মুক্তিযুদ্ধের চেতনা–সলিমুল্লাহ খান

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কি বুঝায় তাহা লইয়া সম্প্রতি একটি সূক্ষ্ম বিতর্কের সূচনা হইয়াছে। কিন্তু কয়েকটি মোটা কথা লইয়া আশা করি কেহ বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইবেন না। ইহাদের মধ্যে প্রধান কথা খোদ ‘স্বাধীনতা’ অথবা যে কোন জাতির বা জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইনানুগ অধিকার।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশ কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইহার দুই সপ্তাহ পরে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার। ইহাতেই প্রমাণ বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য অন্তত সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল না। মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত এই সরকার ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রকে প্রামাণ্য দলিল বলিয়া গণ্য করিলে কয়েকটি বিষয়ে বিতর্কের সমাপ্তি হয়। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্র জারি হইয়াছিল ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সালের ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে। এই প্রতিনিধিগণ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হইয়াছিলেন।


১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ কি কারণে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তাহার একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। সেই ব্যাখ্যা অনুসারে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বতস্ফূর্তভাবে কিম্বা আগ বাড়াইয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নাই। স্বাধীনতা ঘোষণা করিতে তাহাদিগকে বাধ্য করা হইয়াছিল। কারণ ‘পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে।’
খোদ ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রেই উল্লেখ করা হইয়াছিল ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখ-তা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান’। দুঃখের মধ্যে, স্বাধীনতার ঘোষণা লইয়া কেহ কেহ পরকালে একপ্রস্ত বিতর্কের সূচনা করিয়াছিলেন। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রের প্রামাণ্যতা কি কেহ আজ পর্যন্ত অস্বীকার করিয়াছেন? না করিলে জিজ্ঞাসা করিতে হয় এই ঘোষণাপত্রের কোন বক্তব্যটিকে তাহারা অস্বীকার করিতেছেন?
প্রশ্ন উঠিবে ২৬শে মার্চ তারিখে কেন স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা হইয়াছিল। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে তাহার একটা উত্তরও পাওয়া যাইতেছে। ঘোষণাপত্র অনুসারে এই উত্তরটি পাঁচ দফায় পাওয়া যায়।
এক নম্বরে, [পাকিস্তানের] একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানায়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দুই নম্বর কথা, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জনকে নির্বাচিত করেন।
তিন নম্বর কথা, সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে [পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি] জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে মিলিত হইবার জন্য আহবান করেন।
চার নম্বরে, [পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ] এই আহুত পরিষদ-সভা স্বেচ্ছাচারী ও বে-আইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন।
আর পরিশেষে, পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
এই পর্যন্ত যাহা বলা হইল–অর্থাৎ পাকিস্তান কর্তৃক অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধ চাপাইয়া দেওয়া–তাহাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রকৃত আর পর্যাপ্ত কারণ। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছিল আরো একটি বাড়তি কারণ। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ শুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা করিয়াই বসিয়া থাকে নাই। ২৫শে মার্চ মধ্যরাত্রি হইতে তাহারা ‘বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের উপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসংখ্য অপরাধ সংঘটন’ করে।
পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়াছিল আর গণহত্যার মতন অপরাধ ও অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপ করিয়াছিল বলিয়াই বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছিল আর বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করিয়াছিলেন। এই ঘোষণাপত্রের মধ্যস্থতায় তাঁহারা একটি ন্যায়যুদ্ধের আইনানুগ ভিত্তি রচনা করিয়াছিলেন। পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে তাই বলিতে হইবে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের চাপাইয়া দেওয়া অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও দমনপীড়নের জওয়াবে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের ভূখ-ের উপর আপনার কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। এই যুদ্ধে জনগণের মূলধন ছিল তাহাদের ‘বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনা’।


এই পর্যন্ত যাহা বলা হইল–অর্থাৎ অন্যায় যুদ্ধের মুখে ন্যায়যুদ্ধ–তাহা সত্যের অর্ধেক মাত্র। প্রশ্ন উঠিবে ন্যায়যুদ্ধের মধ্যস্থতায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাইবে তাহার লক্ষ্য কি হইবে। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে তাহারও একটি জওয়াব পাওয়া যায়। এই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করিয়াছিল সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সামান্য কারণ, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত’ করা।
বাংলাদেশের ভূখ-ে কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনগণ সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের শর্তহীন আত্মসমর্পণের ঘটনায় সেই কর্তৃত্বই নিরঙ্কুশ হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিজয় লাভ করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর জনগণ যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হইয়াছিলÑযাহার প্রকাশ ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে পাওয়া যায়Ñতাহাই তো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’।
জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার অর্থাৎ স্বাধীনতা পাওয়ার ৪২/৪৩ বৎসরে আমাদেরও খতিয়ান খুলিয়া দেখিতে হইবে আমরা কি পাইলাম। স্বাধীনতা লাভের চারি বৎসরও পার হইতে না হইতে দেশে কেন সামরিক শাসন নামিয়া আসিয়াছিল? এই জিজ্ঞাসা আমাদের করিতেই হইবে। সেই চারি বৎসরে যাহারা ছিলেন জাতির মনোনীত গণপরিষদ বা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্য তাহারা কেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ‘বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনা’র মধ্যস্থতায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে পারিলেন না? ইহাও জিজ্ঞাসার বিষয়।
ইহার পর হরেদরে পনের বৎসর কাটিয়াছে এক ধরনের না আর ধরনের সামরিক শাসনে। ১৯৯০ সনের পর হইতে–মধ্যখানের দুই বছরের কথা ছাড়িয়া বলিতেছি–আবার নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হইয়াছে। কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্টের কি নিবারণ হইয়াছে? ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচার’ কি প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে? যদি না পাইয়া থাকে, তবে তাহার জন্য দায়ী কে? চুপ করিয়া থাকা নহে, এই সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
পাকিস্তান ‘স্বাধীন’ হইয়াছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট তারিখে। ইহার দশ বৎসরের মাথায়Ñ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর নাগাদÑসেই দেশে পহিলা সামরিক শাসন প্রবর্তিত হয়। ১৯৬৪ সালের শেষদিকে এই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়া অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখিয়াছিলেন, ‘স্বাধীনতার ফলে আমরা কি পেলাম? আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য মিত্র শক্তির নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি যে, তাঁদের আর্থিক ও অন্য সাহায্যে আমরা কিছুটা অগ্রসর হয়েছি। আমরা যে পূর্ণ সাফল্য লাভ করতে পারিনি, তার একটি বড় কারণ ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবরের সামরিক শাসন প্রবর্ত্তনের পূর্বে যাঁরা শাসনকার্যে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা ছিলেন ইংরেজের গোলাম। স্বাধীনতার পরেও তাঁরা সেই গোলামীর মনোবৃত্তি ষোল আনা ছাড়তে পারেননি।’ ইহার সহিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরো একটি বাক্য যোগ করেন: ‘তারপর যাঁরা ছিলেন জাতির মনোনীত রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, তাঁদের সম্মানিত কয়েকজনকে বাদ দিয়ে বলতে হয় অধিকাংশের মূলমন্ত্র ছিল Nepotism এবং Pocketism। বাংলায় বলতে গেলে “আত্মীয় প্রতিপালন এবং পকেট পরিপূরণ”।’
এইসব দুর্নীতির কারণেই পাকিস্তানে সামরিক শাসনের প্রয়োজন হয় বলিয়া শহীদুল্লাহ সাহেব অনুমান করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনিও জানিতেন মাত্র শাসনকর্তার পরিবর্তনে দেশের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। পাকিস্তানের সামরিক শাসন সে দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করে নাই। শহীদুল্লাহ সাহেবের মতে, ইহার প্রধান কারণ জনসাধারণের অজ্ঞতা। তাঁহার কথামৃত সামান্য আরেকটু উদ্ধার করিলে মন্দ হইবে না: ‘অন্ধের পক্ষে দিন-রাত দুইই সমান। মূর্খের পক্ষে আযাদী ও গোলামী দুই সমান। যেখানে প্রকৃত প্রস্তাবে শতকরা ৪/৫ জন শিক্ষিত সেখানে আমরা কি আশা করতে পারি? মূর্খ ও নাবালক দুইই সমান। নাবালককে ফাঁকি দিয়ে তার আত্মীয়-স্বজনেরা নিজেদের জেব ভর্তি করে। এদেশে তাই ঘটেছে।’
বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে আজ ৪৩ বছর হইল। বাংলাদেশেরও অনেক গতি হইয়াছে। কিন্তু সমাজের ভিত্তি যে জনগণÑবাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী যে জনগণÑতাহাদের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হইয়াছে? আমাদের দেশে এই ৪৩ বছরেও–অন্য কথা না হয় বলিলাম না, বলেন দেখি–প্রকৃত প্রস্তাবে শতকরা কতজন শিক্ষিত হইয়াছেন?


আমরা নিত্য বলিয়া থাকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হইয়াছেন। কিন্তু আমরা তাঁহাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এই ৪৩ বছরের মধ্যে তৈয়ার করিতে পারি নাই। তাহা হইলে কি করিয়া আমরা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ নিশ্চিত করিব? ইংরেজি ২০০০ সনের ১২ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মহান লেখক আহমদ ছফা এই প্রশ্নটি তুলিয়াছিলেন। আমি আজও প্রশ্নটির কোন সদুত্তর পাই নাই। তাই প্রশ্নটির একটু সবিস্তার বয়ান করিতে হইতেছে।
আহমদ ছফার জন্ম চট্টগ্রাম (দক্ষিণ) জেলার অন্তপাতী পটিয়া উপজেলায়। তাঁহার গ্রামের নাম গাছবাড়িয়া। এখন তাহা সম্প্রতি গঠিত চন্দনাইশ উপজেলায় পড়িয়াছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ ছাড়িয়া আগরতলা হইয়া কলিকাতায় আশ্রয় লইয়াছিলেন। যুদ্ধশেষে তিনি প্রথমে ঢাকায় আসেন, পরে নিজ গ্রামে গেলেন। ইহার পরের কথা তাঁহার লেখায় পাওয়া যাইতেছে: ‘১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে যতবারই আমি গ্রামে গেছি, গ্রামের মানুষদের একটি বিষয়ে রাজি করাতে বারবার চেষ্টা করেছি। গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং মাতব্বর-স্থানীয় মানুষদের একটা বিষয়ে রাজি করাতে বারবার চেষ্টা করেছি। আমি তাঁদের বোঝাতে চেষ্টা করেছিলামÑআমাদের গ্রামের প্রায় একশ মানুষ পাকিস্তানী সৈন্য এবং রাজাকার আলবদরদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। আমাদের গ্রামের মাঝ দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রাস্তাটি চলে গেছে। আমি প্রস্তাব করেছিলাম, গ্রামের প্রবেশমুখে মুক্তিযুদ্ধে নিহত এই শতখানেক মানুষের নাম একটি বিলবোর্ডে লিখে স্থায়ীভাবে রাস্তার পাশে পুঁতে রাখার জন্য।’
আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন: ‘আরো একটা বাক্য লেখার প্রস্তাব আমি করেছিলাম। সেটা ছিল এরকম–হে পথিক, তুমি যে গ্রামের ওপর দিয়ে যাচ্ছ সে গ্রামের একজন সন্তান দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমি আমার এই প্রস্তাবটি ১৯৭২ সাল থেকে করে আসছি। প্রথম প্রথম মানুষ আমার কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করত। তিনচার বছর অতীত হওয়ার পরও যখন প্রস্তাবটা নতুন করে মনে করিয়ে দিতাম লোকে ভাবত আমি তাদের অযথা বিব্রত করতে চাইছি। আমার ধারণা, বর্তমান সময়ে যদি আমি প্রস্তাবটা করি লোকে মনে করবে আমার মাথাটা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে।’
তাহা হইলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কি বুঝাইতেছে? শুদ্ধ আহমদ ছফার নিজ গ্রামে কেন, সারাদেশেই তো একই অবস্থা। তিনি লিখিতেছেন: ‘উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ এবং মধ্যবঙ্গের প্রায় আট-দশটি জেলায় আমাকে কার্যোপদেশে এন্তার ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। আমি যেখানেই গিয়েছি লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন ঘটনা ঘটেছিল কিনা। অনেক গ্রামের লোক আমাকে জানিয়েছে, ‘আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবিরা একেবারেই আসেনি’। অনেক গ্রামের লোক জানিয়েছে পাঞ্জাবিরা এসেছিল, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে এবং অনেক খুনখারাবি করেছে। আমি জিজ্ঞেস করতাম যে সব মানুষ মারা গেছে তাদের নাম-পরিচয় আপনারা জানেন কিনা। গ্রামের লোক উৎসাহ সহকারে জবাব দিতেন–জানব না কেন! অমুকের ছেলে, অমুকের নাতি, অমুকের ভাই ইত্যাদি ইত্যাদি।’
তবুও কেন মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের একটা পূর্ণ তালিকা কেহ প্রণয়ন করিলেন না! আহমদ ছফা আক্ষেপ করিতেছেন, ‘আমি তখন বলতাম, মুক্তিযুদ্ধে নিহত এই মানুষদের নাম আপনারা রাস্তার পাশে লিখে রাখেন না কেন! কোন লোক যখন আপনাদের গ্রামের ওপর দিয়ে যাবে এবং নামগুলো পড়বে [তখন সেই] পথিকের মনে আপনাদের গ্রাম সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেবে। গ্রামের লোকেরা আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকত। যেন আমি কি বলছি সেটার মর্মগ্রহণ করতে একেবারে অক্ষম।’
এই জায়গায় আসিয়া আমাদের মহান লেখক দেখাইতেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কি সুদূর অবস্থা হইয়াছে! আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের যে সমস্ত অঞ্চলে আমি গিয়েছি কোথায়ও দেখিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নাম যতœ এবং সম্মানের সঙ্গে লিখে রাখা হয়েছে। এ ধরনের একটি কাজ করার জন্য আহামরি কোন উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল না। দেশের প্রতি এটুকু ভালবাসা এবং মুক্তিযুদ্ধের কারণে নিহত মানুষদের প্রতি এটুকু শ্রদ্ধাবোধই যথেষ্ট ছিল।’ ইহার প্রতিকার আজও কি সম্ভব নহে? সম্ভব না হইলে বলিতে হইবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নাই।

১০ মার্চ ২০১৪

দোহাই
১. অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘স্বাধীনতা’, দৈনিক পয়গাম, বিপ্লব সংখ্যা, ২৬ অক্টোবর ১৯৬৪, ৯ কার্তিক ১৩৭১।
২. আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় জন্মায়?’ খবরের কাগজ, ১৯ বর্ষ, ৫০ সংখ্যা, ১২ ডিসেম্বর ২০০০, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪০৭।
৩. ‘১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’, সপ্তম তফসিল [১৫০ (২) অনুচ্ছেদ], গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, পুনর্মুদ্রণ, অক্টোবর ২০১১।

পাথেয়–আহমদ ছফা

ভূমিকা–সলিমুল্লাহ খান

মহাত্মা আহমদ ছফা সাহিত্য ব্যবসায়ের প্রথম পর্বে ছোট গল্পে হাত পাকাইতেন। তাহার পাথুরে প্রমাণ ‘পাথেয়’ নামধেয় বর্তমান গল্পটিতেও পাওয়া যাইতেছে। যতদূর জানি এই গল্পটি আহমদ ছফা রচনাবলির হাল সংস্করণে স্থান পায় নাই। তাঁহার একটি কারণ এই হইতে পারে যে আহমদ ছফার একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘নিহত নক্ষত্র’ নামক পুস্তকে ইহা লওয়া হয় নাই।

‘পাথেয়’ প্রথম ছাপা হইয়াছিল ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখে প্রকাশিত ‘হে স্বদেশ’ সংকলনের ‘গল্প’ খণ্ডে। একই তারিখে একই নামে আরও দুইটি খণ্ড — যথাক্রমে ‘প্রবন্ধ’ ও ‘কবিতা’ — প্রকাশিত হইয়াছিল। তিনটা খণ্ডেরই প্রকাশক বাংলা একাডেমি (তৎকালের বানান অনুযায়ী লিখিতে ‘বাঙলা একাডেমী’)। ‘হে স্বদেশ’নামা এই তিন সংকলনেরই প্রচ্ছদ আঁকিয়া দিয়াছিলেন মহাত্মা জয়নুল আবেদিন। খবরটি বলিয়া রাখা বাহুল্য নয়। তিন সংকলনেরই পটভূমিকায় ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এই সকল সংকলনের প্রবর্তনা করিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। তিনি ছিলেন সেকালের ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’ নামক সংগ্রামী সংগঠনের অগ্রগণ্য নেতা।

‘পাথেয়’ গল্পের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে দিন গণহত্যা শুরু করিয়াছিল তাহার দুয়েকদিনের মধ্যেই সারাদেশ হইতে নিপীড়িত মানুষ প্রাণ হাতে করিয়া দেশ ছাড়িতেছিল। দেশের পূর্বাঞ্চলের একটি জেলা হইতে এইরকম বিতাড়িত মানুষের একটি দল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা পানে ছুটিয়া চলিয়াছে। সেই পথুমতি মানুষের মিছিলে হাজারো কাতর ভীতসন্ত্রস্থ অসহায় মানুষের দলে সেদিন ছিলেন গর্ভবতী আসন্নপ্রসবা একজন জননীও। পথিমধ্যে তাহার প্রসববেদনা দেখা দিল। সেকালের ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার অন্তঃপাতী তিতাসনদীর পাড়ে এক জায়গায় জননী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এই নবজাতকের জন্মের দৃশ্যটি আহমদ ছফা পাকাহাতে আঁকিয়াছেন। শরণপথগামী মানুষের কঠিন শোভাযাত্রা ক্ষণিকের জন্য থামিয়াছিল তিতাসের পাড়ে। নবজাতকের আগমন সম্পন্ন হইলে পর মিছিল আবার আগাইয়া চলে।

আমাদের মনে হইয়াছে এই ছোটগল্পে আহমদ ছফা বাংলাদেশের জন্মকাহিনীটি একপ্রস্ত রূপকথার আদলে বলিয়াছেন। ছোটগল্পের অঙ্গে তিনি রূপক বা এলেগরির অঙ্গরাখা চাপাইয়া দিয়াছেন। আমি কোন এক নিবন্ধে এই গল্পের পরিচয় দিয়াছি ‘নতুন জাতির জন্ম’ নাম আরোপ করিয়া।

২৭ নবেম্বর ২০১৩

ছবি: রঘু রায়

ছবি: রঘু রায়

 

মানুষের স্রোতটা এঁকেবেঁকে আলপথ ধরে, বোরোক্ষেতের উপর দিয়ে, ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে, চৌদ্দ পুরুষের বাস্তুভিটের মায়া কাটিয়ে শিকারীতাড়িত একপাল ভীতসন্ত্রস্ত পশুর মতো পালিয়ে আসছে। যতই সামনে যায় সংখ্যা বাড়ে। একটু জিরোয় মাঝে মধ্যে। জিরোয় না, আত্মীয়স্বজন মাবাপ ছেলেমেয়ে কে এলো, কে এলো না, কে জন্মের মতো গেলো ভাবতে চেষ্টা করে। গুলিগোলার আওয়াজ আর আত্মীয়স্বজনের টাটকা লাল রক্তের স্মৃতি আবার তাড়া করে। মানুষগুলো আবার হাঁটে — সোজাপথে নয়, বাঁকাচোরা ঘুপচিঘাপচি জংলাপথ বেছে নেয়। প্রাণের মায়া বড়ো মায়া। দুঃখের কথা কয়ে লাভ নেই, কষ্টের কথা বয়ান করে লাভ নেই। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটির জন্য চোখের জল ফেলে কি হবে! সব তো গেছে। এখন প্রাণ নিয়ে চলো। মানুষগুলো পা চালায়। কেউ কাউকে তাড়া দেয় না। কোথায় যাবে কোন পথ দিয়ে যাবে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু জানে বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় ঢুকতে হবে। তারপরে কি হবে, কি হবে তারপরে? কেউ কিছু জানে না। সব অদৃষ্ট! অদৃষ্টের ফের!

অনেক ঘুরে মানুষগুলো রেলের লাইনের উপর উঠলো। সামনে আটদশজন লাইনে উঠেই থমকে দাঁড়াল। লাইনের উপর দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা জানার জন্য পেছনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, কি, অ কি ক’ যামুনি? পেছনের আটদশজন প্রায় একসঙ্গে জবাব দিলো ‘হ যাওন যাইবো, দুই দিকের পুল ভাঙা।’ তারপরে নিঃশব্দে মানুষের মন্থর আধমরা স্রোতটা রেলের লাইনের উপর উঠে এলো। আকাশে চড়চড়ে রোদ। প্রসারিত মাঠে অল্প অল্প বাতাসে কচি পাটের চারা দুলছে। বোরো ধানে সোনার বরণ ধরেছে। উঠতি বেলায় রোদের ধার ছিলো খুব। এখন তেজটা মরেছে। ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে।

ছবি: রঘু রায়

ছবি: রঘু রায়

নবীনগর থেকে শেয়ালের মতো একবেলার পথ দু’দিনে হেঁটে পাগাচং ইস্টিশানের কাছে এসেছে। রোদে আধাপোড়া হয়েছে সকলে। তেষ্টায় অনেকেরই বুক জ্বলছে। কতো গেরাম, কতো পাড়া, কতো দীঘি, কতো পুকুর পেরিয়ে এলো — এক আঁজলা জল চাইতে পারেনি। পাড়ায় পাড়ায় ডাকাত লুকিয়ে আছে। মানুষ ভারী বেরহম। একদল মারে, আরেকদল কেড়ে রাখে শাড়িগামছা পর্যন্ত। উঠতি বয়সের মেয়ে থাকলে লুটে নিয়ে যায়। বিপদ বড়ো বিপদ। জন্মভূমির সবকিছুই শত্র“তা করছে। কালচে জলের লম্বা বাঁকা গাঙের কাছে আকুল তেষ্টা নিয়ে আঁজলা পেতে দাঁড়াও, গাঙ জল দেবে না।

হাওয়াটা বড় প্রাণ ঠাণ্ডা করা। রেলের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে একজন বুড়ো মানুষ ধুতির খুটে চোখ মুছতে মুছতে ডুকরে কেঁদে উঠলো ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে। ছাওয়ালডারে জন্মের মতন রাইখ্যা আইলাম। ভগবান, তুই দয়ার সাগর। কান্না জিনিসটেই সংক্রামক। আরেকটি মেয়েছেলে। সারাপথে কারো সঙ্গে একটি কথাও বলেনি। তার আমের আঁটির মতো শুকনো মুখে ঢেউ খেলে গেলো। প্রথমে ফুঁপিয়ে তারপর গলা ছেড়ে কেঁদে উঠে। ও ভাই প্রাণহরি, তুই ছাড়া থাকুম কেমনে রে! আরেকজন গলায় কণ্ঠিপরা আধবয়সী, রাধাকৃষ্ণের ভক্ত, কণ্ঠস্বরে দরদ ঢেলে বললো, চুপ করো মা, সব ঠাকুরের ইচ্ছে। কিন্তু গোটা দলটির মধ্যে তখন কান্নার রোল পড়ে গেছে। সকলেই কাউকে না কাউকে হারিয়েছে। বাপ, ভাই, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়, বন্ধু, স্বজন। আচার্যপাড়ার কালীকিঙ্করের মার তিনকুলে কেউ নেই। বুড়ি সারা পথ ভ্যানর ভ্যানর করেছে। একে ডেকে, তাকে ডেকে জিগগেস করেছে। আঁরে সেখানে ভাত দিব রে — দূর থালাবাটিটাও ফেইল্যা আইলাম। পোড়াকপাল, দুইমুঠ ভাত দিলেও খামু কিসে কইর‌্যা। তপনবাবুর বাড়িতে আগুন জ্বইলা উঠল, সকলের নগে আমি বার অইয়া আইলাম।

বুড়ির কথার কেউ জবাব দেয়নি। বুড়িও চুপ মেরে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপরে অন্যকথা তুলেছে। সেখান ভালো তরকারী পাওয়া যায় কিনা। খাওয়ার ভারী লোভ রমণীর মার। বিধবা হলে কি হবে। একটা চ্যাঙড়া বয়সের ছেলে একটা ধমক দিয়েছে। মাইনসের প্রাণ বাঁচে না, তোমার খাই খাই। দেমু নিহি একডা ধাক্কা। তারপর বুড়ি সারাপথ নিজে নিজে আকাশের দেবতাকে অভিশাপ দিয়েছে। বিকেলবেলায় রেলের লাইনের উপর সকলকে কাঁদতে দেখে বুড়ি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। ব্যাপারটা কি প্রথমে আঁচ করতে পারেনি। তারপর ঘোলা ঘোলা চোখ দু’টো একটু কচলে নিয়ে ডানহাতের লাঠিটা বাঁহাতে বদল করে মুখটা বিকৃত করে — অ বাপ রমণীরে বলে বহুকাল আগে স্বর্গগত রমণীর নাম ধরে কান্না জুড়ে দিলো। একটা বৌ দু’দিন আগে তার প্রথম ছেলে হারিয়েছে। স্তন দু’টো ফুলে উঠেছে, যন্ত্রণায় টনটন করছে — সে শুধু পাথরের মতো নির্বাক হয়ে রইলো।

মানুষগুলো সামনে যাচ্ছে। দেশগেরামের স্মৃতিচিহ্ন অন্তর থেকে মুছে ফেলেছে, জন্মভূমির ছবি দৃষ্টি থেকে মুছে ফেলেছে। চারদিকে মৃত্যু জাল পেতেছে। তারই মধ্য দিয়ে তারা হাঁটছে। কান পাতলে শোনে কামানের গর্জন। চোখ মেললে আগুনের শিখা দাউ দাউ নাচে, আত্মীয়স্বজনের রক্ত লাল হয়ে জেগে থাকে। তবু প্রাণের দায়। মানুষগুলো হাঁটছে। চারদিক থেকে বৃত্তাকারে লোহার সাঁড়াশীর মতো ভয়ঙ্কর মৃত্যু, করুণ পাইকারী মৃত্যু দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলছে। তাই তারা যাচ্ছে ভিটেমাটি ছেড়ে, দেশগেরাম ছেড়ে, মাতৃভূমির আঁচল ছেড়ে, নাড়িকাটা ভূমি ছেড়ে। জীবন ভারী সুন্দর। বড়ো মধুর এই বেঁচে থাকা। কোথায় জীবনের উপর মেলে দেয়া সে শান্তসুন্দর ছায়া!

দলের মধ্যে একটি মেয়ে ফিসফিসিয়ে আরেকটি মেয়েকে কি বললো। দু’জন পেছন ফিরে চাইলো। মেয়েদের মধ্যে কথাটা চাউর হয়ে গেলো। সকলেই পেছনে ফিরে ফিরে সে লোকটাকে দেখলো। মেয়েদের দেখাদেখি পুরুষেরাও তাকিয়ে তাকিয়ে সেই কালো লম্বা মানুষটাকে দেখলো। কোন ঘৃণা, কোন বিদ্বেষ, কোন নালিশ নেই কারো। দলের মধ্যে সকলের মুখে মুখে মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হতে থাকলো, গত রাতের সেই লোকটা। মানুষের বিস্ময়বোধ কখনো ফুরোয় না। কৌতূহল এবং বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে মাথার উপর মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়েও মানুষটাকে দেখতে লাগলো সকলে। যেন লম্বা কালো মানুষটার দেশ ছেড়ে যাওয়ার অধিকার নেই। এই দলটি এক সঙ্গে একটি স্কুলঘরে রাত কাটিয়েছে। লোকটিও সঙ্গে ছিলো। গভীর রাতে হরিচরণ কুমোরের বড়ো মেয়েটাকে বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো। বোধ হয় আতঙ্ক, বোধ হয় ভয়ের কারণেই হবে, ধুমসী কালো অনেকদিন ধরে বিয়ে না হওয়া মেয়েটা চিৎকার করে উঠেছিল। সকলে জেগে উঠলে সে লোকটা ভদ্রভাবে সে রাতের মতো কোথায় সরে পড়েছিল। তার সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না, কার ছেলে, কার নাতি, কোথায় ঘর। এখন লোকটা পেছনে পেছনে দলের সঙ্গে আসছে, তার লম্বা ছায়াটা লাইনের উপর পড়েছে। এটাই বিস্ময়ের কারণ।

মানুষের স্রোতটা লাইন বেয়ে ভাতশালা ইস্টিশানের কাছে এসেছে। ইস্টিশান মাস্টারের ঘর বন্ধ। মানুষজনের নামগন্ধ নেই। দিগন্তরেখার ধার অবধি বিস্তৃত রোদ ঝলকানো গোটা বাংলাদেশ মৌন নিস্তব্ধ। বাতাসে শ্বসিত হচ্ছে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস। একটাই দৃশ্য। মানুষ পালাচ্ছে রেলের লাইন ধরে। দাবানল জ্বলে উঠা বন থেকে উর্দ্ধশ্বাসে প্রাণভয়ে পশুরা যেমন পালায় দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে — তেমনি করে।

গুবরেপোকার ডাকের মতো একটানা একটা আওয়াজ ভেসে আসে। খুবই ক্ষীণ আওয়াজ। এ চারপাঁচ দিনের মধ্যে মানুষ গুলোর শ্রবণশক্তি অনেকগুণ বেড়ে গেছে। একজন দু’জন কান খাড়া করে রইলো। বোঁ বোঁ একটানা গুঞ্জন, তারপরে পিট পিট শব্দ। আধবয়েসী একজন মানুষ ঘাড়টা কাত করে কান দু’টো ভালো করে পেতে নিশ্চিন্ত হলো। তারপর বললো, আমার মনে লয় বাওনবাইরা ভৈরবের দিকে পেলেন লইয়া গুলি অইতাছে। কথাটা গোটা দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগলো না। সকলে উত্তরপশ্চিমের দিকে তাকিয়ে রইলো। ব্যাপার কি দেখার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো লাইনের উপর। সত্যি সত্যি চারটি এরোপ্লেন দেখা গেলো। প্রথমে চারটি সাদাবিন্দুর মতো দেখাচ্ছিলো। নীচের দিকে নামলে সমস্ত গতরটা দেখা গেলো। বোঁ বোঁ চক্কর দিয়ে ঘুরছে। প্যাট প্যাট করে মেশিনগানের গুলি ফুটছে। একবার ওপরে উঠছে আবার শিকারী বাজের মতো ছোঁ মেরে নীচে নামছে। মাঝে মাঝে দ্রƒম দ্রƒম শব্দ হচ্ছে — ওগুলো বোমা।

আতঙ্কিত মানুষগুলো আবার পা চালিয়ে দিলো। আকাশ থেকে মৃত্যু ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তানী সৈন্য। বেশী দূর যেতে হলো না। যে সমস্ত মানুষ জন্মের জন্য দায়ী নয় — অথবা রাজনীতির জন্য দায়ী নয়, অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে মুসলমান এবং দেশের হালচাল নিয়ে মাথা ঘামায়নি, মাটি, নরম জলে ভেজা বাংলাদেশের মাটি গাছের মত আঁকড়ে ছিল তারাও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে গরুবাছুর, ধানচাল, কাঁথাবালিশ হাতের কাছে যা পেয়েছে নিয়ে দলে দলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাসাভাঙ্গা পাখীর মতো বেরিয়ে, বিল মাড়িয়ে রেলের লাইনের দিকে ছুটে আসছে। ভাতশালার কাছেই ওদের সঙ্গে নবীনগর থেকে আসা মানুষদের সাক্ষাত হলো। একজন জিগগেস করলো, কি, অ ভাই সাব হবর কি! লোকটি একটি কালো ছাগলের দড়ি ধরে টানতে টানতে বললো, হারে ভালা না ভাই, আর সুখ নাই। পাঞ্জাব্যায় সৈন্য উজানীশর পুলের ঐ পাড়ে আইয়া পড়ছে। পুল ভাঙ্গা নইলে বাওনবাইরা এক দৌড়ে চইল্যা যাইব। জবর যুদ্ধ অইব, মুক্তিফৌজও এই পাড়ে কাইল থুনে পজিশন লইয়া রইছে।

তার দশ মিনিটও অতীত হয়নি। ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কামান গর্জন করে উঠে। ধোঁয়া দেখা যায়, আগুনও দেখা যায়। রাইফেলের গুলির শব্দ আসে। উজানীশরে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। দু’পক্ষে অবিরাম গোলাগুলি চলছে। পাকিস্তানী সৈন্যের ছত্রিশ পাউন্ডার কামানগুলোর আওয়াজ কানে তালা ধরিয়ে দেয়। মানুষগুলো থমকে দাঁড়ালো। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে প্লেন থেকে বোমা ফেলছে, মেশিনগান দিয়ে নিরীহ মানুষের উপর গুলি ছুঁড়ছে। সামনে লড়াই চলছে। সামনে পিছে দুই দিকেই মৃত্যু। মানুষজন বিলের উপর দিয়ে পিঁপড়ের মতো ঝাঁক বেধে ছুটে আসছে রেলের লাইনের দিকে। দুঃসময়, প্রচণ্ড দুঃসময়, সমস্ত বাংলাদেশের উপর দুঃসময় নেমে এসেছে। যে যেখানে আছো ছুটে পালাও। যেভাবে পারো জান বাঁচাও। মানুষের জান এখন ভারী সস্তা। প্রাণের প্রতি পাকিস্তানী সৈন্যের ভয়ঙ্কর দৃষ্টি। যা কিছু প্রাণের আবেগে নড়েচড়ে দেখে দেখে তাক করে গুলি ছুঁড়বে।

রেলের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে মানুষগুলো দেখে দক্ষিণপশ্চিম কোণে আগুনের লালশিখা কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উপরের দিকে উঠছে। বাতাসে খোলাজিহ্বা প্রসারিত করে বাংলাদেশের আকাশে ডাকিনীযোগিনীর মতো নেচে বেড়াচ্ছে ঘৃণাবিদ্বেষের কালো ধোঁয়া আর রোষের তাজা আগুন। কিছুই বাঁচবে না শিশু বুড়ো নারী পুরুষ। আগুনে পুড়ে ঝলসিয়ে যাবে। গুলিতে মরবে। কামানের গোলার আগুনে ধড় থেকে মুণ্ডু উড়ে যাবে। গরুবাছুর জ্বলে অঙ্গার হয়ে পড়ে থাকবে। ফলবান গাছ নীরব সহিষ্ণুতায় আগ্নেয় প্রহার বুকে ধারণ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাংলাদেশে মানুষ নামের কোনো জীব থাকতে পারবে না। কেবল থাকবে মিলিটারী। বুটজুুতোর আওয়াজ নরম পাললিক মাটিতে গেঁথে গেঁথে ওরা টহল দেবে। বাংলাদেশের বাতাসে ওদের গাড়ীর পেট্রোলের দুর্গন্ধ ছাড়া আর কোনো সুবাস পাওয়া যাবে না। বৌ কথা কও পাখি আর ডাকবে না। কুটুমডাকা পাখি আর ঘরের চালে, সীমের মাচায় আসবে না। মানুষগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো হাজার হাজার বছর ধরে গভীর মমতায় তৈরী করা জীবনের রঙ্গমঞ্চ জ্বলে যেতে, পুড়ে যেতে দেখলো। গোটা দলটা সর্বস্ব হারিয়ে পিতৃপুরুষের ভূমির শ্মশান দৃশ্য দেখতে দেখতে হাঁটে। কেননা স্মৃতির চেয়ে, প্রেমের চেয়ে, দুর্বলতার চেয়ে নগদ প্রাণের দামটা ঢের ঢের বেশী। আপাতত তা হারাতে কেউ রাজি নয়।

বাঁচবার আকাক্সক্ষা সে বিশাল জনস্রোতকে সামনের দিকে ঠেলে দিলো। গোটা বাংলাদেশ রিক্ত, নিঃস্ব, অসহায় হয়ে যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করছে। কাঁদবার ফুরসত নেই। পেছনে তাকাবার অবসর নেই। মরবার শক্তিটুকু খরচ করে বাঁচতে চায়। জীবনের প্রতি মানুষের কি টান! তারা মাইল দুয়েক এসে তিতাসনদীর পাড়ে এসে থামে। তিতাসের পাড়ে অজস্র মানুষের হাট বসেছে। অভুক্ত অশোয়া আতঙ্কতাড়িত দিগি¦দিকজ্ঞানহীন হাজার হাজার মানুষ। কেউ নির্ভার নয়। কারো বাচ্চাকাচ্চা আছে, কেউ বয়সের ভারে কাতর, কেউ কাথাবালিশ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ অনর্থক একরাশ হাড়িকুড়ি নাহক প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে এতটা পথ বয়ে এনেছে। সকলেই ওপারের যাত্রী। তিতাস পার হয়ে আখাউড়া যাবে। তারপর বর্ডার পেরিয়ে আগরতলা।

এই প্রাণ হাতে করে বেরিয়ে আসা মানুষগুলোর চোখে আগরতলা নামটি সঙ্গীতের মতো বাজে, স্বপ্নের মতো আভা ছড়িয়ে দেয়। পা ছড়িয়ে বসা যাবে, নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি দূর করা যাবে। সে আকাক্সিক্ষত স্বর্গে কার আগে কে যাবে তাড়াহুড়ো পড়ে গেছে। মানুষ অনেক। নাও কেবল দু’খানা। মাঝি দর হেঁকে বসলো মাথাপিছু আট আনা। গুঞ্জন উঠলো মানুষের মধ্য থেকে, ‘এ তো অত্যাচার, মানুষের বাইচ্চা নয়, ডাকাইত।’ কিন্তু মানুষ ঝুপ ঝুপ করে নৌকোয় উঠতে থাকলো লাফিয়ে।

বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। উজানীশরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। পাঞ্জাবী সৈন্যদের কামানগুলো আরো ঘন আরো জোরে গর্জন করছে। আগুনের শিখা আকাশে দেদীপ্যমান হয়ে উঠছে। ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মানুষের মধ্যে চাপা কিন্তু সতর্কতাসূচক আওয়াজ উঠলো। বইয়া পড়, বইয়া পড়। পেলেন আইতাছে মানুষ দেখলে গুলি ফুট করবে। কুমিল্লার দিক থেকে একটা প্লেন বোঁ বোঁ শব্দ করে অনেক উপর দিয়ে উড়ে আসছে। শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্লেন এখনো দৃষ্টিসীমার মধ্যে ধরা পড়েনি। ‘বইয়া পড়’ শব্দটি মন্ত্রের মতো কাজ করলো! যে যেখানে ছিলো গুটিসুটি মেরে বসে গেলো। ব্রিজের উপরের যারা তারাও বসে গেলো। মাঝি দুজন নৌকো দুখানা ব্রিজের তলায় এসে থামালো। বোঁ করে প্লেনটা অনেক উপর দিয়ে কোণাকুণি উড়ে গেলো। খুব ছোট হয়ে মাটিতে কালোছায়াটা পড়ে উধাও হলো।

সে মেয়েটি তো বসেই ছিলো। প্লেনের শব্দ শুনে ব্রীজের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে গেলো। হাতেপায়ে খিল ধরছে। পাশাপাশি তিনখানা স্লিপারের উপর মেয়েটির শরীর উদরস্থ সন্তানের নিষ্ঠুর অত্যাচারে দুলে দুলে উঠছে। এবার মানুষের দৃষ্টি পড়লো তার উপর। কি ব্যাপার, কি ব্যাপার, এমন করছে কেন। কি মুশকিল! পড়ে যাবে না কি! ওকে কেউ গিয়ে নিয়ে আসো। কে যায়! মেয়েটির পাশ দিয়ে নাকে কাপড় দিয়ে একটি আধবুড়ো মানুষ হেটে এলো। গলায় চাদরটি ঠিকভাবে জড়ানো আছে। ছাতাটিও সঙ্গে করে এনেছে। চেহারা দেখে মনে হয় আদালতের মুন্সি কিংবা মোক্তার কেউ হবে। ডাঙ্গায় নেমে লোকটা দু’দুবার থুতু ফেলে বললো, ‘কি আবার হবে, মাগী ছেলে বিয়াচ্ছে। ছি এই অসময়ে! একটু লাজশরমও নাই।’ কথার টানে মনে হয় স্থানীয় কেউ নয়, অন্য কোথাকার মানুষ।

মানুষের মধ্য থেকে আবার গুঞ্জন উঠলো। আহা প্রাণ! বেদনা উঠেছে। তোমরা কেউ গিয়ে ওকে নিয়ে এসো। জনমতটা গভীর হতে থাকে। আর মেয়েটি শক্ত কঠিন তিনখানা কাঠের স্লিপারের উপর গোঙাচ্ছে। মুখে ফেনা এসে গেছে। পড়ে যেতে পারে, একশো হাত নীচে জল। তোমরা কেউ ওকে নিয়ে এসো। সবাই বসে কিন্তু যায়টা কে! একটা বেঁটেখাটো ফরসাপনা মেয়ে তার স্বামীকে শান্ত অথচ দৃঢ়স্বরে বলল, তুমি ঐ বেচারীকে নিয়ে এসো। নইলে তোমার সঙ্গে আমি যাবো না। কথা ক’টি সমবেত সমস্ত মানুষের কাছে আদেশের মত শোনাল। সত্যি সত্যি চারপাঁচজন মানুষ এগিয়ে গেল। অত্যন্ত সন্তর্পণে মেয়েটার পায়ের নীচে, মাথার নীচে, পিঠের নীচে হাত দিয়ে তাকে পাড়ে নিয়ে এল। প্রচণ্ড ভূমিকম্পে পৃথিবীর ভেতরটা যেমন কাঁপে তেমনি কাঁপছে। শরীরের ভেতর শরীর, প্রাণের ভেতর প্রাণ লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে।

সবহারানো মানুষের কয়েকজন দাঁড়িয়ে চুক চুক করে আফশোস করলো। আহারে, মেয়েটি ভারী কষ্ট পাচ্ছে! এমন অসময়! দেখাদেখি আরো মানুষ দাঁড়িয়ে গেল। একটি মেয়ে বোচকা খুলে দু’খানা পুরোনো শাড়ি বার করে দিল। আর দু’জন মেয়ে মেয়েটাকে যেখানে রেখেছে তার চারদিকে শাড়ির ঘের দিয়ে দিল। একজন বেটাছেলে প্যাকিং বাক্সের ঘর যোগাড় করে এনে দিল। খড়খড়ে শুকনো খড় বিছিয়ে প্রসূতির শয্যারচনা করে তাকে তার উপর শোয়ানো হলো। জীবনের সমস্ত স্থিতি, সমস্ত অবলম্বন ফেলে আসা মানুষগুলো আরেকটি জীবনের নাট্যমঞ্চ তৈরী করার জন্য যতœবান হয়ে উঠলো। সব ঠিক এখন। একজন দাই পেলে ভালোয় ভালোয় সব হয়ে যায়।

ছবি: রঘু রায়

ছবি: রঘু রায়

রমণীকিঙ্করের মা কোনরকমে ওপাড়ে এসেছে। আকাশের দেবতার উদ্দেশ্যে গালাগাল তখনো থামায়নি। চোখের সামনে কি ঘটছে দেখেও দেখছে না। ভগবান চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে। এতগুলো মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে বের করে এনেছে। রমণীর মা দেখবে কেন! রমণীর মা’র এমন কি দায়! বার বার দাইয়ের কথা শুনে রমণীর মা গোটা ব্যাপারটা আঁচ করে নিল। গুরুত্ব উপলব্ধি করে তার মুখের অঙ্গনে একটা মমতার ভাব নামলো, ফুটে উঠলো একটা একাগ্রতা। সৃষ্টির কাজে আহবান। সৃষ্টির ডাকে সমস্ত বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা সুমিতি জেগে ওঠে। আকাশের দেবতাকে এ যাত্রা রেহাই দিয়ে ঘেরাটোপের ভেতর চলে এল। কাজে কে না লাগতে চায়! বিদ্যে কে না দেখাতে চায়!

প্রসূতি নিজের বেদনার উত্তাপে সংজ্ঞাহীন। নতুন জীবনের জন্য সব কিছু করছে মেয়েরা। বেটাছেলেরা যারা ছিল বসে নেই। নদী থেকে জল এনে দিচ্ছে। বাঁশ ফেড়ে ফেলে দাঁও দিয়ে কেটে চিকন করে ফালি বানিয়ে দিচ্ছে। নাড়ি কাটতে সুবিধে হবে। ঘেরাটোপের ভেতরে একটা দক্ষযজ্ঞ চলছে। সকলে কান খাড়া করে রেখেছে সেদিকে। মনোযোগ এত একাগ্র যে, পাকিস্তানী সৈন্যের ছত্রিশ পাউন্ডার কামানের গর্জনও শুনতে পাচ্ছে না। সকলে যেন নিজের নিজের হৃদপিণ্ড হাতে নিয়ে বসে আছে। মুহূর্তগুলো সময়ের চালুনির ফাঁক দিয়ে মিহি বালুকণার মত ঝরছে। ইচ্ছে করলে ছুঁয়ে দেখতে পারে। ঘেরাটোপের ভেতরে একটা তীক্ষè চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল। প্রসূতি কঁকিয়ে উঠল। মা মা বলে চীৎকার জুড়ে দিল। ওঁয়া ওঁয়া করে কেঁদে উঠল। সকলে এক সঙ্গে ঘেরাটোপের কাছে এসে প্রায় একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘কি অইছে গো, ছেলে না মেয়ে?’ রমণীর মা রক্তের লালবসনে ঢাকা একখণ্ড মাংসপিণ্ড দু’হাতে তুলে নিয়ে দাঁতের মাড়ি দেখিয়ে হাসবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ছেলে অইছে গো, ছেলে অইছে’।

ছেলে অইছে গো, ছেলে অইছে। কথাটা দ্রুত খুব দ্রুত আলোড়নের মত ছড়িয়ে পড়লো। মরণভয়ে তাড়িত মানুষেরা আরেকটি নতুন জীবনের আগমন সংবাদ শুনল। যারা হাটছিল গতি বাড়িয়ে দিল। পায়ের চোখ ফুটেছে।

প্রথম প্রকাশ: হে স্বদেশ, বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ফেব্র“য়ারি ১৯৭২), পৃ. ১৩৮-১৪৮।

সহিংসতার মূলে যুদ্ধাপরাধের বিচার — সলিমুল্লাহ খান

 

সমকাল : দেশব্যাপী সহিংসতা-প্রাণহানি চলছে। এর প্রধান কারণ কি?

সলিমুল্লাহ : কম করে হলেও দুটি কারণ আমি বলব। এক. ১৮ দলের কর্মসূচি। তারা ৫ জানুয়ারি ঘোষিত নির্বাচন বর্জন করেছে এবং তারই অংশ এই সহিংস আন্দোলন। এটা অসত্য নয়। তারা হরতাল-অবরোধ ঘোষণা করছে। শেষ বিচারে সহিংসতার দায় খালেদা জিয়ার ওপরে বর্তাবেই। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম বলেছেন, তাদের অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। এটা অনেকটা ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই না প্রবাদের মতো। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের বক্তব্য থেকে অশান্তির পেছনে যে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি — তার স্বীকৃতিই প্রদান করা হয়। কিন্তু এটা হচ্ছে ঘটনাপ্রবাহের ওপরতলা, ভাসা ভাসা দিক।

সমকাল : তলার দিকটা তা হলে কি?

সলিমুল্লাহ : নির্বাচনী হাঙ্গামা মুখ্য নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুই মুখ্য। সেই অর্থে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত প্রশ্নের পুনরুত্থান।

সমকাল : কিভাবে এর ব্যাখ্যা করবেন?

সলিমুল্লাহ : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা নির্বাচনী হাঙ্গামা দেখেছি। ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্তও বিস্তর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তখনও অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এখনকার সঙ্গে পরিমাণ ও গুণে তার বিস্তর পার্থক্য। একটি সংবাদপত্রে দেখেছি, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতায় অন্তত ১১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত শত শত। রেললাইন উপড়ে ফেলা এবং ধ্বংসাত্মক বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করে সম্পদহানির বিষয়টি যদি বাদও রাখি তা হলে এত বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি কিভাবে মেনে নেব? চলতি বছরে প্রায় তিনশ’ লোকের মৃত্যু হয়েছে রাজপথের সহিংসতায় —  এমন হিসাবও আমরা বেসরকারি সূত্রে জানতে পারছি। এটা নির্বাচনী কারণে নয়, বরং দ্বিতীয় কারণে।

সমকাল : এ পর্যায়ের সূচনা ঘটে কোন সময়ে?

সলিমুল্লাহ : এতক্ষণ সংখ্যা বা পরিমাণের কথা বললাম। এখন গুণগত দিকে আসি। আপনার মনে থাকার কথা, এ বছরের ৫ ফেব্র“য়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্র-তরুণরা, যাদের নতুন প্রজন্ম বলা হয়, শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে সংগঠিত হয়। তারা নতুন ধারার একটি আন্দোলন শুরু করে। পরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, ফেব্র“য়ারি থেকে ডিসেম্বর, এই সময়ে যত সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তার ৯০ শতাংশ ঘটানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে। বাকি ১০ শতাংশ নির্বাচনকেন্দ্রিক। এসব হচ্ছে তথ্য। এখন তত্ত্বে আসি। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, তত্ত্ব ছাড়া তথ্য হয় না।

সমকাল : তত্ত্ব কি বলে?

সলিমুল্লাহ : জামায়াতে ইসলামী একটাই অবস্থানে রয়েছে — নির্বাচনে তারা যাবে না। এটা তাদের রণনীতি। যুদ্ধাপরাধী বলে যাদের সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বিচার চলছে তাদের বাঁচাতে এই দলের কাছে শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো — নো ইলেকশন। সহিংস উপায়ে সংবিধান-বহির্ভূত পন্থায় তারা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এটা জামায়াতে ইসলামীর সার কথা।

সমকাল : আর বিএনপির?

সলিমুল্লাহ : এ দলটি এই ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত বলতে পারি। প্রথম কথা, তারা যুদ্ধাপরাধ কথাটি বলে না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে সরাসরি বলে না। তারা বলে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচারের কথা। খালেদা জিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বলেছেন ‘রাজনৈতিক বন্দি’। এটা হচ্ছে তাদের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে, তার প্রকাশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে তাদের সঙ্গে জামায়াতের সহমত রয়েছে। এটা জোটবদ্ধতার কারণ। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী একা হরতাল দেয়। বাকি হরতাল একসঙ্গে ডাকে। বিএনপির ভেতরে অনেকে যুদ্ধাপরাধ বিষয়টির ফয়সালা চায় বলেই এ কৌশল। বিএনপি যদি বলত, একাত্তরে যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার করব, তা হলে হাঙ্গামা কমে আসত। আমরা বলতে পারি, ওই সময়ের অপরাধের যারা বিচার চায় এবং চায় না — এভাবে দেশ বিভক্ত।

সমকাল : সরকারও এ বিভক্তির কথা বলছে?

সলিমুল্লাহ : হ্যাঁ, তারা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলছে। বিএনপি বলছে, বিভক্তির মূল কারণ ভিন্ন — ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী। এখানেও বিএনপির দ্বিধা। তারা এখন আর ত্রয়োদশ সংশোধনীর হুবহু প্রয়োগ চায় না। এটা বহাল থাকলেও বিরোধ হতো। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনেক আগেই মৃত। কারণ বিএনপি বলেছে, তারা এ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী যার তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার, সেই বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রহণ করবে না। বলতে পারেন, আওয়ামী লীগ কেবল পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মৃত ত্রয়োদশ সংশোধনীর দাফনের ব্যবস্থা করেছে।

সমকাল : সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীই সব অশান্তির মূলে…

সলিমুল্লাহ : একজন প্রাজ্ঞ লোক কিভাবে এমন চিন্তাহীন কথা বলেন — ভেবে পাই না। ত্রয়োদশ সংশোধনী বজায় থাকলেও সমস্যা হতো। এর সমাধান কি? সরকার একটা পথ বলছে। বিগত সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার হবে। যেমন ভারত কিংবা সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যান্য দেশে রয়েছে। এক সময়ে আমাদের দেশেও ছিল। বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারত। তারা আন্দোলনে আছে। জামায়াতে ইসলামীও আছে। এখন আমাদের এই দুই দলের আন্দোলনকে আলাদা করে দেখতে হবে। বাতাসে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড রয়েছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কম। কিন্তু ভূমণ্ডলে উষ্ণতা বাড়ানোর জন্য এর দায়ই বেশি। বিএনপি বলছে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের নির্বাচনী আঁতাত। বিএনপির যারা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, বুদ্ধিজীবী, তাদের কেউ কেউ বলছেন, সংগ্রাম কমিটি করতে হবে। তারা সহিংসতায় প্রত্যক্ষ মদদ দিচ্ছেন। ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমে বোমা মারার কথা বলছেন। কিংবা যে মাত্রায় বোমা-ককটেল মারা হচ্ছে, তা বাড়ানোর কথা বলছেন। কিন্তু এ সহিংসতা কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। বোমা মেরে আন্দোলন জোরদার কেবল নির্বাচনের সময় কি ধরনের সরকার থাকবে তার জন্য নয়। এর বড় কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানো।

সমকাল : কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তো জুনিয়র পার্টনার। তাদের ভোট সংখ্যাও খুব বেশি নয়।

সলিমুল্লাহ : আমরা জানি, খাদ্যের পরিমাণ বেশি হলেও ক্ষতি হয় না; কিন্তু সামান্য বিষও ক্ষতির কাজটা করে বেশি। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নিন্দা করে প্রস্তাব পাস হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে এর অঙ্গীকার করেছিল। এ দলের সাধারণ সম্পাদক  সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, আমরা যে আন্তরিক তার প্রমাণ রেখেছি। তারা বিচার করে প্রমাণ করল যে, এতদিন বিচার হয়নি।

সমকাল : পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলছিলেন…

সলিমুল্লাহ : যুদ্ধাপরাধের বিচার যে প্রকৃতই আমাদের জাতীয় ইস্যু এক বা দুটি দলের নয় সেটা এ ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। ওই দেশের সবাই কাদের মোল্লার ফাঁসির নিন্দা হয়তো করছে না। কিন্তু যারা বাংলাদেশকে উপনিবেশ বানাতে চেয়েছিল, তারা পরাজয়ের ৪২ বছর পরও ক্ষোভ প্রশমিত করেনি। যারা ১৬ ডিসেম্বরের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল কিংবা যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারত হয়ে দেশে ফিরেছিল, তাদের বিচার তারা করেনি। এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচারেও হস্তক্ষেপ করছে। তাদের এ পদক্ষেপ দুর্ভাগ্যজনক। যদি বিশ্ব সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়, তাহলে ন্যূনতম ন্যায়বোধ ও আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা করতে হয়। তারা সেটা করছে না।

সমকাল : সা¤প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আস্তিকতা ও নাস্তিকতা ইস্যু সামনে আনা হয়েছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

সলিমুল্লাহ : ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল। আসন পেয়েছিল ৯৯ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের আসন ছিল না; ভোট ছিল। গত চার দশকে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক পানি প্রবাহিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা হারায়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। তবে তারা নিষ্পাপ নয়। ২১ বছর পর তারা ক্ষমতায় ফিরে আসে। কিন্তু এই সময়ে দেশের যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। যারা মুজিবকে হত্যা করেছে; জিয়াউর রহমান তাদের ‘ইনডেমনিটি’ দিয়েছেন। গণভোট করেছেন। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী করেছেন। ইসলামের নামে পাকিস্তানি ধারা ফিরিয়ে এনেছেন। এখন খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চের তরুণদের বলছেন, ‘ওই সব ছেলেমেয়ে নাস্তিক।’ হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর একই সুর। শাহবাগে ঘোষিত কোনো নাস্তিক ছিল না। কিছু ব্লগার, যারা নাস্তিকতার প্রচার করেছে, তাদের কেউ কেউ সেখানে ছিল বলে বিএনপি বলছে। ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাহানারা ইমাম গণআদালত গঠন করেছিলেন। সেখানে আহমদ শরীফের মতো ঘোষিত নাস্তিকেরা ছিলেন। এবারে কেউ তেমন ছিলেন না। নাস্তিকতার সংজ্ঞা কি — এটা কেউ স্পষ্ট বলছে না। কিন্তু এ অভিযোগ শাহবাগে অংশগ্রহণকারীদের ওপর আরোপ করা হয় এবং এটাই জামায়াত-হেফাজত-বিএনপির ঐক্যের ভিত্তি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় পাকিস্তান বলত — ৬ দফা, ১১ দফা কায়েম হলে পাকিস্তান থাকবে না। আর জামায়াতে ইসলামী বলত, ইসলাম থাকবে না। কারণ, ৬ দফা হলে পাকিস্তান থাকবে না। পাকিস্তান না থাকলে ইসলাম থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ পুরো স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। ২৫ মার্চেও ধারণা ছিল পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে আপস হতে পারে। কিন্তু ৬ দফা মানা হলে পাকিস্তান থাকবে না — এই যুক্তিতে ২৫ মার্চ চালানো হয় নৃশংস অভিযান। তারা বুদ্ধিজীবী মারেনি; নাস্তিক মেরেছে। পাকিস্তান এবং জামায়াতে ইসলামী বলেছে — ১৪ ডিসেম্বর যাদের মারা হয়েছে তারা নাস্তিক এবং পাকিস্তানবিরোধী। এখন নাস্তিক ইস্যু তুলে কার্যত সেই অপরাধই স্বীকার করে নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তারা ভালো করেই জানে যে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক নাস্তিক নয়। এটা কেবল পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা। তারা আন্দোলনের জন্য মিথ্যাচার করছে। ফরহাদ মজহার নিজেই ‘এবাদতনামা’য় বলেছেন, ‘আমি নাস্তিক’। এটা এখনও বাজারে আছে। তিনি শাহবাগের আন্দোলনকারীদের যারা নাস্তিক বলেন, তাদের পাশে রয়েছেন।

সমকাল : কেন এ মিথ্যাচার?

সলিমুল্লাহ : হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবল্স বলত — একটা মিথ্যা হাজার বার বললে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। তারা সেটা সত্য বলে মানে। যুদ্ধে জয়ী হতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া চলে। মিথ্যা কে বলছে — তার প্রমাণ মাহমুদুর রহমান, আদিলুর রহমান। ৫ মে রাতের অন্ধকারে বাতি নিভিয়ে শাপলা চত্বরে ‘হাজার হাজার লোক’ শেখ হাসিনা মেরেছেন — এমন কথা বলা হয়। কিন্তু যে রাতে শাপলা চত্বরে একজন লোকও মারা যায়নি, সেখানে ‘হাজার হাজার মৃত্যু’ ঘটেছে এটা কি করে কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন লোক প্রচার করতে পারেন? ৫ মে দিনে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ মে নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরা এলাকাতেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। যে কোনো সাংবাদিক এটা যাচাই করতে পারেন। অধিকারের আদিলুর রহমান বলেছেন, ‘৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে শাপলা চত্বরে।’ এটা হচ্ছে হোমমেড। গোয়েবল্সের মতো প্রচারণা। রাজনীতিকরা জনগণের উপকারের জন্য দু-একটা মিথ্যা বলতে পারেনথ এটা প্লেটো বলেছিলেন। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে যেভাবে মিথ্যাচার হয়েছে, তা রাষ্ট্রের ভিত ধসিয়ে দিতে পারে।

সমকাল : এখন উত্তরণের পথ কি?

সলিমুল্লাহ : সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা চাই, একটা বৃত্তের পরিধি থেকে বৃত্তের কেন্দ্রে পৌঁছাতে অগণিত ব্যাসার্ধ টানা যায়। এখন সরকার যে কায়দায় উত্তরণ চাইছে, সেটা সঠিক কি-না — এ প্রশ্ন আমারও। বিএনপি বড় দল। অনেক সমর্থক রয়েছে। কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছে। সরকার তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে ঐকমত্যে আনার চেষ্টা করতে পারত। উভয় দলের শ্রেণীস্বার্থ এখন মোটামুটি অভিন্ন। উভয় দল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উভয় দল সংকটের জন্য সমান দায়ী। এভাবে তারা সমদূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন। এর কারণ আছে। আওয়ামী লীগ অসহিষ্ণু দল। সিপিবি-বাসদ — তারা যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচার চায়। পদ্ধতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে দ্বিমত। আওয়ামী লীগ পশ্চিমা শক্তিকে খুশি করতে চায়। সিপিবির মতো বামপন্থিরা এতে নাখোশ। এভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিপিবির মধ্যে এই ইস্যুতে স্ববিরোধিতা রয়েছে। সিপিবির কর্মীদের মধ্যেও সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টিতে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারও তাদের কাছে টানতে তেমন সচেষ্ট নয়।

সমকাল : সরকার বলছে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা।

সলিমুল্লাহ : ১৯৪৭ সালেও এ যুক্তি ছিল। আমরা ব্রিটিশ মডেলের গণতন্ত্র গ্রহণ করেছি। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ছিল। আমরা করেছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এইচএম এরশাদের পতনের সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা সামনে আসে। তিন জোট প্রথমে প্রধান বিচারপতিকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তারপর এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। যে কোনো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা যায়। কিন্তু সামরিক শাসনের বিধান কোনো সংবিধানে নেই। এটা হলে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে জনসমর্থন হারিয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর ফের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। জনমত বদলায়। আমি মনে করি, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে জনমত সুইং করছে। সা¤প্রতিক সহিংসতা আওয়ামী লীগ সরকারের জনসমর্থন বাড়াচ্ছে। জনমত সহিংসতার বিরুদ্ধে। বিএনপির উচিত সহিংসতা থেকে সরে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। তবে এই দুই দলের বাইরেও আরও শক্তি রয়েছে সমাজে। প্রকৃতপক্ষে এখন যা চলছে দেশে, সেটা হচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংকট।

সমকাল : কিভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন?

সলিমুল্লাহ : নির্বাচনে শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে সর্বদাই প্রতারণা করা হয়। নির্বাচনে অনেক ত্রুটিও থাকে। আমরা সবটা জানতে পারি না। কেবল তখনই তা প্রকাশ পায়, যখন বড় দলগুলো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করতে থাকে। এ ব্যবস্থা যে নিরপেক্ষ নয়, সেটা দুই দল স্বীকার করে। উত্তরণের পথ হচ্ছে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। হয়তো গরিবের কথা বাসি হলে ফলতে পারে।

সমকাল : কিভাবে এ সংস্কার চাইছেন?

সলিমুল্লাহ : রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ। নির্বাহী বিভাগ, আইন প্রণয়ন বিভাগ বা সংসদ এবং বিচার বিভাগ। কেউ কারও ওপরে নয়; বরং সার্বভৌম। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথমে নির্বাহী বিভাগের কথা রয়েছে, তারপরে আইনসভা এবং তারও পরে বিচার ব্যবস্থা। সংবাদপত্র বামে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপে, ডানে থাকে বিরোধী নেতার। এ দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়। সংবিধানেও কোনটা আগে এবং কোনটা পরে, সেটা যেভাবে রয়েছে তা অকারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমে রয়েছে কংগ্রেস, তারপর প্রেসিডেন্ট এবং তৃতীয় স্থানে বিচার ব্যবস্থা। আমাদের এখানে বিচার ব্যবস্থা তৃতীয় স্থানে থাকলেও সার্বভৌম ক্ষমতার দিক থেকে সমান। আইনসভায় প্রণীত আইন সংবিধানসম্মত কি-না — সে ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন এবং সংবিধানবহির্ভূত ঘোষণা করতে পারেন। বর্তমান সংকটের সমাধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। এটি সাংবিধানিক সংস্থা। বিচার বিভাগও সাংবিধানিক সংস্থা। নির্বাচকালীন সরকারের দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা যায়। একজন প্রধান বিচারপতি এবং দু’জন সাবেক বিচারপতি অতীতে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ৫ বছর। তাদের মেয়াদ বিচার বিভাগের মতো করা যায়। বিচার বিভাগের বিচারপতির মতো দীর্ঘ করা যায়। বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তাদের নিরপেক্ষতা আমরা মেনে নিই। নির্বাচন কমিশনের শক্তি বাড়ানো বর্তমান সংবিধানে সম্ভব নয়। তাদের নিয়োগ পদ্ধতিতে সমস্যা রয়েছে। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে ফর্মুলা করেছিলেন, তাদের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। ধারণায় ত্রুটি ছিল। নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ প্রশাসক চাওয়া হয়েছে। একজন নিরপেক্ষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার না পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ প্রধান উপদেষ্টা কি করে খুঁজে পাব? খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। নিরপেক্ষতার বিষয়টি আপেক্ষিক — প্রকৃতপক্ষে উভয় দলের সম্মতি বা সম-মতি।

সমকাল : আপনি কি তিনটি অঙ্গের মতো চতুর্থটি চাইছেন?

সলিমুল্লাহ : ঠিক তাই। নির্বাচন কমিশনকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। আমরা বলি নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। কিন্তু নির্বাচন এলেই তারা নির্বাহী বিভাগের অধীন হয়ে যায়। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন করা সম্ভব। কিন্তু এজন্য সংবিধানে ব্যবস্থা রাখা চাই।

সমকাল : দেশবাসী আশার আলো দেখতে চায়। এত হানাহানি, রক্তপাত…।

সলিমুল্লাহ : উন্নত দেশগুলোর কেউ কেউ বলে গভর্ন্যান্স। কেউ কেউ এর সঙ্গে গুড শব্দ যোগ করে। আমাদের দেশের শাসন পদ্ধতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন। অনেকেই বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। কিন্তু এজন্য তাদের সবাই ত্রয়োদশ সংশোধনী পুরোপুরি মানতে চায় না। বিএনপি কৌশলগত কারণে বিষয়টি স্পষ্ট করে না। তারা নির্বাচনকালীন সরকারে শেখ হাসিনাকে রাখতে চায় না। রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার কিংবা এ কে খন্দকারের মতো কাউকে এ দায়িত্ব দিতে চায়। এটা হচ্ছে মর্যাদার লড়াই। এর মধ্যে তত্ত্ব নেই, নীতি নেই। কেবলই মর্যাদার লড়াই। হাসিনা ছাড়া যে কাউকে মেনে নিতে তারা রাজি। এভাবে প্রকারান্তরে তারা পঞ্চদশ সংশোধনী মেনে নিচ্ছে। এ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদ এখনও বহাল রয়েছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে অন্য কাউকে ক্ষমতা দিতে হলে অসাংবিধানিক পন্থা অনুসরণ করতে হবে। বিএনপি গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু তারা ভরসা করছে জামায়াতে ইসলামীর ওপর। তারা রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে যা করছে, সেটা অপরাধ। রাষ্ট্র এ সহিংসতা থামাতে পারছে না। এটা তাদের ব্যর্থতা।

সমকাল : কেউ কেউ তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ বাড়াতে বলেন?

সলিমুল্লাহ : কিছু লোক নিজেদের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় দেখতে চান। বর্তমান সংকটে অনেকে উল্লসিত। সামনে তারা সুদিন দেখেন। বিয়োগ চান। কিন্তু বিয়োগ যে বিয়োগান্ত হতে পারে — সেটা ভাবেন না। আমাদের এখন যুক্তরাষ্ট্রকে তৎপর দেখতে হয়। ভারত ও পাকিস্তান তৎপর। চীন তৎপর। জাতিসংঘ তৎপর। কিন্তু এভাবে রাজনীতির সমস্যার সমাধান নেই।

সমকাল : যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, কি বলবেন?

সলিমুল্লাহ : সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তোলা হলে কে আপত্তি করবে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ না এলেও নির্বাচন হতে পারে। হতেই হবে — এ বিষয়ে সাংবিধানিক ধারা দুর্বল। জামায়াতে ইসলামী যদি একাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করত, তা হলে পাত্তা পেত না। কিন্তু ১৯৭০ সালেও আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। ২০ শতাংশ বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এরা বাংলাদেশে রয়েছে এবং নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। কেন শক্তি বাড়ল? এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দায় রয়েছে। তারা ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঐক্যকে ধরে রেখে নতুন সরকার গঠন করতে পারত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন আইনি বৈধতা পেয়েছি। তখন আওয়ামী লীগ ছাড়াও মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, মোজাফফর আহমদকে বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়েছিল। বাকশাল করা হলো অনেক দেরিতে। তুরস্কে মোস্তফা কামাল পাশা ২০ বছর জাতীয় ঐক্যের সরকার পরিচালনা করেছেন। কেবল সমাজতান্ত্রিক দেশে নয়, জাতীয়তাবাদী বিপ্লবেও এ ধরনের সরকার হতে পারে।

সমকাল : ফের উত্তরণের প্রশ্নে আসছি…।

সলিমুল্লাহ : কয়েকভাবে হতে পারে। শেখ হাসিনা পাঁচ বছর টিকে থাকতে পারেন কিংবা ষষ্ঠ সংসদের মতো দশম সংসদের মেয়াদ হতে পারে দেড় মাস বা আরও কয়েক মাস বেশি। এ নির্বাচন সব সমস্যার সমাধান দেবে না। আরেকটির জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে হবে। তা হলে সম্পদের এত অপচয় কেন — সে প্রশ্ন করা হতেই পারে। কেউ মজা করে বলেন, ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হওয়ায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমল। কিন্তু রাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ে মজা করা চলে না। সরকার পরিবর্তনের অনেক পথ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে এটা করাই নানা দিক থেকে শ্রেয়। অন্য পথ যে খারাপ — সেটা বোধ করি বিএনপিও জানে। সেটা তারা কিন্তু ১৯৯০ সালে এইচএম এরশাদকে অপসারণের সময়েও প্রমাণ রেখেছে। আওয়ামী লীগও করেছে।

সমকাল : আপনাকে ধন্যবাদ।

সলিমুল্লাহ : সমকাল পাঠকদের শুভেচ্ছা। দেশের মঙ্গল হোক।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অজয় দাশগুপ্ত

সম্পাদকীয়: দেশে গণতন্ত্র ও তাহার মুলাভাব লইয়া কিছু কথা

আগামি ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন। যদিও অন্তত তিন সপ্তাহ আগেই মোট ৩০০ আসনের ভিতর ১৫৩টির ফলাফল চূড়ান্ত হইয়া গিয়েছে। কেননা দ্বিতীয় আর কোন প্রার্থী না থাকায় সেইসকল আসনে জনগণকে এইবার আর কষ্ট করিয়া ভোটকেন্দ্রে যাইতে হইবে না। নিন্দুকেরা বলিতেছেন, ইহা ডিজিটাল ইলেকশান মাত্র। ফলে আওয়ামী লীগ যে এককভাবে নির্বাচিত হইয়া গিয়াছে ভোটের পূর্বে তাহা ঘোষণা করিতে আর গণকঠাকুর লাগিতেছে না।

বস্তুত দেশে এখনো পর্যন্ত কোন প্রকার গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও কায়েম হইয়া নাই। বছরের পর বছর যাহা কায়েম হইয়া আছে তাহা হইল গণতন্ত্রের মুলা। তফাতের মধ্যে গত দুই দশকে তিন তিনবার ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া দল বিএনপি ভোট বয়কট করাতে এইবার সেই মুলাখানিও আর নাই। ইহাতে যাহারা গণতন্ত্রের জন্য শোক করিতেছেন তাহারা আসলে শোক করিতেছেন সেই মুলার উদ্দেশ্যেই। বর্তমান প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ ঝানু আড়তদারের মত নিয়মরক্ষার আরেক মুলা দেখাইয়া বিএনপিকে পরাস্ত করিয়াছে মাত্র।

স্বৈরাচার পরবর্তী বাংলাদেশে ক্ষমতার দখল লইয়া এই প্রকার মুলামুলি একেবারে নতুন নহে। বিদেশি পিতাদের আশীর্বাদপুষ্ট দুই পরিবারের ঝগড়া নির্বাচনকালীন বরাবরই গৃহযুদ্ধের প্রতিবেশ তৈরি করিতেছে। আর ইহাতে প্রাণ হারাইতেছেন অগণিত জনসাধারণ। অবশ্য ব্যাপার এমনও নহে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন না হইলে তাহারা প্রাণ হারাইতেন না। বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন উপলক্ষে — কখনো গার্মেন্টস শ্রমিক হইয়া ভবন ধসে কখনো বাসচালক হইয়া পেট্রলবোমায় কখনো গরিব হিন্দু হইয়া নিজগৃহে বলাৎকারীর করুণ শিকার রূপে — আরো অগুনতি প্রক্রিয়ায় তাহাদের মরণযাত্রা কিন্তু থমকাইয়া নাই। তদুপরি বর্তমান সহিংসতা সকল কিছুকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। সরকারি ও বিরোধিজোট স্রেফ মানুষ মারার প্রতিযোগিতায় নামিয়াছে যেন।

গত ৪২ বছরে আমাদের শাসকশ্রেণির বিভিন্ন গ্র“প বা দলসমূহ ‘দেশের জনগণ’ লইয়া মুখে যাহাই বলুন অন্তরে কি ভাবেন তাহা আদৌ আর গোপন নাই। তাহাদের আচরণে ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, এই ষোলশ লক্ষ জনসাধারণ যেনবা একপ্রকার বোবাপ্রাণি বিশেষ এবং তাহাদের নিছক রাখাল দরকার। তো সেই রাখালরাজ ওলান দিয়া দুধ দোহন করিবেন তো বটেই পারিলে শিং দিয়াও দুধ দোয়াইবেন। তাহাদের প্রয়োজন মোতাবেক জবাই বলি এই সকলও আছে। ইহার উপর বিভিন্ন পক্ষের রাখালরাজের ভিতর ক্ষীর-মাংশ লইয়া যে ডুয়েল ঘটিবে তাহাতেও বোবাপ্রাণিগণ আত্মাহুতি দিবেন। শাসকশ্রেণির এই যে বিভিন্ন দল, কিম্বা বলা যায় একই শ্রেণিমানসের ভিতর বাড়িয়া ওঠা বিবিধ গ্র“প — তাহাদের রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ বা বাসনা-চিন্তা কি এইসবের অতিরিক্ত কিছু?

ব্যাপারখানা একটু উল্টাইয়া দেখিবার আছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন যখন দেশে এই রকম ক্ষীর-মাংশ লোভী রাখালরাজ প্রতিষ্ঠা করিতে চাহে তখন সে আসলে দেশের জনগণকে একপ্রকার বোবাপ্রাণি রূপেই তৈয়ার করিতে চাহে। গণতন্ত্র তো দূরের কথা সামান্য মানবাধিকার বোধটুকুও তাহারা গড়িয়া উঠিতে দেয় না। সুদীর্ঘকালব্যাপী দেশে সেই প্রক্রিয়া চলমান। ফলত আর গণতন্ত্র লইয়া নহে, স¤প্রতি গণতন্ত্রের মুলাভাব লইয়াই রাজনীতির মাঠ গরম দেখা যাইতেছে বেশ। সুতরাং প্রশ্ন জাগিতেছে, এই যে ষোলশলক্ষ বোবাপ্রাণিকুল — তো তাহারা মরিয়া মরিয়া আসলে করিতেছেনটা কি?

একটু খেয়াল করিলে পরিষ্কার হইবে, একটা সমাজকে বোবা করিয়া রাখিবার প্রধান উপায় তাহার নিজস্ব কোন রাজনৈতিক চেতনা বা শক্তি গড়িয়া উঠিতে না দেওয়া। বাংলাদেশ ৪৩ বছরে পা দিয়াছে বটে। কিন্তু ধুরন্ধর বদমায়েশি ও ষড়যন্ত্রের সেই নীল নক্সা এখনো কায়েম থাকিয়া গিয়াছে। তদুপরি শাসকশ্রেণির এই সকল নীলছবি জনগণ যে একদিন তাহার বুকের লাল রঙ দিয়া জন্মের মত ঘুচাইয়া দিবে না তাহাও বা কে বলিবে। এদিকে আর কয়টি দিন পরেই ইংরেজি নববর্ষে। অপেক্ষার সেই অনন্ত দিবসযাম লইয়া আরো একটি নতুন বছর হাজির হইতেছে।

সকলকে নতুন দিনের আগাম শুভেচ্ছা।

কবি বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ : দ্বিতীয় পর্ব–মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

এমতাবস্থায় ভারতের কোন সীমান্ত এলাকায় চলে যাওয়া তোমাদের জন্য উত্তম হবে। ভারতীয় বেতার শুনে মনে হচ্ছে ওরা আমাদের সংগ্রামের সমর্থক। কাজেই একজনও যদি ভারতীয় শ্রোতা পাওয়া যায় ওতেই কাজ হবে। ওদের বেতার থেকে তা ভালোভাবে ফ্ল্যাশ করা হবে। অন্যদিকে ট্রান্সমিটারটি ভারতীয় সীমান্তে ইনস্টল করা হলে নিরুপদ্রবে অনুষ্ঠান প্রচার করে যাবে। তাঁর ভাষায়, ‘ওখানেও ওদের যন্ত্রে ধরা পড়বে, ঠিক কোন জায়গা থেকে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু ওরা বিমান হামলা করতে পারবে না। কারণ বর্ডার এলাকায় বোমা ফেলার জন্যে ডাইভ দিতে গেলে বিমানের ‘ল্যাজ’ ইন্ডিয়ার ওপর দিয়ে ঘুরে যাবে। তখন তো রক্ষা নেই।’

মোসলেম খানের পরামর্শে ভারতের সীমান্ত অঞ্চল রামগড়ে ট্রান্সমিটারটি নিয়ে যাওয়ার নিয়ত করে তারা। ২ এপ্রিল পটিয়া থেকে রামগড় যাওয়ার সহজ নির্বিবাদ রাস্তার খোঁজখবর নেয়া হয়। ১ কিলোওয়াটের ট্রান্সমিটারটি দু’একদিনের মধ্যে রামগড় পাঠাবার দায়িত্ব নেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী। ৩০ মার্চ বোমা হামলার পর থেকে ১০জনের ক্ষুদে টিমের দু’জন আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ও রেজাউল করিম চৌধুরী বিচ্ছিন্ন ছিল। ৩ এপ্রিল সকালে ড্রাইভার এনামুল হকের লিভার ব্রাদার্সের মাইক্রোবাসে ঐ ২ জন ছাড়া বাকি ৮ জন ও সেকান্দার হায়াত খানসহ ওঁরা রমাগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। (ড্রাইভার এনামুল হকের এই মাইক্রোবাসেই ৩১ মার্চ কালুরঘাট থেকে ওঁরা ৯ জন পটিয়ায় আসে।) যাওয়ার পথে ফুলতলিতে ভাগ্যক্রমে তাঁদের সাথে মোলাকাত হয় নইলে হয়তো তাঁরা বিচ্ছিন্নই থাকত। তাঁদের রুট ছিল, পটিয়া-ফুলতলি (বোয়ালখালি)-কপ্তাই-রাউজান-নাজিরহাট-ফটিকছড়ি-রামগড়। রামগড়ে পৌঁছার মধ্যদিয়ে সমাপ্তি ঘটে দমহীন কর্মব্যস্ত একটি পর্বের। বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে মোটামুটি এইটুকুই ছিল ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৩টি পর্যায়ের আদি বা প্রথম পর্যায়।

‘৩ এপ্রিল সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে আমরা রামগড়ে পৌঁছেছিলাম। সীমান্ত নদীর তীরে রামগড় থানা।… থানার সামনে মাইক্রোবাস থেকে নেমেই এইচ টি ইমামের সম্মুখীন হয়েছিলাম।… কাছে টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ রেখে বলেছিলেন: ইন্ডিয়ান অথরিটি একটা ট্রান্সমিটার দিয়েছেন গতকাল। চালাবার লোক নেই। এখনই দু’জন ব্রডকাস্টারকে নিয়ে নৌকায় ওঠো। একজন বাংলার, একজন ইংরেজির।’

ঐ দিন সন্ধ্যায় তাঁরা সীমান্ত পার হয়ে সাবরুম থানায় ঢোকে। এরপর আরও প্রায় দেড় ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা বাগাফা পৌঁছায়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯২ হেড কোয়ার্টাস। তারপর খানিক পথ যাওয়ার পর একটি বাঁশের ঘরের সামনে তাঁদের জিপ থামে। ঐ দিনই রাত ১০ টায় ঐ ঘরের ২০০ ওয়াট শক্তির শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে সম্প্রচার করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্যারের প্রথম অধিবেশন। এই অধিবেশনটির স্থিতিকাল ছিল প্রায় ১ ঘন্টা।

তাঁদের সাথে মেজর জিয়াউর রহমানের এখানে আবার দেখা হয়। জিয়াউর রহমান ও এইচ টি ইমামসহ তারা ঐ রাতেই রামগড়ে ফিরে আসে। ৪ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৬ জন কর্মী রামগড় থেকে  স্থায়ীভাবে বাগাফায় চলে আসে। সাথে ছিল এ কে খানের ছোট ছেলে শামসুদ্দীন খান জাম্বু। আর একজন ভারতীয় শিখ — ট্রান্সমিটার অপারেটর — অমর সিং। এই টিমটা শালবাগান যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওখান থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্যক্রম চালায়। ৪ এপ্রিল রামগড় থেকে সবাই বাগাফা গেলেও ৬ জন ছাড়া বাকিদের রামগড়ে প্রত্যাগমণ করতে হয়েছিল। কারণ  বাগাফা হেড কোয়ার্টাসের ভারপ্রাপ্ত অফিসার কর্নেল (?) ঘোষ ৩ এপ্রিল বলে দিয়েছিল, ‘ইয়ংম্যান, তোমরা ছ’জন পারমানেন্টলি চলে আসবে। রোজ আনা-নেয়ার ট্রান্সপোর্ট দেয়া যাবে না।’

সীমান্ত রক্ষীবাহিনী হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেয় তাঁদেরকে আর  বাগাফায় রাখা হবে না। স্থানান্তরিত করা হবে শালবাগানে। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ হেড কোয়ার্টাসে। শালবাগান আগরতলা শহরের সন্নিকটে। যেখানে বাংলাদেশের নেতাদের অফিস আছে। ফলে সংবাদ তথ্য সংগ্রহের সুবিধা হবে। তাছাড়া এখানে ৪০০ ওয়াট শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। ৮ এপ্রিল বাগাফায় সকাল বেলার অধিবেশন শেষ করে শালবাগান অভিমুখে রওয়ানা করা হবে। সান্ধ্য অধিবেশন প্রচার করা হবে শালবাগান থেকে।

‘শালবাগানে আমাদের রিসিভ করেছিলেন কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ ব্যানর্জী। সিভিল পোশাকধারী সুদর্শন প্রৌঢ়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর তথ্য ও জন-সংযোগ বিভাগের লোক। …বলেছিলেন: এক দু’দিন বিশ্রাম। এখানে সিগনাল থেকে অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। সব ঠিকঠাক করা লাগবে। এই সুযোগে আপনারা ভালো প্রোগ্রাম তৈরি করুন। কথিকা লিখুন।’

শালবাগান ট্রানজিট ক্যাম্পে বেতার কর্মীদের থাকা খাওয়ার অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। কালুরঘাট ত্যাগের পর থেকে বলতে গেলে তাঁরা এক কাপড়েই ছিল। শালবাগানে কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ ব্যানার্জী কুঞ্জবনে এম আর সিদ্দিকীদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের ব্যাপারে বলে তিনি আগরতলার বাইরে গিয়েছিলেন। বেতার কর্মীদের ভাল মন্দ দেখ ভাল করার কথা বলে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে বেতার কর্মীদের করুণ অবস্থা দেখে মনে খুব আঘাত পান। সব পরিকল্পনা বাতিল করে তিনি তাদের নিয়ে কুঞ্জবনে যান। আগরতলা শহরের প্রান্তিক এলাকা কুঞ্জবন। কৃষি বিভাগের রেস্ট হাউসে এম আর সিদ্দিকীর অফিসের সামনে জিপ থামে। সিদ্দিকী মহোদয়ের উপর খুব চটে গিয়েছিলেন ব্যানার্জী বাবু। ‘অমনি ফেটে পড়েছিলেন কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ বানার্জী। বলেছিলেন: ওরা কেমন আছে, দেখতেই তো পাচ্ছেন।… খাওয়া-শোওয়া কিছুরই ব্যবস্থা তো ছিল না ওদের এই তিনদিন! এভাবে থাকতে হলে কি করে কাজ করবে?’

অবস্থাগতিকে স্থির হয়েছিল, ‘আর সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে নয়, আগরতলা শহরেই আমাদের রাখা হবে। আমাদের ট্রান্সমিটারের কাছে নেয়া হবে না।… সবই হবে পূর্বাহ্নে রেকর্ডকৃত।… সেই জিপ-এ করেই উপনীত হয়েছিলাম ৯১২, কর্নেল চৌমুহনিতে। আগরতলা শহরের প্রাণকেন্দ্র। বেশ বড়োসড়ো বাড়িটি। অনেকগুলো কক্ষ এবং একখণ্ড প্রাঙ্গণ।’

তালেবেতালে ৮ এপ্রিল সকালে বাগাফায় প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত এই সাড়ে ৩ দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল স্তব্ধ। সম্প্রচার করা যায়নি কোন অনুষ্ঠান।

‘৮ এপ্রিল প্রভাতী অধিবেশনের পর তিনদিন বিরতি। আবার শুরু হয়েছিল ১২ এপ্রিল প্রভাতী অধিবেশন দিয়ে। … ৪০০ ওয়াট ক্ষুদ্র তরঙ্গ ট্রান্সমিটার। মিটার ব্যান্ড ৮৩.৫৬।’ ১২ এপ্রিল অধিবেশনের অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হয়েছিল সার্কিট হাউসের বাড়িতে। পরবর্তী অনুষ্ঠানের যাবতীয় রেকর্ডগুলি হয়েছিল সার্কিট হাউসের গ্যারেজ কক্ষে। ‘পরবর্তী দিনগুলোতে গ্যারেজকক্ষেই রেকর্ডিং-এর ব্যাবস্থা চালু হয়েছিল। টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেটে অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হতো। সেই রেকর্ডিং কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ বানার্জী নিয়ে যেতেন এবং ট্রান্সমিটিং-এর ব্যবস্থা করতেন।’

কর্নেল চৌমুহনিতে তাঁদের বেতারের কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন করতে বলা হয়েছিল। এত পরিচিত মুখের ভিড়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা ছিল যারপরনাই কঠিন। এ ব্যাপারটি জানানো হয়েছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে।

বেতার কর্মীদের গোপনীয়তার খাতিরে ২০ এপ্রিল তাঁদের জেল রোডের বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। এ বাড়িতে ঢোকার পূর্বে সবার নাম পাল্টানো হয়েছিল। বেলাল মোহাম্মদ নিয়েছিল লালমোহন ছদ্মনাম। “আমার বাল্যস্মৃতিসমৃদ্ধ প্রিয় নাম। সন্দ্বীপের মুসাপুর গ্রামের  লালমোহন সেন ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের কনিষ্ঠতম (?) সদস্য। … মুস্তফা আনোয়ার নাম নিয়েছিল ‘শক্তি’; প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নামে। আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ‘সুভাষ’; সুব্রত বড়–য়া ‘সুনীল’; পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকদের নাম।” এখানে মেস করে খাওয়া দাওয়া করত। পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু এক মহিলাকে রাখা হয়েছিল রান্নাবান্না করার জন্য।

ইতিমধ্যে, ‘১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি রামগড়ে আনা হয়েছিল ১০ এপ্রিল বেলা ২টায়। বাশেদুল হোসেন ও আমিনুর রহমান রামগড় থেকে পটিয়া ফিরে গিয়েছিলেন ট্রান্সমিটারের জন্যে। গিয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর জিপে। ফটিকছড়ি হয়ে হাটহাজারি-গহিরা-মদনহাট-রাঙ্গুনিয়া-পাহাড়তলি-চন্দ্রঘোনা-কাপ্তাই। কর্ণফুলি নদী পার হয়ে বান্দরবান-দোহাজারি-পটিয়া, পটিয়ায় মেজর মীর শওকত আলীর সঙ্গে তাঁদের দেখা। কিন্তু পটিয়া মাদ্রাসায় ট্রান্সমিটারটি ছিল না। (উল্লেখ্য, ১৭ এপ্রিল পটিয়া মাদরাসায় বোমা  ফেলা হয়েছিল। আর এ এলাকার এম এন এ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরীর সদস্যপদ বাতিল করা হয় ট্রান্সমিটার চুরির অজুহাতে।) সরিয়ে নেয়া হয়েছিল বান্দরবানের সি এন্ড বি গুদামে। রাশেদুল হোসেন ও আমিনুর রহমান ৮ এপ্রিল সকালে দোহাজারি হয়ে বান্দরবানে পৌঁছেছিল। ওয়াপদা-র একটি পিক-আপ-এ তোলা হয়েছিল ট্রান্সমিটার ও যন্ত্র সরঞ্জাম। আবার ফিরতি পথচলা। চন্দ্রঘোনা হয়ে রাঙ্গুুনিয়া-পাহাড়তলি-মদনহাট-গহিরা-হাটহাজারি-ফটিকছড়ি।… ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার ইনস্টল করার স্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল বাগাফা-বেলোনিয়া  সড়কসংলগ্ন ফরেস্ট হিল-এ। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দশ মাইল দূরে।…  …১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি ১২ এপ্রিল যথাযথভাবেই ইনস্টল করেছিলেন তাঁরা। এবং নিজেদের কণ্ঠে ঘোষণা প্রচার, রেকর্ডেও গান প্রচার ছাড়াও সৈয়দ আবদুশ শাকের নিজের লেখা কথিকাও প্রচার করেছিলেন।’ এই ট্রান্সমিটার থেকে সম্ভবত ২৪ মে পর্যন্ত  অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়েছিল। ‘সেটি ২৪ মে ১৯৭১-এর পর থেকে আগরতলায় সংরক্ষিত ছিল। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ নং হেড কোয়ার্টার্সে — শালবাগানে। পরে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।’

২০ এপ্রিল রাতে ‘আকাশবাণী’র খবর শুনতে গিয়ে তাঁরা চমকিত হয়েছিল। ‘সংবাদ বুলেটিনের মধ্যেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল: ‘এই খররের পরপরই এখানে শ্রুত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাষণ পুনঃপ্রচার করা হবে।’

অথচ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র  থেকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রচার করা হয়নি। ব্যাপারটি হচ্ছে, “অল ইন্ডিয়া রেডিও-র শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে ভাষণ প্রচার করেছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। সেটা আরো আগে। এপ্রিলের প্রথম দিকে (১২)। শিলিগুড়ি কেন্দ্রের একটি অতিরিক্ত (স্পেয়ার) ট্রান্সমিটার এজন্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ প্রচারের তাগিদে ট্রান্সমিটারটির নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। তখন থেকে ট্রান্সমিটারটি নিবেদিত  হয়েছিল নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচারের জন্যে। মিডিয়াম ওয়েভে ট্রানজিস্টার সেটে আমরা একদিন পেয়ে গিয়েছিলাম। ঘোষণা শুনেই চমকে উঠেছিলাম। ‘সোয়াধীন বাংলা বেয়তার কেনদর’ পরিষ্কার একটি অবাঙালি কণ্ঠ।”

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

বিভ্রান্তি ঠেকাতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বলে কয়েক দিন পরেই এ সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কালুরঘাট থেকে ভারতে চলে যাওয়ার পরেও অস্থায়ী সরকারের নেতাদের বিভিন্ন ঘোষণা, প্রচারপত্র বা সংবাদ ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে হচ্ছে। এটা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতি বাংলাদেশি নেতৃত্বের অমনোযোগিতার প্রকাশ। মূলত ২৫ মে অবধি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভাল মন্দ সরাসরি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই ছিল।

কালুরঘাট পর্যায়ে যথা সময়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচার ছিল দুঃসাধ্য কাজ। আগরতলা পর্যায়েও প্রথম দিকে ধরাবাঁধা সূচিতে কাজ চালানো যায় নাই। তবে এ পর্যায়ের শেষের দিকে অনুষ্ঠানের রূপরেখা দাঁড়িয়েছিল এরকম, প্রথম অধিবেশন: সকাল ৮:৩০ মি. থেকে ৯:৩০ মি. (বাংলাদেশ সময়); স্থিতিকাল এক ঘন্টা। দ্বিতীয় অধিবেশন: বিকাল ৫:০০ মি. থেকে সন্ধ্যা ৭:০০ মি অথবা ৮:০০ মি. থেকে ১০.০০ মি. (বাংলাদেশ সময়)। স্থিতিকাল ২ ঘন্টা।  কোন কোন সময় আড়াই ঘন্টা।

২৫ মে বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নং দ্বিতল বাড়িতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল তাঁদের নিবাস। অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হত তাঁদের অজ্ঞাত ৪০০ ওয়াট শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে। তাঁদেরকে শালবাগান থেকে আরও ভিতরে কর্নেল চৌমুহনি পরবর্তীতে জেল রোডে রাখা হলেও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হত সম্ভবত শালবাগানের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ হেড কোয়ার্টারের আশপাশের এলাকা থেকে। ২৫ মে সকালের অধিবেশনের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্বের পরিসমাপ্তি হয়। শর্টওয়েভ মারফত এটিই ছিল সর্বশেষ অনুষ্ঠান।

এরিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তারা আগরতলা, কলকাতায় ভীড় জমাতে থাকে। তাছাড়া কলকাতার সর্বত্র ছিল বাংলাদেশের নানা বয়সী অগণিত কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, অভিনেতা, সংবাদ পাঠক, বুদ্ধিজীবীসহ নানা ঘরানার লোকজন। তরুণরা ছিল সংখ্যায় এগিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একটি গঠনমূলক পুর্ণাঙ্গ কাঠামো অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের কাছে  এর প্রয়োজনীয়তা  ক্রমে গাঢ়তর হতে থাকে।

সব মিলিয়ে উপর মহলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৫ মে সান্ধ্য অধিবেশন কলকাতা থেকে ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভে প্রচারের প্রস্তুতি নেয়া হয়। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে আসা বেতারের কিছু কর্মকর্তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আগরতলায় সকালবেলার অধিবেশন শেষ করে জেল রোডের অবস্থানরত কর্মকর্তাদের একটি অংশ কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে। মুস্তফা আনোয়ার ও বেলাল মোহাম্মদ ২৬ মে দুপুরে কলকাতা পৌঁছায়। বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নং দ্বিতল একটি বাড়িতে তাঁরা থাকতেন। নির্বাসিত সরকারের মন্ত্রী কামারুজ্জামান ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রীরা এ বাড়িতে থাকতেন। এক্ষেত্রে পি কে কাউল ছিলেন ভারতীয় তত্ত্বাবধায়ক।

২১/এ, বালু হাক্কাক লেনে ছিল সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার অফিস। সংগ্রামী সরকারের বেতার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত এম এন এ আবদুল মান্নান সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’র অফিসেই বসতেন। কারণ তিনি ‘জয় বাংলা’রও সম্পাদক। এখানে একটি খাতা খোলা হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে যারাই কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিচ্ছিল তাঁদের এই খাতায় পরিচয় নিবন্ধন করা ছিল ফরজ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ৩য় পর্যায়ে এসে নতুন বাঁক নেয়। এ পর্বে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার তার সার্বজনীন চরিত্র হারিয়ে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হয়ে উঠে। ২য় পর্যায়ে ‘আমিনুল হক বাদশার সঙ্গে আমার ক্ষীণ মতভেদ দেখা দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পলিসিগত ব্যাপারে। তিনি চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নামে কিছু প্রচার করতে। আমি প্রতিবাদী হয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য, দেশ থেকে হানাদারদের উৎখাত করা। এজন্যে দেশ-বিদেশে জনমত গড়ে তোলা। আমাদের কার্যক্রম কোনো দলীয়ভিত্তিক নয়, বরং বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক।… আগরতলায় আমার সঙ্গে মতভেদ দেখা দিয়েছিল আমিনুল হক বাদশার। সেটা বেশিদূর গড়ায়নি। মুজিবনগর বা ৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার পর্যায়ে প্রশ্নটি প্রকটতর হয়েছিল।’

“বেতারের নীতিমালার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছিল।… তখন একটি ছিন্নপত্রে আমি একটি মুসাবিদা করেছিলাম। ‘প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ গণ সরকার’-এর লেটার-হেড-এ, মুসাবিদাটি কোনো কাজে আসেনি।”

এ মুসাবিদার কয়েকটি ধারা এ রকম : “ক. এ হচ্ছে একটি নব বিকশিত জাতীয়তাবাদের প্রচার-যন্ত্র-যে জাতি ধর্মবর্ণ দলমতের ঊর্ধ্বে সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধীনতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে উদ্বুদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ। এ প্রচার-যন্ত্র কোনো বিশেষ দলীয় সঙ্কীর্ণতা পোষণ করতে পারে না। খ. একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে জাতীয় যুদ্ধের একমাত্র ধারকবাহক বলে বিবৃত করা হলে এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধের মর্যাদা দেয়া হয় না — ফলে বিশ্বের গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের আনুকূল্য পাওয়া দুষ্কর। একটি পার্টির প্রতি নয়, বরং জনগণের প্রতি সহায়তা আশা করাই সঙ্গত। গ. ছোটদের জন্যে প্রতি রবিবার ‘জ্ঞানের আলো’ প্রশ্নোত্তরের আকারে পরিবেশনা করা হয় — ওতে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন এবং নগ্ন জবাবে শুধু আওয়ামী লীগের কথাই বলা হয়। এটা নিঃসন্দেহে ইতিহাসকে বিকৃত করারই শামিল এবং ওয়াকিবহাল মহলে ও বাংলার গণমনে এর প্রতিক্রিয়া বিরূপ হওয়া স্বাভাবিক। ঘ. কথিকা প্রচারের জন্যে বেশির ভাগই বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োজিত করা দরকার — তাঁরা যে-কোনো মতাদর্শের অনুসারীই হোন না কেন! এখন হচ্ছে রাজনৈতিক দলমতের ঊর্ধ্বে দেশের স্বাধীনতার একক প্রশ্ন।”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই ভাগে কথক নির্বাচনের জন্য ক্লিয়ারেন্স নেয়া, লেখা দেখিয়ে নেয়ার একটা নিয়ম করা হয়েছিল। যা বেতারকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যমকে স্তিমিত করে দিয়েছিল। এ কানুন কিন্তু এম আর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ বা আব্দুল তোয়াব খানদের বেলায় প্রযোজ্য ছিল না।

বেলাল মোহাম্মদের একটি লেখা থেকে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি কেটে দেওয়া হয়েছিল। “আমার একটি পাণ্ডুলিপিতে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি ছিল।… : আরে, আরে! এটা কি লিখেছেন? ‘জনযুদ্ধ’ তো মাও সে তুং-এর কথা! এই অংশটুকু প্রচার করবেন না।… কেটে দেয়া হয়েছিল একটা প্যারাগ্রাফ। সে কথিকাটি আমি আর প্রচার করিনি। এর পরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে  লেখার উৎসাহ হারিয়েছিলাম।”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আগরতলা পর্ব সরাসরি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় বেতারকর্মীরা কোন চাপে ছিল না। এই সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মূলত নিরাপত্তা, টেকনিক্যাল দিক, ভরন পোষণের দিকটা দেখত। বেতারে ছিল কর্মীদের স্বরাজ। যাবতীয় কর্মকাণ্ড ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযুদ্ধের সার্বজনীন চরিত্র ছিল অক্ষুণœ। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২৫ মে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে ঐ (ঊঃযরপং) ছিল অক্ষুণœ। (২৫ মে পর্যন্ত) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।’

স্বাধীন বাংলা বেতারের  ২য় পর্ব পর্যন্ত অনুষ্ঠানের শুরুতে কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের প্রয়োজন পড়েনি। কলকাতা পর্বে ফিক্সড পয়েন্টে অনুষ্ঠান চালু হওয়ার পর থেকে কোরান তেলওয়াতের মাধ্যমে শুরু করা হতো। সিডিউল করে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন পাঠ করা হতো গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক। বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা চালু হওয়ার পর প্রথম দিকে অধিবেশনের শুরুতে কোরান বা কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করার রেওয়াজ ছিল না। ১০ জানুয়ারীর পর কোন এক সময়ে আবার ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির আলোকে পরপর কোরান-গীতা-ত্রিপিটক-বাইবেল (পাঠ করা হতে থাকে)।  সরকারি জনসভায়ও একই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।’

তবে কালুরঘাট পর্বে “৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশন থেকেই সমাপ্তি ঘোষণায় এই কথাটি চালু করেছিলাম: ‘আল্লা রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি তখনই কোনো জাতিকে সাহায্য করি, যখন সে জাতি নিজেকে সাহায্য করে।’ কথাটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমাপ্তি হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।”

পর্যাপ্ত সিনিয়র জুনিয়র বেতার কর্মকর্তা ও বিভিন্ন জমিনের এক ঝাঁক কুশীলবদের সমবেত অংশগ্রহণে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অনেকটা পরিপূর্ণ বেতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ‘৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের অনুষ্ঠান শুরু করার প্রস্তুতিপর্বে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন এম আর আখতার, পটুয়া কামরুল হাসান ও আমিনুল ইসলাম বাদশা।’

বিশাল পরিসরে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। ‘নতুন নতুন অনুষ্ঠান হয়েছিল সংযোজিত। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল ফিক্সড্ পয়েন্ট-এর। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট সময়-সূচি। সংবাদ বুলেটিন প্রচারের সময় ও স্থিতিকাল। ধারাবাহিক কথিকাসমূহের প্রচার-সময়। সপ্তাহিক অনুষ্ঠানের প্রচার-বার। নাটক জীবন্তিকার ফ্রিকোয়েন্সি। উর্দু অনুষ্ঠানের প্রচার-সময়। ইংরেজি অনুষ্ঠানের প্রচার-সময়।… ফিক্সড্পয়েন্ট তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। ও কাজটি অনুষ্ঠান প্রযোজক-সংগঠকদের। সহকর্মী তাহের সুলতান সহযোগিতা দিয়েছিলেন।’

একটু আগেই উল্লেখ করা হল এম আর আখতার মুকুলের কথা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্ব তথা ২৫ মে পর্যন্ত কার্যক্রমে তাঁর কোন নামগন্ধ ছিল না। কলকাতা পর্বে অর্থাৎ স্বাধীন বাংলা বেতারের ৩য় পর্যায়ে মঞ্চে দ্রুত আলো ছড়াতে থাকে এম আর আখতার মুকুলরা। বলা বাহুল্য এ পর্যায়ে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উপর আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়েছিল। এম আর আখতার মুকুলসহ অনেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালুরঘাট ও আগরতলা পর্বকে ধামাচাপা দিতে চাইত। তাঁরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস হিশেবে ২৫ মে রাষ্ট্র করতের উদ্যোগী হয়েছিল। ‘১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক এম আর আখতার উদ্যোগী হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের জন্যে। চট্টগ্রামে  টেলিফোনে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করতে চান ঢাকায়। উত্তরে আমি বলেছিলাম: ২৫ মে? ঐ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস তো ২৬ মার্চ।… সেই অভিনব উদ্যোগ সম্পর্কে পরে আর জানতে পারিনি।’

বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিবৃত্ত, ইতিহাস আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে নানাবিধ প্রসঙ্গ এসেছে। কমরেড দেবেন শিকদারের তৎপরতায় জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলার প্রসঙ্গটি এরকম: ‘কমরেড দেবেন শিকদার ৬ এপ্রিল রাজশাহী জেল ভেঙে বেরিয়েছিলেন। সীমান্ত পেরিয়ে আসার উদ্দেশ্য বলেছিলেন, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলা।… অমূল্য লাহিড়ীকে পাঠানো হয়েছিল মণি সিংহের কাছে। মীজানুর রহমান চৌধুরীকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের কাছে। মশিউর রহমান (জাদু মিয়া) ও আবু নাসের ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগের। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল আগরতলায় আবুল বাশার, কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে আলোচনা করার। এছাড়া যদি সম্ভব হয়, আতাউর রহমান খান এবং মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গেও যোগাযোগের। ১৮ এপ্রিল সবাই পুনর্বার সম্মিলিত হয়েছিলাম টাওয়ার হোটেলে। অমূল্য লাহিড়ী জানালেন, মণি সিং চীনপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট করতে রাজি নন। কারণ তাতে ‘দেবী’র সায় নেই।’

ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রসঙ্গটিও মজার ও লক্ষ্য করার মত। মোজাফফর আহমদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রশংসা করলেন। পরিচয়ের প্রথম দিনই, ‘জনান্তিকে নিম্নকণ্ঠে বলেছিলেন: আপনি তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করছেন। ওদের নিজেদের ভেতরে ঐক্য নেই। মোস্তাক হলো আমেরিকাপন্থী, আর তাজউদ্দিন আমাদেরপন্থী। দুইজনের মধ্যে দারুণ ক্ল্যাশ।… আমি নীরব ছিলাম। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করেছিলেন: দুইজনের মধ্যে যে ক্ল্যাশ, সেটা খেয়াল কইচ্ছেন নি?… : জ্বি না। (কয়েক দিন পরে) : জানেন তো নিশ্চয়, এই তো সেদিন মোস্তাক আর তাজুদ্দিনের মধ্যে এক চোট হয়ে গেছে।…: জি না, স্যার। আমি কিছুই জানি না।…  অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ অনুযোগ দিয়ে বলেছিলেন: দূর, মিয়া! ওদের ভেতরে থাকেন। কিচ্ছু খেয়াল করেন না। সব জেনে আমাদের জানাবেন তো!… উত্তরে সঙ্গে সঙ্গে আমি বলেছিলাম: আমি কি আপনার এজেন্ট, স্যার?’

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর জন্মলগ্নে মুশতারী লজের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গত কারণে বইটিতে নানাভাবে ডা. এম শফী পরিবারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। আমাদের এই আলোচনায়ও তাঁদের ভূমিকার কথা শুরুর দিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৭ মার্চ ন্যাপ নেতা চৌধুরী হারুন অর রশীদ এক ট্রাক গোলাবারুদ নিয়ে ‘মুশতারী লজে’ গিয়েছিলেন। দোতলার ‘টু-লেট’ লাগানো ঘরটিতে সেগুলো রেখেছিলেন। ডা. শফীকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘ভয়ের কারণ নেই। ঘরটি তালাবদ্ধ থাকবে। ব্যাক ডেটে একটি ভাড়াটের দলিল স্বাক্ষর করা হবে। বাড়িওয়ালা যেন কিছুই জানেন না। ভাড়াটে মাস দু’য়েক আগে তালা দিয়ে কোথাও চলে গেছেন।’

৭ এপ্রিল সকাল বেলা পাক হানাদার বাহিনী হানা দিয়েছিল ‘মুশতারী লজে’। ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর হাতে দেয়া হয়েছিল একটি অভিযোগপত্র! স্থানীয় অবাঙালিদের স্বাক্ষর ছিল ওতে। বিচিত্রসব অভিযোগ আনা হয়েছিল। ‘মুশতারী লজ’র দুইজন মাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ডা. মোহাম্মদ শফী ও বেগম মুশতারীর একমাত্র ছোট ভাই খোন্দকার এহসানুল হক আনসারীকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিগ্রেডিয়ার বেগের কাছে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ডা. শফী ছিলেন ব্রিগেডিয়ার বেগের দাঁতের ডাক্তার। তাই সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

“ঘন্ট দু’য়েক পরেই আবার এসেছিল হানাদারের আর একটি দল। লক্ষ্য, দোতলার ঘর তল্লাশি করা।… তালা ভাঙা হয়েছিল দোতলার ঘরের। কিছুই ছিল না আসবাবপত্র। শুধু কয়েকটি কাঠের বাক্স। গোলাবারুদের বাক্স। বাক্সের গায়ে লালকালিতে জ্বলজ্বল করছিল লেখা — ‘২৭ মার্চ ১৯৭১’। লেখাটি ইংরেজি হরফে।… এর পরে হানাদার দলপতির কাছে কোনো কৈফিয়ৎ দেবার উপায় ছিল না।… এই দুজনকে এবারে পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর ফিরে আসেননি তাঁরা।”

এরপর সাত সন্তানের জননী বেগম মুশতারী শফী ১৬ বছর বয়সী বড় কন্যাকে চট্টগ্রামে আত্মীয়ের বাসায় রেখে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় চলে গিয়েছিলেন গ্রামের দিকে। অতিকষ্টে এক সময় পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতায়। স্বাধীন বাংলা বেতারের ৩য় পর্যায়ে তিনি ছিলেন নিয়মিত কথিকা পাঠক। উম্মে কুলসুম ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। ছদ্মনাম নিয়েছিলেন পাছে স্বনামে তাঁকে চিনে ফেলতে পারে পাক হানাদার বাহিনী। আর এতে করে তাঁর সহধর্মী ও ছোট ভাই জীবিত থাকলে তাঁদের উপর নির্যাতন বেড়ে যাবে বা তাঁদেরকে হত্যা করা হবে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন ডা. শফী। পেশায় ছিলেন দাঁতের ডাক্তার। “আধুনিক দন্ত্য চিকিৎসায় পারদর্শী তিনি — খুব সহজেই তাঁর পসার জমে উঠেছিল। শহরের প্রাণকেন্দ্র এনায়েত বাজারে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছিলেন। স্ত্রীর নামে বাড়ির নাম: ‘মুশতারী লজ’।”

‘ডাক্তার মোহাম্মদ শফী ছিলেন একজন সহজ-সরল বাঙালি। বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কে মস্কোপন্থী বা চীনপন্থী, তার ধার ধারতেন না। যিনিই জেল খেটেছেন, তিনিই তাঁর শ্রদ্ধার পাত্র। যাঁরই নামে হুলিয়া আছে, তাঁকেই তিনি আশ্রয় দেবেন।’

ডাক্তার শফীর অধুনিক মননের প্রকাশ ‘বন্ধবী সঙ্ঘ’ কেন্দ্রীক কার্যক্রম। “ডা. শফীর তত্ত্বাবধানে প্রথমত একটি সঙ্ঘ চট্টগ্রামের ‘বান্ধবী সঙ্ঘ’ গড়ে উঠলো — নেত্রী তাঁরই সহধর্মিণী বেগম মুশতারী শফী। ক্রমে স্থানীয় উৎসাহী মহিলাদের সমাবেশ ঘটতে লাগলো এই সঙ্ঘকে ঘিরে। ‘বান্ধবী সঙ্ঘে’র পরিচালনায় ‘বান্ধবী সঙ্গীত ও গিটার শিক্ষার আসর’, ‘বান্ধবী কুটির শিল্প কেন্দ্র’ ইত্যাদি ক্ষুদ্র অথচ সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলো। বেগম মুশতারী শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো চট্টগ্রামের প্রথম মহিলা মাসিক ‘বান্ধবী’। পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ‘বান্ধবী সাহিত্য আসর’। পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশনার পাঁচ বছরের সময় ১৯৬৮ সালে ডা. শফী নিজের বাসভবনের দুটি কামরাকে রূপান্তরিত করলেন একটি ক্ষুদ্র ছাপাখানায়। অভিনব প্রয়াস — ছাপাখানার নাম ‘মেয়েদের প্রেস’ — এতে কম্পোজিটার সব মেয়ে।”

১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় উর্দুভাষীদের উপর কোথাও কোথাও হামলা হয়েছিল। ডা. শফীর আশপাশে কয়েকটি বিহারি পরিবার ছিল। মারমুখো জনতা হামলা করেছিল তাঁদের উপর। ‘বুক টান করে দাঁড়িয়েছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ শফী। এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। এদেশেরই নাগরিক। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু এঁদের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। ডাক্তার মোহাম্মদ শফী উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন: আগে আমাকে মারো। তারপর আমার প্রতিবেশীদের মারবে।… হামলাকারীরা ফিরে গিয়েছিলেন।’

এক সময় যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন পাক বাহিনীর কাছে তারাই ডা. শফীর বিরুদ্ধে নালিশ করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থানার লোকজন এসেছিল ‘মুশতারী লজে’। বেগম মুশতারী শফীর কাছে জানতে চেয়েছিল, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কি না। থানার অনুরোধে বলেছিলেন, ‘সব নাম তো পড়তে পারিনি। প্রথম নামটি ছিল ডাক্তার মালাম-এ গফুরের।… ঐটুকু জবানিতেই অ্যারেস্ট করা হয়েছিল ড. মালামে-এ গফুরকে। প্রতিক্রিয়া হয়েছিল চমৎকার। বিবিধ মহল থেকে অনুরোধ এসেছিল অভিযোগটুকু প্রত্যাহারের জন্যে। বিনিময়ে ড. মালাম-এ গফুর ক্ষতিপূরণ দেবেন।… সুপারিশ করেছিলেন মন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরীও। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আমার উপস্থিতিতেই বলেছিলেন বেগম মুশতারী শফীকে: ভাবী, আপনি একটু লিখে দিন যে ডাক্তার মালাম-এ গফুরের ব্যাপারে আপনার কোনো অভিযোগ নেই। আপনাকে এক লক্ষ টাকা দেয়া হবে।… এবারে সত্যি সত্যি ক্ষেপেছিলেন বেগম মুশতারী শফী। বলেছিলেন: আমি তো মাত্র এক লক্ষ টাকা পাবো। আর আপনি কতো লক্ষ টাকা পাবেন এ জন্যে? আপনার মাধ্যমেই বলে দিচ্ছি, এ বিষয়ে আর যদি কেউ আমাকে বলতে চায়, আমার কাছে ভদ্র ব্যবহার পাবে না।… পরে মালাম-এ গফুরকে জামিনে মক্তি দেয়া হয়েছিল। মুক্তি পেয়েই তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।’

আমরা বেতারের আলাপ থেকে একটু অন্যপ্রসঙ্গে চলে এসেছি। যাই হোক, বেতারি আলাপে ফিরার আগে দস্তিদার দম্পতির প্রসঙ্গটা উল্লেখ করি। বেতারের কাজে ১ জুলাই কলকাতা থেকে আগরতলা এসেছিলেন বেলাল মোহাম্মদ। ‘সে যাত্রায় আগরতলায় আমি ১০ দিন ছিলাম। ঐ সময়েই এসেছিলেন শান্তি দস্তিদার। পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সহধর্মিণী। বিধবার সাজ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণেন্দু দস্তিদার  প্রয়াত হয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দলের সঙ্গে যাত্রা করার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে সকলের সম্মিলিত হবার স্থান নির্দিষ্ট ছিল। পূর্ণেন্দু দস্তিদার যথাসময়ে পৌঁছতে পারেননি। চৌধুরী হারুন-অর রশীদরা তাঁর জন্যে অপেক্ষা করেননি। দলীয় সঙ্গীদের না পেয়ে বৃদ্ধ পূর্ণেন্দু দস্তিদার বেপথু সীমান্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। বিপাকে পড়ে রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। শান্তি দস্তিদার একচোটে নিয়েছিলেন চৌধুরী হারুন-অর রশীদকে। বলেছিলেন: একজন বৃদ্ধ মানুষ। সারাটা জীবন পার্টির সেবা করলো। তাঁর জন্যে দু’টি মিনিট অপেক্ষা করা গেলো না! আমি আর এই পার্টির সঙ্গে থাকবো না। এখানে সি-পি এম নেতাদের কাছে সব বলবো। কলকাতায় গিয়ে।’

বেলাল মোহাম্মদ মনে করতেন চৌধুরী হারুন অর রশীদের খামখেয়লীপনা মুশতারী পরিবারের জন্য কাল হয়েছিল। ‘সেই গোলাবারুদ রাখার কারণেই ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর ওপর এসেছিল বিপদ। কিন্তু চৌধুরী হারুন অর রশীদ তো এখন আগরতলায়। ক্রাফট্স ইনস্টিটিউটে তাঁদের ক্যাম্প।’

কথায় লতা, কথায় শয়তান। আসলে বেলাল মোহাম্মদের বইটিতে এত বেশি প্রসঙ্গ এসেছে যে বইটির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য তৈরি করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। নবেম্বর মাসে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওর অবসরপ্রাপ্ত ডাইরেকটর আর এন আচারিয়া। উপদেশক হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে প্রোগ্রাম ম্যাটেরিয়েলস দেখতে চাইতেন তিনি। আলাপ করতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। “একদিন বলেছিলেন: আচ্ছা, মি: বেলাল, আপনারা উদ্বোধনী ঘোষণায় আরবি ভাষায় সালাম কেন বলেন? সমাপ্তিতে ‘খোদা হাফেজ’ কেন বলেন? শুধু ‘জয় বাংলা’ বললেই কি চলতে পারে না? আমি কোনো আপত্তি তুলছি না। এমনি শুধু জানতে চাইছি।… উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম: আপনারা, স্যার, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নামের সঙ্গে আজকাল ‘শ্রী’ না বলে সচেতনভাবে ‘জনাব’ বলেন কেন? বরাবরই আকাশবাণী থেকে মুসলিম নামগুলোর উচ্চারণে বিকৃতি লক্ষ্য করতাম আমরা। আজকাল আমাদের নেতাদের নামগুলো বেশ যতেœর সাথে উচ্চারণের চেষ্টা করা হয়। এই সদিচ্ছা কেন?” আচারিয়া বাবু দ্রুত আপসে গিয়ে প্রশমিত করেছিলেন আলাপ।

আর এন আচারিয়া সাহেব আরেক দিন শেখ মুজিবুর রহমানহীন ভবিষ্যত নেতৃত্বের ব্যাপার নিয়ে আলাপ উঠিয়ে ছিলেন। ‘: আচ্ছা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো এখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। কি অবস্থায় আছেন, কি পরিণতি হবে, কিছু তো বলা যায় না। … (বেলাল মোহাম্মদ): বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে তেমন কিছু আমরা ভাবতেই চাই না। আমাদের দুর্ভাগ্য, যদি কোন অঘটন ঘটেই, তাহলে বঙ্গবন্ধুর শূণ্যস্থান আর পূরণ হবে না।’ আলাপের এক পর্যায়ে আর এন আচারিয়া বললেন, ‘:প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কথাই বলছি। নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পরে নিশ্চয়ই যোগ্যতম। আপনারা এখন থেকে তাঁর ইমেজ গড়ে তোলার চেষ্ট করুন। এটা অবশ্য আমার একটা নগণ্য পরামর্শ।’

‘২২ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে কলকাতা থেকে নির্বাসিত সরকার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। স্বাগত জানানো হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্র থেকে ধারাবিবরণীর মাধ্যমে। ১৬ ডিসেম্বরের পর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল শত্রুমুক্ত ঢাকা কেন্দ্র। তারপর পুনরায় চালু করার জন্যে ট্রান্সমিটারের অবস্থা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। অগ্রগামী পর্যবেক্ষক হিসেবে কলকাতা থেকে ঢাকা প্রেরিত হয়েছিলেন সৈয়দ আবদুশ শাকের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দশজন প্রতিষ্ঠাতা কর্মীর একজন।’

তথ্য সচিব আনোয়ারুল হক আমাদের জানিয়েছিলেন মন্ত্রিসভাকে ঢাকায় স্বাগত জানানোর মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্র চালু হবে। সে মুহূর্ত থেকে মুজিবনগরের কার্যক্রম শেষ হবে। আর এটাই ছিল প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। ভারত সরকারের মর্জি মোতাবেক ২ জানুয়ারি পর্যন্ত বেতার কার্যক্রম চালাতে হয়েছিল। “ঢাকা কেন্দ্র চালু হবার পরও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যায়নি কলকাতার কার্যক্রম। ২ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত ৫০-কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার থেকে প্রচার করতে হয়েছিল অনুষ্ঠান। মান ছিল ক্রমনিষ্প্রভ। সেই দশদিন নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ বেতার, মুজিরনগর’।”

‘ঘটনাচক্রে শেষের দিনগুলোর দায়িত্বে মুজিবনগরে আমাকেই থাকতে হয়েছিল। ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠা এবং ২ জানুয়ারী ১৯৭২-এ সমাপ্তি। আমার আদ্যোপান্ত কার্যকাল।’

কবি বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির পরিশিষ্ট হিশেবে ২টি অনুষঙ্গ আছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁহার প্রচারিত ৪৭টি কথিকা নিয়ে অনুষঙ্গ-১। আর অনুষঙ্গ-২ এ আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময়ে উঁনার প্রচারিত ৯ টি কবিতা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত যে কোন কিছুর মতো এগুলোরও একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। বেলাল মোহাম্মদের মানস, ঝোঁক বুঝার জন্যও এসব জরুরী। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির এই ‘সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিবৃত্তমূলক বয়ানটা ধরার চেষ্টা করেছি। তাই বিনয়ের সাথে সংযুক্ত অনুষঙ্গ ২টিতে হস্তক্ষেপ থেকে আমরা বিরত থেকেছি।

একটি বইয়ের সংক্ষিপ্ত ভাষ্য কখনোই মূল বইয়ের বিকল্প পাঠ্য হতে পারে না। সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। সদ্য প্রয়াত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পুরোভাগের কাণ্ডারী কবি বেলাল মোহম্মদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এটি একটি অক্ষম প্রয়াস মাত্র।

বইটিতে প্রধানত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘটনা প্রবাহ আলোচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের টুকটাক এত স্মৃতি এসেছে যা এই সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে ধারণ করা অসম্ভব। তারপরও যা না আনলে সংক্ষিপ্ত ভাষ্য কথাটিই অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে শুধু তাই খানিকটা বিবৃত করা হলো। আরও দু’একটি ঘটনার বিবরণ দিতে পারলে সংক্ষিপ্ত ভাষ্যটি হয়তো আরেকটু পূর্ণতা পেত সন্দেহ নাই। কিন্তু আগ্রহী পাঠিকা বইটি কেন উল্টিয়ে দেখবেন না?

বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্মৃতি নিয়ে ইতিবৃত্তমূলক এই বইটির শক্তিশালী দিক: ঘটনা-তথ্য-উপাত্তের বৈপরীত্যহীনতা, সত্যের অকপট নির্ভীক উচ্চারণ ও বিভিন্ন ঘটনার নির্মোহ বয়ান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তো বটেই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অনুসন্ধীৎসুদের কাছেও বইটির অশেষ সমাদর উত্তরোত্তর বাড়বে — এমনটিই আমাদের বিশ্বাস।

(সমাপ্ত)

আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা লইয়া ফ্রানৎস ফানোঁর একটি লেখা

আলজেরীয় যুদ্ধে নারীর ছদ্মবেশে অংশগ্রহণ ছবি: ব্যাটল অব আলজিয়ার্স

আলজেরীয় যুদ্ধে নারীর ছদ্মবেশে অংশগ্রহণ
ছবি: ব্যাটল অব আলজিয়ার্স

উপনিবাসের কবল হইতে দিনে দিনে আলজেরিয়া দেশটা যত মুক্ত হইতেছে, কতিপয় পুরাতন গালগল্প ততই অচল হইয়া পড়িতেছে।

উপনিবাসিক জগতে যেসকল বিষয় ‘বোধের অগম্য’ বলিয়া গোণা হয়, তাহার মধ্যে বহুলকথিত একটি বিষয় হইল আলজেরীয় নারী। কি সমাজবিজ্ঞানী, কি এসলামী আলেমউলামা, কি আইনবিশারদ — আলজেরীয়ার নারী প্রশ্নটি লইয়া ইহাদের সকলেই বহুবিধ গবেষণা করিয়া থাকেন।

কাহারও বিচারে আলজেরীয় নারী পুরুষের দাসী, কাহারও কাছে বা গৃহের সর্বেসর্বা কর্ত্রীঠাকরুণ — নানা বিচারের মধ্যে নারীর প্রকৃত দশাটি যে কি তাহা লইয়া তত্ত্ববিশারদগণের তল্লাশের অবধি নাই।

আরেক পক্ষ আছেন — তত্ত্বে তাঁহারাও কম যান না  — তাঁহারা বলেন আলজেরীয় নারী মুক্তির স্বপ্ন দেখে বৈকি, কিন্তু পশ্চাৎপদ, উগ্র পিতৃতন্ত্র তাহাদের এই ন্যায্য বাসনা পূরণে বাধ সাধে। ফরাসী জাতীয় সংসদেও ইদানীং কালের বির্তক খেয়াল করিলে দেখিতে পাইব ইহারা খাইয়া না খাইয়া এই ‘সমস্যা’র পরিষ্কার সুরাহা করিতে ব্যতিব্যস্ত। অধিকাংশ বক্তাই আলজেরীয় নারীর দুর্দশা লইয়া মহাচিন্তিত, ইহাদের ভাগ্য বদলাইতে বদ্ধপরিকর। তাঁহারা জুড়িয়া দিতে ভুলেন না যে বিদ্রোহটা সামলাইবার ইহাই একমাত্র রাস্তা। উপনিবাসের দশাকে ‘সমাজবিজ্ঞানের বিচার্য মামলা’রূপে বিবেচনা করা উপনিবাসিক ধুরন্ধরগণের নিত্য অভ্যাস। তাঁহারা কহেন এই সকল দেশ তো নিজেকে পরের হাতে তুলিয়া দিবার জন্য মুখাইয়াই আছে। ইহার উজ্জ্বল নমুনা হিসাবে তাঁহারা মাদাগাস্কারের কথা পাড়িয়া থাকেন, পরনির্ভরতা নাকি মাদাগাস্কারীর মনের  শেকড়ে প্রোথিত।

‘আলজেরীয় নারী অধরা, রহস্যময়ী, আর কিনা মর্ষকামী প্রকৃতির’। আলজেরীয় নারীর এই চরিত্র আঁকিতে তাঁহারা ইহার নানা আচার-আচরণ বিশদ বর্ণনা করিয়া থাকেন। কিন্তু সত্যকথা হইল অস্ত্রের জোরে শায়েস্তা করিয়া দখলকৃত দেশের জনগণের চরিত্র অধ্যয়ন করা সহজ কর্ম নহে। শুদ্ধ তাহাদের ভূখণ্ডই দখল হইয়াছে তাহা নহে। শুদ্ধ বন্দর কিংবা আকাশ সীমাও নহে। ফরাসী উপনিবাস খোদ আলজেরীয় ব্যক্তির ভেতরটা অবধি দখল করিয়া বসিয়াাছে, ব্যক্তির অন্তরের গভীরে ক্রমাগত হানা দিয়া তাহার আপন সত্তাকেই উচ্ছেদ করিতেছে, ঠাণ্ডামাথায় ধাপেধাপে তাহাকে কাটিয়াচিরিয়া পঙ্গু করিতেছে।

দেশের জমিন দখল হইল আর দেশের ব্যক্তি দিব্য মুক্ত থাকিল — তাহা হইবার নহে। আস্ত দেশটা, তাহার ইতিহাস, তাহার নিত্য প্রাণস্পন্দন লইয়া পদেপদে প্রশ্ন উঠে, তাহাকে বিকৃত, পঙ্গু করা হয় — ইহার পিছনে উদ্দেশ্য চূড়ান্ত সর্বনাশ  বৈ নহে। এহেন পরিস্থিতিতে মায় ব্যক্তির নিঃশ্বাস নজরবন্দি হয়, বেদখল থাকে। নি:শ্বাসও থাকে যুদ্ধের আওতায়।

সেই হইতে দখলীকৃত দেশবাসী তাহার প্রকৃত ভাব গোপন রাখিবার অভ্যাস আয়ত্ত করে। দখলদারের সামনে দখলীকৃত দেশবাসী লুকাছাপা করিবার, ধোঁকা দিবার বিদ্যা রপ্ত করিয়া ফেলে। অস্ত্রের জোরে জারি দখলদারির কেলেংকারির পাল্টারূপে সে জারি করে নিত্যদিনের সম্পর্কে ফাঁকির কেলেংকারি। দখলীকৃত দেশবাসী দখলদারের সাথে সাক্ষাতমাত্রেই ধোঁকা দিয়া চলে।

যে সকল ছদ্ম সত্য এত বছর উপর্যুপরি ‘সরেজমিন গবেষণা’ করিয়া যথার্থ বলিয়া প্রমাণ করা হইয়াছে, ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আলজেরীয় নারীরা সেইসকল সত্য ধূলিসাৎ করিয়া দিয়াছে। আলজেরীয় বিপ্লব মূল্যবোধ আর দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা বস্তুগত পরিবর্তন তো আনিয়াছেই। কিন্তু সত্য বলিতে, আলজেরীয় জনগণ আসলে কোনদিন নিরস্ত্রই হয় নাই। ১লা নবেম্বর ১৯৫৪ সালে আসিয়া যে লোকের মধ্যে জাগরণ দেখা দিয়াছে তাহা নহে, বরং ফরাসী-মোসলেম আমলের সোনালি দিনগুলি জুড়িয়া যে কায়দাকৌশল তাহারা আয়ত্ত করিয়াছে, মজবুত করিয়াছে তাহাই কাজে লাগাইবার সংকেত দিয়াছে ১লা নবেম্বর।

আলজেরীয় নারীগণ তাহাদের ভাইদের সাথে মিশিয়া নীরবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গঠিয়া তুলিয়াছে, ফলে মুক্তিযুদ্ধে তাহারা মৌলিক ভূমিকা রাখিতে পারিতেছে।

গোড়াতেই উঠিয়াছে বহুল আলোচিত আলজেরীয় নারীর দশার কথা — তাহারা নাকি অবলা অবরোধ বাসিনী। কানা কড়ির মূল্য না পাইয়া অপমানে নীরব অবহেলায় তাহারা নাকি আবদ্ধ থাকে প্রায় না থাকার মতন করিয়াই। যে ‘মোসলেম জগতে’ তাহাদের কোন গুরুত্ব নাই, সেই সমাজই কিনা তাহার ব্যক্তিত্ব পঙ্গু করিয়া,  প্রজ্ঞালাভের সকল উপায় রুদ্ধ করিয়া চিরকাল তাহাকে নাবালিকা বানাইয়া রাখিয়া দেয়।

আলজেরীয় নারী লইয়া এই সকল কথাবার্তা এত দিন ‘বৈজ্ঞানিক কর্ম’ হিসাবে চর্চিত হইয়া আসিয়াছে। আলজেরীয় বিপ্লবের অভিজ্ঞতা আজ হঠাৎ এসকল কথাকে অতি কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলিয়া দিয়াছে।

আলজেরীয় নারীগণের ঘরপ্রীতি — ঘরে আবদ্ধ থাকিবার বাসনা যে জগৎ তাহাকে চাপাইয়া দিয়াছে এমন নহে। বাহিরের সূর্য, রাস্তা কিংবা দৃশ্যের প্রতি বিরাগ বশত যে তাহারা বাহির হন না ইহাও মিছা । দুনিয়া হইতে পলায়নও ইহা নহে।

কথা ইহাই যে স্বাভাবিক সময়ে মোটাদাগে পরিবার ও সমাজ দুইয়ের মধ্যে দুইমুখি আদান প্রদান হইয়া থাকে। পরিবার সমাজের সত্যের ভিত্তি স্বরূপ, আবার পরিবারকে স্বীকৃতি ও বৈধতা দেয় সমাজ। উপনিবাসিক ব্যবস্থা পরিবার ও সমাজের এই পারস্পরিক স্বীকৃতির নিপাত সাধন করে। এ অবস্থায় অগত্যা আলজেরীয় নারীরা নিজেদের উপর নিজেরাই বাধানিষেধ আরোপ করিয়া, গৃহের গণ্ডিতে নিজ অস্তিত্বখানি টিকাইয়া রাখে, আর যুদ্ধে প্রস্তুত হইবার জন্য আপন চেতনায় শান দেয়।

এরূপ আত্ম নির্বাসন, চাপাইয়া দেওয়া পরিবেশকে এহেন প্রত্যাখান, নিজের ভেতর এইরূপ গুটাইয়া আসার মধ্য দিয়া তাহারা নিজ অস্তিত্বকে গণ্ডিতে বাঁধিয়া ফেলে বটে, তথাপি গণ্ডির ভিতর সেই অস্তিত্ব সংহত। দুর্বলতা দূরের কথা, দীর্ঘদিন এই গুটাইয়া থাকাই ছিল বেদখল দেশবাসিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি। এইভাবে নারী একাই বুঝিয়া শুনিয়া, সজ্ঞানে কৌশল খাটাইয়া বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে যুঝিয়া আপন কর্তৃত্ব কায়েম রাখে। আসল উদ্দেশ্য হইল দখলদার বাহিনী যেন প্রতিনিয়ত চতুরঙ্গ প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। শাদাচোখে যাহা নীরক্ত অবরোধবাসনা বলিয়া ভ্রম হয়, তাহা পুরাতন রেওয়াজের আড়ালে আসলে প্রতিরোধই জারি রাখে।

বিপ্লবের হাওয়া ও প্রেরণা নারী ঘরের ভেতর লইয়া আসিয়াছে। বিপ্লবী যুদ্ধ নিছক পুরুষের যুদ্ধ হইতে পারে না।

এই যুদ্ধ সক্রিয় সৈন্য ও মজুদ সৈন্যের দল লইয়া করা যুদ্ধ নহে। আলজেরীয় জনগণ যে বিপ্লবী যুদ্ধে নামিয়াছে তাহা সর্বাত্মক যুদ্ধ; তাহাতে নারী কেবলমাত্র সৈনিকের জামা সেলাই করিয়া, তাহার জন্য বিলাপ করিয়া আপন কর্তব্য সম্পন্ন করে নাই। যুদ্ধের একেবারে মধ্যখানে আলজেরীয় নারী সশরীরে হাজির। গ্রেপ্তার হইয়া, মার খাইয়া, ধর্ষিতা হইয়া, গুলি খাইয়া তাহারা দখলদারের সহিংস ও অমানুষিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দিতেছে।

সেবিকা রূপে, দূত রূপে, যোদ্ধা রূপে আলজেরিয়ার নারীর কর্মকাণ্ড হইতে যুদ্ধটা কত গভীর ও প্রবল তাহা বুঝিতে বেগ পাইতে হয় না।

এইবার আমরা নারীগণের কপালের নিকট নিজেকে সঁপিয়া দেওয়ার অভ্যাস, সাক্ষাৎ বিপদ দেখিয়াও অবিচল থাকা, ঘটনার গুরুত্ব বুঝিয়া কর্মপন্থা ঠিক করিতে না পারা ইত্যাদি অভিযোগ লইয়াও কথা তুলিব। শত বিপদেও তাহার অমলিন হাসি, ঘোর সংকটেও যেন বা অলীক আশা পুষিয়া রাখা, কোনকিছুতেই নত না হওয়া, পিছু না হটা — এইসকল আচরণ দেখিয়া বলা হয়, বাস্তবতা ধরিতে পারিবার মত বুদ্ধি ইহাদের হয় নাই।

নারীর এই মেজাজ যে আদতে পরিস্থিতি লইয়া সুগভীর উপলব্ধির ফসল তাহা দখলদারেরা ধরিতে পারে না। আজিকে আলজেরীয় নারীরা সংগ্রামে যে সাহসের পরিচয় দিতেছে তাহা ভূঁইফোঁড়ও নহে কোন রাতারাতি পরিবর্তনও নহে, তাহাদের কথিত মেজাজই আজ অভ্যুত্থানের তুঙ্গদশায় আসিয়া পৌঁছিয়াছে।

আলজেরিয়ার সমাজে নারীর অবস্থান লইয়া এতদিন এত গরম গরম বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে যে আজিকে ব্যাপার দেখিয়া দখলদার বাহিনী যে থ বনিয়া গিয়াছে ইহাতে আশ্চর্য নাই। আলজেরীয় সমাজ যে এতদিন ধরিয়া প্রচারিত গল্পের মত নারীবিদ্বেষী আসলে নহে ইহা আজ ফাঁস হইয়াছে।

আমাদের ভগিনীরা আমাদের পাশাপাশি শত্রুর ব্যূহ ছিন্নভিন্ন করিতে, পুরাতন যত রাহসিক গালগল্প একদম জন্মের মত নাশ করিতে লড়াই করিতেছে ।

তর্জমা : প্রিয়ম পাল

উৎস: Fanon, Frantz: A Dying Colonialism. Translation: Haakon Clevalier, Monthly Review Press, 1980.

সম্পাদকীয়: সকল সাম্রাজ্যবাদি হুইসেল নিপাত যাক

 

স¤প্রতি বিভিন্ন উৎস হইতে নানানরকম রেলগাড়ির হুইসেলের খবর প্রচার হইতেছে। কেহ কেহ বলিতেছেন, অনেকরকম বগি হইতে অনেকগুলি বাঁশির বাজনা কাঁদিয়া উঠিলেও ট্রেন মূলত একটাই — আর ইহা নির্বাচনী ট্রেন। প্রতি পাঁচবছর পরপর আসিয়া গ্রামবাংলার মাটি কাঁপাইয়া ইহার দানবীয় ছিটি কু কু করিয়া বাজিয়া ও বাজাইয়া চলিয়া যায়। তবে সত্য হইতেছে, এখন পর্যন্ত ট্রেন আসলে দুইটা — পাকমার্কিন এবং কিছুটা রুশ এসেন্সওয়ালা ভারতীয় এক্সপ্রেস। আর তাহাদের নাযিল হইবার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বলিয়াও কোন লেখাজোখা নাই। কিম্বা তাহারা হয়ত দেশের সর্বত্র ও সর্বসময় নাযিল হইয়াই থাকেন। দুঃখের বিষয় এই দুই রেলরূপী অজগর দানবের বিপরীতে শক্তিশালী কোন জনতার প্লাটফর্ম ইতিমধ্যে গড়িয়া ওঠে নাই। ফলে যাহা ঘটিতেছে তাহা তামাশার অধিক।

বর্তমান সরকারি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ এইবারের পূর্বে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসিয়া স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উৎসব বেশ ঘটা করিয়াই করিয়াছিলেন। ইহা যথার্থ আনন্দের কাব্য। বেদনার গীত হইতেছে, ক্ষমতায় আসিবার প্রয়োজনে তাহারা সেইবার সকলকে অবাক করিয়া জামায়াতের সহিত জোট গড়িয়াছিলেন। আওয়ামী লীগের দিকে তাকাইলে এইরকম গণ্ডায় গণ্ডায় স্ববিরোধিতার প্রমাণ দেওয়া যাইবে। একটু পাশে ফিরিয়া দেখিলে নজরে পড়িবে, বিএনপির অঙ্গেও একইরূপ স্ববিরোধিতার বিষয়ে তিলমাত্র গরীবিয়ানা নাই। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র আধাযুগ পরে স্বাধীনতা ঘোষকের দলটি গড়িয়া উঠিয়াছিল রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা গালে গাল মিলাইয়া।

ইহার ফল রূপে দেখা যাইতেছে, তাহাদের কথিত জাতীয়তাবাদ জিনিসটা কখনো ধর্মের বিপরীতে আবার কখনো শ্রেণির লড়াইয়ের বিপরীতে দাঁড় করানো হইতেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দেশে জাতীয় মুক্তির লড়াই শ্রেণির লড়াইকে বাদ দিয়া হইবে কি করিয়া? অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদি এজেন্ডা হইতেছে, জাতীয় মুক্তির লড়াই বিষয়টাকে যেকোনভাবেই হউক পথ হারাইয়া সম্পূর্ণ ভণ্ডুল করিয়া দেওয়া। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মসনদ লইয়া পরস্পরের উদ্দেশ্যে জেহাদ ঘোষণা করিলেও মূলত সাম্রাজ্যবাদের সেই এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করিতেছে। সা¤প্রতিক তাহাদের তফাতের মধ্যে শুদ্ধ পীরসাহেব আলাদা আলাদা।

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষিত কেবল তাহাদের দুই পীরের সরল লড়াই রূপে হাজির হয় নাই। আরো কিছু কৌতূহল লইয়াও তাহার আগমণ। একদিকে দেশের সকল জনগণ যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে, অপরদিকে আওয়ামী লীগকে — কেবল তাহাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত একটি ক্ষুদ্র অংশ বাদে — কেহই আর একদণ্ড বিশ্বাস করিতে পারিতেছে না। দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক-জালিয়াতি, পদ্মাসেতু, শেয়ারবাজার লুট, গুম-ক্রসফায়ার, সাংবাদিক হত্যার তদন্তে গাফেলতি ইত্যাদি হাজার একটা কেচ্ছা লইয়া তাহারা জনগণকে এক চরম দমবন্ধ দশায় ঠেলিয়া দিয়াছে।

কিন্তু লীগের বিকল্প হিশাবে বিএনপিও যে তেমন জনসাড়া পাইতেছে এমন নহে। মানুষের কাছে নগ্ন হইয়া গিয়াছে মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। উপরন্তু দল সংগঠিত না হইবার কারণে বিএনপির জামায়াত নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। ফলে প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ না করিলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে তাহাদের মনোভাব আদৌ গোপন নহে। রাজাকারের ছোটবড় সকল প্রচারযন্ত্র ক্রমাগত ঘুরাইয়া পেঁচাইয়া একটা কথাই তো কহিতেছে, যাহারা যুদ্ধপরাধের বিচারের দাবিটি তুলিতেছে তাহারা নিছকই আওয়ামী লীগ এবং ইসলাম বিরোধি।

এদিকে লীগ সরকার তাহাদের অন্তিমদশায় ভারতকে খুশি করিতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতন সুন্দরবন ধ্বংশের কাজে হাত লাগাইয়াছে। মাত্র কিছুদিন আগে আমেরিকার মন পাইতে তাহারা সাক্ষর করিয়াছে টিকফাচুক্তি। এইসকল গণবিরোধি দুর্যোগ তাহারা ঘটাইতেছে যখন জামায়াত ফের পুরানা ধর্মের জিকির তুলিয়া যুদ্ধাপরাধ বিচার বানচালের জন্য দেশের ভিতর সকল রকম অপচেষ্টায় তৎপর।

রাজনীতি যখন জনগণের নাগাল হইতে ছুটিয়া গিয়া কেবল ষড়যন্ত্রকারি আর লোভী লোকের কারবার হইয়া ওঠে তখন যাহা যাহা ঘটে তাহার সকলকিছুই এখন বাংলাদেশে ঘটিতেছে।