Category Archives: সর্বজন: বুলেটিন ১২

সম্পাদকীয়

আন্দোলনের অস্পষ্টতা কমাইয়া আনিতে হইবে

 

জিকমুন্ট ফ্রয়েড নামক এক জ্ঞানী ব্যক্তি তাঁহার ‘স্বপ্ন ব্যাখ্যা’ নামক বইয়ের এক জায়গায় বলিয়াছেন: কোন স্বপ্ন যেখানে আসিয়া অস্পষ্ট হইয়া পড়ে; দেখিয়াছি, তবে ঠিক কি দেখিয়াছি ঠাহর করিয়া উঠিতে পারি না — ঠিক সেই জায়গায় সেই স্বপ্ন ব্যাখ্যা করিবার চাবি লুকাইয়া থাকে। এই যে আজিকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে চলমান আন্দোলন, এই আন্দোলনে শরিকদের দাবি সত্য দাবি এবং তাহা জাতীয় দাবিও বৈকি। তথাপি, মনে হইতেছে, আন্দোলনকারীরা বুঝিতে পারিতেছে না কিভাবে দাবি আদায় করিয়া তবে ঘরে ফিরিবে। এও হয়তো বুঝিতে পারিতেছে না টানা ১৬ দিন যাবত চলমান অভূতপূর্ব জনসমাবেশ কয়দিন চালাইয়া যাওয়া উচিত। এই না বুঝিতে পারার মধ্যেই, এই অস্পষ্টতার মধ্যেই, এই আন্দোলনের নতুনত্ব।

আন্দোলনকারীদের উচিত হইবে আন্দোলন বন্ধ না করিয়া বরং নতুন নতুন ফ্রন্টে আন্দোলন শুরু করা। অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির লড়াইকে খানিক আগাইয়া লইবার ও নতুন বাংলাদেশ গড়িয়া তুলিবার খানিক সম্ভাবনা এই আন্দোলনে রহিয়াছে। কাজেই আন্দোলন ও আন্দোলনের দাবি বিষয়ক যে অস্পষ্টতা রহিয়াছে সেগুলো কমাইয়া আনিতে হইবে। আন্দোলনকারীদের জানিতে হইবে কি কি করিলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা যাইবে। আন্দোলন বন্ধ করিবার প্রশ্ন কেবল রাজাকার, তাহাদের দোসর ও জনগণের শত্র“দের পক্ষ হইতে আসিতে পারে। হে তরুণ বন্ধুগণ, আপনাদের হারাইবার কিছু নাই। জয় করিবার জন্য রহিয়াছে সমগ্র বাংলাদেশ।

যৌবনের গান, শাহবাগ থেকে জামালখান – মনসুর নবী

Jagroto‘যে চাঁদ সাগরে জোয়ার জাগায়, সে হয়তো তাহার শক্তি সম্বন্ধে আজও নাওয়াকিফ।’ কথাটি মহামতি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর এক ভাষণে বলেছিলেন। তাঁর উদ্দিষ্ট ছিল তরুণ সমাজ। সেই কথাটি আজকের তরুণদের সম্পর্কেও বলা যায়।

তারুণ্যের জাগরণ আজ বাংলাদেশের জাগরণে পরিণত হয়েছে। চল্লিশ বছর বয়স পার করেও বাংলাদেশ যে জেগেছে তাতে আমরা আনন্দিত। আমরা নতুন আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। যে সময়ে আমরা একটু একটু করে হতাশার দিকে ঝুঁকছি, নৈরাশ্য আমাদের গ্রাস করছে ঠিক তখনই তরুণ প্রজন্ম নতুন পথের সন্ধানে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে। তবে তরুণদের এই ‘মহাজাগরণ’ যেন সুবিধাবাদী রাজনীতির স্পর্শে বা কর্পোরেট আন্দোলনে পরিণত না হয়। খারাপ কিছুর সাথে যেন আপোস না করে।

আমরা বার বার প্রতারণার শিকার হয়েছি, রাজনীতিবিদদের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছি স্বাধীনতার পর থেকেই। তাই যে মানুষ তরুণদের জেগে ওঠা দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়, আবার সেই মানুষই শঙ্কিত। তার রক্ত ঘামের আন্দোলন যে বেহাত হয়েছে বার বার! অন্যের ঘরে উঠেছে তার রক্তে অর্জিত ফসল। তাই তার এত ভয়, সন্দেহ। তরুণরা যেমন মানুষের ভেতর আশা জাগিয়েছে তেমনি তাদেরকেই মানুষের এই ভয়, সংশয় ও সন্দেহ দূর করতে হবে।

‘শাহবাগের গণজাগরণ’ কথাটি সম্পূর্ণ ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে শাহবাগ চত্বরে বাংলাদেশের গণজাগরণ শুরু হয়েছে। এবং সেটা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ভেতরে বাহিরে। মানুষের অন্তরে অন্তরে।

কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চলমান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে চলা মামলার রায়ের বিরুদ্ধে ব্লগারদের অবস্থান কর্মসূচির সেই ক্ষুদ্র বীজ থেকে বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে গণজাগরণ। এই জাগরণ সাধারণ মানুষের, অশুভশক্তি বিনাশের জাগরণ। বিদ্রোহী কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘তারুণ্য তিমির বিদারী’। সত্যিই তারুণ্যের শক্তি আজ আশা জাগিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে। সেই তারুণ্য আজ দূর করতে চায় অন্ধকার যা আমাদের চল্লিশ বছর কলঙ্কিত করে রেখেছে। ‘তিমির বিদারী’ যৌবনের এই গান অন্যান্য জায়গার মত চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা জামালখানেও শোনা যাচ্ছে।

যে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে একদিন বাংলাদেশের সকল বয়সী মানুষ যুদ্ধ করেছিল সে স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। কিন্তু বার বার বিভক্ত হয়েছি আমরা। সুবিধাবাদী রাজনীতি আমাদের এক হতে দেয়নি স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার জন্য। আমাদের আবেগকে নিয়ে খেলেছে রাজনৈতিক পক্ষগুলো। আজ এই আন্দোলনও যদি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে পরিণত হয় তাহলে বাংলাদেশের মানুষের জন্য এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর হবে না। তারা হতাশার নতুন গহ্বরে পতিত হবে।

পরজীবী বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপারেও তরুণদের সজাগ থাকতে হবে, কেননা তারা এই আন্দোলনের জন্য ক্যান্সারের ভাইরাসের মত। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী নিজের দেশের চেয়ে নিজের প্রতি বেশি যতœবান। তারুণ্যের ধর্মে যেটা নেই।

তারুণ্য কখনো মিথ্যাকে কি মৃত্যুকে আঁকড়ে ধরে না। তাই আমার বিশ্বাস, এই জাগরণ কোন মিথ্যার কবলে পতিত হবে না। বাংলাদেশের মানুষের সাথে যারা এত বছর বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে, যত অন্যায় করে এসেছে সব কিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তরুণ প্রজন্ম। এই আন্দোলন কারও পদলেহন করবে না বা কোন দলীয় আন্দোলনে পরিণত হবে না। এদেশের জনগণ অনেক নির্যাতন সহ্য করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের, দুর্নীতির শিকার হয়েছে, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে বছরের পর বছর। সব কিছুরই হিসাব নেবে তরুণরা। কেন এখনো ক্ষুধায় আত্মহত্যা করতে হয় এই স্বাধীন দেশে, কেন চিকিৎসার অভাবে মানুষ মরবে? এই জন্যই কি একাত্তরে রক্ত আর সম্ভ্রম হারিয়েছে আমাদের স্বজনরা? সবকিছুরই জবাব আমরা চাইব। চল্লিশ বছর পর জেগে উঠা তারুণ্য দাঁড়াবে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে। এই হোক জাগরণের মূল প্রত্যয়।

(চট্টগ্রাম থেকে)

শাহবাগ: এখান থেকেই শুরু একাত্তরের বিনির্মাণ – এম জে ফেরদৌস

(c) মাহমুদ হোসেন অপু

(c) মাহমুদ হোসেন অপু

মহাত্মা আহমদ ছফা বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের কোন একক নায়ক নাই। শাহবাগ বলছে, মুক্তিযুদ্ধের কোন একক বয়ানও নাই। আজও নির্মিত হয় নাই মুক্তিযুদ্ধে জনগণের বয়ান-ইতিহাস। ছফা আরো বলেছিলেন একাত্তর বিপ্লবের নায়ক শুধুই জনগণ। শাহবাগেরও ইশারা সেই দিকে। রক্তোৎসারণ ব্যতীত সেই ইতিহাসের আত্মীকরণও নাই। আমাদের হাতছাড়া ইতিহাস হাত বাড়িয়ে ডাকছে শাহবাগ।

৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ নিজভূমে না দাঁড়িয়ে পায়ে হেঁটে পরবাসে গিয়েছিল — এও বলেছিলেন আহমদ ছফা। এই দরকারি কূটতর্ক ভিন্ন কোন বিপ্লবাত্মক কালে জরুরত নিয়ে হাজির হবে, সে ভরসায় বিতর্ক আপাতত মুলতবি রাখা যাক। এই ক্ষণকালে আমাদের আলোচ্য হালের জোয়ার: শাহবাগ! জনজোয়ার, মুক্তিযুদ্ধের নায়ক। ফিরে আসা একাত্তর, ফিরতে হবে ইতিহাসের আয়নায়।

মুক্তিযুদ্ধ পাঠ্যবই আর দলীয় শ্লোগানে বিবর্ণ দেয়াললিখনের মতই নির্বিষ বুলি হয়ে ছিল আমাদের জাতীয়তার মুখস্ত ঠোঁটে। আজ সেই হারানো বিপ্লব সতত-বাঙ্ময় — ফিনকি দিয়ে ছুটছে তার রক্ত আবারও ঢাকায়।

আমাদের এই সময়ের শাহবাগগামীতা, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী যেকোন সময়ের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শাহবাগ একটা সমাধানহীন সংকটের নাম। শাহবাগ এমন এক রাজনৈতিক ইভেন্ট যার দ্বারা আজ সংকটাপন্ন সকল রাজনৈতিক আদর্শ, চিন্তা ও দলসমূহ। চিন্তার দেউলিয়াত্ব আর রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে সর্বজনীন শাহবাগ। প্রশ্ন এতই উচ্চকিত; কোথাও গেছে চিন্তার বাধ ভেঙে, আবার কারও বা মুখে চিরতরে এঁটে দিয়েছে কালের কুলুপ।

যুদ্ধাপরাধের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতেই শাহবাগের প্রাথমিক পথ চলা। সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষধারীর মুখোশ উন্মোচন ব্যতিরেকে শাহবাগের কোন দাবিপূরণ সম্ভবপর নয়। বিচারের প্রহসনকে জনতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর তাকত অর্জন ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আজও আমাদের নয়।

সময় বড় আশাব্যঞ্জক, ‘অরাজনৈতিকতা’র বোলে শাহবাগ রাজনৈতিক হয়ে উঠছে। জনতার রায় ভিন্ন তার অস্তিত্বের কোন জারিজুড়ি নাই। স্বাধীনতার বেসাতি আর ফেরেব্বাজির দিন অচিরেই দিনান্তে পৌঁছাবে সেই পথের ইশারা শাহবাগ। স্বপ্নাকাঙ্খা প্রকাশের ভাষা খুঁজে খুঁজে আমরা আজও হয়রান। যদিও জানি রক্তপাতেই আমাদের বর্ণ ও ভাষা প্রাপ্তি। তথাপি সে পথেই হাঁটার সূচনা শাহবাগ।

ভাষা আন্দোলন কণিকা – তাহমিদাল

পাকিস্তান আন্দোলনে পূর্ব বাংলার নানা মত ও পথের লোকই অংশ নিয়েছিলেন। অবিভক্ত বঙ্গ প্রস্তাব জলে যাওয়ার পর মহাত্মা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলও পাকিস্তানের পক্ষে কথা বললেন এবং আশা প্রকাশ করলেন যে পাকিস্তানে নিম্নœবর্ণের হিন্দুরা নিরাপদে বাস করবে। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণতন্ত্র ও অসা¤প্রদায়িকতার আশার গুড়ে বালি পড়ল।

কাগজপত্র দলিল দস্তাবেজে গরিব কৃষকের মুক্তি, ইসলামি ন্যায়বিচার ইত্যাদির বুলি তুললেও পাকিস্তান রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ও মুক্তিকামী আন্দোলনের উপর কঠোর নিপীড়ন চালায়। ইলা মিত্রের উপর চালানো নির্যাতনে যেমন শোষক, জাতিবৈর, নারীবৈর রাষ্ট্রের রূপ চর্মচক্ষে ধরা পড়ে।

‘সীমান্তপারের হুমকি’, কম্যুনিস্ট চর, প্রাদেশিকতার বিপদ — ইত্যাদির কথা বলে যাবতীয় অগণতান্ত্রিক যাঁতাকলকে রাষ্ট্র জায়েজ করতে থাকে। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের ভাষণে এই সব কয়টি জুজুই হাজির করেন, সেইসাথে ঘোষণা দেন উর্দুই হবে সমগ্র পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে।

১৯৪৭ সাল থেকেই নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্রিটিক বাংলায় শুরু হয় এবং নতুন রাজনীতিতে দুইটি প্রধান দিক গুরুত্ব পায়:

১. গণতান্ত্রিক/নাগরিক অধিকার (প্রেস, ট্রেড ইউনিয়ন, বিচার পাওয়ার অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি)

২. জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষকের জমি, শ্রমিকের মজুরি ইত্যাদি)

১৯৪৭-৪৮ সালে প্রতিষ্ঠালগ্নে যুবলীগ একটি ‘গণদাবীর সনদ’ রচনা করে যাতে এই দুইটি দিকই গুরুত্ব পায়। ১৯৪৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জমিদারতন্ত্র, ধনিকশ্রেণির আধিপত্য, ‘৯৫ বনাম ৫’-এর রাষ্ট্র, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির জের, এবং গণআন্দোলনের উপর সরকারি নিপীড়নের প্রতিবাদ করে এক পুস্তিকা বের করে যুবলীগ। সচেতন ছাত্রযুবা সেই পুস্তিকায় পরিষ্কার বলে, ‘কৃষক-মজুরের আন্দোলনকে বাদ দিয়া কোন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনই গড়িয়া উঠিতে পারে না’। যে পাকিস্তান বাংলার জনগণের কাছে ১৯৪৭ সালের আগে জমিদারবিরোধী ও শোষণমুক্তির পথ হিসাবে প্রতিভাত হয়েছিল, সে পাকিস্তানে জমিদারি বিলোপের বিল যে কার্যত জমিদার শ্রেণিকে খেসারত দান ও জোতদার বিকাশের দিকে যাচ্ছে সে বিষয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রের অভিমুখও অনেকটা একই রকম বলে দেখা যায়।

১৯৪৭ থেকেই তমদ্দুন মজলিস ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার জন্য সংগঠিত আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে করাচিতে সংবিধান সভায় পূর্ব পাকিস্তান কংগ্রেসের ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য মোশন উত্থাপন করেন। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ প্রথম থেকেই নতুন রাষ্ট্রে বাংলার রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পক্ষে মত দেন।

তবে মোটের উপর এই পর্যায়ে দাবিদাওয়া আদায়ের রাজনৈতিক দিগন্ত ছিল বিদ্যমান রাষ্ট্রই।

পূর্ব বাংলায় গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তা ভাষা আন্দোলনের সাথে বাঙালি-হাজং-সাঁওতাল, নারী-পুরুষ, শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে জনতার সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনকে এক সুতায় গাঁথার কমবেশি চেষ্টা করেছে। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ ১৯৫১ সালে এক ঘোষণাপত্রে সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষ, কৃষক-শ্রমিক-নারীর গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও অধিকারের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই গণতান্ত্রিক সংগ্রামেরই এক বিস্ফোরক অভিব্যক্তি, যাতে ছাত্র ও শহরের শ্রমজীবী জনতার পাশাপাশি গ্রামের ‘মাঝি-মাল্লা আর কৃষক-মজুর’ কিংবা হাজার হাজার নারী (যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে বা আজিমপুর কলোনিতে) আন্দোলনে কাতারে কাতারে অংশ নেন এবং শ্লোগান তোলেন ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘পুলিশ জুলুম চলবে না’, ইত্যাদি। নূরুল আমীন সরকার পুলিশ-মিলিটারি দিয়ে গ্রেফতার নিপীড়ন চালায়, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে এবং আন্দোলনকে ‘গোলমাল’, ‘হীন ষড়যন্ত্র’ ইত্যাদি বলে নাকচ করার চেষ্টা করে।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৭ সালের জাতীয় বিপ্ল­ব, কৃষক/সাঁওতাল বিদ্রোহ, বা হাজং বিদ্রোহ ইত্যাদি যে নৃশংস কায়দায় দমন করেছিল, মাগরেবি পাকিস্তানের শাসকশ্রেণি ও তাদের পূর্ববঙ্গীয় গণবিরোধী দোসরেরা শুরু থেকেই সেই কায়দা অব্যাহত রাখে। দিনে দিনে নতুন রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক মুখে আলো পড়তে থাকে, এবং পূর্ব বাংলার জনগণের মানসদিগন্ত থেকে পাকিস্তান ক্রমে অপসৃয়মাণ হতে থাকে।

সারাদেশে মৌলিক সমাজ পরিবর্তনের পদধ্বনি – বদরুদ্দীন উমর

(গতকালের পর)

(c) মাহমুদ হোসেন অপু

(c) মাহমুদ হোসেন অপু

‘বাংলাদেশের জনগণ জানে কিভাবে ক্ষমা করতে হয়’ — এ কথা বলার অধিকার কি শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল? অধিকার না থাকলেও তিনি স্বচ্ছন্দে সেই ক্ষমা করতে পেরেছিলেন। কারণ তিনি নিজে এবং তার পরিবারের কেউই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও সামরিক সরকারের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হননি। তাদের কারও গায়ে কোন আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। যখন আক্রমণের ভয়ে সবাই পালিয়ে থাকল, তখন তিনি নিজে বাড়িতে বসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং তারা তাকে পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে আটক করলেও কোন কষ্ট দেয়নি। তিনি পাইপ খেতেন, উৎকৃষ্ট এরিনমোর তামাক ব্যবহার করতেন। তাকে সে তামাক পর্যন্ত তারা নিয়মিতভাবে সরবরাহ করত। তার পরিবারকে ঢাকায় আটক রাখলেও তাদের যেভাবে সেনাবাহিনী নিরাপত্তা দিয়েছিল এদেশের আর কাউকে তা দেয়নি। এটা ছিল এমন সময় যখন বাংলাদেশের জনগণের কারও কোন নিরাপত্তা ছিল না। তার পরিবারের খাওয়া, থাকা, চিকিৎসা থেকে নিয়ে সবকিছুর ব্যবস্থাই সামরিক বাহিনী করেছিল। তার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার সন্তান হওয়ার সময় তার চিকিৎসার ব্যবস্থা তারা করেছিল ঢাকা সামরিক হাসপাতালে। তার ছেলের জন্মও সেখানে হয়েছিল। কোন অসুবিধে হয়নি।

কাজেই শেখ মুজিবের পক্ষে বাংলাদেশের জনগণের কথা বলে ১৯৭১ সালের সামরিক ও বেসামরিক ক্রিমিনালদের ক্ষমা করা সম্ভব হলেও যারা ধর্ষিত হয়েছিল, তারা ও তাদের আত্মীয়স্বজন তাদের ক্ষমা করেননি। যাদের সামরিক বাহিনী এবং তাদের বেসামরিক ঠেঙাড়ে বাহিনী হত্যা করেছিল, তাদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধব তাদের ক্ষমা করেননি। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে যাদের ওপর নানা অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তারা মোটেও তাদের ক্ষমা করেননি। তার পরবর্তী প্রজন্মও যে তাদের ক্ষমা করেনি, তার প্রমাণ শাহবাগ চত্বরে ও দেশজুড়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এ মুহূর্তের আন্দোলন।

এই আন্দোলনের একটা দিক হচ্ছে, এতে কোন রাজনৈতিক দলকেই এরা দখল নিতে দেয়নি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের গোপন আঁতাতের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে উপযুক্ত শাস্তি না দেয়ার বিষয়টি যুক্ত হওয়ার পর ৫ ফেব্র“য়ারি শাহবাগ চত্বরে আন্দোলন শুরু হয়। সেই পরিস্থিতিতে প্রমাদ গুনলেও আওয়ামী লীগ দ্রুত তা সামাল দেয়ার চেষ্টায় আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করতে নিযুক্ত হয়। তারা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তা দমন করতে না পারলেও তার ওপর একটা প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু এই প্রভাব সত্ত্বেও এই আন্দোলনের নেতৃত্ব যাতে আওয়ামী লীগ দখল ও দাবি করতে না পারে তার জন্য আন্দোলনের নেতারা সতর্কতার সঙ্গেই তাদের বাইরে রেখেছে। কেউ কেউ সে চেষ্টা করলেও তাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামে পানির বোতল মারা হয়েছে।

শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিসহ কোন দলকেই তারা দলীয়ভাবে আসতে দেয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটা এক মহাব্যতিক্রমী ব্যাপার। শাহবাগ চত্বরে শুরু হওয়া এই আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন হলেও আন্দোলনকারীরা একে ‘অরাজনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে এর দখল নিতে দেয়নি।

এর তাৎপর্য অপরিসীম। এর মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা বিদ্যমান দুই প্রধান রাজনৈতিক দলকে নেতৃত্ব থেকে বাতিল করেছে। অর্থাৎ তাদের ‘মাইনাস’ করেছে। এই মাইনাসের অর্থ এই নয় যে এ দুই দল ও তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা অন্য সব দল এই মুহূর্তে খারিজ হয়ে গেছে। তা হয়নি। তার জন্য আরো সময় ও অনেক বড় সংগ্রাম প্রয়োজন। বাস্তবে এক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা হল জনগণের চিন্তার গভীর দেশে এইসব রাজনৈতিক দল, এদের রাজনীতি বাতিলের (rejection) এক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটা ঘটতে চল্লিশ বছর লাগলেও বাংলাদেশের জনগণ এখন এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে তারা নিজেদের কোন ভবিষ্যৎ বিদ্যমান সংসদীয় রাজনীতি এবং সংসদীয় কোন রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের মধ্যে দেখেন না।

কিভাবে ভবিষ্যৎ রাজনীতি গঠিত হবে সে বিষয়ে কোন ধারণা না থাকলেও বর্তমান সংসদীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর কোন প্রকৃত কার্যকারিতা যে আর নেই তারই অঘোষিত বাণী এখন এই আন্দোলনের মধ্যে ধ্বনিত হচ্ছে। লক্ষ্য করার বিষয় যে এই প্রতিরোধ আন্দোলনে একটা উৎসবের আমেজ থাকলেও কোন বিশৃঙ্খলা নেই। লাখ লাখ অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়ে একসঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা থাকলেও কোন অশ্লীলতা, কোন যৌন অপরাধমূলক তৎপরতা দেখা যায়নি। সব রকম অপরাধের অভয়ারণ্য এই বাংলাদেশে এটা যে এক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় তা কে অস্বীকার করতে পারে?

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন এক ধরনের এক দফা আন্দোলন হিসেবে বাহ্যত পরিচালিত হলেও এর মধ্যে জনগণের ব্যাপক ক্ষোভ ও বিক্ষোভেরই প্রতিফলন ঘটছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ভাষার দাবিতে শুরু হলেও সে আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে ছিল মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান সরকারের সামগ্রিক শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্তের এক ব্যাপক আন্দোলন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন যেভাবে সংসদীয় দুই প্রধান রাজনৈতিক দল সহ এ ধরনের রাজনৈতিক দলগুলোকে নেতৃত্বের বাইরে রেখে তাদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করছে, তাদের মাঠ দখল করতে দেয়নি, এর তাৎপর্য যারা না বুঝবে তাদের পক্ষে এই আন্দোলনের প্রকৃত চরিত্র এবং এই আন্দোলন ভবিষ্যতে কী ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রামের শর্ত তৈরি করেছে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। আসলে এই আন্দোলনে অনেক রকম ধ্বনিই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এই ধ্বনির আড়ালে শোনা যাচ্ছে সারাদেশে বিদ্যমান শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক মৌলিক সমাজ পরিবর্তনের পদধ্বনি — বর্তমান সংসদীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে বাতিল করে জনগণ যে সংগ্রামের পথে পা বাড়াবেন, সেই সংগ্রামেরই পদধ্বনি।

(সমাপ্ত)

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতা – ভূমিকা ও তর্জমা: লেভিন আহমেদ

(C) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

(C) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ (১৩ ফেব্র“য়ারি ১৯১১ — ২০ নভেম্বর ১৯৮৪) উপমহাদেশের অন্যতম উর্দু কবি ও মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী। তিনি ১৯৬২ সালে বিখ্যাত লেনিন পুরস্কারে ভূষিত হন। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরতে গিয়ে জেলে যেতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ঝলসে উঠেছিল তার ক্ষুরধার লেখনী। তীব্র ভাষায় তিনি তখন পাক হানাদার বাহিনীর এই ভূমিকার সমালোচনা করেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ দেখে ফয়েজের চোখে যা ধরা পড়েছিল তা কেবল রক্ত নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু। ফয়েজ যা দেখেছিলেন গর্ভের খুনমাখা নবজাতক বাংলার গভীরে, তা রক্তের বয়ে চলার তাড়না। এই খুন জমাট-স্থির মৃত্যুস্বরূপ নয়। এই রক্ত প্রবহমান যা বাংলার অনাগত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক রঞ্জিত করে ছুটে যেতে চায়। ভাষার অধিক যা তাই যদি হয় কবিতা, তবে ফয়েজের কবিতা বাংলার রক্তস্নাত আবির্ভাবের স্থিরচিত্র ধরে রাখে নাই, বরং ধরেছিল তার প্রবহমানতা। শাহবাগের এই গণজোয়ার ইতিহাসের প্রবহমানতারই নিদর্শন যার নাম মুক্তিকামী রক্তস্রোত। এহেন ইঙ্গিত আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন কবিদের বিপ্লবী শ্রী ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ।

কোথাও কোন চিহ্ন নেই খুনের

কোথাও কোন চিহ্ন নেই,
কোথাও কোন চিহ্ন নেই খুনের
নেই কোন রক্তের দাগ
আততায়ীর হাতে
অথবা নখের কোনায়

জামার হাতা
দেয়ালে
অথবা ছোরায়
বেয়নেটের মাথায়
চিহ্ন নেই,
কোথাও কোন চিহ্ন নেই খুনের।

এই অদৃশ্য খুন ঝরেনি কোন রাজার খাতিরে
বদান্যতার প্রতিদানস্বরূপ, অথবা ছিল না তা কোন ধর্মীয় উৎসর্গ

পারমার্থিক মুক্তির প্রত্যাশায়
যুদ্ধক্ষেত্রে এই খুন ঝরেনি খ্যাতির আশায়
উদ্যাপিত হয়নি কোন ব্যানারের হরফে।

আব্বা-আম্মা খুনের এই এতিম রক্ত চিৎকার করেছে
ন্যায়বিচারের জন্য;
যদিও কারও সময় হয়নি এই আর্তনাদ শোনার।

কোন সাক্ষী ছিল না, ছিল না কোন প্রত্যক্ষদর্শী;
অভিযুক্ত হয়নি কেউ।
এই রক্ত তাদেরই যারা ধুলোয় ঘর বেঁধেছিল,
অন্তিমকালে ধুলির তরেই এই খুন মিশে গেছে ধুলোয়।

চল আজ বাজারে চল

অশ্রু ভেজা চোখ, কম্পিত হৃদয়
আর গোপন প্রেমের অনুনয় যথেষ্ঠ নয় আজ।
শৃঙ্খলিত পায়ে তাই চল আজ জনসমক্ষে চল।

চল উন্মীলিত করতলে উদ্দাম নৃত্যসহ গানে,
ধুলিভর্তি মাথা আর খুন নিয়ে বুকে,
চল যাই যখন সারা শহরের প্রেমিকেরা
তাকিয়ে আছে শুধু আমাদেরই পানে।

শহরের শাসক ও কৌতূহলী জনতার ভীড়
অভিযোগের তীর এবং পাথরের ঢিলে
এই বিষণ্ণ সকাল আর নিরুদ্দেশ দিনে
আমরা ছাড়া এখানে জীবন দেয়ার কে আছে?
আমরা ছাড়া এই শহরে কারাই বা প্রস্তুত?

ঘাতকের হাতের উপযুক্ত আমরা ছাড়া আর কারা?

পাততাড়ি গোটাও হে ভগ্ন হৃদয়
বন্ধু চলো যাই
মরি ঘাতকের হাতে আবার।

লাহোর জেল, ১৯৫৯