Tag Archives: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

কবি বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ : দ্বিতীয় পর্ব–মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

এমতাবস্থায় ভারতের কোন সীমান্ত এলাকায় চলে যাওয়া তোমাদের জন্য উত্তম হবে। ভারতীয় বেতার শুনে মনে হচ্ছে ওরা আমাদের সংগ্রামের সমর্থক। কাজেই একজনও যদি ভারতীয় শ্রোতা পাওয়া যায় ওতেই কাজ হবে। ওদের বেতার থেকে তা ভালোভাবে ফ্ল্যাশ করা হবে। অন্যদিকে ট্রান্সমিটারটি ভারতীয় সীমান্তে ইনস্টল করা হলে নিরুপদ্রবে অনুষ্ঠান প্রচার করে যাবে। তাঁর ভাষায়, ‘ওখানেও ওদের যন্ত্রে ধরা পড়বে, ঠিক কোন জায়গা থেকে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু ওরা বিমান হামলা করতে পারবে না। কারণ বর্ডার এলাকায় বোমা ফেলার জন্যে ডাইভ দিতে গেলে বিমানের ‘ল্যাজ’ ইন্ডিয়ার ওপর দিয়ে ঘুরে যাবে। তখন তো রক্ষা নেই।’

মোসলেম খানের পরামর্শে ভারতের সীমান্ত অঞ্চল রামগড়ে ট্রান্সমিটারটি নিয়ে যাওয়ার নিয়ত করে তারা। ২ এপ্রিল পটিয়া থেকে রামগড় যাওয়ার সহজ নির্বিবাদ রাস্তার খোঁজখবর নেয়া হয়। ১ কিলোওয়াটের ট্রান্সমিটারটি দু’একদিনের মধ্যে রামগড় পাঠাবার দায়িত্ব নেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী। ৩০ মার্চ বোমা হামলার পর থেকে ১০জনের ক্ষুদে টিমের দু’জন আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ও রেজাউল করিম চৌধুরী বিচ্ছিন্ন ছিল। ৩ এপ্রিল সকালে ড্রাইভার এনামুল হকের লিভার ব্রাদার্সের মাইক্রোবাসে ঐ ২ জন ছাড়া বাকি ৮ জন ও সেকান্দার হায়াত খানসহ ওঁরা রমাগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। (ড্রাইভার এনামুল হকের এই মাইক্রোবাসেই ৩১ মার্চ কালুরঘাট থেকে ওঁরা ৯ জন পটিয়ায় আসে।) যাওয়ার পথে ফুলতলিতে ভাগ্যক্রমে তাঁদের সাথে মোলাকাত হয় নইলে হয়তো তাঁরা বিচ্ছিন্নই থাকত। তাঁদের রুট ছিল, পটিয়া-ফুলতলি (বোয়ালখালি)-কপ্তাই-রাউজান-নাজিরহাট-ফটিকছড়ি-রামগড়। রামগড়ে পৌঁছার মধ্যদিয়ে সমাপ্তি ঘটে দমহীন কর্মব্যস্ত একটি পর্বের। বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে মোটামুটি এইটুকুই ছিল ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৩টি পর্যায়ের আদি বা প্রথম পর্যায়।

‘৩ এপ্রিল সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে আমরা রামগড়ে পৌঁছেছিলাম। সীমান্ত নদীর তীরে রামগড় থানা।… থানার সামনে মাইক্রোবাস থেকে নেমেই এইচ টি ইমামের সম্মুখীন হয়েছিলাম।… কাছে টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ রেখে বলেছিলেন: ইন্ডিয়ান অথরিটি একটা ট্রান্সমিটার দিয়েছেন গতকাল। চালাবার লোক নেই। এখনই দু’জন ব্রডকাস্টারকে নিয়ে নৌকায় ওঠো। একজন বাংলার, একজন ইংরেজির।’

ঐ দিন সন্ধ্যায় তাঁরা সীমান্ত পার হয়ে সাবরুম থানায় ঢোকে। এরপর আরও প্রায় দেড় ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা বাগাফা পৌঁছায়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯২ হেড কোয়ার্টাস। তারপর খানিক পথ যাওয়ার পর একটি বাঁশের ঘরের সামনে তাঁদের জিপ থামে। ঐ দিনই রাত ১০ টায় ঐ ঘরের ২০০ ওয়াট শক্তির শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে সম্প্রচার করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্যারের প্রথম অধিবেশন। এই অধিবেশনটির স্থিতিকাল ছিল প্রায় ১ ঘন্টা।

তাঁদের সাথে মেজর জিয়াউর রহমানের এখানে আবার দেখা হয়। জিয়াউর রহমান ও এইচ টি ইমামসহ তারা ঐ রাতেই রামগড়ে ফিরে আসে। ৪ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৬ জন কর্মী রামগড় থেকে  স্থায়ীভাবে বাগাফায় চলে আসে। সাথে ছিল এ কে খানের ছোট ছেলে শামসুদ্দীন খান জাম্বু। আর একজন ভারতীয় শিখ — ট্রান্সমিটার অপারেটর — অমর সিং। এই টিমটা শালবাগান যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওখান থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্যক্রম চালায়। ৪ এপ্রিল রামগড় থেকে সবাই বাগাফা গেলেও ৬ জন ছাড়া বাকিদের রামগড়ে প্রত্যাগমণ করতে হয়েছিল। কারণ  বাগাফা হেড কোয়ার্টাসের ভারপ্রাপ্ত অফিসার কর্নেল (?) ঘোষ ৩ এপ্রিল বলে দিয়েছিল, ‘ইয়ংম্যান, তোমরা ছ’জন পারমানেন্টলি চলে আসবে। রোজ আনা-নেয়ার ট্রান্সপোর্ট দেয়া যাবে না।’

সীমান্ত রক্ষীবাহিনী হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেয় তাঁদেরকে আর  বাগাফায় রাখা হবে না। স্থানান্তরিত করা হবে শালবাগানে। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ হেড কোয়ার্টাসে। শালবাগান আগরতলা শহরের সন্নিকটে। যেখানে বাংলাদেশের নেতাদের অফিস আছে। ফলে সংবাদ তথ্য সংগ্রহের সুবিধা হবে। তাছাড়া এখানে ৪০০ ওয়াট শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। ৮ এপ্রিল বাগাফায় সকাল বেলার অধিবেশন শেষ করে শালবাগান অভিমুখে রওয়ানা করা হবে। সান্ধ্য অধিবেশন প্রচার করা হবে শালবাগান থেকে।

‘শালবাগানে আমাদের রিসিভ করেছিলেন কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ ব্যানর্জী। সিভিল পোশাকধারী সুদর্শন প্রৌঢ়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর তথ্য ও জন-সংযোগ বিভাগের লোক। …বলেছিলেন: এক দু’দিন বিশ্রাম। এখানে সিগনাল থেকে অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। সব ঠিকঠাক করা লাগবে। এই সুযোগে আপনারা ভালো প্রোগ্রাম তৈরি করুন। কথিকা লিখুন।’

শালবাগান ট্রানজিট ক্যাম্পে বেতার কর্মীদের থাকা খাওয়ার অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। কালুরঘাট ত্যাগের পর থেকে বলতে গেলে তাঁরা এক কাপড়েই ছিল। শালবাগানে কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ ব্যানার্জী কুঞ্জবনে এম আর সিদ্দিকীদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের ব্যাপারে বলে তিনি আগরতলার বাইরে গিয়েছিলেন। বেতার কর্মীদের ভাল মন্দ দেখ ভাল করার কথা বলে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে বেতার কর্মীদের করুণ অবস্থা দেখে মনে খুব আঘাত পান। সব পরিকল্পনা বাতিল করে তিনি তাদের নিয়ে কুঞ্জবনে যান। আগরতলা শহরের প্রান্তিক এলাকা কুঞ্জবন। কৃষি বিভাগের রেস্ট হাউসে এম আর সিদ্দিকীর অফিসের সামনে জিপ থামে। সিদ্দিকী মহোদয়ের উপর খুব চটে গিয়েছিলেন ব্যানার্জী বাবু। ‘অমনি ফেটে পড়েছিলেন কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ বানার্জী। বলেছিলেন: ওরা কেমন আছে, দেখতেই তো পাচ্ছেন।… খাওয়া-শোওয়া কিছুরই ব্যবস্থা তো ছিল না ওদের এই তিনদিন! এভাবে থাকতে হলে কি করে কাজ করবে?’

অবস্থাগতিকে স্থির হয়েছিল, ‘আর সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে নয়, আগরতলা শহরেই আমাদের রাখা হবে। আমাদের ট্রান্সমিটারের কাছে নেয়া হবে না।… সবই হবে পূর্বাহ্নে রেকর্ডকৃত।… সেই জিপ-এ করেই উপনীত হয়েছিলাম ৯১২, কর্নেল চৌমুহনিতে। আগরতলা শহরের প্রাণকেন্দ্র। বেশ বড়োসড়ো বাড়িটি। অনেকগুলো কক্ষ এবং একখণ্ড প্রাঙ্গণ।’

তালেবেতালে ৮ এপ্রিল সকালে বাগাফায় প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত এই সাড়ে ৩ দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল স্তব্ধ। সম্প্রচার করা যায়নি কোন অনুষ্ঠান।

‘৮ এপ্রিল প্রভাতী অধিবেশনের পর তিনদিন বিরতি। আবার শুরু হয়েছিল ১২ এপ্রিল প্রভাতী অধিবেশন দিয়ে। … ৪০০ ওয়াট ক্ষুদ্র তরঙ্গ ট্রান্সমিটার। মিটার ব্যান্ড ৮৩.৫৬।’ ১২ এপ্রিল অধিবেশনের অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হয়েছিল সার্কিট হাউসের বাড়িতে। পরবর্তী অনুষ্ঠানের যাবতীয় রেকর্ডগুলি হয়েছিল সার্কিট হাউসের গ্যারেজ কক্ষে। ‘পরবর্তী দিনগুলোতে গ্যারেজকক্ষেই রেকর্ডিং-এর ব্যাবস্থা চালু হয়েছিল। টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেটে অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হতো। সেই রেকর্ডিং কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ বানার্জী নিয়ে যেতেন এবং ট্রান্সমিটিং-এর ব্যবস্থা করতেন।’

কর্নেল চৌমুহনিতে তাঁদের বেতারের কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন করতে বলা হয়েছিল। এত পরিচিত মুখের ভিড়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা ছিল যারপরনাই কঠিন। এ ব্যাপারটি জানানো হয়েছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে।

বেতার কর্মীদের গোপনীয়তার খাতিরে ২০ এপ্রিল তাঁদের জেল রোডের বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। এ বাড়িতে ঢোকার পূর্বে সবার নাম পাল্টানো হয়েছিল। বেলাল মোহাম্মদ নিয়েছিল লালমোহন ছদ্মনাম। “আমার বাল্যস্মৃতিসমৃদ্ধ প্রিয় নাম। সন্দ্বীপের মুসাপুর গ্রামের  লালমোহন সেন ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের কনিষ্ঠতম (?) সদস্য। … মুস্তফা আনোয়ার নাম নিয়েছিল ‘শক্তি’; প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নামে। আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ‘সুভাষ’; সুব্রত বড়–য়া ‘সুনীল’; পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকদের নাম।” এখানে মেস করে খাওয়া দাওয়া করত। পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু এক মহিলাকে রাখা হয়েছিল রান্নাবান্না করার জন্য।

ইতিমধ্যে, ‘১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি রামগড়ে আনা হয়েছিল ১০ এপ্রিল বেলা ২টায়। বাশেদুল হোসেন ও আমিনুর রহমান রামগড় থেকে পটিয়া ফিরে গিয়েছিলেন ট্রান্সমিটারের জন্যে। গিয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর জিপে। ফটিকছড়ি হয়ে হাটহাজারি-গহিরা-মদনহাট-রাঙ্গুনিয়া-পাহাড়তলি-চন্দ্রঘোনা-কাপ্তাই। কর্ণফুলি নদী পার হয়ে বান্দরবান-দোহাজারি-পটিয়া, পটিয়ায় মেজর মীর শওকত আলীর সঙ্গে তাঁদের দেখা। কিন্তু পটিয়া মাদ্রাসায় ট্রান্সমিটারটি ছিল না। (উল্লেখ্য, ১৭ এপ্রিল পটিয়া মাদরাসায় বোমা  ফেলা হয়েছিল। আর এ এলাকার এম এন এ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরীর সদস্যপদ বাতিল করা হয় ট্রান্সমিটার চুরির অজুহাতে।) সরিয়ে নেয়া হয়েছিল বান্দরবানের সি এন্ড বি গুদামে। রাশেদুল হোসেন ও আমিনুর রহমান ৮ এপ্রিল সকালে দোহাজারি হয়ে বান্দরবানে পৌঁছেছিল। ওয়াপদা-র একটি পিক-আপ-এ তোলা হয়েছিল ট্রান্সমিটার ও যন্ত্র সরঞ্জাম। আবার ফিরতি পথচলা। চন্দ্রঘোনা হয়ে রাঙ্গুুনিয়া-পাহাড়তলি-মদনহাট-গহিরা-হাটহাজারি-ফটিকছড়ি।… ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার ইনস্টল করার স্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল বাগাফা-বেলোনিয়া  সড়কসংলগ্ন ফরেস্ট হিল-এ। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দশ মাইল দূরে।…  …১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি ১২ এপ্রিল যথাযথভাবেই ইনস্টল করেছিলেন তাঁরা। এবং নিজেদের কণ্ঠে ঘোষণা প্রচার, রেকর্ডেও গান প্রচার ছাড়াও সৈয়দ আবদুশ শাকের নিজের লেখা কথিকাও প্রচার করেছিলেন।’ এই ট্রান্সমিটার থেকে সম্ভবত ২৪ মে পর্যন্ত  অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়েছিল। ‘সেটি ২৪ মে ১৯৭১-এর পর থেকে আগরতলায় সংরক্ষিত ছিল। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ নং হেড কোয়ার্টার্সে — শালবাগানে। পরে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।’

২০ এপ্রিল রাতে ‘আকাশবাণী’র খবর শুনতে গিয়ে তাঁরা চমকিত হয়েছিল। ‘সংবাদ বুলেটিনের মধ্যেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল: ‘এই খররের পরপরই এখানে শ্রুত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাষণ পুনঃপ্রচার করা হবে।’

অথচ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র  থেকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রচার করা হয়নি। ব্যাপারটি হচ্ছে, “অল ইন্ডিয়া রেডিও-র শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে ভাষণ প্রচার করেছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। সেটা আরো আগে। এপ্রিলের প্রথম দিকে (১২)। শিলিগুড়ি কেন্দ্রের একটি অতিরিক্ত (স্পেয়ার) ট্রান্সমিটার এজন্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ প্রচারের তাগিদে ট্রান্সমিটারটির নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। তখন থেকে ট্রান্সমিটারটি নিবেদিত  হয়েছিল নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচারের জন্যে। মিডিয়াম ওয়েভে ট্রানজিস্টার সেটে আমরা একদিন পেয়ে গিয়েছিলাম। ঘোষণা শুনেই চমকে উঠেছিলাম। ‘সোয়াধীন বাংলা বেয়তার কেনদর’ পরিষ্কার একটি অবাঙালি কণ্ঠ।”

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

বিভ্রান্তি ঠেকাতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বলে কয়েক দিন পরেই এ সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কালুরঘাট থেকে ভারতে চলে যাওয়ার পরেও অস্থায়ী সরকারের নেতাদের বিভিন্ন ঘোষণা, প্রচারপত্র বা সংবাদ ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে হচ্ছে। এটা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতি বাংলাদেশি নেতৃত্বের অমনোযোগিতার প্রকাশ। মূলত ২৫ মে অবধি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভাল মন্দ সরাসরি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই ছিল।

কালুরঘাট পর্যায়ে যথা সময়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচার ছিল দুঃসাধ্য কাজ। আগরতলা পর্যায়েও প্রথম দিকে ধরাবাঁধা সূচিতে কাজ চালানো যায় নাই। তবে এ পর্যায়ের শেষের দিকে অনুষ্ঠানের রূপরেখা দাঁড়িয়েছিল এরকম, প্রথম অধিবেশন: সকাল ৮:৩০ মি. থেকে ৯:৩০ মি. (বাংলাদেশ সময়); স্থিতিকাল এক ঘন্টা। দ্বিতীয় অধিবেশন: বিকাল ৫:০০ মি. থেকে সন্ধ্যা ৭:০০ মি অথবা ৮:০০ মি. থেকে ১০.০০ মি. (বাংলাদেশ সময়)। স্থিতিকাল ২ ঘন্টা।  কোন কোন সময় আড়াই ঘন্টা।

২৫ মে বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নং দ্বিতল বাড়িতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল তাঁদের নিবাস। অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হত তাঁদের অজ্ঞাত ৪০০ ওয়াট শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে। তাঁদেরকে শালবাগান থেকে আরও ভিতরে কর্নেল চৌমুহনি পরবর্তীতে জেল রোডে রাখা হলেও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হত সম্ভবত শালবাগানের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ হেড কোয়ার্টারের আশপাশের এলাকা থেকে। ২৫ মে সকালের অধিবেশনের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্বের পরিসমাপ্তি হয়। শর্টওয়েভ মারফত এটিই ছিল সর্বশেষ অনুষ্ঠান।

এরিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তারা আগরতলা, কলকাতায় ভীড় জমাতে থাকে। তাছাড়া কলকাতার সর্বত্র ছিল বাংলাদেশের নানা বয়সী অগণিত কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, অভিনেতা, সংবাদ পাঠক, বুদ্ধিজীবীসহ নানা ঘরানার লোকজন। তরুণরা ছিল সংখ্যায় এগিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একটি গঠনমূলক পুর্ণাঙ্গ কাঠামো অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের কাছে  এর প্রয়োজনীয়তা  ক্রমে গাঢ়তর হতে থাকে।

সব মিলিয়ে উপর মহলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৫ মে সান্ধ্য অধিবেশন কলকাতা থেকে ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভে প্রচারের প্রস্তুতি নেয়া হয়। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে আসা বেতারের কিছু কর্মকর্তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আগরতলায় সকালবেলার অধিবেশন শেষ করে জেল রোডের অবস্থানরত কর্মকর্তাদের একটি অংশ কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে। মুস্তফা আনোয়ার ও বেলাল মোহাম্মদ ২৬ মে দুপুরে কলকাতা পৌঁছায়। বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নং দ্বিতল একটি বাড়িতে তাঁরা থাকতেন। নির্বাসিত সরকারের মন্ত্রী কামারুজ্জামান ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রীরা এ বাড়িতে থাকতেন। এক্ষেত্রে পি কে কাউল ছিলেন ভারতীয় তত্ত্বাবধায়ক।

২১/এ, বালু হাক্কাক লেনে ছিল সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার অফিস। সংগ্রামী সরকারের বেতার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত এম এন এ আবদুল মান্নান সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’র অফিসেই বসতেন। কারণ তিনি ‘জয় বাংলা’রও সম্পাদক। এখানে একটি খাতা খোলা হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে যারাই কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিচ্ছিল তাঁদের এই খাতায় পরিচয় নিবন্ধন করা ছিল ফরজ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ৩য় পর্যায়ে এসে নতুন বাঁক নেয়। এ পর্বে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার তার সার্বজনীন চরিত্র হারিয়ে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হয়ে উঠে। ২য় পর্যায়ে ‘আমিনুল হক বাদশার সঙ্গে আমার ক্ষীণ মতভেদ দেখা দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পলিসিগত ব্যাপারে। তিনি চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নামে কিছু প্রচার করতে। আমি প্রতিবাদী হয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য, দেশ থেকে হানাদারদের উৎখাত করা। এজন্যে দেশ-বিদেশে জনমত গড়ে তোলা। আমাদের কার্যক্রম কোনো দলীয়ভিত্তিক নয়, বরং বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক।… আগরতলায় আমার সঙ্গে মতভেদ দেখা দিয়েছিল আমিনুল হক বাদশার। সেটা বেশিদূর গড়ায়নি। মুজিবনগর বা ৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার পর্যায়ে প্রশ্নটি প্রকটতর হয়েছিল।’

“বেতারের নীতিমালার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছিল।… তখন একটি ছিন্নপত্রে আমি একটি মুসাবিদা করেছিলাম। ‘প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ গণ সরকার’-এর লেটার-হেড-এ, মুসাবিদাটি কোনো কাজে আসেনি।”

এ মুসাবিদার কয়েকটি ধারা এ রকম : “ক. এ হচ্ছে একটি নব বিকশিত জাতীয়তাবাদের প্রচার-যন্ত্র-যে জাতি ধর্মবর্ণ দলমতের ঊর্ধ্বে সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধীনতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে উদ্বুদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ। এ প্রচার-যন্ত্র কোনো বিশেষ দলীয় সঙ্কীর্ণতা পোষণ করতে পারে না। খ. একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে জাতীয় যুদ্ধের একমাত্র ধারকবাহক বলে বিবৃত করা হলে এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধের মর্যাদা দেয়া হয় না — ফলে বিশ্বের গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের আনুকূল্য পাওয়া দুষ্কর। একটি পার্টির প্রতি নয়, বরং জনগণের প্রতি সহায়তা আশা করাই সঙ্গত। গ. ছোটদের জন্যে প্রতি রবিবার ‘জ্ঞানের আলো’ প্রশ্নোত্তরের আকারে পরিবেশনা করা হয় — ওতে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন এবং নগ্ন জবাবে শুধু আওয়ামী লীগের কথাই বলা হয়। এটা নিঃসন্দেহে ইতিহাসকে বিকৃত করারই শামিল এবং ওয়াকিবহাল মহলে ও বাংলার গণমনে এর প্রতিক্রিয়া বিরূপ হওয়া স্বাভাবিক। ঘ. কথিকা প্রচারের জন্যে বেশির ভাগই বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োজিত করা দরকার — তাঁরা যে-কোনো মতাদর্শের অনুসারীই হোন না কেন! এখন হচ্ছে রাজনৈতিক দলমতের ঊর্ধ্বে দেশের স্বাধীনতার একক প্রশ্ন।”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই ভাগে কথক নির্বাচনের জন্য ক্লিয়ারেন্স নেয়া, লেখা দেখিয়ে নেয়ার একটা নিয়ম করা হয়েছিল। যা বেতারকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যমকে স্তিমিত করে দিয়েছিল। এ কানুন কিন্তু এম আর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ বা আব্দুল তোয়াব খানদের বেলায় প্রযোজ্য ছিল না।

বেলাল মোহাম্মদের একটি লেখা থেকে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি কেটে দেওয়া হয়েছিল। “আমার একটি পাণ্ডুলিপিতে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি ছিল।… : আরে, আরে! এটা কি লিখেছেন? ‘জনযুদ্ধ’ তো মাও সে তুং-এর কথা! এই অংশটুকু প্রচার করবেন না।… কেটে দেয়া হয়েছিল একটা প্যারাগ্রাফ। সে কথিকাটি আমি আর প্রচার করিনি। এর পরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে  লেখার উৎসাহ হারিয়েছিলাম।”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আগরতলা পর্ব সরাসরি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় বেতারকর্মীরা কোন চাপে ছিল না। এই সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মূলত নিরাপত্তা, টেকনিক্যাল দিক, ভরন পোষণের দিকটা দেখত। বেতারে ছিল কর্মীদের স্বরাজ। যাবতীয় কর্মকাণ্ড ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযুদ্ধের সার্বজনীন চরিত্র ছিল অক্ষুণœ। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২৫ মে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে ঐ (ঊঃযরপং) ছিল অক্ষুণœ। (২৫ মে পর্যন্ত) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।’

স্বাধীন বাংলা বেতারের  ২য় পর্ব পর্যন্ত অনুষ্ঠানের শুরুতে কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের প্রয়োজন পড়েনি। কলকাতা পর্বে ফিক্সড পয়েন্টে অনুষ্ঠান চালু হওয়ার পর থেকে কোরান তেলওয়াতের মাধ্যমে শুরু করা হতো। সিডিউল করে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন পাঠ করা হতো গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক। বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা চালু হওয়ার পর প্রথম দিকে অধিবেশনের শুরুতে কোরান বা কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করার রেওয়াজ ছিল না। ১০ জানুয়ারীর পর কোন এক সময়ে আবার ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির আলোকে পরপর কোরান-গীতা-ত্রিপিটক-বাইবেল (পাঠ করা হতে থাকে)।  সরকারি জনসভায়ও একই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।’

তবে কালুরঘাট পর্বে “৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশন থেকেই সমাপ্তি ঘোষণায় এই কথাটি চালু করেছিলাম: ‘আল্লা রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি তখনই কোনো জাতিকে সাহায্য করি, যখন সে জাতি নিজেকে সাহায্য করে।’ কথাটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমাপ্তি হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।”

পর্যাপ্ত সিনিয়র জুনিয়র বেতার কর্মকর্তা ও বিভিন্ন জমিনের এক ঝাঁক কুশীলবদের সমবেত অংশগ্রহণে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অনেকটা পরিপূর্ণ বেতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ‘৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের অনুষ্ঠান শুরু করার প্রস্তুতিপর্বে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন এম আর আখতার, পটুয়া কামরুল হাসান ও আমিনুল ইসলাম বাদশা।’

বিশাল পরিসরে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। ‘নতুন নতুন অনুষ্ঠান হয়েছিল সংযোজিত। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল ফিক্সড্ পয়েন্ট-এর। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট সময়-সূচি। সংবাদ বুলেটিন প্রচারের সময় ও স্থিতিকাল। ধারাবাহিক কথিকাসমূহের প্রচার-সময়। সপ্তাহিক অনুষ্ঠানের প্রচার-বার। নাটক জীবন্তিকার ফ্রিকোয়েন্সি। উর্দু অনুষ্ঠানের প্রচার-সময়। ইংরেজি অনুষ্ঠানের প্রচার-সময়।… ফিক্সড্পয়েন্ট তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। ও কাজটি অনুষ্ঠান প্রযোজক-সংগঠকদের। সহকর্মী তাহের সুলতান সহযোগিতা দিয়েছিলেন।’

একটু আগেই উল্লেখ করা হল এম আর আখতার মুকুলের কথা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্ব তথা ২৫ মে পর্যন্ত কার্যক্রমে তাঁর কোন নামগন্ধ ছিল না। কলকাতা পর্বে অর্থাৎ স্বাধীন বাংলা বেতারের ৩য় পর্যায়ে মঞ্চে দ্রুত আলো ছড়াতে থাকে এম আর আখতার মুকুলরা। বলা বাহুল্য এ পর্যায়ে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উপর আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়েছিল। এম আর আখতার মুকুলসহ অনেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালুরঘাট ও আগরতলা পর্বকে ধামাচাপা দিতে চাইত। তাঁরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস হিশেবে ২৫ মে রাষ্ট্র করতের উদ্যোগী হয়েছিল। ‘১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক এম আর আখতার উদ্যোগী হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের জন্যে। চট্টগ্রামে  টেলিফোনে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করতে চান ঢাকায়। উত্তরে আমি বলেছিলাম: ২৫ মে? ঐ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস তো ২৬ মার্চ।… সেই অভিনব উদ্যোগ সম্পর্কে পরে আর জানতে পারিনি।’

বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিবৃত্ত, ইতিহাস আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে নানাবিধ প্রসঙ্গ এসেছে। কমরেড দেবেন শিকদারের তৎপরতায় জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলার প্রসঙ্গটি এরকম: ‘কমরেড দেবেন শিকদার ৬ এপ্রিল রাজশাহী জেল ভেঙে বেরিয়েছিলেন। সীমান্ত পেরিয়ে আসার উদ্দেশ্য বলেছিলেন, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলা।… অমূল্য লাহিড়ীকে পাঠানো হয়েছিল মণি সিংহের কাছে। মীজানুর রহমান চৌধুরীকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের কাছে। মশিউর রহমান (জাদু মিয়া) ও আবু নাসের ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগের। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল আগরতলায় আবুল বাশার, কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে আলোচনা করার। এছাড়া যদি সম্ভব হয়, আতাউর রহমান খান এবং মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গেও যোগাযোগের। ১৮ এপ্রিল সবাই পুনর্বার সম্মিলিত হয়েছিলাম টাওয়ার হোটেলে। অমূল্য লাহিড়ী জানালেন, মণি সিং চীনপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট করতে রাজি নন। কারণ তাতে ‘দেবী’র সায় নেই।’

ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রসঙ্গটিও মজার ও লক্ষ্য করার মত। মোজাফফর আহমদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রশংসা করলেন। পরিচয়ের প্রথম দিনই, ‘জনান্তিকে নিম্নকণ্ঠে বলেছিলেন: আপনি তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করছেন। ওদের নিজেদের ভেতরে ঐক্য নেই। মোস্তাক হলো আমেরিকাপন্থী, আর তাজউদ্দিন আমাদেরপন্থী। দুইজনের মধ্যে দারুণ ক্ল্যাশ।… আমি নীরব ছিলাম। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করেছিলেন: দুইজনের মধ্যে যে ক্ল্যাশ, সেটা খেয়াল কইচ্ছেন নি?… : জ্বি না। (কয়েক দিন পরে) : জানেন তো নিশ্চয়, এই তো সেদিন মোস্তাক আর তাজুদ্দিনের মধ্যে এক চোট হয়ে গেছে।…: জি না, স্যার। আমি কিছুই জানি না।…  অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ অনুযোগ দিয়ে বলেছিলেন: দূর, মিয়া! ওদের ভেতরে থাকেন। কিচ্ছু খেয়াল করেন না। সব জেনে আমাদের জানাবেন তো!… উত্তরে সঙ্গে সঙ্গে আমি বলেছিলাম: আমি কি আপনার এজেন্ট, স্যার?’

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর জন্মলগ্নে মুশতারী লজের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গত কারণে বইটিতে নানাভাবে ডা. এম শফী পরিবারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। আমাদের এই আলোচনায়ও তাঁদের ভূমিকার কথা শুরুর দিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৭ মার্চ ন্যাপ নেতা চৌধুরী হারুন অর রশীদ এক ট্রাক গোলাবারুদ নিয়ে ‘মুশতারী লজে’ গিয়েছিলেন। দোতলার ‘টু-লেট’ লাগানো ঘরটিতে সেগুলো রেখেছিলেন। ডা. শফীকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘ভয়ের কারণ নেই। ঘরটি তালাবদ্ধ থাকবে। ব্যাক ডেটে একটি ভাড়াটের দলিল স্বাক্ষর করা হবে। বাড়িওয়ালা যেন কিছুই জানেন না। ভাড়াটে মাস দু’য়েক আগে তালা দিয়ে কোথাও চলে গেছেন।’

৭ এপ্রিল সকাল বেলা পাক হানাদার বাহিনী হানা দিয়েছিল ‘মুশতারী লজে’। ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর হাতে দেয়া হয়েছিল একটি অভিযোগপত্র! স্থানীয় অবাঙালিদের স্বাক্ষর ছিল ওতে। বিচিত্রসব অভিযোগ আনা হয়েছিল। ‘মুশতারী লজ’র দুইজন মাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ডা. মোহাম্মদ শফী ও বেগম মুশতারীর একমাত্র ছোট ভাই খোন্দকার এহসানুল হক আনসারীকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিগ্রেডিয়ার বেগের কাছে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ডা. শফী ছিলেন ব্রিগেডিয়ার বেগের দাঁতের ডাক্তার। তাই সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

“ঘন্ট দু’য়েক পরেই আবার এসেছিল হানাদারের আর একটি দল। লক্ষ্য, দোতলার ঘর তল্লাশি করা।… তালা ভাঙা হয়েছিল দোতলার ঘরের। কিছুই ছিল না আসবাবপত্র। শুধু কয়েকটি কাঠের বাক্স। গোলাবারুদের বাক্স। বাক্সের গায়ে লালকালিতে জ্বলজ্বল করছিল লেখা — ‘২৭ মার্চ ১৯৭১’। লেখাটি ইংরেজি হরফে।… এর পরে হানাদার দলপতির কাছে কোনো কৈফিয়ৎ দেবার উপায় ছিল না।… এই দুজনকে এবারে পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর ফিরে আসেননি তাঁরা।”

এরপর সাত সন্তানের জননী বেগম মুশতারী শফী ১৬ বছর বয়সী বড় কন্যাকে চট্টগ্রামে আত্মীয়ের বাসায় রেখে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় চলে গিয়েছিলেন গ্রামের দিকে। অতিকষ্টে এক সময় পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতায়। স্বাধীন বাংলা বেতারের ৩য় পর্যায়ে তিনি ছিলেন নিয়মিত কথিকা পাঠক। উম্মে কুলসুম ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। ছদ্মনাম নিয়েছিলেন পাছে স্বনামে তাঁকে চিনে ফেলতে পারে পাক হানাদার বাহিনী। আর এতে করে তাঁর সহধর্মী ও ছোট ভাই জীবিত থাকলে তাঁদের উপর নির্যাতন বেড়ে যাবে বা তাঁদেরকে হত্যা করা হবে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন ডা. শফী। পেশায় ছিলেন দাঁতের ডাক্তার। “আধুনিক দন্ত্য চিকিৎসায় পারদর্শী তিনি — খুব সহজেই তাঁর পসার জমে উঠেছিল। শহরের প্রাণকেন্দ্র এনায়েত বাজারে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছিলেন। স্ত্রীর নামে বাড়ির নাম: ‘মুশতারী লজ’।”

‘ডাক্তার মোহাম্মদ শফী ছিলেন একজন সহজ-সরল বাঙালি। বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কে মস্কোপন্থী বা চীনপন্থী, তার ধার ধারতেন না। যিনিই জেল খেটেছেন, তিনিই তাঁর শ্রদ্ধার পাত্র। যাঁরই নামে হুলিয়া আছে, তাঁকেই তিনি আশ্রয় দেবেন।’

ডাক্তার শফীর অধুনিক মননের প্রকাশ ‘বন্ধবী সঙ্ঘ’ কেন্দ্রীক কার্যক্রম। “ডা. শফীর তত্ত্বাবধানে প্রথমত একটি সঙ্ঘ চট্টগ্রামের ‘বান্ধবী সঙ্ঘ’ গড়ে উঠলো — নেত্রী তাঁরই সহধর্মিণী বেগম মুশতারী শফী। ক্রমে স্থানীয় উৎসাহী মহিলাদের সমাবেশ ঘটতে লাগলো এই সঙ্ঘকে ঘিরে। ‘বান্ধবী সঙ্ঘে’র পরিচালনায় ‘বান্ধবী সঙ্গীত ও গিটার শিক্ষার আসর’, ‘বান্ধবী কুটির শিল্প কেন্দ্র’ ইত্যাদি ক্ষুদ্র অথচ সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলো। বেগম মুশতারী শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো চট্টগ্রামের প্রথম মহিলা মাসিক ‘বান্ধবী’। পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ‘বান্ধবী সাহিত্য আসর’। পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশনার পাঁচ বছরের সময় ১৯৬৮ সালে ডা. শফী নিজের বাসভবনের দুটি কামরাকে রূপান্তরিত করলেন একটি ক্ষুদ্র ছাপাখানায়। অভিনব প্রয়াস — ছাপাখানার নাম ‘মেয়েদের প্রেস’ — এতে কম্পোজিটার সব মেয়ে।”

১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় উর্দুভাষীদের উপর কোথাও কোথাও হামলা হয়েছিল। ডা. শফীর আশপাশে কয়েকটি বিহারি পরিবার ছিল। মারমুখো জনতা হামলা করেছিল তাঁদের উপর। ‘বুক টান করে দাঁড়িয়েছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ শফী। এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। এদেশেরই নাগরিক। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু এঁদের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। ডাক্তার মোহাম্মদ শফী উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন: আগে আমাকে মারো। তারপর আমার প্রতিবেশীদের মারবে।… হামলাকারীরা ফিরে গিয়েছিলেন।’

এক সময় যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন পাক বাহিনীর কাছে তারাই ডা. শফীর বিরুদ্ধে নালিশ করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থানার লোকজন এসেছিল ‘মুশতারী লজে’। বেগম মুশতারী শফীর কাছে জানতে চেয়েছিল, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কি না। থানার অনুরোধে বলেছিলেন, ‘সব নাম তো পড়তে পারিনি। প্রথম নামটি ছিল ডাক্তার মালাম-এ গফুরের।… ঐটুকু জবানিতেই অ্যারেস্ট করা হয়েছিল ড. মালামে-এ গফুরকে। প্রতিক্রিয়া হয়েছিল চমৎকার। বিবিধ মহল থেকে অনুরোধ এসেছিল অভিযোগটুকু প্রত্যাহারের জন্যে। বিনিময়ে ড. মালাম-এ গফুর ক্ষতিপূরণ দেবেন।… সুপারিশ করেছিলেন মন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরীও। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আমার উপস্থিতিতেই বলেছিলেন বেগম মুশতারী শফীকে: ভাবী, আপনি একটু লিখে দিন যে ডাক্তার মালাম-এ গফুরের ব্যাপারে আপনার কোনো অভিযোগ নেই। আপনাকে এক লক্ষ টাকা দেয়া হবে।… এবারে সত্যি সত্যি ক্ষেপেছিলেন বেগম মুশতারী শফী। বলেছিলেন: আমি তো মাত্র এক লক্ষ টাকা পাবো। আর আপনি কতো লক্ষ টাকা পাবেন এ জন্যে? আপনার মাধ্যমেই বলে দিচ্ছি, এ বিষয়ে আর যদি কেউ আমাকে বলতে চায়, আমার কাছে ভদ্র ব্যবহার পাবে না।… পরে মালাম-এ গফুরকে জামিনে মক্তি দেয়া হয়েছিল। মুক্তি পেয়েই তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।’

আমরা বেতারের আলাপ থেকে একটু অন্যপ্রসঙ্গে চলে এসেছি। যাই হোক, বেতারি আলাপে ফিরার আগে দস্তিদার দম্পতির প্রসঙ্গটা উল্লেখ করি। বেতারের কাজে ১ জুলাই কলকাতা থেকে আগরতলা এসেছিলেন বেলাল মোহাম্মদ। ‘সে যাত্রায় আগরতলায় আমি ১০ দিন ছিলাম। ঐ সময়েই এসেছিলেন শান্তি দস্তিদার। পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সহধর্মিণী। বিধবার সাজ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণেন্দু দস্তিদার  প্রয়াত হয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দলের সঙ্গে যাত্রা করার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে সকলের সম্মিলিত হবার স্থান নির্দিষ্ট ছিল। পূর্ণেন্দু দস্তিদার যথাসময়ে পৌঁছতে পারেননি। চৌধুরী হারুন-অর রশীদরা তাঁর জন্যে অপেক্ষা করেননি। দলীয় সঙ্গীদের না পেয়ে বৃদ্ধ পূর্ণেন্দু দস্তিদার বেপথু সীমান্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। বিপাকে পড়ে রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। শান্তি দস্তিদার একচোটে নিয়েছিলেন চৌধুরী হারুন-অর রশীদকে। বলেছিলেন: একজন বৃদ্ধ মানুষ। সারাটা জীবন পার্টির সেবা করলো। তাঁর জন্যে দু’টি মিনিট অপেক্ষা করা গেলো না! আমি আর এই পার্টির সঙ্গে থাকবো না। এখানে সি-পি এম নেতাদের কাছে সব বলবো। কলকাতায় গিয়ে।’

বেলাল মোহাম্মদ মনে করতেন চৌধুরী হারুন অর রশীদের খামখেয়লীপনা মুশতারী পরিবারের জন্য কাল হয়েছিল। ‘সেই গোলাবারুদ রাখার কারণেই ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর ওপর এসেছিল বিপদ। কিন্তু চৌধুরী হারুন অর রশীদ তো এখন আগরতলায়। ক্রাফট্স ইনস্টিটিউটে তাঁদের ক্যাম্প।’

কথায় লতা, কথায় শয়তান। আসলে বেলাল মোহাম্মদের বইটিতে এত বেশি প্রসঙ্গ এসেছে যে বইটির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য তৈরি করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। নবেম্বর মাসে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওর অবসরপ্রাপ্ত ডাইরেকটর আর এন আচারিয়া। উপদেশক হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে প্রোগ্রাম ম্যাটেরিয়েলস দেখতে চাইতেন তিনি। আলাপ করতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। “একদিন বলেছিলেন: আচ্ছা, মি: বেলাল, আপনারা উদ্বোধনী ঘোষণায় আরবি ভাষায় সালাম কেন বলেন? সমাপ্তিতে ‘খোদা হাফেজ’ কেন বলেন? শুধু ‘জয় বাংলা’ বললেই কি চলতে পারে না? আমি কোনো আপত্তি তুলছি না। এমনি শুধু জানতে চাইছি।… উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম: আপনারা, স্যার, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নামের সঙ্গে আজকাল ‘শ্রী’ না বলে সচেতনভাবে ‘জনাব’ বলেন কেন? বরাবরই আকাশবাণী থেকে মুসলিম নামগুলোর উচ্চারণে বিকৃতি লক্ষ্য করতাম আমরা। আজকাল আমাদের নেতাদের নামগুলো বেশ যতেœর সাথে উচ্চারণের চেষ্টা করা হয়। এই সদিচ্ছা কেন?” আচারিয়া বাবু দ্রুত আপসে গিয়ে প্রশমিত করেছিলেন আলাপ।

আর এন আচারিয়া সাহেব আরেক দিন শেখ মুজিবুর রহমানহীন ভবিষ্যত নেতৃত্বের ব্যাপার নিয়ে আলাপ উঠিয়ে ছিলেন। ‘: আচ্ছা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো এখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। কি অবস্থায় আছেন, কি পরিণতি হবে, কিছু তো বলা যায় না। … (বেলাল মোহাম্মদ): বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে তেমন কিছু আমরা ভাবতেই চাই না। আমাদের দুর্ভাগ্য, যদি কোন অঘটন ঘটেই, তাহলে বঙ্গবন্ধুর শূণ্যস্থান আর পূরণ হবে না।’ আলাপের এক পর্যায়ে আর এন আচারিয়া বললেন, ‘:প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কথাই বলছি। নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পরে নিশ্চয়ই যোগ্যতম। আপনারা এখন থেকে তাঁর ইমেজ গড়ে তোলার চেষ্ট করুন। এটা অবশ্য আমার একটা নগণ্য পরামর্শ।’

‘২২ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে কলকাতা থেকে নির্বাসিত সরকার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। স্বাগত জানানো হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্র থেকে ধারাবিবরণীর মাধ্যমে। ১৬ ডিসেম্বরের পর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল শত্রুমুক্ত ঢাকা কেন্দ্র। তারপর পুনরায় চালু করার জন্যে ট্রান্সমিটারের অবস্থা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। অগ্রগামী পর্যবেক্ষক হিসেবে কলকাতা থেকে ঢাকা প্রেরিত হয়েছিলেন সৈয়দ আবদুশ শাকের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দশজন প্রতিষ্ঠাতা কর্মীর একজন।’

তথ্য সচিব আনোয়ারুল হক আমাদের জানিয়েছিলেন মন্ত্রিসভাকে ঢাকায় স্বাগত জানানোর মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্র চালু হবে। সে মুহূর্ত থেকে মুজিবনগরের কার্যক্রম শেষ হবে। আর এটাই ছিল প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। ভারত সরকারের মর্জি মোতাবেক ২ জানুয়ারি পর্যন্ত বেতার কার্যক্রম চালাতে হয়েছিল। “ঢাকা কেন্দ্র চালু হবার পরও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যায়নি কলকাতার কার্যক্রম। ২ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত ৫০-কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার থেকে প্রচার করতে হয়েছিল অনুষ্ঠান। মান ছিল ক্রমনিষ্প্রভ। সেই দশদিন নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ বেতার, মুজিরনগর’।”

‘ঘটনাচক্রে শেষের দিনগুলোর দায়িত্বে মুজিবনগরে আমাকেই থাকতে হয়েছিল। ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠা এবং ২ জানুয়ারী ১৯৭২-এ সমাপ্তি। আমার আদ্যোপান্ত কার্যকাল।’

কবি বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির পরিশিষ্ট হিশেবে ২টি অনুষঙ্গ আছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁহার প্রচারিত ৪৭টি কথিকা নিয়ে অনুষঙ্গ-১। আর অনুষঙ্গ-২ এ আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময়ে উঁনার প্রচারিত ৯ টি কবিতা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত যে কোন কিছুর মতো এগুলোরও একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। বেলাল মোহাম্মদের মানস, ঝোঁক বুঝার জন্যও এসব জরুরী। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির এই ‘সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিবৃত্তমূলক বয়ানটা ধরার চেষ্টা করেছি। তাই বিনয়ের সাথে সংযুক্ত অনুষঙ্গ ২টিতে হস্তক্ষেপ থেকে আমরা বিরত থেকেছি।

একটি বইয়ের সংক্ষিপ্ত ভাষ্য কখনোই মূল বইয়ের বিকল্প পাঠ্য হতে পারে না। সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। সদ্য প্রয়াত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পুরোভাগের কাণ্ডারী কবি বেলাল মোহম্মদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এটি একটি অক্ষম প্রয়াস মাত্র।

বইটিতে প্রধানত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘটনা প্রবাহ আলোচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের টুকটাক এত স্মৃতি এসেছে যা এই সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে ধারণ করা অসম্ভব। তারপরও যা না আনলে সংক্ষিপ্ত ভাষ্য কথাটিই অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে শুধু তাই খানিকটা বিবৃত করা হলো। আরও দু’একটি ঘটনার বিবরণ দিতে পারলে সংক্ষিপ্ত ভাষ্যটি হয়তো আরেকটু পূর্ণতা পেত সন্দেহ নাই। কিন্তু আগ্রহী পাঠিকা বইটি কেন উল্টিয়ে দেখবেন না?

বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্মৃতি নিয়ে ইতিবৃত্তমূলক এই বইটির শক্তিশালী দিক: ঘটনা-তথ্য-উপাত্তের বৈপরীত্যহীনতা, সত্যের অকপট নির্ভীক উচ্চারণ ও বিভিন্ন ঘটনার নির্মোহ বয়ান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তো বটেই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অনুসন্ধীৎসুদের কাছেও বইটির অশেষ সমাদর উত্তরোত্তর বাড়বে — এমনটিই আমাদের বিশ্বাস।

(সমাপ্ত)

কবি বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ : প্রথম পর্ব–মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 3.1

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এ অঞ্চলের মানুষের জীবনে একটি নজীরবিহীন ঘটনা। ১৯৭১ শিকল ভাঙ্গার মহাকাল, মহাজনতার কাল। জাতীয় জীবনে পুনরুত্থানের ঘূর্ণাবর্তে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল প্রচলিত সব কানুন, শৃঙ্খলা ও ধ্যানধারণা। তাঁরা উড্ডীন বিহঙ্গের মত নিজেদের আকাশ অবারিত পেতে মেতে উঠেছিল এক সর্বাত্মক কুচকাওয়াজে। যার নাম মুক্তিযুদ্ধ, যার নাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। চৈতন্যগ্রস্ত বিভোর বাংলার নারী পুরুষ সর্বান্তকরণে নিজেকে সপে দিয়েছিল আপনার অভূতপূর্ব ইতিহাস নির্মাণে। অশ্রুতপূর্ব মহাকাব্য রচনায়। যে যেভাবে পারে সলতে জ্বালিয়েছিল জমাট অমানিশায় ভুতুড়ে অন্ধকার এ ভূখন্ডের বাঁকে বাঁকে। অনতিবিলম্বে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আশুকর্তব্যে।

১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। নিয়মানুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাব্য প্রায় সকল প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে আসলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ব্যাঙ্ক বীমা, স্কুল কলেজ, বেতার, শিল্প কারখানাসহ সরকারি অফিস আদালতের প্রায় সর্বত্র আংশিক অসহযোগ চলতে থাকে। “প্রচলিত সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছিল আমাদের সকল বেতার কেন্দ্রে। ‘রেড়িও পাকিস্তান’ নাম ঘোষণা রহিত করা হয়েছিল। আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলো স্থানিক নাম গ্রহণ করেছিল। যেমন ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’ ‘চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র’ ইত্যাদি।” (‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ অনুপম প্রকশনী, চতুর্থ সংস্করণ, পূর্ণমুদ্রণ জুলাই ২০০৬, পৃ:২৬)

১৬ মার্চ ঢাকায় ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক শুরু হয়। আলোচনার জন্য জনাব ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। ২৪ মার্চ পর্যন্ত ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো আলোচনা হয়। ২৫ মার্চ আলোচনা ব্যর্থ হবার পর সন্ধ্যায় ইয়াহিয়ারারা ঢাকা ত্যাগ করে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের এই ছিল সার্বিক অবস্থা। যদি সেদিন আলোচনা ফলপ্রসূ হত? হায়রে আল্লাহ! তাই বুঝি সময়ে সময়ে নেতাদের আলোচনা ব্যর্থ হওয়া ভাল!

২৩ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘বাবর’ ও ‘সোয়াত’ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গর করে। ‘এ সময়ে অস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজ এসে বন্দরে ভিড়েছিল। রটে যাওয়ামাত্রই আক্রোশে ফেটে পড়েছিল মানুষ। বন্দর থেকে স্ট্র্যান্ড রোড-আগ্রাবাদ রোড় হয়ে সেনানিবাসের পথে। অস্ত্র আর গোলাবারুদ যেন সেনানিবাসে নিয়ে যেতে না পারে, পথে পথে তৈরি হয়েছিল ব্যারিকেড। স্বতঃস্ফূর্তভাবে। দেখতে-না-দেখতেই বড়ো বড়ো কাঠপাথর স্তূপাকার করা হয়েছিল এখানে-ওখানে। পিচের ড্রাম রাস্তার ওপর টেনে এনে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল।’

‘না বলে উপায় নেই, আমাদের সামগ্রিক মুক্তিযুদ্ধই ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপার। কোন রাজনৈতিক সংগঠনই আমাদেরকে প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে আহ্বান করেনি। নিতান্তই আকস্মিকভাবে আক্রান্ত একটি জাতি আত্মরক্ষার তাগিদে যা করেছে, সেটাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং তারই কল্যাণে একটি রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন সাধনের পরিবেশ গড়ে উঠেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রও তেমনি একটি তাগিদের ফসল।’

মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গঠনের পটভূমি বর্ণনা করতে গিয়ে এমনটাই বেলাল মোহাম্মদের সিদ্ধান্ত। স্বাভাবিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব নিয়ে বাজারে বহুমাত্রিক বাহাসের চল তো আছেই। তদুপরি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে এদরওদর ‘অবাঞ্ছিত’ ও ‘অভিনব’ টানাহেঁচড়াও কম জারি নাই সমাজে। বেলাল মোহাম্মদ এর কারণ নির্দেশ করে বলেন, ‘পরবর্তীকালে তা মুক্তিযুদ্ধের জন্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য উদ্যম বলে বিবেচিত হয়। আর এ রকম বিবেচিত হবার কারণেই দেখা গেছে, এই কেন্দ্রের উদ্যোক্তা হবার দাবিদার হয়েছিলেন অনেকেই।’

বিভিন্নভাবে এ তর্কটির যবনিকাপাত করতে চেয়েছেন বেলাল মোহাম্মদ। তিনি এক সাক্ষাতকারে স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বেতার কেন্দ্রকে মুক্তিযুদ্ধের প্রচারকাজে নিয়োজিত করার চিন্তা-ভাবনা  হয়তো অনেকের মনেই আসতে পারে। তবে ঘটনাচক্রে এক্ষেত্রে আমি অগ্রণী হতে পেরেছিলাম, আমার হাতেই সংগঠিত হয়েছিল দশজনের একটি ক্ষুদ্র টিম।’

বইয়ের আরেক স্থানে বয়ানটি এসছে এভাবে, ‘কালুরঘাটে ৫ দিনের মধ্যে আমাদের দশজনের একটি ক্ষুদে কর্মীদল গড়ে ওঠে। দলের সদস্যরা হচ্ছেন, অনুষ্ঠান বিভাগীয় আমি (বেলাল মোহাম্মদ), আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, আবদুল্লাহ-আলা-ফারুক, মুস্তফা আনোয়ার, ও কাজী হাবিবউদ্দীন আহমদ এবং প্রকৌশল বিভাগীয় সৈয়দ আব্দুর শাকুর, রাশেদুল হোসেন, আমিনুর রহমান, শারফুজ্জামান ও রেজাউল করিম চৌধুরী।’

মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিশাবে খ্যাত এই বেতারের আদি থেকে অন্তিম মুহুর্ত পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন অনেকেই। এই ১০ জন অন্যদের থেকে আলাদা হওয়ার জায়গাটি হল, ‘এরা ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে সংঘবদ্ধ হয়েছিলন এবং বাংলাদেশে শত্রুপক্ষের প্রথম বিমান হামলার মোকাবিলা করেছিলন, একটি ১-কিলোওয়াট শক্তির ট্রান্সমিটার তুলে নিয়ে মুক্ত অঞ্চলে সরে গিয়েছিলন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরবর্তী সকল পর্যায়ে দেশ শক্রমুক্ত হওয়া অবধি কর্মরত ছিলেন।’

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ। যাই হউক মূল কাহিনীতে ফিরি। ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনী নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাইফেল সদর দফতর ও রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে। ইতিহাসে যা ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে পরিচিত। সন্ত্রস্ত দেশবাসী হয়ে পড়ে দ্বিগবিদিক জ্ঞানশূণ্য, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জাতীয় জীবনের এই কাহিললগ্নে সঠিক মুহূর্তে বেজে উঠেছিল, ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে বলছি…। স্মর্তব্য, প্রথম দু’দিন এই নামে বেতারের কর্যক্রম চালানো হয়েছিল। কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনে “সামরিক প্রহরার তত্ত্ববধায়ক ছিলেন লে. শমশের মোবিন। বলেছিলেন: কেন্দ্রের নাম থেকে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি বাদ দিতে হবে। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ —  এ নামটিই থাকবে। মেজর জিয়ার নির্দেশে আপনাকে জানালাম।… সেদিন দুপুরের অধিবেশন থেকে নির্দেশটি কার্যকর করা হয়েছিল। মূলত ২৬ মার্চ- এ নামটিই আমি প্রথম লিখেছিলাম। আবুল কাসেম সন্দ্বীপের প্রস্তাবে ‘বিপ্লবী’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল।” এটি ২৮ তারিখের ঘটনা। এরপর থেকে পরিবর্তিত ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ নামটি চলতে থাকে। ভারতের স্বীকৃতি দানের আগ পর্যন্ত এ নামটি বহাল ছিল। “৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত। সেদিন থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নামকরণ করা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ বেতার’।”

‘২৬ মার্চ সকালবেলা আমি ছিলাম এনায়েত বাজারে। ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর বাসভবন মুশতারী লজে। রেডিওতে ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠান চলছিল। শোনা গিয়েছিল সামরিক আইনের নির্দেশ ঘোষণা। হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বেতারের অনুষ্ঠান।’

‘বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ — ২৬ মার্চ প্রভাতী অধিবেশনে।… সবাই আগ্রাবাদ অফিস ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন। প্রধান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে কর্তব্যরত প্রকৌশলী। কর্তব্যরত অধিবেশন তত্ত্বাবধায়ক। কারিগরি কর্মীগণ। ঘোষকগণ।’

‘কিন্তু বেতার বন্ধ থাকবে কেন? কথাটা মনে আসতেই একান্তে বেগম মুশতারী শফীকে বলেছিলাম: আচ্ছা, এখন তো রেডিওটা আমরা কাজে লাগাতে পারি।… তিনি উৎসাহী হয়েছিলেন। চালু করা হলে নিজেও যোগদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।’

এভাবেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভ্রুণ তৈরি হতে থাকে। অন্যত্র ব্যাপারটির স্বীকৃতি আছে এভাবে, ‘বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা পর্যায়ে নেপথ্যে উৎসাহক ছিলেন ডাক্তার এম শফী (শহীদ), বেগম মুশতারী শফী, খোন্দকার এহসানুল হক (শহীদ), অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ, এয়ার মাহমুদ প্রমুখ।’

দিনভর নানাবিধ ঝক্কি ঝামেলা দৌঁড়ঝাপ শেষে ক্রমে ঘনিয়ে আসে বহুল আকাঙ্খিত স্বস্তির মাহেন্দ্রক্ষণটি। কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবন প্রস্তুত হয়ে উঠে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’র নামে প্রথম খবর ছড়িয়ে দিতে। “কাগজপত্র গুছিয়ে নিয়ে স্টুডিওতে যাবার জন্যে দাঁড়িয়েছিলাম। তখনই টেলিফোন বেজে উঠেছিল। অন্য প্রান্ত থেকে দ্রুত এবং চাপা কণ্ঠ ভেসে এসেছিল।… : বেলাল সাহেব, আপনারা দেরি করছেন কেন? যা পারেন, প্রচার শুরু করে দিন। এখন সাড়ে সাতটা। লোকেরা রেডিওর কাঁটা ঘোরাচ্ছে। পৌনে ৮টা বাজলেই ‘আকাশবাণী’ ধরবে। আপনাদেরটা কেউ শুনবে না।… বলেছিলেন বার্তা সম্পাদক সুলতান আলী। তিনি দু-একটা সংবাদ-তথ্যও বলে দিয়েছিলেন।… ঠিক সন্ধে ৭-৪০ মিনিটে আবুল কাসেম সন্দ্বীপের কণ্ঠে প্রচারিত হয়েছিল: ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি।… ডাক্তার আনোয়ার আলীর কাছ থেকে পাওয়া হ্যান্ডবিলটিও বারবার প্রচারিত হয়েছিল আমাদের বিভিন্ন কণ্ঠে। বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত ‘জরুরি ঘোষণা’ এবং কবি আবদুস সালামের ভাষণ।”

এই অধিবেশনেই চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নানের ঘোষণাপত্রটি সম্প্রচার করা হয়েছিল। এম এ হান্নান শেখ সাহেবের পক্ষে স্বনামে ঘোষণাটি সম্প্রচার করতে চেয়েছিল। বেলাল মোহাম্মদ তাঁকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছিল যে, এটি গুপ্ত বেতার কেন্দ্র। নিরাপত্তার খাতিরে এখান থেকে কারও নামে কোন কিছু সম্প্রচার করা সম্ভব নয়।

‘স্টুডিওর বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন দু’জন আগন্তুক। একজন আমার পূর্ব পরিচিত ডাক্তার আবু জাফর। অন্যজন এম এ হান্নান। বলেছিলেন: আপনারা মাইকে আমার নাম ঘোষণা করুন। আমি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করবো।… : জি, আচ্ছা। তবে একটি কথা। আপনার নামটা প্রচার করা হবে না। আপনি নিজের কণ্ঠে শুধু এটি পাঠ করবেন।… : কেন, দুপুরবেলা আমি তো আমার নামসহ এটি প্রচার করেছিলাম। এখন অবশ্য বক্তব্যটি একটু বড়ো করে লেখা হয়েছে।… বলেছিলাম: দুপুর বেলা আপনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণাপত্রটি প্রচার করেছিলেন। এখন তা নয়। এখন থেকে এ হচ্ছে একটি গুপ্ত বেতার কেন্দ্র। এখান থেকে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। তাই কোথায় এর অবস্থান, তা আমরা শত্রুদেরকে জানাতে চাই না। জানলেই বিপদ। সহজেই ওরা আক্রমণ করতে পারবে।… এম এ হান্নান মেনে নিয়েছিলেন এবং নাম ঘোষণা ছাড়াই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করেছিলেন। বেতারে নিজের কণ্ঠে দ্বিতীয়বার।’

এই দিন দুপুরেই তিনি আগ্রাবাদ বেতার কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবের রহমানের পক্ষে স্বনামে সংক্ষিপ্ত একটি ঘোষণাপত্র প্রচার করেছিলেন। ‘২৬ মার্চ দুপুরে  তিনি আঞ্চলিক প্রকৌশলী মীর্জা নাসিরউদ্দীন এবং বেতার প্রকৌশলী আবদুস সোবহান, দেলওয়ার হোসেন ও মোসলেম খানের প্রকৌশলিক সহয়োগিতা আদায় করেছিলেন। পাঁচ মিনিট স্থায়ী একটি বিক্ষিপ্ত অধিবেশন। ওতে তিনি নিজের নাম-পরিচয়সহ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেছিলেন।’

২৬ মার্চ  রাত ১০ টায় চট্টগ্রাম বেতার থেকে মাহমুদ হোসেন একটি ইংরেজি ঘোষণাপত্র প্রচার করেছিলেন। “মাহমুদ হোসেন বলেছিলেন: আমি ইংরেজি একটা ঘোষণা প্রচার করেছি মাত্র। বলতে পারেন এস-ও-এস। সম্বোধন করেছি, ‘হ্যালো ম্যানকাইন্ড’ বলে। এই মিনিট দশেক। আমি অবশ্য আপনার অনুসরণে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকেই ঘোষণাটি প্রচার করেছি।… মাহমুদ হোসেনের সঙ্গে ছিলেন আগ্রবাদ হোটেলের সহকারী কর্মাধ্যক্ষ ফারুক চৌধুরী, বেতারের নিজস্ব শিল্পী রঙ্গলাল দেব চৌধুরী ও ঘোষক কবীর। দু’জন প্রকৌশলীকে মাহমুদ হোসেন পিস্তলের মুখে নিয়ে গিয়েছিলেন।”

উদ্যমী সদাচঞ্চল মাহমুদ হোসেন নিজের পরিচয়ে বেলাল মোহাম্মদকে বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সে তাঁর ‘হরে কৃষ্ণ হরে রাম’ কন্সার্ট এক লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছে। তিনি এখন দেশে কারখানা খুলবেন। মালামাল শিপমেন্ট হয়েছে। অচিরেই চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছবে।’

বেলাল মোহাম্মদের সাথে তাঁর পরিচয় মাত্র দেড়-দু’মাস আগের। এই অল্পদিনের মধ্যে তাঁদের সম্পর্ক জমে ওঠেছিল বেশ। তিনি বেলাল মোহাম্মদকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন ‘জয় বাংলা’ শীর্ষক একটি গীতিনক্সা।

‘মাহমুদ হোসেন অরিজিন অব হিপ্পীইজম-এর ওপর একটি ছবি করতে চেয়েছিলেন। আদি উৎসস্থল চিহ্নিত করেছিলেন ভারতবর্ষকে।… লন্ডনে আইউব খানের সভায় একবার হাতবোমা ছোঁড়া হয়েছিল। সেটি ছিল বাঙালি দুই সহোদরের কীর্তি। মাহমুদ হোসেন ছিলেন তাঁদের অন্যতম।’ ২৭ মার্চ পটিয়ায় মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাত করার জন্য গাড়ীর ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। তাঁর একটি মিশন ছিল। ‘তাঁর মিশনটা ছিল সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করা। বলেছিলেন: আপনাকে আগেই বলেছিলাম, ভাস্করপ্রভা আমার স্ত্রী। তিনি মোরারজী দেশাই-এর ভাইঝি। … যা-ই হোক, এখন যদি ভারতে যাওয়া যায়, শ্বশুরকুলের প্রভাব খাটিয়ে সামরিক সাহায্য নিতে পারবো। গোলাবারুদ না পেলে আমরা পাকিস্তানি সৈন্যদের ঠেকাবো কি দিয়ে? এটাই আমার মিশন।’

জিয়াউর রহমান তাঁর প্রস্তাব শুনে উৎসাহী হয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধে বর্ডার ক্রস করার জন্য মেজর সাহেব তাঁকে স্বাক্ষর সম্বলিত একটি স্লিপ দিয়েছিল। ঐদিই রাতেই তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পথে কোন এক ফাঁড়িতে ভুল বোঝাবুঝির ফলে মাহামুদ হোসেনসহ দু’জনকে হত্যা করা হয়।

সে যাই হোক, “প্রায় আধঘন্টা স্থায়ী হয়েছিল এই সূচনা অধিবেশন।… অধিবেশনের সমাপ্তিতে আমরা পরদিন সকাল ৭টার পর আবার অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে, এই ঘোষণা দিয়েছিলাম। কাগজপত্র গুছিয়ে বাইরে এসে দেখেছিলাম সব ফাঁকা। ভবনের প্রাঙ্গণ জনশূণ্য।… কেবল গেটের কাছে একটি জিপ স্টার্ট নিচ্ছে। এম এ হান্নানের জিপ। ছুটে গিয়ে তাঁকে বলেছিলাম: আমরা তিনজন শহরে যাবো।… : গাড়িতে জায়গা হবে না। — বলেই ড্রাইভারকে ইঙ্গিত করেছিলেন গাড়ি ছেড়ে দিতে।… সেই বিজন এলাকায়, সেই উদ্বেগের রাতে আমরা জিপটির ছুটে চলে যাওয়া দেখেছিলাম হতবাক দাঁড়িয়ে থেকে। আমিই মুখ খুলেছিলাম: এরাই নেতৃত্ব দেবে!… সারা পথে রিকশা ছিল না। আলো ছিল না। ৩/৪  মাইল পথ পায়ে হেঁটে আমরা মুশতারী লজে পৌঁছেছিলাম। তখন রাত সাড়ে ১০টা।”

এপ্রিলের মধ্যভাগে আগরতলায় এম আর সিদ্দিকীর কুঞ্জবনের অফিসে আলাপ হচ্ছিল বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ হান্নান, আবদুল ওহাব, নূরুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ছিলেন সেখানে। প্রসঙ্গক্রমে এম এ হান্নান বললেন, ‘এই যে, এঁরা ছিলেন সরকারি কর্মচারী। আমরা ধরে নিয়ে গেলাম কালুরঘাটে। এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজে জড়িত রয়েছেন।… সঙ্গে সঙ্গে আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। এম আর সিদ্দিকীর সামনেই উচ্চস্বরে বলেছিলাম: কি বললেন? ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন? আমাকে?  আমাদের দশজনের একজনকেও আপনারা ধরে নিয়ে যাননি। যাদেরকে নিয়েছিলেন, তারা এখনো পাকিস্তনি বেতারেই কাজ করছেন। আমরা স্বেচ্ছায় গিয়েছিলাম। স্বেচ্ছায় কর্মরত আছি। আপনার মনে নেই, ২৬ মার্চ রাতে আমাদের তিনজনকে কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে ফেলে রেখে জিপ-এ উঠে চলে গিয়েছিলেন? কি সহযোগিতা দিয়েছিলেন সেদিন?’

গুপ্ত ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’র অবস্থান খুঁজে বের করা তেমন কোন কঠিন ব্যাপার না। যে কোন মুহূর্তে পাক বাহিনী হামলা চালাইতে পারে। তাই ট্রান্সমিটার ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল অতি দরকারী। চন্দনপুরার তাহের সোবহানের সল্লা মোতাবেক ২৭ মার্চ সকালে মাহমুদ হোসেনের ট্যাক্সিযোগে পটিয়ায় মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে সাক্ষাত করা হয়। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে বিদ্রোহ করে বাঙ্গলি সেনাবাহিনীদের একটা অংশ বের হয়ে যায়। মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী বাঙ্গালি সৈনিকরা পটিয়ায় অস্থায়ী ছাউনি ফেলে। “মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের অনুষ্ঠান শুনেছিলেন। সন্ধে ৭টা ৪০ মিনিটে এবং রাত ১০ টায়। আমাদের পরিচয় পেয়ে উল্লাসিত হয়েছিলেন।”… তিনটি লরিতে জোয়ানরা সজ্জিত হয়েছিলেন। একটু  আগে-পরে যাত্রা করা হয়েছিল।… সামনে মেজর জিয়াউর রহমানের জিপ।… পেছনে আমাদের ট্যাক্সি।” ট্রান্সমিটারে পৌঁছতে বিকেল ৫টা বেজে গিয়েছিল।… অফিস-কক্ষে শুধু আমরা দুজন। আমি ও মেজর জিয়াউর রহমান। বলেছিলাম: আচ্ছা, মেজর সাহেব, আমরা তো সব ‘মাইনর’, আপনি ‘মেজর’ হিসেবে স্বকণ্ঠে কিছু প্রচার করলে কেমন হয়।… কথাটা ছিল নিতান্ত রসিকতা। তিনি নিয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হিসেবে। সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন: হ্যাঁ। কিন্তু কি বলা যায়, বলুন তো।… প্রথমে তিনি লিখেছিলেন: I, Major Zia do hereby declare independence of Bangladesh…. তখন আমি বলেছিলাম: দেখুন, ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে’ বলবেন কি?… তিনি বলেছিলেন: হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। নিজের নামের শেষে তীর-চিহ্ন দিয়ে লিখেছিলেন: On behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman; সেই সান্ধ্য অধিবেশনে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বকণ্ঠ ঘোষণার পর অনুবাদটিও অন্যদের কণ্ঠে বারবার প্রচার হয়েছিল। ঘোষণাটি প্রধানত আমার সঙ্গে আলোচনা করে রচিত এবং ক্যাপ্টেন অলি আহমদের উপস্থিতিতে। আর বাংলা অনুবাদের সময় আমাকে সহায়তা করেছিলেন অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন আহমদ।”

২৮ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান আরেকটি ঘোষণালিপি নিয়ে এসেছিল। “ওতে নিজেকে তিনি Provisional Head of Bangladesh এবং স্বাধীন বাংলা লিবারেশন আর্মির প্রধান বলে উল্লেখ করেছিলেন। খসড়াটি নিয়ে তাঁর সঙ্গী ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে আলোচনার সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম। মেজর জিয়াউর রহমান দ্বিধাগ্রস্ত, এ ঘোষণাটি প্রচার করা সঙ্গত হবে কিনা। একজন বলেছিলেন: এই প্রাধান্য দাবি আপনাকে করতেই হবে, নইলে দেশে-বিদেশের কাছে আপনার আবেদনের গুরুত্ব কি করে হবে?… তিনি বলেছিলেন: কিন্তু অন্য এলাকায় আমার চেয়ে সিনিয়র বাঙালি অফিসার থাকতে পারেন। তিনিও হয়তো আমাদের মতোই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন এবং প্রতিরোধ শুরু করেছেন।… মেজর  জিয়াউর রহমান আমার সম্মাতি চেয়েছিলেন। বলেছিলাম: ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আপনার মতো আর কেউ আছেন কি না–মানে, কোনো বাঙালি সিনিয়র অফিসার, তা জানার উপায় নেই। বিদেশের কাছে গুরুত্ব উৎপাদনের জন্যে আপনি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর অধীনস্ত সামরিক বাহিনীর প্রধান অবশ্যই বলতে পারেন।… ঘোষণাটি প্রচারের সময় ‘বঙ্গবন্ধুর নাম’ উল্লেখ করা হয়নি। পরে শুধরে নিয়ে অর্থাৎ On behalf of Bangabandhu যোগ করে ঘোষণাটি লে. শমশের মোবিনের কণ্ঠে কয়েকবার প্রচারিত হয়েছিল। সচেতন শ্রোতাদের কাছে মেজর জিয়াউর রহমানের দ্বিতীয় ঘোষণাটি ছিল আপত্তিকর।”

২৯ মার্চ সকালের অধিবেশন শেষে দুপুরের অধিবেশনের জন্য প্রস্তুতি চলছিল। ট্রান্সমিটার ভবনের বাইরে ছিল সবাই। এমতাবস্থায় বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে সহসা অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। সবাই দৌঁড়ে স্টুডিওর দিকে ছুটে যায়। চট্টগ্রাম বেতারের কয়েকজন কর্মকর্তাকে কিছু প্রচার করতে দেখা যায়। ‘স্টুডিওর মাইক্রোফোন তখন বেতার প্রকৌশলী সৈয়দ আবদুশ শাকেরের দখলে। তাঁর পাশে উপবিষ্ট ছিলেন প্রযোজক মুস্তফা আনোয়ার। অপারেশন বুথ-এ রেজাউল করিম চৌধুরী।… এঁদের সমাগম আমাদের জন্যে উৎসাহকর। কিন্তু এমনি সহসা ট্রান্সমিটার চালু করা নিয়মতান্ত্রিক ছিল না। পাঠ শেষ হবার পর আমরা আপত্তি প্রকাশ করেছিলাম।’

মূলত অগোছালো এ সব দিনে অনুষ্ঠানের নির্ধারিত কোন সূচি ছিল না। তারপরও ‘প্রতিদিন সকাল ৯ টার পর প্রথম অধিবেশন। দুপুর ১ টার পর দ্বিতীয় অধিবেশন এবং সন্ধে ৭ টার পর তৃতীয় অধিবেশন। এটাই শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে আমাদের আগাম ঘোষণা। কাঁটায় কাঁটায় অনুষ্ঠান প্রচার সম্ভব ছিল না বলেই এভাবে জানিয়ে রাখা হতো।’

৩০ মার্চ “হাওলা রোড থেকে সবাই ট্রান্সমিটার ভবনে ফিরে এসেছিলাম। সেই প্রভাতী অধিবেশনের জন্যে মেজর জিয়াউর রহমান আর একটি ঘোষণা লিখে নিয়ে এসেছিলেন। পরে তিনি অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন।… ৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশনেই অনুষ্ঠানের সূচনায় ও সমাপ্তিতে একটি রেকর্ড বাজানো হয়েছিল। ঢাকা রেকর্ডের ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটির এপিঠ ও ওপিঠ। প্রস্তাবটি ছিল শারফুজ্জামানের। সূচক সুর হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শেষ দিনটি পর্যন্ত ‘জয় বাংলা  বাংলার জয়’ গানটির প্রচার চালু ছিল। রেকর্ডের প্রথম পিঠ। সমাপ্তিতে নভেম্বর ১৯৭১-এর কোন এক সময়ে গানটির দ্বিতীয় পিঠ বাজানোর বদলে জাতীয় সঙ্গীত প্রচার প্রবর্তিত হয়েছিল।”

‘যে-পরিস্থিতিতে আমাদের তদানীন্তন নির্বাসিত সরকারকে (একসাইল গভ:) প্রাথমিকভাবে তাঁদের নিয়ন্ত্রিত বেতার কেন্দ্রের অধিবেশন সমাপ্তিতে প্রচার প্রবর্তনের মাধ্যমে এ গানটিকে জাতীয় সঙ্গীতরূপে অভিহিত করতে হয়, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা টাঙ্গাইলের জনাব আবদুল মান্নানের রয়েছে। তিনি ছিলেন ঐ সময়ে সংগ্রামী সরকারের তথ্য ও বেতার দপ্তরের এম-এন-এ- ইনচার্জ।’

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা মন্দ হবে না — “‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানের ‘দ্বিতীয় পিঠ’- এর কয়েকটি কথা ছিল নিম্নরূপ:

ভুখা আর বেকারের মিছিল যেন ঐ

দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে,

রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ

ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে।

এই বক্তব্যটি কালক্রমে আত্মদ্রোহের নামান্তর হতে পারে, এ বিষয়েও তৎকালীন নেতৃত্বে মধ্যে বৈদগ্ধ সংক্রমিত হওয়া বিচিত্র ছিল না।”

৩০ মার্চ দুপুর ২টা ১০মিনিটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে পাক বাহিনী বোমাবর্ষণ করে। বাংলাদেশে পাক বাহিনীর এটাই ছিল প্রথম বোমাবর্ষণ। ২টি বোমারু বিমান থেকে আনুমানিক ১০মিনিটের মধ্যে ১০টি বোমা ছোড়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত হয়নি। বোমাবর্ষণ আঁচ করতে পেরে সুবেদার সাবেত আলী আশু করণীয় সম্পর্কে বলে গিয়েছিল। যা ছিল বেশ কাজের।

বোমা বিধ্বস্ত কালুরঘাটে কার্যক্রম চালানোর আর জো রইল না। পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার ডিসমেন্টাল করা হয়। ৩১ মার্চ ট্রাকে করে ট্রান্সমিটারটি পটিয়া মাদরাসার একটি কক্ষে রাখা হয়। প্রথম দিকে বেলাল মোহাম্মদদের পরিকল্পনা ছিল মোবাইল বেতার কেন্দ্র করার। মানে ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি একটি ট্রাকের ওপর ইনস্টল করবে এবং পাশাপাশি আরেকটি ট্রাকে জেনারেটর রাখা হবে। জেনারেটর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহের মাধ্যমে বেতার চলবে। কক্সবাজার ওয়াপদা অফিস থেকে জেনারেটর নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। এই মোবাইল ট্রান্সমিটার চালু করার প্রাথমিক স্থান নির্বাচন করা হয়েছিল পটিয়া। এ পরিকল্পনা মাথায় রেখে ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি কালুরঘাট থেকে পটিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছিল। ১ এপ্রিল বোয়ালখালির ওঁসখাইনের বাসিন্দা বেতারের প্রবীণ প্রকৌশলী মোসলেম খানের সাথে পরামর্শ করা হয়। মোসলেম খানের পরামর্শ ছিল অনেকটা এ রকম, ১ কিলোওয়াট পটিয়ায় ইনস্টল করে কোন লাভ নেই। ঠিকঠাক মত পটিয়াই তো কভার করবে না। তাছাড়া ওরা কালুরঘাটে বোমা ফেলেছে। পটিয়ায় বোমা ফেলতে আর কতক্ষণ।

(চলিবে)

দোহাই

সদ্য প্রয়াত কবি বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য।

স্বাতিজল — মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

স্বাতিজল বিনে কিছুই খায় না চকোর
যে জলে মুক্তা ফলে সারস নায় রাতে
 

নবীনা, নেমেছ তোমরা প্রদোষ রাজপথে
ভৃঙ্গার দল ডানা ভেঙ্গেছে সাধকের ভাঙ্গাদ্বারে

 

শতবাট ঘুরে এক ফোঁটা তবে স্বাতিজল ফোটে যদি
তড়িৎ জীবনে চুচু পিয়ো তুমি শুষ্ক অধর ছুঁয়ে
দ্বারে থাকে না তো মণি মুক্তা অতল সাগর তলে
রতিদান সে তো প্রতি দোরে দোরে নয় খালি পরদ্বারে

 

কোলাহলে তুমি স্বাতিজল পাবে চকোর হয়ো না আর
মুণি ঋষি ঐ টুটে ছুটে চলে মানস পুকুর পাড়।

আহমদ ছফা–মুহাম্মদ তাসনিম আলম

আদর্শিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নমুনা
পশমে পশমে গজিয়ে উঠেছে তাঁর

তাঁর রচনাবলির যেখানেই নোঙ্গর ফেলো
একটুকরো বাংলাদেশ পাবে
প্রবন্ধ উপন্যাস কবিতা বা গল্পের যেখানেই পাল তোলো
ঘুরেফিরে একটি বদ্বীপেই পৌঁছাবেÑ যার নাম বাংলাদেশ

সুস্থ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শরীর প্রকটিত একজন আহমদ ছফায়
রক্ত আর অশ্রুয়
ফোঁড়া আর ব্যথায়
আজন্ম তফাতের মায়াকাতর মর্মটি
অকম্পিত নিপাট কণ্ঠে আজীবন চারিয়ে গেছেন তিনি

তীব্র দহনে পীড়নে বিক্ষোভে ফেটে পড়া আহমদ ছফা
ভয়ঙ্কর এক প্রেমিক পুরুষের নাম
যে কিনা তার প্রিয়তমা বাংলাদেশ কথা বলবে বলে
জবান বাজি ধরেছেন
আটখান করে নিজেকে ভেঙ্গেছেন আটান্নতে

এই তো জীবন!
জনমের মতো জীবন বটে এক!
বাহ! বাপকা ব্যাটা তুমি হে
লহুহে আহমদ ছফা
বহুহে আহমদ ছফা।

শার্ল বোদলেয়রের কবিতা

ভূমিকা ও তর্জমা: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

শার্ল বোদলেয়র (৯ এপ্রিল ১৮২১ -- ৩১ আগস্ট ১৮৬৭)

শার্ল বোদলেয়র (৯ এপ্রিল ১৮২১ — ৩১ আগস্ট ১৮৬৭)

উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ইউরোপীয় সাহিত্য বহুলভাবে ফরাশি প্রভাবিত। শার্ল বোদলেয়রের (জন্ম ৯ এপ্রিল ১৮২১, মৃত্যু ৩১ আগস্ট ১৮৬৭) অভিনব পরীক্ষা-নিরীক্ষা এর অন্যতম প্রধান কারণ। শুধু উনিশ শতকের ফ্রান্স বা ইউরোপ নয়, দুনিয়ার তাবৎ সাহিত্যের ইতিহাসে অসামান্য এক প্রতিভার নাম বোদলেয়র। কবিতার জন্য জগদ্বিখ্যাত হলেও প্রথম জীবনে শিল্প-সাহিত্য — Salon de 1845 —  নিয়ে লেখালেখি করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। কবিতা লিখেছেন খুবই কম। ১৮৪৪ থেকে ১৮৪৭ সালে  L’Artiste সাময়িকীতে ১১টি কবিতা লিখেছিলেন Privat d’Anglemont ছদ্মনামে। অবশ্য স্বনামে প্রথম কবিতা — To a Creole Ladz — ঐ একই কাগজে ২৫ মে ১৮৪৫ সালেই বের হয়। Les Fleurs du mal (১৮৫৭) ও Le Spleen de Paris (১৮৬৯) তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই। ১৮৪৬ সালে La Fanfarlo নামে একখানা আত্মজৈবনিক উপন্যাসিকাও ছাপেন তিনি।

১৮৪৮ সালের বিপ্লবে সরাসরি অংশ নেন বোদলেয়র। খণ্ডকালীন সাংবাদিকতার সূত্রে বিপ্লবের পক্ষে দুহাতে লিখেছেন। দ্বিতীয় সম্রাটের পুনরায় ক্ষমতা দখলে তিনি মারাত্মকভাবে হতাশ হয়ে পড়েন। এ সময়ে ডুব দেন তর্জমাসহ অন্যান্য কাজে। তর্জমা করেছেন দেদার। এডগার এ্যালান পোর গল্পসমগ্রের তর্জমা তাঁর অন্যতম মহান কীর্তি।

ছয় বছর বয়সে পিতা ফ্রাঁসোয়া বোদলেয়রের মৃত্যুতে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রচুর ধনসম্পদ লাভ করেন। ফলে প্রথম যৌবনের কয়েকটা বছর কাটাতে পেরেছেন মনের মত সর্বোচ্চ স্বাধীনভাবে। কৌতূহলবশত চেখে দেখেছেন ভয়াবহ সব মাদক। ঐ সময়ে প্যারিসের অভিজাত গ্যালারি, দামি রেস্তোরাঁ, হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তাঁর। বখে যাওয়া তরুণ বোদলেয়রকে উচিৎ শিক্ষা দিতে ১৮৪১ সালে ভারতমুখী জাহাজে তুলে দেয় সৎবাবা জেনারেল অপিক। জাহাজের সময়টার রেশ তাঁর বিভিন্ন কবিতায় স্পষ্ট। কিভাবে কিভাবে এক বছরের মাথায়, ১৮৪২ সালে, এখান থেকে পালিয়ে তিনি প্যারিসে ফিরে যান। এমতাবস্থায় মামলা করে সৎবাবা তাঁর সম্পদের মালিকানায় নিয়ন্ত্রণারোপ করে এবং হাতিয়ে নেয় তাঁর উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তির বিরাট একটা অংশ। বাকি জীবনের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয় অপ্রতুল একটা ভাতা। নিদারুণ অভাব-অনটন, দুর্বল স্বাস্থ্য এবং পাওনাদারের সীমাহীন চাপে কেটেছে তার শেষ জীবনের কয়েকটি বছর।

Les Fleurs du Mal

মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ১৮৬৭ সালের ৩১ আগস্ট এন্তেকাল করেন এই অসাধারণ কবি। গত ৯ এপ্রিল ছিল তাঁর ১৯২তম জন্মদিন। জন্মদিনে কবিকে স্মরণ করে Les Fleurs du mal গ্রন্থ থেকে ছয়টি কবিতার তর্জমা করা হল। বিভিন্ন ইংরেজি তর্জমার আলোকে এই তর্জমা। তাদের মধ্যে উইলিয়াম এলিজার, রায় ক্যাম্পবেল ও  সাইরিল স্কট প্রধান। ক্ষেত্রবিশেষে এ এস ক্যালাইন, জন রিচার্ডসন, উইলিয়াম এইচ কর্সবাই ও কেট নিলেনের তর্জমাও কাজে লাগানো হয়েছে।

বিতৃষ্ণা

নোয়ায়িত মেঘলা আকাশ ঢাকনি যেন
অযুত নিযুত বিষাদবন্দি বিহ্বল আত্মা ’পর
উদ্ভাসিত দশ দিগন্ত — ভাঁজে ভাঁজে
ছড়িয়ে পড়ে তিমিরভেদী জরাখরা দিবা বেলা মোদের ঘিরে;

সারা জাহান এই যেন রে স্যাঁতস্যাঁতে এক সুড়ঙ্গ জেল
বাদুড় হয়ে আশার পাখি যার ভিতরে
ডানা ঝাঁপটায় (আশা) দেয়ালে দেয়ালে নেতানো পাখায়
টোকায় মাথা বারে বারে জীর্ণ ছাদে;

বৃষ্টি যখন ফোয়ারা মত বর্ষিত হয় মুষলধারে
ফুটে ওঠে শিক যেন হে নির্মম এক কারাগারে,
ক্রুদ্ধ ক্ষিপ্ত মাকড়সার দল নীরবে
আমাদের খুলিতে জাল বুনতে এগিয়ে আসে,

সজোরে ঘণ্টা বাজে হঠাৎ করে
ভয়ানক আহাজারি আকাশময় চারিদিকে,
বিক্ষিপ্ত যাযাবর আত্মা যেন
ফেটে পড়ে বুকফাটা বিলাপে।

সারি সারি শবের গাড়ি শোকার্ত মলিন বেশে
পায়ে পায়ে আত্মা বেয়ে যাচ্ছে হেঁটে, নিভে গেল আশার আলো,
অশ্রু ঝরে, জর্জরিত ধিকিধিকি মনোগ্লানি
শোক নিশানা রোপন করে অবনত মোর করোটিতে।

ঝুল বারান্দা

স্মৃতিপালের পোয়াতি গো, ওগো হাজার রাণীর মহারাণী
ওগো, তুমি আমার তাবৎ পুলক! হ্যাঁ তুমিই আমার বন্দেগি!
ফূর্তিঘেরা ছোঁয়াছুয়ির শত অতীত জ্বলবে তোমার মন জুড়ে,
হর্ষছড়া অস্তলোকে ঘেঁষাঘেঁষির মূর্ছনা
স্মৃতিপালের পোয়াতি গো, ওগো হাজার রাণীর মহারাণী!

টাটকা অনল কয়লা দিয়ে সন্ধ্যা হবে অত্যুজ্জ্বল,
আর গোলাপবরণ কুহেলিকার ঘোমটা তলায় সাঁঝ ঘনাবে ঝুল বারান্দায়
অমন তোমার তুলতুলে বুক! দরাজ তোমার দিলখানি কেবল শুধু আমারি!
আমরা দুজন ঘরে ফিরে বাজিয়ে যেতাম অমর গাথা,
টাটকা অনল কয়লা দিয়ে সন্ধ্যা হবে অত্যুজ্জ্বল!

ধূমায়িত সন্ধ্যালোকে বাহ কি দারুণ অর্কপাত!
এতই অথৈ শূন্যলোক! কতই পাষাণ হৃদকমল!
শুঁকতে তোমায় ঝুঁকে গেলাম দেবীকুলের শিরোমণি
খুশবুতে মুই দম নিয়েছি, তোমার খুন যেন হে গোলাপ জল
ধূমায়িত সন্ধ্যালোকে বাহ কি দারুণ অর্কপাত!

ভাঁজে ভাঁজে মেঘের ফাঁকে জমতে থাকে শর্বরী
তিমির ভেদি চোখে আমার বিঁধল তোমার গরিব সফরী,
তোমার যত দমের সুধা পান করে যাই এই আমি, জয় হে শরাব! জয় হে গরল!
ভাই ঠাউরে চুপিসারে আমার হাতে তোমার পা!
ভাঁজে ভাঁজে মেঘের ফাঁকে জমতে থাকে শর্বরী!

জানি আমি কিসে কেমনে খোশ আয়ুরা পোষ মানে,
যাপিত জীবন আবার পেতে তোমার হাঁটুতে শির পাতি।
কেমনে আবার চাছাই টাছাই মুহুর্মুহু রূপ তোমার,
তোমার অতুলতনু দরাজদিলে শ্যাম রাখি না কুল রাখি?
জানি আমি কিসে কেমনে খোশ আয়ুরা পোষ মানে,

অগণিত মনস্কাম, এমন সব সৌরভ আর বেশুমার যত চুম্বন
পুনর্বার কি জন্ম নিবে বেখবরে নাম না জানা সমুদ্দুরে?
যেমনি করে স্বগর্তে সব অরুণ ওঠে তরুণ সেজে,
অতল গভীর সমুদ্দুরে গোসল সেরে অবশেষে
বাহ কি দেমাগ! বাহ কি সৌরভ! শাব্বাশ নিযুত চুম্বন!

শ্রী

পাথরে ছেদা স্বপ্নের মত রাঙা আমি হে পৃথিবী
হুমড়ি খেয়ে পড়ে সবাই আমার বুকে একে একে
কোন কবির মেন্নতকে উতলে দিতে মুখিয়ে ওরা (স্তন) ধুঁকে ধুঁকে
অবিনাশী নীরব নিথর এ যেন এক ধ্যানীর ছবি (স্তন)।

আকাশজোড়া রাজাসনে রহস্যময় ময়ুরাক্ষী
হংসা মার্কা সফেদ পানে যুক্ত করি তুষার হৃদয়
লাইনচ্যুত আসা যাওয়া দেখতে নারি ঘৃণা হয়
কখ্খনো না কান্না হাসি, হয় কি আবার তার সাক্ষী!

টান টান পোজে আমার কবিরা সব টাস্কি খায়
জমকালো এই মনুমেন্টে (পোজ) সবক তাদের এই ভাবি
গরম তালিমের ঠেলায় জীবন তাদের সংহার হায়;

আমার হাতে তাবিজ কবজ পুতুল এসব মজনুদের (কবিদের)
নিখুঁত নয়া আয়না যা বাড়িয়ে দেখায় কয় না
টলমলে মোর নয়ন দুখান অতুল যাহার গয়না।

নেশায়িত সৌরভ

নিমীলিত নয়ন দুখান তেতোমুখর শরৎ সাঁঝে
কুসুম বুকের সুরভী তোমার শুঁকে শুঁকে ঘ্রাণ নেই,
উল্লোসিত বেলাভূমি উন্মীলিত আমার পানে —
খা খা চোখ ধাঁধানো ময়ূখবিতান একনাগাড়ে যার বুকে;

আনকোরা এক নিঝুম দ্বীপে নিসর্গ দিয়েছে ভরে
বিচিত্র সব গাছগাছালি, নোনাজাতের ফলমূল;
পুরুষ লোকের শরীর হেথায় তেজোদ্দীপ্ত ঝরঝরে,
নারীকুলের নেত্রযুগল অভাবিত অকপট

তোমার ঘ্রাণ উপায় করে মনোরম জগৎ পথে
মাস্তুলে আর পালে ভরা বন্দর এক দেখছি একা
উতাল-তাল সাগরময় নেতিয়ে গেছে ঢেউয় ঢেউয়ে

হরিৎবরণ তেঁতুলগাছের কর্পূর অঢেল যে সময়ে
বাতাস জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নাসা আমার যায় যে ফুলে,
আছড়ে পড়ে হৃদয় জুড়ে সারিগানের সারেং সুর।

গরিবের মৃত্যু

চলে যাওয়াই ডুবায় ভাসায় মৃত্যুর একি পরিহাস
জন্মই যদি মরার লাগি তাইলে মৃত্যুই কেবল ক্ষীণ আশ
এ (মৃত্যু) যেন এক জীবন উতার বানায় মোদের খাস বেখাস
যুগিয়ে যায় দীপ্ত পায়ের শক্তি বল, দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা রাশ।

তুষার-তুলা ঝড়-ঝঞ্ঝা বরফি বাগান পেরিয়ে
আদিগন্ত তিমির জুড়ে ইহাই (মৃত্যু) তীব্র তীক্ষè তমোহর
ইহাই (মৃত্যু) জগতমশহুর সরাইখানা, যার ইশারা পাক কিতাবে বর্ণিয়ে
খাওয়াদাওয়া, তন্দ্রা যাওয়া  মনের সুখে সময় কাটা সবকিছুতে মনোহর।

এই যেন এক মায়ার হাতে দেবদূত বিলিয়ে যায়
ঘুমের নাহার, পরম সাধের স্বাপ্নোপহার হায় হায়!
বেয়াড়া গরিব আদম হাওয়ার ঘর করে দেয় এই সে বেটা (দেবদূত)!

ইহাই (মৃত্যু) তো ভাই মিহি করে (!) যশগৌরব বিধাতার, অখিল মরম শস্যাধার
এই তো মোদের টাকার থলে অর্থনাশা গরিবের, পিতৃনিবাস পুরান জেঠা
অচিনপুরের কামের জগৎ ঢোকার তরে শাহীদ্বার (মৃত্যু)।

জনৈক পথচারী

প্যাঁ পোঁ কান ফাটানো চেঁচামেচি রাস্তাজুড়ে আমায় ঘিরে
দেখতে শুনতে তন্দুরুস্ত, বুক ফাটানো শোক সাগরে রাজকীয় দুঃখ নিয়ে —
একটা মেয়ে হেঁটে গেল, হুর পরীদের হাত যেন তাঁর
উঁচু করে জড়িয়ে ধরে শোক পোশাকের আঁচল পাড়

হালকা পাতলা মার্জিত ঢং, পা যেন তাঁর প্রতিমা রূপ
উত্তেজনা ছড়িয়ে যেন থরোথরো শরীরজুড়ে, পান করে যাই —
তুফানমুখী ঘনায়মান গুমোট আকাশ চোখ হতে তাঁর,
কানায় কানায় তৃপ্ত করে মিষ্টিসুধা, অতি মজা জীবনবাতি লুট করে নেয়

চোখ ধাঁধানো এ যেন এক বিজলি চমক… পরমুহূর্তেই অন্ধকার!– ফেরারী রূপ
হঠাৎ করে যার ঝলকে হল আমার জন্মভূত,
শমন জারির আগে তবে মোলাকাত কি আর হবে না?

যেথায় থেকো, এখান থেকে যোজন দূরে! অনেক দেরী! ভরসা নাই!
আমি তুমি কোথায় থাকি কেউ জানি না দুজনায়,
ইশ, বুঝেছিলে এইটুকু যে যেত তোমার সঙ্গী হতে!

দাবানল একাত্তর – মুহাম্মদ তাসনিম আলম

মাইনপোতা দেশে রাতে কাঠবিড়ালি
নামে, মোরগ ডাকে ভোরে
মুচকি মুচকি হাসে ঠোঁটকাটা ইতিহাস
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মুক্তবাজার অর্থনীতি
শান্তি… শান্তি…
বিনিময় চলে হাটে, গণিকারা হাঁটে নিয়তির বাজারে
তিন পায়া কুকুর ঘরমুখো দৌড়ায় রাজপথে
দাবানল একাত্তর দাউ দাউ শাহবাগে
আগুন পোহায়ে রাত ভোর হয় ভোরের সূর্য হাসে
বাংলাদেশ দু’কদম আগায় পায়ে পায়ে
মাইনপোতা দেশে রাতে কাঠবিড়ালি
নামে, মোরগ ডাকে ভোরে।

ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামী: প্রেক্ষিত শাহবাগ আন্দোলন – মুহাম্মদ তাসনিম আলম

(c) অনন্ত ইউসুফ

(c) অনন্ত ইউসুফ

শাহবাগে কি নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে? এর জবাব একেক জন একেকভাবে দিবে হয়তো। সেসব জবাবের সারকথা একটাই। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে যারা ১৯৭১ সালে আলবদর, আলশামসসহ আরো আরো বাহিনী গঠন করে দখলদার পাকিস্তানি হানাদারদের সার্বিকভাবে সহায়তা করেছিল তাদের যথার্থ বিচার প্রার্থনাই শাহবাগ আন্দোলনের মর্মকথা।

মুক্তিযুদ্ধের মত বুনিয়াদি বিষয়ে দেশের জনগণ আপোসহীন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে শাসকশ্রেণির কোন ধরনের বাটপারি কেউ বরদাসত করছে না, এর স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ শাহবাগসহ সমগ্র দেশের গণজাগরণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে যাদের তিল পরিমাণ দ্বিধা নাই, এতে মতৈক্য হতে অন্তত তাদের কোনরকম ঝামেলা থাকার কথা নয়।

কিন্তু আমার দেশ গংরা তো শুরু থেকে ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ শুনতে পেয়েছে শাহবাগে! এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। ‘ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই নাই’ চালের চুটকি দিয়ে বড়জোর চৌকাঠ পার হওয়া যায়। পুলসিরাত পার হতে নিশ্চয় অনেক যোগ্যতা লাগে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ধোঁকাবাজদের চিহ্নিত করে রদ্দি ঘোষণা করবে, ইনশা আল্লাহ।

জামায়াতে ইসলামী আর ইসলাম এক জিনিশ নয়। এই কথা জনগণকে — বিশেষত আমাদের ওলামাদের — খোলাসা করা অমূলক। তারপরও একটু স্মরণ করা যাক। মুফতি আজম মাওলানা শফি, শায়খ মাওলানা জাকারিয়া, আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানী, আহমদ আলী লাহোরী, মুফতি রশীদ আহমদের মত বাঘা বাঘা আলেমরা জামায়েতে ইসলামের রাজনৈতিক গুরু মওদুদির বিকৃত ইসলামকে খারিজ করেছেন মেলা আগেই। মওদুদি বেঁচে থাকতেই দেওবন্দের বিজ্ঞ আলেমরা সম্মিলিতভাবে জামায়াতে ইসলামীকে হারাম ফতোয়া দেন। আগ্রহী পাঠক বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুকের ‘ইসলাম ও মওদুুুদির সংঘাত’ বইটি।

জামায়েতে ইসলামী ক্ষমতা বলতেই টাল! দুনিয়াবি স্বার্থের খাতিরে এরা খুন-খারাবি থেকে শুরু করে যে কোন কিছুই করতে পারে। প্রকৃত বিচারে জামায়াত-শিবির বা আমার দেশ গংদের পরম বুদ্ধিগুরুরা আজন্ম এমনটাই করে চলেছে। এগুলো ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। তারপরও ওরা ইসলামকে রেহাই দেবে না। নাউযুবিল্লাহ।

এই আন্দোলন কোনভাবেই ইসলাম বিরোধী বা নাস্তিক্যবাদী অথবা সমাজতন্ত্র কি সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার কোন আন্দোলন নয়। এর সুনির্দিষ্ট কিছু দাবিদাওয়া আছে। আরেকটু আমভাবে বলতে গেলে, এই আন্দোলনের স্পিরিটেই আসলে অমন কিছু নাই। তথাকথিত বেহায়াপনা বা নাস্তিকতার জিগির তুলে যারা এই আন্দোলনের বিপক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে তারা সত্যিই মতলববাজ। ব্যাপক স্বাধীনতার সুযোগে অনলাইনে গুটিকয় ব্যক্তির নোংরা ইসলামবিদ্বেষের সাথে এই আন্দোলনকে গুলিয়ে ফেলার কোন অবকাশ নাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজীবকে হত্যা করার পরও তার ব্লগে পোস্ট পড়েছে! রঙের দুনিয়ায় কত কিছুই ঘটে রে! আমরা কোন গোষ্ঠীর ধান্ধার ইন্ধন হলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমগ্র মুসলিম উম্মা। হুজুগেপনা অবশ্যই পরিহার করতে হবে। তাই এমন পরিস্থিতিতে সাচ্চা মুসলমানদের হতে হবে অনেক বেশি সাবধান, দায়িত্বশীল।

ইসলাম সর্বজনীন ধর্ম। ব্যক্তিগত সম্পত্তির মত একে নিয়ে কাউকে ব্যবসা করতে দেয়া যায় না।  কালে কালে ইসলাম বিপন্ন হয়েছে কুলাঙ্গার ধর্ম ব্যবসায়ীদের পাপে। কাজেই সাবধান। ইসলাম ইসলাম বলে ওদের চেঁচামেচির আসল অর্থ বুঝতে হবে। ওদের প্রতারণা থেকে বাঁচতে না পারলে আগামী প্রজন্ম আমাদের অপরাধী করবে। ওদের মুখোশ উন্মোচন করুন। এই সমস্ত ভণ্ডদের সামাজিকভাবে বয়কট করুন। এদের ছোবল থেকে ইসলামকে রক্ষা করুন। এটা প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর ইমানি কর্তব্য। বান্দার দায়িত্ব সাধ্যমত চেষ্টা করা। কেননা, চূড়ান্তভাবে ইসলামকে হেফজতের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং রাব্বুল আ’লামিন।

জয়তু শাহবাগ!