Tag Archives: সায়েম খান

শাহবাগের আত্মকথন – সায়েম খান

আমার নাম শাহবাগ। আমি ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার একটি স্থান। ৫ ফেব্র“য়ারি ২০১৩ সালে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়ার পর দেশের জনসাধারণ তা মেনে নেয় নি। সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনীতি বন্ধের দাবি একসাথে একাকার হয়ে আমার বুকে নামায় জনতার ঢল।

আমি আপ্লুত হয়ে দেখি এখানে সমবেত হওয়া জনসাধারণের স্বতস্ফূর্ততা। পুলকিত হই তাদের চলন, বলন ও ভঙ্গিমায়। উত্তরাধুনিক সময়ে কাট কপি পেস্টের যুগে আমি লক্ষ্য করলাম এখানের মানুষের মৌলিকত্ব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের সুনিপুণ হাতে ফুঁটে উঠেছে পাকিস্তানি জানোয়ারদের অভিনব প্রতিচিত্র।

প্রথম কয়েকদিন আন্দোলনের নির্দিষ্ট কোন নেতৃত্ব ছিল না, ছিল না নির্দিষ্ট কোন কেন্দ্র। এখানে আসা প্রত্যেকেই চেতনাগত জায়গা থেকে এক একজন নেতা। তারপরও আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি মঞ্চ ও নেতৃত্ব। তাই আমার বুকে বসানো হয় একটি মঞ্চ, যা সৃষ্টি করে একগুচ্ছ নেতৃত্ব।

এতে কেউ কেউ প্রশ্ন করে ‘মঞ্চটা শাহবাগ কেন? এখানে করায় তো পুরো শহরে যানজট ও জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।’ অনেকে এর উত্তর দেয় যে সন্তান জন্মদানে প্রসব বেদনা থাকবেই। কিন্তু আমি বলি ১৯৯২ সালে আমার বুকের উপর ফেলে মানবতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবির অগ্রপথিক শহীদ জননী জাহানারা ইমামের উপর রাষ্ট্রীয় মদদে নির্যাতন চালানো হয়, তাই মঞ্চটা এখানে থাকাই সবচেয়ে ভাল। আর এর নাম দেওয়া হয় গণজাগরণ মঞ্চ। গণজাগরণ আমাকে উত্তাল জনস্রোতে পরিণত করে। আর আমি তাকে দেই বাকস্বাধীনতা ও নিরাপত্তা।

কয়েকটি সমাবেশের মাধ্যমে জনস্রোত রূপান্তরিত হল জনসমুদ্রে। আমার নাম দেওয়া হয় ‘প্রজন্ম চত্বর’। কয়েকদিনের মধ্যে আমার শাহবাগ নামটি ছাড়িয়ে পরিচিতি লাভ করে প্রজন্ম চত্বর নামটি। এর মধ্য দিয়ে আমার নতুনভাবে জন্ম হয়। দিনের পর দিন আমাতে দাঁড়িয়ে সবাই জপতে থাকে মুক্তির শ্লোগান। কিন্তু তার নির্দিষ্ট কোন সীমা থাকল না। এর মধ্যে অনেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরল ঘরে। আমার কাছে মনে হল নেতৃত্বগুলো একে ভালভাবে পরিচালনা করলেও তার সুচারু রূপ দিতে পারল না। তারা আমাকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চাইল। কিন্তু তাদের সাথে করে নিতে পারল না এখানকার চেতনা — যা আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে পারত। চেতনা এখানে একাকী আর্তনাদ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমার নতুন পরিচয়ে সঠিকভাবে পরিচিতি লাভ করাটা আর হয়ে উঠল না।

আমার বুকের পর সেই জনস্রোত আর নেই। স্রোত ও নাব্যতা হারিয়ে এখন তা শুকিয়ে মরুপ্রায়। তারপরও আমার শান্তি আমি বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হলাম। হয়তো পুরোপুরি সফল নই কিন্তু বাঙালি জাতিকে নতুনভাবে পথ দেখাতে শুরু করলাম।

আমি, শাহবাগ, পড়ে আছি এখানে নতুন কোন দাবি বা নতুন কোন শ্লোগানে তোমাদের ধারণ করতে। এখানেই শেষ নয়, এখান থেকেই শুরু। হে মুক্তিকামী জনগণ, অপেক্ষায় রইলাম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন বাংলাদেশ গড়তে তোমরা মহাসুখের প্লাবনে আমাকে ভাসিয়ে নেবে।