Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ৩৩

তুর কংগ্রেসে হো চি মিনের ভাষণ

সভাপতি: কমরেড ইন্দোচীনা প্রতিনিধি, আপনি বলুন। (করতালি)

হো চি মিন (১৮৯০-১৯৬৯)

হো চি মিন (১৮৯০-১৯৬৯)

ইন্দোচীনা প্রতিনিধি (হো চি মিন) : কমরেডগণ! আপনাদের সহিত বিশ্ব বিপ্লবের কাজে শামিল হইবার মানসে আমি এই সভায় আসিয়াছিলাম। কিন্তু একজন সমাজতন্ত্রী হিসাবে গভীর বেদনা লইয়া আজ আমি আমার দেশে সাম্রাজ্যবাদীদের ঘৃণ্য অপরাধের প্রতিবাদ করিতে চাহি। (সাধু সাধু!) পঞ্চাশ বছর পূর্বে যে ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দেশে আসিয়া কায়েম হয় ইহা আপনারা সকলেই জানেন। তাহারা সঙ্গিন-বন্দুক ঠেকাইয়া, পুঁজিবাদের নাম করিয়া আমাদের দেশ জয় করিল। সেই হইতে আমরা শুধু নির্লজ্জ নিপীড়ন ও শোষণেরই শিকার হইতেছি না, আমাদের কপালে নির্দয় নির্যাতন ও বিষও জুটিতেছে। মোদ্দা কথায় বলিতে গেলে তাহারা আফিম, মদ প্রভৃতি বিষ খাওয়াইয়া আমাদের বিষাইয়া তুলিয়াছে। এই সাম্রাজ্যবাদী ডাকাতের দল ইন্দোচীনে ঢুকিয়া কি অত্যাচার চালাইয়াছে তাহা আমি এই কয়েক মিনিটে বলিয়া সারিতে পারিব না। স্কুল হইতে কয়েদখানার সংখ্যা বেশি, তথাপি কারাগারে কয়েদি এত বেশি যে আর জায়গা ধরে না। কোন দেশীয় ব্যক্তি সমাজতন্ত্রী ভাবধারার ধারক হইয়াছে শুনিলেই তাহাকে জেলে পুরিয়া দেওয়া হয়, কখনও কখনও বিনা বিচারে মারিয়াও ফেলা হয়। ইহার নাম ইন্দোচীনা বিচার ব্যবস্থা, কারণ তথায় বিচারের পাল্লা ও বাটখারা দুইপ্রকারের। ভিয়েতনামী জনগণ কস্মিনকালেও এয়ুরোপীয় কিংবা এয়ুরোপীয়মনস্ক দেশীয় নাগরিকের সমান বিচার পায় না। সংবাদপত্র কিংবা মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের বেলায় নাই, নাই রাজনৈতিক সংগঠন কিংবা সাধারণ সংগঠন করিবার অনুমতি। আমাদের ভিন দেশে পাড়ি জমাইবার কিংবা পর্যটক হইয়া আরেক দেশে যাইবার সুযোগও নাই। জীবন আমাদের মূর্খতা ও অজ্ঞতার তিমিরে ঢাকা, কারণ শিক্ষা লাভের কোন সুযোগ আমাদের নাই। আমাদের জবরদস্তি করিয়া আফিম সেবন ও মদ্যপান করাইয়া নেশায় বুদ করিয়া রাখা হয়। হাজার হাজার ভিয়েতনামবাসীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে অথবা অন্য লোকের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হত্যাকাণ্ডে ঠেলিয়া দেওয়া হয়।

কমরেডগণ, দুই কোটি ভিয়েতনামবাসীর (খোদ ফ্রান্সের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি) প্রতি ফরাসিদের ব্যবহার এইরূপই। ভিয়েতনাম ফরাসি সুরক্ষার অধীনই বটে (করতালি!)। সমাজতন্ত্রী দলকে ভিয়েতনামের নিপীড়িত জনগণের পক্ষে হাতেনাতে কাজে নামিতেই হইবে। (সাবাস! সাবাস!) …

জঁ লংগুয়ে: আমি নেটিভদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করিয়াছি বটে।

ইন্দোচীনা প্রতিনিধি: আমার বলার প্রথমেই আমি বলিয়াছি সবাইকে অবশ্যই নীরবতা পালন করিতে হইবে (হাস্য)। দলকে সকল উপনিবাসিক দেশে অবশ্যই সমাজতন্ত্র প্রচারের কাজে নামিতে হইবে। সমাজতন্ত্রী দলের তৃতীয় আন্তর্জাতিকে অংশ লইবার সিদ্ধান্ত হইতে আমরা ইহাই বুঝিলাম যে দলটি অবশেষে উপনিবাস প্রশ্নকে যথার্থ গুরুত্ব দিবার পাকা অঙ্গীকার করিল। একটি স্থায়ী প্রতিনিধিদলকে উত্তর আফ্রিকা প্রশ্ন অনুধাবন করার কাজে নিয়োজিত করা হইয়াছে শুনিয়া আমরা যারপরনাই আহ্লাদিত হইয়াছি, আর আমরা আরও খুশি হইব যদি দল কোন সমাজতন্ত্রী সদস্যকে ইন্দোচীনে পাঠায় দেশটি লইয়া সরেজমিন অনুসন্ধান, দেশের বিশেষ বিশেষ সমস্যা ও তাহার ভিত্তিতে যে কার্যক্রম গ্রহণ করিতে হইবে …

একজন (ডানপন্থি) প্রতিনিধি: আনোয়ার পাশার সহিত মিলাইয়া?

ইন্দোচীন প্রতিনিধি: চুপ রও! যতসব সংসদপন্থি! (করতালি!)

সভাপতি: এখন হইতে সব প্রতিনিধিকে অবশ্যই চুপ থাকিতে হইবে! সংসদপন্থি হইলেও, না হইলেও!

ইন্দোচীনা প্রতিনিধি: সমগ্র মানব জাতির দোহাই, সমাজতান্ত্রিক দলের ডান-বাম মত নির্বিশেষে সকল সভ্যের দোহাই দিয়া আমি আপনাদের আহ্বান জানাইতেছি! কমরেড: আমাদের বাঁচান! (বিপুল করতালি)

সভাপতি: এই বিপুল করতালি ও অভিবাদন হইতেই ইন্দোচীনা প্রতিনিধি বুঝিয়াছেন যে বুর্জোয়া শ্রেণি যে অপরাধ চালাইতেছে তাহার বিরুদ্ধে সমগ্র সমাজতান্ত্রিক দল আপনার পক্ষে রহিয়াছে।

বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান–জমিরউদ্দিন আহমদ বি.এ.

মুকাদ্দমা: বর্তমানে সারা দক্ষিণ উপমহাদেশে যেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতর জয় জয়কার চলিতেছে। সম্প্রতি ভারতের গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও আসন্ন লোকসভার নির্বাচনে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি প্রয়াত সর্দার বল্লবভাই পটেলের জন্মদিনে পটেলের এক মূর্তি নির্মাণ কার্য উদ্বোধন করিয়াছেন। এই স্থাপনা নাকি হইবে আমেরিকার স্টাচু অব লিবার্টির দ্বিগুণ এবং তাহার নাম হইবে স্টাচু অব ইউনিটি। মোদিজি সর্দার পটেলকেই ভারতীয় ঐক্যের প্রতীক করিতে প্রয়াস করিতেছেন। গুজরাট দাঙ্গার পর উত্তর প্রদেশের মুজ্জাফ্ফর নগরে এখন ক্ষণে ক্ষণে দাঙ্গা চলিতেছে। এইরূপ পরিস্থিতিতে স্টাচু অব ইউনিটি লইয়া ভাবুক গোষ্ঠি নতুন করিয়া খাবিয়া খাইতেছে। আবার বাংলাদেশে বৌদ্ধরা এই প্রথম আক্রমণের শিকার হইয়াছে। যুদ্ধাপরাধের রায়ের ঘোষণার পরপরই সারা দেশে বিভিন্ন হিন্দু মন্দিরে আক্রমণ হইয়াছে। তাহার সর্বশেষ নিদর্শন নজরে পড়িল পাবনার সাঁথিয়ায়। এদিকে শ্রীলঙ্কায় ও মায়ানমারের সংখ্যাগুরু বৌদ্ধরা যথাক্রমে তামিল ও মুসলমান রোহিঙ্গাদের উপর তোপ চালাইতেছে। এই সকল কথা মাথায় রাখিয়া সাম্প্রদায়িক চিন্তা প্রতিরোধ করিতে বিগত দিনে ভাবুকেরা কিভাবে ভাবিয়া গিয়াছেন তাহার নমুনা স্বরূপ বর্তমান এই প্রবন্ধখানি পুনঃপ্রকাশ করিতেছি

অনেকে অনেক প্রবন্ধ লিখে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, বঙ্কিমচন্দ্র আদৌ মুসলমানবিদ্বেষী নন — এবং আজ পর্যন্তও এ অসম্ভব চেষ্টার ত্রুটি হচ্ছে না। এ চেষ্টা যতই হাস্যাস্পদ হক — একে একেবারে উপেক্ষাও করা যায় না। আন্তর্জ্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিরাও যখন বঙ্কিমের অ-হিন্দু প্রীতি প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর হন, তখন সত্যি দেশের দুর্দ্দশা ভেবে ক্ষুণœ হতে হয়। স্যর যদুনাথ সরকার মহাশয় ১৩৪৫ সনের আষাঢ় সংখ্যা ‘ময়মনসিংহবাসী’তে প্রমাণ করতে প্রয়াস পেয়েছেন যে, বঙ্কিমকে মুসলমানবিদ্বেষী কিছুতেই বলা যায় না, বরং তিনি যে মুসলমান জাতের উপর কয়েক দফা হাত নিয়েছেন তা যুক্তিসঙ্গতই বটে!

এত বড় প্রতিভাবান মনীষী স্যর যদুনাথ সরকার মহাশয় কিছুতেই বুঝতে পারেননি যে, “বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার ‘আনন্দমঠে’ মুসলমান জাতি (যদিও ‘জাতি’ শব্দ ঠিক নহে, ‘ধর্ম্ম-সম্প্রদায়’ বলিলে অধিক সত্য হয়), এবং ইসলামধর্ম্মের উপর নিজের হৃদয়ের বিষ উদগার করিয়াছেন, অনর্থক তাঁহাদেও নিন্দা প্রচার ও তাঁহাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করিয়াছেন।” (ময়মনসিংহবাসী, আষাঢ়, ১৩৪৫)

আমরা একথা বলি না যে ‘বঙ্কিম ইসলাম ধর্ম্মের উপর নিজের হৃদয়ের বিষ উদগার করিয়াছেন।’ তবে ইহাও সত্য যে, তিনি শুধু ‘আনন্দমঠে’ নয়, তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলিতে যেখানেই সুযোগ পেয়েছেন, ভারতের মুসলমানদের উপর একহাত নিয়ে ছেড়েছেন। আজ যে ভারতব্যাপী হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব চলছে তার মূল প্রেরণা যোগাচ্ছে বঙ্কিমের তথা কথিত ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো। মুসলমানদের ‘পাকিস্তান’ দাবীর মূলেও বঙ্কিমের মুসলমান বিদ্বেষ কাজ করছে বলেই আমার বিশ্বাস। পাশাপাশি হিন্দু-মুসলমান যে সম্প্রীতিতে বাস করছিল, বঙ্কিমের আমল হতেই সে সম্প্রীতি ভেঙ্গে — তাঁদের মধ্যে হানাহানি শুরু হয়ে গেল।

অধ্যাপক সরকার মহাশয় মুসলমানকে ‘ধর্ম্ম-সম্প্রদায়’ মনে করেন — ‘জাতি’ বলতে তাঁর সংস্কৃতিতে বাধে। কিন্তু এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমরা তর্ক করতে চাই না — এখন ইহা অনস্বীকার্য্য যে, ভারতের ‘মুসলমান’ একটা ‘জাতি’ —  ‘ধর্ম্মসম্প্রদায়’ মাত্র নহে।

স্যর যদুনাথের প্রবন্ধ ঐতিহাসিক তথ্যের খনি। ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করেও কিন্তু কোন যুক্তি দিয়ে তিনি বঙ্কিমের মুসলমানবিদ্বেষ যুক্তিসঙ্গত বলে প্রমাণ করতে পারেননি। তিনি যে-সব যুক্তির অবতারণা করেছেন, প্রাথমিক তর্কশাস্ত্রের ছাত্রেরাও এসব যুক্তিকে অনায়াসে ‘ভ্রান্তিমান যুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিতে পারে। প্রমাণস্বরূপ তিনি মরহুম মীর মোর্শারফ হোসেন সাহেবের এজিদ ও এজিদপন্থীদের গালির কথা এবং আধুনিক প্রতিভাবান লেখক আবুল মনসুর আহমদ সাহেবের ‘আয়না’ নাকম গল্পের বইয়ের উল্লেখ করেছেন। সরকার মহাশয় লিখেছেন — ‘তিনি (আবুল মনসুর আহমদ) দেখাইয়াছেন যে যেমন আমারদের (হিন্দুদের) মধ্যে তারকেশ্বরের মোহন্ত আছে, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজকেও সেই শ্রেণীর জীব শোষণ করিতেছে।’

কিন্তু সারা ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বা ‘আয়না’ ঘেঁটেও আমরা পেলাম না যে মরহুম মোর্শারফ হোসেন সাহেব বা আবুল মনসুর আহমদ সাহেব কোথাও কোন একটা জাতিকে গালি দিয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত শক্রকে আমি গালি দিতে পারি, সে অন্য কথা — কিন্তু সেজন্য ত আমি একটা জাতের মুণ্ডুপাত করতে পারি না। মুসলমান সমাজে যে তারকেশ্বরের মোহন্তের মত শোষণকারী জীব আছে, সে জীবকে সমালোচনা করে জাতির সামনে ধরলে জাতি অবহিত হবে। সমালোচনা আর গালি ত এক কথা নয়! এজিদ ও সীমারের দুষ্কার্য্যরে জন্য মরহুম মোর্শারফ হোসেন সাহেব কোথাও সমস্ত শিয়া সম্প্রদায়টাকে গালি পাড়েন নাই; এজিদকে এবং সীমারকেই বাক্যবাণে জর্জ্জরিত করেছেন মাত্র। কিন্তু রেজা খাঁ বা মীর জাফরের দোষে ভারতের ‘মুসলমান জাতি’ কেন গাল হজম করবে তা আমাদের বুদ্ধিতে কিছুতেই আসে না। বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ও উমিচাঁদের দলকে এবং অত্যাচারী রেজা খাঁকে বঙ্কিম যা ইচ্ছা তা-ই বলুন — তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু তিনি যদি তাদের পাপের জন্য সমগ্র ভারতের ‘মুসলমান জাতি’কে কষাঘাত করতে আসেন তবে আমরা তা সহ্য করতে যাব কেন?

Grand master  (গ্রাণ্ড মাষ্টার) — ‘Back dog’ (দূর হ কুকুর) বলেছিল আইজাককে (lssak)  সমস্ত ইহূদী জাতিটাকে নয়। সরকার মহাশয় লিখেছেন — “নাট্যশাস্ত্রের নিয়মানুসারে খ্রীষ্টান জঙ্গী মোহন্তের মুখ হইতে এইরূপ রূঢ় কথাই বাহির হওয়া স্বাভাবিক। ‘আনন্দমঠে’র সন্তান ‘মহারাজেরা’ও বিপক্ষকে ঠিক সেইরূপ ভাষায় উল্লেখ করিতেছেন।” ‘আনন্দমঠ’ পড়েই যদি সরকার মহাশয়ের ধারণা হয় যে, বঙ্কিম শুধু বিপক্ষকে স্বাভাবিক উক্তি প্রয়োগ করেছেন, তবে তাঁকে কি দিয়ে বুঝাব, জানি না। আমরা যদি আনন্দমঠ হতে কিছু অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে দেই তবে হইা সহজেই প্রমাণিত হবে যে, বঙ্কিম শুধু বিপক্ষকে রূঢ় কথা বলেননি, বলেছেন মুসলমান জাতিকে। ‘সন্তান’ ‘মহারাজদের’ সঙ্গে যত যুদ্ধ হয়েছে সব যুদ্ধের বিপক্ষ কর্ণধার ছিলেন ইংরেজ আর ‘সন্তান’দের হাতে অনবরত অত্যাচার ভোগ করেছে মুসলমান জাতি। যুদ্ধের আরম্ভও ইংরেজের সঙ্গে এবং শেষও ইংরেজের সঙ্গে। ইংরেজরা বিদ্রোহী ‘সন্তান’দের দমন  করে দেশকে চুরি-ডাকাতি, অত্যাচার-অবিচার ও জেল-জুলুম হতে রক্ষা করলেন আর বঙ্কিমের বিষ উদগারের পাত্র হল মুসলমান জাতি এবং ‘ইংরেজ ভারতবর্ষের পরমোপকারী।’

জ্ঞানানন্দ বললেন — ‘কিছু গোলযোগ বোধ হইতেছে। কালিকার কাণ্ডটার জন্য নেড়েরা গেরুয়া কাপড় দেখিতেছে আর ধরিতেছে।’ (আনন্দমঠ, ১ম খণ্ড, ১৭শ পরিচ্ছেদ) জ্ঞানানন্দ — ‘এই যবনপুরী ছারখার করিয়া নদীর জলে ফেলিয়া দিব। এই শূয়ারের খোঁয়ার আগুনে পোড়াইয়া মাতা বসুমতীকে আবার পবিত্র করিব। ভাই আজ সেই দিন আসিয়াছে।’ ‘সেই শূয়রের নিবাস অগ্নিসংস্কৃত করিয়া নদীর জলে ফেলিয়া দিই।’ — ‘মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধামাধবের মন্দির গড়িব- — ‘মার মার নেড়ে মার।’ (৮ম পরিচ্ছেদ-৩য় খণ্ড)। — ‘উঠ, মুসলমানদের বুকে পিঠে চাপিয়া মার।’ এই সবকে কি আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা মুসলমানদের প্রতি সাদর সম্ভাষণ বলবেন? সন্তানদের যুদ্ধ হল ইংরেজের সঙ্গে — দেশে জুলুম করে খাজনা উঠাল রেজা খাঁ — তাও ইংরেজদের সাহার্য্য;ে কেননা ইংরেজরাই তখন দেশের কর্ত্তা, মুসলমান নামে মাত্র নবাব — আর মুসলমানেরা বঙ্কিমের বক্র চাহনিতে হয়ে গেল ‘নেড়ে’ ‘শূয়র’ ‘যবন’ ইত্যাদি। বঙ্কিমের ‘মসজিদ ভাঙ্গিয়া রাধামাধবের মন্দির’ গড়ার সংকল্পই কি আজকের দিনে হিন্দুদেরকে মসজিদ অপবিত্র ও মসজিদে অগ্নিসংযোগ অনুপ্রেরণা দিচ্ছে না? বঙ্কিমের মুসলমানের ‘বুকে পিঠে চাপিয়া মারাই’ কি আজ সাভারকর ও মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুদেরকে মুসলমানকে ভারতভূমি হতে তাড়াতে ষড়যন্ত্র করার মাল-মসল্লা যোগাচ্ছে না? সরকার মহাশয় কি এ সব প্রশ্নের উত্তর দিবেন?

সন্তানদের মহারাজা সত্যানন্দ বলেন, ‘আমরা রাজা চাহিনা — কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদেরে নিপাত সবংশে করিতে চাই।’ এই কি বঙ্কিমের হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ? এই শিক্ষাই কি জাতীয় কবির  শিক্ষা? এ-সব প্রশ্নের মীমাংসার অবসর এই প্রবন্ধে নাই। সুতরাং এই প্রশ্ন এখন নাই বা তুললাম। আমরা বলব বঙ্কিম সাহিত্য দেশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে — হিন্দুকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে — তাতে ভারতের হিন্দু-মুসলমান উভয় জাতির একতায় এক অলক্ষ্য প্রাচীর সৃষ্টি হয়েছে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না যে — মুসলমান যখন রাজত্বহীন সুতরাং অসহায় তখন কেন বঙ্কিম ও তথাকথিত জাতীয় কবিরা মুসলমানকে গালি দিলেন আর ইংরেজের সাহায্যে হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখলেন।

‘বন্দেমাতরম’ গানটি সম্বন্ধে মন্তব্য করতেও অধ্যাপক মহাশয় ছাড়েননি — তিনি লিখেছেন “মন্দেমাতরম গানটিতে আপত্তি উঠিয়াছে যে উহা হিন্দু মূর্ত্তি পূজার স্তোত্র। সত্য বটে হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর বর্ণনা যে সব ‘সাধন’ গ্রন্থে আছে তাহা খুঁজিয়া এ পর্য্যন্ত একটিও ‘সুজলা সুফলা মলয়জ শীতলা শস্যশ্যামলা’ রূপধারিণী দেবী মূর্ত্তি পাওয়া গেল না।” অধ্যাপক মহাশয় এ গানটি মুসলমানের আপত্তির কিছুই পান নাই তাতে আমরা বিস্মিত নই। তিনি ঐতিহাসিক হতে পারেন কিন্তু পক্ষপাতশূণ্য নন বলে ‘আনন্দমঠে’ কোন দোষ পাননি। ‘বন্দেমাতরম’ আমাদের হিন্দু ভাইদের জাতীয় সঙ্গীত হতে যেয়ে  মুসলমান আপত্তি করবে, তাকে আমরা বিকৃত মস্তিষ্ক বলব। কিন্তু ‘মুসলমানেরা মাতাকে বন্দনা’ করে নাÑ তারা বন্দনা করে খোদাকেÑ আর কিছুকে বন্দনা করাই মুসলমানদের পাপ। সুতরাং গানের প্রথম শব্দটি গ্রহণেই আমাদের আপত্তি। তারপর মধ্যে আছে:

তুমি বিদ্যা, তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি, তুমি মর্ম্ম
তোমার প্রতিমা গড়ি
মন্দিরে মন্দিরে।

অধ্যাপক মহাশয় বিশেষ করে মুসলমান যুগের ইতিহাস বিশারদ, সুতরাং মুসলমান তমদ্দুনের সঙ্গেও পরিচিত। তিনি কি এই শ্লোকগুলোকে মুসলমানদের গ্রহণীয় বলতে চান? মুসলমান কি কোন দিন কারো প্রতিমা গড়ে মন্দিরে রেখে পূজা করতে পারে? তাই বলি আমাদের হিন্দু ভাইয়েরা ‘বন্দেমাতরম’কে হিন্দু ও মুসলমান উভয় জাতির জাতীয় সঙ্গীত বলে চালাতে চান তখনই আমাদের আপত্তি। আশা করি এত শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মহাশয় বুঝেছেন কোথায় বঙ্কিম মুসলমানের উপর তাঁর হৃদয়ের বিষ উদগার করেছেন এবং ‘বন্দেমাতরম’ গান গ্রহণে কোথায় মুসলমানদের আপত্তি।

আর বিশেষ আলোচনা করে প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি করতে চাই না। একজন আধুনিক উদারনৈতিক হিন্দু সমালোচকের উক্তি উদ্ধৃত করেই প্রবন্ধ শেষ করতে চাই। এ উদ্ধৃতি হতে পাঠক বঙ্কিম-সাহিত্যের স্বরূপ বুঝতে পারবেন। মিঃ নন্দগোপাল সেনগুপ্ত তাঁর ‘বাংলা সাহিত্যের ভূমিকা’ নামক গ্রন্থের ২৩০-৩১ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:

তবে বঙ্কিম প্রবর্ত্তিত জাতীয়তার স্বরূপটাও বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। বঙ্কিমের সাহিত্যে অ-হিন্দু বিদ্বেষ আছে, এ কথা বঙ্কিম বেঁচে থাকলে নিজেই স্বীকার করতেন। অনুন্নত হিন্দু, এমনকি হীনবিত্ত হিন্দুও তাঁর সাহিত্যের ত্রিসীমায় ঘেঁষতে পারেন নি। রাজা, জমিদার, যোদ্ধা ও সন্ন্যাসী এবং তাঁদের সুখ-দুঃখ নিয়েই বঙ্কিম ব্যস্ত অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমানে, উন্নত ও অনুন্নতে, ধনী ও দরিদ্রে, একটি স্থায়ি এবং অনড় বিভেদের গণ্ডি টেনে দিয়ে, তিনি কেবল সম্পন্ন বর্ণ-হিন্দুর সংহতি ও পরিপুষ্টিকেই দেশাত্মবোধ নামে প্রচার করে গেছেন। … পরকীয় শক্তির প্রভুত্বেও তিনি সবিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

আমি যে পথে লেনিনবাদী হইলাম–হো চি মিন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আমি পারি নগরে থাকিতে শুরু করিলাম। কখনও আমি চিত্রগ্রাহকের সহযোগীর কাজ করিতাম, কখনও ‘চীনা পুরাতত্ত্ব’ আঁকিতাম (যদিও ইহা ফরাসি দেশে তৈয়ার হইত)। ফরাসি উপনিবাসবাদীরা ভিয়েতনামে কি পরিমাণ অপরাধ করিয়াছে তাহা আমি প্রচার পত্রাকারে বিলি করিতাম।

 

সেই সময়ে আমি সহজাতভাবেই অক্টোবর বিপ্লবকে সমর্থন করিয়াছিলাম। যদিও ইহার সকল ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝিয়াছিলাম তাহা নহে। তখনও পর্যন্ত আমি লেনিনের কোন পুস্তক পাঠ করি নাই। তথাপি আমি লেনিনকে ভালবাসিয়াছিলাম, লেনিনের ভক্ত বনিয়াছিলাম। কারণ আমার বোধ হইত লেনিন এমন এক মহান দেশপ্রেমিক যিনি আপন স্বদেশবাসীকে মুক্ত করিয়াছেন।

 

ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে আমার যোগদানের রহস্য ছিল তাহার সভ্য কমরেডরা (যাঁহাদের আমি সেই সময়ে ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোক বলিয়া ডাকিতাম) আমার প্রতি আর তাবৎ নিপীড়িত জাতির সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। সেই কালে আমি কিন্তু দল, শ্রমিক সংঘ কিংবা সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদ ইত্যাদি বিষয়ের কিছুই বুঝিতাম না।

 

সেইকালে সমাজতান্ত্রিক দলে বিভিন্ন শাখায় তুমুল তর্ক চলিত। তর্কের বিষয়: দল কি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকেই থাকিবে, আড়াই আন্তর্জাতিক গঠন করা কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে নাকি লেনিনের তৃতীয় আন্তর্জাতিকেই য্ক্তু হওয়া কর্তব্য? সপ্তাহে দুই কি তিন দিন সভা হইত। সভায় আমি নিয়মিত উপস্থিত থাকিতাম এবং মন দিয়া সকল আলোচনা শুনিতাম। প্রথম প্রথম আমি পুরাপুরি বিষয়গুলি বুঝিয়া উঠিতে পারিতাম না। কি লইয়া এই তর্কগুলি এত গরম হইয়া উঠে? দ্বিতীয়, আড়াই কিংবা তৃতীয় আন্তর্জাতিক যাহাই হউক বিপ্লব হইলেই তো হইল? ইহা লইয়া এত তর্ক করিবার কি আছে? প্রথম আন্তর্জাতিকেরই বা কি গতি হইল?

 

যাহা জানিতে আমি একান্তই মুখিয়া থাকিতাম এবং যাহা এই সকল আলোচনায়  আসিত না বলিলেই চলে তাহা হইল কোন আন্তর্জাতিক উপনিবাসিক দেশের জনগণের পক্ষে?

 

এক মিটিংয়ে আমার মতে এই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তুলিলাম। কিছু কমরেড আমায় বলিল: দ্বিতীয় নহে, তৃতীয় আন্তর্জাতিকই উপনিবাসী জনগণের পক্ষে । তখন এক কমরেড আমায় ল্য’য়ুমানিটি পত্রিকায় প্রকাশিত লেনিনের ‘জাতীয় এবং উপনিবাস প্রসঙ্গে তত্ত্ব’ লেখাটি পড়িতে দিলেন।

 

লেনিনের এই লেখায় কিছু রাজনৈতিক শব্দ ছিল যাহা আমি ঠিক বুঝিতে পারি নাই। তবুও ইহা আমি বারবার পড়িতে লাগিলাম এবং শেষে ইহার সারাংশ ধরিতে পারিলাম। তখন কি আবেগ, কি উদ্দীপনা, কি স্বচ্ছদৃষ্টি ও আত্মবিশ্বাস আমায় ভর করিল! আনন্দে আমার চোখ জলে ভাসিয়া গেল। কামরায় আমি একাকী বসিয়া ছিলাম, তথাপি আমি চিৎকার দিয়া যেন জনতার উদ্দেশ্যে বলিতে লাগিলাম  ‘হে স্বদেশবাসী, হে শহীদেরা! ইহাই তো আমাদের দরকার! ইহাই আমাদের মুক্তির পথ বাতলাইয়া দিবে।’

 

তাহার পর হইতে লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আসিয়া গেল।

 

পূর্বে দলের শাখার মিটিংয়ে আমি আলোচনা শুধু শুনিয়াই যাইতাম; আমার আবছা আবছা মনে হইত সকলের কথাই বুঝি ঠিক; কাহারা আসলে ঠিক আর কাহারাই বা ঝুট তাহা ঠিক ধরিতে পারিতাম না। তখন অবশ্য ভাব প্রকাশের পর্যাপ্ত ফরাসি শব্দ আমার ভাণ্ডারে ছিল না, তথাপি লেনিন এবং তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর যে কোন অভিযোগ আমি দৃঢ়তার সহিত তছনছ করিয়া দিতাম। আমার একমাত্র যুক্তি ছিল: যদি তোমরা উপনিবাস ব্যবস্থার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করিতে না পার, যদি তোমরা উপনিবাসের জনগণের পক্ষ না লইতে পার তবে তোমরা এ  কেমনতর বিপ্লবে প্রবৃত্ত হইয়াছ?

 

আমি কেবলমাত্র আমার দলের শাখা সমূহে আলোচনায় অংশ লইয়া ক্ষান্ত থাকিতাম না, ‘আমার মত’ প্রতিষ্ঠায় অন্যান্য শাখা সমূহেও হাজির হইতাম। বলিতেই হইবে যে কমরেড মার্সেল কাশিন, ভাইলা কুতুরিয়ে, মুমুসে ও  আরও অনেকে আমায় জ্ঞান বিকাশে সাহায্য করিয়াছেন। পরিশেষে তুর কংগ্রেসে এই কমরেডদের সহিত তৃতীয় আন্তর্জাতিকে যোগদানের পক্ষে ভোট দিয়াছিলাম।

 

সাম্যবাদ নহে, দেশপ্রেমই আমায় সর্বপ্রথম লেনিনের উপর, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের উপর ভরসা যোগাইয়াছিল। ক্রমে ক্রমে লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সহিত মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ পাঠ করিতে করিতে আমি অচিরেই বুঝিতে পারিলাম, কেবলমাত্র সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই পারে সকল নিপীড়িত জাতি ও শ্রমজীবী জনগণকে দুনিয়ার সকল ধরনের দাসত্ব হইতে মুক্ত করিতে।

 

চীনসুদ্ধ আমাদের দেশে ‘জ্ঞানীর বহি’ নামা এক আশ্চর্য পুস্তকের কথা প্রবাদে আছে। কেহ যখন বড় বিপদের সম্মুখীন হয়, এই পুস্তক খুলিয়া দেখে এবং যে পাতা খুলিল তাহাতেই মুস্কিল আসানের উপায় পাইয়া যায়। ভিয়েতনামের সকল বিপ্লবী এবং জনগণের জন্য লেনিনবাদ কেবলমাত্র ‘জ্ঞানীর বহি’ ও দিকনির্দেশকই নহে, বলিতে হয় ইহা তেজোদীপ্ত সূর্যের সেই বিকীরণ যাহা আমাদের সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে লইয়া যাইবে।

 

 

অনুবাদকের টীকা:

 

তুর কংগ্রেস:

 

১৮৪৮ সালে ইউরোপে বিপ্লবের পর ১৮৬৪ সালে লন্ডনে গঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক । মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩), প্রুধোঁ (১৮০৯-১৮৬৫), বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬), এবং ফরাসি বিপ্লবী অগুস্ত ব্লাংকি (১৮০৫-১৮৮১) প্রমুখ ইহার নেতা ছিলেন। ১৮৭২ সালে আসিয়া ইহা দ্বিধাবিভক্ত হয়।

 

এদিকে ফরাসিদেশে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র হয় এবং পারি কমিউনকে দমন করা হয়। ফরাসি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন দমনপীড়নের মুখে শতধাবিভক্ত ও দুর্বল হইয়া পড়ে। মার্কসবাদীদের মধ্যে জুলস গুয়েসদে, পল লাফার্গ প্রমুখ সংসদে নির্বাচিত হন, আন্দোলন চালাইয়া যান, জেলজুলুমেরও শিকার হন।

 

অবশেষে ১৯০৫ সালে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক ধারা মিলিয়া ‘শ্রমিক আন্তর্জাতিকের ফরাসি শাখা’ নামে সমাজতন্ত্রী পার্টি হয়। জঁ জউরে (১৮৫৯-১৯১৪) ইহার নেতা ছিলেন। এই দল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে (১৮৮৯-) শরিক ছিল। ১৯০৬ ও ১৯১৪ সালের ফরাসি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের অনেক প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।

 

১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ আরম্ভ হইলে জার্মানি ফ্রান্স দখলে উদ্যত হয়। তখন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে দ্বিধা দেখা দেয়। একদল যুদ্ধে প্রজাতন্ত্রীদের সাথে একত্র হওয়ার পক্ষপাতী হয়, আরেক অংশ বিরোধিতা করে। প্রথম মহাযুদ্ধের শেষলগ্নে ১৯১৭ সালে রুশদেশে লেনিন বিপ্লব করেন। তখন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে দ্বিধা আরো প্রকট হয়। ১৯১৯ সালে লেনিন ও অন্যান্যরা তৃতীয় আন্তর্জাতিক গঠন করেন।

 

১৯২০ সালের ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর ফরাসি পার্টির তুর কংগ্রেস সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় দ্বিতীয় বনাম তৃতীয় আন্তর্জাতিক (আড়াই আন্তর্জাতিক বাদ দিলে) এবং কমিউনিস্ট বনাম সমাজতন্ত্রী ভাগ হয়ে যায়। আলাদাভাবে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। হো চি মিন ইহার সদস্য ছিলেন।

 

ল্য’য়ুমানিটি শতাব্দীপ্রাচীন ফরাসি পত্রিকা। পুরাতন সমাজতন্ত্রী জঁ জউরে ১৯০৪ সালে এই পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। লেনিনের আমলে তুর কংগ্রেসে সমাজতন্ত্রী বনাম কমিউনিস্ট ভাগ হইলে এই পত্রিকা কমিউনিস্টদের ভাগে পড়ে।

 

কমরেড মার্সেল কাশিন, ভাইলা কুতুরিয়ে, মুমুসে — ইহারা ফরাসি সমাজতন্ত্রী দলের তৎকালীন সদস্য। অধিকাংশই কালে তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষ লইয়াছিলেন।

 

জঁ লংগুয়ে সমাজতান্ত্রিক দলের আদিধারার গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি কার্লমাক্সের মেয়ে জেনির পুত্র।

 

উৎস: Ho Chi Minh on Revolution, Selected Writings, 1920-66, edited by Bernard B. Fall, printed from The Signet

গিয়াপচরিত্র: সাম্রাজ্যবাদ ও জাতীয় মুক্তির যুদ্ধ এবং লেনিনের এশিয়া দর্শন–মোহাম্মদ হাবিব

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪)

ভ্লাদিমির লেনিন রুশদেশের প্রসিদ্ধ রাজনীতিবিশারদ ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর জন্ম ১৮৭০ সালে।  ১৮৯০-এর দশক হতে তিনি পুরাদমে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেন। বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে এশীয় মুক্তির লড়াইয়ে লেনিনের দৃষ্টি সদানিবদ্ধ ছিল। তাঁর চিন্তা উত্তরকালে ভিয়েতনামের জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের নেতা হো চি মিনের জন্য পথনির্দেশক হয়েছিল। গিয়াপ ও ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে জাতীয় মুক্তির লড়াই ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেনিনের বয়ান ও বিচার একনজর দেখা যেতে পারে।

জাতি প্রশ্নে লেনিন:

লেনিনের মোটাদাগে অবস্থান ছিল জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু জাতীয় মুক্তির আন্দোলন ও জাতীয় অসাম্য দূর করার পক্ষে তাঁর শপথ ছিল পাক্কা। লেনিন লিখেছেন তাঁর দল (সামাজিক-গণতন্ত্রী পার্টি) সকল জাতিসত্তার রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও পৃথক রাষ্ট্র গঠনের অধিকার স্বীকার করে।  (লেনিন, ১৯১৩) সেই সাথে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের বিষয়টি তাঁর লেখার একটি বড় বিষয় ছিল। রাষ্ট্রে ধর্ম, জাতি, ভাষা, লিঙ্গ ইত্যাদির ভিত্তিতে বৈষম্যের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। (লেনিন, ১৯১৩) রাষ্ট্রে সকল জাতির সম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সংখ্যালঘু জাতি বা ধর্মের উপর পীড়ন বা বৈষম্য চলবে না। (লেনিন, ১৯১৩) ধর্ম, লিঙ্গ বা জাতি পরিচয়ের কারণে কারো অধিকার খর্ব করা চলবে না । (লেনিন, ১৯১৪)।

যুদ্ধ প্রসঙ্গে:

লেনিনকে যুদ্ধবিশারদ বলা যায় কিনা সে প্রশ্নের সমাধান আমরা করতে পারব না। উনিশ শতকে জার্মান সমরবিদ কার্ল ভন ক্লসভিৎস যুদ্ধকলায় প্রসিদ্ধ। ক্লসভিৎসের ‘যুদ্ধ রাজনীতিরই সম্প্রসারণ, তবে ভিন্নপন্থায়’ এই বাণী অন্যদের মধ্যে লেনিনও স্বীয় বিভিন্ন লেখায় উদ্ধার করেছেন। লেনিন রাজনীতিবিশারদ বটেন। যুদ্ধের রাজনীতি নিয়ে তাঁর শতেক আলোচনা পাওয়া যায়।

যুদ্ধের রাজনীতি আর যুদ্ধের নীতি বা নৈতিকতা — দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যুদ্ধ সকলে নৈতিকভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নন। কেউ সকল যুদ্ধের বিরোধিতা করেন কোন নিক্তিতে তাদের না মেপেই, মানে সামান্যভাবে। কিন্তু লেনিন তাঁদের দলে নন। যুদ্ধের নৈতিকতা সম্পর্কে লেনিনজি লিখেছেন: ‘যুদ্ধমাত্রেরই কেউ বিরোধিতা করলে তাকে সমাজতন্ত্রী বলা অপলাপ হবে।’ (লেনিন, ১৯১৬) পুনরায়:

যুদ্ধমাত্রেরই বিরোধী আমরা নই। … যুদ্ধ নানান রকম। আমাদের দেখতে হবে কোন যুদ্ধ কোন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে শুরু হল, কোন কোন শ্রেণী যুদ্ধে লড়াই করছে, এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়া বিভিন্ন পক্ষের উদ্দেশ্য কি। … (লেনিন, ১৯১৬)

লেনিনের বিচারে বিপ্লবী বা প্রগতিশীল যুদ্ধ আর প্রতিক্রিয়াশীল যুদ্ধের ভেদ মৌলিক:

ক্লসভিৎস নাপোলিয়নীয় আমলে যুদ্ধ সম্পর্কে যা বলেছিলেন তা চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই আজ জানেন, যুদ্ধ নীতি বা রাজনীতিরই সম্প্রসারণ। ফলে কোন যুদ্ধ বুঝতে তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জানা চাই … আঠারো শতকের শেষে যখন বিপ্লবী ফরাসি শহুরে জনতা ও কৃষকসমাজ  বিপ্লবী কায়দায় রাজতন্ত্র উৎখাত করল ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করল, রাজার নিপাত করল, সামন্তপ্রভুদের নিপাত করল, তখন তাদের এই রাজনীতি গোটা ইউরোপের স্বৈরাচারী, জারবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও আধা-সামন্তবাদী ভিত্তিমূল ধরে নাড়া দিল। সকল রাজতন্ত্রী ইউরোপীয় জাতি তাদের রাজনীতির ধারায় অনিবার্যভাবেই একটা জোট গঠন করে বিপ্লবী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিবিপ্লবী যুদ্ধে শামিল হল। ফরাসিজাতি  নিজ দেশের মধ্যে যেমন পয়লাবারের মত এমন বিপুল বৈপ্লবিক উদ্ভাসিত হল যা তারা বহুশতাব্দী হয় নি, তেমনি আঠারো শতকের শেষে যে যুদ্ধে তারা নামল তাতে রণকৌশল বলে যে বিষয়টা আছে সে পুরা বিষয়টাই তারা বিপুল বৈপ্লবিক সৃজনশীলতায় ভেঙে নতুন করে গড়ল। যুদ্ধ নিয়ে আগের বাঁধিগৎ নিয়মকানুনও তারা উড়িয়ে দিল। পুরানা সৈনিকব্যবস্থা বদলিয়ে  বিপ্লবী গণবাহিনী গঠন করল। তারা যুদ্ধের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করল। (লেনিন, ১৯১৭)

রাজনীতি ও যুদ্ধের বিবর্তন:

সাম্রাজ্যবাদের যুগে কি নাপোলিয়েঁর আমলের মত যুদ্ধ সম্ভব? ইউরোপে বা ফ্রান্সে আর সম্ভব নয়। সেখানে এখন যুদ্ধের হাড়মজ্জা বলতে সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু এশিয়ায়? উপনিবেশে? লেনিন বলছেন:

আজকের সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ দেখে আমাদের যেন দৃষ্টিশক্তি লোপ না পায়। বড় শক্তিগুলার মধ্যে এহেন যুদ্ধ সাম্রাজ্যবাদের যুগের বৈশিষ্ট্য। তাই বলে এই যুগে গণতান্ত্রিক যুদ্ধ বিদ্রোহ, যেমন বিদেশী শাসনের নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য নিপীড়িত জাতির যুদ্ধ হবে না এমন কথা কিন্তু নাই। আবার বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্র হাসিলের জন্য সর্বহারার গৃহযুদ্ধ এ যুগে অনিবার্য। তেমনি যে দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় হয়েছে তার সাথে অন্য অন্য বুর্জোয়া বা প্রতিক্রিয়াশীল দেশের যুদ্ধ হতে পারে। (লেনিন, ১৯১৬)

অন্যত্র লেনিন যুদ্ধের বিবর্তন নিয়ে আরও বিস্তারিত কথা বলেছেন:

আধুনিক যুগে যুদ্ধের ঐতিহাসিক প্রকারভেদ : মহান ফরাসি বিপ্লব মানবজাতির ইতিহাসে নোতুন যুগের সূচনা করে। তখন থেকে পারী কমিউন অবধি, মানে ১৭৮৯ থেকে ১৮৭১ অবধি এক প্রকার যুদ্ধ হয়েছে যাকে বলা চলে বুর্জোয়া-প্রগতিশীল, জাতীয়-মুক্তিকামী যুদ্ধ। অন্য কথায়, একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদ উচ্ছেদ, সামন্ত প্রথাপ্রতিষ্ঠানের নিকুচি, ও বিদেশী জালিম শাসনের উচ্ছেদই ছিল এসকল যুদ্ধের মূল উপাদান ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য। সেকারণে এসকল যুদ্ধ ছিল প্রগতিশীল, ফলে যুদ্ধ চলাকালে তাবৎ সাচ্চা বিপ্লবী গণতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রী সমর্থন করত সেই দেশকে (অর্থাৎ সেই বুর্জোয়াকে), যে দেশ সামন্তবাদ, একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ও পরজাতিপীড়নের সবচাইতে শক্ত শক্ত খুঁটিকে উৎখাত বা দুর্বল করে আনছে। যেমন ফরাসি দেশ সেযুগে যেসকল বিপ্লবী যুদ্ধ করেছে তার মধ্যে পরদেশ লুট ও জয়ের একটা ব্যাপার ছিল বটে, কিন্তু তাতে এইসকল যুদ্ধের যে মূল ঐতিহাসিক গুরুত্ব — মানে এইসব যুদ্ধ যে সেকেলে ভূমিদাসপ্রথার ইউরোপে সামন্তবাদ ও নিরঙ্কুশ রাজত্ব ধসিয়ে খানখান করে দিয়েছে – সে গুরুত্ব এতটুকু ম্লান হয় নি। ফরাসি-প্রুশীয় যুদ্ধে জার্মানি ফ্রান্সে লুটতরাজ চালায়, তাতেও যুদ্ধের মূল ঐতিহাসিক মর্ম বদলায় নি। সে মর্ম এই: এ যুদ্ধ কোটিকোটি জার্মান জনগণকে সামন্ত অবক্ষয় থেকে এবং রুশ জার ও নাপোলিয়ঁ এ দুই স্বৈরাচারীর জুলুম থেকে রেহাই দিয়েছে।

আগ্রাসী ও রক্ষণাত্মক যুদ্ধের ভেদবিচার:

১৭৮৯-১৮৭১ যুগের ফল গভীর। তার বৈপ্লবিক স্মৃতি জাগ্রত। সামন্তবাদ, একচ্ছত্র রাজতন্ত্র ও বিদেশী জালিম শাসনের উৎখাতের আগ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সর্বহারার লড়াইসংগ্রাম ছিল চিন্তার বাইরের ব্যাপার। সে যুগে ’রক্ষণাত্মক’ যুদ্ধের ন্যায্যতা বিচারের বেলা সমাজতন্ত্রীরা যেসব বিষয় মাথায় রাখত তার মোদ্দা কথা হল যুদ্ধ মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা ও ভূমিদাসপ্রথার বিরুদ্ধে কিনা। ঠিক এই অর্থে সমাজতন্ত্রীদের কাছে রক্ষণাত্মক যুদ্ধমাত্রই ন্যায্য, শুধু এই অর্থেই ’পিতৃভূমি রক্ষা’ বা ‘রক্ষণাত্মক’ যুদ্ধ ন্যায্য, প্রগতিশীল, ন্যায়সঙ্গত। এই বিচার সমাজতন্ত্রীদের তখন যেমন ছিল এখনো তেমনি। যেমন মরক্কো যদি কাল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, কিংবা ভারত ইংলণ্ডের বিরুদ্ধে কিংবা পারস্য বা চীন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে  – তাইলে এগুলো হবে ন্যায্য, রক্ষণাত্মক যুদ্ধ, তা আক্রমণ আগে যে পক্ষই করুক না কেন; এবং সমাজতন্ত্রীমাত্রই নির্দ্বিধায় নিপীড়িত, পরাধীন, দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে এবং নিপীড়ক, দাসমালিক, পরমাংসলোভী ‘পরা’শক্তির বিপক্ষে দাঁড়াতে কসুর করবে না। (লেনিন, ১৯১৫)

লেনিনের যুদ্ধবিচারের সাথে তুলনীয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বড় ভাবুক জার্মান মনীষী কার্ল কাউৎস্কির বিচার। ১৯১১ সালে নবযুগের যুদ্ধ নিয়ে কাউৎস্কি লিখলেন। তিনি বললেন ক্লসভিৎস মহাশয় বলেছেন ১৮শতকে রাজায় রাজায় যুদ্ধের যুগ থেকে জাতিতে জাতিতে যুদ্ধের যুগে যুগান্তরের কথা । বিশ শতকের গোড়ায় এসে যুগ আরো বদলেছে:

আর সব সামাজিক বিষয়ের মতই যুদ্ধও ধ্রুব শাশ্বত কোন বিষয় না যা বরাবর একই রকম থাকবে বা যা নিয়ে একবার যা বলা হয়েছে তাই আপ্তবাক্য হয়ে থাকবে। যুদ্ধ খুবই পরিবর্তনশীল একটা বিষয়।

ক্লসভিৎস তার ’যুদ্ধ প্রসঙ্গে’ বইতে আঠারো শতকের রাজায় রাজায় যুদ্ধ তথা রাজবংশীয় যুদ্ধ বনাম ফরাসি বিপ্লবের পর শুরু হওয়া জাতীয় যুদ্ধ – এই দুইয়ের তুলনা করেছেন। নাপোলিয়ঁ যুদ্ধকৌশলের সরাসরি প্রভাবের মধ্যে ক্লসভিৎস লেখালেখি করেছেন।  সবচেয়ে তাঁর মনে যেটা দাগ কেটেছিল তা হল বিপ্লবী যুদ্ধের বিপুল বিক্রম ও উদ্দীপনা। বিপ্লবী যুদ্ধে লক্ষ্য হল শত্রুকে যথাশীঘ্র সম্ভব নিকেশ করা। এর পুরা বিপরীত ছিল পুরাতন একচ্ছত্র রাজত্বের সেনাপতিদের ধীরলয়ে রয়েসয়ে যুদ্ধ পরিচালনা। রাজবংশীয়  যুদ্ধের তুলনায় গণযুদ্ধ অনেক বেশি সাংঘাতিক রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের মামলা, কিন্তু তাতে কি! রক্ত ও ধ্বংস সত্ত্বেও বিপ্লবী আমলে জনগণ যে লক্ষ্যে সংগ্রাম করছিল তা তাদের কাছে ছিল অতি আরাধ্য। সে তুলনায় আঠারো শতকে একনায়কের পক্ষে লড়াই করা সেনাবাহিনীর সামনে থাকা লক্ষ্যের প্রেরণাদায়ী শক্তি নগণ্য বৈ নয়।

ক্লসভিৎস কেবল যুদ্ধ হলে কি হয় তার হিসাব করেছেন, শান্তিকালীন রণসজ্জার খবর নেন নি। নিলে তিনি কবুল করতেন শান্তির সময় একচ্ছত্র ক্ষমতার দরকার হয় স্থায়ী সেনাবাহিনীর। স্থায়ী সেনাবাহিনী শান্তির সময় জনগণের ঘাড়ে বোঝাস্বরূপ কায়েম থাকে। সে তুলনায় নাগরিক সেনাবাহিনী কিন্তু শান্তির সময় জনগণের উপর বোঝা হয়ে চাপে না।

নাপোলিয়ঁ যুগ গত হয়েছে। যুদ্ধকলা আরও বিকশিত হয়েছে। এই বিকাশে বুর্জোয়া শ্রেণীর কৃতিত্ব সিংহভাগ। এই বুর্জোয়া শ্রেণীই নাপোলিয়ঁ যুগের পর দিনে দিনে শাসকশ্রেণী হয়ে উঠেছে। এই শ্রেণীর রাজনৈতিক চরিত্র নানা বৈপরীত্যে ভরা। সামন্ত অভিজাত শ্রেণী ও একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুঝতে, পাল্লা দিতে বুর্জোয়ার জনতা ভিন্ন অন্য সহায় নাই। জনতার সহায়তা পেতে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে। কিন্তু আবার বুর্জোয়া চলে জনতাকে শোষণ করে, কাজেই জনগণকে সে ঠিক বিশ্বাস করে না, তাই পদে পদে তার গণতন্ত্রের সাথে বেইমানির ধাত প্রকাশ পায়। বুর্জোয়ার মধ্যে শিল্প পুঁজি ও বুদ্ধিজীবীর প্রভাব যত বাড়ে, জনতার মধ্যে বিশেষত পাতি বুর্জোয়া ও কৃষকের যত প্রাধান্য থাকে এবং যত তারা বুর্জোয়া নাটের গুরুদের হাতের পুতুল হয়, বুর্জোয়া ততদূর পর্যন্ত গণতান্ত্রিক। বুর্জোয়ার মধ্যে অর্থ পুঁজি ও তার চূডান্ত দশা অর্থাৎ লগ্নি পুঁজির প্রভাব যত বাড়ে, জনতার মধ্যে শ্রমিকশ্রেণী যতই বাড়বাড়ন্ত হয় এবং বুর্জোয়ার চিন্তা ও রাজনীতি থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে, বুর্জোয়া তখনি অগণতান্ত্রিক ও প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে।

বুর্জোয়ার এই স্ববিরোধী চরিত্রের ফলে স্বাধীনতা-ব্যবসায় বা লিবারালিজম জিনিসটার মধ্যে সবসময় একটা খাদ থেকে যায়। স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীর মধ্যে সবসময় একটা ইতস্ততভাব, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে ঠিক ভরসা করা যায় না তার উপর। যুদ্ধ নিয়ে তার এই ইতস্তত হয়ে দাঁড়িয়েছে সবচেয়ে মারাত্মক। নিজের বিপ্লবী দশায় বুর্জোয়া জাতীয় যুদ্ধের অবাধ আয়োজন করেছিল, নাগরিক সেনাবাহিনী গঠনের ডাক দিয়েছিল । আর নিজ প্রতিক্রিয়াশীল দশায় এসে সে স্থায়ী সেনাবাহিনীর প্রশংসায় মুখর হয়ে ওঠে। শেষে যা দাঁড়ায় তা নাগরিক সেনাবাহিনী ও স্থায়ী সেনাবাহিনী দুইয়ের মিশেল, মানে স্থায়ী সেনাবাহিনীর আকার ফুলে নাগরিক সেনাবাহিনীর সমান হয়ে দাঁড়ায়। আঠারো শতকের তুলনামূলক ছোট সেনাবাহিনীর ব্যয়ভারই শান্তির সময় জনগণের কাঁধে মস্ত বোঝা হয়ে চেপেছিল। আজকের বিরাটকায়  স্থায়ী সেনাবাহিনীর ব্যয়ভার জনগণের জন্য কি তা বলাই বাহুল্য।

কলাকৌশলের উন্নয়নে সমস্যা বেড়েছে বৈ কমে নি। প্রকৃতির উপর তাতে যেমন মানুষের কর্তৃত্ব বেড়েছে, তেমনি অন্য জাতির উপর পুঁজিবাদী জাতির কর্তৃত্ব বেড়েছে। …  বুর্জোয়া ক্রমেই অবলা পশ্চাতপদ জাতির ওপর শোষণের থাবা বিস্তার করেছে। আঠারো শতকে রাজা রাষ্ট্রকে স্রেফ রাজত্ব হিসাবে দেখত, রাজায় রাজায় যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের বাইরের সকল জাতিকে তাদের হালাল শিকার হিসাবে গণ্য করে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিবাদবিসম্বাদের লক্ষ্য কেবল রাজত্ব – তথা উপনিবেশ ও ‘প্রভাববলয়’ — বৃদ্ধি বা সম্পূর্ণ করা — ঠিক আঠারো শতকের রাজবংশীয় যুদ্ধের মত। ইউরোপের জনগণের কল্যাণের হিসাব দুইশো বছর আগেও ছিল না, আজও সেভাবে নাই।

তবে আঠারো শতকের তুলনায় যুদ্ধের ভয়াল ধ্বংসলীলা ও রণপ্রস্তুতির ব্যয়ভার শতগুণ বেড়েছে। দুইশো বছরে এইটুকু উন্নতি কম কি! (কাউৎস্কি, ১৯১১)

জাতীয় মুক্তির যুদ্ধের বিষয়ে:

লেনিনের আলোচনায় বোঝা যায় লেনিন এশিয়ায় বিপ্লবী বা প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাব্যতা সম্পর্কে নি:সংশয়, এবং এহেন যুদ্ধের তিনি তরফদারও বটেন। জাতীয় মুক্তির যুদ্ধের রাজনীতি ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাঁর বিচার নিম্নরূপ:

সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের চূড়ান্ত দশা। পুঁজিবাদ বিশ শতকে এসে সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে। যে জাতীয় রাষ্ট্র দিয়ে পুঁজি একদা সামন্তবাদ উৎখাত করেছে, তা তার কাছে এখন পুরাতন হয়ে গেছে, জাতিরাষ্ট্রের ক্ষুদ্র পরিধিতে তার হয় না, তার চাই বৃহত্তর পরিসর। … তাই গোটা দুনিয়াটাই পুঁজির মালিকরা ভাগাভাগি করে নিয়েছে, কোন দেশকে বানিয়েছে উপনিবেশ, কোন দেশকে আর্থিক শোষণের জালে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধেছে। আগে তাদের দরকার ছিল মুক্ত বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতা, এখন একচেটিয়া, পুঁজি বিনিয়োগের জন্য জায়গা দখল, সেখান থেকে কাঁচামাল রপ্তানি ইত্যাদি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের লক্ষ্য। … বর্তমান যুদ্ধের বিচিত্র দিক এই যে উপনিবেশের ভাগ্য নিয়ে রফা করতে যুদ্ধ চলছে (ইউরোপ) মহাদেশে। দাসমালিকদের ভেতর লড়াই চলছে দাসত্বকে পাকাপাকি করতে। … অন্যদিকে চীন, পারস্য, ভারতসমেত পরাধীন দেশসমূহের বেলায় আমাদের বিচার স্বতন্ত্র। গত কয়েক দশকে এসকল দেশে প্রধান রাজনীতির প্রধান প্রবণতা হলো কোটিকোটি জনতাকে জাতীয় জীবনে শামিল করা, জাগানো, মহাশক্তিধর পরদেশের নিপীড়ন থেকে তাদের মুক্তি। এহেন ঐতিহাসিক পটভূমিতে বলা যায় এইসকল দেশে আজও  বুর্জোয়া-প্রগতিশীল, জাতীয়-মুক্তিকামী যুদ্ধ হতে পারে বটে। (লেনিন, ১৯১৫)

বিশ শতকে ’বল্গাহীন সাম্রাজ্যবাদে’র শতকে ইতিহাস উপনিবেশী যুদ্ধে ভরা। কিন্তু আমরা ইউরোপীয়রা, মানে দুনিয়ার সিংহভাগ মানুষের উপর সাম্রাজ্যবাদী পীড়নকরনেওয়ালারা আমাদের সহজাত ইউরোপীয় জাত্যাভিমানে বুঁদ হয়ে যাকে উপনিবেশী যুদ্ধ বলি তা আসলে প্রায়ই জাতীয় যুদ্ধ, বা নিপীড়িত জাতির জনগণের জাতীয় বিদ্রোহ। … সাম্রাজ্যবাদ জাতীয় যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। (লেনিন, ১৯১৬)

এশিয়ার মুক্তিযুদ্ধ ও ইউরোপে সংগ্রাম:

১৯০৫-এ রাশিয়ায় একটি বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান ঘটে। এর যে ফল এশিয়ায় ফলেছিল তা লেনিন খেয়াল করতে ভোলেন নি। রাশিয়া তথা ইউরোপের যুদ্ধের সাথে সাথে এশিয়ার একটি  যোগ আছে। বিশ শতকের গোড়ায় রুশ-জাপান যুদ্ধ হয় এশিয়াকে কেন্দ্রে রেখেই। যুদ্ধের পটভূমিতে এদিকে রুশদেশে নিরঙ্কুশ জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে যায়। কিন্তু তার ফল আবার পড়ে এশিয়াতে। লেনিন লিখেছেন:

১৯০৫ সালে রাশিয়ার আন্দোলনের ফলে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সমগ্র এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে — তুরস্কে, পারস্যে, চীনে। ব্রিটিশ ভারতে আজ আন্দোলনের উত্তেজনা টগবগিয়ে ফুটছে।

গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল বিপ্লবী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ওলন্দাজ পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও ওলন্দাজ অন্যান্য উপনিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যবদ্বীপের জনতার মাঝে গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিকাশ লাভ করছে, সেখানে জাতীয় আন্দোলন গঠিত হচ্ছে ইসলামের নিশান উঁচিয়ে। … আবার জাভায় মোটামুটি বিপুলসংখ্যায় যে চীনা জাতের লোক বাস করে তারা স্বদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের হাওয়া নিয়ে এসেছে… বিশ্ব পুঁজিবাদ ও ১৯০৫-এর রুশ আন্দোলন এশিয়াকে জাগিয়ে দিয়েছে, নিযুতকোটি দলিত তিমিরনিবাসী জনতা আজ ন্যূনতম মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের লড়াইয়ে জেগে উঠেছে। (লেনিন, ১৯১৩)’

এবং ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের প্রাক্কালে সমাজবিপ্লব ও জাতীয় মুক্তির লড়াইয়ের সম্পর্ক মাথায় রেখেই লেনিন তাঁদের পরদেশ নীতি পরিষ্কার করেন:

‘সর্বহারার দেশীয় নীতির ন্যায় বৈদেশিক নীতি রয়েছে। … জার্মান পুঁজিপতি হোক কিংবা হোক এংলো-ফরাসি পুঁজিপতি – (…) আমাদের লড়াই তাবৎ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে। … এই লড়াইয়ে আমাদের কোন মিত্র কি আছে? আছে। ইউরোপের নিপীড়িত সকল শ্রেণী, প্রধানত শ্রমিক শ্রেণী। আর সাম্রাজ্যবাদের যাঁতাকলে পিষ্ট জাতিসকল — মূলত আমাদের এশিয়ার পড়শিরা। … (মনে রাখা যায়) সেই ১৯০৫ সালেই রুশ বিপ্লব তুরস্ক, পারস্য ও চীনে বিপ্লবের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। রুশ বিপ্লব যদি উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশের শ্রমিক কৃষকের সাথে বিপ্লবী মৈত্রী করত তাইলে তুরস্কে জার্মানরা এবং তুরস্কে, পারস্যে, ভারতে, মিশরে ব্রিটিশরা বেকায়দায় পড়ে যেত …… সর্বহারার পররাষ্ট্র নীতি হল অগ্রসর দেশের বিপ্লবীদের সাথে ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সকল নিপীড়িত জাতির সাথে মৈত্রী প্রতিষ্ঠা’। (লেনিন, ১৯১৭)

উপনিবেশী যুদ্ধের প্রকৃতি:

উপনিবেশী যুদ্ধে সভ্যতার বড়াইকারী ইউরোপ এশিয়া ও আফ্রিকার জাতির উপর নানা বর্বরতাই করেছে। লেনিন ১৯১২ সালে ইতালি কর্তৃক লিবিয়া দখলের যুদ্ধ নিয়ে লিখেছেন। অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ‘সুসভ্য, সাংবিধানিক রাষ্ট্রের বাহিনী’ হয়ে ইতালি কিভাবে আরবদের উপর ‘উপনিবেশী যুদ্ধের দস্তুরমোতাবেক’ আগ্রাসন চালিয়েছে তা লক্ষ্য করেছেন। এই উপনিবেশী যুদ্ধের দস্তুর কি? লেনিন লক্ষ্য করেছেন, আরব নারী ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। ব্যাপক সংখ্যক আরবের প্রাণদণ্ড হয়। লেনিন ভবিষ্যৎবাণী করেছেন, সামনের দিনে ইতালীয়রা বুলেট, বেয়োনেট, খুন ও ধর্ষণের দ্বারা আরবদের সভ্যতা শেখাবে। লক্ষ্য ইতালীয় পুঁজির অবাধ মুনাফা। (লেনিন, ১৯১২)

চীন ও সান ইয়াত-সেন:

চীন বিশ শতকে বিরাট বৈপ্লবিক ঘটনাবলির পটভূমি। সঙ্গত কারণেই লেনিনের অন্যতম মনোযোগের কেন্দ্র ছিল চীন। এবং চীনকে কেন্দ্র করেই পরাধীন ও নিপীড়িত এশিয়ায় জাতীয় মুক্তির প্রশ্নের জটিলতাটি তাঁর চিন্তায় পরিষ্কার ধরা পড়ে।

১৯১১ সালে চীনে বিপ্লবে রাজতন্ত্র উৎখাত হয় ও সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে কুয়োমিন্টাং পার্টির কর্তৃত্বে জাতীয় প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী সরকার কায়েম হয়। তখন লেনিন লেখেন:

প্রগতিশীল ও সভ্য ইউরোপের দেখছি চীনের নবজন্ম নিয়ে কোন আগ্রহ নেই। ৪০ কোটি পশ্চাৎপদ এশিয়াবাসী মুক্ত হল, রাজনৈতিক জীবনে শামিল হল। দুনিয়ার জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ রুদ্ধতা ভেঙে আলোর পথে, আন্দোলনের পথে, সংগ্রামের পথে আগুয়ান হয়েছে। তাতে সভ্য ইউরোপের থোড়াই এসে গেল। আজ পর্যন্ত এমনকি ফরাসি প্রজাতন্ত্র স্বীকার করল না প্রজাতন্ত্রী চীনকে! … (লেনিন, ১৯১২)

লেনিন কিন্তু চীনের বিপ্লব ও প্রজাতন্ত্র গঠনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন:

রুশ সামাজিক-গণতন্ত্রী দলের সভা চীনের জনগণের বিপ্লবী আন্দোলনের বৈশ্বিক তাৎপর্য স্বীকার করছে। এই আন্দোলন এশিয়ায় মুক্তির সূচনা করেছে ও ইউরোপীয় শাসনের বারোটা বাজাচ্ছে। আমাদের সভা চীনের বিপ্লবী প্রজাতন্ত্রীদের সেলাম জানাচ্ছে। আমাদের সভা সাক্ষী, চীনের বিপ্লবী জনতার সাফল্য রুশ সর্বহারা গভীর উৎসাহ ও ষোলআনা সহমর্মিতার সাথে  খেয়াল করে চলেছে। (লেনিন, ১৯১২)

লেনিন জানতেন চীনের নেতা সান ইয়াত-সেন সমাজতন্ত্রী নন, শ্রমিকবন্ধু নন। চীনে, লেনিন বললেন:

সচ্ছল কৃষক ও বুর্জোয়ার জোট সর্বেসর্বা। সেদেশে সর্বহারা শ্রেণী বলে কিছু নাই, থাকলেও সে ক্ষমতাহীন। … চীনের রাজনৈতিক দলের মধ্যে রয়েছে পাতি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রী যারা নিজেদের বিপ্লবী-সমাজতন্ত্রী বলে। উদারনৈতিক ও পাতি-বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা একসঙ্গে গঠন করেছে জাতীয় দল। আর আছে রক্ষণশীল ভূস্বামী আমলা ও মুক্তি হাসিল করেছে কৃষক গণতন্ত্রী ও স্বাধীনতাপন্থি বুর্জোয়া।…   (লেনিন, ১৯১২)

সান ইয়াত-সেনের দল … মুখে সমাজতন্ত্রের কথা বললেও তাদের প্রকৃত কর্মসূচি কৃষিতে অতিদ্রুত পুঁজিবাদী সম্পর্কের বিকাশসাধন। … (লেনিন, ১৯১২)

তাতে লেনিনের সমর্থন ক্ষুণœ হয় নি:

সান ইয়াত-সেনের কুয়োমিন্টাং দল মানে ’জাতীয়তাবাদী’রা হল (রুশ প্রেক্ষাপটে বলা চলত বিপ্লবী-নারোদবাদী প্রজাতন্ত্রী দল, অর্থাৎ) গণতন্ত্রী দল। (লেনিন, ১৯১৩)

সান ইয়াত-সেন হলেন প্রগতিশীল চীনা গণতন্ত্রী … অনেকটা রুশ নারোদবাদীদের মত চিন্তাভাবনা তাঁর… তিনি বিপ্লবী গণতন্ত্রী … দেখা যাচ্ছে এশিয়ায় এখনো এক বুর্জোয়া শ্রেণী আছে যারা গণতন্ত্রের জন্য আন্তরিক, সংগ্রামী, অবিচল। তাঁদের তুলনা চলে ফরাসিদেশের আলোকায়ন যুগের মহাপুরুষ ও আঠারোশতকের শেষের মহান নেতাদের সাথে।

এশীয় বুর্জোয়ার প্রধান ভরসা ও প্রকৃত প্রগতির অগ্রদূত আর কেউ নয়, এশিয়ার কৃষকসমাজ। আর শত্রু হল বেইমানির ধাতুতে গড়া স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী বুর্জোয়া। … (লেনিন, ১৯১২)

বন্ধুভাবে কঠোর সমালোচনা করতেও ছাড়েন নি:

সান ইয়াত-সেনের দলের দুর্বলতা হল তাঁরা বিপ্লবে এখনো বৃহত্তর জনতাকে শামিল করতে পারেননি। চীনে শ্রমিকশ্রেণী এখনো অতি দুর্বল, তাই গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে তার লক্ষ্যে অবিচলিতভাবে চালিয়ে নেওয়ার নেতৃত্ব দেওয়ার কোন শ্রেণী আপাতত নাই। শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে নেতৃত্ব নাই বলে কৃষকশ্রেণীও নিতান্ত দলিত, নিষ্ক্রিয়, অজ্ঞান ও রাজনীতিতে আগ্রহশূন্য। …  তবু সান ইয়াত-সেনের শত দুর্বলতা (খালি ভাবাভাবি করা, সিদ্ধান্ত নিতে না পারা — যেহেতু শক্ত শ্রমিক সমর্থন নাই তাঁর পেছনে) সত্ত্বেও চীনের বিপ্লবী গণতন্ত্র জনগণকে জাগাতে, মুক্ত করতে ও গণতান্ত্রিক প্রথাপ্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে বহুলাংশে সার্থক হয়েছে। চীনের কৃষককে রাজনীতিতে এনে সান ইয়াত-সেনের দল এশিয়া তথা সমগ্র মানবজাতির উন্নতিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। (লেনিন, ১৯১৩)

পরিশেষে বলা যায়, চীন তথা এশিয়া বিষয়ে লেনিনের চিন্তা ভিয়েতনাম বুঝতে কাজে আসবে।

সূত্র:

1. Lenin, V. (1912). Democracy and Narodism in China.

2. Lenin, V. (1906). Lessons of Moscow Uprising.

3. Lenin, V. (1913). Once more on the segregation of schools according to nationality.

4.  Lenin, V. (1915). Socialism and War.

5.  Lenin, V. (1913). The Awakening of Asia.

6. Lenin, V. (1912). The Chinese Revolution.

7. Lenin, V. (1916). The ‘Disarmament’ Slogan.

8. Lenin, V. (1912). The End of Italo-Turkish War.

9. Lenin, V. (1917). The Foreign Policy of the Russian Revolution.

10. Lenin, V. (1916). The Military Program of Proletarian Revolution.

11. Lenin, V. (1914). The National Equality Bill.

12. Lenin, V. (1912). The Regerenated China.

13. Lenin, V. (1913). The Struggle of Parties in China.

14. Lenin, V. (1913). The Struggle of Parties in China.

15. Lenin, V. (1913). Theses on National Question.

16. Lenin, V. (1917). War and Revolution.

17. Karl Kautsky (1911). War and Peace.

সম্পাদকীয়: প্রতিদিনই মানুষের দুর্ভোগ বাড়িতেছে

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিনকে দিন অনিশ্চিত হইয়া পড়িতেছে। সরকারি দল ও বিরোধী শিবির এখন মুখোমুখি অবস্থানে। একপক্ষের পণ যে কোন উপায়ে ক্ষমতা আকড়াইয়া থাকা। অপর পক্ষের যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। এই কাজে কামিয়াব হইবার জন্য উভয়ই সম্ভাব্য সকল রকম পদ্ধতির আশ্রয় লইতেছে। এক্ষেত্রে তাহাদের নিকট ন্যায়-অন্যায় দেশের ভালমন্দ ও ক্ষতিবৃদ্ধির কোন বাছবিচার নাই। ক্ষমতার লড়াইয়ে যে যেভাবে পারিতেছে সেই ভাবেই নিজের শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করিতেছে। জনগণের দুর্ভোগ জানমালের ক্ষয়ক্ষতি জাতীয় জীবনের ঘোরতর অনিশ্চয়তা কোন কিছুকেই তাহারা গ্রাহ্য করিতেছে না। সকল রকম শঠতা ও প্রবঞ্চণার আশ্রয় তাহারা লইতেছে। বিদেশি মুরুব্বিদের দূতাবাস ও বাস ভবনে নিরন্তর ধরণা চলিতেছে। অবিরাম ধর্মীয় উস্কানি ও সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যাইতেছে। বোমা পটকা হামলা মামলা ও অগ্নিসংযোগের কারণে অনেক মানুষ হতাহত হইতেছে। অক্টোবর মাসের ২৫ তারিখের পর যে হরতাল ও সংঘর্ষ শুরু হইয়াছে তাহাতে দেখা যাইতেছে গরিব দুঃখি নিম্নবিত্ত মানুষেরা অকাতরে প্রাণ হারাইতেছে। অথচ গত ২৩ বছর বর্তমান প্রধান দল বা জোটই পালা করিয়া ক্ষমতায় বসিয়াছে। কিন্তু সমাজের তলায় অবস্থান করা মানুষদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় নাই। ক্ষমতা কেন্দ্রিক বর্তমান এই লড়াইয়ের দেখা যাইতেছে নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্য বিপর্যয়ই দিনকে দিন বাড়িতেছে।

অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় রামু স্টাইলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনা ঘটিতেছে। পাবনার সাঁথিয়া ও লালমনির হাটের ঘটনা আমরা গত সপ্তাহে প্রত্যক্ষ করিয়াছি। নানাভাবে গুজব ছড়াইয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধি ও লুটপাট চালাইবার জন্যই এই হামলার ঘটনা ঘটিতেছে। সবকিছু মিলাইয়া জনগণ আজ জিম্মি দশায় কালাতিপাত করিতেছে। সংকট উত্তরণের কোন নিশানাও চোখে পড়িতেছে না। এভাবেই যদি চলিতে থাকে তবে আমরা কোথায় গিয়া ঠেকিবে তাহা নিশ্চিত নহে। সমাজের যে বর্বর দশা আজ বিরাজ করিতেছে তাহাই যে আরও পাকাপোক্ত হইয়া জগদ্দল পাথরের ন্যায় জন জীবনে চাপিয়া বসিবে তাহাতে সন্দেহ নাই। অন্যদিকে সংকট উত্তরণের জন্য নানান ফর্মূলা নানান জন বিলি করিতেছে। এই শ্রেণির মধ্যে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত হইতে আরম্ভ করিয়া টকশো বক্তা ও স্তম্ভ লেখক অনেক অনেক রসিকগুণিকে পাওয়া যাইবে। তাহাদের কথা শুনিয়া আমরা যে আশ্বস্ত হইতে পারিতেছি কিংবা দুর্যোগের প্রশমণ ঘটিতেছে মোটেই এমন নহে। এই সব আলোচনায় সংকটের মূল প্রকৃতিটি অনুদঘাটিত থাকিয়া যাইতেছে। ফলশ্রুতিতে আমরা অধিকতর নিরাশার অন্ধকার গহ্বরে খাবি খাইতেছি। বস্তুত যখন পুরাতন মরণোন্মুখ দশায় পতিত হয় আর নতুন জন্ম লইতে পারে না সেই ফাঁকা তালেই সামজে নানা কিসিমের ব্যাধি বিকারের উদ্ভব হয়। এটাই প্রতিক্রিয়ার জন্য স্বর্ণযুগ বলিয়া বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে আমরা এই সব কিছুই আজ প্রত্যক্ষ করিতেছি।

এই অবস্থাতো সংক্রিয়ভাবে মাটি ফুঁড়িয়া জেগে উঠে নাই। কেউ না কেউ কোন না কোন শ্রেণি সমাজকে নেতৃত্ব দিয়াছে। তাহারাইতো সমাজের মাথা বলিয়া পরিগণিত। তাঁহাদেরকেই তো আমরা অনুসরণ করিয়া থাকি। সমাজের মাথা স্বরূপ খাড়া হওয়া এই শ্রেণিই এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী। তাহাদের উন্নতির বদৌলতেই সর্বক্ষেত্রে অবক্ষয় নামিয়া আসিয়াছে। কেবল মালিকানা বদল দিয়া জনগণের কি কাজ হইবে? আমাদিগের দরকার সর্বত্র বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংস্কার। আর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংস্কারের সহিত অবশ্যই যুক্ত থাকা চাই অর্থনৈতিক কর্মসূচির। ইহার বাহিরে অন্য কোন পন্থা আছে কি?