Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ৩১

আমাদের ধর্মীয় সাহিত্য ও মাদ্রাছা শিক্ষা–ইবরাহীম খাঁ

বাংলাদেশের মাদ্রাসাসহ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু গলদ দিনকে দিন অতি বড় হইয়া ফুটিয়া উঠিতেছে। মাদ্রাসা শিক্ষাসহ সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার আশু করণীয় হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বিশেষ করিয়া বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার বিষয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া হইতেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কার দাবি একটি জাতীয় দাবি। কোন বিশেষ গোষ্ঠির কোটারিবদ্ধ দাবি ইহা নহে। ইহার প্রমাণ আমরা পাইব প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর আজি হইতে ৫০ বছর আগের একটি লেখা হইতে। সুসাহিত্যিক ইবরাহীম খাঁ একজন দায়িত্ববান ব্যক্তির নাম। সমাজের অভ্যন্তরের ক্রন্দন ও তাহার আশু সমাধান তিনি ধীশক্তি ও অন্তর দিয়া বুঝিতে চেষ্টা করিয়াছেন তাহার জুড়ি মেলা ভার। তাঁহার এই লেখাখানি ১৯৬৩ সনে প্রকাশিত ‘ইছলামের মর্মকথা’ গ্রন্থ হইতে তুলিয়া ধরিয়াছি

১৯৫৬ সালের ৫ই নবেম্বর ঢাকা বোর্ডের সভাঘরে পূর্ব পাক জমীয়তে তোলাবা-এ আরাবীয়ার বার্ষিক সম্মেলনের অধিবেশন ছিল। দাওয়াত পেয়েছিলাম। সভায় স্থান পাওয়া মুশকিল হবে ভেবে মিনিট বিশেক আগে গিয়ে হাজির হলাম। দেখলাম, ছোট্ট সভা ঘর। তাও ভালো করে ভরে নাই। বেদনার সঙ্গে মনে পড়ল, চার-পাঁচ বছর আগে মাদ্রাছার ছাত্রদের মধ্যে কি বিপুল জোশের বন্যাই না দেখেছিলাম। আজ সে গাঙ্গে ভাঁটা শুরু হয়েছে।

হ্যাঁ, তখন ছেলেদের মধ্যে দেখেছিলাম এ দুনিয়াম মানুষের মত বেঁচে থাকার একটা উদগ্র আকাক্সক্ষা। আর সেই পরিপূর্ণ জীবনের প্রস্তুতির পথ হিসাবে তারা মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কারের জন্য নেতৃস্থানীয়দের দুয়ারে আশান্বিত হয়ে কারাঘাত করে ফিরছিল। হয়তো এ কয় বছরে তারা অনুভব করেছে; তাদের সে আকুল আহ্বানে দেশের জনগণের বুকে উৎসাহের তরঙ্গ জাগে নাই; নেতৃস্থানীয়দের চিত্তে নতুন প্রেরণার উন্মেষ ঘটে নাই; মন্ত্রীমণ্ডলীর দীলে তাদের জন্য মুহব্বতের বু-বাশও পয়দা হয় নাই। তাঁদের মধ্যে যাঁরা মাঝে মাঝে মাদ্রাছাকে কিছু টাকা পয়সা দিয়েছেন, তাঁরা তা মাদ্রাছা শিক্ষার সংস্কারের জন্য দেন নাই; মাদ্রাছার যুগ যুগ বঞ্চিত ছাত্রদের সামনে উজ্জ্বল জীবনের কোন নতুন পথ খুলে দেওয়ার জন্যও তাঁদের এ অর্থদান নয় — তাঁরা পরের ধনে এ পোদ্দারী করেছেন। প্রথমত, জনপ্রিয়তা অর্জন দ্বারা নিজেদের ভবিষ্যত গদীর পথ খোলাসা রাখার জন্য; আর দ্বিতীয়ত, আসন্ন আখেরেতে তাঁদের অনিশ্চিত বেহেস্তের ভাঙ্গা সিঁড়ি মরামতের জন্য। কাজেই জমীয়তে তোলাবা-এ আরাবীয়ার বার্ষিক সম্মেলন এখন যদি তরুণ-মনের স্বপ্ন বিবর্জিত মামুলি অধিবেশনে পর্যবসতি হয়ে থাকে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নাই। …

আমাদের মাদ্রাছাগুলিতে বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান না হওয়ায় ছাত্রদের জ্ঞানার্জন পরিশ্রমের অনুপাতে ভয়াবহ রকমে কম হয়ে থাকে। তারা যদি কিছু শিখে, তাদের অধিকাংশই তা বাংলায় ভালো করে তা প্রকাশ করতে পারে না। এজন্য তাদের বেশীর ভাগ ছাত্রই সঙ্কুচিত থাকে। মাদ্রছায় পড়তে গিয়ে যেন তারা একটা অপরাধ করে ফেলেছে। ইংরেজী বিভাগে শিক্ষিত ডক্টর নহীরুদ্দী, জহীরুদ্দী, গহীরুদ্দী সবাই এদেরে কৃপার চোখে দেখে। ভাবে না যে, তারা মাদ্রাছায় পড়লে তারাও মাদ্রাছার বর্তমান শিক্ষিতদের চেয়ে ভালো হতে পারতো না; তাদেরও পাড়াগাঁয়ের কাজীগিরির চাকরির দরখাস্ত হাতে স্থানে-অস্থানে ঘুরে মরতে হতো। এ দাম্ভিক ডক্টরের দল মাদ্রাছাকে যখন তখন নিন্দা করেই নিজ কর্তব্য সমাধা করে — মাদ্রাছা শিক্ষার সংস্কার চেষ্টায় সময় নষ্ট করতে রাজী নয়।

গহীরুদ্দী নিজের ছেলেকে মাদ্রাছায় পড়তে পাঠায় না, আত্মীয়-স্বজনের ছেলেকে মাদ্রাছায় যেতে দেয় না — পরের যে-সব ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে, তাদের পথভ্রান্ত মনে করে। সেই গহীরুদ্দীর হাতে আইয়ামের গরদিশে সরকার নামক গৌরীসেনের টাকা হঠাৎ এসে পড়লে, সে যখন ইছলামের খালেস খেদমতের নামে সে টাকার তোড়া হাতে ভক্তি গদগদভাবে মাদ্রাছার দুয়ারে হাজির হয়, তখন তার সে অন্তহীন ভণ্ডামীর ক্লেদাক্ত কদর্যতায় গা ঘিনÑঘিন করে ওঠে।

মাদ্রাছা শিক্ষার সংস্কার একান্ত প্রয়োজন। সে সংস্কার করতে গেলে ভুল বুঝাবুঝি হবে; হয়তো গালাগালির কাদা ছিটাছিটিও হবে। তবু সাহস করে সংস্কারে হাত দিতে হবে এবং সমাজ শেষ পর্যন্ত সে সংস্কার মেনে নিবে। মাদ্রাছার ছাত্ররা সংস্কার চায়। মাদ্রাছার ছাত্রদের অভিভাবকেরা সংস্কার চায়। অভিভাবক ছাড়া রাষ্ট্রের বাকি নাগরিকেরাও সংস্কার চায়, মাদ্রাছার শিক্ষকেরাও সংস্কারের জন্য উদগ্রীব। সুতরাং, সংস্কারের জন্য সময় একান্ত অনুকূল।

সে সংস্কার কি হবে, এখানে তা আমার বক্তব্য নয়। যাদের হাতে ক্ষমতা ও দায়িত্ব, তাঁরা এর জন্য অবিলম্বে সংস্কার-পরিষদ গঠন করুন, তাঁদের পরামর্শ শুনুন, কাজে হাত দিন।

এখানে আমার বিশেষ বক্তব্য এই যে: সংস্কার যাই হোক, সে সংস্কারের এক প্রধান এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হবে বাংলা ভাষায় কোরাণ-হাদীছ, ফেকা-ওছুল পড়ানোর ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে মাদ্রাছার কোন সংস্কারই কর্যকরী হবে না — হতে পারে না।

উর্দুÑফারছীর মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার ফলে মাদ্রাছার ছাত্রদের বেশীর ভাগেরই সময়, শক্তি ও অর্থেও অপচয় ঘটে আসছে। ঢাকা ইছলামিক ইন্টারের অধ্যাপক মৌলবী আবদুল খালেক নদভী বলেছিলেন: ‘ছোট-বেলায় ফারছী পড়ার শুরুতে ওস্তাদ বলে দিলেন — “ইয়াদ কর ছোখন মানে বাত।” মাথা ঝুঁকিয়ে পড়ে পড়ে ইয়াদ করলাম, ছোখন মানে বাত, ছোখন মানে বাত। বাত মানে যে কথা, একথা বুঝলাম এর বছর দুই পর।’

অন্য কথায়, উর্দু-ফারছী মারফত কোরাণ-হাদীছ পড়ে এঁদের বেশীর ভাগই কেবল ইয়াদ করেন, হৃদয়ঙ্গম করেন না। বহুবার আমি ওস্তাদকে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি, ‘বলতে ব্যাটা, ছবক ইয়াদ হয়েছে?’ ‘ছবক বুঝতে পেরেছ?’ — এ প্রশ্ন শুনেছি বলে মনে পড়ে না। সকল ওস্তাদই অমন, এতবড় অন্যায় অপবাদ আমি দেই না। তাঁদের মধ্যে আলা দরজার ওস্তাদ নিঃসন্দেহ রকমে আছেন, তাঁদের হাতে আলা দরজার আলেমও নিশ্চয় পয়দা হয়। কিন্তু তাদের অনুপাত কত?

কেউ হয়তো বলবেন, ‘স্কুল-কলেজের বাবাজীরাও তো ওই কর্মই করেন-না বুঝে মুখস্থ করেই পরীক্ষার পুলছিরাত পার হতে চান।’ এ অভিযোগ সত্য এবং যে অনুপাতে সত্য ঠিক সেই অনুপাতেই স্কুল-কলেজের শিক্ষা ব্যর্থ। তবে একটু তফাৎ আছে। কেবল মুখস্থের জোরে পাস করার অপচেষ্টার জন্য স্কুল-কলেজের ছেলেদের ফেলের হার ভয়াবহ। তদানীন্তন ডিপিআই আবদুল হাকিম সাহেব তাঁর ‘শিক্ষা-পরিচয়’ নামক কাগজের দ্বিতীয় সংখ্যায় ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজীর স্থান’ শীর্ষক একটি একান্ত সুলিখিত প্রবন্ধে বলেছেন যে, বিগত ৪ বছরের আই-এ পরীক্ষার গড়ে শতকরা ৭০ ছাত্রছাত্রী ফেল করেছে। ও সময়ের মধ্যে আই-এস-সিতে ফেল করেছে শতকরা ৭৫ জন, বিগত তিন বছরে বিএ ও বি-এসসিতে গড়ে ফেল করেছে যথাক্রমে শতকরা ৭০ ও ৬৩ জন। এর কারণ সম্বন্ধে বলা হয়, কলেজের নির্বিচারে ছাত্রভর্তি, অকিঞ্চিতকর অধ্যাপনা, নোটের ব্যবহার ইত্যাদি। কিন্তু যে কারণটি সাধারণ দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, তা হচ্ছে ইংরেজী বলা শিক্ষকের লেকচার বুঝবার ও ইংরেজী বই পড়ে উপযুক্ত মর্ম গ্রহণে ছাত্রদের অক্ষমতা। আমার যতদূর জানা আছে, ইংরেজীর মাধ্যমে পাঠ্য বই পড়ার ও পরীক্ষায় ইংরেজীতে উত্তর লেখায় কলেজের ছেলেদের যে বিপদ, উর্দু ফরছীর মাধ্যমে পাঠ্য বই পড়ার ও পরীক্ষার উত্তর লেখায় মাদ্রাছার ছাত্রদের বিপদ তার চেয়ে  বেশী বৈ কম নয়। সুতরাং, কলেজের ছেলেদেও মত মাদ্রাছার ছেলেদেরও ফেলের হার ভয়াবহ রকমে বেশী হওয়ার কথা। কলেজের পরীক্ষার ফেলের হার নিয়ে কলেজের ছেলেরা নিজের চোখের পানি ফেলে, আফিং কিনতে যায়, শিক্ষিত অভিভাবকরা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করেন, নিরপেক্ষ শিক্ষাবিদরা দেশের ভবিষ্যৎ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে উঠেন, খবরের কাগজে সমালোচনা ছাপা হয়। কিন্তু মাদ্রাছার ছেলে বেশী ফেল করে বলে কোন তরফ হতে কোন আওয়াজ আমাদের কানে আসে না। এ অবস্থা হতে স্বভাবতঃই সন্দেহ জাগে। মনে হয়, কলেজের পড়া যে ঠিকমত হয় না, তা শিক্ষাবিদরা বোঝেন এবং অযোগ্যদের ফেলের মারফত ঠেকিয়ে রাখেন। মাদ্রাছা যে পড়া ঠিকমত হয় না তা মাদ্রাছার শিক্ষকেরা হয় বোঝেন না,  না হয় বুঝেও প্রকাশ করেন না এবং অযোগ্যদের যথাযথা ফেলের মারফত যথেষ্ট হারে ঠেকিয়ে রাখেন না। ফলে অযোগ্যদেরও অনেকে যথাসময়ে সনদ নিয়ে নায়েবে নবী হয়ে বেরিয়ে পড়ে।

ওস্তাদেরা হয়তো ভাবেন, মাদ্রাছা পাস করে এরা চাকরির জন্য কোন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার সুযোগ পাবে না; বিনা পরীক্ষাতেও যে কোন ভালো চাকরি পাবে, তারো দুয়ার এদের সামনে খোলা নাই। এমত অবস্থায় এ বেচারাদের বার্ষিক পরীক্ষার ফল দেখিয়ে ঠেখিয়ে রেখে ফায়দা কি? ছেলেরাই- বা আপ্রাণ পরিশ্রম করার প্রেরণা কোথা হবে পাবে?

শিক্ষক-ছাত্রদের মনের এই প্রতিক্রিয়ার ফল মাদ্রাছা শিক্ষার পক্ষে নিঃসন্দেহ রকমের ভয়াবহ।

আমাদের উর্দুওয়ালা ভাইয়েরা আমাদের পেছনে ফেলে অনেক দূরে এগিয়ে গেছেন। উর্দু ভাষায় কোরানের তরজমা ও তফছীর বহু হয়ে গেছে। হাদীছের অনুবাদও তাঁরা উর্দুতে করে নিয়েছেন। জুমার নামাজের খোতবার উর্দু অনুবাদেও তাঁরা বহুদিন আগে হাত দিয়েছেন। আমাদের ইমামাদের অনেকে ‘ইয়া আল্লা তু রহম কর’ বলে উর্দুওয়ালাদের মাতৃভাষায় মোনাজাত শুরু করেন।

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ আওয়াজ তুলে আমাদের তরুণেরা এক মস্ত কাজ করেছেন। এবার তাঁরা ‘ধর্মভাষা বাংলা চাই’ — এই আওয়াজ তুলন।

আমাদেও মাদ্রাছাগুলিতে বর্তমানে যত ছাত্র পড়ছে, শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টর সাহেবের অফিস হতে নেওয়া নিম্নোক্ত হিসাবে তার আভাস মিলবে:

Sharoni

মাদ্রাছার ছাত্রসংখ্যা এখানেই শেষ নয়। এদের ছাড়া বহু ছেলেমেয়ে গাঁয়ের মসজিদে বসে পড়ে, মোড়লের বাংলো ঘরে বসে পড়ে, অন্দরে মহিলাদের কাছে বসে পড়ে। এদের সংখ্যা অনায়াসে দুই লক্ষ ধরা চলে।

মাদ্রাছা পড়–য়াদের সংখ্যা বিপুল!

মাদ্রাছার শিক্ষা যে বর্তমান কালের অনুপযোগী, এখানে পড়ে ছেলেরা জীবন-যুদ্ধের জন্য সম্যক তৈয়ার হতে পারে না, দেশের চোখওয়ালাদের শতকরা নব্বইজন এ কথা বিশ্বাস করেন।

আমাদের এই বিপুল সংখ্যক ভাই তা হলে আমাদেরই অব্যবস্থা কুব্যবস্থার ফলে ভয়াবহ রকমে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাশরের ময়দানে এ মহাপাপের জবাব দেওয়ার মত কিছু পাওয়া যাবে বলে তা মনে হয় না।

হাশরে যাঁরা বিশ্বাস না করেন, তাঁরা ওপার সম্বন্ধে যদি নিশ্চিত থাকতে চান, থাকুন। কিন্তু আমাদের যাঁদের হাতে ক্ষমতা আছে, তাঁরা এপারেই কি কৈফিয়ত দিয়ে পাড়ি পেতে পারবেন? এ নিদারুণ অবহেলা সে দিন হয়তো শিগগিরই ডেকে আনবে, যে দিন বুকের তাজা রক্ত দিয়েও সমস্ত পাপ ধুয়ে ফেলা সম্ভব হয়ে উঠবে না।

স্বাধীন রাষ্ট্রের একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, বিদেশে তারা কোন নাগরিকের ধন প্রাণ বিপন্ন হলে তার প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্র খাপ হতে তলোয়ার খুলতে প্রস্তুত হয়। আমাদের দেশে যাদের অবহেলায় লক্ষ লক্ষ তরুণের আত্মা অকালে শুকিয়ে মরে, তাদের শাস্তির জন্য কোষের ঘুমন্ত তলোয়ার কি কোনদিনই জেগে ক্রুদ্ধ ঝঙ্কারে বেরিয়ে আসবে না?

মাদ্রাছায় পড়ার ফলে জীবন-যুদ্ধে যারা পরাজয় মানতে বাধ্য হয়, সর্বনাশ কি তাদেরই? এখনো মাদ্রাছায় পড়–য়াদের উপর দেশের জনসাধারণের প্রচুর ভক্তি। এঁদেরই মধ্যে যাঁরা ‘অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী’ মোহ অন্ধ, প্রধানত তাঁদেরই ভ্রান্ত প্রচারের ফলে কি জনসাধারণ অসহায়ভাবে তক্দীরের উপর নির্ভর করে জীবনের সমস্ত দুর্দৈবকে বিনা সংগ্রামে কাপুরুষের মত রবণ করে নেয় নাই? আর আমাদের সমাজের একদা-কর্মচঞ্চল জীবনে যে অপরিসীম অবসাদ নেমে এসেছে, এ তকদীর নির্ভরতা কি তার অন্যতম কারণ নয়?

শুকনা খড়ে তৈরী কুঁড়ে ঘরের বস্তি। তারই মধ্যে নিশ্চিন্তে বাস করি আর ভাবি, আগুন লাগে তো ওরাই পুড়ে মরবে, আমি নিরাপদ।

আমাদের আলেম সমাজের দরবারে আমার একটি আরজ — সংস্কার দাবী আন্দোলনের সামনের কাতারে আপনারাই এসে দাঁড়ান; নইলে বাইরের কেউ সহজে এতে হাত দিতে ভরসা পাবে না।

সংস্কার করতে গেলে বিরুদ্ধ-আন্দোলন হবেই। সংস্কার চেষ্টার অপরাধে মনীষী আনোয়ার শা কাশ্মিরীকে দেওবন্দ ছাড়তে হয়েছিল, আল্লামা জামালুদ্দীন আফগানীর বিরুদ্ধে আল আজহার হতে ফতোয়া জারী হয়েছিল; মুফতী আবদুহুকে বহু ভুগতে হয়েছিল। অথচ আজকে তাঁদের দুজনকেই আধুনিক মিসরের জাগরণী দূত মনে করা হয়ে থাকে।

আমাদের ইংরেজী শিক্ষিত নেতাদের বেশীর ভাগেরই মনোভাব সংস্কারের অনুকূল; কিন্তু সংস্কারে হাত দেওয়ার অনুকূলে নয়। তাঁরা আলেম সমাজকে ভক্তির চোখে যতখানি দেখেন, ভয়ের চোখে দেখেন তার চেয়ে বেশী। ভাবেন মাদ্রাছা সংস্কারের নাম করলেই গোঁড়া মুনশী-মৌলবীর দল রুখে দাঁড়াবে, সমাজময় তোলপাড় শুরু করে দিবে, সামনের নির্বাচনে ভোটারদের ক্ষেপিয়ে তুলবে। স্কুল-কলেজের ছেলেদের হৈ হুল্লুড়েই হয়রান, তার উপর আবার এ ভেঙ্গুলের চাকে ঢিল ছোঁড়া কেন? ওরা ঘুমিয়ে আছে, ঘুমাতে থাক। ওদের কেউ কেউ যদি নেহায়েত কিছু গোলমাল করতে চায়, তা সরকারী দরগা হতে দুই চার তশতরী চাকরির শিন্নী তকছিম করবো; রাহে নাজাতের মুনশীকে মওলানা বলে ডাকবো আর মিলাদ পড়াব আজুরাটা বাড়িয়ে দিবা।

মিছরে মাদ্রাছা সংস্কারের আন্দোলন পরিচালনা করেন মুফতী আবদুহু ও আল্লামা রশীদ রেজার মত সত্যিকার আলেমরা — জগলুল নাহাস পাশার মত রাজনীতিকেরা নন।

এককালে আমাদের মাদ্রাছা সংস্কারে হাত দেন শামসুছ-উলামা আবু নছর অহীদের মত বিশিষ্ট আলেম — কোন রাজপুরুষ বা রাজনৈতিক নেতা নন।

তাই আলেম সমাজের কাছে ফের আরজ, আপনারা এগিয়ে আসেন। হাওয়া একান্ত অনুকূল। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাছার সমগ্র ছাত্র সমাজ, ইংরেজীওয়ালাদের  সকলের এবং মন্ত্রীমণ্ডলীর অন্তত অধিকাংশ তাঁদের এ আন্দোলনে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিবেন।

পথ দুর্গম। কিন্তু ভয়কে ভয় করেই তো ভয় আমরা বাড়িয়ে তুলেছি।

‘লা-তাহজেন ইন্নাল্লাহা মা আনা’।

ঢাকা, ১১ নবেম্বর: ৬৩ (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

বাংলাদেশের সংকট–সৈয়দ মঞ্জুর মোরশেদ

দেশ স্বাধীন হইবার পর পরই মহান লেখক আহমদ ছফা ঊনিশশ বাহাত্তর সনে বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক অনন্য আয়াত উচ্চারণ করিয়া ছিলেন। আমাদের ভুলিয়া গেলে চলিবে না আহমদ ছফা গ্রীস দেশের মনীষী নন কিংবা জেরুজালেম কিংবা আরবদেশেও জন্ম লন নাই। বাংলায় বাড়িয়া উঠিয়াছেন এবং এদেশের মাটিতে দেহ রাখিয়াছেন। আজ হইতে অনেক বছর পরে ভাবীকালের ভাবুক আসিয়া যদি দেখিতে পান এদেশের দুর্দিনে, দুষ্কালে আপামর জন সাধারণের পাশে কোন কোন লেখক দাঁড়াইয়াছেন তাহা হইলে আহমদ ছফাকে খুঁজিয়া পাইবেন। শুধু তাহাই নহে বিস্মিত হইতে হইবে আহমদ ছফা এত সাহস কোথায় পাইলেন? এত সাহস সম্মুচারিত কথা কহিলেন। কোন ভয় তাঁহার ছিল না।

জাতির দুর্দিনে, সংকটকালে, দুর্মর দুঃসহনীয় অবস্থায় শুধু একজন আহমদ ছফা পাশে দাঁড়াইতে পারে দেখিয়া কেহ আশ্চর্য হইবে না বরং অকুণ্ঠ চিত্তে বলিয়া উঠিবেন কবি ভারতচন্দ্র যেমন বলিয়াছিলেন ‘আমার সন্তান যেন দুধে ভাতে থাকে’। কতকাল চলিয়া গেল কত ধুলা ধূসরিত করিয়া ইতিহাসের পাতা উল্টাইয়া গেল। তবু কবির কথা সত্য। আজও প্রতিভাত হয় ইহা আজিকার কোন কবি বলিয়াছেন। আমরাও খুব বিস্মিত হইব না ‘এদেশের বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হইত না আর আজ বুদ্ধিজীবীদের কথা শুনলে এদেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হইবে না’ একথা যদি ২০৭২ সালে কোন কবি, লেখক, বিপ্লবী রাজনীতিক কিংবা কোন অভাজন কলমচিত্ত উচাচারণ করিয়া থাকেন তখনও প্রাসঙ্গিক বলিয়া বিবেচিত হইবে।

আজ হইতে অনেক বছর আগে মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম বাংলাভাষার বিপদ লইয়া যে কবিতা রচিয়াছিলেন আহমদ ছফাও সেই রকম জাতির দুর্দিন লইয়া সাফ সাফ কথা বলিয়াছিলেন। প্রতিটি শব্দ হিরক খণ্ডের মত জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছে আর এত সত্য শব্দ শব্দে নিনাদিত হইতেছে পাছে মনে হইতেছে যুগ যুগ ধরিয়া প্রতিদিনের কথা বলিয়া উচ্চারিত হইবে। দেশ স্বাধীন হইবার পর পরই আহমদ ছফা এ কথা বলিবার প্রয়োজন বোধ করিলেন কেন? আসলে সময় বলি আর প্রকৃতি বলি বাংলাদেশের সমাজে এমন কথা প্রকাশ হউক বাগদেবী স্বরসতী তাহাই চাহিয়াছেন। তাই হইয়াছে। এইখানে মুর্খের মত সমাজ ব্যাখ্যা দিতে যাইব না। আহমদ ছফা পাকিস্তানের দীর্ঘ দুঃশাসনে শিল্পী সাহিত্যিকদের গোলামি সাহিত্য রচনার দুষ্কর্ম দেখিয়াছেন। ইসলামী ব্যবসা দেখিয়াছেন। আরো কি ভয়াবহ বাংলা ভাষার উপর বিজাতীয় হামলা ও চোখের সামনে পরখ করিয়াছেন। রবীন্দ্রনাথকে বর্জনের আস্ফালন দেখিয়াছেন।

পুরো দেশ যখন যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িল তখন একদল লেখক পাকিস্তানি শাসকদের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত হইল। গণভবনে বৈঠকের পর বৈঠক করিল। আর ঐ সকল লেখক বুদ্ধিজীবী শুধু পাকিস্তান রক্ষার জন্য বিবৃতি দিয়া ক্ষান্ত হন নাই কেহ কেহ বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকাণ্ড জড়িত হইলেন। কেহ কেহ রাজাকার, আলবদর, জামাতে ইসলামীদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছিলেন তাহার নজির আছে। আরেকদল লেখক প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাথে ভিড়িয়া গিয়া লুটপাট, কালোবাজারী ব্যবসা, কলিকাতার খালাসী টোলায় রাত্রি কাটাইয়া হোটেল, ফ্ল্যাটে দামী মদের বোতল লইয়া দিন গুজরান করিয়াছেন। সে সময়ের এইসব কাজকর্ম লইয়া কোলকাতার লেখকরাও খুবই শরমিন্দা বোধ করিয়াছেন। অথচ দেশ তখন রক্ত-জল- কাদায় লাল হইয়া গিয়াছে। মুক্তিযোদ্ধারা খাইয়া না খাইয়া, বুকে পিঠে, পায়ে ঘাড়ে, হাড়ে গুলি খাইয়া লড়িয়া গিয়াছে। দেশ ইঞ্চি ইঞ্চি প্রতিদিন স্বাধীন হইতেছে। অথচ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশ জাগিয়া উঠিতেছে। রক্তের দাম কি বুঝিবে। লেখক বুদ্ধিজীবীরা ভারতে প্রবাসী সরকারের নুন খাইয়া বরখেলাপি করিয়া বেড়াইতেছে। কেহ সিনেমা দেখিয়া, কেহ থিয়েটারে নর্তকীর ঘুঙ্গুর দেখিয়া কাটাইতেছে। অথচ বাংলায় সেদিন বোনের শাড়ি লুটিয়া গিয়াছে। জননীর গগন বিদারী কান্না চারিদিক ছিন্নভিন্ন করিয়া ফেলিয়াছে। ঘর বাড়িতে আগুন, লেলিহান শিখা দাউ দাউ জ্বলিতেছে। দলে দলে লোকজন শরনার্থী জীবন বাছিয়া লইয়াছে। পথে পথে মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। পেটে ক্ষুধা, বুক ভরা ব্যথা, আত্মীয় স্বজন, পাড়াপড়শি, ঘরবাড়ি, জমি জিয়ারত সহায় সম্বল সবকিছু হারাইয়া সর্বহারা হইয়াছে। আর মায়ের মুখের ছবি আর বোনের বদনখানি ভাসিয়া উঠিয়াছে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা প্রাণপন যুদ্ধে লড়িতেছে। অথচ অন্যদিকে কি দেখি স্বাধীনতার লড়াইকে বিমূর্ত বিতণ্ডায় পরিণত করিয়া শ্রেণী লড়াইয়ের নামে নিজেরা গহ্বরে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়াছে। অথচ বাংলাদেশের চলমান যুদ্ধকে সম্বল করিয়া বৈশ্বিক রাজনীতি সরব হইয়া উঠিয়াছে। সাম্রাজ্যবাদীরা যুদ্ধের ফলকে লুটিয়া লইয়াছে। এমনকি ভারতের বিভিন্ন রাজ্য শহরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাথে যুক্ত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনেকেই, শিল্পী, সাহিত্যিক জাতির মুক্তি সংগ্রামে যুক্ত না হইয়া সর্বস্ব ভোগী জীবন যাপন করিতেছিল আর রক্তাক্ত লড়াইয়ে সম্মুখ সমরে বাঙালী বুক পাতিয়া দিয়াছিল। আর যুদ্ধ শেষে কি দেখি বাংলাদেশের দুর্দিনে যাহারা কোনো কালেই ছিল না তাহারা স্বাধীন দেশে দর্প করিয়া বেড়াইতেছে। আর যাহারা সবকিছু হারাইয়া ও বিলাইয়া দিয়া স্বাধীনতা ছিনাইয়া আনিল তাহারা উপেক্ষিত হইয়াছিল। আরো কি দেখি স্বাধীনতার দুশমনেরা সাধারণ ক্ষমা পাইতেছে। আর মুক্তিযোদ্ধারা খুন, গুম হইতেছে। দেশের সোনা দানা ধান মান লুটিয়া লইতেছে।

আর পাকিস্তান আমলে যে সকল লেখক শিল্পী সাহিত্যিক শাসক শ্রেণীর হইয়া গোলামী সাহিত্য রচিয়াছিল তাহারা মুখ বদলাইয়া মুখোশ পরিয়া আহা স্বাধীনতার রক্ষাকবচ লিখিতেছে। হায় বাগদেবী তোমার লীলা বুঝা বড়ই ভার। যাহারা গণভবনে বসিয়া পূর্ব পাকিস্তানের গবর্ননের সাথে পাকিস্তান রক্ষা করিবার সনদ লিখিতেছিল তাহারা বোল পাল্টাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হইয়াছেন। বাংলা একাডেমীর ঠাঁই লইয়াছেন। আহা আহা কি অদ্ভুত ইহারা ধর্ম নিরেপক্ষতার বাখান লিখিতেছেন। সে সময়ের সংবাদপত্রের পাতা উল্টাইলে পরিচয় পাইব। গোটা শেখ মুজিবের আমলে। বটের ছায়া তলে উটের মত লুটাইয়া ছিল। অথচ দেশে খুন, গুম, লুট বাড়িয়া চলিয়াছে। দেশের জন্য যাহারা যুদ্ধ করিয়াছিল তাহারাই পদে পদে নিগৃহীত হইতেছিল। কাহাকে কাহাকেও পদত্যাগ করিতে হইয়াছিল। অথচ কেহ কেহ যুদ্ধ না করিয়া, দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করিয়া স্বাধীন দেশে দক্ষিণ দুয়ার দিয়া রাষ্ট্রের ভেতরে ঢুকিয়া পড়িয়া স্বাধীনতার কার্ডটা উড়াইতেছে। উটপাখির মত মুখ বুজিয়া লেখক, শিল্প সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা সকলেই জাতির সর্বনাশা বান ডাকিয়া আনিয়াছে। আর ডাকিনি যোগিনিরা জাতির কবর খুড়িয়া চলিয়াছে।

এসব দেখিয়া কেহ কেহ বুকফাটা কান্নায় মনের কথা কহিবার জন্য উন্মুখ হইয়াছিল। তাহাদের মধ্যে আহমদ ছফা অন্যতম। জাতির মাথা বাঁচিবার ব্যাপারটি আঁচ করিতে পারিয়া বুদ্ধিজীবীদের অবস্থানটি তুলিয়া ধরিলেন। সেদিন বুদ্ধিজীবীরা যদি রুশো, ভলতেয়ার, টমাস পেইন, বার্টান্ড রাসেল, আন্তনিও গ্রামসি আর ফ্রাঁনজ ফাঁনোর মত প্রতিবাদী হইয়া কলম ধরিতেন তাহা হইলে মানুষের স্বাধীনতা বিচ্ছিন্ন হইত না। আর জাতিকে এত দুর্ভোগ পোহাইতে হইত না। পুরো জাতি বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করিয়া অস্তিত্ব ঘোষণা করিত। বুদ্ধিজীবীরা সরব হইলে বাংলাদেশ একদলীয় শাসণের দিকে আগাইয়া যাইত না। ছাউনি ছাড়িয়া ব্যারাকের সেপাইরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সওয়ার হইত না। কিন্তু কি হইল। আওয়ামী লীগ একদলীয় শাসনের দিকে ঠেলিয়া দিল। সে দায় শুধু শেখ মুজিবর রহমানের উপর চাপাইলে হইবে না। সে সময়ের মস্কোপন্থী ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টির বুদ্ধিজীবী, লেখক শিল্পীরা জড়িত ছিল।  আরো কি অদ্ভূত জিয়াউর রহমানের সময় খাল কাটার সময় পুরো পার্টি দলবল লইয়া উঠিয়া পড়িয়া লাগিল। হায় বিপ্লব তুমি বুঝি এভাবেই জিরাফ হইয়া বাঁচিয়া থাক। একেই কি বুড়ো ব্রাহ্মণের গয়া যাত্রা বলে। গয়া যাইতে না পারিলেও কাশি তো যাইতে পারিবে।

আসলে সুবিধা কি জিনিস গোলামি কি জিনিস বুঝিতে হইলে সাতচল্লিশের পর ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধিজীবী, পরে পরে ঢাকা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের দিকে চোখ ফিরাইলে চলিবে। পুরো পাকিস্তান আমল হইতে আজ অবধি সে বিপত্তি দূর হইল না। সেদিন যদি বুদ্ধিজীবীরা যথাসময়ে উৎপন্নমতিত্ব দেখাইতেন তাহা হইলে জাতির জীবনে এত দুর্দশা, দুঃখ সর্বপরি দুষ্কার আসিত না।

দুঃখের দিনে পাশে দাঁড়াইবার কেহ একজন  তো থাকে। তাহা না হইলে দোঁহা কি করিয়া লিখিবে? কি করিয়া সুন্দরের সান্নিধ্য পাইবার জন্য জল্লাদ সময়ে কলম উচাঁইয়া ধরিয়া রুখিয়া দাঁড়াইবে? আহমদ ছফা পারিয়াছিলেন। ইতিপূর্বে কলমচিরা গোলামির ভারে নুয়ে পড়া মানুষ হইয়াছে আর আহমদ ছফার সময়ের বুদ্ধিজীবীরা সুবিধাভোগী জীবনের চতুরাঙ্গে ঢুকিয়া পড়িলেন। আর দুর্যোধনের মত বুদ্ধিজীবীর স্বরূপ বিশ্লেষণ করিয়া জাতিকে পথ দেখাইলেন। জাতির ভবিষ্যত কি হইবে ভাবিত হইয়া পচা গলা দুর্গন্ধময় তমসাচ্ছন্ন চতুর্দিক আমূল উৎপাটন করিবার লক্ষ্যে কলম তুলিয়া লইয়া ধর্মযুদ্ধ শুরু করিয়াছিলেন। বাংলাদেশে তখন চারিদিকে নাগিনী যোগিনী চষিয়া বেড়াইতেছে। খর হলুদ রৌদ্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে। আর নাভিশ্বাস উঠিবার মত পরিস্থিতি তৈয়ার হইয়াছে। সেদিন আহমদ ছফা একা কুটিল সময়ের মুখোমুখি দাঁড়াইয়া পরিস্থিতি বদলাইবার পণ করিয়া লড়িয়া গিয়াছিলেন। জনজীবনে এমনকি জাতীয় উদ্বোধনে সুন্দরের সান্নিধ্য পাইবার বড় সাধ স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। না হইলে স্বীয় জীবন বিপন্ন করিয়া ঘরবাড়ি সংসার না পাতিয়া, নুয়ে পড়া বাঁশের লাহান হেলিয়া না পড়িয়া শিরদাঁড়া খাড়া করিয়া ঋজু মানুষের মত লড়িয়া গেলেন। কেহ কি ইহা বিবেচনায় আনিবে না।

‘ঘর করলাম না, সংসার করলাম না’ যে গান আহমদ ছফা পরিণত বয়সে আসিয়া বাঁধিয়াছিলেন তাহার তাৎপর্যটি কয়জন বুঝিবার পারিয়াছে। না পারে নাই। একজন মানুষের জীবনে ঘর করিবার সংসার করিবার বড়বেশি অভিলাষ থাকিবার পরেও ঘর করিল না সংসার করিল না বিষয়টি নানাজন নানা মুনি নানা রকম ব্যাখ্যা দিয়াছেন, দেখিয়াছি। কিন্তু হালে তা পানি পাইবে না।

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা আয়োজিত বক্তৃতামালায় বলিয়াছিলাম শুধু তাই নয় সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকজনদের মাঝে বহুবার বলিয়াছি। আহমদ ছফা সারাজীবন জাতির সংকট লইয়া লড়াই করিয়াছেন। সে লড়াই কখনো কোন ব্যক্তি, কখনো সমাজ, কখনো রাষ্ট্রীয় দানবশক্তি নতুবা উদাক্ষী মিনার বাসী বিদ্বজ্জন যাহারা সবকিছু বুঝিয়া মুখ ফিরাইয়া সাদা হাতির কোটরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। আহা আহা শাশ্বত সমাজের ধুরন্ধর প্রতিবেশীগণ। ঠিক সময়ে আপনাদের আহমদ ছফা চিনিয়া ছিলেন। না হইলে দুটি লাইনে কি করিয়া জাতিকে সবক দিলেন। যাহোক আহমদ ছফা রচনা যতবারই পড়িয়াছি শুধু ভাবিয়াছি সারা জীবন একটি লেখাই লিখিয়াছেন। তাঁহার রচনার মধ্যে একটি সুরই বাঁশরিতে বাজিতেছে। কি কবিতা, কি গল্প, কি চিন্তাস্ফলক। রচনা, কি উপন্যাস, কি গান, এমনকি বক্তৃতামালা আর কি মুখরচনা আর তা হইল জাতির বিষয় লইয়া।

যদিও অনেকেই বলিয়া থাকেন তিনি গোছানো মানুষ ছিলেন না, সারা জাতি যখন আগাছালো রহিয়া গিয়াছে, জাতির উদ্বোধনে যিনি আউলা ঝাউলা সুতাগুলি সুন্দর নাটাইয়ে বদ্ধ করিবার জন্য সারাজীবন কাটাইয়া দিয়াছেন, তিনি কি করিয়া জাতিকে পিছ দিবেন। তিনি একটি পরিপাটি সবুজ জমিনে দাঁড়াইয়া ঘুড়ি উড়াইবেন বলিয়া, বিহঙ্গ পুরাণের মত সুনীল আকাশ পর্যটন করিবেন বলিয়া সারাজীবন অত্যাচারীতের মুখে ভাষা দিয়াছেন। আজ হইতে তিন যুগ আগে জাতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে বসিয়া জাতির রক্ত চুষিয়া গুপ্তচরবৃত্তি করিতেছে শুধু তাহাই নয় গুপ্ত হত্যায় লিপ্ত হইয়াছে তাহা চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন। আজ যখনই জাতির ভবিষ্যৎ কি হইবে ভাবি তখনই দেখি কি করিয়া এতদিন আগে টের পাইয়াছিলেন। অতি তুলনা হইবে না শুধু বলিব আহমদ ছফা সারাজীবন এ জাতির জেগে উঠার জন্য ত্যাগ করিয়াছেন যেমন গৌতম বুদ্ধ মানুষের মুক্তির জন্য সংসার ত্যাগ করিয়াছিলেন। একজন মানুষের মানুষের বাসনা থাকে কামনা থাকে, সাধ আহ্লাদ, অভিলাষ থাকে কিন্তু ত্যাগ করিবার সাধনা কি সবার থাকে। সবকিছু ছাড়িয়া ঋষি যেমন কৈলাস যায়, নবীজি যেমন হেরা গুহায় গিয়াছিলেন, যিশু যেমন জেরুজালেমের পথে পথে ঘুরিয়াছেন, তেমনি কি যেসকল বিদ্ধানেরা স্বজাতির আশ্বির্বাদ  পাইয়াছেন তাহারা এতটুকু শ্রম ব্যয় করিতে পারেন না?

না, পারেন না। আহমদ ছফা পারিয়াছিলেন। আহমদ ছফার কি লোভ ছিল না? হলফ করিয়া বলিব না যে, ছিল না। যিনি সুলতানের উপর লিখিয়াছেন তিনি তো সুলতানের ছবি লইয়া ব্যবসা করিতে পারিতেন।

আহমদ ছফার খেয়াল তাহা ছিল বলিতে পারি না। তিনি সুফি ছিলেন না, সাধক ছিলেন না কিংবা হিমালয় ফেরৎ মুনী ছিলেন না। তাহলে কি ছিলেন? তিনি একজন মানুষ ছিলেন। যে মানুষ সবকিছু বুঝিতে পারে বিচলিত হইতে পারে। কখনো কখনো সোচ্চার হইতে পারে। কখনো কখনো বিলাপ করিতে পারে। তিনি কি করিয়া বুদ্ধিজীবীর মত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মত, বেশ্যাবাড়ীর দালালদের মত জাতির বিরুদ্ধে চরৈবাতি খেলিবেন। তিনি জীবন দিয়া রুখিয়া দিয়াছেন। যাহারা আহমদ ছফাকে চিনিতেন তাহারা জানিতেন তিনি কাঁদিতে পারিতেন। তাঁহার সাথে যাহারা সাহিত্য করিতে আসিয়াছিলেন তাহারা সারা জীবনব্যাপী ভান করিয়া গেছেন। কখনো যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িবার, কখনো অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়াইবার, কখনো সংগ্রামে শামিল হইবার। আদপে তাহারা কিছু করেন নাই। তাহারা কাঁদিবেন কি করিয়া। কাটা ফুটিলে শিশু যেমন ব্যথায় ককিয়ে উঠে আহমদ ছফা শিশুর উপলব্ধিতে জাতির কান্না কাঁদিয়াছেন। কিন্তু আহমদ ছফার লড়াই শিশুর মত ছিল না।

শুধু একটি নমুনা হাজির করিব। প্রতিটি রচনার পিছনে কোন না কোন উপলব্ধি বা পরিপ্রেক্ষিত জারি থাকে। বাঙালী মুসলমানের মন রচনা লিখিবার পেছনের কাহিনী নিছক কোন সাদা চোখের ব্যাপার ছিল না। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে খুবই প্রণিধানযোগ্য মনীষী আবুল ফজল যিনি সারা জীবন বাংলা সাহিত্য সাধনায় সন্নিহিত জীবন কাটাইয়া দিয়াছিলেন তিনি করিয়া ছাউনি ফেরৎ এমজি তাওয়াবের সাথে তবলীগ জামাত বাহির হইয়াছিলেন যেখানে জড় বুদ্ধির আড়ষ্ঠতা ভাঙ্গিবার জন্য আবুল হোসেন, আবদুল ওদুদদের সাথে মিলিয়া বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন করিয়াছিলেন। আহমদ ছফা ভাবিয়াছেন বাঙালী মুসলমান সমাজের এ জাতীয় পরিনতি কেন হইবে? ওঙ্কার কিংবা অলাতচক্র উপন্যাসের প্রেক্ষিত কি বলিতে হইবে। আসলে আহমদ ছফা সারাজীবন কি চাহিয়াছেন? তাহা বুঝবার জন্য তাহার জীবন ব্যাপীয়া যেসব লেখা লিখিয়া গেছেন তাহা জাতীয় জীবনের সাথে মিলাইয়া লইলে হইবে। আর তা হইল ‘বুদ্ধিবৃত্তির ভণ্ডামীর সকল মুখোশ’ ছিড়িয়া ফেলিয়াছেন। না হইলে ‘সুলতানের’ বাংলাদেশের শিল্প জগতে ফেরা হইত না।

পুরো পাকিস্তান আমল এমনকি কি বাংলাদেশেও আশির দশকের পুরো সময় জুড়ে সুলতান উপেক্ষিত ছিলেন। কিন্তু আহমদ ছফা জাত কলমি বলিয়া কথা রহিয়াছে। তারেক মাসুদ আদমসুরত বানাইলেন। হাসনাত আব্দুল হাই ‘সুলতান’ উপন্যাস লিখিলেন আর কবীর চৌধুরী ইংরেজী অনুবাদ করিলেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী জমানায় এত বড় মোড় ফেরার ঘটনা খুবই কম আছে। আহমদ ছফা মাইকেল এঞ্জেলোর মত প্রতিভাবান একজন শিল্পী মুসলমান সমাজে জন্মিয়াছেন চিনাইলেন। এতবড় কর্ম্ম করিতে নিজে শিল্প পাঠ নেন নাই শুধু ছবি আঁকা পর্যন্ত শিখিয়াছিলেন। রঙের ধারণা বুঝিবার জন্য টুথপেস্ট পর্যন্ত ব্যবহার করিয়াছেন। যেখানে সুলতান পাতা গুলিয়া রঙবানাইতেন তাহা তাঁদের মধ্যে বেলকুচি সফরে খুঁজিয়া পাইয়াছি। আর ছফা শিল্পকলার আধুনিকতা বুঝিবার জন্য টুথপেস্ট কি মাত্রা তৈরীকার পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন। আর অন্যরা জীবন বিপন্ন করিয়া ধান ফলান নাই। কুড়ার রঙকে ধানের রঙ বলিয়া চালাইয়া দিয়াছেন। আজও দেখি কি সাহিত্য কি শিল্প জগতে লোক সাহিত্য কি সীমাহীন নির্মম উপেক্ষার শিকার। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা লোকসাহিত্য লোক কবি কি নিগ্রহের মধ্যে দিন কাটাইতেছে। আজ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাই। দীনেশচন্দ্র সেন কোথায় পাইব? ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ সম্পর্কে কিছু বলিব না। শুধুই বলিব জাতির ভাবসম্পদ আর সংস্কৃতির সমৃদ্ধি পরতে পরতে ছড়াইয়া আছে। আজ যদি তা সংগ্রহ করিয়া রাখে জাতীয় ছবি আগামী দিন কেহ আঁকিতে পারিবে। জাতির গৌরব বড় হইয়া প্রকাশ পাইবে। আহমদ ছফা তাহা ঠিকই উপলব্দি করিয়াছিলেন। তাঁহার লেখায় চিঠিতে  আব্দুল গফুর আলী, রমেশশীল প্রমুখের কথা বলিয়াছেন। আজ শুধু জাতির রাজনৈতিক হাল অবস্থা নিয়া আহমদ ছফার উপলব্দি লইয়া কলম থামাইব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলি লইয়া বুদ্ধিজীবীদের রহস্যজনক কর্মকাণ্ড দেখিয়া সতর্ক হইতে হইবে। আজ বোধ হয় পাঠক বিস্মৃত হইবেন না ‘আওয়ামী লীগ হারলে পুরো জাতি হারে আর আওয়ামী লীগ জিতলে দল জিতে’। এত নির্মোহ উপলব্দি কি করিয়া বিসর্জন দিব। যদিও দশমীর দিন আমাদের খুব কাঁদাইয়া বাপের বাড়ি ছাড়িয়া দূর্গা কৈলাসে ফিরিয়া গেছেন। আর আমাদের দেশের বিদ্ধানেরা জাতিকে সঙ্কটে ফেলিয়া শীতকাল আসিবার আগে চাদর টানিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

আহমদ ছফা আপনি বাঁচিয়াছেন। না হইলে আপনার গায়ে আজ আপনাকে আগুন দিতে হইত। আজ আবার যদি যুদ্ধে যেতে হয় নতুন করিয়া অস্ত্র বল্লম উঁচাইয়া ধরিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িতে হয় তাহা হইলে যেমন সুলতানের ছবির কাছে ফিরিয়া আসিতে হইবে, তেমনি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশা হইতে যদি বেরিয়ে আসিতে হয়, তাহা হইলে সংকট দূর করিবার জন্য বাংলা ভাষায় নতুন করিয়া আহমদ ছফার কাছ হইতেই সবক লইতে হইবে। য়গেলেন। কেহ কি ইহা বিবেচনায় আনিবে না।

‘ঘর করলাম না, সংসার করলাম না’ যে গান আহমদ ছফা পরিণত বয়সে আসিয়া বাঁধিয়াছিলেন তাহার তাৎপর্যটি কয়জন বুঝিবার পারিয়াছে। না পারে নাই। একজন মানুষের জীবনে ঘর করিবার সংসার করিবার বড়বেশি অভিলাষ থাকিবার পরেও ঘর করিল না সংসার করিল না বিষয়টি নানাজন নানা মুনি নানা রকম ব্যাখ্যা দিয়াছেন, দেখিয়াছি। কিন্তু হালে তা পানি পাইবে না।

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা আয়োজিত বক্তৃতামালায় বলিয়াছিলাম শুধু তাই নয় সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকজনদের মাঝে বহুবার বলিয়াছি। আহমদ ছফা সারাজীবন জাতির সংকট লইয়া লড়াই করিয়াছেন। সে লড়াই কখনো কোন ব্যক্তি, কখনো সমাজ, কখনো রাষ্ট্রীয় দানবশক্তি নতুবা উদাক্ষী মিনার বাসী বিদ্বজ্জন যাহারা সবকিছু বুঝিয়া মুখ ফিরাইয়া সাদা হাতির কোটরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। আহা আহা শাশ্বত সমাজের ধুরন্ধর প্রতিবেশীগণ। ঠিক সময়ে আপনাদের আহমদ ছফা চিনিয়া ছিলেন। না হইলে দুটি লাইনে কি করিয়া জাতিকে সবক দিলেন। যাহোক আহমদ ছফা রচনা যতবারই পড়িয়াছি শুধু ভাবিয়াছি সারা জীবন একটি লেখাই লিখিয়াছেন। তাঁহার রচনার মধ্যে একটি সুরই বাঁশরিতে বাজিতেছে। কি কবিতা, কি গল্প, কি চিন্তাস্ফলক। রচনা, কি উপন্যাস, কি গান, এমনকি বক্তৃতামালা আর কি মুখরচনা আর তা হইল জাতির বিষয় লইয়া।

যদিও অনেকেই বলিয়া থাকেন তিনি গোছানো মানুষ ছিলেন না, সারা জাতি যখন আগাছালো রহিয়া গিয়াছে, জাতির উদ্বোধনে যিনি আউলা ঝাউলা সুতাগুলি সুন্দর নাটাইয়ে বদ্ধ করিবার জন্য সারাজীবন কাটাইয়া দিয়াছেন, তিনি কি করিয়া জাতিকে পিছ দিবেন। তিনি একটি পরিপাটি সবুজ জমিনে দাঁড়াইয়া ঘুড়ি উড়াইবেন বলিয়া, বিহঙ্গ পুরাণের মত সুনীল আকাশ পর্যটন করিবেন বলিয়া সারাজীবন অত্যাচারীতের মুখে ভাষা দিয়াছেন। আজ হইতে তিন যুগ আগে জাতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে বসিয়া জাতির রক্ত চুষিয়া গুপ্তচরবৃত্তি করিতেছে শুধু তাহাই নয় গুপ্ত হত্যায় লিপ্ত হইয়াছে তাহা চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন। আজ যখনই জাতির ভবিষ্যৎ কি হইবে ভাবি তখনই দেখি কি করিয়া এতদিন আগে টের পাইয়াছিলেন। অতি তুলনা হইবে না শুধু বলিব আহমদ ছফা সারাজীবন এ জাতির জেগে উঠার জন্য ত্যাগ করিয়াছেন যেমন গৌতম বুদ্ধ মানুষের মুক্তির জন্য সংসার ত্যাগ করিয়াছিলেন। একজন মানুষের মানুষের বাসনা থাকে কামনা থাকে, সাধ আহ্লাদ, অভিলাষ থাকে কিন্তু ত্যাগ করিবার সাধনা কি সবার থাকে। সবকিছু ছাড়িয়া ঋষি যেমন কৈলাস যায়, নবীজি যেমন হেরা গুহায় গিয়াছিলেন, যিশু যেমন জেরুজালেমের পথে পথে ঘুরিয়াছেন, তেমনি কি যেসকল বিদ্ধানেরা স্বজাতির আশ্বির্বাদ  পাইয়াছেন তাহারা এতটুকু শ্রম ব্যয় করিতে পারেন না?

না, পারেন না। আহমদ ছফা পারিয়াছিলেন। আহমদ ছফার কি লোভ ছিল না? হলফ করিয়া বলিব না যে, ছিল না। যিনি সুলতানের উপর লিখিয়াছেন তিনি তো সুলতানের ছবি লইয়া ব্যবসা করিতে পারিতেন।

আহমদ ছফার খেয়াল তাহা ছিল বলিতে পারি না। তিনি সুফি ছিলেন না, সাধক ছিলেন না কিংবা হিমালয় ফেরৎ মুনী ছিলেন না। তাহলে কি ছিলেন? তিনি একজন মানুষ ছিলেন। যে মানুষ সবকিছু বুঝিতে পারে বিচলিত হইতে পারে। কখনো কখনো সোচ্চার হইতে পারে। কখনো কখনো বিলাপ করিতে পারে। তিনি কি করিয়া বুদ্ধিজীবীর মত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মত, বেশ্যাবাড়ীর দালালদের মত জাতির বিরুদ্ধে চরৈবাতি খেলিবেন। তিনি জীবন দিয়া রুখিয়া দিয়াছেন। যাহারা আহমদ ছফাকে চিনিতেন তাহারা জানিতেন তিনি কাঁদিতে পারিতেন। তাঁহার সাথে যাহারা সাহিত্য করিতে আসিয়াছিলেন তাহারা সারা জীবনব্যাপী ভান করিয়া গেছেন। কখনো যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িবার, কখনো অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়াইবার, কখনো সংগ্রামে শামিল হইবার। আদপে তাহারা কিছু করেন নাই। তাহারা কাঁদিবেন কি করিয়া। কাটা ফুটিলে শিশু যেমন ব্যথায় ককিয়ে উঠে আহমদ ছফা শিশুর উপলব্ধিতে জাতির কান্না কাঁদিয়াছেন। কিন্তু আহমদ ছফার লড়াই শিশুর মত ছিল না।

শুধু একটি নমুনা হাজির করিব। প্রতিটি রচনার পিছনে কোন না কোন উপলব্ধি বা পরিপ্রেক্ষিত জারি থাকে। বাঙালী মুসলমানের মন রচনা লিখিবার পেছনের কাহিনী নিছক কোন সাদা চোখের ব্যাপার ছিল না। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে খুবই প্রণিধানযোগ্য মনীষী আবুল ফজল যিনি সারা জীবন বাংলা সাহিত্য সাধনায় সন্নিহিত জীবন কাটাইয়া দিয়াছিলেন তিনি করিয়া ছাউনি ফেরৎ এমজি তাওয়াবের সাথে তবলীগ জামাত বাহির হইয়াছিলেন যেখানে জড় বুদ্ধির আড়ষ্ঠতা ভাঙ্গিবার জন্য আবুল হোসেন, আবদুল ওদুদদের সাথে মিলিয়া বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন করিয়াছিলেন। আহমদ ছফা ভাবিয়াছেন বাঙালী মুসলমান সমাজের এ জাতীয় পরিনতি কেন হইবে? ওঙ্কার কিংবা অলাতচক্র উপন্যাসের প্রেক্ষিত কি বলিতে হইবে। আসলে আহমদ ছফা সারাজীবন কি চাহিয়াছেন? তাহা বুঝবার জন্য তাহার জীবন ব্যাপীয়া যেসব লেখা লিখিয়া গেছেন তাহা জাতীয় জীবনের সাথে মিলাইয়া লইলে হইবে। আর তা হইল ‘বুদ্ধিবৃত্তির ভণ্ডামীর সকল মুখোশ’ ছিড়িয়া ফেলিয়াছেন। না হইলে ‘সুলতানের’ বাংলাদেশের শিল্প জগতে ফেরা হইত না।

পুরো পাকিস্তান আমল এমনকি কি বাংলাদেশেও আশির দশকের পুরো সময় জুড়ে সুলতান উপেক্ষিত ছিলেন। কিন্তু আহমদ ছফা জাত কলমি বলিয়া কথা রহিয়াছে। তারেক মাসুদ আদমসুরত বানাইলেন। হাসনাত আব্দুল হাই ‘সুলতান’ উপন্যাস লিখিলেন আর কবীর চৌধুরী ইংরেজী অনুবাদ করিলেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী জমানায় এত বড় মোড় ফেরার ঘটনা খুবই কম আছে। আহমদ ছফা মাইকেল এঞ্জেলোর মত প্রতিভাবান একজন শিল্পী মুসলমান সমাজে জন্মিয়াছেন চিনাইলেন। এতবড় কর্ম্ম করিতে নিজে শিল্প পাঠ নেন নাই শুধু ছবি আঁকা পর্যন্ত শিখিয়াছিলেন। রঙের ধারণা বুঝিবার জন্য টুথপেস্ট পর্যন্ত ব্যবহার করিয়াছেন। যেখানে সুলতান পাতা গুলিয়া রঙবানাইতেন তাহা তাঁদের মধ্যে বেলকুচি সফরে খুঁজিয়া পাইয়াছি। আর ছফা শিল্পকলার আধুনিকতা বুঝিবার জন্য টুথপেস্ট কি মাত্রা তৈরীকার পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন। আর অন্যরা জীবন বিপন্ন করিয়া ধান ফলান নাই। কুড়ার রঙকে ধানের রঙ বলিয়া চালাইয়া দিয়াছেন। আজও দেখি কি সাহিত্য কি শিল্প জগতে লোক সাহিত্য কি সীমাহীন নির্মম উপেক্ষার শিকার। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা লোকসাহিত্য লোক কবি কি নিগ্রহের মধ্যে দিন কাটাইতেছে। আজ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাই। দীনেশচন্দ্র সেন কোথায় পাইব? ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ সম্পর্কে কিছু বলিব না। শুধুই বলিব জাতির ভাবসম্পদ আর সংস্কৃতির সমৃদ্ধি পরতে পরতে ছড়াইয়া আছে। আজ যদি তা সংগ্রহ করিয়া রাখে জাতীয় ছবি আগামী দিন কেহ আঁকিতে পারিবে। জাতির গৌরব বড় হইয়া প্রকাশ পাইবে। আহমদ ছফা তাহা ঠিকই উপলব্দি করিয়াছিলেন। তাঁহার লেখায় চিঠিতে  আব্দুল গফুর আলী, রমেশশীল প্রমুখের কথা বলিয়াছেন। আজ শুধু জাতির রাজনৈতিক হাল অবস্থা নিয়া আহমদ ছফার উপলব্দি লইয়া কলম থামাইব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলি লইয়া বুদ্ধিজীবীদের রহস্যজনক কর্মকাণ্ড দেখিয়া সতর্ক হইতে হইবে। আজ বোধ হয় পাঠক বিস্মৃত হইবেন না ‘আওয়ামী লীগ হারলে পুরো জাতি হারে আর আওয়ামী লীগ জিতলে দল জিতে’। এত নির্মোহ উপলব্দি কি করিয়া বিসর্জন দিব। যদিও দশমীর দিন আমাদের খুব কাঁদাইয়া বাপের বাড়ি ছাড়িয়া দূর্গা কৈলাসে ফিরিয়া গেছেন। আর আমাদের দেশের বিদ্ধানেরা জাতিকে সঙ্কটে ফেলিয়া শীতকাল আসিবার আগে চাদর টানিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

আহমদ ছফা আপনি বাঁচিয়াছেন। না হইলে আপনার গায়ে আজ আপনাকে আগুন দিতে হইত। আজ আবার যদি যুদ্ধে যেতে হয় নতুন করিয়া অস্ত্র বল্লম উঁচাইয়া ধরিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িতে হয় তাহা হইলে যেমন সুলতানের ছবির কাছে ফিরিয়া আসিতে হইবে, তেমনি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশা হইতে যদি বেরিয়ে আসিতে হয়, তাহা হইলে সংকট দূর করিবার জন্য বাংলা ভাষায় নতুন করিয়া আহমদ ছফার কাছ হইতেই সবক লইতে হইবে। য়গেলেন। কেহ কি ইহা বিবেচনায় আনিবে না।

‘ঘর করলাম না, সংসার করলাম না’ যে গান আহমদ ছফা পরিণত বয়সে আসিয়া বাঁধিয়াছিলেন তাহার তাৎপর্যটি কয়জন বুঝিবার পারিয়াছে। না পারে নাই। একজন মানুষের জীবনে ঘর করিবার সংসার করিবার বড়বেশি অভিলাষ থাকিবার পরেও ঘর করিল না সংসার করিল না বিষয়টি নানাজন নানা মুনি নানা রকম ব্যাখ্যা দিয়াছেন, দেখিয়াছি। কিন্তু হালে তা পানি পাইবে না।

কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আহমদ ছফা রাষ্ট্রসভা আয়োজিত বক্তৃতামালায় বলিয়াছিলাম শুধু তাই নয় সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকজনদের মাঝে বহুবার বলিয়াছি। আহমদ ছফা সারাজীবন জাতির সংকট লইয়া লড়াই করিয়াছেন। সে লড়াই কখনো কোন ব্যক্তি, কখনো সমাজ, কখনো রাষ্ট্রীয় দানবশক্তি নতুবা উদাক্ষী মিনার বাসী বিদ্বজ্জন যাহারা সবকিছু বুঝিয়া মুখ ফিরাইয়া সাদা হাতির কোটরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। আহা আহা শাশ্বত সমাজের ধুরন্ধর প্রতিবেশীগণ। ঠিক সময়ে আপনাদের আহমদ ছফা চিনিয়া ছিলেন। না হইলে দুটি লাইনে কি করিয়া জাতিকে সবক দিলেন। যাহোক আহমদ ছফা রচনা যতবারই পড়িয়াছি শুধু ভাবিয়াছি সারা জীবন একটি লেখাই লিখিয়াছেন। তাঁহার রচনার মধ্যে একটি সুরই বাঁশরিতে বাজিতেছে। কি কবিতা, কি গল্প, কি চিন্তাস্ফলক। রচনা, কি উপন্যাস, কি গান, এমনকি বক্তৃতামালা আর কি মুখরচনা আর তা হইল জাতির বিষয় লইয়া।

যদিও অনেকেই বলিয়া থাকেন তিনি গোছানো মানুষ ছিলেন না, সারা জাতি যখন আগাছালো রহিয়া গিয়াছে, জাতির উদ্বোধনে যিনি আউলা ঝাউলা সুতাগুলি সুন্দর নাটাইয়ে বদ্ধ করিবার জন্য সারাজীবন কাটাইয়া দিয়াছেন, তিনি কি করিয়া জাতিকে পিছ দিবেন। তিনি একটি পরিপাটি সবুজ জমিনে দাঁড়াইয়া ঘুড়ি উড়াইবেন বলিয়া, বিহঙ্গ পুরাণের মত সুনীল আকাশ পর্যটন করিবেন বলিয়া সারাজীবন অত্যাচারীতের মুখে ভাষা দিয়াছেন। আজ হইতে তিন যুগ আগে জাতির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ে বসিয়া জাতির রক্ত চুষিয়া গুপ্তচরবৃত্তি করিতেছে শুধু তাহাই নয় গুপ্ত হত্যায় লিপ্ত হইয়াছে তাহা চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন। আজ যখনই জাতির ভবিষ্যৎ কি হইবে ভাবি তখনই দেখি কি করিয়া এতদিন আগে টের পাইয়াছিলেন। অতি তুলনা হইবে না শুধু বলিব আহমদ ছফা সারাজীবন এ জাতির জেগে উঠার জন্য ত্যাগ করিয়াছেন যেমন গৌতম বুদ্ধ মানুষের মুক্তির জন্য সংসার ত্যাগ করিয়াছিলেন। একজন মানুষের মানুষের বাসনা থাকে কামনা থাকে, সাধ আহ্লাদ, অভিলাষ থাকে কিন্তু ত্যাগ করিবার সাধনা কি সবার থাকে। সবকিছু ছাড়িয়া ঋষি যেমন কৈলাস যায়, নবীজি যেমন হেরা গুহায় গিয়াছিলেন, যিশু যেমন জেরুজালেমের পথে পথে ঘুরিয়াছেন, তেমনি কি যেসকল বিদ্ধানেরা স্বজাতির আশ্বির্বাদ  পাইয়াছেন তাহারা এতটুকু শ্রম ব্যয় করিতে পারেন না?

না, পারেন না। আহমদ ছফা পারিয়াছিলেন। আহমদ ছফার কি লোভ ছিল না? হলফ করিয়া বলিব না যে, ছিল না। যিনি সুলতানের উপর লিখিয়াছেন তিনি তো সুলতানের ছবি লইয়া ব্যবসা করিতে পারিতেন।

আহমদ ছফার খেয়াল তাহা ছিল বলিতে পারি না। তিনি সুফি ছিলেন না, সাধক ছিলেন না কিংবা হিমালয় ফেরৎ মুনী ছিলেন না। তাহলে কি ছিলেন? তিনি একজন মানুষ ছিলেন। যে মানুষ সবকিছু বুঝিতে পারে বিচলিত হইতে পারে। কখনো কখনো সোচ্চার হইতে পারে। কখনো কখনো বিলাপ করিতে পারে। তিনি কি করিয়া বুদ্ধিজীবীর মত, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মত, বেশ্যাবাড়ীর দালালদের মত জাতির বিরুদ্ধে চরৈবাতি খেলিবেন। তিনি জীবন দিয়া রুখিয়া দিয়াছেন। যাহারা আহমদ ছফাকে চিনিতেন তাহারা জানিতেন তিনি কাঁদিতে পারিতেন। তাঁহার সাথে যাহারা সাহিত্য করিতে আসিয়াছিলেন তাহারা সারা জীবনব্যাপী ভান করিয়া গেছেন। কখনো যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িবার, কখনো অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়াইবার, কখনো সংগ্রামে শামিল হইবার। আদপে তাহারা কিছু করেন নাই। তাহারা কাঁদিবেন কি করিয়া। কাটা ফুটিলে শিশু যেমন ব্যথায় ককিয়ে উঠে আহমদ ছফা শিশুর উপলব্ধিতে জাতির কান্না কাঁদিয়াছেন। কিন্তু আহমদ ছফার লড়াই শিশুর মত ছিল না।

শুধু একটি নমুনা হাজির করিব। প্রতিটি রচনার পিছনে কোন না কোন উপলব্ধি বা পরিপ্রেক্ষিত জারি থাকে। বাঙালী মুসলমানের মন রচনা লিখিবার পেছনের কাহিনী নিছক কোন সাদা চোখের ব্যাপার ছিল না। বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে খুবই প্রণিধানযোগ্য মনীষী আবুল ফজল যিনি সারা জীবন বাংলা সাহিত্য সাধনায় সন্নিহিত জীবন কাটাইয়া দিয়াছিলেন তিনি করিয়া ছাউনি ফেরৎ এমজি তাওয়াবের সাথে তবলীগ জামাত বাহির হইয়াছিলেন যেখানে জড় বুদ্ধির আড়ষ্ঠতা ভাঙ্গিবার জন্য আবুল হোসেন, আবদুল ওদুদদের সাথে মিলিয়া বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন করিয়াছিলেন। আহমদ ছফা ভাবিয়াছেন বাঙালী মুসলমান সমাজের এ জাতীয় পরিনতি কেন হইবে? ওঙ্কার কিংবা অলাতচক্র উপন্যাসের প্রেক্ষিত কি বলিতে হইবে। আসলে আহমদ ছফা সারাজীবন কি চাহিয়াছেন? তাহা বুঝবার জন্য তাহার জীবন ব্যাপীয়া যেসব লেখা লিখিয়া গেছেন তাহা জাতীয় জীবনের সাথে মিলাইয়া লইলে হইবে। আর তা হইল ‘বুদ্ধিবৃত্তির ভণ্ডামীর সকল মুখোশ’ ছিড়িয়া ফেলিয়াছেন। না হইলে ‘সুলতানের’ বাংলাদেশের শিল্প জগতে ফেরা হইত না।

পুরো পাকিস্তান আমল এমনকি কি বাংলাদেশেও আশির দশকের পুরো সময় জুড়ে সুলতান উপেক্ষিত ছিলেন। কিন্তু আহমদ ছফা জাত কলমি বলিয়া কথা রহিয়াছে। তারেক মাসুদ আদমসুরত বানাইলেন। হাসনাত আব্দুল হাই ‘সুলতান’ উপন্যাস লিখিলেন আর কবীর চৌধুরী ইংরেজী অনুবাদ করিলেন। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী জমানায় এত বড় মোড় ফেরার ঘটনা খুবই কম আছে। আহমদ ছফা মাইকেল এঞ্জেলোর মত প্রতিভাবান একজন শিল্পী মুসলমান সমাজে জন্মিয়াছেন চিনাইলেন। এতবড় কর্ম্ম করিতে নিজে শিল্প পাঠ নেন নাই শুধু ছবি আঁকা পর্যন্ত শিখিয়াছিলেন। রঙের ধারণা বুঝিবার জন্য টুথপেস্ট পর্যন্ত ব্যবহার করিয়াছেন। যেখানে সুলতান পাতা গুলিয়া রঙবানাইতেন তাহা তাঁদের মধ্যে বেলকুচি সফরে খুঁজিয়া পাইয়াছি। আর ছফা শিল্পকলার আধুনিকতা বুঝিবার জন্য টুথপেস্ট কি মাত্রা তৈরীকার পরীক্ষা করিয়া দেখিয়াছেন। আর অন্যরা জীবন বিপন্ন করিয়া ধান ফলান নাই। কুড়ার রঙকে ধানের রঙ বলিয়া চালাইয়া দিয়াছেন। আজও দেখি কি সাহিত্য কি শিল্প জগতে লোক সাহিত্য কি সীমাহীন নির্মম উপেক্ষার শিকার। বাংলার আনাচে কানাচে ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা লোকসাহিত্য লোক কবি কি নিগ্রহের মধ্যে দিন কাটাইতেছে। আজ আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নাই। দীনেশচন্দ্র সেন কোথায় পাইব? ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ সম্পর্কে কিছু বলিব না। শুধুই বলিব জাতির ভাবসম্পদ আর সংস্কৃতির সমৃদ্ধি পরতে পরতে ছড়াইয়া আছে। আজ যদি তা সংগ্রহ করিয়া রাখে জাতীয় ছবি আগামী দিন কেহ আঁকিতে পারিবে। জাতির গৌরব বড় হইয়া প্রকাশ পাইবে। আহমদ ছফা তাহা ঠিকই উপলব্দি করিয়াছিলেন। তাঁহার লেখায় চিঠিতে  আব্দুল গফুর আলী, রমেশশীল প্রমুখের কথা বলিয়াছেন। আজ শুধু জাতির রাজনৈতিক হাল অবস্থা নিয়া আহমদ ছফার উপলব্দি লইয়া কলম থামাইব।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলি লইয়া বুদ্ধিজীবীদের রহস্যজনক কর্মকাণ্ড দেখিয়া সতর্ক হইতে হইবে। আজ বোধ হয় পাঠক বিস্মৃত হইবেন না ‘আওয়ামী লীগ হারলে পুরো জাতি হারে আর আওয়ামী লীগ জিতলে দল জিতে’; এত নির্মোহ উপলব্দি কি করিয়া বিসর্জন দিব। যদিও দশমীর দিন আমাদের খুব কাঁদাইয়া বাপের বাড়ি ছাড়িয়া দূর্গা কৈলাসে ফিরিয়া গেছেন। আর আমাদের দেশের বিদ্ধানেরা জাতিকে সঙ্কটে ফেলিয়া শীতকাল আসিবার আগে চাদর টানিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন।

আহমদ ছফা আপনি বাঁচিয়াছেন। না হইলে আপনার গায়ে আজ আপনাকে আগুন দিতে হইত। আজ আবার যদি যুদ্ধে যেতে হয় নতুন করিয়া অস্ত্র বল্লম উঁচাইয়া ধরিয়া যুদ্ধে ঝাঁপাইয়া পড়িতে হয় তাহা হইলে যেমন সুলতানের ছবির কাছে ফিরিয়া আসিতে হইবে, তেমনি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যদশা হইতে যদি বেরিয়ে আসিতে হয়, তাহা হইলে সংকট দূর করিবার জন্য বাংলা ভাষায় নতুন করিয়া আহমদ ছফার কাছ হইতেই সবক লইতে হইবে।

দক্ষিণ ভিয়েতনামে সীমিতযুদ্ধের অতিগুরুত্বপূর্ণ এই দশায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীর দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে–ভো নগুয়েন গিয়াপ

হো চি মিন সরবরাহ পথে সৈনিকদের সাথে আলাপরত গিয়াপ

হো চি মিন সরবরাহ পথে সৈনিকদের সাথে আলাপরত গিয়াপ

ভো নগুয়েন গিয়াপ মারা গিয়েছেন। আমরা তাঁকে দেখি নাই, তিনিও বাংলাদেশের খবর নিতে পারেন নাই। তবু, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষা ধার করে বলি, তিনি আমাদের আত্মীয় ছিলেন বললে ভুল হয় না। তিনি তিরিশ বছর ব্যাপী ভিয়েতনামের স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতীয় রণনায়ক ছিলেন। তাঁর প্রশস্তিকীর্তন বেদরকারি। সামনের সর্বজন সংখ্যায় তাঁর সহিত পাঠকের পরিচয় গভীর করার বাসনা রাখি। আপাতত সাম্রাজ্যবাদের যুগে জাতীয় মুক্তির যুদ্ধের পথ নিয়ে গিয়াপের চিন্তাসমুদ্র থেকে একঘটি পাঠকসমীপে নিবেদন করা গেল। এই রচনা ১৯৬৭-৬৮ সাল নাগাদ রচিত হয়ে থাকবে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্বের পর থেকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্বে শক্তির মাপকাঠিতে গোটা সাম্রাজ্যবাদী শিবির ও তাদের নিজ দুর্বলতা টের পেয়েছে। চীন, কোরিয়া, ইন্দোচীন ও কিউবায় পরাজয়ে তাদের এই উপলব্ধি আরও গাঢ় হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিকাশ, টগবগে উদীয়মান জাতীয় মুক্তির আন্দোলন এবং দুনিয়াজোড়া বিপ্লবী আন্দোলনের মুখে মার্কিনদের নেতৃত্বাধীন সাম্রজ্যবাদী শিবির পিছু হটে হাত গুটিয়ে একটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গি নিতে বাধ্য হয়েছে।

অগত্যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ‘চরম প্রতিঘাত’ (সধংংরাব ৎবঃধষরধঃরড়হ) কৌশল ছেড়ে নমনীয় ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’ কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা মনে করে, পারমানবিক যুদ্ধ যেহেতু তারা করতে পারছে না, এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে না থাকতে চাইলে একমাত্র রাস্তা হচ্ছে এই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা কৌশল। যাতে তারা তিন প্রকার যুদ্ধের কথা রেখেছে — বিশেষ যুদ্ধ, সীমিত যুদ্ধ ও সমগ্র যুদ্ধ। তারা ভাবছে তাদের আক্রমণাত্মক নীতি কাজে লাগাতে এই কৌশলের জুড়ি নেই। আর বিশ্বজুড়ে ঢেউ তোলা জাতীয় মুক্তির আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক চৌকিদার হিসেবে সামাল দিতে এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আক্রমণ থামাতে এই রাস্তাই মোক্ষম। তারা বলে বিশেষ যুদ্ধ আর সীমিত/ স্থানীয় যুদ্ধ হল সেই তলোয়ার যা দিয়ে তারা জাতীয় আন্দোলনকে কেটে খানখান করতে পারে — যাতে এরপর নির্বিঘেœ তারা বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

আমাদের দেশের দক্ষিণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা বিশেষ যুদ্ধ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। বেগতিক দেখে রক্ষা স্বরূপ তাড়াহুড়া করে তারা সীমিত যুদ্ধের দিকে গেল। তাদের এই কাণ্ডে শুধু তাদের ব্যর্থতাই প্রকট হয়নি, তাদের গোঁয়ার্তুমি, হিংস্্র ও জঙ্গি চেহারাটাও উদোম হয়ে গেছে।

তো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই সীমিত যুদ্ধের কৌশলটা কেমন? তাদের বুঝমতে সীমিত যুদ্ধ হল তিন প্রকার আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অন্যতম। এই যুদ্ধ মার্কিনদের কাছে সত্যিকার যুদ্ধই বটে, তবে তার আকার ও ব্যাপ্তি হবে সীমিত। বিশেষ যুদ্ধের সাথে তফাতটা হল বিশেষ যুদ্ধে মূলত লড়াইটা করে স্থানীয় দালাল সেনাবাহিনী আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সীমিত যুদ্ধে খোদ মার্কিন সৈনিকরাই লড়ে থাকে।

অবশ্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই আগাগোড়া আক্রমণাত্মক নীতির লক্ষ্য যেহেতু নব্য-উপনিবেশ কায়েম করা, তাই জাতীয় মুক্তির আন্দোলন দমন করতে তারা যখন সীমিত যুদ্ধ করে, তখন মার্কিন সৈনিকের পাশাপাশি স্থানীয় সৈনিক ও পুতুল সরকারও তাদের পাশেপাশে লড়াইয়ে হাজির থাকে। এই পুতুল সৈনিক ও কর্তৃপক্ষ তাদের মতে একটা দরকারি ঢাল বিশেষ।

কথিত নব্য-উপনিবেশবাদী নীতির অধীনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই সীমিত যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে পুতুল সৈনিক ও সরকারকে মজবুত রূপে প্রতিষ্ঠা করা এবং নব্য-উপনিবেশী ব্যবস্থার কেজো হাতিয়ার হিসাবে তাদের আকার দেওয়া। আর সামরিক লক্ষ্যটা মূলত শত্রুর সামরিক শক্তিকে নির্মূল করা। এই কৌশলের মূল দর্শন হচ্ছে শীঘ্রই আক্রমণের দ্বারা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় যুদ্ধটা মিটিয়ে ফেলা।…

সীমিত যুদ্ধে মার্কিন সৈনিক সংখ্যা সীমিত রাখা হয়, অর্থাৎ গোটা মার্কিন পদাতিক, বিমান ও নৌবাহিনীর একটা অংশ মাত্র ব্যবহার করা হয়। সীমিত যুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা স্বীয় শক্তির প্রয়োগ সীমার মধ্যে রাখে, নচেৎ তাদের বৈশ্বিক কৌশলে গোল বাঁধতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমার মধ্যে না রাখলে খোদ মার্কিন দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারা ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। ফলে যুদ্ধ তারা করবে বটে কিন্তু তাদের গোটা শক্তিসামর্থ তারা কাজে লাগাবে না, আবার মার্কিন দেশে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও দিব্যি চালিয়ে যেতে পারবে। এই সীমা তারা এই বুঝ থেকেই আরোপ করে যে এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার যে কোন জাতীয় মুক্তির আন্দোলন দমনে সীমিত সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সীমিত যুদ্ধ করেই তারা নিশ্চিত জয়ী হতে পারবে।

মার্কিন সৈন্য সংখ্যা সীমিত রাখতে হয় বিধায় সাম্রাজ্যবাদীরা বিকল্পস্বরূপ স্থানীয় দালাল বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির উপর বিশেষ মনোযোগ দেয়। তারা ভাবে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় মার্কিন সৈনিকের একটি সীমিত বাহিনী এবং পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত স্থানীয় দালাল সেনাবাহিনী নিয়ে যে কোন পশ্চাৎপদ বা নতুন বিকশিত অর্থনীতির দেশে স্থানীয় আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করতে পারবে এবং প্রতিপক্ষকে স্রেফ সামরিক বল ও গোলাগুলির জোরে ঘায়েল করতে পারবে আর, বিজয়টা তারা অর্জন করে ফেলবে অল্প সময়ের মধ্যেই। তাদের কৌশলগত লক্ষ্য সীমিত, অর্থাৎ যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে সীমিত; আর সামরিক দিক দিয়ে কৌশলগত উদ্দেশ্য সীমিত মানে হল: শক্তি সংহত করে দ্রুত প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তি বিশেষ করে নিয়মিত বাহিনীকে ধ্বংস করা। এটা করা তাদের জন্য জরুরী যাতে বিভিন্ন লক্ষ্য অভিমুখে তাদের সৈনিকদের ছড়িয়ে দেওয়ার বিপদজনক অবস্থায় পড়তে না হয় এবং যুদ্ধটা তাড়াতাড়ি শেষ করে অভিষ্ট অর্জন করতে পারে।

তারা মনে করে প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড হল তার সশস্ত্র বাহিনী; এই বাহিনীকে হারাতে পারলেই তাদের যুদ্ধ হয়ে গেল, আর না পারলে যুদ্ধ চলবে দীর্ঘ দিন ধরে, তখন তারা হেরে যাবে।

জিততে তাদের হবেই, তবেই তারা যুদ্ধোত্তর অনুকূল পরিস্থিতিতে কার্যসম্পাদনের ভার স্থানীয় দালাল বাহিনীকে দিয়ে দিতে পারবে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা স্বদেশি সৈনিকদের শীঘ্র ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারবে আবার নব্য-উপনিবেশবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বহাল রাখতে পারবে।

যুদ্ধের ব্যাপ্তি সীমিত রাখার মানে যুদ্ধকে একটা বিশেষ দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে রাখা, যাতে অন্য জাতি বা অঞ্চলে তার ধাক্কা না ছড়ায়। বিশেষ যুদ্ধের ব্যাপ্তি সীমিত রাখতে না পারলে বড় দেশগুলো এতে জড়িয়ে পড়তে পারে, তখন সাম্রাজ্যবাদীদের রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যেতে হতে পারে এমন কি পরাজয়ও হতে পারে।  তারা যে নতুন একটা বিশ্বযুদ্ধের জন্য এখনও প্রস্তুত নয় সেই হিসাবটা তাদের ভালই জানা আছে।

নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা সীমিত যুদ্ধকে একটা বিশেষ দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে আটকে রাখতে পারে বটে। কিন্তু ব্যাপ্তি যাই হোক, তাদের উদ্দেশ্য ঐ একটাই: যথাশীঘ্র বিপ্লবী শক্তি নির্মূল করা এবং নব্য-উপনিবেশ কায়েম।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সীমিত যুদ্ধ কৌশল নিয়ে উপরের কথাবার্তাগুলো মাথায় রেখে আমরা লক্ষ্য করতে পারি যে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চলমান সীমিত যুদ্ধ ইতিমধ্যে তার আদি সীমা ছাড়িয়ে গেছে — অন্তত ব্যাপ্তির দিক থেকে। সীমিত যুদ্ধে যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর তিন থেকে ছয় বিভাগ/ডিভিশন সেনা চালু করার কথা, সেখানে দক্ষিণ ভিয়েমনামে এরইমধ্যে এগার ডিভিশন মার্কিন ও দালাল বাহিনী মোতায়েন (যার মধ্যে মার্কিন ডিভিশন নয়টি আর দক্ষিণ কোরীয় দুইটি)।

দক্ষিণের রণক্ষেত্রে মার্কিন সেনার কৌশলগত লক্ষ্য কেবল মুক্তিবাহিনীর (খঅঋ) নির্মূলকরণ নয়, শান্তি স্থাপনের দায়ও তারা নিয়েছে। প্রথম কথা, যুদ্ধের ব্যপ্তির দিক থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে যুদ্ধ সীমিত রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। তারা তাদের বিমান ও নৌবাহিনী নিয়ে উত্তর ভিয়েতনামের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, লাও রাজ্যে দিনকে দিন জোরালো হস্তক্ষেপ করছে আর কম্বোডিয় রাজ্যকে নির্লজ্জভাবে উস্কানি দিয়ে চলেছে; মোটের উপর, দক্ষিণ ভিয়েতনামে তাদের বিপন্নদশা থেকে রেহাই পেতে তারা গোটা ইন্দোচীন উপদ্বীপে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার মতলব আঁটছে।

দক্ষিণের সীমিত যুদ্ধ কৌশল গ্রহণে তাদের পেয়েছে। চীন, কোরিয়া, ইন্দোচীন ও কিউবায় পরাজয়ে তাদের এই উপলব্ধি আরও গাঢ় হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিকাশ, টগবগে উদীয়মান জাতীয় মুক্তির আন্দোলন এবং দুনিয়াজোড়া বিপ্লবী আন্দোলনের মুখে মার্কিনদের নেতৃত্বাধীন সাম্রজ্যবাদী শিবির পিছু হটে হাত গুটিয়ে একটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গি নিতে বাধ্য হয়েছে।

অগত্যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ‘চরম প্রতিঘাত’ (massive retaliation) কৌশল ছেড়ে নমনীয় ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’ কৌশল গ্রহণ করেছে। তারা মনে করে, পারমানবিক যুদ্ধ যেহেতু তারা করতে পারছে না, এখন নিষ্ক্রিয় হয়ে না থাকতে চাইলে একমাত্র রাস্তা হচ্ছে এই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা কৌশল। যাতে তারা তিন প্রকার যুদ্ধের কথা রেখেছে — বিশেষ যুদ্ধ, সীমিত যুদ্ধ ও সমগ্র যুদ্ধ। তারা ভাবছে তাদের আক্রমণাত্মক নীতি কাজে লাগাতে এই কৌশলের জুড়ি নেই। আর বিশ্বজুড়ে ঢেউ তোলা জাতীয় মুক্তির আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক চৌকিদার হিসেবে সামাল দিতে এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আক্রমণ থামাতে এই রাস্তাই মোক্ষম। তারা বলে বিশেষ যুদ্ধ আর সীমিত/ স্থানীয় যুদ্ধ হল সেই তলোয়ার যা দিয়ে তারা জাতীয় আন্দোলনকে কেটে খানখান করতে পারে — যাতে এরপর নির্বিঘ্নে তারা বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

আমাদের দেশের দক্ষিণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা বিশেষ যুদ্ধ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। বেগতিক দেখে রক্ষা স্বরূপ তাড়াহুড়া করে তারা সীমিত যুদ্ধের দিকে গেল। তাদের এই কাণ্ডে শুধু তাদের ব্যর্থতাই প্রকট হয়নি, তাদের গোঁয়ার্তুমি, হিংস্্র ও জঙ্গি চেহারাটাও উদোম হয়ে গেছে।

তো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই সীমিত যুদ্ধের কৌশলটা কেমন? তাদের বুঝমতে সীমিত যুদ্ধ হল তিন প্রকার আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অন্যতম। এই যুদ্ধ মার্কিনদের কাছে সত্যিকার যুদ্ধই বটে, তবে তার আকার ও ব্যাপ্তি হবে সীমিত। বিশেষ যুদ্ধের সাথে তফাতটা হল বিশেষ যুদ্ধে মূলত লড়াইটা করে স্থানীয় দালাল সেনাবাহিনী আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী সীমিত যুদ্ধে খোদ মার্কিন সৈনিকরাই লড়ে থাকে।

অবশ্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই আগাগোড়া আক্রমণাত্মক নীতির লক্ষ্য যেহেতু নব্য-উপনিবেশ কায়েম করা, তাই জাতীয় মুক্তির আন্দোলন দমন করতে তারা যখন সীমিত যুদ্ধ করে, তখন মার্কিন সৈনিকের পাশাপাশি স্থানীয় সৈনিক ও পুতুল সরকারও তাদের পাশেপাশে লড়াইয়ে হাজির থাকে। এই পুতুল সৈনিক ও কর্তৃপক্ষ তাদের মতে একটা দরকারি ঢাল বিশেষ।

কথিত নব্য-উপনিবেশবাদী নীতির অধীনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের এই সীমিত যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে পুতুল সৈনিক ও সরকারকে মজবুত রূপে প্রতিষ্ঠা করা এবং নব্য-উপনিবেশী ব্যবস্থার কেজো হাতিয়ার হিসাবে তাদের আকার দেওয়া। আর সামরিক লক্ষ্যটা মূলত শত্রুর সামরিক শক্তিকে নির্মূল করা। এই কৌশলের মূল দর্শন হচ্ছে শীঘ্রই আক্রমণের দ্বারা যত তাড়াতাড়ি পারা যায় যুদ্ধটা মিটিয়ে ফেলা।…

সীমিত যুদ্ধে মার্কিন সৈনিক সংখ্যা সীমিত রাখা হয়, অর্থাৎ গোটা মার্কিন পদাতিক, বিমান ও নৌবাহিনীর একটা অংশ মাত্র ব্যবহার করা হয়। সীমিত যুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা স্বীয় শক্তির প্রয়োগ সীমার মধ্যে রাখে, নচেৎ তাদের বৈশ্বিক কৌশলে গোল বাঁধতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সীমার মধ্যে না রাখলে খোদ মার্কিন দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনধারা ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। ফলে যুদ্ধ তারা করবে বটে কিন্তু তাদের গোটা শক্তিসামর্থ তারা কাজে লাগাবে না, আবার মার্কিন দেশে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডও দিব্যি চালিয়ে যেতে পারবে। এই সীমা তারা এই বুঝ থেকেই আরোপ করে যে এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার যে কোন জাতীয় মুক্তির আন্দোলন দমনে সীমিত সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সীমিত যুদ্ধ করেই তারা নিশ্চিত জয়ী হতে পারবে।

মার্কিন সৈন্য সংখ্যা সীমিত রাখতে হয় বিধায় সাম্রাজ্যবাদীরা বিকল্পস্বরূপ স্থানীয় দালাল বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির উপর বিশেষ মনোযোগ দেয়। তারা ভাবে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় মার্কিন সৈনিকের একটি সীমিত বাহিনী এবং পাশাপাশি আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত স্থানীয় দালাল সেনাবাহিনী নিয়ে যে কোন পশ্চাৎপদ বা নতুন বিকশিত অর্থনীতির দেশে স্থানীয় আক্রমণাত্মক যুদ্ধ করতে পারবে এবং প্রতিপক্ষকে স্রেফ সামরিক বল ও গোলাগুলির জোরে ঘায়েল করতে পারবে আর, বিজয়টা তারা অর্জন করে ফেলবে অল্প সময়ের মধ্যেই। তাদের কৌশলগত লক্ষ্য সীমিত, অর্থাৎ যুদ্ধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে সীমিত; আর সামরিক দিক দিয়ে কৌশলগত উদ্দেশ্য সীমিত মানে হল: শক্তি সংহত করে দ্রুত প্রতিপক্ষের সামরিক শক্তি বিশেষ করে নিয়মিত বাহিনীকে ধ্বংস করা। এটা করা তাদের জন্য জরুরী যাতে বিভিন্ন লক্ষ্য অভিমুখে তাদের সৈনিকদের ছড়িয়ে দেওয়ার বিপদজনক অবস্থায় পড়তে না হয় এবং যুদ্ধটা তাড়াতাড়ি শেষ করে অভিষ্ট অর্জন করতে পারে।

তারা মনে করে প্রতিপক্ষের মেরুদণ্ড হল তার সশস্ত্র বাহিনী; এই বাহিনীকে হারাতে পারলেই তাদের যুদ্ধ হয়ে গেল, আর না পারলে যুদ্ধ চলবে দীর্ঘ দিন ধরে, তখন তারা হেরে যাবে।

জিততে তাদের হবেই, তবেই তারা যুদ্ধোত্তর অনুকূল পরিস্থিতিতে কার্যসম্পাদনের ভার স্থানীয় দালাল বাহিনীকে দিয়ে দিতে পারবে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদীরা স্বদেশি সৈনিকদের শীঘ্র ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারবে আবার নব্য-উপনিবেশবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাও বহাল রাখতে পারবে।

যুদ্ধের ব্যাপ্তি সীমিত রাখার মানে যুদ্ধকে একটা বিশেষ দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে রাখা, যাতে অন্য জাতি বা অঞ্চলে তার ধাক্কা না ছড়ায়। বিশেষ যুদ্ধের ব্যাপ্তি সীমিত রাখতে না পারলে বড় দেশগুলো এতে জড়িয়ে পড়তে পারে, তখন সাম্রাজ্যবাদীদের রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যেতে হতে পারে এমন কি পরাজয়ও হতে পারে।  তারা যে নতুন একটা বিশ্বযুদ্ধের জন্য এখনও প্রস্তুত নয় সেই হিসাবটা তাদের ভালই জানা আছে।

নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা সীমিত যুদ্ধকে একটা বিশেষ দেশ বা অঞ্চলের মধ্যে আটকে রাখতে পারে বটে। কিন্তু ব্যাপ্তি যাই হোক, তাদের উদ্দেশ্য ঐ একটাই: যথাশীঘ্র বিপ্লবী শক্তি নির্মূল করা এবং নব্য-উপনিবেশ কায়েম।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সীমিত যুদ্ধ কৌশল নিয়ে উপরের কথাবার্তাগুলো মাথায় রেখে আমরা লক্ষ্য করতে পারি যে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের চলমান সীমিত যুদ্ধ ইতিমধ্যে তার আদি সীমা ছাড়িয়ে গেছে — অন্তত ব্যাপ্তির দিক থেকে। সীমিত যুদ্ধে যেখানে মার্কিন সেনাবাহিনীর তিন থেকে ছয় বিভাগ/ডিভিশন সেনা চালু করার কথা, সেখানে দক্ষিণ ভিয়েমনামে এরইমধ্যে এগার ডিভিশন মার্কিন ও দালাল বাহিনী মোতায়েন (যার মধ্যে মার্কিন ডিভিশন নয়টি আর দক্ষিণ কোরীয় দুইটি)।

দক্ষিণের রণক্ষেত্রে মার্কিন সেনার কৌশলগত লক্ষ্য কেবল মুক্তিবাহিনীর (LAF) নির্মূলকরণ নয়, শান্তি স্থাপনের দায়ও তারা নিয়েছে। প্রথম কথা, যুদ্ধের ব্যপ্তির দিক থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে যুদ্ধ সীমিত রাখার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। তারা তাদের বিমান ও নৌবাহিনী নিয়ে উত্তর ভিয়েতনামের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে, লাও রাজ্যে দিনকে দিন জোরালো হস্তক্ষেপ করছে আর কম্বোডিয় রাজ্যকে নির্লজ্জভাবে উস্কানি দিয়ে চলেছে; মোটের উপর, দক্ষিণ ভিয়েতনামে তাদের বিপন্নদশা থেকে রেহাই পেতে তারা গোটা ইন্দোচীন উপদ্বীপে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার মতলব আঁটছে।

দক্ষিণের সীমিত যুদ্ধ কৌশল গ্রহণে তাদের লক্ষ্য নব্য-উপনিবেশবাদ বলে লক্ষ লক্ষ মার্কিন সৈনিক মোতায়েনের পরও স্থানীয় পুতুল সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে মজবুত করাকে তারা রাজনৈতিক ও সামরিক দরকার বলে বোধ করছে।

বিশেষ করে এই সীমিত যুদ্ধ কৌশলটা এবং সাধারণভাবে গোটা ‘অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা’র চিন্তাটাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বুর্জোয়া সামরিক চিন্তা থেকে পয়দা হয়েছে। এই বুদ্ধি তারা বের করেছে এমন একটা পরিস্থিতিতে যখন সাম্রাজ্যবাদ দুর্বল, পরাস্ত, রক্ষণাত্মক একটা অবস্থায় চলে যাচ্ছে, যেখানে বিশ্বে শক্তির হিসাবটা তাদের দিকে অনুকূল নয় আর।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের নব্য-উপনিবেশবাদী আগ্রাসী নীতির মতই তাদের সীমিত যুদ্ধে কৌশলও নানা বৈপরীত্য ও একদম গোড়ার কতগুলো অমোচনীয় ঘাটতিতে আকীর্ণ। আসল কথা, এই বৈপরীত্য ও দুর্বলতা যেকোন অনৈতিক আগ্রাসী যুদ্ধে থাকবেই। আমাদের দেশের দক্ষিণাংশে চলমান যুদ্ধটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী যুদ্ধ। এর বিরুদ্ধে জনমনে মার্কিন বিরোধী জাতীয় মুক্তির প্রতিরোধ যত বিকশিত হচ্ছে এই বৈপরীত্য ও দুর্বলতা ততই প্রকট হচ্ছে।

দক্ষিণ ভিয়েতনামে সৈনিক পাঠিয়ে সাম্রাজ্যবাদীরা এমন এক গণযুদ্ধের মুখে পড়ে গেছে যা অনেকটা বিকাশ লাভ করেছে এবং এরই মধ্যে আক্রমণাত্মক অবস্থানে চলে এসেছে।  এই গণযুদ্ধে জনগণের শক্তি সংগঠিত হয়েছে। হানাদারদের সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে তা সমগ্র জনগণকে চালিত করছে। এবং জনগণ সকল পন্থায়, আদিম থেকে আধুনিক যার যা কিছু অস্ত্র আছে তাই নিয়ে ঐক্যবদ্ধ শক্তিরূপে নেমে এসেছে।

এই মহান গণযুদ্ধ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিশেষ যুদ্ধকে ইতিমধ্যেই বীরত্বের সাথে পরাজিত করেছে এবং তা অপ্রতিরোধ্যভাবে বিকশিত হয়ে চলেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যে দিন দক্ষিণে সরাসরি আগ্রাসনে সেনা পাঠিয়েছে সে দিনই তারা পরাজিত হয়েছে, ঘটনাধারায় এটাই প্রমাণিত হয়েছে। তারা তাদের শক্তিকে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। প্রতিটা রণক্ষেত্রে তারা রক্ষণাত্মক অবস্থানে। আর উত্তরে আগ্রসন চালাতে গিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইস্পাত কঠিন প্রাচীরে মাথা ঠুকে মরছে। উত্তরকে রক্ষা করে, দক্ষিণকে মুক্ত করে দেশকে পুনরায় এক করতে উত্তর সেনাবাহিনী ও জনগণ মার্কিন আগ্রাসী ধ্বংসযুদ্ধের বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম শাণিয়ে তুলেছে।

দক্ষিণে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী যুদ্ধ, উত্তরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের এক সদস্য রাষ্ট্রের উপর তাদের বিমান হামলা মার্কিনদের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক শিবির, জাতীয় মুক্তির আন্দোলন এবং বিশ্বের প্রগতিশীল জনতার বিরোধ ঘনিয়ে উঠেছে। মার্কিনিরা ভিয়েতনামে যত আগ্রাসী ভূমিকা নিচ্ছে, সমাজতন্ত্রী দেশগুলো ততই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে এবং ভিয়েতনামী জনগণের দিকে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজতন্ত্রী জাতিসমূহের জন্য জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে সহায় হওয়া এক মহৎ কর্তব্য। দুনিয়ার প্রগতিশীল জনগণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একতাবদ্ধ হয়েছে। খোদ মার্কিন প্রগতিশীল জনগণও প্রতিবাদে মুখর।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা দক্ষিণে সেনা পাঠিয়েছিল পুতুল সেনাবাহিনী ও সরকারের পতন রুখতে এবং পুতুল শক্তিকে মজবুত করতে। অথচ আগ্রাসী যুদ্ধ যতই মার্কিনীকৃত হচ্ছে ততই পুতুল সায়গন সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ভেঙ্গে পড়ছে। মার্কিন আগ্রাসী শক্তি ও দেশবেচা বেইমানদের অপরাধের বোঝা যত ভারী হচ্ছে, দক্ষিণের জনগণ ততই তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণায় ফেটে পড়ছে এবং জাতীয় মুক্তি ফৌজের পতাকা তলে মার্কিন বিরোধী জাতীয় মুক্তির পতাকা তলে চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে লড়াইয়ে শামিল হচ্ছে।

দক্ষিণে মার্কিনিরা যত সেনা বাড়াচ্ছে, লড়াই যত বড় করছে, তত তাদের সীমিত যুদ্ধ কৌশল ও তাদের বৈশ্বিক কৌশলের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে। যত তারা দক্ষিণ ভিয়েতনামে সীমিত যুদ্ধ বড় করছে, তত বিশ্বেও অন্যান্য জায়গায় তাদের অবস্থানে টান পড়ছে। বিশ্বের বিপ্লবী জনতা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে এবং একে একে প্রত্যেক অবস্থান থেকে তারা মার্কিনীদের হটিয়ে দিতে পারে। এমনকি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের মিত্ররাও এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দাঁও মারতে পারে, মূলামূলি করে মার্কিনদের আরও কাহিল করে দিতে পারে। মার্কিনিরা সীমত যুদ্ধ শুরু করেছিল বিশেষযুদ্ধে পরাজয়ের পটভূমিতে, পতনোন্মুখ পুতুল শক্তিকে বাঁচাতে। তবু দিনে দিনে পুতুল শক্তি দুর্বল থেকে শুধু দুর্বলতর হয়েছে।

মার্কিনি অভিযান বাহিনী এসেছিল পুতুল সেনাবাহিনীকে সহায়তা দিতে। কিন্তু মার্কিন ও পুতুল বাহিনীর মধ্যে না আছে পারস্পরিক আস্থা, না সহায়তা বা সমন্বয়। তারা মুখোমুখি ভিয়েতনামী জগনণের গণযুদ্ধের, যে জনগণ রণকৌশল ও কায়দায় উঁচুমাত্রায় সৃজনশীলতা গড়ে তুলেছে।

এই অনৈতিক আগ্রাসী যুদ্ধে মার্কিন অভিযান বাহিনীর সামনে কোন আদর্শ নাই, তাই তাদের মনোবল বা উদ্যমও নিতান্ত অল্প। যত তারা হারছে তত এই ঘাটতিটা বড় হচ্ছে। তাছাড়া যতই তারা সংখ্যা বহুল ও আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হোক, তাদের সমস্যা বহুবিধ: এদেশের ভূমিবিন্যাস, জলবায়ু এবং তাদের নিজেদের সাংগঠনিক বিন্যাস ও প্রশিক্ষণ ভিয়েতনামী রণক্ষেত্রের জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়।

দুবছর আগে প্রথম যখন মার্কিন বাহিনী দক্ষিণে এসেছিল, তারা নিজ বিরাট সামরিক শক্তির সুবিধা নিয়ে সব শক্তি সংহত করে একটা আক্রমণ শাণাতে চেয়েছিল যাতে এক চোটে মুক্তিবাহিনীকে ঘায়েল করা যায় এবং তারাই আগুয়ান থাকে। অথচ প্রায় দশ লক্ষ সৈন্য নিয়েও তারা এই কৌশলের ছক বাস্তবে ফলাতে ব্যর্থ হয়েছে। শক্তিকে সংহত করার বদলে তারা বাধ্য হয়েছে চারদিকে তা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দিতে। ফলে বিরাট মার্কিন বাহিনী ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে গেছে যেগুলোর শক্তি স¦ল্প। তদুপরি, দ্রুত যুদ্ধ মিটিয়ে ফেলার বদলে তাদের কর্মপরিধিতে যোগ হয়েছে নতুন নতুন কাজ। দক্ষিণের গ্রামে ও শহরে জনগণের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মুখে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ মার্কিন ও পুতুল সেনাদের শান্তি স্থাপনের কাজে নিয়োজিত ক্রতে বাধ্য হয়েছে। নিয়মিত বাহিনীর বড় অংশকে শান্তি স্থাপনের নিয়োগ তাদের জন্য কৌশলগত দিক থেকে একটা বিপত্তি। এভাবে আক্রমণের বদলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে একটা রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যেতে হয়েছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনারা তাদের লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পায়নি। তাদের যে আধুনিক পরিদর্শন, সরঞ্জাম নাই তা কিন্তু নয়। বরং ব্যাপার হচ্ছে এই যে, দক্ষিণ ভিয়েতনামের যুদ্ধটা গণযুদ্ধ বলে লক্ষ্যবস্তু বা যুদ্ধক্ষেত্র প্রতিটা জায়গাতেই আছে, আবার কোথাও নাই। দক্ষিণের যুদ্ধে মার্কিনীদের তল্লাশি-ও-খতম অভিযানে সবখানেই দেখা গেছে যে মার্কিন সেনারা প্রতিবারই আচানক ধরা খেয়ে গেছে, মুক্তিবাহিনীর ফাঁদে আটকা পড়ে ধ্বংস হয়েছে।

যতই তারা আক্রমণে যেতে চাক, এভাবে দিনে দিনে তারা রণদক্ষতাও অর্জন করতে পারেনি, কৌশলটাও খাটাতে পারেনি, ফলে রক্ষণাত্মক অবস্থানে যেতে হয়েছে তাদের।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা চেয়েছিল তড়িৎ আক্রমণে শক্র সংহার করতে, অথচ তারা এখন  ফেঁসে গেছে প্রলম্বিত যুদ্ধে। স্রেফ এটাই তাদের একটা পরাজয়। যুদ্ধ যত প্রলম্বিত হবে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনীদের দ্বন্দ্ব সংকট তত প্রকট হবে, তত তারা পরাজয় থেকে আরও বড় পরাজয়ে খাবি খাবে। তেমনি তাদের ভ্রান্ত যুদ্ধকায়দার চিন্তাও পরাজিত হচ্ছে। তাদের লড়াইয়ের কায়দা কেবল গোলাবারুদ অস্ত্রশস্ত্রের শক্তির ভিত্তিতে রচিত। তাই গোলাবারুদ অস্ত্রশস্ত্রের জোর যেখানে খাটে না, সেখানে তাদের কায়দা অকেজো হয়ে পড়ল।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দুনিয়াজোড়া তাদের সেনাবাহিনীর অকল্পনীয় শক্তির গপ্পো দিয়ে সবাইকে — বিশেষত ছোট দুর্বল জাতির জনগণকে কাবু করতে চেয়েছিল। কিন্তু বিধি বাম, হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে গেছে। সত্য ফাঁস হয়েছে যে গণযুদ্ধে মার্কিন হানাদার বাহিনী পরাজিত হচ্ছে, মার্কিন গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে ভিয়েতনামের জনগণ আপন গণশক্তির জোরে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে লড়াই করছে।

 

তর্জমা: মোহাম্মদ হাবিব

 

সূত্র : Vo Nguyen Giap, Big Victory, great task (New York : Pareger, 1968)

সম্পাদকীয়: যুদ্ধ হয় রাজায় রাজায়, নলখাগড়ার প্রাণ যায়

বিগত সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহু ঘটনা ঘটিয়া গেল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে ঘটনা পরম্পরা আরও জটিলতর হইয়া উঠিতেছে। সুবাতাস বহিবার সম্ভাবনা আদৌ দেখা যাইতেছে না। দেশের প্রধান দুই দলের নেত্রীদ্বয়ের ফোনালাপ দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার নতুন কোন মওসুমের আগমন ঘোষণা না করিলেও জনমনে তাহা কিছুটা আশার সঞ্চার করিয়াছে। তবে নেত্রীদ্বয় ঠিক গণতন্ত্রের স্বার্থে আলোচনা করিয়াছেন তাহা বিশ্লেষকরা শতভাগ কবুল না করিলেও এমনকি আন্তর্জাতিক চাপে হইলেও তাহা নতুন ব্যাঞ্জনার তৈয়ার কিছুটা হইলেও করিয়াছে। এখন দেখিবার বিষয় হইল তাহারা কি পরিমাণে গণতান্ত্রিক ছাড় দিয়া আগামীতে আলোচনা করিয়া যান।

কিন্তু গত সপ্তাহের টানা ৬০ ঘন্টার হরতালে সারা দেশে যানমালের যে ক্ষয়ক্ষতি হইয়া গেল তাহা কিন্তু কম নহে। দেশের নানা সংবাদপত্রের হিশাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপির  বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণ শুদ্ধ ১৩ জন লোক এই ৩ দিনে বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত হইয়াছে। আর আহত লোকের সংখ্যার হিশাবও অতি পরিমাণ। হরতাল সমর্থক গোষ্ঠিরা সরকারদলীয় মন্ত্রী, সাংসদ, থানা, বিচারালয়, সংবাদ মাধ্যম অফিসের সামনে ককটেল ও বোমা বিস্ফোরণ করিয়া তাহাদের শক্তি সামর্থ দেখাইয়াছে। সরকারদলীয় সমর্থকরাও পরবর্তীতে কিছুমাত্রায় ঐ একই কাজ করিয়া মাঠে রহিয়াছে। কিন্তু ঘটনা আরও উদ্বেগজনক হইয়াছে যখন আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের বিচারালয়ের সামনে এবং ট্রাবুনালের বিচার ও উকিলের বাসার সামনে ঐ একই কাণ্ড ঘটাইয়াছে। সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়াছে পিরোজপুরের জিয়ানগরে যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বাদী স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে সশস্ত্র হামলা। ঘটনার সময় তিনি কোন রকমে লুকাইয়া অক্ষত থাকিয়াছেন। এই ঘটনায় আগামীতে যুদ্ধাপরাধ সমর্থক গোষ্ঠিরা যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক ধর্মনিরপেক্ষ জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উপর প্রতিশোধ লইবে তাহা নিশ্চিত হইয়া গেল। কিন্তু এই যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠি তাহাতে জনগণ হইতে আরও বিচ্ছিন্ন হইবে এবং তাহারা দৃঢ় প্রতিরোধের সম্মুখিন হইবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।

ইতিমধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাধারণ নির্বাচন ঘনাইয়া আসিয়াছে। শিল্পায়িত উজ্জ্বল গুজরাট ও গুজরাট দাঙ্গার নিন্দিত মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভারতীয় জনতা দলের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নির্বাচিত হইয়াছেন। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দল এখনও তাহাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে নাই। কিন্তু তাহাদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিশাবে রাহুল গান্ধীর নামই বেশি উচ্চারিত হইতেছে। সেই রাহুল গান্ধী এই কয়দিন আগে উত্তর প্রদেশের মুজাফফর নগরে সাম্প্রদায়িক নিহত মুসলমান সম্প্রদায়ের সদস্যদের সহিত পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার পূর্ব সংযোগের দাবি করিয়াছে। যেইখানে তিনি নিজে আগাইয়া এই ক্ষতিগ্রস্থ নিহত লোকদের ও তাহাদের সম্প্রদায়ের সহিত সমবেদনা জানাইয়া তাহাদের নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করিবেন, সেইখানে তিনি এমন এক দাবি করিয়াছেন যাহাতে মনে হইতেছে দাঙ্গায় নিহতদের মৃত্যুর কারণও যেন বৈধ করা হইয়াছে। মনে হইতেছে নির্বাচনে জিতিবার এই দুই দলই সাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈয়ারে ব্যস্ত হইয়াছে।  সাম্প্রদায়িক এই তামাশা এই উপমহাদেশে কল্যাণ আনিতে ব্যর্থ হইয়াছে। ধর্ম নিরপেক্ষ পরিস্থিতি বজায় ও তাহার বিকাশে তাই আর কোন বিকল্প নাই।