Tag Archives: সলিমুল্লাহ খান

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা–সলিমুল্লাহ খান

‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কি বুঝায় তাহা লইয়া সম্প্রতি একটি সূক্ষ্ম বিতর্কের সূচনা হইয়াছে। কিন্তু কয়েকটি মোটা কথা লইয়া আশা করি কেহ বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হইবেন না। ইহাদের মধ্যে প্রধান কথা খোদ ‘স্বাধীনতা’ অথবা যে কোন জাতির বা জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইনানুগ অধিকার।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাত শেষে অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশ কার্যত স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ইহার দুই সপ্তাহ পরে গঠিত হয় অস্থায়ী সরকার। ইহাতেই প্রমাণ বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য অন্তত সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল না। মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত এই সরকার ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রকে প্রামাণ্য দলিল বলিয়া গণ্য করিলে কয়েকটি বিষয়ে বিতর্কের সমাপ্তি হয়। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্র জারি হইয়াছিল ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সালের ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ গণপরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত ক্ষমতাবলে। এই প্রতিনিধিগণ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হইয়াছিলেন।


১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশ কি কারণে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তাহার একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। সেই ব্যাখ্যা অনুসারে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বতস্ফূর্তভাবে কিম্বা আগ বাড়াইয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেন নাই। স্বাধীনতা ঘোষণা করিতে তাহাদিগকে বাধ্য করা হইয়াছিল। কারণ ‘পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে।’
খোদ ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রেই উল্লেখ করা হইয়াছিল ‘বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখ-তা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান’। দুঃখের মধ্যে, স্বাধীনতার ঘোষণা লইয়া কেহ কেহ পরকালে একপ্রস্ত বিতর্কের সূচনা করিয়াছিলেন। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রের প্রামাণ্যতা কি কেহ আজ পর্যন্ত অস্বীকার করিয়াছেন? না করিলে জিজ্ঞাসা করিতে হয় এই ঘোষণাপত্রের কোন বক্তব্যটিকে তাহারা অস্বীকার করিতেছেন?
প্রশ্ন উঠিবে ২৬শে মার্চ তারিখে কেন স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করা হইয়াছিল। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে তাহার একটা উত্তরও পাওয়া যাইতেছে। ঘোষণাপত্র অনুসারে এই উত্তরটি পাঁচ দফায় পাওয়া যায়।
এক নম্বরে, [পাকিস্তানের] একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানায়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
দুই নম্বর কথা, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জনকে নির্বাচিত করেন।
তিন নম্বর কথা, সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে [পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি] জেনারেল ইয়াহিয়া খান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণকে ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে মিলিত হইবার জন্য আহবান করেন।
চার নম্বরে, [পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ] এই আহুত পরিষদ-সভা স্বেচ্ছাচারী ও বে-আইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন।
আর পরিশেষে, পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষার পরিবর্তে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের সহিত আলোচনা অব্যাহত থাকা অবস্থায় একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
এই পর্যন্ত যাহা বলা হইল–অর্থাৎ পাকিস্তান কর্তৃক অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধ চাপাইয়া দেওয়া–তাহাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রকৃত আর পর্যাপ্ত কারণ। ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছিল আরো একটি বাড়তি কারণ। পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ শুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা করিয়াই বসিয়া থাকে নাই। ২৫শে মার্চ মধ্যরাত্রি হইতে তাহারা ‘বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের উপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসংখ্য অপরাধ সংঘটন’ করে।
পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়াছিল আর গণহত্যার মতন অপরাধ ও অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপ করিয়াছিল বলিয়াই বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়াছিল আর বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করিয়াছিলেন। এই ঘোষণাপত্রের মধ্যস্থতায় তাঁহারা একটি ন্যায়যুদ্ধের আইনানুগ ভিত্তি রচনা করিয়াছিলেন। পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে তাই বলিতে হইবে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের চাপাইয়া দেওয়া অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও দমনপীড়নের জওয়াবে বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশের ভূখ-ের উপর আপনার কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে। এই যুদ্ধে জনগণের মূলধন ছিল তাহাদের ‘বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনা’।


এই পর্যন্ত যাহা বলা হইল–অর্থাৎ অন্যায় যুদ্ধের মুখে ন্যায়যুদ্ধ–তাহা সত্যের অর্ধেক মাত্র। প্রশ্ন উঠিবে ন্যায়যুদ্ধের মধ্যস্থতায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পাইবে তাহার লক্ষ্য কি হইবে। ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে তাহারও একটি জওয়াব পাওয়া যায়। এই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করিয়াছিল সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সামান্য কারণ, ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত’ করা।
বাংলাদেশের ভূখ-ে কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের জনগণ সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের শর্তহীন আত্মসমর্পণের ঘটনায় সেই কর্তৃত্বই নিরঙ্কুশ হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিজয় লাভ করে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ হইতে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর জনগণ যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হইয়াছিলÑযাহার প্রকাশ ১০ই এপ্রিলের ঘোষণাপত্রে পাওয়া যায়Ñতাহাই তো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’।
জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার অর্থাৎ স্বাধীনতা পাওয়ার ৪২/৪৩ বৎসরে আমাদেরও খতিয়ান খুলিয়া দেখিতে হইবে আমরা কি পাইলাম। স্বাধীনতা লাভের চারি বৎসরও পার হইতে না হইতে দেশে কেন সামরিক শাসন নামিয়া আসিয়াছিল? এই জিজ্ঞাসা আমাদের করিতেই হইবে। সেই চারি বৎসরে যাহারা ছিলেন জাতির মনোনীত গণপরিষদ বা নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্য তাহারা কেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ‘বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী উদ্দীপনা’র মধ্যস্থতায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে পারিলেন না? ইহাও জিজ্ঞাসার বিষয়।
ইহার পর হরেদরে পনের বৎসর কাটিয়াছে এক ধরনের না আর ধরনের সামরিক শাসনে। ১৯৯০ সনের পর হইতে–মধ্যখানের দুই বছরের কথা ছাড়িয়া বলিতেছি–আবার নিয়মতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হইয়াছে। কিন্তু মানুষের দুঃখ-কষ্টের কি নিবারণ হইয়াছে? ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচার’ কি প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে? যদি না পাইয়া থাকে, তবে তাহার জন্য দায়ী কে? চুপ করিয়া থাকা নহে, এই সকল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
পাকিস্তান ‘স্বাধীন’ হইয়াছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট তারিখে। ইহার দশ বৎসরের মাথায়Ñ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর নাগাদÑসেই দেশে পহিলা সামরিক শাসন প্রবর্তিত হয়। ১৯৬৪ সালের শেষদিকে এই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়া অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখিয়াছিলেন, ‘স্বাধীনতার ফলে আমরা কি পেলাম? আমরা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য মিত্র শক্তির নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি যে, তাঁদের আর্থিক ও অন্য সাহায্যে আমরা কিছুটা অগ্রসর হয়েছি। আমরা যে পূর্ণ সাফল্য লাভ করতে পারিনি, তার একটি বড় কারণ ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবরের সামরিক শাসন প্রবর্ত্তনের পূর্বে যাঁরা শাসনকার্যে নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা ছিলেন ইংরেজের গোলাম। স্বাধীনতার পরেও তাঁরা সেই গোলামীর মনোবৃত্তি ষোল আনা ছাড়তে পারেননি।’ ইহার সহিত মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরো একটি বাক্য যোগ করেন: ‘তারপর যাঁরা ছিলেন জাতির মনোনীত রাষ্ট্রীয় কিংবা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, তাঁদের সম্মানিত কয়েকজনকে বাদ দিয়ে বলতে হয় অধিকাংশের মূলমন্ত্র ছিল Nepotism এবং Pocketism। বাংলায় বলতে গেলে “আত্মীয় প্রতিপালন এবং পকেট পরিপূরণ”।’
এইসব দুর্নীতির কারণেই পাকিস্তানে সামরিক শাসনের প্রয়োজন হয় বলিয়া শহীদুল্লাহ সাহেব অনুমান করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনিও জানিতেন মাত্র শাসনকর্তার পরিবর্তনে দেশের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। পাকিস্তানের সামরিক শাসন সে দেশের জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করে নাই। শহীদুল্লাহ সাহেবের মতে, ইহার প্রধান কারণ জনসাধারণের অজ্ঞতা। তাঁহার কথামৃত সামান্য আরেকটু উদ্ধার করিলে মন্দ হইবে না: ‘অন্ধের পক্ষে দিন-রাত দুইই সমান। মূর্খের পক্ষে আযাদী ও গোলামী দুই সমান। যেখানে প্রকৃত প্রস্তাবে শতকরা ৪/৫ জন শিক্ষিত সেখানে আমরা কি আশা করতে পারি? মূর্খ ও নাবালক দুইই সমান। নাবালককে ফাঁকি দিয়ে তার আত্মীয়-স্বজনেরা নিজেদের জেব ভর্তি করে। এদেশে তাই ঘটেছে।’
বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে আজ ৪৩ বছর হইল। বাংলাদেশেরও অনেক গতি হইয়াছে। কিন্তু সমাজের ভিত্তি যে জনগণÑবাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী যে জনগণÑতাহাদের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হইয়াছে? আমাদের দেশে এই ৪৩ বছরেও–অন্য কথা না হয় বলিলাম না, বলেন দেখি–প্রকৃত প্রস্তাবে শতকরা কতজন শিক্ষিত হইয়াছেন?


আমরা নিত্য বলিয়া থাকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লক্ষ মানুষ শহিদ হইয়াছেন। কিন্তু আমরা তাঁহাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এই ৪৩ বছরের মধ্যে তৈয়ার করিতে পারি নাই। তাহা হইলে কি করিয়া আমরা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ নিশ্চিত করিব? ইংরেজি ২০০০ সনের ১২ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মহান লেখক আহমদ ছফা এই প্রশ্নটি তুলিয়াছিলেন। আমি আজও প্রশ্নটির কোন সদুত্তর পাই নাই। তাই প্রশ্নটির একটু সবিস্তার বয়ান করিতে হইতেছে।
আহমদ ছফার জন্ম চট্টগ্রাম (দক্ষিণ) জেলার অন্তপাতী পটিয়া উপজেলায়। তাঁহার গ্রামের নাম গাছবাড়িয়া। এখন তাহা সম্প্রতি গঠিত চন্দনাইশ উপজেলায় পড়িয়াছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ ছাড়িয়া আগরতলা হইয়া কলিকাতায় আশ্রয় লইয়াছিলেন। যুদ্ধশেষে তিনি প্রথমে ঢাকায় আসেন, পরে নিজ গ্রামে গেলেন। ইহার পরের কথা তাঁহার লেখায় পাওয়া যাইতেছে: ‘১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে যতবারই আমি গ্রামে গেছি, গ্রামের মানুষদের একটি বিষয়ে রাজি করাতে বারবার চেষ্টা করেছি। গ্রামের মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং মাতব্বর-স্থানীয় মানুষদের একটা বিষয়ে রাজি করাতে বারবার চেষ্টা করেছি। আমি তাঁদের বোঝাতে চেষ্টা করেছিলামÑআমাদের গ্রামের প্রায় একশ মানুষ পাকিস্তানী সৈন্য এবং রাজাকার আলবদরদের হাতে প্রাণ হারিয়েছে। আমাদের গ্রামের মাঝ দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রাস্তাটি চলে গেছে। আমি প্রস্তাব করেছিলাম, গ্রামের প্রবেশমুখে মুক্তিযুদ্ধে নিহত এই শতখানেক মানুষের নাম একটি বিলবোর্ডে লিখে স্থায়ীভাবে রাস্তার পাশে পুঁতে রাখার জন্য।’
আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন: ‘আরো একটা বাক্য লেখার প্রস্তাব আমি করেছিলাম। সেটা ছিল এরকম–হে পথিক, তুমি যে গ্রামের ওপর দিয়ে যাচ্ছ সে গ্রামের একজন সন্তান দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছে। আমি আমার এই প্রস্তাবটি ১৯৭২ সাল থেকে করে আসছি। প্রথম প্রথম মানুষ আমার কথা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করত। তিনচার বছর অতীত হওয়ার পরও যখন প্রস্তাবটা নতুন করে মনে করিয়ে দিতাম লোকে ভাবত আমি তাদের অযথা বিব্রত করতে চাইছি। আমার ধারণা, বর্তমান সময়ে যদি আমি প্রস্তাবটা করি লোকে মনে করবে আমার মাথাটা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেছে।’
তাহা হইলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কি বুঝাইতেছে? শুদ্ধ আহমদ ছফার নিজ গ্রামে কেন, সারাদেশেই তো একই অবস্থা। তিনি লিখিতেছেন: ‘উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ এবং মধ্যবঙ্গের প্রায় আট-দশটি জেলায় আমাকে কার্যোপদেশে এন্তার ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে। আমি যেখানেই গিয়েছি লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করেছি, এখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় কোন ঘটনা ঘটেছিল কিনা। অনেক গ্রামের লোক আমাকে জানিয়েছে, ‘আমাদের গ্রামে পাঞ্জাবিরা একেবারেই আসেনি’। অনেক গ্রামের লোক জানিয়েছে পাঞ্জাবিরা এসেছিল, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে এবং অনেক খুনখারাবি করেছে। আমি জিজ্ঞেস করতাম যে সব মানুষ মারা গেছে তাদের নাম-পরিচয় আপনারা জানেন কিনা। গ্রামের লোক উৎসাহ সহকারে জবাব দিতেন–জানব না কেন! অমুকের ছেলে, অমুকের নাতি, অমুকের ভাই ইত্যাদি ইত্যাদি।’
তবুও কেন মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের একটা পূর্ণ তালিকা কেহ প্রণয়ন করিলেন না! আহমদ ছফা আক্ষেপ করিতেছেন, ‘আমি তখন বলতাম, মুক্তিযুদ্ধে নিহত এই মানুষদের নাম আপনারা রাস্তার পাশে লিখে রাখেন না কেন! কোন লোক যখন আপনাদের গ্রামের ওপর দিয়ে যাবে এবং নামগুলো পড়বে [তখন সেই] পথিকের মনে আপনাদের গ্রাম সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেবে। গ্রামের লোকেরা আমার মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকত। যেন আমি কি বলছি সেটার মর্মগ্রহণ করতে একেবারে অক্ষম।’
এই জায়গায় আসিয়া আমাদের মহান লেখক দেখাইতেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কি সুদূর অবস্থা হইয়াছে! আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের যে সমস্ত অঞ্চলে আমি গিয়েছি কোথায়ও দেখিনি মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নাম যতœ এবং সম্মানের সঙ্গে লিখে রাখা হয়েছে। এ ধরনের একটি কাজ করার জন্য আহামরি কোন উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল না। দেশের প্রতি এটুকু ভালবাসা এবং মুক্তিযুদ্ধের কারণে নিহত মানুষদের প্রতি এটুকু শ্রদ্ধাবোধই যথেষ্ট ছিল।’ ইহার প্রতিকার আজও কি সম্ভব নহে? সম্ভব না হইলে বলিতে হইবে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলিতে কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নাই।

১০ মার্চ ২০১৪

দোহাই
১. অধ্যাপক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ‘স্বাধীনতা’, দৈনিক পয়গাম, বিপ্লব সংখ্যা, ২৬ অক্টোবর ১৯৬৪, ৯ কার্তিক ১৩৭১।
২. আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কোথায় জন্মায়?’ খবরের কাগজ, ১৯ বর্ষ, ৫০ সংখ্যা, ১২ ডিসেম্বর ২০০০, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪০৭।
৩. ‘১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’, সপ্তম তফসিল [১৫০ (২) অনুচ্ছেদ], গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, পুনর্মুদ্রণ, অক্টোবর ২০১১।

পাথেয়–আহমদ ছফা

ভূমিকা–সলিমুল্লাহ খান

মহাত্মা আহমদ ছফা সাহিত্য ব্যবসায়ের প্রথম পর্বে ছোট গল্পে হাত পাকাইতেন। তাহার পাথুরে প্রমাণ ‘পাথেয়’ নামধেয় বর্তমান গল্পটিতেও পাওয়া যাইতেছে। যতদূর জানি এই গল্পটি আহমদ ছফা রচনাবলির হাল সংস্করণে স্থান পায় নাই। তাঁহার একটি কারণ এই হইতে পারে যে আহমদ ছফার একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘নিহত নক্ষত্র’ নামক পুস্তকে ইহা লওয়া হয় নাই।

‘পাথেয়’ প্রথম ছাপা হইয়াছিল ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখে প্রকাশিত ‘হে স্বদেশ’ সংকলনের ‘গল্প’ খণ্ডে। একই তারিখে একই নামে আরও দুইটি খণ্ড — যথাক্রমে ‘প্রবন্ধ’ ও ‘কবিতা’ — প্রকাশিত হইয়াছিল। তিনটা খণ্ডেরই প্রকাশক বাংলা একাডেমি (তৎকালের বানান অনুযায়ী লিখিতে ‘বাঙলা একাডেমী’)। ‘হে স্বদেশ’নামা এই তিন সংকলনেরই প্রচ্ছদ আঁকিয়া দিয়াছিলেন মহাত্মা জয়নুল আবেদিন। খবরটি বলিয়া রাখা বাহুল্য নয়। তিন সংকলনেরই পটভূমিকায় ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। এই সকল সংকলনের প্রবর্তনা করিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। তিনি ছিলেন সেকালের ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’ নামক সংগ্রামী সংগঠনের অগ্রগণ্য নেতা।

‘পাথেয়’ গল্পের বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্ব। পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে দিন গণহত্যা শুরু করিয়াছিল তাহার দুয়েকদিনের মধ্যেই সারাদেশ হইতে নিপীড়িত মানুষ প্রাণ হাতে করিয়া দেশ ছাড়িতেছিল। দেশের পূর্বাঞ্চলের একটি জেলা হইতে এইরকম বিতাড়িত মানুষের একটি দল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা পানে ছুটিয়া চলিয়াছে। সেই পথুমতি মানুষের মিছিলে হাজারো কাতর ভীতসন্ত্রস্থ অসহায় মানুষের দলে সেদিন ছিলেন গর্ভবতী আসন্নপ্রসবা একজন জননীও। পথিমধ্যে তাহার প্রসববেদনা দেখা দিল। সেকালের ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার অন্তঃপাতী তিতাসনদীর পাড়ে এক জায়গায় জননী একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। এই নবজাতকের জন্মের দৃশ্যটি আহমদ ছফা পাকাহাতে আঁকিয়াছেন। শরণপথগামী মানুষের কঠিন শোভাযাত্রা ক্ষণিকের জন্য থামিয়াছিল তিতাসের পাড়ে। নবজাতকের আগমন সম্পন্ন হইলে পর মিছিল আবার আগাইয়া চলে।

আমাদের মনে হইয়াছে এই ছোটগল্পে আহমদ ছফা বাংলাদেশের জন্মকাহিনীটি একপ্রস্ত রূপকথার আদলে বলিয়াছেন। ছোটগল্পের অঙ্গে তিনি রূপক বা এলেগরির অঙ্গরাখা চাপাইয়া দিয়াছেন। আমি কোন এক নিবন্ধে এই গল্পের পরিচয় দিয়াছি ‘নতুন জাতির জন্ম’ নাম আরোপ করিয়া।

২৭ নবেম্বর ২০১৩

ছবি: রঘু রায়

ছবি: রঘু রায়

 

মানুষের স্রোতটা এঁকেবেঁকে আলপথ ধরে, বোরোক্ষেতের উপর দিয়ে, ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে, চৌদ্দ পুরুষের বাস্তুভিটের মায়া কাটিয়ে শিকারীতাড়িত একপাল ভীতসন্ত্রস্ত পশুর মতো পালিয়ে আসছে। যতই সামনে যায় সংখ্যা বাড়ে। একটু জিরোয় মাঝে মধ্যে। জিরোয় না, আত্মীয়স্বজন মাবাপ ছেলেমেয়ে কে এলো, কে এলো না, কে জন্মের মতো গেলো ভাবতে চেষ্টা করে। গুলিগোলার আওয়াজ আর আত্মীয়স্বজনের টাটকা লাল রক্তের স্মৃতি আবার তাড়া করে। মানুষগুলো আবার হাঁটে — সোজাপথে নয়, বাঁকাচোরা ঘুপচিঘাপচি জংলাপথ বেছে নেয়। প্রাণের মায়া বড়ো মায়া। দুঃখের কথা কয়ে লাভ নেই, কষ্টের কথা বয়ান করে লাভ নেই। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটির জন্য চোখের জল ফেলে কি হবে! সব তো গেছে। এখন প্রাণ নিয়ে চলো। মানুষগুলো পা চালায়। কেউ কাউকে তাড়া দেয় না। কোথায় যাবে কোন পথ দিয়ে যাবে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু জানে বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় ঢুকতে হবে। তারপরে কি হবে, কি হবে তারপরে? কেউ কিছু জানে না। সব অদৃষ্ট! অদৃষ্টের ফের!

অনেক ঘুরে মানুষগুলো রেলের লাইনের উপর উঠলো। সামনে আটদশজন লাইনে উঠেই থমকে দাঁড়াল। লাইনের উপর দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে কিনা জানার জন্য পেছনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, কি, অ কি ক’ যামুনি? পেছনের আটদশজন প্রায় একসঙ্গে জবাব দিলো ‘হ যাওন যাইবো, দুই দিকের পুল ভাঙা।’ তারপরে নিঃশব্দে মানুষের মন্থর আধমরা স্রোতটা রেলের লাইনের উপর উঠে এলো। আকাশে চড়চড়ে রোদ। প্রসারিত মাঠে অল্প অল্প বাতাসে কচি পাটের চারা দুলছে। বোরো ধানে সোনার বরণ ধরেছে। উঠতি বেলায় রোদের ধার ছিলো খুব। এখন তেজটা মরেছে। ঝিরিঝিরি হাওয়া দিচ্ছে।

ছবি: রঘু রায়

ছবি: রঘু রায়

নবীনগর থেকে শেয়ালের মতো একবেলার পথ দু’দিনে হেঁটে পাগাচং ইস্টিশানের কাছে এসেছে। রোদে আধাপোড়া হয়েছে সকলে। তেষ্টায় অনেকেরই বুক জ্বলছে। কতো গেরাম, কতো পাড়া, কতো দীঘি, কতো পুকুর পেরিয়ে এলো — এক আঁজলা জল চাইতে পারেনি। পাড়ায় পাড়ায় ডাকাত লুকিয়ে আছে। মানুষ ভারী বেরহম। একদল মারে, আরেকদল কেড়ে রাখে শাড়িগামছা পর্যন্ত। উঠতি বয়সের মেয়ে থাকলে লুটে নিয়ে যায়। বিপদ বড়ো বিপদ। জন্মভূমির সবকিছুই শত্র“তা করছে। কালচে জলের লম্বা বাঁকা গাঙের কাছে আকুল তেষ্টা নিয়ে আঁজলা পেতে দাঁড়াও, গাঙ জল দেবে না।

হাওয়াটা বড় প্রাণ ঠাণ্ডা করা। রেলের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে একজন বুড়ো মানুষ ধুতির খুটে চোখ মুছতে মুছতে ডুকরে কেঁদে উঠলো ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে। ছাওয়ালডারে জন্মের মতন রাইখ্যা আইলাম। ভগবান, তুই দয়ার সাগর। কান্না জিনিসটেই সংক্রামক। আরেকটি মেয়েছেলে। সারাপথে কারো সঙ্গে একটি কথাও বলেনি। তার আমের আঁটির মতো শুকনো মুখে ঢেউ খেলে গেলো। প্রথমে ফুঁপিয়ে তারপর গলা ছেড়ে কেঁদে উঠে। ও ভাই প্রাণহরি, তুই ছাড়া থাকুম কেমনে রে! আরেকজন গলায় কণ্ঠিপরা আধবয়সী, রাধাকৃষ্ণের ভক্ত, কণ্ঠস্বরে দরদ ঢেলে বললো, চুপ করো মা, সব ঠাকুরের ইচ্ছে। কিন্তু গোটা দলটির মধ্যে তখন কান্নার রোল পড়ে গেছে। সকলেই কাউকে না কাউকে হারিয়েছে। বাপ, ভাই, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, আত্মীয়, বন্ধু, স্বজন। আচার্যপাড়ার কালীকিঙ্করের মার তিনকুলে কেউ নেই। বুড়ি সারা পথ ভ্যানর ভ্যানর করেছে। একে ডেকে, তাকে ডেকে জিগগেস করেছে। আঁরে সেখানে ভাত দিব রে — দূর থালাবাটিটাও ফেইল্যা আইলাম। পোড়াকপাল, দুইমুঠ ভাত দিলেও খামু কিসে কইর‌্যা। তপনবাবুর বাড়িতে আগুন জ্বইলা উঠল, সকলের নগে আমি বার অইয়া আইলাম।

বুড়ির কথার কেউ জবাব দেয়নি। বুড়িও চুপ মেরে গিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপরে অন্যকথা তুলেছে। সেখান ভালো তরকারী পাওয়া যায় কিনা। খাওয়ার ভারী লোভ রমণীর মার। বিধবা হলে কি হবে। একটা চ্যাঙড়া বয়সের ছেলে একটা ধমক দিয়েছে। মাইনসের প্রাণ বাঁচে না, তোমার খাই খাই। দেমু নিহি একডা ধাক্কা। তারপর বুড়ি সারাপথ নিজে নিজে আকাশের দেবতাকে অভিশাপ দিয়েছে। বিকেলবেলায় রেলের লাইনের উপর সকলকে কাঁদতে দেখে বুড়ি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। ব্যাপারটা কি প্রথমে আঁচ করতে পারেনি। তারপর ঘোলা ঘোলা চোখ দু’টো একটু কচলে নিয়ে ডানহাতের লাঠিটা বাঁহাতে বদল করে মুখটা বিকৃত করে — অ বাপ রমণীরে বলে বহুকাল আগে স্বর্গগত রমণীর নাম ধরে কান্না জুড়ে দিলো। একটা বৌ দু’দিন আগে তার প্রথম ছেলে হারিয়েছে। স্তন দু’টো ফুলে উঠেছে, যন্ত্রণায় টনটন করছে — সে শুধু পাথরের মতো নির্বাক হয়ে রইলো।

মানুষগুলো সামনে যাচ্ছে। দেশগেরামের স্মৃতিচিহ্ন অন্তর থেকে মুছে ফেলেছে, জন্মভূমির ছবি দৃষ্টি থেকে মুছে ফেলেছে। চারদিকে মৃত্যু জাল পেতেছে। তারই মধ্য দিয়ে তারা হাঁটছে। কান পাতলে শোনে কামানের গর্জন। চোখ মেললে আগুনের শিখা দাউ দাউ নাচে, আত্মীয়স্বজনের রক্ত লাল হয়ে জেগে থাকে। তবু প্রাণের দায়। মানুষগুলো হাঁটছে। চারদিক থেকে বৃত্তাকারে লোহার সাঁড়াশীর মতো ভয়ঙ্কর মৃত্যু, করুণ পাইকারী মৃত্যু দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলছে। তাই তারা যাচ্ছে ভিটেমাটি ছেড়ে, দেশগেরাম ছেড়ে, মাতৃভূমির আঁচল ছেড়ে, নাড়িকাটা ভূমি ছেড়ে। জীবন ভারী সুন্দর। বড়ো মধুর এই বেঁচে থাকা। কোথায় জীবনের উপর মেলে দেয়া সে শান্তসুন্দর ছায়া!

দলের মধ্যে একটি মেয়ে ফিসফিসিয়ে আরেকটি মেয়েকে কি বললো। দু’জন পেছন ফিরে চাইলো। মেয়েদের মধ্যে কথাটা চাউর হয়ে গেলো। সকলেই পেছনে ফিরে ফিরে সে লোকটাকে দেখলো। মেয়েদের দেখাদেখি পুরুষেরাও তাকিয়ে তাকিয়ে সেই কালো লম্বা মানুষটাকে দেখলো। কোন ঘৃণা, কোন বিদ্বেষ, কোন নালিশ নেই কারো। দলের মধ্যে সকলের মুখে মুখে মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হতে থাকলো, গত রাতের সেই লোকটা। মানুষের বিস্ময়বোধ কখনো ফুরোয় না। কৌতূহল এবং বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে মাথার উপর মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়েও মানুষটাকে দেখতে লাগলো সকলে। যেন লম্বা কালো মানুষটার দেশ ছেড়ে যাওয়ার অধিকার নেই। এই দলটি এক সঙ্গে একটি স্কুলঘরে রাত কাটিয়েছে। লোকটিও সঙ্গে ছিলো। গভীর রাতে হরিচরণ কুমোরের বড়ো মেয়েটাকে বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলো। বোধ হয় আতঙ্ক, বোধ হয় ভয়ের কারণেই হবে, ধুমসী কালো অনেকদিন ধরে বিয়ে না হওয়া মেয়েটা চিৎকার করে উঠেছিল। সকলে জেগে উঠলে সে লোকটা ভদ্রভাবে সে রাতের মতো কোথায় সরে পড়েছিল। তার সম্বন্ধে কেউ কিছু জানে না, কার ছেলে, কার নাতি, কোথায় ঘর। এখন লোকটা পেছনে পেছনে দলের সঙ্গে আসছে, তার লম্বা ছায়াটা লাইনের উপর পড়েছে। এটাই বিস্ময়ের কারণ।

মানুষের স্রোতটা লাইন বেয়ে ভাতশালা ইস্টিশানের কাছে এসেছে। ইস্টিশান মাস্টারের ঘর বন্ধ। মানুষজনের নামগন্ধ নেই। দিগন্তরেখার ধার অবধি বিস্তৃত রোদ ঝলকানো গোটা বাংলাদেশ মৌন নিস্তব্ধ। বাতাসে শ্বসিত হচ্ছে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস। একটাই দৃশ্য। মানুষ পালাচ্ছে রেলের লাইন ধরে। দাবানল জ্বলে উঠা বন থেকে উর্দ্ধশ্বাসে প্রাণভয়ে পশুরা যেমন পালায় দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে — তেমনি করে।

গুবরেপোকার ডাকের মতো একটানা একটা আওয়াজ ভেসে আসে। খুবই ক্ষীণ আওয়াজ। এ চারপাঁচ দিনের মধ্যে মানুষ গুলোর শ্রবণশক্তি অনেকগুণ বেড়ে গেছে। একজন দু’জন কান খাড়া করে রইলো। বোঁ বোঁ একটানা গুঞ্জন, তারপরে পিট পিট শব্দ। আধবয়েসী একজন মানুষ ঘাড়টা কাত করে কান দু’টো ভালো করে পেতে নিশ্চিন্ত হলো। তারপর বললো, আমার মনে লয় বাওনবাইরা ভৈরবের দিকে পেলেন লইয়া গুলি অইতাছে। কথাটা গোটা দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগলো না। সকলে উত্তরপশ্চিমের দিকে তাকিয়ে রইলো। ব্যাপার কি দেখার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো লাইনের উপর। সত্যি সত্যি চারটি এরোপ্লেন দেখা গেলো। প্রথমে চারটি সাদাবিন্দুর মতো দেখাচ্ছিলো। নীচের দিকে নামলে সমস্ত গতরটা দেখা গেলো। বোঁ বোঁ চক্কর দিয়ে ঘুরছে। প্যাট প্যাট করে মেশিনগানের গুলি ফুটছে। একবার ওপরে উঠছে আবার শিকারী বাজের মতো ছোঁ মেরে নীচে নামছে। মাঝে মাঝে দ্রƒম দ্রƒম শব্দ হচ্ছে — ওগুলো বোমা।

আতঙ্কিত মানুষগুলো আবার পা চালিয়ে দিলো। আকাশ থেকে মৃত্যু ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তানী সৈন্য। বেশী দূর যেতে হলো না। যে সমস্ত মানুষ জন্মের জন্য দায়ী নয় — অথবা রাজনীতির জন্য দায়ী নয়, অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে মুসলমান এবং দেশের হালচাল নিয়ে মাথা ঘামায়নি, মাটি, নরম জলে ভেজা বাংলাদেশের মাটি গাছের মত আঁকড়ে ছিল তারাও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে গরুবাছুর, ধানচাল, কাঁথাবালিশ হাতের কাছে যা পেয়েছে নিয়ে দলে দলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাসাভাঙ্গা পাখীর মতো বেরিয়ে, বিল মাড়িয়ে রেলের লাইনের দিকে ছুটে আসছে। ভাতশালার কাছেই ওদের সঙ্গে নবীনগর থেকে আসা মানুষদের সাক্ষাত হলো। একজন জিগগেস করলো, কি, অ ভাই সাব হবর কি! লোকটি একটি কালো ছাগলের দড়ি ধরে টানতে টানতে বললো, হারে ভালা না ভাই, আর সুখ নাই। পাঞ্জাব্যায় সৈন্য উজানীশর পুলের ঐ পাড়ে আইয়া পড়ছে। পুল ভাঙ্গা নইলে বাওনবাইরা এক দৌড়ে চইল্যা যাইব। জবর যুদ্ধ অইব, মুক্তিফৌজও এই পাড়ে কাইল থুনে পজিশন লইয়া রইছে।

তার দশ মিনিটও অতীত হয়নি। ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর কামান গর্জন করে উঠে। ধোঁয়া দেখা যায়, আগুনও দেখা যায়। রাইফেলের গুলির শব্দ আসে। উজানীশরে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে। দু’পক্ষে অবিরাম গোলাগুলি চলছে। পাকিস্তানী সৈন্যের ছত্রিশ পাউন্ডার কামানগুলোর আওয়াজ কানে তালা ধরিয়ে দেয়। মানুষগুলো থমকে দাঁড়ালো। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে প্লেন থেকে বোমা ফেলছে, মেশিনগান দিয়ে নিরীহ মানুষের উপর গুলি ছুঁড়ছে। সামনে লড়াই চলছে। সামনে পিছে দুই দিকেই মৃত্যু। মানুষজন বিলের উপর দিয়ে পিঁপড়ের মতো ঝাঁক বেধে ছুটে আসছে রেলের লাইনের দিকে। দুঃসময়, প্রচণ্ড দুঃসময়, সমস্ত বাংলাদেশের উপর দুঃসময় নেমে এসেছে। যে যেখানে আছো ছুটে পালাও। যেভাবে পারো জান বাঁচাও। মানুষের জান এখন ভারী সস্তা। প্রাণের প্রতি পাকিস্তানী সৈন্যের ভয়ঙ্কর দৃষ্টি। যা কিছু প্রাণের আবেগে নড়েচড়ে দেখে দেখে তাক করে গুলি ছুঁড়বে।

রেলের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে মানুষগুলো দেখে দক্ষিণপশ্চিম কোণে আগুনের লালশিখা কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উপরের দিকে উঠছে। বাতাসে খোলাজিহ্বা প্রসারিত করে বাংলাদেশের আকাশে ডাকিনীযোগিনীর মতো নেচে বেড়াচ্ছে ঘৃণাবিদ্বেষের কালো ধোঁয়া আর রোষের তাজা আগুন। কিছুই বাঁচবে না শিশু বুড়ো নারী পুরুষ। আগুনে পুড়ে ঝলসিয়ে যাবে। গুলিতে মরবে। কামানের গোলার আগুনে ধড় থেকে মুণ্ডু উড়ে যাবে। গরুবাছুর জ্বলে অঙ্গার হয়ে পড়ে থাকবে। ফলবান গাছ নীরব সহিষ্ণুতায় আগ্নেয় প্রহার বুকে ধারণ করে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাংলাদেশে মানুষ নামের কোনো জীব থাকতে পারবে না। কেবল থাকবে মিলিটারী। বুটজুুতোর আওয়াজ নরম পাললিক মাটিতে গেঁথে গেঁথে ওরা টহল দেবে। বাংলাদেশের বাতাসে ওদের গাড়ীর পেট্রোলের দুর্গন্ধ ছাড়া আর কোনো সুবাস পাওয়া যাবে না। বৌ কথা কও পাখি আর ডাকবে না। কুটুমডাকা পাখি আর ঘরের চালে, সীমের মাচায় আসবে না। মানুষগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো হাজার হাজার বছর ধরে গভীর মমতায় তৈরী করা জীবনের রঙ্গমঞ্চ জ্বলে যেতে, পুড়ে যেতে দেখলো। গোটা দলটা সর্বস্ব হারিয়ে পিতৃপুরুষের ভূমির শ্মশান দৃশ্য দেখতে দেখতে হাঁটে। কেননা স্মৃতির চেয়ে, প্রেমের চেয়ে, দুর্বলতার চেয়ে নগদ প্রাণের দামটা ঢের ঢের বেশী। আপাতত তা হারাতে কেউ রাজি নয়।

বাঁচবার আকাক্সক্ষা সে বিশাল জনস্রোতকে সামনের দিকে ঠেলে দিলো। গোটা বাংলাদেশ রিক্ত, নিঃস্ব, অসহায় হয়ে যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করছে। কাঁদবার ফুরসত নেই। পেছনে তাকাবার অবসর নেই। মরবার শক্তিটুকু খরচ করে বাঁচতে চায়। জীবনের প্রতি মানুষের কি টান! তারা মাইল দুয়েক এসে তিতাসনদীর পাড়ে এসে থামে। তিতাসের পাড়ে অজস্র মানুষের হাট বসেছে। অভুক্ত অশোয়া আতঙ্কতাড়িত দিগি¦দিকজ্ঞানহীন হাজার হাজার মানুষ। কেউ নির্ভার নয়। কারো বাচ্চাকাচ্চা আছে, কেউ বয়সের ভারে কাতর, কেউ কাথাবালিশ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ অনর্থক একরাশ হাড়িকুড়ি নাহক প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে এতটা পথ বয়ে এনেছে। সকলেই ওপারের যাত্রী। তিতাস পার হয়ে আখাউড়া যাবে। তারপর বর্ডার পেরিয়ে আগরতলা।

এই প্রাণ হাতে করে বেরিয়ে আসা মানুষগুলোর চোখে আগরতলা নামটি সঙ্গীতের মতো বাজে, স্বপ্নের মতো আভা ছড়িয়ে দেয়। পা ছড়িয়ে বসা যাবে, নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি দূর করা যাবে। সে আকাক্সিক্ষত স্বর্গে কার আগে কে যাবে তাড়াহুড়ো পড়ে গেছে। মানুষ অনেক। নাও কেবল দু’খানা। মাঝি দর হেঁকে বসলো মাথাপিছু আট আনা। গুঞ্জন উঠলো মানুষের মধ্য থেকে, ‘এ তো অত্যাচার, মানুষের বাইচ্চা নয়, ডাকাইত।’ কিন্তু মানুষ ঝুপ ঝুপ করে নৌকোয় উঠতে থাকলো লাফিয়ে।

বেলা প্রায় পড়ে এসেছে। উজানীশরে প্রচণ্ড যুদ্ধ হচ্ছে। পাঞ্জাবী সৈন্যদের কামানগুলো আরো ঘন আরো জোরে গর্জন করছে। আগুনের শিখা আকাশে দেদীপ্যমান হয়ে উঠছে। ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ মানুষের মধ্যে চাপা কিন্তু সতর্কতাসূচক আওয়াজ উঠলো। বইয়া পড়, বইয়া পড়। পেলেন আইতাছে মানুষ দেখলে গুলি ফুট করবে। কুমিল্লার দিক থেকে একটা প্লেন বোঁ বোঁ শব্দ করে অনেক উপর দিয়ে উড়ে আসছে। শব্দ শোনা যাচ্ছে। প্লেন এখনো দৃষ্টিসীমার মধ্যে ধরা পড়েনি। ‘বইয়া পড়’ শব্দটি মন্ত্রের মতো কাজ করলো! যে যেখানে ছিলো গুটিসুটি মেরে বসে গেলো। ব্রিজের উপরের যারা তারাও বসে গেলো। মাঝি দুজন নৌকো দুখানা ব্রিজের তলায় এসে থামালো। বোঁ করে প্লেনটা অনেক উপর দিয়ে কোণাকুণি উড়ে গেলো। খুব ছোট হয়ে মাটিতে কালোছায়াটা পড়ে উধাও হলো।

সে মেয়েটি তো বসেই ছিলো। প্লেনের শব্দ শুনে ব্রীজের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে গেলো। হাতেপায়ে খিল ধরছে। পাশাপাশি তিনখানা স্লিপারের উপর মেয়েটির শরীর উদরস্থ সন্তানের নিষ্ঠুর অত্যাচারে দুলে দুলে উঠছে। এবার মানুষের দৃষ্টি পড়লো তার উপর। কি ব্যাপার, কি ব্যাপার, এমন করছে কেন। কি মুশকিল! পড়ে যাবে না কি! ওকে কেউ গিয়ে নিয়ে আসো। কে যায়! মেয়েটির পাশ দিয়ে নাকে কাপড় দিয়ে একটি আধবুড়ো মানুষ হেটে এলো। গলায় চাদরটি ঠিকভাবে জড়ানো আছে। ছাতাটিও সঙ্গে করে এনেছে। চেহারা দেখে মনে হয় আদালতের মুন্সি কিংবা মোক্তার কেউ হবে। ডাঙ্গায় নেমে লোকটা দু’দুবার থুতু ফেলে বললো, ‘কি আবার হবে, মাগী ছেলে বিয়াচ্ছে। ছি এই অসময়ে! একটু লাজশরমও নাই।’ কথার টানে মনে হয় স্থানীয় কেউ নয়, অন্য কোথাকার মানুষ।

মানুষের মধ্য থেকে আবার গুঞ্জন উঠলো। আহা প্রাণ! বেদনা উঠেছে। তোমরা কেউ গিয়ে ওকে নিয়ে এসো। জনমতটা গভীর হতে থাকে। আর মেয়েটি শক্ত কঠিন তিনখানা কাঠের স্লিপারের উপর গোঙাচ্ছে। মুখে ফেনা এসে গেছে। পড়ে যেতে পারে, একশো হাত নীচে জল। তোমরা কেউ ওকে নিয়ে এসো। সবাই বসে কিন্তু যায়টা কে! একটা বেঁটেখাটো ফরসাপনা মেয়ে তার স্বামীকে শান্ত অথচ দৃঢ়স্বরে বলল, তুমি ঐ বেচারীকে নিয়ে এসো। নইলে তোমার সঙ্গে আমি যাবো না। কথা ক’টি সমবেত সমস্ত মানুষের কাছে আদেশের মত শোনাল। সত্যি সত্যি চারপাঁচজন মানুষ এগিয়ে গেল। অত্যন্ত সন্তর্পণে মেয়েটার পায়ের নীচে, মাথার নীচে, পিঠের নীচে হাত দিয়ে তাকে পাড়ে নিয়ে এল। প্রচণ্ড ভূমিকম্পে পৃথিবীর ভেতরটা যেমন কাঁপে তেমনি কাঁপছে। শরীরের ভেতর শরীর, প্রাণের ভেতর প্রাণ লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে।

সবহারানো মানুষের কয়েকজন দাঁড়িয়ে চুক চুক করে আফশোস করলো। আহারে, মেয়েটি ভারী কষ্ট পাচ্ছে! এমন অসময়! দেখাদেখি আরো মানুষ দাঁড়িয়ে গেল। একটি মেয়ে বোচকা খুলে দু’খানা পুরোনো শাড়ি বার করে দিল। আর দু’জন মেয়ে মেয়েটাকে যেখানে রেখেছে তার চারদিকে শাড়ির ঘের দিয়ে দিল। একজন বেটাছেলে প্যাকিং বাক্সের ঘর যোগাড় করে এনে দিল। খড়খড়ে শুকনো খড় বিছিয়ে প্রসূতির শয্যারচনা করে তাকে তার উপর শোয়ানো হলো। জীবনের সমস্ত স্থিতি, সমস্ত অবলম্বন ফেলে আসা মানুষগুলো আরেকটি জীবনের নাট্যমঞ্চ তৈরী করার জন্য যতœবান হয়ে উঠলো। সব ঠিক এখন। একজন দাই পেলে ভালোয় ভালোয় সব হয়ে যায়।

ছবি: রঘু রায়

ছবি: রঘু রায়

রমণীকিঙ্করের মা কোনরকমে ওপাড়ে এসেছে। আকাশের দেবতার উদ্দেশ্যে গালাগাল তখনো থামায়নি। চোখের সামনে কি ঘটছে দেখেও দেখছে না। ভগবান চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে। এতগুলো মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে বের করে এনেছে। রমণীর মা দেখবে কেন! রমণীর মা’র এমন কি দায়! বার বার দাইয়ের কথা শুনে রমণীর মা গোটা ব্যাপারটা আঁচ করে নিল। গুরুত্ব উপলব্ধি করে তার মুখের অঙ্গনে একটা মমতার ভাব নামলো, ফুটে উঠলো একটা একাগ্রতা। সৃষ্টির কাজে আহবান। সৃষ্টির ডাকে সমস্ত বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা সুমিতি জেগে ওঠে। আকাশের দেবতাকে এ যাত্রা রেহাই দিয়ে ঘেরাটোপের ভেতর চলে এল। কাজে কে না লাগতে চায়! বিদ্যে কে না দেখাতে চায়!

প্রসূতি নিজের বেদনার উত্তাপে সংজ্ঞাহীন। নতুন জীবনের জন্য সব কিছু করছে মেয়েরা। বেটাছেলেরা যারা ছিল বসে নেই। নদী থেকে জল এনে দিচ্ছে। বাঁশ ফেড়ে ফেলে দাঁও দিয়ে কেটে চিকন করে ফালি বানিয়ে দিচ্ছে। নাড়ি কাটতে সুবিধে হবে। ঘেরাটোপের ভেতরে একটা দক্ষযজ্ঞ চলছে। সকলে কান খাড়া করে রেখেছে সেদিকে। মনোযোগ এত একাগ্র যে, পাকিস্তানী সৈন্যের ছত্রিশ পাউন্ডার কামানের গর্জনও শুনতে পাচ্ছে না। সকলে যেন নিজের নিজের হৃদপিণ্ড হাতে নিয়ে বসে আছে। মুহূর্তগুলো সময়ের চালুনির ফাঁক দিয়ে মিহি বালুকণার মত ঝরছে। ইচ্ছে করলে ছুঁয়ে দেখতে পারে। ঘেরাটোপের ভেতরে একটা তীক্ষè চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল। প্রসূতি কঁকিয়ে উঠল। মা মা বলে চীৎকার জুড়ে দিল। ওঁয়া ওঁয়া করে কেঁদে উঠল। সকলে এক সঙ্গে ঘেরাটোপের কাছে এসে প্রায় একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘কি অইছে গো, ছেলে না মেয়ে?’ রমণীর মা রক্তের লালবসনে ঢাকা একখণ্ড মাংসপিণ্ড দু’হাতে তুলে নিয়ে দাঁতের মাড়ি দেখিয়ে হাসবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ছেলে অইছে গো, ছেলে অইছে’।

ছেলে অইছে গো, ছেলে অইছে। কথাটা দ্রুত খুব দ্রুত আলোড়নের মত ছড়িয়ে পড়লো। মরণভয়ে তাড়িত মানুষেরা আরেকটি নতুন জীবনের আগমন সংবাদ শুনল। যারা হাটছিল গতি বাড়িয়ে দিল। পায়ের চোখ ফুটেছে।

প্রথম প্রকাশ: হে স্বদেশ, বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ফেব্র“য়ারি ১৯৭২), পৃ. ১৩৮-১৪৮।

সহিংসতার মূলে যুদ্ধাপরাধের বিচার — সলিমুল্লাহ খান

 

সমকাল : দেশব্যাপী সহিংসতা-প্রাণহানি চলছে। এর প্রধান কারণ কি?

সলিমুল্লাহ : কম করে হলেও দুটি কারণ আমি বলব। এক. ১৮ দলের কর্মসূচি। তারা ৫ জানুয়ারি ঘোষিত নির্বাচন বর্জন করেছে এবং তারই অংশ এই সহিংস আন্দোলন। এটা অসত্য নয়। তারা হরতাল-অবরোধ ঘোষণা করছে। শেষ বিচারে সহিংসতার দায় খালেদা জিয়ার ওপরে বর্তাবেই। বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম বলেছেন, তাদের অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। এটা অনেকটা ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই না প্রবাদের মতো। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের বক্তব্য থেকে অশান্তির পেছনে যে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি — তার স্বীকৃতিই প্রদান করা হয়। কিন্তু এটা হচ্ছে ঘটনাপ্রবাহের ওপরতলা, ভাসা ভাসা দিক।

সমকাল : তলার দিকটা তা হলে কি?

সলিমুল্লাহ : নির্বাচনী হাঙ্গামা মুখ্য নয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের ইস্যুই মুখ্য। সেই অর্থে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত প্রশ্নের পুনরুত্থান।

সমকাল : কিভাবে এর ব্যাখ্যা করবেন?

সলিমুল্লাহ : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা নির্বাচনী হাঙ্গামা দেখেছি। ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্তও বিস্তর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তখনও অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এখনকার সঙ্গে পরিমাণ ও গুণে তার বিস্তর পার্থক্য। একটি সংবাদপত্রে দেখেছি, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতায় অন্তত ১১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত শত শত। রেললাইন উপড়ে ফেলা এবং ধ্বংসাত্মক বিভিন্ন পন্থা অনুসরণ করে সম্পদহানির বিষয়টি যদি বাদও রাখি তা হলে এত বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি কিভাবে মেনে নেব? চলতি বছরে প্রায় তিনশ’ লোকের মৃত্যু হয়েছে রাজপথের সহিংসতায় —  এমন হিসাবও আমরা বেসরকারি সূত্রে জানতে পারছি। এটা নির্বাচনী কারণে নয়, বরং দ্বিতীয় কারণে।

সমকাল : এ পর্যায়ের সূচনা ঘটে কোন সময়ে?

সলিমুল্লাহ : এতক্ষণ সংখ্যা বা পরিমাণের কথা বললাম। এখন গুণগত দিকে আসি। আপনার মনে থাকার কথা, এ বছরের ৫ ফেব্র“য়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্র-তরুণরা, যাদের নতুন প্রজন্ম বলা হয়, শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে সংগঠিত হয়। তারা নতুন ধারার একটি আন্দোলন শুরু করে। পরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়কে কেন্দ্র করে সহিংসতার মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে, ফেব্র“য়ারি থেকে ডিসেম্বর, এই সময়ে যত সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তার ৯০ শতাংশ ঘটানো হয়েছে যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে। বাকি ১০ শতাংশ নির্বাচনকেন্দ্রিক। এসব হচ্ছে তথ্য। এখন তত্ত্বে আসি। মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন, তত্ত্ব ছাড়া তথ্য হয় না।

সমকাল : তত্ত্ব কি বলে?

সলিমুল্লাহ : জামায়াতে ইসলামী একটাই অবস্থানে রয়েছে — নির্বাচনে তারা যাবে না। এটা তাদের রণনীতি। যুদ্ধাপরাধী বলে যাদের সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বিচার চলছে তাদের বাঁচাতে এই দলের কাছে শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো — নো ইলেকশন। সহিংস উপায়ে সংবিধান-বহির্ভূত পন্থায় তারা সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এটা জামায়াতে ইসলামীর সার কথা।

সমকাল : আর বিএনপির?

সলিমুল্লাহ : এ দলটি এই ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত বলতে পারি। প্রথম কথা, তারা যুদ্ধাপরাধ কথাটি বলে না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে সরাসরি বলে না। তারা বলে স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচারের কথা। খালেদা জিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বলেছেন ‘রাজনৈতিক বন্দি’। এটা হচ্ছে তাদের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে, তার প্রকাশ। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে তাদের সঙ্গে জামায়াতের সহমত রয়েছে। এটা জোটবদ্ধতার কারণ। যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী একা হরতাল দেয়। বাকি হরতাল একসঙ্গে ডাকে। বিএনপির ভেতরে অনেকে যুদ্ধাপরাধ বিষয়টির ফয়সালা চায় বলেই এ কৌশল। বিএনপি যদি বলত, একাত্তরে যারা অপরাধ করেছে তাদের বিচার করব, তা হলে হাঙ্গামা কমে আসত। আমরা বলতে পারি, ওই সময়ের অপরাধের যারা বিচার চায় এবং চায় না — এভাবে দেশ বিভক্ত।

সমকাল : সরকারও এ বিভক্তির কথা বলছে?

সলিমুল্লাহ : হ্যাঁ, তারা স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ বলছে। বিএনপি বলছে, বিভক্তির মূল কারণ ভিন্ন — ত্রয়োদশ ও পঞ্চদশ সংশোধনী। এখানেও বিএনপির দ্বিধা। তারা এখন আর ত্রয়োদশ সংশোধনীর হুবহু প্রয়োগ চায় না। এটা বহাল থাকলেও বিরোধ হতো। ত্রয়োদশ সংশোধনী অনেক আগেই মৃত। কারণ বিএনপি বলেছে, তারা এ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী যার তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানের পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার, সেই বিচারপতি খায়রুল হককে গ্রহণ করবে না। বলতে পারেন, আওয়ামী লীগ কেবল পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মৃত ত্রয়োদশ সংশোধনীর দাফনের ব্যবস্থা করেছে।

সমকাল : সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, পঞ্চদশ সংশোধনীই সব অশান্তির মূলে…

সলিমুল্লাহ : একজন প্রাজ্ঞ লোক কিভাবে এমন চিন্তাহীন কথা বলেন — ভেবে পাই না। ত্রয়োদশ সংশোধনী বজায় থাকলেও সমস্যা হতো। এর সমাধান কি? সরকার একটা পথ বলছে। বিগত সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার হবে। যেমন ভারত কিংবা সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যান্য দেশে রয়েছে। এক সময়ে আমাদের দেশেও ছিল। বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করতে পারত। তারা আন্দোলনে আছে। জামায়াতে ইসলামীও আছে। এখন আমাদের এই দুই দলের আন্দোলনকে আলাদা করে দেখতে হবে। বাতাসে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড রয়েছে। কার্বন-ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কম। কিন্তু ভূমণ্ডলে উষ্ণতা বাড়ানোর জন্য এর দায়ই বেশি। বিএনপি বলছে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের নির্বাচনী আঁতাত। বিএনপির যারা থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, বুদ্ধিজীবী, তাদের কেউ কেউ বলছেন, সংগ্রাম কমিটি করতে হবে। তারা সহিংসতায় প্রত্যক্ষ মদদ দিচ্ছেন। ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমে বোমা মারার কথা বলছেন। কিংবা যে মাত্রায় বোমা-ককটেল মারা হচ্ছে, তা বাড়ানোর কথা বলছেন। কিন্তু এ সহিংসতা কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়। বোমা মেরে আন্দোলন জোরদার কেবল নির্বাচনের সময় কি ধরনের সরকার থাকবে তার জন্য নয়। এর বড় কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানো।

সমকাল : কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তো জুনিয়র পার্টনার। তাদের ভোট সংখ্যাও খুব বেশি নয়।

সলিমুল্লাহ : আমরা জানি, খাদ্যের পরিমাণ বেশি হলেও ক্ষতি হয় না; কিন্তু সামান্য বিষও ক্ষতির কাজটা করে বেশি। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নিন্দা করে প্রস্তাব পাস হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে এর অঙ্গীকার করেছিল। এ দলের সাধারণ সম্পাদক  সৈয়দ আশরাফ বলেছেন, আমরা যে আন্তরিক তার প্রমাণ রেখেছি। তারা বিচার করে প্রমাণ করল যে, এতদিন বিচার হয়নি।

সমকাল : পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রস্তাব প্রসঙ্গে বলছিলেন…

সলিমুল্লাহ : যুদ্ধাপরাধের বিচার যে প্রকৃতই আমাদের জাতীয় ইস্যু এক বা দুটি দলের নয় সেটা এ ঘটনায় প্রমাণ হয়ে গেল। ওই দেশের সবাই কাদের মোল্লার ফাঁসির নিন্দা হয়তো করছে না। কিন্তু যারা বাংলাদেশকে উপনিবেশ বানাতে চেয়েছিল, তারা পরাজয়ের ৪২ বছর পরও ক্ষোভ প্রশমিত করেনি। যারা ১৬ ডিসেম্বরের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল কিংবা যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারত হয়ে দেশে ফিরেছিল, তাদের বিচার তারা করেনি। এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচারেও হস্তক্ষেপ করছে। তাদের এ পদক্ষেপ দুর্ভাগ্যজনক। যদি বিশ্ব সভ্যতার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়, তাহলে ন্যূনতম ন্যায়বোধ ও আন্তর্জাতিক নিয়মের তোয়াক্কা করতে হয়। তারা সেটা করছে না।

সমকাল : সা¤প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আস্তিকতা ও নাস্তিকতা ইস্যু সামনে আনা হয়েছে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?

সলিমুল্লাহ : ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশের মতো ভোট পেয়েছিল। আসন পেয়েছিল ৯৯ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের আসন ছিল না; ভোট ছিল। গত চার দশকে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে অনেক পানি প্রবাহিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা হারায়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। তবে তারা নিষ্পাপ নয়। ২১ বছর পর তারা ক্ষমতায় ফিরে আসে। কিন্তু এই সময়ে দেশের যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। যারা মুজিবকে হত্যা করেছে; জিয়াউর রহমান তাদের ‘ইনডেমনিটি’ দিয়েছেন। গণভোট করেছেন। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী করেছেন। ইসলামের নামে পাকিস্তানি ধারা ফিরিয়ে এনেছেন। এখন খালেদা জিয়া গণজাগরণ মঞ্চের তরুণদের বলছেন, ‘ওই সব ছেলেমেয়ে নাস্তিক।’ হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর একই সুর। শাহবাগে ঘোষিত কোনো নাস্তিক ছিল না। কিছু ব্লগার, যারা নাস্তিকতার প্রচার করেছে, তাদের কেউ কেউ সেখানে ছিল বলে বিএনপি বলছে। ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাহানারা ইমাম গণআদালত গঠন করেছিলেন। সেখানে আহমদ শরীফের মতো ঘোষিত নাস্তিকেরা ছিলেন। এবারে কেউ তেমন ছিলেন না। নাস্তিকতার সংজ্ঞা কি — এটা কেউ স্পষ্ট বলছে না। কিন্তু এ অভিযোগ শাহবাগে অংশগ্রহণকারীদের ওপর আরোপ করা হয় এবং এটাই জামায়াত-হেফাজত-বিএনপির ঐক্যের ভিত্তি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় পাকিস্তান বলত — ৬ দফা, ১১ দফা কায়েম হলে পাকিস্তান থাকবে না। আর জামায়াতে ইসলামী বলত, ইসলাম থাকবে না। কারণ, ৬ দফা হলে পাকিস্তান থাকবে না। পাকিস্তান না থাকলে ইসলাম থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ পুরো স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। ২৫ মার্চেও ধারণা ছিল পাকিস্তানের সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে আপস হতে পারে। কিন্তু ৬ দফা মানা হলে পাকিস্তান থাকবে না — এই যুক্তিতে ২৫ মার্চ চালানো হয় নৃশংস অভিযান। তারা বুদ্ধিজীবী মারেনি; নাস্তিক মেরেছে। পাকিস্তান এবং জামায়াতে ইসলামী বলেছে — ১৪ ডিসেম্বর যাদের মারা হয়েছে তারা নাস্তিক এবং পাকিস্তানবিরোধী। এখন নাস্তিক ইস্যু তুলে কার্যত সেই অপরাধই স্বীকার করে নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। তারা ভালো করেই জানে যে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোক নাস্তিক নয়। এটা কেবল পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা। তারা আন্দোলনের জন্য মিথ্যাচার করছে। ফরহাদ মজহার নিজেই ‘এবাদতনামা’য় বলেছেন, ‘আমি নাস্তিক’। এটা এখনও বাজারে আছে। তিনি শাহবাগের আন্দোলনকারীদের যারা নাস্তিক বলেন, তাদের পাশে রয়েছেন।

সমকাল : কেন এ মিথ্যাচার?

সলিমুল্লাহ : হিটলারের প্রচার সচিব গোয়েবল্স বলত — একটা মিথ্যা হাজার বার বললে মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়। তারা সেটা সত্য বলে মানে। যুদ্ধে জয়ী হতে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া চলে। মিথ্যা কে বলছে — তার প্রমাণ মাহমুদুর রহমান, আদিলুর রহমান। ৫ মে রাতের অন্ধকারে বাতি নিভিয়ে শাপলা চত্বরে ‘হাজার হাজার লোক’ শেখ হাসিনা মেরেছেন — এমন কথা বলা হয়। কিন্তু যে রাতে শাপলা চত্বরে একজন লোকও মারা যায়নি, সেখানে ‘হাজার হাজার মৃত্যু’ ঘটেছে এটা কি করে কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন লোক প্রচার করতে পারেন? ৫ মে দিনে কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। ৬ মে নারায়ণগঞ্জ ও ডেমরা এলাকাতেও কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। যে কোনো সাংবাদিক এটা যাচাই করতে পারেন। অধিকারের আদিলুর রহমান বলেছেন, ‘৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে শাপলা চত্বরে।’ এটা হচ্ছে হোমমেড। গোয়েবল্সের মতো প্রচারণা। রাজনীতিকরা জনগণের উপকারের জন্য দু-একটা মিথ্যা বলতে পারেনথ এটা প্লেটো বলেছিলেন। কিন্তু শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে যেভাবে মিথ্যাচার হয়েছে, তা রাষ্ট্রের ভিত ধসিয়ে দিতে পারে।

সমকাল : এখন উত্তরণের পথ কি?

সলিমুল্লাহ : সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তবে মনে রাখা চাই, একটা বৃত্তের পরিধি থেকে বৃত্তের কেন্দ্রে পৌঁছাতে অগণিত ব্যাসার্ধ টানা যায়। এখন সরকার যে কায়দায় উত্তরণ চাইছে, সেটা সঠিক কি-না — এ প্রশ্ন আমারও। বিএনপি বড় দল। অনেক সমর্থক রয়েছে। কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছে। সরকার তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুতে ঐকমত্যে আনার চেষ্টা করতে পারত। উভয় দলের শ্রেণীস্বার্থ এখন মোটামুটি অভিন্ন। উভয় দল যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য প্রতিযোগিতা করে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উভয় দল সংকটের জন্য সমান দায়ী। এভাবে তারা সমদূরত্ব বজায় রাখতে চাইছেন। এর কারণ আছে। আওয়ামী লীগ অসহিষ্ণু দল। সিপিবি-বাসদ — তারা যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্তদের বিচার চায়। পদ্ধতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে দ্বিমত। আওয়ামী লীগ পশ্চিমা শক্তিকে খুশি করতে চায়। সিপিবির মতো বামপন্থিরা এতে নাখোশ। এভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সিপিবির মধ্যে এই ইস্যুতে স্ববিরোধিতা রয়েছে। সিপিবির কর্মীদের মধ্যেও সরকারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব সৃষ্টিতে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারও তাদের কাছে টানতে তেমন সচেষ্ট নয়।

সমকাল : সরকার বলছে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা।

সলিমুল্লাহ : ১৯৪৭ সালেও এ যুক্তি ছিল। আমরা ব্রিটিশ মডেলের গণতন্ত্র গ্রহণ করেছি। পাকিস্তান ইসলামী প্রজাতন্ত্র ছিল। আমরা করেছি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এইচএম এরশাদের পতনের সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা সামনে আসে। তিন জোট প্রথমে প্রধান বিচারপতিকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেয়। তারপর এরশাদ পদত্যাগ করেন এবং প্রধান বিচারপতি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। যে কোনো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা যায়। কিন্তু সামরিক শাসনের বিধান কোনো সংবিধানে নেই। এটা হলে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করে জনসমর্থন হারিয়েছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর ফের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। জনমত বদলায়। আমি মনে করি, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে জনমত সুইং করছে। সা¤প্রতিক সহিংসতা আওয়ামী লীগ সরকারের জনসমর্থন বাড়াচ্ছে। জনমত সহিংসতার বিরুদ্ধে। বিএনপির উচিত সহিংসতা থেকে সরে এসে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। তবে এই দুই দলের বাইরেও আরও শক্তি রয়েছে সমাজে। প্রকৃতপক্ষে এখন যা চলছে দেশে, সেটা হচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থার সংকট।

সমকাল : কিভাবে এর ব্যাখ্যা দেবেন?

সলিমুল্লাহ : নির্বাচনে শ্রমিক ও কৃষকদের সঙ্গে সর্বদাই প্রতারণা করা হয়। নির্বাচনে অনেক ত্রুটিও থাকে। আমরা সবটা জানতে পারি না। কেবল তখনই তা প্রকাশ পায়, যখন বড় দলগুলো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ করতে থাকে। এ ব্যবস্থা যে নিরপেক্ষ নয়, সেটা দুই দল স্বীকার করে। উত্তরণের পথ হচ্ছে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। হয়তো গরিবের কথা বাসি হলে ফলতে পারে।

সমকাল : কিভাবে এ সংস্কার চাইছেন?

সলিমুল্লাহ : রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ। নির্বাহী বিভাগ, আইন প্রণয়ন বিভাগ বা সংসদ এবং বিচার বিভাগ। কেউ কারও ওপরে নয়; বরং সার্বভৌম। বাংলাদেশের সংবিধানে প্রথমে নির্বাহী বিভাগের কথা রয়েছে, তারপরে আইনসভা এবং তারও পরে বিচার ব্যবস্থা। সংবাদপত্র বামে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপে, ডানে থাকে বিরোধী নেতার। এ দিয়ে তাদের অবস্থান বোঝানো হয়। সংবিধানেও কোনটা আগে এবং কোনটা পরে, সেটা যেভাবে রয়েছে তা অকারণ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথমে রয়েছে কংগ্রেস, তারপর প্রেসিডেন্ট এবং তৃতীয় স্থানে বিচার ব্যবস্থা। আমাদের এখানে বিচার ব্যবস্থা তৃতীয় স্থানে থাকলেও সার্বভৌম ক্ষমতার দিক থেকে সমান। আইনসভায় প্রণীত আইন সংবিধানসম্মত কি-না — সে ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেন এবং সংবিধানবহির্ভূত ঘোষণা করতে পারেন। বর্তমান সংকটের সমাধানের জন্য নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। এটি সাংবিধানিক সংস্থা। বিচার বিভাগও সাংবিধানিক সংস্থা। নির্বাচকালীন সরকারের দায়িত্ব বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা যায়। একজন প্রধান বিচারপতি এবং দু’জন সাবেক বিচারপতি অতীতে এ দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ৫ বছর। তাদের মেয়াদ বিচার বিভাগের মতো করা যায়। বিচার বিভাগের বিচারপতির মতো দীর্ঘ করা যায়। বিচার বিভাগের রাজনীতিকরণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারপরও তাদের নিরপেক্ষতা আমরা মেনে নিই। নির্বাচন কমিশনের শক্তি বাড়ানো বর্তমান সংবিধানে সম্ভব নয়। তাদের নিয়োগ পদ্ধতিতে সমস্যা রয়েছে। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে ফর্মুলা করেছিলেন, তাদের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। ধারণায় ত্রুটি ছিল। নির্বাচনকালে নিরপেক্ষ প্রশাসক চাওয়া হয়েছে। একজন নিরপেক্ষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার না পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ প্রধান উপদেষ্টা কি করে খুঁজে পাব? খালেদা জিয়া বলেছিলেন, পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়। নিরপেক্ষতার বিষয়টি আপেক্ষিক — প্রকৃতপক্ষে উভয় দলের সম্মতি বা সম-মতি।

সমকাল : আপনি কি তিনটি অঙ্গের মতো চতুর্থটি চাইছেন?

সলিমুল্লাহ : ঠিক তাই। নির্বাচন কমিশনকে এর সঙ্গে যুক্ত করা। আমরা বলি নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। কিন্তু নির্বাচন এলেই তারা নির্বাহী বিভাগের অধীন হয়ে যায়। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন করা সম্ভব। কিন্তু এজন্য সংবিধানে ব্যবস্থা রাখা চাই।

সমকাল : দেশবাসী আশার আলো দেখতে চায়। এত হানাহানি, রক্তপাত…।

সলিমুল্লাহ : উন্নত দেশগুলোর কেউ কেউ বলে গভর্ন্যান্স। কেউ কেউ এর সঙ্গে গুড শব্দ যোগ করে। আমাদের দেশের শাসন পদ্ধতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন। অনেকেই বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। কিন্তু এজন্য তাদের সবাই ত্রয়োদশ সংশোধনী পুরোপুরি মানতে চায় না। বিএনপি কৌশলগত কারণে বিষয়টি স্পষ্ট করে না। তারা নির্বাচনকালীন সরকারে শেখ হাসিনাকে রাখতে চায় না। রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার কিংবা এ কে খন্দকারের মতো কাউকে এ দায়িত্ব দিতে চায়। এটা হচ্ছে মর্যাদার লড়াই। এর মধ্যে তত্ত্ব নেই, নীতি নেই। কেবলই মর্যাদার লড়াই। হাসিনা ছাড়া যে কাউকে মেনে নিতে তারা রাজি। এভাবে প্রকারান্তরে তারা পঞ্চদশ সংশোধনী মেনে নিচ্ছে। এ সংশোধনী অনুযায়ী সংসদ এখনও বহাল রয়েছে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে অন্য কাউকে ক্ষমতা দিতে হলে অসাংবিধানিক পন্থা অনুসরণ করতে হবে। বিএনপি গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করছে। কিন্তু তারা ভরসা করছে জামায়াতে ইসলামীর ওপর। তারা রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে যা করছে, সেটা অপরাধ। রাষ্ট্র এ সহিংসতা থামাতে পারছে না। এটা তাদের ব্যর্থতা।

সমকাল : কেউ কেউ তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ বাড়াতে বলেন?

সলিমুল্লাহ : কিছু লোক নিজেদের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় দেখতে চান। বর্তমান সংকটে অনেকে উল্লসিত। সামনে তারা সুদিন দেখেন। বিয়োগ চান। কিন্তু বিয়োগ যে বিয়োগান্ত হতে পারে — সেটা ভাবেন না। আমাদের এখন যুক্তরাষ্ট্রকে তৎপর দেখতে হয়। ভারত ও পাকিস্তান তৎপর। চীন তৎপর। জাতিসংঘ তৎপর। কিন্তু এভাবে রাজনীতির সমস্যার সমাধান নেই।

সমকাল : যেভাবে নির্বাচন হচ্ছে, কি বলবেন?

সলিমুল্লাহ : সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রশ্ন তোলা হলে কে আপত্তি করবে? প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ না এলেও নির্বাচন হতে পারে। হতেই হবে — এ বিষয়ে সাংবিধানিক ধারা দুর্বল। জামায়াতে ইসলামী যদি একাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করত, তা হলে পাত্তা পেত না। কিন্তু ১৯৭০ সালেও আওয়ামী লীগ ৮০ শতাংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। ২০ শতাংশ বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। এরা বাংলাদেশে রয়েছে এবং নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে। কেন শক্তি বাড়ল? এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দায় রয়েছে। তারা ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঐক্যকে ধরে রেখে নতুন সরকার গঠন করতে পারত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন আইনি বৈধতা পেয়েছি। তখন আওয়ামী লীগ ছাড়াও মওলানা ভাসানী, মণি সিংহ, মোজাফফর আহমদকে বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে নেওয়া হয়েছিল। বাকশাল করা হলো অনেক দেরিতে। তুরস্কে মোস্তফা কামাল পাশা ২০ বছর জাতীয় ঐক্যের সরকার পরিচালনা করেছেন। কেবল সমাজতান্ত্রিক দেশে নয়, জাতীয়তাবাদী বিপ্লবেও এ ধরনের সরকার হতে পারে।

সমকাল : ফের উত্তরণের প্রশ্নে আসছি…।

সলিমুল্লাহ : কয়েকভাবে হতে পারে। শেখ হাসিনা পাঁচ বছর টিকে থাকতে পারেন কিংবা ষষ্ঠ সংসদের মতো দশম সংসদের মেয়াদ হতে পারে দেড় মাস বা আরও কয়েক মাস বেশি। এ নির্বাচন সব সমস্যার সমাধান দেবে না। আরেকটির জন্য সবাইকে প্রস্তুত হতে হবে। তা হলে সম্পদের এত অপচয় কেন — সে প্রশ্ন করা হতেই পারে। কেউ মজা করে বলেন, ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হওয়ায় রাষ্ট্রের ব্যয় কমল। কিন্তু রাষ্ট্রের ভাগ্য নিয়ে মজা করা চলে না। সরকার পরিবর্তনের অনেক পথ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে এটা করাই নানা দিক থেকে শ্রেয়। অন্য পথ যে খারাপ — সেটা বোধ করি বিএনপিও জানে। সেটা তারা কিন্তু ১৯৯০ সালে এইচএম এরশাদকে অপসারণের সময়েও প্রমাণ রেখেছে। আওয়ামী লীগও করেছে।

সমকাল : আপনাকে ধন্যবাদ।

সলিমুল্লাহ : সমকাল পাঠকদের শুভেচ্ছা। দেশের মঙ্গল হোক।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অজয় দাশগুপ্ত

১৯৭১ : কবি জসীমউদ্দীনের সাক্ষ্য–সলিমুল্লাহ খান

 

১৯৭১ সালের ছায়া বাংলাদেশের সাহিত্যে কতদূর পর্যন্ত পড়িয়াছে তাহা এখনও পর্যন্ত সঠিক পরিমাপ করা হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ কবি জসীমউদ্দীনের কথা পাড়া যায়। এই মহান কবি ১৯৭১ সালেও বাঁচিয়া ছিলেন। সেই বাঁচিয়া থাকার অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ একটি ক্ষীণকায় কবিতা সংকলনও ছাপাইয়াছিলেন।

স্বীকার করিতে হইবে, এই কবিতা সংকলনের খবর অনেকেই রাখেন না। যাঁহারা রাখেন তাঁহারাও রাখিতে বিব্রত বোধ করেন। জসীমউদ্দীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়কে দ্বিতীয় দলের দৃষ্টান্তস্বরূপ স্মরণ করা যায়। তিনি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র সংকলন প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন, ‘বিশেষ উদ্দেশ্যমূলকতার দায় বহন করতে গিয়ে কবিতার প্রাণশক্তি এখানে যে দারুণভাবে পীড়িত হয়েছে তা না মেনে উপায় নেই।’

১৯৭১ সালের প্রায় তিরিশ বছর আগে — ১৯৪০ সালে — অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দুঃখ করিয়াছিলেন নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও সৃজনীপ্রতিভা অল্পদিনেই শেষ হইয়া গিয়াছিল। ইহার কারণ কি দেখাইতে গিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও ‘মানস সংগঠনে’ কোন রূপান্তর হয় নাই। নজরুল ইসলামের কবিতায় যে বিপ্লবধর্ম তাহা পুরাতন ঐতিহ্যের পুরুজ্জীবন ঘটাইয়াছে কিন্তু কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হতে পারে নাই। আর জসীমউদ্দীনের কাব্যসাধনায় সিদ্ধি আসিয়াছিল দেশের ‘গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি’ হইতে। হুমায়ুন কবিরের মতে, তিনিও কল্পনা আর আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে বিশেষ অগ্রসর হইতে পারেন নাই। দুই বড় কবির কথা মনে করিয়া হুমায়ুন কবির আক্ষেপ করিয়াছিলেন, ‘আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।’

কবি জসীমউদ্দীন

কবি জসীমউদ্দীন

১৯৪০ সালে যে দশক শুরু হইয়াছিল সেই দশক নাগাদ বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তর্গত কবি ও সাহিত্য সাধকেরা মোটের উপর তিন ভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছিলেন। একভাগে ছিলেন সংরক্ষণশীলরা। ইহাদের সম্পর্কে হুমায়ুন কবির জানাইয়াছিলেন, “তার ঝোঁক অতীতের দিকে, তার ধর্ম প্রচলিত ব্যবস্থার সংরক্ষণ। ইসলামের অন্তর্নিহিত সামাজিক সাম্যকেও তা ব্যাহত করে।” ইহার ফলে বাংলার মুসলমান সমাজ যেমন ‘অনিশ্চিত মতি’ তেমনি ‘গতিহীন’ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীলরা। ইঁহারা স্রোতের বিরুদ্ধে পুরাতন বন্দরে ফিরিয়া যাইতে চাহিতেন। অসম্ভবের পায়ে আত্মনিবেদন বৃথা জানিয়াও ইঁহারা সমাজ মানসের সমস্ত উদ্যম সেই অসম্ভবের পায়ে উৎসর্গ করিয়াছিলেন।

সবশেষে ছিলেন আরেক দল ইঁহারা সংখ্যায় ও শক্তিতে দুর্বলতম। ইঁহারা ভবিষ্যতের সাধক। এই দলের কথা মনে রাখিয়াই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, ‘ভবিষ্যতের অভিযানে আশঙ্কা থাকতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনা আরো বেশি, অথচ আজো বাঙালি মুসলমানের যৌবন সে দুঃসাহসিকতায় বিমুখ।’

হুমায়ুন কবির এই তৃতীয় ভাগের উপরই ঈমান আনিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘সমস্ত পৃথিবীতে বর্তমানে যে আলোড়ন, তারও নির্দেশ ভবিষ্যতের দিকে। সেই প্রবাহ যদি বাঙালি মুসলমানকে নূতন সমাজসাধনার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, তবে মুসলমান সমাজসত্তার অন্তর্নিহিত ঐক্য ও উদ্যম দূর্বার হয়ে উঠবে, বাঙলার কাব্যসাধনায়ও নতুন দিগন্ত দেখা দিবে।’ হুমায়ুন কবিরের এই আশা ও আশীর্বাদ সত্য হইয়াছিল ১৯৭১ সাল নাগাদ। বাংলার কাব্যসাধনায় নতুন দিগন্ত দেখা দিয়াছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ প্রভৃতি কবির জন্মের পর।

জসীমউদ্দীনের কবিতা এই তিনভাগের মাপে বিচার করিলে দেখা যায় একই সাথে দুই ভাগ জুড়িয়া বিরাজ করিতেছিল। তাঁহার কবিতাকে আকারের দিক হইতে দেখিলে সংরক্ষণশীল ভাগে দেখা যায়। অথচ বাসনার বিচারে তাঁহাকে তৃতীয় ভাগে ফেলা যায়। এই স্ববিরোধ আমলে লইয়াই হুমায়ুন কবির ১৯৪০ সালে লিখিয়াছিলেন, “সা¤প্রতিক বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাদের নাই, সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনা বিমুখ।”

ইতিকথার পরেও একটা কথা থাকে। কথায় বলে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। বাংলাদেশের পুরাতন আঙ্গিকের চৌহদ্দির মধ্যেও জসীমউদ্দীনের প্রাণশক্তি পুরাপুরি নিঃশেষিত হইয়া যায় নাই। তাহার প্রমাণ ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা লইয়া লেখা এই ক্ষীণকায় — সুনীলবাবুর ভাষায় ‘জসীম উদ্দীনের ক্ষুদ্রতম’ — কাব্যগ্রন্থেও মিলিতেছে।

এই গ্রন্থে ‘বঙ্গ-বন্ধু’ নামে একটি কবিতা আছে। তাহার নিচে তারিখ  দেওয়া আছে ১৬ মার্চ ১৯৭১; এই কবিতার উপর মন্তব্য করিতে বসিয়া সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় লিখিয়াছেন, ‘এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব এই বঙ্গবন্ধু, যাঁর হুকুমে অচল হয়ে গিয়েছিল শাসকের সকল নিষ্পেষণ যন্ত্র, বাঙালী নরনারী হাসিমুখে বুকে বুলেট পেতে নিয়েছিল শোষক সেনাবাহিনীর।’ কথাটি মিথ্যা নহে। জসীমউদ্দীনের শ্লোকে:

তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালী মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।

জসীমউদ্দীন বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের আরও একটি জয়ের কথা বলিয়াছেন যাহা বিশারদ অধ্যাপকদের দৃষ্টি এড়াইয়া গিয়াছে। যাহা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন করিতে চাইয়াছিলেন কিন্তু পারেন নাই বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান তাহা পারিয়াছেন। হিন্দু ও মুসলমানকে তিনি প্রেম-বন্ধনে মিলাইয়াছেন। যাহা মহাত্মা মোহনদাস গান্ধী জীবন দান করিয়াও পারেন নাই, তিনি তাহা সম্ভব করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন:

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশবন্ধুর শান্ত মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তারিখ দিয়া লিখিত একটি কবিতার নাম ‘কবির নিবেদন’। তাহার কয়েক পঙক্তি:

প্লাবনের চেয়ে — মারীভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ
নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ
প্রতিদিন এরাঁ নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়
তৈমুর লং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পোড়ামাটি নীতির একটি প্রতীক ধামরাই রথে আগুন। জসীমউদ্দীন পাকিস্তানের রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর কীর্তিস্তম্ভস্বরূপ এই ধামরাই রথ ভস্মীভূত করিবার কাহিনী লিখিয়া রাখিয়াছেন। এই কবিতা হইতে অংশবিশেষ বাছিয়া লওয়া সহজ কর্ম নহে।

বছরে দুবার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা
কোথাও গাজীর গানের আসরে ওখালের মধুর সুরে
কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।
শ্রোতাদের মনে জাগায়ে তুলিত কত মহিমার কথা,
কত আদর্শ নীতির ন্যায়ের গাথিয়া সুরের লতা।
পুতুলের মত ছেলেরা মেয়েরা পুতুল লইয়া হাতে,
খুশীর কুসুম ছড়ায়ে চলিত বাপ ভাইদের সাথে।
কোন যাদুকর গড়েছিল রথ তুচ্ছ কি কাঠ নিয়া,
কি মায়া তাহাতে মেখে দিয়েছিল নিজ হৃদি নিঙাড়িয়া।
তাহারি মাথায় বছর বছর কোটি কোটি লোক আসি
রথের সামনে দোলায়ে যাইত প্রীতির প্রদীপ হাসি।
পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ,
এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্ম শেষ।
শিল্পী হাতের মহা সান্তুনা যুগের যুগের তরে
একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে।

এই কবিতার নিচে তারিখ লেখা আছে ১৬ মে ১৯৭১।

১৯৭১ সালে জসীমউদ্দীনের বয়স প্রায় সত্তর বছর ছুঁই ছুঁই করিতেছে। তাঁহার সৃষ্টিক্ষমতাও ততদিনে নিঃসন্দেহে কমিয়া আসিতেছে। তবু ধন্য আশা কুহকিনী। দেশ স্বাধীন হইয়াছে। কবি গাহিতেছেন:

ঝড়ে যে ঘর ভাঙিয়া গিয়াছে আবার গড়িয়া নিব

ঝড়ের আধারে যে দীপ নিভেছে আবার জ্বালায়ে দিব।

ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যগ্রন্থের মলাট

ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে কাব্যগ্রন্থের মলাট

এই ধরনের সরল পঙক্তি পড়িবার বহু আগেই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।” কাব্যসাধনার প্রকরণে ইহা সত্য হইলেও কাব্যের ‘নিরাকারে’  কোথায় যেন একটা দুর্মর নাদ আছে যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট ছিল পাকিস্তানের শেষ স্বাধীনতা দিবস। সেদিন জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন সেই অপ্রকাশের বেদনা।

আজি আজাদীর এ পুত দিবসে বার বার মনে হয়

এই সুন্দর শ্যাম মনোহরা এ দেশ আমার নয়।

এই বেদনা নিঃসন্দেহে পুনরাবৃত্তির অযোগ্য।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণে সংগঠিত সংগ্রামী সংগঠন বাংলাদেশ  লেখক শিবির ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘হে স্বদেশ’ নামে তিনটি সংকলন প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাদের কবিতা সংকলনে জসীমউদ্দীনের একটি কবিতা দেখা যায়। নাম ‘একুশের গান’; কবিতাটি যখন লেখা হইয়াছিল উল্লেখ নাই। কবিতার অন্তর্গত সাক্ষ্য হইতে অনুমান করি ইহার রচনাকাল ১৯৫২ সালের কাছাকাছি কোন এক সময় হইবে। কারণ তখন পূর্ববঙ্গ প্রদেশের জনসংখ্যা চার কোটি বলিয়াই প্রসিদ্ধ ছিল।

আমি কবিতাটির দোহাই দিয়া শেষ করিতেছি। ইহার যে রূপকল্প তাহাতেও জসীমউদ্দীনের শক্তি তাজা বোমার মত বিস্ফোরিত হইয়াছে। ‘একুশের গান’ কবিতাটিতে মোট বাইশটি পঙক্তি দেখা যায়। টুকরা টুকরা উদ্ধার না করিয়া আমি গোটা কবিতাটি ছাপাইয়া দিতেছি।

আমার এমন মধুর বাঙলা ভাষা

ভায়ের বোনের আদর মাখা

মায়ের বুকের ভালোবাসা।

এই ভাষার রামধনু চড়ে

সোনার স্বপন ছড়ায় ভবে

যুগযুগান্ত পথটি ধরে

নিত্য তাদের যাওয়া আসা।

পূব বাংলার নদীর থেকে

এনেছি এর সুর

শস্যদোলা বাতাস দেছে

কথা সুমধুর।

বজ্র এরে গেছে আলো

ঝঞ্ঝা এরে দোলদোলালো

পদ্মা হলো সর্বনাশা।

বসনে এর রঙ মেখেছি

তাজা বুকের খুনে

বুলেটেরি ধূম্রজালে

ওড়না বিহার বুনে।

এ ভাষারি মান রাখিতে

হয় যদি বা জীবন দিতে

চার কোটি ভাই রক্ত দিয়ে

পূরাবে এর মনের আশা।

অধিক মন্তব্য করিব না। শুধু লক্ষ্য করিব ‘দেছে’ শব্দের ব্যবহার। আরো শব্দের মধ্যে আছে ‘এরে’। সবচেয়ে দুর্র্ধষ রুপকল্প ‘ওড়না বিহার’ — ‘বুলেটের ধূম্রজালে ওড়না বিহার বুনে’। ইহাকে অসাধারণ বলিলে কমই বলা হয়। এই রকম আরেকটি শ্লোক পাইয়াছিলাম “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে” কবিতা সংকলনের ‘জাগায়ে তুলিব আশা’ কবিতায়। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন:

শোন ক্ষুধাতুর ভাইরা বোনেরা, উড়োজাহাজের সেতু

রচিত হইয়া আসিছে আহার আজি(কে) মোদের হেতু।

স্বীকার করিব রূপকল্প পরিচয়ে ‘উড়োজাহাজের সেতু’ ‘ওড়না বিহার’ বা উড়ন্ত ধর্মাশ্রমকে ছাড়াইয়া যায় নাই।

দোহাই

১। জসীমউদদীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (ঢাকা : নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৭২)।

২। হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০১২)।

৩। সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন, ৩য় সংস্করণ। (ঢাকা: নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, ১৯৮৮)।

৪। বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত , হে স্বদেশ : কবিতা (ঢাকা : বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২)।কোথাও গাজীর

‘আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই’– আহমদ ছফা

 

মহাত্মা আহমদ ছফার এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হইয়াছিল বাংলা ১৩৯৯ সালের ২৩ শ্রাবণ তারিখে ‘বাংলাবাজার পত্রিকা’ নামক একটি দৈনিকে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিয়াছিলেন সাংবাদিক রাজু আলাউদ্দিন ও জুলফিকার হায়দার। ‘সর্বজন’ পত্রিকার জন্য ইহা সংগ্রহ করিয়াছেন সৈয়দ মনজুর মোরশেদ। আমরা তাঁহাদের সকলের ঋণ স্বীকার করিতেছি।

আহমদ ছফার তুলনা আহমদ ছফাই। তাঁহার লেখা যেমন অনন্য, বলাও তেমন অতুলনীয়। গোটা ছয়টি প্রশ্নের উত্তরে তিনি এখানে একটা জাতির সংকটের ছবি অনিন্দ্যসত্য ভাষায় তুলিয়া ধরিয়াছেন। তিনি গিয়াছেন সংকটের একেবারে মর্মমূলে। তিনি বলিয়াছিলেন আমাদের জাতীয় সংকটের মূলে আছে আমাদের দেশি বুদ্ধিব্যবসায়ীদের অন্তর্গত সংকট — তাঁহাদেরই চরিত্র ও দায়িত্বহীনতা। সত্যের অনুরাগে তাঁহারা অবিচল নহেন।

আহমদ ছফার মতে, ‘লেখকের কাজ হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা বিস্তৃত করা, চিন্তার সীমানাকে বিস্তৃত করা।’ তিনি মনে করেন সত্য উদঘাটনই লেখকের কাজ কারণ ‘সত্যই একমাত্র মানুষকে উদ্ধার করতে পারে।’ বাংলাদেশে একমাত্র আহমদ ছফার পক্ষেই বলা সম্ভব ছিল, ‘আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই’।

‘বাংলাবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশের সময় এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম সরবরাহ করিয়াছিলেন সাংবাদিক বন্ধুরা। তাঁহাদের দেওয়া শিরোনাম ছিল কঠিন: ‘আহমদ ছফা: প্রজ্ঞার আলো’; আমরা নতুন কোমল নাম রাখিলাম: ‘আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই’; বলা বাহুল্য, আমরা আহমদ ছফারই মুখনিসৃত একটি অমৃত হইতে এই নামটি লইয়াছি।

সলিমুল্লাহ খান

১ ডিসেম্বর ২০১৩

বাংলাবাজার পত্রিকা: কম্যুনিজমের বিপর্যয়কে আপনি কিভাবে দেখেন?

আহমদ ছফা: যখন কম্যুনিজম ছিল তখন থার্ড ওয়ার্ল্ডের মানুষের সামনে একটা অপশন ছিল। এটা ছিল এরকম যে আমরা পশ্চিমা সমাজব্যবস্থার বাইরেও অন্যরকমভাবে আমাদের সামাজিক সমস্যাবলি সলভ করার চেষ্টা করতে পারি। এই বিশ্বাসটাকে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

সুতরাং এখন আমাদের জন্য দরকার একধরনের বিকল্প উপায়। সমগ্র অবস্থাটাকে একেবারে অন্যরকম চিন্তাচেতনা দিয়ে ভাবতে হবে। এটা করতে না পারলে যা হবে [তা অভাবনীয়]। যেমন এই সন্ত্রাসের সৃষ্টি। এখন বাংলাদেশে এমন একটি অবস্থা এসেছে — আমি তো মনে করি এ সময়ে ঐসব এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনগুলো একেবারে দুই বছরের জন্য বন্ধ করে দেয়া উচিত। বন্ধ করে দেয়া হোক। বন্ধ করে দিয়ে এই মাস্টার এবং ছাত্র সবাইকে গ্রামে পাঠানো হোক। তাহলে এই সন্ত্রাসটা বন্ধ করা যাবে। আর ইউনিভার্সিটিগুলো তো এমনিতেই বন্ধ থাকে। মাস্টাররা তো না পড়িয়েই মাইনে পাচ্ছে। সুতরাং এইসব শিক্ষিত মাস্টার ও ছাত্রদেরকে গ্রামে পাঠিয়ে গণশিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হোক। এক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পেছনে তাদের বাবা-মা প্রচুর টাকা খরচ করে, তার পরেও বছরে একটা ছেলের পেছনে সরকারের বিরাট অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। এই ছেলেরা যদি এভাবে মারামারি করতে থাকে — ব্যাটারা বন্ধ রাখুক এক বছর। বন্ধ রেখে সংশোধন করুক।

এখন এই রোগ এতই জটিল হয়ে গেছে যে, মাস্টাররাও সংক্রমিত হয়ে গেছে। সুতরাং এক বা দুই বছর বন্ধ রেখে সংস্কার করা হোক। এ সময়ের মধ্যে আমাদের এমফেসিস দিতে হবে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি এডুকেশনের ওপর। কারণ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা যদি শক্ত না হয় তাহলে শিক্ষার কোন বুনিয়াদ সৃষ্টি হয় না। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার প্রাইমারি স্কুল। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ কমিয়ে এটা প্রাইমারি খাতে ইনভেস্ট করা হোক। আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনা শুনলাম — এটা বন্ধ করে দিলে কি হয়? যদি ইউনিভার্সিটিতে জ্ঞানচর্চা না হয়, পবিত্রতা না থাকে, মানবতার মৌলিক শিক্ষাগুলোর চর্চা না হয় তাহলে এটা বন্ধ করে দিলে কি হয়! এমনিতেও তো পাঁচ বছরের জায়গায় বারো বছর লাগে। সুতরাং দুই বছর বন্ধ রেখে টেনশনটাকে ডিফিউজ করা হোক। ইটিজ দা বেস্ট সলুশন।

ভাস্কর: শামীম সিকদার

ভাস্কর: শামীম সিকদার

বাংলাবাজার পত্রিকা: মাঝে মাঝে তো সন্ত্রাসী ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় দুই বা তিন মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয় এবং খোলার পর আগের মতই সন্ত্রাস চলতে থাকে। সুতরাং বন্ধ করে দিলেই কি সন্ত্রাস দূর হবে?

আহমদ ছফা: এক বা দুই মাসের জন্য নয়, একদম দুই বছরের জন্য বন্ধ করে দিতে হবে। এখানে কোন ক্লাস হবে না, ইলেকশন হবে না, কোন পার্টি হবে না, নো ছাত্রলীগ, নো বিএনপি, নো জামাত এবং এই দেড় দুই লাখ ছেলেকে গ্রামে পাঠিয়ে গ্রামসংস্কার কাজে নিয়োগ করতে হবে।

বাংলাবাজার পত্রিকা: বর্তমান মুহূর্তে সরকার ও বিরোধী দল রাজনীতিতে কি ধরনের ভূমিকা রাখছে বা ভবিষ্যতে এরা দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়?

আহমদ ছফা: এটা আমি জানি না। রাজনৈতিক দলগুলো সে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যেই হোক তারা যে কাজটা করে, দেখতে হবে তার সামাজিক ডিমান্ড আছে কিনা। আজকে বিএনপি সরকারের রবীন্দ্রজয়ন্তী করার কথা না। খালেদা জিয়া রবীন্দ্রনাথ বোঝে না, [তবু তারা এটা] এ কারণেই করে যে, এটার সামাজিক ডিমান্ড আছে। সুতরাং সামাজিক ডিমান্ড হচ্ছে রাজনীতির চেয়ে বড়। আমাদের রাজনীতির বয়স কত? ৩০ বছর? কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের বয়স ১০০০ বছর।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সবচাইতে বড় গুণ হল এই, অন্যান্য লেখকরা সব সময় চলমান রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন, তিনি লিখেছেন সমাজ নিয়ে। সমাজটা হাজার বছরের, পলিটিকসটা খুব রিসেন্ট। এখানে সবাই পলিটিকস করতে চায় কিন্তু সমাজকে বাদ দিয়ে। পলিটিকস যদি সমাজকে কন্ট্রোল করে তাহলে এর ফল শুভ হয় নয়। সমাজই পলিটিকসকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে যে স্বর্গ থেকে এসে একটা [লোক] সবকিছু ঠিক করে দিয়ে যাবে তা না। আমাদের নিজেদের মধ্য থেকে একটা রেনেসাঁসের দরকার। এর আগেও একাজটি করা যে হয়নি তা না। এমনকি আকরম খাঁ বা মানিক মিয়া সাহেবও তাদের লিমিটেড ক্যাপাসিটি থেকে এটা করেছেন। এটা করার জন্য যা দরকার তা হলো মাটি ও মানুষের প্রতি আনুগত্য। কিন্তু এখন এই কাজটা কারা করবে? মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি দরকার তা তো নেই।

আধুনিক মানের যে আর্ট এটা তো নেই কারো এবং সবাই তো লোভে [পড়ে] কাজ করছে। আমাকে কবি বলুক, আমাকে সাহিত্যিক বলুক — এই যে লোকের একটা আকাক্সক্ষা এটাও এক ধরনের লোভ। এর ফলে একজন লোক নিজেকে অতিক্রম করে যাবার স্পৃহাটা হারিয়ে ফেলে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের দেশটা খারাপ দেশ নয়। আমাদের মানুষ খারাপ মানুষ নয়। কদিন আগে এক মার্কিন ভদ্রলোক এসেছিলেন, আমাদের ল এন্ড অর্ডার সিচুয়েশন নিয়ে অনুযোগ করলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম নিউ ইয়র্কের পুলিশ বাজেট কত আর ঢাকার পুলিশ বাজেট কত? নিউ ইয়র্কের পুলিশ বাজেট আমাদের জাতীয় বাজেটের আড়াই গুণ বেশি আর ক্রাইমের পরিমাণ ১০ গুণ বেশি। আমাদের দেশে চুরি-ছিনতাই হচ্ছে কিন্তু লস এঞ্জেলসে যে ঘটনা ঘটে গেল — বন্যার মত লোকজন এসে সব লুটেপুটে নিয়ে গেল — তো এদেরকে আমরা সিভিলাইজড সোসাইটি বলি কেন? আমাদেরও তো একটা সভ্যতা আছে। আমাদের যে একেবারে আশা নেই এটা ঠিক নয়।

কিন্তু এই ভাল সমাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব যাঁদের ওপর তাঁরা কি করছে? এখানকার ইন্টেলেকচুয়াল ক্রাইমের পরিমাণ শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। সুতরাং আমাদের ইন্টেলেকচুয়ালরা সমাজকে কিছু দিতে পারছেন না। একটা ক্রাইসিস চলছে। আমি নিজে চেষ্টা করে ছয়টি বাংলা উপন্যাস জার্মানিতে অনুবাদ করানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। আশ্চর্যের কথা হলো, ওখানে পাঠানোর মত ছয়টি উপন্যাস আমি পাইনি। বঙ্কিম বাংলা গদ্যে রেনেসাঁসের সূচনা করেছিলেন। কিন্তু তিনি গোঁড়া সাম্প্রদায়িক, তাঁর নাম উচ্চারণ করলেও অজু করতে হয়। তারপরও তিনি সমগ্র বাংলা গদ্যকে একটা স্টার্টিং দিয়েছিলেন। এটা আমাদের সাহিত্যে কেউ দিতে পারেননি।

বাংলাবাজার পত্রিকা: এটা কি বলা যায় যে মূল্যবান জিনিসটা পপুলারিটি পায় কিন্তু অনেক পরে?

আহমদ ছফা: মূল্যবান জিনিস পপুলার না হলেও কোন ক্ষতি নেই এবং কম লোক বোঝে বলেই এটা মূল্যবান। আমি জনপ্রিয় লেখকদের মত না লিখে কোন অন্যায় তো করিনি। লেখকের কাজ হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা বিস্তৃত করা, চিন্তার সীমানাকে বিস্তৃত করা। আর একজন লেখক তো নট নন, ফিল্ম একটর নন, রাজনৈতিক প্রচারক নন। তাঁর কাজ হচ্ছে সত্যকে উদঘাটন করা, সত্যই একমাত্র মানুষকে উদ্ধার করতে পারে। আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই।

বাংলাবাজার পত্রিকা: বাইরের সংস্কৃতির অবাধ অনুপ্রবেশকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আহমদ ছফা: জীবনানন্দ বলেছেন, ‘দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে ওঠে আমার এই বাঙ্গালীর মন’। এখন তো বাইরের পৃথিবী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই যে ডিশ এন্টেনা আসলো, সারা [পৃথিবী] ঘরের কোণে চলে এসেছে, পৃথিবীর প্রবাহগুলো তরঙ্গের মত আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আমাদের উচিত এ সময় একটি জাতীয় মানস তৈরি করা, যাতে করে পৃথিবীর তরঙ্গগুলো আমরা রিসিভ করতে পারি। কিন্তু আনফর্চুনেটলি, আমাদের দুই প্রধান নেতা ভাসানী ও শেখ মুজিব — এ দুজনের যদি আধুনিক শিক্ষার আলো থাকত! মাওলানা সাহেব ছিলেন ট্রাডিশনাল লিডার এবং শেখ সাহেব ছিলেন একেবারে জননন্দিত ব্যক্তি। রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ মুজিবের অবদান খুবই মূল্যবান। তিনি হাজার বছরের সবচাইতে মূল্যবান ব্যক্তি কিন্তু একটা রাষ্ট্র চালানোর [জন্য] যেসব বিষয়ে আধুনিক শিক্ষা দরকার ছিল, [যেমন] আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি — এগুলো তাঁর দখলে ছিল না। এই অভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। এখন যাঁরা আছেন তাদেরকে সবদিক দিয়ে আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাবাজার পত্রিকা: গণ আদালতের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?

আহমদ ছফা: গোলাম আযমের প্রতি জনগণ যে রায় দিয়েছে, এটা ঠিক আছে। খুবই ভাল হয়েছে। এটার দরকার ছিল। সরকারগুলো বছরের পর বছর যা ইচ্ছা তাই করবে! জনগণেরও একটা রায় আছে, জনগণ সেটা সাহসের সাথে জানিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একটা স্পষ্ট সীমারেখা সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু একটা বিষয়ে আমার ভয় হচ্ছে। এখন আমরা যেভাবে এগুচ্ছি তাতে গোলাম আযমকে একটা শহীদের মর্যাদা দিতে যাচ্ছি। জামাত-শিবিরকে মোকাবেলা করতে হলে একটু গভীরে যেতে হবে। এই যে পার্লামেন্টে জামাত এতগুলো সিট পেল — এটা কেন পেল? এটা তলিয়ে দেখতে হবে। যেসব অপকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে জামাত জনমনে প্রভাব বিস্তার করছে সেগুলোর পাশাপাশি পাল্টা মতামত ও বক্তব্য নিয়ে আমাদেরকে জনগণের কাছে যেতে হবে।

আমি একবার গ্রামে গিয়ে আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে দেখলাম যে সে ক্যাসেটে সাঈদীর বক্তৃতা শুনছে। আমার মনে হলো, গ্রামের অন্তঃপুর পর্যন্ত যে ব্যক্তির প্রভাব পৌঁছে গেছে তার এই জনপ্রিয়তার উৎসটা কি।

সাঈদী প্রতিটি মাহফিলে বক্তৃতার জন্য সম্মানী নেন পঁচিশ হাজার এক টাকা এবং এক বছরের আগে তাঁর শিডিউল পাওয়া যায় না। ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতা দিয়ে ও ক্যাসেটের রয়ালটি বাবদ সাঈদী যে অর্থ পায় তা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মাইকেল জ্যাকসন [তুল্য] বলা যেতে পারে। সুতরাং এসব চিন্তা করে সাঈদীর বক্তৃতাগুলো আমি একদিন ভাল করে শুনলাম।

শুনে আমার যেটা মনে হলো তা এই। সাঈদী যদি ওয়াজ না করে গান গাইতেন, তাহলেও খুব জনপ্রিয় গায়ক হতেন। দ্বিতীয়ত তাঁর বলার মধ্যে তিনি একধরনের ড্রামাটিক সাসপেন্স তৈরি করেন। তিনি একজন ভাল অভিনেতা এবং শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখার ক্ষমতা রাখেন। তৃতীয়ত নাটক বা গান শুনতে পয়সা লাগে, ওয়াজ শুনতে পয়সা লাগে না। চতুর্থত যৌন আবেদনমূলক ছায়াছবি মানুষ যে কারণে এনজয় করে, সাঈদীর বক্তৃতায় তাও রয়েছে। ওঁর বক্তৃতায় আধুনিক ব্লু-ফিল্মের উপাদান রয়েছে।

তিনি যদি একঘণ্টা বক্তৃতা করেন তার মধ্যে অন্তত দশ মিনিট থাকবে যৌনতা। পঞ্চমত ব্লু-ফিল্ম দেখার পর দর্শকের মনে এক ধরনের পাপবোধ জাগে, অন্যদিকে ওয়াজ শোনার পর মনে পূন্যের সঞ্চার হয়। সুতরাং আমি দেখলাম যে সাঈদীর জনপ্রিয়তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অতএব আমাদের যেটা উচিত ছিল তা হলো এ বিষয়ে একটা পুস্তিকা লিখে জনগণকে সচেতন করে তোলা। আমরা এটা না করে সাঈদীর বক্তৃতাসভা পণ্ড করার লড়াইয়ে নেমেছি এবং এর ফলে তাঁকে একজন স্টার বানিয়ে দিয়েছি।

শাহবাগের পর–সলিমুল্লাহ খান

2

গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে যে গণ আন্দোলন শুরু হইয়াছিল তাহার এক বছর পার হইতেছে। এই এক বছরে প্রায় এক যুগের মতন ঘটনা ঘটিয়াছে। শাহবাগে সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলন দেখা দেওয়ার পর ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও কম দেখা দেয় নাই। একটা প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনসাধারণের ধর্মানুভূতি ব্যবহার করিয়া এই আন্দোলনকে দুর্বল করা। ইহারা প্রচার করিয়াছিলেন শাহবাগের আন্দোলন নাস্তিক ছেলেপিলেদের আন্দোলন মাত্র। দ্বিতীয় ধরনের প্রতিক্রিয়াটি ছিল হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপর হামলা করিয়া সাম্প্রদায়িক উস্কানি সৃষ্টি করা। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি হয়ত আশা করিয়াছিলেন হামলার মধ্যস্থতায় প্রতিবেশী দেশের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আরো সক্রিয় করা যাইবে। দেশে দেশে দাঙ্গা বাধিয়া যাইবে। সৌভাগ্যের মধ্যে, তাহারা ষোল আনা সফল হন নাই।

এই সমস্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগী মহল মিথ্যা প্রচারণার আশ্রয় লইয়াছিল। ইহাতেই প্রমাণ তাহাদের ভিত্তি দুর্বল ছিল। এই জাতীয় মিথ্যা প্রচারণার মধ্যে সবচেয়ে জ্যান্ত মিথ্যাটি ছিল ৫ মে তারিখে মতিঝিলের জমায়েতকে কেন্দ্র করিয়া। যাহারা বলিয়াছিলেন সেদিন দিবাগত রাত্রে মতিঝিলে কমপক্ষে আড়াই হাজার মানুষ নিহত হইয়াছিলেন তাহারা কিন্তু এখনো বোবা হইয়া যান নাই।

১৯৭১ সনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা খুঁটি ছিল গণতন্ত্র বা সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার। সেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করিয়াই বাংলাদেশের জনগণ জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে অটুট ঐক্যের পরিচয় দিয়াছিল। তারপরও পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি সামরিক বলপ্রয়োগ করিয়া এই জাতির ইচ্ছাশক্তিকে খামোশ করিতে চাহিয়াছিল। পাকিস্তানের হাতে তখন হাতিয়ার ছিল একটাই — ধর্ম, পবিত্র ধর্ম এসলাম। বিপদের দিনে এসলামের দোহাই পাকিস্তানকে রক্ষা করিতে পারে নাই। কারণ খোদ ধর্মই তাহাদের পক্ষে ছিল না।

শাহবাগে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদের মোকাবেলায় দেখা যাইতেছে যুদ্ধাপরাধী পক্ষের হাতেও সেই একই ধর্মাভিমানের অতিরিক্ত কোন নতুন ন্যায়, নতুন যুক্তি ছিল না। ইহাই তাহাদের মূল দুর্বলতা। তাই তাহাদিগের আশ্রয় হইয়া দাঁড়াইয়াছিল একের পর এক মিথ্যাপ্রচার আর গুজব রটানো। তাহাতেই মনে হইতেছে শাহবাগের তরুণেরা তিষ্ঠিয়া গিয়াছেন। শাহবাগের তরুণজাতি তিষ্ঠিয়াছে প্রকৃত প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের জোরে।

শাহবাগ কি তাহা হইলে সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত হইয়াছে? উত্তরে হাঁ বলিতে পারিলে খুশি হইতাম। বাংলাদেশ কায়েম হইয়াছে শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের অনুগত থাকিয়া। বাংলাদেশকে যদি টিকিয়া থাকিতে হয় তাহাও থাকিতে হইবে একই নীতিতে অটল থাকিয়া। প্রশ্ন উঠিবে শতকরা শতভাগ গণতন্ত্র কি পদার্থ?

৫ জানুয়ারির পর দেশের রাজনীতিতে একটা আপাত-পরিবর্তন ঘটিয়াছে। গত একবছর ধরিয়া যে ধরনের হত্যা, নির্যাতন আর বলাৎকারের ঘটনা দেশে ঘটিয়াছে এই মুহূর্তে তাহাতে একটা চিড় ধরিয়াছে। এ কথা সত্য। কিন্তু সেই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর ঘটিবে না তাহা কি কেহ হলপ করিয়া বলিতে পারেন?

হত্যা, নির্যাতন ও বলাৎকার বন্ধ করিবার একমাত্র যুক্তিসঙ্গত পথ জনসাধারণের মধ্যে ন্যায়ের অনুরাগ সৃষ্টি করা। কিন্তু বিরাজমান রাষ্ট্র যদি নিজেই সেই ন্যায়ের সীমা প্রতিদিন লংঘন করিতে থাকে তবে এই রাষ্ট্রের শত্রুর প্রয়োজন পড়িবে না। সে নিজেই নিজের কবর খুড়িতে যথেষ্ট হইবে।

শাহবাগের আন্দোলনকে অনেকে লিঞ্চিঙ্গের দাবি বলিয়া গালি দিয়াছিলেন। উত্তর আমেরিকার দাক্ষিণাত্যে চার্লস লিঞ্চ বলিয়া এক দুর্বৃত্ত দাসমালিক কাল মানুষ ধরিয়া ধরিয়া বিনা ওজরে ফাঁসিতে লটকাইত। তাহা হইতে এই লিঞ্চিং নামটা আসিয়াছে। অথচ শাহবাগ বিনাবিচারে কাহারও হত্যা দাবি করে নাই। তাহারা দাবি করিয়াছিল বিচারের। অথচ এখন দেশে যে সকল বিচার-বহির্ভূত হত্যার ঘটনা অহরহ ঘটিতেছে শাহবাগ কেন তাহার বিরুদ্ধে কিছুই বলিতে পারিতেছে না? ইহাতেই শাহবাগের পেছন দরজা। এই চোরাপথেই শত্রু তাহার সর্বনাশ করিতেছে। এখানেই শাহবাগকে সাবধান হইতে হইবে। শাপলা দিয়া শাহবাগ বধ সম্পন্ন হয় নাই। সাপ দিয়া হইতে পারে।

১৯৭১ সালে যাহারা জাতির সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছিল, যাহারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের দাবিকে উপেক্ষা করিয়া হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর বলাৎকারের সহিত সহযোগিতা করিয়াছিল, তাহাদের ন্যায়সঙ্গত বিচারের জন্য জাতি ৪২ বছর অপেক্ষা করিয়াছে, বিনাবিচারে হত্যার দাবি তোলে নাই — এ কথা ভুলিলে চলিবে না। আর স্বাধীন বাংলাদেশে জাতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যাহারা প্রকাশ্যে লড়িতেছে তাহাদের বিচারের দাবিকে কেন পাশ কাটাইতে হইবে?

গত এক বছর ধরিয়া যাহারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করিবার মতলবে দেশব্যাপী হত্যা, নির্যাতন ও বলাৎকার করিয়াছে তাহাদেরও বিচারের মুখামুখি করিতে হইবে। বিচার-বহির্ভূত হত্যা কোন ওজরেই অনুমোদন করা যাইবে না। কারণ মাত্র এই নহে যে হত্যা শুদ্ধ আরো হত্যা ডাকিয়া আনিবে। মনে রাখিতে হইবে নরকের পথও মঙ্গলালোকের মোমবাতি দিয়াই সাজানো থাকে। শাহবাগের তরুণজাতি যদি আবালবৃদ্ধ জাতির বিবেক হইয়া উঠিতে চাহে তো তাহাকে শতকরা শতভাগ গণতন্ত্রের আওয়াজ তুলিতে হইবে। আর গণতন্ত্র শব্দের মধ্যেই কিনা লুকাইয়া আছে মানুষে মানুষে সমানাধিকার, মানুষের মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের দাবি।

শাহবাগের তরুণজাতি কি প্রস্তুত? ভুলিলে চলিবে না বাংলাদেশ না বাঁচিলে গণতন্ত্র বাঁচিবে না। আরো বেশি মনে রাখিতে হইবে গণতন্ত্র না বাঁচিলে বাংলাদেশও জাহান্নামে যাইবে।

শাহবাগের পর কি? অনেকেই এই প্রশ্ন তুলিতেছেন। আমরা বলিব শাহবাগের আর পর নাই। শাহবাগের পর শাহবাগই আমাদের জনগণের রক্ষাকবচ।

জেনারেল এরশাদের রাজনীতি লইয়া আহমদ ছফার দুইটি নিবন্ধ–সলিমুল্লাহ খান

 

পরলোকগত মনীষী মহাত্মা আহমদ ছফা ইংরেজি ২০০০ সালের আগায় ও ২০০১ সালের গোড়ায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে মুখ্য বিষয় করিয়া দুই দুইটি নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। লেখা দুইটি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল যথাক্রমে ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ও ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। দ্বিতীয় নিবন্ধটি প্রকাশের কিছুদিন পর তিনি পরলোকগমন করেন। বলা প্রয়োজন লেখা দুটি এখনও আহমদ ছফার রচনাবলিতে যোগ করা হয় নাই।

জীবনের শেষদিকে তিনি অনেক সময় নিজের হাতে লিখিতে পারিতেন না। কিম্বা লিখিতে চাহিতেন না। তাঁহার তিনদিকে জড় হওয়া তরুণতরুণীরা অনেক সময় শ্র“তি লিখিতেন। এখানে উৎকলিত প্রথম নিবন্ধটির শ্র“তি লিখিয়াছিলেন মেকী খীসা। দ্বিতীয় লেখাটির শেষে এমন কাহারও নাম লেখা আছে কিনা দেখা যাইতেছে না। অধুনালুপ্ত ‘আজকের কাগজ’ কর্তৃপক্ষের ঋণস্বীকার করিয়া আমরা লেখা দুটি নতুন করিয়া এখানে ছাপাইতেছি। ছাপার সময় আমরা কিছু কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধন করিয়াছি। কোন কোন জায়গায় বানানরীতির সমতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সংশোধন আবশ্যক হইয়াছে আর কোথাও কোথাও সঙ্গতিবিধানের জন্য একটা দুইটা শব্দ যোগ করা হইয়াছে। সংযুক্ত শব্দগুলি তৃতীয় বন্ধনীযোগে দেখান আছে।

 3

এই দুই নিবন্ধযোগে মহাত্মা আহমদ ছফা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গোড়ার গলদ চোখে বুড়া আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছিলেন। এই আদি গলদের প্রকাশ্য লক্ষণ বা আলামত আকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদের নাম লওয়া যায়। জেনারেল এরশাদ ১৯৮০ সালের দশকটার বলিতে গেলে প্রায় পুরাটা জুড়িয়াই বাংলাদেশ শাসন করিয়া তটস্থ রাখিয়াছিলেন। তিনি ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন একটি পূর্বঘোষিত সামরিক অভ্যুত্থানের দৌলতে। আর ১৯৯০ ইংরেজি নাগাদ একধরনের ব্যাপ্তিতে জনপ্রিয় অথচ ব্যঞ্জনায় সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মধ্যস্থতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছিলেন। তবে সকলেই জানেন সেই অভ্যুত্থানে তিনি নিহত কিম্বা নির্বাসিত কোনটাই হন নাই। তাঁহাকে কিছুদিন একটি কারাগারে রাখা হইয়াছিল।

কারাগার জায়গাটা বিশেষ সুখের জিনিশ নহে। তাই বেশিদিন না যাইতেই জেনারেল এরশাদ রাজনীতিতে ফিরিয়া আসিলেন। শুদ্ধ আসিলেন বলিলে যথেষ্ট বলা হইবে না। তিনি রীতিমত পুনর্বাসিতই হইলেন। পর পর দুইটি সংসদীয় নির্বাচনে তাঁহার দল গর্ব করিবার মতন অনেকগুলি আসনে জয়লাভ করিল। লোকের মনে প্রশ্ন দেখা দিল — এরশাদ সাহেবের এই শক্তির উৎস কোথায়?

আহমদ ছফা এই নিবন্ধে এই প্রশ্নের একটি যুক্তিসংগত উত্তর দিয়াছেন। ১৯৯০ সালের পর যে দুই দুইটি চাঁদ — যাঁহাদের নাম যথাক্রমে হাসিনা ও খালেদা — বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে পালা করিয়া উদিত হইয়াছেন, তাঁহাদের সামনে ধ্র“বনক্ষত্রের জ্যোতির মতন জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নামবাহী এই বিশেষ রাজনীতিবিদটি। এখানে উৎকলিত প্রবন্ধদ্বয়ের প্রথমটিযোগে আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে রাজনীতির মধ্যেই।’

আমাদের দুর্ভাগ্য এই নিবন্ধ দুটি লেখার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মহাত্মা আহমদ ছফা এই ধুলির ধরা হইতে বিদায় লইয়াছেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদ আজও — এই ভূমিকা মুসাবিদার ক্ষণ ২০১৩ ইংরেজির ডিসেম্বর মাসেও — বাঁচিয়া আছেন। নিছক বাঁচিয়াই নহেন, দিব্যই আছেন। কেন এবং কিভাবে আছেন তাহার জবাবে নানান মুনি নানান মত প্রকাশ করিবেন একথা নিশ্চিত জানি। আমাদের হাতে আহমদ ছফার যে মতটি আছে তাহাও — কম করিয়া বলিলেও বলিতে হইবে — বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আহমদ ছফার কথা আমরা যদি ভুল না বুঝিয়া থাকি তো বলিব তিনি বলিয়াছেন এরশাদ সাহেবের পতন হইলেও তিনি যে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রতিনিধি প্রকৃত প্রস্তাবে সেই স্বৈরতন্ত্রের পতন হয় নাই। তাহা একটা বেসামরিক লেবাস পরিয়াছে মাত্র।

এখানে উৎকলিত প্রথম প্রবন্ধে — অর্থাৎ ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ — আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত এইরকম: ‘আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসাবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন।’ আহমদ ছফার এই সিদ্ধান্তের সহিত যাঁহারা একমত হইবেন না, তাঁহারাও নিচের বাক্য দুইটি পড়িয়া বিশ্বাস করি ক্ষণকাল তিষ্ঠাইবেন। আর নিঃশ্বাস চাপিয়া বলিবেন, সাধু! সাধু! তিনি লিখিয়াছেন, ‘এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজস্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে।’

মাস ছয়েক পর অর্থাৎ ২০০১ সালের গোড়ায় প্রকাশিত দ্বিতীয় নিবন্ধযোগে আহমদ ছফা ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মূলকথা হল লড়াইরত দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়মকানুন এবং নীতিবোধ সক্রিয় থাকে [কিন্তু] প্রতিহিংসা নিয়মনীতি কিছুই মানে না।’ সেই দিন আহমদ ছফা যে পরিস্থিতি দিব্যচোখে দেখিতে পাইয়াছিলেন আজ — এক যুগ পর — আমরা তাহা দানবের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতে বাধ্য হইতেছি। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আরেকটা কথা চালু আছে। রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। কিন্তু শেষকথার আলামত হিসেবে চরিত্রহীনতা, নীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক ভোজবাজির যে চিত্রগুলো একটার পর একটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তা থেকে এটা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে আগামীতে আমরা একটি প্রচণ্ড জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।’ আর আজও আমরা বলিতে পারিতেছি না সংকট কাটিয়া যাইতেছে।