Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ৩৮

কবি বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ : দ্বিতীয় পর্ব–মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

এমতাবস্থায় ভারতের কোন সীমান্ত এলাকায় চলে যাওয়া তোমাদের জন্য উত্তম হবে। ভারতীয় বেতার শুনে মনে হচ্ছে ওরা আমাদের সংগ্রামের সমর্থক। কাজেই একজনও যদি ভারতীয় শ্রোতা পাওয়া যায় ওতেই কাজ হবে। ওদের বেতার থেকে তা ভালোভাবে ফ্ল্যাশ করা হবে। অন্যদিকে ট্রান্সমিটারটি ভারতীয় সীমান্তে ইনস্টল করা হলে নিরুপদ্রবে অনুষ্ঠান প্রচার করে যাবে। তাঁর ভাষায়, ‘ওখানেও ওদের যন্ত্রে ধরা পড়বে, ঠিক কোন জায়গা থেকে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু ওরা বিমান হামলা করতে পারবে না। কারণ বর্ডার এলাকায় বোমা ফেলার জন্যে ডাইভ দিতে গেলে বিমানের ‘ল্যাজ’ ইন্ডিয়ার ওপর দিয়ে ঘুরে যাবে। তখন তো রক্ষা নেই।’

মোসলেম খানের পরামর্শে ভারতের সীমান্ত অঞ্চল রামগড়ে ট্রান্সমিটারটি নিয়ে যাওয়ার নিয়ত করে তারা। ২ এপ্রিল পটিয়া থেকে রামগড় যাওয়ার সহজ নির্বিবাদ রাস্তার খোঁজখবর নেয়া হয়। ১ কিলোওয়াটের ট্রান্সমিটারটি দু’একদিনের মধ্যে রামগড় পাঠাবার দায়িত্ব নেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী। ৩০ মার্চ বোমা হামলার পর থেকে ১০জনের ক্ষুদে টিমের দু’জন আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ও রেজাউল করিম চৌধুরী বিচ্ছিন্ন ছিল। ৩ এপ্রিল সকালে ড্রাইভার এনামুল হকের লিভার ব্রাদার্সের মাইক্রোবাসে ঐ ২ জন ছাড়া বাকি ৮ জন ও সেকান্দার হায়াত খানসহ ওঁরা রমাগড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। (ড্রাইভার এনামুল হকের এই মাইক্রোবাসেই ৩১ মার্চ কালুরঘাট থেকে ওঁরা ৯ জন পটিয়ায় আসে।) যাওয়ার পথে ফুলতলিতে ভাগ্যক্রমে তাঁদের সাথে মোলাকাত হয় নইলে হয়তো তাঁরা বিচ্ছিন্নই থাকত। তাঁদের রুট ছিল, পটিয়া-ফুলতলি (বোয়ালখালি)-কপ্তাই-রাউজান-নাজিরহাট-ফটিকছড়ি-রামগড়। রামগড়ে পৌঁছার মধ্যদিয়ে সমাপ্তি ঘটে দমহীন কর্মব্যস্ত একটি পর্বের। বেলাল মোহাম্মদের বয়ানে মোটামুটি এইটুকুই ছিল ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৩টি পর্যায়ের আদি বা প্রথম পর্যায়।

‘৩ এপ্রিল সন্ধ্যা হয় হয় সময়ে আমরা রামগড়ে পৌঁছেছিলাম। সীমান্ত নদীর তীরে রামগড় থানা।… থানার সামনে মাইক্রোবাস থেকে নেমেই এইচ টি ইমামের সম্মুখীন হয়েছিলাম।… কাছে টেনে নিয়ে কানের কাছে মুখ রেখে বলেছিলেন: ইন্ডিয়ান অথরিটি একটা ট্রান্সমিটার দিয়েছেন গতকাল। চালাবার লোক নেই। এখনই দু’জন ব্রডকাস্টারকে নিয়ে নৌকায় ওঠো। একজন বাংলার, একজন ইংরেজির।’

ঐ দিন সন্ধ্যায় তাঁরা সীমান্ত পার হয়ে সাবরুম থানায় ঢোকে। এরপর আরও প্রায় দেড় ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা বাগাফা পৌঁছায়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯২ হেড কোয়ার্টাস। তারপর খানিক পথ যাওয়ার পর একটি বাঁশের ঘরের সামনে তাঁদের জিপ থামে। ঐ দিনই রাত ১০ টায় ঐ ঘরের ২০০ ওয়াট শক্তির শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে সম্প্রচার করা হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্যারের প্রথম অধিবেশন। এই অধিবেশনটির স্থিতিকাল ছিল প্রায় ১ ঘন্টা।

তাঁদের সাথে মেজর জিয়াউর রহমানের এখানে আবার দেখা হয়। জিয়াউর রহমান ও এইচ টি ইমামসহ তারা ঐ রাতেই রামগড়ে ফিরে আসে। ৪ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৬ জন কর্মী রামগড় থেকে  স্থায়ীভাবে বাগাফায় চলে আসে। সাথে ছিল এ কে খানের ছোট ছেলে শামসুদ্দীন খান জাম্বু। আর একজন ভারতীয় শিখ — ট্রান্সমিটার অপারেটর — অমর সিং। এই টিমটা শালবাগান যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওখান থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্যক্রম চালায়। ৪ এপ্রিল রামগড় থেকে সবাই বাগাফা গেলেও ৬ জন ছাড়া বাকিদের রামগড়ে প্রত্যাগমণ করতে হয়েছিল। কারণ  বাগাফা হেড কোয়ার্টাসের ভারপ্রাপ্ত অফিসার কর্নেল (?) ঘোষ ৩ এপ্রিল বলে দিয়েছিল, ‘ইয়ংম্যান, তোমরা ছ’জন পারমানেন্টলি চলে আসবে। রোজ আনা-নেয়ার ট্রান্সপোর্ট দেয়া যাবে না।’

সীমান্ত রক্ষীবাহিনী হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নেয় তাঁদেরকে আর  বাগাফায় রাখা হবে না। স্থানান্তরিত করা হবে শালবাগানে। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ হেড কোয়ার্টাসে। শালবাগান আগরতলা শহরের সন্নিকটে। যেখানে বাংলাদেশের নেতাদের অফিস আছে। ফলে সংবাদ তথ্য সংগ্রহের সুবিধা হবে। তাছাড়া এখানে ৪০০ ওয়াট শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। ৮ এপ্রিল বাগাফায় সকাল বেলার অধিবেশন শেষ করে শালবাগান অভিমুখে রওয়ানা করা হবে। সান্ধ্য অধিবেশন প্রচার করা হবে শালবাগান থেকে।

‘শালবাগানে আমাদের রিসিভ করেছিলেন কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ ব্যানর্জী। সিভিল পোশাকধারী সুদর্শন প্রৌঢ়। সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর তথ্য ও জন-সংযোগ বিভাগের লোক। …বলেছিলেন: এক দু’দিন বিশ্রাম। এখানে সিগনাল থেকে অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করা হবে। সব ঠিকঠাক করা লাগবে। এই সুযোগে আপনারা ভালো প্রোগ্রাম তৈরি করুন। কথিকা লিখুন।’

শালবাগান ট্রানজিট ক্যাম্পে বেতার কর্মীদের থাকা খাওয়ার অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। কালুরঘাট ত্যাগের পর থেকে বলতে গেলে তাঁরা এক কাপড়েই ছিল। শালবাগানে কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ ব্যানার্জী কুঞ্জবনে এম আর সিদ্দিকীদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মীদের ব্যাপারে বলে তিনি আগরতলার বাইরে গিয়েছিলেন। বেতার কর্মীদের ভাল মন্দ দেখ ভাল করার কথা বলে গিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে বেতার কর্মীদের করুণ অবস্থা দেখে মনে খুব আঘাত পান। সব পরিকল্পনা বাতিল করে তিনি তাদের নিয়ে কুঞ্জবনে যান। আগরতলা শহরের প্রান্তিক এলাকা কুঞ্জবন। কৃষি বিভাগের রেস্ট হাউসে এম আর সিদ্দিকীর অফিসের সামনে জিপ থামে। সিদ্দিকী মহোদয়ের উপর খুব চটে গিয়েছিলেন ব্যানার্জী বাবু। ‘অমনি ফেটে পড়েছিলেন কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ বানার্জী। বলেছিলেন: ওরা কেমন আছে, দেখতেই তো পাচ্ছেন।… খাওয়া-শোওয়া কিছুরই ব্যবস্থা তো ছিল না ওদের এই তিনদিন! এভাবে থাকতে হলে কি করে কাজ করবে?’

অবস্থাগতিকে স্থির হয়েছিল, ‘আর সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সঙ্গে নয়, আগরতলা শহরেই আমাদের রাখা হবে। আমাদের ট্রান্সমিটারের কাছে নেয়া হবে না।… সবই হবে পূর্বাহ্নে রেকর্ডকৃত।… সেই জিপ-এ করেই উপনীত হয়েছিলাম ৯১২, কর্নেল চৌমুহনিতে। আগরতলা শহরের প্রাণকেন্দ্র। বেশ বড়োসড়ো বাড়িটি। অনেকগুলো কক্ষ এবং একখণ্ড প্রাঙ্গণ।’

তালেবেতালে ৮ এপ্রিল সকালে বাগাফায় প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত এই সাড়ে ৩ দিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল স্তব্ধ। সম্প্রচার করা যায়নি কোন অনুষ্ঠান।

‘৮ এপ্রিল প্রভাতী অধিবেশনের পর তিনদিন বিরতি। আবার শুরু হয়েছিল ১২ এপ্রিল প্রভাতী অধিবেশন দিয়ে। … ৪০০ ওয়াট ক্ষুদ্র তরঙ্গ ট্রান্সমিটার। মিটার ব্যান্ড ৮৩.৫৬।’ ১২ এপ্রিল অধিবেশনের অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হয়েছিল সার্কিট হাউসের বাড়িতে। পরবর্তী অনুষ্ঠানের যাবতীয় রেকর্ডগুলি হয়েছিল সার্কিট হাউসের গ্যারেজ কক্ষে। ‘পরবর্তী দিনগুলোতে গ্যারেজকক্ষেই রেকর্ডিং-এর ব্যাবস্থা চালু হয়েছিল। টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেটে অনুষ্ঠান রেকর্ড করা হতো। সেই রেকর্ডিং কর্নেল শঙ্করপ্রসাদ বানার্জী নিয়ে যেতেন এবং ট্রান্সমিটিং-এর ব্যবস্থা করতেন।’

কর্নেল চৌমুহনিতে তাঁদের বেতারের কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন করতে বলা হয়েছিল। এত পরিচিত মুখের ভিড়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা ছিল যারপরনাই কঠিন। এ ব্যাপারটি জানানো হয়েছিল ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে।

বেতার কর্মীদের গোপনীয়তার খাতিরে ২০ এপ্রিল তাঁদের জেল রোডের বাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। এ বাড়িতে ঢোকার পূর্বে সবার নাম পাল্টানো হয়েছিল। বেলাল মোহাম্মদ নিয়েছিল লালমোহন ছদ্মনাম। “আমার বাল্যস্মৃতিসমৃদ্ধ প্রিয় নাম। সন্দ্বীপের মুসাপুর গ্রামের  লালমোহন সেন ছিলেন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের কনিষ্ঠতম (?) সদস্য। … মুস্তফা আনোয়ার নাম নিয়েছিল ‘শক্তি’; প্রিয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নামে। আবুল কাসেম সন্দ্বীপ ‘সুভাষ’; সুব্রত বড়–য়া ‘সুনীল’; পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকদের নাম।” এখানে মেস করে খাওয়া দাওয়া করত। পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু এক মহিলাকে রাখা হয়েছিল রান্নাবান্না করার জন্য।

ইতিমধ্যে, ‘১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি রামগড়ে আনা হয়েছিল ১০ এপ্রিল বেলা ২টায়। বাশেদুল হোসেন ও আমিনুর রহমান রামগড় থেকে পটিয়া ফিরে গিয়েছিলেন ট্রান্সমিটারের জন্যে। গিয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর জিপে। ফটিকছড়ি হয়ে হাটহাজারি-গহিরা-মদনহাট-রাঙ্গুনিয়া-পাহাড়তলি-চন্দ্রঘোনা-কাপ্তাই। কর্ণফুলি নদী পার হয়ে বান্দরবান-দোহাজারি-পটিয়া, পটিয়ায় মেজর মীর শওকত আলীর সঙ্গে তাঁদের দেখা। কিন্তু পটিয়া মাদ্রাসায় ট্রান্সমিটারটি ছিল না। (উল্লেখ্য, ১৭ এপ্রিল পটিয়া মাদরাসায় বোমা  ফেলা হয়েছিল। আর এ এলাকার এম এন এ অধ্যাপক নূরুল ইসলাম চৌধুরীর সদস্যপদ বাতিল করা হয় ট্রান্সমিটার চুরির অজুহাতে।) সরিয়ে নেয়া হয়েছিল বান্দরবানের সি এন্ড বি গুদামে। রাশেদুল হোসেন ও আমিনুর রহমান ৮ এপ্রিল সকালে দোহাজারি হয়ে বান্দরবানে পৌঁছেছিল। ওয়াপদা-র একটি পিক-আপ-এ তোলা হয়েছিল ট্রান্সমিটার ও যন্ত্র সরঞ্জাম। আবার ফিরতি পথচলা। চন্দ্রঘোনা হয়ে রাঙ্গুুনিয়া-পাহাড়তলি-মদনহাট-গহিরা-হাটহাজারি-ফটিকছড়ি।… ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার ইনস্টল করার স্থান নির্দিষ্ট হয়েছিল বাগাফা-বেলোনিয়া  সড়কসংলগ্ন ফরেস্ট হিল-এ। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দশ মাইল দূরে।…  …১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি ১২ এপ্রিল যথাযথভাবেই ইনস্টল করেছিলেন তাঁরা। এবং নিজেদের কণ্ঠে ঘোষণা প্রচার, রেকর্ডেও গান প্রচার ছাড়াও সৈয়দ আবদুশ শাকের নিজের লেখা কথিকাও প্রচার করেছিলেন।’ এই ট্রান্সমিটার থেকে সম্ভবত ২৪ মে পর্যন্ত  অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়েছিল। ‘সেটি ২৪ মে ১৯৭১-এর পর থেকে আগরতলায় সংরক্ষিত ছিল। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ নং হেড কোয়ার্টার্সে — শালবাগানে। পরে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।’

২০ এপ্রিল রাতে ‘আকাশবাণী’র খবর শুনতে গিয়ে তাঁরা চমকিত হয়েছিল। ‘সংবাদ বুলেটিনের মধ্যেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল: ‘এই খররের পরপরই এখানে শ্রুত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাষণ পুনঃপ্রচার করা হবে।’

অথচ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র  থেকে স্থায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রচার করা হয়নি। ব্যাপারটি হচ্ছে, “অল ইন্ডিয়া রেডিও-র শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে ভাষণ প্রচার করেছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। সেটা আরো আগে। এপ্রিলের প্রথম দিকে (১২)। শিলিগুড়ি কেন্দ্রের একটি অতিরিক্ত (স্পেয়ার) ট্রান্সমিটার এজন্যে ব্যবহার করা হয়েছিল। তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ প্রচারের তাগিদে ট্রান্সমিটারটির নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। তখন থেকে ট্রান্সমিটারটি নিবেদিত  হয়েছিল নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচারের জন্যে। মিডিয়াম ওয়েভে ট্রানজিস্টার সেটে আমরা একদিন পেয়ে গিয়েছিলাম। ঘোষণা শুনেই চমকে উঠেছিলাম। ‘সোয়াধীন বাংলা বেয়তার কেনদর’ পরিষ্কার একটি অবাঙালি কণ্ঠ।”

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ

বিভ্রান্তি ঠেকাতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে বলে কয়েক দিন পরেই এ সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একটা ব্যাপার চোখে পড়ার মত, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কালুরঘাট থেকে ভারতে চলে যাওয়ার পরেও অস্থায়ী সরকারের নেতাদের বিভিন্ন ঘোষণা, প্রচারপত্র বা সংবাদ ভারতীয় প্রচার মাধ্যমে হচ্ছে। এটা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতি বাংলাদেশি নেতৃত্বের অমনোযোগিতার প্রকাশ। মূলত ২৫ মে অবধি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভাল মন্দ সরাসরি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতেই ছিল।

কালুরঘাট পর্যায়ে যথা সময়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচার ছিল দুঃসাধ্য কাজ। আগরতলা পর্যায়েও প্রথম দিকে ধরাবাঁধা সূচিতে কাজ চালানো যায় নাই। তবে এ পর্যায়ের শেষের দিকে অনুষ্ঠানের রূপরেখা দাঁড়িয়েছিল এরকম, প্রথম অধিবেশন: সকাল ৮:৩০ মি. থেকে ৯:৩০ মি. (বাংলাদেশ সময়); স্থিতিকাল এক ঘন্টা। দ্বিতীয় অধিবেশন: বিকাল ৫:০০ মি. থেকে সন্ধ্যা ৭:০০ মি অথবা ৮:০০ মি. থেকে ১০.০০ মি. (বাংলাদেশ সময়)। স্থিতিকাল ২ ঘন্টা।  কোন কোন সময় আড়াই ঘন্টা।

২৫ মে বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নং দ্বিতল বাড়িতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটিই ছিল তাঁদের নিবাস। অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হত তাঁদের অজ্ঞাত ৪০০ ওয়াট শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটার থেকে। তাঁদেরকে শালবাগান থেকে আরও ভিতরে কর্নেল চৌমুহনি পরবর্তীতে জেল রোডে রাখা হলেও অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হত সম্ভবত শালবাগানের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর ৯১ হেড কোয়ার্টারের আশপাশের এলাকা থেকে। ২৫ মে সকালের অধিবেশনের মধ্যদিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্বের পরিসমাপ্তি হয়। শর্টওয়েভ মারফত এটিই ছিল সর্বশেষ অনুষ্ঠান।

এরিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তারা আগরতলা, কলকাতায় ভীড় জমাতে থাকে। তাছাড়া কলকাতার সর্বত্র ছিল বাংলাদেশের নানা বয়সী অগণিত কবি, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, অভিনেতা, সংবাদ পাঠক, বুদ্ধিজীবীসহ নানা ঘরানার লোকজন। তরুণরা ছিল সংখ্যায় এগিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ অন্যান্য পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের একটি গঠনমূলক পুর্ণাঙ্গ কাঠামো অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশি নেতৃবৃন্দের কাছে  এর প্রয়োজনীয়তা  ক্রমে গাঢ়তর হতে থাকে।

সব মিলিয়ে উপর মহলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২৫ মে সান্ধ্য অধিবেশন কলকাতা থেকে ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভে প্রচারের প্রস্তুতি নেয়া হয়। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে আসা বেতারের কিছু কর্মকর্তাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর আগরতলায় সকালবেলার অধিবেশন শেষ করে জেল রোডের অবস্থানরত কর্মকর্তাদের একটি অংশ কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করে। মুস্তফা আনোয়ার ও বেলাল মোহাম্মদ ২৬ মে দুপুরে কলকাতা পৌঁছায়। বালিগঞ্জের সার্কুলার রোডের ৫৭/৮ নং দ্বিতল একটি বাড়িতে তাঁরা থাকতেন। নির্বাসিত সরকারের মন্ত্রী কামারুজ্জামান ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রীরা এ বাড়িতে থাকতেন। এক্ষেত্রে পি কে কাউল ছিলেন ভারতীয় তত্ত্বাবধায়ক।

২১/এ, বালু হাক্কাক লেনে ছিল সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার অফিস। সংগ্রামী সরকারের বেতার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত এম এন এ আবদুল মান্নান সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’র অফিসেই বসতেন। কারণ তিনি ‘জয় বাংলা’রও সম্পাদক। এখানে একটি খাতা খোলা হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে যারাই কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দিচ্ছিল তাঁদের এই খাতায় পরিচয় নিবন্ধন করা ছিল ফরজ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ৩য় পর্যায়ে এসে নতুন বাঁক নেয়। এ পর্বে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার তার সার্বজনীন চরিত্র হারিয়ে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের মুখপাত্র হয়ে উঠে। ২য় পর্যায়ে ‘আমিনুল হক বাদশার সঙ্গে আমার ক্ষীণ মতভেদ দেখা দিয়েছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পলিসিগত ব্যাপারে। তিনি চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নামে কিছু প্রচার করতে। আমি প্রতিবাদী হয়েছিলাম। আমাদের লক্ষ্য, দেশ থেকে হানাদারদের উৎখাত করা। এজন্যে দেশ-বিদেশে জনমত গড়ে তোলা। আমাদের কার্যক্রম কোনো দলীয়ভিত্তিক নয়, বরং বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক।… আগরতলায় আমার সঙ্গে মতভেদ দেখা দিয়েছিল আমিনুল হক বাদশার। সেটা বেশিদূর গড়ায়নি। মুজিবনগর বা ৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার পর্যায়ে প্রশ্নটি প্রকটতর হয়েছিল।’

“বেতারের নীতিমালার প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়েছিল।… তখন একটি ছিন্নপত্রে আমি একটি মুসাবিদা করেছিলাম। ‘প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ গণ সরকার’-এর লেটার-হেড-এ, মুসাবিদাটি কোনো কাজে আসেনি।”

এ মুসাবিদার কয়েকটি ধারা এ রকম : “ক. এ হচ্ছে একটি নব বিকশিত জাতীয়তাবাদের প্রচার-যন্ত্র-যে জাতি ধর্মবর্ণ দলমতের ঊর্ধ্বে সাড়ে সাত কোটি মানুষের স্বাধীনতাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে উদ্বুদ্ধ, ঐক্যবদ্ধ। এ প্রচার-যন্ত্র কোনো বিশেষ দলীয় সঙ্কীর্ণতা পোষণ করতে পারে না। খ. একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে জাতীয় যুদ্ধের একমাত্র ধারকবাহক বলে বিবৃত করা হলে এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধের মর্যাদা দেয়া হয় না — ফলে বিশ্বের গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের আনুকূল্য পাওয়া দুষ্কর। একটি পার্টির প্রতি নয়, বরং জনগণের প্রতি সহায়তা আশা করাই সঙ্গত। গ. ছোটদের জন্যে প্রতি রবিবার ‘জ্ঞানের আলো’ প্রশ্নোত্তরের আকারে পরিবেশনা করা হয় — ওতে ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন এবং নগ্ন জবাবে শুধু আওয়ামী লীগের কথাই বলা হয়। এটা নিঃসন্দেহে ইতিহাসকে বিকৃত করারই শামিল এবং ওয়াকিবহাল মহলে ও বাংলার গণমনে এর প্রতিক্রিয়া বিরূপ হওয়া স্বাভাবিক। ঘ. কথিকা প্রচারের জন্যে বেশির ভাগই বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োজিত করা দরকার — তাঁরা যে-কোনো মতাদর্শের অনুসারীই হোন না কেন! এখন হচ্ছে রাজনৈতিক দলমতের ঊর্ধ্বে দেশের স্বাধীনতার একক প্রশ্ন।”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই ভাগে কথক নির্বাচনের জন্য ক্লিয়ারেন্স নেয়া, লেখা দেখিয়ে নেয়ার একটা নিয়ম করা হয়েছিল। যা বেতারকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যমকে স্তিমিত করে দিয়েছিল। এ কানুন কিন্তু এম আর আখতার মুকুল, ফয়েজ আহমদ বা আব্দুল তোয়াব খানদের বেলায় প্রযোজ্য ছিল না।

বেলাল মোহাম্মদের একটি লেখা থেকে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি কেটে দেওয়া হয়েছিল। “আমার একটি পাণ্ডুলিপিতে ‘জনযুদ্ধ’ শব্দটি ছিল।… : আরে, আরে! এটা কি লিখেছেন? ‘জনযুদ্ধ’ তো মাও সে তুং-এর কথা! এই অংশটুকু প্রচার করবেন না।… কেটে দেয়া হয়েছিল একটা প্যারাগ্রাফ। সে কথিকাটি আমি আর প্রচার করিনি। এর পরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে  লেখার উৎসাহ হারিয়েছিলাম।”

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের আগরতলা পর্ব সরাসরি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও অনুষ্ঠান পরিকল্পনায় বেতারকর্মীরা কোন চাপে ছিল না। এই সময়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মূলত নিরাপত্তা, টেকনিক্যাল দিক, ভরন পোষণের দিকটা দেখত। বেতারে ছিল কর্মীদের স্বরাজ। যাবতীয় কর্মকাণ্ড ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযুদ্ধের সার্বজনীন চরিত্র ছিল অক্ষুণœ। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২৫ মে ১৯৭১ পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে ঐ (ঊঃযরপং) ছিল অক্ষুণœ। (২৫ মে পর্যন্ত) স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়।’

স্বাধীন বাংলা বেতারের  ২য় পর্ব পর্যন্ত অনুষ্ঠানের শুরুতে কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের প্রয়োজন পড়েনি। কলকাতা পর্বে ফিক্সড পয়েন্টে অনুষ্ঠান চালু হওয়ার পর থেকে কোরান তেলওয়াতের মাধ্যমে শুরু করা হতো। সিডিউল করে সপ্তাহের বিভিন্ন দিন পাঠ করা হতো গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক। বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা চালু হওয়ার পর প্রথম দিকে অধিবেশনের শুরুতে কোরান বা কোন ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠ করার রেওয়াজ ছিল না। ১০ জানুয়ারীর পর কোন এক সময়ে আবার ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির আলোকে পরপর কোরান-গীতা-ত্রিপিটক-বাইবেল (পাঠ করা হতে থাকে)।  সরকারি জনসভায়ও একই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল।’

তবে কালুরঘাট পর্বে “৩০ মার্চ প্রভাতী অধিবেশন থেকেই সমাপ্তি ঘোষণায় এই কথাটি চালু করেছিলাম: ‘আল্লা রাব্বুল আলামীন বলেছেন, আমি তখনই কোনো জাতিকে সাহায্য করি, যখন সে জাতি নিজেকে সাহায্য করে।’ কথাটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সমাপ্তি হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।”

পর্যাপ্ত সিনিয়র জুনিয়র বেতার কর্মকর্তা ও বিভিন্ন জমিনের এক ঝাঁক কুশীলবদের সমবেত অংশগ্রহণে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অনেকটা পরিপূর্ণ বেতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। ‘৫০ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারের অনুষ্ঠান শুরু করার প্রস্তুতিপর্বে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন এম আর আখতার, পটুয়া কামরুল হাসান ও আমিনুল ইসলাম বাদশা।’

বিশাল পরিসরে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। ‘নতুন নতুন অনুষ্ঠান হয়েছিল সংযোজিত। প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল ফিক্সড্ পয়েন্ট-এর। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানের নির্দিষ্ট সময়-সূচি। সংবাদ বুলেটিন প্রচারের সময় ও স্থিতিকাল। ধারাবাহিক কথিকাসমূহের প্রচার-সময়। সপ্তাহিক অনুষ্ঠানের প্রচার-বার। নাটক জীবন্তিকার ফ্রিকোয়েন্সি। উর্দু অনুষ্ঠানের প্রচার-সময়। ইংরেজি অনুষ্ঠানের প্রচার-সময়।… ফিক্সড্পয়েন্ট তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। ও কাজটি অনুষ্ঠান প্রযোজক-সংগঠকদের। সহকর্মী তাহের সুলতান সহযোগিতা দিয়েছিলেন।’

একটু আগেই উল্লেখ করা হল এম আর আখতার মুকুলের কথা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ২য় পর্ব তথা ২৫ মে পর্যন্ত কার্যক্রমে তাঁর কোন নামগন্ধ ছিল না। কলকাতা পর্বে অর্থাৎ স্বাধীন বাংলা বেতারের ৩য় পর্যায়ে মঞ্চে দ্রুত আলো ছড়াতে থাকে এম আর আখতার মুকুলরা। বলা বাহুল্য এ পর্যায়ে এসে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের উপর আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়েছিল। এম আর আখতার মুকুলসহ অনেকেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কালুরঘাট ও আগরতলা পর্বকে ধামাচাপা দিতে চাইত। তাঁরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস হিশেবে ২৫ মে রাষ্ট্র করতের উদ্যোগী হয়েছিল। ‘১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক এম আর আখতার উদ্যোগী হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের জন্যে। চট্টগ্রামে  টেলিফোনে তিনি আমাকে বলেছিলেন, ২৫ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন করতে চান ঢাকায়। উত্তরে আমি বলেছিলাম: ২৫ মে? ঐ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা দিবস তো ২৬ মার্চ।… সেই অভিনব উদ্যোগ সম্পর্কে পরে আর জানতে পারিনি।’

বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিবৃত্ত, ইতিহাস আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে নানাবিধ প্রসঙ্গ এসেছে। কমরেড দেবেন শিকদারের তৎপরতায় জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলার প্রসঙ্গটি এরকম: ‘কমরেড দেবেন শিকদার ৬ এপ্রিল রাজশাহী জেল ভেঙে বেরিয়েছিলেন। সীমান্ত পেরিয়ে আসার উদ্দেশ্য বলেছিলেন, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলা।… অমূল্য লাহিড়ীকে পাঠানো হয়েছিল মণি সিংহের কাছে। মীজানুর রহমান চৌধুরীকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমদের কাছে। মশিউর রহমান (জাদু মিয়া) ও আবু নাসের ভাসানীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে যোগাযোগের। আমার ওপর দায়িত্ব ছিল আগরতলায় আবুল বাশার, কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে আলোচনা করার। এছাড়া যদি সম্ভব হয়, আতাউর রহমান খান এবং মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গেও যোগাযোগের। ১৮ এপ্রিল সবাই পুনর্বার সম্মিলিত হয়েছিলাম টাওয়ার হোটেলে। অমূল্য লাহিড়ী জানালেন, মণি সিং চীনপন্থীদের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট করতে রাজি নন। কারণ তাতে ‘দেবী’র সায় নেই।’

ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রসঙ্গটিও মজার ও লক্ষ্য করার মত। মোজাফফর আহমদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রশংসা করলেন। পরিচয়ের প্রথম দিনই, ‘জনান্তিকে নিম্নকণ্ঠে বলেছিলেন: আপনি তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করছেন। ওদের নিজেদের ভেতরে ঐক্য নেই। মোস্তাক হলো আমেরিকাপন্থী, আর তাজউদ্দিন আমাদেরপন্থী। দুইজনের মধ্যে দারুণ ক্ল্যাশ।… আমি নীরব ছিলাম। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কুমিল্লার আঞ্চলিক ভাষায় প্রশ্ন করেছিলেন: দুইজনের মধ্যে যে ক্ল্যাশ, সেটা খেয়াল কইচ্ছেন নি?… : জ্বি না। (কয়েক দিন পরে) : জানেন তো নিশ্চয়, এই তো সেদিন মোস্তাক আর তাজুদ্দিনের মধ্যে এক চোট হয়ে গেছে।…: জি না, স্যার। আমি কিছুই জানি না।…  অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ অনুযোগ দিয়ে বলেছিলেন: দূর, মিয়া! ওদের ভেতরে থাকেন। কিচ্ছু খেয়াল করেন না। সব জেনে আমাদের জানাবেন তো!… উত্তরে সঙ্গে সঙ্গে আমি বলেছিলাম: আমি কি আপনার এজেন্ট, স্যার?’

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর জন্মলগ্নে মুশতারী লজের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সঙ্গত কারণে বইটিতে নানাভাবে ডা. এম শফী পরিবারের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। আমাদের এই আলোচনায়ও তাঁদের ভূমিকার কথা শুরুর দিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

২৭ মার্চ ন্যাপ নেতা চৌধুরী হারুন অর রশীদ এক ট্রাক গোলাবারুদ নিয়ে ‘মুশতারী লজে’ গিয়েছিলেন। দোতলার ‘টু-লেট’ লাগানো ঘরটিতে সেগুলো রেখেছিলেন। ডা. শফীকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘ভয়ের কারণ নেই। ঘরটি তালাবদ্ধ থাকবে। ব্যাক ডেটে একটি ভাড়াটের দলিল স্বাক্ষর করা হবে। বাড়িওয়ালা যেন কিছুই জানেন না। ভাড়াটে মাস দু’য়েক আগে তালা দিয়ে কোথাও চলে গেছেন।’

৭ এপ্রিল সকাল বেলা পাক হানাদার বাহিনী হানা দিয়েছিল ‘মুশতারী লজে’। ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর হাতে দেয়া হয়েছিল একটি অভিযোগপত্র! স্থানীয় অবাঙালিদের স্বাক্ষর ছিল ওতে। বিচিত্রসব অভিযোগ আনা হয়েছিল। ‘মুশতারী লজ’র দুইজন মাত্র প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ডা. মোহাম্মদ শফী ও বেগম মুশতারীর একমাত্র ছোট ভাই খোন্দকার এহসানুল হক আনসারীকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিগ্রেডিয়ার বেগের কাছে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ডা. শফী ছিলেন ব্রিগেডিয়ার বেগের দাঁতের ডাক্তার। তাই সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

“ঘন্ট দু’য়েক পরেই আবার এসেছিল হানাদারের আর একটি দল। লক্ষ্য, দোতলার ঘর তল্লাশি করা।… তালা ভাঙা হয়েছিল দোতলার ঘরের। কিছুই ছিল না আসবাবপত্র। শুধু কয়েকটি কাঠের বাক্স। গোলাবারুদের বাক্স। বাক্সের গায়ে লালকালিতে জ্বলজ্বল করছিল লেখা — ‘২৭ মার্চ ১৯৭১’। লেখাটি ইংরেজি হরফে।… এর পরে হানাদার দলপতির কাছে কোনো কৈফিয়ৎ দেবার উপায় ছিল না।… এই দুজনকে এবারে পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আর ফিরে আসেননি তাঁরা।”

এরপর সাত সন্তানের জননী বেগম মুশতারী শফী ১৬ বছর বয়সী বড় কন্যাকে চট্টগ্রামে আত্মীয়ের বাসায় রেখে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় চলে গিয়েছিলেন গ্রামের দিকে। অতিকষ্টে এক সময় পৌঁছে গিয়েছিল কলকাতায়। স্বাধীন বাংলা বেতারের ৩য় পর্যায়ে তিনি ছিলেন নিয়মিত কথিকা পাঠক। উম্মে কুলসুম ছদ্মনাম নিয়েছিলেন। ছদ্মনাম নিয়েছিলেন পাছে স্বনামে তাঁকে চিনে ফেলতে পারে পাক হানাদার বাহিনী। আর এতে করে তাঁর সহধর্মী ও ছোট ভাই জীবিত থাকলে তাঁদের উপর নির্যাতন বেড়ে যাবে বা তাঁদেরকে হত্যা করা হবে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে এসেছিলেন ডা. শফী। পেশায় ছিলেন দাঁতের ডাক্তার। “আধুনিক দন্ত্য চিকিৎসায় পারদর্শী তিনি — খুব সহজেই তাঁর পসার জমে উঠেছিল। শহরের প্রাণকেন্দ্র এনায়েত বাজারে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছিলেন। স্ত্রীর নামে বাড়ির নাম: ‘মুশতারী লজ’।”

‘ডাক্তার মোহাম্মদ শফী ছিলেন একজন সহজ-সরল বাঙালি। বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কে মস্কোপন্থী বা চীনপন্থী, তার ধার ধারতেন না। যিনিই জেল খেটেছেন, তিনিই তাঁর শ্রদ্ধার পাত্র। যাঁরই নামে হুলিয়া আছে, তাঁকেই তিনি আশ্রয় দেবেন।’

ডাক্তার শফীর অধুনিক মননের প্রকাশ ‘বন্ধবী সঙ্ঘ’ কেন্দ্রীক কার্যক্রম। “ডা. শফীর তত্ত্বাবধানে প্রথমত একটি সঙ্ঘ চট্টগ্রামের ‘বান্ধবী সঙ্ঘ’ গড়ে উঠলো — নেত্রী তাঁরই সহধর্মিণী বেগম মুশতারী শফী। ক্রমে স্থানীয় উৎসাহী মহিলাদের সমাবেশ ঘটতে লাগলো এই সঙ্ঘকে ঘিরে। ‘বান্ধবী সঙ্ঘে’র পরিচালনায় ‘বান্ধবী সঙ্গীত ও গিটার শিক্ষার আসর’, ‘বান্ধবী কুটির শিল্প কেন্দ্র’ ইত্যাদি ক্ষুদ্র অথচ সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলো। বেগম মুশতারী শফীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হলো চট্টগ্রামের প্রথম মহিলা মাসিক ‘বান্ধবী’। পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ‘বান্ধবী সাহিত্য আসর’। পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশনার পাঁচ বছরের সময় ১৯৬৮ সালে ডা. শফী নিজের বাসভবনের দুটি কামরাকে রূপান্তরিত করলেন একটি ক্ষুদ্র ছাপাখানায়। অভিনব প্রয়াস — ছাপাখানার নাম ‘মেয়েদের প্রেস’ — এতে কম্পোজিটার সব মেয়ে।”

১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময় উর্দুভাষীদের উপর কোথাও কোথাও হামলা হয়েছিল। ডা. শফীর আশপাশে কয়েকটি বিহারি পরিবার ছিল। মারমুখো জনতা হামলা করেছিল তাঁদের উপর। ‘বুক টান করে দাঁড়িয়েছিলেন ডাক্তার মোহাম্মদ শফী। এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। এদেশেরই নাগরিক। ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু এঁদের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। ডাক্তার মোহাম্মদ শফী উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন: আগে আমাকে মারো। তারপর আমার প্রতিবেশীদের মারবে।… হামলাকারীরা ফিরে গিয়েছিলেন।’

এক সময় যাদের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলেন পাক বাহিনীর কাছে তারাই ডা. শফীর বিরুদ্ধে নালিশ করেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থানার লোকজন এসেছিল ‘মুশতারী লজে’। বেগম মুশতারী শফীর কাছে জানতে চেয়েছিল, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে কি না। থানার অনুরোধে বলেছিলেন, ‘সব নাম তো পড়তে পারিনি। প্রথম নামটি ছিল ডাক্তার মালাম-এ গফুরের।… ঐটুকু জবানিতেই অ্যারেস্ট করা হয়েছিল ড. মালামে-এ গফুরকে। প্রতিক্রিয়া হয়েছিল চমৎকার। বিবিধ মহল থেকে অনুরোধ এসেছিল অভিযোগটুকু প্রত্যাহারের জন্যে। বিনিময়ে ড. মালাম-এ গফুর ক্ষতিপূরণ দেবেন।… সুপারিশ করেছিলেন মন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরীও। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আমার উপস্থিতিতেই বলেছিলেন বেগম মুশতারী শফীকে: ভাবী, আপনি একটু লিখে দিন যে ডাক্তার মালাম-এ গফুরের ব্যাপারে আপনার কোনো অভিযোগ নেই। আপনাকে এক লক্ষ টাকা দেয়া হবে।… এবারে সত্যি সত্যি ক্ষেপেছিলেন বেগম মুশতারী শফী। বলেছিলেন: আমি তো মাত্র এক লক্ষ টাকা পাবো। আর আপনি কতো লক্ষ টাকা পাবেন এ জন্যে? আপনার মাধ্যমেই বলে দিচ্ছি, এ বিষয়ে আর যদি কেউ আমাকে বলতে চায়, আমার কাছে ভদ্র ব্যবহার পাবে না।… পরে মালাম-এ গফুরকে জামিনে মক্তি দেয়া হয়েছিল। মুক্তি পেয়েই তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।’

আমরা বেতারের আলাপ থেকে একটু অন্যপ্রসঙ্গে চলে এসেছি। যাই হোক, বেতারি আলাপে ফিরার আগে দস্তিদার দম্পতির প্রসঙ্গটা উল্লেখ করি। বেতারের কাজে ১ জুলাই কলকাতা থেকে আগরতলা এসেছিলেন বেলাল মোহাম্মদ। ‘সে যাত্রায় আগরতলায় আমি ১০ দিন ছিলাম। ঐ সময়েই এসেছিলেন শান্তি দস্তিদার। পূর্ণেন্দু দস্তিদারের সহধর্মিণী। বিধবার সাজ। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ণেন্দু দস্তিদার  প্রয়াত হয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দলের সঙ্গে যাত্রা করার কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে সকলের সম্মিলিত হবার স্থান নির্দিষ্ট ছিল। পূর্ণেন্দু দস্তিদার যথাসময়ে পৌঁছতে পারেননি। চৌধুরী হারুন-অর রশীদরা তাঁর জন্যে অপেক্ষা করেননি। দলীয় সঙ্গীদের না পেয়ে বৃদ্ধ পূর্ণেন্দু দস্তিদার বেপথু সীমান্তের পথে যাত্রা করেছিলেন। বিপাকে পড়ে রোগে ভুগে মারা গিয়েছিলেন। শান্তি দস্তিদার একচোটে নিয়েছিলেন চৌধুরী হারুন-অর রশীদকে। বলেছিলেন: একজন বৃদ্ধ মানুষ। সারাটা জীবন পার্টির সেবা করলো। তাঁর জন্যে দু’টি মিনিট অপেক্ষা করা গেলো না! আমি আর এই পার্টির সঙ্গে থাকবো না। এখানে সি-পি এম নেতাদের কাছে সব বলবো। কলকাতায় গিয়ে।’

বেলাল মোহাম্মদ মনে করতেন চৌধুরী হারুন অর রশীদের খামখেয়লীপনা মুশতারী পরিবারের জন্য কাল হয়েছিল। ‘সেই গোলাবারুদ রাখার কারণেই ডাক্তার মোহাম্মদ শফীর ওপর এসেছিল বিপদ। কিন্তু চৌধুরী হারুন অর রশীদ তো এখন আগরতলায়। ক্রাফট্স ইনস্টিটিউটে তাঁদের ক্যাম্প।’

কথায় লতা, কথায় শয়তান। আসলে বেলাল মোহাম্মদের বইটিতে এত বেশি প্রসঙ্গ এসেছে যে বইটির সংক্ষিপ্ত ভাষ্য তৈরি করতে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে। নবেম্বর মাসে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন অল ইন্ডিয়া রেডিওর অবসরপ্রাপ্ত ডাইরেকটর আর এন আচারিয়া। উপদেশক হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন। মাঝে মাঝে প্রোগ্রাম ম্যাটেরিয়েলস দেখতে চাইতেন তিনি। আলাপ করতে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। “একদিন বলেছিলেন: আচ্ছা, মি: বেলাল, আপনারা উদ্বোধনী ঘোষণায় আরবি ভাষায় সালাম কেন বলেন? সমাপ্তিতে ‘খোদা হাফেজ’ কেন বলেন? শুধু ‘জয় বাংলা’ বললেই কি চলতে পারে না? আমি কোনো আপত্তি তুলছি না। এমনি শুধু জানতে চাইছি।… উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম: আপনারা, স্যার, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নামের সঙ্গে আজকাল ‘শ্রী’ না বলে সচেতনভাবে ‘জনাব’ বলেন কেন? বরাবরই আকাশবাণী থেকে মুসলিম নামগুলোর উচ্চারণে বিকৃতি লক্ষ্য করতাম আমরা। আজকাল আমাদের নেতাদের নামগুলো বেশ যতেœর সাথে উচ্চারণের চেষ্টা করা হয়। এই সদিচ্ছা কেন?” আচারিয়া বাবু দ্রুত আপসে গিয়ে প্রশমিত করেছিলেন আলাপ।

আর এন আচারিয়া সাহেব আরেক দিন শেখ মুজিবুর রহমানহীন ভবিষ্যত নেতৃত্বের ব্যাপার নিয়ে আলাপ উঠিয়ে ছিলেন। ‘: আচ্ছা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো এখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। কি অবস্থায় আছেন, কি পরিণতি হবে, কিছু তো বলা যায় না। … (বেলাল মোহাম্মদ): বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে তেমন কিছু আমরা ভাবতেই চাই না। আমাদের দুর্ভাগ্য, যদি কোন অঘটন ঘটেই, তাহলে বঙ্গবন্ধুর শূণ্যস্থান আর পূরণ হবে না।’ আলাপের এক পর্যায়ে আর এন আচারিয়া বললেন, ‘:প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের কথাই বলছি। নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পরে নিশ্চয়ই যোগ্যতম। আপনারা এখন থেকে তাঁর ইমেজ গড়ে তোলার চেষ্ট করুন। এটা অবশ্য আমার একটা নগণ্য পরামর্শ।’

‘২২ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে কলকাতা থেকে নির্বাসিত সরকার ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। স্বাগত জানানো হয়েছিল ঢাকা কেন্দ্র থেকে ধারাবিবরণীর মাধ্যমে। ১৬ ডিসেম্বরের পর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল শত্রুমুক্ত ঢাকা কেন্দ্র। তারপর পুনরায় চালু করার জন্যে ট্রান্সমিটারের অবস্থা পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। অগ্রগামী পর্যবেক্ষক হিসেবে কলকাতা থেকে ঢাকা প্রেরিত হয়েছিলেন সৈয়দ আবদুশ শাকের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দশজন প্রতিষ্ঠাতা কর্মীর একজন।’

তথ্য সচিব আনোয়ারুল হক আমাদের জানিয়েছিলেন মন্ত্রিসভাকে ঢাকায় স্বাগত জানানোর মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্র চালু হবে। সে মুহূর্ত থেকে মুজিবনগরের কার্যক্রম শেষ হবে। আর এটাই ছিল প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত। কিন্তু পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। ভারত সরকারের মর্জি মোতাবেক ২ জানুয়ারি পর্যন্ত বেতার কার্যক্রম চালাতে হয়েছিল। “ঢাকা কেন্দ্র চালু হবার পরও সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করা যায়নি কলকাতার কার্যক্রম। ২ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত ৫০-কিলোওয়াট ট্রান্সমিটার থেকে প্রচার করতে হয়েছিল অনুষ্ঠান। মান ছিল ক্রমনিষ্প্রভ। সেই দশদিন নাম ঘোষণা করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ বেতার, মুজিরনগর’।”

‘ঘটনাচক্রে শেষের দিনগুলোর দায়িত্বে মুজিবনগরে আমাকেই থাকতে হয়েছিল। ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ প্রতিষ্ঠা এবং ২ জানুয়ারী ১৯৭২-এ সমাপ্তি। আমার আদ্যোপান্ত কার্যকাল।’

কবি বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির পরিশিষ্ট হিশেবে ২টি অনুষঙ্গ আছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁহার প্রচারিত ৪৭টি কথিকা নিয়ে অনুষঙ্গ-১। আর অনুষঙ্গ-২ এ আছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময়ে উঁনার প্রচারিত ৯ টি কবিতা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত যে কোন কিছুর মতো এগুলোরও একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে। বেলাল মোহাম্মদের মানস, ঝোঁক বুঝার জন্যও এসব জরুরী। ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইটির এই ‘সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে’ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ইতিবৃত্তমূলক বয়ানটা ধরার চেষ্টা করেছি। তাই বিনয়ের সাথে সংযুক্ত অনুষঙ্গ ২টিতে হস্তক্ষেপ থেকে আমরা বিরত থেকেছি।

একটি বইয়ের সংক্ষিপ্ত ভাষ্য কখনোই মূল বইয়ের বিকল্প পাঠ্য হতে পারে না। সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও নয়। সদ্য প্রয়াত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পুরোভাগের কাণ্ডারী কবি বেলাল মোহম্মদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এটি একটি অক্ষম প্রয়াস মাত্র।

বইটিতে প্রধানত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘটনা প্রবাহ আলোচিত হলেও মুক্তিযুদ্ধের টুকটাক এত স্মৃতি এসেছে যা এই সংক্ষিপ্ত ভাষ্যে ধারণ করা অসম্ভব। তারপরও যা না আনলে সংক্ষিপ্ত ভাষ্য কথাটিই অপাংক্তেয় হয়ে পড়ে শুধু তাই খানিকটা বিবৃত করা হলো। আরও দু’একটি ঘটনার বিবরণ দিতে পারলে সংক্ষিপ্ত ভাষ্যটি হয়তো আরেকটু পূর্ণতা পেত সন্দেহ নাই। কিন্তু আগ্রহী পাঠিকা বইটি কেন উল্টিয়ে দেখবেন না?

বেলাল মোহাম্মদের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের স্মৃতি নিয়ে ইতিবৃত্তমূলক এই বইটির শক্তিশালী দিক: ঘটনা-তথ্য-উপাত্তের বৈপরীত্যহীনতা, সত্যের অকপট নির্ভীক উচ্চারণ ও বিভিন্ন ঘটনার নির্মোহ বয়ান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তো বটেই, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা অনুসন্ধীৎসুদের কাছেও বইটির অশেষ সমাদর উত্তরোত্তর বাড়বে — এমনটিই আমাদের বিশ্বাস।

(সমাপ্ত)

আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা লইয়া ফ্রানৎস ফানোঁর একটি লেখা

আলজেরীয় যুদ্ধে নারীর ছদ্মবেশে অংশগ্রহণ ছবি: ব্যাটল অব আলজিয়ার্স

আলজেরীয় যুদ্ধে নারীর ছদ্মবেশে অংশগ্রহণ
ছবি: ব্যাটল অব আলজিয়ার্স

উপনিবাসের কবল হইতে দিনে দিনে আলজেরিয়া দেশটা যত মুক্ত হইতেছে, কতিপয় পুরাতন গালগল্প ততই অচল হইয়া পড়িতেছে।

উপনিবাসিক জগতে যেসকল বিষয় ‘বোধের অগম্য’ বলিয়া গোণা হয়, তাহার মধ্যে বহুলকথিত একটি বিষয় হইল আলজেরীয় নারী। কি সমাজবিজ্ঞানী, কি এসলামী আলেমউলামা, কি আইনবিশারদ — আলজেরীয়ার নারী প্রশ্নটি লইয়া ইহাদের সকলেই বহুবিধ গবেষণা করিয়া থাকেন।

কাহারও বিচারে আলজেরীয় নারী পুরুষের দাসী, কাহারও কাছে বা গৃহের সর্বেসর্বা কর্ত্রীঠাকরুণ — নানা বিচারের মধ্যে নারীর প্রকৃত দশাটি যে কি তাহা লইয়া তত্ত্ববিশারদগণের তল্লাশের অবধি নাই।

আরেক পক্ষ আছেন — তত্ত্বে তাঁহারাও কম যান না  — তাঁহারা বলেন আলজেরীয় নারী মুক্তির স্বপ্ন দেখে বৈকি, কিন্তু পশ্চাৎপদ, উগ্র পিতৃতন্ত্র তাহাদের এই ন্যায্য বাসনা পূরণে বাধ সাধে। ফরাসী জাতীয় সংসদেও ইদানীং কালের বির্তক খেয়াল করিলে দেখিতে পাইব ইহারা খাইয়া না খাইয়া এই ‘সমস্যা’র পরিষ্কার সুরাহা করিতে ব্যতিব্যস্ত। অধিকাংশ বক্তাই আলজেরীয় নারীর দুর্দশা লইয়া মহাচিন্তিত, ইহাদের ভাগ্য বদলাইতে বদ্ধপরিকর। তাঁহারা জুড়িয়া দিতে ভুলেন না যে বিদ্রোহটা সামলাইবার ইহাই একমাত্র রাস্তা। উপনিবাসের দশাকে ‘সমাজবিজ্ঞানের বিচার্য মামলা’রূপে বিবেচনা করা উপনিবাসিক ধুরন্ধরগণের নিত্য অভ্যাস। তাঁহারা কহেন এই সকল দেশ তো নিজেকে পরের হাতে তুলিয়া দিবার জন্য মুখাইয়াই আছে। ইহার উজ্জ্বল নমুনা হিসাবে তাঁহারা মাদাগাস্কারের কথা পাড়িয়া থাকেন, পরনির্ভরতা নাকি মাদাগাস্কারীর মনের  শেকড়ে প্রোথিত।

‘আলজেরীয় নারী অধরা, রহস্যময়ী, আর কিনা মর্ষকামী প্রকৃতির’। আলজেরীয় নারীর এই চরিত্র আঁকিতে তাঁহারা ইহার নানা আচার-আচরণ বিশদ বর্ণনা করিয়া থাকেন। কিন্তু সত্যকথা হইল অস্ত্রের জোরে শায়েস্তা করিয়া দখলকৃত দেশের জনগণের চরিত্র অধ্যয়ন করা সহজ কর্ম নহে। শুদ্ধ তাহাদের ভূখণ্ডই দখল হইয়াছে তাহা নহে। শুদ্ধ বন্দর কিংবা আকাশ সীমাও নহে। ফরাসী উপনিবাস খোদ আলজেরীয় ব্যক্তির ভেতরটা অবধি দখল করিয়া বসিয়াাছে, ব্যক্তির অন্তরের গভীরে ক্রমাগত হানা দিয়া তাহার আপন সত্তাকেই উচ্ছেদ করিতেছে, ঠাণ্ডামাথায় ধাপেধাপে তাহাকে কাটিয়াচিরিয়া পঙ্গু করিতেছে।

দেশের জমিন দখল হইল আর দেশের ব্যক্তি দিব্য মুক্ত থাকিল — তাহা হইবার নহে। আস্ত দেশটা, তাহার ইতিহাস, তাহার নিত্য প্রাণস্পন্দন লইয়া পদেপদে প্রশ্ন উঠে, তাহাকে বিকৃত, পঙ্গু করা হয় — ইহার পিছনে উদ্দেশ্য চূড়ান্ত সর্বনাশ  বৈ নহে। এহেন পরিস্থিতিতে মায় ব্যক্তির নিঃশ্বাস নজরবন্দি হয়, বেদখল থাকে। নি:শ্বাসও থাকে যুদ্ধের আওতায়।

সেই হইতে দখলীকৃত দেশবাসী তাহার প্রকৃত ভাব গোপন রাখিবার অভ্যাস আয়ত্ত করে। দখলদারের সামনে দখলীকৃত দেশবাসী লুকাছাপা করিবার, ধোঁকা দিবার বিদ্যা রপ্ত করিয়া ফেলে। অস্ত্রের জোরে জারি দখলদারির কেলেংকারির পাল্টারূপে সে জারি করে নিত্যদিনের সম্পর্কে ফাঁকির কেলেংকারি। দখলীকৃত দেশবাসী দখলদারের সাথে সাক্ষাতমাত্রেই ধোঁকা দিয়া চলে।

যে সকল ছদ্ম সত্য এত বছর উপর্যুপরি ‘সরেজমিন গবেষণা’ করিয়া যথার্থ বলিয়া প্রমাণ করা হইয়াছে, ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে আলজেরীয় নারীরা সেইসকল সত্য ধূলিসাৎ করিয়া দিয়াছে। আলজেরীয় বিপ্লব মূল্যবোধ আর দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা বস্তুগত পরিবর্তন তো আনিয়াছেই। কিন্তু সত্য বলিতে, আলজেরীয় জনগণ আসলে কোনদিন নিরস্ত্রই হয় নাই। ১লা নবেম্বর ১৯৫৪ সালে আসিয়া যে লোকের মধ্যে জাগরণ দেখা দিয়াছে তাহা নহে, বরং ফরাসী-মোসলেম আমলের সোনালি দিনগুলি জুড়িয়া যে কায়দাকৌশল তাহারা আয়ত্ত করিয়াছে, মজবুত করিয়াছে তাহাই কাজে লাগাইবার সংকেত দিয়াছে ১লা নবেম্বর।

আলজেরীয় নারীগণ তাহাদের ভাইদের সাথে মিশিয়া নীরবে প্রতিরোধের ব্যবস্থা গঠিয়া তুলিয়াছে, ফলে মুক্তিযুদ্ধে তাহারা মৌলিক ভূমিকা রাখিতে পারিতেছে।

গোড়াতেই উঠিয়াছে বহুল আলোচিত আলজেরীয় নারীর দশার কথা — তাহারা নাকি অবলা অবরোধ বাসিনী। কানা কড়ির মূল্য না পাইয়া অপমানে নীরব অবহেলায় তাহারা নাকি আবদ্ধ থাকে প্রায় না থাকার মতন করিয়াই। যে ‘মোসলেম জগতে’ তাহাদের কোন গুরুত্ব নাই, সেই সমাজই কিনা তাহার ব্যক্তিত্ব পঙ্গু করিয়া,  প্রজ্ঞালাভের সকল উপায় রুদ্ধ করিয়া চিরকাল তাহাকে নাবালিকা বানাইয়া রাখিয়া দেয়।

আলজেরীয় নারী লইয়া এই সকল কথাবার্তা এত দিন ‘বৈজ্ঞানিক কর্ম’ হিসাবে চর্চিত হইয়া আসিয়াছে। আলজেরীয় বিপ্লবের অভিজ্ঞতা আজ হঠাৎ এসকল কথাকে অতি কঠিন প্রশ্নের মুখে ফেলিয়া দিয়াছে।

আলজেরীয় নারীগণের ঘরপ্রীতি — ঘরে আবদ্ধ থাকিবার বাসনা যে জগৎ তাহাকে চাপাইয়া দিয়াছে এমন নহে। বাহিরের সূর্য, রাস্তা কিংবা দৃশ্যের প্রতি বিরাগ বশত যে তাহারা বাহির হন না ইহাও মিছা । দুনিয়া হইতে পলায়নও ইহা নহে।

কথা ইহাই যে স্বাভাবিক সময়ে মোটাদাগে পরিবার ও সমাজ দুইয়ের মধ্যে দুইমুখি আদান প্রদান হইয়া থাকে। পরিবার সমাজের সত্যের ভিত্তি স্বরূপ, আবার পরিবারকে স্বীকৃতি ও বৈধতা দেয় সমাজ। উপনিবাসিক ব্যবস্থা পরিবার ও সমাজের এই পারস্পরিক স্বীকৃতির নিপাত সাধন করে। এ অবস্থায় অগত্যা আলজেরীয় নারীরা নিজেদের উপর নিজেরাই বাধানিষেধ আরোপ করিয়া, গৃহের গণ্ডিতে নিজ অস্তিত্বখানি টিকাইয়া রাখে, আর যুদ্ধে প্রস্তুত হইবার জন্য আপন চেতনায় শান দেয়।

এরূপ আত্ম নির্বাসন, চাপাইয়া দেওয়া পরিবেশকে এহেন প্রত্যাখান, নিজের ভেতর এইরূপ গুটাইয়া আসার মধ্য দিয়া তাহারা নিজ অস্তিত্বকে গণ্ডিতে বাঁধিয়া ফেলে বটে, তথাপি গণ্ডির ভিতর সেই অস্তিত্ব সংহত। দুর্বলতা দূরের কথা, দীর্ঘদিন এই গুটাইয়া থাকাই ছিল বেদখল দেশবাসিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি। এইভাবে নারী একাই বুঝিয়া শুনিয়া, সজ্ঞানে কৌশল খাটাইয়া বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে যুঝিয়া আপন কর্তৃত্ব কায়েম রাখে। আসল উদ্দেশ্য হইল দখলদার বাহিনী যেন প্রতিনিয়ত চতুরঙ্গ প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। শাদাচোখে যাহা নীরক্ত অবরোধবাসনা বলিয়া ভ্রম হয়, তাহা পুরাতন রেওয়াজের আড়ালে আসলে প্রতিরোধই জারি রাখে।

বিপ্লবের হাওয়া ও প্রেরণা নারী ঘরের ভেতর লইয়া আসিয়াছে। বিপ্লবী যুদ্ধ নিছক পুরুষের যুদ্ধ হইতে পারে না।

এই যুদ্ধ সক্রিয় সৈন্য ও মজুদ সৈন্যের দল লইয়া করা যুদ্ধ নহে। আলজেরীয় জনগণ যে বিপ্লবী যুদ্ধে নামিয়াছে তাহা সর্বাত্মক যুদ্ধ; তাহাতে নারী কেবলমাত্র সৈনিকের জামা সেলাই করিয়া, তাহার জন্য বিলাপ করিয়া আপন কর্তব্য সম্পন্ন করে নাই। যুদ্ধের একেবারে মধ্যখানে আলজেরীয় নারী সশরীরে হাজির। গ্রেপ্তার হইয়া, মার খাইয়া, ধর্ষিতা হইয়া, গুলি খাইয়া তাহারা দখলদারের সহিংস ও অমানুষিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষ্য দিতেছে।

সেবিকা রূপে, দূত রূপে, যোদ্ধা রূপে আলজেরিয়ার নারীর কর্মকাণ্ড হইতে যুদ্ধটা কত গভীর ও প্রবল তাহা বুঝিতে বেগ পাইতে হয় না।

এইবার আমরা নারীগণের কপালের নিকট নিজেকে সঁপিয়া দেওয়ার অভ্যাস, সাক্ষাৎ বিপদ দেখিয়াও অবিচল থাকা, ঘটনার গুরুত্ব বুঝিয়া কর্মপন্থা ঠিক করিতে না পারা ইত্যাদি অভিযোগ লইয়াও কথা তুলিব। শত বিপদেও তাহার অমলিন হাসি, ঘোর সংকটেও যেন বা অলীক আশা পুষিয়া রাখা, কোনকিছুতেই নত না হওয়া, পিছু না হটা — এইসকল আচরণ দেখিয়া বলা হয়, বাস্তবতা ধরিতে পারিবার মত বুদ্ধি ইহাদের হয় নাই।

নারীর এই মেজাজ যে আদতে পরিস্থিতি লইয়া সুগভীর উপলব্ধির ফসল তাহা দখলদারেরা ধরিতে পারে না। আজিকে আলজেরীয় নারীরা সংগ্রামে যে সাহসের পরিচয় দিতেছে তাহা ভূঁইফোঁড়ও নহে কোন রাতারাতি পরিবর্তনও নহে, তাহাদের কথিত মেজাজই আজ অভ্যুত্থানের তুঙ্গদশায় আসিয়া পৌঁছিয়াছে।

আলজেরিয়ার সমাজে নারীর অবস্থান লইয়া এতদিন এত গরম গরম বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে যে আজিকে ব্যাপার দেখিয়া দখলদার বাহিনী যে থ বনিয়া গিয়াছে ইহাতে আশ্চর্য নাই। আলজেরীয় সমাজ যে এতদিন ধরিয়া প্রচারিত গল্পের মত নারীবিদ্বেষী আসলে নহে ইহা আজ ফাঁস হইয়াছে।

আমাদের ভগিনীরা আমাদের পাশাপাশি শত্রুর ব্যূহ ছিন্নভিন্ন করিতে, পুরাতন যত রাহসিক গালগল্প একদম জন্মের মত নাশ করিতে লড়াই করিতেছে ।

তর্জমা : প্রিয়ম পাল

উৎস: Fanon, Frantz: A Dying Colonialism. Translation: Haakon Clevalier, Monthly Review Press, 1980.

সম্পাদকীয়: সকল সাম্রাজ্যবাদি হুইসেল নিপাত যাক

 

স¤প্রতি বিভিন্ন উৎস হইতে নানানরকম রেলগাড়ির হুইসেলের খবর প্রচার হইতেছে। কেহ কেহ বলিতেছেন, অনেকরকম বগি হইতে অনেকগুলি বাঁশির বাজনা কাঁদিয়া উঠিলেও ট্রেন মূলত একটাই — আর ইহা নির্বাচনী ট্রেন। প্রতি পাঁচবছর পরপর আসিয়া গ্রামবাংলার মাটি কাঁপাইয়া ইহার দানবীয় ছিটি কু কু করিয়া বাজিয়া ও বাজাইয়া চলিয়া যায়। তবে সত্য হইতেছে, এখন পর্যন্ত ট্রেন আসলে দুইটা — পাকমার্কিন এবং কিছুটা রুশ এসেন্সওয়ালা ভারতীয় এক্সপ্রেস। আর তাহাদের নাযিল হইবার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ বলিয়াও কোন লেখাজোখা নাই। কিম্বা তাহারা হয়ত দেশের সর্বত্র ও সর্বসময় নাযিল হইয়াই থাকেন। দুঃখের বিষয় এই দুই রেলরূপী অজগর দানবের বিপরীতে শক্তিশালী কোন জনতার প্লাটফর্ম ইতিমধ্যে গড়িয়া ওঠে নাই। ফলে যাহা ঘটিতেছে তাহা তামাশার অধিক।

বর্তমান সরকারি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ এইবারের পূর্বে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসিয়া স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উৎসব বেশ ঘটা করিয়াই করিয়াছিলেন। ইহা যথার্থ আনন্দের কাব্য। বেদনার গীত হইতেছে, ক্ষমতায় আসিবার প্রয়োজনে তাহারা সেইবার সকলকে অবাক করিয়া জামায়াতের সহিত জোট গড়িয়াছিলেন। আওয়ামী লীগের দিকে তাকাইলে এইরকম গণ্ডায় গণ্ডায় স্ববিরোধিতার প্রমাণ দেওয়া যাইবে। একটু পাশে ফিরিয়া দেখিলে নজরে পড়িবে, বিএনপির অঙ্গেও একইরূপ স্ববিরোধিতার বিষয়ে তিলমাত্র গরীবিয়ানা নাই। মুক্তিযুদ্ধের মাত্র আধাযুগ পরে স্বাধীনতা ঘোষকের দলটি গড়িয়া উঠিয়াছিল রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা গালে গাল মিলাইয়া।

ইহার ফল রূপে দেখা যাইতেছে, তাহাদের কথিত জাতীয়তাবাদ জিনিসটা কখনো ধর্মের বিপরীতে আবার কখনো শ্রেণির লড়াইয়ের বিপরীতে দাঁড় করানো হইতেছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত দেশে জাতীয় মুক্তির লড়াই শ্রেণির লড়াইকে বাদ দিয়া হইবে কি করিয়া? অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদি এজেন্ডা হইতেছে, জাতীয় মুক্তির লড়াই বিষয়টাকে যেকোনভাবেই হউক পথ হারাইয়া সম্পূর্ণ ভণ্ডুল করিয়া দেওয়া। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মসনদ লইয়া পরস্পরের উদ্দেশ্যে জেহাদ ঘোষণা করিলেও মূলত সাম্রাজ্যবাদের সেই এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করিতেছে। সা¤প্রতিক তাহাদের তফাতের মধ্যে শুদ্ধ পীরসাহেব আলাদা আলাদা।

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষিত কেবল তাহাদের দুই পীরের সরল লড়াই রূপে হাজির হয় নাই। আরো কিছু কৌতূহল লইয়াও তাহার আগমণ। একদিকে দেশের সকল জনগণ যেমন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে, অপরদিকে আওয়ামী লীগকে — কেবল তাহাদের দ্বারা সুবিধাপ্রাপ্ত একটি ক্ষুদ্র অংশ বাদে — কেহই আর একদণ্ড বিশ্বাস করিতে পারিতেছে না। দফায় দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক-জালিয়াতি, পদ্মাসেতু, শেয়ারবাজার লুট, গুম-ক্রসফায়ার, সাংবাদিক হত্যার তদন্তে গাফেলতি ইত্যাদি হাজার একটা কেচ্ছা লইয়া তাহারা জনগণকে এক চরম দমবন্ধ দশায় ঠেলিয়া দিয়াছে।

কিন্তু লীগের বিকল্প হিশাবে বিএনপিও যে তেমন জনসাড়া পাইতেছে এমন নহে। মানুষের কাছে নগ্ন হইয়া গিয়াছে মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। উপরন্তু দল সংগঠিত না হইবার কারণে বিএনপির জামায়াত নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ দৃশ্যমান। ফলে প্রকাশ্যে অবস্থান গ্রহণ না করিলেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে তাহাদের মনোভাব আদৌ গোপন নহে। রাজাকারের ছোটবড় সকল প্রচারযন্ত্র ক্রমাগত ঘুরাইয়া পেঁচাইয়া একটা কথাই তো কহিতেছে, যাহারা যুদ্ধপরাধের বিচারের দাবিটি তুলিতেছে তাহারা নিছকই আওয়ামী লীগ এবং ইসলাম বিরোধি।

এদিকে লীগ সরকার তাহাদের অন্তিমদশায় ভারতকে খুশি করিতে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতন সুন্দরবন ধ্বংশের কাজে হাত লাগাইয়াছে। মাত্র কিছুদিন আগে আমেরিকার মন পাইতে তাহারা সাক্ষর করিয়াছে টিকফাচুক্তি। এইসকল গণবিরোধি দুর্যোগ তাহারা ঘটাইতেছে যখন জামায়াত ফের পুরানা ধর্মের জিকির তুলিয়া যুদ্ধাপরাধ বিচার বানচালের জন্য দেশের ভিতর সকল রকম অপচেষ্টায় তৎপর।

রাজনীতি যখন জনগণের নাগাল হইতে ছুটিয়া গিয়া কেবল ষড়যন্ত্রকারি আর লোভী লোকের কারবার হইয়া ওঠে তখন যাহা যাহা ঘটে তাহার সকলকিছুই এখন বাংলাদেশে ঘটিতেছে।