Tag Archives: অনন্ত ইউসুফ

সাদা ধূসর জঙ্গলের দিনরাত্রি — অনন্ত ইউসুফ

অনন্ত ইউসুফ

অনন্ত ইউসুফ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ৫ অক্টোবর কুষ্টিয়ার ভেড়ামাড়ায় বসে বাগেরহাটের রামপালের বহুল সমালোচিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ‘ডিজিটাল মোড়ক’ খুললেন। এই মোড়কের রঙ্গিন খামে ১,৩৪০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাথে আছে রামপালের ঠিক পাশের ইউনিয়ন বুড়িরডাঙ্গা থেকে শুরু করে মংলা পর্যন্ত বিস্তৃত শিল্পায়ন, জাহাজভাঙ্গা শিল্প এবং সরকারের ইচ্ছা মোতাবেক মংলা শিল্পনগরী। এরই মধ্যে প্রায় ৩০টি শিল্প প্রতিষ্ঠান তাদের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে পশুর নদী, কুমারখালি, দাউদখালি, বিশনা, মাদারতোলা এবং বেতবুনিয়া খালপাড়ে। আর চোখের ধূসর পর্দায় ভাসছে সাদাটে প্রাণ-প্রাণীহীন সুন্দরবন।

‘আমার কিছুটা দেরী হয়ে যায়, জুতোয় পেরেক ছিল…।’ যদি ভুল না করে থাকি তবে নিশ্চিত সন্দীপন চট্টোপাধ্যয় এভাবেই লিখেছেন তাঁর ‘জঙ্গলের দিনরাত্রি’ উপন্যাসে। তিনি নিজেকে নিয়েই লিখেছেন। তবে মনে হয় তাঁর কথাটা আমাদের সম্বন্ধেই।

পেরেক আমার জুতোতেও আছে তাই রামপালে জমি অধিগ্রহণ শুরুর প্রায় আড়াই বছর পর লিখছি। পেরেক আমাদের জুতোতেও আছে। তাই পত্রিকাওয়ালা, কলমজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট যারা দাবি করছেন গত আড়াই বছর ধরে সোচ্চার ছিলেন, নিঃসন্দেহে তাদের সেইসব চিৎকারের ওজন ছিল ফিশফাশের মত। আর এই ফাঁকে দখল হয়েছে ১,৮০০ একর আবাদী জমি। চলছে দিন রাত পশুর নদীতে ড্রেজিং। মাটিতে ঢাকা পড়েছে ৫০০ একর জমি। অতিরিক্ত ড্রেজিংয়ের চাপে হুমকির মুখে ১২০ প্রজাতির জলজ প্রাণী। ২০১০ সালে নির্ধারিত জমির-দরে চলছে পুর্নবাসন কাজ। আর জমি ফেরত চেয়ে পথে নামা, শ্লোগান দেওয়া চাষিদের কপালে জুটছে ১৪৪ ধারা। জেল। জুলুম।

রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব এবং সুন্দরবন বিষয়ে মতামতগুলো প্রধানত দুইভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এই দুই মতামত নির্মিত হয়েছে মূলত প্রবল ক্ষমতাধর সরকারের ‘পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না’ এবং পরিবেশ সচেতন শব্দজীবী মানুষের ‘ধ্বংসের মুখে সুন্দরবন’ এই দুই টেক্সেটের উপর।

দুই প্রান্তে এই দুই নির্মাণের মাঝে ‘ধ্বংসের মুখে সুন্দরবন’ দর্শক-পাঠককে সক্রিয় করে তুলেছে। তারা পঠিত তথ্য উপাত্ত নিয়ে বসে থাকেনি, পৌঁছে দিয়েছে অন্য মানুষের হাতে। এই প্রক্রিয়ায় গত কয়েক মাসে সুন্দরবন বাচাঁও আন্দোলন তার জন-রাজনৈতিক চরিত্র সুসংহত করেছে প্রবলভাবে।

ছবি: অনন্ত ইউসুফ

ছবি: অনন্ত ইউসুফ

তবে এও সত্যি জন-রাজনৈতিক চরিত্র নির্মাণের দীর্ঘসূত্রতার ফাঁকতালে সরকার প্রকাশ করেছে বিতর্কিত ইএইএ রির্পোট। একদিনের জন্যও থেমে থাকেনি জমি অধিগ্রহণ কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ। তদুপরি এগিয়ে এসেছে মোড়ক উন্মোচন।

গত তিন বছরে মংলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ২,০০০ বিঘা জমি পুঁজিপতিদের দখলে গেছে। অথচ এখনো এই আন্দোলনের এজেন্ডায় যোগ হয়নি মংলায় চলমান শিল্পায়ন। সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যেদিন এই জঙ্গলের দিনরাত্রি বার্ন ফটোগ্রাফের মতন সাদা ধূসর প্রান্তরে পরিণত হবে।

আবারো পোশাক শ্রমিকের লাশের পাহাড় – অনন্ত ইউসুফ

©  মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বুধবার সকালে রানা প্লাজা নামক বহুতল ভবন ধসে পড়ার ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত উদ্ধার করা মৃতের সংখ্যা ২৫৯ ছাড়িয়ে গেছে। আহতের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ধ্বংসস্তুপের নিচে আটকা পড়ে আছে আরো অসংখ্য মানুষ। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অভাবে অগোছালো ও ধীরগতিতে চলছে উদ্ধার তৎপরতা।

তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে ভয়াবহতম আগুন লাগার ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় এই ঘটনা ঘটল। তাজরীনের আগুনে অন্তত ১১৪ জন পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। তাজরীনের মালিককে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

ধসে পড়ার একদিন আগে রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দিলে পৌরসভা, বিজিএমইএ এবং শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারা ভবন মালিকের সাথে বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কাজ বন্ধ রাখার। কিন্তু সিদ্ধান্ত না মেনে পরদিন সকালেই ভবনটির পাচঁটি পোশাক কারখানা জোরপূর্বক চালু করা হলে এক ঘণ্টার মধ্যেই ধসে পড়ে ভবনটি।

দেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পর একে অপরকে দুষছে পৌরসভা, বিজিএমইএ এবং শিল্প পুলিশ। স্থানীয় যুবলীগ নেতার মালিকানাধীন ঐ ভবনের নিচের তিনটি তলায় ছিল বিপণিবিতান, ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। চতুর্থ থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাচঁটি পোশাক কারখানা। বিজিএমই প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী কারখানাগুলোতে প্রায় তিন হাজার দুইশত জন শ্রমিক কাজ করতেন।

শিল্প পুলিশের পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান সর্বজনকে জানান তাদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পোশাক কারখানার মালিকরা কারখানা চালু করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। ‘আগের দিনই শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা বলেছিলাম ভবনে কাজ বন্ধ রাখতে। কিন্তু তারা আমাদের কথা রাখেননি।’

বিজিএমইএ শিল্প পুলিশের অভিযোগ পাশ কাটিয়ে তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সমস্ত দায় চাপিয়েছেন ভবন মালিকের উপর। শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স’ সলিডারিটির নেত্রী কল্পনা আক্তার বলেন, ‘গত আট বছরে তিনটি ভয়াবহ ভবনধসের ঘটনায় এই নিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৪০০। অথচ প্রতিবার সুষ্ঠু বিচারের নামে শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করেছে সরকার ও বিজিএমইএ। বেশির ভাগ দুর্ঘটনার পর আহত ও নিহতের পরিবার খুব অল্প টাকার এককালীন সহযোগিতা পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাও জোটে না শ্রমিকদের ভাগ্যে। যতদিন পর্যন্ত আগুন দিয়ে ভবন ধসিয়ে শ্রমিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হবে না, দক্ষ মনিটরিং সেল গঠন করা হবে না, আমি মনে করি ততদিন এমন ভয়াবহ চিত্র ফিরে ফিরে আসবে।’

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে ভবনধসের ঘটনা নতুন নয়। রানা প্লাজা ধসের আগে ২০০৫ সালে সাভারের বাইপাইলে স্পেকট্রাম গার্মেন্টসের ভবন ধসে প্রাণ হারায় ৯০ জন শ্রমিক। ঐ মর্মান্তিক ঘটনার পর স্পেকট্রামের মালিকের বিরুদ্ধে ৪৫টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। কিন্তু সেসব মামলা এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

স্পেকট্রামের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ঠিক পরের বছর ২০০৬ সালে ভবনধসের ঘটনায় তেজগাঁওয়ের ফিনিক্স গার্মেন্টসে নিহত হন ২১ জন শ্রমিক। স্পেকট্রামের মত ফিনিক্স গার্মেন্টস দুর্ঘটনায় দোষী ব্যক্তিরা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অনুমোদনহীন রানা প্লাজা

রানা প্লাজার মালিক যুবলীগ নেতা সোহেল রানা স্থানীয় সাংসদ মুরাদ জংয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ভবন নির্মাণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং সাভার পৌরসভার উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি সাভারের এই ভবনটির অনুমোদনের বিষয়ে উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে, তবে সাংসদের সহযোগিতায় সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

সাভার অঞ্চলের একজন রাজউক কর্মকর্তার দাবি ভবনটি তাদের সীমানায় পড়লেও রানা প্লাজা নির্মাণে কোন অনুমতি দেয়নি রাজউক। তাদের কাছে কোনপ্রকার অনুমোদনের জন্য ভবনমালিকও আসেননি। তিনি জানান তার জানা মতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছে সাভার পৌরসভা।

সাভার পৌরসভার মেয়র রেফাতউল্লাহ দাবি করেন সব ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে রানা প্লাজা ভবন নির্মাণের অনুমোদন পেয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা নয়তলা ভবনের অনুমতি দেইনি। অনুমোদন ছিল ছয়তলা পর্যন্ত। আমাদের ধারণা ভবনের নকশা ঠিকমত পরীক্ষা করা হয়নি। এতে কোন প্রকার দুর্নীতি ছিল কিনা বিষয়টা দেখা হচ্ছে।’

‘মালিকেরা আমাগো ভাইবইনরে খুন করছে…’

©  মাহমুদ হোসেন অপু

© মাহমুদ হোসেন অপু

ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও রানা প্লাজার বিভিন্ন তলার পাঁচটি পোশাক কারখানায় তিন হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ শুরু করেন। পোশাক কারখানাগুলো হচ্ছে নিউ ওয়েভ বটমস লিমিটেড, নিউ ওয়েভ স্টাইল লিমিটেড, ফ্যান্টম এ্যাপারেলস লিমিটেড, ফ্যান্টম ট্যাক লিমিটেড ও ইথার টেক্সটাইল লিমিটেড। কাজ শুরুর এক ঘণ্টার মধ্যেই ধসে পড়ে ভবনটি।

রানা প্লাজার মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা আলী আজগর বলেন, ‘আগের দিন পিলার ভাঙ্গা দেইখা শ্রমিকেরা কারখানায় ঢুকতে চায় নাই। কিন্তু আমাগোরে জোর কইরা ঢুকাইছে, ঢুকানোর সমে কইছিলো নাইলে তিনদিনের বেতন কাইটা ফালাইবো। মালিকেরা আমাগো ভাইবইনরে খুন করছে…।’

ঘুমিয়ে চলছে কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর

পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে, ১৯৭০ সালে তৎকালীন সরকার গড়ে তুলেছিল কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কারখানাগুলোর পেশাগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। সেই সময় এই দপ্তরের জনবল ছিল ৩১৪, অথচ স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এই প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান তো বাড়েইনি বরং কমতে কমতে তলানিতে ঠেকেছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি এখন এই দপ্তরে কাজ করছেন মাত্র ১৮৪ জন কর্মচারী। তাদের গুরুদায়িত্ব দেশের পাঁচ হাজার পোশাক কারখানাসহ অন্য শিল্পকারখানাগুলোর ছাড়পত্র দেওয়া এবং গুণগতমান দেখভাল করা।

১৯৭৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় হাজারে উন্নীত হলেও সরকার এই দপ্তরের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব এখনো অনুধাবন করতে পারেনি। অবহেলা, ত্র“টিপূর্ণ পরিদর্শন ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত লোকবল নিয়ে ঠেলে ঠুলে চলছে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর।

সূত্রমতে, একজন কর্মকর্তা পরিদর্শক অফিস  থেকে কোন কারখানা পরিদর্শনে গেলে গাড়িভাড়া বাবদ তাকে দেওয়া হয় প্রতি কিলোমিটারে মাত্র এক টাকা। ফলে এই এক টাকার কাজ অফিসে বসেই সারেন কর্মকর্তারা। গত পাঁচ বছরে দুর্ঘটনা ব্যতীত পরিদপ্তর থেকে কোন অনুসন্ধানী দল কারখানা পরিদর্শনে যায়নি। একইভাবে ছাড়পত্র দেওয়ার কাজটাও তারা টেবিলে বসেই সেরে নেন, পরিদর্শনে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়া, কলকারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জানা নেই বাংলাদেশের কতগুলো কারখানার কাছাকাছি জায়গায় জলাধার অথবা খালি জায়গাজমি আছে — দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধারকাজে যা খুবই প্রয়োজনীয়। দেশের কয়টি কারখানায় নির্মাণগত ত্র“টি রয়ে গেছে তারও কোন হিশেব নেই পরিদপ্তরে।

একেবারেই অকার্যকর করে রাখা কারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তর হতে পারত বাংলাদেশে পোশাকশিল্প বিকাশ এবং শ্রমিক অধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিকে পঙ্গু করে রেখে পোশাকশিল্প মালিকেরা একের পর এক অন্যায় করেও বিনা বিচারে পার পেয়ে যাচ্ছে। দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি চলছে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।

১৯৭৯ সালে পোশাক শিল্প যাত্রা শুরু করেছিল ১২,০০০ ডলার মূল্যের সামগ্রী রপ্তানি  করে। আজকের দিনে অঙ্কটা ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেলেও খুব একটা উন্নত হয়নি পোশাক শ্রমিকদের জীবনমানের। অন্যকিছু বাদ দিলেও, কেবল পোশাকশিল্পের স্বার্থেই এই মুহূর্তে কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

‘জামায়াত আমাদের কেউ না, এসব জালিমদের সাথে আমাদের তুলনা করাও ভুল’ – মঈনুদ্দিন রুহি

যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন শুরু হইবার পর হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠনের নাম নতুন করিয়া সামনে চলিয়া আসিয়াছে। সংগঠনটির লক্ষ্য উদ্দেশ্য, ‘ইসলাম রক্ষা’য় তাহাদের আন্দোলন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহিত তাহাদের সম্পর্ক প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলিয়াছেন সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মঈনুদ্দিন রুহি। সর্বজন পত্রিকার পক্ষে সাক্ষাৎকারটি লইয়াছেন অনন্ত ইউসুফ

মঈনুদ্দিন রুহি

মঈনুদ্দিন রুহি

হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম শুরু হইল কবে থেকে?

আমাদের নেতা আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১০ সালে। একটু খোঁজখবর নিলেই জানতে পারবেন শরিয়তবিরোধী নারীনীতি ও শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে একটা সফল আন্দোলন দিয়ে হেফাজতে ইসলাম যাত্রা শুরু করছিল। একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই — আমাদের আন্দোলন কখনো সরকারবিরোধী ছিল না। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন ছিল সরকারের শরিয়তবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে। এমনকি এই ২০১৩ সালেও হেফাজতে ইসলাম দেশব্যাপি যে আন্দোলন শুরু করছে সেই আন্দোলনকেও কোনভাবেই সরকারবিরোধী বলা যাবে না। কারণ আমরা ইসলামের অবমাননার বিরুদ্ধে এবং নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলন করতেছি। আমাদের কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নাই। একজন মুসলমান হিশাবে ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, যারা ইসলাম ও রাসুলের অবমাননা করবে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সব মুসলমানের জন্য ফরজ।

নারীনীতি কিংবা শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর গত দুই তিন বছরে আপনারা কি করছেন? হযরত মুহাম্মদকে (সা:) নিয়া বানানো বিতর্কিত আমেরিকান ছবি নিয়া দেশে বিদেশে অনেক সমালোচনা হইছে। সেই বিষয়ে আপনাদের কোন বক্তব্য ছিল কি?

হেফাজতে ইসলাম গত তিন বছর চুপ করে বসেছিল বললে ভুল হবে। ইসলাম রক্ষায় আমরা সবসময় সোচ্চার ছিলাম এবং এখনো আছি। ফতোয়াবিরোধী হাইকোর্টের রায়, কোরআনবিরোধী নারী নীতিমালা এবং ধর্মহীন শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে মুফতি আমিনীসহ ওলামায়ে কেরামদের পক্ষ থেকে যে আন্দোলনের শুরু হইছিল, সেই আন্দোলনে আমাদের নেতা আল্লামা আহমদ শফীর নেতৃত্বে আমরা আমাদের ইমানি দায়িত্ব পালন করছি। আন্দোলনের কারণে আমাদের অসংখ্য নেতাকর্মী জেলজুলুমের স্বীকার হইছেন। তবে আমরা আন্দোলন থেকে সরে যাই নাই। আমাদের নেতা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। সেই সাক্ষাতের অল্প কয়দিন পরেই আমাদের নেতারা জেলহাজত থেকে সসম্মানে বের হয়ে আসেন। ইসলামের কল্যাণে আমরা সবসময় সরব ছিলাম এবং এখনো সরব আছি।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে আপনারা ব্লগ এবং ফেসবুকের কয়েকজন ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে আন্দোলন শুরু করলেন। অথচ এর আগেও বাংলাদেশে বহু মানুষ ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বলছে, ব্লগ-ফেসবুকে লিখছে। আজকে এই ইস্যুতে সরব হওয়ার কারণ কি?

নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে কিছু নাস্তিক নষ্ট ছেলেমেয়ে এবং তাদের দোসররা যখন রাসুলকে গালমন্দ করে আজেবাজে কথা ব্লগে লিখতেছে তখন হেফাজতে ইসলামসহ দেশের আলেমসমাজের নেতৃত্বে দেশব্যাপি আমরা গণআন্দোলন শুরু করছি। ব্লগার বাংলাদেশে আগেও ছিল তা আমরা জানি। সব ব্লগার নাস্তিক এই কথাও আমরা কখনো বলি না। কিন্তু যারা চিহ্নিত নাস্তিক এবং দেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংস করে ফেলতেছে আমরা তাদের এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামছি। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাইছি যে যত দ্রুত সম্ভব আইন করে এই মোনাফেকদের বিচার করা হোক।

কোন এক ইমানদার ব্যক্তি গত বছরের ২১ মার্চ ব্লগার আসিফ মহীউদ্দিন এবং রাজীব হায়দারের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার কারণে হাইকোর্টে একটা রিট করে। রিটের শুনানি শেষে ব্লগগুলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সরকারকে নির্দেশ দিছিল হাইকোর্ট। আমার জানা মতে এরপর তাদের দুইজনকে গ্রেফতারও করা হয়।

বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেখলাম ওলামা মাশায়েকরা হেফাজতে ইসলামকে জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট সংগঠন বলে দাবি করছে। এছাড়া আপনাদের সমাবেশ থেকেও সাঈদীর মুক্তির দাবিতে কয়েকজন নেতা বক্তব্য দিছেন।

জামায়াত-শিবিরের সাথে আমাদের সাংগঠনিক কোন সম্পর্ক দূরে থাক আমাদের সাথে জামায়াতের আকিদাগত দিক দিয়েও কোন মিল নাই। তেল আর পানিতে কখনো মিশ খায় না। জামায়াত-শিবিরের সাথে আমাদের ফারাক তেল আর পানির মত। তাছাড়া আমাদের নেতা আল্লামা আহমদ শফী সাহেব তিনটি বই লিখছেন জামায়াতের ভণ্ড রাজনীতি নিয়ে। বইগুলা তিনি প্রধানমন্ত্রীকেও উপহার দিছেন। একটা বিষয় মনে রাখবেন, হেফাজতে ইসলাম জামায়াতের মত ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন অথবা কোন গুপ্ত জঙ্গি সংগঠন নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমরা যা করেছি সরকার এবং প্রশাসনকে জানিয়েই করেছি। সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আমাদের বিভিন্ন ইসলামি সম্মেলনে নিয়মিত আসেন। তিনি ছাড়াও আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা — এই যেমন মহিউদ্দিন চৌধুরী — আল্লামা আহমদ শফী সাহেবের কাছে দোয়া নিতে অসেন।

আমি আবারো বলব হেফাজতে ইসলাম মানবতাবিরোধীদের বিচারের পক্ষে। আর ‘সাঈদীর মুক্তি চাই, নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি চাই’ শ্লোগান যারা দিছে তাদের সাথে হেফাজতে ইসলামের কোন সম্পর্ক নাই। আমি বিশ্বাস করি আমাদের কোন নেতা এধরনের বক্তব্য দেন নাই। আর যদি আমাদের কোন নেতা এই কথা বলেই থাকেন তবে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং কথাটার দায়ভার তিনি একাই বহন করবেন। এধরনের আহাম্মকি কথার দায়ভার অবশ্যই হেফাজতে ইসলাম নিবে না এবং কেউ এই নীতির বাইরে গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর মিছিলে যারা সাঈদীর মুক্তির দাবি নিয়ে শ্লোগান দিছে তারা কেউই হেফাজতে ইসলামের কর্মী না।

তবে এটা দুঃখজনক যে জনগণকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে এবং রাজনৈতিক স্বার্থে কিছু ওলামা যে ভাষায় আল্লামা আহমদ শফীকে ১৯৭১ সালে মুজাহিদ বাহিনীর নেতা বলে অপবাদ দিয়েছেন তাতে মনে হয় তাদের মতিভ্রম হয়েছে। মতিভ্রম ছাড়া কেউ এমন কথা বলতে পারে না। যদি তাদের কাছে কোন প্রমাণ থাকে তবে দয়া করে সেই প্রমাণ নিয়ে আসুক। আর আমি জোর গলায় বলতে চাই হেফাজতে ইসলামের সাথে জামায়াত কিংবা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের কোন প্রকার সাংগঠনিক যোগাযোগ নাই। আমরা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন সুষ্ঠু বিচার চাই।

তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন বিচার আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন হচ্ছে না?

আমি বিশ্বাস করি সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে। এই বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পেতে হবে, তবেই আমরা সাধুবাদ জানাব।

শাহবাগে চলমান আন্দোলনকে আপনারা কিভাবে দেখেন?

শাহবাগে যারা যায় তারা সবাই নাস্তিক এই কথা আমরা বলি না, যেমন আমরা কখনো দাবি করি নাই সব ব্লগারই নাস্তিক। অনেক জ্ঞানীগুণী মানুষও শাহবাগে গেছেন এবং যান। কিন্তু যারা এই আন্দোলন পরিচালনার সাথে যুক্ত তাদের নিয়ে আমাদের আপত্তি আছে। কারণ তারা স্বঘোষিত নাস্তিক, ইসলামের অবমাননাকারী। তারা রাতের বেলা শাহবাগে মেয়েছেলে নিয়ে বেলাল্লাপনা করে।

এই অভিযোগের কোন প্রমাণ কি আপনার কাছে আছে?

অবশ্যই প্রমাণ আছে। প্রমাণ ছাড়া আমরা কোন কথা বালি না। বিভিন্ন ব্লগে আমরা দেখেছি কি পরিমাণ বেলাল্লাপনা চলতেছে শাহবাগে।

আমরা দেখেছি কিছু ছবি ফটোশপে ম্যানিপুলেট করে জামায়াত-শিবির কর্মী সমর্থকরা তাদের ব্লগে প্রকাশ করছে। আপনারা সম্ভবত সেইসব ছবিই দেখছেন।

অবশ্যই না। আমরা জেনে শুনে তথ্য সংগ্রহ করি। এটা ভাবার কোন কারণ নাই যে জামায়াতের মিথ্যাচারের ব্যাপারে আমরা ওয়াকিবহাল নই। আমরা যেসব ছবি দেখেছি সেগুলো অবশ্যই কোন জামায়াতের সাইট থেকে নেয়া নয়। আর তাছাড়া শাহবাগে কি হচ্ছে এটা তো খালি চোখেই দেখা যায়। যেভাবে তারা সরকারবিরোধী এবং বিচারবিভাগের প্রতি অশ্লীল ভাষায় শ্লোগান দিচ্ছে এটা কোন সুস্থ মানুষ করতে পারে না।

আপনারা বার বার দাবি করেন যে জামায়াতের সাথে আপনাদের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু জামায়াত-শিবির আন্দোলন শুরু করার আগে তো আপনারা আন্দোলনে নামেন নাই।

আপনার কথাটা মানতে পারলাম না। এটা অপনাদের মিডিয়ার প্রচার যে আমরা জামায়াতের সাথে আন্দোলন করতেছি। সচেতন মানুষের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ আমরা আশা করি না।

আমি কিন্তু প্রশ্নের উত্তরটা পাইলাম না।

আপনার প্রশ্ন এড়ানোর তো কিছু নাই। জামায়াত আমাদের কেউ না, এসব জালিমদের সাথে আমাদের তুলনা করাও ভুল। আর এদের প্রতি আমাদের কোন আগ্রহও নাই। হেফাজতে ইসলাম ইসলামের সেবায় সবসময় সোচ্চার ছিল, থাকবে। আমরা একমাত্র আল্লাহ ব্যতিত আর কারও গোলাম নই। যেসব মিডিয়া ইসলাম চায় না, ইসলামের ভাল চায় না এটা তাদেরই প্রচার, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কি ব্যবস্থা?

এটা একজন মানুষের সিদ্ধান্ত না, আমরা হেফাজতে ইসলামের দলীয় মিটিংয়ে এই বিষয়ে সিধান্ত নিব।

আপনারা বললেন মিডিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন, দাবি তুলতেছেন শাহবাগের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিচারের বন্দোবস্ত করার। কিন্তু কুরআনে সুরা মুজাম্মিলের ১০ নম্বর আয়াত আর সুরা নিসার ৬৮ নম্বর আয়াতে বলা আছে সবুর করতে…

শোনেন পবিত্র কুরআনে কি লেখা আছে আমরা জানি। আমরা কুরআন নিয়ে গবেষণা করি এবং আমরা জানি কুরআনে আল্লাহতালা কি নির্দেশ দিছেন। একটা কথা মনে রাখবেন অল্প পড়ে বেশি জানার ভাব করাটাও কঠিন গুনাহর কাজ।

কিন্তু আপনারা যেভাবে আন্দোলন করতেছেন তাতে করে কি কুরআনের নির্দেশ ঠিকমত মানা হচ্ছে?

[এই পর্যায়ে সংযোগ কেটে দেন মঈনুদ্দিন রুহি।]

শাহবাগে বোমা বিস্ফোরণ, নারায়ণগঞ্জে খুন – অনন্ত ইউসুফ

পুলিশের কড়া পাহারা ডিঙ্গিয়ে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তকারীরা। শুক্রবার বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় র‌্যাব-৩ এর ডিএডি জালাল উদ্দিন আহত হয়েছেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, পিজি হাসপাতালের ভেতর থেকে ওই বোমাগুলো পূবালী ব্যাংক এবং জাতীয় জাদুঘরের মধ্যবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করতে তিনি দেখেছেন।

প্রায় দুই ফুট ব্যবধানে পরপর দুটি বোমার বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তারপরও মঞ্চ বা সমাবেশস্থল ত্যাগ করেননি ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার জনতা। মিছিলে- শ্লোগানে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন নানা শ্রেণি পেশার মানুষ।

গণজাগরণ মঞ্চের একজন কর্মী জানান শুক্রবার বিকেলে একাত্তরে নির্যাতিত নারীদের সম্মানে আয়োজিত প্রজন্ম চত্বরের এই সমাবেশে নারী ও শিশুর সংখ্যাই ছিল বেশি। নারী সমাবেশে এই হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন যত বড় হামলাই আসুক তারা প্রজন্ম চত্বরে সমাবেশ ও কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে এই প্রথম হামলা হল।

একই দিন নারায়ণগঞ্জ গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক সংস্কৃতিকর্মী রাফিউর রাব্বির ছেলে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকির (১৭) মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বুধবার থেকে নিখোঁজ থাকার পর শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে তার লাশ পাওয়া যায়। কিশোর ত্বকি সম্প্রতি এ লেবেল পাশ করেছে।