Tag Archives: হো চি মিন

লর্ড বার্ট্রান্ড রাসেল সমীপে বার্তা–হো চি মিন

আপনি আমেরিকান যুদ্ধাপরাধীদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক গণআদালত গঠন করিয়াছেন, এই উপলক্ষ্যে আমি আপনাকে আমার গভীরতম অভিনন্দন জানাইতেছি। ভিয়েতনামের জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং শান্তির বিরুদ্ধে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীরা যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি করিতেছে। তাহারা যে পাশবিক অত্যাচার আর অপরাধ করিতেছে তাহা হিটলারীয় ফ্যাসিবাদি নির্মমতাকে হার মানাইয়াছে। আন্তর্জাতিক গণআদালত এহেন অপরাধের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে নিন্দা এবং দুনিয়াব্যাপী এই অপরাধ যুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়িয়া তুলিবে। সেই সাথে ভিয়েতনাম হইতে মার্কিন দালাল সৈন্যবাহিনী অপসারনের বজ্রনিনাদ তুলিবে।

বার্ট্রান্ড রাসেল

বার্ট্রান্ড রাসেল

ন্যায়বিচারের দাবিতে এবং জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের খাতিরে ইহার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক। মানব জাতির ও বিশ্ব শান্তির পহেলা শত্রু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে দুনিয়ার মানুষের বিবেক জাগাইতে এই গণআদালত অবদান রাখিবে। চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ভিয়েতনামের জনগণ আপনাদের এই মহৎ উদ্যোগে অন্তর হইতে শুভেচ্ছা জানাইতেছে। আমরা আপনাদের হৃদয় উজাড় করা সাধুবাদ জানাইতেছি। আশা করি আপনি এই হৃদয় নিংড়ানো অভিনন্দন গণআদালতের সর্বজনকে পৌঁছাইয়া দিবেন। আমি গণআদালতের সর্বাঙ্গ সাফল্য কামনা করি।

একান্ত আপনার,

হো চি মিন। নবেম্বর ১৯৬৬

উৎস: Against U.S Aggression For National Salvation. Ho Chi Minh. Foreign Languages publissing House. Hanai- 1967

তর্জমা: প্রিয়ম পাল

অনুবাদকের টীকা:

১৯৪০ সালে জার্মানি ফ্রান্সের বড় অংশ দখল করিয়া দালাল সরকার কায়েম করে। অচিরে জাপান ইন্দোচীন দখল করে। চিনে ঘাঁটি গাড়িয়া  হো চি মিন জাপানি ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ের জাতীয় ঐক্য ফৌজ গঠন করেন। ১৯৪৫ সালে মার্কিনিরা জাপানকে পরাস্ত ও নিরস্ত্র করে। তখন হো চি মিন রিপাবলিক ঘোষণা করেন। বিধি বাম! ফরাসি বাহিনী ফিরিল। তখন হো চি মিন ফরাসিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেন। জেনারেল গিয়াপ এই মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি। ১৯৫৪ সালে দিয়েনবিয়েন ফুতে ফরাসিদের লড়াইয়ে শোচনীয় হারে যুদ্ধের ফয়সালা হইয়া যায়। জেনেভায় বহুজাতিক এক সম্মেলনে শান্তিচুক্তি হয়। তাহাতে ভিয়েতনাম উত্তর ও দক্ষিণ দুই রাষ্ট্রে ভাগ হয়। হো হন উত্তরের রাষ্ট্রপতি। দক্ষিণের হবু রাষ্ট্রপতি দিয়েমকে আমেরিকা মুলুক থেকে নগদ আমদানি করা হইল।

জঁ পল সার্ত্র

জঁ পল সার্ত্র

১৯৫০-এর পূর্ব হইতেই দুনিয়ায় সমাজতন্ত্রের বাড়বাড়ন্ত ঠেকানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাহার পবিত্র কর্তব্য বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছিল। ভিয়েতনামে দেশভাগ হইলে পর মার্কিনরা দক্ষিণের দিয়েমশাহীর হাত শক্ত করিতে তোড়জোড় শুরু করিল। সিআইএ — মানে মার্কিনি গোয়েন্দা সংস্থার কতিপয় কর্মকর্তা ইহাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

অবশেষে ১৯৫৯-৬০ সাল নাগাদ দেশকে মুক্ত ও পুনরায় একত্র করিতে ভিয়েতনামের কমুনিস্ট পার্টি সিদ্ধান্ত নেয়। তখন দক্ষিণে জাতীয় মুক্তি ফৌজ গঠিত হয়। আমেরিকায় তখন কেনেডি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হইলেন। তিনি ভিয়েতনামে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করিলেন। এই বিশেষ বাহিনী দক্ষিণের দালাল সরকারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ সমেত নানা সহায়তা করিত। যাহা হউক ১৯৬৫ সালে আসিয়া মার্কিনিরা ভাবিল আর অপেক্ষা করা যাইতেছে না। এখনই দক্ষিণে সকল মুক্তিযুদ্ধ দমন করিতে হইবে। ১৯৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনী উত্তর ভিয়েতনামে বোমাহামলা ও দক্ষিণে মুক্তিযুদ্ধ দমনে ব্রতী হয়। এই পরিস্থিতিতে হো ১৯৬৬ সালে বক্তৃতাটি দিয়াছিলেন।

মার্কিনিদের সহিত অল্পাধিক অস্ট্রেলীয়, নিউজিল্যান্ডীয় ও দক্ষিণ কোরীয় সৈনিকও দক্ষিণ ভিয়েতনামে ছাউনি ফেলিয়াছিল।

ইংরেজ দার্শনিক লর্ড বার্টান্ড রাসেল ১৯৬৬ সালের নবেম্বর মাসে ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধাপরাধের বিচার করিতে একটি গণআদালত গঠন করিয়াছিলেন। ডিসেম্বর মাসে হো তাঁহাকে অভিনন্দন করিয়া বার্তাটি পাঠান।

ফরাসি দার্শনিক জঁ পল সার্ত্র এই উদ্যোগে রাসেলের সতীর্থ হইয়াছিলেন, আরও অনেক মনীষীই হইয়াছিলেন।

রাসেলগঠিত এই গণআদালত ১৯৬৭ সালে সুইডেন ও ডেনমার্কে অধিবেশন করে। তাহাতে অপরাধে মার্কিন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে অভিযুক্ত হয়।

১৯৯২ সালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঘাতক দালালদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির বিচার করিবার লক্ষ্যে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণে এবং জাহানারা ইমাম, কর্নেল নুরুজ্জামান, শাহরিয়ার কবির প্রমুখের অগ্রণী ভূমিকার দ্বারা যে গণআদালত গঠা হয় তাহা — কবিরের সাক্ষ্য অনুসারে — রাসেলগঠিত গণআদালতের আদল দ্বারা অনুপ্রাণিত।

সমগ্র দেশের মুক্তিযোদ্ধা ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান–হো চি মিন

জনগণ না চাইলেও হররোজ সহিংসতা চলছেই সূত্র: ইন্টারনেট

জনগণ না চাইলেও হররোজ সহিংসতা চলছেই
সূত্র: ইন্টারনেট

হে দেশের মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ,

আমাদের দেশ দখল করিবার মানসে বর্বর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা আগ্রাসী যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু তাহারা ক্রমাগত নাস্তানাবুদ হইতেছে।

তাহারা তড়িঘড়ি করিয়া আমাদের দেশের দক্ষিণে মোতাবেক ৩ লক্ষের মতন হানাদার সৈন্যের সমাবেশ করিয়াছে। আক্রমণাত্মক কৌশলের অংশ হিসাবে পুতুল প্রশাসন ও ভাড়াটিয়া সেনাবাহিনী খাড়া করিয়াছে। যুদ্ধে তাহারা যারপরনাই আদিম কায়দার আশ্রয় লইতেছে — যাহার মধ্যে রহিয়াছে ভয়াবহ বিষাক্ত রাসায়নিক, নাপাম বোমা সহ অন্যান্য অস্ত্রাদির নির্বিচার ব্যবহার। তাহাদের নীতি দাঁড়াইয়াছে ‘সব পোড়াইয়া দে, সবাইকে খুন কর এবং সকলই ধ্বংস কর’ নীতি। এহেন অপরাধ করিয়া তাহারা আমাদের দক্ষিণের বাসিন্দাদের শায়েস্তা করিবে বলিয়া পণ করিয়াছে।

কিন্তু জাতীয় মুক্তি জোটের দৃঢ় এবং বিজ্ঞ নেতৃত্বে দক্ষিণ ভিয়েতনামের যোদ্ধা ও জনগণ একযোগে বীরোচিত লড়াই করিতেছে এবং দক্ষিণকে সম্পূর্ণ মুক্ত করিতে, উত্তরকে রক্ষা করিতে আর দেশকে এক করিতে সংগ্রামে উদ্যত হইয়াছে।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা পাগল হইয়া দক্ষিণে তাহাদের ক্ষতি পোষাইয়া নিতে উত্তর ভিয়েতনামে বিমান আক্রমণ শুরু করিয়াছে যেন আমরা তাহাদের শর্ত মত মিটমাট করিতে মরিয়া হইয়া উঠি। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনাম ইহাতে ভীত নয়। আমাদের জনগণ ও যোদ্ধারা মনেপ্রাণে যুদ্ধ করিতে আর উৎপাদন বাড়াইতে চেষ্টা করিতেছে। এখন পর্যন্ত আমরা শত্রুর ১,২০০-র অধিক যুদ্ধবিমান ধ্বংস করিতে সমর্থ হইয়াছি। আমরা শক্রর ধ্বংস-যুদ্ধ রুখিয়া দিতে, আর সেই সাথে দক্ষিণে আমাদের আপন জাতির মানুষদের সর্ববিধ সহায়তা করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

অবস্থাদৃষ্টে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা ভীত হইয়া হাইফং ও হ্যানোয়ের আশেপাশে বিমান আক্রমণের দ্বারা যুদ্ধের মাত্রা বৃদ্ধি করিতেছে। তাহাদের এই বেগতিক মাথাখারাপ কর্মকাণ্ডের সহিত তুলনা দেওয়া চলে আহত পশুর অন্তিম ছটফটানির সহতি।

হো চি মিন (১৮৯০-১৯৬৯)

হো চি মিন (১৮৯০-১৯৬৯)

জনসন ও তাহার গোষ্ঠির বুঝা উচিত: তাহারা হয়তো ৫ লক্ষ, ১০ লক্ষ কিংবা তাহারও অধিক সৈন্য দক্ষিণ ভিয়েতনামে আনিয়া আগ্রাসী যুদ্ধকে আরও প্রবল করিতে সক্ষম। তাহারা হয়তো সহস্রাধিক বোমারু বিমান দ্বারা উত্তর ভিয়েতনামে আঘাত হানিতে সমর্থ। কিন্তু জাতীয় মুক্তি অর্জনে জনগণের যুদ্ধ করিবার যে ইস্পাত কঠিন মনোবল রহিয়াছে ইহা তাহারা কখনও ভাঙ্গিতে পারিবে না। যতই তাহারা অত্যাচার করিবে ততই তাহারা পাপের বোঝা বৃদ্ধি করিবে। এই যুদ্ধ পাঁচ, দশ, বিশ কিংবা আরও বহু বৎসর চলিতে পারে। হ্যানয়, হাইফং এবং আরও বহু শহর ও স্থাপনা হয়ত ধ্বংস হইয়া যাইবে কিন্তু ভিয়েতনামী জনগণের দম বিন্দুমাত্র কমিবে না। স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের চাইতে মূল্যবান আর কিছুই থাকিতে পারে না। এক বার জয়ী হইলে আমাদের জনগণ দেশকে পুনরায় গড়িয়া তুলিবে এবং আরও বৃহৎ মনোহর স্থাপনায় সাজাইয়া তুলিবে।

সকলেই জানেন যখনই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা এই অপরাধ যুদ্ধ বাড়াইবার মতলব ভাঁজিতে থাকে তখনই তাহারা বিশ্ব জনমতকে ধোঁকা দিবার মানসে ‘শান্তি আলোচনা’ নামক কলা ঝুলায়, আর তাহার ‘শান্তি আলোচনায়’ বসিতে অনিচ্ছুক হইলে ভিয়েতনামের মুণ্ডপাত করিয়া থাকে।

রাষ্ট্রপতি জনসন সাহেব, আপনি মার্কিন জনগণ আর বিশ্বের সকল লোকের নিকট প্রকাশ্যে উত্তর দিন: সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, উন্নতি এবং ভিয়েতনামের আঞ্চলিক একত্রিকরণ যাহা জেনেভা চুক্তিতে আছে তাহা কে বরখেলাপ করিল? ভিয়েতনামী সৈন্য কি আমেরিকায় আগ্রাসন চালাইয়াছে কিংবা পাইকারী হারে আমেরিকানদের নিধন করিয়াছে? আমেরিকান সরকারই কি ভিয়েতনামে আগ্রাসন চালাইতে জঙ্গী বাহিনী পাঠায় নাই এবং তাহারা কি ভিয়েতনামীদের নির্মূল করিতেছে না?

যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই আগ্রাসী যুদ্ধ বন্ধ করে, আমেরিকান এবং ভাড়াটিয়া সৈন্যদের এখান হইতে প্রত্যাহার করিয়া লয় তবে তৎক্ষণাৎ শান্তি সংস্থাপিত হইবে। ভিয়েতনামের দাবী পরিষ্কার, গণপ্রজাতান্ত্রিক ভিয়েতনাম সরকারের ৪টি দাবী আর দক্ষিণ ভিয়েতনাম জাতীয় মুক্তি ফৌজের ৫টি দাবী। ইহার অন্যথা নাই।

ভিয়েতনামী জগনণ শান্তির কদর করিতে জানে। জনগণ চাহে সত্যকারের শান্তি, স্বাধীনতা আর স্বাধিকারের শান্তি, ছদ্ম শান্তিও নহে, ‘আমেরিকান শান্তি’ও নহে ।

পিতৃভূমি রক্ষা করিতে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতির প্রতি আমাদের দায়শোধ করিতে আমাদের দেশের জনগণ এবং সেনাবাহিনী যেনবা এক আত্মায় যুক্ত রহিয়াছে। নির্ভীক তাহাদের আত্মত্যাগ, সকল বাধা ডিঙ্গাইবার সাহস তাহাদের অবিচল; চূড়ান্ত বিজয় না করিয়া লড়াই তাহারা ছাড়িবে না। অতীতে আমরা আরও কঠিন অবস্থায় জাপানী ফ্যাসিবাদী এবং ফরাসী উপনিবাসীদের পরাজিত করিয়াছিলাম। এক্ষণে দেশে এবং বিদেশে সুবাতাস বহিতেছে। মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্যে জনগণের লড়াই নিশ্চিতরূপে শতভাগ সাফল্য লাভ করিবে।

প্রিয় স্বদেশবাসী ও যোদ্ধাগণ,

আমরা ন্যায়ের পক্ষে — ইহ্ াআমাদের শক্তি; উত্তর হইতে দক্ষিণ পর্যন্ত জনগণ মৈত্রীডোরে আবদ্ধ, অকুতভয় লড়াই করিবার ঐতিহ্য আমাদের রহিয়াছে এবং সারা দুনিয়ার প্রগতিপন্থি জনগণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সমাজতান্ত্রিক দেশের সাহায্য ও সহানুভূতি আমাদের দিকে রহিয়াছে। জয় আমাদের হইবেই।

নতুন এই পরিস্থিতিতে সকল আত্মত্যাগ আর বাধা পার করিয়া এই গৌরবময় ঐতিহাসিক কার্যসিদ্ধি করিতে আমরা একতাবদ্ধ: মার্কিন আগ্রাসীদের পরাজিত করিবই।

মার্কিন জনগণশুদ্ধ সমাজতান্ত্রিক দেশের এবং জগতের সকল কল্যাণকামী জনগণকে তাহাদের হৃদয় উজাড় করা সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য এই সুযোগে ভিয়েতনামী জনগণের পক্ষ হইতে আমি আমার অন্তরের অন্তস্থল হইতে শুকরিয়া জানাইতেছি। আমি দৃঢ়তার সহিত বিশ্বাস করি যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা যতই নতুন নতুন অপরাধের ধরন যুক্ত করিবে ততই ভ্রাতৃপ্রতিম সমাজতান্ত্রিক দেশ ও গোটা বিশ্বের শান্তিকামী ও বিবেকী জনগণের সাহায্য ও সহযোগিতা ভিয়েতনামীদের প্রতি আরও প্রগাঢ় হইবে যতক্ষণ পর্যন্ত না জাতীয় মুক্তি অর্জনে মার্কিন আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পূর্ণ জয় আসে।

ভিয়েতনামী জনগণের জয় হইবেই!

মার্কিন আগ্রাসীদের পরাজয় নিশ্চিত!

সুখী, সমৃদ্ধ, দৃঢ়, স্বাধীন, গণতান্ত্রিক এবং য্ক্তু ভিয়েতনাম জিন্দাবাদ! সমগ্র দেশের দেশপ্রেমিক এবং যোদ্ধাগণ জোর কদমে আগাইয়া চল!

আমি যে পথে লেনিনবাদী হইলাম–হো চি মিন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমি পারি নগরে থাকিতে শুরু করিলাম। কখনও আমি চিত্রগ্রাহকের সহযোগীর কাজ করিতাম, কখনও ‘চীনা পুরাতত্ত্ব’ আঁকিতাম (যদিও ইহা ফরাসি দেশে তৈয়ার হইত)। ফরাসি উপনিবাসবাদীরা ভিয়েতনামে কি পরিমাণ অপরাধ করিয়াছে তাহা আমি প্রচার পত্রাকারে বিলি করিতাম।

 

সেই সময়ে আমি সহজাতভাবেই অক্টোবর বিপ্লবকে সমর্থন করিয়াছিলাম। যদিও ইহার সকল ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়াছিলাম তাহা নহে। তখনও পর্যন্ত আমি লেনিনের কোন পুস্তক পাঠ করি নাই। তথাপি আমি লেনিনকে ভালবাসিয়াছিলাম, লেনিনের ভক্ত বনিয়াছিলাম। কারণ আমার বোধ হইত লেনিন এমন এক মহান দেশপ্রেমিক যিনি আপন স্বদেশবাসীকে মুক্ত করিয়াছেন।

 

ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে আমার যোগদানের রহস্য ছিল তাহার সভ্য কমরেডরা (যাঁহাদের আমি সেই সময়ে ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোক বলিয়া ডাকিতাম) আমার প্রতি আর তাবৎ নিপীড়িত জাতির সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। সেই কালে আমি কিন্তু দল, শ্রমিক সংঘ কিংবা সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ ইত্যাদি বিষয়ের কিছুই বুঝিতাম না।

 

সেইকালে সমাজতান্ত্রিক দলে বিভিন্ন শাখায় তুমুল তর্ক চলিত। তর্কের বিষয়: দল কি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেই থাকিবে, আড়াই আন্তর্জাতিক গঠন করা কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে নাকি লেনিনের তৃতীয় আন্তর্জাতিকেই য্ক্তু হওয়া কর্তব্য? সপ্তাহে দুই কি তিন দিন সভা হইত। সভায় আমি নিয়মিত উপস্থিত থাকিতাম এবং মন দিয়া সকল আলোচনা শুনিতাম। প্রথম প্রথম আমি পুরাপুরি বিষয়গুলি বুঝিয়া উঠিতে পারিতাম না। কি লইয়া এই তর্কগুলি এত গরম হইয়া উঠে? দ্বিতীয়, আড়াই কিংবা তৃতীয় আন্তর্জাতিক যাহাই হউক বিপ্লব হইলেই তো হইল? ইহা লইয়া এত তর্ক করিবার কি আছে? প্রথম আন্তর্জাতিকেরই বা কি গতি হইল?

 

যাহা জানিতে আমি একান্তই মুখিয়া থাকিতাম এবং যাহা এই সকল আলোচনায়  আসিত না বলিলেই চলে তাহা হইল কোন আন্তর্জাতিক উপনিবাসিক দেশের জনগণের পক্ষে?

 

এক মিটিংয়ে আমার মতে এই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তুলিলাম। কিছু কমরেড আমায় বলিল: দ্বিতীয় নহে, তৃতীয় আন্তর্জাতিকই উপনিবাসী জনগণের পক্ষে । তখন এক কমরেড আমায় ল্য’য়ুমানিটি পত্রিকায় প্রকাশিত লেনিনের ‘জাতীয় এবং উপনিবাস প্রসঙ্গে তত্ত্ব’ লেখাটি পড়িতে দিলেন।

 

লেনিনের এই লেখায় কিছু রাজনৈতিক শব্দ ছিল যাহা আমি ঠিক বুঝিতে পারি নাই। তবুও ইহা আমি বারবার পড়িতে লাগিলাম এবং শেষে ইহার সারাংশ ধরিতে পারিলাম। তখন কি আবেগ, কি উদ্দীপনা, কি স্বচ্ছদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস আমায় ভর করিল! আনন্দে আমার চোখ জলে ভাসিয়া গেল। কামরায় আমি একাকী বসিয়া ছিলাম, তথাপি আমি চিৎকার দিয়া যেন জনতার উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিলাম  ‘হে স্বদেশবাসী, হে শহীদেরা! ইহাই তো আমাদের দরকার! ইহাই আমাদের মুক্তির পথ বাতলাইয়া দিবে।’

 

তাহার পর হইতে লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আসিয়া গেল।

 

পূর্বে দলের শাখার মিটিংয়ে আমি আলোচনা শুধু শুনিয়াই যাইতাম; আমার আবছা আবছা মনে হইত সকলের কথাই বুঝি ঠিক; কাহারা আসলে ঠিক আর কাহারাই বা ঝুট তাহা ঠিক ধরিতে পারিতাম না। তখন অবশ্য ভাব প্রকাশের পর্যাপ্ত ফরাসি শব্দ আমার ভাণ্ডারে ছিল না, তথাপি লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর যে কোন অভিযোগ আমি দৃঢ়তার সহিত তছনছ করিয়া দিতাম। আমার একমাত্র যুক্তি ছিল: যদি তোমরা উপনিবাস ব্যবস্থার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করিতে না পার, যদি তোমরা উপনিবাসের জনগণের পক্ষ না লইতে পার তবে তোমরা এ  কেমনতর বিপ্লবে প্রবৃত্ত হইয়াছ?

 

আমি কেবলমাত্র আমার দলের শাখা সমূহে আলোচনায় অংশ লইয়া ক্ষান্ত থাকিতাম না, ‘আমার মত’ প্রতিষ্ঠায় অন্যান্য শাখা সমূহেও হাজির হইতাম। বলিতেই হইবে যে কমরেড মার্সেল কাশিন, ভাইলা কুতুরিয়ে, মুমুসে ও  আরও অনেকে আমায় জ্ঞান বিকাশে সাহায্য করিয়াছেন। পরিশেষে তুর কংগ্রেসে এই কমরেডদের সহিত তৃতীয় আন্তর্জাতিকে যোগদানের পক্ষে ভোট দিয়াছিলাম।

 

সাম্যবাদ নহে, দেশপ্রেমই আমায় সর্বপ্রথম লেনিনের উপর, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর ভরসা যোগাইয়াছিল। ক্রমে ক্রমে লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সহিত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ পাঠ করিতে করিতে আমি অচিরেই বুঝিতে পারিলাম, কেবলমাত্র সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই পারে সকল নিপীড়িত জাতি ও শ্রমজীবী জনগণকে দুনিয়ার সকল ধরনের দাসত্ব হইতে মুক্ত করিতে।

 

চীনসুদ্ধ আমাদের দেশে ‘জ্ঞানীর বহি’ নামা এক আশ্চর্য পুস্তকের কথা প্রবাদে আছে। কেহ যখন বড় বিপদের সম্মুখীন হয়, এই পুস্তক খুলিয়া দেখে এবং যে পাতা খুলিল তাহাতেই মুস্কিল আসানের উপায় পাইয়া যায়। ভিয়েতনামের সকল বিপ্লবী এবং জনগণের জন্য লেনিনবাদ কেবলমাত্র ‘জ্ঞানীর বহি’ ও দিকনির্দেশকই নহে, বলিতে হয় ইহা তেজোদীপ্ত সূর্যের সেই বিকীরণ যাহা আমাদের সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে লইয়া যাইবে।

 

 

অনুবাদকের টীকা:

 

তুর কংগ্রেস:

 

১৮৪৮ সালে ইউরোপে বিপ্লবের পর ১৮৬৪ সালে লন্ডনে গঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক । মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩), প্রুধোঁ (১৮০৯-১৮৬৫), বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬), এবং ফরাসি বিপ্লবী অগুস্ত ব্লাংকি (১৮০৫-১৮৮১) প্রমুখ ইহার নেতা ছিলেন। ১৮৭২ সালে আসিয়া ইহা দ্বিধাবিভক্ত হয়।

 

এদিকে ফরাসিদেশে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র হয় এবং পারি কমিউনকে দমন করা হয়। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দমনপীড়নের মুখে শতধাবিভক্ত ও দুর্বল হইয়া পড়ে। মার্কসবাদীদের মধ্যে জুলস গুয়েসদে, পল লাফার্গ প্রমুখ সংসদে নির্বাচিত হন, আন্দোলন চালাইয়া যান, জেলজুলুমেরও শিকার হন।

 

অবশেষে ১৯০৫ সালে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ধারা মিলিয়া ‘শ্রমিক আন্তর্জাতিকের ফরাসি শাখা’ নামে সমাজতন্ত্রী পার্টি হয়। জঁ জউরে (১৮৫৯-১৯১৪) ইহার নেতা ছিলেন। এই দল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে (১৮৮৯-) শরিক ছিল। ১৯০৬ ও ১৯১৪ সালের ফরাসি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের অনেক প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।

 

১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হইলে জার্মানি ফ্রান্স দখলে উদ্যত হয়। তখন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে দ্বিধা দেখা দেয়। একদল যুদ্ধে প্রজাতন্ত্রীদের সাথে একত্র হওয়ার পক্ষপাতী হয়, আরেক অংশ বিরোধিতা করে। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষলগ্নে ১৯১৭ সালে রুশদেশে লেনিন বিপ্লব করেন। তখন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে দ্বিধা আরো প্রকট হয়। ১৯১৯ সালে লেনিন ও অন্যান্যরা তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠন করেন।

 

১৯২০ সালের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ফরাসি পার্টির তুর কংগ্রেস সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় দ্বিতীয় বনাম তৃতীয় আন্তর্জাতিক (আড়াই আন্তর্জাতিক বাদ দিলে) এবং কমিউনিস্ট বনাম সমাজতন্ত্রী ভাগ হয়ে যায়। আলাদাভাবে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। হো চি মিন ইহার সদস্য ছিলেন।

 

ল্য’য়ুমানিটি শতাব্দীপ্রাচীন ফরাসি পত্রিকা। পুরাতন সমাজতন্ত্রী জঁ জউরে ১৯০৪ সালে এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। লেনিনের আমলে তুর কংগ্রেসে সমাজতন্ত্রী বনাম কমিউনিস্ট ভাগ হইলে এই পত্রিকা কমিউনিস্টদের ভাগে পড়ে।

 

কমরেড মার্সেল কাশিন, ভাইলা কুতুরিয়ে, মুমুসে — ইহারা ফরাসি সমাজতন্ত্রী দলের তৎকালীন সদস্য। অধিকাংশই কালে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষ লইয়াছিলেন।

 

জঁ লংগুয়ে সমাজতান্ত্রিক দলের আদিধারার গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি কার্লমাক্সের মেয়ে জেনির পুত্র।

 

উৎস: Ho Chi Minh on Revolution, Selected Writings, 1920-66, edited by Bernard B. Fall, printed from The Signet