Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ২৮

মুক্তিযোদ্ধা: একাত্তর থেকে চুরাশি — কাজী নূর-উজ্জামান

 

স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পরিগঠনে আমাদের জাতীয় জীবনে ১৯৭১ সালের মতন বৃহৎ ঘটনা আর আসে নাই। জনগণ বুকের রক্ত স্বেচ্ছায় চালাইয়া দিয়াছিল একটি শোষণহীন ও ধর্মনিরপেক্ষ দেশ গঠনের কল্পনায়। কারণ দেশবাসীর মনে সদা জাগরুক ছিল হিন্দুত্ববাদী ভারত রাষ্ট্র ও এসলামি পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যন্তরের ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে পদে পদে উপস্থিত থাকা শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস। দুঃখের মধ্যে, ১৯৭১ সালে জনগণের দেখা সেই স্বপ্ন অক্ষুণœ রহিল না। একাত্তরের পরাজিত গোষ্ঠী ছলে বলে কৌশলে জনতার আকক্সক্ষা ছিনাইয়া লইল। কিন্তু শোষণহীন, ধর্মনিরপেক্ষতার আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসেনানীরা কখনো ছাড়েন নাই। তাহারই নিদর্শন মুক্তিযুদ্ধের সময় ৭ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্ণেল কাজী নূর-উজ্জামান লিখিত বর্তমান রচনা

আমরা ১৯৭১ সালে সশস্ত্রভাবে স্বাধীনতার যুদ্ধ করেছি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ধ্যান-ধারণা যাই থাকুক না কেন, বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন ছিল সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্তি এবং সেই মুক্তির লক্ষ্যেই জনসাধারণ স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং স্বীকার করেছেন সীমাহীন আত্মত্যাগ। পাক-ভারত বিভক্তির পরই এই অঞ্চলের জনসাধারণ পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাদীদের ষড়যন্ত্র ও শোষণের হাত থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর সেই আন্দোলন বিভিন্নভাবে দানা বেঁধে ষাটের দশকের শেষের দিকে একটা বিশিষ্ট পর্যায়ে উন্নীত হয়। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে এদেশে যেসব ঘেরাও আন্দোলন সংঘটিত হয় তার মাধ্যমে কৃষক-শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ লক্ষ্য করেন যে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় সম্ভব। বস্তুত ঘেরাও আন্দোলনের সাফল্যই পরবর্তীকালে গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ভিত রচনা করে, যদিও সে আন্দোলন পরে বুর্জোয়া সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে চলে যায়। আওয়ামী লীগের ছয়দফাও ক্রমান¦য়ে পরিবর্তিত হয় এক দফায় — অর্থাৎ স্বাধীনতার দাবিতে।

কাজী নূর-উজ্জামান (২৪ মার্চ ১৯২৫ - ৬ মে ২০১১)

কাজী নূর-উজ্জামান (২৪ মার্চ ১৯২৫ – ৬ মে ২০১১)

সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধে বিজয়ের পর স্বাধীনতার অঙ্গীকার ও লক্ষ্য শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ ব্যর্থ আওয়ামী লীগ শাসকদের হাতে কিভাবে রুদ্ধ ও বিপথগামী হয় একথা আমরা সবাই জানি। আওয়ামী লীগের ব্যর্থতা, দমননীতি, গণবিরোধী ভূমিকা দেশে নতুন করে সামরিক শাসনের পথকে প্রশস্ত করে।

বস্তুত জিয়ার আমল থেকেই দেশে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী রাজনীতির সূচনা ঘটে সংঘটিত আকারে। আজ আমরা অনেকে জিয়ার আমলকে স্থিতিশীল ও সঠিক সময় বলে ভ্রান্তভাবে চিহ্নিত করে থাকি। অথচ জিয়ার আমলে দেশ ও জাতির যে চরম সর্বনাশ ঘটেছে তার তুলনা বিরল এবং আজকে আমরা যে পরিস্থিতির জের বয়ে চলেছি তার সৃষ্টিকর্তা ছিলেন জিয়াউর রহমান।

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদের সম্মুখীন করে গেছেন জিয়াউর রহমান। তাঁর ক্ষমতালিপ্সার হাতিয়ার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর আমলে তাঁরই ছত্রছায়ায় পুনর্গঠিত হয়ে শক্তি সঞ্চয় করেছে। জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরসহ শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে বিনা বিচারে কিংবা বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসি দিয়েছেন। ক্ষমতায় তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলে ঘোষণা করলেও মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের জনগণকে তিনি চরম লাঞ্ছনার মুখে নিক্ষেপ করেছেন। তাঁর আমলেই পাকিস্তানীরা ফিরে পেয়েছে পরিত্যক্ত সম্পত্তি যা তারা বিক্রি করে দিয়ে আবার চলে গেছে পাকিস্তানে। জিয়ার আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন হয়েছে সবচেয়ে কম। মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স করে যে টাকা খরচ করেছেন তা মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোন কাজেই আসেনি; পরন্তু সেই কমপ্লেক্সের কর্তা তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তার ও মন্ত্রী হালিম চৌধুরী কমপ্লেক্সের টাকার সঠিক হিসেব আজও দিতে পারবেন কিনা সন্দেহ।

জিয়া আত্মস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে স্থ’ূল রাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোকে ভেঙ্গে যে কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন তার জের জাতি আজও বইছে এবং আজকের সামরিক সরকার ও ভবিষ্যৎ সামরিক সরকারের জন্য এ অপধারা অনুসরণীয় হয়ে থাকবে। জিয়া নিজে দল গঠন করেছিলেন রাজনৈতিক টাউট, রাজাকার, আলবদর, সুবিধাবাদী ও ক্ষমতালোভীদের নিয়ে এবং অন্য দলকে ভেঙ্গেছেন তাঁর ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার উদ্দেশ্যে। জিয়ার পুরো অবস্থানটাই ছিল ভ্রান্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

জিয়ার আমলেই মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ এদেশে তাদের ভিতকে নবতর রূপে সংগঠিত করে স্বাধীনতার পক্ষের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ পায়। প্রশাসনে পুনরায় মার্কিন সমর্থক আমলারা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বলতে গেলে সা¤্রাজ্যবাদীদের পুনঃশক্তিসঞ্চয়ই এদেশে স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল ও ধর্ম-ব্যবসায়ীদের উত্থানে সাহায্য করে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে  জামাতে ইসলামীর নতুন কর্তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে, ‘একাত্তরে ভুল করিনি’ — বলে ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে সারা জাতির স্বাধীনতার চেতনা ও মর্যাদাকে আঘাত করে।

দেশের অর্থনীতিকে জিয়াউর রহমান দেউলিয়ার পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানী আমলের মডেলে তিনিও দেশে গড়ে তুলেছিলেন ভিত্তিহীন অবাধ লুণ্ঠনের অর্থনীতি।

জিয়ার আমলের প্রথম থেকে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত আওয়ামী লীগসহ কোন দলেরই কার্যকর কোন ভূমিকা ছিল না। জিয়াকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি ছিল না কারোই। জাতীয়ভাবে জিয়াকে প্রথম চ্যালেঞ্জ করেছিল একমাত্র  মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৮১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থনে সারাদেশের বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। উল্লেখ্য তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত দশ দলীয় জোট সন্ত্রাস কায়েম করেও কোন সফল হরতাল পালন করতে পারেনি। এ অবস্থায় দেশের জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন আন্দোলনে শরীক হয়েছেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন পরিচালনা করেছিল সাত দফা ঘোষণার ভিত্তিতে। তাঁদের ঘোষণাগুলো ছিল —

এক.   জামাতে ইসলামী ও তার সমস্ত প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অঙ্গ সংগঠনসমূহকে নিষিদ্ধ  ঘোষণা করা হল। এবং এই সকল সংগঠনের সকল প্রকার তৎপরতা প্রতিহত ও বানচাল করার জন্য জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।

দুই.    জাতির জানি দুশমন গোলাম আজমসহ সকল চিহ্নিত রাজাকার-আলবদর ও স্বাধীনতার শত্রু প্রশাসনের অভ্যন্তরে বা বাইরে যেখানেই অবস্থান করুন না কেন — দেশদ্রোহিতার অপরাধে শাস্তি প্রদান করতে হবে। অন্যথায় তাদেরকে গণআদালতে বিচারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

তিন.   মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা বিনাশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে।

চার.   পরিত্যক্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান, সম্পত্তি ও ব্যবসা স্বনামে বেনামে লেনদেন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে এবং অর্থ ও সম্পত্তি পাচারকারী পাকিস্তানী অনুচরদের শাস্তি প্রদান করতে হবে।

পাঁচ.   প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও জনগণের সম্পত্তি আত্মসাৎকারীদের বরখাস্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। সমাজ থেকে টাউট, ফড়িয়া ও চোরাচালানীদের উচ্ছেদ করতে হবে।

ছয়.    দ্রব্যমূল্যকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য ভ্রান্ত অর্থনৈতিক পলিসিকে পাল্টিয়ে নতুন অর্থনৈতিক পলিসি গ্রহণ করতে হবে।

সাত.  বেরুবাড়ী, দক্ষিণ তালপট্টি (পূর্বাশা) ও গঙ্গার পানির ওপর আমাদের সার্বভৌম অধিকার যে কোন মূল্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বিদেশী আগ্রাসনকে প্রতিহত করার জন্য জনগণকে সামরিক দিক দিয়ে সংগঠিত, সজ্জিত ও প্রস্তুত করে তুলতে হবে।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃত্বে পরিচালিত তৎকালীন আন্দোলনে দেশের সব মুক্তিযোদ্ধা দলীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী পরিহার করে সাত দফার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। আন্দোলনের বিশেষ পর্যায়ে দেশের রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, শ্রমিক ও ছাত্র সমাজ অকুণ্ঠ সমর্থন জানায় যা কোন সংগঠনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা থাকলেই সম্ভব। আন্দোলনের এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৮১ সালের ১৬ই মে সারা দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে। এই হরতালের প্রতিও স্বাধীনতার পক্ষের বিভিন্ন সংগঠন ও জনসাধারণ অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। জিয়াউর রহমান তখন পিছু হটতে বাধ্য হন। এই হরতাল প্রতিহত করার জন্য জিয়া তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ তথা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে করজোড়ে এক মাসের সময় চান। জিয়া তাৎক্ষণিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি পরীক্ষাকরণ ও অন্যান্য বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ন্যাশনাল কমিটি গঠন করেন। এর চেয়ারম্যান করা হয় তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী মেজর জেনারেল মাজেদুল হককে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতৃবৃন্দ তখন হরতাল একমাস পিছিয়ে ১৬ই জুন তারিখ নির্ধারণ করেন। জিয়া তখন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে জামাতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কিভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা যাচাই করে দেখবেন। কিন্তু এর কিছু দিন পরই তিনি নিহত হন। শাসন ক্ষমতায় মুক্তিযোদ্ধা বিদ্বেষী ও স্বাধীনতারবিরোধী পক্ষের প্রাধান্য এরপর আরো বৃদ্ধি পায়।

১৯৮০-৮১ সালে আমরা যে সাত দফা উত্থাপন করেছিলাম তার মূল সুর ছিল সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন। সেই সাত দফা আজ এক দফা অর্থাৎ সমাজ পরিবর্তনের দফায় পরিণত হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যে ২১ দফা উত্থাপন করেছে তার মূল সুরও সমাজ পরিবর্তন, অর্থাৎ ’৭১ সালের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন।

আমরা জানি ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের চরম মুহূর্তেও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি ছিল না। কেউ কেউ অসহযোগ আন্দোলন দিয়ে ট্যাংক-মেশিনগান ঠেকাবার অবাস্তব দম্ভও করেছেন। ২৫শে মার্চ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আঘাত করলে তারা যে যেভাবে পারেন ছিটকে দেশ থেকে বেরিয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এমনকি ভারতে গিয়েও তারা নিরাপদ বোধ করছিলেন না। তারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠনেও রাজী ছিলেন না। এপ্রিল মাসে যে সরকার গঠিত হয়েছিল তা মুক্তিযোদ্ধাদের হুমকীর জন্যই হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন আরো বলেছিল যে, আওয়ামী লীগাররা সরকার গঠন না করলে তারাই সামরিক সরকার গঠন করবেন। প্রগতিশীল বিদেশী সাংবাদিকরাও তখন অন্যান্য দেশের বিপ্লবী অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে আওয়ামী লীগারদের সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন। পরন্তু দেশের মানুষের আর্তনাদ ছিল সরকার গঠনের পক্ষে যা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। এরপর নেতারা সরকার গঠনে বাধ্য হলেও সরকারের নিজেদের নাম ঘোষণায় তারা অনিচ্ছুক ছিলেন এই যুক্তিতে যে এতে বাংলাদেশের ভেতরে তাদের পরিবার পরিজন বা আত্মীয়স্বজন পাকবাহিনীর অত্যাচারের মুখোমুখি হতে পারে। অথচ হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা তাদের পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা মোটেও ভাবেননি। সরকার গঠনের আগে অনেকে কান্নাকাটিও করেছিলেন সেদিন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল চাপে এবং তাজউদ্দীনের পরামর্শে তারা বাধ্য হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত। অথচ স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগারদের হাতেই মুক্তিযোদ্ধারা নিগৃহীত হয়েছে, ফায়দা লুটেছে সেই সব ভীরু নেতা ও চেলা-চামুণ্ডারা। সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধে আওয়ামী লীগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচেষ্টা একাত্ম ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল দলমত নির্বিশেষে।

স্বাধীনতার অঙ্গীকার বাস্তাবায়নে বা মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত অধ্যায় সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ১৯৮১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের সাত দফার আন্দোলনের মাধ্যমে যে ধারার সূচনা করেছিলেন ১৯৮৪ সালে এসে তা এক দফায় পরিণত হয়েছে, আর সেই এক দফা হচ্ছে সব ধরনের স্বৈরাচারী শাসক ও শোষকদের উৎখাত করে সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যমে শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। দেশের শতকরা ৯০ জন মানুষের মনে আজ চরম ক্ষোভ। কোটি কোটি মানুষের মনে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রত্যয় বিরাজ করছে। দেশের ছাত্র শ্রমিক ও কৃষকদের মনে আপোষহীন সংগ্রামের প্রস্তুতি। এই মুহূর্তে আমরা অভাব লক্ষ্য করছি শুধু সৎ ও সঠিক নেতৃত্বের। তবে আমরা আশাবাদী যে সময়ের নিরিখে বাস্তবতার প্রয়োজনে সঠিক রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে উঠবেই। ১৯৭১-এর শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভৌগোলিক স্বাধীনতার গণ্ডি পেরিয়ে অবশ্যই আরেক ধাপ অগ্রসর হবে। এবং এটা ঐতিহাসিক সত্য যে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অবলুপ্তির মাধ্যমে নির্বিশেষ মানুষের কল্যাণকামী শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম অব্যাহতভাবেই চলবে — কারণ এটাই ছিল ’৭১-এর রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপ্ন।

 

প্রথম প্রকাশ: বিচিত্রা, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৮৪

উৎস: কাজী নূর-উজ্জামান, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতি (ঢাকা: ডানা প্রকাশনী, ১৯৮৫)

লংমার্চের ডায়েরি — রায়হান রাজু

3

বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনার প্রতিবাদে ঢাকা-সুন্দরবন লংমার্চ অনুষ্ঠিত হইল ২৪ হইতে ২৮ সেপ্টেম্বর তারিখে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এই লংমার্চে সহস্ররাধিক লোক অংশ নেয়। এই রচনা লংমার্চে অংশগ্রহণকারী এক তরুণের দিনলিপি

২৪ সেপ্টেম্বর লংমার্চের প্রথম দিন। সকাল ১০টার আগেই প্রেসক্লাব চত্বরে লংমার্চের জমায়েত নদীর জোয়ারের মত ফুলতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে প্রায় ৩,০০০ লোকের বহর নিয়ে লংমার্চ শুরু হয়। লংমার্চের বহর যখন ঢাকার রাজপথ অতিক্রম করছে তখন রাস্তার দুই ধারে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যায়। লংমার্চ-যাত্রী বেশির ভাগের পরনে সাদা টিশার্ট, তাতে একটা কথাই লেখা: ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহু বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোন বিকল্প নাই’।

সাদা টিশার্ট আর মাথায় সবুজ ক্যাপ পরে পিচঢালা উত্তপ্ত রাজপথে পিঁপড়ার মত সারিবদ্ধ হয়ে পিলপিল করে এগিয়ে চলেছে লংমার্চ। গন্তব্য রামপালের দ্বিগরাজ। উদ্দেশ্য পরিষ্কার। লুটপাটের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করা।

প্রেসক্লাব শাহবাগ ধানমণ্ডি কলাবাগান হয়ে সংসদ ভবনের সামনে কিছুক্ষণ যাত্রা বিরতি। এরই মধ্যে প্রচণ্ড গরমে সকলে প্রায় অর্ধসিদ্ধ। তারপর বাসে উঠে যাত্রা শুরু। রানা প্লাজার সামনে পৌঁছতেই দেখা যায় রাস্তার দুই ধারে গার্মেন্টস শ্রমিকরা সারিবদ্ধ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যানারে ফ্যাস্টুনে প্রকটিত রানা প্লাজায় আহত নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ আর পোশাক শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৮,০০০ টাকা করার দাবি। এছাড়া জাতীয় সম্পদ সুন্দরবনকে রক্ষার আহ্বান আর লংমার্চকে অভিবাদন তো আছেই। রানা প্লাজার সামনে লংমার্চের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ ও নিহত শ্রমিকদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়।

এরপর যাত্রা শুরু হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অভিমুখে। সেখানের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা লংমার্চকে স্বাগত জানায় এবং দুপুরে সেখানে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। খাওয়ার পর সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক সমাবেশ শেষে মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হয়। পুরো যাত্রাপথে সংস্কৃতি মঞ্চ, সমগীত, গায়েন, সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন ও চারণের বন্ধুরা সুন্দরবনকে নিয়ে রচিত গান সহ নানা ধরনের উদ্দীপনামূলক গান গেয়ে লংমার্চ মাতিয়ে রাখে। রাস্তার পাশের জনগণ সেই উদ্দীপনায় শরিক হন শ্লোগানে শ্লোগানে। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ লাইন। দীর্ঘক্ষণ ধরে তারা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে ফ্যাস্টুন আর ব্যানারে সজ্জিত হয়ে। অভিবাদন লংমার্চ।

সন্ধ্যার সময় মানিকগঞ্জ শহরে পৌঁছতেই চোখে পড়ে গাছের ডালে, রাস্তার ধারে লটকানো ব্যানার। তাতে মানিকগঞ্জবাসীর সুন্দরবন রক্ষার গণদাবি জ্বলজ্বল করছে। রাস্তার দুই ধারে সাধারণ জনগণের যে অভূতপূর্ব সাড়া ও উত্তেজনা তা লংমার্চের যাত্রীদের বহুগুণ উদ্দীপ্ত করে। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে সমাবেশস্থল বিজয়মেলার মাঠ অবধি বিভিন্ন রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণের যে উপস্থিতি তাতে মনে হয় মানিকগঞ্জ শহরে উৎসবের ঢল নেমেছে। বিজয়মেলার মাঠে জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের বক্তৃতার মধ্য দিয়ে সমাবেশ শেষ হলে শুরু হয় গান ও নাটক। মানিকগঞ্জ টাউন হলে এই লংমার্চ বহরের জন্য রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

কোন রকমে খাওয়া শেষ হওয়ার পর সংকট বাঁধে রাতে থাকার জায়গা নিয়ে। অনেকেই ল কলেজের বারান্দায়, রাস্তার ধারে বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। অনেকে থাকার জায়গা না পেয়ে গোল হয়ে বসে সারা রাত গান গায়। আমরা কয়েকজন উপায়ান্তর না দেখে টাউন হলে খাওয়ার জায়গাটি পরিষ্কার করে সেখানেই শুয়ে পড়ি। থাকার জায়গা সংকট হলেও মানিকগঞ্জ জাতীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের লংমার্চকে আপ্যায়নের চেষ্টার কমতি ছিল না।

কোন রকমে রাত কাটল বটে। কিন্তু ভোরে এত মানুষ টয়লেট করে কোথায়? কেউ ছুটে গেল হাসপাতালে, কেউ স্থানীয় লোকজনের বাড়িতে, আবার কেউ বা শহরের মার্কেটগুলোতে। পুরো লংমার্চ জুড়েই টয়লেট সংক্রান্ত এই সংকট প্রকট ছিল।

যাহোক, শুরু হল লংমার্চের দ্বিতীয় দিনের যাত্রা। গন্তব্য ফরিদপুর। মানিকগঞ্জ থেকে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে পৌঁছতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল। কিন্তু মুষলধারের বৃষ্টিও আমাদের যাত্রা থামাতে পারল না। ফেরির অপেক্ষায় রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাসের শত শত যাত্রী বাসের মধ্য থেকেই লংমার্চের শ্লোগান আর গান শুনে করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায়। ফেরির অপেক্ষায় আটকে থাকা সমগীত আর গায়েনের পিকআপ থেকে একটার পর একটা গান ফেরিঘাটের সকলের মনযোগ কেড়ে নেয়। অবশেষে বর্ষার উত্তাল পদ্মা পার হয়ে রাজবাড়ি শহর প্রদক্ষিণ ও আজাদী ময়দানে সমাবেশ। তারপর দুপুরের খাওয়া।

লংমার্চের বহর এগিয়ে যায় ফরিদপুর শহরের দিকে। লংমার্চের সারি ফরিপুরের মুজিব সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফেলে। কিন্তু রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সারি আর শেষ হয় না। লংমার্চের যাত্রী কম বেশি আড়াই হাজার। কিন্তু তাদের মাথায় ফরিপুরের হাজার হাজার মানুষের সমর্থন শুধু নয়, তাদের মাথায় সারা দেশের কোটি মানুষের গণরায়। এই নিয়েই লংমার্চের যাত্রা। সন্ধ্যায় ফরিদপুরের অম্বিকাচরণ মেমোরিয়াল হলের মাঠে বিশাল এক সমাবেশ হয়। সমাবেশে জাতীয় কমিটির প্রতিনিধিসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। তারপর ওখানেই রাতের খাওয়া শেষ করে কেউ ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে কেউ বা অম্বিকাচরণ হলে আবার কেউ স্থানীয় লোকজনের বাড়িতে রাত্রিযাপন করে।

মধ্যরাতে আমরা কয়েকজন চা খেতে বের হই। আলাপ হয় এক চা দোকানির সাথে। সুন্দরবন রক্ষার যে লংমার্চ তা নিয়ে আপনারা কি ভাবছেন? আমরা তো হাজার হাজার লোক লংমার্চ করছি। আপনাদের মত কি? লোকটি তাকিয়ে থাকে। পান চিবুতে থাকে। আর একটার পর একটা চা বানাতে থাকে। কোন উত্তর দেয় না। বেশ কয়েক বার জিজ্ঞাস করার পর আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে দেয়ালের দিকে একটি পেপার কাটিং দেখাল। এক রিকশাওয়ালার সাক্ষাৎকার। পেপার থেকে কেটে দেয়ালে আঠা দিয়ে সেটে দিয়েছে। তাতে লেখা ‘আর যাই করি ভোটের সময় দুই নেত্রীর কাছে যামু না।’

পরদিন সকালে অম্বিকাচরণ হলেই সকালের খাওয়া শেষ করে লংমার্চ যাত্রা করে যশোরের  উদ্দেশ্যে। তৃতীয় দিনে মধুখালিতে মিছিল ও সমাবেশ শেষ হওয়ার পরপরই আবার বৃষ্টি নেমে আসে। বৃষ্টির মধ্যে আতির আলী সড়ক, এম আর রোড প্রদক্ষিণ করে মাগুরা পৌর ভবনের সামনে পৌঁছাই আমরা। সেখানে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষ করে মাগুরা শহর প্রদক্ষিণ করে লংমার্চ এগিয়ে যেতে থাকে।

সামনে ঝিনাইদহ। নবগঙ্গা নদীর ব্রিজ থেকে শুরু করে ঝিনাইদহ শহর প্রদক্ষিণ করে দুপুরে ঝিনাইদহ উজীরপুর হাই স্কুলে খাওয়ার ব্যবস্থা করেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। দুপুরে খাওয়ার আগেই ঝিনাইদহ শহরে আরো দুইটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে সবাই যখন খাওয়া দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত তখন পূর্ব ঘটনার জের ধরে লংমার্চে অংশ নেওয়া দুইটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশের সামান্য লাঠিচার্জের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। ঝিনাইদহ থেকে লংমার্চ এগুতে থাকে। গন্তব্য যশোর। যশোর টাউন হল মাঠে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রাত্রিযাপন ও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হয় আবদুর রাজ্জাক মিউনিসিপাল কলেজে।

পরদিন লংমার্চের চতুর্থ দিন। পুরা যশোর শহর প্রদক্ষিণের পর নোয়াপাড়া ও অভয়নগরে সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ ঢুকে পড়ে খুলনা জেলায়। প্রথমে ফুলতলা, তারপর দৌলতপুরে সমাবেশ। দুপুরে খাওয়া শেষ করে খুলনার হাদিস পার্কের সমাবেশের উদ্দেশ্যে লংমার্চ এগুতে থাকে। রেলওয়ে স্ট্যান্ডে আরো একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। সাড়ে ৪টার দিকে লংমার্চের সকলেই যখন হাদিস পার্কের বিশাল সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে আবার বৃষ্টি এসে হানা দেয়। বৃষ্টিতে খুলনা শহরের রাস্তাগুলোতে গোড়ালি ডোবা পানি জমে গেল। আর হাদিস পার্কে জড় হওয়া হাজার হাজার খুলনাবাসী বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে জাতীয় কমিটি হাদিস পার্কের সমাবেশটি সন্ধ্যার পরিবর্তে পরদিন সকালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। খুলনার রূপসা নদীতে জোয়ারের মত উপচে পড়া মানুষগুলি পরদিন সকালে সমাবেশের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সকালেও শেষ রক্ষা হল না। সকালেও ছিল মুষলধারে বৃষ্টি।

লংমার্চের পঞ্চম দিন সকালে মিছিল শুরু হলে আকাশ গুমোট বেঁধে গর্জন করতে থাকে। এই বুঝি রাতের মত আবার বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিবে খুলনা নগরী। বলতে না বলতেই বল্লমের ফলার মত বৃষ্টির ফোটা আঘাত হানতে থাকে মিছিলে। মিছিল থামেনি। পুরা খুলনা শহর প্রদক্ষিণ করে হাদিস পার্কে তড়িঘড়ি সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ।

সেদিন ২৮ সেপ্টেম্বর। লংমার্চের শেষ দিন। সকল প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছে দ্বিগরাজের মহাসমাবেশ, রামপালের মানুষ। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই লংমার্চ যাত্রা করল দ্বিগরাজের দিকে। তারপর বাগেরহাট জেলা শহর বিশেষ করে পৌরসভা রোড, রেল রোড, খান জাহান আলী রোড, কর্মকারপট্টি, ঘোষপট্টি, ফলপট্টি সড়কগুলি প্রদক্ষিণ করে বাগেরহাট পুরাতন কোর্ট সংলগ্ন মাঠে সমাবেশ শেষ করে লংমার্চ যখন দ্বিগরাজ ছুঁই ছুঁই করছে তখন বিকালের ক্লান্ত সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। অন্যদিকে লংমার্চ বহরের উদ্দীপ্ত শ্লোগান আর রামপাল দ্বিগরাজের মানুষের রাস্তার ধারে বিপুল উৎসাহ করতালি আর অভ্যর্থনা লংমার্চকে তেজোদ্দীপ্ত করে তুলছে। লংমার্চ দ্বিগরাজে পৌঁছলে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহ দেখা দেয়।

মহাসমাবেশে উপস্থিত দেবাশীষ নামে একজনের সাথে আলাপ করে জানতে পারি, সে পশুর নদীর ওপার থেকে এসেছে। কেন এসেছে জিজ্ঞাস করলে সে বলে, ‘এখানে তো শেখ হাসিনা বসবাস করবে না, আমাদের বসবাস করতি হবি। তাই আমাদের ভালমন্দ আমাদের দেখতি হবি। সামবেশের লোকজন কি বলে তাই জানতি আইছি।’

সব বাধাবিঘ্ন প্রতিকূলতা পেরিয়ে দ্বিগরাজে সুন্দরবন ঘোষণা ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের বক্তৃতার মধ্য দিয়ে লংমার্চের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব আনু মুহাম্মদ ‘সুন্দরবন ঘোষণা’য় বলেন, সরকারকে অবিলম্বে সুন্দরবন ধ্বংস করার চক্রান্ত বাদ দিতে হবে এবং সুন্দরবন রক্ষায় নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ১১ অক্টোবরের মধ্যে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের ঘোষণা প্রত্যাহার না করলে ১২ অক্টোবর সুন্দরবন রক্ষায় নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে বলে ঘাষণা করেন আনু মুহাম্মদ।

বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার এক বছর: বিচার করতে হবে — সলিমুল্লাহ খান

রামুসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার এক বছর পূর্তি হইল ২৯ সেপ্টেম্বর। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করিবার আয়োজন করে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ। স্মরণসভা পর্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখিয়াছিলেন সলিমুল্লাহ খান। অত্র তাহার বক্তব্যখানি সামান্য পরিমার্জনা করিয়া ছাপানো হইল

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ ছবি: সর্বজন

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ
ছবি: সর্বজন

আজকের স্মরণসভার সভাপতি, মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথি এবং রামুর সর্বস্তরের বৌদ্ধ হিন্দু মুসলিম জনসাধারণ, আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি।

২৯ সেপ্টেম্বর যে ঘটনা ঘটেছিল সেখানে কারা আক্রমণ করেছিল আপনারা অনেকেই জানেন। আপনারা অনেকেই সাক্ষী আছেন। সরকারি তদন্ত কমিটি তাদের নাম খুঁজে পায় না। আপনারা জানেন যারা কোন কাজ — ভাঙ্গার কাজ — হাতে নেয়, আমাদের বাংলা ভাষায় তাদের বলে ক্রীড়নক। তারা খেলার হাতিয়ার। তাদের পিছনে পরিকল্পনাকারী থাকে। পরিকল্পনাকারীদের  পিছনে আরো বড় পরিকল্পনাকারী থাকে। আপনারা

দেখুন গত এক বছরে এদেশে কত ঘটনা ঘটেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ সনে যখন রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হয়, পরে উখিয়া টেকনাফে হামলা হয়, তখন আমরা মনে করেছিলাম এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ঘটনাগুলো যে বিছিন্ন নয় তা দেখাতে আমি বেশি দূরে যাব না। আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায়, যাকে আমরা উপমহাদেশ বলি সেখানে, এই ধরনের ঘটনা প্রচুর হচ্ছে। আপনারা দেখেন ভারতে হচ্ছে কোথাও কোথাও , শ্রীলঙ্কায় হচ্ছে, বার্মাতেও কোথাও কোথাও হচ্ছে, পাকিস্তানে হচ্ছে, আফগানিস্তানে হয়েছে। আমি আর বেশি দূরে যাচ্ছি না।

মাঝে মাঝে আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এর পিছনের কারণটা কি। আমরা সকলেই মনে করি যে আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। তাহলে অসম্প্রীতি তৈরি করে কারা? সোজা কথায়, অসম্প্রীতি তৈরি করলে যাদের লাভ তারাই করে।

আমরা ১৯৭১ থেকে শুরু করি সবকিছুই। ৪২ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু তার আগেও তো ইতিহাস ছিল। আমি পুরানা ইতিহাসে যাব না। ধরুন, ২০০ বছরের মত এদেশ ব্রিটিশের শাসনে ছিল। তখন বলা হয়েছিল এদেশে তো হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান এবং নানা ধর্মের মানুষ আছে। আবার বাঙ্গালি পাঞ্জাবি সিন্ধি গুজরাটি বিহারি নানা জাতির মানুষ আছে। আপনারা জানেন নানা অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য থাকে। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য ছিল। তার পরিণতিতে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি।

ব্রিটিশ আমলেও তেমন বৈষম্য ছিল। তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ব্রিটিশরা যদি চলে যায়, এদেশ শাসন করবে কারা? তখন বড় বড় মনীষীরা বলেছিলেন এ সমস্যা সমাধানের সহজ কোন পথ নাই। সমাধান কি? এদেশের সব লোককে হয় হিন্দু হয়ে যেতে হবে না হয় সব লোককে মুসলমান হয়ে যেতে হবে। নাহলে এই সমস্যার কোন সমাধান নাই। এই কথা এমন সব বড় বড় লোক বলেছিলেন যাদের নাম আনলেও বিশ্বাস হবে না। আমি নাম নিচ্ছি না। কিন্তু আমরা জানি এটা কোন সমাধান নয়। এটা একটা অবাস্তব সমাধান। আমাদেরকে যার যার ধর্মে থাকতে হবে এবং আমাদেরকে একই দেশে বসবাস করতে হবে। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়? আমরা তখন, ১৯৭১ সালে, বলেছিলাম ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা। এই দাবিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল।

কিন্তু আমি দেখি দেশে এখন কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী বের হয়েছেন যারা বলেন ধর্মনিরপেক্ষতা কোথা থেকে আসল আমরা টের পাচ্ছি না। আমি তাদেরকে সবিনয়ে প্রশ্ন করতে চাই, যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমানাধিকার, ন্যায়, সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে মানবিক মর্যাদা থাকবে কোথায়? আর যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমান আচরণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র না নেয় — যাকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা বলি — তাহলে মানবিক মর্যাদা, সাম্য এবং ন্যায় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? যারা বলছেন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায় থাকবে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে না তারা আন্তরিক কথা বলছেন না। আমার ধারণা, এই কথা যারা বলছেন তারাই এই আক্রমণটা করেছেন। তার একটা দীর্ঘমেয়াদী কারণও আছে।

এদেশে চিরকাল শাসন করতে পারবে না এটা ব্রিটিশ বুঝতে পেরেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তারা নিজেরাই বলেছিলেন আমরা চলে যাব। তারা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে চলে গেছেন। তারা বার্মা থেকে চলে গেছেন। তারা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকে চলে গেছেন। ওটা চলে যাবার সময়। আমরা ওটার নাম দিয়েছি পরাধীনতার শেষকাল।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান ছবি: সংগৃহীত

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান
ছবি: সংগৃহীত

তাহলে স্বাধীনতার কালে আমরা কিভাবে দেশ চালাব? পাকিস্তান আমলের ২৩-২৪ বছরে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, ভারতবর্ষে যে আঞ্চলিক বৈষম্য হয়েছিল সেটার অবসান হবে। তখন মানুষকে প্রবঞ্চিত করে বলা হয়েছিল তোমার মধ্যে বহু পরিচয় আছে। তুমি পূর্বাঞ্চলের লোক, একই সাথে তুমি ভারতের, সেটাও তোমার পরিচয়। ঘটনাচক্রে যারা নির্যাতিত তাদের কোন না কোন ধর্মপরিচয় থাকে। তখন তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা কলা — তোমরা মুসলমান। সেই জন্য পাকিস্তান হয়েছে। কিন্তু সেই মানুষেরাই কিছুদিন পর বুঝতে পেরেছে এই পাকিস্তান তাদের সমস্যার সমাধান করবে না। এখন বার্মার মধ্যে মুসলমানদের উপর অত্যাচার হয়। ধরে নিলাম। তো সেটা বলে রামুর বৌদ্ধদের উপর অত্যাচারের যুক্তি যারা দেখায় তারা মানবিক মর্যাদায়, সাম্যে, ন্যায়ে, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না। এই আক্রমণ করেছে তারাই। এগুলো হচ্ছে লম্বা কথা। আমরা এখন নগদ কথায় আসি।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে আজকের এই ২৯ তারিখ পর্যন্ত এই এক বছরে কত ঘটনা ঘটেছে। আপনারা জানেন এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটি রায় ঘোষিত হল। ঢাকার শাহবাগে তরুণরা সমাবেশ করে বলল যুদ্ধাপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি চাই। তখন কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেল — আমি লম্বা কাহিনীকে সংক্ষেপ করছি, আপনারা সকলেই জানেন — দেশের কত জায়গায় ৯৪-৯৫ জায়গায় হিন্দু মন্দিরে হামলা হল। আমি আমার সেই সমস্ত বৌদ্ধ বন্ধুরা যারা আগে বক্তৃতা দিয়েছেন তাঁদের বক্তব্যের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেই বলছি, আক্রমণ একলা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর হয় নাই। পৃথিবীর নানা দেশে যেখানে যে দুর্বল — তথাকথিত সংখ্যালঘু — তার উপরেই হামলা হয়। এই বাংলাদেশে হয়েছে। ভারতে দেখেন মুসলমানদের উপর হচ্ছে। এগুলো করে কারা? দেখেন আমরা এখন ইন্টারনেটের যুগে এসছি। সেদিন দেখলাম একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, কক্সবাজার জেলা পরিষদ এখন কম্পিউটার আউটসোর্সিং করছে। মানে কম্পিউটার বেশি শিখে আমরা এখন পয়সা কামাতে পারব। কিন্তু তার বিপদের দিকও আছে। বলে ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি? ফাঁদ হচ্ছে এই — রামুতে যা ঘটেছিল সেটাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা — একজনের নামে অপবাদ দিয়ে আরেক জনকে দোষী করা। এটাকে ইংরেজিতে বলে ব্ল্যাক প্রপাগান্ডা। আমি কথাটা পছন্দ করি না। আমি বলব এটা হোয়াইট প্রপাগান্ডা। এটা সাদা মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যাপ্রচার। কিন্তু পরিণতিতে যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আপনারা সবাই দেখেছেন। আমরা সকলেই তার ভুক্তভোগী।

কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারির পর বুঝতে পারলাম তার পিছনে একটা সংঘবদ্ধ হাত আছে। এটা কোন বিছিন্ন ব্যক্তি, রামুর কয়েকজন ব্যক্তি করেছে বললে পুরাপুরি সত্য বলা হবে না। তাহলে দেশের পঁচানব্বইটা জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরের উপর, বাড়ির উপর কেমন করে হামলা হল? এটা কি করে সম্ভব? এমনকি রামুতেও আক্রমণ করার জন্য ট্রাকে ট্রাকে যে লোক এসেছে সেটা তথাকথিত লোকের মনের রাগ থেকে সম্ভব নয়। এটা দুইদিনের ঘটনা হতে পারে না।

এই জন্যই বলছি বৌদ্ধ মন্দির পুনরায় নির্মাণ করার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ অবশ্যই দেব। এটা না দিলে অন্যায় হবে। আমাদের সুলতানা কামাল আপাও বলেছেন, সরকার যে এটা নির্মাণ করে দিয়েছে সেটার জন্য আপনারা তাকে সাধুবাদ জানাবেন। বৌদ্ধমন্দিরগুলোর পুনর্নির্মাণ করাটা সমস্যার স্বীকৃতি মাত্র, সমাধান নয়। এই ধরনের ঘটনা আর যেন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে ঘটনাটা কেন ঘটে। সে জন্য আমি বললাম ব্রিটিশ আমল থেকে  শুরু করে আমরা দেখেছি ঘটনাগুলি সবসময় ঘটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পিছনে কি থাকে? থাকে স্বার্থবুদ্ধি, বিশেষত অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভবিষ্যতে এদেশে শাসন চালাবে কে? কে এদেশের উপর প্রতাপ করবে? যারা করতে চায় তারা নিজের শাসন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষমতাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য মানুষের মধ্যে ক্রমাগত ভীতির সঞ্চার করে। বলে এদেশ থেকে চলে যেতে হবে তোমাকে। আমি বলি, এটা কি তোমার বাপের সম্পত্তি? হ্যাঁ, রাজনীতি শুধু তোমাকে সেই বাপের সম্পত্তি করে দেয় অন্যকে তার বাপের সম্পত্তি থেকে উৎখাত করার জন্য। এজন্য তা যদি আমরা বুঝতে চাই তো আমাদের ঘটনার গভীরে যেতে হবে।

এখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশে একটা বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটাকে ‘নামে’ই  আমি বলব, কারণ বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে। একটা রায় ঘোষিত হল। প্রথম রায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল কারণ সে দেশে নাই, পালিয়ে গেছে। সেই একই ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর আরেকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। তখন ছাত্রজনতা সহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ শাহবাগে এসে বিক্ষোভ করল। তখন সেটাকে ঠেকানোর জন্য কি ধরনের মিথ্যা, সাদা প্রচারণার সুযোগ নেওয়া হল, আপনারা দেখেছেন। বলল কি শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই নাস্তিক। ভাগ্যিস বলে নাই শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই বৌদ্ধ। এখন নাস্তিকদের তো মন্দির নাই। ভাঙ্গবে কোনটা? তারা পারবে নাস্তিকদের ধরে ধরে হত্যা করতে। আমি সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই, রামুর ঘটনা সেই ঘটনার অংশ। যেহেতু ঘটনাটা ৫ মাস আগে ঘটেছিল তাই আমরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এটা কেমন করে সম্ভব? আসলে এটা সম্ভব সেইভাবে যেভাবে অন্য ঘটনাগুলো ঘটেছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার উদাহরণ তো ভারতে স্থাপন করা হয়েছে। নিশ্চয় সেখান থেকে এরা শিক্ষা নিয়েছে।

এজন্য বলছি এই অত্যাচারের কাহিনী কোন বিশেষ ধর্মের সাথে যুক্ত নয়। এসলাম ধর্মের কোথাও বলে না যে মন্দির ধ্বংস করতে হবে। এসলাম ধর্ম বৌদ্ধধর্মের চেয়ে বয়সে ১,০০০ বছরের ছোট ধর্ম। আমিও এসলামি সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি। এসলাম ধর্মের বাণী আমি যেটুকু বুঝি তা হল আল্লাহর চোখে সকল মানুষ সমান। আর আমি কার্ল মার্কসের বই পড়ে কার্ল মার্কসের শিষ্য হয়েছি অতি অল্প বয়সে। সেখানে আবার কার্ল মার্কসের শিক্ষা বলতে আমি বুঝেছি, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যকে নির্মাণ করে, দেবতারা নির্মাণ করে না। এই দুইয়ের মধ্যে আমি কোন বিরোধ দেখি না। মানুষ নিজের ভাগ্যের নির্মাতা নিজেই। তার ভাগ্য ভাগ্যদেবীর উপর নির্ভর করে না। ভাগ্য তাকেই সহায়তা করে যে বীরদর্পে সাহসের সাথে এগিয়ে যায়। কাজেই যে ঘটনা ঘটেছে এখানে, যারা আক্রমণ করেছে, সেটাকে ঠেকাবার জন্য রামুতে অন্তত একজন হলেও তো মানুষ ছিল। একজন হলেও ঠেকাতে গিয়েছে। মানুষের মাথা তো ফেটেছে। এটাই আমাদের গৌরবের কথা।

এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে, আমাদের জনগণের যদি চাপ না থাকত, সারা পৃথিবীতে দুর্নামে আমাদের নামে যদি রি রি পড়ে না যেত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশ সরকারও এই মন্দিরগুলি নির্মাণ করে দিতেন না। বিশ্ব জনমতের চাপ আছে, দেশের জনমতের চাপ আছে। তাই সরকার যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে তাহলে তাকে কাজ করতে হবে। আমি সরকারকে ধন্যবাদ দেব। একই সাথে বলব এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য কমপক্ষে দুইটা কাজ করা দরকার। এক হচ্ছে: এ কাজ যে বা যারা করেছে তাদেরকে ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। এটার কোন ক্ষমা নাই। যদি ৪২ বছর পরে ১৯৭১ সালে করা যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে পারে তাহলে রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলাকারী অপরাধীদের অনুসন্ধানে যদি ৪০ বছরও লাগে, তার বিচার করতে হবে। যদি এই বিচার না হয় তাহলে এই ধরনের আক্রমণকারীরা আবারও উৎসাহিত হবে। এই বিচার হবে তখনই যখন আমরা সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে — শুধু বৌদ্ধদের মধ্যে নয় — মুসলমানদের মধ্যে, হিন্দুদের মধ্যে, দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই বিচারের দাবি জনপ্রিয় করতে পারব।

আপনাদের সন্তান, আমার বন্ধু ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া একটা অসাধারণ সমৃদ্ধ ভাল বই বের করেছেন। এটা হয়তো হাজার হাজার কপি ছাপা হয় নাই। আপনাদের যাদের সাধ্য আছে দেখবেন। তাতে দলিল অনেক আছে। সরকারি তদন্ত কমিটিতে যে সমস্ত কথা লোকে বলে নাই তার চেয়ে বেশি কথা এই বইতে বলা আছে। ‘রামু: সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংকলন’ এই বইটা আপনারা নিশ্চয় দেখবেন। তাতে অনেক কাহিনী আছে।

আমি আজকে বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করব। আমি বলব যে বিচাররের দাবিটা আমরা তখনই প্রতিষ্ঠিত করতে পারব যখন জানব আক্রমণকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। প্রকৃত উদ্দেশ্য আমি এইভাবে সংক্ষেপে বলি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা তৈরি হওয়ার আগের ইতিহাস দেখেন। পাকিস্তান আমলে আমরা বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম যে মানুষে মানুষে বিভেদের মূল কারণ বুঝি ধর্ম। আমরা পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করেছি সেটা আসল কারণ ছিল না। আসল কারণ ছিল মানুষের উপর মানুষের শোষণকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানুষকে ধর্ম পরিচয় দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা। সেজন্য ব্রিটিশ শাষিত ভারতবর্ষের একটা অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করেছিল, আরেকটা অংশ ভারত রাষ্ট্র করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ আমরা গড়েছিলাম একটা মহান আদর্শ নিয়ে — ধর্ম পরিচয় দিয়ে আর কেউ কাউকে শোষণ করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিন চার পাঁচ বছরের মধ্যেই আবারও সেই ধর্ম পরিচয় বড় করে তোলার যে রাজনীতি দেশে গড়ে উঠল সেটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। পরিতাপের বিষয়।

ছবি: সর্বজন

ছবি: সর্বজন

এটা কি করে সম্ভব হল? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এদেশে আর কোন দিন পাকিস্তানিরা শাসন করবে না। শুধু তাই নয়, এদেশে বাঙ্গালিরাও বাঙ্গালি কি অন্য জাতির লোকদের আর শোষণ করবে না — এটা কি মানুষের আশা ছিল না? অন্তত বেশির ভাগ মানুষের আশা তো তাই ছিল। সে আশা পূরণ হয়নি। যারা মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার, মানুষের উপর মানুষের শোষণ এবং শাসনকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায় তাদের কোন না কোন ছুতা লাগবে। আমরা সকলেই শ্রমজীবী মানুষ। আমরা সকলেই কৃষক মানুষ। এই পরিচয় যদি বড় হয়ে ওঠে তাহলে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ভেদটা বড় থাকে না। কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে যদি আমি মানুষের মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ভেদাভেদটাকে বড় করে রাখতে পারি তাহলে যারা বড় লোক হয়েছে নতুন করে, এদেশ হয়ে যাদের নতুন জমিনদারি হয়েছে, যারা নতুন শিল্পপতি হয়েছে তাদের সুবিধা হয়। তারা পুরানো আমলের পাকিস্তানি রাজনীতিকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

সেজন্য আজকে তারা বলছে, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। আমি বলব দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত নয়। প্রত্যেক দেশেই কিছু চোর, কিছু ডাকাত, কিছু দুর্বৃত্ত থাকে। তাই কি আপনি বলবেন, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সাহেব — তিনি প্লেবয় টাইপের মানুষ — একবার বলেছিলেন পৃথিবীর মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। যারা তাজমহল দেখেছে আর যারা তাজমহল দেখে নাই। পৃথিবীতে সব মানুষকে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আপনারা দেখছেন আমার সামনে দিলীপবাবু আছেন। বাংলাদেশে আপনারা কয়েক হাজার দিলীপ পাবেন। কেউ বলবে, বাংলাদেশের মানুষ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। যাদের নাম দিলীপ আর যাদের নাম দিলীপ নয়। চাইলে তো এরকম ভাগাভাগি আপনি করতেই পারেন।

এদেশের মানুষ কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, আর কেউ এসলামের পক্ষে এরকম দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে — এটা একটা মিথ্যা প্রচারণা। আমরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। এ হিশাবে আমরা সকলেই বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু ধর্ম হিশাবে আপনার এসলাম ধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়, বৌদ্ধধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়। এটাই তো ছিল বাংলাদেশের বাণী।

আজ সেটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তারা বলছে দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। কারণ আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল তারা কত জন? তারা সংখ্যালঘু ছিল। আজকে রামুতে ব্যাপক মানুষের সাক্ষ্য, সারাদেশে মানুষের প্রতিবাদের ¯্রােত দেখে বোঝা যায়, যারা এই অপরাধ করেছে তারাও স্বীকার করতে পারছে না যে আমরা এই অপরাধ করেছি। তাদের লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ছদ্মবেশে এর ছবির সাথে ওর ছবির সাথে নিজের ছবি ছাপিয়ে তাদেরকে প্রমাণ করতে হচ্ছে আসলে এটা আমি বা আমরা করি নাই। এখানেই তাদের পরাজয়। আজ এই জনসভায় আপনি তাকে আহ্বান করছেন না। অর্থাৎ জনগণের বিচারের একটা পদ্ধতি আছে। জনগণের সেই বিচারের পদ্ধতিকে অক্ষুণœ রাখুন।  আমাদের দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হবে না। আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছি। আমরা সবাই বাংলাদেশের পক্ষে আছি। কিন্তু যার যার ধর্ম সে সে রাখতেই পারি।

এই বৌদ্ধমন্দির পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ সেই উদার ঐতিহ্যের একটু হলেও দেখিয়েছে। জানি মনের দাগ অত সহজে যাবে না। নদী মরে গেলেও রেখ রেখে যায়। এই স্মৃতি বহুদিন থাকবে। কিন্তু এই স্মৃতি থেকে আমরা একটাই শিক্ষা নেব — এই ধরনের ঘটনা যেন আর একবার না ঘটে। এটার যেন আবৃত্তি না হয়। সেটা করতে হলে আমাদের — আমি আগেই বলেছিলাম — ৪০ বছর লাগলেও যেমন বিচার করতে হবে, এটা বুঝতে যদি আমাদের ৮০ বছরও লাগে এই বিচার অব্যাহত রাখতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে কোন জিনিশটা মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে। আর কোন জিনিশটা সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা ঐক্যের পথেই হাঁটি। এই বিভক্তির পথে যারা মানুষকে ধাবিয়ে দেয় তাদেরকে আমরা পরাজিত করি। তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

আমি আপনাদের আর বেশি সময় নেব না। ঢাকা থেকে মহান অতিথি যারা এসছেন তাদের কথা আপনারা শুনুন। আমার জন্মও আপনাদের কক্সবাজার জেলায়। আমার বাড়ি মহেশখালিতে। আমি চাঁটগাইয়াতেও বলতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার অতিথি অভ্যাগত বন্ধুদের সৌহার্দ্যরে জন্য বাংলাতেই বললাম। তো অঁনারা বেয়াজ্ঞুনে ভালা থাইক্কন। আসসালামুলাইকুম। নমস্কার।

অনুলিখন: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

সম্পাদকীয়: জনতার রায়

যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালের সপ্তম রায়ে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হইল। বাংলাদেশে জাতি গঠনকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার ৪২ বছরেও সমাপ্ত না হওয়ায় অন্যান্যের মত তাহার বিচারও ঝুলিয়া ছিল। তাহার বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণার দিন তাই চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীন পত্রিকায় কাক্সিক্ষতভাবেই লিখিয়াছিলেন আজ চট্টগ্রামের কলঙ্ক মুক্তির দিন। রায়ে এই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়াছে। জনতা যেই রায় বহু আগেই দিয়া রাখিয়াছে, আদালত বিগত সপ্তাহে তাহা ঘোষণা করিয়াছে মাত্র। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই রায়ের ক্ষণটি শুদ্ধ চট্টগ্রামের নহে, গোটা বাংলাদেশেরই এক বিশেষ দিন বলিয়া গণ্য হইবে।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ডাক্তার নূতনচন্দ্র সিংহকে হত্যা, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজাফফর আহমদ ও তাঁহার পুত্রের গুম প্রভৃতি ঘটনায় সন্দেহাতীতভাবে অপরাধী প্রমাণিত হইয়াছেন। বিগত বৎসরগুলিতে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বলবান হইয়া উঠিয়াছিলেন। একধিবার সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার পদ পর্যন্ত অলঙ্কৃত করিয়াছিলেন। ১৯৭১ সালে তাঁহার পিতার মুসলিম লীগের রাজনীতি ও তাঁহার সীমাহীন দম্ভের রাজনীতি লইয়া জনমনে যে বিপুল অস্বস্তি তাহার কোন পাত্তাই দিতে চাহিতেন না তিনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত এই বাংলাদেশে তিনি যেন বা সকল আইন আদালতের ঊর্ধ্বে এই ভাব তিনি বিগত বৎসরগুলিতে ক্রমাগত দেখাইয়াছেন।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায় ঘোষণার আগের রাত্রিতে ইন্টারনেটে রায়ের আংশিক অনুলিপি প্রকাশ হইয়া পড়ে। এই খবর বাহির হইবা মাত্র সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে নানা রূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়াছে। একটি মহল যেন এই ঘটনার জন্যই একান্ত চিত্তে অপেক্ষা করিতেছিল। তাহারা একযোগে হল্লা করিয়া বলিতেছে এই ঘটনার পরে ট্রাইবুনালের রায়ের আর কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকিল না। তাহাদের এই কাণ্ড দেখিলে মনে হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমস্ত কৃতকর্মের দায় এই ঘটনার পর লঘু হইয়া গেল বুঝি। মুক্তিযুদ্ধের শত শহীদের, বীরের অশ্রু, নারীপুরুষ, শিশু, বৃদ্ধের লাঞ্ছনা মিথ্যা হইয়া গেল।

আমরা বলিতে চাহি, রায়ের কোন অনুলিপি পূর্বাহ্নেই প্রকাশ হইয়া পড়াও কাক্সিক্ষত নহে। বিচার প্রক্রিয়ার সহিত সংশ্লিষ্ট কোন বিভাগের এহেন গাফিলতি কোনভাবেই কাম্য হইতে পারে না। ইহার তিরস্কারই যথেষ্ঠ নহে, অপরাধীদের শনাক্ত করিয়া বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাইতে হইবে। পুনর্বার কোন রায় ফাঁস যাহাতে না হইতে পারে সেইরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করাও আশু কর্তব্য।

এই রায়ের পর আমরা পুনর্বার বলিতে চাই, যুদ্ধাপরাধের বিচার ও তাহার রায় কার্যকর করিতে জনগণকে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করিতে হইবে। কোন কারণে এতটুকু বিচলিত হইলে চলিবে না।

এদিকে ঢাকার ল্যাব এইড নামক নামজাদা বেসরকারি হাসপাতালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাসুম নামের এক ছাত্র ভুল চিকিৎসার কারণে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হইয়াছেন বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। ইহার পর ছাত্রজনতা দায়ীদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলনে শামিল হইয়াছে।

শুধুমাত্র বিরাট অংকের টাকার লোভে এই ধরনের বেসরকারি হাসপাতালসমূহ বিরাট রকমের মৃত্যুর বাণিজ্য করিতেছে। গাফেলতি ও ভুল চিকিৎসার কারণে এই ল্যাব এইড হাসপাতালেই অধ্যাপক মৃদুলকান্তী চক্রবর্তী ও কবি খন্দকার আশরাফ হোসেনের মৃত্যু হইয়াছে। তবে ল্যাব এইডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিশাবে দেখার অবকাশ নাই। গোটা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও জনসেবা এক বিরাট লোভ ও লালসার শিকারে পরিণত হইয়াছে। সরকারি হাসপাতালেও গাফেলতি কম দেখা যায় না। গত ঈদুল ফিতরের উৎসবের চার দিনে এক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ৪০ জন রোগীর মৃত্যু হইয়াছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালসমূহের এহেন অবস্থায় অতিসত্বর কঠোর ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের কর্তব্য হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কিন্তু যেই শ্রেণি সামান্য সর্দিকাশি সারাইতেও সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল লক্ষ্য করিয়া ছুটিয়া যায়, তাহারা আগ বাড়াইয়া এই কাজ যে করিতে আসিবে না তাহা বলাই বাহুল্য। পুরো স্বাস্থ্যখাতকে ঢালিয়া সাজাইতে হইলে সরকারের উপর জনগণের কঠোর চাপ প্রয়োগের বিকল্প নাই। রাজপথের আন্দোলন সেই চাপ প্রয়োগের অন্যতম একটি পদক্ষেপ হইতে পারে মাত্র।