Tag Archives: মাহবুব অনিন্দ্য

শাহবাগ-সংহতি: প্রগতির সড়কসেতু অথবা দূরের বাতিঘর – মাহবুব অনিন্দ্য

Rally 8

বাতাস হয়ে উঠেছে এলোমেলো, পুরানো যা কিছু ছিল, সবই যেন উল্টে গিয়েছে। কে কাকে দণ্ড দেবে, কাল যে ছিল দণ্ডবিধাতা আজ সে কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে, ওখানে, সেখানে, যেদিকে কান পাতো, শোনা যাবে বিদ্রোহের পদধ্বনি। যারা এতদিন ভয়ে কথা বলত না তারাও আজ গর্জন করে উঠেছে। (সত্যেন সেন, মহাবিদ্রোহের কাহিনী, ১৯৫৮: ৩৯)

প্রগতির সড়ক বা সেতু ধরে কতটা এগোনো যায় পথ? শাহবাগের অভূতপূর্ব এই মানবসংহতির আপাতবিচারে কোন বিষয়গুলো নির্ধারক বা নিয়ামক হতে পারে? সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমষ্টির চেতনা-উন্মেষের এই কালপর্বে শাহবাগ ঠিক কি প্রকার তাৎপর্য হাজির করে চলেছে এখনই তার হিসাব-সমীকরণ মেলানো সহজ কাজ নয়। হয়ত বা উচিতও নয়। বিশেষ করে এর সাথে যখন জড়িয়ে আছে বাঙালির সবচেয়ে গর্বের ও একইসাথে, বলা যায়, সবচেয়ে দুঃখের ইতিহাসও।

মাত্র নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামে স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জন করে এই বাঙালিই বিশ্ব ইতিহাসে বিরলতম এক ঘটনার জন্ম দিয়েছে। লিপিবদ্ধ করেছে বিশ্বের নানা প্রান্তে স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য প্রেরণার ইতিহাস, মানবসত্তার নয়া ইশতেহার। আবার, একাত্তরেই এই ছোট্ট ভূখণ্ডে বিশ্বের সবচেয়ে নারকীয় হত্যা-ধর্ষণ-লুটতরাজ-অগ্নিসংযোগের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে মানুষ! অবশ্য সব মানুষকে মানুষ বলা ঠিক না, যেমন পাকিস্তানি হানাদার-হায়েনা ও তাদের যাবতীয় অপকর্মের সহযোগী রাজাকার-আলবদর-আলশামস প্রভৃতি। তবে সামাজিক যোগাযোগের নানা মাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, জগতের কোন পশু-প্রজাতি এইসব বিশ্বাসঘাতক-নরখাদকের নাম বহন করতে রাজি হচ্ছে না। এতে করে নাকি পশুসমাজে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিবে!

এহেন নানামুখী সৃজনশীলতা-রাগ-ক্ষোভ ও পরিহাসে প্রজন্মের অন্তরের শক্তি টের পাওয়া যাচ্ছে। টের পাওয়া যাচ্ছে সর্বাঙ্গীন ঘৃণার মাত্রা ও উত্তাপ।

উনিশশ একাত্তর এভাবে জাতির চৈতন্যে বারবার ফিরে আসছে, হানা দিচ্ছে প্রজন্মের মনোজগতে। আকুতি জানাচ্ছে। একাত্তর পর্বতের বুক ফুঁড়ে আসা অবিরাম ঝর্নার মত, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে যাওয়া চেতনার সতত স্ফূরণ। একাত্তর কখনো অতীত বা পতিত হয় না। মুক্তিযুদ্ধ কোন হারানো-ফুরানো জিনিস বা ফেলে আসা দিনের গল্পকাহিনী হয় না।

একাত্তর অথবা মুক্তিসংগ্রাম বাঙালির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক বর্তমান, জীবনের সবচেয়ে নিকট বাস্তব। যেন হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা মূল্যবান পরশপাথর, সোনার চেয়েও কিছু বেশি চিকচিক, আলো। যুদ্ধাপরাধের বিচার তাই ইতিহাসের দায় নয়, বরং বলা যায়, ইতিহাসের কাছে দায় মেটানোর, ইতিহাসের কলঙ্কমোচনের দায়।

ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু এই কারণে না যে, সেটা নিজে থেকেই পুনরাবৃত্তি ঘটায় বা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। বরং ইতিহাস এজন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে বারংবার ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো অগ্রাহ্য করা একটা  দেশের জাতিগত চেতনায় প্রভাব ফেলে। এবং পুরো দেশটাই পুরোনো ঐ ঘটনাগুলোর কবলে জিম্মি হয়ে থাকে।  (ইয়াকুব খান বাঙ্গাশ, দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

জাতিরাষ্ট্রের স্কন্ধ থেকে যুদ্ধকালীন বীভৎস অপরাধের পাষাণভার নামিয়ে ফেলার প্রত্যয়ে জনসাধারণ বিশেষত তরুণসমাজ আন্দোলনে নেমেছে। কাদের মোল্লার বিচারের রায় মূলত এই আন্দোলনের উপলক্ষ হলেও, ছাত্রজনতার প্রতিরোধ-আন্দোলনকে নির্দিষ্ট কোন গণ্ডিতে বা সীমায় আবদ্ধ থাকতে দেখা যাচ্ছে না। দিন যত গেছে শাহবাগে মানুষের সম্মিলন-সংহতির মাত্রা বেড়েছে, আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে, শহরে-গ্রামে, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ লালনকারী বাঙালির মধ্যেও। কাদের মোল্লার বিচারের রায় থেকে সৃষ্ট হতাশা-সন্দেহ-অবিশ্বাস এবং বিচার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিপুল সংশয় থেকে প্রথমে ইন্টারনেট অ্যাকটিভিস্ট পরিচয়ে তরুণরা আন্দোলনের সূচনা করলেও পরে সেটি বয়স শ্রেণি লিঙ্গ পেশা শিক্ষা নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানুষের নতুন এক সংহতি রচনা করে।

শাহবাগের বিরাট সম্মিলন, হাজারো কণ্ঠের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করা অবিরাম শ্লোগান, মানুষের হৃদয়ের দাবির পক্ষে প্রতিবাদী গান-করতালি, রক্তের উত্তেজনা, দিনরাতের জাগরণ — কোন কিছুই আর আন্দোলনের মাত্রা ও পরিধি বোঝাতে সক্ষম নয়। আন্দোলন ছড়িয়ে গেছে মানুষের প্রাণময় সত্তার গভীরে, একাত্তর নিয়ে মানুষের প্রতীকী পুঁজি হয়েছে সমৃদ্ধ। সার্বিক অর্থে দেশ সমাজ রাজনীতি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ না দেখা তরুণ প্রজন্মের অন্তরের আকাক্সক্ষা টের পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথযাত্রার আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে তাদের মন ও মননের ইশারা অনুভব করা যাচ্ছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সমকালীন বাংলাদেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নানামুখী সংকট ও বিশৃঙ্খলা, দায় এড়ানো ভাব, বর্তমান প্রজন্মের অসচেতনতা এসব ক্ষেত্রেও শাহবাগ অন্দোলন নিঃসন্দেহে বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা করবে। এভাবে শাহবাগ নির্মাণ করেছে মানুষের জাতীয়তাবোধের নতুন জায়গাজমি, বোঝাপড়ার নয়া রাস্তা। এর নামই প্রগতি বা সামনে এগিয়ে যাওয়া।

শাহবাগ সংহতির উপর্যুক্ত বিচার বিশ্লেষণ এই প্রগতির আপাত পরিমাপক বা নির্ধারক হতে পারে। কেননা শুধু সামাজিক সংহতি দিয়ে প্রগতি বিচার করা যায় না, সেই সংহতির গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করতে হয়। গ্রিসের ভাববাদী দার্শনিক প্রোটাগোরাস বলেছিলেন, ‘মানুষই হচ্ছে সবকিছুর মাপকাঠি, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই জ্ঞানবিজ্ঞান ও বিশ্বচরাচরকে দেখতে হবে।’ (নাজমুল করিম, সমাজবিজ্ঞান সমীক্ষণ, ১৯৭২: ২১৯)

প্রগতির সড়ক ধরে কতটা সামনে এগোনো যাবে এই প্রশ্নে তাই মানুষের কাছেই ফিরে যেতে হবে। গভীর অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করতে হবে তাদের মন ও মনন, আকাক্সক্ষার নানাদিক। দূর ভবিষ্যতে তুখোড় কোন সমাজবিজ্ঞানী ঐতিহাসিক দার্শনিকের নৈর্ব্যক্তিক গবেষণা শাহবাগ নির্দেশিত প্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের সার্বিক ফলাফল হাজির করতে পারে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপকাঠামো নিজের ভাবকল্পনায় একবার দেখে নিতে চাইলে শাহবাগে নিরস্ত্র মানুষের ক্ষমতার জায়গাটা একবার মিলিয়ে নেয়া যেতে পারে।

সংকটের মুহূর্তে এমন করে মানুষ গর্জে ওঠে বারবার। তারা ‘এক ঘুষিতে ভাঙতে পারে লোহার কড়াই’! উনিশশ বাহান্ন উনসত্তর কি একাত্তরের রক্ত অভ্যুত্থান সংগ্রাম আর এই ২০১৩ সালের অভূতপূর্ব শাহবাগ গণজাগরণে বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের শক্তি প্রমাণ করেছে। জানান দিয়েছে তারা ‘মিছেমিছি বড়াই’ করে না। এই মানুষদের সৃজনে-শক্তিতে সকল ভয়কে জয় করে বাংলাদেশ এগিয়ে যায়। শাহবাগ থেকে স্পষ্ট দেখা যায় দূরের বাতিঘর। আর অন্ধকারের ভয় নেই।