Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ৩৬

অ আ পাঠশালা: আলাদীনের চেরাগ–ইচ্ছা কুমার

 

ছোট ছোট দুটি পা ছোট দুই হাত
গালি খায় লাথি খায় করে মাথা হেট
তার দিকে চেয়ে রয় কত খালি পেট
তবু মুখ বুজে সয়ে যায় ভোর থেকে রাত

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গানের কথা মনে পড়েছে। এই গানের আরেকটি কলি হচ্ছে, ‘এ মহাভারত দাদা এ মহাভারত, মাছের মতোই আছে শিশুর আড়ৎ, জ্বালানীর মতো আছে শিশুর যোগান।’ মহাভারত খুঁজতে হবে না। ঢাকা শহরেই পাওয়া যাবে শতশত শিশুর আড়ৎ। শিশুরা রাস্তায় বস্তিতে থাকে। তারা কেউ কেউ পত্রিকার হকার, কেউ ফুল বেচে, কেউ বই, কেউ কলা-ডিম। কেউ ভিক্ষা করে। অনেকেই পরিচিত টোকাই হিসেবে। ঠিক কাকের মতোন মহানগরীর নোংরা পরিষ্কার করে। আবার প্রতুল:

শিশুমেলা শিশুদিন শিশু বৎসর
কত মধু মাখা বুলি ছাপা অক্ষর
আলো ঝলমলে সভা ভাবের জোয়ার
তবু ভবিষ্যতেরা খাটে ভূতের বেগার।

ঢাকা শহরে এখন ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে গেছে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল। সে সব স্কুলে বেশ চড়া দামে আমরা আমাদের শিশুদের জন্য শিক্ষা কিনি। যার যত বেশি টাকা সে তার সন্তানকে তত দামী স্কুলে ভর্তি করাতে পারবে। স্কুলের নামগুলো শুনলেই মনে হয় আমরা বুঝি এখনও বৃটিশ উপনিবেশ। যেমন; স্কলাস্টিকা, কুইন এলিজাবেথ স্কুল, টাইনি টটস, মাস্টার মাইন্ড এ রকম হাজারো নাম। সবার রমরমা  ব্যবসা এবং একাধিক স্কুল ভবন-ক্যাম্পাস। শিক্ষা ব্যবসা করে অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। অথচ সমাজের সব শ্রেণি-স্তরের শিশুদের শিক্ষার আয়োজন করতে অনেকেই নারাজ। অনেকে ভেক ধরে। যেমন, বিশ্ববেহায়া এরশাদ তার রাজত্বের সময় যে সব ‘পথকলি’ স্কুল খুলেছিল সেগুলি এখন নিশ্চিহ্ন। ঢাকা শহরের পথ ঘাটের সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা এখন বিভিন্ন এনজিও ব্যবসার হাতিয়ার। সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ নদী ভাঙ্গন, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, মঙ্গা-খরা পিড়ীত হয়ে রাজধানী ঢাকায় জড়ো হয়। ঢাকায় থাকা খাওয়ার ব্যয় আকাশ সমান। অসহায় মানুষগুলো যারা আমাদের দেশের নাগরিক, যারা ভোটার তারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে অক্ষম।

অনেক দিন ধরে আমি অ আ পাঠশালার কথা শুনছিলাম। এ স্কুলের প্রধান সংগঠক জাকির হাসান হাদি ও টুটুল ভাইয়ের সঙ্গে আমার ভাল বন্ধুত্ব। একদিন পাঠশালায় হাজির হলাম। স্কুলের গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখি শহীদ মিনার। এখানে লেখা আছে, ‘শিক্ষা পণ্য নয়- শিক্ষা আমাদের আধিকার।’ খুব বেশি বড় নয় স্কুলটা। লম্বা চওড়া বেশ কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ। প্রত্যেকটি কক্ষ ছাত্র-ছাত্রীতে ঠাসা। হাদি ভাইয়ের কাছে জানলাম, এখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত দুই শিফটে ক্লাস চলে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণি এক শিফটে চলে। প্রতিদিন ক্লাস হয় সকাল ৮ থেকে ১২.৩০ পর্যন্ত। ছাত্র-ছাত্রী সবমিলিয়ে প্রায় ৭০০; যদিও পাঠশালায় ভর্তির জন্য আবেদন করেছে ৩০০০; প্রথম শ্রেণির একটি ক্লাসে ঢুকলাম। একজন শিক্ষিকা ক্লাস নিচ্ছিল। দুই একটা বাচ্চার সাথে আলাপ করলাম। ওদের লেখা খাতাপত্র নেড়েচেড়ে দেখলাম। আমার ভীষণ ভাল লাগল। আসলে স্কুলটা পরিচালিত হয় খুব আন্তরিকতার সাথে। যেহেতু এটা সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষালয়, যে সমস্ত শিক্ষার্থীও শিক্ষা গ্রহণের আগ্রহ বেশি তারাই এখানে ঠিকে থাকে। তারপর হাদি ভাই আমাকে ৫ম শ্রেণির ক্লাসে ঢুকিয়ে দিয়ে বললেন বাচ্চাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলতে। সামনে ওদের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা হবে। যদিও দেশজুড়ে আওয়ামী-বিএনপির ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই চলছে। সবকিছু ছাড়িয়ে এই সব শিক্ষার্থীর চোখে নতুন স্বপ্ন ও আশা। তাদের মুখগুলো কত উজ্জ্বল। ওদের মধ্যে আমি নিজেকেই খুঁজে পাই। প্রতিটি মুখে যেন আমারই মুখচ্ছবি খচিত। আমার জাতি। ওদের সঙ্গ আমাকে শিহরিত করল। ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রী মিলিয়ে ৪০ জন মত। আমি বাচ্চাদের সাথে অনেকে গল্প করলাম। শেষে ওদের গান শুনালাম। বাচ্চারা খুব খুশি। কিছুদিনের মধ্যে ওদের ফেয়রওয়েল হবে। এই স্কুল ছেড়ে সবাই হাইস্কুলে ভর্তি হবে। কত মজা! কতা আশা সবার মনে।

5

অ আ পাঠশালার একটি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে

অ আ পাঠশালা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা সেবা দিচ্ছে ১৯৯১ সাল থেকে। মধ্য বাড্ডার পোস্ট অফিস গলির পাশেই স্কুলটির অবস্থান।  ১৯৯১ সালের ২১ ফেব্র“য়ারি ভাষা শহীদদের আত্মদানের চেতনায় সিক্ত হয়ে স্থানীয় কিছু যুবক মিলে প্রতিষ্ঠা করে অ আ পাঠশালা। সেই থেকে তিল তিল করে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছে। যেখানে কিছুই ছিল না ২২ বছর ধরে ধীরে ধীরে অনেক কিছুই হয়েছে। অনেক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকাতার মধ্যেও এগিয়ে যাচ্ছে পাঠশালাটি। এখনও স্কুলের নির্মাণকাজ চলছে। কিন্তু পরম দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) স্কুলের জায়গাটি একয়ার করেছে এবং পাঠশালাটি উচ্ছেদ করার জন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত আল্টিমেটাম দিয়েছে। রাজউকের কথা, স্কুলটি যেহেতু সরকারী জায়গায় তাই অবৈধ। আমরা জানি, হাইকোটের রায়ে অবৈধ হবার পরও কারওয়ান বাজারের পাশে হাতিরঝিলের উপর বিজিএমইআই ভবন কেমন চকচক করছে। যারা মানুষকে হত্যা করে, পুড়িয়ে মারে তাদের মালিকদের সংগঠনের অবৈধ স্থাপনাতে সরকার একটা আচঁড়ও দেয় না। হাইকোর্টকে কলা দেখায় এবং কানাকে হাইকোর্ট দেখায়। আর গার্মেন্টসের শ্রমিক, রিক্সাওয়ালা খেটে খাওয়া মেহনতী মানুষের সহায়হীন সন্তানেরা বিনা মূল্যে যেখানে একটু লেখা পড়ার সুযোগ পায় সরকার সেখানে সাহায্য না করে উল্টো পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট ও বুলডোজার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমরা ঘৃণা করি এই অবাঞ্ছিত সরকার ও রাষ্ট্রকাঠামোকে। অ আ পাঠশালার মত আলোকবর্তিকা যে আলো জ্বেলেছে সেটা নিভানো যাবে না। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করতে গেলে বাংলায় বিপ্লবী বসন্ত শুরু হবে। অ আ পাঠশালা হবে বাংলাদেশের গেজি পার্ক।

এরশাদ কেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন?–আহমদ ছফা

 

শহিদ নূর হোসেন

শহিদ নূর হোসেন

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আমি একবার অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। দেড়বছর আগের কথা। বুড়িগঙ্গার অপর পাড়ে কামরাঙ্গীর চরে হাফেজ্জি হুজুরের মাদ্রাসার বার্ষিক সভায় আমাকে কিছু বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমাদের দেশের মুখচেনা বুদ্ধিজীবীদের একটা বিরাট অংশ মোল্লা-মওলানাদের মানুষ মনে করতে চান না। আমি এই মনোভাবটির বিরুদ্ধে অনেক দিন থেকেই প্রতিবাদ করে আসছি। একজন মানুষ টুপি পরে। দাড়ি রাখে, লম্বা জামা পরে এ সকল কারণে মানুষটি অমানুষ হয়ে যায় — এ রকম একটি ধারণা সৃষ্টি করার জন্যে একধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। নাটক সিনেমায় একজন ক্রিমিনাল দেখাতে হলে একজন টুপিপরা, দাড়িওয়ালা মানুষকে স্টেজে হাজির করতে হয়। এই মনোভাব বর্ণবৈষম্যবাদের মতোই জঘন্য এবং নিন্দনীয়।

যা হোক, আসল কথায় ফিরে আসি। আমি যখন হুজুরদের সভায় গিয়ে বসলাম, তার অল্পক্ষণ পরেই দেখা গেল সভার উপস্থিত লোকজনদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। তার একটু পরেই এলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। একেবারে নিকট থেকে এই প্রথম তাঁকে দেখার সুযোগ হল। ছিমছাম চেহারার দীঘলদেহী মানুষ। পাঞ্জাবি পায়জামা এবং টুপিতে এরশাদ সাহেবকে সত্যি সত্যি একজন মুসল্লির মতন দেখাচ্ছিল। এরশাদ সাহেব এত সুন্দর চেহারার মানুষ আগে কোন ধারণা ছিল না।

দীর্ঘ একঘণ্টা ধরে তাঁর বক্তৃতা শুনলাম। আমার ধারণা হল এই ভদ্রলোক ইচ্ছা করলে অত্যন্ত নরম জবানে গুছিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেন। এরশাদ সাহেব অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে একটানা প্রায় দশ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। একজন স্বৈরাচারী একনায়কের পক্ষে একটানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকা কম কৃতিত্বের কথা নয়। এরশাদ সাহেবের ক্ষেত্রে এটি সম্ভব হয়েছিল। কারণ তিনি সামরিক শাসনের কড়াকড়ির সঙ্গে নরম জবানের একটা সুন্দর সমন্বয়সাধন করতে পেরেছিলেন। আমার ধারণা এরশাদ সাহেবের মানুষকে বোকা বানানোর ক্ষমতা ছিল অসাধারণ।

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। একটা পর্যায়ে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং এগারো দলসহ সমস্ত রাজনৈতিক দল এরশাদ সাহেবকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে রাজপথে নেমে এসেছিল। সে বিষয়ে কোন কিছু পুনরাবৃত্তি করার কোন প্রয়োজন নেই। সকলে জানেন বিক্ষুব্ধ জনগণের দুর্বার গণ আন্দোলনের মুখে এরশাদকে ক্ষমতা ছেড়ে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

আমি এরশাদ সাহেবের ওপর শুরু থেকেই একটা বিরোধী মনোভাব পোষণ করে আসছিলাম। কারণটা রাজনৈতিক নয়। তিনি ক্ষমতা দখল করার পর কবিতা লিখতে আরম্ভ করলেন। সবগুলো দৈনিকের প্রথম পাতায় তাঁর লেখা পদ্য ঘটা করে ছাপা হতে থাকল। এটুকুর মধ্যে যদি এরশাদ সাহেব সীমাবদ্ধ থাকতেন আমার ক্ষোভটা হয়তো অত তীব্র আকার ধারণ করত না। তিনি তাঁর অধীনস্থ আমলাদের মধ্যে কবিতা লেখার বাতিকটা এত অধিক পরিমাণে সঞ্চারিত করতে পেরেছিলেন যে সেক্রেটারিদের মধ্যে কেউ কেউ অফিসে আসা মাত্রই অন্য সেক্রেটারিদের বিগত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে কত লাইন কবিতা লেখা হয়েছে সেটা পাঠ করে শোনাতেন।

এরশাদ সাহেব রাজনীতিতে যেমন একটা দল গঠন করলেন, কবিদের নিয়েও [তেমন] আর একটা কবিতার দল বানালেন। সে এক মহা রমরমা কাণ্ড। বঙ্গভবনে কবিতা পাঠের আসর বসে। সেখানে এরশাদ সাহেব স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন এবং মোসাহেব কবিরা দাড়ি নেড়ে মাথা দুলিয়ে কর্তাকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, আপনার কবিতা বাংলা কাব্যে নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে। কথাগুলো পত্র-পত্রিকায় এত জোরের সঙ্গে প্রচারিত হত যে আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হত, ক্ষমতা দখল করার পর থেকে এরশাদ সাহেবের মধ্যে ক্রমশ একটা নতুন কবিসত্তা জন্ম নিতে আরম্ভ করেছে।

এরশাদ পতনের পরের দিন সংবাদপত্র ঘিরে জনগণের আগ্রহ

এরশাদ পতনের পরের দিন সংবাদপত্র ঘিরে জনগণের আগ্রহ

এরশাদ সাহেবের সঙ্গে অন্যান্য স্বৈরাচারী একনায়কদের ফারাক কোথায় সে ব্যাপারেও সামান্য ধারণা জন্মাল। এরশাদ সাহেব রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পর শুধু কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন না, দিকে দিকে একজন মস্ত প্রেমিক হিসেবেও তার সুনাম রটে গেল। এরশাদ সাহেব যখন ক্ষমতার মধ্যগগনে সে সময়ে আমরা কতিপয় বন্ধু মিলে ‘উত্তরণ’ নামাঙ্কিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা চালাতাম। বাংলা একাডেমীর এক তৎকালীন কর্মকর্তা আমাকে একটা গান দেখালেন। গানটির লেখক ছিলেন সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা। এই ভদ্রলোক রাঙ্গামাটিতে উপজাতীয় একাডেমির একজন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি একটি গান লিখেছিলেন, সে গানটির প্রথম পঙ্ক্তি ছিলো — নতুন বাংলাদেশ গড়বো মোরা নতুন করে আজ শপথ নিলাম। এই গানটি উপজাতীয় একাডেমি থেকে প্রকাশিত বার্ষিক সংকলনটিতে ছাপা হয়েছিল। এই বার্ষিক সংকলনটি দেখে আমি ভীষণ ক্ষিপ্ত এবং মর্মাহত হয়েছিলাম। কারণ প্রায় প্রতিদিন এ গানটি রেডিও টেলিভিশনে গাওয়া হত এবং রচয়িতা হিসেবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম দেখানো হত। একটি দেশের প্রেসিডেন্ট একজন সাধারণ নাগরিকের লেখা একটি গানকে নিজের গান বলে চালিয়ে দিয়ে গীতিকার খ্যাতি পেতে চান, এটা আমার কাছে অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ বলে মনে হয়েছিল।

আমি এটাও অনুভব করছিলাম যে এই গানচুরির সংবাদটি দেশের মানুষদের জানানো প্রয়োজন। অনেক দৈনিক সাপ্তাহিকের সম্পাদকদের পেছনে আমি ছুটাছুটি করেছি। দেখলাম তাদের অনেকেই এই গানচুরির বিষয়টি জানেন। কিন্তু খবরটি ছাপাতে কেউ রাজি নন। রাঙ্গামাটির এক চাকমা বন্ধু জানালেন, আমি যদি এ গানটি নিয়ে বাড়াবাড়ি করি তাহলে সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে। একাডেমি থেকে তার চাকরিটা যাবে এবং মাথা বাঁচানো দায় হয়ে পড়বে। অগত্যা আমাদের কাগজে সংবাদটি ছাপলাম। এরশাদ সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার গান চুরি করেছে। সংবাদটি এভাবে ছাপলে আমাদের পত্রিকার সেটি শেষ প্রকাশিত সংখ্যা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই উল্টো করে খবরটা ছাপতে হল। আমরা ছাপলাম, সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরা দেশের রাষ্ট্রপতি গীতিকার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গান চুরি করে উপজাতীয় একাডেমির বার্ষিক সংকলনে ছেপেছে। সুতরাং সুরেন্দ্রলাল ত্রিপুরার শাস্তি হওয়া উচিত। এই ঘটনাটির পর থেকে এরশাদ সাহেবের প্রতি আমার মনে একটা ঘৃণা এবং অনুকম্পা গভীরভাবে রেখাপাত করেছে।

এরশাদ সাহেব গণ আন্দোলনের দাপটে বাধ্য হয়ে ক্ষমতা ছাড়লেন। বেগম খালেদা জিয়া সরকার তাঁকে কারাগারে পাঠাল। তাঁকে কি ধরনের করুণ জীবন-যাপন করতে হচ্ছে, সে সংবাদ মাঝেমধ্যে কাগজে ছাপা হত। পাঠ করে আমার মনে একধরনের কষ্ট জন্ম নিত। আহা! মানুষটা অল্প কিছুদিন আগেও প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে বারো কোটি মানুষকে শাসন করেছে। আজ তাঁর কি দুর্দশা!

এরশাদবিরোধি আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পোস্টার

এরশাদবিরোধি আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পোস্টার

এরশাদ অনেক ধরনের নালিশ করতেন। তাঁকে ঘিঞ্জি সেলে রাখা হয়েছে। সংবাদপত্র দেওয়া হয় না। যে সব খাবার দেওয়া হয় সেগুলো মুখে দেওয়ার অযোগ্য ইত্যাদি ইত্যাদি। এরশাদের কারাবাসের সময়ে কারারুদ্ধ রাষ্ট্রপতির প্রতি বেগম জিনাত মোশাররফের উথলানো দরদের কথাও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। বেগম জিনাত এরশাদকে প্যান্ট, শার্ট, পাজামা-পাঞ্জাবি, গেঞ্জি এবং অন্তর্বাস জেলখানায় নিয়মিত পাঠাতেন এবং তার মন কম্পাসের কাঁটার মতো কারারুদ্ধ এরশাদের প্রতি হেলে থাকত। এরশাদের জন্যে কষ্ট পেতাম ঠিকই কিন্তু তাঁর সৌভাগ্যে একধরনের ঈর্ষাও বোধ করতাম।

এরশাদ এখন ক্ষমতায় নেই। তিনি কারাগারে দুঃখদুর্দশার মধ্যে দিন অতিবাহিত করছেন। এই চরম দুঃসময়েও সুসময়ের বান্ধবী জিনাত মোশাররফ অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে এরশাদের সুখ-সুবিধার দিকে মনোনিবেশ করছেন। বেগম জিনাত এরশাদের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করতে গিয়ে তার নিজের সংসারটি ভাঙতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমি মনে মনে এই মহিলার খুব তারিফ করতাম। এরশাদ যখন জেল থেকে মুক্তি পেলেন তখন পত্র-পত্রিকার সাংবাদিকদের কাছে পাঁচকাহন করে জিনাতের প্রতি তাঁর অনুরাগের কথা প্রকাশ করলেন। কিন্তু একটা সময়ে যখন তিনি অনুভব করলেন যে, তিনি জিনাতকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন না, তখন তাকে পচাকলার খোসার মত নির্মম অবজ্ঞায় ছুঁড়ে দিলেন। এরশাদের এই কাজটিকে আমার গানচুরির কাজটির চাইতেও অধিক জঘন্য মনে হয়েছিল।

এরশাদ লোভী, প্রতারক এবং ভণ্ড নয় শুধু একজন কাপুরুষও বটে। পশ্চিমা দেশগুলোতে নারী-পুরুষের সম্পর্ক অধিকতর খোলামেলা। সেখানে কোন রাজনীতিবিদ যদি কোন নারীর সঙ্গে এই ধরনের কাপুরুষোচিত আচরণ করত তা হলে সেখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ইতি ঘটত। আমি মনে মনে এরশাদকে এইভাবে মূল্যায়ন করেছিলাম। এরশাদের কবিতা নকল, গান নকল, পুত্র নকল, প্রেম নকল এমন কি আস্ত এরশাদ মানুষটাই একটা নকল মানুষ। আমাদের এই জাতি অত্যন্ত ভাগ্যবান কারণ একজন আগাগোড়া নকল মানুষ এই জাতিকে দশটি বছর শাসন করেছে।

আমার মূল্যায়নের পদ্ধতিটা কিছুটা ভাবাবেগজনিত। যে সমস্ত মানুষ খুব ঠাণ্ডামাথায় চিন্তা-ভাবনা করতে অভ্যস্ত, এরশাদ সম্পর্কে সে রকম অনেক মানুষের মতামত আমি জানতে চেষ্টা করেছি। তাদের মধ্যে যে সমস্ত মানুষ সরাসরি এরশাদের দ্বারা বিশেষভাবে উপকৃত হয়নি সে সমস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য সকলেই আমাকে বলেছে, এরশাদ অত্যন্ত খারাপ মানুষ। আর এরশাদ যে খারাপ মানুষ সে ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ একমত।

এখন এরশাদের সম্পর্কে আমার মনে যে একটা বিস্ময়বোধ জন্ম নিয়েছে, সে বিষয়ে কিছু কথা বলব। এরশাদকে যখন মামলার পর মামলায় অভিযুক্ত করে খালেদা জিয়া সরকার জেলখানায় ঢোকাল, অনেকের মত আমিও ধরে নিয়েছিলাম এরশাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ। যে কৃষ্ণগহবরের মধ্যে এরশাদ ঢুকেছেন সেখান থেকে কোনদিন বেরিয়ে আসতে পারবেন না। দু’বছর না যেতেই আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর হাসিনা এবং খালেদা দুই নেত্রীকে করজোড়ে এরশাদের সামনে হাজির হতে হল। খালেদা জিয়া বললেন, আপনি আমার দলকে সমর্থন করুন, আপনার সমর্থনে আমার দল যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়, আপনাকে রাষ্ট্রপতি বানাব। এরশাদ খালেদার আবেদনে কর্ণপাত করলেন না, কারণ এই মহিলার ওপর তিনি ভয়ানক ক্ষুব্ধ ছিলেন। মহিলা তাঁকে জেলখানায় পাঠিয়েছেন। সুতরাং তাঁর সঙ্গে কোন রকমের বোঝাপড়া কিছুতেই হতে পারে না।

হাসিনা বললেন, আপনি আমার দলকে সমর্থন করে আমাদেরকে সরকার গঠন করার সুযোগ করে দিন। আমরা আপনার সবগুলো মামলা জামিনের ব্যবস্থা করব এবং আপনাকে মুক্তমানব হিসেবে কারাগারের বাইরে নিয়ে আসব। বাস্তবিকই হাসিনা এরশাদের সমর্থন নিয়ে ঐকমত্যের সরকার গঠন করলেন এবং এরশাদ সাহেব বাইরে চলে এলেন। এরশাদ সাহেবের সমস্ত রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে টান টান দড়ির ওপর দিয়ে চীনা এ্যাক্রোব্যাট মেয়েরা যেভাবে সাইকেল চালায় তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিস্থিতি যতই খারাপ এবং অনিশ্চিত হোক না কোন তিনি ঠিকই নিরাপদে তাঁর কাজটি করে যাবেন।

বেশ কিছুদিন বাইরে থাকার পর এরশাদ আবার নতুন একটা মোচড় দিলেন। সর্বত্র বলে বেড়াতে লাগলেন আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে রসাতলের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখন থেকে তিনি এই সরকারের বিরোধিতা করবেন। কারণ এই সরকারের ইতিবাচক কোন কিছু অবদান রাখার ক্ষমতা নেই। তারপরে বেগম খালেদা জিয়া জামাতের সঙ্গে মিলে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করলেন। চারদলীয় ঐক্যজোটের কর্মপদ্ধতি এবং রূপরেখা যখন আকার পেতে শুরু করেছে সে সময়ে একটি পুরনো মামলায় এরশাদকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা হল। জরিমানার টাকা যদি শোধ করতে না পারে, তাহলে আরো দু’ বছর জেল খাটতে হবে।

এরশাদ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে যাচ্ছেন। এ সময়ের মধ্যে আদালত থেকে জানানো হয়েছে তাকে দু’বছরের কম সময় জেলের মধ্যে থাকতে হবে। কেননা আগে যতটা সময় তিনি জেলে ছিলেন, তাতে পাঁচ বছরের মেয়াদ থেকে সে সময়টা কাটা যাবে। এরশাদের আপিলে কি রায় দেওয়া হবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় নেই। হয়তো এরশাদের দণ্ডাদেশ বহাল থাকবে। হয়তো তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু আমি আমার একটা আশংকার কথা উচ্চারণ করতে চাই। এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজষ্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার।

কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে ধরনের রাজনীতির মধ্যেই। আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসেবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন। এই দেশের ভাগ্য, দেশের জনগণ অনেক ত্যাগতিতিক্ষার মাধ্যমে সামরিক শাসনের কব্জা থেকে দৃশ্যত একটা গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সেই সামরিক শাসনের একনায়ক মানুষটিকে কিছুতেই সরানো যাচ্ছে না।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক আজকের কাগজ

১১ সেপ্টেম্বর ২০০০

জেনারেল এরশাদের রাজনীতি লইয়া আহমদ ছফার দুইটি নিবন্ধ–সলিমুল্লাহ খান

 

পরলোকগত মনীষী মহাত্মা আহমদ ছফা ইংরেজি ২০০০ সালের আগায় ও ২০০১ সালের গোড়ায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে মুখ্য বিষয় করিয়া দুই দুইটি নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। লেখা দুইটি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল যথাক্রমে ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ও ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। দ্বিতীয় নিবন্ধটি প্রকাশের কিছুদিন পর তিনি পরলোকগমন করেন। বলা প্রয়োজন লেখা দুটি এখনও আহমদ ছফার রচনাবলিতে যোগ করা হয় নাই।

জীবনের শেষদিকে তিনি অনেক সময় নিজের হাতে লিখিতে পারিতেন না। কিম্বা লিখিতে চাহিতেন না। তাঁহার তিনদিকে জড় হওয়া তরুণতরুণীরা অনেক সময় শ্র“তি লিখিতেন। এখানে উৎকলিত প্রথম নিবন্ধটির শ্র“তি লিখিয়াছিলেন মেকী খীসা। দ্বিতীয় লেখাটির শেষে এমন কাহারও নাম লেখা আছে কিনা দেখা যাইতেছে না। অধুনালুপ্ত ‘আজকের কাগজ’ কর্তৃপক্ষের ঋণস্বীকার করিয়া আমরা লেখা দুটি নতুন করিয়া এখানে ছাপাইতেছি। ছাপার সময় আমরা কিছু কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধন করিয়াছি। কোন কোন জায়গায় বানানরীতির সমতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সংশোধন আবশ্যক হইয়াছে আর কোথাও কোথাও সঙ্গতিবিধানের জন্য একটা দুইটা শব্দ যোগ করা হইয়াছে। সংযুক্ত শব্দগুলি তৃতীয় বন্ধনীযোগে দেখান আছে।

 3

এই দুই নিবন্ধযোগে মহাত্মা আহমদ ছফা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গোড়ার গলদ চোখে বুড়া আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছিলেন। এই আদি গলদের প্রকাশ্য লক্ষণ বা আলামত আকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদের নাম লওয়া যায়। জেনারেল এরশাদ ১৯৮০ সালের দশকটার বলিতে গেলে প্রায় পুরাটা জুড়িয়াই বাংলাদেশ শাসন করিয়া তটস্থ রাখিয়াছিলেন। তিনি ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন একটি পূর্বঘোষিত সামরিক অভ্যুত্থানের দৌলতে। আর ১৯৯০ ইংরেজি নাগাদ একধরনের ব্যাপ্তিতে জনপ্রিয় অথচ ব্যঞ্জনায় সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মধ্যস্থতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছিলেন। তবে সকলেই জানেন সেই অভ্যুত্থানে তিনি নিহত কিম্বা নির্বাসিত কোনটাই হন নাই। তাঁহাকে কিছুদিন একটি কারাগারে রাখা হইয়াছিল।

কারাগার জায়গাটা বিশেষ সুখের জিনিশ নহে। তাই বেশিদিন না যাইতেই জেনারেল এরশাদ রাজনীতিতে ফিরিয়া আসিলেন। শুদ্ধ আসিলেন বলিলে যথেষ্ট বলা হইবে না। তিনি রীতিমত পুনর্বাসিতই হইলেন। পর পর দুইটি সংসদীয় নির্বাচনে তাঁহার দল গর্ব করিবার মতন অনেকগুলি আসনে জয়লাভ করিল। লোকের মনে প্রশ্ন দেখা দিল — এরশাদ সাহেবের এই শক্তির উৎস কোথায়?

আহমদ ছফা এই নিবন্ধে এই প্রশ্নের একটি যুক্তিসংগত উত্তর দিয়াছেন। ১৯৯০ সালের পর যে দুই দুইটি চাঁদ — যাঁহাদের নাম যথাক্রমে হাসিনা ও খালেদা — বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে পালা করিয়া উদিত হইয়াছেন, তাঁহাদের সামনে ধ্র“বনক্ষত্রের জ্যোতির মতন জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নামবাহী এই বিশেষ রাজনীতিবিদটি। এখানে উৎকলিত প্রবন্ধদ্বয়ের প্রথমটিযোগে আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে রাজনীতির মধ্যেই।’

আমাদের দুর্ভাগ্য এই নিবন্ধ দুটি লেখার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মহাত্মা আহমদ ছফা এই ধুলির ধরা হইতে বিদায় লইয়াছেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদ আজও — এই ভূমিকা মুসাবিদার ক্ষণ ২০১৩ ইংরেজির ডিসেম্বর মাসেও — বাঁচিয়া আছেন। নিছক বাঁচিয়াই নহেন, দিব্যই আছেন। কেন এবং কিভাবে আছেন তাহার জবাবে নানান মুনি নানান মত প্রকাশ করিবেন একথা নিশ্চিত জানি। আমাদের হাতে আহমদ ছফার যে মতটি আছে তাহাও — কম করিয়া বলিলেও বলিতে হইবে — বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আহমদ ছফার কথা আমরা যদি ভুল না বুঝিয়া থাকি তো বলিব তিনি বলিয়াছেন এরশাদ সাহেবের পতন হইলেও তিনি যে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রতিনিধি প্রকৃত প্রস্তাবে সেই স্বৈরতন্ত্রের পতন হয় নাই। তাহা একটা বেসামরিক লেবাস পরিয়াছে মাত্র।

এখানে উৎকলিত প্রথম প্রবন্ধে — অর্থাৎ ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ — আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত এইরকম: ‘আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসাবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন।’ আহমদ ছফার এই সিদ্ধান্তের সহিত যাঁহারা একমত হইবেন না, তাঁহারাও নিচের বাক্য দুইটি পড়িয়া বিশ্বাস করি ক্ষণকাল তিষ্ঠাইবেন। আর নিঃশ্বাস চাপিয়া বলিবেন, সাধু! সাধু! তিনি লিখিয়াছেন, ‘এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজস্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে।’

মাস ছয়েক পর অর্থাৎ ২০০১ সালের গোড়ায় প্রকাশিত দ্বিতীয় নিবন্ধযোগে আহমদ ছফা ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মূলকথা হল লড়াইরত দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়মকানুন এবং নীতিবোধ সক্রিয় থাকে [কিন্তু] প্রতিহিংসা নিয়মনীতি কিছুই মানে না।’ সেই দিন আহমদ ছফা যে পরিস্থিতি দিব্যচোখে দেখিতে পাইয়াছিলেন আজ — এক যুগ পর — আমরা তাহা দানবের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতে বাধ্য হইতেছি। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আরেকটা কথা চালু আছে। রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। কিন্তু শেষকথার আলামত হিসেবে চরিত্রহীনতা, নীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক ভোজবাজির যে চিত্রগুলো একটার পর একটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তা থেকে এটা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে আগামীতে আমরা একটি প্রচণ্ড জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।’ আর আজও আমরা বলিতে পারিতেছি না সংকট কাটিয়া যাইতেছে।

রাজনীতিতে আসন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতি–আহমদ ছফা

 

আজকের কাগজের পাঠক-পাঠিকার স্মরণ থাকতে পারে প্রায় মাসছয়েক আগে এ কাগজে আমি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে একটি লেখা লিখেছিলাম। ওই রচনাটিতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক ভূমিকার সঙ্গে পারমাণবিক বস্তুর তুলনা করেছিলাম। পারমাণবিক বর্জ্য এমন এক জিনিস তাঁর তেজষ্ক্রিয়া কেয়ামতের দিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত এমন কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারেন নি যা পারমাণবিক বর্জ্যরে তেজষ্ক্রিয়তা হরণ করতে পারে।

আমি সামান্য কলাম-লেখক। রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার যোগ্যতা এবং ক্ষমতা কোনটাই আমার নেই। তথাপি এরশাদের ওপর লেখাটি আমি অন্তরাবেগের তাগিদে লিখে ফেলতে পেরেছিলাম। আমার কথাগুলো যদি মিথ্যা প্রমাণিত হত আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। এখন দেখতে পাচ্ছি আমার কথাগুলো সত্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। এই বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি বিষাদাচ্ছন্ন করেছে।

সকলেই জানেন, এরশাদ একজন মহাটাউট মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে এবং রাজনৈতিক জীবনে এমন কোন গর্হিত অপরাধ নেই যা এরশাদের দ্বারা সংগঠিত হয়নি। এরশাদ সেনাবাহিনীর সাহায্যে ক্ষমতা জবরদখল করেছেন। দীর্ঘদিন একনায়কতন্ত্র কায়েম রেখেছেন। শিল্প-সাহিত্য থেকে শুরু করে নারীঘটিত ব্যাপার পর্যন্ত সবকিছুতে কেলেঙ্কারির প্রমাণ রেখেছেন। এরশাদের স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে বাংলাদেশকে গোটা নব্বই দশকের অধিকাংশ সময় রাজপথে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। শহীদ নূর হোসেন থেকে শুরু করে অনেক মানুষকে প্রাণবিসর্জন দিতে হয়েছে। রাজপথে অনেক রক্ত ঝরেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ত্যাগ করে এরশাদকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।

এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেয়ার পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে বিএনপি জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া এরশাদকে নানারকম দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত করে কারাগারে পাঠান এবং তাঁর বিচারের ব্যবস্থা করেন। বিচারে এরশাদকে দণ্ডিত ঘোষণা করা হয়। এরশাদের কারাদণ্ডের মেয়াদ ফুরোবার আগেই আবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার মধ্যে কে ক্ষমতায় যাবেন সে ব্যাপারটি নির্বাচনের অব্যবহিত পরে অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়। কারণ জয়ী আওয়ামী লীগ এবং পরাজিত বিএনপি উভয়ের মধ্যে আসনসংখ্যার ফারাক ছিল খুবই অল্প। এরশাদের দল যে পক্ষকে সমর্থন দেবে তাদেরই সরকার গঠন করার কথা। বাজারে জনরব আছে বেগম জিয়া এরশাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি যদি বিএনপিকে সমর্থন দেন এবং ক্ষমতায় যেতে সাহায্য করেন তাহলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানানো হবে। এরশাদ খালেদা জিয়াকে সমর্থন দেননি। সরকার গঠনে শেখ হাসিনাকেই সহায়তা করেছিলেন। পুরস্কার স্বরূপ হাসিনা এরশাদকে কারাগার থেকে মুক্তিদান করেছিলেন।

হাসিনার শাসনকালের তিন বছর অতীত না হতেই এরশাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার মতপার্থক্য প্রবল হতে থাকে। এক পর্যায়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চারদলীয় ঐক্যজোট গঠন করেন। প্রায় এক বছরের অধিক সময় পর্যন্ত দেশের নানা জায়গায় সশরীরে শরীকদলের নেতাদের সঙ্গে হাজির থেকে এরশাদ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করতে কুণ্ঠিত হননি যে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে হটাতে না পারলে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ থাকবে না। বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র্য, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনে এরশাদ চারদলের সঙ্গে জোট তৈরি করতে বাধ্য হয়েছেন।

তারপরের কাহিনী অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলাটি আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় জীবিত করে এরশাদকে কারারুদ্ধ করে। বিচারে এরশাদের পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা হয়। যেহেতু তিনি বিচারের আগে বেশকিছু দিন কারাগারে ছিলেন তাই তাঁর কারাবাসের মেয়াদ কমিয়ে আনা হয়। যা হোক, অল্প কিছুদিন আগে এরশাদের পক্ষ থেকে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা হয়। জরিমানার টাকা পরিশোধ করা সত্ত্বেও এরশাদের [পক্ষে] জেল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। সরকার তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক নতুন মামলা দায়ের করেছে। এ মামলার আসামি হিসেবে বন্দী থাকার সময় এরশাদের সঙ্গে বর্তমান সরকারের তরফ থেকে আলাপ আলোচনা করার জন্যে আমাদের প্রতিবেশী দেশের এক কূটনীতিক — মধ্যপ্রাচ্যের আরেক কূটনীতিককে সঙ্গে নিয়ে — কারাগারে এরশাদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। কারাগারে এ সাক্ষাতের স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সরকার এ ঘটনাটিকে স্বীকার করে নেয়নি।

কিন্তু তারপরও [কথা আছে।] এই সাক্ষাতকারের প্রতিক্রিয়ার দরুন জেলখানায় এরশাদের অসুখ বেড়ে যায়। তাঁর হৃৎপিণ্ডের গতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং [তিনি] চোখে কম দেখতে আরম্ভ করেন। হাসিনা সরকারকে পাছে এরশাদের অকালমৃত্যুর জন্যে দায়ী হতে হয় সে আশঙ্কায় [তাঁকে] জেলখানা থেকে মুক্ত করে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালের প্রিজন সেলে স্থানান্তর করে তড়িঘড়ি সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়।

সরকারের সময়োচিত সুচিকিৎসার উদ্যোগ গ্রহণ করার সুফল যে ইতিমধ্যে ঘটতে আরম্ভ করেছে তা দেশের সকল মানুষ স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন। এরশাদের আরোগ্যলাভের লক্ষণগুলো ইতিমধ্যে দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। প্রিজন সেলে তিনি জাতীয় পার্টির উনচল্লিশ জন নেতা ও কর্মীর সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন এবং তাদের পরবর্তী কর্মপন্থা কি হতে পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছেন। তাছাড়া এরশাদের স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ এবং ভ্রাতা জিএম কাদের সব সময় দেখা-সাক্ষাত করছেন। ডাক্তারদের মতে এরশাদের দৃশ্যত কোন অসুখ নেই। [তবে] তাঁর চোখের অসুখ এখনো পুরোপুরি সারেনি। জেল থেকে যেদিন মুক্তি পাবেন তাঁর চোখ দু’টো সেদিন সেরে উঠবে।

এরশাদের আরোগ্যলাভের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও একটা মস্ত বড় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। চারদলীয় ঐক্যজোট কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এরশাদের দলের এমপিরা লাঙ্গল প্রতীক রক্ষার দোহাই দিয়ে সংসদ অধিবেশনে হাজিরা দিয়েছেন। জাতীয় পার্টি আবার দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। পার্টির প্রেসিডেন্ট এরশাদ একদিকে এবং নাজিউর রহমান মঞ্জুর অন্যদিকে। এ ভাঙ্গনের মধ্যেও কোনরকম পাতানো খেলার ব্যাপার আছে কিনা কারো আগাম বলার উপায় নেই। কেননা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নীতিহীনতা এবং চরিত্রহীনতার প্রকোপ এত অধিক যে ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থে এবং ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজনে যে কোন দল যে কোন দলের সঙ্গে আঁতাত গড়ে তুলতে পারে। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দর্শনের গরমিল যতই থাকুক না কেন [তা] কোনরকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে না।

এরশাদ আবার বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে মুক্তমানব হিসেবে দেখা দেবেন। সেটা আর অনুমান এবং কল্পনার বিষয় নয়। যে কোন দিন শাহবাগের হাসপাতাল থেকে গুলশানের বসত বাড়িতে বীরদর্পে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফেরত যেতে পারেন তিনি। এরশাদের মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পার্টির সামনে আরো একটা সম্ভাবনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। মিজান-মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন যে অংশটি এতকাল এরশাদকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছে তারাও আবার এরশাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে বর্তমান সরকারকে সমর্থন দিয়ে শক্তিবৃদ্ধি করবেন সেটা একটুও অমূলক নয়। আরেকটা কথা চালু আছে। রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। কিন্তু শেষকথার আলামত হিসেবে চরিত্রহীনতা, নীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক ভোজবাজির যে চিত্রগুলো একটার পর একটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তা থেকে এটা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে আগামীতে আমরা একটি প্রচণ্ড জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।

বিগত ৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ প্যারেড ময়দানে যে উত্তপ্ত ভাষণটি দিয়েছেন তার মধ্যে দেশের বিবদমান বড় দল দু’টির মধ্যে আগামী নির্বাচনকে উপলক্ষ্য করে শান্তি এবং সমঝোতা প্রতিষ্ঠার কোন ইঙ্গিত খুঁজে পাওয়া যায়নি। বরং বলা যেতে পারে সংঘাতের সম্ভাবনা তিনি অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমাদের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী সভাসমিতি এবং জনসমাবেশে প্রধান বিরোধী দল এবং তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে যে ধরনের অশালীন এবং অশোভন উক্তি করেছেন তার মধ্যে রাজনৈতিক সুস্থতা এবং সুরুচির পরিচয় পাওয়া যায়নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে এ পর্যন্ত দশ/বারোটা ডক্টরেট ডিগ্রি আদায় করেছেন। এতগুলো ডক্টরেট ডিগ্রি যাঁর জিহ্বার উচ্চারণে শালীনতা সঞ্চার করতে পারেনি তাঁর কাছ থেকে কোনরকম যুক্তিপূর্ণ মন্তব্য এবং উচ্চারণের প্রত্যাশা অনেকটা দুরাশার নামান্তর।

প্রধানমন্ত্রীর এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং দাম্ভিক কথাবার্তা শুনে দেশের চক্ষুমান মানুষদের মনে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এ অসহায়ত্বের অনুভূতিটি যতটুকু সম্ভব পত্রপত্রিকায় প্রকাশও করে যাচ্ছেন সীমিত আকারে। কারণ দেশের অধিকাংশ জনপ্রিয় এবং চালু পত্রিকা সরকারি দলের সমর্থক। তারা সরকার বেকায়দায় পড়বে এমন কোন মতামত এবং মন্তব্য প্রকাশ করতে সাধারণত কুণ্ঠিত থাকেন। কিন্তু অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। সরকারি দল এবং সরকারপ্রধানের সার্বক্ষণিক তোয়াজ করা এক কথা, দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মূলকথা হল লড়াইরত দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়মকানুন এবং নীতিবোধ সক্রিয় থাকে [কিন্তু] প্রতিহিংসা নিয়মনীতি কিছুই মানে না। মারি অরি পারি যে কৌশলে। আমাদের দুঃখ এখানেই যে সরকার এ প্রতিহিংসার ইন্ধনই যুগিয়ে যাচ্ছে।

প্রথম প্রকাশ : দৈনিক আজকের কাগজ

সম্পাদকীয়: লাথি মার, ভাঙ রে তালা!

গত ১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে উপস্থিত হইলে গীতা সেন তাঁহাকে প্রভূত ক্ষোভ লইয়া বলেন, ‘আমরা আপনাদের তৈরি করছি, আপনারা আমাদের তৈরি করেন নাই।’ প্রশ্ন হইতেছে, আমরা দেশের এই ষোলশ-লক্ষ জনগণ হররোজ এত অত্যাচার-অবিচার সহ্য করিয়া ফের আবার আগুনে পুড়িয়া হইলেও — কেন আবার তাহাদের তৈরি করিতেছি? নির্দিষ্ট সময় পরে পরে শাসকশ্রেণির কিছু সিন্ডিকেটের ভিতর হইতে একটিকে বাছিয়া লইবার মাধ্যমে — আমাদের এই যে অতিন্দ্রিয় গণতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রয়োগের সুখ — তাহা কি আগুনে পুড়িয়া কয়লা হইবার মতন উষ্ণ?

তদুপরি গীতা সেনকে আমরা নমস্কার জানাই। তিনি তাঁহার যন্ত্রণার প্রতি সৎ থাকিয়া জনগণের কিছু ন্যায্য ক্ষোভের কথা ভয়ডরবিহীনভাবে  জানাইয়াছেন। তাঁহার সম্মুখে তখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দাঁড়াইয়াছিলেন। ধারনা করা যায়, বিরোধিদলের নেতার কানেও কথাগুলি পৌঁছাইয়াছে। কিন্তু প্রাণের শ্রবণে এবং তনুমনে দগদগে ঘাঁ লইয়া তাঁহাদের অধিক হয়ত শুনিয়াছে ষোলশ-লক্ষ জনগণ। আমাদের শাসকশ্রেণিও কি বিলকুল তাহা অবগত নহে? পরন্তু তাঁহারা আরো জানেন যে, যাহারা প্রাণের শ্রবণে এবং তনুমনে দগদগে ঘাঁ লইয়া শুনিয়াছে তাহারা আকারে ষোলশ-লক্ষ হইলেও এক অদ্ভুত গণতন্ত্রের মায়ায় তাহাদের গণগ্রেপ্তার করিয়া রাখা হইয়াছে। অন্তত ৯১-পরবর্তী দেশে তো সেই অদ্ভুত কাণ্ডকারখানাই ঘটিতেছে।

একটু নজর করিলে দেখা যাইবে এই গণতন্ত্র ব্যবসায় আমরা আওয়ামীজোটকে একবার লুটেরা আবিষ্কার করিয়া বিএনপিকে মসনদে বসাইতেছি। আবার মসনদে বসিয়া বিএনপি-জোট দুর্নীতির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হইলে আমরা ফের আওয়ামীজোটকে নির্বাচিত করিতেছি। যদিও কখনোই কোন বিরোধিদলকে জনগণের বঞ্চনার সহিত একাত্ম হইয়া তাহাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া লইয়া রাজপথে আন্দোলন করিতে দেখা যায় না। এমনকি সেই সকল বিষয়ে তাহারা টু-ফা শব্দটিও তোলেন না। শুদ্ধ সরকারি দলের হাজারো লুটপাট ও অনাচারই তাহাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হইবার পাথেয়। সরকারি দলও তাহাদের গণবিদ্বেষ আবিষ্কার করিয়া নির্বাচনের পূর্বে যথারীতি কূটকৌশল আঁটিতে থাকেন। কিন্তু অপর মধুলোভী বিরোধিদল তাহা মানিবে কেন? ফলে দুই ভ্রমরের বিষে দেশের মানুষের প্রাণ পুনরায় জর্জর হইয়া ওঠে। স¤প্রতি সেই নাশকতা শুরু হইয়াছে। শুদ্ধ রাস্তায়-রেলপথে পুড়িয়া, হাত-পা-মাথা ভাঙ্গিয়া নহে– ঘরের মধ্যেও ভয়ে-ক্ষুধায়-অতিরিক্ত বিদ্যুত বিলে মানুষ শুকাইয়া মরিতেছে।

গত দুই সপ্তাহে এই নাশকতার কারণে শতাধিক মানুষ খুন হইয়াছেন। খোঁজ লইলে দেখা যাইবে তাঁহাদের ৯৮ শতাংশই আম-জনসাধারণ, সরকারি বা বিরোধিজোটের যেকোন প্রকার আছরমুক্ত। গাজীপুরে ট্রাকচালক পিতা অসহায়ভাবে তাহার চোখের সামনে কিশোর ছেলেকে পুড়িয়া মরিতে দেখিয়াছেন। শাহবাগে পেট্রলবোমায় দুই তরুণ মামাতোফুপাতো ভাই কাজের সন্ধানে গ্রাম হইতে শহরে আসিয়া কয়লার অঙ্গারে পরিনত হইয়াছে। কিন্তু শাসকশ্রেণির চোখে এইসমস্ত যেনবা–এই ষোলশ-লক্ষ মরিয়া বাঁচিয়া ভুতের দেশে — জনসংখ্যা সমস্যার একটা পরোক্ষ সমাধান। তাহারা গণতন্ত্র উদ্ধার ও সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার কাজে কত কি না করিতেছেন। ষোলশ-লক্ষ মরিয়া বাঁচিয়া ভুতের প্রতিনিধিরূপে তাহাদের দুই পক্ষের মনমত একটা ভোট অনুষ্ঠান তাহারা করিবেনই। যাহাতে তাহারা আরো একবার প্রমাণ করিয়া ছাড়িবেন, ইহারা ভুত নহে ইহারা জনগণ এবং জনগণই সকল ক্ষমতার উতস। তবে সত্য হইতেছে, আমাদের দেশে ভোট ও গণতন্ত্রের এই ব্যাপারখানা কেবলি — দরিদ্র কৃষককে মিথ্যা বুঝাইয়া জাল টিপ-সই লইয়া — তাহার সর্বস্ব লুটিবার ছলের সহিত হুবহু মিলিয়া যায় মাত্র।

তদুপরি, একবার এই জোটের পানে চেয়ে আরেকবার অইজোটের পানে, অনেক গণতন্ত্র লিখে চলে যাওয়া সেইসব নানারঙের দিনগুলি সম্ভবত শেষ হইয়া আসিতেছে। বর্তমান সরকারি দলও যেমন চূড়ান্ত অজনপ্রিয় এবং জনবিচ্ছিন্ন, সেইরকম বিরোধিদলও তাহাদের মসনদলোভী লড়াই-সংগ্রামে আদৌ তেমন জন-সাড়া পাইতেছে না। অপরদিকে সেনাশাসনের পক্ষে সম্ভবত সমাজবিচ্ছিন্ন কুচক্রী সুশীল ছাড়া আর কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। নিশ্চয় সেইদিন খুব দূরে নহে, গণগ্রেপ্তার এই ষোলশ-লক্ষ মরিয়া বাঁচিয়া ভুতের ভিতর হইতে জোরসে আওয়াজ ঊঠিবে–

‘লাথি মার, ভাঙ রে তালা!

যত সব বন্দিশালায়–

           আগুন জ্বালা,

 আগুন জ্বালা, ফেল উপাড়ি!’