Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ২৭

নতুন জাতির জন্ম — সলিমুল্লাহ খান

‘মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেই।’ — আহমদ ছফা, ১৯৭৭

বাংলা ১৩৮৪ সালের বৈশাখ — মোতাবেক ১৯৭৭ ইংরেজির মে মাসে — মহাত্মা আহমদ ছফা বলিয়াছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেই।’ কেন তিনি এমন কথা বলিতে বাধ্য হইয়াছিলেন তাহা বুঝিতে আরো একটু নিকট অতীতের দিকে চোখ ফিরাইতে হইবে।

©রঘু রায়

©রঘু রায়

বাংলাদেশের জন্ম মুক্তিযুদ্ধের ঔরসে সম্পন্ন হইয়াছিল। সেই সত্য ততদিনে অনেকেই ভুলিতে বসিয়াছেন। কেহ কেহ বলিতেছিলেন বাংলাদেশের জন্ম হইয়াছিল রুশ-মার্কিন ঠাণ্ডাযুদ্ধের হিমঘরে, আর কেহ বা পাণ্ডিত্যের পরাকাষ্ঠা প্রকাশ করিয়া ঘোষণা করিতেছিলেন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের উত্তাপে বাংলাদেশ জন্মিয়াছিল। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম কখনোই হইত না যদি না এই দেশের মানুষ স্বাধীনতা না চাহিত, যদি না সংগ্রামে অংশগ্রহণ করিত। এই অতি সামান্য সত্যটিও একদিন মানুষ ভুলিতে বসিয়াছিল। সেই দুঃসময়ে আহমদ ছফা ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ নাম রাখিয়া একপ্রস্ত নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সহিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মবৃত্তান্ত অচ্ছেদ্য — এই সত্য পুনরায় ঘোষণা করিবার জন্য আহমদ ছফা যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা, দুর্ভাগ্য আমাদের, আজও ভবিষ্যদ্বাণীই রহিয়া গেল।

‘যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করুন,’ আহমদ ছফা সেদিন লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশে একটি মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। রাশিয়া চায়নি, আমেরিকা চায়নি, ভারত চায়নি, চিন চায়নি, পাকিস্তান চায়নি বাংলাদেশে বাঙ্গালিদের একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হোক। তথাপি বাঙ্গালি জনগণের দাবি অনুসারে এখানে একটি যুদ্ধ হয়েছে, হতে পারে সে যুদ্ধের ফলাফল অপরে আত্মসাৎ করেছেন।’ বিনামূল্যে, বিনাযুদ্ধে এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। রাষ্ট্রের জন্ম দেওয়া এক কথা, জাতির জীবন গড়িয়া তোলা সম্পূর্ণ আর এক কথা। জাতি গঠিতে হইলে নেতৃত্বের প্রশ্নটা অবান্তর থাকে না।

আহমদ ছফা ১৯৭৭ সালে ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, ‘যাঁরা একটি নতুন জাতির জন্মের স্বপ্ন দেখে রণধ্বনি তুলেছিলেন, সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন — সমাজের কোলে বিকশিত সেই কেন্দ্রবিন্দুটি থেকে আগামী দিনের নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবেই।’ স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিবে, ইঁহারা কাঁহারা? ১৯৭১ সালের জুলাই নাগাদ কলিকাতায় উপনীত আহমদ ছফা ‘ঢাকায় যা দেখেছি যা শুনেছি’ নাম দিয়া একপ্রস্ত জবানবন্দি জাহির করিয়াছিলেন। উপসংহারচ্ছলে তিনি লিখিয়াছিলেন: ‘শ্যামপুরে ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির পাশ দিয়ে বুড়িগঙ্গা পার হওয়ার সময় বাচ্চা মাঝি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল, “ওই যে দেখুন, কত লাশ গাঙ্গে”।’ আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিলেন, ‘চেয়ে দেখলাম দশ বারটা পেটফোলা লাশ কচুরীপানার দামের পাশে ভাসছে।’ লেখক স্বগত উচ্চারণ করিলেন, ‘এরাই তো স্বাধীনতার নিশান উড়িয়েছিলেন, এরাই তো রণধ্বনি তুলেছিলেন।’


ইহার পরের ঘটনার বয়ান আহমদ ছফা প্রকাশ করিয়াছিলেন ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রকাশিত একটি ছোটগল্প যোগে। গল্পটির নাম ‘পাথেয়’। যতদূর খবর রাখি এই গল্পটি আহমদ ছফার কোন গ্রন্থে এমনকি ‘রচনাবলি’তেও পাওয়া যায় না। এই জায়গায় গল্পটির কিছু অংশ তুলিয়া ধরিতেছি। ১৯৯৮ ইংরেজির দিকে এক সাক্ষাৎকারে মহান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জানাইয়াছিলেন নানান কাজের ভিড়ে দুইটি ইচ্ছা অপূর্ণ ছিল তাঁহার। একটা ইচ্ছা বাচ্চাদের জন্য গল্প ও কবিতা লেখা। আর ইচ্ছাটি ছিল ‘সরল গভীর কিছু গল্প লেখা যেগুলো হবে পোস্টমর্ডান এটিচুডের।’ আমার ধারণা ‘পাথেয়’ গল্পটি এই দ্বিতীয় ধাচেরই।

‘পাথেয়’ গল্পটির কাহিনী অকথ্য কিছু নহে। ১৯৭১ সালের মার্চ কিংবা এপ্রিল মাসের ঘটনা। মানুষের স্রোত চলিয়াছে নিরন্তর। চলিয়াছে নিকটে যে দিকে সীমান্ত সে দিকে, নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। এরকম জনস্রোত সেদিন বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে সকল প্রত্যন্ত অঞ্চলে দেখা গিয়াছিল। আহমদ ছফা যে বিশেষ দলটির বিবরণ লিখিতেছেন সেটি যাত্রা করিয়াছে মেঘনার পূর্বপারের নবীনগর হইতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে।

পিছনে পাকিস্তানি বাহিনীর তাড়া। আহমদ ছফা এক জায়গায় লিখিতেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে প্লেন থেকে বোমা ফেলছে, মেশিনগান দিয়ে নিরীহ মানুষের উপর গুলি ছুঁড়ছে। সামনে লড়াই চলছে। সামনে পিছনে দুই দিকেই মৃত্যু। মানুষজন বিলের উপর দিয়ে পিঁপড়ের মতো ঝাঁক বেধে ছুটে আসছে রেলের দিকে। দুঃসময় প্রচণ্ড দুঃসময়, সমস্ত বাংলাদেশের উপর দুঃসময় নেমে এসেছে।’ এই পর্যন্ত আসিয়া আহমদ ছফা বয়ান করিতেছেন, ‘রেলের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে মানুষগুলো দেখে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আগুনের লাল শিখা কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে উপরের দিকে উঠছে। বাতাসে খোলা জিহ্বা প্রসারিত করে বাংলাদেশের আকাশে ডাকিনী যোগিনীর মতো নেচে বেড়াচ্ছে ঘৃণাবিদ্বেষের কালো ধোঁয়া আর রোষের তাজা আগুন।’

শরণার্থীর দলটি আগাইয়া চলিতেছে। মাঝে মধ্যে পিছনে ফিরিয়া দেখিতেছে। ‘মানুষগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো হাজার হাজার বছর ধরে গভীর মমতায় তৈরি করা জীবনের রঙ্গমঞ্চ জ্বলে যেতে, পুড়ে যেতে। গোটা দলটা সর্বস্ব হারিয়ে পিতৃপুরুষের ভূমির শ্মশানদৃশ্য দেখতে দেখতে হাঁটে। কেননা স্মৃতির চেয়ে, প্রেমের চেয়ে, দুর্বলতার চেয়ে নগদ প্রাণের দামটা ঢের ঢের বেশি। আপাতত তা হারাতে কেউ রাজি নয়।’


‘পাথেয়’ গল্পটার অপর নাম ‘যাত্রাপুস্তক’ও হইতে পারিত। এই পর্যন্ত আনিয়া তিনি যাত্রীর দলটিকে থামাইলেন। স্থান তিতাসের পাড়। ‘বাঁচবার আকাক্সক্ষা সে বিশাল জনস্রোতকে সামনের দিকে ঠেলে দিলো। গোটা বাংলাদেশ রিক্ত, নিঃস্ব, অসহায় হয়ে যেন নিরুদ্দেশ যাত্রা করছে। কাঁদবার ফুরসত নেই। পেছনে তাকাবার অবসর নেই। মরবার শক্তিটুকু খরচ করে বাঁচতে চায়! জীবনের প্রতি মানুষের কি টান! তারা মাইল দুয়েক এসে তিতাস নদীর পাড়ে এসে থামে।’
এই তিতাসের পাড়েই আহমদ ছফার গল্পের নামঘটনা।

তিতাসের পাড়ে অজস্র মানুষের হাট বসেছে। অভুক্ত, অশোয়া আতঙ্কতাড়িত দিগি¦দিকজ্ঞানহীন হাজার হাজার মানুষ। কেউ নির্ভার নয়। কারো বাচ্চাকাচ্চা আছে, কেউ বয়সের ভারে কাতর, কেউ কাঁথাবালিশ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ অনর্থক একরাশ হাড়িকুড়ি নাহক প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে এতোটা পথ বয়ে এনেছে। সকলেই ওপারের যাত্রী। তিতাস পার হয়ে আখাউড়া যাবে। তারপর বর্ডার পেরিয়ে আগরতলা। এই প্রাণ হাতে করে বেরিয়ে আসা মানুষগুলোর চোখে আগরতলা নামটি সঙ্গীতের মতো বাজে, স্বপ্নের মতো আভা ছড়িয়ে দেয়।

এই ফাঁকে কেহ কেহ দুই পয়সার ব্যবসায়ও করে। ‘মানুষ অনেক। নাও কেবল দুখানা। মাঝি দর হেঁকে বসলো মাথা পিছু আট আনা। গুঞ্জন উঠলো মানুষের মধ্যে থেকে! ‘এ তো অত্যাচার, মানুষের বাইচ্চা নয়, ডাকাইত!’ কিন্তু মানুষ ঝুপ ঝুপ করে নৌকায় উঠতে থাকলো লাফিয়ে।’

নিছক মাঝির দল নহে, এই সুযোগে আরো অনেকেই চুটাইয়া ব্যবসায় করিতেছে। যে দলটি নবীনগর হইতে একবেলার পথ দুইদিনে হাঁটিয়া পাগাচং ইস্টিশানের কাছে আসিয়াছে তাহাদের সকলেই রোদে আধপোড়া হইয়াছে। ‘তেষ্টায় অনেকেরই বুক জ্বলছে। কতো গেরাম, কতো দীঘি, কতো পুকুর পেরিয়ে এলো — এক আঁজলা জল চাইতে পারেনি। পাড়ায় পাড়ায় ডাকাত লুকিয়ে আছে।’ অবিশ্বাস্য হইলেও এই সত্যে সন্দেহ রাখা চলে না। কাহিনীকার লিখিতেছেন, ‘মানুষ ভারি বেরহম। একদল মারে, আরেকদল কেড়ে রাখে শাড়ি-গামছা পর্যন্ত। উঠতি বয়সের মেয়ে থাকলে লুটে নিয়ে যায়। বিপদ বড়ো বিপদ। জন্মভূমির সবকিছুই শত্রুতা করছে। কালচে জলের লম্বা বাঁকা গাঙ্গের কাছে আকুল তেষ্টা নিয়ে আঁজলা পেতে দাঁড়াও, গাঙ্গ জল দেবে না।’

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে বাংলাদেশের যে ছবি আহমদ ছফা আঁকিয়াছিলেন তাহাকেও নিতান্ত প্রেমের গল্প মনে হইবে না। ‘রেলের লাইনের উপর দাঁড়িয়ে একজন বুড়ো মানুষ ধূতির খুটে চোখ মুছতে মুছতে ডুকরে কেঁদে উঠলো ফেলে আসা পথের দিকে তাকিয়ে। ছাওয়ালডারে জন্মের মতো রাইখা আইলাম। ভগবান তুই দয়ার সাগর।’ আরেক শরণার্থী নারী, আহমদ ছফার ভাষায়, ‘মেয়েছেলে’। ‘সারাপথে কারো সঙ্গে একটি কথাও বলেনি। তার আমের আঁটির মতো শুকনো মুখে ঢেউ খেলে গেলো। প্রথম ফুঁপিয়ে তারপর গলা ছেড়ে কেঁদে ওঠে। ও ভাই, প্রাণহরি, তুই ছাড়া থাকুম কেমনে রে।

আরেকজন গলায় কণ্ঠিপরা আধবয়সী, রাধাকৃষ্ণের ভক্ত। কণ্ঠস্বরে দরদ ঢেলে বললে, চুপ করো মা, সব ঠাকুরের ইচ্ছে।’ আহমদ ছফা একটি চিত্তাকর্ষক চরিত্র খুঁজিয়া পাইয়াছেন রমণীর মায়ের মধ্যে। ‘খাওয়ার ভারি লোভ রমণীর মার। বিধবা হলে কি হবে। একটা চ্যাংড়া বয়সের ছেলে একটা ধমক দিয়েছে। মাইনসের প্রাণ বাঁচে না, তোমার খাই খাই। দেমু নিহি একডা ধাক্কা। তারপর বুড়ি সারাপথ নিজে নিজে আকাশের দেবতাকে অভিশাপ দিয়েছে।’

এই অজস্র খণ্ডচিত্রের মেলার মধ্যেও আহমদ ছফা একটি অখণ্ড জীবনের ছবি খুঁজিয়া পাইতেছেন।

মানুষগুলো সামনে যাচ্ছে। দেশগেরামের স্মৃতিচিহ্ন অন্তর থেকে মুছে ফেলেছে, জন্মভূমির ছবি দৃষ্টি থেকে মুছে ফেলেছে। চারদিকে মৃত্যু জাল পেতেছে। তারই মধ্য দিয়ে তারা হাঁটছে। কান পাতলে শোনে কামানের গর্জন। চোখ মেললে আগুনের শিখা দাউ দাউ নাচে, আত্মীয়স্বজনের রক্ত লাল হয়ে জেগে থাকে। । তবু প্রাণের দায়। মানুষগুলো হাঁটছে।

 জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবির কয়েকটি দৃশ্যের মতো এই পর্বটা। ‘মানুষগুলো পা চালায়। কেউ কাউকে তাড়া দেয় না। কোথায় যাবে কোন পথ দিয়ে যাবে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু জানে বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় ঢুকতে হবে। তারপরে কি হবে, কি হবে তারপরে কেউ কিছু জানে না। সব অদৃষ্ট, অদৃষ্টের ফের।’ অদৃষ্ট শব্দটার একটা অর্থ যাহা দেখা হয় নাই। সেই অর্থের রূপকথা দিয়াই অপরার্থ — কপাল। কপালটা চোখের উপর বলিয়া দেখা হয় নাই — এই অর্থে কপাল বলিতে অদৃষ্ট বোঝায়।


তিতাসের পাড়ে যখন আগরতলামুখী মানুষের দল ঝুপ ঝুপ করিয়া চড়িতেছে তখন আর একটি ঘটনা ঘটিল। ততক্ষণে বেলা প্রায় পড়িয়া আসিয়াছে। অদূরে উজানীশরে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হইয়াছে। পাঞ্জাবি সৈন্যদের কামান আরো ঘন আরো জোরে গর্জন করিতেছে। আগুনের শিখা আকাশে দেদীপ্যমান হইয়া উঠিতেছে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হইয়া যাইতেছে চারিদিক। এমন সময় এক ঘটনা ঘটিল। ‘হঠাৎ মানুষের মধ্যে চাপা কিন্তু সতর্কতাসূচক আওয়াজ উঠলো। বইয়া পড়, বইয়া পড়। পেলেন আইতাছে মানুষ দেখলে গুলি ফুট করবে।’

কুমিল্লার দিক হইতে একটা প্লেন বোঁ বোঁ শব্দ করিয়া অনেক উপর দিয়া উড়িয়া আসিতেছে। শব্দ শোনা যাইতেছে। প্লেন এখনো দৃষ্টিসীমার মধ্যে ধরা পড়ে নাই। কাহিনীকার লিখিতেছেন, ‘বইয়া পড় শব্দটি মন্ত্রের মতো কাজ করলো! যে যেখানে ছিলো গুটিসুটি মেরে বসে গেলো। ব্রীজের উপরের যারা তারাও বসে গেলো। মাঝি দুজন নৌকো দুখানা ব্রীজের তলায় এনে থামালো। বোঁ করে প্লেনটা অনেক উপর দিয়ে কোনাকুনি উড়ে গেলো। খুব ছোট হয়ে মাটিতে কালো ছায়াটা পড়ে উধাও হলো।’

একজন সন্তান-সম্ভবা নারীও ছিলেন শরণপথযাত্রীর এই দলে। তাহার প্রসববেদনা শুরু হইয়াছে এই ডামাডোলের মধ্যে। ‘সে মেয়েটি তো বসেই ছিলো। প্লেনের শব্দ শুনে ব্রীজের উপর লম্বা হয়ে শুয়ে গেলো। হাতে পায়ে খিল ধরছে। পাশাপাশি তিনখানা সিøপারের উপর মেয়েটির শরীর উদরস্থ সন্তানের নিষ্ঠুর অত্যাচারে দুলে দুলে উঠছে। এবার মানুষের দৃষ্টি পড়লো তার উপর। কি ব্যাপার, কি ব্যাপার, এমন করছে কেন।’

কথার লোকের অভাব নাই। ‘মেয়েটির পাশ দিয়ে নাকে কাপড় দিয়ে একটি আধবুড়ো মানুষ হেটে এলো।’ কাহিনীকার লিখিতেছেন, ‘গলায় চাদরটি ঠিকভাবে জড়ানো আছে। ছাতাটিও সঙ্গে করে এনেছে। চেহারা দেখে মনে হয় আদালতের মুন্সি কিংবা মোক্তার কেউ হবে। ডাঙ্গায় নেমে লোকটা দু’ দুবার থুতু ফেলে বললো, ‘কি আবার হবে, মাগী ছেলে বিয়াচ্ছে। ছি এই অসময়ে। একটু লাজশরমও নাই।’

তারপর এক পর্যায়ে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর চারি কি পাঁচজন মানুষ আগাইয়া আসিল। ‘অত্যন্ত সন্তর্পণে মেয়েটার পায়ের নীচে, মাথার নীচে, পিঠের নীচে হাত দিয়ে তাকে পাড়ে নিয়ে এল। প্রচ- ভূমিকম্পে পৃথিবীর ভেতরটা যেমন কাঁপে তেমনি কাঁপছে। শরীরের ভেতর শরীর, প্রাণের ভেতর প্রাণ লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দিয়েছে।’

এই অসময়ে মানুষ কিভাবে মানুষের পাশে দাঁড়ায়, চোখে না দেখিলে বিশ্বাস হয় না। ‘একটি মেয়ে বোচকা খুলে দু’খানা পুরোনো শাড়ি বার করে দিল। আর দুজন মেয়ে মেয়েটাকে যেখানে রেখেছে তার চারদিকে শাড়ির ঘের দিয়ে দিল। একজন বেটাছেলে প্যাকিং বাক্সের ঘর যোগাড় করে এন দিল। খড়খড়ে শুকনো খড় বিছিয়ে প্রসূতির শয্যারচনা করে তাকে তার উপর শোয়ানো হলো।’ একজন দাইও জুটিল এই দুর্গ্রহের ভিড়ে। ‘রমণী কিঙ্করের মা কোনরকমে ওপাড়ে এসেছে। আকাশের দেবতার উদ্দেশ্যে গালাগাল তখনো থামায়নি। চোখের সামনে কি ঘটছে দেখেও দেখছে না। ভগবান চোখের মাথা খেয়ে বসে আছে। এতগুলো মানুষকে ঘরবাড়ি থেকে বের করে এনেছে। রমণীর মা দেখবে কেন? রমণীর মা’র এমন কি দায়।’

তাহার পরও কথা আছে। ‘বার বার দাইয়ের কথা শুনে রমণীর মা গোটা ব্যাপারটা আঁচ করে নিল। গুরুত্ব উপলব্ধি করে তার মুখের অঙ্গনে একটা মমতার ভাব নামলো, ফুটে উঠলো একটা একাগ্রতা। সৃষ্টির কাজে আহ্বান। সৃষ্টির ডাকে সমস্ত বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা সুমতি জেগে ওঠে। আকাশের দেবতাকে এ যাত্রা রেহাই দিয়ে ঘেরোটোপের ভেতর চলে এল।’ কাহিনীকার বলেন, ‘কাজে কে না লাগতে চায়। বিদ্যে কে না দেখাতে চায়।’

তাহার পর? তাহার পর সেই দৃশ্য, যাহার নাম জন্ম। আহমদ ছফা লিখতেছেন,

প্রসূতি নিজের বেদনার উত্তাপে সংজ্ঞাহীন। নতুন জীবনের জন্য সব কিছু করছে মেয়েরা। বেটাছেলেরা যারা ছিল বসে নেই। নদী থেকে জল এনে দিচ্ছে। বাঁশ দিচ্ছে। নাড়ি কাটতে সুবিধে হবে। ঘেরাটোপের ভেতরে একটা দক্ষযজ্ঞ চলছে। সকলে কান খাড়া করে রেখেছে সে দিকে। মনোযোগ এত একাগ্র যে পাকিস্তানী সৈন্যের ছত্রিশ পাউণ্ডার কামানের গর্জনও শুনতে পাচ্ছে না। সকলে যেন নিজের নিজের হৃদপিণ্ড হাতে নিয়ে বসে আছে। মুহূর্তগুলো সময়ের চালুনির ফাঁক দিয়ে মিহি বালুকণার মত ঝরছে। ইচ্ছে করলে ছুয়ে দেখতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ‘ঘেরাটোপের ভেতরে একটা তীক্ষè চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেল। প্রসূতি কঁকিয়ে উঠল। মা মা বলে চীৎকার জুড়ে দিল।’ ওঁয়া ওঁয়া আওয়াজ শুনিয়া সকলে বুঝিল মা খালাস হইয়াছেন। ‘মরণভয়ে তাড়িত মানুষেরা আরেকটি নতুন জীবনের আগমন সংবাদ শুনল। যারা হাটছিল গতি বাড়িয়ে দিল।’ আহমদ ছফার কথায়, তাহাদের ‘পায়ে চোখ ফুটেছে’।

‘পাথেয়’ গল্পের কাঠামো ছোটগল্পের। শরণার্থী শিবিরে বা যাত্রাপর্বে এই ধরনের অনেক শিশুর জন্ম হইয়াছে সন্দেহ নাই। অগণিত মৃত্যুর পটভূমিতে এই নবজাতকের কান্না, নতুন জীবনের এই আগমন সংবাদ, নতুন জাতির জন্মের আগাম বার্তা লইয়া হাজির হয় নাই — এমন কথা বলা অসম্ভব। এই রূপকথার নায়ক-নায়িকাই সেই মনুষ্যের দল যাঁহারা একটি নতুন জাতির জন্মের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, রণধ্বনি তুলিয়াছিলেন, সংগ্রামে শরিক হইয়াছিলেন। ইঁহাদের মধ্য হইতে যে নেতৃত্বের বাহির হইয়া আসিবার কথা তাহারা আজও ভবিষ্যতের গর্ভেই লুকাইয়া রহিয়াছেন।

                                     প্রথম প্রকাশ: বাংলাদেশ প্রতিদিন ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩

দোহাই
১    আহমদ ছফা, ‘আমি যদি পুরো জীবন ব্যয় করে একটি উপন্যাস লিখতে পারতাম,’ রাজু আলাউদ্দিন, আলাপচারিতা (ঢাকা: পাঠক সমাবেশ, ২০১৩), পৃ. ২১১-২৪।
২    ——— ‘ঢাকায় যা দেখেছি যা শুনেছি,’ সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০১০), পৃ. ৩৪৫-৬১।
৩    ———-‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা,’ সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত, বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, ২য় সংস্করণ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৯), পৃ. ১৪৩-২০৩।
৪  ———–‘পাথেয়,’ বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত, হে স্বদেশ: গল্প (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৭২), পৃ. ১৩৮-৪৮।

‘ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি’ — প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

রামুসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার এক বছর পূর্তি হইতে চলিয়াছে। এক্ষণে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যকার আতঙ্ক কি অবিশ্বাস তো কাটেই নাই, বরং প্রাণে মনে আশঙ্কার নিত্য পাহাড়। বিচার প্রক্রিয়া যে পথে আগাইয়াছে তাহাতে বরং নতুন সহিংসতা এমনকি সাম্প্রদায়িক আক্রমণ সংগঠনের জমিন প্রস্তুত হইতেছে। তদুপরি ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দির ও বিহার পুনর্নির্মাণের ঘটনা আপাত আনন্দের হইলেও তাহার গর্ভেই প্রথিত আছে দুশ্চিন্তার আরেক বীজ। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর সাক্ষাৎকার লইয়াছেন আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু © আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

সরকারের শেষ সময়ে এসে একরকম তাড়াহুড়া করেই ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির ও বিহারগুলো সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হল। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে এ বিষয়টি কি ধরনের প্রভাব রেখেছে?

সহিংসতার পর সরকারের যে উদ্যোগ — যেমন নিরাপত্তা দেওয়া, ত্বরিতগতিতে ক্ষতিগ্রস্ত বিহারগুলো পুনর্নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়ন করা, যারা বাড়িঘর হারিয়েছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি মিলিয়ে সরকারের যে ইতিবাচক মনোভাব — তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তারা যেভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিল তা কাটিয়ে উঠতে সরকারের এসব পদক্ষেপ অনেকটাই ভূমিকা রেখেছে।

তবে প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বিহার তো শুধু একটা ভবন না। একটা বিহারে অনেক কিছুই থাকে। অনেক কিছুই ছিল। বিশেষত শিক্ষাকেন্দ্র হিশেবে এখানে অনেক প্রাচীন, দুর্লভ ধর্মীয় ও অন্যান্য বিষয়ের পুস্তকাদি ছিল। ওগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনেক কিছুই এখানে ছিল যার কোনটাই আমরা উদ্ধার করতে পারিনি। স্বর্ণর, পিতলর, ব্রোঞ্জর, অষ্টধাতু, শ্বেতপাথরের অসংখ্য মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি লুটপাট হয়ে গেছে, ভাঙচুর করা হয়েছে, আগুনে পুড়ে গেছে, নষ্ট হয়েছে। কয়েক দফায় ১৩-১৪টি বুদ্ধমূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে বলে শুনেছি। সেগুলো প্রশাসনের কাছেই আছে। লুট হওয়া মূল্যবান মূর্তি উদ্ধারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ ছিল না। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই ক্ষতিগুলো পূরণ করা যেত। বিহারগুলোতে আগে যে পরিপূর্ণতা ছিল তাতে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সেই অভাবগুলো কিছু কিছু ভরাট করার উদ্যোগ নেওয়া হলে সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে পুরোপুরি সফল।

উদ্বোধনের পর বিহারগুলো পরিচালনা কমিটির কাছে বুঝিয়ে দিয়ে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী তো চলে গেছে। এরপরও কি এসব দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ থাকছে?

এগুলো বারবার আলোচনায় এসেছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা আমাদের বারবার বলেছেন, এখন সময় কম, উদ্বোধন করতে হচ্ছে। তারা ভরসা দিয়েছেন উদ্বোধনের পরও কাজ করা হবে। অবশ্য উদ্বোধনের প্রথম তারিখ পিছিয়ে যাওয়ার পর কিছু কাজ পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে। শুনেছি পরবর্তীতে ফারিকুল বিবেকারাম বৈাদ্ধবিহারে কিছু কাজ করা হয়েছে।

উদ্বোধনের পর পূজারিরা আগের মত পূজা, বন্দনা এবং উপাসনা শুরু করেছেন। দেশ ও বিশ্বশান্তি কামনায় নিয়মিত প্রার্থনাও হচ্ছে। তবে পুরো বিহার জুড়ে ফাঁকা ফাঁকা পরিবেশ বিরাজ করছে।

আপনি জুন মাসে একটি লেখায় বলেছিলেন যেই নকশায় বিহারগুলো নির্মাণ হচ্ছে তাতে অনেক পূজারি সন্তুষ্ট নন এবং এভাবে নির্মাণ করায় বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ফিরে আসবে না। একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আমি বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক জায়গা থেকেই বলেছিলাম। কিছু বিহারে অনেক বেশি কাজ হয়েছে — ল্যান্ডস্কেপ ও শোভাবর্ধনের কাজের মাধ্যমে পর্যটনবান্ধব একধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এদিকে লক্ষ্য করার বিষয় হল আমাদের উপাসনালয়ে নারী পূজারির সংখ্যা বেশি। তারা একটু ঘরোয়া, পরিপাটি পরিবেশ পছন্দ করেন। তাছাড়া গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বরের পর থেকে সবার মধ্যে অন্যরকম মনমানসিকতা বিরাজ করছে। তাই পূজারিরাও চাচ্ছিল, সৌন্দর্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘরোয়া পরিবেশ ও মন্দিরের সুরক্ষা বিধানের জন্য সীমানাপ্রাচীরগুলো যাতে যথাযথভাবে নির্মাণ করা হয়। আমি এটুকুই শুধু বলেছিলাম যে সীমানাপ্রাচীরের অভাবে পূজারিরা পুরোপুরি খুশি হতে পারছেন না।

পুনর্নির্মিত চাকমারকুল অজন্তা বৌদ্ধ বিহার © আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

পুনর্নির্মিত চাকমারকুল অজন্তা বৌদ্ধ বিহার © আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

আমি ইতিবাচক জায়গা থেকেই বিষয়টা সামনে এনেছিলাম। হয়তো অনেকের খারাপ লেগেছে, অনেকে ক্ষুব্ধ, ব্যথিত হয়েছেন। এজন্য আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু আমার পর্যবেক্ষণে আমি যা দেখেছি শুধু তাই শালীনতা বজায় রেখে, নিরপেক্ষভাবে বলার চেষ্টা করেছি।

এছাড়া, বৌদ্ধবিহারগুলো দেখতে সাধারণ ভবন থেকে আলাদা। সীমা বিহার সহ কয়েকটি বিহারে কারুকাজ যুক্ত করা হয়েছে। কারুকাজগুলো অলঙ্কারের মত, এগুলো না থাকলে ভবনগুলো শুধু প্রাসাদের মতই দেখাত। কারুকাজগুলো হওয়াতে দূর থেকেই বোঝা যায় এগুলো বৌদ্ধবিহার। এর মাধ্যমে ঐ বিহারগুলোর কাজের মান, আবেদন, আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এ কাজগুলো যাতে সকল জায়গাতেই করা হয় সে বিষয়েও আমি গুরুত্ব দিয়েছিলাম।

মাত্র দুই জায়গায় — সীমা বিহার ও বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে — কারুকাজগুলো যুক্ত করা হয়েছে। তার মানে অধিকাংশ পুনর্নির্মিত মন্দির আপনার বক্তব্য অনুযায়ী মন্দির হয়ে উঠছে না, বিল্ডিং থেকে যাচ্ছে।

আমি ঠিক এরকম বলিনি। অন্যান্য মন্দিরে কয়েক ধাপ বিশিষ্ট চূড়া নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, একধরনের বৌদ্ধিক কারুকাজ। আমরা বলতে চাচ্ছিলাম, সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই বাকি বিহারগুলোতে যদি অলঙ্করণগুলো কিছু পরিমাণে করা যেত তাহলে সেগুলোর আবেদনও সীমা বিহারের আবেদনের মত বেড়ে যেত।

ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের নকশা ও রীতিনীতির প্রায় অনুরূপভাবে মন্দিরগুলো পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে শতাধিক বছরের ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছিল একটি বেসরকারি সংস্থা। পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রায় শুরুতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল এবং ইউনেস্কোর সহায়তা পাওয়ারও সুযোগ ছিল। এমনকি সরকার একটু উদ্যোগী হলে পুরো রামুকে হেরিটেজ জোন হিসেবে তৈরি করাও সম্ভব ছিল। শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটল না কেন?

আমি যতদূর জানি তারা চেয়েছিল প্রাচীন, কাঠের যে মন্দিরগুলো বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ধারণ করে আছে সেগুলো সংরক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে। আর সরকারি উদ্যোগে যে নতুন বিহারগুলো হচ্ছে সেগুলোও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য ও প্রাচীন, ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরের প্রায় অনুরূপ নকশায় নির্মাণ হোক। তারা সার্বিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তারা আমাদের কমিউনিটির সাথেও কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের কমিউনিটি তাদের সাথে একমত হতে পারেনি। অনেকে মনে করেছে কারুকাজ ও বৌদ্ধিক নিদর্শন রেখে কাজ করা সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তার উপর সরকারিভাবেও বারবার বলা হচ্ছিল যে সময় খুব কম, ঐ সময়ের মধ্যেই যেভাবে করা যায় করে নিতে হবে। বেশি সময় নিলে মন্দিরটা নাও হতে পারে — এই ধরনের আশঙ্কাও কারও কারও মধ্যে কাজ করেছে। বিহার কর্তৃপক্ষরা কে কত তলার আলিশান ভবন পাবেন সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। ধৈর্য ধরা, অপেক্ষা করার মত মনমানসিকতা তাদের মধ্যে ছিল না। বিভিন্ন তোড়জোড়, টানাপোড়নের কারণে শেষ পর্যন্ত কেউ পুরানো নকশায় মন্দির নির্মাণে আগ্রহী হয়নি। ঐ কাজগুলো করা গেলে আমাদের বৌদ্ধবিহারগুলো প্রাণ পেত, সেগুলো আরো দীর্ঘস্থায়ী হত, ঐতিহ্যগুলো টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মাইলফলক পদক্ষেপ হত। আমরা আসলেই একটা বড় ভুল করে ফেলেছি। একটা বড় সুযোগ ছিল, তা হাতছাড়া হয়ে গেল। ক্ষতিটা খুবই দুঃখজনক।

ল্যান্ডস্কেপ ও শোভাবর্ধনের কাজ যেসব মন্দিরে হয়েছে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি কি সরকারই করবে, নাকি মন্দিরগুলোকেই সেই বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হবে?

এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে তেমন কোন আলোচনাও হয়নি। এগুলো হয়তো মন্দির কর্তৃপক্ষকেই দেখতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতি মাসে কিছু বাড়তি খরচ করতে হবে।

পর্যটন বান্ধব পরিবেশ তৈরি হওয়ায় মন্দিরগুলোতে পর্যটক আসা বেড়ে যেতে পারে। এতে পূজারিদের পূজা অর্চনায় বিঘœ ঘটার সম্ভাবনাও থেকে যায়। এই সমস্যা মোকাবেলায় আপনারা কি করছেন?

কিছু কিছু বিহারে পারিপার্শ্বিক সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। এমন কাজের পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল পর্যটনবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা, পর্যটকদের আকৃষ্ট করা। আমরা একে অভিনন্দন জানাই। বৌদ্ধবিহারগুলো নিঃসন্দেহে পর্যটক আসার মত কিছু স্পট। কিন্তু আবার একই সাথে মনে রাখা দরকার, এগুলো কোন উদ্যান নয়। সাধারণত কোন উদ্যানে মানুষজন সবসময় যাওয়া আসা করতে পারে, হৈচৈ করতে পারে, আড্ডা দিতে পারে। আর বৌদ্ধবিহারে মানুষ প্রার্থনা করে, ধ্যান করে, পড়াশোনা করে — সবকিছু মিলিয়ে শান্ত একটা পরিবেশ বৌদ্ধবিহারে বজায় থাকে। পর্যটকরা সম্মানবোধ, শালীনতাবোধ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতি বজায় রেখে এখানে আসা যাওয়া করলে কোন সমস্যা নেই। এই ন্যূনতম বিষয়গুলো অনেক সময় মানা হয় না। অনেকেই এসে বুদ্ধমূর্তি জড়িয়ে ধরে ফটোসেশন করেন, বসে আড্ডা দেন, গল্পগুজব করেন, বিহার প্রাঙ্গণে জুতা পায়ে বিচরণ করেন। এগুলো করতে বাধা দিলে বাড়াবাড়ি করেন। ফলে পর্যটকদের অবাধ আসা যাওয়া বুদ্ধবিহারের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেরকম কোন পরিস্থিতি তৈরি হলে বুদ্ধবিহারগুলোর জাঁকজমকপূর্ণ সংস্কার আমাদের ভালর চেয়ে খারাপটাই করবে।

ঘটনার আগেও আমাদের এখানে পর্যটক এসেছেন। আমরা কখনোই কারও কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। এখন পর্যটকরা ভাবতে পারেন এখানে জনগণের টাকায়, সরকারিভাবে পর্যটনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, ফলে কেউ বাধা দিতে পারবে না। এরকম ভাবনার ফলে ঝামেলা হতে পারে। বিহারের রীতিনীতিগুলো আমরা যদি তাদের বোঝাতে না পারি, তারা যদি এগুলো বুঝতে না চান, তাহলে মনোমালিন্য, ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কাও থেকে যায়।

তাছাড়া কোন প্রকার বাধাগ্রস্ত হলে পর্যটকরা মনে করতে পারেন গত বছরের ঘটনার জন্যই তাদেরকে বাঁকা চোখে দেখা হচ্ছে, দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে, আগে যেমন আমাদের রীতিনীতি, সমস্যাগুলো পর্যটকদের বুঝিয়ে বলতে পারতাম, তাদের মন রক্ষা করতে গিয়ে এখন হয়তো তা বলতেই পারব না। বোঝানো তো পরের কথা। হয়তো আমাদের পুরোই উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তারা যদি আমাদের বিষয়গুলো বিবেচনা করেন তো ভাল, নইলে আমাদের দুর্ভোগ পোহাতে হবে। পুরো বিষয়টা নিয়ে আমরা এখন রীতিমত চিন্তিত।

রামু শহরের মন্দিরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোটামুটি ভাল হলেও শহর থেকে দূরে, গ্রামের মধ্যকার বিহারগুলোর নিরাপত্তায় তেমন কোন ব্যবস্থা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সীমানাপ্রাচীর পর্যন্ত নেই। পূজারি এবং বিহারের ভিক্ষু-শ্রমণদের প্রার্থনা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এগুলো কি ধরনের প্রভাব রাখছে বা ভবিষ্যতে রাখতে পারে?

গত ২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনার আগে আমরা কখনো নিজেদের সংখ্যালঘু কিংবা অনিরাপদ ভাবিনি। ঐ ঘটনার পর অনেকের মনমানসিকতা বদলে গেছে, অনেকের মধ্যে এখনো আতঙ্ক, ভীতি বিরাজ করছে। অনেকে সান্ত¡নামূলক, বা কাউকে খুশি করার জন্য হয়তো বলবে আমরা এখন আবার সেই আগের মতই সুখে শান্তিতে আছি। কিন্তু সেই কথা ঠিক না। মনের ক্ষত শুকাতে আরো সময় লাগবে।

ঘটনা ঘটার পর প্রশ্ন উঠল, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় কিভাবে এমন ঘটনা ঘটল; বিভিন্ন দপ্তর, নিরাপত্তা বাহিনী কেন নিরাপত্তা দিতে পারল না? সে সময়ে এসপি সেলিম মাহমুদ জাহাঙ্গীর অজুহাত দেখিয়ে বলেন, পুলিশের সংখ্যা পর্যাপ্ত ছিল না বলে যথাসময়ে তারা প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। একইভাবে, প্রশাসন থেকেও একই কথা বলা হয়েছে — প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যবস্থার স্বল্পতার কারণে তারা কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য পদস্থ কর্মকর্তা ঐ ঘটনার পর একরকম কমিটমেন্ট করে গিয়েছিলেন যে এখানে স্থায়ীভাবে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। ঘটনার পর এক বছর হয়ে গেল। যতই সময় গড়িয়েছে, আমরা বরং দেখলাম ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গা থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এখনো দেখা যাচ্ছে, অনেক জায়গায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আতঙ্ক এখনো কাটেনি, আস্থার জায়গাটা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। এই মুহূর্তে নিরাপত্তা জোরদার করাটা বেশি দরকারি ছিল। আমি যতদূর জানি, মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্তও হয়েছিল পৃথকভাবে শুধুমাত্র কক্সবাজার জেলায় কিছু নতুন পদ সৃষ্টি করে সাতশ’র কাছাকাছি পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হবে। এ কাজটি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। যেখানে জনবলের অপর্যাপ্ততার কথা বলে প্রশাসনের অনেকেই পার পেয়ে গেছে, সেখানে ঘটনার এক বছর পরও জনবল বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

প্রসাশনিক নিরাপত্তা বাড়ানো হলে ভাল হবে। এটা ক্ষতিগ্রস্তদের একটা দাবি। তবে এটাও স্বীকার করছি যে বাংলাদেশ পুলিশি রাষ্ট্র নয়। পুলিশ প্রহরা বসিয়ে সম্প্রীতি রক্ষা করা সম্ভব নয় এবং সেটি সম্প্রীতির লক্ষণও নয়। পুলিশ প্রহরায় বাঁচাটা আমার জন্য অপমানজনক এবং প্রতিবেশী অবৌদ্ধদের জন্যও অপমানজনক। সম্প্রীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিবেশীদের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনার জন্য জোরাল কোন উদ্যোগ তো গত এক বছরে দেখা যায়নি। আপনি কি মনে করেন সম্প্রীতি আপনা আপনি ফিরে আসা সম্ভব?

সরকারের উদ্যোগে মৈত্রী কমিটি গঠন করার আওয়াজ উঠেছিল কিন্তু পরবর্তীতে সম্ভবত সেটা প- হয়ে গেছে। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসন ও কিছু বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে কিছু কিছু সম্প্রীতি সমাবেশ হয়েছে। এর বাইরে মাঠ পর্যায়ে তেমন কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে আরো কিছু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল। সম্প্রীতি সমাবেশগুলো কোন ভবনে গ-ীবদ্ধ না রেখে সেগুলো খোলা মাঠে সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজন করা গেলে ভাল হত। ফেসবুকের ব্যবহার ও অপব্যহার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা যেত। অথবা কোন প্রকার অপরাধ সংঘটিত হলেও, নাগরিক হিশেবে, প্রতিবেশী হিশেবে আমাদের প্রথম কি করণীয়, সহিংসতায় না গিয়ে কোন ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায় এই বিষয়গুলো নিয়ে জোর প্রচারণা চালানো উচিত ছিল। এগুলো আমরা এখনো ব্যাপক হারে, গণহারে করতে দেখিনি।

আপনি বলছেন কোন উদ্যোগ নিতে দেখিনি, কিন্তু আপনারাই বা কেন উদ্যোগ নিলেন না? বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলামানরাই কেন উদ্যোগ নিল না? সমন্বিতভাবে রামুবাসী কেন কোন উদ্যোগ নিল না?

আমরা একেবারেই কোন উদ্যোগ নেইনি তা নয়। ঘটনার কয়েক মাস পর যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসছিল তখন আমরা রামুর কিছু হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ মিলে বিভিন্ন স্থানে সম্প্রীতি সমাবেশের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু সহযোগিতার অভাবে ও বিভিন্ন টানাপোড়নের কারণে সেগুলো বেশিদিন চালানো যায়নি। গণমানুষ ও সুধী সমাজের অংশগ্রহণের অভাবে আমরা উদ্যোগগুলো গুটিয়ে নেই। আর যারা অব্যাহত রাখতে পারত তারা সেভাবে উদ্যোগ নেয়নি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্যোগে এগুলো চলমান রাখা উচিত চিল। এমন প্রচারণার প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে।

এমতাবস্থায়, গত এক বছরে রামুর বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস বা সম্প্রীতি কতটুকু ফিরেছে? এক্ষেত্রে কোন জায়গাগুলোতে মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল, কিন্তু দেওয়া হয়নি?

আমরা এখনো পুরোপুরি আগের জায়গায় ফিরতে পারিনি — একথা ঠিক। তবে সম্প্রীতি যে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে তাও নয়। যে ক্ষত তৈরি হয়েছে তা সারাতে আরো কিছু সময় লাগবে, সকলের সহযোগিতা লাগবে। এক্ষেত্রে, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দায়ের করা মামলা, গ্রেফতার, জামিন, আটক রাখা ইত্যাদি বিষয়ও সম্পর্কিত। মামলাগুলোর বিচারকাজ এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যেন ভুল করেও একজন নিরীহ, নির্দোষ মানুষ শাস্তি ভোগ না করে। আমরা দেখেছি এ ঘটনার সাথে রাজনীতি, প্রতিহিংসা, শত্রুতা ইত্যাদি এসে যুক্ত হয়েছে। এ বিষয়গুলো সম্প্রীতির জন্য ক্ষতিকর। সন্দেহভাজন আসামীদের তালিকা দীর্ঘ হয়ে গেলে, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই দিনের পর দিন কাউকে কারাভোগ করতে হলে তাদের মধ্যে একপর্যায়ে ক্ষোভ জমে যাবে। এর ফলে পরে বিচ্ছিন্ন সহিংসতা ঘটতে পারে। এমনকি তা সাম্প্রদায়িক রূপও নিতে পারে।

এছাড়া, আমি বলতে চাই, ঘটনাটা আচমকা ঘটেনি। ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের যেমন একটা দায়বদ্ধতা আছে, তেমনি ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাদের উপর ছিল — তাদের ব্যর্থতা বা সম্পৃক্ততা যাই হোক — তাদেরও তো একটা দায়বদ্ধতা আছে। দোষ যদি হয়ে থাকে তাহলে তাদেরও হয়েছে। কিন্তু এখন কষ্ট পাচ্ছে শুধু এক পক্ষ — হামলাকারী। যাদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করার কথা তারা যদি বারবার অবহেলা করেন, তাহলে ঘটনাগুলো বারবার ঘটতেই থাকবে। যখনই সাম্প্রদায়িকতার আশঙ্কা দেখা যাবে তৎক্ষণাৎই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ক্ষতিপূরণ দেওয়া, অপরাধীদের ধরা, শাস্তি দেওয়া পরে আসছে — ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এগুলোর কোন কিছু দিয়েই ক্ষতিটা পূরণ করা যায় না। যারা ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদেরও ক্ষতি হচ্ছে। তার চেয়ে ঘটনা ঘটার আগে রোধ করতে পারলেই বরং ভাল।

এখানকার বড়–য়ারা একটা অসাধারণ জীবন কাটাচ্ছিল। এই ঘটনা না ঘটলে এত আয়োজনের প্রয়োজন ছিল না।

ঘটনার এগার মাস পর, সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুইদিনে মোট সাতটি মামলায় সব মিলিয়ে ৩৬৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হল। চার্জশিটে কাদের অভিযুক্ত করা হল, আর চিহ্নিত কারা চার্জশিট থেকে বাদ পড়ল? মামলায় এ বিলম্বের ফলে কি ধরনের বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে?

গত সেপ্টেম্বরের ২ ও ৩ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যে সাত মামলার অভিযোগপত্রে মূল আসামীদের কারও নাম নেই। যারা সন্দেহভাজন আসামী হিশেবে আটক ছিল চার্জশিটে তাদের নাম এসেছে। মামলার চার্জশিট গঠনে বিলম্ব হলেও ভাল হয় যদি মূল আসামীদের শনাক্ত করা যায়। আমরা আশা রাখব বাকি মামলার চার্জশিট গঠনে পূর্ণ সতর্কতা এবং নিরপেক্ষতা অবলম্বন করা হবে।

পুরোপুরি আন্তরিকতা থাকলে মামলার তদন্তে এত সময় লাগার কথা না। এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মামলায় কেন এত বিলম্ব হবে? বিলম্ব যখন হয়েই গেছে, এখন লক্ষ্য রাখতে হবে নির্দোষ কেউ যেন শাস্তির শিকার না হয়। মামলার বিলম্ব বিড়ম্বনাই শুধু বাড়াবে। সন্দেহভাজন হিশেবে যাদের আটক করা হয়েছে তারা বিচারের আগেই প্রায় এক বছর জেল খেটে ফেলল। তাদের পরিবার, জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের মনও ধীরে ধীরে বিষিয়ে ওঠার কথা। এই বিষয় পরে অন্যদের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু এ বিষয়ে কাউকে কোন কথা বলতে দেখা যায়নি। কেন?

অত্যন্ত বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা হওয়ায় তার প্রতি প্রতিক্রিয়াও অনেকটা একপেশে হয়ে গেছে। কোন মানবাধিকার সংগঠনও তাদের হয়ে কথা বলতে এগিয়ে আসেনি। অপরাধীদের বা অভিযুক্তদের পক্ষে বা তাদের হয়ে কথা বলার মত কোন লোক পাওয়া যায়নি। কিন্তু আমি মনে করি, তাদের কথাও বিবেচনা করা দরকার। বিনা বিচারে, বিনা প্রমাণে কোন মানুষ এতটা দিন কারাগারে অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে পারেন না। যেমন আমরা বলছি, আমরা তো নির্দোষ, কোন অপরাধ করিনি। বিনা অপরাধে আমাদের কেন এত বড় সহিংসতার শিকার হতে হল — এই আমাদের দুঃখ। কেউ দোষী হলে প্রমাণ সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় আইনে তার বিচার হবে। সেটা আমাদেরও দাবি। কিন্তু যে জড়িত নয় তাকে যদি বিনা বিচারে বা ভুল বিচারের কারণে শাস্তি ভোগ করতে হয়, তাহলে তো তার মধ্যেও ঠিক আমাদের মতই দুঃখ চলে আসবে।

নিঃসন্দেহে এটা মানবাধিকারেরও প্রশ্ন। এর মধ্যে আরো কিছু আশঙ্কাও আছে। তাদের এই অন্যায় শাস্তিভোগের কারণে ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা তৈরি হতে পারে, তা থেকে ঘটতে পারে বড় ধরনের সহিংসতা। ক্ষোভ আর প্রতিহিংসা যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তার প্রমাণ তো গত বছরের ঘটনার মধ্য দিয়ে মিলেছে। একই ঘটনা যেন আর না ঘটে সে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখনো সময় আছে। মানবিকতার দিক বলুন, মানবাধিকারের দিক বলুন আর আস্থা বা সম্প্রীতির দিক বলুন সব দিক দিয়েই নিরপরাধের শাস্তিভোগ অনাকাক্সিক্ষত ও ক্ষতিকর। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।

নিরপরাধ লোকের জেল খাটার বিপরীতে অনেক আসামী অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বিচার না হওয়াটা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজনকে কিভাবে প্রভাবিত করছে?

যাদের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল, ছবিতে দেখা গেল, তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের নাম আসল, তাদের অনেকেই এখনো আইনের বাইরে। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকের মধ্যেই এ নিয়ে দুঃখ আছে। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে আমি কারও শাস্তি কামনা করতে পারি না — অপরাধ করলেও না। ক্ষতিগ্রস্তরা এবং বোদ্ধামহল যা বলছেন তা হল অপরাধ করে অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে, বিচার বা জবাবদিহিতার মুখোমুখি না হলে অপরাধীর মধ্যে বোধোদয় হবে না। ফলে সমাজে, ধর্মে, রাষ্ট্রে অনাচার আরো বেড়ে যাবে। সেজন্যই তাদের বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তরা যাদের অপরাধ করতে দেখল, তার ভগবানের মূর্তিকে ভাঙচুর করতে দেখল, তার থাকার শেষ সম্বল বাড়িঘরে আগুন দিতে দেখল, সেই মানুষগুলোই যখন তাদের সামনে অবাধে ঘুরে বেড়ায় তখন ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আশঙ্কা, আস্থাহীনতা, হীনমন্যতাবোধ কাজ করা স্বাভাবিক। তাকে আবার আস্থাশীল করার জন্য, তাকে সান্ত¡না দেওয়ার জন্য, তার ক্ষোভ প্রতিহিংসা লোপ করার জন্য অপরাধীদের রাষ্ট্রীয় আইন, বিচারের মুখোমুখি করা দরকার।

বিহারগুলো আমাদের পরিচিতি, ঐতিহ্য। বুদ্ধের স্থান শুধু মন্দিরে না আমাদের হৃদয়েও। সেদিন বিহারের বুদ্ধ শুধু পোড়ে নাই, আমাদের মনও পুড়েছে। পুনর্বাসন, পুনর্নির্মাণ এগুলো যেমন ক্ষত শুকাতে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নয়নে কাজ করেছে, তেমনি সেই ক্ষতের স্থায়ী উপশমের জন্য প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দরকার ছিল। কিন্তু ঘটনাটা কারা ঘটাল, কাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, কোথায় কারা পরিকল্পনা করেছে এ বিষয়গুলো রাষ্ট্র এখনো শনাক্ত করতে পারেনি। যারা ঘটনাটা ঘটাল তাদের অধিকাংশই পার পেয়ে গেছে। তারা সফল। বিষয়টাকে যত হালকাভাবে নেওয়া হল, তার অর্থ একটাই — এরকম ঘটনা রোধ করা যাবে না, এগুলোকে বাস্তবতা হিশেবে মেনে নিতে হবে। রামুর ঘটনা যেমন শুরু না, তেমনি শেষও না।

অনেক বিশ্লেষক গত বছর মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর সংগঠিত সাম্প্রদায়িক হামলার সাথে রামুর সাম্প্রদায়িক হামলাকে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করেছেন। আপনি কি এরকম কোন সম্পর্ক বা প্রভাব দেখেন?

ব্রিটেন থেকে স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর থেকেই মায়ানমারে জাতিগত দাঙ্গা ও সহিংসতা লেগে আছে। মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, হামলা করা হচ্ছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করা হচ্ছে না। এগুলো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হওয়াতে মায়ানমারের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব আমাদের উপর পড়েছে নিঃসন্দেহে। ওখানকার জাতিগত সহিংসতা এদেশের সাধারণ অনেক মানুষের মাঝে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। তাদের অনেকেই সুযোগ পেয়ে ২৯ সেপ্টেম্বরের হামলায় যোগ দিয়েছে — এ কথা অস্বীকার করার জো নেই। আমার মনে হয় অনেক কারণের মধ্যে মায়ানমারের ঘটনাগুলোও কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সাথে সাথে এটাও বলব, কোন দেশে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ঐ জাতি-ধর্ম অন্য যে দেশে সংখ্যাগুরু সেখানে বদলা নেওয়াকে ভাতৃপ্রেম বলে মনে করা হলে তা হবে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এতে সাম্প্রদায়িকতা বরং বৃদ্ধিই পাবে, ছড়িয়ে পড়বে। আমরা আহ্বান জানাব, যে দেশেই সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে তা প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। সরকার, প্রশাসন, সাধারণ জনগণকে মিলেমিশে একসাথে কাজ করতে হবে।

মায়ানমারে দাঙ্গা হলে জনগণ জীবন রক্ষার্থে খুব ভরসা নিয়েই বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করে। ২০১২ সালের দাঙ্গার সময় অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদী হয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু সরকারের কড়া পাহারার কারণে অনেকে আসতে পারেনি। অনেকে বাধ্য হয়ে নদীতে ভেসেছে, অনেকে মায়ানমারে ফিরে গেছে, সহিংসতার শিকার হয়েছে। এভাবে তো মানুষ বাঁচতে পারে না। এটাও তো মানবাধিকার লঙ্ঘন। যাহোক, ঘরছাড়া লোকদের জায়গা দিতে গিয়ে বাংলাদেশকে ভুগতে হয়। তার উপর ওখানে ঘটনা ঘটলে এখানকার সংখ্যালঘুদের উপরও তার রেশ পড়ে। এজন্য ওখানকার সহিংসতা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ সরকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মায়ানমার সরকারের সাথে কথা বলতে হবে। সমস্যা সমাধানে দুই রাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগ খুব জরুরি।

অনুলিখন: মাহবুবুল হক ভূঁইয়া

সম্পাদকীয়: মজুরি ও লংমার্চ

Sundarban

যে কোন দেশে যে কোন শিল্পের প্রধান হাতিয়ার শ্রমিক। তাহার কাজের কি মজুরি হইবে সেই মানদণ্ড কমবেশি সকল দেশেই রহিয়াছে। এই মান দেশের বর্তমান বাজার মূল্যের সহিত অবশ্যম্ভাবী সম্পর্কযুক্ত। ইহা ছাড়াও শিল্পের মালিক শ্রমিকের সম্পর্ক, কোন শ্রেণির সরকার রাষ্ট্র চালাইতেছে তাহা এবং সর্বোপরি শিল্পোন্নতির কোন স্তরে দেশটি রহিয়াছে তাহাও মজুরি নির্ধারণে নিয়ামক হিশাবে কাজ করে।

বর্তমানে বাংলাদেশে তৈয়ারি পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি হইতেছে মাসে ৩,০০০ টাকা। বর্তমান বাজার মূল্যের সহিত ভারসাম্য আনিতে সরকার ইতিমধ্যেই ঘোষণা করিয়াছে মজুরি স্কেল নতুন করিয়া নির্ধারণ করিবে। পোশাক শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন বাজারদরের সহিত তুলনা করিয়া তাহাদের ন্যূনতম মজুরি ৮,১০০ টাকার সামান্য বেশি দাবি করিয়াছে। সিপিডি নামক এনজিও হিশাব কষিয়া ন্যূনতম উচিত মজুরি বলিয়া যাহা বাহির করিয়াছে তাহাও এই অঙ্কের কাছাকাছি। আদপে সামান্য বেশিই — ৮,২০০ টাকা। অন্যদিকে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা মানিয়া লইলেও তাহারা মাসিক ৬০০ টাকা হারে মজুরি বাড়াইতে পারিবে বলিয়া মজুরি বোর্ডকে জানাইয়াছে। বাস্তবতা বিবর্জিত এহেন প্রস্তাব বিগত এক সপ্তাহের শ্রমিক অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ বৈকি।

পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা শ্রমের দেশ হিশাবে দুনিয়াতে নাম কামাইয়াছে বাংলাদেশ। এই সস্তা শ্রমের ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে মালিকেরা কঠোরহস্ত। তাহাদের লোভের কাছে শ্রমিকের ঘামের তো নয়ই, জানেরও কোন দাম নাই। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রায় ঋতু পরিবর্তনের মতই পোশাক কারখানায় আগুন লাগিলে কিংবা তাহা ধ্বসিয়া পড়িলে শুদ্ধ শ্রমিকের জানই কোরবানি হইয়া থাকে। এমতাবস্থায় শ্রমিকেরা তাহাদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে এক বিশাল সমাবেশ করিয়াছে। অবশ্য এই সমাবেশ আয়োজনের পিছনে শ্রমিকদের ন্যায্য ক্ষোভকে পুঁজি করিয়া সরকারের বিশেষ মন্ত্রীবাহাদুরের ফায়দা হাসিলের চেষ্টাও অনেকে চিহ্নিত করিয়াছেন। তবে আমরা দৃঢ়কণ্ঠে বলিতে চাই, সরকারের সৈন্যসামন্তরা প্রকৃত প্রস্তাবে অদ্যাবধি শ্রমিকদের প্রকৃত বন্ধু যেমন হইতে পারে নাই, তেমনি তাহাদের উস্কানিতে শ্রমিকরা মাঠে নামিয়াছে বলিয়া যাহাদের দাবি তাহারাও সত্য হইতে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করিতেছে।

যাহারা বিশৃঙ্খলা রক্ষার দোহাই পাড়িয়া শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির ন্যায্য দাবিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সমান্তরালে স্থাপন করিতেছে তাহারা এই বিশৃঙ্খলার আসল দায় যাহাদের প্রাপ্য তাহাদেরই আড়াল করিতেছে মাত্র। স্পষ্ট করিয়া বলিতে হইবে, কারখানার মালিক আর মালিক সমিতিই দিনের পর দিন মাসের পর মাস ধরিয়া তাহাদের লাভের অঙ্ক বাড়াইবার বিপরীতে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার হইতে ক্রমাগত বঞ্চিত করিয়া এই ক্ষোভের আগুন জ্বালাইয়াছে। বিশৃঙ্খলার দায় তাই প্রথমত মালিকদেরই প্রাপ্য।

এই দিকে ঢাকা হইতে বাগেরহাটের রামপালের উদ্দেশ্যে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির উদ্যোগে এক বিরাট কাফেলা সুন্দরবন রক্ষায় লংমার্চ করিতেছে। বিগত দশক ধরিয়াই দেখা যাইতেছে বিভিন্ন বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের নাম করিয়া বাংলাদেশে হাজির হইতেছে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের তাগিদে। কিন্তু এই সকল প্রকল্প কতটুকু দেশ ও জনগণের প্রকৃত উন্নতির কথা বিবেচনা করিয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে তাহা লইয়া প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠিয়াছে। বরং দেখা গিয়াছে জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্র এবং কোম্পানির মুনাফা করিয়া দিতেই আমাদের সরকারগুলো বেশি তৎপর। এক্ষেত্রে সরকার ও তাহার প্রতিনিধিরা যে ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা হাতাইয়া লয় ও জনগণকে পশুর ন্যায় মনে করে তাহা বিগত জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর ঘুষ ও ফুলবাড়িতে গুলি করিয়া মানুষ মারার মধ্য দিয়া প্রমাণিত হইয়াছে। এইবারে, বাগেরহাটের রামপালে স্থাপিত হইতে যাওয়া কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেলায়ও দেশের বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে ভারত সরকারের লাভ করিয়া দিবার অভিযোগটি আরো জোরের সহিত সামনে আসিতেছে। ইহাতে আমাদের কোন মন্ত্রীর কি লাভ হইল তাহা বলিবার সময় অবশ্য এখনো আসে নাই।

জনগণ প্রগতি বিরুদ্ধ নহে। দেশের বিদ্যুৎ ও শক্তির সংকট মোকাবেলায় জনবান্ধব নীতির বিকল্প নাই। ভারতের একটি বাঁধের কারণে পদ্মা ধ্বংস হইয়াছে। সুন্দরবনকে বাঁচাইতে হইবে।