Tag Archives: নাজমুল সুলতান

চন্দ্রপৃষ্ঠে সাঈদী, নিম্নবর্গবাদ ও রাজনীতির বিলোপ – নাজমুল সুলতান

নিম্নবর্গ বরাবর শাসকশ্রেণির কর্মকাণ্ডের সহিত সম্পর্কাধীন — এমনকি তাদের মৌহূর্তিক দ্রোহ এবং জাগরণের কালেও সেই অধীনতার সম্পর্ক পুরোপুরি বিলীন হয় না। — আন্তনিয়ো গ্রামসি

চন্দ্রপৃষ্ঠে আল্লামা সাঈদীর মুখাবয়ব দর্শনের গুজব ইতিমধ্যে বিবিধ ব্যাখ্যানের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তর্ক আছে সাঈদীর চন্দ্ররূপ দর্শনের পরিসর, ব্যপ্তি তথা নিম্নবর্গের জনতা কতটুকু তা গ্রহণ করেছে তা নিয়ে। আমি সেই তর্কে ঢুকব না। ধরে নিচ্ছি, নিম্নবর্গের জনতার কিছু অংশ হলেও চন্দ্রেপৃষ্ঠে সাঈদীবদন আবির্ভূত হওয়ার গুজবকে সত্যজ্ঞান করেছে।

তো এই ঘটনাকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়াসমূহকে মোটাদাগে দুই কিসিমের ব্যাখ্যাপদ্ধতিতে ফেলা যায়। একদিকে আছেন তারা যারা গুজবে বা গায়েবি তরিকায় সাঈদীর চন্দ্ররূপ আবির্ভাবের মাঝে নিম্নবর্গের (subaltern) জনতার রাজনৈতিক বাসনার প্রতিফলন দেখেছেন। তারা বলেন, সাঈদী নিম্নবর্গের জনগণেরই প্রতিনিধি। দোসরা ব্যাখ্যাপদ্ধতির মতে এই রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া গুজবের মূলে নিম্নবর্গের ধর্মচেতনাকে ব্যবহার করে জামায়াত-শিবির গংয়ের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের প্রচেষ্টা। আরেকটু আগ বাড়িয়ে, মার্কসীয় শব্দবন্ধে কেউ কেউ সেই ঘটনাকে বলবেন নিম্নবর্গের ভুয়া-চৈতন্য, তথা ঐ নির্দিষ্ট গুজবে কানপাতাটা নিম্নবর্গের সত্যিকারের শ্রেণিচেতনার প্রতিফলন নয়।

এই লেখায় উপরোক্ত ব্যাখ্যাপদ্ধতিসমূহের তুলনামূলক আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ হবে না। বরং চন্দ্রেপৃষ্ঠে সাঈদী এই গুজব এবং প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যাগুলোর সূত্র ধরে এইবেলা আরেকটা কথা পাড়তে চাই। সাঈদী নিম্নবর্গের প্রতিনিধি হতে পারেন কিনা সে আলোচনার আগে নিম্নবর্গ ক্যাটাগরিকে এইসব পাঠ কিভাবে বুঝেছে সেইদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার।

পয়লা পাঠ ধরে নেয় ক্ষমতাবলয়ের বাইরে থাকার দরুন নিম্নবর্গের সকল বহিঃপ্রকাশই তার শ্রেণিরাজনীতির নমুনা। নিম্নবর্গ চেতনার প্রকাশমাত্রই রাজনৈতিকভাবে শুদ্ধ ঘটনা। দোসরা ব্যাখ্যাপদ্ধতি বলে নিম্নবর্গের ন্যায্য রাজনৈতিক ক্ষোভ এবং গুজবে বিশ্বাসজাত প্রতিবাদ ম্যানিপুলেশনের কারণে তাদের শ্রেণিস্বার্থের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রথম পাঠ ম্যানিপুলেশন স্বীকার করে না, দোসরা পাঠ তা করে। আমি আরেকটু সামনে গিয়ে বলতে চাই, ম্যানিপুলেশন যদি হয়ে থাকে, তবে তা ঘটবার সম্ভাবনা নিম্নবর্গের সামাজিক সংগঠনের মাঝেই হাজির ছিল।

এ কথা সর্বজনবিদিত যে নিম্নবর্গবাদের গোড়ায় আছে একটা ন্যায্য পর্যালোচনা — যার লক্ষ্যবস্তু ছিল আধিপত্যশীল বয়ানগুলোর তরফে নিম্নবর্গের কর্তাসত্তাকে পরাধীন করে রাখা। মধ্যবিত্তীয় আলোকায়নবাদী প্রকল্পগুলো ইতিহাসের যে খোপে পুরে রেখে তারে বুঝতে চায় সেই খোপের মাঝে থেকে নিম্নবর্গীয় কর্তা কথা কইতে পারে কিনা সে প্রশ্ন তুলেছিলেন নিম্নবর্গবাদী তাত্ত্বিকেরা। ন্যায্য ছিল বটে তাদের সেই জিজ্ঞাসা।

নিম্নবর্গবাদ নিয়ে বিস্তারিতে যাবার যোগ আপাতত নাই, তাই এই লেখায় বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করতে চাই নিম্নবর্গবাদী প্রকল্পের একটা বিশেষ পূর্বানুমানের দিকে। নিম্নবর্গবাদ তার সদিচ্ছা সত্ত্বেও, আমার প্রস্তাবে, নিম্নবর্গের কর্তাসত্তা বুঝবার পথে আরেক ধরনের সংকট তৈরি করে। সেই সংকটটা খোলাসা করবার জন্য সাম্প্রদায়িকতার ধারণা নিয়ে আলোচনার শরণ নেয়া যাক।

আধিপত্যবাদী বয়ানে সাম্প্রদায়িকতাকে নিম্নবর্গের অনালোকিত দশার প্রতিফল হিশাবে দেখা হয়। অন্যদিকে নিম্নবর্গবাদীরা দাবি করেন যে সাম্প্রদায়িকতার গোড়া ব্রিটিশ উপনিবেশবাদে প্রোথিত (যথা জ্ঞানেন্দ্র পান্ডে দাবি করেন: সাম্প্রদায়িকতা মূলত উপনিবেশবাদী জ্ঞানোৎপাদনকরণ প্রকল্প)। সাম্প্রদায়িকতার আদিকারণ নিয়ে জরুরি তর্কে প্রবেশ আমার অভিপ্রায় নয়, তবু দুই একটা কথা বলে রাখা যায়। ব্রিটিশ ভারতে ধর্মীয় গোষ্ঠীসমূহের জাতীয়-সম্প্রদায়জ্ঞান গড়ে উঠার পিছনে উপনিবেশী শাসনপদ্ধতির অবদান ষোল আনা। উপনিবেশপূর্ব ভারতবর্ষে হিন্দু বা মুসলিম সমাজের সম্প্রদায়জ্ঞান ছিল বটে, কিন্তু তার বিন্যাস সাফ সাফ বিভাজনকেন্দ্রিক ছিল না। সম্প্রদায়মূহের ঐতিহাসিক রূপান্তর ঘটে উপনিবেশীয় শাসনপদ্ধতির অভিজ্ঞতার সূত্র ধরে।

বলা বাহুল্য, সেই রূপান্তরের পরিণতি ঘটে দেশবিভাগ এবং সন্নিহিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে। উপনিবেশপূর্ব ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ কিংবা বিদ্বেষ সামাজিক পর্যায়ে হাজির ছিল না তা বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার জাতীয়করণ নিঃসন্দেহে উপনিবেশবাদী শাসন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়। আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, আপতিকভাবে উপনিবেশবাদের পটভূমিতে দাঁড়ানো উনিশ শতকীয় ভারতবর্ষীয় জাতীয়তাবাদের সংঘটনের মাঝেই সেই বিভাজনবাদী সাম্প্রদায়িকতার জাতীয়করণের শর্ত হাজির ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ধারণাকৃত জাতি ছিল বিশেষ, আর সেই জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ গড়ে উঠা মুসলিম লিগীয় জাতি-ধারণাও ছিল বিভাজনবাদী। উপনিবেশবাদের প্রেক্ষিতে জন্ম নেওয়া জাতীয়তাবাদের পেটে সাম্প্রদায়িকতার জাতীয়করণের সম্ভাবনাও তাই তৈরি হয়। সম্প্রদায়জ্ঞান বুঝবার একটা মৌলিক পদ্ধতি হচ্ছে কোন সম্প্রদায় কেমন করে তার বর্ডার বা সীমারেখা ধারণাগতভাবে স্থাপন করে সেই দিকে নজর দেওয়া। সীমারেখার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ কেননা তার সাহায্যে বোঝা যায় কিভাবে এক সম্প্রদায় আরেক সম্প্রদায় থেকে নিজেকে আলাদা করে। উপনিবেশপূর্ব সম্প্রদায়সমূহের সীমারেখা ছিল বহুমাত্রিক, অস্পষ্ট এবং অনির্দিষ্ট। ফলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ যা ছিল তা স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে যেতে পারে নাই। বিধি বাম — যে জাতীয়তাবাদ ভারতবর্ষের উপনিবেশের বিপরীতে বয়ান তৈরি করতে প্রয়াস পেয়েছিল, তার মাঝেই লুক্কায়িত ছিল সাম্প্রদায়িকতার জাতীয়করণের বীজ।

এবার ফেরা যাক আমার উদ্দিষ্ট বিষয়ের দিকে। কোন কোন নিম্নবর্গবাদীদের দাবি নিম্নবর্গে যে সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায় তা কার্যকারণগতভাবে নিম্নবর্গীয় সমাজের বহিরঙ্গের বিষয়। এই কাজে নেমে তারা সাম্প্রদায়িকতার আদিকারণ তালাশ করবার সাথে সাম্প্রদায়িকতার (আদিকারণ নির্বিশেষে) সামাজিক স্বরূপকে গুলিয়ে ফেলেন। উপনিবেশবাদের মাঝে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িকতার শিকড় ঢুঁড়ে তারা ভুল করেন না, কিন্তু তারা যখন সাম্প্রদায়িকতার ঐতিহাসিক রূপান্তর আমলে না নিয়ে তাকে বিদ্যমান জাতীয়তাবাদী কিংবা সেকুলার রাজনীতির প্রতিক্রিয়ারূপে দেখান তখন সমস্যার শুরু হয়। সাম্প্রদায়িকতা ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ সংঘটনের সঙ্গে অন্তর্নিহিতভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। তাতে রাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদ যেমন তা দেয়, তেমনি রাষ্ট্র বহির্ভূত সমাজও অংশগ্রহণ করে। কারণ রাষ্ট্র তথা রাজনীতি সমাজের উপরিতলে থাকে না, তা সমাজ কিভাবে সংঘটিত হবে তা নির্ধারণেও ভূমিকা রাখে। রাষ্ট্র বহির্ভূত সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও পদ্ধতিতেও তাই সাম্প্রদায়িকতা স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। নিম্নবর্গের জনসাধারণ সেই সমাজ ও রাষ্ট্রের অংশ; রাজনৈতিক ক্ষমতায় তাদের হাত নাই বটে, কিন্তু ক্ষমতা নিম্নবর্গের তল্লাটে প্রভাব খাটায় বৈকি। শিরোক্তিতে দেওয়া আন্তনিয়ো গ্রামসির বাণীও আমাদের তাই শিক্ষা দেয়।

নিম্নবর্গবাদীরা সাম্প্রদায়িকতাকে নিম্নবর্গের সামাজিক চৈতন্য হতে আলাদা করার দরুন নিম্নবর্গীয় শ্রেণিকে তাদের অন্তর্গত দ্বন্দ্বের মাঝে বুঝবার পথ বন্ধ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক নিম্নবর্গবাদী শহীদ আমিনের ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশে নিম্নবর্গীয় জনতার মাঝে গান্ধি সম্পর্কিত গুজবের ব্যাখ্যা। আমিনের দাবি মোটাদাগে দুইটা: সত্যিকারের গান্ধির সাথে নিম্নবর্গের জনতার নির্মিত গান্ধির কোন যোগাযোগ ছিল না বা থাকবার দরকার নাই (সাঈদীর ক্ষেত্রে একই দাবি কেউ কেউ করেছিলেন), আর নিম্নবর্গের নির্মিত গান্ধি আদতে ছিলেন নিম্নবর্গীয় সমাজে বিদ্যমান ইনসাফের ও ন্যায্যতার ধারণা মতে। এই পাঠের পূর্বানুমান হচ্ছে যে নিম্নবর্গীয় সমাজে যা বিদ্যমান তা কেবল আধিপত্যবিরোধী ইনসাফের আর ন্যায়বিচারের ধারণা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইত্যাকার প্রতিক্রিয়াশীলতা নিম্নবর্গের বহিরঙ্গের বিষয়, আর তাই গান্ধির নামে তাদের ন্যায্যতা পাবার সুযোগ ছিল না। এই পাঠের সাথে আমি দ্বিমত পোষণ করি উপরে উল্লেখিত কারণে — সমাজ সংগঠন যদি বিদ্যমান সকল উপাদান নিয়ে নির্মিত হয় (সেই সকল উপাদানসমূহের আদিকারণ নির্বিশেষে), তবে এটুকু মনে করবার কারণ নাই যে গুজবে কেবল ইনসাফের কথা থাকে। সাম্প্রদায়িকতা বা তদ্রƒপ উপাদানও সেখানে সমানরূপে থাকতে পারে। বাস্তবিক প্রতিনিধি আর নিম্নবর্গকৃত তার ধারণার মাঝে যোগাযোগ নাই বলে যে দাবি সমান্তরালে তোলা হয় তাও সমস্যাজনক, তবে সেই প্রশ্নে যাওয়ার ফুরসত আজকে আর নাই।

আর দশটা শ্রেণির তুলনায় নিম্নবর্গ — যেমন দেখিয়েছিলেন গ্রামসি — অবস্থানগতভাবে ক্ষমতার প্রতি বিরুদ্ধতাপ্রবণ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে নিম্নবর্গ সমাজের বিদ্যমান দ্বন্দ্ব এবং উপাদান নিয়ে নির্মিত নয়। তাদের সামাজিক বিদ্যমানতাকে তাই তাদের মুক্তিকামী রাজনীতির সাথে মিলিয়ে দেখা অযৌক্তিক। সারকথা হল: নিম্নবর্গ হওয়ার দরুন নিম্নবর্গের রাজনৈতিক আবির্ভাবের বহুত্ব কমে না। সেই প্রতিনিধিত্ব যেমন সাঈদীকে ভাষা দিতে পারে, তেমনি ফুলবাড়ীকেও ভাষা দিতে পারে। নিম্নবর্গের সকল প্রকাশের মাঝে সামাজিক শ্রেণিচেতনা থাকবে, কিন্তু লেনিনের কথাও মনে রাখান মতন: সামাজিক শ্রেণিচেতনার প্রকাশ মাত্রই মুক্তিকামী রাজনীতির প্রকাশ নয়। রাজনৈতিক শ্রেণিচেতনা (লেনিনের ভাষায় class political consciosuness) সামাজিক শ্রেণিচেতনার অধিক কিছু। এই চেতনা আধিপত্যের সম্পর্কের মাঝে নিহিত নয়, তাকে নির্মাণ করতে হয়। নিম্নবর্গের ক্ষমতা-বিরুদ্ধতা রাজনীতির অপরিহার্য অংশ, কিন্তু তা রাজনীতির সমার্থক নয়।

মিলে সামান্যে যার দেখা: শাহবাগ ও সামান্যতা – নাজমুল সুলতান

Michilরসিকজন মাত্রই অবগত আছেন যে ‘পাবে সামান্যে কি তার দেখা’ বলে লালন সাঁইয়ের একটা অনন্য গীতিকা আছে। বাংলা ভাষায় সামান্য বলতে আজকাল বুঝায় তুচ্ছ, যার কোন বিশেষত্ব নাই। ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রে ‘সামান্য’ শব্দটার অর্থ আরেকটু নির্দিষ্ট: যা সাধারণ, যা সার্বজনীন, সেই গুণের নামই সামান্যতা (universality)। এক প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক যেমন বলেছিলেন, সামান্যতা যদি গণ (genus) হয়, তবে বিশেষ হচ্ছে প্রজাতিসম (species)। এরূপ সামান্যতা সর্বত্রই আছে, আবার নির্দিষ্ট কোন স্থান-কালে নাই। এই প্রেক্ষিতে লালন বললেন সামান্যে সত্যের দেখা মিলে না। তবে কি লালন বিশেষে সত্যের নিবাস দেখেছিলেন (যেমন দাবি করে থাকেন কেউ কেউ)?

বিশেষ মাত্রই নির্দিষ্ট, আর নির্দিষ্ট বিশেষসমূহের মাঝে যা সার্বজনীন তাকেই বলা হয় সামান্যতা। আমাদের প্রস্তাব এই যে লালন সামান্যের বিপরীতে নির্দিষ্ট বিশেষ স্থাপন করেন নাই, এবং সেই কারণেই লালন সামান্যতাবিরোধী ভাবুক নন। লালন ঐ গীতিকাতেই বলেছিলেন নিরাকার ব্রহ্ম ফিরেন একা একা, তার দোসর নাই।  বিশেষ নির্দিষ্ট বটে, তবে তা অপরাপর বিশেষদের সাথে যৌথ সামান্যতার সূত্রে সম্পর্কিত। যা একক, তা এই বিদ্যমান বিশেষ-সামান্যের সম্পর্ক ছিঁড়ে আবির্ভূত হয়। তার নাম আমরা দিলাম এককত্ব, ইংরাজিতে যারে বলে সিংগুলারিটি।

লালনের কথার মাঝে থেকেই আমরা যোগ করব সামান্যতার আরেক রূপের কথা। লালনের দেখানো এককত্ব থেকেই তৈরি হতে পারে আরেক ধরনের সামান্যতা।  সেই সামান্যতা একক, সব জায়গায় নাই, আবার তার পরও সামান্যতা। এই সেই সামান্যতা যারে ফরাশি দার্শনিক আলাঁ বাদিয়ু বলেন একক-সামান্যতা (universal-singular)। যা একক তা আর দশটা বিশেষের ন্যায় প্রতিনিধিত্বশীল নয়, তবু তা সমগ্রতারে ধারণ করবার দাবি করতে পারে। ধরা যাক সর্বহারা ধারণাটার কথা। সর্বহারা কেবল সমাজের বিশেষ একটা অংশ নয়, তথা তা কর্মজীবী শ্রেণির সমার্থক নয়, তার থেকে কিঞ্চিৎ অতিরিক্ত। সমাজের অংশ হয়েও সমাজে যার জায়গা নাই তার নামই কি সর্বহারা না? এই একক অংশই সমগ্রতা হয়ে উঠবার সক্ষমতা রাখে, যদিও তা আর সকল বিশেষ অংশের থেকে আগাগোড়া আলাদা। তার মানে, এককত্বের জোরেই তা আর দশটা অংশকে ধারণ করার দাবি করে। যে একক সামান্য হয়ে ওঠে, তা বিভিন্নতারে গ্রাস করে না, বরং তাদের জায়গা দেয় নিজের মাঝে, বিভিন্নতার প্রতি অভিন্নতা দেখিয়ে। কারণ একক-সামান্যতা খালি নেতির জোরে বলীয়ান না, তা সাথে সাথে তৈরি করে নয়া বাস্তবতা, যেখানে বিদ্যমান বিশেষদেরও জায়গা দেয়া সম্ভবপর হয়। বলা বাহুল্য, যা একক তা মূর্ত; বিমূর্ততার খাপে মিলিয়ে তারে আনা যায় না।

শাহবাগ নাম্নী ঘটনা গতানুগতিক আর দশটা ঘটনার মতন নয়। তা নিয়মের বাইরের ঘটনা, এবং এই কারণেই এই ঘটনার মাঝে এককত্ব আছে।  বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে, আমরা দেখেছি, এই ঘটনা রাজনৈতিক জাতিসত্তা পুনর্নির্মাণের বাসনা প্রকাশ করছে। এই প্রকাশ একটা সীমার মাঝে ক্রিয়াশীল, ঠিক। তবু চোখ খুললেই দেখা যাবে জাতিরাষ্ট্রের অন্যান্য বিশেষ রাজনীতির বিপরীতে এই আন্দোলন একধরনের আপেক্ষিক সামান্যতা নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আচমকা কিছু লোক এক হয়ে, শাহবাগের চত্বর দখল করে, নিজেদের জনগণ আকারে দাবি করল। শাহবাগ গোটা বাংলাদেশ নয়, গোটা ঢাকা শহরও নয়। তবু তা আপামর জনগণের প্রতিনিধি হয়ে দাঁড়াল। আমরা বলব যে শাহবাগ আন্দোলনের এই ক্ষমতার মূলে তার সামান্যতা। এককত্ব রূপে আবির্ভূত সামান্যতার বদৌলতেই নানা মতের নানা বোধের জনগণকে এই আন্দোলন এক সূত্রে গেঁথেছে।

শাহবাগের নিন্দুকেরা আজ জাত-ধর্ম গেল বলে শোরগোল তুলেছেন। বলাই বাহুল্য, পূর্বস্থিত বিশেষের দোহাই দিয়ে উদীয়মান সামান্যতা খারিজ করার আরেক নামই ডানপন্থা। যে পন্থার কূটরেখা প্রবাহিত এডমুন্ড বার্ক থেকে হালের ‘আমার দেশ’ অব্দি। এতদিনে আমরা জেনে গেছি ইতিহাস প্রগতির একক রঙ্গমঞ্চ নয়, প্রতিক্রিয়াশীলতা তার বাহুবলে অনায়াসে দখল করে নিতে পারে ইতিহাসের ছড়ি। ডানপন্থার সৈনিকেরা যে ভাষায় অভিযোগ তোলেন, শাহবাগ সেই ভাষায় উত্তর দিবে কেন? শাহবাগকে এই বিশেষীকরণ প্রকল্পের মোকাবিলা করতে হবে তার সামান্যতা দিয়েই।  লৈঙ্গিক কিংবা ধার্মিক বিশেষের বিপরীতে শাহবাগ তার স¤প্রদায়-অতিক্রমী সামান্যতা জারি রাখুক।