Tag Archives: লেভিন আহমেদ

জিজেকের ভায়োলেন্স: পুঁজিবাদী সমাজে বলপ্রয়োগের নতুন বিন্যাস – লেভিন আহমেদ

দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ও মনোবিশ্লেষক স্লাভয় জিজেকের জন্ম তৎকালীন কম্যুনিস্ট স্লোভেনিয়ায়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বই ‘মতাদর্শের মহিমান্বিত অভিপ্রায়’ (Sublime Object of Ideology) প্রকাশিত হইলে তাত্ত্বিক হিশাবে জিজেকের সুনাম জগৎব্যাপী ছড়াইয়া পড়ে। জাক লাঁকা, গেয়র্গ হেগেল ও কার্ল মার্কসের ব্যাখ্যাকারী হিশাবে ব্যাপক মুন্সিয়ানা দেখাইয়াছেন তিনি। হেগেলীয় ডায়ালেক্টিকস থেকে শুরু করিয়া ছায়াছবি, বাজারি গীত কোন কিছুই তাঁহার আগ্রহের বাইরে নহে। ২০০৮ সালে বলপ্রয়োগ (Violence) শিরোনামে তাঁর একখানা বই প্রকাশিত হয়। বর্তমান রচনাটি তাহার পর্যালোচনার প্রয়াস মাত্র

ভায়োলেন্স (পিকাডর, ২০০৮)

ভায়োলেন্স (পিকাডর, ২০০৮)

বলপ্রয়োগ কথাটি কিভাবে আমাদের মনোজগতে ভেসে ওঠে — এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। নিশ্চয় বলপ্রয়োগ সন্ত্রাস, সহিংসতা, খুন, উদ্বেগ ও টানটান উত্তেজনার মিশ্র আবহ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। জিজেকের মতে, ঠিক এখানেই পহেলা বিপত্তি ঘটার সম্ভাবনা; তাই এক কদম পিছিয়ে বুঝে শুনে তারপর অগ্রসর হওয়া জরুরি মনে করেন তিনি। ব্যক্তির বলপ্রয়োগ ও সহিংস কর্মকাণ্ডের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এড়িয়ে পেছনের দিগন্তকে — যেখান থেকে এসব ঘটনাবলির  উদয় ঘটে — ফর্সা করা জরুরি। কেননা এ প্রচেষ্টাই কেবল বলপ্রয়োগের স্বরূপ উন্মোচিত করতে পারে। ব্যক্তির বলপ্রয়োগ ও সামজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বলপ্রয়োগের তুলনামূলক সম্পর্ক বিচার ও দ্বিতীয়টি প্রথমটিকে কিভাবে উসকে দেয় তা নিরূপণ করাই জিজেকের বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। ব্যক্তির বলপ্রয়োগ ও ব্যবস্থার বলপ্রয়োগের তফাত টেনে জিজেক বলতে চান, ব্যক্তির বলপ্রয়োগ উদ্যাপনের ডামাডোলের ভেতরে আমরা নৈর্ব্যক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের কথা হামেশাই ভুলে যাই। জিজেকের প্রস্তাব ব্যক্তির ও ব্যবস্থার বলপ্রয়োগের দ্বান্দ্বিক বিচারের মাধ্যমেই বলপ্রয়োগের সামগ্রিক পর্যালোচনা হাজির করা সম্ভব।

তিনি এই বইতে আরো দুই প্রকার বলপ্রয়োগের হদিস দেন: প্রতীকী বলপ্রয়োগ (সিম্বলিক ভায়োলেন্স)  ও গায়েবি বলপ্রয়োগ (ডিবাইন ভায়োলেন্স)।  প্রতীকী বলপ্রয়োগ প্রকৃতপক্ষে ভাষার মামলা। ভাষা এবং ভাষার অন্তর্গত কাঠামোর মধ্যেই এই বলপ্রয়োগ সূচিত হয়। ভাষার অর্থজগৎ কিভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাস্তবজগৎকে স্থানচ্যুত করে তার বিস্তারিত আলোচনা বইটিতে রয়েছে। গায়েবি বলপ্রয়োগের আলোচনায় জিজেক বাল্টার বেনিয়ামিনের দোহাই দিয়ে বলেন, গায়েবি বলপ্রয়োগ ইহজাগতিক বিষয়, পরলোকের সাথে তার সম্পর্ক অতি সামান্য। গায়েবি বলপ্রয়োগের সাথে সহিংসতা এবং রক্তপাতের প্রশ্ন জড়িত। জিজেকের অনুযোগ, কতিপয় বামঘরানার উদারনীতিবাদী বুদ্ধিজীবী ফানোঁ এবং বেনিয়ামিনের গায়েবি বলপ্রয়োগতত্ত্বের ঝাঁজকে প্রশমিত করতে চান। চলমান আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদী সমাজে উক্ত চার ধরনের বলপ্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করাই বইটির মূল উদ্দেশ্য।

প্রথম অধ্যায়ে জিজেক ব্যক্তি কর্তৃক বলপ্রয়োগ (সাবজেক্টিব ভায়োলেন্স)  ও ব্যবস্থা কর্তৃক বলপ্রয়োগের (সিস্টেমিক ভায়োলেন্স) পার্থক্য নির্দেশ করেন। এই পর্যন্ত বলপ্রয়োগের চরিত্র বিচারে নৈর্বাক্তিক-প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা প্রতীকী বলপ্রয়োগকে অগ্রাহ্য করে তাত্ত্বিকগণ শুধুমাত্র ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ঘটনাকে প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। জিজেক এই বইতে দান উল্টিয়ে দিয়ে বলছেন, পুঁজিবাদী সমাজে সাংগঠনিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের মর্ম বোঝা জরুরি। কারণ অদৃশ্য সিস্টেমিক বলপ্রয়োগই তার বিপরীতে ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ঘটনার জন্ম দেয়। এখন ব্যক্তির বলপ্রয়োগকে আমরা কিভাবে বিচার করব? সোজা কথায়, এই বলপ্রয়োগ ব্যক্তির দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে। ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, এই লোক এই বলপ্রয়োগের ঘটনার জন্য দায়ী। কিন্তু নৈর্ব্যক্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের হোতা শনাক্ত করা সহজ নয়। যেমন সহজ নয় অর্থনৈতিক মন্দার জন্য দায়ী ব্যক্তি শনাক্ত করা। ব্যক্তির বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে যেমন আমরা নিজেদের দায়ী মনে করি, তেমনি — জিজেকের প্রস্তাব — নৈর্ব্যক্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সাংগঠনিক বলপ্রয়োগের দায়ও আমাদের উপর বর্তায়।

জিজেক এখানে ক্ষমতার (আইনসম্মত কর্তৃত্ব অর্থে) সাথে বলপ্রয়োগের পার্থক্য টেনে বলছেন, সত্যিকার নেতৃত্বের কখনো বলপ্রয়োগের দরকার পড়ে না। কেবলমাত্র ব্যর্থ নেতৃত্বেরই বলপ্রয়োগের দরকার পড়ে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা সাধারণত বলপ্রয়োগের উপর ভিত্তি করেই টিকে থাকে। পুঁজির বেপরোয়া গতি অব্যাহতভাবে বলপ্রয়োগের ঘটনা ঘটিয়ে চলে যা কিনা স্বাভাবিক বলেই মেনে নেওয়া হয়। লেখক এই স্বাভাবিক অবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এভাবে জিজেক পুঁজিবাদের বলপ্রয়োগের চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে লিবারেল, অহিংস, উন্নয়নবাদী প্রপাগান্ডার মুখোশ উম্মোচিত করেছেন। জিজেকের অন্তর্দৃষ্টি: মার্কেটকে অবারিত রাখতে হলে পুঁজিবাদের বলপ্রয়োগের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু এই বলপ্রয়োগের হোতা হিশেবে কাউকে শনাক্ত করা বা দোষী করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। জিজেক বলছেন, তাই বলে আমরা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেতে পারি না। এই সহিংসতার জন্য আমরাও সম্যকভাবে দায়ী।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের কারণ জিজেকের মতে পুঁজিবাদের আগ্রাসী চরিত্রের মধ্যেই নিহিত। সন্ত্রাসবাদীরা বলপ্রয়োগের আশ্রয় নিয়ে পুঁজির একচেটিয়া দাপটের মুখে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে চায় যা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের মাধ্যমে সম্ভব হয়ে ওঠে না। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কোণঠাসা হয়ে পড়া জনগোষ্ঠীসমূহের সামগ্রিক অসন্তোষের মধ্যেই এরূপ সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের কারণ খুঁজতে হবে। বিপদের বিষয় হল ব্যক্তির বলপ্রয়োগের দৃষ্টিগ্রাহ্যতা ও স্পর্শকাতরতার ফলে তা প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগের মাত্রাকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে ব্যক্তির বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগ প্রায়শই বৈধতা পায়।

জিজেক শুধু নৈর্ব্যক্তিক বলপ্রয়োগের চরিত্র বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত হননি, ‘বলপ্রয়োগ’ বইয়ে তিনি প্রতীকী বলপ্রয়োগের স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রয়াস পেয়েছেন। এই বলপ্রয়োগ আধিপত্যশীল ডিসকোর্সের ভাষাভঙ্গির মধ্যে নিহিত থাকে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে জিজেক প্রশ্ন তুলেছেন, কেন বাসনাময় কর্তা হিশেবে অপরের সান্নিধ্য আজ ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে? কেন অপরের সম্ভোগ-বাসনাকে প্রশমিত করার জন্য এত তোড়জোড়? অপরকে দূরে সরিয়ে রাখা প্রতীকী দেয়াল ভাঙ্গনের সম্ভাবনা থেকেই এই ভয়ের সূত্রপাত। ফ্রয়েড বহু আগেই বলেছেন, প্রতিবেশী হল সেই অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশকারী যার সম্ভোগপ্রণালি আমাদের বিরক্ত করে। তাই প্রতিবেশী যখন সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত জীবনে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা করে তখন তা তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। রটনা আছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা অন্যান্য সভ্যতার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি উদার ও সহনশীল। জিজেক বলছেন এই রটনার কারণ পাশ্চাত্যে সামাজিক জীবনের অনুপস্থিতি। সমাজে ব্যক্তির প্রতিদিনকার জীবনযাত্রায় পারস্পরিক দূরত্বের মধ্যে এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রোথিত। অর্থাৎ পাশাপাশি থেকে যে যার মত জীবনযাপন করছে কিন্তু কেউ কারও সাথে মিশছে না। এই পরিস্থিতিতে সমাজজীবনের এই বিচ্ছিন্নতা সমস্যার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একমাত্র সমাধান হিশেবে দেখা দিয়েছে।

জিজেক বলেন হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) ব্যঙ্গচিত্র নিয়ে মুসলিমবিশ্বের প্রতিক্রিয়া ছিল আসলে মুহাম্মদকে (সাঃ) ঘিরে পাশ্চাত্যের মনোভাবের বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষের প্রকাশ। মুসলিম দেশগুলো যেমন পাশ্চাত্যকে ভুল দৃষ্টিতে দেখছে, ঠিক তেমনি পাশ্চাত্যও প্রাচ্যকে ভুলভাবে পাঠ করছে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও সন্ত্রাসকে ব্যাখ্যা করতে হলে — জিজেক বলছেন — আমাদের ভাষার গঠনের দিকে নজর ফেরাতে হবে। কারণ ভাষা বলপ্রয়োগের অন্যতম হাতিয়ার। ভাষাই বস্তুর উপর গুণ ও অর্থারোপ করে যা সেই বস্তুর নিজস্ব নয়। বস্তুর এই অযাচিত নামকরণ বলপ্রয়োগের নামান্তর বৈকি। লাকাঁ বলছেন ব্রহ্মপদ (মাস্টার সিগনিফায়ার) প্রতীকীজগৎকে একটি সুনির্দিষ্ট আকৃতি দেয়। প্রতিটি শব্দ ব্রহ্মপদের সাপেক্ষে অর্থলাভ করে থাকে। কিন্তু ব্রহ্মপদ কোন যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ব্রহ্মপদ নিজেই নিজের জোরে টিকে থাকে এবং তা অন্য কোন শব্দের সাপেক্ষে অর্থলাভ করে না। ব্রহ্মপদের এই প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য পদের সাপেক্ষে তার অর্থপ্রাপ্তি চূড়ান্ত বলপ্রয়োগের উপরই টিকে থাকে। তাই আমরা দেখতে পাই ভাষাকে — যা পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম — আশ্চর্য ব্যাপার বলে মনে হলেও তা চূড়ান্ত বিচারে বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই টিকে থাকে। ভাষাই প্রকৃত মানদণ্ড ঠিক করে দেয়, ভাষাই বলে দেয় কোনটি বলপ্রয়োগ আর কোনটি বলপ্রয়োগ নয়।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের বসন্তকালীন সময়ে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা ও আমেরিকায় আছড়ে পড়া হারিকেন ক্যাটরিনার দুর্যোগ পরবর্তী লুটের ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে জিজেক বলেন, ১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া দাঙ্গার সাথে এই দুই ঘটনার উল্লেখযোগ্য তফাত রয়েছে। ১৯৬৮ সালের বিদ্রোহে যে এয়ুটোপীয় স্বপ্ন ছিল — জিজেক বলছেন — তা সাম্প্রতিক দাঙ্গাগুলোতে পরিলক্ষিত হয়নি। অর্থাৎ এই সহিংস বিক্ষোভগুলো কোন এয়ুটোপীয় প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে না। অর্থহীনতার মাঝেই শেষ পর্যন্ত তা মিলিয়ে যাচ্ছে। কারণ হিশেবে জিজেক বলেন, উত্তর-মতাদর্শিক যুগে সহিংস বিক্ষোভ কোন সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে না, বরং রাষ্ট্র ও প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ফলে এইসব সহিংস বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে। পুঁজির দাপটের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়া মানুষ সহিংস বিক্ষোভের মধ্য দিয়েই নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তাদের কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কিংবা দাবিদাওয়া নেই। মূলকথা হল তারা বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্বাচ্ছন্দ বোধ করছে না, নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছে না। প্রসঙ্গত কিছুদিন আগে ওয়াল স্ট্রিটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিক্ষোভ সম্পর্কে জিজেক একই মন্তব্য করেন। তবে কোন কোন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক (যেমন চায়না মিয়েভিল) জিজেকের এই তত্ত্বের সাথে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, সাম্প্রতিক অকুপাই মুভমেন্টগুলোতে বিক্ষোভকারীরা সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করেই সমবেত হয়েছে।

ইউরোপ কয়েকশত বছর সময়ব্যাপী পুঁজিবাদী বিকাশের মধ্য দিয়ে আধুনিকতার স্বরূপ দেখেছে যে সময়টাতে প্রায় সেই সময়েই বিজ্ঞান আধিপত্যশীল ডিসকোর্স হিশেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে পেরেছে। কিন্তু মুসলিম বিশ্বে এই পরিবর্তন এসেছে আচমকা, ফলে পুঁজি তাদের প্রতীকীজগৎকে নৃশংসভাবে ছিন্নভিন্ন করতে পেরেছে। তারা তাদের ধর্মাশ্রিত প্রতীকীজগৎ হারিয়েছে, কিন্তু নতুন কোন প্রতীকীজগৎ বিনির্মাণের অবকাশ পায়নি। ফলে অকস্মাৎ পরিবর্তনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তারা ধর্মাশ্রিত উগ্রপন্থী রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। জিজেক এই পর্যায়ে এসে ‘ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদী’দের মনোঃবিশ্লেষণের প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি বলেন, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে তারা নিজেরা সংশয়ান্বিত বলেই অপরের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে তারা তাদের নিজেদের নাজুকতাকে আড়াল করতে চান।

হারিকেন ক্যাটরিনার দুর্যোগপরবর্তী সময়ে কালদের দ্বারা ধর্ষণ ও লুট সংক্রান্ত যেসব খবর মিডিয়া প্রচার করেছিল তা পরবর্তীতে ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। তার উল্লেখ করে জিজেক বলেন, আধিপত্যশীল ডিসকোর্সসমূহ বর্ণবাদী, সাম্প্রদায়িক, পুরুষতান্ত্রিক ফ্যান্টাসিতে ভরপুর যা লিবারেল ভদ্রলোকেরা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে লজ্জাবোধ করেন। লিবারেল তাত্ত্বিকগণ সীমান্তের কাঁটাতারকেই বিশ্বজনীন ভাতৃত্বের সবচেয়ে বড় বাধা মনে করেন। জিজেক তাদের সমালোচনা করে বলছেন, সীমান্ত কাঁটাতারমুক্ত করলেই বিদ্যমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলির সমাধান হবে না; সত্যিকার আর্থসামাজিক বৈষম্যের বেড়াজাল মুক্ত করলেই বিশ্বজুড়ে চলমান সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব। বলা বাহুল্য, তা উদারনীতিবাদী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সম্ভব নয়।

স্লাভয় জিজেক

স্লাভয় জিজেক

চতুর্থ অধ্যায়ে জিজেক যুক্তির অন্তর্নিহিত অসঙ্গতিগুলোকে তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন। এমানুয়েল কান্টের দোহাই দিয়ে লেখক বলছেন, একটি প্রশ্নের দুইদিক থেকেই ন্যায্য তর্ক তোলা সম্ভব। যেমন এই মহাবিশ্ব সসীম এবং অসীম দুটিই আমরা প্রমাণ করতে পারি। কান্ট বলছেন, যুক্তির মধ্যকার এই পারস্পরিক বিরোধের নিষ্পত্তি যদি সম্ভব না হয় তবে মানবতা এক নিরানন্দ সংশয়ের মধ্যে নিপতিত হবে। অনুরূপভাবে, একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন মুসলিম ও একজন উদারনীতিবাদী খ্রিস্টানের পরস্পরবিরোধী যুক্তি থাকতে পারে। হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) ব্যঙ্গচিত্রকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের অসন্তোষ এবং এই অসন্তোষকে ঘিরে পাশ্চাত্যের সমালোচনাকে তিনি এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।

তারপর তিনি গণহত্যার ঘটনাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী কর্তৃক ইহুদি নিধনের দোহাই তুলে ইসরায়েল যেমন অপরের অনুকম্পা জাগিয়ে পরদেশ দখল করে, ঠিক তেমনি মুসলিম দেশগুলি (বিশেষ করে ইরান) ইসরায়েলের নৃশংসতা প্রমাণ করতে গিয়ে ইহুদিদের গণহত্যার বিষয়টি বেমালুম চেপে যায়। পাশাপাশি স্বাধীনতা ব্যবসায়ী সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদীদের ভণ্ডামি, তাদের অবদমিত বর্ণবাদ, ইসলাম বিদ্বেষ ও ইউরোপকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকে এই অধ্যায়ে কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। বের্টল্ট ব্রেখট বলেছিলেন, ব্যাঙ্ক ডাকাতির ঘটনা নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চেয়ে নগণ্য নয় কি? অনুরূপভাবে জিজেক প্রশ্ন তুলেছেন, রাষ্ট্রের আইনবহির্ভূত বলপ্রয়োগ রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের চেয়ে তুচ্ছ নয় কি?

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিবাদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের ‘বেআইনি’ বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেন। এই বিবাদের সমাধানকল্পে তিনি জেরুজালেমকে তৃতীয় পক্ষের তত্ত্বাবধানে রাখার প্রস্তাব করেন। অতঃপর তিনি সন্ত্রাস ও মুক্তিকামী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের মধ্যকার ভেদরেখা চিহ্নিতকরণের জটিলতার বিষয়টি খোলাসা করেন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ধর্মকে মোকাবেলায় সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ ও উদারনীতিবাদের ব্যর্থতার আলোচনা করে  জিজেক বলেন বর্তমানে নিরীশ্বরবাদের পতাকাতলেই সকল ধর্ম সমবেত হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিপ্লবী নিরীশ্বরবাদই সত্যিকার ধর্ম হিশেবে বিশ্বজনীন আবেদন নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হতে পারে।

পঞ্চম অধ্যায়ে জিজেক রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে সংস্কৃতির মামলা বলে চিহ্নিত করার উদারনীতিবাদী (লিবারেল) কৌশলের সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন আজকের দিনের যাবতীয় সমস্যাগুলোকে কেন শুধুমাত্র সহনশীলতার অভাবজনিত সমস্যা হিশেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে? কেন এই সমস্যাগুলোকে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য ও অন্যায়জাত সমস্যা হিশেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে না? কেন এই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান হিশেবে রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিবর্তে সহনশীলতার নীতিকে প্রস্তাব করা হচ্ছে? কারণ রাজনীতিকে সংস্কৃতির খোপে ঢোকানো (কালচারাইজেশন অব পলিটিক্স) উদারনীতিবাদী ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদীদের (মাল্টিকালচারালিস্ট) মতাদর্শিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যজাত সমস্যাগুলোকে তাই সাংস্কৃতিক সমস্যা হিশেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তার কারণ হিশেবে জিজেক ইঙ্গিত করেন, বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রকাঠামো বজায় রেখে এই আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান সম্ভব নয় বলেই সাংস্কৃতিক ভিন্নতার দিকে আমাদের নজর সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রসংগে স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার আন্তঃসংঘর্ষ (ক্ল্যাশ অব সিবিলাইজেশনস) তত্ত্বের সমালোচনা করেন তিনি। ফ্রাঁসোয়া ফুকুয়ামার ‘ইতিহাসের যবনিকাপাত’ (এন্ড অব হিস্ট্রি) গ্রন্থে উদারনৈতিক গণতন্ত্রকেই রাজনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য চূড়ান্তরূপ বলে ঘোষণা দেন। এখানে জিজেক ফুকুয়ামাকেও ছেড়ে কথা বলেননি। বেনিয়ামিনকে উদ্ধৃত করে তিনি রাজনীতিকে সংস্কৃতির খোপে ঢোকানোর পরিবর্তে সংস্কৃতিকে রাজনীতির আলোকে দেখার প্রস্তাব রাখেন। পরিশেষে সামাজিক পরিসর (সোশাল স্ফিয়ার) ও ব্যক্তিগত পরিসর (প্রাইবেট স্ফিয়ার) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় তিনি বলেন এই দুই পরিসরের কার্তেসীয় বিভাজনের মাধ্যমেই উদারনৈতিক জ্ঞানতত্ত্বের ভীত টিকে থাকে।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে জিজেক গায়েবি বলপ্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। হিচককের ‘সাইকো’ ছবির গোয়েন্দা খুনের দৃশ্যে গডস-পয়েন্ট-অব-ভিয়ু শট ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে খোদা আসমান থেকে জমিনে নেমে আসেন। মজলুমের পক্ষে তিনি দুনিয়াবি ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেন এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইনসাফ কায়েম করেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপরওয়ালার এই বেআইনি বলপ্রয়োগকেই জিজেক গায়েবি বলপ্রয়োগ নামে চিহ্নিত করতে চান। বাল্টার বেনিয়ামিনের ইতিহাসের দর্শন সংক্রান্ত থিসিসে (থিসিস অন দ্য ফিলসফি ইন হিস্ট্রি) তিনি পল ক্লির বিখ্যাত চিত্র ‘এঞ্জেলাস নুভো’র প্রসঙ্গ তোলেন। চিত্রটির দোহাই দিয়ে জিজেক বলেন ইতিহাসের ফেরেশতা (এঞ্জেল অব হিস্ট্রি) যদি অন্যায়-স্তুপে হস্তক্ষেপ করে প্রগতির নারকীয় যজ্ঞ থামিয়ে দিতেন তবে যে কাণ্ডটি ঘটত তাই গায়েবি বলপ্রয়োগের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

এখন প্রশ্ন হল গায়েবি বলপ্রয়োগের কোন নৈর্ব্যক্তিক মাপকাঠি আছে কিনা। বলপ্রয়োগের ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের কাছে যা উপরওয়ালার আদেশ, তা বাইরের দর্শকের কাছে নিছকই ব্যক্তির নৈরাজ্যের নামান্তর ছাড়া আর কিছু মনে নাও হতে পারে। কোন বলপ্রয়োগের ঘটনাকে গায়েবি বলে গণ্য করার ঝুঁকি তাই পুরোটাই ব্যক্তির উপর বর্তায়। গায়েবি বলপ্রয়োগের মাজেজা চিরকালই আইনি ক্ষমতার কাছে আজগুবি ঠেকে। জিজেকের মতে, গায়েবি বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই আশেকের সাথে মাসুকের প্রকৃত প্রেমের সূচনা ঘটে।

এই বইতে জিজেক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষিতে বলপ্রয়োগের নানা প্রকারভেদ আলোচনা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচারের প্রয়াস পেয়েছেন। সেই সাথে বর্তমান বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট মোকাবেলায় উদারনীতিবাদী ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদীরা যেসব সমাধান বাতলে দিচ্ছেন সেগুলোর সামগ্রিক সমালোচনাও হাজির করার চেষ্টা করা হয়েছে। লেখক বলপ্রয়োগের আপাত মোহে রোমাঞ্চিত না হয়ে বইটিতে তার আসল সুরত দেখানোর চেষ্টা করেছেন। অহিংস উন্নয়নবাদী নীতির পথ পরিহার করে জিজেক খোলাখুলিভাবেই এখানে বাতিলের বিরুদ্ধে হক প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত বলপ্রয়োগের পক্ষ নিয়েছেন। যারা প্রাতিষ্ঠানিক বলপ্রয়োগকে আড়াল করে তার বিপরীতে পরিচালিত ব্যক্তির বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন জিজেক তাদের মুখোশ উন্মোচিত করেছেন। পুঁজিবাদী সমাজে বলপ্রয়োগের কারণ হিশেবে তিনি প্রতিবেশী-ভীতিকে চিহ্নিত করেন এবং এই বলপ্রয়োগ যে আসলে ভাষার মামলা তা খোলাসা করেন। ভাষা প্রকৃত বলপ্রয়োগকে পাশ কাটিয়ে তাকে প্রতীকী বলপ্রয়োগ আকারে হাজির করে। বর্তমান সময়ে উদারনীতিবাদীদের প্রধান মতাদর্শিক হাতিয়ার হিশেবে সহনশীলতানীতির সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেন তিনি। তারপর বাল্টার বেনিয়ামিনের দোহাই তুলে তিনি বিদ্যমান সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের উপায় হিশেবে গায়েবি বলপ্রয়োগের বিপ্লবী দিকগুলোর উপর আলোকপাত করেন। জিজেকের শেষ কথা হল নিষ্ক্রিয়তা বর্তমান সময়ের প্রধান হুমকি নয়। বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার তৎপরতা, লিবারেল অন্তঃসারশূন্যতাকে ঢাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা, আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলার বাস্তবতা বিবর্জিত উদ্যোগই বর্তমান সময়ের প্রধান হুমকি। জিজেকের মতে কখনো কখনো চূড়ান্ত অসহযোগ বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর বলপ্রয়োগের মাধ্যম হতে পারে।

 স্লাভয় জিজেক, ভায়োলেন্স: সিক্স সাইডওয়েস রিফ্লেকশন্স (পিকাডর, ২০০৮)

প্রত্যক্ষবাদী দুর্গে ওগুস্ত ব্লঁকির পরোক্ষ হামলা – লেভিন আহমেদ

অভিজাতবর্গের কাছে প্রত্যক্ষবাদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের বিপ্লব ঠেকানোর হাতিয়ারস্বরূপ। সমাজবিজ্ঞানীদের  ঘাড় থেকে সেই ভূত আজও যায়নি। সমাজবিজ্ঞান চর্চার নামে আজও প্রত্যক্ষবাদের সেই পুরানো মদ সুবাসিত সঞ্জীবনী মোদকরূপে আমজনতাকে গেলানো হচ্ছে। এই বাদের বিরুদ্ধে ওগুস্ত ব্লঁকির লেখা ‘প্রত্যক্ষবাদ সংক্রান্ত নোট’ প্রবন্ধের নির্যাস বর্তমান রচনা

ওগুস্ত ব্লঁকি (১৮০৫-১৮৮১)

ওগুস্ত ব্লঁকি (১৮০৫-১৮৮১)

নামজাদা ফরাশি সমাজতন্ত্রী, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক ওগুস্ত ব্লঁকি (১৮০৫-১৮৮১) ইউরোপের ইতিহাসে সশস্ত্র সংগঠিত অভ্যুত্থানের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তৎকালীন ফরাশি রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে উপর্যুপরি বিদ্রোহ পরিচালনা করেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে প্রতিবারই তিনি রাষ্ট্রের কাছে পরাস্ত হন। ফলে জীবনে একাধিকবার দীর্ঘ সময়ের জন্যে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। কারামুক্তির অব্যবহিত পরে বিপ্লবীদের এক রাজনৈতিক সভায় ভাষণ দেয়ার সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান ব্লঁকি। তখন থেকেই একজন আপোসহীন বিপ্লবী হিসেবে ব্লঁকির খ্যাতি জগতব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সশস্ত্র বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী রাজনৈতিক তত্ত্ব ব্লঁকিবাদ নামে সুপরিচিত।

ওগুস্ত ব্লঁকি (Auguste Blanqui) কার্ল মার্কস থেকে শুরু করে বাল্টার বেনিয়ামিন পর্যন্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকের বিস্ময়দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। ফরাশিদেশে তাঁর সময়ে আরেকজন খ্যাতিমান ব্যক্তির বাস ছিল। তাঁর নাম ওগুস্ত কোঁত (১৭৯৮-১৮৫৭)। কোঁত প্রত্যক্ষবাদের জনক হিসেবে সুপরিচিত। তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। তৎকালীন ফরাশি সমাজে প্রত্যক্ষবাদ ক্ষমতাতন্ত্রের ছত্রছায়ায় নয়া কুলীনধর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। অভিজাতবর্গের কাছে প্রত্যক্ষবাদ হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের বিপ্লব ঠেকানোর হাতিয়ারস্বরূপ। এহেন পরিস্থিতিতে ওগুস্ত ব্লঁকি কোঁত এবং তাঁর প্রচারিত প্রত্যক্ষবাদ মতবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরতে বাধ্য হন। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘প্রত্যক্ষবাদ সংক্রান্ত নোট’ (Notes on positivism) লিখে যান (ইন্টারনেটে লেখাটির ঠিকানা: http://www.marxists.org/reference/archive/blanqui/1869/positivism.htm)।

পরিহাসের বিষয়, প্রত্যক্ষবাদ সমূলে উৎপাটিত তো হয় নি, বরং বিগত দেড়শ বছরে ইউরোপের গণ্ডি পেরিয়ে সুদূর ভারতবর্ষ পর্যন্ত এর শাখা-প্রশাখা পল্লবিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে তৎকালীন ক্ষমতাকাঠামোর প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ফলে ব্রাহ্মণদের পায়ের নিচে যখন মাটি সরে গিয়েছিল, কোঁত প্রচারিত প্রত্যক্ষবাদের জমিনে দাঁড়িয়েই তারা তখন উচ্চকিত রব তুলতে পেরেছিল। ইতিহাসের বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা পাড়ি দিয়ে  পুরানো শতাব্দীর অন্ধকার গর্ভ থেকে নয়া শতাব্দীর উদয় ঘটল। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীদের  ঘাড় থেকে প্রত্যক্ষবাদের ভূত আজও নামল না। সমাজবিজ্ঞান চর্চার নামে আজও প্রত্যক্ষবাদের সেই পুরানো মদ সুবাসিত সঞ্জীবনী মোদকরূপে আমজনতাকে গেলানো হচ্ছে। বর্তমান সময়ের এই নৈরাশ্যকর পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে ব্লঁকির লেখাটির নির্যাসটুকু এখানে তুলে ধরা হল।

ওগুস্ত কোঁত (১৭৯৮-১৮৫৭)

ওগুস্ত কোঁত (১৭৯৮-১৮৫৭)

যা ঘটে তা ভালর জন্যই ঘটে — এই হল প্রত্যক্ষবাদের বিধান। এক সময়ে খ্রিস্টধর্মের বিশেষ ধারা ক্যাথলিকবাদ প্রবল বিক্রমে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখন প্রত্যক্ষবাদের কাছে তাই সত্য ছিল। বর্তমানে খ্রিস্টধর্মের এই শাখা দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রত্যক্ষবাদের কাছে তা ভ্রান্ত বিবেচিত হচ্ছে। সেই হিসেবে সামন্তবাদও আচ্ছা, যতক্ষণ না পর্যন্ত তা ভেঙ্গে পড়ছে। বুড়ি হলেই বুঝি মা দুর্গা ডাইনি হয়ে যান! ব্লঁকির অভিমত, সত্যের এই ভ্রান্ত উপস্থাপন ধারাবাহিক প্রগতির অশুভ তত্ত্ব প্রমাণের জন্যে মোটেও যথেষ্ঠ নয়। শৃঙ্খলাবাতিকগ্রস্ত তত্ত্বপ্রণেতাদের এই বদখেয়াল তাই অপাঙক্তেয় ও হাস্যকর। তারা সমাজতত্ত্বকে গাণিতিক বিজ্ঞানের অনুবর্তী করে তাকে বনসাঁইয়ে পরিণত করতে চান। পরিহাসের বিষয়, প্রত্যক্ষবাদের নামে এসব ছাইভস্ম এখন বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ব্লঁকির মতে কোঁত মশাই জ্ঞানজগতের এক নব্য পুরোহিত। ব্রাহ্মণ। আবিষ্কারের নেশা তাঁর ছিল না। তার পরিবর্তে আচারসর্বস্ব শ্রেণিবিভাগ ও বর্গীকরণ করে তিনি জীবন পার করেছেন। তাও করেছেন নিজের খেয়ালখুশি অনুযায়ী, ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের উপর ভিত্তি করে। প্রত্যক্ষবাদের এই কথিত জনক তাই শেষ পর্যন্ত কিনা উদ্ভট অতীন্দ্রিয়বাদের খপ্পরেই পড়লেন। আপ্তবাক্যবিরোধী এই ব্যক্তি তাঁর কথিত মানবতার ধর্মকে সমস্ত সংস্কার ও যাজকীয় আড়ম্বরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন।

কিন্তু কেন? ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে নাপলেয়ঁ কর্তৃক সংগঠিত কুদেতা তাঁকে ভীতসন্ত্রস্ত করেছিল। কারণ নাপলেয়ঁর এই বিজয় ক্ষিপ্রগতিতে অতীতের সংস্কার-ইমারতকে ভেঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল। এই সাফল্যের মোড় ঘুরিয়ে বিপ্লবকে বেদখল করতেই তিনি তাঁর এই নয়া কুলীনধর্ম প্রণয়ন করেন যা জনগণকে বশে রাখবে এবং সেই সাথে বর্ণব্যবস্থা, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও খ্রিস্টধর্মের যাবতীয় গুণাবলিকেও রাখবে অক্ষত। কিন্তু জ্ঞানের প্রথাগত শাখাগুলোর কর্ণধাররা কেন তবে তাঁকে কঠোর সমালোচনা থেকে বিরত থেকেছেন? কেন তাঁরা কোঁতকে মানবতার শেষ পয়গম্বর বলে ঘোষণা দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি? তাঁরা একদিকে তাঁর পক্ষে কথা বলেন, আবার একইসাথে তাঁকে সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেন না। তাঁর শেষদিককার ভাববাণীগুলোর মধ্যে কিছু ভুলচুক থাকলেও প্রথম দিককার কথাগুলো একবারে অব্যর্থ — এই হল তাঁদের অভিমত।

ব্লঁকির অনুযোগ প্রত্যক্ষবাদ তার গণ্ডির বাইরের সবাইকে অপাঙক্তেয় গণ্য করে এবং আর সব বিপরীত চিন্তাধারাকে অযৌক্তিকভাবে খারিজ করে দেয়। তাই প্রত্যক্ষবাদকে চূড়ান্ত নেতিবাদ বা (নেগেটিবিজম) অথবা  বিনাশবাদ (নিহিলিজম) বলে অভিহিত করলেও অত্যুক্তি হয় না। ব্লঁকির মতে, প্রত্যক্ষবাদ কূটযুক্তির প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়। সমাজবিজ্ঞান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে হেন জালিয়াতি নেই প্রত্যক্ষবাদ যার আশ্রয় নেয়নি। ঐতিহাসিক নথিপত্র বিকৃতির দিক দিয়ে প্রত্যক্ষবাদের সাফল্য পুরোহিত জঁ লোরিকেকেও ঈর্ষান্বিত করে। অথচ প্রত্যক্ষবাদের এহেন ঔদ্ধত্য ভিত্তিহীন। বিজ্ঞানের আলখাল্লা গায়ে দিয়ে প্রত্যক্ষবাদ পূত পবিত্র হতে চায়, বিজ্ঞানকে পরিণত করতে চায় ব্রাহ্মণ্যবাদ ও বাতিল খ্রিস্টধর্মে। কেউ এর চোখে চোখ রেখে কথা কইতে পারে না। প্রত্যক্ষবাদকে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করা চাই। আর যাই হোক, ‘বিজ্ঞান’ বলে কথা! তাই প্রত্যক্ষবাদ আজ রক্ষণশীল নপুংশকদের আত্মরক্ষার ঢালে পরিণত হয়েছে। যারা কোন প্রগতিশীল সমাজবিপ্লবের সাথে যুক্ত না থেকে শান্তিতে জীবন পার করতে চায়, প্রত্যক্ষবাদ সেই জাগতিক সুখবাদীদের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে — এই হল ব্লঁকির বক্তব্য।

সন্দেহের কারণ নেই যে সব বস্তুই পরস্পর সম্পৃক্ত। ঘড়ির প্রতিটি সেকেন্ড পরবর্তী সেকেন্ডকে অনুসরণ করে। কিন্তু মানবজীবনের ঘটনাবলি এবং প্রাকৃতিক জগতের ঘটনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য তফাত রয়েছে। ব্লঁকি উদাহরণ দিয়ে বলছেন, মানব জীবনের ঘটনাবলির দিক প্রতি মুহূর্তে বদলাতে পারে। যেমন ধরুন, একজোড়া  দম্পতি বিয়ে করে বাড়ি ফিরছে। এমন সময় কেউ বরকে  হত্যা  করে কনেকে  হস্তগত করল। এখন মেয়েটির বাচ্চাদের পিতা হবে অন্য একজন। হত্যাকাণ্ডটি ঘটার ফলে ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরে গেল। তাই বলা যায়, সম্পর্ক সব সময়ই রয়েছে, কিন্তু এই সম্পর্কের রূপ বদলাতে কতক্ষণ?

ব্লঁকির অকাট্য যুক্তি — অতীতকে  দুর্লঙ্ঘ সূত্রে সূত্রায়িত করতে গিয়ে একে অযৌক্তিকভাবে মহিমান্বিত করা অন্যায়। ক্যাথলিকবাদের ধ্বজা ধরলে তাই এভাবে ফেঁসে  যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বর্তমানে অবশ্য কেউ নিয়তিবাদের দোহাই দিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মকে টেনে আনতে সাহস পায় না। ব্লঁকি বলেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খ্রিস্টধর্ম তো কিছু দেয়ই নি, বরং বারবার অশুভ চক্রান্তে লিপ্ত হয়ে মানবজাতির অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছে।

ব্লঁকির অভিমত, নিরবচ্ছিন প্রগতির নিয়তিবাদী মতবাদ ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিছু নয়। এই নিয়তিতত্ত্ব ক্যাথলিকবাদকে লুই ফিলিপের আমলে (১৮৩০- ১৮৪৮) ব্যাপক জনপ্রিয়তা দিয়েছিল। নিরবচ্ছিন্ন প্রগতিতত্ত্ব বেনিয়াশক্তি ও গণতান্ত্রিক জাগরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসময় দাঁড়িয়ে যায়। প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যবিত্তরা তখন নিরবচ্ছিন্ন প্রগতির এই ঘোটকী ডিম্বকে সযতেœ তা দিয়েছিল এবং একে সার্বজনীন মানবমুক্তির মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যর্থ চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছিল। সৎ চিন্তা ও ন্যায়বোধ তখন সমাজ থেকে হয়েছিল নির্বাসিত, আত্মসর্বস্বতার মন্ত্রই হয়ে উঠেছিল একমাত্র পুণ্যশ্লোক।

প্রত্যক্ষবাদ পাদ্রীদের আলখাল্লার মত। মধ্যযুগীয় খ্রিস্টধর্মের আফিম গিলে তার প্রশংসা-প্রলাপ বকাই এর প্রধান কাজ। প্রত্যক্ষবাদের কবলে পড়ে দশাপ্রাপ্ত হয়ে ওগুস্ত কোঁত তাঁর সমাজতাত্ত্বিক ইমারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ব্লঁকির তীক্ষè বিদ্রƒপ: এই ইমারতের কাঠপাথরের নিচে তাঁর শিষ্যরা যদি চাপা পড়ত তাও অনেক ভাল হত। ব্লঁকির অভিযোগ, কোঁতের শিষ্যরা ইতিহাসকে কাটছাট করে তা দিয়ে খ্রিস্টধর্মের আলখাল্লা বানিয়েছে। বিজ্ঞান নয়, বাইবেলই কোঁতের প্রকৃত প্রেরণার উৎস। ওগুস্ত কোঁত (পড়ুন ওগুস্ত কাউন্ট) মশায়ের বইয়ের প্রতিটি খণ্ড যেন বিশুদ্ধ বাতেনি বিজ্ঞান!

ব্লঁকির কাছ থেকে আমরা জানতে পাই, মধ্যযুগের সরলরৈখিক বয়ান তৈরি করতে গিয়ে প্রত্যক্ষবাদ চিন্তা এবং ন্যায়ের মহান শহীদদের নাম (যেমন আবেলার্দ, আর্নৌদ দে ব্রেসিয়া, রিয়েনজি প্রমুখ) গোপন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করেনি। অবশ্য প্রত্যক্ষবাদ তাদের চ্যালেঞ্জ করতেও সাহস করেনি। শুধুমাত্র পোপের শাসনকে বৈধতা দেয়ার জন্যে প্রত্যক্ষবাদ ইতিহাসের পাতা থেকে উক্ত চিন্তাবিদদের নাম চক্রান্তমূলকভাবে মুছে ফেলে ক্ষান্ত হয়েছে।  রাজার গদি যদি পোক্ত হয় তবে তাঁর আচার মাত্রই যৌক্তিক ও বৈধ, সিংহাসন নড়বড়ে হলে রাজামাত্রই দুষ্ট — এই হল প্রত্যক্ষবাদের নীতি।

প্রত্যক্ষবাদের ধৃষ্টতা দেখলে অবাক হতে হয়! এই বুঝি সে চন্দ্র সূর্য, গ্রহ নক্ষত্র সব আবিষ্কার করে ফেলে জগতের বস্তুরাশিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরল। জগতের কোন কিছুই বুঝি এর আগে অস্তিমান ছিল না। প্রত্যক্ষবাদই বুঝি জগতের সব কিছু আবিষ্কার করে তার সঠিক বিন্যাসসাধন করল! সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানকে প্রত্যক্ষবাদ জটিল জ্ঞানতত্ত্বের বিষয়ে পরিণত করতে ওস্তাদ। যেমন ধরুন, ‘রেকউই তাঁর নিজের সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারে না’ — এই সাধারণ বাক্যটিকে প্রকাশ করতে প্রত্যক্ষবাদ গোটা পনের পৃষ্ঠা খরচ করে। প্রত্যক্ষবাদের আরো একটি অভিনব আবিষ্কার, ‘প্রত্যেক যুগের পূর্ববর্তী যুগ ও পরবর্তী যুগ রয়েছে।’ ওগুস্ত কোঁত ছাড়া আর কেইবা এমন তত্ত্ব আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন? ব্লঁকি লোকটি রসিক বটেন। তিনি বলছেন,  আমাদের চেহারার ঠিক মাঝখানে কোঁত মশাই একটি দৃষ্টবাদী নাক লাগিয়ে দিয়েছেন। পয়গম্বর মসির আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত এই নকল নাক নিয়েই বুঝি আমাদের চলতে হবে!

সমাজবিজ্ঞান ও ইতিহাসের দর্শন থেকে প্রত্যক্ষবাদ সুকৌশলে ন্যায়ের ধারণাকে অপসারিত করেছে, প্রগতিকে করেছে নিয়তিবাদের রঙে রঞ্জিত। প্রত্যক্ষবাদের মতে, বিকল্প সম্ভাবনা অন্বেষণের চেয়ে বরং বর্তমানে যা আছে তাই আচ্ছা। ভাল কিংবা মন্দ বিচারের কোন মাপকাঠিই প্রত্যক্ষবাদের নেই। ভালমন্দ বিচারের কোন মাপকাঠি যদি থেকেই থাকে তবে তা নাকি অধিবিদ্যায় পর্যবসিত হবে!

ব্লঁকি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, প্রগতির চালিকাশক্তি হল শিক্ষা। ইতিহাস তা-ই আমাদের শেখায়। চিন্তার সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়ার ফলেই জ্ঞানের আলোক বিচ্ছুরিত হয়। এই প্রক্রিয়ার প্রতিবন্ধক সবকিছুই অশুভ অন্ধকার। খ্রিস্টধর্ম চিন্তার মিথস্ক্রিয়া এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। খ্রিস্টধর্মই প্রগতির সবচেয়ে বড় দুশমন।

প্রত্যক্ষবাদীরা এখন নাক সিঁটকিয়ে বলবেন, ছি পাঠক! যা পড়ছেন তা তো কুৎসিত অধিবিদ্যা! ব্লঁকির পাল্টা সওয়াল, বিজয়ী রথের চাকা যেদিকে ঘোরে প্রত্যক্ষবাদীরাও সেদিকে ভিরমি খেয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষবাদের অনুসৃত নীতি অনুসারে, পনেরশ বছর ধরে খ্রিস্টধর্ম রাজাসনে ছিল বলে তাকে প্রগতির পরাকাষ্ঠা হিসেবে দেখতে হবে। আবার খ্রিস্টধর্মের শক্তিক্ষয়ের ফলে এখন তাকে প্রগতির প্রতিবন্ধক হিসেবে চিহ্নিত করলেও দোষ নেই। যে সময় যে রাজা,  নুন খেয়ে তার গুণ গাওয়াই হল প্রত্যক্ষবাদের নীতি। ক্ষমতাতন্ত্রের  ছত্রছায়ায় পাদ্রীর আলখাল্লা পড়ে আরাম কেদারায় বসে জ্ঞানজগতে পা দুলিয়ে মাতবরি করাই প্রত্যক্ষবাদীদের (মহান!) কাজ।

পারি কমিউনের ব্যারিকেড, ১৮৭১। কমিউনের সদস্যরা ব্লঁকি দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন

পারি কমিউনের ব্যারিকেড, ১৮৭১। কমিউনের সদস্যরা ব্লঁকি দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন

ব্লঁকির অভিমত, প্রত্যক্ষবাদীদের কাছে পশ্চাদপসরণই হল প্রগতি, আর প্রগতি মানে পশ্চাদপসরণ। মধ্যযুগের যবনিকাপাত ঘটিয়ে গ্রিক ও লাতিন শিল্পকলার পুনর্জাগরণ তাই এদের কাছে পশ্চাদপসরণ ছাড়া আর কিছু নয়। কেননা এই পুনর্জাগরণ নাকি খ্রিস্টধর্মের ধারাবাহিক বিকাশকে স্তব্ধ করেছে! প্রাচীনত্বের পূজারী প্রত্যক্ষবাদ বর্তমানকে দিচ্ছে ধোঁকা, প্রগতিসমুদ্রে সৃষ্টি করছে মরাকটাল।

নিরবচ্ছিন্ন নিয়তিবাদী প্রগতিতত্ত্ব অকাট মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। ভাগ্যিস গ্রিক ও রোমান সভ্যতা মধ্যযুগীয় খ্রিস্টধর্মের যবনিকাপাত ঘটিয়ে আধুনিক সভ্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। ব্লঁকির বিস্ময়, খ্রিস্টধর্মের এই তিমির ব্যাধি কিভাবে কয়েক শতাব্দীব্যাপী মানবতাকে পঙ্গু করে রেখেছিল তা এক গবেষণার বিষয় বৈকি!

ব্লঁকি মনে করেন ছাপাখানা উদ্ভাবনের মধ্য দিয়েই বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটেছে। আর প্রাচীনের সন্ততি ভেবে প্রত্যক্ষবাদ বিজ্ঞানকে কোলে নিতে চায়। কিন্তু প্রত্যক্ষবাদীরা সাবধান! এই হল সেই বিজ্ঞান খ্রিস্টধর্ম যার নামে কলঙ্ক রটিয়েছে। খ্রিস্টধর্মের অপঘাতে বিজ্ঞানকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। আসুরিক শক্তিকে রুখে দেয়ার জন্য বিজ্ঞান যখন জেগে উঠেছে তখন কোন মুখে খ্রিস্টধর্মের অন্ধ অনুরাগী প্রত্যক্ষবাদ বিজ্ঞানের স্তুতিপাঠ করে ব্লঁকি তা জানতে চান।

ব্লঁকির শাণিত শ্লেষ: প্রত্যক্ষবাদ চোখ ধাঁধানো ভোজবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। চটকদার নামকরণের মাধ্যমে প্রত্যক্ষবাদ সত্যের উপর একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। শুরু থেকেই প্রত্যক্ষবাদ বিজ্ঞানের পেছনে লেগে ছিল। প্রত্যক্ষ বিজ্ঞান (পজিটিব সায়েন্স) নাম দিয়ে প্রত্যক্ষবাদ একসময় বিজ্ঞানকে হস্তগত করে এবং নির্লজ্জভাবে ঘোষণা দেয় যে ‘কোঁতের পূর্বে যা ছিল তাঁর সবটুকুই নেতি-বিজ্ঞান (নেগেটিব সায়েন্স)।’

প্রত্যক্ষবাদ পরিচিত বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখাকে ‘বিশেষ বিজ্ঞান’ (পার্টিকুলার সায়েন্স) হিসেবে শ্রেণিকরণ করেছে, আর বিজ্ঞানকে আখ্যায়িত করেছে প্রত্যক্ষবাদী দর্শন বলে। কোঁতের শ্রেণিকরণের এই হল প্রকৃত দশা। তাঁর মতে মানববিদ্যা হল বিশেষ বিজ্ঞানসমূহের বিজ্ঞান। আহা! ব্রাহ্মণের কৈলাস দর্শন! ব্লঁকির মতে, এই নামপঞ্জির কোন ব্যবহারিক মূল্য নেই। প্রাত্যহিক প্রাসঙ্গিকতাবিহীন এই পঞ্জির দশা ঠিক কাঁচের ভেতরে সাজিয়ে রাখা পুতুলের মত। এই অন্তঃসারশূন্য শ্রেণিকরণের বাইরের ঠমক দেখে আমজনতার চোখ ধাঁধিয়ে যায়। যেনবা বিদ্যাদেবী সরস্বতী তাঁর ময়ূরবাহন ছেড়ে প্রত্যক্ষবাদী কাঠামোর উপর সওয়ার হয়েছেন। যাই হোক, বিদ্যা বলে কথা! মাথায় তুলে রাখতে হবে বৈকি!

ব্লঁকির বিচাওে, প্রত্যক্ষবাদের সারবস্তু যদি কিছু থেকেই থাকে তবে তা হল তার বস্তুবাদ। এই গুণটি বাদ দিলে প্রত্যক্ষবাদের বাকি সব তুচ্ছ এবং অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হল প্রত্যক্ষবাদীরা বস্তুবাদের সত্যকে স্পষ্টভাবে কখনো স্বীকার করে না। তাঁরা কোন সিদ্ধান্তে আসতেই রাজি নন। বস্তুবাদকে অধিবিদ্যায় পর্যবসিত করেই তাদের সুখ।

বস্তুর অনন্ত দশাকে তর্কের খাতিরে স্বীকার করলেও প্রত্যক্ষবাদ বস্তুবাদের আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্যগুলোকে অস্বীকার করে বিমূর্ত কূটতর্কের অবতারণা করে যা সাধারণ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির অগম্য। যদি স্থান ও কালের নিরিখে বস্তুর অসীমত্বকে অস্বীকার করা হয়, যদি আত্মা নশ্বর দেহের গুণ বলে বিবেচিত না হয়, তবে এই আধাখেঁচড়া তত্ত্বকে বস্তুবাদ বলে অভিহিত করার সার্থকতা কি?

ব্লঁকি আরো বলেন, নানান ঠমক ও জমক সহকারে প্রত্যক্ষবাদ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার একই কথা পুনরাবৃত্তি করে চলে। সত্যি বলতে কি, প্রত্যক্ষবাদ জার্মানদেশীয় বিশেষবাদ (পার্টিকুলারিজম) এবং জ্ঞানের বিশ্বজনীন সামান্যবাদকে (ইউনিবার্সালিজম) জঁপমালার দুটি গুটিতে পরিণত করে দিনরাত জঁপতে থাকে। প্রত্যক্ষবাদ যেন সেই রূপকথার ব্যাঙ্গমি, কোন কিছুই যার অবোধ্য নয়। যেন সেই আলাদীনের দৈত্য, কোন কিছুই যার অগম্য নয়। তুরীয় গণিতবিদ্যা থেকে শুরু করে সমাজতত্ত্বের অপাঙক্তেয় খুঁটিনাটি বিষয়েও নাক গলাতে প্রত্যক্ষবাদ দ্বিধাবোধ করে না।

কোঁত মশাই উনবিংশ শতাব্দীর কেবল দুটি চিন্তার ঘরানাকেই শুধু শনাক্ত করতে পেরেছেন এবং আশ্চর্যের বিষয় হল তাদের দুটোই চিন্তার দিক দিয়ে যৌক্তিক একেশ্বরবাদী। বস্তুবাদী ও নিরীশ্বরবাদী ঘরানাকে তিনি ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি। অবশ্য এহেন কর্মের পেছনে ভদ্রলোকটির যুক্তি কম নয়। সিধা কথায় বলতে গেলে, তিনি নিরীশ্বরবাদকে প্রত্যক্ষবাদের মধ্যেই আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। এখন অবশ্য গুরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর শিষ্যরাও নিরীশ্বরবাদের মধ্যে অধিবিদ্যাকে খুঁজে ফেরেন। প্রত্যক্ষবাদ থেকে যদি নিরীশ্বরবাদ ও বস্তুবাদী চিন্তাগুলোকে বাদ দেয়া হয় তবে বাতিকগ্রস্ত শ্রেণিকরণবিদ্যা ছাড়া আর কিই বা অবশিষ্ট থাকে? প্রত্যক্ষবাদ শুধুমাত্র নামের গুণে সমাজবিজ্ঞানের সকল শাখার স্বঘোষিত জনকে পরিণত হয়েছে। ব্লঁকির মতে, কোঁত মশায়ের লেখার এই হল অন্তঃসারশূন্য ঠমক।

১০

ব্লঁকি এখানেই থেমে যাননি। তিনি আরো বলেন, চিন্তার মিথস্ক্রিয়া প্রগতির উৎস এবং এই মিথস্ক্রিয়ার যারা বিরোধী তারাই অশুভ শক্তি। যারা চিন্তার এই মিথস্ক্রিয়াকে অগুণন বৃদ্ধি করে যায় তারাই সত্যের কাণ্ডারি। এভাবে যদি বিবেচনা করি তবে আমরা দেখতে পাই, ছাপাখানার আবিষ্কার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অন্যদিকে খ্রিস্টধর্ম অভিশাপ ছাড়া  আর কিছু নয়। অনুশাসনের বেড়াজালে মানব প্রাণকে শৃঙ্খলিত করতে খ্রিস্টধর্মের জুড়ি নেই। চিন্তার প্রবাহকে রুদ্ধ করে খ্রিস্টধর্ম সত্যকে গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ব্লঁকির অবাক বিস্ময়, প্রত্যক্ষবাদ এই বাতিল ধর্মকেই কিনা নতুন মোড়কে হাজির করছে!

ব্লঁকি বলেন, ‘রিবিয়ু পজিটিব’ (মার্চ-এপ্রিল ১৮৬৯) শিরোনামে ওয়েরবাহ (Wirouboff) মশায়ের প্রবন্ধটি ব্রাহ্মণ্য মোটাবুদ্ধি ও প্রত্যক্ষবাদী বামনত্বের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই খুবসুরত প্রবন্ধটির ছত্রে ছত্রে রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের অক্ষমতা ফুটে উঠেছে। তিনি প্রশ্ন করেন, রাষ্ট্র এবং তার পাচাঁটা প্রত্যক্ষবাদ কবে কোথায় ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পেরেছে? তবুও আমরা বলি, ওঁ সমাজতত্ত্ব, প্রত্যক্ষবাদ কি জয়!

ব্লঁকির সুচিন্তিত অভিমত, রাষ্ট্রের ত্রাসের মুখে জনগণের  জীবনে যখন চিরস্থায়ী জরুরি অবস্থা নেমে আসে, তখন বিদ্রোহ অথবা বলপ্রয়োগের কাছে নতি স্বীকার — এই দুটি পথ ছাড়া বিকল্প কোন রাস্তা খোলা থাকে না। নায়ক ও নির্বোধ — এই দুই চূড়ান্ত বৈপরীত্বের মধ্যে কোন একটিকে বেছে নেয়া ছাড়া তখন আর কোন গত্যন্তর থাকে না।

ব্লঁকির সাফ জবাব, প্রত্যক্ষবাদ যতই  প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী বলে নিজেকে জাহির করুক না কেন, কোঁতের দ্বৈত চরিত্র একটি অপরটির সাথে পরস্পর সম্পৃক্ত। প্রগতির পরিব্রাজক হওয়া সত্ত্বেও খ্রিস্টধর্মের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল অপরিসীম। ‘অপরের পেছনে লেগে থেক না, নিজেকেও অপরের শিকারে পরিণত হতে দিও না’ — এই বাণীই হল তাঁর সংকীর্ণ আত্মকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্নতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

বুদ্ধিবৃত্তিক দুরাচারের রাজনৈতিক জবাব – লেভিন আহমেদ

Vandalismযারা একাত্তরে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের গণহত্যাকে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা বা গৃহযুদ্ধ বলে প্রচার করেন, দুই অঙ্কের কোটায় লোক মারা যাওয়ায় আজ সেটাকে তারা বলছেন গণহত্যা! দক্ষিণগামী রাজনৈতিক-মানবাধিকার তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার এ ঘটনাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে তো বলেই ফেললেন যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নাকি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগের ২৫ বছরে এত মানুষ হত্যা করেনি যা শেখ হাসিনার সরকার শুধু ফেব্র“য়ারি মাসে খুন করেছে। অঙ্ক কষে বলতে হবে, পাকিস্তান আমলে তাহলে ষাট সত্তরজন লোককেও হত্যা করা হয়নি! ভ্রান্তিপূর্ণ এ দাবির মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে তিনি পাকিস্তানের সামরিক শাসনকেই উৎকৃষ্ট শাসন হিশাবে বৈধতা দিলেন।

তিনি তাঁর সাম্প্রতিক একটি লেখায় জানাচ্ছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান নাকি চাকমা, মারমা মান্দিসহ অন্যান্য জাতিসত্তার টুঁটি চেপে ধরবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জনসম্পৃক্তি ও বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে আমলে না নিয়ে যারা ভাষা তথা সাংস্কৃতিক উপাদানকে রাজনীতিকরণের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সরল ও যান্ত্রিক সংযোগ স্থাপন করেন তারা যে ভ্রান্তির কানাগলিতে আটকে পড়েছেন সে কথা বলাই বাহুল্য। বাঙালির জাতিবোধের রাজনৈতিক ধারা আবশ্যিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মপরিচয়ের রাজনীতি হয়ে উঠবে — এমন পরিণতিবাদী (teleological) কথা কেউ যদি ভাবেন তবে সেটা তাদেরই বুদ্ধিবৃত্তির অপুষ্টির লক্ষণ।

তিনি জামায়াতের এই তাণ্ডবকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই হিশাবে চিহ্নিত করেছেন। নরেন্দ্র মোদীকে গুজরাট গণহত্যায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে যদি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, তার পক্ষে হাজারো শিবসেনা দেশজুড়ে তাণ্ডব চালাবে এবং পুলিশের উপর হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেখানেও হতাহতের ঘটনা ঘটবে। এখন তাণ্ডবটি সম্পর্কে কিছুই না বলে পরের ঘটনাটিকে গণহত্যা বলে প্রচার চালানোর মানে দাঁড়ায় পূর্বের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে এড়িয়ে যাওয়া।

জামায়াত-শিবির হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বিনা প্ররোচনায় হামলা চালিয়েছে, দেশজুড়ে রাস্তাঘাটে তাণ্ডব চালিয়েছে, টার্গেট করে আচমকা গুলিবর্ষণ করে এমনকি ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যা করেছে। এ ঘটনাগুলো যেমন সত্য ঠিক তেমনি এটাও সত্য যে পুলিশ বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ায় অনেক নিরাপরাধ লোকের প্রাণহানি হয়েছে। তার দায় প্রশাসনের ঘাড়ে না চাপিয়ে শাহবাগের আন্দোলনকারী এমন কি আন্দোলনের সাথে যারা সংহতি জানিয়ে লেখালেখি করছেন তাদের ঘাড়ে চাপানো এবং কূটতর্ক করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার মতলব ছাড়া আর কিছু নয়।

পুলিশের এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ড প্রকারান্তরে জামায়াত নেতৃবৃন্দের মনোবাসনাকেই পূর্ণ করল যারা গরিবদের ধর্মের নামে উত্তেজিত করে রাস্তায় নামিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। মহামতি ফরহাদ মজহার জামায়াতের এই তাণ্ডবের প্রেক্ষিত বিচার না করেই ঘোষণা দিচ্ছেন এটা নাকি ইসলামের উপর আঘাতের প্রতিক্রিয়া মাত্র। এহেন প্রচার সেকুলার বনাম ইসলাম কিংবা আস্তিক বনাম নাস্তিক এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চক্রান্তেরই অংশ। এ মিথ্যা অপপ্রচার আজ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সরকারি মিডিয়ার প্রচারকেও হার মানিয়েছে। তিনি পুলিশের এই হত্যাকে একাত্তরের গণহত্যার সাথে তুলনা করে একাত্তরের গণহত্যাকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার, এমনকি খাট করছেন।

ডানপন্থী মিডিয়া জামায়াত-শিবির কর্তৃক হিন্দু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে এখন বেমালুম চেপে যাচ্ছে, তাদের কেউ কেউ বলছে এটা অপরাপর মিডিয়ার অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। যারা গৃহযুদ্ধের জুজু দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বানচাল করতে চেয়েছে এখন তারাই দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর জন্য সচেষ্ট। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না বলে অবশ্য সংখ্যালঘু উচ্ছেদ বা নিধন প্রচেষ্টা বললে যথার্থ হয়।

ফরহাদ মজহার শাহবাগের ফাঁসি চাই দাবিকে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’ প্রচেষ্টার সমতুল্য বলে প্রচার চালাচ্ছেন। এটা ঠিক যে আন্দোলনকারীরা বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখতে না পারায় জনগণ কেমন রায় চায় সেটাও জানিয়ে দিতে আপত্তি করছে না। এখন যারা বিচার স্থগিত করে রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থাকে আমূল সংস্কারের কথা বলছেন তারা এক হিশাবে বাঙ্গালিকে হাইকোর্ট দেখাতে সচেষ্ট হয়েছেন সে কথা বলাই বাহুল্য। আন্দোলনকারীরা যে বিচার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চায় না তা নয়, সেই দীর্ঘপ্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পাশাপাশি তারা সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের যে কোন মূল্যে দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে চায়। এমন প্রমাণিত অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি তারা চায়। যারা মানবতার দোহাই তুলে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তিকে রদ করতে চায় তারা তো এতদিন সর্বোচ্চ শাস্তি হিশাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার যে বিধান তার উৎখাতে সচেষ্ট হয়নি। কাজেই এখন মৃত্যুদণ্ড বিরোধিতার মানে দাঁড়ায় যুদ্ধাপরাধীদের যে কোন মূল্যে রক্ষা করে তাদের আবার রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করা।

একাত্তরে যে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূচনা ঘটেছিল তারই ধারাবাহিকতা হিশাবে শাহবাগের আন্দোলনকে পাঠ করতে হবে। এর সাথে ফ্যাসিবাদের কল্পিত সম্পর্ক রচনা বুদ্ধিবৃত্তিক দুরাচারের লক্ষণ বৈ নয়। বরং ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে সুনিশ্চিত করাই শাহবাগ আন্দোলনের লক্ষ্য। শাহবাগ আন্দোলনের সাথে সরকার আছে বটে কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থনের দরুন এই আন্দোলনের তাৎপর্য কোনভাবেই ম্লান হয়নি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় যে কলঙ্কের দাগ এখনো আমাদের গায়ে লেগে আছে তা মুছে ফেলার ডাক দিয়েছে শাহবাগ। শাহবাগ আন্দোলন উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে তো দেয়নিই বরং উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আপন জাতিবোধের একটি জনসম্পৃক্ত ধারার রাজনৈতিক উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ জাতি পেশার লোকজন একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী আকারে হাজির হতে পারে।

আর চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিটি একটি গণদাবি — কেবল তারুণ্যের অথবা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের দাবি নয়। কাজেই শাহবাগ কেবলমাত্র তারুণ্যের প্রতিনিধি নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা তথা স্বাধীন সার্বভৌম শোষণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে লালন করে এমন সকল বয়সের সকল পেশার লোকের প্রতিনিধি হিশাবেই উপস্থিত শাহবাগ।

ফরহাদ মজহারের টকশোর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া – লেভিন আহমেদ

সাংস্কৃতিক উপাদানকে রাজনীতির পরিসর থেকে উৎখাত করা কোন বিপ্লবী মতাদর্শের রাজনৈতিক লক্ষ্য হতে পারে না। কোন না কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে এবং স্বাভাবিকভাবেই যে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো থেকে তার রসদ সংগ্রহ করে। তাই মত-নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণা আকাশ-কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।

বাঙ্গালির জাতিবোধ গোড়া থেকেই একটি রাজনৈতিক অভিব্যক্তি। এদেশে বাঙ্গালির জাতিবোধ কেমন করে আধিপত্যশীল ইসলামকেন্দ্রিক রাজনীতিকে টেক্কা দিয়ে পূর্ববাংলার জনতাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রন্থিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করল তা ইতিহাসের আলোয় না দেখলে বোঝা যাবে না।

কালের পরিক্রমায় একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবার নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের নামে ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় সামিল হচ্ছে এবং নব্য পুঁজিপতি ও দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল মিডিয়া তাদের এই প্রচেষ্টায় ঘৃতাহুতি দিচ্ছে। তথাকথিত বিপ্লবী ইসলামপন্থীরাও আজ জামায়াতে ইসলামী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে নীরব থাকায় বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির সবকটি ধারাই প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ফ্যাসিবাদের মোহনায় এসে আজ এক হয়েছে। তাদের এই অপতৎপরতা প্রতিরোধে আজ জেগে উঠেছে শাহবাগ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সংখ্যালঘু স¤প্রদায় ও ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর নারী-পুরুষগণও সেখানে সমানভাবে তৎপর। তারা এতদিনে বুঝে ফেলেছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা যে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিকল্প নির্মাণ করেছে সেখানে কখনো তাদের ঠাঁই হবে না। কিন্তু বাঙ্গালি জাতিবোধের রাজনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেখানে তাদের পরিপূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারার সমূহ সম্ভাবনা এখনো জারি আছে।

সংখ্যাগুরুকে ভিকটিম বানানোর মধ্য দিয়েই সকল ফ্যাসিবাদের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে আজকে বলা হচ্ছে মুসলমানরা নাকি নির্যাতিত! কিন্তু কে না জানে আওয়ামী লীগের বিশুদ্ধ মুসলমানিত্ব! জামায়াত-শিবির নির্যাতনকে মুসলমান নির্যাতনের সমার্থক যারা বলছেন তারা এদেশে ফ্যাসিবাদের সদর রাস্তাটিকেই বরং প্রশস্ত করে দিচ্ছেন।

জনসম্পৃক্ত বাঙ্গালি জাতিবোধের শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারাটির (যাকে শহীদ জননী জাহনারা ইমাম বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারা হিশাবে চিহ্নিত করেছেন) উত্থানের প্রেক্ষিত আমাদের ইতিহাসের আলো ফেলে দেখতে হবে। বাঙ্গালি জাতি যুগ যুগ ধরে নিষ্পেষিত হয়েছে বিধায় যখন তারা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করল তখন তা বাঙ্গালি জাতিবোধের রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর নির্মিত হলেও এ রাষ্ট্র ভিন্ন জাতিসত্তার অংশীদারিত্বকে স্বীকার করতে সক্ষম যদি না রাষ্ট্রটিকে উগ্রজাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি গ্রাস করে ফেলে। শাহবাগ যেমন সা¤প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রতিরোধ করেছে, ঠিক তেমনি উগ্রজাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির বিপক্ষেও সোচ্চার হয়েছে। তাই শাহবাগের রাজপথে আজ শুনতে পাই: ‘আমি কে তুমি কে, চাকমা মারমা বাঙ্গালি।’ অথবা ‘আমি কে তুমি কে, গারো চাকমা সাঁওতাল বাঙ্গালি।’

আরেকটা কথা বলা জরুরি। রাজীবকে নাস্তিকতার কারণে হত্যা করা হয়নি, বরং শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠক হিশেবেই তাঁকে নিকেশ করা হয়েছে। কাজেই প্রজন্ম চত্বরে তাঁকে শহীদ ঘোষণা করা অন্যায় হয়েছে বলে মনে হয় না। নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রাজীবের নাস্তিকতা ও ইসলামবিদ্বেষকে ফলাও করে প্রচার করে প্রকারান্তরে তাঁর হত্যাকাণ্ডকেই বৈধতা দেয়া হচ্ছে। রাজীবের নাস্তিকতা শাহবাগের উপর আরোপ করার জন্যই পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। শাহবাগ ভীরুর মতন রাজীব প্রশ্নে সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি, বরং আন্দোলনের গায়ে কলঙ্কতিলক পড়বে জেনেও আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিশেবে রাজীবকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে ন্যায়বিচারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে।

আজকে যখন ফরহাদ মজহার রাজীবকে শহিদ ঘোষণা নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন আমাদের তা ব্যথিত করে। যে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি দখলদারের হাতে মারা যায় সে কি শহিদ নয়? একজন দুষ্কৃতিকারী যদি একাত্তর সালে পাকিস্তানিদের হাতে মারা পড়ত, তবে কি তাকে আমরা শত্র“র হাতে প্রাণ হারানো এক নাগরিক না বলে নিছক দুষ্কৃতিকারী হিশেবে চিহ্নিত করতাম?

মিথ্যার রাজনৈতিক মঞ্চায়নে কপট যুক্তি থাকতে পারে, তাতে সত্যের প্রতিষ্ঠা হয় না। যারা এ ধরনের গুপ্তহত্যা এবং একাত্তরের রাজাকারদের গণহত্যা, ধর্ষণ এবং লুণ্ঠনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছেন, তারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির স্বার্থেই ইসলামের রাজনীতিকরণ করছেন — ঠিক যেমনটি করেছিলেন পাকিস্তানের স্বৈরশাসকগণ।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতা – ভূমিকা ও তর্জমা: লেভিন আহমেদ

(C) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

(C) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১৩ ফেব্র“য়ারি ১৯১১ — ২০ নভেম্বর ১৯৮৪) উপমহাদেশের অন্যতম উর্দু কবি ও মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী। তিনি ১৯৬২ সালে বিখ্যাত লেনিন পুরস্কারে ভূষিত হন। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরতে গিয়ে জেলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ঝলসে উঠেছিল তার ক্ষুরধার লেখনী। তীব্র ভাষায় তিনি তখন পাক হানাদার বাহিনীর এই ভূমিকার সমালোচনা করেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ দেখে ফয়েজের চোখে যা ধরা পড়েছিল তা কেবল রক্ত নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু। ফয়েজ যা দেখেছিলেন গর্ভের খুনমাখা নবজাতক বাংলার গভীরে, তা রক্তের বয়ে চলার তাড়না। এই খুন জমাট-স্থির মৃত্যুস্বরূপ নয়। এই রক্ত প্রবহমান যা বাংলার অনাগত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক রঞ্জিত করে ছুটে যেতে চায়। ভাষার অধিক যা তাই যদি হয় কবিতা, তবে ফয়েজের কবিতা বাংলার রক্তস্নাত আবির্ভাবের স্থিরচিত্র ধরে রাখে নাই, বরং ধরেছিল তার প্রবহমানতা। শাহবাগের এই গণজোয়ার ইতিহাসের প্রবহমানতারই নিদর্শন যার নাম মুক্তিকামী রক্তস্রোত। এহেন ইঙ্গিত আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন কবিদের বিপ্লবী শ্রী ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ।

কোথাও কোন চিহ্ন নেই খুনের

কোথাও কোন চিহ্ন নেই,
কোথাও কোন চিহ্ন নেই খুনের
নেই কোন রক্তের দাগ
আততায়ীর হাতে
অথবা নখের কোনায়

জামার হাতা
দেয়ালে
অথবা ছোরায়
বেয়নেটের মাথায়
চিহ্ন নেই,
কোথাও কোন চিহ্ন নেই খুনের।

এই অদৃশ্য খুন ঝরেনি কোন রাজার খাতিরে
বদান্যতার প্রতিদানস্বরূপ, অথবা ছিল না তা কোন ধর্মীয় উৎসর্গ

পারমার্থিক মুক্তির প্রত্যাশায়
যুদ্ধক্ষেত্রে এই খুন ঝরেনি খ্যাতির আশায়
উদ্যাপিত হয়নি কোন ব্যানারের হরফে।

আব্বা-আম্মা খুনের এই এতিম রক্ত চিৎকার করেছে
ন্যায়বিচারের জন্য;
যদিও কারও সময় হয়নি এই আর্তনাদ শোনার।

কোন সাক্ষী ছিল না, ছিল না কোন প্রত্যক্ষদর্শী;
অভিযুক্ত হয়নি কেউ।
এই রক্ত তাদেরই যারা ধুলোয় ঘর বেঁধেছিল,
অন্তিমকালে ধুলির তরেই এই খুন মিশে গেছে ধুলোয়।

চল আজ বাজারে চল

অশ্রু ভেজা চোখ, কম্পিত হৃদয়
আর গোপন প্রেমের অনুনয় যথেষ্ঠ নয় আজ।
শৃঙ্খলিত পায়ে তাই চল আজ জনসমক্ষে চল।

চল উন্মীলিত করতলে উদ্দাম নৃত্যসহ গানে,
ধুলিভর্তি মাথা আর খুন নিয়ে বুকে,
চল যাই যখন সারা শহরের প্রেমিকেরা
তাকিয়ে আছে শুধু আমাদেরই পানে।

শহরের শাসক ও কৌতূহলী জনতার ভীড়
অভিযোগের তীর এবং পাথরের ঢিলে
এই বিষণ্ণ সকাল আর নিরুদ্দেশ দিনে
আমরা ছাড়া এখানে জীবন দেয়ার কে আছে?
আমরা ছাড়া এই শহরে কারাই বা প্রস্তুত?

ঘাতকের হাতের উপযুক্ত আমরা ছাড়া আর কারা?

পাততাড়ি গোটাও হে ভগ্ন হৃদয়
বন্ধু চলো যাই
মরি ঘাতকের হাতে আবার।

লাহোর জেল, ১৯৫৯

জনতার কাছেই প্রশ্নের উত্তর – লেভিন আহমেদ

২০০৭ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক বাহিনীর অবস্থান ও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত ছাত্র বিক্ষোভের স্মৃতি ম্লান হওয়ার আগেই আবার কম্পিত হল শাহবাগের রাজপথ। সেই সাথে তারুণ্যের কণ্ঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে শোনা গেল মুহুর্মুহু উত্তপ্ত শ্লোগান। শাহবাগের এই আন্দোলন তবে কি রাজনীতির আকাশে নতুন সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস? এই প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখেই অভূতপূর্ব এই গণজাগরণ নানান দিক থেকে আমাদের কাছে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে।
প্রজন্ম চত্বরের এই আন্দোলন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ভিত্তিমূলে নাড়া দিয়েছে এবং অসাম্প্রদায়িক জনতাকে একটি রাজনৈতিক পাটাতনে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। জনতা এখন তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত হয়েছে। তারা রাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে ক্ষমতাসীন দলের আপোসকামী রাজনৈতিক চালকে ইতিমধ্যে বানচাল করে দিয়েছে। এই আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির জাতিবোধের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করে দিল, একই সাথে ভোগবাদী সংস্কৃতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত তরুণদের নিয়ে আসল রাজপথে। তরুণদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে এই প্রথম ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোন রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। শ্লোগানেও এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। যেমন অনেককে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘তুমি কে আমি কে, পাহাড়ি বাঙালি।’ তাছাড়া নারীর সামাজিক স্থানবণ্টন ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এই আন্দোলন। নারীরা যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার আন্দোলনে তাদের ব্যাপক উপস্থিতির মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয়েছে।
এই আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হলেও বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উৎপাটিত করে নতুন সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলন যে বাংলাদেশে অসম্ভব নয় এই গণজাগরণ তারই ইঙ্গিতবাহী। আশার কথা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী দলগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎপরতাকে প্রতিরোধের দাবিও আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে উঠে এসেছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মধ্যবিত্ত তরুণদের সংখ্যাই বেশি যারা তাদের শ্রেণিসত্তার নিগড়ে আবদ্ধ থাকলেও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রশ্নে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে। এই আন্দোলন নজির দেখাল সঙ্কটে সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে এই তরুণেরাই সাম্প্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ এবং ক্ষমতার যেকোন পুঞ্জিভবনের বিপরীতে অবস্থান নিতে সক্ষম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা বাঙালির জাতিবোধ আওয়ামী লীগের একচেটিয়া কোন মতাদর্শ নয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবোধের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা আমাদের সামনে হাজির হল যার পাটাতনে দাঁড়িয়ে সাম্যবাদী রাজনীতির জমিন উর্বর করার চিন্তা সম্ভব হয়ে উঠছে।
সমাজে শ্রেণিবৈষম্য থাকলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের সম্ভাবনা থেকেই যায়। শুধুমাত্র আইন করে একে দমানো সম্ভব নয়। আশার কথা এই যে তরুণ প্রজন্মের একাংশ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি সকল ধরনের নিপীড়নমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিলোপের জন্যও ধীরে ধীরে সোচ্চার হচ্ছে। বাজারসেবী উদারনৈতিক গোষ্ঠী এবং তাদের ভাড়াটে সংস্কৃতিসেবী মিডিয়া এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মেজাজকে প্রশমিত করে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার জন্য সচেষ্ট রয়েছে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদ শব্দটাকে মুড়িমুড়কির স্তরে নামিয়ে এনেছে দক্ষিণগামী অপশক্তি। তারা তারুণ্যের এই নবজাগরণকে গোড়াতেই ফ্যাসিবাদের উত্থান বলে রায় দিয়েছে। তাদেরও জনগণ ইতিমধ্যেই দুশমন হিশেবে চিহ্নিত করে ফেলেছে।
আন্দোলন বিচ্ছিন্ন মানুষকে গ্রন্থিবদ্ধ করে জনজীবনে রাজনীতির উন্মেষ ঘটায়। রাজনীতির গ্রন্থিতে সম্পৃক্ত জনতাকে অজ্ঞ কিংবা হুজুগে ভাবার কোন কারণ নেই। তাদের কাছেই রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান রয়েছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন সময়ের মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ নির্ধারিত হবে। একবিংশ শতাব্দীর মুক্তিযোদ্ধা ও নব্যরাজাকারদের চেহারাও এই আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হবে। যারা এদেশের নাগরিক হয়েও বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির পদলেহন করেছে তাদের প্রতীকী নামই রাজাকার। সা¤্রাজ্যবাদের দোসর পুরানো এবং নব্যরাজাকার উভয়কে গণআন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করার মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এই পুনরাবৃত্তি মানে পুরাতনের অধিষ্ঠান নয় বরং নতুনের মধ্য দিয়ে পুরাতনের উত্তরণ এবং সঞ্জীবন।