Monthly Archives: এপ্রিল 2013

সম্পাদকীয়: ইহা নিছক গণহত্যা

‘চাকুরি না জীবন?’ স্বাধীনতা ব্যবসায়ী এই মোক্ষম প্রশ্নটাই উহাদের সামনে ছুড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল। সিদ্ধান্ত লইবার সময় একেবারেই কম। চাকুরি ছাড়া জীবন লইয়া তাহারা কি করিবে? জীবনটা কোনরকম টানিয়া টুনিয়া বহিয়া লইবার জন্যই না চাকুরি বাঁচানো দরকার। আর মালিকপক্ষ তো বলিয়াই দিয়াছে জীবন বাছিলে তাহারা চাকুরি হারাইবে। এই ঝুঁকিটা তাহাদের কাছে বড্ড বেশি ঠেকিয়াছে। চাকুরি হারাইবার চেয়ে জীবন হারাইবার ঝুঁকি লওয়াই বরং সহজ মনে করিয়াছে তাহারা।

অতয়েব তাহারা জীবন ঠেলিয়া চাকুরি বাছিয়াছেন। তাহাতে চাকুরি তো বাঁচিলই না, নিজেরাও মরিয়া বসিলেন। নড়বড়ে বিশাল ভবনটি একদিন তাহাদিগকে সতর্ক করিয়াছে। আর কত?

প্রশ্ন হইতেছে, স্বাধীনতা ব্যবসায়ের এই রমরমা কালে বসিয়া ইহার অন্যথা করে এই সাধ্যই বা কাহার আছে? আপাত সুযোগ থাকিলেও এইখানে আসলে বাছাইয়ের সুযোগই বা কতখানি?

সাভারের নয় তলা বিশিষ্ট রানা প্লাজায় আগের দিনই ফাঁটল ধরা পড়িয়াছিল। প্রথম তিনটি তলার দোকানপাট, ব্যবসা বাণিজ্য সেই দিনই বন্ধ হইয়া গিয়াছে। কেহ কেহ নিজেদের মালপত্রও সরাইয়া ফেলিয়াছিল। উপরের পাঁচটি তলায় পোশাকশিল্পের গুটিকয় কারখানা। ইহাদের মালিকেরা ‘টাকার কুমির’। তাহাদের তো একদিনও কাজ বন্ধ রাখা চলিবে না! তাই শ্রমিকদের ডাকিয়া আনিয়া মৃত্যুকূপে ঢুকিতে বাধ্য করা হইল। তাহার পর যাহা ঘটিল তাহা কোন দুর্ঘটনা নহে, নিছক গণহত্যা। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত উদ্ধারকৃত লাশের সংখ্যা আড়াইশ ছাড়াইয়াছে। ঠাণ্ডা মাথায় সংঘটিত এইরূপ হত্যাকাণ্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গ্যাসচেম্বারে ঢুকাইয়া মারিয়া ফেলার কুখ্যাত পদ্ধতির কথাই বারবার মনে করাইয়া দেয়।

এহেন অপরাধে পোশাক কারখানাগুলির মালিক ও ব্যবস্থাপকদের ফাঁসির কাষ্ঠে না ঝুলাইলে আইনের শাসন বলিয়া কথাটা গালভরা বুলির ঊর্ধ্বে উঠিতে পারিবে না। ইহার আগে এহেন হত্যাকাণ্ডের পর দুষ্কৃতিকারীরা পার পাইয়া যাইবার ফলেই তাহার ঘনঘন পুনরাবৃত্তি ঘটিতেছে।

আর তাই সাভার গণহত্যার দায় সরকার ও রাষ্ট্রের কাঁধেও সমানভাবে বর্তাইবে। তাহাদিগকে তিরস্কার মাত্র করিয়া ছাড়িয়া দিলে চলিবে না, গণহত্যার দায়ে আক্ষরিক অর্থেই বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতে হইবে। ইহার বিকল্প শূন্য।

দুঃখের বিষয়, এই দফা খোদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মালিকপক্ষকে বাঁচাইবার পাঁয়তারা করিতেছেন। অনেক কথার মধ্যে তিনি বলিলেন, ‘শাস্তির চেয়ে বেশি জরুরি প্রাণ বাঁচানো’। আমরা স্পষ্ট ভাষায় তাঁহার সহিত দ্বিমত করিয়া বলিব, একটিবার শাস্তি দিয়া দেখুন, দুর্ঘটনা কমিয়া যাইবে, অনেক প্রাণ আপনিই বাঁচিয়া যাইবে। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের কথাবার্তা প্রকারান্তরে যেন এই গণহত্যাকেই সমর্থন জানাইতেছে। সেই কথা এইখানে আর নাই বা পাড়িলাম।

এদিকে, ভবনধসের পর উদ্ধার তৎপরতায় নিদারুণ অদক্ষতা ও সমন্বয়হীনতা চোখে পড়িতেছে। সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিডিআর, পুলিশ উদ্ধারকর্মে যোগ দিলেও এত বড় দুর্ঘটনা সামাল দেওয়ার মতন জ্ঞান তাহাদের নাই বলিয়া দেখা গিয়াছে। কাজের কাজ যাহা করার করিতেছে স্থানীয় অনভিজ্ঞ জনগণ আর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

মানবিকতার স্বার্থে জনগণ সর্ববিধ উপায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াইয়াছে। ভবিষ্যতেও আমাদের মানবিকতা পরাজিত হইবে না বলিয়াই বিশ্বাস। এইবার সময় আসিয়াছে মানবিকতা ছাড়াইয়া নিজেদের রাজনৈতিকতার পর্যায়ে উত্তরণ ঘটাইবার। এই কাণ্ড যতদিন না ঘটিবে ততদিন মানবিকতা প্রদর্শনের এইরূপ অনাকাক্সিক্ষত বিদঘুটে রাস্তার প্রাদুর্ভাব ঘটিতে থাকিবে আর বহিয়া চলিবে মানবিকতার অপচয়।

আর তাই এক্ষণে সকল শ্রেণির জনগণকে ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিতে হইবে। লিবারেল মানববন্ধন আর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বন্দি না থাকিয়া জনমত গঠন করিবার সকল পদ্ধতি অবলম্বন করিতে হইবে যুবসমাজকে। বিচার নিশ্চিত করিতে যথাযথ পর্যায়ে আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কার্যকর চাপ তৈরিও অব্যাহত রাখিতে হইবে। তদুপরি, রাস্তায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাথে একাত্ম হইবার বিকল্প নাহি। সর্বোপরি, সুস্পষ্ট লক্ষ্যে দৃঢ় আন্দোলন গড়িয়া তুলিতে হইবে। এজন্য তরুণ যুবকদেরই নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে হইবে।

মনে রাখা দরকার, নিম্নবিত্তের যেই শ্রমিকেরা মারা গেলেন তাহাদের শ্রমের লাভটা তাহারা কিছুই পাইতেন না, সকলি খাটিত মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের সুখ সাচ্ছন্দে, বিলাস ব্যাসনে। শ্রমিকদের পক্ষ লইয়া মাঠে নামা শ্রমিকদের জন্য যতটা তাহার চেয়ে আপন লাভেই অধিক প্রয়োজন। এই কথা না বোঝা বোকার স্বর্গে বসবাসের সামিল। দিন ফুরাইলে কাঁদিয়া লাভ হইবে না।

আমেরিকার হে স্কয়ারে শ্রমিকহত্যার স্মরণে পালন শুরু করা মে দিবসের বার্ষিকী সমাগত। পাঁচ মাস আগে তাজরীন ফ্যাশনস আর আজিকার রানা প্লাজার গণহত্যার সামনে কি হে স্কয়ার ম্লান হইয়া পড়িতেছে না?

আবারো পোশাক শ্রমিকের লাশের পাহাড় – অনন্ত ইউসুফ

©  মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বুধবার সকালে রানা প্লাজা নামক বহুতল ভবন ধসে পড়ার ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত উদ্ধার করা মৃতের সংখ্যা ২৫৯ ছাড়িয়ে গেছে। আহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ধ্বংসস্তুপের নিচে আটকা পড়ে আছে আরো অসংখ্য মানুষ। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অভাবে অগোছালো ও ধীরগতিতে চলছে উদ্ধার তৎপরতা।

তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে ভয়াবহতম আগুন লাগার ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় এই ঘটনা ঘটল। তাজরীনের আগুনে অন্তত ১১৪ জন পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তাজরীনের মালিককে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

ধসে পড়ার একদিন আগে রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দিলে পৌরসভা, বিজিএমইএ এবং শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা ভবন মালিকের সাথে বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কাজ বন্ধ রাখার। কিন্তু সিদ্ধান্ত না মেনে পরদিন সকালেই ভবনটির পাচঁটি পোশাক কারখানা জোরপূর্বক চালু করা হলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ধসে পড়ে ভবনটি।

দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর একে অপরকে দুষছে পৌরসভা, বিজিএমইএ এবং শিল্প পুলিশ। স্থানীয় যুবলীগ নেতার মালিকানাধীন ঐ ভবনের নিচের তিনটি তলায় ছিল বিপণিবিতান, ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চতুর্থ থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাচঁটি পোশাক কারখানা। বিজিএমই প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী কারখানাগুলোতে প্রায় তিন হাজার দুইশত জন শ্রমিক কাজ করতেন।

শিল্প পুলিশের পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান সর্বজনকে জানান তাদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পোশাক কারখানার মালিকরা কারখানা চালু করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ‘আগের দিনই শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা বলেছিলাম ভবনে কাজ বন্ধ রাখতে। কিন্তু তারা আমাদের কথা রাখেননি।’

বিজিএমইএ শিল্প পুলিশের অভিযোগ পাশ কাটিয়ে তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সমস্ত দায় চাপিয়েছেন ভবন মালিকের উপর। শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স’ সলিডারিটির নেত্রী কল্পনা আক্তার বলেন, ‘গত আট বছরে তিনটি ভয়াবহ ভবনধসের ঘটনায় এই নিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০০। অথচ প্রতিবার সুষ্ঠু বিচারের নামে শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করেছে সরকার ও বিজিএমইএ। বেশির ভাগ দুর্ঘটনার পর আহত ও নিহতের পরিবার খুব অল্প টাকার এককালীন সহযোগিতা পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাও জোটে না শ্রমিকদের ভাগ্যে। যতদিন পর্যন্ত আগুন দিয়ে ভবন ধসিয়ে শ্রমিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হবে না, দক্ষ মনিটরিং সেল গঠন করা হবে না, আমি মনে করি ততদিন এমন ভয়াবহ চিত্র ফিরে ফিরে আসবে।’

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ভবনধসের ঘটনা নতুন নয়। রানা প্লাজা ধসের আগে ২০০৫ সালে সাভারের বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের ভবন ধসে প্রাণ হারায় ৯০ জন শ্রমিক। ঐ মর্মান্তিক ঘটনার পর স্পেকট্রামের মালিকের বিরুদ্ধে ৪৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব মামলা এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

স্পেকট্রামের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ঠিক পরের বছর ২০০৬ সালে ভবনধসের ঘটনায় তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স গার্মেন্টসে নিহত হন ২১ জন শ্রমিক। স্পেকট্রামের মত ফিনিক্স গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় দোষী ব্যক্তিরা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনুমোদনহীন রানা প্লাজা

রানা প্লাজার মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা স্থানীয় সাংসদ মুরাদ জংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ভবন নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সাভার পৌরসভার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি সাভারের এই ভবনটির অনুমোদনের বিষয়ে উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে, তবে সাংসদের সহযোগিতায় সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

সাভার অঞ্চলের একজন রাজউক কর্মকর্তার দাবি ভবনটি তাদের সীমানায় পড়লেও রানা প্লাজা নির্মাণে কোন অনুমতি দেয়নি রাজউক। তাদের কাছে কোনপ্রকার অনুমোদনের জন্য ভবনমালিকও আসেননি। তিনি জানান তার জানা মতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সাভার পৌরসভা।

সাভার পৌরসভার মেয়র রেফাতউল্লাহ দাবি করেন সব ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে রানা প্লাজা ভবন নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা নয়তলা ভবনের অনুমতি দেইনি। অনুমোদন ছিল ছয়তলা পর্যন্ত। আমাদের ধারণা ভবনের নকশা ঠিকমত পরীক্ষা করা হয়নি। এতে কোন প্রকার দুর্নীতি ছিল কিনা বিষয়টা দেখা হচ্ছে।’

‘মালিকেরা আমাগো ভাইবইনরে খুন করছে…’

©  মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও রানা প্লাজার বিভিন্ন তলার পাঁচটি পোশাক কারখানায় তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ শুরু করেন। পোশাক কারখানাগুলো হচ্ছে নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম এ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেড ও ইথার টেক্সটাইল লিমিটেড। কাজ শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই ধসে পড়ে ভবনটি।

রানা প্লাজার মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা আলী আজগর বলেন, ‘আগের দিন পিলার ভাঙ্গা দেইখা শ্রমিকেরা কারখানায় ঢুকতে চায় নাই। কিন্তু আমাগোরে জোর কইরা ঢুকাইছে, ঢুকানোর সমে কইছিলো নাইলে তিনদিনের বেতন কাইটা ফালাইবো। মালিকেরা আমাগো ভাইবইনরে খুন করছে…।’

ঘুমিয়ে চলছে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর

পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে, ১৯৭০ সালে তৎকালীন সরকার গড়ে তুলেছিল কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কারখানাগুলোর পেশাগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। সেই সময় এই দপ্তরের জনবল ছিল ৩১৪, অথচ স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এই প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান তো বাড়েইনি বরং কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এখন এই দপ্তরে কাজ করছেন মাত্র ১৮৪ জন কর্মচারী। তাদের গুরুদায়িত্ব দেশের পাঁচ হাজার পোশাক কারখানাসহ অন্য শিল্পকারখানাগুলোর ছাড়পত্র দেওয়া এবং গুণগতমান দেখভাল করা।

১৯৭৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় হাজারে উন্নীত হলেও সরকার এই দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব এখনো অনুধাবন করতে পারেনি। অবহেলা, ত্র“টিপূর্ণ পরিদর্শন ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত লোকবল নিয়ে ঠেলে ঠুলে চলছে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর।

সূত্রমতে, একজন কর্মকর্তা পরিদর্শক অফিস  থেকে কোন কারখানা পরিদর্শনে গেলে গাড়িভাড়া বাবদ তাকে দেওয়া হয় প্রতি কিলোমিটারে মাত্র এক টাকা। ফলে এই এক টাকার কাজ অফিসে বসেই সারেন কর্মকর্তারা। গত পাঁচ বছরে দুর্ঘটনা ব্যতীত পরিদপ্তর থেকে কোন অনুসন্ধানী দল কারখানা পরিদর্শনে যায়নি। একইভাবে ছাড়পত্র দেওয়ার কাজটাও তারা টেবিলে বসেই সেরে নেন, পরিদর্শনে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়া, কলকারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জানা নেই বাংলাদেশের কতগুলো কারখানার কাছাকাছি জায়গায় জলাধার অথবা খালি জায়গাজমি আছে — দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধারকাজে যা খুবই প্রয়োজনীয়। দেশের কয়টি কারখানায় নির্মাণগত ত্র“টি রয়ে গেছে তারও কোন হিশেব নেই পরিদপ্তরে।

একেবারেই অকার্যকর করে রাখা কারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তর হতে পারত বাংলাদেশে পোশাকশিল্প বিকাশ এবং শ্রমিক অধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিকে পঙ্গু করে রেখে পোশাকশিল্প মালিকেরা একের পর এক অন্যায় করেও বিনা বিচারে পার পেয়ে যাচ্ছে। দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি চলছে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।

১৯৭৯ সালে পোশাক শিল্প যাত্রা শুরু করেছিল ১২,০০০ ডলার মূল্যের সামগ্রী রপ্তানি  করে। আজকের দিনে অঙ্কটা ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেলেও খুব একটা উন্নত হয়নি পোশাক শ্রমিকদের জীবনমানের। অন্যকিছু বাদ দিলেও, কেবল পোশাকশিল্পের স্বার্থেই এই মুহূর্তে কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

শিবগঞ্জবাসীর অন্ধকারে দুই মাস – মোহা: সফিকুল ইসলাম

কর্মহীন ১ লাখ, সরবরাহ শুরু হতে আরো এক মাস
:: শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) থেকে ::

ভষ্মীভূত জেলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি

ভষ্মীভূত জেলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি

জামায়াত-শিবিরের নৈরাজ্যমূলক সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ফলে পল্লীবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় প্রায় দুই মাস ধরে শিবগঞ্জবাসী অন্ধকারে জীবনযাপন করছে। বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা বন্ধ থাকার কারণে প্রায় ১ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। এসব পরিবারের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।

চড়া দামে ডিজেল কিনে ফসল বাঁচাতে গিয়ে লক্ষাধিক কৃষক অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া এলাকার হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর পড়াশুনা বিঘিœত হচ্ছে দারুণভাবে।

এই পরিস্থিতি খুব শীঘ্রই সমাধান হচ্ছে না। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপনের পর সরবরাহ শুরু করতে আরো অন্তত এক মাস সময় লেগে যাবে বলে জানিয়েছেন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো: হাসান শাহ নেওয়াজ।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণা হওয়ার পরপরই জামায়াত শিবিরের কর্মীরা স্থানীয় পল্লীবিদ্যুতের ভবনে হামলা চালিয়ে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে পল্লীবিদ্যুতের স্থাপনাসহ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যায়।

ক্ষয়ক্ষতি

এ ঘটনায় পল্লীবিদ্যুতের তিনটি ভবন, একটি রেস্ট হাউস, তিনটি স্টাফ কোয়ার্টার, চল্লিশটি আবাসিক কোয়ার্টার, একটি গোডাউন, ১৫ মেগাওয়াটের একটি সাবস্টেশন, ২৬টি মোটরসাইকেল, একটি পিকআপ, একটি প্রাইভেট কার, হাজার হাজার গজ বৈদ্যুতিক তার ও খুঁটিসহ প্রায় দুইশ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।

হামলাকারীরা আবাসিক এলাকায় ঢুকে আবাসিক এলাকার মহিলাদের ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে জিম্মি করে স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকাসহ যাবতীয় জিনিশপত্র ছিনতাই করে নেয়। নিরুপায় হয়ে তারা এক কাপড়ে বাসা থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচায়।

২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে উপজেলার প্রায় প্রতিটি মাঠে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফর্মার ও বৈদ্যুতিক তার চুরির হিড়িক পড়েছে। বিগত ৫৫ দিনে কানসাট, দাইপুকুরিয়া, মনাকষা ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ থেকে শতাধিক ট্রান্সফর্মার ও হাজার হাজার গজ তার চুরি হয়েছে।

কৃষি ও শ্রম ক্ষেত্রে বিপর্যয়

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধ্বংস হওয়ায় ১৬০টি গভীর নলকূপ, ১,৪৯৯টি অগভীর নলকূপ ও ১৫টি এলএলপি সেচস্কিম বন্ধ হয়ে গেছে। ৩৫ হাজার কৃষক গ্রাহকের আবাদকৃত প্রায় আট হাজার হেক্টর জমির ইরি বোরো ধানের জমিতে সেচ বন্ধ রয়েছে। অধিক অর্থ ব্যয়ে অনেক কৃষক স্যালোমেশিনের সাহায্যে সেচব্যবস্থা চালু করলেও উপজেলার উত্তরাঞ্চলের দাইপুকুরিয়া, শাহাবাজপুর ও মোবারকপুর ইউনিয়নের কিছু জায়গায় পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ১,২০০ হেক্টর জমির ইরি বোরো ধান বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এতে প্রায় আড়াই হাজার কৃষক দিশাহারা। অন্যদিকে অসাধু ডিজেল ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন এলাকায় র্ঠিকমত সেচ দিতে না পারায় গম ও ভুট্টার ফলনও কমে গেছে বলে কৃষকরা জানান।

বিদ্যুৎ না থাকার ফলে কানসাট পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির অধীন দুই হাজার রাইসমিলের ছয় হাজার শ্রমিক, পাঁচশ বরফমিলের দশ হাজার শ্রমিক ও বরফ বিক্রেতা, ছয়-সাতটি ওয়েল্ডিং মেশিনের সাড়ে তিন হাজার শ্রমিক, মোবাইল ফোন মেরামতকারী দেড় হাজার দোকানের মালিক ও কর্মচারী মিলে প্রায় তিন হাজার, ফ্রিজ, টেলিভিশন, কম্পিউটার, ফ্যান ইত্যাদি মেরামতকারী প্রায় তিন হাজার দোকান বন্ধের ফলে ১৫ হাজার শ্রমিকসহ সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার কলকারখানা, দোকানপাট বন্ধ থাকায় লক্ষাধিক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। ঐ লক্ষাধিক পরিবারের সাড়ে চার লাখ মানুষ প্রায় দুই মাস ধরে অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

বিঘ্নিত যোগাযোগ ও শিক্ষা

সংস্কারের কাজ করছে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি

সংস্কারের কাজ করছে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি

বর্তমান সময়ে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম মোবাইল ফোন ব্যবহার বিঘিœত হচ্ছে চরম মাত্রায়। মোবাইল ব্যবহারকারী শিবগঞ্জের প্রায় চার লাখ মানুষ ফোনসেট চার্জ করা নিয়ে এতই বিপাকে পড়েছে যে বাড়ি থেকে ১২-১৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মোবাইল প্রতি ১০ টাকা করে দিয়ে চার্জ করাতে হচ্ছে। শিবগঞ্জের প্রায় ৫০টি  হাটবাজারে বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থায় এভাবে টাকা নিয়ে মোবাইল চার্জ করা হচ্ছে।

বিদ্যুতের অভাবে এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ এলাকার লক্ষাধিক ছাত্রছাত্রীর পড়াশুনা বিঘ্নিতত হচ্ছে। এর কারণে পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

এ ঘটনার পর থেকে শিবগঞ্জে জামায়াত-শিবির সহ ১৮ দল প্রায় প্রতিদিন হরতাল, বিক্ষোভসহ নানা ধরনের কর্মসূচি দেওয়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। জামায়াত-শিবির ও ১৮ দলের কর্মীদের সাথে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের কর্মী ও পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ককটেল বিস্ফোরণ ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি এক এলাকার লোকজন অন্য এলাকার রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতেও আতঙ্কিত বোধ করছেন।

শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম মিজানুর রহমান জানান ২৮ ফেব্রুয়ারির পর পল্লীবিদ্যুতে আগুন দেওয়া সহ বির্ভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে শিবগঞ্জ থানায় ২৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামী করা হয়েছে সনাম ও অজ্ঞাত প্রায় ১৭-১৮ হাজার জনকে। এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে তিন শতাধিক।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার খোন্দকার ফরহাদ আহমদ বলেন, পরিস্থিতি বর্তমানে নাগালের মধ্যে রয়েছে। ইতিমধ্যে উপজেলা সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কেউ বিঘœ ঘটানোর চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ

বিএনপি জেলা কমিটির সভাপতি ও ১৮ দলের নেতা সাবেক এমপি অধ্যাপক মো: শাহ্জাহান আলি মিয়া পল্লীবিদ্যুৎ ধ্বংসের জন্য বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আ: এনামুল হক ও পল্লীবিদ্যুতের সাবেক মহাব্যবস্থাপক নূরুল ইসলামকে সরাসরি দায়ী করে বলেন, জনগণের টাকায় গড়ে ওঠা পল্লীবিদ্যুৎ কার্যালয়কে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে তারা নিজেদের দুর্নীতি ঢাকার চেষ্টা করেছেন এবং পরে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের উপর এর দোষ চাপিয়ে তাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালাচ্ছেন।

শিবগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মৌলানা মো: মনিরুল ইসলাম দাবি করেন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কোন কর্মী পিকেটিং করেনি। সরকারি দলের কর্মীরা নিজেরাই পল্লীবিদ্যুৎ কার্যালয়ে আগুন দিয়ে আমাদের উপর দোষ চাপাচ্ছে। তারা আমাদের নির্যাতন করে পচাত্তরের মত একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চায়।

বিদ্যুৎ চালু থাকার পরও বিদ্যুৎ না দিয়ে সরকার জনগণকে অহেতুক কষ্ট দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী তাদের অভিযোগ নাকচ করে বলেন, জামায়াত-শিবিরসহ ১৮ দল শুধু পল্লীবিদ্যুৎই ধ্বংস করেনি, সংখ্যালঘুদের মন্দির ভাংচুর, পর্যটন মোটেল, শ্মশানঘাট, সৌরবিদ্যুৎসহ সবকিছুই ধ্বংস করে দিয়েছে।

বিদ্যুৎ চালুর ব্যাপারে তিনি বলেন, ২০ বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা পল্লীবিদ্যুৎ তারা মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিয়েছে।

পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো: হাসান শাহ নেওয়াজ বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে কর্তৃপক্ষ পূর্ণোদ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। তবে সরবরাহ শুরু করতে আরো অন্তত এক মাস সময় লেগে যাবে।

গল্প নয় পরিবর্তনের সত্যি গল্প – মোছা: তোরিফা নাজমিনা

শিক্ষা ব্যবস্থার হাল হকিকত, তাহাতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অন্যায় দৌরাত্ম্য, শিক্ষাবিস্তারে স্থানীয় ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদি বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখিয়াছেন জুগিন্দা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। এইসব থেকে উত্তরণে সামান্য দূরদৃষ্টি আর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাই কত বড় ভূমিকা রাখিতে পারে তাহাও জানা যাইতেছে

School

:: গাংনী (মেহেরপুর) থেকে ::

মেহেরপুরের একটি গ্রাম জুগিন্দা। সেই গ্রামের এক স্কুল জুগিন্দা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। গাংনী উপজেলার সবদিক থেকে গ্রামটি পিছিয়ে পড়া। ২০০৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর যখন ঐ স্কুলে যোগদান করতে যাই তার আগে এই গ্রামে যাইনি। যদিও এই উপজেলাতেই আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা তবু কেন জানি কোন প্রয়োজন হয়নি সে গ্রামে যাওয়ার। গ্রামটি আমার বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে। তবে গাংনী উপজেলার প্রায় সব প্রধান শিক্ষক এই গ্রামটাকে এবং এই স্কুলটাকে চেনেন। কারণ এখানে আমার পূর্বের তিন প্রধান শিক্ষককেই চরম অসম্মানজনকভাবে এই স্কুল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে নানা কারণে। আল্লাহই জানেন আমার সেদিন কবে আসবে!

যেদিন প্রথম আসলাম সে দিনটা ছিল বার্ষিক ফল প্রকাশের দিন। যোগদানের আনুষ্ঠানিকতা সেরে বাকি ছয়জন সহকর্মীর সাথে আমি পরিচিত হচ্ছি, এমন সময় একজন অভিভাবক এলেন। তার ছেলে পরীক্ষায় ফেল করেছে; তবুও তাকে পরবর্তী ক্লাসে প্রমোশন দিতে হবে। আমি বললাম, বসেন ছেলের ফলাফল খাতা দেখি কি অবস্থা। আর অমনি ভদ্রমহিলা বললেন, ‘ওসব দেখতি হবি না। আমার ভাই এই স্কুল কমিটির নোক। সে বুইলি দিল আমার ছেইলিকে পরের কিলাসে তুইলি দেন।’

আমি বললাম, ‘আমি তো এখন এই স্কুলের হেডমাস্টার। সে ফেল করলে তো পরের ক্লাসে দিতে পারব না।’

তিনি ক্ষেপে গেলেন, ‘দাঁড়ান তাইলে আমার ভাইকেই ডাইকি আনছি, তখন তোলেন কিনা দেইখি নিছি।’

এই বলে তিনি চলে গেলেন। আমি শিশুটার খাতাগুলো দেখতে চাইলাম। দেখি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বের হওয়ার মত অবস্থা। ছেলেটার একটা খাতা পাওয়া যাচ্ছে না। বাকি যে খাতাগুলো পাওয়া গেল তাতে তার পাশ নম্বর আসবে না নিশ্চিত। খাতাগুলো যে ঠিকভাবে দেখা হয়নি তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আমি রীতিমত অপ্রস্তুত। প্রথম দিনেই এসবের আশা করিনি।

কিছুক্ষণ পরই একজন মাঝবয়সী লোককে — তার শরীর থেকে সিগারেটের উৎকট গন্ধ বের হচ্ছিল — সঙ্গে করে ভদ্রমহিলাটি ফিরে এলেন। অফিসে ঢুকেই সেই লোকটি অফিসের খাতাপত্র ঘাঁটাঘাটি করে ফলাফল খাতা খুঁজতে লাগল। খাতাটি আমার হাতেই ছিল। আমি তো রীতিমত বেকুব! আমি তাকে বসতে বলে নিজের পরিচয় দিয়ে বললাম, ‘ভাই, আমি আপনাদের এই স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিশেবে আজই যোগদান করলাম। ভাই, আসেন আগে আমরা পরিচিত হই। আর আপনি কি তথ্য চাইছেন বলেন, ওরা আপনাকে সেটা বলে দেবে। আপনি দয়া করে ঐ চেয়ারে বসেন।’

এই স্কুলে আসার আগে আমার শুভাকাক্সক্ষীরা পইপই করে বারণ করেছিল। কারণ, আমি যেমন মাথাগরম মানুষ তাতে নাকি এখানে চাকরি করতে এলে গ্রামের লোকের সাথে আমার দুইবেলা মারামারি লেগে যাবে। তাদের সে সতর্কবাণী মনে হলেও, আমি ভেবে দেখলাম বিড়াল আমাকে পয়লা রাতেই মারতে হবে। তারপর ফলাফল খাতা দেখে সহকারীদের ইশারায় থামতে বলে তাকে জানিয়ে দিলাম যে তার ভাগ্নেকে কোনভাবে প্রমোশন দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ তার মত আরো অনেকেরই এই দাবি আছে। তাকে প্রমোশন দিলে তাদেরও দিতে হয়। তাহলে আর এই পরীক্ষার কোন মানে থাকে না। এবং অন্য অভিভাবকদেরও বলে দিলাম যে আমি কমিটির সদস্যের অনুরোধই রাখলাম না তাহলে আর আপনাদের কথা রাখি কিভাবে? আর এরপর থেকে এভাবে কাউকে প্রমোশন দেওয়া হবে না, বিশেষ কারণ ছাড়া। এই কথা শুনে কেউ কেউ বলল, সবার এক নিয়ম হইলে ঠিক আছে। কেউ আবার বলল, ‘মাগী নতুন আইসিছে তো তাই নিয়ম দেখাইছে।’ শেষমেশ সদস্য সাহেব বিরসবদনে বিদায় নিলেন।

যা হোক, এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা আর গালাগাল শুনে পার করলাম নতুন কর্মস্থলের প্রথম দিন। পরে আস্তে আস্তে অভিভাবকদের এবং গ্রামের লোকদের আস্থা অর্জন করতে শুরু করি। তারপর দুই একদিনের কাজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝলাম সুদক্ষ শিক্ষক থাকা সত্ত্বেও নানা অনিয়মে স্কুলের অবস্থা একেবারে শোচনীয়! আমার ১৭ বছরের কর্মজীবনে এমন স্কুল আমি কখনো দেখিনি। স্কুলের গুরত্বপূর্ণ রেজিস্টারগুলো নাই বললেই চলে, আর যেগুলো আছে তা কারও সামনে উপস্থাপন করার যোগ্য নয়। এরপর শুরু হল গাঁটের টাকা খরচ করে সেসব গুছিয়ে তোলার কাজ। তখন স্কুল ফান্ড একেবারেই শূন্য। সবকিছু গোছানোর পাশাপাশি নতুন শিশু জরিপ করা হল আর বছরের শুরুতেই পুরোদমে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু করে দিলাম।

এরপর এল দ্বিতীয় পর্বের সমস্যা। সঠিকভাবে স্কুল চালানোতে অভিভাবকদের আস্থা পেলেও পরিশ্রমবিমুখ শিক্ষকের আস্থা হারালাম। একজন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্কুল থেকে পদ কেটে নিয়ে অন্য স্কুলে পালালেন, আর দুইজন স্বেচ্ছায় অন্য স্কুলে বদলি হয়ে গেলেন। ফলে ‘হারাধনের সাতটি ছেলের রইল বাকি চার।’ এক শিফটের স্কুলকে দুই শিফটে চালাতে হল। আর এদিকে আমার শরীরের অবস্থা খুবই নাজুক। নানা কারণে মনও ভাল না। এমতাবস্থায় স্কুলের এই অবস্থা দুর্যোগের ষোলকলা পূর্ণ করল।

তবু আমি হাল ছাড়িনি। চার মাস শূন্য থাকার পরে সে পদে দুইজন শিক্ষক এলেন। তারা আমারই ছাত্রী আর আগে থেকেই একজন এই স্কুলের ছাত্রী ছিল। সহকারী শিক্ষকের পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই আমার ছাত্রী। তো, সে বছরের বাকি চারমাস প্রাণ লাগিয়ে কাজ করল সবাই। নানা উৎসব, আনন্দে মুখর হয়ে উঠল আবার স্কুল। সবার মধ্যে এক অদ্ভুত সৌহার্দ্য জেগে উঠল। ওরা শুধু স্কুলকেই ভালবাসল না, আমাকেও বাসল।

আমাদের স্কুলে প্রতিদিন রান্না হয়। খাবার সময় একটু বেশি ভাত চাপিয়ে দেয় চালাকি করে যেন আমি সুস্থ হয়ে উঠি, আর ওদের এই পাগলামিতে আমি গোপনে চোখ মুছি! এই একসাথে খাওয়ার ফলে আমাকে আর আলাদা করে কোন স্টাফ মিটিং করতে হত না। খাবার সময় সবার কাছ থেকে গল্পের ছলে সব খোঁজ নেওয়া যেত এবং তারাও তাদের সমস্যার কথা জানাত অকপটে। তখন সেটা স্কুলের থেকে অন্যরকম কিছু হয়ে গেল সবার কাছে। ঠিক যেন পরিবারের মত। এবং তার অভাবনীয় ফলও এল বছর শেষে। সমাপনী পরীক্ষায় শতভাগ পাশের সাথে একটি মেয়ে বৃত্তি পেল। যেখানে পূর্বের দুই বছর সমাপনীতে ফলাফলের চিত্র খুবই বেহাল ছিল। ২০০৮ সালে পাশের হার ৩৩ শতাংশ এবং ২০০৯ সালে পাশের হার ছিল ৫৫ শতাংশ। এবং ঐ স্কুল থেকে তার আগ পর্যন্ত বৃত্তি পাওয়ার কোন ইতিহাসও ছিল না।

কিন্তু এই সাফল্যও আমার জন্য খুশি হবার মত যথেষ্ট কিছু ছিল না। কারণ স্কুলের সার্বিক অবস্থা তখনো বেশ নাজুক। অসচেতন অভিভাবক একটা বড় সমস্যা। মা সমাবেশ, উঠান বৈঠক, হোম ভিজিট করেও ফল পাওয়া যায় না। সপ্তাহে এক দুই দিন স্কুলে না আসা তেমন কোন বড় ব্যাপার না তাদের কাছে। আর মায়ের কোলে ছোট বাচ্চা থাকলে তো আর কথাই নাই। দেখা যাবে স্কুলপড়–য়া শিশুটি তার মায়ের কাজে সহযোগিতা করার জন্য মাসের অর্ধেক দিনই স্কুলে আসে না। আর এ বিষয়গুলো বলেও কোন লাভ হয় না। আরো সমস্যা হল শিশুদের নানা পারিবারিক কাজে — বিশেষ করে কৃষিকাজে এবং ফসল তোলার সময় ফসল কুড়ানোর কাজে — লাগানো। যেসব পরিবারে পেটের চিন্তা থাকে তাদের শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন করা যে খুবই কঠিন বিষয় তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কারণ একদিন স্কুলে না এসে মাঠে মরিচ তুলে বা আলু কুড়িয়ে, বা ছাগল চরিয়ে, ঘাস কেটে, খড়ি কুড়িয়ে পরিবারকে সাহায্য করা পড়ার চাইতে তাদের কাছে বেশি গুরত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাতে যা হবার তাই হয়। বছর শেষে বৃত্তির সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে দাঁড়ায়। একই ক্লাসে দুই তিনবার থেকে কেউ বা ঝরে পড়ে। তেমনই গত বার্ষিক পরীক্ষায় প্রায় এক চতুর্থাংশ ছেলেমেয়ের এই অবস্থা হয়।

এবার আসল কথায় আসি। গত বার্ষিক পরীক্ষা চলার সময় আমি সবগুলো ঘর ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। এমন সময় এক ঘরে দেখি একটা ছেলে পরীক্ষার খাতা হাতে করে অঝরে কাঁদছে। তার দুঃখের কারণ এই শ্রেণিতে সে দুই বছর আছে কিন্তু এবারও সে কিছু পারছে না আর সব বন্ধুরা নতুন ক্লাসে চলে যাবে, সে একা হয়ে যাবে। ডিউটি টিচার বকা দিচ্ছে, ‘সারা বছর স্কুলে আসবি না, আর এখন খাতা হাতে নিয়ে বসে কাঁদলেই আমার মন গলে যাবে?’ আমি নিজেও ছেলেটির মায়ের কাছে গেছি আগে যেন তাকে নিয়মিত স্কুলে পাঠায় কিন্তু সে বিষয়ে কথা রাখেনি তারা। বাবা-মা দুজনই নিরক্ষর। তাই তারা বাড়িতেও পড়ার তদারকি করতে পারে না।

আমি সব নিয়ম ভেঙ্গে তার পাশে বসে বলে দিতে গিয়ে দেখলাম যদি হাতে ধরে শেখানো যায় তবে ছেলেটি পারে বা পারবে। স্কুলের পরে এমন করে পড়ানোর একজন কাউকে দরকার। কিন্তু কে পড়াবে? যদি তাদের জন্য বাড়তি ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেত তবে বেশ হত। আর মাসে দুই হাজার টাকা পেলেই এমন একটা নিরাময় পাঠের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এসব কথা ভেবে ঐ ছেলেটি, যার নাম শামিম, তাকে নিয়ে ফেসবুকে একট নোট লিখি। শিরোনাম ছিল ‘একজন শামিম’। আমাদের গাংনীর ছেলে সাইদুর রহমান সাবু সেটা একটা গ্র“পে শেয়ার করে। এবং সেখানে একটা অপরিচিত ছেলে তার ফোন নম্বর দিয়ে আমার এই ছেলেমেয়েগুলোর জন্য কিছু করার আগ্রহ দেখায়। আমি যোগাযোগ করি, ফোনে কথা হয়, ফেসবুকে যুক্ত হই। ছেলেটির নাম আবদুস সাত্তার খান। সে একজনকে ঠিক করে দেয় যিনি প্রতিমাসে আমাকে দুই হাজার টাকা দেবেন এই বিশেষ নিরাময়মূলক ক্লাসের জন্য, যাতে স্কুল টাইমের বাইরে শিশুদের বাড়তি পরিচর্যা করা যায়। টাকা দেবেন মনোয়ার ভাই। তারা ‘গ্রাম পাঠাগার আন্দোলন’ নামের একটা কার্যক্রম শুরু করেছেন। তাদের স্বপ্ন গ্রামে গ্রামে হবে পাঠাগার। সেখান থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে গ্রামের সমস্যা সমাধানের। গ্রামের মানুষেরা একত্রিত হয়ে ঠিক করবে তাদের সমস্যা কি, তা কিভাবে সমাধান করা যায়। নিজেরাই এখানে গতর খাটাবে, অর্থ দিবে, বুদ্ধি দিবে। মোট কথা নিজেদের গ্রাম সাজাবে নিজেরাই। তারা তাদের এই চিন্তার কথা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে গ্রাম পাঠাগার আন্দোলনের মাধ্যমে।

তাদের সাহস পেয়েই আমি শুরু করে দেই কাজ। আমার মনে না থাকলেও মাস শেষ হবার আগেই মনোয়ারের ফোন পাই, ‘আপা আজ টাকাটা দিতে চাই, কত দেব?’ ভাবা যায়! তারপর আমাদের গাংনীর আরেক ছেলে আমাদের প্রিয় রেজাও তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে এখানে সহযোগিতার ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং তার ফলে কাজের পরিধি একটু বেড়ে যায়। আমি দুই হাজার টাকা দিয়ে প্রথমে শুধুমাত্র প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুদের জন্য বিশেষ পাঠের ব্যবস্থা করলেও পরে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিশুদের জন্য আরেকটা ক্লাসের ব্যবস্থা করি। তাতে আমার মাসে খরচ হচ্ছে ৪,০০০ টাকা।

এই প্রতিশ্র“তি পাবার পর আমি এই পিছিয়ে পড়া শিশুদের মা সমাবেশ করি এবং এই কাজের পরিকল্পনার কথা জানাই। তারা সবাই এতে খুশি হন এবং তাদের শিশুদের স্কুলে ও বিশেষ পাঠে দেবার জন্য প্রতিশ্র“তি দেন। আর শিক্ষকের বেতনের জন্য প্রয়োজনীয় টাকা পেয়ে গেলেও, অভিভাবকদের অংশগ্রহণ করানোও আমার কাছে জরুরি মনে হল। কারণ সহজে কোন কিছু পেলে তার মূল্য থাকে না। তাদের কাছ থেকে মাসিক সামান্য কিছু বেতন নেওয়া হল আর যাদের অবস্থা খুবই হতদরিদ্র তাদের একেবারেই ফ্রি করে দেওয়া হল। তাতে দেখা যাচ্ছে প্রতি মাসে শিক্ষকের বেতন পরিশোধ করেও আমার স্কুল ফান্ডে বেশ কিছু টাকা জমা হচ্ছে। এক মাসে একজন শিক্ষক চিকিৎসাজনিত ছুটি নিলে সেই টাকা থেকে বেতনের ব্যবস্থা করে একজন প্যারা-শিক্ষকের ব্যবস্থা করে ছুটিতে যাওয়া শিক্ষকের অভাব পূরণের ব্যবস্থা করে নিয়েছি। আধবেলা কাজের জন্য তাকে ১,৫০০ টাকা দিলেই চলছে। প্যারা-শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে স্কুলটাকে এক শিফটেই চালিয়ে নিতে পারছি। এবং সামান্য সহযোগিতা পেলে পরের বছরও এই কার্যক্রম চালিয়ে যাবার সাহস পাচ্ছি।

তিন মাসের পরিচর্যাতেই অনেক পরিবর্তন এসেছে শিশুদের। যারা বর্ণমালা চিনত না ঠিকমত এখন তারা ভাঙ্গা ভাঙ্গা উচ্চারণে গল্পের বই পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে যে তারাও পারে। আমি নিশ্চিত এই শিশুরা আর ঝরে পড়বে না কোনদিন এবং ক্রমশ উন্নতি করবে।

আমার মনে হয় বাংলাদেশের প্রতিটা স্কুলেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং সেটা সম্ভব। কেন যে আমরা সবসময় সবকিছুর জন্য সরকার বা কোন এনজিও বা বিদেশি সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকি কে জানে! আপনিও পারেন আপনার গ্রামের স্কুলে এমন একটা কাজ শুরু করতে। আজই পারেন। যেখানে খেলতে খেলতেই এমন কাজ হয়ে যায় সেখানে পরিকল্পনা করে আগালে কতকিছুই না হতে পারে!

রাজনীতিতে জগাখিচুড়ি ও ধর্মীয় দলে গোঁজামিল – নূরুল আনোয়ার

নাস্তিকেরা ধর্মের বিরুদ্ধে যাহা করিয়াছেন মৌলানারা তাহার একশ গুণ বেশি ধর্মের ক্ষতি করিয়া চলিয়াছেন বলিয়াই মনে হইতেছে। মৌলানারা একশ দলে বিভক্ত হইয়া আছেন, আর আমাদের সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীরা নিজ নিজ স্বার্থে তাঁহাদের যথেচ্ছ ব্যবহার করিতেছেন

৬ এপ্রিল ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ

৬ এপ্রিল ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ

রাজনীতির সংজ্ঞাটা কি? আমি অনেকদিন ধরে আমার মোটা মাথা দিয়ে চিন্তা করে কোনরকম কিনারা করতে পারছিলাম না। ভেবে পাইনি এটা কোন ধরনের বস্তু। মানুষের মাথায় যখন তাত্ত্বিক চিন্তা কাজ করে না তখন সহজভাবে জিনিশটাকে বোঝার চেষ্টা করে। তখন পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে তন্নতন্ন করে দেখে তার কাক্সিক্ষত বস্তুটি খুঁজে পাওয়া যায় কিনা। আমি অনেকদিন ধরে তাই করছিলাম। প্রতিদিন পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন, সভা-সমাবেশ ইত্যাদি দেখেশুনে, বোঝার চেষ্টা করে একটা জায়গায় স্থির হয়েছিলাম যে ইচ্ছে করলে রাজনীতির একটা সংজ্ঞা আমরা দাঁড় করাতে পারি। আমি তাই করতে চেষ্টা করলাম।

একবাক্যে বললে, রাজনীতিবিদরা পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশন, সভা-সমাবেশ এবং হাল আমলে সৃষ্ট টকশোতে দেশের কল্যাণের নামে যা কিছু বলে বেড়াচ্ছেন তাকে হয়তো রাজনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। আরো একটু খোলাসা করে বলি তো দেশের কল্যাণের নামে ভালোমন্দ, সত্যমিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়, বিচার-অবিচার, আদর্শ-অনাদর্শ, কাজ-অকাজের কথার মিশেল দিয়ে এবং ওগুলোর মাধ্যমে ককটেল বানিয়ে একপক্ষের ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং অন্যপক্ষের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করার জন্য রাজনীতিবিদরা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে যা কিছু প্রচার করেন তাকেই রাজনীতির তত্ত্বকথা বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে।

সম্প্রতি যা দেখছি, শুনছি এবং বুঝছি তাতে রাজনীতির জন্য এধরনের একটা সংজ্ঞা তৈরি করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে আমার মনে হয়। রাজনীতিবিদরা বলে থাকেন রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কথাটা একসময় এরশাদ সাহেব প্রায়ই বলতেন — তাঁর মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছিল কথাটা। রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই — এ সংজ্ঞার আলোকে তিনি যা ইচ্ছে করতেন, এখন যেমন তিনি সকালে একরকম এবং বিকেলে আরেক রকম কথা বলেন। তখন তাঁর এ মত নিয়ে কেউ দ্বিরুক্তি করেননি, এখনো করেন না। তার মানে কি এরশাদ সাহেবের রাজনীতির সংজ্ঞাকে সকলে কম বেশি মেনে নিয়েছেন?

এরশাদ সাহেব তো একটা উদাহরণ। তাঁর মতো রাজনীতিবিদ খুঁজলে আরো ভূরি ভূরি পাওয়া যাবে। আমরা যদি কোন রাজনীতিবিদের জীবনের একেকটি দশক ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি তাহলে তাঁদের কথার মধ্যে সামঞ্জস্যের চেয়ে অসামঞ্জস্যই বেশি ধরা পড়বে। এর মানে আমাদের রাজনীতিবিদরা মিথ্যার ভিত্তির ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এবং এ মিথ্যার বেসাত করে তাঁরা রাজনীতি করছেন। আমাদের এ রাজনীতিবিদদের দেখতে দেখতে আমরা সকলে একরকম অভ্যস্ত হয়ে উঠছি যে তাঁরা যা করছেন তাই স্বাভাবিক মনে করছি। আমরাও ধরেই নিয়েছি রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। সুতরাং যার শেষ নেই তার মধ্যে সত্য যতই থাকুক মিথ্যার মিশেল অবশ্যই দিতে হবে এবং সত্যি সত্যি তাঁরা তা দিয়েই চলেছেন। ফলে রাজনীতিতে আমরা শেষ জিনিসটা দেখতে পারছি না। রাজনীতিবিদদের এ অপকর্ম আমরা আগে থেকেই মেনে নিয়েছি। এখন তাঁদের করুণা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার থাকে না।

এ তো গেল রাজনীতিবিদদের কথা। তাদের পাশাপাশি আমাদের বুদ্ধিজীবীদের অবস্থানটা এখন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যাঁরা রাজনীতিবিদদের দেখাদেখি হোক কিংবা হালুয়া-রুটিতে ভাগ বসানোর জন্য হোক নিজের অতীত আদর্শকে বিসর্জন দিয়ে একেকটা রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় এসে দাঁড়াতেও পিছপা হন না। যাঁরা আগে লেনিনবাদ, মার্কসবাদ ইত্যাদিতে বিশ্বাস করতেন তাঁরা এখন মওদুদীবাদ কিংবা ধর্মতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আবার যাঁরা ধর্মতন্ত্র, স্বাধীনতাবিরোধিতা ইত্যাদির প্রচার চালিয়েছিলেন, কিংবা পক্ষ নিয়েছিলেন তারা প্রগতিশীল রাজনীতির ধ্বজা উড়িয়ে চলেছেন। নানা কারণে রাজনীতিবিদদের করুণা করা গেলেও এসব বুদ্ধিজীবীদের করুণা আমরা কিভাবে করব?

এ দুটি শ্রেণির লোকজন যা করে চলেছেন তাতে তাঁদের সুবিধাবাদী ছাড়া আর কি বলা যায়? এর সদুত্তর কে দেবে? এসব জাতি-প্রজাতি নিয়ে যত নাড়াচাড়া করা হয় তত দুর্গন্ধ ছড়ায়। সুগন্ধ আমরা তাদের কাছ থেকে পাব না। তাঁদের কাছ থেকে ভাল কিছু আশা করা আমরা ছেড়ে দিয়েছি।

ওপরে যেসব কথা বলেছি ওগুলো বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। সম্প্রতি রাজনীতিতে তাঁদের দেখাদেখি আরেকটা শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে। তাঁরা আগেও ছিলেন, কিন্তু এখন যেভাবে আছেন সেভাবে ছিলেন না। এ শ্রেণিটি কারা? এ শ্রেণিটি হলেন মৌলানারা, যাঁদের আমরা আলেমসমাজ বলে থাকি। দেশের মানুষের মনের নরম জায়গায় এ আলেমসমাজের একটা স্থান ছিল। আমাদের কেন জানি মনে হচ্ছে এ আলেমসমাজ অর্থা মানুষের নরম জায়গার মানুষগুলো আস্তে আস্তে  মানুষের মনের কঠিন জায়গায় চলে যাচ্ছে। এটা মোটেই শুভ লক্ষণ নয়। আমাদের ভোঁতা মাথায় কাজ করে না তাঁরা কি সত্যি সত্যি নিজেরা উদ্বুদ্ধ হয়ে ধর্ম গেল ধর্ম গেল বলে চিকার করছেন, নাকি আমাদের সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ বা বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের স্বার্থে রাজনীতিতে আলেমদের ব্যবহার করছেন।

জাতি হিসেবে আমরা ধর্মপ্রাণ জাতি। ধর্মের উপর কোন আঘাত আসুক আমরা কেউ চাই না। আমরা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকল ধর্মের কথা মাথায় রেখে বলছি। সম্প্রতি ধর্ম নিয়ে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে সেটা আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে আমরা জানি না। মধ্যপন্থী ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে বহির্বিশ্বে আমাদের দেশের একটা সুনাম রয়েছে। আমাদের সংশয় হয় আমরা সেটা ধরে রাখতে পারব কিনা। বাংলাদেশ যদি সত্যি সত্যি আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সিরিয়া, মিশর, লিবিয়া ইত্যাদি দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়ায়, সেটা দেশের জন্য তো নয়ই, আলেমসমাজের জন্যও সুফল বয়ে আনবে না। হিংসা সব সময় হিংসা বাড়ায়।

সবসময় একটা প্রশ্ন জাগে আমাদের আলেমসমাজ তো আগে এত হিংস্র ছিলেন না। সমাজের একটা কোমল শ্রেণির মানুষ হিসেবে সকলে তাঁদের জানতেন। মাদ্রাসার একেবারে নিচু শ্রেণিতে পড়া একটা ছাত্রকে দেখলে আমাদের ঈর্ষা হয়। কারণ সমাজের মানুষ মাদ্রাসায় পড়ে ধর্মকর্ম করে বলে ওই নিচু ক্লাসে পড়া ছাত্রটিকেও হুজুর বলে সম্বোধন করেন, মাঝে মাঝে সালাম দিতেও তাঁরা দ্বিধা করেন না। যদিও সকলে জানেন, ওই ছাত্রটির মধ্যে জ্ঞান-গরিমার বহর খুবই অল্প।

একটু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে, মাদ্রাসায় যারা পড়েন বেশির ভাগ ছাত্র সমাজের গরিব এবং খেটে খাওয়া পরিবারের সন্তান। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা খুব কম মাদ্রাসায় পড়ে। ধর্মীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং মাদ্রাসার শিক্ষার জন্য যেসব মৌলানা চিকার করেন তাঁদের সন্তানেরাও খুব কম মাদ্রাসায় পড়ে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় একটা সংবাদ ছাপা হয়েছিল যে জাঁদরেল মৌলানা রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগের সন্তানেরা মাদ্রাসায় পড়ে না। তাঁরা তাঁদের সন্তানদের দেশের বাইরে রেখে পড়াশুনা করান। তাহলে মাদ্রাসা শিক্ষা কাদের জন্য? শুধুই খেটে খাওয়া মানুষের সন্তানদের জন্য?

এই বৈষম্য ছাড়াও আরেকটি আশঙ্কার বিষয় তাদের কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ধর্মের লাঠি ধরিয়ে দিয়ে মৌলানা-রাজনীতিবিদরা তাদের রাস্তায় নামিয়ে আনছেন। তাদের মুখ দিয়ে জেহাদের কথা বলানো হচ্ছে ধর্ম গেল ধর্ম গেল বলে। আমি বাঁশখালীতে নিজের চোখে দেখে এলাম মাদ্রাসার কচি কচি শিশুরা ধর্মের লাঠি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। তাদের দেখাদেখি স্কুলের শিশুরাও থেমে নেই। এটা আমাদের জন্য তো শুভ লক্ষণ হতে পারে না। এ শিশুরা যখন বড় হবে, না বুঝে না শুনে তারা বাংলাদেশকে একটা আফগানিস্তান কিংবা পাকিস্তান বানাতে চাইবে না তার নিশ্চয়তা কি!

নাস্তিকদের নিয়ে কথা উঠেছে। বাংলাদেশে নাস্তিকদের অস্তিত্ব রয়েছে সেটা আজ নতুন নয়। যাঁরা নাস্তিক ছিলেন তাঁদের নিয়ে কথা উঠেছে অনেক আগে থেকে। তাঁদের বিরুদ্ধে আন্দোলান সংগ্রাম কম হয়নি। কিন্তু ফল কিছু হয়েছে বলে তো মনে হয় না। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে হযরত মুহম্মদের (সাঃ) সময়েও নাস্তিক ছিল। কিন্তু কখনো তাঁরা লাঠি নিয়ে তাড়াতে যাননি, যার যার নিজের মত চলার অধিকার দিয়েছিলেন। তাঁদের উদারতা ছিল। কিন্তু আমাদের মৌলানাদের একাংশের মধ্যে এমন কোন উদারতা দেখি না। এটা আমাদের খুব কষ্ট দেয়।

খারাপ জিনিশ যত নাড়াচাড়া করা হয় তত দুর্গন্ধ ছড়ায়। মৌলানা সাহেবরা যাকে খারাপ জিনিশ বলে জানেন তাঁরা সে জিনিসটাকে এত নাড়াচাড়া করেন কেন? আমরা নাস্তিকের পক্ষ নিয়ে বলছি না। বাংলাদেশে নাস্তিকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। গুটিকয় যারা আছেন তারা যদি আস্তিকের কানের কাছে এসে চিকার করে বলে, তোমরা সকলে নাস্তিক হয়ে যাও, নাস্তিক হয়ে যাও, আমাদের তো মনে হয় না আস্তিকেরা নাস্তিকদের কথা শুনবেন। কারণ বিশ্বাসের ব্যাপারটি এমন একটি বস্তু যে মাথায় একবার ঢুকে গেলে হাতুড়ি দিয়ে পিটালেও সেটা বেরুতে চায় না। কোন মতের পেছনে দ্বিমত করেন এমন মানুষ থাকতেই পারে। যদি সেটা অশোভন কিংবা অশ্লীলতার পর্যায়ে না যায় তাহলে তাকে তার মত থাকতে দিলেই হয়।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, আল্লাহ-রাসুলের বিরুদ্ধে কথা বললে মুসলমানদের বুকে লাগবে সেটাই স্বাভাবিক। যারা এসব কাজ করেন সত্যি সত্যি অন্যায় করেন। আমাদের কেউ কেউ আল্লাহ-খোদা না মানতে পারেন, তার অর্থ এই নয় যে অন্যদের আঘাত দিয়ে কথা বলতে হবে। এ তো গেল নাস্তিকদের বিষয়। কিন্তু মৌলানা সাহেবরা কি করছেন? মৌলানারা কি মৌলানাদের কাতারে আছেন?

২০ এপ্রিল বরিশালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমাবেশ

২০ এপ্রিল বরিশালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমাবেশ

আমরা বুক ফুলিয়ে বলি ইসলাম ধর্মে কোন বর্ণ-গোত্র-দল ইত্যাদির অস্তিত্ব নেই। মৌলানা সাহেবরা কি বলবেন বর্তমানে ইসলামে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে ইসলাম ধর্ম আদর্শের জায়গায় স্থির আছে? যদি স্থির থাকে তাহলে আবারও প্রশ্ন করি, বাংলাদেশে এত এত ইসলামি দল কেন? সত্যিকার অর্থে আমরা যদি ইসলাম মেনে থাকি তাহলে ইসলামি রাজনীতির একটাই দল হওয়া উচিত ছিল। কোন দলের নাম করে লাভ নেই, যদি গুণে দেখা হয় বাংলাদেশে ইসলামি রাজনৈতিক দল বা গোত্রের সংখ্যা একশর কম নয়। এই যে একশ ইসলামি রাজনৈতিক দল বা গোত্র রয়েছে এদের মতাদর্শ কি একরকম? উত্তর সকলের জানা — নানা দল নানা মতাদর্শে বিশ্বাসী হতে বাধ্য। কিন্তু ইসলামে তো এত মতাদশের্র স্থান নেই। ইসলামের মতাদর্শ হওয়ার কথা ছিল একটা তবে এত দলের আবির্ভাব কেন?

মৌলানা সাহেবেরা কি জবাব দেবেন আমরা জানি না। হয়তো উত্তর আমরা পাব। আপনারা বলবেন, আমাদের নানা রকম মতাদর্শ থাকতেই পারে। আমরা কোরান-হাদিস, আল্লাহ-রাসুল ইত্যাদি বিশ্বাস করি, কিন্তু নাস্তিকতা করি না। জবাবের যুক্তি আছে। কিন্তু ইসলামে যে এতগুলো গোত্র, দল রয়েছে সেগুলো কি সত্যের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে? সত্যের ভিত্তির উপর যদি দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে এতগুলো গোত্র বা দলের সৃষ্টি হলো কিভাবে? ইসলামে এতগুলো সত্যের স্থান কোথায়?

নাস্তিকেরা এক বাক্যে সব শেষ করে দিল — আমরা ওসব মানি না। কিন্তু আপনারা মেনে কি করছেন? যে সকল মানুষ ইসলামের এক পতাকাতলে ছিল আপনারা নানারকম মতাদর্শ তৈরি করে, নানা দলে বিভক্ত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন না? যেখানে আপনারা ইসলামকে একশটি মত এবং দলে বিভক্ত করেছেন সেখানে কোন দল এবং মতকে আমরা উকৃষ্ট মনে করব? আমরা ইসলামে বিশ্বাস করি। ইসলামের উদারতাকে পছন্দ করি। কিন্তু ইসলামের সে বিশ্বাস এবং উদারতাকে আপনারা বুকে ধারণ করেন কিনা এ প্রশ্ন আমাদের জাগে।

যেখানে একশটা দল রয়েছে সেখানে সব দল ইসলামি আদর্শ লালন করে সেটা আমরা বিশ্বাস করতে পারি না। আমাদের কেন জানি মনে হয়, প্রত্যেকটা ইসলামি দলে কম বেশি ত্রুটি রয়েছে এবং মৌলানা সাহেবরা তা আমাদের কাছে খোলাসা করেন না নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী জেনে। খাবার-দাবারে যেভাবে ফরমালিন দিয়ে মানুষকে অসুস্থ করে তোলা হচ্ছে, ধর্মের ভেতরও সেরকম একধরনের ফরমালিন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে ফরমালিনমুক্ত দল কোনটি মৌলানা সাহেবরা বলবেন কি?

আমরা মনে করতে বাধ্য হচ্ছি, নাস্তিকেরা ধর্মের বিরুদ্ধে যা করছেন মৌলানারা তার একশ গুণ বেশি ধর্মের ক্ষতি করে চলেছেন। আপনারা একশ দলে বিভক্ত হয়ে আছেন, আর আমাদের সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীরা আপনাদের যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। কারণ তাঁরা ভালমন্দের ধার ধারেন না। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই — এই বাক্যকে আদর্শ হিসেবে লালন করে তাঁরা নিজেদের স্বার্থে আপনাদের লাঠি হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। আপনাদের আলেম সমাজ হিসেবে সাধারণ মানুষ যে শ্রদ্ধা করত অপরাজনীতির খপ্পরে পড়ে আপনাদের সেই শ্রদ্ধা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে এ কথাটা বুঝতে আপনারা বোধকরি একটু দেরি করে ফেলছেন।

একটা উদাহরণ দিয়ে আমি আমার লেখাটা শেষ করতে চাই। আমি চট্টগ্রামে আমার গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। তখন দেশজুড়ে জামায়াতের সহিংসতা চলছে। চট্টগ্রামে তার রূপ ছিল ভয়াবহ। আমি বাড়িতে এসেছি জেনে গ্রামের পড়ালেখা জানে না এমন খেটে খাওয়া কিছু মানুষ আমার কাছে ছুটে এসেছিলেন। তাঁরা আমাকে বললেন, দেশে ইসলাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে কোন ইমান কাজ করছে না। আমরা এখন কি করব? সাঈদী সাহেবের মত একজন জবরদস্ত মৌলানাকে ফাঁসি দেওয়া হচ্ছে। এটাও কি সম্ভব?

একজন সেটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, সাঈদী সাহেব রাজাকার ছিলেন। তিনি রাসুলের নামে দরুদ পড়তেন না। তাঁর লোকজন চট্টগ্রামের দশজন মৌলানাকে খুন করার জন্য তালিকা তৈরি করেছে। আরেকজন বললেন, তাঁরা মাজার মানে না। আরেকজন বললেন, তারা ওহাবি, নবি মানে না। আরেকজন বললেন, সাঈদী সাহেবকে চাঁদে দেখা গেছে। আমার মোবাইলে তাঁর ছবি আছে। মসজিদের ইমাম সাহেব রাত দুইটার সময় সেই ছবি তুলেছেন।

এই অবস্থায় ব্যাপারটা একরকম হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাবার মত অবস্থা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমি অনেক কষ্টে তাঁদের থামিয়েছিলাম। আমি কি জবাব দেব স্থির করতে পারছিলাম না। আমি তাঁদের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা ধর্ম মানেন? সকলে জবাব দিলেন, মানি। আমি আবার জানতে চাইলাম, আপনারা নামাজ-রোজা করেন? তাঁরা সকলে জবাব দিলেন, জ্বি করি। আমি আরো জানতে চাইলাম, আপনারা রোজা-নামাজ কোথা থেকে শিখলেন? তারা জবাব দিলেন, আমাদের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে দেখাদেখি শিখেছি। আমি বললাম, তাহলে মৌলানাদের দরকার কি? তাঁদেরকে তাঁদের জায়গায় থাকতে দিন। তাঁরা যা ইচ্ছা করছেন করুন। আপনারা আপনাদের বিশ্বাসের জায়গায় স্থির থাকেন। অনেকে দেখলাম আমার কথার দ্বিমত করলেন না।

আমাদের প্রশ্ন, মৌলানা সাহেবরা বলবেন কি, গ্রামের এই যে চিত্র, তা কিসের লক্ষণ? আপনাদের শ্রদ্ধার জায়গাটা আপনারা কোথায় নিয়ে ঠেকিয়েছেন একটু ভাবুন তো! আপনাদের কবে শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের কবল থেকে আপনারা কখন ফিরে আসবেন সেটা জানতে আমাদের খুব ইচ্ছা করে।

লেখকের সকল বক্তব্যের সহিত সর্বজন একমত নহে

ফটোফিচার: মৃত্যুর মিছিল – মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

লেখা ও ছবি: মাহমুদ হোসেন অপু

আমি তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের ছবি তুলেছিলাম। বুঝতে পারিনি এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আমাদের আবার মুখোমুখি হতে হবে আরো একটি মৃত্যুমিছিলের। অবাক হই, প্রতিবার সরকারি উদ্ধার তপরতা সমন্বয়হীনতায় ভোগে। অহেতুক সময়ক্ষেপনে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। উন্নত উদ্ধার সরঞ্জাম নেই, রাতে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই, আটকে পড়া জীবিতদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ নেই… নেই, নেই আর নেই। এত ‘নেই’য়ের মাঝে স্বস্তির জায়গা একটাই: উদ্ধার তপরতায় সাধারণ মানুষের প্রাণপণ প্রচেষ্টা।

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

রোকেয়া ও সাম্প্রদায়িকতা – ফাতেমা-তুজ-জোহরা

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

মিসেস আর এস হোসেন তথা একালের বেগম রোকেয়া এক বিস্ময়ের নাম। লেখক জীবনের শুরুর ১৪ বছর বিহারের ভাগলপুরে থেকে বাংলা ভাষায় কথা বলার মত একটি লোক পাননি রোকেয়া। এরপর কলিকাতায় গিয়ে ১১ বছর উর্দু স্কুল পরিচালনা করার সময় যাদের পরিচারিকা, ছাত্রী বা শিক্ষয়েত্রী হিশাবে পেয়েছেন সবাই ছিলেন উর্দুভাষী। বাংলা ভাষার চর্চার এহেন বিরূপ পরিবেশেও তিনি বাংলা অনুশীলন করে যান। এর থেকে বড় বিস্ময় আর কি হতে পারে? বাংলা ভাষার প্রতি রোকেয়ার ভক্তি বৃথা যায়নি। তাঁর প্রতি বাংলা ভাষা তার কপাট বন্ধ রাখেনি। এর প্রমাণ পরবর্তীকালে তিনি এ ভাষার একজন তেজস্বিনী লেখক হিশাবে মর্যাদা লাভ করেছেন।

বেগম রোকেয়ার লেখক জীবনের স্বীকৃতি কিংবা তাঁর লেখার সমালোচনার ক্ষেত্রে আরেক ধরনের বিস্ময় আমরা লক্ষ্য করি। এক্ষেত্রে অবিভক্ত বাংলার সেই সময়ের শিক্ষিত গোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের প্রবণতা উল্লেখ করবার মতন। প্রথমেই উল্লেখ করি বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম কোরান ও হাদিস শরিফের অনুবাদক গিরিশচন্দ্র সেনের কথা। তিনিই প্রথম বেগম রোকেয়ার রচনার সদর্থে সমালোচনা করেন। ১৯০৩ সালে গিরিশচন্দ্র তাঁর সম্পাদিত ‘মহিলা’ পত্রিকায় লেখেন, ‘প্রবন্ধ রচয়িত্রির প্রতি আমাদের আন্তরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা আছে।… তিনি বেশ বুদ্ধিমতী, চিন্তাশীল মনস্বিনী কন্যা। বঙ্গীয় মোসলমান কুলে অসামান্য নারী বলিয়া আমরা তাঁকে শ্রদ্ধা, আদর ও সম্মান করি।’ হৃদয়বান ভাই গিরিশচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘মহিলা’ পত্রিকাতে ১৯০৩ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যে রোকেয়ার ২০টি প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়। বেগম রোকেয়ার এত লেখা তাঁর জীবনকালে আর কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় নাই।

বয়সে বেগম রোকেয়ার প্রায় ২০ বছরের ছোট, কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর স্বল্পস্থায়ী ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় রোকেয়ার নতুন-পুরানো কয়েকটি লেখা ছাপান। বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদের সাথে পত্রালাপে আমরা নজরুলকে বেগম রোকেয়ার কর্মকাণ্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতে দেখি।

অন্যদিকে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৌলবি আবদুল করিম বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধ-বাসিনী’র ভূমিকায় এই রচনার বিশেষত্বের দিকটি তুলে ধরেন: ‘অবরোধ-বাসিনী লিখিয়া লেখিকা আমাদের সমাজের চিন্তা-ধারার আর একটি দিক খুলিয়া দিয়াছেন। অনেকে অনেক প্রকার ইতিহাস লিখিয়া যশস্বী হইয়াছেন; কিন্তু পাক-ভারতের অবরোধ-বাসিনীদের লাঞ্ছনার ইতিহাস ইতিপূর্ব্বে আর কেহ লিখেন নাই।’

এ তো গেল একদিক। আরদিকে বেগম রোকেয়ার লেখালেখি ও কলিকাতায় তাঁর বালিকা বিদ্যালয় পরিচালনার বিরুদ্ধে প্রতিত্রিুয়াশীল মোল্লা মৌলবিরা ফতোয়া দেওয়া থেকে শুরু করে পত্রিকায় রোকেয়ার নামে কুৎসা রটানো পর্যন্ত কোন কিছুই বাদ রাখেন নাই।

মোল্লাদের এসকল প্রচেষ্টা বৃথা যায়। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় রোকেয়ার সাহিত্যকর্ম নিয়ে সেই সময়ে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি বা সমালোচকদের — যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — অবিরাম নীরবতা।

বেগম রোকেয়া শুধুমাত্র নারী জাগরণের জন্য কিছু পুস্তক প্রচার এবং বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন বললে ভুল বলা হয়। তাঁর রচনাবলিতে সেই সময়ের হেন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নাই যা তিনি আলোচনা করেন নাই। ঔপনিবেশিক ভারত, ভারতের মুক্তির উপায়, কৃষকের সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, সাম্প্রদায়িকতার বিপদ, শিক্ষাদীক্ষার সমস্যা — কি আলোচনা করেন নাই তিনি!

গিরিশচন্দ্র সেন এন্তেকাল করেন ১৯১০ সালে। বেগম রোকেয়া দেহ রাখেন ১৯৩২ সালে। এর পর আরো নয়টি বছর বেঁচে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের এত বিশাল লেখার স্তূপে বেগম রোকেয়ার উল্লেখ পর্যন্ত নাই? তাঁর সম্পর্কে ভাই গিরিশচন্দ্রের আবার শরণ নেই: ‘তিনি মোসলেম সম্ভ্রান্ত ঘরের পতœী, তিনি বেশ বুদ্ধিমতী, চিন্তাশীল মনস্বিনী কন্যা।’

তবে কি সেই সময়ের প্রধান সংকট সাম্প্রদায়িকতাই বেগম রোকেয়া সম্পর্কে সাহিত্য মহারথীদের নিশ্চুপ থাকার কারণ? ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তৎকালীন ভারতবর্ষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময়ের অনেক রথী মহারথী সাম্প্রদায়িকতার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করেন কিংবা নিজেরাই সাম্প্রদায়িকতার ঝাণ্ডা উড়িয়েছেন। দেড়শত বছরের এয়ুরোপীয় বিদ্যা ও উপনিষদের ঐতিহ্য থাকলেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পাল্টা কোন রাজনীতি পেশ করতে ব্যর্থ হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের মত বর্ণহিন্দুরা। ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক স্বার্থের রেষারেষিতে নিজের দেশটাকেও তাঁরা দুই টুকরা করেন।

অনেকে বলবেন সাম্প্রদায়িক কারণে নয় কবিগুরু কিংবা সেই সময়ের প্রধান সাহিত্যিকরা এমনিতেই বেগম রোকেয়ার লেখাজোখা লক্ষ্য করেন নাই। তবে আমরা বলি সেটা আরো বড় সমস্যা। যখন কোন দেশের শ্রেষ্ঠ লেখকরা অপর মহৎ লেখকের লেখা চিনতে পারেন না সেখানে অন্তত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা সম্ভব নয়। আজ পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে করুণ হাল তা অকারণ নয়।

এবার আসি পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে। বর্তমান যুদ্ধাপরাধবিরোধী জাতীয় আন্দোলনকে রোধ করতে হেফাজতে ইসলাম নামে একটি গোষ্ঠী ১৩ দফা দাবি পেশ করেছে। তাদের এসব দাবি শুনলে মনে হয় যেন আজ এদেশে এসলাম অতল সাগরে ডুবে যাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ডুবতে যাওয়া সাঈদী, গোলাম আযমদের রক্ষা করতে হেফাজতে ইসলাম মাঠে নেমেছে। হেফাজতের ১৩ দফায় নারীবিদ্বেষের কথা নতুন করে বলে আর লাভ নাই। কিন্তু ফরহাদ মজহারের কথা বলতে হবে। তিনি বেগম রোকেয়াকে ঢাল করে তাঁর ‘নারীবাদী’ এনজিও প্রবর্তনা, উবিনীগকে যেমন নারীশোষণের কাজে লাগিয়েছেন ঠিক তেমনি হেফাজতের ১৩ দফাও আমলে নিয়েছেন।

আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। বেগম রোকেয়ার Sultana’s Dream বা ‘সুলতানার স্বপ্ন’ জগদ্বিখ্যাত রচনা। আজ তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো ‘হেফাজতের স্বপ্ন’ লিখতেন। তাঁর ‘সুবেহ্ সাদেক’ নামা ক্ষুদ্র প্রবন্ধখানিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতি প্রাসঙ্গিক। নারীর প্রতি বিরুদ্ধাচারণ ও নারীবাদী এনজিওসমূহের প্রতি বেগম রোকেয়ার মনোভাব এই প্রবন্ধে সূক্ষ্মভাবে উঠে এসেছে।

সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা করে উন্নতি কখনো সম্ভব নয়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করুন দেশভাগের অন্যতম কারণ। আর বর্তমান কালের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আবারো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেশে সমূহ অকল্যাণ বয়ে আনবে। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি বেগম রোকেয়ার সীমাহীন আস্থার কথা যেন আমরা ভুলে না যাই।