এশিয়ায় ফলেছিল তা লেনিন খেয়াল করতে ভোলেন নি। রাশিয়া তথা ইউরোপের যুদ্ধের সাথে সাথে এশিয়ার একটি  যোগ আছে। বিশ শতকের গোড়ায় রুশ-জাপান যুদ্ধ হয় এশিয়াকে কেন্দ্রে রেখেই। যুদ্ধের পটভূমিতে এদিকে রুশদেশে নিরঙ্কুশ জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে যায়। কিন্তু তার ফল আবার পড়ে এশিয়াতে। লেনিন লিখেছেন:

১৯০৫ সালে রাশিয়ার আন্দোলনের ফলে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমগ্র এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে — তুরস্কে, পারস্যে, চীনে। ব্রিটিশ ভারতে আজ আন্দোলনের উত্তেজনা টগবগিয়ে ফুটছে।

গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ওলন্দাজ পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও ওলন্দাজ অন্যান্য উপনিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যবদ্বীপের জনতার মাঝে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিকাশ লাভ করছে, সেখানে জাতীয় আন্দোলন গঠিত হচ্ছে ইসলামের নিশান উঁচিয়ে। … আবার জাভায় মোটামুটি বিপুলসংখ্যায় যে চীনা জাতের লোক বাস করে তারা স্বদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের হাওয়া নিয়ে এসেছে… বিশ্ব পুঁজিবাদ ও ১৯০৫-এর রুশ আন্দোলন এশিয়াকে জাগিয়ে দিয়েছে, নিযুতকোটি দলিত তিমিরনিবাসী জনতা আজ ন্যূনতম মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে জেগে উঠেছে। (লেনিন, ১৯১৩)’

এবং ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের প্রাক্কালে সমাজবিপ্লব ও জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের সম্পর্ক মাথায় রেখেই লেনিন তাঁদের পরদেশ নীতি পরিষ্কার করেন:

‘সর্বহারার দেশীয় নীতির ন্যায় বৈদেশিক নীতি রয়েছে। … জার্মান পুঁজিপতি হোক কিংবা হোক এংলো-ফরাসি পুঁজিপতি – (…) আমাদের লড়াই তাবৎ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। … এই লড়াইয়ে আমাদের কোন মিত্র কি আছে? আছে। ইউরোপের নিপীড়িত সকল শ্রেণী, প্রধানত শ্রমিক শ্রেণী। আর সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট জাতিসকল — মূলত আমাদের এশিয়ার পড়শিরা। … (মনে রাখা যায়) সেই ১৯০৫ সালেই রুশ বিপ্লব তুরস্ক, পারস্য ও চীনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। রুশ বিপ্লব যদি উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশের শ্রমিক কৃষকের সাথে বিপ্লবী মৈত্রী করত তাইলে তুরস্কে জার্মানরা এবং তুরস্কে, পারস্যে, ভারতে, মিশরে ব্রিটিশরা বেকায়দায় পড়ে যেত …… সর্বহারার পররাষ্ট্র নীতি হল অগ্রসর দেশের বিপ্লবীদের সাথে ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সকল নিপীড়িত জাতির সাথে মৈত্রী প্রতিষ্ঠা’। (লেনিন, ১৯১৭)

উপনিবেশী যুদ্ধের প্রকৃতি:

উপনিবেশী যুদ্ধে সভ্যতার বড়াইকারী ইউরোপ এশিয়া ও আফ্রিকার জাতির উপর নানা বর্বরতাই করেছে। লেনিন ১৯১২ সালে ইতালি কর্তৃক লিবিয়া দখলের যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘সুসভ্য, সাংবিধানিক রাষ্ট্রের বাহিনী’ হয়ে ইতালি কিভাবে আরবদের উপর ‘উপনিবেশী যুদ্ধের দস্তুরমোতাবেক’ আগ্রাসন চালিয়েছে তা লক্ষ্য করেছেন। এই উপনিবেশী যুদ্ধের দস্তুর কি? লেনিন লক্ষ্য করেছেন, আরব নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। ব্যাপক সংখ্যক আরবের প্রাণদণ্ড হয়। লেনিন ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, সামনের দিনে ইতালীয়রা বুলেট, বেয়োনেট, খুন ও ধর্ষণের দ্বারা আরবদের সভ্যতা শেখাবে। লক্ষ্য ইতালীয় পুঁজির অবাধ মুনাফা। (লেনিন, ১৯১২)

চীন ও সান ইয়াত-সেন:

চীন বিশ শতকে বিরাট বৈপ্লবিক ঘটনাবলির পটভূমি। সঙ্গত কারণেই লেনিনের অন্যতম মনোযোগের কেন্দ্র ছিল চীন। এবং চীনকে কেন্দ্র করেই পরাধীন ও নিপীড়িত এশিয়ায় জাতীয় মুক্তির প্রশ্নের জটিলতাটি তাঁর চিন্তায় পরিষ্কার ধরা পড়ে।

১৯১১ সালে চীনে বিপ্লবে রাজতন্ত্র উৎখাত হয় ও সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে কুয়োমিন্টাং পার্টির কর্তৃত্বে জাতীয় প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী সরকার কায়েম হয়। তখন লেনিন লেখেন:

প্রগতিশীল ও সভ্য ইউরোপের দেখছি চীনের নবজন্ম নিয়ে কোন আগ্রহ নেই। ৪০ কোটি পশ্চাৎপদ এশিয়াবাসী মুক্ত হল, রাজনৈতিক জীবনে শামিল হল। দুনিয়ার জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ রুদ্ধতা ভেঙে আলোর পথে, আন্দোলনের পথে, সংগ্রামের পথে আগুয়ান হয়েছে। তাতে সভ্য ইউরোপের থোড়াই এসে গেল। আজ পর্যন্ত এমনকি ফরাসি প্রজাতন্ত্র স্বীকার করল না প্রজাতন্ত্রী চীনকে! … (লেনিন, ১৯১২)

লেনিন কিন্তু চীনের বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্র গঠনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন:

রুশ সামাজিক-গণতন্ত্রী দলের সভা চীনের জনগণের বিপ্লবী আন্দোলনের বৈশ্বিক তাৎপর্য স্বীকার করছে। এই আন্দোলন এশিয়ায় মুক্তির সূচনা করেছে ও ইউরোপীয় শাসনের বারোটা বাজাচ্ছে। আমাদের সভা চীনের বিপ্লবী প্রজাতন্ত্রীদের সেলাম জানাচ্ছে। আমাদের সভা সাক্ষী, চীনের বিপ্লবী জনতার সাফল্য রুশ সর্বহারা গভীর উৎসাহ ও ষোলআনা সহমর্মিতার সাথে  খেয়াল করে চলেছে। (লেনিন, ১৯১২)

লেনিন জানতেন চীনের নেতা সান ইয়াত-সেন সমাজতন্ত্রী নন, শ্রমিকবন্ধু নন। চীনে, লেনিন বললেন:

সচ্ছল কৃষক ও বুর্জোয়ার জোট সর্বেসর্বা। সেদেশে সর্বহারা শ্রেণী বলে কিছু নাই, থাকলেও সে ক্ষমতাহীন। … চীনের রাজনৈতিক দলের মধ্যে রয়েছে পাতি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রী যারা নিজেদের বিপ্লবী-সমাজতন্ত্রী বলে। উদারনৈতিক ও পাতি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা একসঙ্গে গঠন করেছে জাতীয় দল। আর আছে রক্ষণশীল ভূস্বামী আমলা ও মুক্তি হাসিল করেছে কৃষক গণতন্ত্রী ও স্বাধীনতাপন্থি বুর্জোয়া।…   (লেনিন, ১৯১২)

সান ইয়াত-সেনের দল … মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও তাদের প্রকৃত কর্মসূচি কৃষিতে অতিদ্রুত পুঁজিবাদী সম্পর্কের বিকাশসাধন। … (লেনিন, ১৯১২)

তাতে লেনিনের সমর্থন ক্ষুণœ হয় নি:

সান ইয়াত-সেনের কুয়োমিন্টাং দল মানে ’জাতীয়তাবাদী’রা হল (রুশ প্রেক্ষাপটে বলা চলত বিপ্লবী-নারোদবাদী প্রজাতন্ত্রী দল, অর্থাৎ) গণতন্ত্রী দল। (লেনিন, ১৯১৩)

সান ইয়াত-সেন হলেন প্রগতিশীল চীনা গণতন্ত্রী … অনেকটা রুশ নারোদবাদীদের মত চিন্তাভাবনা তাঁর… তিনি বিপ্লবী গণতন্ত্রী … দেখা যাচ্ছে এশিয়ায় এখনো এক বুর্জোয়া শ্রেণী আছে যারা গণতন্ত্রের জন্য আন্তরিক, সংগ্রামী, অবিচল। তাঁদের তুলনা চলে ফরাসিদেশের আলোকায়ন যুগের মহাপুরুষ ও আঠারোশতকের শেষের মহান নেতাদের সাথে।

এশীয় বুর্জোয়ার প্রধান ভরসা ও প্রকৃত প্রগতির অগ্রদূত আর কেউ নয়, এশিয়ার কৃষকসমাজ। আর শত্রু হল বেইমানির ধাতুতে গড়া স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী বুর্জোয়া। … (লেনিন, ১৯১২)

বন্ধুভাবে কঠোর সমালোচনা করতেও ছাড়েন নি:

সান ইয়াত-সেনের দলের দুর্বলতা হল তাঁরা বিপ্লবে এখনো বৃহত্তর জনতাকে শামিল করতে পারেননি। চীনে শ্রমিকশ্রেণী এখনো অতি দুর্বল, তাই গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে তার লক্ষ্যে অবিচলিতভাবে চালিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দেওয়ার কোন শ্রেণী আপাতত নাই। শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে নেতৃত্ব নাই বলে কৃষকশ্রেণীও নিতান্ত দলিত, নিষ্ক্রিয়, অজ্ঞান ও রাজনীতিতে আগ্রহশূন্য। …  তবু সান ইয়াত-সেনের শত দুর্বলতা (খালি ভাবাভাবি করা, সিদ্ধান্ত নিতে না পারা — যেহেতু শক্ত শ্রমিক সমর্থন নাই তাঁর পেছনে) সত্ত্বেও চীনের বিপ্লবী গণতন্ত্র জনগণকে জাগাতে, মুক্ত করতে ও গণতান্ত্রিক প্রথাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে বহুলাংশে সার্থক হয়েছে। চীনের কৃষককে রাজনীতিতে এনে সান ইয়াত-সেনের দল এশিয়া তথা সমগ্র মানবজাতির উন্নতিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। (লেনিন, ১৯১৩)

পরিশেষে বলা যায়, চীন তথা এশিয়া বিষয়ে লেনিনের চিন্তা ভিয়েতনাম বুঝতে কাজে আসবে।

সূত্র:

1. Lenin, V. (1912). Democracy and Narodism in China.

2. Lenin, V. (1906). Lessons of Moscow Uprising.

3. Lenin, V. (1913). Once more on the segregation of schools according to nationality.

4.  Lenin, V. (1915). Socialism and War.

5.  Lenin, V. (1913). The Awakening of Asia.

6. Lenin, V. (1912). The Chinese Revolution.

7. Lenin, V. (1916). The ‘Disarmament’ Slogan.

8. Lenin, V. (1912). The End of Italo-Turkish War.

9. Lenin, V. (1917). The Foreign Policy of the Russian Revolution.

10. Lenin, V. (1916). The Military Program of Proletarian Revolution.

11. Lenin, V. (1914). The National Equality Bill.

12. Lenin, V. (1912). The Regerenated China.

13. Lenin, V. (1913). The Struggle of Parties in China.

14. Lenin, V. (1913). The Struggle of Parties in China.

15. Lenin, V. (1913). Theses on National Question.

16. Lenin, V. (1917). War and Revolution.

17. Karl Kautsky (1911). War and Peace.