Category Archives: সর্বজন: বুলেটিন ৩৩

সম্পাদকীয়

ইনসাফের দাবি দাবাইয়া রাখা যাইবে না

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হইবার পর প্রথমে তাহাকে এসলামবিরোধী আন্দোলন এবং এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগের আন্দোলন হিসেবে কলংকিত করিবার চেষ্টা চলিতেছে। এর দায় গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন পরিচালনাকারীদের উপরও বর্তায়। আওয়ামী লীগের সাথে তাদের অতিরিক্ত সম্পৃক্ততায় আন্দোলনের ক্ষতি বৈ উপকার হয়নি। বেড়ায় ক্ষেত খাইয়া লইতেছে।

যাহারা ‘গৃহযুদ্ধে’র হুমকি দিয়াছিলেন তাহারা অনেকাংশে সফল হইয়াছেন। এখন বিএনপি-আওয়ামী বিরোধ আবার মাঠে হাজির হইয়াছে। আওয়ামী লীগ ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটি’র নামে আর বিএনপি ‘জননিরাপত্তা কমিটি’ লইয়া রণসজ্জায় নামিবার প্রস্তুতি লইতাছে। অতীত অভিজ্ঞতা হইতে বলা যায়, ইহাদের ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ’ বা ‘জননিরাপত্তা’ সাধারণ জনগণের নিরাপত্তাকেই আরও বিঘ্ন করিবে। হয়ত ইহার অতল গহ্বরেই যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিটি হারাইয়া যাবে। বাংলাদেশে সকল সমস্যাকে আড়াল করিবার জন্য বিএনপি-আওয়ামী লীগের বিরোধকে সমস্যার মূল গোড়া হিসেবে দেখাইবার ‘গণতান্ত্রিক’ রীতি চালু আছে। গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, রাষ্ট্রদূত ও ব্যবসায়ীকুল এরূপেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে লালন করিতে চাহে। তাহারা সকলেই এখন দুই পক্ষকে ঠাণ্ডা করিতে ব্যস্ত। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার লইয়া আমাদের আশঙ্কা অমূলক নয়। ইহার ফলে সর্বৈব লাভবান হইবে জামায়াত ইসলাম। তাহাদের হিসাব নিকাশ অনুযায়ী যদি এরই ধারাবাহিকতায় সামরিক শাসন আসে তবে তো তাদের পোয়াবারো।

চট্টগ্রামে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশ হইতে পারিল না। কেন? বলিবেন হেফাজতে ইসলাম বাধা দান করিবে। কিন্তু ইহা প্রশ্নের উত্তর নহে। চট্টগ্রামে কি য্দ্ধুাপরাধীদের বিচার চাহে এমন লোক নাই? অবশ্যই আছে। তবে তাহারা কেন সম্পৃক্ত হইতে পারিতেছেনা ইহার মধ্যেই যথার্থ উত্তরটি পাওয়া যাবে।

আরও একটি বিষয়, হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে অনেক কওমি মাদ্রাসার ছাত্র দেখিলাম। তাহারা এসলাম রক্ষার দাবি নিয়া আসিয়াছে। তাহারা জীবন দিতেও পিছপা হবে না। রাষ্ট্র ও এসলাম ব্যবসায়ীদের কাছে তাহাদের জীবন এতটাই সস্তা! রাষ্ট্র তাহাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করে না, মর্যাদার সাথে খাওয়া-পড়া-জীবন ধারণের সুযোগ দেয় না। আবার তাহাদের অভিভাবকরূপী এসলাম ব্যবসায়ীরাও তাহাদের জীবন দিতে বলে। আসলে তাহারা আমাদের সাধারণ জনগণের বেহাল দশারই করুণতম রূপ।

আমরা একাত্তরের গণহত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচার চাহিতে আসিয়াছি। এ আন্দোলন চলাকালীন আরও অনেক হত্যা ও হতাহতের ঘটনা ঘটিতেছে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর বিভৎস আক্রমণ চলিতেছে। আমরা অবিলম্বে এসব ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাহিতেছি। আন্দোলনের শুরুতে সাগর রুনির পরিবার সহ অনেকেই বিভিন্ন হত্যাকান্ডের বিচার দাবি করিয়া আন্দোলনের সাথে একাত্ম হইয়াছিলেন। তাহারা ভরসা রাখিয়া ছিলেন এ আন্দোনের মধ্য দিয়া হয়তো ইনসাফের জয়যাত্রা হইবে। প্রতিটি গণআন্দোলনে এই ঘটনাই ঘটে। ইহাই তো গণআন্দোলনের শক্তি। তাই জনগণের ইনসাফের দাবিকে আওয়ামী-বিএনপি বিরোধের ছলে আড়াল করিবার অপচেষ্টাকে নস্যাৎ করিতে হইবে। আমাদের সংগ্রাম চলবেই ।

সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ – মুক্তি মল্লিক

আল-আমিন আবু আহমেদ আশরাফ

© আল-আমিন আবু আহমেদ আশরাফ

পাক ভারতের খ্যাতিমান দার্শনিক একবাল আহমদ। অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিহার প্রদেশে তাঁর জন্ম। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অযৌক্তিক পরিণামে ১৯৪৭ এ সমগ্র ভারতসহ বিহার প্রদেশের মানুষেরও নিয়তি নির্ধারিত হয়ে যায়। বলা বাহুল্য বিহারের মুসলমানরাও পাইকারী হারে দেশ ভাগের কুফল ভোগ করে। সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায় যখন বিহার ত্যাগ করে পাকিস্তানে যাওয়া নিয়তি হিসাবে মেনে নিল তখন তরুণ একবাল আহমদও পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে বিহার ত্যাগের সংকল্প করেন। সাথে তাঁর সঙ্গী হন আপন বড় ভাই।

কিন্তু সমস্যা শুরু হয় একবাল আহমদের মাকে নিয়ে। একবাল ও তাঁর বড় ভাই যখন তাঁদের মাকে বিহার ত্যাগ ও পাকিস্তানে গমনের আমন্ত্রণ জানান তখন তাঁদের মা বাধ সাধেন। তিনি  বলেন বিহারে আমার স্বামীর কবর। আমি এখানেই থাকব। তোমরা যদি মনে কর মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্রে যাওয়া দরকার তো তোমরা যাও। কিন্তু মনে রেখ এপথে তোমরা জায়নবাদকেই তোমাদের পাথেয় হিসাবে গ্রহন করেছ। বৃদ্ধ একবাল আহমদের মা বিহারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একবাল আহমদ তাঁর মায়ের এই উক্তিটি সারা জীবন মনে রাখেন।

অবিভক্ত বাংলার মশহুর বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। পূর্ব বঙ্গের ঢাকা জেলায় তাঁর জন্ম। সকলেই জানেন তিনি তাঁর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কিংবা অধ্যাপনার জীবন দিয়েই বিখ্যাত নন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জন্যও তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন। কোন বনেদি বর্ণ হিন্দু পরিবারে তাঁর জন্ম হয় নি। বরং হিন্দু সমাজের নীচু গোত্রের মেধাবী সন্তান ছিলেন এই মেঘনাদ সাহা।

 চল্লিশের দশকের শেষাশেষি যখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটাপন্ন তখন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ। সাম্প্রদায়িক হানাহানি তিনি মেনে নিতে পারেন নি। বরং তিনি এর একটি বিহিত করতে চাইলেন। বাংলার বর্ণ হিন্দু সমাজ ক্রমেই বাংলা ভাগের দাবি তোলে। ভারতের কেন্দ্রীয় কংগ্রেস তাতে নিরব সমর্থন দেয়। মেঘনাদ সাহা নিজে বর্ণ হিন্দু নন। কিন্তু সমগ্র দেশের কল্যাণের খাতিরে তিনি বর্ণ হিন্দুদের বাংলা ভাগ প্রস্তাবকেই সমর্থন করেন। তিনি হয়ত ভেবেছিলেন বাংলা ভাগের মধ্যদিয়েই আনন্দধারা এ ভুবনে কিছুটা বইবে।

অতঃপর ভারত-পাকিস্তান তাদের স্বাধীনতা অর্জন করল। কিন্তু সাম্প্রদায়িক সমস্যার কোন সমাধান হয় নাই। পূর্ব বঙ্গের লক্ষ লক্ষ নিঃস্ব বাঙ্গাল কিংবা লাখ লাখ মুহাজিরের পাকিস্তানের উদ্দেশ্যে রক্তাক্ত দেশ ত্যাগ সংবেদনশীল মেঘনাদ সাহার হৃদয় ভেঙ্গে দেন। তিনি উপলব্ধি করলেন বর্ণ হিন্দুদের নিজ স্বার্থের জন্য বাংলা ভাগ দেশের ধ্বংসই ডেকে এনেছে। বাংলা ভাগ কিংবা ভারত ভাগ দেশের আপামর জনসাধারণের কোন কল্যাণই বয়ে আনে নি। অতঃপর বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা মার্ক্সবাদের শরণাপন্ন হলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে গঙ্গার জল অনেক দূর বয়ে গেছে। পদ্মার বুকে ফারাক্কা বাঁধের সকল আঞ্জাম শুরু হয়েছে। এক সময়ের বর্ণ হিন্দু বন্ধুরা মার্ক্সবাদী মেঘনাদকে ত্যাগ করলেন। নিপীড়িত, নিঃস্ব পূর্ব বঙ্গের রিফুজিদের পুনর্বাসনের আন্দোলন শুরু করলে এককালের  মেঘনাদ সাহার বন্ধু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জবাহরলাল নেহেরু পর্যন্ত তাঁকে অপদস্ত করতে ছাড়েন নি। নেহেরু সেই দিন বলেছিলেন মেঘনাদ সাহা সেকেলে হয়ে পড়েছেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে তাঁর কোন আগ্রহ নেই।

উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবৃক্ষ অনেক রথী-মহারথীদের ধ্বংস করে দিয়েছে। মেঘনাদ সাহা তাঁর বাংলা বিভাজন কালের ভুল সিদ্ধান্ত ও সাম্প্রদায়িক পথ পরিহার করে মার্ক্সবাদী হলেও ভারতের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে কোন দিশা খুঁজে পান নি। কারণ গাছের গোড়া কেটে শত পানি ঢাললেও গাছের কোন লাভ নেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংস, গুজরাট দাঙ্গা আধুনিক ভারতের বাতিঘর হয়ে আছে।

আজ দেশে যুদ্ধপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের জন্য যখন আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছে তখনই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি এই আন্দোলনের ক্ষতি সাধনের জন্য মাঠে নেমে পড়েছে। তাদের এই কাজে সহায়তা করছে কিছু বুদ্ধিজীবী।

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠি স্বাধীনতার পর থেকেই স্বাধীনদেশের জনগণের আশা আকাক্সক্ষার কানাকড়ি মূল্যও দেন নাই। সেই কারণে ক্ষমতার যতই হাত বদল হোক জনগণের তাতে কোন লাভ নেই। শাসকগোষ্ঠি তাই জনগণকে ভয় করে। এবং বুলেটের মাধ্যমে সেই ভয়কে প্রশমিত করে। বিগত কয়েক দিনে দেশে যে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে তাতে জনগণের শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে অনাস্থারই প্রমাণ দেয়। তবে এই অনাস্থা যুদ্ধপরাধীদের বিচার বন্ধের বিরুদ্ধে নয়। বরং দুর্নীতিপরায়ণ, ক্ষতালিপ্সু শাসকগোষ্ঠির অত্যাচারের বিরুদ্ধে। এই সুযোগে যুদ্ধাপরাধী সমর্থক কিছু বুদ্ধিজীবী এই ঘটনার প্রেক্ষিতে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিনিধি হিসাবে প্রমাণের জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছেন। তারা এ জন্য মার্ক্সবাদের দোহাই পাড়তে কসুর করছেন না। প্রকৃতপক্ষে তাদের এই ব্যাখ্যার মূল উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে আড়ার করার অপচেষ্টা মাত্র। যে কোনক্রমে একটি এসলামী রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ভারতবর্ষে কোথাও শান্তি স্থাপনের নজির দিতে পারে নাই।

এই বুদ্ধিজীবীদের তত্ত্বমতে যদি বাংলাদেশে একটি এসলামী রাষ্ট্রও কায়েম হয় তবে তাকে একবাল আহমদের মায়ের মত বলতে হবে জায়নবাদীদের এসলামী  রাষ্ট্র। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন তাই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

‘রাষ্ট্র এখন নিজেই বিচারের মুখোমুখি’ – সলিমুল্লাহ খান

(২য় কিস্তি)   (শেষ কিস্তি)

[এই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রতি দৈনিক বণিক বার্তার পক্ষ হইতে গ্রহণ করা হইয়াছিল। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটির প্রথম কিস্তি আজ ছাপানো হইল  — সম্পাদক।]

বণিক বার্তা: একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সৃষ্ট সংকটকে কিভাবে দেখছেন?

সলিমুল্লাহ খান: এখানে প্রেক্ষাপট দুটি। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র হিসেবে জন্ম নিয়েছে একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ২৩ বছর ধরে এখানে সংগ্রাম হয়েছে। সেটাকে আমরা বলি স্বাধীনতা বা স্বাধিকার আন্দোলন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ১৯৭৭ সালে লেখা  বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা শীর্ষক প্রবন্ধে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, বাংলাদেশে একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, সেটা ভালো বা মন্দের জন্য হোক। হতে পারে এর ফল অন্যে আত্মসাৎ করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। একে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দুই, মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পক্ষে একমত হয়েছিল। ঐতিহাসিক এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বাকি ১ শতাংশ লোক বাংলাদেশে ছিল যারা পাকিস্তান রাষ্ট্র চেয়েছিল। তাতেও কোনো অপরাধ হতো না, যদি না তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তা করত। এটাও একটা ঘটনা।

দুর্ভাগ্য, গণহত্যায় অংশ নেয়া পাকিস্তানি সেনারা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কারণ আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল। তাদের বিচার করা যাবে না, এমন কোনো কথা চুক্তিতে ছিল না। তারা আত্মসমর্পণ করে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের কাছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বন্দিরা প্রথমে ভারতে যায় এবং সেখান থেকে তাদের পাকিস্তানে পাঠানো হয়। স্বীকার করতে হবে, তাদের বিচার হয়নি।

কিন্তু বাংলাদেশের যেসব রাজনৈতিক দল মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ আরো ছোট ছোট দল পাকিস্তান আর্মিকে সহায়তা করেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী খুব কম লোকই নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজাকার বা দালালদের গণহারে পিটুনি দেয়া হয়নি। হয়েছে বলে যে কথা প্রচারিত আছে তা সঠিক নয় ।

আরো কয়েকটি কথা বাজারে প্রচলিত আছে। যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে ভয়াবহ (যেমন আল বদরের কিছু লোক) তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। গোলাম আজমও দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন, পরে ফেরত এসেছেন। সংক্ষেপে বললে, জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ লোক যারা পাকবাহিনীকে যুদ্ধে সহায়তা করেছেন, তারা বিচারের মুখোমুখী হননি। ফলে আমরা বলতে পারি প্রথম প্রেক্ষাপট — মুক্তিযুদ্ধ।

দ্বিতীয় প্রেক্ষাপট হলো বর্তমান মহাজোট সরকার তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন। এটি পূরণ করতে বা অন্য কোনো কারণেই হোক তারা ট্রাইব্যুনাল তৈরি করেছেন। এর বিরুদ্ধে কিছু অপপ্রচার চলছে। আমি বলবো, যারা এসব করছে তারা জামায়াতের সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে তারা চিঠি লিখছেন, বলেছেন এ ট্রাইব্যুনাল বৈধ নয়।

আমরা মনে করি জামায়াতের দাবি অসার। বৈধ বলতে আমরা আইনের পরিভাষায় যা বুঝি এটাও সেরকম বৈধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের আন্তর্জাতিক মান বলে একটা কথা আমরা বাজারে শুনি। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশি ট্রাইব্যুনাল। কথাটা হলো, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল; ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর ক্রাইমস, তা নয়। ইন্টারন্যাশনাল শব্দটা এখানে ক্রাইমের বিশেষণ। এক দেশে যুদ্ধের সময় অন্য দেশের নাগরিক যে অপরাধ করেÑ এ জাতীয় অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ বলে, এ ট্রাইব্যুনাল তার বিচার করছে না। এ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশি বিচারকদের  দ্বারা গঠিত। এর বিষয়বস্তু কিন্তু সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। ইন্টারন্যাশনাল শব্দটি একটি ভদ্রশব্দ। আর ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল জনবোধ্য শব্দ । আর আমরা মুখে মুখে জনবোধ্য কথাটাই বলি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশে যে অপরাধ হয়েছিল তা বিচারের জন্য এ দেশের একটি বৈধ সরকার এটি গঠন করেছে।

এখন যে কোন ট্রাইব্যুনালেরই সমালোচনা করা যাবে। যাবে না কেন? নুরেমবার্গ, টোকিও ট্রাইব্যুনালেরও সমালোচনা করা যাবে। সমালোচনা এক কথা নাকচ বা নিকুচি করা সম্পূর্ণ আর। বাংলাদেশের  ট্রাইব্যুনালকে নাকচ করে দেয়ার জন্য একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। এই হচ্ছে বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপট। এ ট্রাইব্যুনাল বৈধ, এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের উদ্যোগে গঠিত। আর এতে বাংলাদেশের জনসাধারণের সমর্থন আছে। যদি না থাকতো, তাহলে এ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার নির্বাচনে জিততে পারতো না। বিচার প্রক্রিয়ায় ক্রুটি থাকলে তা সংশোধনে উচ্চ আদালতে আপিলের ব্যবস্থাও তো আছে।

বণিক বার্তা: এ প্রেক্ষাপটে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হলো কেন?

সলিমুল্লাহ খান: যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে নাকচ (বা বানচাল) এবং এর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য যে প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে সেটা শুধু কাগজে কলমে নয়, বাস্তবেও। যা ইস্যু নয় তাকে ইস্যু করছে । যা ইস্যু নয় সেটাকে ইস্যু না করলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে চ্যালেঞ্জ করা যাচ্ছে না। অতএব ইস্যু বদলানোর জন্য তারা এটা করছে। উদাহরণস্বরূপ: এমন কোনো দেশ নেই যেখানে দুচারজন নাস্তিক নেই। সেটা ইহুদি, খ্রিষ্টান এমনকি হিন্দুদের মধ্যেও রয়েছে। শিবনারায়ণ রায়ের মতো লোক নিত্য বলে গেছেন, আমি নাস্তিক, আমি নাস্তিক। লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও হামেশা বলতেন, আমি নাস্তিক। কিন্তু শিবনারায়ণ রায় বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিচার তো ভারত করেনি। মুসলিম সমাজেও এমন লোক থাকতে পারে।

কে নাস্তিক আর কে নয় এটা এখানে আন্দোলনের ইস্যু হয়ে গেল। ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁহাকে, তাঁহার পবিত্র নামের, নিন্দা করে এয়ুরোপে নিত্যদিন আন্দোলন চলছে। এর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজ বিক্ষুব্ধ। বাংলাদেশেও এধরনের কোনো কোনো তুচ্ছ লোক থাকতে পারে। তবে এখানকার ছাপা কোনো পত্রিকায় এ ধরনের কোনো কার্টুন ছাপানো যাবে না। এমন কোনো সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা যাবে না। এখন নতুন যে ইন্টারনেট মিডিয়া এসেছে, যার ব্যবহার সর্বস্তরের মানুষ ভালো করে জানেও না, তার সুযোগ নিয়ে আমেরিকানরা ইউটিউবে একটি খারাপ ছবি তুলে দিয়েছে। এজন্য আমেরিকাতেও সে লোকের বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু কিছু লোক এমন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচারে যখন ট্রাইব্যুনাল বসলো তখন কেন এ ইস্যুগুলোকে বড় করে সামনে আনা হচ্ছে। এটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হয়তো এ বিচারকে দুর্বল করার জন্য কতগুলো লোক একে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। আরেক দল এসে সেটাকে বড় করে বলছে নিন্দাকারীদের বিচার করো। উদ্দেশ্য কি? মুসলমানদের ধর্মীয় ঐক্যের মূল জায়গাটি হলো নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)। সে জায়গায় আঘাতের উদ্দেশ্য পরিস্কার। আপনাকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করবো, আঘাতটা এ মুহূর্তে কেন? এ আঘাত বা তার বিচারের উদ্দেশ্যই হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুকে গৌণ ও সন্দেহপূর্ণ করে তোলা। হিন্দুদের ওপর আক্রমণের কারণ একই।

২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ প্রথমে করেছে ইকবাল হল আর জগন্নাথ হলে । বেশি করেছে। অন্য হলে যে আক্রমণ করেনি, সে কথা আমি বলছি না। ইকবাল হলে একজনও প্রাণে বাঁচেনি। সলিমুল্লাহ হলেও আক্রমণ হয়েছে। তবে জগন্নাথ হলকে তারা একেবারে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। এতেই বোঝা যায়, হিন্দুদের হিন্দু বলে পয়েন্ট আউট করা ১৯৪৮ সালের পর থেকে পাকিস্তান সরকারের বৈশিষ্ট্য ছিল। সেটারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এখন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলো যে ধরনের অপরাধের কারণে সে ধরনের অপরাধই তো পুনরায় সংঘটিত হচ্ছে।

কয়েকদিন আগে বেগম খালেদা জিয়া একটি বিবৃতি দিলেন। খুব দুঃখ লাগলো, তিনি বললেন — আমরা খবর পেয়েছি সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। কিন্তু আক্রমণটা কারা করছে সে ব্যাপারে তিনি কোনো ইঙ্গিত দিলেন না। কবি ফরহাদ মজহারও বেগম জিয়ার মতো অভিযোগ করলেন দেশে গণহত্যা চলছে। আর তিনিও কোনোভাবেই উল্লেখ করলেন না সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের বিষয়টি। চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত তৃতীয় মাত্রায়ও তাঁকে দেখলাম। কয়েকটি নিবন্ধও লিখেছেন তিনি। তিনি ক্রমশ ভোল পাল্টাতে পারেন। তিনি স্পষ্ট পারেন।

মজহার লিখেছেন, এ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দিক থেকে সব পক্ষের কাছে কিছু দাবি তোলা খুব জরুরি। যাতে কয়েকটি আশু ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে জাতীয় সম্মতি তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাতে প্রথমেই থাকবে যে সব নাগরিকের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং উপাসনালয় ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেকে বাড়িঘর হারিয়ে সর্বহারা হয়ে পথে বসেছে, তাদের আর্থিক সহযোগিতা দেয়া। ২. যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন তারা যে পক্ষেরই হোক তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। ৩. গণহত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর নীতিমালা গ্রহণ করা। ৪. পুলিশকে জাতিসংঘের বিধান মেনে চলতে বাধ্য করা। তিনি কিন্তু কোথাও একবারও হিন্দু সম্প্রদায়ের নাম নেননি। মাত্র লিখেছেন, ‘যে সব নাগরিকদের’। এমন ভান করছেন যেন সব নাগরিকের ওপর হামলা হয়েছে।

অথচ এবার সংঘবদ্ধ কমিউনিটি হিসেবে হিন্দুদের বাড়িতে সিস্টেমেটিক্যালি আক্রমণ হয়েছে । অনেক সময় হয়তো বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যেত মুসলমানদের বাড়িতেও আক্রমণ হয়েছে। এযাত্রা ব্যাপক আকারে হিন্দুদের মন্দিরে-বাড়িতে আক্রমণ হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছিল রামুতে। তখন বৌদ্ধরা কি অপরাধ করেছিল? আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি রামুর ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তারা ছিল অনেক বেশি কৌশলী। কিন্তু এবারেরটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়ে গেল রামুর ঘটনাও কারা ঘটিয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী ঘটিয়েছিল। ওখানে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননাকে কেন্দ্র করে একজন বাঙ্গালি বৌদ্ধকে দায়ী করে ওই আক্রমণ চালানো হয়েছে। সেটা হয়েছিল পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রজেক্টের মতো। এখন তারা সারা দেশে এটি করল। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার নিয়ে যে সহিংসতা তৈরি হয়েছে সেটাকে বাদ দিয়ে রামুর ঘটনা কিছু বোঝা যাবে না।

ইন্টারনেটে নবী করিমের (সঃ) নামে অবমাননাকর প্রচার কেন? হিন্দুদের বাড়িতে কেন আক্রমণ হচ্ছে? একা একা কোনটাই বোঝা যাবে না। তিনটি ঘটনাকে এক জায়গায় দাঁড় করালে দেখা যাবে সবগুলোরি উদ্দেশ্য একটাই — যুদ্ধাপরাধের বিচারটা থামিয়ে দেয়া।

(চলবে)
(২য় কিস্তি)   (শেষ কিস্তি)

ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা লইয়া ‘লাল’ ব্যান্ডদলের গান

ব্যান্ডদল ‘লাল’

ব্যান্ডদল ‘লাল’

ভূমিকা ও তর্জমা: নাসিফ আমিন

পাকিস্তানের বামপন্থী ব্যান্ডদল ‘লাল’। বিখ্যাত উর্দু কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, হাবিব জালিবসহ বহু বিপ্লবীর কবিতাকে সঙ্গীত হিশাবে উপস্থাপন করিবার মধ্য দিয়া এই দল বেশ সুখ্যাতি পাইয়াছে। গত বছর দিল্লির জবাহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এক দারুণ কনসার্ট করিয়াছিল এই ব্যান্ডদল। তৈমুর রহমানের নেতৃত্বে এই দল গঠিত। তিনি কম্যুনিস্ট মজদুর কিষাণ পার্টির মহাসচিবও বটেন।

তো এই ব্যান্ডদল বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলনের সহিত একাত্মতা ঘোষণা করিয়া নূতন গান বান্ধিয়াছে। গানখানির কথা কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের ‘সিনাই উপত্যকা’ (১৯৭১) কবিতার বহি হইতে লওয়া। তিনি এই কবিতাখানি লিখিয়াছিলেন ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ। সেইদিন বাংলাদেশের মানুষ সাফ সাফ জানাইয়া দিয়াছিল তাহারা আর পাকিস্তানের সাথে নাই। সেই দিন — মানে ২৩ মার্চ — ছিল পাকিস্তান দিবস। ঐ দিবস তৎকালীন পাকিস্তানে বহুদিন ধরিয়া পালিত হইয়া আসিতেছিল। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ পাকিস্তান আন্দোলনের ডাক দিয়াছিল। ইহার স্মরণেই দিনটির উদযাপন। ১৯৭১ সালের সেইদিন এই দেশের মানুষ — মানে তদকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালিরা — তাহাদের সরকারি বেসরকারি ভবনের ছাদে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ইহা ছিল বাংলাদেশের জনগণের চূড়ান্ত প্রতিবাদ। সেদিন কেবলমাত্র রাষ্ট্রপতির বাসভবন আর ঢাকা সেনানিবাসের সামনে পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়াছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ নিজ বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করিতেছেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ নিজ বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করিতেছেন

২৩ মার্চ ১৯৭১ তারিখে ফয়েজের লেখা কবিতাটিকে গান করিয়াছে ‘লাল’। দলের হইয়া তৈমুর রহমান ভূমিকা সহকারে গানখানি ফেসবুকে পেশ করিয়াছেন। ভূমিকাটি নিচে দেওয়া হইল।

‘লাল’ কখনোই শুদ্ধ জনপ্রিয়তার জন্য কাজ করে নাই; বরং নির্যাতিত শ্রেণির স্বপক্ষে দাবি তুলিয়াছে। আমাদের নূতন কাজটি ‘লাল’ এবং ‘এই তো সময়’ নামা বাঙালি কমরেডদের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত। ইহার ভিডিওচিত্রটি বাঙালি কমরেডদের বানান। বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলনের সহিত একাত্মতা পোষণ করা ছাড়াও আমরা আমাদের ইতিহাসের সেই না বলা অধ্যায়ের কথা বলিতে চাহি যাহা ঐতিহাসিক ভুল স্বীকার করিয়া লইতে অস্বীকৃতি জানায়।

অনেকেই ইহাকে বিরক্তিকর ভাবিতে পারেন, বাকিরা দুর্ব্যবহার ও দোষারোপেও আমাদের ধুইয়া দিতে পারেন। আমরা এই সকল কিছুই মোকাবিলা করিব, শক্তির বিরুদ্ধে সত্য বলিব, এবং কোনরূপ ডরভয় ছাড়াই নির্যাতিত মানবতার যে মতাদর্শ তাহার মুখপাত্র হইব।

এই সমস্ত ঘটনাবলিতে আমাদের কিছুই করিবার নাই ভাবিয়া বসিয়া থাকিলে কোন মঙ্গলই আসিবে না। আমরা প্রত্যেকেই এই অতীতের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত এবং এ ব্যাপারে আমাদের ভূমিকা কিংবা কর্তব্য আমরা বিলকুল এড়াইতে পারিব না। যেমন, এই আমি, তৈমুর রহমান হইলাম প্রধান বিচারপতি শেখ আবদুল রহমানের নাতি যিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (যে মামলার কখনো মীমাংসা হয় নাই) হইতে বাহির করিয়া আনিবার দায়ে চাকরি হইতে অবসরের আগেই চ্যুত হইয়াছিলেন। সেই সময়টাতে আমার জন্ম। তাছাড়াও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলিবার ঐতিহাসিক কর্তব্যটা আমি আমার মধ্যে দারুণভাবে অনুভব করি। তেমনিভাবে, আমি আশা করিব আমার পাকিস্তানি জ্ঞাতিভাই, যাহারা আব্বাস টাউন কিংবা বাদামি বাগ, যে যেখানেই এই গোড়া শক্তির দ্বারা স্বভূমে অত্যাচারিত হইয়া আসিতেছেন তাহারা অতীতের এইসব ঘটনাবলি স্বীকার করিয়া লহিবেন। যদি আমরা শক্তির বিরুদ্ধে সত্য উচ্চারণ না করি এবং যদি আমরা ন্যায়বিচারের পক্ষে না দাঁড়াই তবে সেই সমস্ত বিষয় ফের ঘটিবে।

এ যাত্রায় উক্ত গানে ফয়েজের কবিতাটির শেষ স্তবক দিয়াই মুলতবি টানি। ইহা লিখিত হইয়াছিল ২৩ মার্চ ১৯৭১; বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে। তিনি তখন বলিয়াছিলেন এবং এখনো ইহা অবশ্যই বলা উচিত:

‘…রোজ কেয়ামত মাথায় করিয়া এই যে দিব্যি বাঁচিয়া থাকা
রোজ শাস্তির বিধানের এখনো তো পাও নাই কোন দেখা।’

(ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা: কি যে হাল হায় বুঝাইতে পারি নাই)

কি যে হাল হায় বুঝাইতে পারি নাই – ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

ফয়েজ আহমদ ফয়েজ

(নাসিফ আমিন কৃত ভূমিকা)

কি যে হাল হায় বুঝাইতে পারি নাই
পারি নাই আজও শান্ত করিতে হৃদয়

ফের কাবিন হইতে পারে নাই সেই সে ওয়াদা
কথাগুলোও ফের জবান হইতে পারিয়াছে আর কই

যাহার নামে ফের জারি হইয়াছে পরোয়ানা
হুকুম পায় নাই সে হাজির করিতে সাক্ষীসবুতনামা
ফের মোমবাতিগুলোও আর রাত্রি হইয়া নিভিতে পারে নাই

ফের মদের মজা মারিবার আগে মোর সেই দারুণ ধরফরানি
ফের সেই মজমা যাহা এখনো মদের আড্ডা হতে পারেনি

আবারও তলব করিছে তোমারে অস্থির সেই চোখে
দেখা না হইল আবারও আলিঙ্গনের সেই রাতে

আখেরি দরজা কখন ফের বন্ধ হইল জানি না অইখানে
এইখানেও মোনাজাত খতম হইয়া গেল কবুল না হয়ে

ফয়েজ, রোজ কেয়ামত মাথায় করিয়া এই যে দিব্যি বাঁচিয়া থাকা
রোজ শাস্তির বিধানের এখনো তো পাও নাই কোন দেখা।’

তর্জমা: নাসিফ আমিন