Tag Archives: প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

প্রবারণার তাৎপর্য — প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড্ডয়ন  ছবি: সর্বজন

প্রবারণা পূর্ণিমায় ফানুস উড্ডয়ন
ছবি: সর্বজন

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব প্রবারণা পূর্ণিমা পালিত হইল বিগত সপ্তাহে। এই উৎসব একদিকে বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুশাসনের বিশেষ প্রকাশ, অন্যদিকে ইহার সহিত বিজড়িত মহামতি বুদ্ধের জীবনের নানান তাৎপর্যময় স্মৃতি

প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক অবিস্মরণীয় দিন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত এই তিন মাস সময়কে বৌদ্ধ পরিভাষায় বর্ষাবাস বলা হয়। একে বর্ষাযাপনও বলা যায়। কিন্তু বৌদ্ধদের কাছে বর্ষা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুখদুঃখ, ভালমন্দ, দান, শীল (নীতি), ভাবনা তথা ত্রিপিটক সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে বর্ষা বৌদ্ধদের কাছে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

বাঁকখালী নদীতে কাগজী জাহাজ ভাসান

বাঁকখালী নদীতে কাগজী জাহাজ ভাসান

কর্মই জীবন। মানুষ সংসারে জন্ম নিলে আমরণ তার কর্মব্যস্ততা থাকে। প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে ব্যস্ত জীবন কাটায়। কাজগুলো ভাল বা মন্দ যাই হোক। কিংবা হতে পারে মূল্যবান কিংবা মূল্যহীন কাজ। কিন্তু বর্ষায় মানুষের গতিশীল জীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে। সার্বক্ষণিক ঘোরাফেরা কাজকর্ম করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মহামতি বুদ্ধের সময়ে ভিক্ষুসংঘ দেব মানবের কল্যাণে ধর্মপ্রচারের জন্য দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়তেন, বিচরণ করতেন। তাঁদের এই অভিযান কোন পার্থিব স্বার্থসিদ্ধির জন্য ছিল না। পরহিত বা কল্যাণ সাধনই ছিল মূল লক্ষ্য। বর্ষা ঋতুতে চতুর্দিকে বিচরণ করা দুঃসাধ্য ছিল। এই সময়ের মত তখনো প্রকৃতির তা-বলীলা চলত সময়ে সময়ে। এই সমস্ত কারণে ভিক্ষুসংঘকে কোন এক জায়গায় স্থির থেকে বুদ্ধ বর্ষাঋতু পালনের জন্য ভিক্ষুসংঘকে কিছু নিয়মনীতিও বেঁধে দেন। তিন মাস ব্যাপী বর্ষা ঋতু উদ্যাপনের বিধিবিধান এবং বিনয় সমৃদ্ধ এই পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে বর্ষাবাস বা বর্ষাব্রত।

প্রবারণা কি

বুদ্ধের সময়ে শত শত এমনকি হাজার হাজার ভিক্ষুসংঘ একই স্থানে একসাথে অবস্থান করে ধর্ম বিনয় শিক্ষা করতেন। যেখানে দুজন একসাথে কিছুক্ষণ বা কিছু দিন অবস্থান করলে বিভিন্ন ধরনের মতবিরোধ এবং মনোমালিন্য হয় সেখানে একত্রে এত সংখ্যক ভিক্ষুসংঘ অবস্থান করলে মনের জান্তে বা অজান্তে স্বাভাবিকভাবেই অনেক ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। কিন্তু বৌদ্ধ ভিক্ষুদের কাছে সেটা কখনো কাম্য নয়। একে অপরের প্রতি সদা মৈত্রীভাব পোষণ করাই তাঁদের নিত্যদিনের ব্রত।

মানুষ মাত্রেই চেতন কিংবা অচেতন মনে ভুল করতে পারে। সেই ভুলকে দৃঢ়তার সাথে স্বীকার করে সংশোধনের প্রচেষ্টায় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই তো জীবনের সার্থকতা। কিন্তু ভুল স্বীকার করার মত সৎসাহস সবার থাকে না। নিজের দোষ স্বীকারের মধ্যে যে মহত্ত্ব আছে তা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিশেষভাবে দেখাতে সমর্থ হন প্রবারণায়। বর্ষাবাস শেষে, সকল প্রকার ভেদাভেদ গ্লানি ভুলে গিয়ে কলুষমুক্ত হওয়ার জন্য ভিক্ষুসংঘ পবিত্র সীমা ঘরে সম্মিলিত হয়ে একে অপরের নিকট দোষ স্বীকার করেন। সুতরাং বলা যায়, প্রবারণা মানে ভুলত্রুটির নির্দেশ। আশার তৃপ্তি, অভিলাষ পূরণ ও ধ্যান শিক্ষার সমাপ্তি।

প্রবারণার বিধান

মহাকারুণিক বুদ্ধ তখন শ্রাবস্তীর জেতবন বিহারে অবস্থান করছিলেন। কোশলরাজ্য হতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভিক্ষুসংঘ বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধদর্শনে আসলেন। বুদ্ধের সাথে তাঁদের কুশলাদি বিনিময় হল। বুদ্ধ তাঁদের কাছ থেকে কিভাবে তাঁরা বর্ষাবাস উদ্যাপন করেছেন তা জানতে চাইলেন। তাঁরা উত্তর দিলেন পরস্পরের সাথে বিবাদ-বিসংবাদ এড়াবার জন্য তাঁরা প্রত্যেকে মৌনভাবে বর্ষাবাস অতিবাহিত করেছেন। বর্ষাব্রতের সমাপ্তিতে তাঁরা কেউ কারো সাথে কোন ধরনের বাক্যালাপ না করে মৌনভাব বজায় রেখে বুদ্ধদর্শনে এসেছেন। তাঁদের কথা শুনে শাস্তা বুদ্ধ মৃদু হাসলেন। বুদ্ধের মৃদু হাসিতে যেন মুক্তা ঝরে পড়ছে। এতটা সময় ধরে একসাথে থাকার পরও কোন ভাব বিনিময় না করে থাকাতে পারাটাও কম কিসের! কতটা সংযমী হলে তা সম্ভব হয় তা বুঝতে না পারার কোন কারণ নেই। করুণাময় বুদ্ধ তাঁদের উপদেশ দিলেন, ‘ভিক্ষুসংঘ একসাথে অবস্থান করলে মৌনব্রত পালন বিধেয় নয়। তোমাদের এরূপ আচরণ প্রশংসাযোগ্য নয়। বর্ষাবাস শেষে তোমরা প্রবারণা উদ্যাপন করবে। একে অপরের প্রতি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। একস্থানে থাকাকালীন একজন অপরজনকে অনুশাসন করলে উভয়েরই কল্যাণ হয়। শাসন পরিশুদ্ধ হয়। এতে সমগ্র ভিক্ষুসংঘের শ্রীবৃদ্ধি সাধিত হয়।’ অতঃপর তথাগত বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘকে আহ্বান করে বাধ্যতামূলকভাবে প্রবারণা উদ্যাপনের বিধান প্রবর্তন করেন।

বিনয় বিধান অনুসারে প্রবারণা দুই প্রকার: পূর্ব কার্তিকী প্রবারণা এবং পশ্চিম কার্তিকী প্রবারণা। আষাঢ়ী পূর্ণিমায় বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান করে আশ্বিনী পূর্ণিমায় যে বর্ষাবাস সমাপ্ত হয় তাকে পূর্ব কার্তিকী প্রবারণা বলে। আর আষাঢ়ী পূর্ণিমার পরবর্তী এক মাসের মধ্যে বর্ষাবাস আরম্ভ করে তিন মাস পর যে প্রবারণা অনুষ্ঠিত হয় তাকে পশ্চিম কার্তিকী প্রবারণা বলে। এই দ্বিবিধ বর্ষাবাসকে যথাক্রমে প্রথম বর্ষাবাস ও দ্বিতীয় বর্ষাবাস বলে।

ভিক্ষুসংঘের পাশাপাশি বৌদ্ধ উপাসক উপাসিকাদের জন্যও প্রবারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবারণা উদ্যাপনের পরপর তারা মাস ব্যাপী কঠিন চীবর দানোৎসবে মেতে ওঠেন। এছাড়া আরো কিছু কালজয়ী ঘটনা প্রবারণাকে আরো বেশি সমৃদ্ধ ও তাৎপর্যময় করে তুলেছে।

তাবতিংস স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে বুদ্ধ

বুদ্ধের মতে প্রত্যেক বুদ্ধমাতা প্রথম সন্তান জন্মের এক সপ্তাহ পরে মৃত্যুবরণ করেন। এবং মৃত্যুও পর তাবতিংস স্বর্গে অবস্থান করেন। একইভাবে গৌতম বুদ্ধের মাতা মহামায়া ও সিদ্ধার্থের (পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধ) জন্মের এক সপ্তাহ পরে মৃত্যুবরণ করেন এবং তাবতিংস স্বর্গে উৎপন্ন হন। কারণ বুদ্ধমাতার গর্ভে দ্বিতীয় সন্তান আসতে পারেন না। এছাড়াও জগতে এক সাথে দুজন সম্যক সম্বুদ্ধ উৎপন্ন হন না। ভদ্রকল্পের পঞ্চবুদ্ধের মধ্যে বর্তমানে চলছে চতুর্থতম বুদ্ধ গৌতম বুদ্ধের শাসন। গৌতম বুদ্ধের শাসন বিলুপ্তির পরে ভদ্রকল্পের শেষ বুদ্ধ আর্যমৈত্রীয় বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হবেন।

এই সম্পর্কে গৌতম সম্যক সম্বুদ্ধ সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিমাতা গৌতমীর কাছে লালিত পালিত হলেন। এজন্য তাঁকে গৌতম বুদ্ধ বলা হয়। ক্রমান্বয়ে তিনি ৩৫ বছর বয়সে সম্যক সম্বুদ্ধত্ব ফল লাভ করলেন। তিনি দিব্যজ্ঞানে মাতৃদেবীর অবস্থান সম্পর্কে জ্ঞাত হলেন। মাতাকে দুঃখমুক্তি দানের মানসে বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে গমন করলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। সেখানে তিনমাস অবধি অভিধর্ম পিটক (চিত্ত চৈতসিক সম্পর্কে বিশদ ব্যাখা) দেশনা করে মাতাকে মুক্তিমার্গ দান করেছিলেন। সাথে অসংখ্য দেব ব্রহ্মা ও ধর্মচক্ষু লাভ করেছিলেন। অতঃপর বর্ষাবাসের পর তথাগত বুদ্ধ স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যলোকে অবতরণ করেছিলেন। সেদিন ছিল শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা। আর সেটি ছিল বুদ্ধের জীবনের সপ্তম বর্ষাবাস।

মর্ত্যলোকে অবতরণের সময় এক অবিনাশী স্মৃতি সমৃদ্ধ ঘটনা ঘটে যায়। বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে বর্ষাবাস যাপনকালীন মাতৃদেবীকে উদ্দেশ্য করে ধর্মদেশনা করলেও পরে সেই দেশনাবলি ছিল দেব উপযোগী। আগেই বলা হয়েছে, সেই দেশনায় অসংখ্য দেব ব্রহ্মা ধর্মজ্ঞান লাভ করেছিলেন। তখন দেব পরিষদ চিন্তা করলেন তারা কিভাবে বুদ্ধের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারেন। বিশ্বকর্মা দেবপুত্র বুদ্ধের সম্মানে দৈব শক্তিতে তাবতিংস স্বর্গ থেকে ভারতের সাংকাশ্য নগর পর্যন্ত তিনটি স্বর্গীয় সিঁড়ি রচনা করলেন। মধ্যখানের সিঁড়ি ছিল মণিমুক্তা খচিত, বামপাশের সিঁড়ি ছিল রোপ্য খচিত এবং ডানপাশের সিঁড়ি ছিল স্বর্ণ খচিত। বুদ্ধ মাঝখানের সিড়ি দিয়ে দেবলোক হতে মর্ত্যলোকে অবতরণ করেছিলেন। ডানপাশের সিঁড়ি বেয়ে মহাব্রহ্মাসহ ব্রহ্মাগণ শ্বেতচ্ছত্র ধারণ করেছিলেন। বামপাশের সিঁড়ি বেয়ে দেবগণ বুদ্ধের প্রতি দিব্যপুষ্প বর্ষণ করতে করতে সাধু সাধু ধ্বনিতে আকাশ বাতাশ প্রকম্পিত করে বুদ্ধের গুণকীর্তন করেছিলেন। সেদিন স্বর্গ-মর্ত্য একাকার হয়ে গিয়েছিল। সেদিন ছিল এমন এক বিরল এবং দুর্লভ সময় সন্ধিক্ষণ যখন দেবতা এবং মানুষ সরাসরি পরস্পরকে দর্শন করার সুযোগ লাভ করেছিলেন। ভারতের সেই সাংকাশ্য নগরী এখন পর্যন্ত বৌদ্ধদের জন্য পবিত্র তীর্থধাম হয়ে আছে। এবং ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে যে প্রত্যেক সম্যক সম্বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গ থেকে উক্ত সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করবেন। এটাকে অপরিবর্তনীয় স্থানও বলা হয়।

বৈশালী থেকে রাজগৃহের পথে বুদ্ধ

বুদ্ধের সময় বৈশালী ছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। এক প্রতাপশালী রাজবংশ বৈশালীকে শাসন করতেন। কথিত আছে যে ক্ষত্রিয় বংশের সাত হাজার সাতশত সাত জন রাজা বৈশালীকে ক্রমান্বয়ে শাসন করেছিলেন। ধনধান্যে পরিপূর্ণ বৈশালীতে হিংসাত্মক তাণ্ডব, বিবাদ-বিসংবাদ বলতে কিছুই ছিল না। রাজা প্রজা রাজ্য রাজত্ব যেন একই সুতোয় গাঁথা। হঠাৎ উক্ত রাজ্যে ত্রিবিধ উপদ্রব দেখা দিল। দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও অমনুুষ্যের উপদ্রবে রাজ্যের মানুষ দুর্বিসহ জীবনের ভার টানতে শুরু করলেন। রাজ্যের অশান্তি এবং প্রজাদের ভোগান্তি রাজাকে ভীষণভাবে ব্যথিত করল। কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? তরবারি দিয়ে কিংবা চতুরঙ্গিনী সেনাদল দ্বারা তো এর সমাধান হবে না। প্রজাবৎসল রাজার মনের প্রতিটি কোণে কষ্ট জমাট বাঁধতে শুরু করল। রাজা এবং অমাত্যবর্গ পরিত্রাতা বুদ্ধের শরণে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন।

বুদ্ধ তখন রাজা বিম্বিসার কর্তৃক দানকৃত পূর্বারাম বিহারে অবস্থান করছিলেন। বৈশালীবাসীর পক্ষে মহালি লিচ্ছবির রাজা পুরোহিত পুত্রকে নৃপতি বিম্বিরারের কাছে পাঠানো হল। তারা প্রেরিত সংবাদটি রাজকীয় শিষ্ঠাচার বজায় রেখে রাজার সামনে নিবেদন করলেন। বৈশালীর কল্যাণে রাজা প্রমূখ প্রেরিত প্রতিনিধিগণ বুদ্ধকে সবিনয়ে ফাং (নিমন্ত্রণ) করলেন। বুদ্ধ পাঁচশত ষড়াবিজ্ঞ অর্হৎ সহ বৈশালীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। বুদ্ধ-অন্তঃপ্রাণ রাজা বিম্বিসার বুদ্ধের যাতে কষ্ট না হয় সেজন্য গমনাগমনের সকল রাস্তা সুসজ্জিত করে দিলেন। রাজগৃহ এবং গঙ্গার মধ্যখানে পাঁচযোজন ভূমি স্থান করে প্রতিযোজন অন্তর অন্তর জানুপ্রমাণ গভীর পঞ্চবর্ণের পুষ্পরাজি ছিটিয়ে দিলেন। ধ্বজা পতাকা ও কদলী বৃক্ষাদি প্রোথিত করলেন। ছোট এবং বড় দুইটি শ্বেতচ্ছত্র ভগবানের মস্তকোপরি ধারণ করে সপরিবারে পুষ্পগন্ধাদির দ্বারা পূজা করতে করতে বুদ্ধকে এক একটি বিহারে বিশ্রাম করিয়ে মহাদানাদি কর্ম সম্পাদন করে পাঁচ দিন পর গঙ্গাতীরে উপনীত হয়ে সেখানে নৌকা সজ্জিত করে বৈশালীবাসীদের সংবাদ পাঠালেন।

তাঁরাও দ্বিগুণ পূজা করবে বলে বৈশালী এবং গঙ্গার মাঝখানে ত্রিযোজন ভূমি সমান করে  বুদ্ধের উপর চারটি শ্বেতচ্ছত্র এবং অন্যান্য ভিক্ষুদের প্রত্যেকের মাথার উপর দুইট করে শ্বেতচ্ছত্র ধারণ করে এগুলো দ্বারা বুদ্ধকে পূজা করার মানসে গঙ্গাতীরে উপস্থিত হলেন। রাজা বিম্বিসার দুইটি নৌকা একত্রে বেঁধে তার উপরে মণ্ডপ সজ্জিত করে সর্বরতœময় বুদ্ধাসন প্রস্তুত করলেন। বুদ্ধ উক্ত আসনে উপবেশন করলেন। অপরাপর ভিক্ষুগণ বুদ্ধকে ঘিরে উপবেশন করলেন। মহারাজা বিম্বিসার গলঃপ্রমাণ জলে নেমে করজোড়ে বুদ্ধকে বিদায় জানালেন। বুদ্ধ যে কয়দিন রাজগৃহের বাইরে ছিলেন সে কয়দিন বুদ্ধ ফিরে না আসা পর্যন্ত রাজা গঙ্গাতীরে অবস্থান করেছিলেন।

মন্দিরে বুদ্ধকে শ্রদ্ধা নিবেদন

মন্দিরে বুদ্ধকে শ্রদ্ধা নিবেদন

বুদ্ধ সশিষ্য বৈশালীতে পদধূলি দিলেন। বুদ্ধ বৈশালীতে পা রাখার সাথে সাথে প্রবল বর্ষণ শুরু হল। রাজা, প্রজা, এবং অমাত্যবর্গ বুদ্ধকে মহাসমারোহে পূজা করলেন। বুদ্ধ প্রধান সেবক ধর্মভাণ্ডাগারিক আনন্দ স্থবিরকে নগরের চতুর্দিকে রতনসূত্র পাঠ করতে বললেন। আনন্দ স্থবির নগরীতে পদচারণপূর্বক রতনসূত্র পাঠের সাথে সাথে জল ছিটালে মুষলধারে বৃষ্টি নামে। রাজ্যের সর্বপ্রকার উপদ্রব মুহূর্তের মধ্যে দূর হল এবং বৈশালীবাসীর অন্তহীন দুর্দশা নিবারণ হল। সমগ্র বৈশালীবাসী আনন্দে উদ্বেলিত হল। যেন তাদের পুনর্জন্ম হল। বুদ্ধ বৈশালী থেকে বিদায় নিলেন। বৈশালীবাসী যথাযোগ্য পূজার মাধ্যমে বুদ্ধকে বিদায় জানালেন।

এদিকে নাগলোকের মহাঋদ্ধিমান (অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন) নাগেরা চিন্তা করলেন বুদ্ধপূজার এই দুর্লভ সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না। সাথে সাথে নাগলোকের পাঁচশত নাগরাজ বিমানের (জাহাজের) মত পাঁচশত ঋদ্ধিময় ফনা বুদ্ধপ্রমূখ পাঁচশত ভিক্ষুসংঘের মাথার উপর বিস্তার করল। এইভাবে নাগদের পূজা করতে দেখে দেবলোকের দেবতারা, ব্রহ্মলোকের ব্রহ্মরা বুদ্ধকে পূজা করতে এসেছিলেন। সেই দিন মানুষ, দেবতা, ব্রহ্মা, নাগ সবাই শ্বেতছত্র ধারণ করে ধর্মীয় ধ্বজা উড্ডয়ন করে বুদ্ধকে পূজা করেছিলেন। বুদ্ধ সেই পূজা লাভ করে পুনরায় রাজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেই শুভ সন্ধিক্ষণ ছিল শুভ প্রবারণা দিবস।

এই হৃদয়ছোঁয়া চিরভাস্বর স্মৃতিসম্ভারকে অম্লান করে রাখার জন্য বাংলাদেশের বৌদ্ধরা বিশেষ করে রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রবারণা দিবসে নিকটবর্তী বাঁকখালী নদীতে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য খচিত কাগজী জাহাজ ভাসিয়ে প্রবারণা উদ্যাপন  করেন। তবে সেইদিন নাগ, দেব, ব্রহ্মা যেভাবে পেরেছিলেন বর্তমান সময়ের মানুষ তা অবিকল পারার কথা নয়। ক্ষেত্র বিশেষে এর বিকৃতিও দেখা গেছে। তবে এক্ষেত্রে একটি কথা প্রণিধানযোগ্য যে বৌদ্ধ ধর্মে বিনা কারণে কিংবা মনের হরষে আদর্শ উদ্দেশ্য বিনা কোন উৎসব পালনের বালাই নেই।

শুভ প্রবারণা উপলক্ষে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র দেশবাসীকে জানাই মৈত্রীময় শুভেচ্ছা।

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

‘ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি’ — প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

রামুসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার এক বছর পূর্তি হইতে চলিয়াছে। এক্ষণে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার আতঙ্ক কি অবিশ্বাস তো কাটেই নাই, বরং প্রাণে মনে আশঙ্কার নিত্য পাহাড়। বিচার প্রক্রিয়া যে পথে আগাইয়াছে তাহাতে বরং নতুন সহিংসতা এমনকি সাম্প্রদায়িক আক্রমণ সংগঠনের জমিন প্রস্তুত হইতেছে। তদুপরি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির ও বিহার পুনর্নির্মাণের ঘটনা আপাত আনন্দের হইলেও তাহার গর্ভেই প্রথিত আছে দুশ্চিন্তার আরেক বীজ। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর সাক্ষাৎকার লইয়াছেন আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু © আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

সরকারের শেষ সময়ে এসে একরকম তাড়াহুড়া করেই ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বিহারগুলো সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হল। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বিষয়টি কি ধরনের প্রভাব রেখেছে?

সহিংসতার পর সরকারের যে উদ্যোগ — যেমন নিরাপত্তা দেওয়া, ত্বরিতগতিতে ক্ষতিগ্রস্ত বিহারগুলো পুনর্নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়ন করা, যারা বাড়িঘর হারিয়েছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি মিলিয়ে সরকারের যে ইতিবাচক মনোভাব — তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তারা যেভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিল তা কাটিয়ে উঠতে সরকারের এসব পদক্ষেপ অনেকটাই ভূমিকা রেখেছে।

তবে প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বিহার তো শুধু একটা ভবন না। একটা বিহারে অনেক কিছুই থাকে। অনেক কিছুই ছিল। বিশেষত শিক্ষাকেন্দ্র হিশেবে এখানে অনেক প্রাচীন, দুর্লভ ধর্মীয় ও অন্যান্য বিষয়ের পুস্তকাদি ছিল। ওগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনেক কিছুই এখানে ছিল যার কোনটাই আমরা উদ্ধার করতে পারিনি। স্বর্ণর, পিতলর, ব্রোঞ্জর, অষ্টধাতু, শ্বেতপাথরের অসংখ্য মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি লুটপাট হয়ে গেছে, ভাঙচুর করা হয়েছে, আগুনে পুড়ে গেছে, নষ্ট হয়েছে। কয়েক দফায় ১৩-১৪টি বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে বলে শুনেছি। সেগুলো প্রশাসনের কাছেই আছে। লুট হওয়া মূল্যবান মূর্তি উদ্ধারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ ছিল না। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই ক্ষতিগুলো পূরণ করা যেত। বিহারগুলোতে আগে যে পরিপূর্ণতা ছিল তাতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই অভাবগুলো কিছু কিছু ভরাট করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে পুরোপুরি সফল।

উদ্বোধনের পর বিহারগুলো পরিচালনা কমিটির কাছে বুঝিয়ে দিয়ে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী তো চলে গেছে। এরপরও কি এসব দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ থাকছে?

এগুলো বারবার আলোচনায় এসেছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা আমাদের বারবার বলেছেন, এখন সময় কম, উদ্বোধন করতে হচ্ছে। তারা ভরসা দিয়েছেন উদ্বোধনের পরও কাজ করা হবে। অবশ্য উদ্বোধনের প্রথম তারিখ পিছিয়ে যাওয়ার পর কিছু কাজ পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুনেছি পরবর্তীতে ফারিকুল বিবেকারাম বৈাদ্ধবিহারে কিছু কাজ করা হয়েছে।

উদ্বোধনের পর পূজারিরা আগের মত পূজা, বন্দনা এবং উপাসনা শুরু করেছেন। দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় নিয়মিত প্রার্থনাও হচ্ছে। তবে পুরো বিহার জুড়ে ফাঁকা ফাঁকা পরিবেশ বিরাজ করছে।

আপনি জুন মাসে একটি লেখায় বলেছিলেন যেই নকশায় বিহারগুলো নির্মাণ হচ্ছে তাতে অনেক পূজারি সন্তুষ্ট নন এবং এভাবে নির্মাণ করায় বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ফিরে আসবে না। একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আমি বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক জায়গা থেকেই বলেছিলাম। কিছু বিহারে অনেক বেশি কাজ হয়েছে — ল্যান্ডস্কেপ ও শোভাবর্ধনের কাজের মাধ্যমে পর্যটনবান্ধব একধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এদিকে লক্ষ্য করার বিষয় হল আমাদের উপাসনালয়ে নারী পূজারির সংখ্যা বেশি। তারা একটু ঘরোয়া, পরিপাটি পরিবেশ পছন্দ করেন। তাছাড়া গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সবার মধ্যে অন্যরকম মনমানসিকতা বিরাজ করছে। তাই পূজারিরাও চাচ্ছিল, সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘরোয়া পরিবেশ ও মন্দিরের সুরক্ষা বিধানের জন্য সীমানাপ্রাচীরগুলো যাতে যথাযথভাবে নির্মাণ করা হয়। আমি এটুকুই শুধু বলেছিলাম যে সীমানাপ্রাচীরের অভাবে পূজারিরা পুরোপুরি খুশি হতে পারছেন না।

পুনর্নির্মিত চাকমারকুল অজন্তা বৌদ্ধ বিহার © আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

পুনর্নির্মিত চাকমারকুল অজন্তা বৌদ্ধ বিহার © আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

আমি ইতিবাচক জায়গা থেকেই বিষয়টা সামনে এনেছিলাম। হয়তো অনেকের খারাপ লেগেছে, অনেকে ক্ষুব্ধ, ব্যথিত হয়েছেন। এজন্য আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণে আমি যা দেখেছি শুধু তাই শালীনতা বজায় রেখে, নিরপেক্ষভাবে বলার চেষ্টা করেছি।

এছাড়া, বৌদ্ধবিহারগুলো দেখতে সাধারণ ভবন থেকে আলাদা। সীমা বিহার সহ কয়েকটি বিহারে কারুকাজ যুক্ত করা হয়েছে। কারুকাজগুলো অলঙ্কারের মত, এগুলো না থাকলে ভবনগুলো শুধু প্রাসাদের মতই দেখাত। কারুকাজগুলো হওয়াতে দূর থেকেই বোঝা যায় এগুলো বৌদ্ধবিহার। এর মাধ্যমে ঐ বিহারগুলোর কাজের মান, আবেদন, আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এ কাজগুলো যাতে সকল জায়গাতেই করা হয় সে বিষয়েও আমি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।

মাত্র দুই জায়গায় — সীমা বিহার ও বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে — কারুকাজগুলো যুক্ত করা হয়েছে। তার মানে অধিকাংশ পুনর্নির্মিত মন্দির আপনার বক্তব্য অনুযায়ী মন্দির হয়ে উঠছে না, বিল্ডিং থেকে যাচ্ছে।

আমি ঠিক এরকম বলিনি। অন্যান্য মন্দিরে কয়েক ধাপ বিশিষ্ট চূড়া নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, একধরনের বৌদ্ধিক কারুকাজ। আমরা বলতে চাচ্ছিলাম, সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই বাকি বিহারগুলোতে যদি অলঙ্করণগুলো কিছু পরিমাণে করা যেত তাহলে সেগুলোর আবেদনও সীমা বিহারের আবেদনের মত বেড়ে যেত।

ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের নকশা ও রীতিনীতির প্রায় অনুরূপভাবে মন্দিরগুলো পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে শতাধিক বছরের ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রায় শুরুতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং ইউনেস্কোর সহায়তা পাওয়ারও সুযোগ ছিল। এমনকি সরকার একটু উদ্যোগী হলে পুরো রামুকে হেরিটেজ জোন হিসেবে তৈরি করাও সম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটল না কেন?

আমি যতদূর জানি তারা চেয়েছিল প্রাচীন, কাঠের যে মন্দিরগুলো বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ধারণ করে আছে সেগুলো সংরক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে। আর সরকারি উদ্যোগে যে নতুন বিহারগুলো হচ্ছে সেগুলোও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন, ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের প্রায় অনুরূপ নকশায় নির্মাণ হোক। তারা সার্বিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারা আমাদের কমিউনিটির সাথেও কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের কমিউনিটি তাদের সাথে একমত হতে পারেনি। অনেকে মনে করেছে কারুকাজ ও বৌদ্ধিক নিদর্শন রেখে কাজ করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তার উপর সরকারিভাবেও বারবার বলা হচ্ছিল যে সময় খুব কম, ঐ সময়ের মধ্যেই যেভাবে করা যায় করে নিতে হবে। বেশি সময় নিলে মন্দিরটা নাও হতে পারে — এই ধরনের আশঙ্কাও কারও কারও মধ্যে কাজ করেছে। বিহার কর্তৃপক্ষরা কে কত তলার আলিশান ভবন পাবেন সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। ধৈর্য ধরা, অপেক্ষা করার মত মনমানসিকতা তাদের মধ্যে ছিল না। বিভিন্ন তোড়জোড়, টানাপোড়নের কারণে শেষ পর্যন্ত কেউ পুরানো নকশায় মন্দির নির্মাণে আগ্রহী হয়নি। ঐ কাজগুলো করা গেলে আমাদের বৌদ্ধবিহারগুলো প্রাণ পেত, সেগুলো আরো দীর্ঘস্থায়ী হত, ঐতিহ্যগুলো টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মাইলফলক পদক্ষেপ হত। আমরা আসলেই একটা বড় ভুল করে ফেলেছি। একটা বড় সুযোগ ছিল, তা হাতছাড়া হয়ে গেল। ক্ষতিটা খুবই দুঃখজনক।

ল্যান্ডস্কেপ ও শোভাবর্ধনের কাজ যেসব মন্দিরে হয়েছে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি কি সরকারই করবে, নাকি মন্দিরগুলোকেই সেই বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে?

এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে তেমন কোন আলোচনাও হয়নি। এগুলো হয়তো মন্দির কর্তৃপক্ষকেই দেখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতি মাসে কিছু বাড়তি খরচ করতে হবে।

পর্যটন বান্ধব পরিবেশ তৈরি হওয়ায় মন্দিরগুলোতে পর্যটক আসা বেড়ে যেতে পারে। এতে পূজারিদের পূজা অর্চনায় বিঘœ ঘটার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এই সমস্যা মোকাবেলায় আপনারা কি করছেন?

কিছু কিছু বিহারে পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। এমন কাজের পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, পর্যটকদের আকৃষ্ট করা। আমরা একে অভিনন্দন জানাই। বৌদ্ধবিহারগুলো নিঃসন্দেহে পর্যটক আসার মত কিছু স্পট। কিন্তু আবার একই সাথে মনে রাখা দরকার, এগুলো কোন উদ্যান নয়। সাধারণত কোন উদ্যানে মানুষজন সবসময় যাওয়া আসা করতে পারে, হৈচৈ করতে পারে, আড্ডা দিতে পারে। আর বৌদ্ধবিহারে মানুষ প্রার্থনা করে, ধ্যান করে, পড়াশোনা করে — সবকিছু মিলিয়ে শান্ত একটা পরিবেশ বৌদ্ধবিহারে বজায় থাকে। পর্যটকরা সম্মানবোধ, শালীনতাবোধ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি বজায় রেখে এখানে আসা যাওয়া করলে কোন সমস্যা নেই। এই ন্যূনতম বিষয়গুলো অনেক সময় মানা হয় না। অনেকেই এসে বুদ্ধমূর্তি জড়িয়ে ধরে ফটোসেশন করেন, বসে আড্ডা দেন, গল্পগুজব করেন, বিহার প্রাঙ্গণে জুতা পায়ে বিচরণ করেন। এগুলো করতে বাধা দিলে বাড়াবাড়ি করেন। ফলে পর্যটকদের অবাধ আসা যাওয়া বুদ্ধবিহারের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেরকম কোন পরিস্থিতি তৈরি হলে বুদ্ধবিহারগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ সংস্কার আমাদের ভালর চেয়ে খারাপটাই করবে।

ঘটনার আগেও আমাদের এখানে পর্যটক এসেছেন। আমরা কখনোই কারও কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। এখন পর্যটকরা ভাবতে পারেন এখানে জনগণের টাকায়, সরকারিভাবে পর্যটনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, ফলে কেউ বাধা দিতে পারবে না। এরকম ভাবনার ফলে ঝামেলা হতে পারে। বিহারের রীতিনীতিগুলো আমরা যদি তাদের বোঝাতে না পারি, তারা যদি এগুলো বুঝতে না চান, তাহলে মনোমালিন্য, ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কাও থেকে যায়।

তাছাড়া কোন প্রকার বাধাগ্রস্ত হলে পর্যটকরা মনে করতে পারেন গত বছরের ঘটনার জন্যই তাদেরকে বাঁকা চোখে দেখা হচ্ছে, দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে, আগে যেমন আমাদের রীতিনীতি, সমস্যাগুলো পর্যটকদের বুঝিয়ে বলতে পারতাম, তাদের মন রক্ষা করতে গিয়ে এখন হয়তো তা বলতেই পারব না। বোঝানো তো পরের কথা। হয়তো আমাদের পুরোই উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তারা যদি আমাদের বিষয়গুলো বিবেচনা করেন তো ভাল, নইলে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। পুরো বিষয়টা নিয়ে আমরা এখন রীতিমত চিন্তিত।

রামু শহরের মন্দিরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোটামুটি ভাল হলেও শহর থেকে দূরে, গ্রামের মধ্যকার বিহারগুলোর নিরাপত্তায় তেমন কোন ব্যবস্থা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সীমানাপ্রাচীর পর্যন্ত নেই। পূজারি এবং বিহারের ভিক্ষু-শ্রমণদের প্রার্থনা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এগুলো কি ধরনের প্রভাব রাখছে বা ভবিষ্যতে রাখতে পারে?

গত ২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনার আগে আমরা কখনো নিজেদের সংখ্যালঘু কিংবা অনিরাপদ ভাবিনি। ঐ ঘটনার পর অনেকের মনমানসিকতা বদলে গেছে, অনেকের মধ্যে এখনো আতঙ্ক, ভীতি বিরাজ করছে। অনেকে সান্ত¡নামূলক, বা কাউকে খুশি করার জন্য হয়তো বলবে আমরা এখন আবার সেই আগের মতই সুখে শান্তিতে আছি। কিন্তু সেই কথা ঠিক না। মনের ক্ষত শুকাতে আরো সময় লাগবে।

ঘটনা ঘটার পর প্রশ্ন উঠল, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় কিভাবে এমন ঘটনা ঘটল; বিভিন্ন দপ্তর, নিরাপত্তা বাহিনী কেন নিরাপত্তা দিতে পারল না? সে সময়ে এসপি সেলিম মাহমুদ জাহাঙ্গীর অজুহাত দেখিয়ে বলেন, পুলিশের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল না বলে যথাসময়ে তারা প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। একইভাবে, প্রশাসন থেকেও একই কথা বলা হয়েছে — প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যবস্থার স্বল্পতার কারণে তারা কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা ঐ ঘটনার পর একরকম কমিটমেন্ট করে গিয়েছিলেন যে এখানে স্থায়ীভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। ঘটনার পর এক বছর হয়ে গেল। যতই সময় গড়িয়েছে, আমরা বরং দেখলাম ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গা থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এখনো দেখা যাচ্ছে, অনেক জায়গায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি, আস্থার জায়গাটা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এই মুহূর্তে নিরাপত্তা জোরদার করাটা বেশি দরকারি ছিল। আমি যতদূর জানি, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্তও হয়েছিল পৃথকভাবে শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলায় কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করে সাতশ’র কাছাকাছি পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে। এ কাজটি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। যেখানে জনবলের অপর্যাপ্ততার কথা বলে প্রশাসনের অনেকেই পার পেয়ে গেছে, সেখানে ঘটনার এক বছর পরও জনবল বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

প্রসাশনিক নিরাপত্তা বাড়ানো হলে ভাল হবে। এটা ক্ষতিগ্রস্তদের একটা দাবি। তবে এটাও স্বীকার করছি যে বাংলাদেশ পুলিশি রাষ্ট্র নয়। পুলিশ প্রহরা বসিয়ে সম্প্রীতি রক্ষা করা সম্ভব নয় এবং সেটি সম্প্রীতির লক্ষণও নয়। পুলিশ প্রহরায় বাঁচাটা আমার জন্য অপমানজনক এবং প্রতিবেশী অবৌদ্ধদের জন্যও অপমানজনক। সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিবেশীদের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য জোরাল কোন উদ্যোগ তো গত এক বছরে দেখা যায়নি। আপনি কি মনে করেন সম্প্রীতি আপনা আপনি ফিরে আসা সম্ভব?

সরকারের উদ্যোগে মৈত্রী কমিটি গঠন করার আওয়াজ উঠেছিল কিন্তু পরবর্তীতে সম্ভবত সেটা প- হয়ে গেছে। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন ও কিছু বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে কিছু কিছু সম্প্রীতি সমাবেশ হয়েছে। এর বাইরে মাঠ পর্যায়ে তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। সম্প্রীতি সমাবেশগুলো কোন ভবনে গ-ীবদ্ধ না রেখে সেগুলো খোলা মাঠে সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজন করা গেলে ভাল হত। ফেসবুকের ব্যবহার ও অপব্যহার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা যেত। অথবা কোন প্রকার অপরাধ সংঘটিত হলেও, নাগরিক হিশেবে, প্রতিবেশী হিশেবে আমাদের প্রথম কি করণীয়, সহিংসতায় না গিয়ে কোন ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায় এই বিষয়গুলো নিয়ে জোর প্রচারণা চালানো উচিত ছিল। এগুলো আমরা এখনো ব্যাপক হারে, গণহারে করতে দেখিনি।

আপনি বলছেন কোন উদ্যোগ নিতে দেখিনি, কিন্তু আপনারাই বা কেন উদ্যোগ নিলেন না? বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলামানরাই কেন উদ্যোগ নিল না? সমন্বিতভাবে রামুবাসী কেন কোন উদ্যোগ নিল না?

আমরা একেবারেই কোন উদ্যোগ নেইনি তা নয়। ঘটনার কয়েক মাস পর যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসছিল তখন আমরা রামুর কিছু হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ মিলে বিভিন্ন স্থানে সম্প্রীতি সমাবেশের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু সহযোগিতার অভাবে ও বিভিন্ন টানাপোড়নের কারণে সেগুলো বেশিদিন চালানো যায়নি। গণমানুষ ও সুধী সমাজের অংশগ্রহণের অভাবে আমরা উদ্যোগগুলো গুটিয়ে নেই। আর যারা অব্যাহত রাখতে পারত তারা সেভাবে উদ্যোগ নেয়নি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্যোগে এগুলো চলমান রাখা উচিত চিল। এমন প্রচারণার প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে।

এমতাবস্থায়, গত এক বছরে রামুর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস বা সম্প্রীতি কতটুকু ফিরেছে? এক্ষেত্রে কোন জায়গাগুলোতে মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল, কিন্তু দেওয়া হয়নি?

আমরা এখনো পুরোপুরি আগের জায়গায় ফিরতে পারিনি — একথা ঠিক। তবে সম্প্রীতি যে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে তাও নয়। যে ক্ষত তৈরি হয়েছে তা সারাতে আরো কিছু সময় লাগবে, সকলের সহযোগিতা লাগবে। এক্ষেত্রে, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলা, গ্রেফতার, জামিন, আটক রাখা ইত্যাদি বিষয়ও সম্পর্কিত। মামলাগুলোর বিচারকাজ এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যেন ভুল করেও একজন নিরীহ, নির্দোষ মানুষ শাস্তি ভোগ না করে। আমরা দেখেছি এ ঘটনার সাথে রাজনীতি, প্রতিহিংসা, শত্রুতা ইত্যাদি এসে যুক্ত হয়েছে। এ বিষয়গুলো সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর। সন্দেহভাজন আসামীদের তালিকা দীর্ঘ হয়ে গেলে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই দিনের পর দিন কাউকে কারাভোগ করতে হলে তাদের মধ্যে একপর্যায়ে ক্ষোভ জমে যাবে। এর ফলে পরে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ঘটতে পারে। এমনকি তা সাম্প্রদায়িক রূপও নিতে পারে।

এছাড়া, আমি বলতে চাই, ঘটনাটা আচমকা ঘটেনি। ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের যেমন একটা দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাদের উপর ছিল — তাদের ব্যর্থতা বা সম্পৃক্ততা যাই হোক — তাদেরও তো একটা দায়বদ্ধতা আছে। দোষ যদি হয়ে থাকে তাহলে তাদেরও হয়েছে। কিন্তু এখন কষ্ট পাচ্ছে শুধু এক পক্ষ — হামলাকারী। যাদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারা যদি বারবার অবহেলা করেন, তাহলে ঘটনাগুলো বারবার ঘটতেই থাকবে। যখনই সাম্প্রদায়িকতার আশঙ্কা দেখা যাবে তৎক্ষণাৎই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিপূরণ দেওয়া, অপরাধীদের ধরা, শাস্তি দেওয়া পরে আসছে — ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এগুলোর কোন কিছু দিয়েই ক্ষতিটা পূরণ করা যায় না। যারা ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদেরও ক্ষতি হচ্ছে। তার চেয়ে ঘটনা ঘটার আগে রোধ করতে পারলেই বরং ভাল।

এখানকার বড়–য়ারা একটা অসাধারণ জীবন কাটাচ্ছিল। এই ঘটনা না ঘটলে এত আয়োজনের প্রয়োজন ছিল না।

ঘটনার এগার মাস পর, সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুইদিনে মোট সাতটি মামলায় সব মিলিয়ে ৩৬৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হল। চার্জশিটে কাদের অভিযুক্ত করা হল, আর চিহ্নিত কারা চার্জশিট থেকে বাদ পড়ল? মামলায় এ বিলম্বের ফলে কি ধরনের বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে?

গত সেপ্টেম্বরের ২ ও ৩ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যে সাত মামলার অভিযোগপত্রে মূল আসামীদের কারও নাম নেই। যারা সন্দেহভাজন আসামী হিশেবে আটক ছিল চার্জশিটে তাদের নাম এসেছে। মামলার চার্জশিট গঠনে বিলম্ব হলেও ভাল হয় যদি মূল আসামীদের শনাক্ত করা যায়। আমরা আশা রাখব বাকি মামলার চার্জশিট গঠনে পূর্ণ সতর্কতা এবং নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা হবে।

পুরোপুরি আন্তরিকতা থাকলে মামলার তদন্তে এত সময় লাগার কথা না। এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মামলায় কেন এত বিলম্ব হবে? বিলম্ব যখন হয়েই গেছে, এখন লক্ষ্য রাখতে হবে নির্দোষ কেউ যেন শাস্তির শিকার না হয়। মামলার বিলম্ব বিড়ম্বনাই শুধু বাড়াবে। সন্দেহভাজন হিশেবে যাদের আটক করা হয়েছে তারা বিচারের আগেই প্রায় এক বছর জেল খেটে ফেলল। তাদের পরিবার, জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মনও ধীরে ধীরে বিষিয়ে ওঠার কথা। এই বিষয় পরে অন্যদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু এ বিষয়ে কাউকে কোন কথা বলতে দেখা যায়নি। কেন?

অত্যন্ত বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা হওয়ায় তার প্রতি প্রতিক্রিয়াও অনেকটা একপেশে হয়ে গেছে। কোন মানবাধিকার সংগঠনও তাদের হয়ে কথা বলতে এগিয়ে আসেনি। অপরাধীদের বা অভিযুক্তদের পক্ষে বা তাদের হয়ে কথা বলার মত কোন লোক পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমি মনে করি, তাদের কথাও বিবেচনা করা দরকার। বিনা বিচারে, বিনা প্রমাণে কোন মানুষ এতটা দিন কারাগারে অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে পারেন না। যেমন আমরা বলছি, আমরা তো নির্দোষ, কোন অপরাধ করিনি। বিনা অপরাধে আমাদের কেন এত বড় সহিংসতার শিকার হতে হল — এই আমাদের দুঃখ। কেউ দোষী হলে প্রমাণ সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় আইনে তার বিচার হবে। সেটা আমাদেরও দাবি। কিন্তু যে জড়িত নয় তাকে যদি বিনা বিচারে বা ভুল বিচারের কারণে শাস্তি ভোগ করতে হয়, তাহলে তো তার মধ্যেও ঠিক আমাদের মতই দুঃখ চলে আসবে।

নিঃসন্দেহে এটা মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। এর মধ্যে আরো কিছু আশঙ্কাও আছে। তাদের এই অন্যায় শাস্তিভোগের কারণে ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা তৈরি হতে পারে, তা থেকে ঘটতে পারে বড় ধরনের সহিংসতা। ক্ষোভ আর প্রতিহিংসা যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তার প্রমাণ তো গত বছরের ঘটনার মধ্য দিয়ে মিলেছে। একই ঘটনা যেন আর না ঘটে সে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো সময় আছে। মানবিকতার দিক বলুন, মানবাধিকারের দিক বলুন আর আস্থা বা সম্প্রীতির দিক বলুন সব দিক দিয়েই নিরপরাধের শাস্তিভোগ অনাকাক্সিক্ষত ও ক্ষতিকর। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

নিরপরাধ লোকের জেল খাটার বিপরীতে অনেক আসামী অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বিচার না হওয়াটা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনকে কিভাবে প্রভাবিত করছে?

যাদের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল, ছবিতে দেখা গেল, তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নাম আসল, তাদের অনেকেই এখনো আইনের বাইরে। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকের মধ্যেই এ নিয়ে দুঃখ আছে। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে আমি কারও শাস্তি কামনা করতে পারি না — অপরাধ করলেও না। ক্ষতিগ্রস্তরা এবং বোদ্ধামহল যা বলছেন তা হল অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে, বিচার বা জবাবদিহিতার মুখোমুখি না হলে অপরাধীর মধ্যে বোধোদয় হবে না। ফলে সমাজে, ধর্মে, রাষ্ট্রে অনাচার আরো বেড়ে যাবে। সেজন্যই তাদের বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তরা যাদের অপরাধ করতে দেখল, তার ভগবানের মূর্তিকে ভাঙচুর করতে দেখল, তার থাকার শেষ সম্বল বাড়িঘরে আগুন দিতে দেখল, সেই মানুষগুলোই যখন তাদের সামনে অবাধে ঘুরে বেড়ায় তখন ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আশঙ্কা, আস্থাহীনতা, হীনমন্যতাবোধ কাজ করা স্বাভাবিক। তাকে আবার আস্থাশীল করার জন্য, তাকে সান্ত¡না দেওয়ার জন্য, তার ক্ষোভ প্রতিহিংসা লোপ করার জন্য অপরাধীদের রাষ্ট্রীয় আইন, বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।

বিহারগুলো আমাদের পরিচিতি, ঐতিহ্য। বুদ্ধের স্থান শুধু মন্দিরে না আমাদের হৃদয়েও। সেদিন বিহারের বুদ্ধ শুধু পোড়ে নাই, আমাদের মনও পুড়েছে। পুনর্বাসন, পুনর্নির্মাণ এগুলো যেমন ক্ষত শুকাতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নয়নে কাজ করেছে, তেমনি সেই ক্ষতের স্থায়ী উপশমের জন্য প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দরকার ছিল। কিন্তু ঘটনাটা কারা ঘটাল, কাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, কোথায় কারা পরিকল্পনা করেছে এ বিষয়গুলো রাষ্ট্র এখনো শনাক্ত করতে পারেনি। যারা ঘটনাটা ঘটাল তাদের অধিকাংশই পার পেয়ে গেছে। তারা সফল। বিষয়টাকে যত হালকাভাবে নেওয়া হল, তার অর্থ একটাই — এরকম ঘটনা রোধ করা যাবে না, এগুলোকে বাস্তবতা হিশেবে মেনে নিতে হবে। রামুর ঘটনা যেমন শুরু না, তেমনি শেষও না।

অনেক বিশ্লেষক গত বছর মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলার সাথে রামুর সাম্প্রদায়িক হামলাকে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি কি এরকম কোন সম্পর্ক বা প্রভাব দেখেন?

ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর থেকেই মায়ানমারে জাতিগত দাঙ্গা ও সহিংসতা লেগে আছে। মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, হামলা করা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হচ্ছে না। এগুলো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়াতে মায়ানমারের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের উপর পড়েছে নিঃসন্দেহে। ওখানকার জাতিগত সহিংসতা এদেশের সাধারণ অনেক মানুষের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। তাদের অনেকেই সুযোগ পেয়ে ২৯ সেপ্টেম্বরের হামলায় যোগ দিয়েছে — এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। আমার মনে হয় অনেক কারণের মধ্যে মায়ানমারের ঘটনাগুলোও কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সাথে সাথে এটাও বলব, কোন দেশে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ঐ জাতি-ধর্ম অন্য যে দেশে সংখ্যাগুরু সেখানে বদলা নেওয়াকে ভাতৃপ্রেম বলে মনে করা হলে তা হবে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এতে সাম্প্রদায়িকতা বরং বৃদ্ধিই পাবে, ছড়িয়ে পড়বে। আমরা আহ্বান জানাব, যে দেশেই সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে তা প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। সরকার, প্রশাসন, সাধারণ জনগণকে মিলেমিশে একসাথে কাজ করতে হবে।

মায়ানমারে দাঙ্গা হলে জনগণ জীবন রক্ষার্থে খুব ভরসা নিয়েই বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করে। ২০১২ সালের দাঙ্গার সময় অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদী হয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের কড়া পাহারার কারণে অনেকে আসতে পারেনি। অনেকে বাধ্য হয়ে নদীতে ভেসেছে, অনেকে মায়ানমারে ফিরে গেছে, সহিংসতার শিকার হয়েছে। এভাবে তো মানুষ বাঁচতে পারে না। এটাও তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। যাহোক, ঘরছাড়া লোকদের জায়গা দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে ভুগতে হয়। তার উপর ওখানে ঘটনা ঘটলে এখানকার সংখ্যালঘুদের উপরও তার রেশ পড়ে। এজন্য ওখানকার সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মায়ানমার সরকারের সাথে কথা বলতে হবে। সমস্যা সমাধানে দুই রাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগ খুব জরুরি।

অনুলিখন: মাহবুবুল হক ভূঁইয়া