Tag Archives: মাহবুব রশিদ

শাহবাগ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আভাস – মাহবুব রশিদ

© আল-আমিন আবু আহমেদ আশরাফ

© আল-আমিন আবু আহমেদ আশরাফ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের কথা আমরা সবাই বলে থাকি। শাহবাগ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশের স্বপ্ন থেকেই পুষ্টি পায়।

সবাই বারবার বহুল ব্যবহৃত শব্দবন্ধটুকু ব্যবহার করে। বিশেষত নেতারা — ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী নেতারা। তারা আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কি বুঝাতে চায় তা স্পষ্ট নয়। জাতীয়তাবাদী হওয়াটাই কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? আমরা মনে করি তা নয়। বারবার সভা সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলাটাও মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের চেতনার সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়।

শাহবাগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটা অংশের স্বপ্ন দেখে। সেই অংশটা হল: ন্যায়বিচার পাওয়া। যেদেশে অপরাধীর বিচার হবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়া দরকার ন্যায়বিচারের অনুরোধে। প্রতিহিংসা চরিতার্থের প্রয়োজনে নয়। ঘৃণা বাঁচিয়ে রাখার দাবিতে নয়। প্রতিহিংসাপরায়ণেরা তাদের ক্ষতগুলো শুকাতে দেয় না। বাঁচিয়ে রাখে। ক্ষতগুলো বাঁচিয়ে রাখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিনিধিত্ব দাবি করা রাজনীতিও। যতদিন ক্ষত বেঁচে আছে ততদিন তা দেখিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রাখতে পারবে, ক্ষত শুকিয়ে গেলে তো আর কোন রাজনৈতিক পুঁজি নেই তার। বিভেদ বাড়লে, জনগণ ঐক্যবদ্ধ না হলে তাদের লাভই তো সর্বাগ্রে।

দেশে ন্যায়বিচার পাবার আকাক্সক্ষার পরিপূরক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আরেকটি অংশ: অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। যেখানে সব বর্ণ-ধর্ম-জাতি-গোত্রের সমঅধিকার থাকবে।

শাহবাগের আন্দোলন নিয়ে যুদ্ধাপরাধী রাজনীতির প্রতিক্রিয়া আমরা সবাই লক্ষ করেছি। যুদ্ধাপরাধীরা নিজেদের রক্ষার স্বার্থে প্রথমেই যে অস্ত্র প্রয়োগ


করেছে তা হল সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানো। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করে যাচ্ছে। এই দেশে আজও হিন্দুরা আক্রান্ত হয়। বৌদ্ধরা আক্রান্ত হয়। পাহাড়ি আর সমতলের আদিবাসী আক্রান্ত হয়। তাদের সংখ্যালঘু করে রাখা হয়। এটা তো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন না, চেতনা না। অন্য যে কোন গোষ্ঠীর তুলনায় হিন্দুরা মুক্তিযুদ্ধে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাদের প্রাণের দাবি। অথচ বাংলাদেশে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হয়েছে।

শাহবাগে আলোচিত হয়নি এমন অনেক অংশও আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার।

যেমন শিক্ষা ব্যবস্থা। ভিন্ন ভিন্ন চার রকম শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলিত আমাদের দেশে। কোন মানুষ কি রকম হবে তা নির্ধারণ করে দেয় এই রকম বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা। মাদ্রাসা শিক্ষার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উৎপাদন পদ্ধতি ও সম্পর্কের সাথে এই ব্যবস্থায় দূরত্ব অনেক। সাধারণত গরিব লোকেই সে ধারায় শিক্ষিত হয়। এবং গরিবই রয়ে যায়। কারণ সে মাধ্যম, বাস্তব জগতে কিছু করে-কেটে নিজের উন্নতির কোন পন্থা তাকে দেয় না।

মধ্যবিত্ত সাধারণ বাংলা মাধ্যমে পড়ে। তাই কিছুটা উন্নতি তারা করতে পারলেও এক জায়গায় গিয়ে তাদের পথ শেষ হয়ে যায়। তারা ঐ মধ্যবিত্তই রয়ে যায়। একই পদ্ধতিতে।

ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে উচ্চবিত্ত। তারা উচ্চবিত্তই হয়। বিত্ত সংগ্রহের সব তরিকাই তাকে শেখানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এটা নয় যে শিক্ষা ব্যবস্থায় তাকে নানা শ্রেণিতে বিভক্ত করবে, বৈষম্য জারি রাখবে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একইভাবে বাস্তবায়িত হয় না ভূমি ব্যবস্থাপনায়। পাহাড়ে আর সমতলে জমি কেনার মালিক হবার ক্ষত্রে বৈষম্য ধরে রাখা হয়। আদিবাসীদের ভূমি দান করে দেয়া হয় সমতলের বসতিস্থাপনকারীদের। শত্র“ সম্পত্তি আইনে বঞ্চিত করা হয় হিন্দুদের।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয় না হিন্দু মুসলমান উভয়ের জন্য প্রচলিত ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক আইনে, বিবাহ নীতিতে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়িত হয় না সমাজে নারী বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। এই কারণেই নারীকে পণ্যে পরিণত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন হয় না স্বাস্থ্যখাতে। সেখানে বড়লোকেরা বেশি খাতির পায়। ফাইভ স্টার হোটেলের মত হাসপাতালে থাকে। নারীর শরীরকে একটা পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয় জন্মনিয়ন্ত্রণের নামে।

শাহবাগে সেসব কিছু অনালোচিত থেকে গেছে। অনেক সময় গড়িয়ে গেলেও সেগুলো আনা যায় নাই। কারণ শাহবাগের যে লক্ষ্য তাই অর্জন করা যায় নাই আজ পর্যন্ত। সেটাও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ক্ষমতাসীনারা সব সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও সে চেতনা বাস্তবায়ন করতে চায় না। ১৯৭২ থেকে আজ পর্যন্ত কেউ চায়নি। সবখানে বৈষম্য বাঁচিয়ে রাখা হয়। আমাদের বিভক্ত রাখা হয় — আমাদের শোষণ করার স্বার্থে। গণজাগরণ তাই বেপথু হবার সম্ভবনা বাড়ে।

সত্যিকার মানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন সম্ভব না। একটা বৈপ্লবিক সরকারই সে চেতনা বাস্তবায়ন করতে পারে। আর কেউ নয়।

ব্লগার ফেনোমেনা ও সময়ের প্রশ্ন – মাহবুব রশিদ

আজ শাহবাগে যাবার সময় রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কিছু মনে না করলে একটা কথা জিগাই… ব্লগার কাগো কয়?’

আমি বললাম, কম্পিউটারে যারা লেখালেখি করে তাদের ব্লগার বলে।

অকস্মাৎ ব্লগাররা একটা ফেনোমেনা হয়ে উঠেছেন। তারা কিন্তু সমাজের বাইরের কেউ না। ব্লগিং তাদের কারও পেশাও না। এদের কোন ক্লাস ইন্টেন্সিটিও নাই। একটা কমিউনিটিতেই তাদের পদচারণা। সে কমিউনিটিতে তাদের আলাদা নর্ম আছে, আলাদা ভাষা আছে, আলাদা আচরণবিধি আছে। সে কমিউনিটির বাইরে কোন আলাদা জাতীয় চেহারা তাদের ছিল না। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ দূরে থাক, নাগরিক অনেকেই তাদের চেনে না।

কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় তারা আজ জাতীয় চরিত্র।

সে দায়দ্বায়িত্ব নেওয়ার জন্য এ কমিউনিটি কতটা প্রস্তুত?

ব্লগারদের ডাকে সারা ঢাকা শহর, সারা দেশ মোমবাতি জ্বালিয়েছে। অফিসের কেরানিকে পর্যন্ত ডাক দিয়েছে কিছু না জেনেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিন মিনিট নীরবতা পালন করেছে। কম করে হলেও ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ শাহবাগে এসেছে।

এসব মানুষের সাথে সেই ব্লগারদের কোন সংযোগ আদৌ আছে কি? তারা কি সেই সেনাপতি না যার সেনাবাহিনীর উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই? যে সেনাবাহিনীকে সে মবিলাইজ করতে পারে না?

তাই ব্লগারদের সব রকম সুচেতনা থাকা সত্ত্বেও তা রাজনীতির দখলে। তাই ব্লগারদের আন্দোলন আজ যে বেশি ক্ষমতাবান তার করতলগত।

সমাজের একটি ছোট অংশ হিসেবে সব মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ব্লগাররা ন্যায় দাবি নিয়ে এসেছিল। সবাই সে দাবির সাথে সংহতিও জানিয়েছিল। ফলে পাই শাহবাগের প্রথম ১০ দিনের অসাধারণ গণজোয়ার।

কিন্তু সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় নাই ক্ষমতাবান রাজনীতির ইন্টারভেনশনের ফলে।

তাই অনবরত ক্রেডিবিলিট হারাচ্ছে শাহবাগ।

শাহবাগের শুরুর দাবি ছিল ক্ষমতাবানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। কিন্তু সে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। তার চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তার র‌্যাডিকাল হয়ে ওঠার সব সম্ভবনা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

ইদানিং সে নানান রকম হাইকোর্টও দেখাচ্ছে।

ব্লগাররা আউট অভ নাথিং হয়ে উঠলেন ন্যাশনাল হিরো। কিন্তু তার কোন স্টেক নাই। এমন নির্বিষ প্রোটেস্টার বা আন্দোলনকারী আর কবে কে কোথায় পেয়েছিল?

অনলাইনে যারা এ্যাক্টিভিজিম করেন, সময় তাদের সামনে এক বড় প্রশ্ন নিয়ে এসেছে।

তারা ভার্চুয়ালি বুলিবাগিশ ক্যাচালপ্রিয় একটা কমিউনিটি হয়েই থাকবেন?

নাকি বুক টান টান করে দাঁড়াবেন?

ঘাস কলি যত গোপনে ফোটায় ছোট ছোট সাদা ফুল।

উঁকি দিয়ে ফুল ঝরে যাবে তুমি কেন?

সংঘবদ্ধ হোন। সংঘং সরনং গচ্ছামি।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

সিন্ধুকে লুকানো মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন – মাহবুব রশিদ

পেছনে ফিরে তাকালে বিষয়টা অবিশ্বাস্যই মনে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয় নাই। হানাদারেরা ফিরে গেছে। ফিরে বই লিখেছে। সাক্ষাৎকার দিয়েছে।
ভুট্টো মরার আগে বাংলাদেশেও এসেছিলেন। দালালেরা তাকে জিন্দাবাদও দিয়েছে! যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে মানুষ পুনর্বাসিত হয় নাই। কিন্তু দালালদের পুনর্বাসন হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা যেখানে ভিক্ষা করে, রাজাকারেরা বহাল তবিয়তেই আছেন, সব সরকারের আমলেই।
রাজনৈতিকভাবেও রাজাকার ও তার দল বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তো জামায়াত ছাড়া হয়ই না। আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক আন্দোলন করেছিল জামায়াতকে নিয়ে পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বই সালে।
আজ বিএনপি তাদের নিয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের আন্দোলন করছে।
বিএনপি আবার আরেক কাঠি সরেস, জামায়াতের তিন লাখ ভোট তারা হারাতে চায় না। তাই জামায়াত থেকে তারা মন্ত্রীও বানিয়ে থাকে। লজ্জা!!
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম তা গড়তে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। নিদারুণভাবে। আওয়ামী-বিএনপি-জাতীয় পার্টি-সামরিক-বেসামরিক-সামরিক বাহিনী প্রভাবিত-তত্ত্বাবধায়ক-অন্তর্বর্তীকালীন সব সরকারই মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যর্থ।
কিন্তু এখনো জনগণ সে স্বপ্নের জন্য লড়ে যাচ্ছে। তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয় নাই। মুক্তিযুদ্ধ এমন একটা চেতনা যা মানুষের মনের সিন্দুকে লুকিয়ে থাকে অমূল্য রত্নের মত। সিন্দুকটা হয়তো খোলা হয় না সব সময়। কিন্তু সময় এলেই মানুষ সেই চেতনা বের করে আনে।
মানুষের উপর আস্থা আমার সে কারণেই। বিএনপি আওয়ামী দ্বি-দলীয় বৃত্তে মানুষ নিজেদের বিভক্ত করেছে। কিন্তু একই সাথে তারা মনের গোপন সিন্দুকে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন লালন করেছে, সংরক্ষণ করেছে।
শাহবাগ সে সিন্দুকে লুক্কায়িত রত্নেরই উজ্জ্বলতা। গতকাল সন্ধ্যায় সে রত্ন হাজারো মোমের শিখায় ঝিলমিল করে উঠেছিল।
বেঁচে থাক সে শিখা। দুহাত দিয়ে তাকে আড়াল করুন রাজাকারের দালালি আর তাদের সাথে আপোসের রাজনীতি থেকে।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩