Tag Archives: মকবুল আহমেদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার: ভ্রান্তির ফাঁদ ও বুর্জোয়া দলসমূহের অভিন্ন স্বার্থের জয় — মকবুল আহমেদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির পক্ষে-বিপক্ষে আন্দোলন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর পার করে দিতে পারল। বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে তৈরি ফাঁদ এবং বর্তমান বিরোধী দল ও তার মিত্রদের সচেতনভাবে সেই ফাঁদে পা ফেলে আন্দোলন-আন্দোলন খেলার বিষয়টি জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোন আন্দোলন নয়। রাষ্ট্রের স্বৈরতান্ত্রিক কোন বৈশিষ্ট্যবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন তো নয়ই। বর্তমান রচনায় এই বিষয়টিই আমি দেখাতে চেষ্টা করব। একই সাথে বলার চেষ্টা করব এ আন্দোলন বর্তমান সরকারের বা আওয়ামী লীগের মৌলিক কোন স্বার্থবিরোধী তো নয়ই বরং তা তার শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার সহায়ক বৈকি।

আমাদের মনে আছে, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এরশাদ-মওদুদদের পতন হলে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কোন পক্ষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। হয়েছে তিন জোটের রূপরেখা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মারপ্যাচে জামায়াত আওয়ামী লীগ বিএনপি বামজোট প্রভৃতির আঁতাতের মাধ্যমে স্বৈরাচারী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরই রক্ষক তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট। এরশাদ তার সরকারের প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিকট সেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্র শ্রমিক পেশাজীবী সংগঠনগুলির নেতৃত্বের আনুষ্ঠানিক পরাজয় ঘটে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শরিক বুর্জোয়া পাতিবুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য যে ফর্মুলা তৈরি করেছিল (এবং পরে যেভাবে তিন জোটের রূপরেখা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়েছিল) তা ছিল পতিত স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের গায়ে কোন আঁচড় না লাগানোর একটা আনুষ্ঠানিক আয়োজন।

বিএনপি আওয়ামী লীগ জামায়াতের স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের ক্ষমতা থেকে শুধু এরশাদকেই হটিয়ে দিতে, কখনো স্বৈরাচারী রাষ্ট্রকে চূর্ণ করা নয়। সেজন্য তখন বলা হয়েছিল ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’ জাতীয় শ্লোগান। তিন জোটের রূপরেখা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার মাধ্যমেই সেই স্বৈরাচারী রাষ্ট্র (যে রাষ্ট্রে এরশাদের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সকল সুযোগ ছিল তা) অক্ষত ও অক্ষুণœ রাখার সকল আয়োজন সম্পন্ন হয়েছিল। বিএনপি আওয়ামী লীগ জামায়াত জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল এরশাদ-মওদুদ তাদের খেয়ালখুশিতে স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিল, তাই তাদের সরাতে হবে। তাদের হটিয়ে দিলেই সবকিছু ফয়সালা হয়ে যাবে। তারা তখন সফল হয়েছিল স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণের সকল ক্ষোভ ও বিদ্রোহকে শুধুমাত্র ব্যক্তি এরশাদ-মওদুদের বিরুদ্ধে নিয়ে যেতে। রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী চরিত্রের কাঠামো বা বৈশিষ্ট্যের জন্যই যে শাসকগণ (এরশাদ, খালেদা, হাসিনা সবাই) স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন এবং রাষ্ট্রের সেই স্বৈরাচারী চরিত্রের উপাদান নির্মূল করাই যে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত তা সেদিন ভালভাবেই আড়াল করতে পেরেছিল লীগ বিএনপি জামায়াত।

১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দলগুলি এরশাদকে ও তৎকালীন রাষ্ট্রকে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট বলে অনেক গালমন্দ করেছিল। তারা সেদিন এরশাদকে হটিয়ে ২০১৩ সাল অবধি বহুবার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সিংহাসনে বসেছেন। তারাও প্রত্যেকে পরস্পরকে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট বলে গালমন্দ করেছেন এবং করে চলেছেন। এখন অবশ্য সেই কথিত স্বৈরাচারী এরশাদকেও গণতন্ত্র চর্চার প্রধান কেন্দ্র বলে কথিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সুবোধ গণতন্ত্রীর মত বসে থাকতে দেখা যায়।

2.1কি করে একজন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতা স্বৈরতন্ত্রী হয়ে ওঠে বা গণতন্ত্রী হয় তা বুঝব কিভাবে? ভোটে দাঁড়ালে বা ভোটে জিতলেই কি তারা গণতন্ত্রী হয়ে যায়? শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই স্বৈরতন্ত্র ও গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য থাকে। অথচ রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ও অগণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিকে আঙ্গুলিনির্দেশ না করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রতিটি ক্ষমতাসীন দল বা সরকার প্রধানকেই বিরোধীরা স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যায়িত করছেন।

১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে পরবর্তীকালে সংহত ও সাংবিধানিক রূপ দেওয়া তো দূরের কথা, বরং স্বৈরাচারী ও আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর ঘটানোর প্রক্রিয়াকেও বিসর্জন দিয়ে ফেলে তথাকথিত তিন জোট। আগেই বলেছি, তাদের রূপরেখা অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য নয়, এরশাদ আমলের স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে রক্ষার মাধ্যমে একজন স্বৈরাচারের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য। এ যাবৎ সকল তত্ত্বাবধায়ক সরকার একই কাজ করে চলেছে। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাষ্ট্রের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এরশাদ স্বৈরাচারী হয়েছিলেন, সেই একই চরিত্রের জন্য খালেদা বা হাসিনাও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছেন।

বিষয়টি পরিষ্কার যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে স্বয়ং গণতান্ত্রিক করতে পারে না। তার কাজ সাবেক অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কারা স্বৈরতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে তার সরকার গঠনের জন্য একটি নির্বাচন তদারকি করা মাত্র। শাহাবুদ্দিন আহমদ ও অন্যান্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানগণ এ কাজটিই করেছিলেন। এখন যে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাইছে তার সাথে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শাসনের কোন সম্পর্ক নেই। বিএনপি জামায়াত এখনো কোন ইশতেহারে বলেনি, যে যে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার যে যে বিষয়ে তাদের ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছিল তার সুরাহা বা তার গণতান্ত্রিক রূপান্তর তারা কিভাবে করবে। জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, কর্মসংস্থান সর্বোপরি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের নিমিত্ত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের জন্য কি কি পরিকল্পনা তাদের রয়েছে তার কোন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মসূচি দেখা যায় না। এছাড়া, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার কমতি নেই। ব্যর্থতাসমূহ চিহ্নিত করে সেসব ক্ষেত্রে তাদের বিকল্প কর্মসূচি বা গণতান্ত্রিক দিকনির্দেশনা কি হবে তা জনগণ এখন অবধি জানে না। কি স্থানীয় কি জাতীয় পর্যায়ে জনগণের জীবন-জীবিকার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে বিএনপি জামায়াতের সরকারবিরোধী কোন কর্মসূচি বর্তমান সরকারের আমলে বিশেষ দেখা যায়নি।

শুধু নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাওয়া কোন রাজনৈতিক দলের জন্য গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হতে পারে না যতক্ষণ না তারা জনগণের জন্য উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের কর্মসূচি তুলে ধরতে পারেন। সাবেক নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে অক্ষত ও বহাল রেখে তার শাসক হবার বাসনা পূরণের ইচ্ছা এবং তার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাওয়ার মধ্যে কোন গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার ছবি ফুটে ওঠে না।

2.2নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার জন্য জনহিতকর কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেয়ে মেয়াদ শেষে পরবর্তী নির্বাচনে কিভাবে জিততে পারবে তার হিশেব নিকেষ কষে তড়িঘড়ি করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নাকচ করলেন — যদিও ব্যবস্থাটা একরকম তাদেরই আমদানি এবং তারাই এর অন্যতম সুফলভোগী। এবং বলল এ সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে বর্তমান সরকারের অধীনে এবং নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্বে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিরোধী বিএনপির জন্য আওয়ামী লীগের এই ফাঁদ অনেকটাই ভ্রান্তিমূলক, কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা কখনো বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্বার্থহরণকারী কোন ব্যবস্থা ছিল না। বরং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় বুর্জোয়া দলগুলোর নেতৃত্বের ও আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতায় এবং দুর্বল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনায় সক্ষমতার অভাবের কারণেই তত্ত্ববধায়ক সরকার টিকে ছিল। এ কথা স্পষ্ট যে নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা অর্জনে প্রধান অন্তরায় স্বয়ং সরকার। সেক্ষেত্রে মরিয়া হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অকার্যকর করা স্বয়ং ক্ষমতাসীন জোট সরকারের সমর্থকরাই সঠিক বলে মনে করেন না। আওয়ামী লীগের এ পদক্ষেপকে তাদের নিজেদের স্বার্থের দিক থেকেও একটি ভ্রান্ত পদক্ষেপ বলে রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন। তা সত্ত্বেও সরকারের অন্য কোন নীতির বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিরোধীদল আন্দোলনে যাবার আগেই আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফাঁদটি পাতলেন এবং ক্ষমতার মোহে অন্ধ বিএনপি তাতেই পা ফেলল।

সরকারের অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রসার, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, পরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও অন্যন্য ক্ষেত্রে সরকারের দলীয় বাহিনীর সস্ত্রাস, সরকারের জনস্বার্থ বিরোধী নানা নীতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সর্বোপরি জনগণের জীবনমানের অধোগতি প্রভৃতি বিষয়ে অন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়ার যথেষ্ট কারণ ও সুযোগ ছিল বিরোধীদলের। বিরোধী বিএনপি জামায়াত জোটকে তাদের নেতাদের দুই একটি ব্যক্তিগত ইস্যু ছাড়া বর্তমান সরকারের কোন অন্যায্য কাজ বা নীতির বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করার কোন উদ্যোগ নিতে দেখা করা যায়নি।

সরকার দলীয় লোকদের অন্তর্বিরোধ দেখে এবং দেশের সর্বস্তরে দুর্নীতির ক্রমপ্রসার ও জনগণের অসহায় জীবনযাপন প্রভৃতির মধ্যে বিরোধীদলের সচেতন নীরবতা বিএনপিকে বরং বর্তমান সরকারের সকল কর্মকাণ্ডের বড় সমর্থক বলে প্রতীয়মান করেছে। বর্তমান সরকারের পাতা ফাঁদে পা ফেলে বিএনপি বরং আওয়ামী লীগকেই অনেক বেশি স্বস্তি দিয়েছে।

তত্ত্বাবধায় সরকার দাবির এ আন্দোলনে শ্রমিক কৃষক পেশাজীবীর কোন স্বার্থকে জড়িত করে মালিকশ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করার কোন বিষয় নেই। এ আন্দোলনে দরিদ্র যাত্রী সাধারণের স্বার্থে বাস লঞ্চ ট্রেন মালিকের অতি মুনাফা ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন কথা বলার প্রয়োজন হচ্ছে না। এ আন্দোলনে গার্মেন্টস শ্রমিকের পক্ষে দাঁড়িয়ে গার্মেন্টস মালিকের বিরুদ্ধে কোন বক্তব্য নেই। এ আন্দোলনের সাথে দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতির ফলে কৃষক শ্রমিকের অনাহার অর্ধাহারের বিষয়টিকে যুক্ত করা হয়নি। এ আন্দোলনে তাদেরই রাষ্ট্রের অপরাপর কালাকানুনের বিরুদ্ধে কথা বলা হচ্ছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রমিক জনতার পক্ষে কথা বলার মানেই হল কোন না কোন মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে কথা বলা। বিএনপি আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি জামায়াত সবাই নিজেরাই একপ্রকার মালিকপক্ষের কিংবা সেই পক্ষের হীনস্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তাই জনগণকে দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত ও নিষ্পেষিত করে এমন শোষণ ও নিপীড়নমূলক সমস্যা নিয়ে মালিকপক্ষ ও সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত না করতে পারার সুযোগ বিএনপি জামায়াতের জন্য যেমন সুখকর তেমনি বর্তমান জোট সরকারের জন্যও নিরাপদ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির আন্দোলন একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শাসক বুর্জোয়া শ্রেণির একটি অংশকে কোটি টাকা ব্যয়ের নির্বাচনে হারিয়ে অন্য আরেকটি কোটিপতি অংশকে ক্ষমতাসীন করার এবং জনগণের উপর পীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে রক্ষা করে চলার দাবি ছাড়া আর কিছুই নয়। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গণতান্ত্রিক ইস্যু বা কর্মসূচি ছাড়া শুধু কোটিপতিদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাবার এই দাবিকে গণতন্ত্রের সপক্ষে আন্দোলন বলার কোন যৌক্তিকতা নেই। বর্তমান বিএনপি শুধু নয়, আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের অতীতের আচরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সরকারের দুঃশাসনের প্রতি জনগণের ক্ষোভ ও রাষ্ট্রের দুর্নীতিপরায়ণ শাসনব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থার ফলে জনসাধারণের গতি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমাবেশের দিকে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বিএনপির সমাবেশে জনগণের যে জমায়েত তাকে তাদের তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন নিরপেক্ষ সরকার দাবির পক্ষে জনগণের সমর্থন বলার কোন সুযোগ নেই।

দীর্ঘ চার পাঁচ বছর ধরে বিএনপি যদি নিজেদের আন্দোলনকে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারে — এখন অবধি তাই হয়েছে — এবং জনগণের মধ্যে সচেতন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠনের অভাব হেতু বিএনপি যদি জনগণের একটি অংশকে তাদের পেছনে জমায়েত রাখতে সক্ষম হয়, তাতেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত রাজনৈতিক বুর্জোয়া দলের স্বার্থের জয় হল বলে ধরে নেওয়া যায়। তাদের জয় এ কারণে যে জনগণ কোন বুর্জোয়া শোষণ ও স্বার্থবিরোধী, দরিদ্র জনসাধারণের স্বার্থের পক্ষের কোন রাজনৈতিক শক্তির পেছনে জমায়েত হয়নি। সর্বোপরি, বলতে বাধা নেই, এই জয় প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রেণির অভিন্ন স্বার্থেরই জয়।

একজন সহজ মানুষের প্রতিকৃতি– মকবুল আহমেদ

রম্যরচনার ধারা বাংলাদেশের সাহিত্যের মধ্যে অপ্রধান বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। রাজনৈতিক ধারার লেখকদের মধ্যে আরো কম পাওয়া যাইবে রম্য প্রভাব। রাজনৈতিক বিষয়ে লেখার মধ্যে হাস্যরসের সরস ব্যঞ্জনা সৃষ্টির অনন্যসাধারণ লেখক ছিলেন আসহাব উদ্দীন আহমদ। তাঁহার মৃত্যুদিবস ছিল গত ২৮ মে তারিখে। ১৯৯৪ সালের এই দিনে এই মহান লেখকের মহাপ্রয়াণ ঘটে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। তাঁহার মৃত্যুদিবস স্মরণে বাংলা ভাষার পাঠকদের সামনে তাঁহার সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য তুলিয়া ধরা হইল

আসহাব উদ্দীন আহমদ

আসহাব উদ্দীন আহমদ

আসহাব উদ্দীন আহমদ জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালে চট্রগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর গ্রামে। তাঁর মায়ের নাম নাছিমা খাতুন, বাবার নাম মুনশী সফর আলী চৌধুরী। আসহাব উদ্দীন ছিলেন একাধারে সফল শিক্ষক, সরস লেখক ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ। বর্তমানে তাঁর রচনাবলির দুস্প্রাপ্যতার কারণে নতুন প্রজন্মের পাঠক তাঁকে চিনতে পারছেন না এবং পুরনো পাঠকেরা ভুলে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্যই এখানে তাঁর কর্মজীবনের ও রচনাবলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হবে।
আসহাব উদ্দীন আহমদ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন তাঁর নিজ গ্রামের বাণীগ্রাম-সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৩২ সালে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন চট্রগ্রাম কলেজে ১৯৩৪ সালে। কোলকাতা বিশ্ব্যবিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে বিএ পাসের পর ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৯ সালে।
শিক্ষাজীবন শেষ করেই আসহাব উদ্দীন আহমদ শিক্ষকতায় যোগ দেন। তিনি চট্রগ্রাম কলেজ, মহসীন কলেজ (তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজ), লাকসাম নবাব ফয়েজুন্নেসা কলেজ, ফেনী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।
আসহাব উদ্দীন আহমদ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপনাকালেই পূর্ব পাকিস্তানে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। ততদিনে বাংলা ভাষার উপর চরম আঘাত হানার অপচেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনসাধারণের উপর নির্যাতনের রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সংখ্যালঘু জনগণের উপর নির্যাতন ও সর্বোপরি বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য কয়েকজন সহকর্মী অধ্যাপক ও কয়েকজন হিন্দু-মুসলমান ছাত্রের উদ্যোগে আসহাব উদ্দীন কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত করেন ‘প্রগতি মজলিশ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। কুমিল্লা বীর চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি ও টাউন হলের উল্টা দিকে একটি কাপড়ের দোকানের দোতলায় ছিল এর অফিস।
মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কোন প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা তখন সহজ কাজ ছিল না। পাকিস্তানি শাসকদের প্রতিক্রিয়শীল ও নিপীড়নমূলক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আসহাব উদ্দীন ও তাঁর বন্ধু অধ্যাপকরা কঠিন কাজটি করলেন। কাজেই, সাথে সাথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রশাসনের কোপদৃষ্টি পড়ল ‘প্রগতি মজলিশ’ সংগঠন এবং অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন ও তাঁর বন্ধুদের উপর। গোয়েন্দা বাহিনীর সবকটি শাখার টিকটিকিরা লেগে গেল উল্লেখিত অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে। তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে টিকে থাকাই আসহাব উদ্দীন ও তাঁর বন্ধু অধ্যাপকদের জন্য দুস্কর হয়ে উঠল।
আসহাব উদ্দীন আহমদের যখন অধ্যাপনা করতেন তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন বিখ্যাত সমব্যয়ী দার্শনিক ড. আখতার হামিদ খান। অবাঙ্গালি ড. খান পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোপানল থেকে অধ্যাপক আসহাব উদ্দীনসহ অন্যদের রক্ষা করে আগলিয়ে রাখেন। সেদিন আখতার হামিদ খান না থাকলে উক্ত অধ্যাপকদের তো বিপদ হতই তাছাড়াও ‘প্রগতি মজলিশর’ও মৃত্যু ঘটত নিঃসন্দেহে।
আসহাব উদ্দীন আহমদ ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপনা করেন। এ সময় পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব-পশ্চিমের বিভেদ নীতি ও বাংলা ভাষার উপর আঘাতের ফলে তাঁর চিন্তা ও তৎপরতা রাজনীতিকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। তারই ফলশ্রুতি ‘প্রগতি মজলিশ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। এ কাজে তাঁর প্রধান সহযোদ্ধা ছিলেন অধ্যাপক আবুল খায়ের। একই কলেজের অধ্যাপক আবুল খায়ের ছিলেন আগে থেকেই মার্কসবাদে দীক্ষিত এবং সমাজতন্ত্রী। আসহাব উদ্দীনের জীবনে ও চিন্তায় তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে। কুমিল্লায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহসী হয়নি। তাই এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক আবুল খায়েরের সাথে অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন। ১৯৫৩ সালে ‘প্রগতি মজলিশ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগেই কুমিল্লা টাউন হলে সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয় নিখিল পূর্ববঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন। যাতে পূর্ববঙ্গের সকল নামজাদা শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানবিরোধী আদ্দোলনে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। এ সাহিত্য সম্মেলনের মুখ্য নেতৃত্বে ছিলেন আসহাব উদ্দীন আহমদ।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আসহাব উদ্দীনের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। এই আন্দোলন তাঁকে ক্লাসরুমের নিরুদ্বিগ্ন শান্ত নিরাপদ জীবন থেকে একেবারে আন্দোলনের ময়দানে, রাজপথে নিয়ে আসে।
কলেজের শিক্ষকতা থেকে সেই ভাষা আন্দেলনের পথে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে রাজনীতির ময়দানে নেমে এলেন। এসে ঠাঁই করে নিলেন জনজীবনের মাঝে, দীক্ষা নিলেন মার্কসবাদে, নিজেকে সমর্পণ করলেন কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির সংগ্রামে, অঙ্গীকার করলেন সমাজতন্ত্রের। কলেজের শ্রেণিকক্ষের দিকে তিনি আর ফিরে তাকাননি। কাদা-মাটি মাখা কৃষক-শ্রমিককে তিনি ভাই বলে আলিঙ্গন করলেন। আমৃত্যু তিনি সেই পথে ছিলেন।
আসহাব উদ্দীন আহমদ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিপ্লবী রাজনীতির অনুসারী হওয়ার জন্য পাকস্তান আমলে তিনি এক বছর জেল খাটেন এবং রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তিনি ১৫ বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে হুলিয়া মাথায় নিয়ে জীবন কাটান। পাকিস্তান সরকার তাঁকে ধরে দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। এ সময় তিনি গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বাড়িতে, তাদের আশ্রয়ে আত্মগোপন করে কাটান। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ চাষী মুক্তি সমিতি, বাংলাদেশ লেখক শিবির, চট্টগ্রাম যাত্রী কল্যাণ সমিতি প্রভৃতি সংগঠনের সাথে কাজ করেন ও নেতৃত্ব দেন।
রাজনীতির পাশপাশি মানুষকে সচেতন করার হাতিয়ার হিসেবে লেখালেখিকে বেছে নেন আসহাব উদ্দীন আহমদ। শোষণমুক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে জীবনকালেই তিনি ২৭টি বই লিখে যান। তিনি তাঁর লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ‘আমার সাহিত্য জীবন’ বইতে বলেন, ‘আমার লেখায় হাসি-ঠাট্টার ভেতর দিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অবিচারকে তুলে ধরা হয়েছে এবং জনগণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রচার করা হয়েছে, জনপ্রিয় করা হয়েছে, প্রোপাগান্ডার আকারে নয়, সাহিত্য রূপে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি আমার ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ কায়েমের জন্য প্রেরণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই লিখেছি। শোষণ জুলুমের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মনোভাব সৃষ্টিই আমার লেখার উদ্দেশ্য।’
আসহাব উদ্দীন আহমদের গ্রন্থাবলির নাম এখানে তুলে ধরছি: ১. বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর ২. ধার, ৩. উদ্ধার, ৪. সের এক আনা মাত্র, ৫. জান ও মান, ৬. বন্দে ভোটরম্ (ইংরেজি ভাষায়) ৭. পথ চলিতে, ৮. আওয়ামী লীগের মীর জাফরী ঐতিহ্য, ৯. হাতের পাঁচ আঙ্গুল, ১০. লেখক ও পাচক, ১১. দাড়ি সমাচার, ১২. বিপ্লব বনাম অতি বিপ্লব, ১৩. ভাতের বাংলা কাপড়ের বাংলা, ১৪. বাঁশ সমাচার, ১৫. দ্বিপদ বনাম চতুষ্পদ, ১৬. আমার সাহিত্য জীবন, ১৭. শিকল ভাঙার গান (প্রথম সংস্করণের নাম ‘ইন্দিরা গান্ধীর বিচার চাই’), ১৮. চিঠিপত্র, ১৯. ঘুষ, ২০. ফেলে আসা দিনগুলি, ২১. উজান স্রোতে জীবনের ভেলা, ২২. দাম শাসন দেশ শাসন, ২৩. ভূমিহীন কৃষক, কড়িহীন লেখক, ২৪. সেরা রম্য রচনা, ২৫. সংবর্ধনার উত্তরে ভাষণ ‘উজান স্রোতের যাত্রী’, ২৬. শিশু তোতা পাখি নয়, ২৭. লাথি লাঠি গণতন্ত্র, ২৮. নতুন বোতলে পুরানো মদ, ২৯. আসহাব উদ্দীন রচনা সংগ্রহ, চার খ-।
আসহাব উদ্দীন আহমদের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল অংশ তাঁর লেখালেখির জীবন। তাঁর লেখক জীবনে আর্থিক অনটনের অবস্থায় পড়ে নিজেকে নিয়েও তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছেন ভূমিহীন কৃষকের সাথে কড়িহীন লেখকের তুলনা দিয়ে। নিজের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকে নিয়ে তিনি সরস রসিকতা করতে জানতেন। আসহাব উদ্দীন বাংলা ভাষার একজন ভিন্ন ও বিরল ধারার লেখক। সমাজের বৈরী সম্পর্ক, নিপীড়িত মানুষের বেদনাক্লিষ্ট জীবন কাহিনী, শাসকশ্রেণির অন্তঃসারশূন্য লক্ষ্য ও স্বেচ্ছাচারী ভূমিকা এমন ব্যঙ্গবিদ্রƒপে, এমন জনবোধ্য ভাষায় চিত্রিত করেছেন খুব কম লেখকই। আসহাব উদ্দীনের প্রতিটি গ্রন্থের নামকরণে ও বিষয়বস্তুতে সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটে উঠেছে।
বাংলা ভাষায় প্রতিবাদী রাজনৈতিক চেতনাসমৃদ্ধ ও জনবোধ্য ভাষায় সমাজসচেতন ব্যঙ্গ রচনার ধারায় আসহাব উদ্দীন আহমদ একজন সফল ও প্রধান লেখক। এই সফলতা ও কৃতিত্ব তিনি তাঁর জীবনকালেই পেয়েছেন। সাহিত্য রচনার পেছনেও আসহাবউদ্দীনকে অনুপ্রাণিত করেছে মানুষের প্রতি ভালবাসা ও প্রতিবাদী চেতনাবোধ। আমাদের দেশের মানুষের আয়ুর গড়পড়তা হিসেবে তিনি দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন। তাঁর জীবন আশি বছর অতিক্রম করেছিল। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং মানুষের প্রয়োজনীয় কাজটি সম্পাদন করে দিতে তাঁর দায়িত্ববোধের কথা তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। সেই কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি নিবেদিত থেকেছেন তিনি সারা জীবন। মানুষের কল্যাণের জন্য নিরলস খেটেছেন সাধারণ কর্মীর মত। জীবনের প্রতি ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর এই অঙ্গীকার তাঁর সকল লেখায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
রিক্ত, নিঃস্ব ও সর্বহারা মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন আসহাব উদ্দীন। তাঁর কর্মজীবনের সময়কালকে নানা পর্বে ভাগ করলে যেমন শিক্ষকতা, রাজনীতি, লেখালেখি প্রভৃতি পর্বের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার একটা কালপর্বকেও তাঁর জীবনে যোগ করতে হয়। সারা জীবন তিনি নানা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রম দিয়েছেন, কষ্ট স্বীকার করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ও শ্রমে যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম: ১. বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজ, ২. চট্রগ্রাম সিটি কলেজ, ৩. সাতকানিয়া কলেজ, ৪. সাধনপুর পল্লী উন্নয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, ৫. পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় এবং ৬. রতœপুর উচ্চ বিদ্যালয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে স্ব স্ব মহিমায় গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে চলেছে।
আসহাব উদ্দীন আহমদ একজন অনন্যসাধারণ লোক হয়েও সব সময় সহজ সাধারণ রূপে বিরাজ করতেন। তিনি কৃষক সমাজকে উচ্চ মূল্য দিতেন। কৃষক সমাজের মুক্তি সংগ্রামে যুক্ত হয়ে তিনি নিজেকে কৃষক সমাজের বাইরের লোক বলে ভাবতেন না। তিনি এমন বেশভূষা ধারণ করতেন না পাছে কৃষকেরা তাঁকে পর ভাবেন। তিনি জীবনের দ্বিতীয়াংশে (রাজনৈতিক ও লেখক জীবনে) শার্ট-কোর্তার সাথে প্যান্টের বদলে স্বচ্ছন্দে লুঙ্গি পরতে পছন্দ করতেন। গ্রামে কি শহরে বড় বড় সভা-সমিতিতেও তিনি লুঙ্গি পরে চলে যেতেন।
আসহাব উদ্দীন ভালবাসতেন চির দুঃখী কৃষককে এবং কৃষক মুক্তির সংগ্রামকে। আর ভালবাসতেন শ্যামল প্রকৃতি, বৃক্ষ ও ফুল। এমনই এক অনুভূতি জানিয়ে তাঁর নিজের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক হিসেবে আমার প্রতি এক চিঠি লিখেন ১৯৯৩ সালে। সেই চিঠির অংশবিশেষ এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তিনি আমাদের প্রতি লিখেন,

আপনারা আমার সালাম ও শুভেচ্ছা জানবেন। বাঁশখালী কলেজের চারদিকে এবং সরকারী রাস্তা থেকে যে পথটি কলেজের মাঠের দিকে উঠেছে তার দুধারে কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগালে কলেজের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়বে। মনে হবে, কলেজের গলায় একটি খুব বড় মালা শোভা পাচ্ছে। এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতা নিয়ে কাজটি সুসম্পন্ন করলে আমি অপরিসীম সুখী হব, আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে আমার বক্তব্য হলে: প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, বইকে ভালোবাসুন। বই হলো মনের খোরাক। যে সব শিক্ষিত লোক বইপত্র পড়েন না তারা নিজেদের মনকে উপবাসী রাখার অপরাধে অপরাধী। তাদের প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত লোক বলা যায় না…।’ (চিঠিপত্র)

পরের বছর ২৮ মে তারিখে আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নেন অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ। বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজ প্রাঙ্গণে লাল হয়ে ফুটে থাকা তাঁর প্রিয় এক কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে তিনি শায়িত আছেন। তাঁকে লাল সালাম।