Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ২৬

সম্পাদকীয়: জনদরদি শক্তির দায় বাড়িতেছে ঢের!

BCL attack on CPB rallyবিগত সপ্তাহে সিলেটে বাসদ-সিপিবির জনসভায় ছাত্রলীগ এক ন্যক্কারজনক হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্মুখে সংঘটিত হামলায় সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ বাসদ-সিপিবির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা আহত হন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ যে ক্রমেই বিষাক্ত হইয়া উঠিতেছে ছাত্রলীগের এই হামলা তাহারই নবতর নিদর্শন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার মেয়াদোত্তীর্ণ হইবার খানিক আগে এই শাসনামলের সালতামামি করিতে বসিলে দেখা যাইবে তাহাতে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগের সহিংসতারই বাড় বাড়ন্ত। সেসবের মূল কারণ ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা। টেন্ডারবাজি, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল, বাজার হাটের ইজারা, চাকরির সুপারিশ প্রভৃতি কর্মে তাহারা সর্বদাই বেপরোয়া। গণতান্ত্রিক একটি দেশে এহেন কর্মকাণ্ড করিতে গিয়া তাহারা মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিকে পেশির জোরে খেদাইয়া দিয়াছে। মুষ্টিমেয় রাজনৈতিক নেতার যোগসাজসেই এই সকল ব্যবসায়ের বিলি বণ্টনের ব্যবস্থা হইয়া থাকে।

এহেন অগণতান্ত্রিক পন্থায় সারাদেশের মানুষ জিম্মি হইয়া পড়িয়াছে। প্রশাসনকে হাতের কব্জায় রাখিয়া এই ধরনের দুর্বৃত্তপনায় নিমজ্জিত থাকিয়া ক্ষমতাশীল দলের নেতাকর্মীরা দেশের জনগণ কিংবা বিরোধীদলসমূহকে নিপিড়ন করিয়াই ক্ষান্ত থাকে নাই বাটোয়ারার প্রশ্নে তাহারা নিজ দলের নেতা, কর্মীদেরও প্রতিপক্ষ আকারেই দেখিয়াছে। ফলে যে কোন সময়ে যে কোন উছিলায় একই সংগঠনের নেতাকর্মীরা আত্মঘাতী যুদ্ধে জড়াইয়া পড়িতে পিছপা হয় না। দেশের পামর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা শিকেয় তুলিয়া রাখা হয়। ছাত্রলীগের নাম শুনিলেই আজ গণমনে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের কথা মনে পড়িয়া যায়। যেভাবে দিনে দুপুরে প্রকাশ্য রাজপথে হতভাগ্য বিশ্বজিৎকে বিনা অপরাধে কোপাইয়া, পিটাইয়া মারা হইল তাহা ভুলিবার নয়।

বিগত ৪২ বছরের বাংলাদেশ বিশ্বজিতের মত নিত্য রক্তাক্ত হইয়া প্রমাণ করিয়াছে গণতন্ত্র অদ্যাবধি বহু দূরবর্তী বিষয়। সকল গণতান্ত্রিক দল ও রাজনৈতিক সংগঠনকে আজ তাই নতুন করিয়া আন্দোলনের পথে আগাইয়া যাইবার সময় আসিয়াছে। দেশের বাম প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহই যে শত বিপদ, নির্যাতন তুচ্ছ করিয়া একান্তই গণমানুষের তরে রাজনীতি করিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে ইহাও মিথ্যা নয় যে তাহারা এখন পর্যন্ত কোন আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে চালিত করিতে পারে নাই। ইংরেজ আমলে স্বাধীন ভারতবর্ষ কিংবা পাকিস্তান আমলে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়া তাহার তরে আন্দোলন চালনা করিয়াছিল বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলই। কিন্তু চূড়ান্ত ফয়সালার ঠিক আগ মুহূর্তে জনগণের কাতার হইতে দূরে সরিয়া গিয়াছে তাহারা। নজির গরহাজির নয়। ইংরেজ পর্বে সোভিয়েত রাষ্ট্রের পরামর্শ শুনিয়া কমিউনিস্ট দল আর পাকিস্তান যুগে চিনের ইঙ্গিত দেখিয়া ভাসানীর দল এই কাজই করিয়াছে। ফাঁকতালে স্বাধীন ভারত ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিজয় আত্মসাৎ করিল কংগ্রেস আর আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার অব্যবহিত পরে অপরিপক্ব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ না করিয়া বরং তাহার ঘাড়ে সওয়ার হইয়া সমাজতন্ত্র করিবার এক অলীক স্বপ্ন দেখিয়াছিল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

বিগত দিনের ভুলত্রুটি উপলদ্ধি করিয়া সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে ভবিষ্যতের আপোসহীন সংগ্রাম করিবার সৎসাহস দেখাইতে হইবে। নতুবা বর্তমান এই পরিস্থিতি পাড়ি দিবার বিকল্প কোন পথ খোলা থাকিবে না। শুধুমাত্র রাজপথের সংগ্রাম, প্রতিরোধই একমাত্র হাতিয়ার করিয়া বেশি দূর আগানো যাইবে না। দেশের সাহিত্য, সমাজ ও ইতিহাস বিষয়ে ক্ষমতাশীল দলগুলোর একরৈখিক আলোচনায় পরাভূত না হইয়া অধিকতর পরিশ্রম ও আন্তরিকতার সহিত তত্ত্ব আলোচনায় বহুল পরিমাণে শরিক হইতে হইবে। ইহা রাজপথের সংগ্রামকে জোরদার ও বিস্তৃত করিতে ভূমিকা রাখিবে। আমেন।

ঢাকার মধ্যবিত্তের বাংলা সিনেমা দর্শন — মো: হারিছুর রহমান

ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া তিনটি সিনেমার আলোকে হাল আমলের বাংলা সিনেমার সাথে মধ্যবিত্ত দর্শকের বিচ্ছেদ ও পুনঃসংযোগের প্রচেষ্টা ও তাহাতে ভারতীয় সিনেমার প্রভাব এই রচনার বিষয়

 

বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে কোন এক চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞের কথা শুনছিলাম কিছুদিন আগে। তিনি বলছিলেন, খোদ হলিউডে এখন নিত্যনতুন মৌলিক ছবি না হয়ে বরং সিকুয়েল ছবি হচ্ছে। এর কারণ হিশেবে তিনি নতুন ছবির প্রচার বাবদ ব্যয় এবং ব্যবসায়িক ঝুঁকির কথা বললেন। নতুন ছবি নির্মাণের পর বিশ্বব্যাপী প্রচারণায় যে খরচ করতে হয় তা থেকে কিছুটা রেহাই পেতেই এক ছবির কয়েক পর্ব নির্মাণ করেন তারা। হলিউডের মত বলিউডেও হরহামেশা ঘটছে এমন ঘটনা। ‘ধুম’ থেকে শুরু করে ‘মার্ডার’ বা ‘আশিকী’ তারই প্রমাণ।

My Name is Khan 1ব্যবসার এই কৌশল এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের খুব একটা আমল করতে দেখা যায়নি। এখানেও নতুন সিনেমার বাজারজাতকরণে অন্য সিনেমার প্রচারণা বা জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগানোর বিষয়টা আছে। তবে একটু অন্যভাবে। গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া তিনটি ছবি আমার বক্তব্য স্পষ্ট করবে। ছবিগুলো হচ্ছে ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘ভালোবাসা আজকাল’ এবং ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’। প্রথম নামটি একটি সাম্প্রতিক হিন্দি সিনেমার নামের হুবহু প্রতিলিপি। দ্বিতীয়টি অল্প কিছুদিন আগে নির্মিত অন্য একটি হিন্দি ছবির আক্ষরিক অনুবাদ। ঈদের শেষ ছবিতে নামের এই ধরনের অনুকরণ না থাকলেও এর নির্মাণশৈলীতে বলিউডের ছাপ স্পষ্ট। এর গানের অধিকাংশই ভারতীয় গায়ক, সঙ্গীত ও নৃত্য পরিচালক, বা সহশিল্পীর অংশগ্রহণে চিত্রায়িত। তার উপর, আপাত দৃষ্টিতে অধিকাংশ গান ভারতে ধারণ করা। গানের চরণে চরণে ‘ঝাটকা’ বা ‘সাজনা’র মতন হিন্দি শব্দের ব্যবহার প্রতুল। এছাড়া হালের হিন্দি ছবির অনুকরণে আইটেম সং এমনকি কাওয়ালির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য। পুরো ছবি দেখে মনে হবে এ যেন তামিল বা তেলেগু অ্যাকশন ছবির সাথে বলিউডি সঙ্গীতের সংমিশ্রণে নির্মিত পাঁচমিশালি সিনেমা।

Valobasha Ajkalঝুম্পা লাহিড়ীর ‘নেমসেক’ উপন্যাসের সারবত্তা সন্ধান করেই হয়তো বাংলাদেশের নির্মাতারাও ভারতীয় সিনেমার নামে নিজেদের সৃষ্টিকর্মের নাম রাখেন। এর ফলে তাদের প্রচারণার কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়। আগে বাংলাদেশি সিনেমা ভারতীয় হিন্দি সিনেমার কাহিনী অনুকরণ করলেও নামটা বদলে দেওয়া হত। ‘শোলে’ সিনেমা বাংলাদেশে এসে হয়ে গেছে ‘দোস্ত দুশমন’, ‘দিল’ হয়েছে ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’। কপিরাইট নিয়ে এসে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ধরনের সিনেমাও পুনর্নির্মিত হয়েছে। কিন্তু হাল আমলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কাহিনীর ছবিতেও জনপ্রিয় হিন্দি ছবির নামটা নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে সৃজনশীলতার অভাবকে দায়ী করা যাক বা না যাক, প্রচারণার সুবিধার দিকটি যে এই নামধারণে অন্যতম বিবেচ্য সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।

পশ্চিমা বিদ্যায়তনে — বিশেষ করে সিনেমা ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে — হিন্দি সিনেমাকে ‘জজবাত’ বা আবেগ আর ‘দৌলত’ বা টাকা হিশেবে উল্লেখ করা হচ্ছে অনেকদিন ধরেই। হিন্দি সিনেমা বিকাশের প্রারম্ভিক পর্ব থেকে নির্মাতাদের এ দুইটি দিকে লক্ষ্য ছিল প্রবল। ভিটামাটি বিক্রি করে সিনেমা বানিয়ে যদি ফ্লপের মুখ দেখতে হয় তবে তো নির্মাতাকে পথে বসতে হবে। তাই নির্মাণের আগেই সিনেমার কাহিনী নিয়ে জনমত যাচাই থেকে শুরু করে নির্ভরযোগ্য নায়ক নায়িকা, সঙ্গীত পরিচালক, গায়ককে ‘সাইন’ করানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সাথে সিনেমার কাহিনীকে হতে হয় আবেগ-উদ্রেককারী এক বয়ান, যাতে দর্শক সহজেই সিনেমাকে আপন করে নিতে পারে।

Nishshartho Valobasha 1ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে হিন্দি সিনেমা এখন ইন্ডাস্ট্রিতে রূপ নিয়েছে, দেশি বড় বড় অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। সেখানে বাংলাদেশের সিনেমা এখনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনিয়োগক্ষেত্র। তাই বলে হিন্দি ও বাংলা সিনেমার অসম তুলনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং অবাধ সংস্কৃতির এই যুগে প্রবল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলা সিনেমা কিভাবে তার জায়গা করে নিতে পারে এবং জাতীয় পরিচয় নির্মাণের স্মারক হতে পারে তা শনাক্ত করার লক্ষ্যেই এই রচনা। সাথে সাথে হাল আমলে বাংলা সিনেমার সাথে মধ্যবিত্তের বিচ্ছেদ ও পুনঃসংযোগের প্রচেষ্টার দিকেও একটু দৃষ্টি দেওয়া হবে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গীত বিষয়ক আলোচনায় সেমিওলজি বা চিহ্নবিজ্ঞানের পিয়ার্সিয়ান ব্যাখ্যার প্রয়োগ করেছেন টমাস তুরিনো। এক্ষেত্রে তুরিনোর আগ্রহ ‘সিম্বল’ বা ‘আইকনে’র চেয়ে বরং ‘ইনডেক্স’ বা সূচকের প্রতি বেশি। তুরিনো বলেন, আমরা যখন কোন গান বা সিনেমা দেখি বা শুনি তখন দর্শকশ্রোতা হিশেবে সুর বা কাহিনীর সাথে ব্যক্তিক আবেগে জড়িয়ে যাই এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে তাকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। গানের কথা বা সিনেমার সংলাপ সে অর্থে কতগুলো আবেগ উদ্রেকারী চিহ্ন মাত্র। সিনেমার ভাষাও তাই আমাদের রেফারেন্স দেয়। রোলাঁ বার্থের মিথকে আমাদের সামনে হাজির করে।

এ কথা সিনেমার বিভিন্ন চরিত্র বিচারেও প্রযোজ্য। হাল আমলের বাংলা সিনেমার আলোচিত নায়ক অনন্ত জলিলের কথাই বিবেচনা করা যাক। দর্শক অভিনয় দক্ষতা দেখার সাথে সাথে অনন্ত সম্পর্কিত নানা ধরনের আলোচনাকে মানসপটে হাজির করে থাকে। অনন্ত জলিল সম্পর্কিত যেসব আলাপচারিতা জারি আছে তার মধ্যে ‘পম গানা’ এতই আলোচিত হয়েছে যে তা এখন অনলাইন ‘আরবান ডিকশনারি’তে জায়গা করে নিয়েছে। সেদিক থেকে অনন্ত এখন ইতিহাসের অংশ। তার ইংরেজি, বাংলার প্রমিত-অপ্রমিত উচ্চারণের মিশ্রণ, ধীরগতিতে কথা বলা, কিংবা গার্মেন্টস ব্যবসা থেকে সহসাই সিনেমায় প্রবেশ করা — এগুলো সবই অনন্ত জলিলকে নিয়ে ঢাকার মধ্যবিত্তের প্রাত্যহিক মুখরোচক আলোচনার অন্যতম অনুষঙ্গ। তাই বাস্তবের অনন্ত যখন সিনেমায় সুপার হিরো হিশেবে হাজির হন তখন দর্শক তা মেনে নিতে পারে না। তারা বরং অনন্তের ব্যঙ্গবিদ্রুপ করতেই বেশি মজা পায়।

চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও দর্শক নিয়ে চলমান একটি গবেষণার খাতিরে সম্প্রতি নামকরা দুটি সিনেমা হলের — বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্স ও বলাকা সিনেমা — দর্শকদের পর্যবেক্ষণ ও তাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে আমার। অনেক দর্শকের মতে, অনন্ত তার নিজ ক্যারিশমায় হল থেকে নির্বাসিত অনেক মধ্যবিত্ত দর্শককে হলে ফিরিয়ে এনেছেন। সে ধারণা অবশ্য পুরোপুরি বেঠিক নয়। একজন দর্শক বললেন, পাঁচ বছর আগে একবার হলে বাংলা সিনেমা দেখার পর এসেছেন অনন্তর ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ দেখতে। আরেকজন জানালেন, সিনেমাটি ভাল হয়েছে শুনে এসেছেন। অন্য একজন বললেন, সিনেমাটিতে ভাল প্রযুক্তি, ভাল ভাল লোকেশন ব্যবহার করা হয়েছে শুনে এসেছেন। তবে মধ্যবিত্ত দর্শকদের বিচরণক্ষেত্র বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্স এবং বলাকা দুই হলেই একটি বিষয় লক্ষ্য করার মত। সবার আলোচনার বিষয়বস্তু মাত্র একটাই: অনন্ত জলিল। দর্শকরা শুধু তাকে নিয়েই কথা বলছে এবং হাসাহাসি করছে। সিনেমা হলের লবিতে দাঁড়িয়ে থাকা থেকে শুরু করে হলে প্রবেশ, হলে অবস্থান বা হল থেকে বেরিয়ে এসেও অনেকে শুধু অনন্তর কথা বলে হাসি তামাশায় মশগুল। বলাকায় সিনেমা দেখে বেরিয়ে একদল তরুণী তো রীতিমত পোজ দিয়ে ছবি তুললেন অনন্ত জলিলের ছবির সাথে। হাসাহাসিতেও তাদের কেউ কারও চেয়ে কম যান না। একজন তরুণীকে অনন্ত জলিলের জনপ্রিয়তার কথা জিজ্ঞাস করতেই হাসতে হাসতে মন্তব্য করলেন, অনন্তর বিচ্ছেদের অভিনয় দেখলেও হাসি পায়। আমার মনে তখন জিজ্ঞাসা এসব তরুণ তরুণীর প্রিয় নায়ক তাহলে কে? কেনই বা অনন্তকে দেখে হাসছে তারা? আমার প্রশ্নের উত্তর পেতেও সময় লাগে না। জানতে পারি, বালাকা এবং বসুন্ধরাতে আসা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত তরুণ তরুণীর প্রিয় নায়ক বাংলাদেশি কেউ নন।

কেন বাংলাদেশের নায়ক নায়িকা এসব দর্শকের প্রথম পছন্দ বা প্রিয়র তালিকায় নেই? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে সাংস্কৃতিক হেজিমনি ও আধুনিকতার ধারণাকে খোলাসা করতে হবে। দর্শক যখন বাংলা সিনেমা দেখে তখন তাদের কাছে অন্যান্য সিনেমার অভিজ্ঞতা বা রেফারেন্সও থাকে। নিয়মিত দেখা ইংরেজি, ভারতীয় বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু ছবির রেফারেন্স মাথায় কিলবিল করে। অনন্তকে শাহরুখ, সালমানের কাতারে ফেলে অনন্তর মধ্যে অভিনয় দক্ষতা, স্মার্টনেস, আকর্ষণ খুঁজতে থাকে দর্শক। ফলে অনন্তকে যে শুধু ঘরের নায়কদের সাথেই লড়াই করতে হচ্ছে তা নয়, বরং হরেক শক্তিশালী কারখানায় নির্মিত সিনেমার নায়কদের সাথেও নিরন্তর যুদ্ধ করে যেতে হয়।

অনন্ত জলিল

অনন্ত জলিল

অনন্ত জলিলের ছবি নিয়ে যে সবাই হাসাহাসি করছে তা নয়। অনেক দর্শক এখন ঢাকার বিভিন্ন শপিংমলের সিডি-ডিভিডির দোকানে অনন্ত জলিলের আগের সিনেমা বা এখনকার সিনেমার গান খুঁজছেন। এমন একজন ত্রিশোর্ধ পুরুষ ক্রেতার কাছে জানতে চেয়েছিলাম তিনি নতুন সিনেমাটি দেখেছেন কিনা। তিনি জানালেন বলাকায় ছবিটি দেখেছেন। ‘ভালই লেগেছে, তবে নায়কটা একটু ভাব নিয়ে থাকে,’ স্পষ্ট মন্তব্য  তার। এ কথা শুনে এক দোকানি বললেন, এখন প্রতিদিন চার পাঁচজন করে ক্রেতা অনন্তর পুরানো ছবি চায় কিন্তু তারা ওসব সিনেমা রাখেন না। সাথে সাথে ব্যঙ্গ করে বললেন, ‘“অনন্ত হীরা”র মধ্যে লোকজন কি পাইছে? ওর কথা স্লো, অভিনয় ভাল না। তবে ওর নিজের অনেক টাকা আছে তাই ছবিতে ভাল গান বা ভাল ভাল লোকেশন ব্যবহার করে।’ অনেক দর্শক অনন্তর সিনেমায় ব্যবহৃত গানের প্রশংসা করেছেন, সিনেমার আকর্ষণীয় লোকেশনের প্রশংসা করেছেন বা প্রযুক্তির ব্যবহারকেও স্বাগত জানিয়েছেন। তবে অনেকে আবার প্রযুক্তির বালখিল্য ব্যবহার বিশেষ করে কিছু জায়গার অ্যানিমেশনকে কার্টুনের সাথে তুলনা করেছেন।

দর্শকদের এহেন প্রতিক্রিয়াকে বুঝতে ঢাকাই সিনেমার প্রতি মধ্যবিত্তের আচরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। ঢাকার মধ্যবিত্ত ঢাকাই চলচ্চিত্রের সংস্পর্শে যতটা না এসেছে তার চেয়ে বেশি এসেছে বলিউডের হিন্দি বা কলকাতার বাংলা সিনেমার সাথে। উপমহাদেশের চলচ্চিত্রের যাত্রালগ্ন থেকেই ঢাকাকে নির্মাণের দিক থেকে না হলেও প্রদর্শনের দিক থেকে একটা উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিশেবেই ধরা হত। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগে পর্যন্ত ঢাকায় কোন ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখানে ইংরেজি ছবি যেমন চলেছে, চলেছে লাহোর, কলকাতা, কোলাপুর বা বোম্বে নির্মিত হিন্দি, উর্দু ও বাংলা ছবি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, দেশবিভাগের পূর্বে ভাষা কখনো রাজনৈতিক বিষয় ছিল না। দেশবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে ভাষাকেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণের প্রচেষ্টায় নিজ ভাষায় সিনেমা তৈরির তাগিদ আসে। ১৯৫৭ সালে ঢাকা প্রথম চলচ্চিত্র উন্নয়ন কেন্দ্র পায়, তবে অন্যান্য ভাষায় সিনেমাও চলতে থাকে। নিজস্ব ভাষায় সিনেমা বানালেও ঢাকার চলচ্চিত্র জগৎ উর্দু জাতাকল থেকে বের হতে পারেনি, বরং ১৯৬৫ সালের আগ পর্যন্ত এফডিসির ছবিগুলোর অধিকাংশই ছিল উর্দু ভাষায় নির্মিত।

আর ১৯৬৫ সালেই পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ভারতীয় সিনেমা দেখানো বন্ধ করা হয় — কোন যোগ্য বিকল্পের ব্যবস্থা না করেই। কিন্তু ততদিনে ঢাকার দর্শকরা সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি হিন্দি ও এক হাজারের মত কলকাতার বাংলা সিনেমার সাথে পরিচিত হয়েছে, পরিচিত হয়েছে সিনেমার ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে, নায়ক নায়িকার সাথে। এখানকার দর্শক তখন হিন্দি জগতের দিলীপ কুমার, রাজকাপুর, নূরজাহান, মধুবালা, ওয়াহিদা রেহমান, নূতন, বিজয়ন্তীমালা থেকে শুরু করে শামসাদ, গীতা দত্ত, মুকেশ, রফি, লতা, আশার মত সেলিব্রিটির সাথে পরিচিত হয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে মজে গেছেন। অনেকে তাদের আইকনও বানিয়ে ফেলেছেন। হিন্দির পাশাপাশি নিজ ভাষায় উত্তম সুচিত্রার অভিনয়ও তাদেরকে মুগ্ধ করেছে।

ভারতীয় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় জুটি উত্তম-সুচিত্রা

ভারতীয় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় জুটি উত্তম-সুচিত্রা

ভারতীয় সিনেমার সাথে যে নস্টালজিক সম্পর্ক ঢাকার দর্শক লালন করত তা আরো একবার ধাক্কা খায় ১৯৭১ সালে বাংলেদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর। তখন ভারতীয় সিনেমার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখার সাথে সাথে পাকিস্তান, এমনকি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সিনেমার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। থাকে শুধু ঢাকায় নির্মিত বাংলা সিনেমা। তবে ঢাকার ক্যাপ্টিভ দর্শকদের সাথে ঢাকার সিনেমার সখ্যতা গড়ের ওঠার আগেই আবার ভিডিও হোম সিস্টেম প্রযুক্তি ঢাকার দর্শককে ভারতীয় সিনেমার দিকে টেনে নিয়ে যায়। আশির দশকে ঢাকার মধ্যবিত্ত ফিল্মফেয়ার বা রোজ ভ্যালী থেকে ভারতীয় হিন্দি, বাংলা সিনেমার ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া করে এনে ঘরে বসে সেই সিনেমা দেখা শুরু করল। ভারতীয় সিনেমার সাথে মধ্যবিত্তের সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হল। গত শতকের নব্বই দশকে ডিশ অ্যান্টেনা, ক্যাবল টিভি এবং তারপর ভিসিডি, ডিভিডি ও ইন্টারনেট সেই সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর করল, আর মধ্যবিত্তকে বাংলা সিনেমা থেকে দূরে ঠেলে দিল। ঢাকার ইন্ডাস্ট্রির ৫৬ বছরের ইতিহাসে প্রায় ৩,০০০ সিনেমা নির্মিত হলেও তার সাথে মধ্যবিত্তের সম্পর্ক খুব কমই ঘটেছে।

হালের ভারতীয় সিনেমা মধ্যবিত্তের জনপ্রিয় সংস্কৃতি বা বিনোদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এই শ্রেণি আপন পরিচয় নির্মাণেও ভারতীয় সিনেমাকে যে সাংস্কৃতিক পুঁজি হিশেবে নিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হিন্দি ভাষা রপ্ত করা থেকে শুরু করে বলিউডের সর্বশেষ ফ্যাশন, স্টাইল এখন এখানকার মধ্যবিত্ত তরুণ তরুণীর ফ্যাসিনেশন। ঈদ বা অন্যান্য উৎসবে বড় বড় বিপণি-বিতানে ভারতীয় পণ্যের পসরা। সেসব পণ্যের নামকরণ ও চাহিদাই বলে দেয় ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রভাব কতটা সর্বব্যাপী।

লেখক বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে ‘বাংলাদেশে ভারতীয় সিনেমার প্রবাহ, জনপ্রিয়তা ও প্রভাব’ বিষয়ে গবেষণা করছেন

দোহাই

আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র: আর্থ-সামাজিক পটভূমি (বাংলা একাডেমী, ২০০৮)।

গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প: সঙ্কটে জনসংস্কৃতি (শ্রাবণ, ২০০৮)।

A. Rajadhyaksha and P. Willemen, Encyclopaedia of Indian Cinema (British Film Institute, 1999).

T. Turino, ‘Signs of imagination, identity, and experience: A Peircian semiotic theory for music,’ Ethnomusicology, vol. 43 no. 2 (1999), pp. 221-55.

Z. H. Raju, ‘Cinematic Border Crossings in Two Bengals,’ in A. G. Roy, and C. B. Haut, eds., Travels of Bollywood Cinema, From Bombay to LA (Oxford University Press, 2012).

কর্ণফুলী বিদ্যুৎ প্রকল্প — শরদিন্দু শেখর চাকমা

বাংলাদেশের বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার বাগেরহাটের রামপালে এক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত লইয়াছে। পরিবেশ বিপর্যয় ও আশু ক্ষতির সাবধানবাণী কর্ণে না তুলিয়া সরকারের উপদেষ্টা, মন্ত্রীরা বরং ইহার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের আশা করিতেছেন, এমনকি প্রকল্পের বিরোধিতাকারীদের ক্ষেত্রবিশেষে হুমকি ধামকি দিতেও পিছপা হইতেছেন না। এর আগে, বর্তমান বাংলাদেশের সীমানায় প্রথম কৃত্রিম বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন হইয়াছিল রাঙ্গামাটি জেলায়। সেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়ায় কি ফল দেখা দিয়াছিল আমরা তাহা পুনরায় স্মরণ করিয়া দেখিতে চাই। এই আশায় ঢাকার অঙ্কুর প্রকাশনী হইতে ২০০২ সালে প্রকাশিত শরদিন্দু শেখর চাকমা রচিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের একাল-সেকাল’ বহির ‘কণফুলী বিদ্যুৎ প্রকল্প’ অধ্যায়খানি তুলিয়া ধরিতেছি। কর্ণফুলী প্রকল্প পাহাড়িদের জীবনে যে অতিশয় কষ্ট ও দুর্ভোগ বহিয়া আনিয়াছিল তাহাতে সমতলবাসী সর্বাত্মক একাত্ম হইতে পারে নাই। আজ তাহাদের ঘাড়েই রামপাল আসিয়া পড়িতেছে, হইতেছে নতুন চিন্তার কারণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের সত্যিকার দুর্ভোগ আরম্ভ হয় যখন কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয় এবং বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ৩৫০ বর্গমাইল এলাকা — যেটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে উর্বর এলাকা ছিল — কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে যায়। বাঁধটির নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৫২ সালে ও শেষ হয় ১৯৫৮ সালের প্রথম দিকে। কিন্তু যখন বাঁধের সব spill way বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন বাঁধটি ভেঙ্গে যায়। তারপর জেনারেল আয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর আমেরিকার সাহায্যে আবার নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৬১ সালে শেষ হয়।

কাপ্তাই বাঁধ এলাকা

কাপ্তাই বাঁধ এলাকা

বাঁধ নির্মাণের সময় বলা হয় যে মাত্র ২৫০ বর্গমাইল এলাকা ডুবে যাবে, কিন্তু বাঁধ নির্মাণ শেষে দেখা গেল যে ৩৫০ বর্গমাইল এলাকা ডুবে গেছে এবং বর্ষাকালে লেকের পানি বেড়ে গেলে কর্ণফুলী হ্রদের আয়তন হয় ৪০০ বর্গমাইল। এই ৩৫০ অথবা ৪০০ বর্গমাইলের মধ্যে অনেকের নিজস্ব ফলের এবং সেগুন বাগান, সরকারের সংরক্ষিত বন এবং সেই সঙ্গে unclassed field state forest ডুবে যায়। বর্তমানে রাঙ্গামাটি শহরের প্রধান বাজার যেটি রিজার্ভ বাজার নামে পরিচিত, সেটা কর্ণফুলী বাঁধ নির্মাণের আগে সংরক্ষিত বন ছিল। সে জন্য বাজারের নাম রিজার্ভ বাজার হয়েছে।

বাঁধ নির্মাণের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট ৩৬৯ মৌজার মধ্যে ১২৫ টি মৌজা পানির তলে চলে যায়। এতে ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি অর্থাৎ জেলার মোট কৃষি জমির প্রায় ৪০% হ্রদের জলে ডুবে যায়। আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় ১ লাখ লোক। যাদের মধ্যে অধিকাংশ ছিল চাকমা। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট লোক সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩ ভাগের ১ ভাগ লোক কর্ণফুলী বাঁধ নির্মাণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১ লাখ লোকের মধ্যে পরিবারের সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার এবং তাদের মধ্যে ১০ হাজার পরিবার ছিল কৃষি জমির মালিক। বাকীরা ছিল জুম চাষী। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য কাসালং সংরক্ষিত বনের এলাকা dereserve করা হয় এবং সেখানে প্রায় ১০ হাজার একর কৃষি জমি পাওয়া যায়। সে জমিতে ৩,৭৩৪ পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হয়। কিন্তু সর্বোৎকৃষ্ট জমিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারগুলোকে দেয়া হয়। রামগড় এবং বান্দরবান মহকুমায়ও ১১,৩২২ একর সরকারী খাস জমি পাওয়া যায়। কিন্তু আসলে এই সব জমি ছিল চাকমা, মারমা এবং ত্রিপুরা উপজাতিদের আবাদী জমি কিন্তু তাদের বন্দোবস্তকৃত ছিল না। কারণ ইতিপূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে cadastral survey না হওয়াতে লোকজন জমি বন্দোবস্তের জন্য আবেদন করলে জমির প্লট এবং খতিয়ান উল্লেখ করে আবেদন করতে পারতো না। তারা আবেদন করতো জমির চৌহদ্দি উল্লেখ করে এবং জমির পরিমাণ উল্লেখ থাকত অনুমানের উপর ভিত্তি করে। কাজেই সেই জমি আবাদ করার পরে, জরিপ করা হলে জমির পরিমাণ কম বেশি হতো। তাই কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য যখন খাস কৃষি জমি খোঁজা হয় তখন সে সব এলাকার লোকজনের জমি জরিপ করে দেখা হয় এবং উল্লেখিত ১১,৩২২ একর কৃষি জমি পাওয়া যায়। ফলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণে কেবল যাদের ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, কেবল তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাই নয়, যাদের ঘরবাড়ি জায়গাজমি ডুবে যায়নি তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তাদের আবাদি কৃষি জমি কিন্তু অবন্দোবস্তকৃত জমি এখন উদ্বাস্তুদের নামে বন্দোবস্ত দেয়া হয়। তবুও কৃষি জমির অভাবে কর্ণফুলী বাঁধ নির্মাণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সকলকে পুনর্বাসিত করা সম্ভব হয়নি। যাদের পুনর্বাসন করা যায়নি তাদের সংখ্যা ছিল ৮ হাজার জুমিয়া পরিবার এবং আরও কয়েক হাজার চাষী পরিবার যাদের পূর্বে কৃষি জমি ছিল, কিন্তু সে জমি হ্রদের পানিতে ডুবে যায়। এভাবে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অধিবাসীই বেশি আর কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

Parbotto Chottogramer Ekal Shekalবাঁধ নির্মাণের ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তাদের খুবই নাম মাত্র ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়। তাছাড়া জুমিয়া পরিবার এবং অন্যদের যাদের বসতভিটা বন্দোবস্তকৃত ছিল না, অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েল অনুযায়ী যারা খাস জমিতে ঘরবাড়ি অথবা ফলের বাগান করেছিল তাদের বসতভিটা অথবা ফলের বাগানের জমির জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। তারা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল কেবল বাড়িঘরের এবং ফলবান বৃক্ষের।

জুমিয়ারা প্রত্যেক জুমের জন্য ৬ টাকা খাজনা দিয়ে জুম চাষ করতো। তারা জুমের জন্য কোনও ক্ষতিপূরণ পায়নি।

ক্ষতিপূরণ দেওয়ার হার ছিল নি¤œরূপ:

(ক) প্রথম শ্রেণীর জমি প্রতি একর ৬০০ টাকা
(খ) দ্বিতীয় শ্রেণীর জমি প্রতি একর ৪০০ টাকা
(গ) তৃতীয় শ্রেণীর জমি প্রতি একর ২০০ টাকা
(ঘ) পরিবার পিছু বসতবাড়ির জন্য (গড়ে) ৫০০ টাকা
(ঙ) প্রতি ফলবান বৃক্ষ ১০ টাকা
(চ) প্রতি অফলবান বৃক্ষ ৫ টাকা
(ছ) প্রতি কলাগাছ ০.২৫ পয়সা
(জ) প্রতি আনারস গাছ ০.৬ পয়সা

যদিও ১৯৬১ সালে বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হয়, ১৯৬৪ সালে যখন আমি রাঙ্গামাটি বদলি হই তখনও অনেকে সেই ক্ষতিপূরণ পায়নি।

১৯৭০ সালে Far Eastern Review ম্যাগাজিনে একটি প্রতিবেদনে বলা হয় যে কর্ণফুলী প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছিল, মাত্র ২.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হয়েছিল। কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতিগ্রস্তদের এভাবে বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (তখন চট্টগ্রাম কলেজে বিএ ক্লাশের ছাত্র) একটি প্রচারপত্রও চট্টগ্রাম শহরসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করেন। তখন ১৯৬৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে আটক করা হয়। কিন্তু এম এন লারমার বিরুদ্ধে সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। কারণ লারমা যে প্রচারপত্র বিতরণ করেছিলেন সেই প্রচারপত্রে ছিল কাপ্তাই ক্ষতিগ্রস্তদের বঞ্চনার বর্ণনা এবং তাদের যথাযথ পুনর্বাসনের দাবি। এই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সত্তরের দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশের নবগঠিত শাসনতন্ত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের জন্য কোনও বিশেষ অধিকার লাভে ব্যর্থ হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি  সমিতি গঠন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণআন্দোলন শুরু করেন। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের নতুন শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়। কিন্তু গণপরিষদের সদস্য হিসেবে সেই শাসনতন্ত্রে তিনি স্বাক্ষর করেন নি। কারণ শাসনতন্ত্রে উপজাতিদের কোনও অধিকার স্বীকৃতি পায়নি। ১৯৮৩ সালের ৯ নভেম্বর তারিখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তারই গঠিত জনসংহতি সমিতির একটি বিদ্রোহী গ্রুপের হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার নেতৃত্বে আন্দোলন চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে বিরোধের মীমাংসা হয় এবং সেই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহেরও অবসান হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, যদিও পার্বত্য জেলার মোট আয়তন ৫,০৯৩ বর্গমাইল অর্থাৎ দেশের আয়তনের দশ ভাগের এক ভাগ, কিন্তু সমগ্র জেলাটি পাহাড় পর্বত, উঁচু-নিচু টিলা নদনদী ঝরনা ইত্যাদিতে ভর্তি। কৃষি জমির পরিমাণ খুবই কম। সম্ভবত সেই কারণেই ১৯০০ সালে যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েল প্রণীত হয় তখন ম্যানুয়েলের একটি ধারায় বলা হয় যে এখন হতে জেলায় কোনও পরিবারকে ২৫ একরের বেশি কৃষি জমি বন্দোবস্ত দেয়া চলবে না। এরপর কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট কৃষি জমির ৪০ ভাগ কর্ণফুলী লেকের নিচে চলে যায়। সর্বোচ্চ সংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েলে সংশোধন করে একটি নতুন বিধি যোগ করা হয় যাতে বল হয় যে ভবিষ্যতে কোনও পরিবারকে ১০ একরের বেশি কৃষি জমি বন্দোবস্ত দেয়া যাবে না। বাংলাদেশ হওয়ার পরে সেই ১০ একর কমিয়ে ৫ একর করা হয়।

১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার Forestall Forestry and Engineering International Ltd. নামে এক কানাডিয়ান কোম্পানীকে পার্বত্য চট্টগ্রামের  মাটি এবং ভূমির ব্যবহার, উপজাতি সমাজের উপর কাপ্তাই বাঁধের প্রভাব এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি উন্নয়নে কি কি ব্যবস্থা নেয়া যায় ইত্যাদি বিষয়ে জরিপ পরিচালনার জন্য নিয়োগ করে। এই জরিপকার্য কলম্বো পরিকল্পনার অধীনে কানাডিয়ান সরকারের আর্থিক সাহায্যে করা হয়। কোম্পানীটি ১৯৬৪ হতে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দু বছর জরিপ চালিয়ে মোট ৯ খণ্ডে একটি  বিরাট প্রতিবেদন পেশ করে।

উল্লেখিত প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিকে মোট চারভাগে ভাগ করা হয় এবং কি আয়তন ভূমিতে কী কী ফসল উৎপাদন করা সম্ভব তা নি¤েœাক্তভাবে বর্ণনা করা হয়:

(ক) চাষাবাদ যোগ্য জমি: ৭৭,০০০ একর (মোট জমির ০২%)
(খ) ফলের বাগান করার উপযোগী: ৬,৭০,০০০ একর (মোট জমির ২১%)
(গ) কেবল বন করার উপযোগী: ১৬,০০,০০০ একর (মোট জমির ৫১%)
(ঘ) সংরক্ষিত বন: ৮০০,০০০ একর (মোট জমির ২৬%)
     মোট: ৩১,৪৭,০০০ একর

কাজেই দেখা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আয়তনে বড় হলেও, সেখানে চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই কম।

কর্ণফুলী বাঁধ নির্মাণের সময় এবং পরবর্তীকালে বাঁধ নির্মাণের ফলে যে সব জায়গা ডুবে যাবে সেই সব জায়গায় জঙ্গল পরিষ্কার করে সেই জঙ্গলের গাছ অপসারণ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দান, তাদের পুনর্বাসন ইত্যাদি কাজে তখন হাজার হাজার শ্রমিক, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী, কাপ্তাই প্রজেক্ট এবং অন্যান্য সরকারী বেসরকারী কাজেও হাজার হাজার বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। অনেক সুযোগ সন্ধানী বাঙালি সরকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কেবল চাকরী বাকরী, ঠিকাদারী, ব্যবসা নয়, কাপ্তাই প্রকল্পের উদ্বাস্তু হিসেবে পরিচয় দিয়ে ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনও দাবি করে এবং পেয়েও যায়। তখন সুবিধাবাদী, সুযোগ সন্ধানী বাঙালিদের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল উর্বর ক্ষেত্রে নয়, একটি স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। পাহাড়িরা এমনকি বৃটিশ আমলে আগত অনেক বাঙালিও ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন না পেয়ে চরম হতাশ হয়ে পড়ে। এরকম অবস্থায় ১৯৬৪ সালের প্রথম দিকে ভারতের কাশ্মীরের হযরত বাল দরগা হতে মহানবীর কেশ চুরিকে কেন্দ্র করে কলকাতাসহ ভারতের অনেক স্থানে দাঙ্গা লেগে যায়। দাঙ্গার প্রতিক্রিয়ায় তদানীন্তন গভর্ণর মোনায়েম খানের মদদে পূর্ব পাকিস্তানে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা বাঁধে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এই প্রথম দাঙ্গা বাঁধে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েক জায়গায় বিশেষ করে নতুন বসতি এলাকা মারিশ্যায় অন্য জেলা হতে আগত বাঙালিরা পাহাড়িদের উপর চড়াও হয় এবং বহু মেয়ের শ্লীলতাহানি করে। এক দিকে ক্ষতিগ্রস্ত এবং উদ্বাস্তু অপর দিকে তারা পুনর্বাসন তো দূরের কথা জমিজমা এবং ঘরবাড়িরও ক্ষতিপূরণ পায়নি। তারপর তাদের এবং তাদের মেয়েদের অত্যাচার। ফলে তারা ধরেই নেয় যে, পাকিস্তানে থাকা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। হাজার হাজার উপজাতি রামগড়, বিশেষ করে নতুন পুনর্বাসিত এলাকা মারিশ্যা হতে ভারতে চলে যাওয়া শুরু করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে ব্যাপক হারে উপজাতি জনগণ ভারতে চলে যাওয়া শুরু করলে ভারত সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করে। সংবাদপত্র এবং অন্যান্য গণমাধ্যমসমূহও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার শুরু করে। তাছাড়া শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী শ্রীমাভো বন্দর নায়েকও পাকিস্তানের কাছে কড়া প্রতিবাদ করেন। এতে পাকিস্তান সরকারের টনক নড়ে। গভর্ণর মোনায়েম নিজে রাঙ্গামাটি এবং বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা মারিশ্যায় বার বার পরিদর্শন করতে যান এবং উপজাতিদের যথাযথভাবে পুনর্বাসনের এবং তাড়াতাড়ি ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেন। সেই সঙ্গে তিনি উপজাতিদের ভারতে না যেতে অনুরোধ করতে থাকেন। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সরকারী কর্মকর্তা এতদিন যারা অন্য জেলায় কর্মরত ছিলেন, তাদের প্রায় সকলকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি করে আনা হয়। ঐ সময় আমি রংপুর জেলার গাইবান্ধা মহকুমায় মাত্র কিছু দিন আগে সিলেট হতে যোগদান করেছি। আমাকে টেলিগ্রামের মাধ্যমে রাঙ্গামাটিতে বদলি করে আনা হয় এবং রাঙ্গামাটিতে যোগদান করার পরই সবচেয়ে উপদ্রুত এলাকা মারিশ্যায় পাঠানো হয়। কয়েক জন দুষ্কৃতিকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাদের উস্কানিদাতা আনসারীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ম্যানুয়েলের ৫১ ধারা অনুযায়ী বহিষ্কার করা হয়। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে এবং উপজাতিদের ভারতে যাওয়াও বন্ধ হয়। কিন্তু এর মধ্যেও ৪০ হাজারের অধিক উপজাতি ভারতে চলে যায়। ভারত সরকার তাদের প্রায় সবাইকে বর্তমান অরুণাচল প্রদেশে পুনর্বাসন করে। কিছু কিছু শরণার্থী ত্রিপুরা রাজ্যে এবং কিছু কিছু আসামেও স্ব স্ব উদ্যোগে পুনর্বাসিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় যারা অরুণাচল প্রদেশে পুনর্বাসিত হয়েছে তারা এখনও ভারতীয় নাগরিকত্ব পায়নি। ফলে তারা এখন সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

১৯৯৪ সালে আমি চাকরী হতে অবসর গ্রহণের পর অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রীপরিষদ সচিব মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান আমাকে তার বাসায় যেতে অনুরোধ করেন। উল্লেখ্য গত শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি প্রথমে কাপ্তাই প্রকল্পের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং জেলার  Ex-Officio অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার এবং পরে জেলার ডেপুটি কমিশনার হয়েছিলেন। সে সময় আমিও রাঙ্গামাটিতে কর্মরত ছিলাম। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বলেন যে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য তিনি যখন বার বার সরকারের কাছে অর্থের জন্য লিখেছিলেন, একদিন তাকে গোপন পত্রে জানিয়ে দেয়া হয় যে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা জঙ্গলের লতাপাতা খেয়েও বাঁচতে পারে। কাজেই তাদের জন্য বেশি সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

ফাদার টিম এবং ফরহাদ মজহার — আহমদ ছফা

আজ হইতে পুরা দুই যুগ মানে গোটা ২৪ বছর আগে মহাত্মা আহমদ ছফা এই লেখাটি সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশ করিয়াছিলেন। যতদূর জানা যায় লেখাটি এখনো তাঁহার কোন গ্রন্থের মধ্যে লওয়া হয় নাই।

এই লেখায় তিনি যে শঙ্কা প্রকাশ করিয়াছিলেন তাহা প্রায় ষোল আনাই ফলিয়া গিয়াছে। ২৪ বছর কম সময় নহে। ১৯৪৭ হইতে ১৯৭১ যতটুকু সময়, ১৯৮৯ হইতে ২০১৩ ঠিক ততটুকু সময় বটে। তবে এই সময়ের পরিসরে বাংলাদেশের সমাজ গঠনে কোন অপূর্ব পরিবর্তন ঘটে নাই। যদি কিছু ঘটিয়াই থাকে তাহাতে কিন্তু প্রমাণ হয় নাই বাংলাদেশ পৃথিবীর বাহিরের দেশ। নেপচুন কিংবা মঙ্গলগ্রহে তাহার অবস্থান নহে।

সত্যের মধ্যে বাংলাদেশে গত ২৪ বছরে আরো বিশ্বযোগ ঘটিয়াছে। ঘটিয়াছে দেশে এনজিও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের শ্রীবৃদ্ধিও। ইতিমধ্যে আহমদ ছফার মহাবিয়োগ ঘটিলেও যতদূর জানা যায় ফাদার টিম আজও আমাদের মধ্যে বাঁচিয়া আছেন। ফরহাদ মজহার তো দিব্য তবিয়তেই বহাল আছেন।

এই লেখাটি আমরা ‘খবরের কাগজ’ হইতে হুবহু পুনর্মুদ্রণ করিতেছি। সম্পাদনার মধ্যে কিছু ছাপার ভুল সংশোধন করা হইয়াছে মাত্র। যেমন ‘ফরহাদ মজহার’ নামটি আদপে ছাপা হইয়াছিল ‘ফরহাদ মযহার’। আর একটি কথা। পড়িবার সুবিধার জন্য আমরা লেখাটিতে তিনটি পর্ববিভাগ করিয়া দিয়াছি। লেখাটি সংগ্রহ করিয়া দিয়াছেন সৈয়দ আনোয়ার করিম। আর লেখাটি ‘সর্বজন’ সমীপে পাঠাইয়াছেন সৈয়দ মনজুর মোরশেদ। উভয়ের সাকিন সৈয়দবাড়ি, রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম। আমরা তাঁহাদের ঋণ স্বীকার করিতেছি। এই ঋণ পরিশোধ করার অতীত।

বেশ কিছুদিন থেকে এনজিওর পক্ষে-বিপক্ষে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। অনেকে বলছেন এনজিওরা দেশের ভালো করছে আবার অনেকে বলছেন, না দেশের উন্নয়নে এনজিওর ভূমিকা ঋণাত্মক। এই ব্যাপারে আমি আমাদের পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘উত্তরণ’-এর পর পর দুটি সংখ্যায় একটি দীর্ঘ লেখা লিখেছিলাম। ঐ লেখায় বলেছিলাম যে এনজিও আমাদের দেশের তথা উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি সাম্প্রতিক ব্যাপার। অতীতে এনজিও জাতীয় কোন কিছু ছিল না এবং ভবিষ্যতেও থাকবে কিনা সন্দেহ। পৃথিবীর সর্বাঙ্গীন বিকাশের এই পরিস্থিতিতে এনজিওর উদ্ভব হয়েছে।

সে যা হোক এনজিও আমাদের জাতীয় জীবনে একটা উল্লেখ্য স্থান দখল করে বসেছে। ঐ রচনায় দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম আমাদের দেশে এনজিওগুলো যে পদ্ধতিতে কাজকর্ম পরিচালনা করে তা সমাজের বিশেষ মঙ্গল বয়ে আনছে না। অন্যদিকে নানাবিধ সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করছে। পরে আমি আনন্দিত হয়ে লক্ষ্য করেছি সরকার এনজিওর কর্মকাণ্ডের উপর কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। পরে আরো জেনেছি সাভারস্থ বিপিএটিসি ইনস্টিটিউটে বিসিএস ক্যাডারদের আমার ঐ লেখাটা পড়ানো হচ্ছে।

সাম্প্রতিককালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ইংরেজি সাপ্তাহিকে ফাদার টিম এবং জনাব ফরহাদ মজহার এনজিওর কাজকর্মের তারিফ করে দুটো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ফরহাদ মজহার সাহেবের সাক্ষাৎকারটির বিষয়ে পরে কিছু বলবো। শুরুতে আমি ফাদার টিমের বক্তব্য সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।

ফাদার টিম তাঁর সাক্ষাৎকারে যা বলেছেন সারসংক্ষেপ করলে [তা] এরকম দাঁড়াবে। এনজিওগুলো গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণের কল্যাণসাধন করছে। এনজিও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনেক গরিব মানুষ উপকৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কখনো এই গরিব মানুষদের অসহনীয় অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করেনি। এনজিওরা এগিয়ে এসে তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে এবং অনেক কিছু ভালো কাজ করছে। সুতরাং বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এনজিও অবশ্যই ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

ফাদার উইলিয়াম টিম

ফাদার উইলিয়াম টিম

ফাদার টিম একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী। আমাদের দেশের দরিদ্র জনগণের মঙ্গলের জন্য তিনি যে শ্রম, নিষ্ঠা এবং উদ্যোগ অতীতে ব্যয় করেছেন এবং বর্তমানেও করছেন তা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ জিনিশ। আমি তাঁকে ছোট করতে চাইবো না। তাঁর উপর শ্রদ্ধা রেখে বিনীতভাবে একটি ছোট প্রশ্ন করতে চাই। এনজিওগুলো কি কখনো রাজনৈতিক পার্টির ভূমিকা পালন করতে পারবে? রাজনৈতিক দলগুলোর হ্রস্ব দৃষ্টির যে সমালোচনা [তিনি] করেছেন [তা] কবুল করতে আপত্তি নেই। কিন্তু রাজনৈতিক পার্টির প্রয়োজনীয়তা কি তিনি অস্বীকার করতে পারেন?

আরো একটি প্রশ্ন। এনজিওর মাধ্যমে বিকল্প উন্নয়ন কতটুকু সম্ভব? জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ মানুষ যদি ভূমিহীন হয়ে পড়ে তাহলে আমাদের সমাজের মোট কর্মহীন মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৭ কোটির মতো। বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে যত এনজিও কর্মরত আছে তাদের মাধ্যমে যত লোক উপকৃত হচ্ছে তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে ধরলেও আনুমানিক (কর্মচারীসহ) ৬-৭ লাখ। ৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬-৭ লাখ মানুষ নিয়ে এনজিওগুলো ব্যস্ত রয়েছে। বাকি মানুষগুলো যাবে কোথায় এবং তাদের অবস্থা কি দাঁড়াবে?

ফাদার টিম আরো অনেক কথা বলেছেন। আমরা সেসব উত্থাপন করতে যাচ্ছি না। এখন জনাব ফরহাদ মজহারের সাক্ষাৎকারটির বিষয়ে কিছু বলি।

ফরহাদ সাহেব এনজিওর একটা তাত্ত্বিক ছদ্ম প্রগতিশীল ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন এনজিওগুলো প্রাক-ধনতান্ত্রিক যে সম্পর্ক সমাজে এখনো টিকে আছে তার অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এটা একটা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা। আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা ধনতান্ত্রিক না সামন্ততান্ত্রিক, না আধা-সামন্ততান্ত্রিক — এ নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অতীতে বিস্তর বাদানুবাদ হয়েছে। আমরা সে সবের মধ্যে প্রবেশ করতে চাই না। এনজিওকে হালাল করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের একটা খোঁড়া যুক্তির অবতারণা না করলেও পারতেন ফরহাদ সাহেব। এটা এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতারণা। তিনি যে কর্মটি করছেন সামাজিকভাবে যুক্তিসিদ্ধ দেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি এ কৌশলটির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

ফরহাদ মজহার

ফরহাদ মজহার

তারপর তিনি বলেছেন, এনজিও দুই রকমের। একধরনের এনজিও পাশ্চাত্যের উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করছে। অন্য এনজিওগুলো বাংলাদেশে একটা সমাজ বিপ্লবের প্রেক্ষাপট নির্মাণের পথ প্রশস্ত করছে। তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে তিনি কার্ল মার্কসের নামও উল্লেখ করেছেন। আমি যদি তাঁর কথা যথাযথ বুঝে থাকি তাহলে তার অর্থ দাঁড়াবে এরকম। বাংলাদেশে কিছু কিছু মার্কসবাদী এনজিও রয়েছে যারা অদূর ভবিষ্যতে একটি বিপ্লবী রাজনীতি নির্মাণ করতে সক্ষম হবে। ফরহাদ সাহেব এই কথাগুলো বললেন কি কারণে তা বুঝতে পারলাম না।

এই দেশের বিপ্লবী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা এবং ভ্রান্তির কথা বলে শেষ করা যাবে না। তারপরেও একটা কথা সত্য যে ঐ ভ্রান্তি এবং ঐ ব্যর্থতা থেকেই উত্তরণের পথ বেরিয়ে আসবে। যদি না আসে এদেশের এই জনগোষ্ঠীর কোন ভবিষ্যৎ নেই। এই দেশে বিপ্লবী রাজনীতির (নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও) যতটুকু বিকাশ হয়েছে তা এই সমাজ বাস্তবতার ভেতর থেকেই হয়েছে। বিপ্লবী রাজনীতির যে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তা আত্মসাৎ করেই নতুন বিপ্লবী সংগঠন জন্ম নিতে পারে। একটা জনগোষ্ঠী সফল হোক ব্যর্থ হোক [তাদের] বৈপ্লবিক অভিজ্ঞতা নেগেট করে কোন বিপ্লবী আন্দোলন জন্ম নিতে পারে না। কিন্তু ফরহাদ মজহার সাহেবের বক্তব্য শুনে মনে হয় যে এদেশের একশ্রেণীর এনজিও আগামী কোন এক প্রত্যুষে বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। তাঁর এই বক্তব্যের বাস্তব সম্ভাবনা কতদূর? তাত্ত্বিক বিতর্কে আমরা যেতে চাই না। যে সমস্ত দেশ অর্থকড়ি দিয়ে এই ফরহাদ কথিত মার্কসবাদী এনজিওগুলো চালু রেখেছে তারা কি চাইবে যে এদেশে একটি বিপ্লব ঘটুক?

ফরহাদ মজহার সাহেব বুদ্ধিমান মানুষ। তাঁর বাকচাতুরি এবং নানাবিধ গুণ ও পারমঙ্গতার বিষয়ে আমরা বিলক্ষণ অবগত আছি। চটকদার বাক্য উচ্চারণ করে তিনি বেশিদূর যেতে পারবেন না। নিজে বিভ্রান্ত হবেন এবং অন্যদের বিভ্রান্তিতে ফেলবেন। আমার তো শংকা হয় ইতিমধ্যে তিনি একটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবার কারখানা খুলে বসেছেন। ফরহাদ সাহেব আত্মপ্রসাদ অনুভব করার জন্য যদি এসব কথাবার্তা বলে থাকেন আমাদের বলার কিছু থাকবে না। এমন কি বারাঙ্গনারাও আপন আপন পেশাকে সম্মানজনক মনে করে।

এদেশে অনেকে এনজিও করছে। ফরহাদ সাহেবের প্রয়োজন আছে, তিনিও করছেন। এই সরল সত্য সরলভাবে প্রকাশ করলে ভালো হতো। তা না করে বিপ্লব, সমাজতন্ত্র, মার্কসবাদ এসব জড়িত করে একটা জগাখিচুড়ি বক্তব্য রেখে [তিনি] নিজে মুশকিলে পড়লেন এবং অন্যদেরও মুশকিলে ফেললেন। এতে ফরহাদ সাহেবের প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে বটে কিন্তু এক বিন্দু নৈতিক সততার প্রমাণ মেলেনি।

এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে সাম্প্রতিককালের সমাজ বিপ্লবে নতুন নতুন পন্থা এবং সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। সমাজ বিপ্লবের সনাতন মার্কসীয় ধ্যানধারণার মধ্যে নানা ভাংচুর চলছে। নানা খোঁজখবর করতে চেষ্টা করেছি। এ সমস্ত দেশগুলোর কোথাও [কেউ] সমাজ বিপ্লবের সংগে এনজিও ধ্যান-ধারণার মিলন ঘটাতে পেরেছে সে রকম কোন সংবাদ তো পাইনি।

ফরহাদ সাহেব বিপ্লবের এরকম একটি মৌলিক তত্ত্ব দাঁড় করাতে পেরেছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি শুভ সংবাদ। আমরা তাঁকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাবো। আমাদের স্বীকার করে নেওয়া উচিত বিপ্লবের অন্যান্য তাত্ত্বিক প্রথিতযশা মনীষীর পাশে ফরহাদের একটা স্থান থাকবে। অথবা বলতে হবে বাংলাদেশ পৃথিবীর বাইরের একটি দেশ। নেপচুন কিম্বা মঙ্গলগ্রহে তার অবস্থান!

ফরহাদ সাহেব নানা সময় নানা কথা বলে থাকেন এবং নানান কাজ করে থাকেন। অনেক সময় তাঁর কাজকর্মের মধ্যে সংগতি খোঁজার চেষ্টা করলে চেষ্টাই সার হয়। কোন ফল মেলে না। কখনো তিনি কবি, কখনো বিপ্লবী, কখনো এনজিও মালিক, কখনো রাজনৈতিক নেতা, কখনো বা মার্কিন প্রবাসী বাঙালী ভদ্রলোক। এই এতগুলো পরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়ে তাঁকে আমরা চিনে নেবো? একই অংগে এত রূপ! এত বৈচিত্রের মধ্যে কোন বিন্দুটিতে আমরা একটা সামগ্রিক ঐক্য খুঁজে পাবো?

আমার তো মনে হয় ফরহাদ সাহেব হয়তো অতিমানব নয়তো রঙিন কুয়াশা যা দৃষ্টিকে ক্রমাগত প্রতারিত করে। আল্লাহ না করুন এই শেষের পরিচয়টি যদি সত্য প্রমাণিত হয় ভীষণভাবে ব্যথিত হবো।

প্রথম প্রকাশ: খবরের কাগজ, বর্ষ ৮ সংখ্যা ৩৮, ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯, ৬ আশ্বিন ১৩৯৬

ফেলানি খাতুন — কবীর সুমন

Felani

২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় ১৫ বছর বয়সী ফেলানি খাতুন। বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে এই মৃত্যু হইলেও বাহিনীটির একটি বিশেষ আদালত সম্প্রতি তাহাকে বেকসুর খালাস দেয়। বিচারের নামে এই প্রহসনে তাৎক্ষণিকভাবে অন্যান্যের মধ্যে প্রতিবাদ জানাইয়াছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী কবীর সুমন। সুমন ফেলানি খাতুনকে লইয়া একটি গানও রচনা করেন। নিজেই তাহাতে সুর ও কণ্ঠ দেন। গত ১৯ সেপ্টেম্বর গানটি ধারণ করার পর সুমনের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাহা প্রকাশ করা হয়

কবীর সুমন

কবীর সুমন

ওপার বাংলা এপার বাংলা
মাঝখানে কাঁটাতার
গুলি খেয়ে ঝুলে থাকলে ফেলানি
বল তো দোষটা কার।

কেউ দোষী নয় ফেলানি খাতুন
বিএসএফ জানে ঠিক
পথ ভুল করে নিয়েছিল গুলি
হঠাৎ তোমার দিক।

বেকসুর ছুটি পেয়েছে সেপাই
খুনিরা যেমন পায়
ভেবে দেখ মেয়ে ঐ খুনিটাও
বাংলায় গান গায়।

তুমিও গাইতে গুনগুন করে
হয়তো সন্ধ্যে হলে
তোমারই মতন সেই সুরগুলো
কাঁটাতার থেকে ঝোলে।

শোন বিএসএফ শোন হে ভারত
কাঁটাতারে গুনগুন
একটা দোয়েল বসেছে যেখানে
ফেলানি হয়েছে খুন।

রাইফেল তাক কর হে রক্ষী
দোয়েলেরও ভিসা নেই
তোমার গুলিতে বাংলার পাখি
কাঁটাতারে ঝুলবেই।

অডিও লিঙ্ক: http://www.kabirsumanonline.com/home/2013/09/20/felani-khatun