Tag Archives: নাসিফ আমিন

ঋত্বিক ঘটক সমীপে–জন এব্রাহেম

ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক ঘটক,
বিভক্ত হইয়া গেলেন; অনিচ্ছা সত্ত্বেও
দেশ ভাগ হইয়া গেল
তাঁহার দুনিয়াদারি আর আসমানদারিতে।
যদিও এইসবে তাঁহার কোন হাত ছিল না
ওরফে ছিল প্রতিক্রিয়া — স্বাভাবিক মতামত জানানো — বিষয়ের প্রতিফলন।
ঋত্বিক ঘটক,
দেশছাড়া, বেজন্মা, অচ্ছুত, অপাঙ্ক্তেয়
বিক্টোরীয় ব্যারাগ্রস্ত গাঁজাখোরি রাবীন্দ্রিক চিন্তাধারার
গুষ্টি তিনিই উদ্ধার করিতেন।

দেবস্তুতি তথা ঐসব বিক্টোরীয় ব্যারাগ্রস্ত
গাঁজাখোরি রাবীন্দ্রিক চিন্তাধারার রথীমহারথীদের
গুণকীর্তন করিবার চাইতে জীবন
তাঁহার কাছে ছিল অধিক মূল্যবান।

ফলত তাঁহাকে বাঙ্গালি চিন্তাধারা হইতে বাদ দেওয়া হইয়াছিল
ঋত্বিক ঘটক — রায়তের জমিদারিতে
ব্রাক্ষণ্যবাদী চিন্তাধারায় খাপ না খাওয়া একখানা নাম
যদিও এইখানে ভুলিয়া যাওয়া বিষয়ের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি শোনা যায়
যেন সেসব ‘ডেথ অফ এ সেলসম্যান’ উপন্যাসের মতন
স্মৃতিবিলাসী করিয়া তোলে হায়,
কাগজের দীর্ঘ কলামে ‘ছবি বিশ্বাস আর নাই’
হৃদক্রিয়া বন্ধ হইয়া ধরাধাম ত্যাগ করিয়াছেন
এমন খবর ছয়লাব, কি দারুণ জনপ্রিয় হইয়া যায়।
অথচ ঋত্বিক ঘটকের মৃত্যু কাকপক্ষীতেও টের পায় নাই।

বরং, মনে পড়িতেছে, ঋত্বিক ঘটক
লম্বা মতন লোকটা, আমার কাঁধে হাত রাখিয়াছেন
কি ভীষণ নৈকট্যবোধে আগলাইয়া রাখিতেছেন
আড়াল করিতেছেন, যেন সম্মুখে সা¤্রাজ্যবাদী আগ্রাসন।
এই সেই মানুষ যিনি আমার সম্মুখে দাঁড়ায়ে
মানুষ হইয়া উঠিবার শর্তগুলি নিয়া বারংবার প্রশ্ন করিতেছেন।
তথাপি মনুষ্যত্বের অভিবাদনে হাত বাড়াইয়া মুসাবিদা করিতেছেন
স্বীকার করিয়া নিতেছেন সর্বজনেরে
গ্রহণ করিয়া নিতেছেন সবাইরে
পাছায় লাথি কষিয়া কহিতেছেন, ‘উঠ, জাগিয়া উঠ বাছা’
আবেগে নয়, জাগরণের জৌলুসে স্মরণ করিতেছি আপনারে,
ঋত্বিক ঘটক

ঋত্বিক দা
বরং আপনারে ডাকি না কেন ঋত্বিক দা
আমি জানি আপনি দেহ ছাড়িয়াছেন

কিন্তু জানিবেন, বাঁচিয়া আছি আপনারই জন্য
বিশ্বাস করুন, যেদিন সপ্তম সিলমোহর উম্মোচিত হইবে
আমি আমার ক্যামেরাকে বন্দুকের মতন তাক করিব
এবং আমার বিশ্বাস সেই আওয়াজের প্রতিধ্বনি
আপনার অস্থিমজ্জায় অনুরণন তুলিবে
এবং অনুপ্রেরণা দিতে ধ্বনিত হইয়া
ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে আমারই কাছে।

শুকরিয়া ঋত্বিকদা

বন্ধ্যামি আর বিরক্তি ব্যতিরেকে
ধন্যবাদ জানাই আপনাকে

ঋত্বিক দা
আপনারে স্মরণ করি
শব্দসব যখন আপনার অর্থবেদ করিতে ব্যর্থ হয়
ঋত্বিক দা
আপনি আজীবন আমার
মেধায়
সত্তায়
পবিত্র আত্মায় বিরাজ করিবেন।

আমেন।

তর্জমা: নাসিফ আমিন

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ১৭ আগস্ট ২০১৩

নৈতিক প্রশ্নে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ – মোকাররম হোসেন

তর্জমা: নাসিফ আমিন

১৯৭১ (c) রঘু রায়

১৯৭১
(c) রঘু রায়

বাংলাদেশের জনগণ প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উদ্যাপন করে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর নয় মাস জুলুমের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভারতীয় বাহিনী ও বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করেন। প্রতি বছর এই বিজয় উদ্যাপন চলিতেছে। ইহার মধ্যে একপ্রস্ত আলোচনা কিন্তু অমীমাংসিতই থাকিয়া যাইতেছে। একাত্তরের সেই নির্মম দিনে একটা বিশেষ গোষ্ঠী কি ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছিল সেই আলোচনার এখনো মীমাংসা হয় নাই।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের সঙ্গে সঙ্গে কুৎসিত এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়াছিল এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জন্য হইয়াছিল আরেকখানি নূতন অধ্যায়ের সূচনা। অবশ্য লোকে যাহাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামে চিনে সেই প্রতিরোধ সংগ্রাম লইয়া লোকমনে এখনো ভুল ধারণার অন্ত নাই। তথাপি বহু বাংলাদেশি এখনো পর্যন্ত মীমাংসা করিয়া উঠিতে পারে নাই যে কিভাবে তাহারা স্বাধীনতা যুদ্ধকে লইবে এবং যাহারা সরাসরি স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া নিরীহ জনগণকে হত্যা করিয়াছিলেন তাহাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কি হইবে। বাংলাদেশের জনগণের উচিত এই সমস্ত বিষয় সামনে তুলিয়া আনা এবং এইসবের একটা মীমাংসা করা যেন এই প্রসঙ্গ লইয়া যাবতীয় তর্কবিতর্কের অবসান ঘটে।

গত ৩৭ বছরে বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটিয়াছে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কোন সদ্গতি হয় নাই। পরিহাসের বিষয় এই যে রাস্তাঘাটে অলিতে গলিতে এখনো যেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিত্যদিনের ঘটনা সেই বাংলাদেশেই মুহাম্মদ ইউনুস এবং তাঁহার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করিয়াছেন। তবু বলিতে হয়, নির্মমভাবে দুই রাষ্ট্রপ্রধান খুন এবং গুটিকয়েক সামরিক অভ্যুত্থানের মতন বিশাল বিশাল রাজনৈতিক দুর্যোগের পাশাপাশি এই দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা হইতে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রূপান্তরের মতন ঘটনাও ঘটিয়াছে।

ইতিহাসের বিকৃতি

নয় মাস যাবৎ পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ নিপীড়নের কালে একটা বিশেষ গোষ্ঠী কি ভূমিকায় লিপ্ত হইয়াছিল তাহা সম্পর্কে এত কিছুর পরও লোকমনে এখনো দ্বিধা কাজ করে। এর হেতু, লোকে রাজনৈতিক ও নৈতিক তৎপরতার মধ্যে ফারাক করিতে পারে না। এই দুই প্রকারের তৎপরতা সম্পর্কে বিস্তার করিলেই যাবতীয় ভুল বুঝাবুঝির অবসান হইতে পারে।

বিগত বছরগুলোতে কিছু রাজনৈতিক দল বারবার বাংলাদেশের ইতিহাস — বিশেষত স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস — বিকৃত করিবার পায়তারা করিয়াছে। বিশেষ মতলবে ইতিহাসের ঘটনাবলি বিকৃত করা অস্বাভাবিক কিছু নহে; কিন্তু সত্য হইল সত্যকে দাবাইয়া রাখা যায় না। তাছাড়া মনে রাখিতে হইবে, দূর অতীতের ইতিহাস লেখা হইতে সা¤প্রতিক সময়ের ইতিহাস লেখা অধিকতর কষ্টকর। কেননা সা¤প্রতিক সময়ের যে কোন বিষয়ের সাথে আবেগ জড়াইয়া থাকে। উপরন্তু, সেইসব ঘটনায় উপস্থিত লোকজন জীবিত থাকে এবং তাহারা সাধারণত কোন না কোনভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় ক্ষমতা চর্চায় সামিল হয়। এই গোষ্ঠীর লোক তাহাদের নিজের মতন নানা ব্যাখ্যা তৈয়ার করিয়া মতবিরোধিতা, প্রতিহিংসামূলক তর্কবিতর্কের অবতারণা করে। এতে টানটান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং তথাপি গোষ্ঠীগত মেরুকরণ তৈয়ার হয়।

উন্নত বিশ্বে বিশেষজ্ঞগণ বিষয় বা ঘটনার সত্যতা লইয়া বাহাস করেন। কিছু রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় দলের লোকেরা এর মধ্য হইতে মতবিরোধ তৈরির চেষ্টা করে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এই জাতীয় কোন দলেই অংশ লয় না। কেননা তাহারা সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক হুজুগ ব্যতিরেকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করিতে এবং সিদ্ধান্ত লইতে সক্ষম। তবে কিছু কিছু দেশে এখনো ইতিহাস বিষয়ক মতবিরোধ জারি আছে। কেননা কিছু কিছু লোক চায় এই মতবিরোধ বলবত থাকুক। তাহারা এই মতবিরোধকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধামতন নিজেদের স্বার্থে মোক্ষম ব্যবহার করে।

বাংলাদেশ হইল সেই দেশ যেখানে স্বাধীনতা সংগ্রাম লইয়া তর্কবিতর্কের এখনো অবসান হয় নাই। জনগণ যদি রাজনৈতিক ও নৈতিক তৎপরতাকে আলাদা করিতে শিখিত এবং তদুপরি বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করিতে সক্ষম হইত তবে বহু বেহুদা তর্ক আপনাতেই সাঙ্গ হইত। কাহাকে রাজনৈতিক তৎপরতা বলে কিংবা নৈতিক তৎপরতা কি বস্তু — এই সমস্ত লইয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের আলোকে আলোচ্য রচনাখানি শেষ হইবে। এই ধারণা দুইটিকে বিচার করা হইবে যথাক্রমে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোকে। ক্ষেত্রবিশেষে অন্য দেশের ইতিহাস হইতেও উদাহরণ টানা হইবে।

রাজনৈতিক তৎপরতা কি?

সমাজতত্ত্ববিদ ম্যাক্স বেবারের মতে, যদি কাহারো কর্মকাণ্ড যে কোন প্রকারের ক্ষমতা ভাগাভাগি অথবা বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আলাদা তাৎপর্য বহন করে তবে সেই কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক তৎপরতা বলা যাইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার ইরাক হামলা — ভুল হৌক শুদ্ধ হৌক — একটি রাজনৈতিক তৎপরতা যাহা দিয়া বুশ সরকার দেখাইতে চাহিয়াছিল ইরাকে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে। কিন্তু যখন সেই দেশে কোন গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র পাওয়া গেল না, তখন গোটা ব্যাপারখানা রাজনৈতিক প্রশ্ন হইতে নৈতিক প্রশ্নে রূপান্তরিত হইল। এই আমেরিকা সরকার এখন ইরাকে এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে ‘গণতন্ত্র’ কায়েমের কোশেশ করিতেছে। আমেরিকার জনগণও এই প্রশ্নে বিভক্ত হইয়াছে। একইভাবে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা লইয়া বহু নৈতিক প্রশ্ন উঠিয়াছিল এবং সরকার যুদ্ধের পিছনে যেইসব যুক্তি দিয়াছিল সেইসব যুক্তি লইয়া আমেরিকার জনগণ এখনো বাহাস জারি রাখিয়াছে। এক পক্ষের লোকে যে কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক তৎপরতা হিশাবে দেখে সেই একই কর্মকাণ্ডকে অন্য পক্ষ নৈতিক তৎপরতা হিশাবে পড়িতে পারে। তদুপরি আমরা ‘ন্যায় যুদ্ধ’ এবং ‘অন্যায় যুদ্ধ’ লইয়া নূতন নূতন ধারণা পয়দা হইতেও দেখি। যে কোন যুদ্ধ ন্যায় কিংবা অন্যায় যাহাই হৌক না কেন, নির্দিষ্ট কিছু সত্য কখনো অস্বীকার করা যাইবে না। ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞের সহিত সম্পর্কিত যে কোন প্রশ্ন কখনো নৈতিক প্রশ্নের দায় এড়াইতে পারে না। তেমনিভাবে নিরীহ বাঙ্গালিদের উপর পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরোচিত হামলা কোন মানদণ্ডেই যৌক্তিক নহে।

মনে রাখিতে হইবে, কোন হামলার বিপরীতে আত্মরক্ষা কিংবা অপরকে রক্ষার করিবার জন্য কিন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালিত হয় নাই। সেরেফ রাজনৈতিক কারণেই এই গণহত্যা সংঘটিত হইয়াছিল। ‘হালের “ন্যায় যুদ্ধ” মতবাদ এবং আন্তর্জাতিক বিধি কেবলমাত্র একটি কারণকেই যুদ্ধের কারণ হিশাবে স্বীকার করিয়া লয় — হামলার পাল্টা হিশাবে আত্মরক্ষা কিংবা অপরকে রক্ষা।’ (ম্যাকমোহন ২০০৫: ১)। বাঙ্গালিদের উপর এই হামলা ছিল নৈতিকভাবে ভুল ও অন্যায় আচরণ। পাকিস্তানিরা ‘প্রতিরোধ যুদ্ধের’ যুক্তি দিয়া ‘অপারেশ সার্চলাইটের’ ন্যায্যতা কখনোই দাবি করিতে পারিবে না। কেননা সংসদ অধিবেশন বাতিল ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানিরা যে আন্দোলন পরিচালনা করিয়াছিল তাহা ছিল নিতান্তই অহিংস আন্দোলন। তাই ‘প্রতিরোধ যুদ্ধের’ যুক্তি দিয়া পাকিস্তান সরকার নিজ জনগণের উপর হামলাকে ব্যাখ্যা করিতে পারিবে না। তাছাড়া প্রতিরোধ যুদ্ধ সাধারণত দুইটা রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ঘটে। এছাড়া ১৯৭০ সালের সময়, ‘নীতি মোতাবেক “প্রতিরোধ যুদ্ধ” অনৈতিক এবং অবৈধ ছিল, কেননা কোন সত্যিকারের হামলার কিংবা সংঘটিত হইতে পারে এমন হামলার বিপরীতে এই জাতীয় যুদ্ধ পরিচালিত হয় নাই।’ (কাউফমেন ২০০৫: ২৩)।

যাহাদের আমরা আজিকে বাংলাদেশের জনগণ বলি, তাহারাই বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে নানা রাজনৈতিক তৎপরতার সাথে ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত ছিল। ব্রিটিশ শাসন শুরুর আগ পর্যন্ত (১৭৫৭), রাজনৈতিক তৎপরতায় আম আদমি সম্পৃক্ত ছিল না বলিলেই চলে। কেননা তখন খোদ রাজনৈতিক তৎপরতার ধারণাটাই অনুপস্থিত ছিল। পলাশীর যুদ্ধের সময় যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যবাহিনী বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাজিত করিয়াছিল তখন আম আদমি সেই যুদ্ধে অংশ লয় নাই। সেই লড়াই ছিল আদতে দুই সৈন্যবাহিনীর মধ্যে। ১৮৫৭ সালের পর প্রত্যক্ষ ব্রিটিশ শাসনের সময় হইতে রাজনীতিতে খুঁটিনাটি পরিবর্তন আসা শুরু করিয়াছিল। কারণ ব্রিটিশরা তখন ধাপে ধাপে নূতন একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু করিতেছিল আর তাহাতে সীমিত মাত্রায় জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি হইয়া পড়িয়াছিল।

নগদ আগ্রহের বাহিরেও যেসব বিষয় থাকিয়া যায়

বিগত ১০০ বছরে এমন অনেক ঘটনা ঘটিয়াছে যেখানে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তাহাদের নগদ চাহিদা ও আশার ঊর্ধ্বে উঠিয়া রাজনৈতিক নেতাদের উপর এমত বিশ্বাসে সমর্থন যোগাইয়াছিল যে সেই নেতাদের তৎপরতাই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জন্য সুফল বহিয়া আনিবে। এই সমস্ত ঘটনাই বাংলাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক হইয়া আছে। ১৯৪০ সালে পাকিস্তান আন্দোলনের দাবিকে সমর্থন করাই যুক্তিযুক্ত মনে করিয়াছিল পূর্ব বাংলার জনগণ। এজন্যই নিচুজাতের হিন্দু মুসলমান সকলে মিলিয়া পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়াছিল। তাহারা সেই সময় মনে করিয়াছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ব বাংলার মুসলমানদের সমর্থন দেওয়া রাজনৈতিকভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত। দুই স¤প্রদায়ের জনগণের কাছে ইহা ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং এই আন্দোলনের ভিতর কোন নৈতিক মূল্যবোধের বালাই ছিল না। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস লড়িয়াছিল ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান করিতে এবং ভারত বিভাগের আগ পর্যন্ত মুসলিম লীগ লড়িয়াছিল আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে। যদিও সেসময় বহু নিরীহ হিন্দু মুসলমান দাঙ্গার শিকার হইয়াছিল, তথাপি কোন রাজনৈতিক দলই সেই সা¤প্রদায়িক দাঙ্গাকে সমর্থন দেয় নাই। যে কেহই পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক হইতে পারে কিন্তু সা¤প্রদায়িক দাঙ্গাকে ধিক্কার দিবে না এমন মানুষ হয়তো খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। সেই সময় পূর্ব বাংলার অধিকাংশ জনগণ রাজনৈতিক তৎপরতাকে নৈতিক তৎপরতা হইতে আলাদা করিতে কামিয়াব হইয়াছিল। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এই ভেদরেখা ঘুচিয়া গিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এখন নৈতিক প্রশ্ন এস্তেমাল করা হইতেছে।

রাজনৈতিক প্রশ্নের সহিত নৈতিক প্রশ্নের গোঁজামিলনের বিসমিল্লাহ হইয়াছিল তখনই, যখন পাকিস্তানের পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের ভাষা উর্দু হইবার কারণে এবং মুসমলানদের ভাষা হিশাবে উর্দুকে (যেহেতু উর্দু হরফের সহিত আরবি হরফের মিল রহিয়াছে) প্রতিষ্ঠা করিবার যুক্তিতে শতকরা মাত্র ৭ জনের ভাষাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উপর চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা চালাইয়াছিলেন। রাজনৈতিক তৎপরতাকে এইভাবে এসলামের নৈতিক আলখাল্লা পরাইয়া রাষ্ট্র করা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের নৈমিত্তিক কর্মকাণ্ড হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। যদিও খুব অল্প পরিসরে ইহার আরম্ভ, তথাপি এই প্রবণতা গোটা পাকিস্তানের রাজনীতিকেই একে একে গ্রাস করিয়া ফেলিয়াছিল।

১৯৫২ সালের ভাষার আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন (এই নির্বাচনের পর ৯২(ক) ধারা জারির মধ্য দিয়া পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ পুরাপুরি ধ্বসিয়া পড়িয়াছিল এবং কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হইয়াছিল), সামরিক আইন আরোপ, ছয় দফা দাবি (পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যবাদী জুলুম অবসানের লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ কর্তৃক উত্থাপিত ছয় দফা দাবি যাহাতে প্রাদেশিক রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে ফেডারেল পাকিস্তানের দিশা দেওয়া হইয়াছিল), শেখ মুজিবুর রহমাদের উত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, এয়াহিয়া খান কর্তৃক সংসদ অধিবেশন সভার ডাক, জুলফিকার আলী ভুট্টোর হস্তক্ষেপে সেই সভা বাতিল ঘোষণা সকলই ছিল রাজনৈতিক প্রশ্নে গৃহীত রাজনৈতিক তৎপরতা। যদিও সত্য যে ক্ষমতাসীন দল বেশ অনেকবারই এইসব তৎপরতায় নৈতিক প্রলেপ লেপন করিবার কোশেশ করিয়াছে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা প্রমাণ করিতে চাহিতেছিল পূর্ব পাকিস্তানিরা আদতে সাচ্চা দেশপ্রেমিক কিংবা সহি মুসলমান নহে। কিছু উর্দুপ্রেমী এমন ঘোষণাও করিয়াছিল যে উর্দুরক্ষা এসলাম ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মরক্ষার সামিল:

এমতাবস্থায়, উর্দু ভাষা রক্ষা ধর্মরক্ষার সামিল। এবং প্রত্যেক মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব হইল উর্দু ভাষা রক্ষায় সাধ্যমত কাজ করা। (রহমান ১৯৯৬: ৭৫)

পশ্চিম পাকিস্তানিরা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি এবং শেখ মুজিবের মতন মহতী বাঙ্গালি নেতাকে অপদস্ত করিতে বারবার নৈতিক বাতাবরণ ব্যবহার করিয়াছে। অথচ এই সমস্ত ধর্মীয় বাতাবরণের সহিত ধর্মের কোন যোগাযোগ নাই। এইসব শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকিবার অন্যায় কারণগুলো ধামাচাপা দেওয়ার ফন্দি। তাহারা এইসমস্ত কর্ম নিজেদের রাজনৈতিক অসততা ও মুনাফেকি ঢাকিবার জন্যই করিয়া থাকিত। আসল প্রশ্ন হইতে মনোযোগ সরাইবার জন্যই মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাপারে ধর্মীয় বাতাবরণ লাগাইত।

১৯৪০ সালে কেহ পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করিবে কি করিবে না তাহা নিতান্তই ছিল তাহাদের নিজস্ব বাছাই। তখন বহু মুসলমানই ছিল দেশভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে। আবার কোন কোন মুসলমান পাকিস্তানের ধারণা দ্বারা এতই আবেগতাড়িত ছিল যে পাকিস্তানের নাগরিক হইবার জন্য তাহারা নিজের জন্মভূমি ছাড়িয়া যাইতেও প্রস্তুত ছিল। সংখ্যালঘিষ্ঠ হইবে জানিয়াও অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠী পূর্ব বাংলায় থাকিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছয়দফা দাবির বিরুদ্ধে ভোট দিলেও দিতে পারিত। কিন্তু ছয়দফার সহিত কোন নৈতিক প্রশ্ন জড়িত ছিল না। তাহাতে হয়তো বা ছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাগাইয়া তোলা দারুণ এক জাতীয় চেতনা। তাহাতে কোনরূপ ধর্মীয় রঙ বিলকুল মাখানো হয় নাই। পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা তাহাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডে নৈতিক প্রলেপ লেপনের চেষ্টা করিয়া যাইতেছিল।

বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ ও এই সংক্রান্ত যেসব ঘটনা ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আখেরি পরিণতি পাইয়াছিল তাহার ঐতিহাসিক কারণ পর্যালোচনার দিক বাদ দিয়া যে কেহই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারে যে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সর্বোচ্চ স্বাধিকার সহ পাকিস্তানের অখণ্ডতাই টিকাইয়া রাখিতে চাহিয়াছিল। তখন হয়তো গুটিকয় লোকই চাহিতেছিল, পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান হইতে আলাদা হৌক। তবে ইহা নিশ্চিত যে তখন উক্ত প্রশ্নে মতামত পর্যালোচনার কোন ব্যবস্থাই বলবত ছিল না। অখণ্ড পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া যাওয়া সকলেই নিশ্চিত এই সত্য স্বীকার করিয়া লইবেন।

১৯৭১ সালের চরম পরিণতির আগ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই চাহিতেছিল, দীর্ঘ সামরিক শাসনের দরুন উদ্ভূত সমস্যাসমূহের রাজনৈতিক সুরাহা হৌক। এই প্রেক্ষিতে তখন রাজনৈতিক সুরাহা প্রক্রিয়া চলিতেছিল এমত ঘোষণাও দিয়াছিলেন পাকিস্তানের এক সামরিক জান্তা। (জহির ১৯৯৪) পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা চলমান রাজনৈতিক সমস্যাগুলোকে সামরিক কায়দায় সুরাহা করিবেন এমত প্রমাণ থাকিবার পরও জনগণ আশায় বুক বাধিয়া ছিলে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গণহত্যার আগ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উক্ত সুরাহা প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রশ্ন হিশাবেই দেখিয়া আসিতেছিলে। তাহাদের ধারণা ছিল এই সমস্ত ক্ষেত্রে প্রত্যেকের একটা নিজস্ব মত থাকিতে পারে। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা কর্তৃক উক্ত গণহত্যাকে সমর্থন করিবার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রশ্নটি রাজনৈতিক বাছাইয়ের প্রশ্ন হিশাবে উপস্থিত ছিল। গণহত্যার ঘটনার পরপরই উক্ত প্রশ্ন নৈতিক প্রশ্ন হিশাবে হাজির হইল।

নৈতিক তৎপরতা কি?

সমাজতত্ত্ববিদ এমিল ডুর্খেইমের কাছে নৈতিকতার বিষয়টি সমাজবদ্ধতার শক্তি হিশাবে প্রতিদিনকার সামাজিক জীবনযাপন ও কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাঁহার মতে, ব্যক্তিমাত্রই অন্তর্গত নৈতিকতার জরুরত আছে এবং সাথে সাথে মুক্ত হইবার নিমিত্তেও তাহার বাহিরের নিয়ন্ত্রণ দরকার পড়ে। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়াছিল সকলের মিলিত নৈতিক মূল্যবোধগুলো জনসাধারণের হস্তক্ষেপের বাহিরে থাকিবে। এই সিদ্ধান্ত সমস্ত মানবজাতিকে একটা নৈতিক শিক্ষা দিতে সক্ষম হইয়াছিল। গ্রীসদেশীয় ভাবধারা হইতেই মূলত এই আধুনিক নৈতিক শিক্ষাখানির উৎপত্তি।

আরস্তু কহেন প্রত্যেক মানুষই সাধারণত কম বেশি ভীতু, সাহসী, বাসনাকামী, রাগী, দুঃখী, সুখী এবং ব্যথিত হইতে পারে। তিনি আরো বলেন অসূয়া, নির্লজ্জতা এবং পরশ্রীকাতরতা এইসবের নাম হইতেই বোঝা যায় যে এইগুলি খারাপ আচরণ। পরকীয়া, চৌর্যবৃত্তি ও খুনখারাবির মতন কর্মকাণ্ডও একইরকম। (মেকেন্টায়ার ১৯৯৮: ৬৫)

যে কোন কারণেই হৌক, কাউকে জখম করা নৈতিকভাবে ঠিক নয়। একইভাবে খুনখারাবি, ধর্ষণ এবং চুরিচামারি নৈতিকভাবে অন্যায় কাজ। এমনকি যুদ্ধের সময়ও নিরস্ত্র লোকজন হত্যা অনৈতিক কাজ। ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোত্রপরিচয়ের জন্য গণহত্যাও তেমনিভাবে নৈতিকভাবে অন্যায়। রাজনৈতিক জরুরত কখনো নৈতিকভাবে ভুল কর্মকে সঠিক করিতে পারিবে না। যে কোন রাজনৈতিক তৎপরতা একটা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কিংবা মুহূর্তে সঠিক মনে হইতে পারে, কিন্তু নৈতিকতার প্রশ্ন কোন পরিস্থিতিতেই কভু বদলাইবে না। সত্তরের সময় পাকিস্তানের কুলীন রাজনীতিবিদরা নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাদের উপর দফায় দফায় অভিযোগ আনিয়া গণহত্যার মতন অনৈতিক কাজকেও গ্রহণযোগ্য করিতে চাহিয়াছিল। এতে তাহারা যে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল তাহাই বেশি বেশি করিয়া প্রমাণিত হয়। যেসমস্ত নেতাগণ নির্দোষ বাঙ্গালি হত্যার পিছনে দায়ী ছিল তাহারা জার্মানির নাৎসি এবং বসনিয়ার নেতাদের মতই মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী। তাহারা তাহাদের নৈতিক অবস্থানে সৎ ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে তাহারা অপরাধী হিশাবেই চিহ্নিত।

একাত্তরের ২৫ মার্চের নারকীয় ঘটনার পর, বাংলাদেশের সংকটের প্রশ্নটি নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হইল। ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত যে কারোরই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার বা না দেওয়ার কিংবা ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে সমর্থন দেওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু অপারেশন সার্চলাইটের পর, এবং পশ্চিম পাকিস্তানি কর্তৃক নির্দোষ বাঙ্গালিদের উপর নির্বিচার হামলার পর সমঝোতার সকল শর্ত রাজনৈতিক যৌক্তিকতা হারাইল। তাহারা একটা নৈতিক প্রশ্নকে ঠিক বেঠিকের পর্যায়ে নামাইয়া লইয়া গেল। তথাপি কোন শর্তেই নির্বিচারে নির্দোষ মানুষ হত্যা নৈতিকভাবে সঠিক হইতে পারে না।  বলা হইয়াছিল যে সংসদ চালু হইলে এবং পাকিস্তান সংসদের নেতা হিশাবে শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবিধান প্রণয়নের ভার দেওয়া হইলে পাকিস্তান গোল্লায় যাইবে। আরো বলা হইয়াছিল ছয় দফার ব্যাপারে শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপোসী আচরণ পাকিস্তানকে প্রায় ভাগই করিয়া ফেলিয়াছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরা কি কারণে পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর হামলা করিয়াছিল তাহা কোন কোন পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ ও পণ্ডিতগণ এখনো খুঁজিয়া ফিরিতেছেন। ‘কোন বাছাবাছি বালাই ছিল না। তাহাদের হামলাটা ছিল একেবারে এলোপাতাড়ি এবং দয়ামায়াহীন।’ (মেস্কারেনহাস ১৯৭১)। ঘুমন্ত নিরস্ত্র স্বদেশি জনগণের উপর হামলা নিঃসন্দেহে কাপুরুষোচিত।

রাজনৈতিক সংকটে সামরিক মীমাংসার আশ্রয় লওয়া সেসময় যেমন অনৈতিক, এই সময়েও তেমনি ইহা নৈতিকভাবে একটা ভুল সিদ্ধান্ত। ভুট্টোর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক জাতীয় সংসদ অধিবেশন বাতিলের মধ্য দিয়া তৈয়ার করা রাজনৈতিক সংকটের মীমাংসা রাজনৈতিক সুরাহার মধ্য দিয়া হইতে পারিত; হত্যাযজ্ঞ দিয়া নহে। এয়াহিয়া খান শেখ মুজিবকে যেইরূপে পাকিস্তানের অখণ্ডতা ধ্বংসকারী হিশাবে দেখিয়াছেন ভুট্টোকে সেইভাবে দেখেন নাই। অথচ ভুট্টো সেইসময় ‘দ্বৈত সংসদ’ প্রস্তাবনার মাধ্যমে পাকিস্তানের মৃত্যু ঘোষণা করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন ‘ইধার হাম… উধার তুম’ (এইপারে আমি আর ঐপারে তুমি)। আমেরিকার সংবাদপত্রে প্রকাশ, ‘ভুট্টো এবং তাহার অনুসারীরা আওয়ামী লীগের দফা অনুযায়ী দুর্বল ফেডারেল ব্যবস্থা গ্রহণ না করিয়া কৌশলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারেন যে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের বাড়তি রাষ্ট্র হিশাবে স্বশাসনের অধিকার দেওয়া যাইতে পারে এবং এক্ষেত্রে তাহারা পূর্ব পাকিস্তানকে তফাতে রাখিতেই প্রস্তুত।’ (২০০০: ৫০৬)

ইহা ঠিক যে সকলেই যুদ্ধে সামিল হইতে পারিবে না, কিন্তু নৈতিকভাবে সঠিক থাকিয়া যেমন এই সংগ্রামকে সমর্থন করা যায়, তেমনি নৈতিকভাবে ভুল পথ গ্রহণ করিয়া হত্যাকারীদের সহযোগিতাও করা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে কেবল মুষ্টিমেয় কিছু লোক নৈতিকভাবে ভুল পথ বাছিয়া লইয়াছিল এবং হামলাকারী ও তাহাদের রাজনৈতিক সমর্থকদের সহযোগিতা করিয়াছিল। বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, পেশাজীবী ও শিক্ষকদের হত্যার জন্য নির্মিত আলবদর, আসশামসসহ আরো জঙ্গি সংঠনেই মুষ্টিমেয় বাঙ্গালিদের এই গোষ্ঠী যোগ দিয়াছিল। এই সংগঠনের সদস্যরা নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে হামলা চালাইত এবং একটা নির্দিষ্ট স্থানে লইয়া সারিবদ্ধভাবে নিরীহ লোকজনদের হত্যা করিত। এই জাতীয় কর্মকাণ্ডকে কখনোই রাজনৈতিক তৎপরতা বলা যাইতে পারে না। পাকিস্তানি আগ্রাসনের সমর্থক অনেকেই তখন এহেন কর্মকাণ্ডেই লিপ্ত ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, জার্মানির কাছে ফরাশিদেশ আত্মসমর্পণ করিবার পর, ভিশি সরকার জর্মন বাহিনীর সহিত হাত মিলায়। জর্মন আগ্রাসন ১৯৪৫ পর্যন্ত বহাল ছিল এবং সেই সময় শার্ল দাগলের নেতৃত্বে একটা প্রতিরোধ আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রত্যেক ফরাশি নাগরিক যেমন সেই আন্দোলনে যোগ দেয় নাই তেমনি সকলেই আগ্রাসী বাহিনীর সাথে হাতও মিলায় নাই। আগ্রাসনের পর ফরাশি সরকার সহযোগিতাকারীদের একটা ফর্দ তৈয়ার করে তাহাদের চিহ্নিত করে এবং তাহাদের শাস্তির ব্যবস্থা করে। ‘ক্রান্তিলগ্নের ন্যায়বিচার’ হিশাবে ১০,০০০ জন সহযোগিতাকারীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়া শাস্তিঘোষণার মধ্য দিয়া পুরা প্রতিরোধকারী শক্তিকেই শাস্তি দেওয়া হইয়াছিল। এর মধ্যে আদালত ২,০০০ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়াছিল এবং ৪০,০০০ জনেরও বেশি লোককে কারাগারে পাঠাইয়াছিল। ভিশি সরকারের প্রধানমন্ত্রী পিয়ের লেবালকেও সেই সময় দণ্ড দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ঘটিয়াছিল অন্য ঘটনা। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পনের পরপরই উদ্ধারকৃত অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ লইয়া দারুণ এক দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থা বিরাজ করিতেছিল। দেশের ভেতরকার প্রতিরোধ শক্তি হিশাবে কাজ করা আঞ্চলিক দলের অনেকগুলো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আওতায় ছিল না। ফলত প্রবাসী সরকারের পক্ষে দেশে আইনশৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে কঠিন সময় পার করিতে হইয়াছে। তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি শেখ মুজিব তখন বিদেশে আটক ছিলেন। এই সমস্ত বিষয়ের জন্য নূতন সরকারের পক্ষে সহযোগিতাকারীদের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভবপর হইয়া ওঠে নাই। তদুপরি আমেরিকা, চীন ছাড়াও অন্য অনেক মুসলিম দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয় নাই। নূতন সরকার সেই সময় সহযোগিতাকারীদের কোন তালিকা তৈয়ার করে নাই, যদিও শহরে পাড়ায় মহল্লায় সকলেই এই সকল সহযোগিতাকারীদের চিনিত। ইহাদের সকলেই হামলায় অংশ লইয়াছিলেন এমন নহে; কিন্তু তাহারা পাকিস্তানের আগ্রাসনেরও নিন্দা করে নাই। এই জন্য সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে একটা তালিকা তৈরি করা দরকার। এবং তাহাদের সকলকেই বিশেষ আদালতের সামনে ন্যায়বিচারে জন্য হাজির করা প্রয়োজন। অবশ্য ফৌজদারি মামলায় আসামি করা হইয়াছিল এমন অনেকের নাম লইয়া একখানা ফর্দ তৈয়ার করা হইয়াছিল সেসময়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, না জানি কি কারণে তাহাদের বিরুদ্ধেও কোন পদক্ষেপ লওয়া হয় নাই। কে কিরূপ সহযোগিতা করিয়াছিল সেসবের তোয়াক্কা না করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সকল সহযোগিতাকারীকে ঢালাওভাবে সাধারণ ক্ষমা করিয়া দিলেন। শেখ মুজিবের গুপ্তহত্যার পর, জিয়াউর রহমান সহযোগিতাকারীদের নিজ সরকারের উঁচু উঁচু রাজনৈতিক অবস্থানে বসাইয়া আবার পুনর্বাসিত করিলেন।

রাজনৈতিক তৎপরতার সহিত নৈতিক তৎপরতার মিশেল

এয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিক্সন সরকারের সহযোগিতায় চীনের সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পুরস্কার হিশাবে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচার হইতে পার পাইয়া গিয়াছিল। কিন্তু পাকিস্তানি বর্বর হামলার শিকার পূর্ব পাকিস্তানিদের কাছে পাকিস্তানের সমর্থকেরা মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী। রাজনৈতিক প্রচারণা কোন একটা কর্মকাণ্ডের ভিন্ন মানে তৈয়ার করিতে পারে কিন্তু নৈতিক প্রশ্নের সর্বজনীনতা কখনোই পরিবর্তন হয় না। অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অপরাধীরা হইলেন অন্যায়কারী এবং ‘প্রত্যেক ভুল কাজই হইল মিথ্যাচার’ (মেকেন্টায়ার ১৯৯৮: ীরর)। ‘বিচারের কালে অন্যায়কারীর কর্মকাণ্ড সবসময় মিথ্যাচার হিশাবেই প্রকাশিত হয় এবং এই মোতাবেক তাহারা বাস্তবতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে।’ (প্রাগুক্ত)

পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্ব বাস্তবতাকে ভুলভাবে উপস্থাপনে সফল হইয়াছে। কিন্তু যেহেতু ‘প্রত্যেক ভুল কাজই হইল মিথ্যাচার’ তথাপি তাহাদের ভুল কর্মকাণ্ডগুলো মিথ্যাচারে ভরা। তাহারা নিজেদের সকল ভুল কর্মকাণ্ডের জন্য এখনো বলির পাঁঠা খুঁজিতেই রত। কিছু কিছু ছুটকা ছাটকা সত্য বাদ দিলে হামুদুর রহমান কমিশন সেই ‘বৃহৎ মিথ্যাচারেরই’ সাক্ষ্য। কোন জাতির নিষ্পাপ সাধারণ জনগণকে হত্যা করাটা কোন নৈতিকতার বিচারেই ন্যায্য হইতে পারে না। পারে কি? যাহারা সেরেফ পাকিস্তানি প্রচারণায় কান দিয়া নৈতিক তৎপরতাকে রাজনৈতিক তৎপরতা হইতে আলাদা করিতে ব্যর্থ হন তাহাদের উচিত নিজেদের সামনে এই চিয়ায়ত প্রশ্নটি তুলিয়া ধরা। এখনো পর্যন্ত পাকিস্তানি সরকার এবং সেই দেশের সমাজ একাত্তরে তাহাদের ভুলগুলো স্বীকার করিয়া লইতে সম্মত হয় নাই। ‘অন্যায়কারীরা’ তাহাদের ভুল কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা চাহিয়া দুঃখ প্রকাশ করিবে — এটা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা নহে। যতদিন পর্যন্ত না এই ভুল স্বীকার করা হইতেছে, ততদিন পর্যন্ত পাকিস্তানকে সমর্থন করাটা একটা নীতি বহির্ভূত কাজ।

দোহাই

R M Hare, The Language of Morals (Clarendon: Oxford Press, 1952).

Alice Kaplan, The Collaborator: The Trial and Execution of Robert Brasillach (Chicago: The ChicagoUniversity Press, 2000).

Whitley Kaufman, ‘What’s Wrong with Preventive War? The Moral and Legal Basis for the Preventive Use of Force,’ Ethics and International Affairs, 19, No 3, December 2005.

Pieter Lagrou, The Legacy of Nazi Occupation (Cambridge: CambridgeUniversity Press, 2000).

Alasdair MacIntyre, A Short History of Ethics: A History of Moral Philosophy from the Homeric Age to the Twentieth Century (Notre Dame: University of Notre Dame Press, 1998).

Jeff McMahan, ‘Just Cause for War,’ Ethics and International Affairs, 19, No 3, December 2005.

Anthony Mascarenhas, The Rape of Bangladesh (Delhi: Vikas Publications, 1971).

Tariq Rahman, Language and Politics in Pakistan (Karachi: Oxford University Press, 1996).

Hasan Zaheer, The Separation of East Pakistan: The Rise and Realisation of Bengali Muslim Nationalism (Karachi: Oxford University Press, 1994).

প্রবন্ধের লেখক মোকাররম হোসেন ভার্জিনিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব, সমাজকর্ম এবং ফৌজদারি বিচার বিভাগে কর্মরত। তাহার ইডাক ঠিকানা mhossain@vsu.edu mhossain@vsu.edu।

প্রথম প্রকাশ: ইকনমিক এন্ড পলিটিকাল উইকলি, বালাম ৪৪, নং ৫ (জানুয়ারি ৩১ — ফেব্রুয়ারি ৬, ২০০৯), পৃষ্ঠা ২৬-২৯

ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা লইয়া ‘লাল’ ব্যান্ডদলের গান

ব্যান্ডদল ‘লাল’

ব্যান্ডদল ‘লাল’

ভূমিকা ও তর্জমা: নাসিফ আমিন

পাকিস্তানের বামপন্থী ব্যান্ডদল ‘লাল’। বিখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, হাবিব জালিবসহ বহু বিপ্লবীর কবিতাকে সঙ্গীত হিশাবে উপস্থাপন করিবার মধ্য দিয়া এই দল বেশ সুখ্যাতি পাইয়াছে। গত বছর দিল্লির জবাহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক দারুণ কনসার্ট করিয়াছিল এই ব্যান্ডদল। তৈমুর রহমানের নেতৃত্বে এই দল গঠিত। তিনি কম্যুনিস্ট মজদুর কিষাণ পার্টির মহাসচিবও বটেন।

তো এই ব্যান্ডদল বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলনের সহিত একাত্মতা ঘোষণা করিয়া নূতন গান বান্ধিয়াছে। গানখানির কথা কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘সিনাই উপত্যকা’ (১৯৭১) কবিতার বহি হইতে লওয়া। তিনি এই কবিতাখানি লিখিয়াছিলেন ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ। সেইদিন বাংলাদেশের মানুষ সাফ সাফ জানাইয়া দিয়াছিল তাহারা আর পাকিস্তানের সাথে নাই। সেই দিন — মানে ২৩ মার্চ — ছিল পাকিস্তান দিবস। ঐ দিবস তৎকালীন পাকিস্তানে বহুদিন ধরিয়া পালিত হইয়া আসিতেছিল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ পাকিস্তান আন্দোলনের ডাক দিয়াছিল। ইহার স্মরণেই দিনটির উদযাপন। ১৯৭১ সালের সেইদিন এই দেশের মানুষ — মানে তদকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালিরা — তাহাদের সরকারি বেসরকারি ভবনের ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ইহা ছিল বাংলাদেশের জনগণের চূড়ান্ত প্রতিবাদ। সেদিন কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতির বাসভবন আর ঢাকা সেনানিবাসের সামনে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়াছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ নিজ বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করিতেছেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ নিজ বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করিতেছেন

২৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ফয়েজের লেখা কবিতাটিকে গান করিয়াছে ‘লাল’। দলের হইয়া তৈমুর রহমান ভূমিকা সহকারে গানখানি ফেসবুকে পেশ করিয়াছেন। ভূমিকাটি নিচে দেওয়া হইল।

‘লাল’ কখনোই শুদ্ধ জনপ্রিয়তার জন্য কাজ করে নাই; বরং নির্যাতিত শ্রেণির স্বপক্ষে দাবি তুলিয়াছে। আমাদের নূতন কাজটি ‘লাল’ এবং ‘এই তো সময়’ নামা বাঙালি কমরেডদের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। ইহার ভিডিওচিত্রটি বাঙালি কমরেডদের বানান। বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলনের সহিত একাত্মতা পোষণ করা ছাড়াও আমরা আমাদের ইতিহাসের সেই না বলা অধ্যায়ের কথা বলিতে চাহি যাহা ঐতিহাসিক ভুল স্বীকার করিয়া লইতে অস্বীকৃতি জানায়।

অনেকেই ইহাকে বিরক্তিকর ভাবিতে পারেন, বাকিরা দুর্ব্যবহার ও দোষারোপেও আমাদের ধুইয়া দিতে পারেন। আমরা এই সকল কিছুই মোকাবিলা করিব, শক্তির বিরুদ্ধে সত্য বলিব, এবং কোনরূপ ডরভয় ছাড়াই নির্যাতিত মানবতার যে মতাদর্শ তাহার মুখপাত্র হইব।

এই সমস্ত ঘটনাবলিতে আমাদের কিছুই করিবার নাই ভাবিয়া বসিয়া থাকিলে কোন মঙ্গলই আসিবে না। আমরা প্রত্যেকেই এই অতীতের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং এ ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা কিংবা কর্তব্য আমরা বিলকুল এড়াইতে পারিব না। যেমন, এই আমি, তৈমুর রহমান হইলাম প্রধান বিচারপতি শেখ আবদুল রহমানের নাতি যিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (যে মামলার কখনো মীমাংসা হয় নাই) হইতে বাহির করিয়া আনিবার দায়ে চাকরি হইতে অবসরের আগেই চ্যুত হইয়াছিলেন। সেই সময়টাতে আমার জন্ম। তাছাড়াও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলিবার ঐতিহাসিক কর্তব্যটা আমি আমার মধ্যে দারুণভাবে অনুভব করি। তেমনিভাবে, আমি আশা করিব আমার পাকিস্তানি জ্ঞাতিভাই, যাহারা আব্বাস টাউন কিংবা বাদামি বাগ, যে যেখানেই এই গোড়া শক্তির দ্বারা স্বভূমে অত্যাচারিত হইয়া আসিতেছেন তাহারা অতীতের এইসব ঘটনাবলি স্বীকার করিয়া লহিবেন। যদি আমরা শক্তির বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ না করি এবং যদি আমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে না দাঁড়াই তবে সেই সমস্ত বিষয় ফের ঘটিবে।

এ যাত্রায় উক্ত গানে ফয়েজের কবিতাটির শেষ স্তবক দিয়াই মুলতবি টানি। ইহা লিখিত হইয়াছিল ২৩ মার্চ ১৯৭১; বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে। তিনি তখন বলিয়াছিলেন এবং এখনো ইহা অবশ্যই বলা উচিত:

‘…রোজ কেয়ামত মাথায় করিয়া এই যে দিব্যি বাঁচিয়া থাকা
রোজ শাস্তির বিধানের এখনো তো পাও নাই কোন দেখা।’

(ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা: কি যে হাল হায় বুঝাইতে পারি নাই)

কি যে হাল হায় বুঝাইতে পারি নাই – ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

(নাসিফ আমিন কৃত ভূমিকা)

কি যে হাল হায় বুঝাইতে পারি নাই
পারি নাই আজও শান্ত করিতে হৃদয়

ফের কাবিন হইতে পারে নাই সেই সে ওয়াদা
কথাগুলোও ফের জবান হইতে পারিয়াছে আর কই

যাহার নামে ফের জারি হইয়াছে পরোয়ানা
হুকুম পায় নাই সে হাজির করিতে সাক্ষীসবুতনামা
ফের মোমবাতিগুলোও আর রাত্রি হইয়া নিভিতে পারে নাই

ফের মদের মজা মারিবার আগে মোর সেই দারুণ ধরফরানি
ফের সেই মজমা যাহা এখনো মদের আড্ডা হতে পারেনি

আবারও তলব করিছে তোমারে অস্থির সেই চোখে
দেখা না হইল আবারও আলিঙ্গনের সেই রাতে

আখেরি দরজা কখন ফের বন্ধ হইল জানি না অইখানে
এইখানেও মোনাজাত খতম হইয়া গেল কবুল না হয়ে

ফয়েজ, রোজ কেয়ামত মাথায় করিয়া এই যে দিব্যি বাঁচিয়া থাকা
রোজ শাস্তির বিধানের এখনো তো পাও নাই কোন দেখা।’

তর্জমা: নাসিফ আমিন

পক্ষপাতজনিত পক্ষাঘাত – নাসিফ আমিন

[কবি ও গল্পকার মাহবুব মোর্শেদ গতকাল তাঁহার ফেসবুক পাতায় ‘আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান’ নামে একখানা নোট লিখিয়াছেন। ইহাতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ‘সর্বজন’ বুলেটিন ও তাহার প্রকাশক ‘আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা’ সম্পর্কে কিছু পর্যবেক্ষণ রহিয়াছে। ইহার প্রসঙ্গে আমাদের সহযাত্রী কবি নাসিফ আমিন অদ্য তাঁহার ফেসবুক পাতায় একপ্রস্ত নোট দিয়াছেন। পরিমার্জনাসহ নোটখানি এই স্থলে ছাপা হইল। — সম্পাদক]
 
© মুনেম ওয়াসিফ

© মুনেম ওয়াসিফ

ফেসবুকে মাহবুব মোর্শেদ তাঁহার নিজের মনোভাব নিয়া একখানা ছোটগল্প লিখিয়াছেন। এই ছোটগল্পের নাম দিয়াছেন ‘আহমদ ছফা, ফরহাদ মজহার ও সলিমুল্লাহ খান’। গল্পের নায়ক যেভাবে দ্বন্দ্ব নিয়া ভাবিত থাকে তিনি নিজের সেই গল্পের নায়ক হইবার কারণে সেই রকম দ্বন্দ্ব নিয়া ভাবিত থাকিবার কোশেশ করিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হইলেন। কেননা দ্বন্দ্ব নিয়া ভাবিতে থাকিলে তাঁহার আর গল্প লিখা হইবে না। দ্বন্দ্ব নিয়া ভাবিলে তাঁহাকে ঐতিহাসিকতা, বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করিতে হইবে। প্রত্যেকটা সিদ্ধান্তকে যুক্তি দিয়া তুলিয়া ধরিতে হইবে। কিন্তু তিনি যেহেতু ভাবিয়া লইয়াছেন তিনি গল্প লিখিবেন তাই এই সমস্ত বিষয়ের বালাই তাঁহার কাছে নাই।

কিন্তু গল্পকার গল্পের ছলে যেসকল বিষয় এবং সিদ্ধান্ত পেশ করিয়াছেন সেসব বিশ্লেষণের দায় আমার আছে। কারণ আমি গল্প লিখিতে বসি নাই; বিশ্লেষণ করিতে বসিয়াছি।

লেখকের প্রথম অনুমান হইল, দেশ দুইভাগে ভাগ হইয়া গেছে। একপক্ষে আওয়ামী লীগ তাহার কুক্ষিগত শাহবাগ আন্দোলন নিয়া দণ্ডায়মান, অপরপক্ষে পুলিশি নির্যাতনের পরও অদমিত জামায়াত-বিএনপি যোদ্ধা। তিনি দুই পক্ষের দ্বন্দ্বকে হাজির করিতেছেন এইভাবে যে জামায়াত তথা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আওয়ামী লীগের মতন দল দিয়া মীমাংসা করা যাইবে কিনা। শেষে তাঁহার সিদ্ধান্ত হইল: আওয়ামী লীগের দ্বারা এই কর্ম সম্পাদন সম্ভব নহে। এই বলিয়াই তিনি ক্ষান্ত দিলেন। এই মীমাংসা কেমনে হইবে, কে করিবে, কখন হইবে এই সমস্ত ব্যাপারে মুখে কুলুপ আঁটিলেন। কেন আঁটিলেন? তিনিই তো দ্বন্দ্ব আকারে এই মীমাংসার কথা তুলিয়াছেন। এক তরফে দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত দেখাইয়া দোসরা তরফরে তিনি জামায়াত-বিএনপিরে আলগা রাখিলেন কেন? কেন জামায়াত-বিএনপিকে এই মীমাংসার সামনে দাঁড় করাইলেন না? এখানে যে ফাঁকি ইহা কি শুভঙ্করের নাকি মাহবুব মোর্শেদের!

তা লেখকের মতে তো পক্ষ ছিল দুইটা। কিন্তু আচমকা তিনি এই দ্বন্দ্ব নিরসনের জন্য কোথা হতে জানি ‘জনগণ’কে আমদানি করিলেন। কহিলেন, ‘মতাদর্শিতভাবে এদের পরাজিত করতে হবে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে’। বঙ্গদেশ যদি দুইভাগে ভাগ হইয়া যায় তাহা হইলে এই দুইভাগের বাহিরে তিনি আবার নতুন করিয়া জনগণ পাইবেন কোথায়? মতাদর্শিকভাবে পরাজিত করাটা কি বস্তু? এই প্রশ্ন থাকিয়াই যাইবে।

যাই হোক, গল্পকার কল্পনাচ্ছলে ভুল করিবেন এমতে আমরা লেখকের এই যে দুই পক্ষ বানাইবার কোশেশ তাহাকে ভ্রম বলিয়া নিস্তার দিলাম। এখন এই দুই পক্ষের বাহিরে ‘জনগণ’ যদি থাকিয়া থাকে এবং মতাদর্শিক লড়াই যদি পন্থা হইয়া থাকে তবে মাহবুব মোর্শেদরে শুদ্ধ করিয়া আমরা বলিব আসলে পক্ষ তিনটা। কিন্তু তিনি যেহেতু জামায়াত-বিএনপির ব্যাপারে চুপ ছিলেন সেহেতু তিনি মনে মনে জামায়াত-বিএনপিকেই ‘জনগণ’ নামে ডাকিয়াছেন কিনা এমত একখানা খটকাও থাকিয়া যায় বৈকি! এবং এই খটকা যদি সত্য হয় তো মাহবুব মোর্শেদ ভাবিলে ভাবিতেও পারেন যে জামায়াত-বিএনপি দিয়াই মতাদর্শিক লড়াই সম্ভব!

যাই হোক, যেহেতু তিনি বলিয়াছেন আওয়ামী লীগকে দিয়া উল্লেখিত দ্বন্দ্বের মীমাংসা হইবে না; আমরা ভাবিয়া নিতে পারি যে, মাহবুব মোর্শেদ জামায়াত-বিএনপি দিয়া মতাদর্শিক লড়াই করাইতে চাহিবেন না। এইটা ভাবিয়া নেওয়াটা আমাদের মহানুভবতা। যেকোন গল্পকারের মানরক্ষায় আমরা এমত মহানুভবতা মাঝে মাঝেই দেখাইতে পারি।

তো মতাদর্শিক লড়াই চালাইতে এই দুই পক্ষ হইতে আলাদা হইতে হইবে। এবং খেয়াল করিলে দেখিবেন, আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা ‘সর্বজন’ বুলেটিন প্রকাশের মাধ্যমে সেই চেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে।

অথচ মাহবুব মোর্শেদ নির্দ্বিধায় বলিয়া যাইতেছেন, সলিমুল্লাহ খান আওয়ামী লীগ বন্দনা করিতেছেন এবং আহমদ ছফারেও এই কর্মে ব্যবহার করিতেছেন। কিন্তু একটিবার সুযোগ পাইলেন না বিস্তারিত করিবার কিম্বা প্রমাণ হাজির করিবার। কারণ এমন প্রমাণ নাই। গোটা ‘সর্বজন’ ঘাঁটিয়া একখানা আওয়ামী বন্দনার প্রবন্ধ বাহির করিবার চ্যালেঞ্জ আমি মাহবুব মোর্শেদরে দিলাম। কৃতকার্য হইলে প্রমাণ হইবে যে ছোটগল্পকার মাহবুব মোর্শেদ আসলে নির্বোধ আহাম্মক নহেন।

জানিয়া রাখা ভাল, মাহবুব মোর্শেদের যদিও লোক সমাগম দেখিলে মাথা গরম হয় না মানে বিপ্লবের খোয়াব জাগে না; কিন্তু পুলিশের উপর হামলা কিংবা দেশব্যাপী বোমাবাজি করিবার মধ্যে কবি ফরহাদ মজহার কিন্তু বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখিতে পান। তাই মাহবুব মোর্শেদ এবং ফরহাদ মজহারেও তফাত আছে। সাবধানে থাকা ভাল, যেন আপনার চাকুরিজীবী পাতিবুর্জোয়া এবং বিপ্লবের খোয়াবহীন মন সহসা যেন না ছুঁলো বোমা বিপ্লবেরে! হায়, পক্ষপাতে যদি হয় পক্ষাঘাত!

সলিমুল্লাহ খান আওয়ামী রেটরিক খাড়া করিয়া ফরহাদ মজহারের সমালোচনা করেন নাই। সলিমুল্লাহ খানের করা প্রত্যেকটা সমালোচনা প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক আলোচনা ও ইতিহাস তত্ত্বতালাশের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ সমালোচনা। সমালোচনা করিলেই আওয়ামীপন্থি বলা হইবে — এইটা সমালোচনার ভাল কোন পন্থা হইতে পারে না। ইহা সেরেফ বুঝিবার অক্ষমতাজনিত শিশুতোষ দোষারোপ। ফরহাদ মজহার, মাহবুব মোর্শেদ কিংবা অন্য যে কেহ হন, আহ্বান করি, যুক্তিতর্ক দিয়া সলিমুল্লাহ খানের করা ফরহাদ মজহারের সমালোচনাগুলোর সমালোচনা করিতে পারিলে করেন। সেরেফ শিশুতোষ দোষারোপ আর আওয়ামী ট্যাগ লাগাইয়া দিলেই সমালোচনা হয় না — এটা নিশ্চিত জানেন মহোদয়েরা।

এই বঙ্গদেশে আন্দোলন করিবার একশত একটা ইস্যু আছে। সমস্ত ইস্যু নিয়া শাহবাগ আন্দোলন বেগবান হয় নাই বলিয়া গোসলের পানির সাথে বাচ্চাকেও ফেলিয়া দিবেন — মানে শাহবাগ আন্দোলনের সম্ভাবনা ত্যাগ করিবেন — এমন হইতে পারে না। সমস্ত দাবি শাহবাগ আন্দোলন দিয়া মিটাইতে হইব এমন ধারণার মানে হইল শাহবাগ আন্দোলন বাংলাদেশের শেষ আন্দোলন। আদতে শাহবাগ আন্দোলন আন্দোলনের একটা পর্যায় মাত্র; ইহা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাপ্তির মধ্য দিয়া বৃহত্তর বৈপ্লবিক অর্জনের দিকে আগাইয়া যাওয়া।

মাহবুব মোর্শেদ বলিতেছেন, ‘জামায়াত-শিবিরের সশন্ত্র অবস্থান বনাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পক্ষে পুলিশের সশস্ত্র অবস্থানের মধ্য দাঁড়িয়ে কারও না কারও একথা বলার অধিকার থাকা উচিত যে, এ যুদ্ধ আমরা চাই না।’ বেশ ভাল কথা। যুদ্ধ আমরা কেহই চাহি না এই সুন্দর ভুবনে। এই কথা আমরা আগেও বলিয়াছি। পুনরায় বলিতেছি। কিন্তু সাথে এই অধিকারও থাকা উচিত নয় কি যেন কেহ কহিতে পারে, ‘আমি ন্যায়বিচার চাই, আমি ন্যায়বিচার চাই।’

সাঈদী কি কৃষক সমাজের প্রতিনিধি? – নাসিফ আমিন

ফরাশিদেশের একখানা কাহিনী দিয়া শুরু করি। তখন ফরাশিবিপ্লব শুরুর কাল। মানে ১৭৮৯ হইতে ১৭৯৪ সালের মধ্যকার সময়। সেই দেশের পশ্চিমাংশে বঁদে নামা প্রদেশে এই কাহিনীর সূত্রপাত। অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় এই প্রদেশে কৃষক-চাষাভূষার সংখ্যাই ছিল বেশি। স্বভাবত সেই চাষাভূষারা তাহাদের ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসে বেশি মাত্রায় বুঁদ হইয়া যাজকদের যারপরনাই অনুগত ছিল। এমনকি চাষাভূষাদের রাজনৈতিকতা নির্ধারণ হইত যাজকদের অঙ্গুলিহেলনে। সেই যাজকেরা ছিল আবার তখনকার বুর্বো রাজবংশের দালাল। বিপ্লবীরা যখন সেই রাজবংশ ও যাজকতন্ত্রবিরোধী সংগ্রামের ডাক দিল তখন চাষাভূষারাই সেই বুর্বো রাজবংশের হইয়া বিপ্লবীদের প্রতিরোধ করিতে নামিয়াছিল। এই প্রতিরোধের পেছনে অনুঘটক হিশাবে আগ হইতে কাজ করিতেছিল শহুরে বুর্জোয়া কর আদায়কারী, খাদ্যশস্যের কারবারি এবং জাতীয় স¤পদ কুক্ষিগতকারীদের শোষণ ও জুলুম। যেহেতু তখন বিপ্লব সবে শুরু হইয়াছিল, তাই এই শোষণ-জুলুমের ব্যবস্থা তখনো পর্যন্ত সমূলে উৎপাটন সম্ভব হয় নাই, বরং সেই ব্যবস্থা বেশ পাকাপোক্তভাবেই জারি ছিল।

তো এই নিয়া কৃষক-চাষাভূষা সমাজের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাধিয়াছিল। এই দানাবাধা ক্ষোভ বিস্ফারিত হইবে এমনটাই স্বাভাবিক। তেমনটি হইয়াও ছিল। কিন্তু তাহাদের অগাধ ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসের দরুন তাহারা যাজকদের দ্বারা প্ররোচিত হইয়া প্রতিপক্ষ হিশাবে বিপ্লবীদেরই বুঝিয়া পাইয়াছিল। তাছাড়া তখন — মানে ১৭৯০ সাল নাগাদ — যাজকবিষয়ক সংবিধান নামক এক বিধান গৃহীত হয়। যাহাতে বলা হইয়াছিল, সকল রোমান ক্যাথলিক গীর্জা তৎকালীন ফরাশি সরকারের অধীনস্ত হইবে। এই সংবিধান মোতাবেক ১৬০ জনের প্রায় সকল যাজক শপথ গ্রহণ করিয়াছিল। কিন্তু সাতজন জনপ্রিয় যাজক এই শপথে অসম্মতি জানায়। ফলত তাহারা অনুগত কৃষক-চাষাভূষা সমাজকে বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে চেতাইয়া দেয়। এবং এই সুযোগে যাজকদের সংগঠন আবার মাথা তুলিয়া দাঁড়ায়।

তবে বঁদের এই বিদ্রোহের প্রধান কারণ হিশাবে বলা হইয়া থাকে কবঁসিয়ে কর্তৃক সৈন্যবাহিনীতে তিন লাখ নতুন সৈন্য সংগ্রহের নির্দেশকে। এই বিদ্রোহে প্রথম দিকে কৃষকরা নেতৃত্ব দিলেও পরে তাহা যাজকদের হাতে চলিয়া যায়। ১৭৯৩ সালের অক্টোবর মাস নাগাদ বঁদে বাহিনী পরাজিত হয়। তাছাড়া এর মধ্যে ১৭৯১ সালের যে যাজকদের নেতৃত্বে বিদ্রোহ হয় তাহাতে কৃষক সমাজ সমর্থন দেয় নাই। এমনকি যাজকদের যখন ১৭৯২ সাল নাগাদ নির্বাসিত করা হয় তখনো কৃষক সমাজ তাহাদের সাহায্যে আগাইয়া যায় নাই। কেননা ততদিনে কৃষক সমাজ বুঝিয়া গিয়াছিল যাজকগণ তাহাদের নিজেদের কর্তৃত্বের লড়াই করিতেছে; তাহাতে কৃষক সমাজের কোন মুক্তি নিহিত নাই। ফরাশি বিপ্লবের ইতিহাসে বঁদের এই বিদ্রোহকে কাউন্টার রেবুলুশন তথা প্রতিবিপ্লব হিশাবেই পাঠ করা হয়।

গত ৪ মার্চ ২০১৩ তারিখে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় কবি ফরহাদ মজহার ‘নির্মূলের রাজনীতি’ নামক প্রবন্ধে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দেশব্যাপী জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব বিষয়ে লিখিতেছেন,

গ্রামে যারা কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী, দিনমজুর ও নানান পেশায় নিয়োজিত মানুষ তারা বিক্ষোভে আস্তে আস্তে যুক্ত হয়ে পড়তে শুরু করে। আগুন যখন জ্বলছে ঠিক তখনই দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা হোল। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কোন শ্রেণীর প্রতিনিধি সেটা এই রায় ঘোষণার পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কমপেক্ষে পঞ্চাশের বেশি গ্রামের গরিব মানুষ জীবন দিলো। আহত হয় কয়েক হাজার। মনে রাখতে হবে তাকে এখনো ফাঁসি দেওয়া হয় নি, শুধু  ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা করা হোল মাত্র। এর ফলে লড়াই মধ্যবিত্তের পরিসর থেকে বেরিয়ে গ্রামীণ খেটে খাওয়া গরিব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। রাজনীতির গুণগত উল্ল­ম্ফন ঘটে গেল। শহরের বিরুদ্ধে গ্রামের গরিব জনগণের বিদ্রোহের একটি পটভূমি তৈরি হোল।

ফরহাদ মজহারের এই বক্তব্য পড়িয়া একখানা প্রশ্ন তীব্রভাবে জাগিয়া উঠিল। উক্ত প্রবন্ধে তিনি কি বলিবার চেষ্টা করিতেছেন যে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আদতে কৃষক-চাষাভূষা তথা গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন? সাঈদী কি তবে কৃষক সমাজের নেতা? ফরহাদ মজহারের মতন ‘শিক্ষিত’ লোক যখন সমস্ত বিষয়াবলি এইভাবে অতি সরলীকৃত করিয়া সাঈদীকে কৃষক সমাজের প্রতিনিধি বানাইয়া দিতেছেন তখন বুঝিতে হইবে বিশেষ কোন একটা বিষয়কে জোর করিয়া যুক্তিরহিতভাবে খাড়া করাইবার চেষ্টা চলিতেছে। বার বার কার্ল মার্কসের নাম জপিয়া লেখক একজন ধর্মব্যবসায়ীকে কৃষক সমাজের প্রতিনিধি বানাইবার কোশেশ করিতেছেন। তাঁহার এই যে ভেলকিবাজি তাহাতে কোন সত্য নাই, কপট রাজনীতি আছে মাত্র।

উপরের আলোচনায় আমি ফরাশি বিপ্লবের সময়কার প্রতিবিপ্লবী কৃষক বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করিয়াছি। সেই সময়কার যাজকরা যেইভাবে সরল ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসী কৃষক সমাজকে বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে তাতাইয়া দিয়াছিল, এই সময়েও জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধী নেতারা তেমনিভাবে কৃষক সমাজকে শাহবাগের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে চেতাইয়া দিতেছে কৃষকদের সরল ধর্মবিশ্বাসরে পুঁজি করিয়া।

এইখানে কোন শ্রেণিচৈতন্য নিয়া এই জামায়াতে ইসলামীর নেতারা কৃষকদের চেতাইয়া দিতেছে — ব্যাপারটা কখনোই এমন নহে; তাহারা সেরেফ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষকে ধর্মের নামে ব্যবহার করিতেছে।

আমরা জানি, বাংলাদেশে কৃষক সমাজের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ এখনো রচিত হয় নাই। তাহারা নিশ্চিতভাবে এই মুনাফাখোরি ব্যবস্থার প্রতি ক্ষুদ্ধ। কিন্তু তাহাদের এই ক্রোধকে ধর্মের দোহাইয়ে বিপরীত দিকে চালিত করিতেছে এই জামায়াতে ইসলামীর ধর্ম ব্যবসায়ীরা। তাহারা অপরাধীর দণ্ড প্রত্যাহার করিতে গ্রামের সাধারণ কৃষকদের ধর্মের নামে লেলাইয়া দিতেছে।

যাহারা এই রকম নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য খেটে খাওয়া মানুষকে ‘যুদ্ধে’ নামাইয়া দিতেছে তাহারা তো আদতে এই কৃষক সমাজের জন্য কোন মুক্তির দিশা দিতেছে না। তাহা হইলে তাহারা কেমনে কৃষক সমাজের প্রতিনিধি হইলেন?

আর গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ যদি নিজেদের মধ্যে ভাবিয়া লন যে পরলোকে শান্তির জন্য তাহারা নিজ নিজ ধর্মের বন্দনা করিবেন, আখিরাতে নাজাত পাইবার জন্য নামাজ পড়িবেন; তাহা হইলে তাহারা তাহা নির্দ্বিধায় করিতে পারেন। এর জন্য জামায়াতে ইসলামীর তো দরকার নাই। জামায়াতে ইসলাম তো আর কৃষক সমাজকে বেহেশত নসিব করাইয়া দিতে পারিবে না।

তো দেখা যাইতেছে, জামায়াতে ইসলামী বলি আর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বলি কেহই কৃষক সমাজকে ইহকালে অর্থনৈতিক মুক্তি যেমন দিতে পারিতেছে না তেমনি পরকালেও বেহেশত আনিয়া দিতে পারিতেছে না। এই নেতারা যখন কৃষক সমাজের জন্য ইহকালে পরকালে কোন মুক্তির দিশাই দিতে পারিতেছেন না তবে তাহাদের কৃষক সমাজের প্রতিনিধি কেন বানাইতে চাহিতেছেন ফরহাদ মজহার?

পণ্ডিত মজহার এইখানে নির্লজ্জের মতন যুক্তিরহিতভাবে ধর্মব্যবসায়ীদের পক্ষে সাফাই গাহিয়া যাইতেছেন। এই ধর্মব্যবসায়ীরা যেইভাবে কৃষক সমাজকে ধর্মের নামে ধোঁকা দিতেছে তেমনি ফরহাদ মজহারও কৃষক সমাজকে ধোঁকা দিতেছেন। এবং সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হইল, এই ধোঁকা তিনি কখনো মার্কসের নাম জপিয়া দিতেছেন, কখনো বা দিতেছেন এসলামের নাম জপিয়া জপিয়া।

কৃষক সমাজের উপর উবিনীগ নামক এঞ্জিয়োর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা জারি রাখিবার জন্যই কি কৃষক সমাজকে এই ধোঁকাবাজির মধ্যে রাখা? উবিনীগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিশাবে বলি কিংবা দার্শনিক হিশাবেই বলি ফরহাদ মজহার কি এমন প্রশ্ন এড়াইয়া যাইতে পারেন?

যেহেতু সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ে ক্ষিপ্ত গ্রামের নানা শ্রম ও পেশার মানুষের সংঘঠিত তাণ্ডবের সহিত আমি বঁদের কৃষকদের প্রতিবিপ্লবী বিদ্রোহের তুলনা করিয়াছি, সেহেতু অনেকে প্রশ্ন করিতে পারেন, আমি কি শাহবাগ আন্দোলনকে ফরাশি বিপ্লবের সাথে তুলনা করিতেছি কিনা। এমন প্রশ্নের জবাবে আমি বলিব, ফরাশি বিপ্লব যেমন কয়েক মাসের ঘটনা নহে, তেমনি শাহবাগ আন্দোলনও বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নহে। ফরাশি বিপ্লব ছিল একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। সেইখানে বঁদের প্রতিবিপ্লবী ঘটনার মতন অনেক ঘটনা ঘটিয়াছে। এই সকল ঘটনা মোকাবিলা করিয়া করিয়াই ফরাশি বিপ্লব বিপ্লব হইয়া উঠিয়াছে।

শাহবাগ আন্দোলনও তেমনি আমাদের জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের একটা পর্যায়। শাহবাগ আন্দোলনের মধ্য দিয়া আমরা ভবিষ্যতে বৃহত্তর বৈপ্লবিক অর্জনের দিকে আগাইয়া যাইব। এই সফরে ফরহাদ মজহারের মতন এমন অনেক প্রতিবিপ্লবীর সাথে আমাদের মোকাবিলা সারিতে হইবে। এমন প্রতিবিপ্লবীদের ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করিয়া আমাদের সামনে আগাইয়া যাইতে হইবে।

সাম্প্রদায়িকতা মোকাবিলা করিতে হইবে – নাসিফ আমিন

Slogan 2

 যে কোন প্রকারের সা¤প্রদায়িক হামলা এবং দাঙ্গা লাগাইবার ফন্দি-উস্কানি ঠেকাইতে আমাদের সকলেরই সামাজিকভাবে এবং রাজনৈতিকভাবে তৎপর থাকা দরকার।

মনে রাখিতে হইবে, গোলাম আযম, কাদের মোল্লা বা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কেহই নবী কিংবা পয়গম্বর না। যাঁহারা তাঁহাদের নবী বা পয়গম্বর জ্ঞানে এমত মনোভাব পোষণ করিতেছেন যে উক্ত ব্যক্তিগণের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা যাইবে না; তাঁহারা খোদ নিজধর্মদ্রোহী কাজ করিতেছেন। মহানবী (স:) নিজে নবুয়তের সিলসিলা সিলগালা করিয়া দিয়াছেন। কোন মুসলমান অপরাধ করিলেও তুমি সেই মুসলমান বান্দাটির পসোফাই গাহিবা এমত কথা নবীজী কখনো কহেন নাই। বরং অপরাধী যদি মুসলমানও হয়, সেই অপরাধীর শাস্তি দিতেই বলিয়াছেন তিনি। খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, রাহাজানি, জুলুম নিশ্চয়ই এসলাম ধর্মে অপরাধ হিশাবেই গণ্য হয়। তাহা হইলে এইসব করিয়া সাঈদী নিশ্চয় নিরাপরাধী হইতে পারেন না। সাঈদী যে অপরাধ করিয়াছেন, এই সত্যের অপলাপে খোদ খোদাই নাখোশ হইবেন সবচেয়ে বেশি!

যাঁহারা সাঈদীর জনপ্রিয়তারে সামনে তুলিয়া ধরিতেছেন তাঁহাদের উচিত শাহবাগের আন্দোলনের জনপ্রিয়তাও মর্মে মর্মে অনুধাবন করা। সাঈদীর ভক্ত যেমন মুসলমান ঘরের ছেলেরা তেমনি শাহবাগ আন্দোলনও কিন্তু প্রধানত মুসলমান ঘরের ছেলেরাই করিতেছে। বরং এই আন্দোলন আরো জাতীয় গুরুত্বে পৌঁছাইয়াছে। কেননা এই আন্দোলনে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান আদিবাসী নারী পুরুষ সকলে এক হইয়াছেন। অতয়েব এই আন্দোলনকে অমুসলমানের আন্দোলন বলিবার কোন জো নাই। এই আন্দোলনকে অনেকে অমুসলমানের আন্দোলন কিংবা আওয়ামী লীগের আন্দোলন আখ্যা দিতেছেন। যাঁহারা এমত মিথ্যা প্রচার চালাইতেছেন তাঁহারা নিজেরাই খোদ মুসলমান কিনা ভাবিবার বিষয়! একটি বিশেষ মুহূর্তের জাতীয় স্বার্থের সহিত আওয়ামী লীগের একটি স্বার্থ অভিন্ন হইয়াছে বলিয়া যে গোটা আন্দোলনের কৃতিত্ব আওয়ামী লীগের ঘরে চালান দেওয়া হইবে — এমত বক্তব্যের মধ্যে সত্য নাই; মতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও সা¤প্রদায়িক কূটচাল আছে মাত্র।

দেশের এই দুর্যোগকালে সকলেই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সা¤প্রদায়িক শক্তিকে মোকাবিলা করিতে তৎপর থাকিবেন এমন আশা করিতেছি।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ১ মার্চ ২০১৩