Category Archives: সর্বজন: বুলেটিন ২৪

সম্পাদকীয়

লাশের রাজনীতি

সারাদেশে উদ্ভুত সহিংস পরিস্থিতি ও প্রাণহানির ঘটনাকে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি-জামায়াত জোটের মধ্যে হানাহানির পর্যায়ে ফেলিবার সব প্রচেষ্টা জারি আছে। ঘটনাকে এই জায়গায় লইয়া যাইতে পারিলে অনেকের লাভ আছে। কেউ কেউ বলিতেছেন গত কয়েকদিনের প্রাণহানির ঘটনা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত যে পরিমাণ মানুষ পুলিশের গুলিতে মারা গিয়াছিল সেই সংখ্যাকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। বস্তুত চল্লিশজন মরিল কি পঞ্চাশজন মরিল তাই নিয়া তর্ক না করিয়া বলা যায় যদি একজন মানুষও পুলিশের গুলিতে মৃত্যুবরণ করে তাও অনেক। আর মারা পড়িতেছে কাহারা — যাহারা সমাজের নীচু তলার মানুষ তাহারাই।

আমাদের বুঝিতে হইবে, উপনিবেশিক ব্যবস্থা যে সহিংস অবস্থা সমাজে জারি রাখে জাতীয় মুক্তি সম্পন্ন না হইলে, আপাত স্বাধীন দেশে অর্থাৎ নয়া উপনিবেশিত দেশেও পূর্ববৎ বহাল থাকে। গত ৪২ বছরে এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তাহা প্রমাণ হইতেছে। শাসক শ্রেণির অন্তর্নিহিত দূর্বলতা ও সামাজিক কাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তন না হওয়াতে এই অবস্থা হয়।

জামায়াত শিবির যাহাদের সাথে লইয়া রায় বাতিলের জন্য সহিংসতা করিতেছে — দলটি কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করে না। কস্মিনকালেও জামায়াত তা করিবে না। তাই এই আন্দোলনের মধ্যবিত্ত ও নিম্নœমধ্যবিত্ত শ্রেণি হইতে আগত নেতৃত্ব যেন উপরোল্লিখিত বিষয়গুলি মনে রাখেন। আমাদের বুঝিতে হইবে কিভাবে জামায়াতের মত সা¤্রাজ্যবাদের দালাল ও বাতিল শক্তি শোষণ, বঞ্চনার চাপে দিশেহারা মানুষকে তাদের স্বার্থে কাজে লাগাইতে পারিতেছে। যে শাসকশ্রেণি জনগণের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়ন না করিয়া শুধুমাত্র দেশের গান বাজাইয়া দেশপ্রেম জাগ্রত রাখিবার তাল করে তাহার অন্তঃসার শূন্যতা সমাজে আলবৎ ধরা পরিবে।

অন্যদিকে যে শক্তি বিদ্যমান সংকটের সমাধান ইসলামি রাজনীতির পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে হইবে বলিয়া মনে করিতেছে তাহাদের চিন্তা যে ভ্রান্ত তাহাও স্মরণ রাখিতে হইবে। এই ধারার লোকেরা মূলত শ্রেণি বিভাজন ও শাসক শ্রেণির ঐতিহাসিক দূর্বলতার কারণে বহিরাবয়বের যে বিভাজন দৃশ্যমান আছে তাহার এক অংশকেই পোক্ত করিতে চাহিতেছে। তাহারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বলিতেছে জামায়াত শিবিরের শক্তিবৃদ্ধি ও মতবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়াকেই আমাদের মঙ্গল। এই মতবাদকে অবশ্যম্ভাবি করিয়া তুলিতে তাহারা সর্বোচ্চ শক্তি নিয়া মাঠে আছে। কাজেই বর্তমান সময়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পূর্ণ একটা জিনিশ এই বিষয়টা ক্রমে স্পষ্ট করিয়া তুলিবার মধ্যে দিয়াই সংকটের সত্যিকার সমাধান আসিবে।

গুজব না গজব: স্বাধীনতার সংকট – সলিমুল্লাহ খান

Vandalism 3

‘পরাধীন ভারতবর্ষে চাষীর লড়াই’ নামা সুবিখ্যাত ইতিহাসের লেখক রণজিৎ গুহ একদা লিখিয়াছিলেন, গুজব না ছড়াইয়া পৃথিবীর ইতিহাসে নিচুতলার মানুষ কোনদিন কোন বড় আকারের বিদ্রোহ ঘটাইতে পারে নাই। তিনি প্রাচীন রোম হইতে একালের এয়ুরোপ ও আফ্রিকা হইয়া পরাধীন ভারতের যুগ-পর্যন্ত ইতিহাস ঘাঁটিয়া দেখাইয়াছেন যে সকল দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে অক্ষর পরিচয় ব্যাপক হয় নাই সে সকল দেশে গুজবের প্রকোপ বেশি। বড় গুজব ছাড়া বড় বলাৎকারের ঘটনা ঘটানো একপ্রকার অসম্ভবই বলিতে হইবে।

গত শনিবার দিবাগত রাত্রে — মার্চের এক তারিখ পার হইবার রাতে — চট্টগ্রাম হইতে নদীয়া পর্যন্ত গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছিল মৌলবি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী চাঁদে দাঁড়াইয়া আছেন। ১৮৩২ সালের কোল বিদ্রোহে, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহে, এমন কি খোদ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামেও এই ধরনের বহু গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। ফরাশি বিপ্লবের আগের দশ বছরে ফরাসিদেশের গ্রামে গ্রামে চাষীদের লড়াইয়ে গুজব বড় ভূমিকা পালন করে। ১৮৩০ সালেও বিলাতের কৃষক বিদ্রোহে গুজব বড় ভূমিকায় অভিনয় করে।

সচরাচর গুজব প্রথম কে ছড়াইয়া দেয় তাহার কোন হদিশ পাওয়া যায় না। সাঈদীর গুজবের সহিত তুলনা করিলে একটা প্রভেদ চোখে পড়িবে।

এবারের গুজব ছড়াইয়া পরে গত শনিবার গভীর রাত্রে। পত্রিকায় লিখিয়াছে, শনিবার রাত বারোটার পর সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ হইতে সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাইতেছে বলিয়া মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। ঝিনাইদহের অনেক এলাকায়ও মাইকিং করা হয়।

গুজবের কারণেই বিপুল জনসাধারণ রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে। এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সত্যের তলায় আরও সত্য আছেন কিনা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। গুজব — বিদ্বানেরা বলেন — হইতেছে সমাজ মনের ভাষা। সমাজে কি চলিতেছে তাহার খবর শহরের টেলিভিশন ধরিতে পারে না। গুজবই তাহার প্রমাণ। আমি জানি আলেম সমাজ বলিয়াছেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গিয়াছে এহেন কথার কোন ভিত্তি শরীয়তে নাই। যাহারা এহেন বক্তব্য প্রচার করিতেছেন তাহাদের ঈমান নষ্ট হইয়া যাইবে। সবই সত্য। তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়।

কথা হইতেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন প্রজাতন্ত্র আকারে গঠিত হইবার চল্লিশ বছর পরও দেশে এ ধরনের গুজবে কান দিবার মত এত মানুষ কিভাবে থাকিয়া গেল? আরও কথা আছে, গুজবে কান দিতে যাহারা তৈয়ার থাকে, তাহারা কেন তৈয়ার থাকিবেন ?

আমাদের রাষ্ট্র জনসাধারণ হইতে বেশ তফাতে বসবাস করিয়া থাকে। এই তফাত কতখানি তাহা পাঁচ দশ বৎসর পর পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠানাদি হইয়া থাকে তাহাতে পুরাপুরি ধরা পড়ে না। গুজবে এই তফাতটা খানিক মাপা যায়। গুজবের বিষয়টা কি তাহাও দেখিতে হইবে। কিন্তু এক্ষণে আমি গুজবের ‘প্রকার’ নিয়া কথা বলিতেছি না। বলিতেছি ‘আকার’ নিয়া।

সকলেই জানে বাংলাদেশ এখনও চাষাভুষার দেশ। ভদ্রলোকের ভাষায় আমাদের সমাজ কৃষক সমাজ। এমনকি শহরে যে বিপুল ভাসমান জনসমাজ তাহাও কৃষক জনসমাজ। কি ভাষায় কি ভাবে। সমাজে প্রতিদিন নতুন নতুন কথা যোগ হইতেছে কিন্তু ভাষা বদলাইতে আরও সময় লাগে। আমরা দেখিয়া শুনিয়া মনে হইতেছে তাসের ঘরে বসিয়া আছি। কথাটা খুলিয়া বলা দরকার।

এমন এক সময় ছিল বাংলাদেশের মাটিতে জমিদারশ্রেণি রাজত্ব করিতেন। জমিদারদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন, মুসলমানও ছিলেন। ইংরেজ জাতির অধীনে চলিয়া যাইবার পর এই ব্যবস্থায় পাকা হইল। কলিকাতা হইতে নিলামে জমিদারি কিনিয়া অনেকে নতুন জমিদারও হইলেন। দেশের বাদবাকি জনসাধারণের সকলকে জমিদাররা এক কথায় ‘প্রজা’ বা ‘চাষী’ বলিতেন। কিন্তু চাষীদের মধ্যেও নানান অর্থপ্রকার তৈয়ারি হইতেছিল। দেশ যখন ‘স্বাধীন’ হইল তখন অনেক ‘প্রজা’ জমির ‘মালিক’ হইলেন।

দেখা গেল চাষীর দেশে ধনী, মাঝারি ও ছোট চাষী ছাড়াও আরও মানুষ আছে। গ্রামে শতে পঞ্চাশ লোকের কোন জমি নাই। তাহারা খেতে-খামারে কাজ করে। মোট বহন করে, কাঠ কাটে। এই রকমই আমাদের গ্রামের সমাজ। কেহ এখন রিকশা চালাইতেছে, কেহ ধান ভাঙ্গার কলে খাটিতেছে। কৃষক সমাজের এই স্তরভেদ দেখিলেই বুঝা যাইবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত ‘জাতীয়তাবাদী’ দল বড় ও মাঝারি চাষীর গায়ে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। মানে তাহাদের নীতিতে এই বড় চাষীরাই জেতেন।

গ্রামে আরও মানুষ আছে। তাহারা শুদ্ধ ভোট দেয়। কখনও তাহাদের কাজ থাকে। কখনও কাজ নাই। বাংলাদেশের ‘জাতীয়’ রাজনৈতিক দলগুলি ইহাদের ভোট লইয়া দেশ চালায়। প্রমাণিত হয় জনপ্রিয়তা। এই জনপ্রিয়তার ভিত্তি কত যে ঠুনকা তাহা কেবল সংকটের সময় বুঝা যায়।

আজ যে সংকট দেখা যাইতেছে তাহাতে বুঝা যায় এদেশের শাসক মহাজনেরা দেশের খবর রাখেন না। তাই জনসাধারণ তাহাদের কানে গুজব দেয়। গুজব শব্দটির সহিত গজব শব্দটির মিল আছে। এই মিল হইতে পারে আপতিক। তাহার পরও বলিব, ইহা গজবই।

কেহ কেহ বলিতেছেন দেশের যে যে এলাকায় জামায়াত ও বিএনপির শক্তি বেশি সে সে এলাকায় পুলিশের সহিত সংঘর্ষ তীব্র হইয়াছে। দেখা যাইতেছে খালি দেশের উত্তরাঞ্চলেই এই সংঘর্ষ তীব্রতর হয় নাই, দক্ষিণ-পূর্বেও, দক্ষিণ-পশ্চিমেও। এক কথায় গ্রামঞ্চলে, মফস্বলে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়িয়াছে। প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। সংঘর্ষের আরও কয়েকটি চেহারা চোখে না পড়িয়া যাইবে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে জনতা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একটা সাবস্টেশন পোড়াইয়া দিয়াছে। তাহাতে এলাকার সেচ কার্য পর্যন্ত বন্ধ হইতেছে। এখানে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণি সংগ্রামের একটা হালকা ছায়া চোখে পড়ে।

বড় ভূমিকম্পের আগে যেমন ছোট ছোট কম্পন হয় এবারের সংকটের সহিত সেই ছোট ছোট কম্পনের তুলনা করা যায়। দুর্ভাগ্যের মধ্যে এবার এই চাষীদের মধ্যে গুজব ছড়াইয়াছে এমন একটি দল যাহারা দেশের জন্য ‘গজব’ বিশেষ। তাহারা মুসলমানকে লাগাইতেছে হিন্দুর বাড়িতে, হিন্দুর মন্দিরে হামলার কাজে। ১৯৭১ সালের মহাযুদ্ধের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শত চেষ্টা করিলেও বাংলাদেশে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাইতে পারে নাই। এতক্ষণে ইহারা পারিতেছে। কেন পারিবে?

গ্রামাঞ্চলে শ্রেণি বিভাজন আগেও ছিল। দেশ স্বাধীন হইবার পর এই বিভাজন কমে নাই। বরং বাড়িয়াছে। এতদিনে আর জমিদার নাই। আছে ধনী কৃষক ও মাঝারি কৃষক। আছে গরীব কৃষক ও কৃষি মজুর। আছে ভাসমান জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার রাজনৈতিক আদর্শ দেশকে এক জায়গায় আনিয়াছিল।

শুদ্ধ জামায়াতকে দোষ দিয়া পার পাওয়া যাইবে না। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা ব্যবসায় যে একবস্তু নহে তাহা বুঝিতে হইবে। দেশ স্বাধীন হইয়াছিল সকলের জন্য। এখন যেন মনে হয় দেশটা স্বাধীন হইয়াছে শুদ্ধ ব্যবসায়ীদের জন্য। ইহার মূল্য দিতে হইবে না?

একটা জিনিশ চোখে পড়িবে। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে যে সমৃদ্ধির জোয়ার দেখা দিয়াছে তাহাকে বলা হইতেছে বার্ষিক এত এত শতকরা হারে প্রবৃদ্ধি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও নানা স্তর আছে। আজ সেই আলোচনার জায়গা নাই। শুদ্ধ তফাতটাই দেখিতে বলিতেছি।

গ্রামের চাষীদের মধ্যে যে ক্ষোভ তাহাকে পুঁজি করিয়াছে এমন একটি শ্রেণি যাহারা নিজেরাই শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের জোট হইতে তৈয়ার হইয়াছেন। তাহারা জনসাধারণকে এসলামের কলা দেখাইতেছেন। এই কলাই গুজব আকারে চাঁদে গিয়া দাড়াইয়াছে।

এই ধরনের নিয়তিকেই গ্রীক পুরাণে বলা হইত ট্রাজেডি। বাংলায় আমরা বলি নিয়তি। নিয়তি মানে মনে রাখিতে হইবে যাহার ‘য়তি’ অর্থাৎ ‘যতি’ নাই। যাহার পরিণতিতে যতি নাই বাংলায় তাহাকেই আমরা ‘নিয়তি’ বলিয়া থাকি।

৪ মার্চ ২০১৩

গণহত্যা, বেগম জিয়া ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার – বিধান রিবেরু

Vandalism 2গণহত্যা বা জেনোসাইড শব্দটি পহেলা জনসম্মুখে ছুঁড়িয়া মারেন পোলিশ আইনজ্ঞ রাফায়েল লেমকিন। বলা বাহুল্য নয় হিটলার কর্তৃক গণহারে ইহুদি নিধনের ঘটনাকে এক কথায় বলিবার উদ্দেশ্যেই ঐ শব্দের ব্যবহার। শব্দটি আসিয়াছে গ্রিক মবহড়ং (জনগণ বা জাতি) ও ল্যাটিন পধবফবৎব (হত্যা করা) শব্দ দুইটি হইতে। ডিকশনারি অব সোশিওলজি মোতাবেক এই গণহত্যার সংজ্ঞা হইল, এই কর্মটি এমন এক কর্ম যাহার দ্বারা একটি জাতি অথবা নৃতাত্ত্বিক কিংবা বিশেষ বর্ণ বা ধর্মের গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করিবার প্রয়াস প্রকাশ পায়। জাতিসংঘের সংজ্ঞাও কম বেশি একই রকম। তারপরও উলেখ করিতেছি: গণহত্যা হইল বিশেষ জনগোষ্ঠীর উপর উদ্দেশ্য নিয়া ব্যাপকহারে হত্যাকাণ্ড চালান, যাহা সাধারণত রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশ জন্মের আগে হিটলারের গণহত্যা হইয়াছে বলিয়া উহার মর্ম এদেশের মানুষ বুঝিবে না তাহা নয়। কারণ এই ভূখণ্ডের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ আসিয়াছিল। সেইদিন নিরস্ত্র সাধারণ বাঙালি জনগণের উপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা সামরিক বাহিনী দিয়া যে হত্যাযজ্ঞ চালাইয়াছিল তাহা আজ অব্দি দগদগে স্মৃতি হইয়া রহিয়াছে এদেশের মানুষের মনে। অতয়েব গণহত্যা কি, তাহার চরিত্র কিরূপ সেই ব্যাখ্যা নতুন করিয়া না দিলেও চলিবে।

কিন্তু তারপরও আমরা প্রত্যক্ষ করিলাম বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যাহাদের নামকরণের মধ্যেই ফ্যাসিবাদী উৎকট গন্ধ সড়সুড়ি মারিতেছে। সেই দলের মাথার মনি বেগম খালেদা জিয়া বলিলেন ২৮ মার্চ বাংলাদেশে ‘গণহত্যা’ হইয়াছে। কেন? সেইদিন জামায়াতে ইসলামীর কুখ্যাত রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণপূর্বক মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ হইয়া জামায়াত-শিবির পুরা দেশে তুলকালাম তাণ্ডব শুরু করিয়া দেয়। তাহারা পুলিশের উপর হামলা করিয়াই ক্ষান্ত থাকে না। হিন্দু ঘরবাড়িতে আগুন দেয়, এমনকি মন্দিরেও ভাংচুর চালায়। এসময় পুলিশ তাহাদের ঠেকাইতে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে। ফলে পুলিশ সদস্য যেমন মারা যায়, তেমনি প্রাণ হারায় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। সাধারণের জানও কোরবান হয়।

এখন কথা হইল, সংঘাত কি পুলিশ হুট করিয়া গিয়া বিশেষ কোন জাতিগোষ্ঠীর উপর করিয়াছে? নাকি পরিকল্পনা মাফিক মাদ্রাসায় গিয়া পুলিশ ও বিজিবি গুলি ছুঁড়িয়াছে? এগুলার কিছুই হয় নাই। উস্কানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিয়াছে জামায়াত-শিবির কর্মীরাই। অন্যদিকে, না পুলিশ স্বেচ্ছায় গিয়া তাহাদের উপর হামলা করিয়াছে, না তাহারা কোন বিশেষ জাতিগোষ্ঠী। আমরা বরং দেখিলাম, সাঈদী সমর্থকরা ট্রাইবুনালের রায়ে অসন্তুষ্ট হইয়া মারমুখী ও দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হইয়া আস্ফালন ও নাশকতা শুরু করিল। বোমাবাজি করিতে থাকিল। এই ঘটনা কোনভাবেই গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়িতেছে না। তথাপি বেগম খালেদা জিয়া পয়লা মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডাকিয়া গণহত্যার নতুন রূপ ছুঁড়িয়া দিলেন আমাদের সামনে। অবশ্য ওয়াশিংটন টাইমসের এই নব্যনিবন্ধ লেখিকা ব্যাখ্যা করিলেন না পূর্বের ধারণাগত গণহত্যার সঙ্গে তাঁহার ‘গণহত্যা’র ফারাক কোথায়।

বেগম জিয়ার তাত্ত্বিক সংবাদ সম্মেলন শেষ হইবার কয়েক ঘণ্টার মাথায় প্রতিক্রিয়া জানান দার্শনিক বলিয়া খ্যাত ফরহাদ মজহার। তিনিও বলিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যাহা হইয়াছে তাহা এক প্রকার গণহত্যা বৈকি। এই প্রতিক্রিয়া তিনি বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার টেলিভিশনে — নাম দিগন্ত টেলিভিশন। তিনি যাহা বলেন ও যাহা করেন বোধ করি তাহা বুঝিয়া শুনিয়াই করিয়া থাকেন। উপরে উল্লিখিত গণহত্যার সংজ্ঞা মজহার সাহেব জানেন না — এই কথা চন্দ্রাহত ব্যক্তিও বলিবেন না। সেই অর্থে জ্ঞানপাপী ফরহাদ মজহার আর কত জ্ঞানপাপ করিয়া যাইবেন তাহা বলিতে পারিবেন নতুন ইংরাজি প্রবন্ধ লেখিকা বেগম খালেদা জিয়া। মনে হইতেছে এই বেগম জিয়াই মজহারের নতুন দার্শনিক গুরু। বেগম যাহা বলিবেন তাহাই সহি, তাহাই মজহারের দর্শননামা।

প্রথম প্রকাশ: ওয়ার্ডপ্রেস, ১ মার্চ ২০১৩

বুদ্ধিবৃত্তিক দুরাচারের রাজনৈতিক জবাব – লেভিন আহমেদ

Vandalismযারা একাত্তরে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের গণহত্যাকে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা বা গৃহযুদ্ধ বলে প্রচার করেন, দুই অঙ্কের কোটায় লোক মারা যাওয়ায় আজ সেটাকে তারা বলছেন গণহত্যা! দক্ষিণগামী রাজনৈতিক-মানবাধিকার তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহার এ ঘটনাকে গণহত্যা আখ্যা দিয়ে তো বলেই ফেললেন যে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নাকি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগের ২৫ বছরে এত মানুষ হত্যা করেনি যা শেখ হাসিনার সরকার শুধু ফেব্র“য়ারি মাসে খুন করেছে। অঙ্ক কষে বলতে হবে, পাকিস্তান আমলে তাহলে ষাট সত্তরজন লোককেও হত্যা করা হয়নি! ভ্রান্তিপূর্ণ এ দাবির মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে তিনি পাকিস্তানের সামরিক শাসনকেই উৎকৃষ্ট শাসন হিশাবে বৈধতা দিলেন।

তিনি তাঁর সাম্প্রতিক একটি লেখায় জানাচ্ছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান নাকি চাকমা, মারমা মান্দিসহ অন্যান্য জাতিসত্তার টুঁটি চেপে ধরবে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, জনসম্পৃক্তি ও বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে আমলে না নিয়ে যারা ভাষা তথা সাংস্কৃতিক উপাদানকে রাজনীতিকরণের সাথে সাম্প্রদায়িকতার সরল ও যান্ত্রিক সংযোগ স্থাপন করেন তারা যে ভ্রান্তির কানাগলিতে আটকে পড়েছেন সে কথা বলাই বাহুল্য। বাঙালির জাতিবোধের রাজনৈতিক ধারা আবশ্যিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মপরিচয়ের রাজনীতি হয়ে উঠবে — এমন পরিণতিবাদী (teleological) কথা কেউ যদি ভাবেন তবে সেটা তাদেরই বুদ্ধিবৃত্তির অপুষ্টির লক্ষণ।

তিনি জামায়াতের এই তাণ্ডবকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই হিশাবে চিহ্নিত করেছেন। নরেন্দ্র মোদীকে গুজরাট গণহত্যায় উসকানি দেয়ার অভিযোগে যদি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, তার পক্ষে হাজারো শিবসেনা দেশজুড়ে তাণ্ডব চালাবে এবং পুলিশের উপর হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় সেখানেও হতাহতের ঘটনা ঘটবে। এখন তাণ্ডবটি সম্পর্কে কিছুই না বলে পরের ঘটনাটিকে গণহত্যা বলে প্রচার চালানোর মানে দাঁড়ায় পূর্বের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে এড়িয়ে যাওয়া।

জামায়াত-শিবির হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর বিনা প্ররোচনায় হামলা চালিয়েছে, দেশজুড়ে রাস্তাঘাটে তাণ্ডব চালিয়েছে, টার্গেট করে আচমকা গুলিবর্ষণ করে এমনকি ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে পুলিশ হত্যা করেছে। এ ঘটনাগুলো যেমন সত্য ঠিক তেমনি এটাও সত্য যে পুলিশ বেপরোয়া ও দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ায় অনেক নিরাপরাধ লোকের প্রাণহানি হয়েছে। তার দায় প্রশাসনের ঘাড়ে না চাপিয়ে শাহবাগের আন্দোলনকারী এমন কি আন্দোলনের সাথে যারা সংহতি জানিয়ে লেখালেখি করছেন তাদের ঘাড়ে চাপানো এবং কূটতর্ক করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার মতলব ছাড়া আর কিছু নয়।

পুলিশের এই নির্বিচার হত্যাকাণ্ড প্রকারান্তরে জামায়াত নেতৃবৃন্দের মনোবাসনাকেই পূর্ণ করল যারা গরিবদের ধর্মের নামে উত্তেজিত করে রাস্তায় নামিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। মহামতি ফরহাদ মজহার জামায়াতের এই তাণ্ডবের প্রেক্ষিত বিচার না করেই ঘোষণা দিচ্ছেন এটা নাকি ইসলামের উপর আঘাতের প্রতিক্রিয়া মাত্র। এহেন প্রচার সেকুলার বনাম ইসলাম কিংবা আস্তিক বনাম নাস্তিক এই দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চক্রান্তেরই অংশ। এ মিথ্যা অপপ্রচার আজ মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রের সরকারি মিডিয়ার প্রচারকেও হার মানিয়েছে। তিনি পুলিশের এই হত্যাকে একাত্তরের গণহত্যার সাথে তুলনা করে একাত্তরের গণহত্যাকেই প্রকারান্তরে অস্বীকার, এমনকি খাট করছেন।

ডানপন্থী মিডিয়া জামায়াত-শিবির কর্তৃক হিন্দু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে এখন বেমালুম চেপে যাচ্ছে, তাদের কেউ কেউ বলছে এটা অপরাপর মিডিয়ার অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়। যারা গৃহযুদ্ধের জুজু দেখিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বানচাল করতে চেয়েছে এখন তারাই দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর জন্য সচেষ্ট। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা না বলে অবশ্য সংখ্যালঘু উচ্ছেদ বা নিধন প্রচেষ্টা বললে যথার্থ হয়।

ফরহাদ মজহার শাহবাগের ফাঁসি চাই দাবিকে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’ প্রচেষ্টার সমতুল্য বলে প্রচার চালাচ্ছেন। এটা ঠিক যে আন্দোলনকারীরা বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা রাখতে না পারায় জনগণ কেমন রায় চায় সেটাও জানিয়ে দিতে আপত্তি করছে না। এখন যারা বিচার স্থগিত করে রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থাকে আমূল সংস্কারের কথা বলছেন তারা এক হিশাবে বাঙ্গালিকে হাইকোর্ট দেখাতে সচেষ্ট হয়েছেন সে কথা বলাই বাহুল্য। আন্দোলনকারীরা যে বিচার ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন চায় না তা নয়, সেই দীর্ঘপ্রক্রিয়া বাস্তবায়নের পাশাপাশি তারা সমস্ত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের যে কোন মূল্যে দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে চায়। এমন প্রমাণিত অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি তারা চায়। যারা মানবতার দোহাই তুলে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তিকে রদ করতে চায় তারা তো এতদিন সর্বোচ্চ শাস্তি হিশাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার যে বিধান তার উৎখাতে সচেষ্ট হয়নি। কাজেই এখন মৃত্যুদণ্ড বিরোধিতার মানে দাঁড়ায় যুদ্ধাপরাধীদের যে কোন মূল্যে রক্ষা করে তাদের আবার রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করা।

একাত্তরে যে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের সূচনা ঘটেছিল তারই ধারাবাহিকতা হিশাবে শাহবাগের আন্দোলনকে পাঠ করতে হবে। এর সাথে ফ্যাসিবাদের কল্পিত সম্পর্ক রচনা বুদ্ধিবৃত্তিক দুরাচারের লক্ষণ বৈ নয়। বরং ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে সুনিশ্চিত করাই শাহবাগ আন্দোলনের লক্ষ্য। শাহবাগ আন্দোলনের সাথে সরকার আছে বটে কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থনের দরুন এই আন্দোলনের তাৎপর্য কোনভাবেই ম্লান হয়নি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়ায় যে কলঙ্কের দাগ এখনো আমাদের গায়ে লেগে আছে তা মুছে ফেলার ডাক দিয়েছে শাহবাগ। শাহবাগ আন্দোলন উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে তো দেয়নিই বরং উগ্র জাতীয়তাবাদের সমালোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আপন জাতিবোধের একটি জনসম্পৃক্ত ধারার রাজনৈতিক উত্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যার উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধর্ম বর্ণ জাতি পেশার লোকজন একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী আকারে হাজির হতে পারে।

আর চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিটি একটি গণদাবি — কেবল তারুণ্যের অথবা বিশেষ কোন রাজনৈতিক দলের দাবি নয়। কাজেই শাহবাগ কেবলমাত্র তারুণ্যের প্রতিনিধি নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা তথা স্বাধীন সার্বভৌম শোষণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে লালন করে এমন সকল বয়সের সকল পেশার লোকের প্রতিনিধি হিশাবেই উপস্থিত শাহবাগ।