Tag Archives: পারভেজ হুদাভাই

শাহবাগ মোড়: আমরা পাকিস্তানিরা কেন জানি না এবং জানতে চাই না – পারভেজ হুদাভাই

তর্জমা: অগণিতা বসন

 (গতকালের পর)

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি ইদানিংকালে পাকিস্তানের স্কুলে পাঠ্য এমন কিছু বই ঘাটাঘাটি করি। পঞ্চম শ্রেণির সামাজিকবিদ্যা (ইংরেজি সংস্করণ) বইতে — বার বয়সের বাচ্চাদের এই বই পড়ান হয় — শিশুদের শিক্ষা শুরু হয় হিন্দু মুসলমান পার্থক্য (উদাহরণস্বরূপ হিন্দুরা স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকেও জীবিত আগুনে পুড়ায় কিন্তু মুসলমানরা তা করে না), পাকিস্তানের গোপন শত্র“র ব্যাপারে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা (ধর্মীয় উগ্রবাদীদের কথা নেই) এবং অব্যাহত জিহাদের গুরুত্ব দিয়ে। অখণ্ড পাকিস্তান সর্ম্পকে বইটিতে মাত্র তিনটি বাক্য আছে যার শেষ লাইন বলছে, ‘ভারতের সাহায্যে পূর্ব পাকিস্তান পৃথক হয়েছে।’

অষ্টম শ্রেণির পাকিস্তান শিক্ষা (ইংরেজি সংস্করণ) বিষয়ের পাঠ্যবইতে বিষয়টি আরো সংক্ষিপ্ত। সেখানে সরাসরি বলা হয়েছে, ‘সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের কিছু নেতা ভারতের সক্রিয় সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে যেতে সমর্থ হয় এবং বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।’ এছাড়া নবম-দশম শ্রেণির উর্দু বই — এখানকার বর্ণনাই সবচেয়ে বিস্তৃত — তিন পৃষ্ঠ জুড়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার ব্যাখ্যা হাজির করেছে। উপশিরোনামগুলোর মধ্যে আছে: ক) ইয়াহিয়া খানের অদক্ষ সরকার। খ) ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দুদের আধিপত্য, গ) হিন্দু শিক্ষকদের অনৈতিক ভূমিকা, ঘ) ভাষাগত সমস্যা, ঙ) ভারতের হস্তক্ষেপ, চ) ১৯৭০ সালের নির্বাচন।

কিম্ভূতকিমাকার এহেন ইতিহাস দেখে পাকিস্তানি তরুণদের পক্ষে ১৯৭১ বুঝা অসম্ভব। কিন্তু তাদেরই বা কি দোষ! আমরা যারা ১৯৫০ কি ১৯৬০ দশকে বড় হয়েছি তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে একটি দেশ বটে কিন্তু কখনোই এক জাতি নয়। আজকের তরুণরা ভাবতেও পারবে না পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে কত ব্যাপকভাবে বাঙ্গালিবিরোধী বর্ণবাদ ছিল। চরম লজ্জার সাথে আমি আলবত স্বীকার করব, চিন্তাভাবনাহীন নাবালক বয়সে আমিও আমারই দেশের এই ছোট ও কাল মানুষগুলি দেখে অস্বস্তি বোধ করতাম। ভুল ধারণার বশে  আমরা ভাবতাম প্রকৃত মুসলমান ও পাকিস্তানিরা লম্বা, ফর্সা আর খাসা উর্দু জবানে তারা কথা বলবে। রেডিও পাকিস্তান থেকে প্রচারিত অদ্ভুত উচ্চরণের বাংলা সংবাদ শুনে সহপাঠীরা কত না ঠাট্টা মশকরা করত!

পূর্ব পাকিস্তান ‘হারানো’র বেদনায় কাতর অনেক পাকিস্তানি এখনো বিশ্বাস করে ১৯৭১ কোন রাজনৈতিক পরাজয় ছিল না, বরং ছিল সামরিক পরাজয়। ডা. আব্দুল কাদির খান — যিনি এ সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর প্রধান সৈয়দ মুনাওয়ার হাসানের সাথে সাক্ষাৎ করেন — লিখেছেন, পারমাণবিক বোমা পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখলেও রাখতে পারত। ‘১৯৭১ সালের আগে আমাদের যদি পারমাণবিক সামর্থ থাকত, তাহলে লজ্জাজনক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে অর্ধেকটা দেশ — বর্তমান বাংলাদেশ — আর আমাদের হারাতে হত না।’

আদতেই কি তা ঘটত? পারমাণবিক বোমা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিক্ষুব্ধ জনগণ আর মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ এড়াতে পারত না। যতই ট্যাঙ্ক আর যুদ্ধবিমান থাকুক না কেন পশ্চিম পাকিস্তানের অবস্থানগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব ছিল। বিরুদ্ধমতের ভারতকে পারি দিয়ে এক হাজার মাইল দূর থেকে নব্বই হাজার সেনার নিয়মিত রসদ জোগানো অসম্ভব ছিল। ভারত আকাশ সীমা বন্ধ করে দিলে যোগাযোগের একমাত্র পথ খোলা থাকে সমুদ্র পথ। দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চললে পাকিস্তান নিঃস্ব হয়ে যেত। এর চেয়ে বড় কথা, আক্রান্ত হলে সকল দখলদার বাহিনী — কাশ্মিরে ভারতীয় বাহিনী আর আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী সহ — কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এবং নির্যাতন বাড়ার সাথে সাথে স্থানীয় বিক্ষোভ-বিদ্রোহ বাড়তে থাকে।

আমি এখনো আমাদের মহান বিজ্ঞানীর সিদ্ধান্তটি বুঝতে চেষ্টা করছি। ঢাকার বিক্ষুব্ধ স্বধীনতাকামীদের উপর কি শেষ পর্যন্ত বোমা মারা যেত? অথবা কলকাতা কি দিল্লিকে ধ্বংস করে লাহোর বা করাচির কি কোন লাভ হত? পারমাণবিক বোমা বর্ষণের ভয় দেখিয়ে ভারতকে হয়তো যুদ্ধের বাইরে রাখা যেত, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে পাইকারি হারে গণহত্যা ঘটত।

অতীত ঘুরিয়ে দেয়া যায় না, কিন্তু এখন সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশ যৌক্তিকভাবেই পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে বলছে — যদিও আমরা এখন পর্যন্ত তা দিতে অস্বীকার করছি। এখনই সময় আমাদের ক্ষমা চাওয়ার এবং দুই দেশের সর্ম্পকের নতুন অধ্যায় সূচনা করার। কাজটি করার সততা আর সাহস যদি আমাদের থাকে, তাহলে, উপরি হিশাবে, বেলুচিস্তানের সমস্যা বুঝা, এবং সম্ভবত তার সমাধান করাও, সহজতর হতে পারে।

দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

শাহবাগ মোড়: আমরা পাকিস্তানিরা কেন জানি না এবং জানতে চাই না – পারভেজ হুদাভাই

তর্জমা: অগণিতা বসন

শাহবাগ মোড়: কোথায় সে? কাদের মোল্লা: সে কে?

গতকাল ইসলামাবাদে বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া একদল শিক্ষার্থীর সাথে আমি আড্ডাবাজি করি। যতদূর বুঝা গেল তারা এখনো কিছু জানতে পারে নাই। অবশ্যই তারা তাহরির চত্বর ও আফজাল গুরুর ফাঁসি কার্যকর সর্ম্পকে জানে। কিন্তু শাহবাগ স্কয়ার ঢাকায় শুনে তারা খুব একটা আগ্রহ দেখাল না। ঢাকায় যে আন্দোলন হচ্ছে সে বিষয়েও তারা অনাগ্রহী। এক থেকে পাঁচ লক্ষ বাঙ্গালি শাহবাগে জড় হয়ে দেশাত্মবোধক গান গাচ্ছে, কবিতা আবৃত্তি করছে আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে পাঠ করছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় রায়।

ফেব্র“য়ারির পাঁচ তারিখে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ছয় অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়। ঢাকার মিরপুর এলাকার সাধারণ জনগণের উপর ব্যাপক নৃসংশতা চালানোর জন্য কাদের মোল্লা ‘মিরপুরের কসাই’ নামে খ্যাত। সে একজন কবিকে শিরোñেদ, এগার বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণসহ ৩৪৪ জনকে খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদেরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেয়। কিন্তু শাহবাগ মোড়ের আন্দোলনকারীদের জন্য এই রায় সন্তোষজনক নয় — তারা মোল্লার ফাঁসি চায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ প্রদর্শন ছাড়াও সহিংস প্রতিবাদ করে। টাকাপয়সা ছিটিয়ে বিশ্বজনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা সত্ত্বেও তারা ব্যর্থ হয়।

মজার বিষয়, মোল্লার মামলা তুর্কি সরকারের নেকনজরে পড়েছিল। তুরস্কের রাষ্ট্রপতি আব্দুল্লাহ গুল গত মাসে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বরাবর এক চিঠি পাঠান। তাতে সকল গণহত্যাকরীর শাস্তি মাফ করতে অনুরোধ করা হয়। দুভার্গ্যজনক হলেও সত্য যে তুর্কি রাষ্ট্রপতির হস্তক্ষেপ ছিল অদ্বিতীয়। প্রায় সারা বিশ্ব এ গণহত্যাকারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশূন্য।

মোল্লার ভাগ্য নির্ধারণী খেলায় পাকিস্তান কোন অগ্রহ দেখায়নি। গণমাধ্যম নিশ্চুপ আছে এবং ঠিক তেমনি দূতাবাসগুলোও কোন বিবৃতি দেয়নি। পরিহাসের বিষয়, কাদের মোল্লা দ্বিজাতি তত্ত্বের সমর্থনকারী ও অখণ্ড পাকিস্তানের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাশাপাশি লড়াই করলেও তাকে পূর্ব পাকিস্তানের বিহারিদের মতই পরিত্যাগ করা হয়েছে। ১৯৭১ সালে রাজাকার, আলবদর, আলশামস সহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাহিনী পাকিস্তানি সেনাদেরকে বাঙ্গালিদের উপর — মাঝে মাঝে হিন্দুদের বেছে বেছে — গণহত্যা চালাতে সাহায্য করেছে। এদের মধ্যে অনেক মিলিশিয়া জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ছিল।

যেই যোজন যোজন দূরত্ব বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানকে পৃথক করে রেখেছে তার কারণেই আজ [পাকিস্তানিদের] শাহবাগের প্রতি এত অনাগ্রহ। জাতীয় ইতিহাসের এই পর্বটি — যেখানে ৫৪ ভাগ জনগণ ঠিক করেছিল তারা ৪৬ ভাগ জনগণ থেকে আলাদা হয়ে যাবে — পাকিস্তানিদের কাছে আজও প্রধানত অপ্রাসঙ্গিকই রয়ে গেছে। তাদের কাছে, বাংলাদেশ চাঁদের ওপাশের দেশ হলেও কিছু যায় আসে না। এখন প্রশ্ন: কেন?

(চলবে)