Monthly Archives: অগাষ্ট 2013

সম্পাদকীয়: আহমদ ছফার ইহকাল ও পরকাল

জনধন্য বাংলা মুলুকে আহমদ ছফার নাম খুব বেশি লোক শুনিয়াছেন এমন ভাবিবার কারণ নাই। আজ হইতে এক যুগ আগে — মোতাবেক ২০০১ ইংরাজির ২৮ জুলাই — তিনি গত হইয়াছেন। ১৯৪৩ ইংরাজির ৩০ জুন চট্টগ্রাম জিলার চন্দনাইশ থানাধীন হাশিমপুর এয়ুনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে তিনি জন্মিয়াছিলেন। তাঁহার কর্মসাধনা কথাসাহিত্য, কাব্য, সঙ্গীত, নাটক, প্রবন্ধ, মজলুম জনগণের রাজনীতি ইতি আদি বিচিত্র পথে গমন করিয়াছে। তবে সাধনার সকল বেণী ভুবন ভ্রমিয়া শেষে একটি বিন্দুতেই মিলিত হইয়াছে। সেই সঙ্গমবিন্দুর সামান্য নাম মজলুম জাতির মুক্তিসংগ্রাম। বিশেষ বলিতে ছফার রচনায় ইহার মূর্তি ১৯৭১ সাল নাগাদ পাকিয়া ওঠা বাঙ্গালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম তথা বাংলাদেশ নামচিহ্নের ভিতর দিয়া বাঙ্গালির প্রথম জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক তাৎপর্য। আমাদের সংস্কার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আহমদ ছফার জন্ম দিয়াছেন। এই যুদ্ধ যেসকল তত্ত্বকার ফলাইয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে আহমদ ছফার জায়গা সবার উপরে থাকিবে।

আহমদ ছফা কোন ধাতু দিয়া গড়িয়া উঠিয়াছিলেন তাহা বুঝিতে হইলে বাঙ্গালির জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম কি করিয়া মূর্ত হইয়া উঠিল তাহার তত্ত্ব লইতে হইবে। আমরা সকলেই জানি ১৯৪৭ সালে যেই কারণে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান পাকিস্তান সমর্থন করিয়াছে সেই একই কারণে ১৯৭১ সালে তাঁহারা সমর্থন করিয়াছে বাংলাদেশ। পাকিস্তান আন্দোলনে শুদ্ধ ধর্মই কাজ করিয়াছে, নিম্নবর্ণের হিন্দু ও চাষা মুসলমানের শ্রেণিচেতনা একেবারেই কাজ করে নাই — এমনটা ভাবিলে ভুল হইবে। অন্তত ছফা এমনটা ভাবিতেন না।

কিন্তু বেশি দিন না যাইতেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক চেহারা বাহির হইয়া আসিল। শুদ্ধ ‘মুসলমান’ বটিকা দিয়া আর বেশিদিন নির্যাতিত জাতিসত্তাগুলাকে দাবাইয়া রাখা গেল না। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের দুইটি শর্ত ধীরে ধীরে মূর্ত হইয়া উঠিল। এক শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশে জাতির সংজ্ঞা তৈয়ার করিতে হইবে। আরেক শর্ত বলিতেছে উচ্চশ্রেণির জুলুম হইতে মজলুম কৃষক শ্রমিক জনতাকে বাঁচাইবার কথা। প্রথম কর্তব্য করা না গেলে দ্বিতীয়টি আর সম্ভব হইবে না। এই দুই কর্তব্যের ছক কাটিয়া একযোগে আগাইতে হইবে। এই বিশ্বাস আহমদ ছফা ধারণ করিয়াছিলেন। ইহার মধ্যেই আহমদ ছফার সারবস্তু লুকাইয়া রহিয়াছে।

ইতিহাসের দ্বন্দ্ব থামিয়া থাকে না। একদিন যাহারা জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মোহন বাঁশি বাজাইয়াছিলেন সেই বামপথের পথিকরা দ্বন্দ্ব শনাক্ত করিতে না পারিয়া জনগণের রাজনীতির খাত হইতে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়া যাইতে লাগিলেন। বিকাশমান নতুন মধ্যশ্রেণির সংগঠন আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের দাবি লইয়া নিজ নামে আগাইয়া আসিল। পদ্মায় অনেক জল গড়াইল। রাজপথে শ্রমিক কৃষক ছাত্র জনতা অনেক খুন ঢালিয়া দিল। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়া মানুষ ১৯৭১ সালে আসিয়া পঁহুছিল। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পূর্ব বাংলার মানুষ বুকের রক্ত ঢালিয়া দিয়া ঔপনিবাসিক ও ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের থাবা হইতে নিজেদের মুক্ত করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম করিল।

বাঙ্গালি অবাঙ্গালি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান ইতি আদি নির্বিশেষে এই অঞ্চলের পুরা জনগোষ্ঠীর আকাক্সক্ষার সম্মিলিত ঐক্য বাংলাদেশ নামক জাতীয় রাষ্ট্র সম্ভব করিয়া তুলিয়াছে। ছফা বলিতেছেন, জাতিগত পরিচয়ে আমরা বাঙ্গালি হইলেও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে আমরা বাংলাদেশি। স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করিতে হইবে। মুক্তিসংগ্রামের চূড়ায় উঠিয়া আমরা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি, রাষ্ট্রের জাতিনিরপেক্ষ নীতি, রাষ্ট্রের শ্রেণিনিরপেক্ষ নীতি ইতি আদি নানান ওয়াদা শুনিয়াছিলাম। এই সকল ওয়াদাই গণতন্ত্রের নানান রূপের প্রকাশ।

স্বাধীন বাংলাদেশে ছফা দেখিলেন আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের ফল অপরে আত্মসাৎ করিয়াছে। সেই বেহাত বিপ্লবের কাহিনী তিনি উমরভর আমাদের শুনাইয়াছেন। বাংলাদেশের মানুষের জাতীয় স্বাধীনতার তীব্র স্পৃহা ধারণ করা শুরু হইতেই দোদুল্যমান মধ্যশ্রেণির রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের জন্য সম্ভব ছিল না। ইহার জের ধরিয়া ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পায়ে পায়ে হাঁটিয়া ভারতে গিয়া আশ্রয় ভিক্ষা করিয়াছিল। পয়গম্বরের মত ছফা বার বার বলিয়াছেন ইহার মূল্য আমাদের অনেক দিন ধরিয়া দিয়া যাইতে হইবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সমাজ ও অর্থনীতির পুনর্গঠনে দোদুল্যমান মধ্যশ্রেণির সংগঠন আওয়ামী লীগ কিছুই করিতে পারিলেন না। তাঁহারা লুটপাটে মজিয়া রহিলেন। জাতীয় শিল্পের বিকাশ না ঘটিয়া এখানে একটি লুটপাটতন্ত্র কায়েম হইল। সেই তন্ত্রের গঠনতন্ত্র আমাদের জমানায় আসিয়াও অবিকল রহিয়াছে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটা শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি দিবার সম্ভাবনা মাঠেই মারা গেল। গণতন্ত্রের কবর দিয়া আওয়ামী লীগ একনায়কতন্ত্র কায়েম করিলেন। একাত্তরের মহাসিন্ধুর জলে ¯œাত হইয়া যে সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিবার দায়িত্ব মহাকাল আমাদের ওপর দিয়াছিল তাহার কিছুই আমরা করিতে পারিলাম না। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়িবার ওয়াদা শুরু হইতেই লঙ্ঘিত হইল। পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুর উপর যে নির্যাতন হইয়াছিল তাহার মাত্রা কোনমতেই কমিল না। তাহার সহিত জুড়িল আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ লুটপাট, দিল্লির সরকারের বাংলাদেশকে তাঁবে রাখিবার নীতি। জনগণের দুঃখ দুর্দশা নিরসনের কোন চেষ্টা না করিয়া শাসকশ্রেণি দেশের সম্পদ লুটিয়া পুটিয়া খাইতে লাগিল। এই বিষাক্ত পরিবেশে কিছু এসলাম ধর্মব্যবসায়ী গোষ্ঠীর — যাহারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র চাহে নাই, যাহাদের মনের মধ্যে এখনো পাকিস্তান রাষ্ট্রটি জাগরূক — প্রচারের মুখে আওয়ামী লীগ বিরোধিতা সমান সমান ভারত বিরোধিতা ও হিন্দু বিরোধিতা দাঁড়াইয়া গেল। আহমদ ছফা দাবি করিয়াছেন বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হইবার পর দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির যে শ্রীবৃদ্ধি তাহার প্রধান দায় শেষ বিচারে আওয়ামী লীগকেই লইতে হইবে। আওয়ামী লীগ ফাঁক তৈয়ার করিয়াছেন, সেই ফাঁক দিয়া সমাজে প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি জলের মত ঢুকিয়া পড়িয়াছে। ক্রমে আওয়ামী লীগ নিজেও তাহার অংশ হইয়া পড়িয়াছে। রক্ষণশীলতা নতুনভাবে জাগিয়া উঠিয়াছে। জিয়াউর রহমান, হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ প্রমুখের জমানায় সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষ পত্রপুষ্পে বিকশিত হইয়াছে। তাহাদের পরের জমানায় আসিয়া বিষবৃক্ষের বিষময় ফল আজ আমরা চাক্ষুষ করিতেছি।

১৯৭১ আহমদ ছফাকে সারা জীবন ভাবাইয়াছে। তিনি মনে করিতেন এই যুদ্ধ শুদ্ধ বাঙ্গালির জাতীয় রাষ্ট্রেরই জন্ম দেয় নাই, ভারতবর্ষের অমীমাংসিত জাতি সমস্যারও গিঁট খুলিয়া দিয়াছে। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম একদিকে যেমন জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্ব খারিজ করিয়া দিয়াছে অন্য দিকে ভারতি উচ্চবর্ণ শাসকশ্রেণির এক ভারতি জাতির তত্ত্বও খারিজ করিয়া দিয়াছে। ভারতবর্ষ বহু ভাষা বহু ধর্ম বহু বর্ণ বহু জাতির দেশ। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ভারতের সেই সব চাপা পড়িয়া থাকা জাতির সংজ্ঞা নির্ণয়ের পথ দেখাইয়া দিয়াছে। তাঁহার প্রস্তাব বাংলাদেশকে ভারতের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে হইলে এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার দিকে ধাবিত হইতে হইবে যাহা অনিবার্যভাবেই ভারতি বৃহৎ শ্রেণির শোষণ হইতে, উচ্চ বর্ণের জুলুম হইতে ভারতের শোষিত এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীগুলোকে তাহাদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং আর্থিক দাবির প্রতি সজাগ করিয়া তুলিবে। ধর্মের ধুয়া তুলিয়া বিশেষ লাভ হইবে না। ছফা বলিতেছেন, বাংলাদেশের সহিত ভারতের মূল দ্বন্দ্ব ধর্মে নহে, সমাজ ব্যবস্থায়। একই সাথে তিনি উল্লেখ করিতে ভুলেন নাই ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক ভাবের আদি উৎস ভারতি সমাজের বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা। ইহারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি কখনো কখনো জাতপাতের বিরুদ্ধে নমশুদ্রের জাগরণের একটি প্রকাশ আকারেও পাঠ করিবার কোশেশ করিয়াছেন বলিয়া আমাদের সংস্কার।

আহমদ ছফা ভাবিতেন ১৯৭১ বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের হাজার বছরের জরার বাঁধন খুলিয়া দিয়াছে। আপন বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ লইয়া তাঁহার গভীর ভাবনা ছিল। তিনি আবিষ্কার করিয়াছেন এই জনগোষ্ঠীর মনের উপর যুগ যুগ ধরিয়া একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত করিয়া রাখিয়াছে। তাহাদের মনের পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হইয়া ওঠে নাই। যুগের পর যুগ ধরিয়া এই সমাজের মানুষ জুলুমের শিকার হইয়াছে। বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা হইতে বাঁচিতে তাহারা কালে কালে বৌদ্ধ হইয়াছে, মুসলমান হইয়াছে। কিন্তু মৌলিক উৎপাদন পদ্ধতিতে কোন বদল আসে নাই। ফলে ধর্ম বদলেও তাহাদের মুক্তি আসে নাই। ১৯৭১ সালে আসিয়া তাহারা একটি রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দিলেন। জাতিরাষ্ট্র হিশাবে বাংলাদেশের জন্ম তাই নতুন সংস্কৃতি নির্মাণের এক অভূতপূর্ব শর্ত আমাদের সামনে মূর্ত করিয়া তুলিয়াছে। সেই শর্ত মোতাবেক বাঙ্গালি পরিচয় ভিন্ন বাঙ্গালি মুসলমানের চলিবে না। শিল্পে সাহিত্যে দর্শনে সর্বত্র আমাদের একটি নতুন জাগরণ সম্ভব করিয়া তুলিতে হইবে। বাংলার ঘাসের উপর ফোঁটা ফোঁটা নতুন সংস্কৃতির শিশির যোগ করিতে হইবে। কিন্তু ছফা বলিতে ভুলেন নাই মুসলমান প্রধান বাঙ্গালির দেশে নতুন সংস্কৃতি নির্মাণ করিতে হইলে বাঙ্গালিয়ানার নতুন একটি সংজ্ঞা নির্মাণ করিতে হইবে। তাঁহার সিদ্ধান্ত,  উনিশ শতকের ঔপনিবাসিক শিক্ষায় লালিত উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় ও তাঁহাদের এই দেশি দোসর তথাকথিত প্রগতিশীলরা বাঙ্গালিয়ানার যে আদল খাড়া করিয়াছেন  তাহার অনেক কিছুই আমাদের ফেলিয়া দিতে হইবে। আবার দক্ষিণপন্থী ধর্মতান্ত্রিক রাজনীতির যে ভাব ইসলাম পরিচয়কে বাঙ্গালিয়ানার বিরুদ্ধে খাড়া করাইয়া দেয় তাহাও আমাদের খারিজ করিতে হইবে। ছফা বলিতেছেন উনিশ শতকের বাঙ্গালি বর্ণ হিন্দুর জাগরণের সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবাসিক চেতনা বাদ দিয়া প্রগতিমুখী সারবস্তুটুকু বাঙ্গালি মুসলমানকে অবশ্যই গ্রহণ করিতে হইবে। ধর্মশাসিত বাঙ্গালি মুসলমান সমাজে ধর্মতান্ত্রিক সামন্তচিন্তার একচ্ছত্র প্রতাপের অবসান ঘটাইতে হইবে। এই সমাজকে কাটিয়া চিরিয়া তাহার কুসংস্কার, জাড্য, বদ্ধমত ইতি আদি জীর্ণ অংশ বাদ দিতে হইবে। ইহা করিতে না পারিলে সমাজ আগাইয়া যাইতে পারিবে না। দিন দিন আপন ভারে আপনি নুইয়া পড়িবে।

আমাদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ বেহাত হইয়াছে। মুক্তিসংগ্রামের অঙ্গীকার জাতি, ধর্ম ও শ্রেণিনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আমরা কায়েম করিতে পারি নাই। ঠিক সেই কারণে আজ চল্লিশ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধ জারি আছে। আহমদ ছফার অর্থবেদ করিলে সেই মহাসিন্ধুর কল্লোল আমরা শুনিতে পাইব। শাসক দোদুল্যমান মধ্যশ্রেণির যে সকল দল পালা করিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখিয়াছেন তাহাদের কেহই প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে ধারণ করিতে পারেন নাই। উৎপাদনবিমুখ লুটপাটমুখী অর্থনৈতিক নীতি, প্রতিক্রিয়ার রাজনৈতিক শক্তি ও শ্রেণিগত অবস্থান মিলিয়া মিশিয়া তথাকথিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’ ও বিপক্ষের শক্তি উভয়কে মূলত এক কাতারে লইয়া আসিয়াছে। এই গণবিরোধি একপক্ষের বিপরীতে গণতান্ত্রিক সর্বজনপক্ষ একদিন অন্তরের অমৃতের বলে রুখিয়া দাঁড়াইবে এমনটা আহমদ ছফা বিশ্বাস করিতেন। সেই কর্মসাধনার ভার তিনি দিতে চাহিতেন যাহাদের আমরা বামপথের পথিক বলি তাহাদের। কিন্তু তিনি একটি শর্ত জুড়িয়া দিয়াছিলেন। হাল আমলের গণবিচ্ছিন্ন রাজনীতি হইতে তাহাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। গত শতকের ষাটের দশকের গোড়ার দিকে শ্রমিক কৃষক ছাত্র যুবক মেহনতি জনতাকে সাথে লইয়া জাতীয় মুক্তসংগ্রাম আর শ্রেণিসংগ্রাম একসাথ চালাইয়া যাইবার যে ছক তাঁহারা কাটিয়াছিলেন তাহার ভাব আবার ফিরাইয়া আনিতে হইবে। ইহা করিতে না পারিলে বাংলাদেশ নামের কোন সার্থকতা থাকিবে না। সত্য, মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটাইয়া বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যৎ নাই।

আহমদ ছফা বিপ্লব করিতে চাহিতেন। ইহা আমাদের সংস্কার। কিন্তু তাঁহাকে নৈরাজ্যবাদী বলিতে আমরা রাজি হইব না। একটি জনগোষ্ঠীর জীবনে রাষ্ট্রগঠনের গুরুত্ব কি তাহা তিনি জীবন দিয়া অনুধাবন করিয়াছেন। সমাজকে তিনি ফেলনা মনে করিতেন না। মানুষের ইতিহাসে সভ্যতার কর্জ তিনি অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করিয়াছেন। সবচাইতে দূরবর্তী সম্ভাবনা সবচেয়ে সহজ কথায় বলিয়া দিবার সৎসাহস আমাদের জমানায় তাহার মত আর কাহারো মনে আমরা দেখি নাই। আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সহিত, আমাদের জাতীয় সাহিত্যের সহিত তিনি একাকার হইয়া গিয়াছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মোহনায় আসিয়া আহমদ ছফার ইহকাল ও পরকাল মিশিয়া গিয়াছে। আহমদ ছফাকে পাশ কাটাইয়া এই জাতির কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা ভাবিবার সময় আসিয়াছে।

এই বছর তাহার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধা। সর্বজনের বর্তমান সংখ্যা আমরা তাঁহাকে নিবেদন করিয়া সাজাইয়াছি। সর্বজনের এই ‘আহমদ ছফা বিশেষ সংখ্যা’র প্রধান আকর্ষণ একাদশ আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা। ‘আহমদ ছফার সাধনা’ বিষয়ে এইবার বক্তৃতা রচিয়াছেন আফজালুর রহমান।  ইহাতে আহমদ ছফার ছয়টি দুষ্প্রাপ্য রচনা আমরা প্রচার করিতেছি। এই ছয়টি রচনা এখনো আহমদ ছফা রচনাবলিতে জায়গা করিয়া লয় নাই। ‘চাই সমান্তরাল সংস্কৃতি’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখি নি’ রচনা দুইটি যোগাড় করিয়া দিয়াছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া নিবাসী সৈয়দ মনজুর মোরশেদ।

সম্পাদনা কাজে আমাদের আরো সহায় হইয়াছেন মুহাম্মদ তাসনিম আলম, মেহেদি হাসান, রায়হান রাজু, আলামিন খান ও মো: রুম্মান শিকদার। অক্ষরবিন্যাসে ছিলেন মিজানুর রহমান সেলিম।

এই হ্রস্ব পথযাত্রায় সর্বজন আরো যেসকল মহাজনের কর্জ স্বীকার করিতে চাহে তাহাদের মধ্যে আছেন আবদুল হক, ডা: কাজী কামরুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া, নূর মোহাম্মদ, আকতারুজ্জামান, তরিকুল ইসলাম মধু, শহিদুর রহমান, জহিরুল ইসলাম কচি, শিবু কুমার শীল, কাজী নিয়াজ আহমদ ও তাওহীদ হাসান। তাঁহারা আমাদের চির উত্তমর্ণ।

আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ১১: আহমদ ছফার সাধনা — আফজালুর রহমান

2.1

আহমদ ছফা তাঁহার যুগের অন্য অনেক সাহিত্যিকের চাইতে একটু কমই পরিচিত। ইহার পিছনে হয়তো নানান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কারণ রহিয়াছে। তবে তাঁহার রীতকরণের রীতিপদ্ধতি যে অন্যদের চাইতে আলাদা তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যায়। আমরা শুদ্ধ একটি নমুনা হাজির করিব।

তাঁহার যুগের অনেক সাহিত্যিক যখন হাল ফ্যাশনের হরেক রকম জবরজং সাহিত্যবস্তুর নেশায় বুঁদ তখন আহমদ ছফা জার্মান মহাকবি গ্যেটেতে মজিয়াছিলেন। গ্যেটের অমর কাব্য ‘ফাউস্ট’ বাংলায় তর্জমা করিয়া প্রকাশ করিয়াছিলেন। কখনো তিনি আপনাকে গ্যেটের মতন প্রতিভাবান বলিয়াও দাবি করিতেন। (খান ২০১০: ৩৩) দুইজনের মধ্যে একটা কাকতালীয় মিলও হয়তো খাড়া করা যাইতে পারে। গ্যেটে যখন জার্মান সাহিত্যের আকাশে বিচরণ করিতেছিলেন তখন জার্মান জাতির চিত্তে জাতীয়তার বোধ জাগি জাগি করিতেছিল। আর আহমদ ছফা যখন সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করিয়াছিলেন তখনো তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মনে একটা জাতীয়তার বোধ অলক্ষ্যে হইলেও জাগিয়া উঠিতেছিল।

ইহার বাহিরেও তাঁহার গ্যেটেপ্রেমের অন্যবিধ কারণ বর্তমান ছিল। গ্যেটে মহান সাহিত্যিক। তাঁহার দ্বারস্থ হইয়া তিনি অনেক কিছু শিখিয়াছিলেন। ছফার নিজের মুখেই শুনা যাউক:

নানা চড়াই উৎরাই উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে আমার জীবন। আমাদের দেশের ইতিহাসেও অনেকগুলো বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। কালের কুটিল গতি বার বার কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলেছে, আমার জীবন স্থিত থাকে কেমন করে? নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়? আমাদের দেশে নারকীয় পরিস্থিতি কখনো ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, কখনো ভেতর থেকে ঠেলে উঠে আকাশ বাতাস আচ্ছন্ন করেছে। শক্তিমানের দম্ভ, মূর্খের আস্ফালন, বলদর্পী বর্বরের অট্টহাস্য দেখে যখন মনে হয়েছে জীবনে বেঁচে থাকার সার্থকতা কি? এই ধরনের সংকটের মুহূর্তগুলিতে গ্যোতের রচনা, রচনার শরীরে প্রবাহিত চিন্ময় জীবন প্রবাহ আপন মেরুদণ্ডের উপর থিতু হতে, মানুষের উপর আস্থা অর্পণ করতে অনেকখানি সহায়তা করেছে। (ছফা ২০১১গ: ১৩০)

আর কি পাইয়াছিলেন সে সম্পর্কে বলিতেছেন আহমদ ছফা: ‘গ্যোটে জার্মানীর প্রধান কবি এ কথা সত্য বটে, কিন্তু তাঁর আবেগের সততা, অনুভূতির দাহিকা শক্তি একজন স্বল্পজ্ঞান বাঙ্গালি যুবকের চিত্তের সমস্ত জায়গা অধিকার করে নিয়েছিল, এটা একটুও অতিশয়োক্তি নয়। সত্য প্রিয় হোক, অপ্রিয় হোক, মিষ্টি তেতো যাই হোক না কেন একমাত্র সত্যই মানুষকে সাহায্য করতে পারে আর কিছু নয়। এই শিক্ষা আমার চেতনায় গেঁথে গেছে।’ (ছফা ২০১১গ: ১৩০) গ্যেটে সম্পর্কে আরেক লেখায় তিনি একখানা পুরানা কথা নতুন করিয়া বলিয়াছিলেন: ‘এক মশালের আগুন থেকে যেমন অন্য মশালের আগুন জ্বলে উঠতে পারে তেমনি এক প্রতিভাই অন্য একজন প্রতিভাবানের অন্তরের আগুন জ্বালিয়ে তুলতে পারে।’ (ছফা ২০১১খ: ১২২)

আহমদ ছফার ক্ষেত্রে কি এই কথা সত্য? আমরা বলিব তাঁহার দাবি অমূলক নহে। তিনি আমাদের সাহিত্যের এক যুগান্তকারী প্রতিভা। প্রতিভাবান সাহিত্যিক হইবার জন্য যেসকল উপাদান অপরিহার্য তাহার সকলই আহমদ ছফার মধ্যে ছিল। পৃথিবীর সব দেশের সব বড় সাহিত্যিকই স্ব স্ব সময় ও সমাজের মর্মবেগকে তাঁহাদের রচনায় রূপায়ন করিতে সক্ষম হয়েন। আহমদ ছফাও হইয়াছেন। আপন সময় ও সমাজের হৃদস্পন্দন তিনি যতটা ধরিতে পারিয়াছিলেন তত তাঁহার কালে আর কেহই পারে নাই। নিজের সমাজ ও দেশকে ভালবাসিবার, বড় করিবার এক উদগ্র বাসনা তাঁহাকে পাইয়া বসিয়াছিল। সমাজহিতৈষী কর্মকাণ্ড, নানান সংগঠন গড়িয়া তোলা, রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণ প্রভৃতিও তিনি করিয়াছেন।

তবে মূলত সাহিত্য চর্চার মাধ্যমেই তিনি জাতির প্রতি তাঁহার দায়িত্ব পালন করিয়া গিয়াছেন। একরকম বলা চলে, লিখিয়া জাতি গঠনের কাজকে তিনি নিজের জন্য বাছিয়া লইয়াছিলেন। তিনি আটখানা উপন্যাস লিখিয়াছেন। আকারে ছোট হইলেও কাহিনী বিন্যাস, চরিত্র নির্মাণ ও সমাজবাস্তবতাকে শিল্পরূপ দিবার নিরিখে প্রত্যেকটিই বড় সাহিত্যের লক্ষণাক্রান্ত। ‘বাঙ্গালি মুসলমানের মন’, ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: শতবর্ষের ফেরারী’, ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’, ‘বাংলার চিত্র ঐতিহ্য ও সুলতানের সাধনা’ প্রভৃতি প্রবন্ধ আমাদের চিন্তার ইতিহাসে নতুন নতুন দিগন্তের উন্মোচন করিয়াছে।

অত্র লেখায় আহমদ ছফার নিজ সমাজ — যাহাকে তিনি বাঙ্গালি মুসলমান সমাজ বলিয়াছেন — এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁহার চিন্তাধারা তুলিয়া ধরিয়া তাঁহার সাধনার বিশেষ দিকটির প্রতি আলোকপাত করিবার চেষ্টা করা হইয়াছে।

আহমদ ছফা জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন বাঙ্গালি মুসলমান কৃষককুলে। তখনকার দিনে এই সমাজের মানুষই বঙ্গদেশে সংখ্যায় সর্বাধিক ছিলেন। তাঁহারা যুগ যুগ ধরিয়া নির্যাতিত হইয়া আসা জনগোষ্ঠী। আবার এই মাটির সাক্ষাৎ সন্তানও ইহারাই। বলা চলে এই সমাজের মানুষ পূর্বে নিম্নবর্ণের হিন্দু ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁহারা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। আবার শঙ্করাচার্যের আবির্ভাবের ফলে প্রাচীন আর্যধর্মের নবজীবন প্রাপ্তির পরে এই বৌদ্ধরা ভীতসন্ত্রস্ত হইয়া দলে দলে এসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। আহমদ ছফা জানাইতেছেন,

বাঙালি মুসলমানরা শুরু থেকেই তাঁদের আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দুর্দশার হাত থেকে আত্মরক্ষার তাগিদেই ক্রমাগত ধর্ম পরিবর্তন করে আসছিলেন। কিন্তু ধর্ম পরিবর্তনের কারণে তাঁদের মধ্যে একটা সামাজিক প্রভুত্ব অর্জনের উন্মেষ হলেও জাগতিক দুর্দশার অবসান ঘটেনি। বাংলাদেশে নতুন নতুন রাজশক্তি প্রতিষ্ঠা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা আশাতীত হারে বৃদ্ধি লাভ করেছে। যেহেতু মৌলিক উৎপাদন পদ্ধতির মধ্যে কোন পরিবর্তন বা রূপান্তর ঘটেনি, তাই রাজশক্তিকেও পুরনো সমাজ সংগঠনকে মেনে নিতে হয়েছে। সে জন্যই মুসলিম শাসনামলেও বাঙালি মুসলমানেরা রাজনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিগৃহীত ছিলেন। (ছফা ২০১১ঙ: ১০৪)

আসলে ব্রিটিশপূর্ব যে মুসলমান শাসনামল সেই সময় রাজশক্তির সাথে রাজকাজে সহায়তা করিবার অবস্থায় বাঙ্গালি মুসলমান ছিল না। মৌলিক সামাজিক রূপান্তর না ঘটিবার কারণে রাজশক্তিকে সহায়তা করিবার এবং রাজকাজে অংশগ্রহণ করিতে যোগ্য হইয়া উঠিবার জন্য যে নিরাপদ আর্থিক ভিত্তির দরকার পড়ে তাহা এই দরিদ্র মুসলমানদের কখনই ছিল না। পরবর্তীতে পলাশী যুদ্ধের পরে উচ্চশ্রেণির মুসলমানেরাও সামাজিক নেতৃত্বের আসন হইতে সম্পূর্ণভাবে বিতাড়িত হয়। ইংরেজ আমলে তাঁহাদের জায়গায় আসীন হয় উচ্চবর্ণের হিন্দুরা। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হইবার পর এই নির্যাতিত জনগোষ্ঠী প্রজা অভিধায় অভিষিক্ত হইয়াছিল। উনিশ শতকের গোড়া হইতেই ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতদের তত্ত্বাবধানে বাংলা গদ্য পরিস্ফুট হইতে শুরু করে। কলিকাতায় ছাপাখানা বসে। নতুন সাহিত্যের ভিত্তি রচিত হয়।

2.2

স্বভাবতই ইহার নেতা বনিয়াছিলেন বর্ণহিন্দুরা। অন্যদিকে বাঙ্গালি মুসলমান তখন অতীতের গর্ভগুহায়। উত্তর ভারতে যেমন স্যার সৈয়দ আহমদের মত সামাজিক নেতার আবির্ভাব হইয়াছিল বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে এমনটা ঘটে নাই। সরকারি চাকুরি, শিল্প সাহিত্য প্রভৃতিতে বাঙ্গালি হিন্দুরাই প্রভুত্ব করিতেছিল। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তুলনা করিলে ব্যবধান অন্তত এক শতাব্দীর। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা জরুরি: উনিশ শতকে বাংলার বর্ণহিন্দু সামাজিক নেতারা সংখ্যায় ছিলেন মোট জনগণের শতকরা ১০ ভাগ। তাঁহারা হিন্দুসমাজ হইতে আগত হইলেও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সহিত কোন নিবিড় যোগ তাঁহাদের ছিল না। সেই বিচারে মুসলমান কৃষকদের সহিত অর্থনৈতিক ও জীবন জীবিকার প্রশ্নে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের খুব একটা তফাত করা যাইবে না। ১৯০৫ সালে স্বদেশি আন্দোলন, ১৯০৯ সালে মর্লে-মিন্টো সংস্কারের অধীনে হিন্দু মুসলমানের পৃথক প্রতিনিধিত্ব এবং ১৯১১ সালে আদমশুমারির পরেই কেবল বর্ণহিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের লইয়া ভাবিতে শুরু করেন। কারণ ইতিমধ্যে এইসব ঘটনার প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িকতার মহড়া একদফা হইয়া গিয়াছে। ‘আনন্দ মঠ’ উপন্যাস স্বদেশি আন্দোলনের প্রেরণাপুস্তকে পরিণত হইয়াছে। এইসকল বিবেচনা করিয়া আহমদ ছফা যথার্থই বলিয়াছেন, ‘হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথাই এদেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস।’ (ছফা ২০১১ঙ: ১০৪)

বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে যে সামাজিক প্রভুত্ব অর্জনের আকাক্সক্ষা জন্মলাভ করিয়াছিল তাহার প্রমাণ পাওয়া যায় ওহাবি এবং ফরায়েজি আন্দোলনে। দীর্ঘদিন তাঁহারা ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রতি বিরূপ মনোভাব পুষিয়া রাখিয়াছিলেন। ১৮২৬ সালে শুরু হওয়া ওহাবি আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে কিরূপ সাড়া জাগাইয়াছিল তাহা উইলিয়ম হান্টার তাঁহার বহিতে উল্লেখ করিয়াছেন। ১৮৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ওহাবি বিদ্রোহ দমন করিতে সমর্থ হয়। ইহার পূর্বেই ঘটিয়া গিয়াছে ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধ। আমরা আগেই বলিয়াছি পলাশী যুদ্ধের পর মুসলমান অভিজাত শ্রেণিটি তাহার স্থানচ্যুত হয়। এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করিতে হইবে। যেই মুসলমান অভিজাত শ্রেণিটি পলাশী যুদ্ধের পর দৈন্যদশায় পতিত হয় পরবর্তী এক শতাব্দী ধরিয়া তাহাদের ক্ষয় হইতে থাকে। কর্নওয়ালিস ও স্যার জন শোরের সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূত্রপাত হয় তখন দেখা যায় যে বাংলার মোট ভূমির চার ভাগের এক ভাগই নিষ্কর এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের ভোগদখলে। কোম্পানির সরকার বহুদিন পর্যন্ত এই নিষ্কর জমির ভোগদখল বাজেয়াপ্তির চেষ্টা চালায়। এই প্রক্রিয়া ১৮২৮ সালে শুরু হইয়া পরের দুই দশকের মধ্যে সম্পন্ন হয়। ফলে দেখা যাইতেছে ওহাবি দমন এবং সাবেক অভিজাত শ্রেণি সমূলে উৎপাটন একই সময়ে আসিয়া মিশিয়াছিল।

হিন্দু মধ্যবিত্ত বনাম মুসলমান মধ্যবিত্তের প্রতিযোগিতা শুরু হইল ইতিহাসের এই পর্যায়ে আসিয়া। উল্লেখ্য, হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইতিমধ্যে পুরাদমে প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে। মুসলমান সমাজের সেই সময়কার সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে আহমদ ছফা বলেন: ‘বাংলা সাহিত্যের আধুনিক রূপায়নের যে প্রক্রিয়াটি ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে শুরু হয়েছিল সেই বিশেষ সময়টিতেও দেখতে পাই মুসলমান সমাজে পুরাণ পুঁথি পঠিত হচ্ছে এবং লেখা হচ্ছে নতুন পুঁথি। তারপরে আধুনিক বাংলা ভাষা যখন সকল শ্রেণির, সকল ধর্মের বাঙালি জনগণের উপর অপ্রতিহত প্রভুত্ব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে… সেই প্রক্রিয়াটিতে ছেদ পড়ে গেছে।’ (ছফা ২০১১ঘ: ১০১)

মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদসহ প্রথমদিককার মুসলমান সাহিত্যিকরা ঐ নগরলালিত ভাষায় সাহিত্য রচনা করিয়াছেন। সর্বপ্রথম নজরুল ইসলামই সমাজের সাধারণ বাঙ্গালি মুসলমানের ঘরে ব্যবহৃত পুঁথি সাহিত্যের ভাষাকে আপন সাহিত্যে স্থান দিয়াছেন। তবে তিনি পুঁথি সাহিত্যের জীর্ণ কঙ্কালটা বর্জন করিয়া তাহার প্রাণের উত্তাপটুকু সাহিত্যের আসরে লইয়া আসিয়াছিলেন। নজরুল এই সমাজের মানুষ ও তাহাদের ভাষা সম্পর্কে বিলক্ষণ অবগত ছিলেন। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন: ‘সমাজের যে অংশের মানুষের মধ্যে এই সাহিত্যের চল ছিল, সেই মানুষদের মানস জগত এবং মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি জানতেন। সর্বোপরি বোধবুদ্ধিতে পরিপক্কতা অর্জনের পূর্বে এই ধরনের সাহিত্যের প্রতি একটা অনপনেয় শ্রদ্ধাবোধ জন্মানোই হল আসল কথা।’ (ছফা ২০১১ঘ: ১০৫)

১৯৬৯ সালে আহমদ ছফা ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামক এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। উক্ত প্রবন্ধে তিনি কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলার সর্বশেষ সাহিত্যাদর্শ হিশাবে উল্লেখ করিয়াছিলেন। ছফার বিচারে বাংলার আর তিন সাহিত্যাদর্শ মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নজরুল ইসলাম চার সাহিত্যাদর্শের একজন হইয়া উঠিয়াছিলেন মূলত একদিকে বাংলা সাহিত্যে নতুন ভাবসম্পদ আনয়ন এবং অন্যদিকে মুসলমান সম্প্রদায়ের ভাষাহীন পরিচয় ঘুচাইয়া তাহাদের চিত্তে আত্মবিশ্বাস আনিয়া দিবার মধ্য দিয়া। আহমদ ছফার জবানে:

তাঁর একক চেষ্টায় মুসলিম সমাজের ভেতরে যে ভাবাবেগ তিনি জাগাতে পেরেছিলেন, যে আত্মবিশ্বাসের আগুন জ্বালিয়ে তুলতে সফল হয়েছিলেন সে ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে অন্য কোন মুসলিম চিন্তাশীল ব্যক্তির তুলনা হয় না। এই সমাজটিকে ভেতর থেকে বিকশিত করে তোলার জন্য একজন আত্মভোলা খেয়ালি, দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামরত কবির পক্ষে যতটুকু দায়িত্ব গ্রহণ করা উচিত ছিল, তার চাইতে অনেক গুরু দায়িত্ব তিনি পালন করে গেছেন। (ছফা ২০১১ঘ: ১০৯)

আহমদ ছফার জীবনভর সাধনার একটি ধারাও এই খাত বাহিয়া প্রবাহিত হইয়াছে। তবে একটু ভিন্নভাবে। বাঙ্গালি মুসলমান সমাজে আদরণীয় এইসব পুঁথি সাহিত্যের বিষয়বস্তু এবং অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ের নতুন সাহিত্যিকদের উপর এসবের প্রভাব বিশ্লেষণ করিয়া তিনি তাঁহার সমাজের মানুষের অজ্ঞানের উপর আলো ফেলিয়াছেন। তাঁহাদের চিন্তাপদ্ধতির বিশেষ ধারাটি ছফা উদ্ঘাটন করিয়াছেন:

বাঙালি মুসলমানের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষি ভিত্তিক কৌম সমাজের লোক। তাদের মানসিকতার মধ্যেও আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণ সমূহ সুপ্রকট। বার বার ধর্ম পরিবর্তন করার পরও বাইরের দিক ছাড়া তাদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন গিয়েছে, নতুন ভাবাদর্শ এ দেশে তরঙ্গ তুলেছে, নতুন রাজশক্তি এদেশে নতুন শাসন পদ্ধতি চালু করেছেন, কিন্তু তারা মনের দিক দিয়ে অশ্ব ক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতই বার বার বিচ্ছিন্ন থেকে গিয়েছেন। (ছফা ২০১১ঙ: ১০৪)

শুদ্ধ ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ নামক প্রবন্ধে নয়, তাঁহার অনেক লেখাতেই প্রসঙ্গটি ঘুরিয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। আহমদ ছফার দাবি, বাঙ্গালি মুসলমানের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেই বিষয়টি প্রতিভাত হইয়া উঠিবে। বিশ শতকের শেষপাদে আসিয়া বাঙ্গালি মুসলমানের মনের অবস্থা কি তাহা জানাইতেছেন আহমদ ছফা: ‘তার মনের  আদিম সংস্কারগুলো কাটেনি। সে কিছুই গ্রহণ করে না মনের গভীরে।… যেহেতু আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান এবং প্রসারমান যান্ত্রিক কৃৎকৌশল স্বাভাবিকভাবে বিকাশ লাভ করছে এবং একাংশ সুফলগুলোও ভোগ করছে ফলে তার অবস্থা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে ইঁচড়ে পাকা শিশুর মত। অনেক কিছুরই সে সংবাদ জানে, কিন্তু কোন কিছুকে চিন্তা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, মনীষা দিয়ে আপনার করতে জানে না।’ (ছফা ২০১১ঙ: ১০৭)

তিনি আরো বলিতেছেন: ‘বাঙালি মুসলমান বিমূর্তভাবে চিন্তা করতেই জানে না এবং জানে না এই কথাটি ঢেকে রাখার যাবতীয় প্রয়াসকে তার কৃষ্টি কালচার বলে পরিচিত করতে কুণ্ঠিত হয়না।’ (ছফা ২০১১ঙ: ১০৮) ইহার কারণ হিশাবে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন: ‘সুদীর্ঘ কাল ব্যাপি একটি ঐতিহাসিক পদ্ধতির দরুন তার মনের উপর একটি গাঢ় মায়াজাল বিস্তৃত রয়েছে, সজ্ঞানে তার বাইরে সে আসতে পারেনা।’ (ছফা ২০১১ঙ: ১০৮) আর ‘এই সামাজিক অধস্তন অবস্থাই,’ সলিমুল্লাহ খান ব্যাখ্যা করিতেছেন, যুগ যুগ ধরিয়া ‘বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক পদ্ধতি বা অচেতন জগৎ।’ (খান ২০১০: ৪৪)

আহমদ ছফা এই অবস্থা অতিক্রম করিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহার সারা জীবনের লক্ষ্য ছিল আপন সমাজের মানুষকে ন্যায়নীতির দিকে, বিজ্ঞানদৃষ্টির দিকে, মানবিকতার দিকে এবং অসাম্প্রদায়িকতার দিকে চালিত করা। তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন নিজের সমাজের মানুষের প্রতি নিবিড় ভালবাসা না থাকিলে এই কাজ অসম্ভব। বাঙ্গালি মুসলমানের সীমাবদ্ধতার নির্মম সমালোচনা তিনি করিয়াছেন সত্য, কিন্তু সেই সমালোচনায় আপন সমাজের প্রতি তাঁহার ভালবাসায় ছেদ পড়ে নাই। এই সমাজের জন্য তিনি সারাজীবন ভাবিয়াছেন, আর ভাবিয়াছেন এই সমাজের একজন হইয়াই। ভালবাসার চেহারাটা আমরা তাঁহার আপন জবানি হইতে ঠাহর করিতে যতœ করিব: ‘আমাদের পৃথিবীতে একটা জায়গা আছে কি না সেটা খুঁজে দেখার সময় এসে গেছে। আমাদের সকল লোকজন যারা রোজা রাখে, নামাজ পড়ে, পান খায়, থুথু ফেলে, রাস্তাঘাটে পায়খানা প্রস্রাব করে রাখে, ঝগড়াঝাঁটি করে এদের জীবনের মধ্যে কোন অমৃত আছে কি না এটা খোঁজ করার প্রয়োজন আছে। (ছফা ২০১৩ক: ৪১২) আহমদ ছফা যোগ করিয়াছেন, ইহাই তাঁহার কারবার: ‘ইট ইজ মাই বিজনেজ।’

2.3

এদিক দিয়া আহমদ ছফার স্থান নজরুল ইসলামের পরেই। কেহ কেহ হয়ত কাজী আব্দুল ওদুদ, আবুল হোসেন এবং আবুল ফজল প্রবর্তিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কথা বলিবেন। তাঁহারাও এই সমাজের জাড্য, পশ্চাদপদতা এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন চালনা করিয়াছিলেন। আমাদের সমাজে এই আন্দোলনের একটা প্রভাব নিশ্চয় পড়িয়াছে। স্বয়ং আহমদ ছফা এ কথা কবুল করিয়াছেন। কিন্তু ছফা যত গভীরভাবে সমস্যাটা অনুধাবন করিতে পারিয়াছেন তাঁহারা তেমন পারেন নাই। কেননা প্রশ্নটা শুদ্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্নতা কিংবা বিজ্ঞানদৃষ্টির অভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একটা উদাহরণ টানিলে বিষয়টি পরিষ্কার হইবে। শিখা গোষ্ঠীর অন্যতম কাজী আব্দুল ওদুদ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ে প্রবন্ধ লিখিয়াছেন। অনুরূপভাবে আহমদ ছফাও উপরোক্ত দুই সাহিত্যিকের কীর্তির বিচার করিয়াছেন। দুইয়ের তুলনা করিলেই ছফার বক্তব্যের সারবত্তা ও অন্তর্দৃষ্টি ধরা পড়িবে।

আধুনিক বাংলা সাহিত্য যে আমলে গড়িয়া উঠিয়াছে তাহার নাম ঔপনিবেশিক আমল। এই সমাজে সব সত্যের বড় সত্য ঔপনিবেশিক শক্তি ও উপনিবেশিত সমাজের মধ্যে প্রভু ও দাসের সম্পর্ক। আধুনিক বাংলা সাহিত্য তৈয়ার হইয়াছিল এই ব্যবস্থার গর্ভেই। উনিশ শতকে বাংলার সমাজে যে ভাবতরঙ্গ আসিয়াছিল তাহা কেবল একটা অংশের মধ্যেই সীমিত ছিল। ইহার প্রতিভূদের প্রত্যেকেই এই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার সুবিধাভোগী মধ্যশ্রেণি হইতে আগত। বুর্জোয়াশ্রেণির ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে আমরা নানান জায়গায় শুনিয়াছি। কিন্তু উপনিবেশিত সমাজের বুর্জোয়াশ্রেণির ক্ষেত্রে অবস্থাটা ভিন্ন রকম। জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম চিন্তাবিদ ফ্রানৎস ফানোঁ এই সম্পর্কে বলিয়াছেন, ‘পরাধীন দেশের জাতীয় বুর্জোয়া আপন জন্মলগ্নেই পশ্চিমা বুর্জোয়ার অবক্ষয়দশার কাতারবন্দি হইতে চাহে। এই বাসনায় তাহারা একলাফে আগাইয়া গেল এমন ভাবিবার জো নাই। আসলে তাহারা শুরুই করিল অন্তিমদশা হইতে।’১

বুর্জোয়া মতাদর্শের এই অবক্ষয়দশার আরম্ভ হইয়াছিল বুর্জোয়াশ্রেণি কর্তৃক রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করিবার পর। ততদিনে বুর্জোয়া ও সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রাম ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে হাজির হইয়াছে। এই সময়ে আসিয়া বুর্জোয়াদের আর সর্বজনের কথা বলিয়া পূর্বতন সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করিতে হইতেছে না। এশিয়া আফ্রিকার দেশে দেশে উপনিবেশ স্থাপিত হইয়াছে। আরো নতুন নতুন জায়গার উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে। কার্ল মার্কস স্মর্তব্য: ‘এই তত্ত্ব সত্য না ঐ তত্ত্ব সত্য তাহা শুধিবার দিন তখন শেষ হইয়াছে। প্রশ্নটা দাঁড়াইল ইহা পুঁজির উপকারে আসে না হানিকর হয়, ইহাতে পুঁজির সুবিধা হইবে নাকি হইবে না। স্বার্থশূন্য তত্ত্বজিজ্ঞাসুর জায়গায় জুড়িয়া বসিল ভাড়াটিয়া মল্লযোদ্ধার দল। খাঁটি বিজ্ঞানসাধনার স্থলে হাজির হইল ভেজাল বুদ্ধির মতলবপ্রসূত সাফাইবাজি।’২

সেই জমানায় যেসকল নতুন চিন্তা হাজির হইয়াছিল তাহার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় চিন্তাটি ‘উপযোগবাদ’ বলিয়া পরিচিত। এই ধারার প্রধান চিন্তানায়ক জেরেমি বেন্থাম ও জন স্টুয়ার্ট মিল। বেন্থাম প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস বলিয়াছেন: ‘তাঁহার শুষ্ক অর্বাচীন চক্ষুতে আধুনিক দোকানদার, বিশেষ ইংরাজ দোকানদারকেই মনুষ্যের সাধারণ বা স্বাভাবিক রূপ বলিয়া ভ্রম হয়।… যদি বন্ধুবর হাইনরিশ হাইনের মত সাহস সঞ্চয় করিতে পারিতাম তো জেরেমিজিকে বুর্জোয়া আহাম্মকির প্রবাদপুরুষ বলিয়া ডাকিতে কসুর করিতাম না।’৩

2.5মার্কস-কথিত এইসকল মনীষী সমাজের প্রধান দ্বন্দ্বকে এড়াইয়া গিয়াছেন। তাঁহারা আপন আপন সমাজের প্রেক্ষিতে সমাজের অভ্যন্তরের প্রধান দ্বন্দ্ব-সংঘাত অর্থাৎ শ্রম ও মজুরির তীব্রতর সংঘাত শনাক্ত করিতে পারেন নাই। উনিশ শতকের বাংলায় মিল, বেন্থাম, কোঁৎ খাইয়া মানুষ হওয়া বাঙ্গালি মনীষীগণের বেলায়ও কি একই কথা খাটে না? ঔপনিবেশিক সমাজের সংঘাতের মৌল পদ্ধতিটা তাঁহাদের অধরাই থাকিয়া গিয়াছে। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার বর্ণবাদী শাসন-শোষণের কবলে পড়িয়া তাঁহারা নিজেদের গৌরবময় অতীত আবিষ্কার করিতে বদ্ধপরিকর হইয়াছিলেন। কিন্তু সমাজের নিম্নস্তরের অধিকাংশ গরিব দুঃখী মানুষের জীবনের প্রধান চাহিদা গড়িতে পারেন নাই, ফলশ্রুতিতে তাঁহাদের সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড সমাজ অভ্যন্তরে খুব একটা রেখাপাত করে নাই। গরিব কৃষক বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের ভিত্তিতে যে ধরনের সমাজের রূপকল্প সামনে রাখিয়া বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালনার দরকার ছিল বাংলার কোন মনীষী সেই কাজ করিয়া উঠিতে পারেন নাই। অধিকাংশের কোন রাষ্ট্রচিন্তাই ছিল না। অতীত ভারতে হিন্দু শাসনের স্বপ্নে বিভোর হইয়া তাঁহারা সমাজের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দিয়াছেন। ছফা মনে করিতেন বঙ্কিমচন্দ্র ও ভূদেব মুখোপাধ্যায় দুইজন ব্যতিক্রমী মনীষী যাঁহাদের মনে রাষ্ট্রচিন্তার উদয় হইয়াছিল। ইহার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রই হিন্দু মধ্যবিত্তের সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রকাঠামো হাজির করিতে পারিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার নির্মিত জাতীয়তার আদর্শ ছিল খণ্ডিত। ইতিহাসকে তিনি ভাবাবেগের যুক্তিতে প্রবাহিত করিয়া দিয়াছিলেন।

ঠিক এই কারণেই আহমদ ছফা বঙ্কিমকে ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ ও উপমহাদেশে একটা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র তৈয়ার করিবার পরিকল্পনার প্রধান পুরোহিত হিশাবে চিহ্নিত করিয়াছেন। তাঁহার ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: শতবর্ষের ফেরারী’ নামধেয় প্রবন্ধে তিনি এই রায় দিয়াছেন। আমরা মনে করি তাহা যথার্থ। এইখানে বলা হয়তো বাহুল্য হইবে না, অনেকেই বাংলার আরেক সাহিত্যাদর্শ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এইসকল অভিযোগ হইতে মুক্ত মনে করিতে পারেন। আহমদ ছফা নিজেও অনেকটা তেমন মনে করিতেন। তাঁহার মতে, ‘বঙ্কিম সানন্দে যে অন্ধকার ছড়িয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত একজন ব্যক্তিত্বের জীবনভর সংগ্রাম তা দূর করতে পারেনি পুরোপুরি।’ (ছফা ২০১২খ: ২০৯) এই রকম মনে হইবার নানান কারণ বর্তমান। অস্বীকার করিবার জো নাই, সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ একধরনের প্রতিবাদ জারি রাখিয়াছিলেন। পারিপার্শ্বিকতা হইতে মুক্ত হইয়া সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠিয়া থাকিবার একটা প্রবণতা তাঁহার ছিল। যেমনটা আহমদ ছফা গ্যেটে সম্পর্কে বলিয়াছেন: ‘সমাজ সংসার থেকে অনেকটা দূরে অবস্থান করে প্রবহমানতার সূত্রসমূহের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন।’ (ছফা ২০১১খ: ১২০) কিন্তু গৌড়জন সমীপে আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসা ঠাকুর কি হিন্দুত্ববাদী চিন্তার ঘেরাটোপ হইতে আদৌ মুক্ত হইতে পারিয়াছিলেন?

2.4

১৯৭১ সালে এই অঞ্চলে যে বাংলাদেশ নামক একটা স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হইয়াছিল তাহার তাৎপর্য আহমদ ছফা যথার্থ বুঝিতে পারিয়াছিলেন। এই কারণেই তাঁহাকে পূর্ববর্তী সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের চিন্তার একটা বিচার করিতে হইয়াছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো চূর্ণ করিয়া বাংলাদেশ জন্মগ্রহণ করিয়াছে। আহমদ ছফা একাত্তরের সেই মহাসিন্ধুর কল্লোল কান পাতিয়া শুনিয়াছিলেন। আর শুনিয়াছিলেন বলিয়াই উনিশ শতকের মনীষীদের অনেক গুণের অনুরাগী হইয়াও তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন, ‘উনিশ শতকের অনেক অমৃতই বর্তমানে গরলে পরিণত হইয়াছে।’

আমরা বলিব বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রধান ব্যাখ্যাকার হিশাবে আহমদ ছফা পূর্বের ধারাবাহিকতা ছাড়াইয়া এক নতুন ও অভিনব অবস্থানে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন। এই প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খানের মন্তব্য উল্লেখযোগ্য: আহমদ ছফা জাতীয় সাহিত্যের মূল হইতে আসিয়াছিলেন এবং সেখানেই ফিরিয়া গিয়াছেন। আমাদের জাতীয় সাহিত্য হইতে তাঁহাকে আলাদা করা যাইবে না।

১৯৭১ সনের অভিজ্ঞতা আমাদের জাতীয় সাহিত্যের সংজ্ঞা সামান্য বড় করিয়াছে। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয় সাহিত্য বলিতে যাহা বুঝাইতেন আজ আমরা ঠিক তাহা বুঝি না, একটু অতিরিক্ত বুঝিয়া থাকি। ইহার নাম ১৯৭১।

… এই অধিকই আহমদ ছফার মধ্যে বিশেষ হইয়াছে। (খান ২০১০: ১৮)

১৯৭১ সালে এদেশের মানুষ পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল। এই রকম ব্যাপক জনযুদ্ধ অত্র অঞ্চলে ইহার পূর্বে আর ঘটে নাই। অন্য অনেক মানুষের মত তিনিও যুদ্ধের সময় কলিকাতা শহরে আশ্রয় লইয়াছিলেন। বন্দুক হাতে সামনা সামনি জঙ্গ না লড়িলেও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়া প্রবাহিত হইয়াছিলেন তিনি। তাঁহারই বুকে ‘একাত্তর সালের মর্মবাণী মোহন সুন্দর বজ্রনিনাদে’ বাজিয়াছিল। ‘জাতির যে জাগরণ যে প্রতিরোধ, যে দৃঢ় সংকল্প, মৃত্যুর যে সরল প্রস্তুতি, জয়ের যে নেশা, যে আত্মত্যাগ, যে বোকামি এবং উন্মাদনা’ তিনি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন তাহা হৃদয় দিয়া তিনি ধারণ করিয়াছিলেন। ইহারই ফলে মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য, জটিলতা ও ব্যাঞ্জনা তিনি ধরিতে পারিয়াছেন। মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত আহমদ ছফার সিন্ধান্ত যাহারা মুক্তির সংগ্রামকে গৃহযুদ্ধ আখ্যা দিয়া মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করিয়াছিল তাহাদের হইতে সম্পূর্ণ পৃথক, ইহা তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু ইহা বলা হয়তো বাহুল্য হইবে না যে একাত্তর সালে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগের ব্যাখ্যা হইতেও তাঁহার বিচার আগাগোড়া আলাদা। আমরা বলিব, তাঁহার ব্যাখ্যাই মুক্তিযুদ্ধের ঘোরতর বিচার।

আহমদ ছফার মতে বাংলাদেশ যে এমন একটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের সামনে হাজির হইবে তাহা পূর্ব হইতে কেহই অনুধাবন করিতে পারে নাই। পৃথিবীর আর আর দেশে যেমন মুক্তিসংগ্রামের পূর্বপ্রস্তুতি থাকে একাত্তর সালে আমাদের দেশে তেমন কোন পূর্বপ্রস্তুতিই ছিল না। এই কথা কাহারও অবিদিত নহে। আওয়ামী লীগ নামক জাতীয় মধ্যশ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী যে দলটি একাত্তর সালের অব্যবহিত পূর্বে নেতৃত্বের জায়গায় আসীন হয় তাহারা একেবারে চূড়ান্ত মুহূর্তেও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা ও কাপুরুষতার পরিচয় দিয়াছিল। আহমদ ছফার ভাষায়: ‘আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসই করতে পারেননি যে তাঁরা সত্যি সত্যি পাকিস্তানি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন। তাঁদের দৃষ্টি যদি পূর্ব থেকে স্বচ্ছ থাকত তাহলে সে সম্পর্কে পূর্ব প্রস্তুতি তাঁরা গ্রহণ করতেন।’ (ছফা ২০১৩খ: ২৪৪)

এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মত বড় ঘটনার পরও দেখা যায় মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই মধ্যশ্রেণি ও বুদ্ধিজীবীদের ভিতর সেই আন্দোলনের উত্তাপ কমিয়া আসিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ‘গণসাহিত্য প্রসঙ্গে’ নামক এক লেখায় ছফা লিখিতেছেন: ‘একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তবীজ থেকে যে অঙ্কুর গজিয়ে উঠেছিল আমাদের সাহিত্যে, অনাদর অবহেলা উপেক্ষার খরায় তা কেমন করে শুকিয়ে গেল সমগ্র পূর্ব বাংলার সংস্কৃতির জন্য সে এক বেদনা মথিত দুঃসংবাদ।” (ছফা ২০১১ক: ৪৫-৪৬)

একাত্তর সালের প্রেক্ষিতেও তিনি একই ঘটনা লক্ষ্য করিয়াছেন। চূড়ান্ত মুহূর্তে সশস্ত্র বর্বর বাহিনীর সামনে জনগণকে বলির পাঁঠার মত দাঁড়াইয়া যাইতে হইল। অথচ কোন লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী তাহা পূর্ব হইতে আঁচ করিতে পারেন নাই। ঔপনিবেশিক সমাজের গর্ভে গজাইয়া ওঠা জাতীয় মধ্যশ্রেণি সর্বত্র এই রকম অবস্থায় আসিয়া দাঁড়ায়। অত্র ফ্রানৎস ফানোঁর একটি উক্তি অপ্রাসঙ্গিক হইবে না। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে যেমন আহমদ ছফা আলজেরিয়ার সংগ্রামে তেমনি ফ্রানৎস ফানোঁ। মহাত্মা ছফা এই মনীষীর লেখা গভীর অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিতেন এবং তাঁহার ছাত্রদেরও পাঠ করিতে বলিতেন। ফানোঁ ফরমাইয়াছেন, ‘মুক্তিসংগ্রামের বেলায় শিক্ষিত শ্রেণির দশা, জনগণের সহিত তাহাদের কাজের সম্পর্কের অভাব, তাহাদের নিরতিশয় আলস্য আর বলিতে বাধা নাই লড়াইয়ের ক্রান্তিলগ্নে তাহাদের কাপুরুষতা বহু মর্মান্তিক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়া থাকে।’৪

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃশ্রেণির এমত কাপুরুষতা সত্যসত্যই জাতির জীবনে গভীর সংকট ডাকিয়া আনিয়াছিল। কোটি কোটি নিরস্ত্র অসহায় মানুষকে একটি বর্বর সেনাবাহিনীর মুখোমুখি বলির পাঠার মত দাঁড়াইতে হইয়াছিল। তাহার চাইতেও বড় কথা বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম ভারতের শাসকশ্রেণির যুদ্ধে পরিণত হইয়াছিল। আহমদ ছফার ভাষায়: ‘খুনি জল্লাদ ইয়াহিয়া বাহিনীর হাতে মারের পর মার খেয়ে উলঙ্গ অসহায়, রিক্ত অবস্থায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।’ (ছফা ২০১৩গ: ১৫৪)

আহমদ ছফা ইহার কারণও খুঁজিয়া পাইয়াছেন। পাইয়াছেন আওয়ামী লীগের শ্রেণিচরিত্রের মধ্যে:

বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রাম যে ভারতের নিজস্ব যুদ্ধে পরিণত হল তার পেছনে যে কারণটি সক্রিয় তা হল শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন মধ্যশ্রেণিভুক্ত আওয়ামী লীগের শ্রেণিচরিত্র। বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলধিতল মন্থিত করে নতুন ভূখণ্ড জেগে উঠার মত প্রতিরোধের প্রবল আকাক্সক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিচের দিকের স্থল সমূহ ঠেলে উপরের দিকে উঠে এসেছে। এই জাগরিত জনসংখ্যা এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা দর্শন করে শেখ মুজিব আশান্বিত হওয়ার চাইতে অধিক আতঙ্কিতই হয়েছিলেন। (ছফা ২০১৩গ: ১৫৩)

শ্রেণিগত কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই এই জাগরিত জনতাকে কোন পথে চালিত করিবেন। গণআন্দোলনের প্রবল তোড়ে একদিকে যেমন তাহাদের পিছনে হটিবার উপায় ছিল না অন্যদিকে সামনে আগাইয়া যাইবার সাহসও তাহাদের ছিল না। বস্তুত আওয়ামী লীগ ছিল মধ্যশ্রেণিভুক্তদের একটি দল। ১৯৬৬ সালে এই দলের পক্ষ হইতে ছয়দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। ইহার পূর্বে তাহারা কস্মিনকালেও স্বায়ত্তশাসনের দাবির কথা পাড়ে নাই। ১৯৬৭ সালের পর হইতে কম্যুনিস্ট পার্টি ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি মস্কো পিকিং প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত হইয়া নজিরবিহীন অঞ্চলবহির্ভূত আনুগত্যের সূচনা করে। এই দলগুলি তখন দেশের ভিতরকার ঘটনার সহিত জড়াইয়া না থাকিয়া আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন মতাদর্শিক বিভেদে বেশি করিয়া জড়াইয়া পড়ে। এই সময়ে জনগণের মধ্যে ছয়দফা দাবির গ্রহণযোগ্যতা প্রকট হইয়া ওঠে। বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগ সেই সময়েই ছয়দফার দাবি উত্থাপন করিয়াছিল যখন ইতিমধ্যে বাঙ্গালি জনগণের মধ্যে একটি মধ্যবিত্তশ্রেণি দুধের সরের মত ভাসিয়া উঠিয়াছিল। ইহার বাহিরে ছাত্রদের ১১ দফার মত অধিকতর প্রতিগতিশীল দাবিদাওয়া ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করিয়াছিল। কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন ও পেশাজীবীদের বিভিন্ন আন্দোলন তো ছিলই।

এই সমস্ত আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ হিশাবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। জনগণ শেখ মুজিবকে কারাগার হইতে মুক্ত করিয়া আনে। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। একাত্তর সালের মার্চ মাসের পূর্বেই আওয়ামী লীগ পুরামাত্রায় নেতৃত্বের আসনে আসীন ছিল। জনমানসে তখন স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা টগবগ করিয়া ফুটিতেছিল। লোকলোচনে যেন একটি গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত এবং ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গোচরিভূত হইয়া উঠিতেছিল। আহমদ ছফা সেই সময়ের জনমানসের চিত্র অঙ্কন করিতে গিয়া বলিয়াছেন,

ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে ঢাকা উত্তাল মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়, রাস্তাগুলো যেন নদী — মানুষ জলের ধারার মত ছুটে ছুটে আসছে, কণ্ঠে গণগণে উত্তাপ, বুকে জ্বালা হাতে লাঠি, মিছিলে মিছিলে নগরী সয়লাব। লক্ষ কণ্ঠের সম্মিলিত তুর্যধ্বনি আকাশের নীল খিলানে গিয়ে আঘাত করছে। গর্ভের বাচ্চা পর্যন্ত মায়ের পেটে কান পেতে এ অমোঘ বজ্রনিনাদের আহ্বান শুনছে। কবরের পূর্ব পুরুষেরা অতীতের মোহনিদ্রা ভেঙ্গে যেন পাশ ফিরে জেগে উঠছে। আমাদের জীবনে জেগে উঠার, জাগিয়ে তোলার মাহেন্দ্রলগ্ন সেই একবারই এসেছিল। (ছফা ২০১২ক: ১৬৯-১৭০)

কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ‘আর দাবায়া রাখবার পারবা না’ বলিয়াই ক্ষান্ত দিয়াছিলেন। ইহার বাহিরে কোন কার্যকর পন্থা গ্রহণ করিবার ক্ষমতা তাঁহার ছিল না। আগে থাকিতেই যদি কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইত, দেশের অভ্যন্তরে যদি প্রতিরোধের প্রস্তুতি থাকিত তাহা হইলে  আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে এই ভাবে পায়ে পায়ে হাঁটিয়া ভারতে যাইয়া আশ্রয় ভিক্ষা করিতে হইত না। মুক্তির সংগ্রামরত সবদেশই অপরদেশের সাহায্য লইয়া থাকে। কিন্তু কোন রকম প্রস্তুতি ছিল না বলিয়া চূড়ান্ত মুহূর্তে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারতের উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়ে। ইহাতে মুক্তিসংগ্রামের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলাইয়া যায়। আহমদ ছফা উপমহাদেশের ইতিহাস, বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সম্পর্কের জটিলতা অন্তর্গতভাবে বুঝিতেন। তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন এইভাবে ভারতের সহায়তায় স্বাধীনতা অর্জনের মূল্য বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন যাবৎ দিয়া যাইতে হইবে।

বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামকে কাজে লাগাইয়া ভারত তাহার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সংঘাতকে আপাত অর্থে ছাইচাপা দিতে পারিয়াছিল। ভারতের রাজনীতিতেও তখন ঘোর ঝঞ্ঝা। শাসকশ্রেণির জন্য তখন ঘোর দুর্দিন। এই সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাহাদের তুরুপের তাসে পরিণত হয়। কিন্তু একই সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করা দরকার। ইহা আবিষ্কারক খোদ আহমদ ছফা। তিনি বলিয়াছেন: ‘ঐতিহাসিকভাবে ভারত উপমহাদেশের সমস্ত অঞ্চল দীর্ঘকাল একসঙ্গে অবস্থান করার কারণে রাষ্ট্রীয় সীমানা আলাদা হওয়া সত্ত্বেও একের প্রভাব অন্যের উপর পড়তে বাধ্য। … ভারত বহুভাষিক, বহুজাতিক দেশ। বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম সেই সত্যকে আরো প্রোজ্জ্বল এবং আরো বাস্তবভাবে তুলে ধরেছে।’ (ছফা ২০১৩গ: ১৫২)

আমাদের মুক্তির সংগ্রামের ভিতর এই তাৎপর্য নিহিত ছিল বলিয়াই ভারত চাহিয়াছিল যুদ্ধটা অতি দ্রুত শেষ হইয়া যাক। যুদ্ধের নেতৃত্বটাও যাহাতে আওয়ামী লীগের মত একটি মধ্যশ্রেণির দলের হাতে অটুট থাকে সেই ব্যাপারে তাহারা হুঁশিয়ার ছিল। ইতিমধ্যে দেশের অভ্যন্তরে জনগণ তাহাদের মত করিয়া হাতের কাছে যাহা পাইয়াছে তাহা লইয়াই প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করিয়াছিল। এই যুদ্ধ যদি আরো ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহা হইলে পরিস্থিতি ভিন্নদিকে মোড় লইবে। আওয়ামী লীগ উনিশশ সত্তরের নির্বাচনের পর যে নেতৃত্বের দণ্ড হাতে পাইয়াছে তাহা হইতে বঞ্চিত হইবে। এমনকি এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় অনুরূপ যুদ্ধের সূচনা ভারত রাষ্ট্রের অন্তর্গত জাতিসমূহ শুরু করিয়া দিতে পারে। কেননা ভারতের তথাকথিত এক জাতীয়তার কংস-কারায় তখন অনেক জাতি শাসরুদ্ধ হইয়া ত্রাহি ত্রাহি রব করিতেছিল। আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, ত্রিপুরা এই সমস্ত পূর্ব ভারতীয় রাজ্যে তখন জাতীয় মুক্তির আন্দোলন গতি লাভ করিয়াছিল। ফলে ভারতের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ন্ত্রণে রাখিয়া যত দ্রুত সম্ভব একটা রফায় যাওয়া। আবার ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত যে সকল মুক্তিযোদ্ধা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করিবার জন্য আসিত ভারত সরকার তাহাদের হাতে ভারী অস্ত্রসস্ত্র তুলিয়া দিতে ভয় পাইত। দেশের অভ্যন্তরে যাহারা স্বাধীনভাবে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিয়াছিল তাহাদের সহিত ভারতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটিয়াছে কিছু ক্ষেত্রে। ভারত এবং আওয়ামী লীগ সরকার উভয়েই সাবধানতা অবলম্বন করিত। তাহারা কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের অনুগত লোকজনকেই যুদ্ধ করিবার জন্য বাছিয়া লইত। যদি সত্য সত্যই এই অঞ্চলে একটি দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ শুরু হইয়া যায় তাহা হইলে ভারতের পক্ষে যুগপৎ আম এবং ছালা উভয়ই হারাইবার সম্ভাবনা ছিল। পৃথিবীর গণসংগ্রামের ইতিহাসে যুদ্ধ দীর্ঘ হইবার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের নেতৃত্বের গুণগত রূপান্তরের নজির নিতান্ত অল্প নহে। ইহা ভারতের অজ্ঞাত ছিল না।

তাহার পরও বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে। ভারত, চীন, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেহই চাহে নাই এই অঞ্চলে একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটুক। এই স্বাধীনতা বাংলাদেশের মানুষকে আপন রক্ত ঝরাইয়া অর্জন করিতে হইয়াছে। অনেক অপমান, অনেক দুর্ভোগ, অনেক নির্যাতন তাহাদের সহিতে হইয়াছে। দুনিয়ার আর আর যে দেশ মুক্তিযুদ্ধ করিয়া স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে সেই দেশের সহিত বাংলাদেশের তফাত এই যে কোন মনীষী কোন দল কিংবা কোন নেতার সুচিন্তিত চিন্তার রূপায়ন হিশাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে নাই। মুক্তিযুদ্ধ সূচনার প্রাক্কালে নেতৃশ্রেণির মধ্যে যে কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি তাহা এই বিষয়টিরই সম্প্রসারিতরূপ। আহমদ ছফা বলিতেছেন: ‘মনীষা ও প্রজ্ঞার বলে সচেতন বুদ্ধি খাটিয়ে ঐতিহাসিক অন্তর্দৃষ্টির নিরিখে এই জাতিসত্তার অস্থিত্ব কেউ আবিষ্কার করেনি। বাংলাদেশ বর্তমানে যে কঠিন সংকটে নিপতিত, তাও মূল জাতিসত্তা চিনতে না পারারই সংকট।’ (ছফা ২০১৩খ: ২৪২)

সেই বিচারে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব এই দেশের যুগ যুগ ধরিয়া নির্যাতিত জনগণেরই প্রাপ্য। ইতিহাসে বিভিন্ন যুুগে এই জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে লড়াই সংগ্রাম করিয়া আসিয়াছে। ব্রিটিশ শাসনামলের একটি পর্যায়ে আসিয়া বাংলার এই অংশের মানুষের সংগ্রাম মুসলিম জাতীয়তার ছদ্মবেশ ধারণ করিয়াছিল। একমাত্র পাকিস্তান পর্বে আসিয়াই তাহা জাতিগত খাতে প্রবাহিত হয়। ব্রিটিশ পর্বে বাংলা ও ভারতবর্ষের উপনিবেশবিরোধী সংগ্রাম এই ধারায় নানা সংকটের কারণে প্রবাহিত হইতে পারে নাই। একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ যেন আবার নতুন করিয়া সেই জাতিগত খাতে লড়াই শুরু করিবার নজির স্থাপন করিল। আহমদ ছফাই প্রথম আমাদের মুক্তিসংগ্রামের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্য আবিষ্কার করিতে পারিয়াছিলেন। ১৯৭১ সালের পূর্বে আমরা যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ ছিলাম সেই রাষ্ট্রটি ব্রিটিশ ভারত হইতে আলাদা হইয়াছিল স্বতন্ত্র মুসলিম জাতিসত্তার দাবিতে। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বও দাবি করিয়াছিল জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত ভারতি মিলিয়া এক জাতি। অনেকেই বলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জিন্নাহ কথিত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভ্রান্তি প্রমাণ করিয়াছে। আহমদ ছফাও কবুল করিয়াছেন এই দাবি সত্য। কিন্তু তিনি যোগ করিয়াছেন, শুদ্ধ ঐটুকু বলিলেই সত্য পুরাটা প্রকাশিত হয় না। এই সত্যের ভিতর আরো এক সত্য লুকাইয়া রহিয়াছে। ইহা আহমদ ছফার আবিষ্কার। তিনি দাবি করিয়াছেন বাংলাদেশ সৃষ্টি হইবার মধ্য দিয়া দ্বিজাতি তত্ত্ব যেমন ভুল প্রমাণিত হইয়াছে তেমনি সমান ভুল প্রমাণিত হইয়াছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস কথিত এক ভারতীয় জাতির তত্ত্ব। ছফা বলিতেছেন ভারত বহু ভাষা বহু ধর্ম বহু বর্ণ বহু জাতির দেশ। ‘ভারত একটি দেশ নয়, অনেকগুলি দেশের পাশাপাশি সমাহার।’

বাংলাদেশের জাতীয়তার এই প্রেক্ষিতটি সাধারণত আওয়ামী লীগ স্বীকার করে না। তাহারা বরং জাতীয়তার অতীতমুখী প্রেক্ষিতটাকে সানন্দে বরণ করিয়া লয়। এই জায়গাতেই আহমদ ছফার সাথে শাসকশ্রেণি প্রচারিত মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যার বিরোধ। আহমদ ছফা জাতীয়তার যে ধারণা চিহ্নিত করিতে পারিয়াছেন তাহা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মর্মবেগকে ধারণ করিতে সক্ষম। জাতীয়তার এই ধারণার মুখ ভবিষ্যতের দিকে। এই জাতীয়তার বোধ নতুন সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের যে দায়িত্ব কাঁধে চাপাইয়া দেয় তাহা বহন করিবার মত শক্তি ও সাহস উপনিবেশের গর্ভে গজাইয়া ওঠা একটা মধ্যশ্রেণির কখনই থাকে না। এই জায়গায় আসিয়াই আহমদ ছফা সবকিছুকে ছাপাইয়া অভিনব সম্ভাবনা সম্পন্ন সময়ের স্রষ্টা হইতে চাহিয়াছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে আহমদ ছফাকে জাতীয় সাহিত্যের পূর্বতন ধারাবাহিকতা হইতে আলাদা করিয়াছে ইহার চিহ্ন জাতীয়তার এই নবতর বোধের গভীরেই প্রোথিত।

আহমদ ছফার বিচারে ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির নিরিখে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পলাশী যুদ্ধের চাইতেও অধিক তাৎপর্যময়। তাঁহার ধারণা এই মুক্তিযুদ্ধ দিয়া উপমহাদেশের রাজনীতি এক নতুন কক্ষপথে প্রবেশ করিয়াছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয় উপমহাদেশের অন্যান্য জাতির সামনে একটি ভাষাভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের নজির যেমন স্থাপন করিয়াছে তেমনি এই দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালি মুসলমানের সঙ্গে অন্যান্য জাতি ও ধর্মসম্প্রদায়ের সম্পর্ককে একটা নতুন বোঝাপড়ার জায়গায় আনিয়া হাজির করিয়াছে। নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত সংগ্রামের মধ্য দিয়া একটা নতুন সমাজ সৃজনের বাস্তবতাকে সামনে আনিয়াছে।

2.7অনেকে হয়তো বলিবেন বাংলাদেশের বাইরে অন্যান্য জাতিসত্তা তো দিব্যি টিকিয়া আছে। ভারতের অভ্যন্তরস্থ বিভিন্ন ভাষাভিত্তিক জাতি তো ভারতকে মানিয়াই লইয়াছে। এমনকি কাশ্মিরসহ বাংলাদেশের উত্তর পূর্বে অবস্থিত জাতিসমূহের লড়াই বর্তমান সময়ে আসিয়া অনেকটা স্তিমিত মনে হইবে। কিন্তু ভারতীয় বৃহৎপুঁজির অধীনে হিন্দি ভাষার দাপটে তাহাদের আত্মা কি গুমরিয়া মরিতেছে না? ১৯৪৭ সালে বাংলার জনগণের শিক্ষিত ও অগ্রসর যে অংশটা বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তার অধীনে বিলীন হইয়াছিল পশ্চিমবঙ্গে তাহাদের আজ কি অবস্থা? স্মর্তব্য অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক:

… সেখানে ইট বা চুন বালি থাকলেও একটা স্থাপত্য গড়ে উঠতে পারে এমন কোন নকশা নেই। কোন বঙ্কিম, কোন দ্বিজেন্দ্রলাল কিংবা কোন রবীন্দ্রনাথ যে আবার বলে উঠবেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী’ … তা এখন আর সম্ভব বলে মনে হয় না। মনে হয়, ভারতের জীবন ও সভ্যতার মূল স্রোত থেকে দূরে বাংলায় আলাদা ধারা সৃষ্টির জন্য যদুনাথের পাণ্ডিত্যপূর্ণ আহ্বানের কোন শ্রোতা পশ্চিমবঙ্গে এখন আর নেই। পশ্চিম বাংলা হচ্ছে সর্বভারতীয় সভ্যতার কুহক মায়াবিনী হাতছানির শিকার। হয়ত ইচ্ছুক শিকার। (রাজ্জাক ২০১০: ৪৩-৪৪)

বাংলাদেশের সংকটও কম গুরুতর নহে। তবে তাহার প্রকৃতি ভিন্ন। আহমদ ছফা বুঝিয়াছিলেন বাংলাদেশকে নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখিতে হইবে। শুধু বজায় রাখিলেই চলিবে না, আশেপাশের অন্যান্য জাতির ও বাঙ্গালি জনগোষ্ঠীর সম্মুখে দিকনির্দেশনার কেন্দ্র হইয়া তাহাদের আশা ভরসাও অনেকখানি ধারণ করিতে হইবে।

দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র কায়েম হইল। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রাণরসে সিক্ত হইয়া যে নতুন জাতিরাষ্ট্র কুঁড়ি মেলিল পত্র পুষ্প পল্লবে তাহা কি করিয়া বিকশিত হইবে? এই প্রশ্ন মাথায় রাখিয়া ছফা জীবনভর চিন্তা করিয়াছেন। বাংলাদেশকে টিকিয়া থাকিবার জন্য একটি উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক ভিত্তি যেমন অতি দ্রুত গড়িয়া তুলিবার দরকার তেমনি দরকার নতুন সংস্কৃতির দিকনির্দেশনার। এসকল শর্ত পূরণ করিবার মধ্য দিয়াই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে সত্যের ইশারা করিয়াছে এবং ছাত্র কৃষক শ্রমিক জনতা যে লক্ষ্যে অকুতোভয় হইয়া লড়াইয়ে ঝাপাইয়া পড়িয়াছিল তাহার প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ শুরু হইবে। বলা হয়তো বাহুল্য নহে, সমাজে সংস্কৃতি বলিতে যে ধারণাটি চালু আছে ছফা তাহার বাহিরে ভাবিতে অভ্যস্ত ছিলেন: ‘জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য বিষয়গুলোর চর্চা যেহেতু এখনো আদিম পর্যায়ে রয়ে গেছে, তাই সাধারণ্যে একটি ধারণা জন্মে গেছে। তারা সংস্কৃতি বলতে মনে করতে আরম্ভ করেছেন কটি কবিতা, কটি গল্প, উপন্যাস, ভাওয়াইয়া গান, নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত। জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়গুলোর স্থান আমাদের সংস্কৃতিতে নেই।’ (ছফা ২০০৮: ২১২)

2.6

সংস্কৃতি বলিতে আহমদ ছফা আরো গভীর ও ব্যাপক কিছু — যাহা জাতির মর্মমূল স্পর্শ করিয়া বিশ্ব মানবের সহিত মানুষকে একত্র করিয়া দেয় এমন কিছু — বুঝিতেন। তাহার সংস্কৃতি ভাবনা অনেকটা আন্তনিয়ো গ্রামসির মতন। গ্রামসি মনে করিতেন,

প্রকৃত সংস্কৃতি একদমই অন্যরকম এক ব্যাপার। সংস্কৃতি হল নিজের ভেতরের আত্মাকে সংগঠিত করা, তাতে শৃঙ্খলা আনা। সংস্কৃতি হল নিজের ব্যক্তিসত্তার সাথে বোঝাপড়া করা। সংস্কৃতি হল এক উচ্চতর চৈতন্য লাভ যা দিয়ে মানুষ নিজের ঐতিহাসিক মূল্য বুঝবে, জীবনে নিজের কাজটা চিনবে, নিজের অধিকার ও কর্তব্য শনাক্ত করতে পারবে। এর কোনটাই স্বতঃস্ফূর্ত বা আপনা আপনি হয়ে ওঠে না। এমন নয় যে নিজের ইচ্ছা হোক আর না হোক কতগুলো ক্রিয়া বিক্রিয়া আপনা আপনি ঘটে যাবে আর মানুষ সংস্কৃতি লাভ করে ফেলবে। (গ্রামসি ২০১৩: ১৪)

বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে যে সম্ভাবনা লইয়া হাজির হইয়াছিল তাহাকে বাস্তবে রূপ দিবার জন্য প্রয়োজন একটি সমাজ বিপ্লব। ‘… প্রতিটা বিপ্লবের পেছনে বিচার ও পর্যালোচনার এক কঠোর পরিশ্রমী পর্যায় থাকে, যখন সংস্কৃতি ও চিন্তা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে যায়’। (গ্রামসি ২০১৩: ১৪) গ্রামসির মতই আহমদ ছফার বোঝাপড়াও ইহাই। আমাদের দেশের জন্য বিচার ও পর্যালোচনার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সংস্কৃতি চারিয়ে দিবার যে কর্তব্য তাহা নির্ধারণ করিয়াছিলেন আহমদ ছফা। সকল প্রথা-প্রতিষ্ঠানকে নতুন যুগের জন্য ভিতর হইতে প্রস্তুত করিবার গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করিয়াছিলেন। ‘যারা বাংলাদেশের সর্বমানবের জীবনের মঙ্গলের মত একটি প্রাণোচ্ছ্বল সংস্কৃতি কামনা করেন, তাদের রাজনীতি এবং সংস্কৃতিকে পিঠেপিঠি ভাইবোনের মত দেখা ছাড়া উপায় নাই। কেননা রাজনীতিতে যদি ফ্যাসিবাদ শিকড় গেড়ে বসে, সাংস্কৃতিক অগ্রসরণের প্রশ্নই উঠে না। সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ছাড়া কোন রাজনৈতিক অগ্রগতি নেই। রাজনীতি সুন্দরভাবে, সুস্থভাবে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক স্থাপন করে বাঁচার সংগ্রাম।’ (ছফা ২০০৮: ২১৩-১৪)

এমন করিয়াই ভাবিতেন আহমদ ছফা। তিনি আরো বলিতেছেন, ‘রাজনৈতিক সংগ্রামকে স্বাভাবিক পরিণতির দিকে এগিয়ে নেয়ার প্রয়োজনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংগ্রামকেও এগিয়ে নিতে হবে। সুস্থ রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া সুস্থ সংস্কৃতি কখনো আশা করা যাবে না। সুস্থ সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে যারা আশা রাখেন তাদের গৌণ কাজ হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংগ্রামকে বিকশিত হতে সাহায্য করা।’ (ছফা ২০০৮: ২২৪)

বাংলাদেশের সংস্কৃতির রূপরেখাটি কি হইবে তাহার কিছু আলামত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়া পরিষ্কার হইয়াছিল। অবিভক্ত বাংলার সংস্কৃতির অনেক উপাদান ইহাতে রহিয়াছে, কিন্তু শুদ্ধ তাহা দিয়াই বাংলাদেশের চলিবে না। আবার যাহারা আদিম কৌম সমাজের কৃষিভিত্তিক ঢিলাঢালা বাঙ্গালি সংস্কৃতির বড়াই করেন তাহাদের সহিতও আহমদ ছফা একমত ছিলেন না। তিনি মনে করিতেন সেই সংস্কৃতি দিয়া যুগের চাহিদা পূরণ হইবে না। ছফার বিচারে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এক সম্পূর্ণ নতুন বস্তু। তিনি দেখাইতেছেন, ‘ব্রিটিশ সৃষ্ট হিন্দু মধ্যবিত্ত বাবু কালচার অথবা আলীগড় প্রভাবিত মুসলিম মধ্যবিত্ত মানসিকতা কিংবা প্রতীচ্যের দুষ্ট প্রভাবে দূষিত মানসিকতায় আমাদের সময়ে যে নতুন মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত তা প্রতিফলিত হওয়ার কথা নয়।’

বাংলাদেশের নতুন সমাজের নতুন মানবিক সম্বন্ধের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করিয়া তিনি অনুধাবন করিয়াছিলেন,

বাংলাদেশের সর্ব মানুষের মধ্যে জ্ঞানের বিস্তার এখন অপরিহার্য সামাজিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞান এবং যুক্তির আলোকে এযাবৎকাল ধরে ধর্মীয় কুসংস্কার এবং সমাজের প্রাণহীন আচার সংস্কারগুলো কখনো বিচার করা হয়নি। কামাল পাশার তুরস্কের মত বাংলাদেশেও অনেকগুলো মজ্জাগত ধর্মীয় সংস্কার জোর করে পিটিয়ে তাড়াতে হবে। শুধু হিন্দু মুসলমান সৌভ্রাতৃত্ব নয়, গারো, হাজং, চাকমা, মগ যে সকল অধিবাসী আছেন, যে সকল উর্দুভাষী থেকে যাবেন তাদেরকে পুরোপুরি মানবিক মর্যাদা দিতে হবে। মানুষকে সত্যিকারভাবে মর্যাদা না দিয়ে মানুষের কোন শ্রদ্ধেয় সমাজ সৃজন সম্ভব নয়। (ছফা ২০০৮: ২১৩)

জনগণের আবেগের ঘরে নাড়া দিয়া জীবনের আগুনকে যুগের সমস্যা এবং সংগ্রামের খড়কুটাতে সহস্র শিখায় জ্বালাইয়া তুলিবার কথা বলিয়াছিলেন তিনি। কি করিলে দেশ ও জাতির সত্য উন্নতি হইবে তাহা লইয়া আহমদ ছফার সমান আর কাহাকেও আমরা ভাবিতে দেখি নাই। এই দেশ এই জাতিকে ভালিবাসিতে গিয়া তিনি কখনো আমাদের বন্ধু বনিয়াছেন, কখনো শিক্ষক বনিয়াছেন, কখনো বা বনিয়াছেন অভিভাবক। আমাদের লইয়া তিনি ভাবিয়াছেন বিস্তর। আবার আমাদের একজন হইয়া আমাদের মত করিয়া আমাদের ভাবনা তিনি ভাবিয়াছেন। আমাদের সংস্কার দেশ ও জাতির সত্য স্বার্থ কোথায় নিহিত তাহা নির্ণয় করা সত্যিকারার্থে অঙ্গীকারাবদ্ধ জাতীয় মধ্যশ্রেণির অবশ্যকর্তব্য। এক্ষণে আমরা আবার ফ্রানৎস ফানোঁর শরণ লইব: ‘অনুন্নত দেশে প্রকৃত জাতীয় মধ্যশ্রেণির কাজ হইবে নিয়তি যে ব্রত তাহাদের জন্য বাঁধিয়া দিয়াছে তাহা না মানিয়া জনগণের সহিত এক কাতারে শামিল হওয়াকে বিহিত কর্তব্য বলিয়া জ্ঞান করা। ইহা ছাড়া অন্য উপায় নাই। তথাপি এই বীরের পথ, সঠিক পথ আর ন্যায়ের পথ যে জাতীয় মধ্যশ্রেণি ভুলিয়াও বাছিয়া লয় না ইহাই আমাদের পরম বেদনায় লক্ষ্য করিতে হয়।’৫

ফানোঁর রচনা বাংলাদেশে বসিয়া পাঠ করিয়াছিলেন আহমদ ছফা। নয়া রাষ্ট্র বাংলাদেশের জাতীয় মধ্যশ্রেণি তাহাদের দায়িত্ব কর্তব্য কেমন পালন করিতেছেন তাহার তত্ত্ব তালাশ করিয়াছিলেন তিনি। ছফা যে জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের শুরু দেখিয়াছিলেন শাসকশ্রেণি সেখানে দেখিয়াছিলেন যুদ্ধের শেষ। ছফা মনে করিতেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে নতুন সমাজের গোড়াপত্তন করিয়াছে। এই সমাজ গড়িয়া তুলিতে হইবে। ইহাও মুক্তিযুদ্ধের সম্প্রসারিত রূপ বৈকি! কিন্তু ফানোঁর মত ছফাকেও বেদনার সহিত লক্ষ্য করিতে হইয়াছে বাংলাদেশের জাতীয় মধ্যশ্রেণি জনগণের সহিত এক কাতারে শামিল না হইয়া নিয়তি নির্ধারিত বেইমানির পথটিই বাছিয়া লইয়াছে। তাহাদের এই বেইমানির বাখান তিনি সারা জীবন করিয়া গিয়াছেন।

মুক্তিযুদ্ধের পরে যে শ্রেণিটি ক্ষমতায় আসীন হইয়াছিল তাহার শ্রেণিচরিত্র পরিষ্কার। পাকিস্তানি শাসনের ছাতার তলেই এই শ্রেণিটির বিকাশ ও বৃদ্ধি। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হইয়াই তাহারা পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পরিত্যক্ত অস্ত্রসস্ত্র ভারতে পাচার করিতে শুরু করিল। কলকারখানায় জাতীয় উৎপাদন কাঠামো তৈরির কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করা হইল না। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পাইয়া তাহারা বেপরোয়া হইয়া উঠিল। এই বেপরোয়া ভাব এক সার্বিক সামাজিক নৈরাজ্যের জন্ম দিল। আহমদ ছফা লিখিতেছেন, ‘উৎপাদনের নৈরাজ্য সামাজিক নৈরাজ্যকে হাজারগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজর রন্ধ্রে রন্ধ্রে।… সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে সবল দুর্বলের গলায় পা দিয়ে নিজের  প্রবল অস্তিত্ব ঘোষণা করল। সামাজিক মূল্য চেতনা ধূলায় গড়াগড়ি দিতে থাকল এবং নতুন কোন মূল্য চেতনা উন্মেষের লক্ষণও দেখা গেল না।’ (ছফা ২০১৩খ:২৭৩)

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দেশ গঠন সীমাবদ্ধ হইয়া পড়িল কেবলমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতিদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির জাতীয়করণের মধ্যে। এইরূপ জাতীয়করণের মধ্য দিয়া প্রকৃত প্রস্তাবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরাই লুটপাট করিয়া নিজেদের সম্পদ বাড়াইয়াছেন। চারিদিকে লোভলাভের এক সর্বগ্রাসী আবহাওয়া বিরাজ করিতেছিল। এই অবস্থা দেখিয়া যে সমস্ত তরুণ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করিয়াছিল তাহাদের অনেকে মুষড়াইয়া পড়িল। কেউ কেউ আবার এই নৈরাজ্যে নিজেরাও শামিল হইয়া পড়িল। সেই অসহনীয় পরিস্থিতির বিবরণ দিয়া শেষ করা যাইবে না। পরিস্থিতির সহিত তাল মিলাইয়া অনেক লেখক, বুদ্ধিজীবী, কবি সাহিত্যিক সাজানো মঞ্চে দাঁড়াইয়া মাইনেভোগী নটনটীর মত সেই পুরানা কথা আবৃত্তি করিতেছিল। অথচ তাহাদের দায়িত্ব ছিল প্রকৃত সত্য জনগণের সামনে তুলিয়া ধরিয়া সরকারের সমালোচনা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ানো। এইভাবে যথাযথ দায়িত্ব পালন না করিয়া ক্রমাগত ভাড়া খাটিবার ফলে তাহাদের মধ্যে যতটুকু শৈল্পিক অঙ্গীকার ও সুকৃতি ছিল তাহাও নিঃশেষ হইয়া পড়িল। আহমদ ছফা লিখিতেছেন:

এই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠী যাদের বেশির ভাগ দরিদ্র এবং নিরক্ষর, তাদের জন্য নতুন সমাজের প্রয়োজনে ধর্মের অভিভাবকত্বহীন একটা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত সৃষ্টির পাশাপাশি বাংলাদেশের সকল ধর্মের এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল নির্মাণ করার চ্যালেঞ্জটা যখন সামনে এল, দেখা গেল বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের তার সম্মুখীন হওয়ার ক্ষমতা, প্রস্তুতি, মেধা এবং মানসিকতা কোনটাই নেই। (ছফা ২০০৮: ১৭০-৭১)

ছফা তাহার কারণও ব্যাখ্যা করিয়াছেন:

পাকিস্তান আমলে যে সকল ব্যক্তি, পাকিস্তান সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের ভেতর থেকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোধিতা করে জাতীয় আন্দোলনের প্রতি কখনো ক্ষীণ, কখনো জোরাল সমর্থন ব্যক্ত করার চেষ্টা করতেন, স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় তারা একটি নিরাপদ অবস্থান পেয়ে গেলেন। দেশটির সংস্কৃতির অভিভাবক হয়ে নতুন ব্রাহ্মণের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে স্বৈরাচারী রাষ্ট্রশক্তির সহায়তায় আত্মতুষ্টি এবং তোষামোদের এমন পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে আরম্ভ করলেন, বাঙালি জনগোষ্ঠীর মুুুক্তি-সংগ্রাম তরঙ্গ তার মধ্যে ধ্বনিত হয়ে উঠলো না। কৃষক, মজুর, দরিদ্র জনগোষ্ঠী যারা মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিক আত্মত্যাগ করেছে, তাদের আশা-আকাক্সক্ষার কোন চিহ্নই তাদের চিন্তা-চেতনায় স্থান করে নিতে পারেনি। (ছফা ২০০৮: ১৭১)

আজতক বাংলাদেশের ইতিহাস এই ধারাবাহিকতায় চলিতেছে। এখানে এমন এক ধনিক শ্রেণির বিকাশ ঘটিয়াছে যাহার সহিত জাতীয় বিকাশের কোন সম্পর্ক নাই। একাত্তর সালের পর প্রতিক্রিয়ার শক্তি ছিন্নভিন্ন হইয়া গিয়াছিল। শাসকশ্রেণি জোর করিয়া ক্ষমতায় টিকিয়া থাকিবার প্রয়োজনে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে সমাজে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। ক্রমাগত তামসিকবৃত্তি ও কাপালিক শক্তিকে সমাজের পাতাল প্রদেশ হইতে টানিয়া তোলা হইয়াছে। জাতির এই দশা দেখিয়া ছফা মন্তব্য করিয়াছিলেন:

শেষ পর্যন্ত কি ভিখারীই থেকে যাব? আমরা কি রাজনীতিতে প্রজ্ঞা এবং ভালবাসার বদলে ফাঁকিবাজীই করে যাব? সরকারের নামে নির্যাতনই চলবে এ দেশে? বিজ্ঞানের নামে বিদেশের সেকেন্ড হ্যান্ড যন্ত্রপাতি বিক্রয়ের ক্যানভাসার সৃষ্টি হবে? সামাজিকতার নামে তামসিকবৃত্তির চর্চা করবো? সাহিত্যের নামে বাজে কথার আড়ত বানাবো? লোকহিতের নামে জুয়াচুরি করবো? এক অদ্ভুত দেশে আমরা বাস করি। এ দেশে বিজ্ঞান এসেছে বিলাসের উপকরণ হিসেবে, শোষণের হাতিয়ার হিসেবে। আধুনিক মানববাদী শিক্ষা আমাদের দেশে এসেছে আমলা সৃষ্টির ফুঁসমন্তর হয়ে। পৃথিবীর অত্যগ্রসর সামাজিক বিপ্লব এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের আগ্নেয় চেতনা আমাদের দেশের ঘাটে এসে তুকতাক বশীকরণ বিদ্যার আকার ধারণ করেছে। (ছফা ২০০৮: ২৩০)

2.8

আহমদ ছফা স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন বাংলাদেশে গণসংগ্রামের উত্তাপ হইতে নতুন মানুষ জন্ম লইবে। বাংলাদেশে এক সর্বব্যাপি ও দীপ্তধারার সভ্যতার সূচনা হইবে। আপাতত মনে হইতেছে সে আশা সুদূর পরাহত। কিন্তু তাঁহার বিশ্বাস ছিল, অন্তরের অমৃতের বলে বুক বাঁধিয়া আবার দাঁড়াইবে বাংলাদেশ। তাহার দিকনির্দেশনাও তিনি দিয়া গিয়াছেন।

আহমদ ছফা সম্পর্কে বলিয়া শেষ করা যাইবে না। তাঁহার সাহিত্যকর্ম আমাদের সম্মুখে রহিয়াছে। পাঠ করিলে অবাক হইয়া একটা কথা না ভাবিয়া পারা যায় না: এমন বড় মহৎ লেখকও এই মাত্র একযুগ আগে বাংলাদেশে, ঢাকা নগরীতে বিচরণ করিতেন।

বোধিনী

১   ‘In its beginnings, the national bourgeoisie of the colonial countries identifies itself with the decadence of the bourgeoisie of the west. We need not think that it is jumping ahead; it is infact beginning at the end.’ (Fanon 2001: 123)

২ ‘It was thenceforth no longer a question, whether this or that theorem true, but whether useful to capital or harmful, expedient or inexpedient. In place of disinterested inquirers, there were hired prize fighters, in place of genuine scientific research, the bad conscience the evil intent of apologetic.’ (Marx 1961: 609)

৩ ‘With the driest naivete he takes the modern shopkeeper, especially the English shopkeeper as the normal man… Had I the courage of my friend Heinrich Heine, I should call Mr. Jeremy a genius in the way of bourgeois stupidity.’ (Marx 1961: 609)

৪      ‘It so happens that the unpreparedness of the educated classes the lack of practical links between them and the mass of the people, their laziness, and, let it be said their cowardice at the decisive moment of the struggle will give rise to tragic mishaps.’ (Fanon 2001: 119)

৫ ‘In an underdeveloped country an authentic national middle class ought to consider as its bounden duty to betray the calling fate has marked out for it, and to put itself to school with the people… but unhappily we shall see that very often the national middle class does not follow this heroic, positive and just path.’ (Fanon 2001: 120)

দোহাই

১      সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান সম্পাদিত, জাতীয় সাহিত্য ১ (ঢাকা: আগামী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০১০)।

২      আন্তনিয়ো গ্রামসি, ‘সমাজতন্ত্র ও সংস্কৃতি,’ তাহমিদাল জামি অনূদিত, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান সম্পাদিত, সর্বজন, নবপর্যায় ৯, ১৭ মে ২০১৩।

৩      আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফার সময়,’ সাক্ষাৎকার: নাসির আলী মামুন, আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ৫ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১৩ক), পৃ. ৪০৩-৮৪।

৪      ———- ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ৫ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১৩খ), পৃ. ২৩৭-৮২।

৫      ———- ‘শেখ মুজিবুর রহমান-১,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ৭ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১৩গ), পৃ. ১৪৫-৫৮।

৬      ———- ‘একাত্তর: মহাসিন্ধুর কল্লোল,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ৮ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১২ক), পৃ. ১৬০-৭৪।

৭      ———- ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ২য় খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১২খ), পৃ. ২০৩-১৪।

৮      ———- ‘গণসাহিত্য প্রসঙ্গে,’ উত্তর খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১ক), পৃ. ৪৪-৪৭।

৯      ———- ‘গ্যোতে এবং রবীন্দ্রনাথ,’ উত্তর খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১খ), পৃ. ১১৮-২২।

১০     ———- ‘গ্যোতে: জনৈক বাঙালির দৃষ্টিতে,’ উত্তর খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১গ), পৃ. ১২৭-৩১।

১১     ———- ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ,’ উত্তর খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১ঘ), পৃ. ৯৮-১১১।

১২     ———- ‘বাঙালি মুসলমানের মন,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ১ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১ঙ), পৃ. ৮৯-১০৮।

১৩    ———- ‘সাম্প্রতিক বিবেচনা: বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, ৬ষ্ঠ খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ১৫১-২৩৯।

১৪     আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ: জাতির অবস্থা, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ২০১০)।

১৫     Frantz Fanon, The Wretched of the Earth, trans. Constance Farrington (London: Penguin Books, 2001).

১৬     Karl Marx, Capital, vol. 1, trans. Samuel Moore and Edward Aveling (Moscow: Progress Publishers, 1961).

আহমদ ছফা স্মৃতিবক্তৃতা ১১: সভাপ্রধানের বক্তব্য — মুহম্মদ নূরুল ইসলাম

3

প্রয়াত বন্ধুবর আহমদ ছফার সুহৃদ-সুজন এবং সুধী-সজ্জন মণ্ডলি, আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আহমদ ছফার স্মৃতির প্রতি নিবেদিত আজকের স্মারক বক্তৃতা সভায় আসতে পেরে আমি কৃতার্থ। সহৃদয় আয়োজকবৃন্দকে জানাই সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ।

জীবনকালে আহমদ ছফা আজিজ সুপার মার্কেটের এক কামরায় একটি স্কুল করেছিলেন। সমাজে যারা নীচু ধাপে জীবন ধারণ করেন তাদের সন্তানগণ এই স্কুলে লেখাপড়া করত। আমি নিজেও এই স্কুলে দুই একবার গিয়েছি, শিশুদের সাথে কথাবার্তা বলেছি। স্কুল বলছি বটে, কিন্তু স্কুল নামক প্রচলিত ধারণার মধ্যে এটি পড়ত না। এ স্কুলে পাশ ফেল সার্টিফিকেট প্রভৃতি সামাজিকভাবে অতি জরুরি বিষয়গুলি ছিল গৌণ। দেখা, শোনা, শেখা, বোঝা, হিশাব করা, চিন্তা করা এসবই ছিল প্রধান।

চট্টগ্রামের রাউজানে মহামুনি গ্রামে একজন জাপানি ভিক্ষু উনিশশ বাহাত্তর সালে একটি আশ্রম গড়ে তোলার প্রয়াস পান। একেবারে নিঃস¦ শিশুদের আশ্রয় হয়ে ওঠে এই আশ্রম। ভিক্ষু রেভারেন্ড তেনজো ওয়াতানাবের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছিল প্রকৌশলবিদ্যায়। আশ্রমের শিশুদেরকে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। এ আশ্রমের শিশুরা অনেকেই বর্তমানে সচ্ছল সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী তরুণ তরুণী।

আরেকজনের কথা বলি। নাম তাঁর তালেব আলী। ব্রিটিশ আমলে তরুণ দোকানি তালেব আলী চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বসবাস করতেন। ইংরেজ শাসনের শেষ দিকে তালেব আলী তাঁর সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে পাঁচ বিঘা জমি কিনে গ্রামের লোকজনকে সাথে নিয়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তুললেন। আশপাশের অনেকগুলি গ্রামের মধ্যে সেটিই প্রথম স্কুল। শিশুরা সেখানে বিনা খরচে পড়াশুনা করত। শুধু তাই নয়, বছরের প্রথমেই এলাকার শিশুদেরকে প্রয়োজনীয় বই শ্লেট পেন্সিল ইত্যাদি শিক্ষা-উপকরণ নিজ অর্থে কিনে উপহার দিতেন তালেব আলী। আমার পরম সৌভাগ্য আমি সে স্কুলের ছাত্র।

তেনজো ওয়াতানাবে, তালেব আলী কিংবা আহমদ ছফা কেবল নন, অগণিত বহু মানুষের অকৃত্রিম সহৃদয়তার সফল প্রচেষ্টার ফসল এরকম বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরা বাংলাদেশে মূলধারার শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মাঝে অক্ষরজ্ঞান প্রসারের মাধ্যমে সমাজ গঠনে অবদান রাখছে। ব্যক্তির এরকম সাহসী উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও প্রয়োজনের তুলনায় সীমাবদ্ধ ও অপ্রতুল। অনগ্রসর সমাজে এ কাজ রাষ্ট্রের প্রধানতম কর্তব্য বলে বিবেচিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল এলাকায় তৎকালীন পৌরপিতা নূর আহমদ চেয়ারম্যান প্রথমবারের মত বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে তৎকালীন ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। জাপান, সিঙ্গাপুরসহ বহু দেশে এ কাজ প্রথমে রাষ্ট্রই সম্পন্ন করেছে। এ সকল দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিষ্ঠিত সরকার বর্তমানে শিশুদের আধুনিক সমৃদ্ধ ও বিশ^ায়িত প্রাযুক্তিক জ্ঞানভাণ্ডারের যোগ্যতম ব্যবহারকারীরূপে গড়ে তোলার ঐকান্তিক প্রয়াসে লিপ্ত।

সম্প্রতি পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বাংলাদেশ সরকার হাজার কয়েক বিদ্যালয় সরকারি করেছেন। এর মানেটা কি? অন্য কারও স্কুল সরকার অধিগ্রহণ করেছেন? প্রয়োজনের তাগিদে এতগুলি স্কুল স্থানীয় লোকজন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা এখন সরকার রক্ষণাবেক্ষণ ও আর্থিক সুবিধা প্রদানের নামে দখলে নিলেন? গত বিয়াল্লিশ বছরে সরকার কোথায় কয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা কি পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং সেগুলি চালাতে বছরে জনগণকে কত টাকা ট্যাক্স গুনতে হয়, তার একটা পরিষ্কার হিশাব চাইতে তো পারি। ছফা বেঁচে থাকলে হয়তো আরো জানতে চাইতেন জনগণের কল্যাণে আসে না এমন যে সকল প্রতিষ্ঠান সেগুলিতে জনগণের কত টাকা সরকার বিনিয়োগ করে চলেছেন ও সেগুলি চালাতে কত টাকা জনগণকে নিত্য দিতে হয়। জনগণের সরকার হলে হিশাবগুলি পাওয়া যেত।

বিগত ১৯৮৯ সালের পর থেকে সারা পৃথিবীতে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, জীবনধারা, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি ইত্যাদি সকল কিছুতে একটি অতিদ্রুত পরিবর্তনের ধারা চালু হয়েছে। অনেক মানুষ ব্যাপারটি টের পেয়েছেন এবং তার সাথে মানিয়ে চলেছেন। তথ্য প্রযুক্তির কথাই ধরুন। এটি শিক্ষিত মানুষের সমাজকে প্রায় একই সমতলে স্থাপন করে দিয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশে এটি বড় ধরনের বিভাজনেরও সৃষ্টি করেছে। প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ এখনো অক্ষরজ্ঞানহীন। তাদের অনেকেই এখনো প্রাগৈতিহাসিক যুগে বসবাস করেন। তাদের কাছেও তথ্য প্রযুক্তি পৌঁছে গেছে মোবাইল ফোন ইত্যাদির কল্যাণে। তবে তার সাথে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমৃদ্ধি তাদের কাছে এখনো যথাযথ পৌঁছায়নি।

তথ্যপ্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলার মানুষকে  ছয় সাত হাজার বছর আগের পৃথিবী থেকে যীশুখ্রিস্টের পরের তৃতীয় সহস্রাব্দে নিয়ে আসা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ। চট্টগ্রাম প্রকৌশল  ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির সহযোগিতায় একটি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক নতুন উদ্যোগ সৃষ্টির ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে এদেশের উদ্যোগী ব্যক্তিগণ ও ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীগণের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে নিত্যব্যবহার্য নতুন নতুন পণ্য সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হবেন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

জাপান ও বাংলাদেশের কয়েকজন তরুণ-তরুণী শিক্ষাদানের কাজটিকে সহজ ও প্রতিটি শিশুর উপযোগী করে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ঘটানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি অকল্পনীয় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। একে কাজে লাগানোর জন্য যে ন্যূনতম শিক্ষার দরকার সেটা সরকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিশাবে বিবেচনা করতে আহ্বান জানাই। একটি শিশু হেঁটে দশ মিনিটে পৌঁছতে পারে সেরকম দূরত্বে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানাচ্ছি। প্রতিটি শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার জন্য এ কাজটি জরুরি। শিশুকে অনুপ্রাণিত করতে, শিশুর মনে জানার জন্য কৌতূহল, আকাক্সক্ষা ও প্রণোদনা সৃষ্টি করতে সক্ষম এমন প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োজিত করার আবেদন রাখছি সকলের কাছে। শিক্ষকের আর্থিক সচ্ছলতা ও সামাজিক মর্যাদা সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। জনগণের সৃষ্ট স্কুলকে কেবল সরকারিকরণ যথেষ্ট নয়।

জাপানের বন্ধুগণের সহায়তায় নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য জাপান হতে কিছু প্রযুক্তি হস্তান্তরের কাজ করতে গিয়ে আমার ধারণা হয়েছে যাদের কাছে যে ভাষায় প্রাযুক্তিক জ্ঞান জমা আছে এবং ক্রমাগত জমছে তাদের নিকট হতে সে আরদ্ধ জ্ঞান ও কৌশল অর্জন করতে হলে সে ভাষায় দক্ষতা থাকতে হবে। ইংরেজি তো অবশ্যই, জাপানি, জার্মান, ফরাশি প্রভৃতি ভাষা শিক্ষা আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এবং জরুরি। বাংলা ভাষা জানা লোকের জন্য এগুলি শেখা অনেকটা সুবিধাজনক। এদেশের ছেলেমেয়েদেরকে জাপানে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য জাপানে পাঠাতে গিয়ে, বাংলা বর্ণমালার সমৃদ্ধ উচ্চারণ আয়ত্ত থাকার কারণে বাংলাভাষী লোকজনের পক্ষে জাপানি ভাষা আয়ত্ত করা অনেক সহজ বলে আমার ধারণা হয়েছে। চট্টগ্রামে অবস্থানকারী জাপানিদের বাংলা শেখাতে গিয়ে সে ধারণা আরো বদ্ধমূল হয়েছে।

মানুষের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কেবল আহমদ ছফা, তেনজো ওয়াতানাবে আর তালেব আলীর মত লোকেরা বুঝতে পেরেছিলেন তা নয়। আমরা সকলেই সেটি উপলব্ধি করি। তাঁরা যেটুকু করে গেছেন সেগুলো লিটারেসি এবং নিউমারেসি অর্জন বলে আখ্যায়িত হতে পারে। আজকের দিনে তা পর্যাপ্ত নয়। নিউরোসায়েন্টিস্টদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ হতে প্রতীয়মান যে মানুষের মস্তিষ্কের বাম-ডান দুই অংশের ভিন্ন ভিন্ন কর্মপরিধি, যথাক্রমে গাণিতিক- যৌক্তিক ও আবেগ-কল্পনা। এসবের সমন্বিত অনুশীলন ও প্রয়োগ — সর্বোপরি সঠিকভাবে চিন্তা করতে পারার ক্ষমতা অর্জন — শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। শিক্ষা সস্তা কোন ব্যাপার নয়। এখানেই আমাদের মত সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আজকের ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞান ও গণিত জানতে বুঝতে পারার সাথে সাথে সৃজনশীলও হতে হবে। মেধাবীরা বিভিন্ন অণুপরমাণুর নানাপ্রকার সংযোজন বিয়োজন ঘটিয়ে নিত্যনতুন পদার্থ ও প্রক্রিয়া পরিকল্পনা ও সৃষ্টি করবেন। জীবন ও জগতের কল্যাণে নতুন নতুন শক্তির উৎস উদ্ভাবন ও তার উৎপাদন এবং ব্যবহারের বিধিবিধান তৈরি করবেন। মহৎ শিল্পকর্ম ও সঙ্গীত সৃষ্টি করবেন। মহাবিশ্বের সুদূর সীমান্তের রহস্য উন্মোচন করবেন। কেউ কেউ আবার খাদ্য উৎপাদনকারী, রাজনীতিজীবী, আজ্ঞাবহ কর্মচারী, সীমান্তরক্ষী, দোকানি প্রভৃতি পেশায় নিয়োজিত হবেন।

আমার কথাগুলোকে এমনভাবে নিবেন না যাতে মনে হতে পারে আমি কেবল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। জার্মান ভাষায় যাকে ‘নাটুর ভিজেনশ্যাফ্ট্’ আখ্যা দেওয়া হয়। ‘গাইস্টেস ভিজেনশ্যাফ্ট্’ বা মানবিক-জ্ঞান অর্জন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্পূর্ণ মানুষ চাই। আমাদের ছেলেমেয়েদেরকে চতুর্মাত্রিক পৃথিবীতে পরিপূর্ণ মানুষ হিশাবে তৈরি করার কাজে নিত্য সচেতন ও যত্নবান থাকতে হবে। কাজটি অতি জরুরি।

সুধীমণ্ডলি, আসুন এই লক্ষ্যে সকলে ভাবনাচিন্তা এবং সঠিক কাজগুলি করি। সেটাই হবে বন্ধু আহমদ ছফার স্মৃতির প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শন। আহমদ ছফার স্মরণে আয়োজিত এ সভায় উপস্থিত থেকে অংশ গ্রহণ করার জন্য আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।