Tag Archives: জোবাইদা নাসরীন

রাজনীতির বিনির্মাণ: শাহবাগের হাত ধরে – জোবাইদা নাসরীন

Potakaশাহবাগে আন্দোলন চলছে। স্পর্ধিত তারুণ্যের হাত ধরে এই আন্দোলন ভিত্তি পেলেও এখন এটি বয়স, পেশা, ধর্ম, গোত্র ছাপিয়ে সময়ের সেরা দাবিরূপে হাজির হয়েছে। ৪২ বছর বয়সী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এক ক্রান্তিকালে এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আন্দোলনেরও অভিমুখ ঠিক করে দেবে। বাংলাদেশের সমাজ কোন দিকে চলবে তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই আন্দোলনের সাফল্য-ব্যর্থতার উপর।

এই আন্দোলনের পাটাতন থেকেই শ্লোগান এসেছে, ‘তুমি কে আমি কে? গারো চাকমা বাঙালি। বাঙালির বাংলাদেশে রাজাকারের ঠাঁই নাই, আদিবাসীদের বাংলাদেশে রাজাকারের ঠাঁই নাই।’ মুক্তিযুদ্ধের সমকালীন বেশ কিছু জনপ্রিয় শ্লোগানের সাথে সাথে যোগ হয়েছে কিছু নতুন শ্লোগান। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’র সাথে সাথে চলছে, ‘একাত্তরের চেতনা: মালিকানা ছাড়বো না। একাত্তরের চেতনা: ধর্ষকদের ছাড়বো না। একাত্তরের চেতনা: লুটেরাদের ছাড়বো না।’

এই আন্দোলনের দাবি দৃশ্যত একটা হলেও এর ভিতর গভীরভাবে জড়িয়ে আছে আরো অনেক ধরনের দাবি, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের  অঙ্গীকার। আড়াল-আবডাল, ফিসফিসানির সংস্কৃতি ভেঙ্গে গড়ে উঠেছে প্রতিবাদের সংস্কৃতি — এটি এই সময়ের বড় প্রাপ্তি।

এই আন্দোলন সংঘটনের দিক থেকে মূলত শ্লোগান-নির্ভর। শ্লোগানের উপর দাঁড়িয়ে টানা আধা-মাসের বেশি সময় ধরে চলছে আন্দোলন। যতক্ষণ শ্লোগান থাকে মঞ্চে ততক্ষণই মানুষ থাকে। শ্লোগান নেই, মানুষ নেই। বক্তৃতার চলন নেই। এতদিন জনতা অনেক বক্তৃতা শুনেছে। এখন শ্লোগানের কণ্ঠই তার কণ্ঠ। এখন শ্লোগানই তার দাবি আদায়ের হাতিয়ার।

এখন পর্যন্ত অর্জন অনেক। ফেসবুকে ব্লগারদের একটি ম্যাসেজ দেখে শাহবাগ চত্বরে জড় হওয়া কয়েকজন মানুষ রাতারাতি পরিণত হয়েছে লাখো মানুষে। কাদের মোল্লার মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে মাত্র। এটি একটি ঘটনা, কিন্তু বহুদিন থেকেই মনে হয় এদেশের মানুষ এমনি এক প্রতিরোধ তৈরি করতে চেয়েছে। এই আন্দোলন থামার নয়, থামাবার নয়।

একাত্তর এদেশের মানুষের সবচেয়ে আবেগের বিষয়। এই একাত্তর নিয়ে আমাদের মধ্যে একটি ‘রোমান্টিক ভিকিটিমহুডের’ মাদকতা ছিল। কিন্তু সেই একাত্তর এবার এসেছে ভিন্নভাবে। রোমান্টিকতার বাইরে গিয়ে মানুষ রাজপথে নেমেছে। একাত্তর নিয়ে শুধু হা-হুতাশ কিংবা জড়িয়ে ধরা আবেগ নয়, একাত্তর যে কতটা জীবন্ত এদেশের মানুষের মনে তারই প্রমাণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। যারা ভাবেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাত্তর এক মীমাংসিত অধ্যায়, তারা যে কতটা ভুলের মধ্যে আছেন তা এই আন্দোলন দেখিয়ে দিল।

এই মঞ্চ থেকেই উঠেছে একাত্তর নিয়ে কর্পোরেট-বাণিজ্য কিংবা রাজনৈতিক-বাণিজ্য বিরোধী ডাক। আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দিয়েছেন, এখানে কোন রাজনৈতিক দলের নেতারা এসে বক্তব্য দিতে পারবেন না। এই আন্দোলন নিয়ে কোন ধরনের দলবাজি করা যাবে না। তাই এটিকে অনেকেই ভুল করে ভাবছেন এটা রাজনীতির বাইরের মঞ্চ। তারা হয়ত ভুলে গেছেন যে এটা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোন আন্দোলন নয়। বরং এটা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পাটাতন। এই পাটাতনেই আজ মিলেছে সবাই। রাজনীতি বি-নির্মাণের যে তোরণ তৈরি হয়েছে মানবতাবিরোধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন সংযোজন। এ ধারার রাজনীতিতে এ দেশ এতদিন অভ্যস্ত ছিল না।

রাজনীতি বি-নির্মাণের যে পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ তা নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন একটি স্রোত। এর শব্দ অনেক দূর থেকে শোনা যায়।

ই-ডাক: zobaidanasreen@gmail.com