Tag Archives: শাহমান মৈশান

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ভবিষ্যৎ – শাহমান মৈশান

© অনন্ত ইউসুফ

বাংলাদেশের প্রতিবাদের সংস্কৃতির একটি নব্য প্রপঞ্চের নাম শাহবাগ আন্দোলন। মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নাই যাদের, তাদের অর্থাৎ বর্তমান প্রজন্মের সাহসী ‘অরাজনৈতিক’ তরুণদের রাজনৈতিক তাৎপর্যমণ্ডিত সংঘবদ্ধ উত্তাপ এই আন্দোলনের খনিজ উৎস। গণজাগরণ নামে একে ডাকা হয়েছে। এর অর্থ হল মুক্তিযুদ্ধের পর জনগণ অনেকদিন ঘুমিয়েছিল। এই ঘুমগ্রস্ত সময়ে একাত্তরের অর্জন, মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় চেতনা এবং রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক প্রগতির জন্য প্রয়োজনীয় জনকর্মস্পৃহা লোপাট হয়েছে। এই লুপ্তির প্রক্রিয়াটিকে সর্বজনের আবেগ ও রাজনৈতিক কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বোঝাপড়ার একটি মোক্ষম পরিসর তৈরি করে দিয়েছে শাহবাগ আন্দোলন। রাজনৈতিক ফায়দা লুটের নানা রহস্যময় তরিকার কালো পর্দা ছিদ্র করে দিয়েছে এই আন্দোলন। জামায়াত-শিবিরের সাথে দোস্তির-মৈত্রীর সকল ঘটনাকেই এই আন্দোলন ক্রুদ্ধ চোখে দেখেছে।

শাহবাগ জাগরণ জনগণের একটি সর্বাত্মক উপলব্ধিও জারি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ যে পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশ যে ভারত নয়, বাংলাদেশকে যে বাংলাদেশ হিশাবেই থাকতে হবে — রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সংক্রান্ত সেরকম একটি তীক্ষè রাজনৈতিক চেতনারও খোঁজ আছে এই আন্দোলনে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ধর্মীয় ভাবাদর্শ দিয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক ভুলের মোহজাল ছিঁড়ে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। অতএব, বাঙালি মুসলমান এদেশে সংখ্যার দিক থেকে গরিষ্ঠ হলেও, বাংলাদেশ কোন ইসলামি রাষ্ট্র নয়। জন্মসূত্রে বাংলাদেশ একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র। পাকিস্তান আজ ছদ্মধর্মরাষ্ট্র হিশাবে এর সামরিকতা দিয়ে জর্জরিত। আবার, ‘সংকটের মুখে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা’ — স্বয়ং অমর্ত্য সেন এই প্রশ্ন তুলেছেন।

জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র উত্থান ও ধর্মনিরপেক্ষতা লুপ্তির মতন পরস্পর সম্পর্কিত প্রসঙ্গ দুইটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিপ্লবী চরিত্র গায়েব হয়ে যাবার প্রক্রিয়াটির মধ্যেই নিহিত আছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর,  শ্রেণিবিভক্ত সমাজ ও জনগণকে দেশগঠনের ঐক্যবদ্ধ কর্মীতে রূপান্তরিত করতে না পারার বিপ্লবী রাজনীতির ভূমিকাহীনতার ব্যর্থতাকেও এই প্রসঙ্গে আমাদের পাঠ ও পর্যালোচনা করতে হবে। অথচ আহমদ ছফার অলাতচক্র উপন্যাসের পাতা ছিঁড়ে বলতে পারি, সাংবাদিক-গায়ক-অভিনেতা-শিল্পী-ভবঘুরে-বেকার-পেশাদার লুচ্চা-বদমায়েশ-চোরছ্যাঁচর সকলেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল স্বাধীনতার চুম্বক আকর্ষণে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। ম্যাক্সিম গোর্কির নীচুতলার মানুষ নাটকের লুকা নামক পরিব্রাজক সর্বহারা বৃদ্ধ চরিত্রের ওই সংলাপটি যেন সেই সত্যই প্রকাশ করে — এই দুনিয়ায় একটা মাছিরও কোন না কোন গুণ আছে।

জনগণের লড়াইয়ের গুণে অর্জিত এই বাংলাদেশ আজ এক ‘উদিত দুঃখের দেশ’। শাহবাগ আন্দোলনের শক্তি ও তাৎপর্য হল অসমাপ্ত লড়াইয়ের ব্যর্থতাগুলো ও ইতিহাসের অমীমাংসিত দায় থেকে ভবিষ্যতের ভাবনাগুলো নিয়ে আশাবাদী পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি করা। কারণ, বাংলাদেশের সর্বজনের রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাকে একমাত্র মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিই পারে একটি বৈপ্লবিক আত্মপ্রকাশের পথ করে দিতে। রাজনৈতিক ইতিহাসের স্মৃতি কেবল ভাবাবেগজনিত দুর্বলতাই উৎপাদন করে না, পুনর্গঠনের দিব্য শক্তিও সরবরাহ করে। সেজন্যই একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে সূচিত ও সোচ্চার এই আন্দোলন থেকে ভবিষ্যতের গতিশীল লড়াইয়ের কিছু দিশা সংগ্রহ করা যেতে পারে।

শাহবাগ আন্দোলনের অগ্নিবর্ণ পটভূমিতে, লিবারাল চিন্তক অমর্ত্য সেন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার ও বহুমতসহিষ্ণুতার সামনে ঘনিয়ে আসা সংকটের সূত্র হিশাবে কোন বিষয়গুলো চিহ্নিত করেছিলেন তা এখানে স্মরণ করছি। কারণ, বাংলাদেশেও ধর্মনিরপেক্ষতার ও বহুমতসহিষ্ণুতার সামনে ঘনিয়ে আসা সংকট একেবারে মৃত্যুবাণ নিয়ে হাজির। অধ্যাপক সেন বলছেন, সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদ, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ এবং জঙ্গি রক্ষণশীলতা — এই তিনটি সূত্রই ধর্মনিরপেক্ষতার ও বহুমতসহিষ্ণুতার সামনে ঘনিয়ে আসা সংকটের কারণ। ভারতের উগ্র হিন্দুধর্মী রাজনীতির একই বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের উগ্র জামায়াতে ইসলামীধর্মী রাজনীতির ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। যেমন, ‘গোষ্ঠীগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে হিংসা ও অস্ত্রের ব্যবহার, অন্য একটি [প্রধানত হিন্দু] সম্প্রদায়কে শত্রু চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে আঘাত শাণিত করা, বিভেদমূলক আবেগজনিত উন্মাদনার মাধ্যমে জনসমাবেশ ঘটানো এবং নির্দিষ্ট [এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বৌদ্ধ] সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক বাহুবলের প্রয়োগ’। শাহবাগ আন্দোলনের বৈপ্লবিক অর্থ দিয়ে, এই সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে সর্বজনের রাজনীতি কায়েমের জন্য আমাদের লড়তে হবে।

দ্বিতীয়ত, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের সমস্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, আমাদের ভাবনাচিন্তাগুলো স্বচ্ছ ও সোচ্চার হয়ে উঠছে না। এমনিতে সাম্প্রদায়িক চরিত্রের জন্য বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। অন্যদিকে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নব্য ব্যাখ্যার প্রশ্নে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তর্ক তুলেছিলেন এই বলে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে নিপীড়িতের সংগ্রাম দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে। বঞ্চিতদের লড়াকু ইতিহাসের অভিন্ন বাস্তবতা দিয়ে অন্যান্য জাতি যেমন মারমা, চাকমা, সাঁওতাল, ত্রিপুরা প্রভৃতিকে একটি বহুমুখী জাতীয়তাবাদের কাঠামোতে আত্মস্থ করার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভেতরে ভাবাদর্শিক পরিসর নির্মাণ করতে হবে। ফলে, বাংলাদেশ যে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র, এই বাস্তবতা অভিযোজনের জন্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি দরকার। অমর্ত্য সেন বলছেন,

ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী আন্দোলনের তৃতীয় উপাদান জঙ্গি রক্ষণশীলতা। এর অর্থ সাধারণ মানুষের কুসংস্কারের প্রতি যুক্তিহীন অন্ধ আকর্ষণকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য চরমপন্থী আবেগ মন্থনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। ধর্মের নামে কুসংস্কারের আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে অন্ধবিশ্বাসের ভিত্তিতে রাজনৈতিক উন্মাদনা সহজেই সৃষ্টি করা যেতে পারে। […ভারতের] অযোধ্যায় [বাবরি] মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতা দেখিয়ে দেয় রক্ষণশীলতাকে কিভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশে বৌদ্ধ উপাসনালয় ও হিন্দু মন্দিরে হামলা এবং যুদ্ধাপরাধীর মুখ চাঁদে দেখা যায় বলে শতসহস্র মুসলমানকে পৈশাচিক ধ্বংস সাধনে উসকে দেয়ার ক্ষেত্রেও রক্ষণশীলতাকে জঙ্গি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ভয়ঙ্কর কৌশলেরই প্রয়োগ ঘটেছে। এক্ষেত্রে, এই রক্ষণশীলতার অচলায়তন ভাঙতে, সবার আগে প্রগতির বৈপ্লবিক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ রাজনৈতিক কর্মীদের — যারা প্রধানত মধ্যশ্রেণির, তাদেরকে — সেই জনগণের সাথে সর্ববিধ দূরত্ব ঘোচানোর জন্য লাগসই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নিতে হবে। তথাকথিত ‘রক্ষণশীল’ জনগোষ্ঠীর মনকে বুঝতে না পারলে এবং পরস্পরের মধ্যে পরিচয়ের সম্যক উপলব্ধি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে, ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি যেমন শক্ত ভিত্তি  পাবে না, তেমনি দেশকে আলোর পথ দেখাতেও সেই রাজনীতি ব্যর্থ হবে। আর সেটা ঘটলে মুক্তিযুদ্ধটাই ব্যর্থ হবে, জাতি নিপতিত হবে ঘোর সংকটে!