Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ১৩

সম্পাদকীয়–শাহবাগ, হেফাজত, রানা প্লাজা প্রভৃতি

অত্র আমরা খানিক পুরানা কাসুন্দি ঘাঁটিয়া দেখিব।
বিগত ৫ মে দিবাগত রাতে হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান চালাইবার সময় পুলিশ নিরাপত্তার দোহাই দিয়া শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চটি উঠাইয়া দেয়। ইহার পূর্বে ৫ ফেব্রুয়ারি হইতে টানা তিনটি মাস, সে ছিল এক অপূর্ব শাহবাগ। বলা হইতেছিল, যুদ্ধাপরাধের ন্যায্য বিচারের দাবিতে এই আন্দোলন একেবারেই ‘অরাজনৈতিক’। কিন্তু এত বড় একটা ঘটনা ‘অরাজনৈতিক’ হইবে কি করিয়া? বরং এই ‘অরাজনৈতিক’ কথাটার মানে তো এই যে দেশের বিরাজমান গণবিরোধী রাজনীতিকে শাহবাগ প্রত্যাখ্যান করিতেছিল।
শাহবাগ যেমন অনেক সম্ভাবনার পথ নিয়া হাজির হইয়াছে সেইরূপ ভবিষ্যতের তরফে ইহার সীমাবদ্ধতা লইয়া আলোচনা জরুরি। আর ইহা যতখানি সম্ভব নির্মোহভাবে করিতে হইবে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করিয়া আছে। এই দলটির পেটে প্রগতির বীজ আদৌ না থাকিলেও ইহা অন্তত মানিতে হইবে, ১৯৭১ সালের লীগ আর এই ২০১৩ সালের লীগের মধ্যে পার্থক্য আকাশ পাতাল। মুক্তিযুদ্ধ বেহাত হইবার জন্য সমাজে যে সুবিধাবাদী শ্রেণিটি দায়ী আওয়ামী লীগ তো তাহাদেরই সংগঠন। পরবর্তীতে আমরা দেখিতেছি, এই সুবিধাবাদী শ্রেণি বিএনপি-জাতীয় পার্টি ইত্যাদি আরো দল গঠন করিয়া এবং জামায়াতকে ফের রাজনীতিতে ফিরাইয়া বেশ একখানা গণতন্ত্র গণতন্ত্র খেলিতেছে। তো, বর্তমান আমলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ কম নহে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে সরকারের সহিত জামায়াতের গোপন আঁতাত হইতেছে এমন সন্দেহ করিয়াই শাহবাগে প্রথম গণবিস্ফোরণ ঘটিয়াছিল। এই কথা ভুলিবার নহে।
এদিকে মাত্র আর মাসকয় পরে জাতীয় নির্বাচন। ভোটে যাহারাই জিতুক, দেশের অধিকাংশ লোক সাফ সাফ বুঝিতেছে, ইহাতে তাহাদের কপালের সবিশেষ উনিশ-বিশ ঘটিবে না। প্রতিবার কোন একটি জোটকে ‘মন্দের ভাল’ ভাবিয়া ভোট দিতে দিতে ইতিমধ্যে তাহারা বিরাট হতাশ। এই হতাশার ফল হিশাবে সমাজে নানান ধরনের অস্থিরতাও ক্রমবর্ধমান। শাহবাগ সৃষ্টির এই সময়খানা বেশ নজর করিবার মতন।
কিন্তু এই গণবিস্ফোরণের একেবারে গোড়া হইতেই যথারীতি জামায়াতের কিছু বুদ্ধিজীবী এবং তাহাদের অপরাপর কুচক্রীমহল ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করিলেন। দিন দশেকের মাথায় যুদ্ধাপরাধ বিচার বানচালের কুমতলবে শুরু হইল ধর্মের জিকির। একদিকে তাহাদের খুনি স্কোয়াড আরম্ভ করিল গুপ্তহত্যা। অপরদিকে তাহাদের হইয়া ‘অহিংস পথে’ মাঠে নামিলেন হেফাজত আর মুখে একটুখানি মিষ্টি করিয়া কহিলেন, তাহারা বেশ জামায়াত-বিরোধী। কিন্তু ইহা যে ডাহা মিথ্যা তাহা নগদ হাতেনাতে ধরা পড়িল ১১ এপ্রিল ফটিকছড়িতে। এইদিন এক কওমি মাদ্রাসার ভিতর শিবিরকর্মীদের ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি আর চাপাতি দিয়া কোপানোর দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক্ষণে কাহারই বা অজানা?
তদুপরি বুদ্ধিজীবীদের যাহারা সরাসরি জামায়াতের পক্ষ নিতে পারিতেছিলেন না তাহারা এইবার যুক্ত হইলেন হেফাজতের কাতারে। এক কাঠি সরেস হইয়া তাহারা দাবি করিলেন, গোটা শাহবাগ আওয়ামী লীগের তৈয়ার আর শাহবাগ ও আওয়ামী লীগ উভয়ই এসলাম-বিরোধী। প্রশ্ন হইতেছে, আওয়ামী লীগ আদৌ কোন অসাম্প্রদায়িক দল কিনা, নাকি তাহারা স্রেফ সুবিধাবাদী মধ্যশ্রেণির রাজনীতিই করিয়া থাকে?
আর এই সুবিধাবাদ প্রসঙ্গে লীগ হইতে বিএনপি-জামায়াত কি তাহাদের অতিপ্রিয় হেফাজতও বা আলাদা কোথায়? ইহার বিশেষ প্রমাণ হিশাবে ধরা যায় রানা প্লাজা। নিহত সহস্রাধিক শ্রমিকের বিষয়ে তাহাদের যে প্রগাঢ় নীরবতা তাহার অর্থ তো এই, তাহাদের বিচারে এই সকল শ্রমিককুল যেন বা আশরাফুল মাখলুকাতই নহে। শ্রমিকের ঘাম শুকাইবার পূর্বে তাহার ন্যায্য মজুরি প্রদানের যে হাদিস তাহা হেফাজতের কোন নেতাকর্মী উচ্চারণটি পর্যন্ত করিলেন না। আবার ইনসাফ ইনসাফ বলিয়া তাহাদের পেটি-বুদ্ধিজীবী পারিষদ মুখে মুখে কত না ফেনা ভাসাইতেছেন।
এদিকে ‘অধিকার’ নামে একটি মানবাধিকার সংস্থা শাপলা চত্বরে হতাহতের প্রকৃত খবর জানাইতে বেশ অনুসন্ধান করিয়াছেন। আপাতভাবে এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রায় দেড়-দুই মাস কাটিয়া যাইবার পরও দেখা যাইতেছে রানাপ্লাজায় কর্মরত বহু শ্রমিক এখনো নিখোঁজ। কিন্তু ইহা লইয়া তাহাদের বা কোন ‘মানবাধিকার’ সংগঠনের কোনপ্রকার ব্যস্ততার নজির নাই। জোর গুজব, ১১ এপ্রিল ফটিকছড়িতে বহু খুনের ঘটনা ঘটিয়াছিল। কিন্তু ‘মানবাধিকার’ ব্যবসায়ী অধিকারাদি সংগঠন এই প্রসঙ্গেও নীরব।
যাহা হৌক, চার দশক বাদে হইলেও দেশে ঘাতক রাজাকারের বিচারসভা বসিয়াছে। বিয়াল্লিশ বছর পর তবে কেন নূতন উদ্যমে অসমাপ্ত জাতীয় মুক্তির লড়াই শুরু হইবে না?

হিন্দুস্তানের প্রথম মোগল সম্রাট বাবরের অসিয়ত– শেখ গোলাম মকসূদ হিলালী

সম্রাট বাবর ও তাঁর পুত্র হুমায়ুন

সম্রাট বাবর ও তাঁর পুত্র হুমায়ুন

যে কোন সুস্থ জাতির জাতীয় জীবন ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। অর্থাৎ রাষ্ট্রের সহিত ধর্মের সম্পর্কের দিক দিয়া রাষ্ট্র কোন বিশেষ ধর্মীয় রূপ পরিগ্রহ করিবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন যখন তীব্র গতি লাভ করিল তখনি আমরা দেখিলাম যুদ্ধাপরাধ সমর্থক কিছু ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ও এক দঙ্গল ধুরন্ধর জাতীয় জীবনের এই ধর্মনিরপেক্ষ ভাবের গোড়ায় কুঠারাঘাতের চেষ্টা করিলেন। কপট এই সকল গোষ্ঠী ও ব্যক্তিবর্গ প্রচার করিয়া থাকেন রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ব্রিটিশ উপনিবাসিক শক্তি এয়ুরোপ মহাদেশ হইতে ভারতবর্ষে আমদানি করিয়াছে। কিন্তু চোখ-কান  খোলা রাখিয়া ইতিহাস ঘাটিলে যে কেহই দেখিবেন, ভারতবর্ষের মানুষ বিভিন্ন সময় তাহাদের নিজস্ব বাস্তবতায় সমাজের প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় জীবনে বিভিন্ন রূপে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবের চর্চা প্রকট করিয়াছেন। মুঘল আমলে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির একটি নমুনা আমরা দেখিতে পাই পুত্র হুমায়ুনের উদ্দেশে লিখিত মুঘল সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তনকারী জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবুরের অসিয়তনামায়। অসিয়তনামাখানা ১৯৩০ ঈসায়িতে শেখ গোলাম মকসূদ হিলালী বাংলায় তর্জমা করিয়াছিলেন।
বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্বের গবেষণায় হিলালী মহাশয়ের কীর্তি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ও মুহম্মদ এনামুল হক প্রমুখের কীর্তির কাতারে জায়গা করিয়া লইবার যোগ্য। বলা হয়তো বাহুল্য হইবে না, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হইলে শাসকশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক ভেদনীতির বিরুদ্ধে তিনি “ওংষধসরপ অঃঃরঃঁফব ঞড়ধিৎফং ঞযব ঘড়হ-গঁংষরসং” নাম্নি এক বহি প্রচার করেন। এই কাজ করিতে যাইয়া উদার হৃদয়ের অধিকারী এই পণ্ডিত শাসকশ্রেনীর কোপানলে পড়িয়াছিলেন। আজ আমরা তাহার তর্জমায় বাবুরের অসিয়তনামাখানি পুনরায় প্রকাশ করিতেছি। ১৯৯৩ সালে রাজশাহী হইতে প্রকাশিত ‘হিলালী রচনাবলী’ দ্বিতীয় খণ্ডের ১৬৮ নম্বর পৃষ্ঠা হইতে আমরা উহা উদ্ধার করিতেছি

হিন্দুস্তানের প্রথম মোগল সম্রাট জহীরুদ্দীন মুহম্মদ বাবুর মৃত্যুকালে পূত্র হুমায়ুনকে নিম্নলিখিত অসিয়ত করিয়া যান। মূল দলীলখানা ভূপালের সরকারী পুস্তকাগারে রক্ষিত আছে। ইংরেজি অনুবাদ ১৯২৯ এর আগস্ট মাসের ‘The Indian Review’ পত্রিকায় ড. সৈয়্যেদ মহমুদ লিখিত [প্রবন্ধে] ৪৯৯ পৃষ্ঠায় এবং  Indian Islam লিখিত ১৯৩০ খৃষ্টাব্দে মুদ্রিত ওহফরধহ ওংষধস গ্রন্থের ১৫৭ পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য।

‘বাছা’, ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোক বাস করে, খোদা তায়ালাকে ধন্যবাদ যে তিনি তোমার উপর এই দেশের শাসনভার ন্যস্ত করিয়াছেন, এখন তোমার কর্তব্য এই যে —
(১) ধর্ম ব্যাপারে গোঁড়ামীর বশীভূত হইবে না, এবং দেশের সর্ব শ্রেণীর লোকের ধর্মমত ও আচারের প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়া নিরপেক্ষভাবে ন্যায় বিচার করিবে।
(২) বিশেষভাবে গো-হত্যা হইতে বিরত থাকিবে, তাহা হইলে ভারতবাসীর হৃদয়ে স্থান লাভ করিতে পারিবে। ইহাতে এদেশীয় লোক তোমার নিকট কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ থাকিবে।
(৩) কোন সম্প্রদায়ের উপাসনা গৃহ কখনও ভগ্ন করিবে না এবং সর্বদা ন্যায়পরায়ণ থাকিবে তাহা হইলে রাজা প্রজার মধ্যে আন্তরিক সম্বন্ধ বজায় থাকিবে এবং দেশে শান্তি ও সন্তুষ্টি বিরাজ করিবে।
(৪) ইসলাম প্রচারে জবর দস্তীর অস্ত্র অপেক্ষা ভালবাসা ও বাধ্যতার তলোয়ার অধিক কার্যকরী হইবে।
(৫) শিয়া-সুন্নীর বিরোধের প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শন করিবে নতুবা ইহার ফলে ইসলাম দুর্বল হইয়া পড়িবে।
(৬)  প্রজা-মণ্ডলীর নানা বৈশিষ্ট্যকে বৎসরের বিভিন্ন ঋতু বলিয়া গণ্য করিবে — তাহা হইলে রাষ্ট্রদেহে কোন ব্যাধি প্রবেশ করিতে পারিবে না।

কল্পনা– মাহমুদ হাছান

কল্পনা চাকমা

কল্পনা চাকমা

কল্পনা
মাহমুদ হাছান

তোদের চোখে মুখে এখনো ছিনালিপনা
দেখিস না কল্পনা হয়ে মেঘের কালো আলপনা
ঝুলে আছে খবংপুড়িয়ার পাহাড়টায়
হায়! শুধুই কি কল্পনা..
যখন পাহাড়ের দেবতার রোষানলে পড়ে
প্রজাপতি খুলে দিয়েছিল তার ঝাপি
যখন ঝড়ের দাপটে তাবৎ বৃক্ষরাজির
কোটরে কোটরে অশ্রুজলে মাখামাখি,
রক্তিম গণ্ডদেশে টোল পড়া মেয়েটা অস্ত্র বাগিয়ে
বেণী দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত হারিয়ে গেল খবংপুড়িয়ার পাহাড়টায়
তার চোখ ছিল শিশিরে বোনা
করপুটে মুক্তির বাসনা
চেয়েছিল শুধু একখানা শিশিরের তাঁত
দুমুঠো জুমের ভাত
আর ঘুচাতে বার বার ফিরে আসা শুকরীর প্রসববেদনা কাতর রাত
তাই আমাদের হোচপানা
দিদি তোর কালো কুন্তলে ভেসে উঠা মেঘেদের আলপনা
রক্তের ফোয়ারায় জেগে
মুক্তির কল্পনা… য়

চারটি কবিতা– শামসেত তাবরেজী


গ্রীবা-উদ্ধত সিভিলতা কদাকার
তুলিয়াছে ধুয়া আমাদের এই গাঁয়ে,
জাহির করছে যত প্রেম শঠতার
তুলেছে শস্য সামরিকতার নায়ে।
কোটাল বাহিনী প্রচারিছে সমাচার
খাঁড়া দণ্ডের পতাকাই উদ্ধার!
দেশপ্রেম কভু দিও না হৃদয়ে নিভায়ে,
ব্যত্যয় হলে রাখিও সেপাই সাজায়ে।

খিদা লাগে পেটে? অখিল খিদায় তুই
উন্নয়নের সাঁকো ভেঙ্গে দিলি আর
ছেদিলি বজরা, তলায় গাঁথিলি সুঁই,
তুই-ই কি তাহলে নরাধম নচ্ছার?

জাতিতত্ত্বটা বুঝলি না টায়ে-টায়ে,
যেথায় আমার আব্বাজনাব লুকায়ে!


কালকিষ্টি বিধানের বই ঘোরে হাতে-হাতে দণ্ডমুণ্ড লয়ে
এগাঁও ওগাঁও, সবখানে। প্রভূত আবেগে নাড়ে দৃঢ় চোয়ালের
সব কটি হাড়, আষাঢ়স্য বদমায়েসীর দিনে আরো ঢের
কদম্ব বগলদাবা করে সুবিখ্যাত হযরত ‘লুই কানালয়ে’
গম্ভীর আমেজে। মিতব্যয়ী ঢেঁকুরের সাথে পানরস
উঠে এসে কিঞ্চিৎ তটস্থ রাখে উথালপাথাল করা শরীরী তাগদ,
তক্তাপানে বিমুগ্ধ তাকিয়ে থাকে হ্যারা, খাইল্যা কলস
ওইদিকে বেজে যায় বিহক্সগী মুদ্রা তুলে, অশেষ দরদ
কণ্ঠ থেকে ঝরে গেলে সমিতির সকল ছাইতান
পুচ্ছ নাড়িয়ে দোল দ্যায়। বিধানের চৌষট্টি কলা
রক্তের দাগচিহ্ন মুছতে না মুছতেই হেপাড়ের খালু-আব্বাজান
ডেকে নিয়ে বেহাত সম্পন্ন করে। কষে বাঁধা তক্তায় অটলা —
রানির মুখচ্ছদ বদলায় খালি, হ্যাতেই বেজায় খুশি ফকিন্নির দল
বিধানের বই মেনে বেটে দ্যায় রক্তের সমস্ত ফসল ।


এখানেই শেষ নয়, কোতলপর্ব আছে বাকী,
সঙ্গে সমুদ্রঠেলা! ভ্রাতুষ্পুত্রপুত্রীগণের কোরাস
মধুসমাপনে ঢুলে ঢুলে গীত হবে সম্পূর্ণ ফ্রি,
বৈদগ্ধে বাঙ্ময় হবেন নগরের শ্রেষ্ঠ খাটাস,
তাছাড়াও গন্ধশোঁকা আছে, রক্তের ঢেউ
গুনে গুনে গাইতে হবে জাতিতত্ত্ব বিষয়ক গীতি।
নাদুসনুদুস করে গড়তে হবে মলাঢেলাটাকি,
প্রমাণিতে হবে এরা রক্তপায়ী টিরেনোসোরাস!

শেষদৃশ্য মঞ্চায়নের আগে নিজেকে প্রস্তুত কর,
ঘাড়ের রগটায় দাও বুলিয়ে কোমল হাতখানি।
ব্রীড়াকৌশলের নীতিশাস্ত্রসমুজ্জ্বল গ্রন্থ তুলে ধর,
একমাত্র ভাষা হোক রক্তমাখা বিপুল গোঙানি
রে মাধবী তোর!  তুই কোতলপর্বের শ্রেষ্ঠ হারামি,
তোর মধ্যে ঢুকে আছে তক্তার যত নষ্টামি!


বড় ডর লাগে এই মেঘ, দিকনেছাড়া বেতালা বাতাস।
যদিবা উল্টায়ে দ্যায় সামান্য এ কোশাখানি মোর?
যদি সেই রক্তমল সমস্ত শিথানে আনে ফের সর্বনাশ?
যদিবা গণিত ছেড়ে শূন্যে উড়াল দ্যায় সব কটি জোড়?
বিজোড়ে যুক্ত হয়ে আল্গা করে দেহের খিলান?
হেঁটমুণ্ডু ঊর্ধ্বপদ এ দেশ ভি নয়া এক মহা সার্কাস
দেখাবার আয়োজন করে, আমি তারে কিবায় রুখব,
এ সামান্য দেহ মোর কবেই তো নিয়াছে সেয়ান?

অশেষ বুজরকি করে, যেটুকু রয়েছে তা পাপের ধীয়ার —
একটাও মাছ তাতে আটকা পড়ে না, শামুক আর গুগলির যুব-
স্যাঙাতেরা শিং তুলে বিকট পদক্ষেপে টিক্কা-ইয়াহিয়ার
মতন খাবলে ধরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। এমত অশুভ

মেঘ সামরিকতার তুমি চলে যাও, দূরে চলে যাও —
আমারে আবার বাইতে দীনেশ সেনের কাছে দোয়াধর্ম চাও। য়
সূত্র: লেখকের ‘তক্তা’ নামক কাব্যগ্রন্থ

খাঁটি মুসলমান: একটি খণ্ড অনুসন্ধান– নূর মোহাম্মদ

‘কে খাঁটি মুসলমান আর কে আদৌ মুসলমান নয়: একটি সমস্যা’ প্রবন্ধের প্রথম কিস্তিতে উমাইয়া বংশের শাসনামলে ধর্ম সম্পর্কে শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখ করতে গিয়ে উদ্ধৃত করেছিলাম, ‘আজিজ বা দ্বিতীয় উমর (৭১৭-৭২০) ছাড়া উমাইয়া আর কেহই ধর্মের প্রতি ততটা অনুরক্ত ছিলেন না।’ (বাংলা বিশ্বকোষ, ১ম খণ্ড, ১৯৭২, পৃ. ৪০৬)
ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে কিন্তু আসলে উসমানের (রাঃ) নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সময় থেকেই এক গভীর রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের শুরু করে। এসব যুদ্ধে শুধু সাধারণ অর্থেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়নি, সেসব হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও ভয়াবহতার কথা ভাবাই যায় না। কে বা কোন অংশ যে ইসলামের পথে সঠিকভাবে ছিল তা নির্ণয় করতে ঐতিহাসিকদের সঙ্গে ইসলাম ধর্মের বিশেষজ্ঞদেরও প্রয়োজন।

আমরা জানি প্রথম খলিফা ছাড়া বাকি তিনজন অর্থাৎ হজরত উমর(রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলীর (রাঃ) স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তিনজনকেই হত্যা করা হয়েছে। হযরত উমর (রাঃ) নামাজ পাঠরত অবস্থায় আবু লুলু নামক জনৈক অগ্নি উপাসকের খঞ্জরাঘাতে শহিদ হন (৩ ডিসেম্বর ৬৪৪)। কিন্তু হযরত উসমান ও হযরত আলীকে মুসলমানরাই হত্যা করেছিল। শুধু তাই নয় হযরত আলীকে (রাঃ) অভিযোগের কাঠগড়াতে বড় দুঃসময়ে দাঁড় করিয়ে খারেজিদের উদ্ভব। বলা যেতে পারে, ইসলামের ইতিহাসে সেই প্রথম স্বতন্ত্র একটি গোষ্ঠীর উত্থান লক্ষ্য করা গেল।

হযরত উসমানের (রাঃ) হত্যাকাণ্ড লইয়া সিফ্ফিনের সময় (জুলাই ৬৫৭) মু’য়াবিয়া কর্তৃক হযরত আলীর (রাঃ) নিকট কুরআন মোতাবেক রায় দেওয়ার জন্য দুই জন মধ্যস্থতাকারীর নাম প্রস্তাব করা হয়। সেই উপলক্ষে খারেজি বিভেদের সূত্রপাত হয়। হযরত আলীর (রাঃ) অধিক সংখ্যক সৈন্য এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু একদল সৈন্য বিশেষ করিয়া তামীম গোত্রীয় সৈন্যরা ধর্মীয় বিষয়ের উপর মানুষের মধ্যস্থতার তীব্র প্রতিবাদ উত্থাপন করে। তাহারা উচ্চস্বরে বলিতে থাকে, ‘একমাত্র আল্লাহর উপরই রায় নির্ভর করে’ এবং সেনাবাহিনী ত্যাগ করিয়া কুফার অনতিদূরে হ’ারূর‌্যা নামক গ্রামে বাস করিতে লাগিল। (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ১ম খণ্ড, ১৯৮২, পৃ. ৩৮৭)

এদেরকে দলত্যাগী বলা হয়েছে।… ‘বিদ্রোহীদের নামকরণ সম্পর্কে কথিত হয় যে, কুফা হইতে নিষ্ক্রমণ বা চলিয়া যাওয়া হইতেই এই খারিজী (যাহারা চলিয়া গিয়াছে) নাম করণ করা হইয়াছে।’ (প্রাগুক্ত)
হযরত আলীকে (রাঃ) প্রথম থেকেই দুরূহ পথ অতিক্রম করতে হয়েছিল। হযরত উসমানের (রাঃ) হত্যার বিচার দাবি করে বিদ্রোহীরা হজরত আয়েশা, তালহা ও যুবাইয়েরের নেতৃত্বে বসরা আক্রমণ করে দখল করে নেয়। তারা আলীর মনোনীত শাসনকর্তাকে বন্দি করে এবং হযরত উসমানের (রাঃ) হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে হত্যা করে।
হযরত আলী (রাঃ) বসরা আক্রমণ করলেন। তবে যুদ্ধের প্রারম্ভেই আপোস নিষ্পত্তির জন্য তালহা ও যুবাইয়েরের সঙ্গে কথাবার্তা আরম্ভ করলেন। তিনি উসমানের (রাঃ) হত্যার জন্য দায়ীদের শাস্তি প্রদান সমর্থন করলেন আর চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য সময় চাইলেন। শান্তিপূর্ণ মীমাংসার আশায় উভয় পক্ষ শিবিরে ফিরে যায়।
কিন্তু হযরত আলীর সৈন্যদলে উসমানের হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট বহু লোক ছিল। তারা ভাবল, যুদ্ধের সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। তাই পরদিন প্রত্যুষে তারা অতর্কিতে তালহা ও যুবাইয়েরের দলকে আক্রমণ করে। তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়। তালহা ও যুবাইয়ের যুদ্ধে নিহত হলেন। হযরত আয়েশার (রাঃ) উষ্ট্র ঘিরে বহুক্ষণ যুদ্ধ চলল। অবশেষে তাঁর উষ্ট্র আহত হল এবং যুদ্ধ থেমে গেল। হযরত আলী (রাঃ) আয়েশাকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করলেন। (উষ্ট্রের যুদ্ধ ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ)
উষ্ট্রের যুদ্ধে উভয় পক্ষে মোট ১০ সহ¯্র মুসলমান নিহত হল। (কবীর ২০০৯, পৃ. ১৪৫-৪৬) এই যুদ্ধ প্রসঙ্গে পরবর্তী সময়ে আল মুতাজিলারা একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে। তাদের মতে ‘আলী, তালহা, আল যুবাইয়ের ও আয়েশা (রাঃ) মূলত প্রকৃত ধার্মিক মুসলমান ছিলেন। কিন্তু তাহাদের মধ্যে যে যুদ্ধ বাঁধে তাহার ফলে তাহারা দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়েন। ইহাদের দুই দলই ন্যায়পন্থী হইতে পারে না। দুই দলের এক দল গুনাহ করিয়াছেন; কিন্তু সে কোন দল আমরা জানি না।’ (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ২য় খণ্ড, ১৯৮২, পৃ. ২৭৩)।
এ ধরনের মন্তব্য বরং পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে তোলে। এই মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল হযরত হাসান আল বসরীর সময়। ‘তাহাদের মূলনীতি বিশ্বাস (ইমান) ও অবিশ্বাসের (কুফর) মধ্যবর্তী এক তৃতীয়াবস্থা। ইহা স্বীকার করে যাহারা তাহারাই মুতাজিলা। একটি পৃথক সংগঠন গঠনের জন্য হাসান আল বসরীর দল হইতে পৃথক হইয়া যান (ই’তাযালা) বরং হাসানই তাহাদিগকে “সরিয়া পড়” (ই’তাযিলা) বলিয়া নিজ দল হইতে বাহির করিয়া দেন। তাহারা ও তাহাদের অনুসারীগণ মুতাজিলা নামে পরিচিত হন। এই একমাত্র ঐতিহাসিক সত্য হইলেও ইহা হইতে তাহা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ মুতাজিলা তাহাদের নামের জন্য গর্ববোধ করিত। ইহা যদি তাহাদের শত্রুদের দেওয়া অবজ্ঞাসূচক নাম হইত তাহা হইলে তাহারা কখনো তাহাতে গৌরব অনুভব করিত না। এইমত নির্ভুল বলিয়া স্বীকার করা যায় না। কারণ মুতাজিলিগণ নিজেদের অখ্যায়িত না করিয়া বরং আহল আল আদল হুয়া আল তাওহিদ বলিয়া থাকে এবং হাসান আল বসরীর ঐ উক্তির কারণেই সুন্নিগণ তাহাদিগকে মুতাজিলা (সুন্নিদল পরিত্যাগকারী) আখ্যা দেয়।’ (প্রাগুক্ত, পৃ. ২৭২)


হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) জীবদ্দশায় ইহুদিরা সর্বশক্তি নিয়োগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর ধর্মত্যাগীদের আন্দোলনের সময় ইহুদি ও খ্রিস্টানগণ ধর্মত্যাগীদের প্রকাশ্যভাবে সহায়তা করেছিল। এছাড়া বাইজান্টাইনদের সাথে মুসলমানদের বারবার যুদ্ধ করতে হত। তাই হযরত উমর (রাঃ) এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে আরব উপদ্বীপকে ইসলামের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিরূপে — কেবলমাত্র মুসলমানদের আবাসভূমি হিশাবে — সম্ভাব্য বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র ও অসদাচরণের হাত হতে রক্ষা করতে হবে। এতদুদ্দেশে তিনি খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়কে আরব দেশ ছেড়ে মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্যত্র চলে যাবার আদেশ দেন। শুধু তাই নয়, তিনি আরবের বাইরে আরবগণকে কোন শহরে বা নগরে বসবাসের অনুমতি দেননি। কারণ এতে তারা নগর সভ্যতার বিলাস ব্যসনে মগ্ন হয়ে সামরিক কর্তব্য  থেকে বিচ্যুত হবে। সেজন্য তিনি বিভিন্ন দেশে তাদেরকে সুনির্দিষ্ট সামরিক নিবাসে বসবাস করতে নির্দেশ দেন। (কবীর, পৃ. ১২৭-২৮) কিন্তু দুভাগ্যের বিষয় দেখা গেল যে, হযরত ওসমান গনী (রাঃ) খিলাফতের শেষদিকে নানা কারণে মুসলমান সমাজে মতদ্বৈধ ও দলাদলি ভয়াবহরূপ পরিগ্রহ করে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয় (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৫)। তদুপরি রাজ্যবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের মধ্যে ধনসম্পদের প্রাচুর্য ও বিলাস ব্যসনের সমারোহ দেখে হযরত উসমান ব্যাথিত ও মর্মাহত হন। সুরম্য অট্টালিকা, অসংখ্য দাসদাসী, বহু মূল্যবান পোশাক পরিচ্ছদ, অগণিত অশ্ব ও উষ্ট্রাদি রাজ্যের সর্বত্র এমনকি পবিত্র নগর মক্কা ও মদিনার সহজ সরল জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন সাধিত করেছিল। আবুজর এ বস্তুতান্ত্রিক জীবনযাত্রার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। তিনি ধনী সম্প্রদায়কে দরিদ্রদের উপকারার্থে তাদের ধন পরিহার করতে বললেন। কুরানের বাণী উদ্ধৃত করে তিনি আন্দোলন শুরু করেন। মুয়াবিয়া তার সাধুতা পরীক্ষা করতে গিয়ে বরং উল্টো বিপদ আশঙ্কা করে তাঁকে খলিফা উসমানের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। খলিফা তাঁর সাথে তর্ক বিতর্ক করেও তাঁকে নিবৃত্ত করতে পারলেন না। তিনি আবুজরকে বললেন, ধনী ও সম্পদশালী ব্যক্তিরা যাকাত আদায় করলে তিনি তাদেরকে আর কিছুই করতে পারেন না বা তাদের ধনসম্পদে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৮-৩৯)
খুলাফা-ই-রাশিদীনের আমলে ‘সমাজজীবন’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইসলামী বিশ্বকোষের একাংশে বলা হয়েছে, খুলাফা-ই-রাশিদীনের আমলে মেয়েদের জন্য তখনো অবরোধপ্রথা সৃষ্টি হয়নি। তারা অবাধে চলাফেরা করতে পারত এবং খলিফাগণের বক্তৃতা ও আলেমদের ধর্মোপদেশ শ্রবণ করতে পারত। (প্রাগুক্ত) মেয়েদের অবাধ চলাফেরা উমাইয়া শাসনের প্রায় শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।


সমকাল পত্রিকায় আবু সাঈদ খান গত ২৯ মে ২০১৩ তারিখে ‘ড্রেসকোডেও চাই অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী’ শিরোনামের এক নিবন্ধে লিখেছেন, রাজধানীর একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রদের শার্ট ও ছাত্রীদের কামিজের লম্বা হাতা কেটে দিয়েছেন উপাধ্যক্ষ ও কয়েকজন শিক্ষক। স্কুলের ড্রেসকোড অনুযায়ী কনুই পর্যন্ত হাতা রাখার কথা, তার চেয়ে লম্বা থাকায় এ ব্যবস্থা  নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলেছেন, ছেলেদের শার্ট ও মেয়েদের কামিজের হাতা কনুই পর্যন্ত হবে। তা স্কুলের ডায়েরিসহ বিভিন্ন জায়গায় লিখিত আছে। কিছু শিক্ষার্থী তা না মানায় বারবার সর্তক করা হয়েছে। তারপরও নিয়ম না মানায় যে ধরনের ব্যবস্থা আগে নেয়া হত এবারও তাই নেওয়া হয়েছে। এই নিয়ে অভিভাবক মহলেও এবার প্রতিক্রিয়া হয়েছে। অভিভাবকরা কেউ কেউ অধ্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন। সেই অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২৬ মে উপাধ্যক্ষ মাহবুবা খানমকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ঘটনাখানি আমাকে হতবাক করেছে।
এ ঘটনার উপর গত শনিবারে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মেয়েদের পোশাকে হাতা কাটার এ ঘটনা কেবল ধর্মীয় অনুভূতিতেই আঘাত হানেনি বরং ইসলামের অলঙ্ঘনীয় বিধান পর্দা পালনে বাধা দেওয়ার মত অপরাধ। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটতে পারে তা ভাবাই যায় না।’ ইত্যাদি।
গত কিস্তিতে আমি কর্মক্ষেত্রে নারীর ভূমিকা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিলাম, দেশের প্রায় হেন খাত নাই যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নারীর উপস্থিতি নেই। কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন বাধা অতিক্রম করে বাংলাদেশের নারীরা পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে চলেছেন। এ প্রসঙ্গে একটি প্রকাশিত সংবাদের শিরোনামে দৃষ্টি আকর্ষণ করি: ‘হাল ধরেছেন নারীরাই: এক দশকে ৭০ লাখ যুক্ত হয়েছেন কৃষিকাজে’ (বণিক বার্তা, ১১ মে ২০১৩)। এবং বর্তমানে ১ কোটি ৫ লক্ষ নারী শ্রমিক কৃষিকাজে শ্রমশক্তি বিক্রি করে চলেছেন। নির্মাণ খাতেও মেয়েদের বড় ধরনের অংশগ্রহণের উল্লেখ রয়েছে যার দৃষ্টান্ত সকলের সামনেই দৃশ্যমান।
অন্যান্য খাতের কথা বাদ দিলেও পোশাকশিল্প খাতে কর্মরত নারী, নারী নির্মাণ শ্রমিক ও কৃষিকাজে নিযুক্ত বিরাট সংখ্যক নারী শ্রমিক — শুধুমাত্র এই তিনটি খাতের শ্রমিকদের ড্রেসকোড কি হবে? তাছাড়া বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন মেসে নিয়োজিত কাজের বুয়ারা রয়েছেন তাদের ড্রেসকোডই বা কেমন হবে?
কৃষিকাজে নারীরা কয়েকটি মৌসুমে যে কাজ করে থাকে তার প্রধান অংশ এখনও বোধ করি ধান চাল। তাহলে বিভিন্ন মৌসুম অনুযায়ী এবং বিভিন্ন ফসলের চরিত্রগত পার্থ্যকের ফলে নারী শ্রমিকরা ঠিক একই ধারায় কাজ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে ড্রেসকোড বা পরিধেয় বস্ত্র কি হবে? নারী শ্রমিকদের আর্থিক বিরাট দৈন্যদশা না থাকলে শখ করে তারা পুরুষদের সঙ্গে একই ধরনের কৃষিকাজে অংশ নাও করতে পারত। কিন্তু আজ কর্মক্ষেত্রের পরিসর যেভাবে বাড়ছে সেই তুলনায় বেকার সমস্যা সমাধান হচ্ছে না। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে গ্রামের মেয়েরা। ফলে অভিভাবকরা অল্প বয়সেই তাদের মেয়েদের পোশাক কারখানায় কাজ করতে পাঠিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের প্রতিটা সরকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও ধান উৎপাদনের সাফল্যের কথা বড় জোর গলায় বলে থাকেন — অথচ চরমভাবে ন্যায্য মজুরি বঞ্চিত বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা এই ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে চলেছেন তার স্বীকৃতিটুকু পর্যন্ত কেউ দিতে চান না।
মৌলানা শাহ আহমদ শফী দাবি করেছেন, দেশের ৯০ শতাংশ মুসলমান। এদের মধ্যে পর্দাহীন নারী তো রয়েছেই, তার উপর ইসলামের অনুশাসন যথাযথভাবে পালন করা মুসলমানের সংখ্যা বিরাট সে কথা বলা যাবে না। তা সত্ত্বেও তিনি ৯০ শতাংশ মুসলমান বলে উল্লেখ করেছেন। ৫ মের সমাবেশে একই আওয়াজ উঠেছিল — বাংলাদেশ মুসলমানের দেশ — ঢাকা শহর মুসলমানের শহর। যেন অন্য ধর্মাবলম্বীদের দেশ এটা নয়। তা বেশ! বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষই মুসলমান। কিন্তু ৫ মে ‘নয়া দিগন্ত’ পত্রিকার প্রথম পাতায় একটা বড় প্রচারপত্র প্রকাশিত হয়। শিরোনাম: হেফাজতে ইসলামের নিকট জাতির প্রত্যাশা। এর ৩নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে,

আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলমান জন্মগত সূত্র ও আরবি নামের সূত্রে মুসলিম দাবীদার হলেও শিরকমুক্ত পরিশুদ্ধ ঈমানদারদের সংখ্যা অনেক কম। ফলে ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হওয়া সত্ত্বেও ধর্মনিরপেক্ষতার মত কুফরী মতবাদের অনুসারী হওয়াকে অনেকেই ক্ষতিকর মনে করে না। এর প্রধান কারণ হল ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানের দৈন্যতা। আর এ জন্যই মুসলমানের ঘরে ইসলামের দুশমন পয়দা হচ্ছে। তাই আজ হেফাজতে ইসলামের প্রধান কর্মসূচি হওয়া উচিত শিরকমুক্ত পরিশুদ্ধ ঈমানের চর্চা বৃদ্ধি করা।

জামায়াতে ইসলামের অন্যতম মুখপত্র ‘নয়া দিগন্ত’ হেফাজতে ইসলামের কর্মবীরদের নসিহত করছে কোনটা তাদের প্রধান কর্মসূচি হবে। তাছাড়া এখানে একটা ব্যাপার ইচ্ছাকৃত উহ্য রাখা হয়েছে তা হল জামায়াতের হিশাবে এদেশের শতকরা কত ভাগ খাঁটি মুসলমান তার অন্তত একটা আনুমানিক পরিমাণ তাদের নিশ্চয় জানা আছে। তাদের সংগঠনের প্রয়োজনেই এই জরিপের ফলাফল তাদের জানা না থাকার কথা নয়। ফলে হেফাজতে ইসলামের শতকরা ৯০ ভাগের হিশাব জামায়াতের হিশাবের সঙ্গে মিলে যাওয়ারও কথা নয়। এই সব হিশাব আমাদের জানা থাকলে খাঁটি মুসলমানের ভূমিকা সম্পর্কে আমরা কিছুটা অবগত হতে পারতাম।

সাভার ট্র্যাজেডি: কতিপয় প্রসঙ্গ– নূরুল আনোয়ার

গত মে মাসের ১৩ তারিখে গুলশানে অবস্থিত হোটেল লেক শোরে সাভার ট্র্যাজেডির উপর একটা বড়সড় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে দেশি-বিদেশি অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। ঐ সেমিনারের রেশ ধরে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির একটি দল সরেজমিন বর্তমান পরিস্থিতি দেখার জন্য সাভার গিয়েছিল। আমিও ছিলাম সেই দলের সঙ্গে। সেখানে গিয়ে আমি পুরো ব্যাপারটিকে সাদামাটা চোখে দেখার চেষ্টা করেছি।

আমরা সকলে জানি, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাভার ট্র্যাজেডি পৃথিবীর ভয়াবহতম ঘটনার একটি। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে দুটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। প্রথমটি হল এ ঘটনার ভয়াবহতা। এই ঘটনায় অনেক মানুষ মারা গেছে; আহত হয়েছে অনেকে। এই আহত মানুষের একটা বড় অংশ অঙ্গহানির কারণে আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। তার উপর এখনো অনেকে
নিখোঁজ রয়েছেন। এই যে মৃত, আহত এবং নিখোঁজ মানুষ, তাদের সংখ্যাটা কত তা এখন পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিরূপণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। হয়তো ঘটনার আকস্মিকতায় তা সম্ভব হয়নি। ছাড়াছাড়াভাবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান হতাহতের পরিসংখ্যান তৈরি করলেও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান হাতে পেতে হয়তো আরো সময় লাগবে। যারা মারা গেছে তারা আর ফিরে আসবে না। তাদের নিয়ে কেউ তেমন একটা ভাবছেও না। কিন্তু যারা আহত হয়ে হাসপাতাল কিংবা বাসাবাড়িতে শুয়ে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে, যারা নিজেদের জীবনকে ভাগ্যের কাছে সঁপে দিয়েছে, তাদের কি হবে? তাদের নিয়েই যত ভাবনা। হয়তো কেউ না কেউ তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।

মানুষ আশায় বাঁচে, আশায় বুক বাঁধে। তারাও সেই আশায় আছে। যারা আহত-নিহত হয়েছে কিংবা নিখোঁজ রয়েছে তাদের যা ক্ষতি তা তো হয়েই গেছে। কিন্তু আহত, নিহত এবং নিখোঁজদের যারা স্বজন — কারও মা, কারও বাবা, কারও ভাই কি বোন, কারও ছেলে বা মেয়ে, কারও জ্ঞাতি — তাদের একটা বড় অংশ সাভারের দুর্গতদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাদেরই বা কি হবে? হ্যাঁ, এখন তাদের দিকেও তাকাতে হবে। এটা একটা কঠিন বাস্তবতা।

আমি বলেছিলাম সাভার ট্র্যাজেডির ভেতর দিয়ে দুটি জিনিস ফুটে উঠেছে। দ্বিতীয়টা কি? দ্বিতীয়টা হল আমাদের মনোবল। বাঙালি চরম দুর্দিনেও ভেঙ্গে পড়ে না। এ জাতি হতাশাগ্রস্ত জাতি নয়। ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাব এ জাতির জীবনে হাজার রকম দুর্যোগ এসেছে, আবার সেই দুর্যোগ সকলে সম্মিলিতভাবে মোকাবেলাও করেছে। সর্বশেষ নজিরটা দেখা গেছে সাভার ধ্বংসলীলা থেকে হতাহতদের উদ্ধারকর্মে। এখানে কোন লোক দেখানো ব্যাপার ছিল না। এক বাচ্চা ছেলে গুলিতে মারা যাওয়ার পর এক মন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে। সেটা একটা প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। সাভারের ধ্বংসলীলায় উদ্ধারকর্মীরা সেই মতে বিশ্বাসী ছিলেন না। যারা উদ্ধারকর্মে নেমেছিলেন তাদেরও অনেককে আহত হতে হয়েছে। জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কাজ চালাতে গিয়ে কায়কোবাদ নামের একজন জীবনও উৎসর্গ করেছেন। কায়কোবাদ প্রমাণ করেছিলেন বাঙালি বীরের জাতি, মৃত্যুকে ভয় করে না। সতের দিন পর রেশমা নামের এক বোনকে জীবিত উদ্ধার করার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে উদ্ধারকর্মীরা কত সতর্কভাবে কাজ করেছে।

সাভার ট্র্যাজেডিতে আমরা কিছুটা রাজনীতির গন্ধ পেয়েছিলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীর বলেছিলেন বিএনপি-জামায়াতের লোকজন খাম্বা ধরে ভবনটিকে নাড়া দিয়েছিল বলে সেটি ভেঙ্গে পড়েছে। সেটি মানুষের মধ্যে যেমন হাসির খোরাক জুগিয়েছে, তেমনি মানুষ আবার ধিক্কারও জানিয়েছে। বিরোধীদলের পক্ষ থেকেও রাজনীতি থেমে ছিল না। তারা বলেছিল সরকার অনেক লাশ গুম করে ফেলছে। হাস্যকর কথা। বিরোধীদল একবারও ভাবেনি, যারা জীবন বাজি রেখে উদ্ধারকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিল দলটির মন্তব্য তাদের কিভাবে হেয় করছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দেশের কল্যাণের কথা বলে। মানুষের কথা বলে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অনুগত লোকজনের অভাব নেই। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কয়জন অনুগত কর্মীকে এ কাজে নিয়োজিত করেছে আমাদের প্রশ্ন জাগে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল যদি তাদের তরফ থেকে দশজন করেও লোক নিয়োগ দিত তাহলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দেশপ্রেমের বিষয়টা কিছুটা হলেও ফুটে উঠত, পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ থেকে লোকজনদের উদ্ধার করার পথও অনেক প্রশস্ত হত এবং সরকার লাশ সরিয়ে ফেলছে এ কথাটাও বলার সুযোগ তৈরি হত না।
লাশ সরানোর ব্যাপারটি সাভারের একজন উদ্ধারকর্মীর কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তিনি জানালেন, লাশ সরানোর প্রশ্ন আসবে কেন? হাজার হাজার মানুষের মাঝখান দিয়ে হাজার হাজার লাশ সরাবার সুযোগ কোথায়? যারা এসব প্রশ্ন তোলে তারা কি একবারও ভেবেছে, যারা নিজের জীবনবাজি রেখে উদ্ধারকর্ম চালিয়েছে এসব কথা বলে তাদের প্রতি কি রকম অসম্মান করা হয়?

উদ্ধারকর্ম শেষ হয়েছে কয়েকদিন হয়ে গেল। যেখানে রানা প্লাজা ধসে পড়েছিল সেখানে এখন স্মৃতি ছাড়া কিছু নেই। এখন বাতাসে এক ধরনের গন্ধ। কেউ কেউ মন্তব্য করছে এসব পঁচা লাশের গন্ধ। ঐ জায়গায় এখনো কৌতূহলী মানুষের শেষ নেই। এখনো স্বজনহারা মানুষের আনাগোনা। নিখোঁজ মানুষের ছবিটি বুকে সেঁটে তারা তাদের প্রিয় মানুষটি খুঁজছে। তারা জানে প্রিয় মানুষটিকে আর ফিরে পাবে না। তারপরও কেউ এসেছে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে তারা হারিয়েছে বলে। যারা উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়েছে ভবিষ্যৎ তাদের ঘন আঁধারে ঢাকা। যারা আহত হয়ে হাসপাতালে শুয়ে আছে তাদের সকলে দেখতে যাচ্ছে। কিন্তু যারা মৃত এবং নিখোঁজ তাদের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত কেউ কোন সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেনি।

ময়মনসিংহের চৌদ্দ বছরের মেয়ে রেখা। তার লাশ চিহ্নিত করা যায়নি। রানা প্লাজার হাহাকার করা জায়গার পাশে উদাস চোখে তাকিয়ে আছেন মা মর্জিনা বেগম। পাশে দাঁড়িয়ে বাবা। তারা লাশ পাবেন সেই আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য মেয়ে যদি পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকত এক

ধরনের সান্ত¡না তারা পেতেন। লাশ পেলে কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকতেন। সে নিজে চলে গেল, অন্যদেরও ভাসিয়ে গেল। সে যদি বেঁচে থাকত হয়তো অন্যদের মত কিছু সাহায্য-সহযোগিতাও তারা পেতেন। এখন একূল ওকূল দুকূলই গেছে। গ্রামে যাবে সে খরচ তাদের নেই। এ তো মাত্র একজন মর্জিনার কথা। তার মত যে আরো কত আছে তার হিসেব নেই।

সাভারের এনাম হাসপাতালে এখনো অনেক আহত রোগী বিছানায় শুয়ে। তাদের অনেকের হাত নেই, অনেকের পা নেই। অনেকে হাত-পা দুই-ই হারিয়েছে। যাদের হাত-পা আছে তারাও অনেকটা অসহায়। তারা যেন বেঁচে থেকেও মড়া। তাদের চোখে মুখে অসহায়ত্ব। অনেকে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছে বটে, কিন্তু তা নিয়ে তারা আহ্লাদিত নয়। টাকাটা তাদের খুবই দরকার। কিন্তু অভাবের চেয়ে পোড়া শরীরের ভার সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে এটাই তাদের বেশি করে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছে। ঘটনাচক্রে মনে হয়েছে যেসব আহত মানুষকে লোকজন সাহায্য-সহযোগিতা করে চলেছেন, ঐ সাহায্য-সহযোগিতার পুরোটা তারা পাচ্ছে না। তাদের চারপাশে ঘিরে থাকা আত্মীয়স্বজন যে টাকাপয়সা সরিয়ে নিচ্ছে না তা বলা মুশকিল। অনেক রোগীর সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, কত টাকা সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছে তারা তা জানে না। জানে তাদের আত্মীয়স্বজন। কিন্তু সেই আত্মীয়স্বজন টাকার সঠিক তথ্যটা কাউকে দিচ্ছে না। তারা ভেতর থেকে তা চেপে যাচ্ছে।

হাসপাতালের প্রধান এনাম সাহেব মনে করেন, যে হারে সাহায্য-সহযোগিতা এসেছে তা একেকজনের ভাগে বারো থেকে ষোল লক্ষ টাকার কমে নয়। যেসব মহিলারা হাত-পা হারিয়ে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, সেই সুবাদে তারা কিছু টাকা পেয়েছে বটে, কিন্তু ঐ টাকা স্বামী নামক প্রাণীটি যে যথেচ্ছভাবে খরচ করবে না তার নিশ্চয়তা কি? এক সময় যখন এসব মহিলা সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে তখন স্বামীজির ঐ মহিলার প্রতি সব মোহ কেটে যাবে। তখন ঐ মহিলার পথে পথে ভিক্ষা চাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এখনই নাকি অনেক স্বামী অন্য মহিলাকে বিয়ে করতে উঠেপড়ে লেগে গেছে। স্ত্রীর সাহায্যের টাকা দিয়ে কেউ কেউ গ্রামে গিয়ে জায়গা কিনছে। এ জায়গা নিশ্চয় স্ত্রীর নামে কিনছে না। সুতরাং যেসব টাকা মানুষজন সাহায্য হিসেবে দিচ্ছে তা সঠিক খাতে ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। খতিয়ে দেখার কাজটি কে করবে তা আগে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নইলে এ সাহায্যের টাকা যতটুকু না  উপকারে আসবে, তার চেয়ে বেশি ভোগান্তি হয়ে দেখা দেবে। সবকিছু দেশের সমাজের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে করা উচিত।
বিক্ষিপ্তভাবে যেসব সাহায্য-সহযোগিতা এসেছে তা একটা জায়গায় আসা উচিত ছিল। যেসব টাকা তাদের হাতে পৌঁছে গেছে ঐ টাকা দিয়ে সকল আহত মানুষদের সুন্দরভাবে পুনর্বাসন করা যেত। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে — আমার কথাগুলো ওরকম মনে হওয়াই স্বাভাবিক।
আহতদের নিয়ে আর বেশি চিন্তা না করলেও চলবে। তারা যা পেয়েছে তা দিয়ে বেশ থাকতে পারবে, যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করে। তবে যারা একেবারে পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছে তাদের অবশ্যই অবশ্যই পুনর্বাসিত করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হল, যারা মারা গেল তাদের পরিবারের জন্য কি করণীয়? তারা তো এখন পর্যন্ত কোন সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি। তাদের একটা সুষ্ঠু তালিকা প্রণয়ন করা দরকার। এটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। যাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি মারা গেছে তাদের ব্যাপারটি বিশেষভাবে নজরে আনতে হবে। যাদের মা-বাবা উভয়েই মারা গেছে ঐ পরিবারের সন্তানদের কি করা যায় তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। সমাজের আপামর জনগোষ্ঠী যেভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে তাতে অসম্ভব কাজটিও সম্ভব হয়ে উঠতে বাধ্য। আশার কথা, সাভারের ধ্বংসলীলাকে নিয়ে নানাভাবে রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। তবে তা দেশের সাধারণ মানুষ নস্যাৎ করে দিয়েছে। কোথাও কেউ মারা গেলে রাজনীতিবিদরা তাদের নিজের দলের লোক হিসেবে দাবি করে। এখানে স্বার্থ নেই বলে সেটা হয়নি। সেটা হতে পারলে ভাল হত। সাভার ট্র্যাজেডি থেকে শেখার অনেক কিছু রয়েছে।

সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অনেক মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছে। কিছু হাসপাতাল যেভাবে সেবা দিয়ে চলেছে তারা মানবতার নজির সৃষ্টি করেছে। খুব আফসোস হয়, অনেক নামিদামি হাসপাতালের সম্পৃক্ততা আমরা দেখতে পাইনি। সেনাবাহিনীর উদ্ধার তৎপরতা ছিল লক্ষণীয়। এটা আমাদের ভালভাবে নাড়া দিয়েছে। অবাক হয়ে ভাবতে হয় অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের কথা। এ স্কুলটি বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেছে। লাশ আর অসহায় মানুষের নিত্য গতায়াত ছিল এ স্কুলের মাঠে। এ স্কুলের শিক্ষার্থীরা ঘটনার শেষ না দেখা পর্যন্ত ক্লাস করতে পারেনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ অসহায় মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সাভারের সাধারণ মানুষের উদারতার কথা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। তারা তো উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ছিলই, প্রতিদিন নিজেদের বাড়ি থেকে রান্না করে এনে সাধারণ মানুষের মাঝে খাবার বিলিও করেছে। তাদের মানবতা দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না।

অধরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হারুনুর রশীদ যে অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন তা না দেখলে বোঝা যাবে না। রাতদিন তাকে পরিশ্রম করতে হয়েছে। এখনো তার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ লেগে আছে। মানুষ হারা বেদনায় তার বুকটা ভারি হয়ে আছে, তারপরও একটা আত্মতৃপ্তি তার রয়েছে এধরনের একটা কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে। স্কুলের বারান্দায় শত শত লাশ রাখা হত, মাঠে রাখলে তাড়াতাড়ি পচন ধরার ভয়ে। লাশ আনা নেওয়া শেষ হলে হারুনুর রশীদ সাহেব পুরো বারান্দাটা কালো রঙ দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন শোকের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। এ সম্মানকে কিভাবে আমরা খাট করে দেখব?
মানবতার জয় হোক।

এই রচনার সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ‘সাভার ট্র্যাজেডি: সাধারণ মানুষ যা শিখিয়ে গেল’ শিরোনামে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় ২৫ মে ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত হয়