Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ১২

মধ্যবিত্ত বনাম প্রান্তিক দর্শক: মাঝে অনন্ত জলিল– তানিয়া সুলতানা

M A Jalil Ananta (13) (Copy)
‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে…।’ এ হাওয়া আমাদের কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সে বিষয়ে কোন জ্যেতিষীকে কোন মন্তব্য করতে দেখিনি, যদিও তারকারা তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রধান বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচ্য হয়ে আসছেন প্রতি বছরই। এর মাঝে বেশকিছু সিনেমা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ঘুরে এল। ফিল্ম ইন্সটিউটের ঘোষণা থেকে শুরু করে ফিল্ম সিটি, চলচ্চিত্র নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তাও চলছে হরদম।
চলচ্চিত্র শিল্প আশির দশকে মধ্যবিত্ত দর্শকের পাশাপাশি নি¤œমধ্যবিত্তকেও তার দর্শকে পরিণত করে জনগণের এক বিশাল অংশকে তার ভোক্তায় পরিণত করে। ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কিন্তু ৯০ দশকের শুরুতে ভিসিআর, ক্যাবল টিভি প্রভৃতির জোয়ারে হিন্দি সিনেমার আধিপত্যে আর পেরে উঠেনি এ শিল্প। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষ কারিগরের সহায়তায় নির্মিত সিনেমাগুলো আমাদের ড্রইংরুমে প্রযুক্তির কল্যাণে ঠাঁই করে নেয়। সিনেমা ইতিহাসের শুরু থেকেই এই শিল্প নন্দন আর কারিগরি দক্ষতানির্ভর এক জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। দর্শকপ্রিয়তাই চলচ্চিত্রকে বাঁচিয়ে রাখে — কেননা মাধ্যটি কেবল প্রযুক্তিঘনই নয়, প্রচ- রকম পুঁজিঘনও বটে। ফলে শিল্প তৈরির পাশাপাশি ব্যবসায়িক সফলতাও এর জন্য এক অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ফলে চলচ্চিত্রে আপনি তখনই টিকে থাকবেন, যখন আপনি যথাযথ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন, যথাযথ ভঙ্গিতে গল্প বলতে পারছেন এবং ছবির ব্যবসায়িক সাফল্য তুলে আনতে বাজার যথাযথভাবে যাচাই করে সে অনুযায়ী আপনার সিনেমাটি বানাতে পারছেন।
এর জন্য যে দক্ষতা দরকার সেই দক্ষ জনশক্তির যোগান আমাদের দেশে কোথায়? চলচ্চিত্রকে শিল্প ঘোষণা করা হলেও কার্যত তা আসলে কুটিরশিল্পের আদলেই চলছে। আশির দশক পর্যন্ত তেমন কোন বড় সমস্যা না হলেও এরপরই আমাদের চলচ্চিত্রকে প্রতিযোগিতা করতে হয় মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাশি কিংবা ভারতের পুঁজিঘন এবং প্রযুক্তিঘন ইন্ডাস্ট্রির ছবিগুলোর সাথে। এর কারণ হয়তো ভেতরে ভেতরে দর্শকরা নড়েচড়ে উঠছিলেন কিন্তু তাতে নির্মাতারা কিংবা সরকারি নীতিনির্ধারকরা সে দোলায় আন্দোলিত হননি। এতদিন দর্শকদের কাছে বাংলা সিনেমার কোন বিকল্প ছিল না। কিন্তু নতুন এবং কাক্সিক্ষত স্বাদ পেতেই দর্শকদের একটি বড় অংশ মুখ ফিরিযে নেন। তারা কিনে নিলেন ভিসিআর, ভিসিডি, টিভি, বাড়িতে লাগালের ‘ডিশের লাইন’। সিনেমার হলে গিয়ে অদক্ষ শ্রমনির্ভর ফর্মুলা ছবি দেখার চেয়ে হলিউড কিংবা বলিউডের দক্ষ, পেশাদার শিল্পী ও কলাকুশলী নিয়ে বানানো সিনেমা ঘরে বসে দেখাই শ্রেয় বোধ হল। চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং এর নীতিনির্ধারকদের এই গাফিলতির বলি হল আমাদের দেশের প্রত্যেকটি সিনেমা হল এবং তার মালিকেরা। সিনেমার ক্রেতা হারিয়ে একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হল।
টিকে থাকা সিনেমা হলগুলোতে প্রধানত তারাই যায় যাদের বিনোদনের আর কোন বিকল্প নেই। ফলে বাংলা সিনেমার মূল বাজার হয়ে উঠেছে সংক্ষিপ্ত এবং দরিদ্র। কারণ এর ক্রেতারা দরিদ্র কিংবা নানা অর্থে প্রান্তিক। এই বাজার তাই বাংলা সিনেমার নির্মাণে কিংবা কোন বড় পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারকারী ইস্যু হিসেবে কাজ করে না। এ কারণেই বারবার মধ্যবিত্ত দর্শককে ফিরিয়ে আনবার কথা বলা হয়। খুব স্পষ্ট ভাষাতেই বলা হয় মধ্যবিত্তের প্রিয় হবার মধ্য দিয়েই বাংলা সিনেমার মুক্তি। এখন কথা হল এই দাবিটি কতটা ন্যায্য? আর এভাবে আদৌ ‘মুক্তিলাভ’ সম্ভব কিনা?
দাবিটি আসলে ততক্ষণই ন্যায় থাকছে যতক্ষণ সিনেমাকে পণ্য আকারে ভাবা হচ্ছে। কিন্তু যখনই একে বিনোদন আকারে দেখছি, দেখছি সব মানুষের অধিকার হিসেবে, তখন আর যুক্তি থাকে না মধ্যবিত্তের পক্ষে। রস আস্বাদনের মনন এবং মগজ আছে বলে নয় — মধ্যবিত্ত সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখে না দেখে না বলে যে আমরা নাকের পানি আর চোখের পানি একাকার করছি তার কারণ সে গাঁটের পয়সা খরচ করার সামর্থ্য রাখে। আর কিছুই নয়। আফসোসের বিষয় তার সে শখ নাই, আছে ‘রিক্সাঅলার’।
মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী বাংলা ছবি নিয়ে আসলে কি মনোভাব পোষণ করে তা সম্প্রতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নায়ক অনন্ত জলিলকে নিয়ে ব্যাপক মাত্রার হাসি তামাশার মধ্য দিয়ে। আমরা এখন যে পরিমাণে মধ্যবিত্ত দর্শককে হলমুখী করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি, ছবির আধেয় এবং উপস্থাপনায় নানান সিনেমাটিক কারিশমা আরোপ করে, তা আরো দশগুণ বাড়ালেও মধ্যবিত্ত হলমুখী হবেন কিনা তা হলফ করে বলা যাবে না। যতদিনে এটুকু অর্জন করব, বলিউড, হলিউড, টালিউড ততদিনে আরো এগিয়ে যাবে।
অনন্ত জলিলের সিনেমাকে এখানে তুলনা হিসেবে নেওয়া যায়। সবগুলো সিনেমাই আশাতীত রকমের হিট হবার পরও এগুলো খুব বেশি আশার জন্ম দেয় না। স্টার সিনেপ্লেক্সে দা স্পিড দেখার অভিজ্ঞতা আমার এক কথায় ভয়াবহ ছিল। সিনেমা উপভোগ এখানে মুখ্য নয়, দর্শক গিয়েছিল তামিল নায়কদের নকল করতে গিয়ে অনন্ত জলিলের বিভিন্ন ‘ত্রুটিবিচ্যুতি’ নিয়ে মজা উপভোগ করতে। এটাই ‘স্বাভাবিক’! ‘রিক্সাঅলার’ জন্য সিনেমা না বানানোর এমন পুরস্কার তাকে হজম করতেই হবে। যে দর্শক ঘরে বসে বসেই পৃথিবীর যে কোন দেশের বড় বাজেট, দক্ষ এবং পেশাদার কলাকুশলীর চলচ্চিত্র উপভোগ করছেন, তার কাছে এক ধরনের ‘স্ট্যান্ডার্ড’ ফিট হয়ে যাচ্ছে। তাই অন্ধ অনুকরণ খুব সহজেই তিনি ধরে ফেলে চালাকির হাসি হাসবেন। এবং আপনি শিল্পী না হয়ে পরিণত হবেন সঙয়ে।
উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে বসার ঘরে, শোবার ঘরে, পত্রিকায়, ম্যাগাজিনে, মুঠোফোনে সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে হলিউড-বলিউডের ছবি। আপনি কিভাবে আশা করেন, বিএফডিসির স্টুডিওতে শুটিং করে, অদক্ষ অপেশাদার শিল্পী নিয়ে এসব দর্শকের চাহিদা মেটানো সম্ভব?
অথচ এখনো যারা হলে যাচ্ছেন — যাদের ঘরে টিভি নেই, যাদের বিনোদন বলতে শুধুমাত্র সিনেমা হল — তাদের নিয়ে কারও কোন মাথাব্যথা নেই। কারণ তারা খেটে খাওয়া লোক, না হয় রিক্সাঅলা! আমরা এক সময় বলেছি তারা আসলে যৌনতা খোঁজে, সহিংসতা খোঁজে। এ কথা বলে আমরা সাড়াশি অভিযান চালিয়েছি। এখন সিনেমায় যৌনতা এবং সহিংসতার বাড় বাড়ন্ত কম। তবু তারা সিনেমা হলে যাচ্ছেন। কেন? উত্তর একটাই: এছাড়া আর তাদের কোন রাস্তা নাই। বাংলা সিনেমা যখন ধুঁকে ধুঁকে মরছে তখনো তারাই গাঁটের পয়সা খরচ করছে। কিন্তু আমরা জানতেও চাই না, এসব প্রান্তিক দর্শক কি দেখতে চায় রুপালি পর্দায়। অথচ মধ্যবিত্ত দর্শক কেন যাচ্ছে না তাই নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার অবধি নেই; তাদেরকে ফেরাতে আমাদের খরচাপাতির শেষ নেই। ইমপ্রেস টেলিফিল্মস মধ্যবিত্ত দর্শককে বিনোদন দিতে একের পর এক সিনেমা প্রযোজনা করেছে এবং ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অনন্ত জলিলের ব্যবসায়িক সফলতার পেছনে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ প্রান্তিক দর্শকরাই রয়েছেন।
অথচ তাদের কথা আমরা চিন্তাও করি না। মধ্যবিত্ত দর্শক পাচ্ছে সব ধরনের বিনোদন। সিনেমা হলমুখী এই প্রান্তিক দর্শক ক্ষুধার্তের মতন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে কখন কোন সিনেমা আসছে। কখন তারা একটি ভাল ছবি দেখবেন, তাদের ঘামে ভেজা পয়সা উসুল হবে। এসব সিনেমা হলে পার্শ্ববর্তী দেশের সিনেমার প্রবেশাধিকার এতদিন ছিল না। ফলে সেখানে মধ্যবিত্ত দর্শক ভুলেও পা মারাতেন না। এইসব ভদ্রলোকরা যেতেন না বলেই সিনেমা হলের পরিবেশ বিগড়ে গেলেও কারও কোন মাথাব্যথা ছিল না। মধ্যবিত্ত দর্শকের দেশীয় চলচ্চিত্রে মন নেই বলে, ভারত থেকে সিনেমাও আমদানি করা হল। কিন্তু কিছুতেই লাভ হচ্ছে না। যে মধ্যবিত্ত দর্শক সিনেমা হলকে পাশ কাটিয়ে চলেন আর যাদের কাছে রুপালি পর্দার মানুষগুলো একরকম অচ্ছুৎ মানুষ হিসেবেই গণ্য হন, তাদের প্রশংসা পেতে আমাদের কতরকম ব্যস্ততা। এতসব আয়োজনে কারণ, মধ্যবিত্ত বেশি পয়সা দিয়ে ছবির টিকেট কিনতে পারেন। টিকেট কিনেই ক্ষান্ত হন না, সাথে তার পপকর্ন আর ড্রিংকসও লাগে।
রিক্সাঅলার ছবির পেছনে অত বাজেট নেই, ছবি দেখার শখ থাকলেও এবং খরচের আকাক্সক্ষা থাকলেও আমরা তার জন্য সিনেমা বানাতে চাই না। তার বিনোদনের কথা ভাবি না বলেই, মধ্যবিত্তের হাতের মুঠোয় হলিউড বলিউড নাচানাচি করে, আর তাদের কপালে লেখা থাকে — যা কেউ দেখে না সেই — ফর্মুলা ছবি। প্রচলিত ব্যবস্থায় এই প্রান্তিক দর্শকদের কথা বলার কোন সুযোগ নেই। এবং তাদেরকে শেষ এবং একমাত্র লক্ষ্য হিসেব করে পরিচালক প্রযোজকরা অব্যর্থ সব মারণাস্ত্র ব্যবহার করে স্থূলভাবে। পাছে তারা সূক্ষ্মভাব বুঝতে ব্যর্থ হন! জগজ্জোড়া কি মধ্যবিত্ত কি নি¤œবিত্ত, কি হলিউড কি বলিউড একই জিনিশ দেখে এবং দেখায় — যৌনতা আর সহিংসতা। ফলে প্রান্তিক দর্শকদেরও একই ওষুধে ঘায়েল করার চেষ্টা করা হয়। এবং আমরা দেখেছি বাংলা সিনেমা যত মধ্যবিত্ত দর্শক হারিয়েছে, তত ঝুঁকেছে এই প্রান্তিক দর্শকদের প্রতি এবং ততই বেড়েছে যৌনতা এবং সহিংসতার ব্যবহার। ফলে বাংলা ছবির যে বেহাল দশা তাতে সন্দেহ নেই প্রান্তিক দর্শকরাই ‘দায়ী’! ভাবটা এমন যেন নীলছবির মূল দর্শকই বাংলাদেশের এই প্রান্তিক দর্শক। মধ্যবিত্তের বিলাসি কামড়ায় এর যে কতবড় আশ্রয় সেটি যেন ভাবনাতে আনাই বড় পাপ।
এখন ছবির মান ভাল করতে আবারও যে মধ্যবিত্তের পেছনে আমাদের ছুটে চলা তাতে দোষ নেই। কিন্তু আমাদের এই চলার গতি এবং চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবনার যে নীতি তার কোথাও যে এই প্রান্তিক দর্শকের ঠাঁই নেই তাতেই অবাক হই। মধ্যবিত্তকে আপনি দর্শক হিসেবে যাদ পান তাহলে আপনি ভাগ্যবান। আর প্রান্তিক দর্শককে নিয়ে যদি আপনি না ভাবেন তবে তা একই সাথে হবে মস্ত ভুল এবং মহাপাপ।

একজন সহজ মানুষের প্রতিকৃতি– মকবুল আহমেদ

রম্যরচনার ধারা বাংলাদেশের সাহিত্যের মধ্যে অপ্রধান বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। রাজনৈতিক ধারার লেখকদের মধ্যে আরো কম পাওয়া যাইবে রম্য প্রভাব। রাজনৈতিক বিষয়ে লেখার মধ্যে হাস্যরসের সরস ব্যঞ্জনা সৃষ্টির অনন্যসাধারণ লেখক ছিলেন আসহাব উদ্দীন আহমদ। তাঁহার মৃত্যুদিবস ছিল গত ২৮ মে তারিখে। ১৯৯৪ সালের এই দিনে এই মহান লেখকের মহাপ্রয়াণ ঘটে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। তাঁহার মৃত্যুদিবস স্মরণে বাংলা ভাষার পাঠকদের সামনে তাঁহার সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য তুলিয়া ধরা হইল

আসহাব উদ্দীন আহমদ

আসহাব উদ্দীন আহমদ

আসহাব উদ্দীন আহমদ জন্মেছিলেন ১৯১৪ সালে চট্রগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর গ্রামে। তাঁর মায়ের নাম নাছিমা খাতুন, বাবার নাম মুনশী সফর আলী চৌধুরী। আসহাব উদ্দীন ছিলেন একাধারে সফল শিক্ষক, সরস লেখক ও নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদ। বর্তমানে তাঁর রচনাবলির দুস্প্রাপ্যতার কারণে নতুন প্রজন্মের পাঠক তাঁকে চিনতে পারছেন না এবং পুরনো পাঠকেরা ভুলে যাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের জন্যই এখানে তাঁর কর্মজীবনের ও রচনাবলির সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হবে।
আসহাব উদ্দীন আহমদ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন তাঁর নিজ গ্রামের বাণীগ্রাম-সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৩২ সালে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন চট্রগ্রাম কলেজে ১৯৩৪ সালে। কোলকাতা বিশ্ব্যবিদ্যালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে বিএ পাসের পর ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে এমএ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৯ সালে।
শিক্ষাজীবন শেষ করেই আসহাব উদ্দীন আহমদ শিক্ষকতায় যোগ দেন। তিনি চট্রগ্রাম কলেজ, মহসীন কলেজ (তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজ), লাকসাম নবাব ফয়েজুন্নেসা কলেজ, ফেনী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।
আসহাব উদ্দীন আহমদ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপনাকালেই পূর্ব পাকিস্তানে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন গড়ে ওঠে। ততদিনে বাংলা ভাষার উপর চরম আঘাত হানার অপচেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। পাকিস্তানের শাসকশ্রেণির ধর্মভিত্তিক রাজনীতি তখন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনসাধারণের উপর নির্যাতনের রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সংখ্যালঘু জনগণের উপর নির্যাতন ও সর্বোপরি বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য কয়েকজন সহকর্মী অধ্যাপক ও কয়েকজন হিন্দু-মুসলমান ছাত্রের উদ্যোগে আসহাব উদ্দীন কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত করেন ‘প্রগতি মজলিশ’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। কুমিল্লা বীর চন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি ও টাউন হলের উল্টা দিকে একটি কাপড়ের দোকানের দোতলায় ছিল এর অফিস।
মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কোন প্রগতিবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা তখন সহজ কাজ ছিল না। পাকিস্তানি শাসকদের প্রতিক্রিয়শীল ও নিপীড়নমূলক কর্মকা-ের বিরুদ্ধে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আসহাব উদ্দীন ও তাঁর বন্ধু অধ্যাপকরা কঠিন কাজটি করলেন। কাজেই, সাথে সাথে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রশাসনের কোপদৃষ্টি পড়ল ‘প্রগতি মজলিশ’ সংগঠন এবং অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন ও তাঁর বন্ধুদের উপর। গোয়েন্দা বাহিনীর সবকটি শাখার টিকটিকিরা লেগে গেল উল্লেখিত অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে। তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে টিকে থাকাই আসহাব উদ্দীন ও তাঁর বন্ধু অধ্যাপকদের জন্য দুস্কর হয়ে উঠল।
আসহাব উদ্দীন আহমদের যখন অধ্যাপনা করতেন তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন বিখ্যাত সমব্যয়ী দার্শনিক ড. আখতার হামিদ খান। অবাঙ্গালি ড. খান পাকিস্তান রাষ্ট্রের কোপানল থেকে অধ্যাপক আসহাব উদ্দীনসহ অন্যদের রক্ষা করে আগলিয়ে রাখেন। সেদিন আখতার হামিদ খান না থাকলে উক্ত অধ্যাপকদের তো বিপদ হতই তাছাড়াও ‘প্রগতি মজলিশর’ও মৃত্যু ঘটত নিঃসন্দেহে।
আসহাব উদ্দীন আহমদ ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৫৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপনা করেন। এ সময় পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব-পশ্চিমের বিভেদ নীতি ও বাংলা ভাষার উপর আঘাতের ফলে তাঁর চিন্তা ও তৎপরতা রাজনীতিকে ঘিরে আবর্তিত হতে থাকে। তারই ফলশ্রুতি ‘প্রগতি মজলিশ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা। এ কাজে তাঁর প্রধান সহযোদ্ধা ছিলেন অধ্যাপক আবুল খায়ের। একই কলেজের অধ্যাপক আবুল খায়ের ছিলেন আগে থেকেই মার্কসবাদে দীক্ষিত এবং সমাজতন্ত্রী। আসহাব উদ্দীনের জীবনে ও চিন্তায় তাঁর প্রভাব সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে। কুমিল্লায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে সাহসী হয়নি। তাই এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক আবুল খায়েরের সাথে অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন। ১৯৫৩ সালে ‘প্রগতি মজলিশ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগেই কুমিল্লা টাউন হলে সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হয় নিখিল পূর্ববঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলন। যাতে পূর্ববঙ্গের সকল নামজাদা শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংবাদিক উপস্থিত হয়েছিলেন। পাকিস্তানবিরোধী আদ্দোলনে এ সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিল। এ সাহিত্য সম্মেলনের মুখ্য নেতৃত্বে ছিলেন আসহাব উদ্দীন আহমদ।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন আসহাব উদ্দীনের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা। এই আন্দোলন তাঁকে ক্লাসরুমের নিরুদ্বিগ্ন শান্ত নিরাপদ জীবন থেকে একেবারে আন্দোলনের ময়দানে, রাজপথে নিয়ে আসে।
কলেজের শিক্ষকতা থেকে সেই ভাষা আন্দেলনের পথে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে রাজনীতির ময়দানে নেমে এলেন। এসে ঠাঁই করে নিলেন জনজীবনের মাঝে, দীক্ষা নিলেন মার্কসবাদে, নিজেকে সমর্পণ করলেন কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির সংগ্রামে, অঙ্গীকার করলেন সমাজতন্ত্রের। কলেজের শ্রেণিকক্ষের দিকে তিনি আর ফিরে তাকাননি। কাদা-মাটি মাখা কৃষক-শ্রমিককে তিনি ভাই বলে আলিঙ্গন করলেন। আমৃত্যু তিনি সেই পথে ছিলেন।
আসহাব উদ্দীন আহমদ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিপ্লবী রাজনীতির অনুসারী হওয়ার জন্য পাকস্তান আমলে তিনি এক বছর জেল খাটেন এবং রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তিনি ১৫ বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে হুলিয়া মাথায় নিয়ে জীবন কাটান। পাকিস্তান সরকার তাঁকে ধরে দেওয়ার জন্য পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। এ সময় তিনি গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের বাড়িতে, তাদের আশ্রয়ে আত্মগোপন করে কাটান। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ চাষী মুক্তি সমিতি, বাংলাদেশ লেখক শিবির, চট্টগ্রাম যাত্রী কল্যাণ সমিতি প্রভৃতি সংগঠনের সাথে কাজ করেন ও নেতৃত্ব দেন।
রাজনীতির পাশপাশি মানুষকে সচেতন করার হাতিয়ার হিসেবে লেখালেখিকে বেছে নেন আসহাব উদ্দীন আহমদ। শোষণমুক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে জীবনকালেই তিনি ২৭টি বই লিখে যান। তিনি তাঁর লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে ‘আমার সাহিত্য জীবন’ বইতে বলেন, ‘আমার লেখায় হাসি-ঠাট্টার ভেতর দিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও অবিচারকে তুলে ধরা হয়েছে এবং জনগণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে প্রচার করা হয়েছে, জনপ্রিয় করা হয়েছে, প্রোপাগান্ডার আকারে নয়, সাহিত্য রূপে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি আমার ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ কায়েমের জন্য প্রেরণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই লিখেছি। শোষণ জুলুমের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মনোভাব সৃষ্টিই আমার লেখার উদ্দেশ্য।’
আসহাব উদ্দীন আহমদের গ্রন্থাবলির নাম এখানে তুলে ধরছি: ১. বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর ২. ধার, ৩. উদ্ধার, ৪. সের এক আনা মাত্র, ৫. জান ও মান, ৬. বন্দে ভোটরম্ (ইংরেজি ভাষায়) ৭. পথ চলিতে, ৮. আওয়ামী লীগের মীর জাফরী ঐতিহ্য, ৯. হাতের পাঁচ আঙ্গুল, ১০. লেখক ও পাচক, ১১. দাড়ি সমাচার, ১২. বিপ্লব বনাম অতি বিপ্লব, ১৩. ভাতের বাংলা কাপড়ের বাংলা, ১৪. বাঁশ সমাচার, ১৫. দ্বিপদ বনাম চতুষ্পদ, ১৬. আমার সাহিত্য জীবন, ১৭. শিকল ভাঙার গান (প্রথম সংস্করণের নাম ‘ইন্দিরা গান্ধীর বিচার চাই’), ১৮. চিঠিপত্র, ১৯. ঘুষ, ২০. ফেলে আসা দিনগুলি, ২১. উজান স্রোতে জীবনের ভেলা, ২২. দাম শাসন দেশ শাসন, ২৩. ভূমিহীন কৃষক, কড়িহীন লেখক, ২৪. সেরা রম্য রচনা, ২৫. সংবর্ধনার উত্তরে ভাষণ ‘উজান স্রোতের যাত্রী’, ২৬. শিশু তোতা পাখি নয়, ২৭. লাথি লাঠি গণতন্ত্র, ২৮. নতুন বোতলে পুরানো মদ, ২৯. আসহাব উদ্দীন রচনা সংগ্রহ, চার খ-।
আসহাব উদ্দীন আহমদের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল অংশ তাঁর লেখালেখির জীবন। তাঁর লেখক জীবনে আর্থিক অনটনের অবস্থায় পড়ে নিজেকে নিয়েও তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ করেছেন ভূমিহীন কৃষকের সাথে কড়িহীন লেখকের তুলনা দিয়ে। নিজের অর্থনৈতিক দৈন্যদশাকে নিয়ে তিনি সরস রসিকতা করতে জানতেন। আসহাব উদ্দীন বাংলা ভাষার একজন ভিন্ন ও বিরল ধারার লেখক। সমাজের বৈরী সম্পর্ক, নিপীড়িত মানুষের বেদনাক্লিষ্ট জীবন কাহিনী, শাসকশ্রেণির অন্তঃসারশূন্য লক্ষ্য ও স্বেচ্ছাচারী ভূমিকা এমন ব্যঙ্গবিদ্রƒপে, এমন জনবোধ্য ভাষায় চিত্রিত করেছেন খুব কম লেখকই। আসহাব উদ্দীনের প্রতিটি গ্রন্থের নামকরণে ও বিষয়বস্তুতে সমাজের নানা অসঙ্গতি ফুটে উঠেছে।
বাংলা ভাষায় প্রতিবাদী রাজনৈতিক চেতনাসমৃদ্ধ ও জনবোধ্য ভাষায় সমাজসচেতন ব্যঙ্গ রচনার ধারায় আসহাব উদ্দীন আহমদ একজন সফল ও প্রধান লেখক। এই সফলতা ও কৃতিত্ব তিনি তাঁর জীবনকালেই পেয়েছেন। সাহিত্য রচনার পেছনেও আসহাবউদ্দীনকে অনুপ্রাণিত করেছে মানুষের প্রতি ভালবাসা ও প্রতিবাদী চেতনাবোধ। আমাদের দেশের মানুষের আয়ুর গড়পড়তা হিসেবে তিনি দীর্ঘজীবন পেয়েছিলেন। তাঁর জীবন আশি বছর অতিক্রম করেছিল। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং মানুষের প্রয়োজনীয় কাজটি সম্পাদন করে দিতে তাঁর দায়িত্ববোধের কথা তিনি কখনো বিস্মৃত হননি। সেই কর্তব্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি নিবেদিত থেকেছেন তিনি সারা জীবন। মানুষের কল্যাণের জন্য নিরলস খেটেছেন সাধারণ কর্মীর মত। জীবনের প্রতি ও সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর এই অঙ্গীকার তাঁর সকল লেখায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
রিক্ত, নিঃস্ব ও সর্বহারা মানুষের মুক্তির উপায় হিসেবে শিক্ষাকে হাতিয়ার হিসেবে দেখতেন আসহাব উদ্দীন। তাঁর কর্মজীবনের সময়কালকে নানা পর্বে ভাগ করলে যেমন শিক্ষকতা, রাজনীতি, লেখালেখি প্রভৃতি পর্বের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার একটা কালপর্বকেও তাঁর জীবনে যোগ করতে হয়। সারা জীবন তিনি নানা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য শ্রম দিয়েছেন, কষ্ট স্বীকার করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে ও শ্রমে যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম: ১. বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজ, ২. চট্রগ্রাম সিটি কলেজ, ৩. সাতকানিয়া কলেজ, ৪. সাধনপুর পল্লী উন্নয়ন উচ্চ বিদ্যালয়, ৫. পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় এবং ৬. রতœপুর উচ্চ বিদ্যালয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে স্ব স্ব মহিমায় গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে চলেছে।
আসহাব উদ্দীন আহমদ একজন অনন্যসাধারণ লোক হয়েও সব সময় সহজ সাধারণ রূপে বিরাজ করতেন। তিনি কৃষক সমাজকে উচ্চ মূল্য দিতেন। কৃষক সমাজের মুক্তি সংগ্রামে যুক্ত হয়ে তিনি নিজেকে কৃষক সমাজের বাইরের লোক বলে ভাবতেন না। তিনি এমন বেশভূষা ধারণ করতেন না পাছে কৃষকেরা তাঁকে পর ভাবেন। তিনি জীবনের দ্বিতীয়াংশে (রাজনৈতিক ও লেখক জীবনে) শার্ট-কোর্তার সাথে প্যান্টের বদলে স্বচ্ছন্দে লুঙ্গি পরতে পছন্দ করতেন। গ্রামে কি শহরে বড় বড় সভা-সমিতিতেও তিনি লুঙ্গি পরে চলে যেতেন।
আসহাব উদ্দীন ভালবাসতেন চির দুঃখী কৃষককে এবং কৃষক মুক্তির সংগ্রামকে। আর ভালবাসতেন শ্যামল প্রকৃতি, বৃক্ষ ও ফুল। এমনই এক অনুভূতি জানিয়ে তাঁর নিজের গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজের শিক্ষক হিসেবে আমার প্রতি এক চিঠি লিখেন ১৯৯৩ সালে। সেই চিঠির অংশবিশেষ এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তিনি আমাদের প্রতি লিখেন,

আপনারা আমার সালাম ও শুভেচ্ছা জানবেন। বাঁশখালী কলেজের চারদিকে এবং সরকারী রাস্তা থেকে যে পথটি কলেজের মাঠের দিকে উঠেছে তার দুধারে কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগালে কলেজের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়বে। মনে হবে, কলেজের গলায় একটি খুব বড় মালা শোভা পাচ্ছে। এ ব্যাপারে ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতা নিয়ে কাজটি সুসম্পন্ন করলে আমি অপরিসীম সুখী হব, আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে আমার বক্তব্য হলে: প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, বইকে ভালোবাসুন। বই হলো মনের খোরাক। যে সব শিক্ষিত লোক বইপত্র পড়েন না তারা নিজেদের মনকে উপবাসী রাখার অপরাধে অপরাধী। তাদের প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত লোক বলা যায় না…।’ (চিঠিপত্র)

পরের বছর ২৮ মে তারিখে আমাদের কাছ থেকে চিরবিদায় নেন অধ্যাপক আসহাব উদ্দীন আহমদ। বাঁশখালী ডিগ্রী কলেজ প্রাঙ্গণে লাল হয়ে ফুটে থাকা তাঁর প্রিয় এক কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে তিনি শায়িত আছেন। তাঁকে লাল সালাম।

শুদ্ধভাবে গাইতে কোন অন্তরায় আর নেই : সুধীন দাশ

বাংলাদেশের সঙ্গীতের জগতে জীবন্ত কিংবদন্তী—একাধারে সঙ্গীত শিল্পী, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, শিক্ষক এবং এসব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি নজরুল সঙ্গীতের স্বরলিপিকার হিসেবেই অধিক পরিচিত। সঙ্গীতের এই দিকপাল শিল্পী কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো বাংলা সঙ্গীতের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর জাদুস্পর্শে নজরুল সঙ্গীতকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন, পাশাপাশি নিজেকে নিবেশিত করেছেন শুদ্ধ স্বরলিপি তৈরিতে। নজরুলের তত্ত্বাবধানে বা তিনি সুস্থ থাকাকালীন রেকর্ডকৃত ‘গ্রামোফোন রেকর্ড’ শুনে শুনে তিনি নজরুলের সঙ্গীতের কথা ও সুর সংকলন করেছেন। নজরুল একাডেমি থেকে ৫টি ও নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে ১৬টি মোট ২১ টি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে এই কিংবদন্তীতুল্য সঙ্গীতজ্ঞের নজরুল গীতির স্বরলিপি। বাংলাদেশে তিনিই প্রথম লালনগীতিরও স্বরলিপি লিখেছেন। তিনি সুধীন দাশ, আজ অশীতিপর। কাজী নজরুল ইসলামের ১১২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সাময়িকী বিশুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত চর্চার পথিকৃত্ সুধীন দাশের সঙ্গে কথা বলতে তাঁর বাসভবনে গিয়েছিল। দীর্ঘ কথোপকথনে তাঁর সংগ্রামমুখর অনবদ্য সঙ্গীতজীবনের নানা কথা আসে। একের পর এক স্মৃতির খেরোখাতার পাতা উল্টাতে থাকেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শেখ মেহেদী হাসান ও মাইনুল ইসলাম

সুধীন দাশ

সুধীন দাশ

আপনার গানের শুরুটা কীভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তখন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ১৯৪৭ সালে পার্টিশনের সময় অনেক গুণী শিল্পী, বিশেষ করে হিন্দু শিল্পী, ভারত চলে যায়। এতে ভালো শিল্পীর সঙ্কট দেখা দেয়। ১৯৪৮ সালের ৮ মার্চ রেডিওতে আমার প্রথম ব্রডকাস্ট হয়। তখন রেডিওর নিজস্ব তালিকাভুক্ত গীতিকারদের গান গাইতে হতো। আমি যার গান গেয়েছিলাম, তার নাম ছিল সত্যজিত্ মজুমদার। প্রথম ব্রডকাস্টে আমি দুটি আধুনিক গান গেয়েছিলাম। একটির কথা আজো মনে আছে, যার প্রথম লাইনটি ছিল—‘অলকার পথে বলাকার মতো হবো গো মেঘের সাথী’। প্রথম গানেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম এবং ভালো শিল্পীর তালিকায় এসে যাই। মাসে চারটি অর্থাত্ প্রায় প্রতি সপ্তাহেই আমার প্রোগ্রাম থাকত। সকাল থেকে রাতে শেষ সম্প্রচার পর্যন্ত একজন শিল্পীর ৩-৪ বার গাইতে হতো। পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীতও করতাম। রেডিওর অডিশনে রবীন্দ্র, নজরুল সবই গেয়েছিলাম। সেসময় রেডিওতে প্রধানত আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত, পল্লীগীতি, মুর্শিদী ও মারফতি গান পরিবেশিত হতো। আমি যখন রেডিওতে গাওয়া শুরু করি তখন নজরুল সঙ্গীত বা গীতি বলতে কিছু ছিল না। শিল্পীর গাওয়া নজরুলের গান শেষ হলে ঘোষক বলতো, এতক্ষণ আপনারা শুনলেন আধুনিক বাংলা গান, গানটি রচনা করেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। রেডিওতে রাগপ্রধান গান—বোধহয় আমিই প্রথম শুরু করেছিলাম। আধুনিক গানের রাগভিত্তিক উপস্থাপনাকেই রাগপ্রধান গান বলা হতো।” সেসময় লালনের গান করতেন? সুধীন দাশ জানান, ‘তখন লালনের গানের এতো কদর ছিল না। আরো একটি কথা, তখন রেকর্ডিংয়ের কোন ব্যবস্থা ছিল না। ওই সময় রেকর্ডিং কি বস্তু আমরা জানতামই না। কিছু গান ওয়াক্স ডিস্ক থেকে সরাসরি সম্প্রচার হতো। সেসময় রেকর্ড তৈরি করত একমাত্র গ্রামোফোন কোম্পানি। সেটিও ছিল কোলকাতায়। রেডিওতে তখন শিল্পীদের সরাসরি গাইতে হতো। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত একজন শিল্পীর বিভিন্ন পর্যায়ে ৫/১০/১৫ মিনিট করে ৩-৪ বারে গাইতে হতো।’ ওই সময়ের রেডিও শিল্পী কয়েকজনের নাম জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘লুত্ফর রহমান, বেদারউদ্দীন আহমেদ, সোহরাব হোসেন, আব্দুল লতিফ আর লায়লা আরজুমান্দ বানু, আফসারী খানম, রোকেয়া ইসলাম, মাহবুবা রহমান, মালিকা পারভীন বানু, জাহানারা হাসানসহ আরো অনেকে।’ নীলুফার ইয়াসমীন তখন ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘নীলুফার ইয়াসমীন আরো অনেক পরে এসেছে। আমাদের মাঝামাঝি সময়ে যে নাম করল—নীলিমাদের সঙ্গে, তার নাম ফরিদা ইয়াসমীন। নীলুফারদের সবচাইতে বড় বোন। বড় অদ্ভুত গলা ছিল ওর। কিন্তু ও একটু খেয়ালি ছিল—গান নিয়মিত করলো না, ওদের সবগুলো বোনেরই সাংঘাতিক গলা ছিল। ফৌজিয়াও সংসারী হয়ে গেলো। নীলা এসেছে অনেক পরে।’ কথার মাঝখানে আমরা কণ্ঠশিল্পী আব্বাস উদ্দীনের কথা জানতে চাইলাম, তিনি জানান, ‘আব্বাস উদ্দীন তখন সঙ্গীতের দিকপাল। বেতারে মাঝে মাঝে আসতেন। নাজিমুদ্দিন রোডের রেডিও অফিসের (এখন শেখ বোরহানউদ্দীন কলেজ) ঠিক উল্টো দিকে তখন ছোট্ট একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। আমরা বলতাম আমানের রেস্টুরেন্ট। এই রেস্টুরেন্টে শিল্পীদের আড্ডা ছিল। সেখানে মোটামুটি সব শিল্পীই আসতেন, আব্বাস উদ্দীনও মাঝে মাঝে আসতেন। যেহেতু রেডিওতে কয়েকটা পর্বে আমাদের গাইতে হতো। সকালে ছিল ফার্স্ট ট্রান্সমিশন, দুপুরে একটা, বিকেলে একটা, রাতে নিউজের আগে-পরে একটা, এভাবে প্রতি ট্রান্সমিশনে একজন শিল্পীর একটি করে আইটেম থাকতো। একটা অনুষ্ঠান থেকে আরেকটা অনুষ্ঠানের ফাঁকে আমানের চায়ের দোকান ছাড়া আড্ডা মারার আর কোন জায়গা ছিল না আমাদের। এ কারণে এই সাধারণ রেস্টুরেন্ট খুব বিখ্যাত হয়ে ওঠেছিল। কিংবদন্তী শিল্পী আব্বাস উদ্দীন, জয়নুল আবেদিন, জসীমউদ্দীনসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিকে এখানে আসতে দেখেছি। ‘আব্দুল আলীমও আসতেন?’ জিজ্ঞাস করতে তিনি বললেন, ‘আব্দুল আলীম সাহেব আরো পরে এসেছেন। মীর কাসিম খান (সেতার বাজাতেন), আবদুল আহাদ, ফতেহ লোহানীসহ তত্কালীন যত বিখ্যাত শিল্পী প্রায় সবাই অল্প-বিস্তর আসতেন এখানে।’ রণেন কুশারীর কথা জিজ্ঞাস করতেই তিনি বললেন, নাট্যকার সায়ীদ আহমেদ নামে তিনি বেশি পরিচিত। তিনি রেডিওর লোক ছিলেন। আমরা যখন রেডিওতে যাই তখন স্পিকার শামসুল হুদা (প্রয়াত) চৌধুরী রেডিওর প্রোগ্রাম প্রডিউসার ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি রেডিওর রিজওনাল ডিরেক্টর হয়েছিলেন। সেই সময় রেডিও নাজিমুদ্দীন রোড থেকে শাহবাগে আসে। এই সবকিছুই আমি নিজের চোখে দেখেছি।’ ‘সে সময় আপনাদের সম্মানী কেমন দিতো’—জিজ্ঞাস করতেই সুধীন দাশ বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘আজকালের সাথে তুলনা করলে সাংঘাতিক রকমের সম্মানী পেতাম। সেই সময়তো এটা পেশা ছিল না, ছিল নেশা। রেডিওর প্রোগ্রাম যখন আসত তখন রীতিমতো এই ভেবে আনন্দ অনুভব করতাম যে, রেডিওতে গান গাইতে যাব।’ ‘আপনি কার কাছে গান শিখেছেন’—ইত্তেফাক সাময়িকীকে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনে একজনের কাছেই গান শিখেছি। তিনি ওস্তাদ সুরেন দাশ। আমার বড় ভাই। ওনার সংগীতাচার্য উপাধি ছিল। আমার এই ভাই কোলকাতার খুব বড় গুণীশিল্পী গিরিজা শঙ্কর চক্রবর্তীর ছাত্র ছিলেন। কালীপদ চক্রবর্তী নামে তাঁর এক ছাত্রের কাছে আমি সারেগামা শিখেছি। তাছাড়া ১৯৪৮-৪৯ সালে কুমিল্লা টাউন হলে আমি নিয়মিত সংগীতানুষ্ঠান করতাম। আমার দাদার ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতি মাসে কি শিখল সেটা মূল্যায়ন করার জন্য, তাদের উত্সাহিত করার জন্য আমি নিজে উদ্যোগ নিয়ে একটি মাসিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। নাম ছিল ‘সংগীত শিক্ষার্থী সম্মেলন’। এই সংগীতানুষ্ঠান আমার একার কোন অনুষ্ঠান ছিল না। আমার দাদার যারা ছাত্র-ছাত্রী ছিল অনেক কিছু তারা সহজে বুঝতে পারতো না। এতো বড়ো একজন গুণীর সামনে থাকলে কিছুটা নার্ভাসনেস আসতে পারে। কিন্তু এদের সাথে আমার যোগাযোগটা ছিল সহজ। অনুষ্ঠানে তাদের কাছে-ধারেই হাঁটতাম, ঘুরতাম। এরা আমার কাছে আসতো—যেটা বুঝে না সেটা ঠিক করতে। প্রতিমাসে টাউন হলে সংগীত শিক্ষার্থী সম্মেলন হতো।’
স্ত্রী নীলিমা দাশ সম্পর্কে জানতে চাইলে বেশ রসিয়ে অবলীলায় তিনি বলে চললেন— ‘১৯৫৫ সালে বিয়ে করি। কুমিল্লার মেয়ে- নীলিমা কর—এখন নীলিমা দাশ। সেও সুরেন দাশের কাছে গানের তালিম নিতো। একটা সময় গেছে যখন নীলিমাকেই মানুষ চিনত। সে তখন রেডিওর শিল্পী, রেডিওতে দাপটের সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে নীলিমা একজন। এখন আর নীলিমা দাশকে আগের মতো সবাই চিনে না। মিডিয়া বলতে তখন ঢাকা বেতার কেন্দ্র। তারপর যখন টেলিভিশন এলো সেখানেও আমাকে ডাকেনি, ডেকেছিল নীলিমাকে।’ —‘আপনার সঙ্গে কী কাজী নজরুল ইসলামের দেখা হয়েছিল, নজরুলের সঙ্গীতের ভুবনে আপনি এলেন কিভাবে?’ —এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁর সহজ উত্তর: ‘না। কবি নজরুল ইসলাম কথাটা শুনেছি; কিন্তু কৌতূহল বোধ করিনি। শিল্পী গান গায়, আমরা সেই গান শুনি। আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, জগন্ময় মিত্র, বিশ্বদেব—ওঁদের চিনতাম। গানটির শিল্পী ওরা কিন্তু গানটির স্রষ্টা কে সে নিয়ে আগ্রহ ছিল না। তখন নজরুলের গানকেই আঙ্গুরবালার গান বলে চিনি। এই সময়ে নজরুলের গান একটি স্বতন্ত্র মর্যাদা নিয়ে চর্চা হতে লাগলো। এতোদিন যারা আধুনিক গান, পল্লীগীতি গাইত তারা নজরুলের গান গাইতে শুরু করলেন। তখন আমিও গাইতে শুরু করি। আমি বুঝতে শুরু করলাম, আমার জানা অনেক গানই মূলত নজরুলের গান। কিন্তু এই সময়টাতেই আমি বিভ্রান্ত হতে শুরু করি। আমি শৈশবে, কৈশোরে যে গান শুনেছি যে সমস্ত শিল্পী তখন নজরুলের গান গাইতে আরম্ভ করেছে তাদের গাওয়ার সাথে মূল সুর ও বাণীর অনেক তফাত্ লক্ষ্য করলাম। তখনই শুনলাম কোলকাতা থেকে নজরুলের গানের স্বরলিপির বই বের হচ্ছে। সংবাদ শুনে অত্যন্ত উত্সাহ নিয়ে আমি কোলকাতা গেলাম। যাওয়ার আগেই আমার বন্ধু শেখ লুত্ফর রহমান আমাকে একদিন দুটো স্বরলিপির বই দেখতে দিয়েছিল। তাকে কেউ কোলকাতা থেকে পাঠিয়েছিল। সেই বইয়ের দুই-একটি গানের স্বরলিপি দেখে বুঝলাম এরাও ঠিক কাজটি করছে না। মূল বাণী-সুরের একেবারে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। একারণে আমার বিভ্রান্তি আরো বাড়তে লাগলো। অথচ আমি রবীন্দ্র সঙ্গীতের শিল্পী। রবীন্দ্র সঙ্গীতের বিশুদ্ধতা প্রশ্নাতীত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টিকে এমনভাবে সুরক্ষিত করে গেছেন, এখানে বিকৃতির কোন উপায় নেই। সেটা কিসের কারণে? তিনি প্রতিটি গান স্বরলিপি করে বই আকারে ছাপিয়ে গেছেন। নজরুলের ক্ষেত্রে সে রকমটি ঘটেনি। নজরুল অল্প কিছু গানের স্বরলিপি করেছেন; কিন্তু সেগুলোতে অনেক সময় ডিটেলস ছিল না। গানের ভাষায় যাকে বলে বন্দেশ। কাঠামো ছিল, কিন্তু এর মধ্যে গায়কী ছিল না। যে কারণে নজরুলের গানগুলো মূল সুরে গাওয়া হচ্ছিল না। আমি বই দুটো দেখে আরো দু-একজনের সাথে কথা বলি। এক্ষেত্রে অগ্রণী নজরুল একাডেমীর তত্কালীন সাধারণ সম্পাদক কবি তালিম হোসেন। তিনি নজরুলপ্রেমিক ছিলেন। তাঁর খুব ইচ্ছা ছিল নজরুলের গান শুদ্ধভাবে প্রচারিত হোক, শুদ্ধ স্বরলিপি তৈরি হোক। অনেক বৈঠকও করেছেন নজরুল সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। কিন্তু কাউকেই এই কাজটি করতে আগ্রহী হতে দেখলাম না। কাজটি সহজ ছিল না। যারা করে একমাত্র তারাই জানে—এজন্য রীতিমতো মগজ খাটাতে হয়, সাথে সাথে স্বরলিপির বিয়ষটাও জানতে ও বুঝতে হয়। তাদের কেউই অগ্রসর হননি। দু-একজন যারা অগ্রসর হয়েছিলেন, গানের মূল রেকর্ড তাদের কাছে ছিল না বা থাকলেও তারা এগুলোর সদ্ব্যবহার করেননি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কোলকাতায় যাই। হরপ্রকাশনীর মালিক আব্দুল আজিজ, তিনিই স্বরলিপি প্রকাশক ছিলেন। স্বরলিপির বইগুলোর তখন দু-দিনটি করে সংস্করণ বের হচ্ছে। দেখতে দেখতে প্রায় ৮-১০ খণ্ড ছাপা হয়ে গেছে। আমি তাকে বললাম—‘আপনিতো একটা মহত্ কাজ করছেন, কিন্তু স্বরলিপির নামে কি প্রকাশিত হচ্ছে এটা কি আপনি জানেন? এতে অনেক ভুল আছে। মূল সুরের থেকে অনেক দূরে বেশির ভাগ গান।’ তিনি বললেন, ‘এরকম কথা তো আপনি ছাড়া আর কাউকে বলতে শুনিনি। এখানে হটকেকের মতো এই বই বিক্রি হচ্ছে।’ আমি বললাম—‘আপনার স্বরলিপিকারদের বলবেন, তারা ঠিক কাজটি করছে না।’ আমি সেই স্বরলিপির বইয়ে ভুল দাগিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু পরের সংস্করণেও স্বরলিপি শুদ্ধ করার চেষ্টা তারা করেনি। বেদনাদায়ক হচ্ছে, যাদের নামে স্বরলিপি ছাপা হচ্ছিল-তারা সবাই নজরুলের সহচর ছিলেন। কিন্তু তারা দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দেননি। কারণ হচ্ছে—আদি রেকর্ড, যেসব গান নজরুলের অনুমোদনে, নজরুলের প্রশিক্ষণে (নজরুল তখন গ্রামোফোন রেকর্ডে চাকরি করতেন, তখন তাঁকে প্রচুর গান লিখতে হতো, সুর করতে হতো, মাঝে-মধ্যে বাধ্য হয়ে বাইরের অন্য সুরকারও তাঁর নিজের গান সুর করতে দিতেন) গীত হয়েছিল সে সব রেকর্ডকে স্বরলিপির আদর্শ হিসেবে ধরা হয়নি। এইসব নানা কারণে বাধ্য হয়ে, আমার ব্যক্তিগত কোন স্বার্থ ছিল না, তত্কালীন নজরুল একাডেমীর সম্পাদক তালিম হোসেনের সহযোগিতায় আমি প্রথম স্বরলিপির কাজে হাত দিলাম। মনের তাগিদে সেই কাজ শুরু করি। তখন আমি বুঝতে শুরু করলাম—যাঁকে চিনতাম না, জানতাম না, সে নজরুল কেবল নাম নয়, একজন অতি মানব। নজরুলের তুলনা শুধু নজরুল। একটা মানুষ মাত্র ২০-২২ বছরের সাহিত্যজীবনে—গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক ছাড়াও প্রায় তিন-সাড়ে তিন হাজার গান লিখে যেতে পারে এটা কি সহজ কথা? তার মধ্যে কিছু কিছু গান অতুলনীয়, আর এমন গানগুলো যদি বিকৃত হয় তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব কারণে আমি স্বরলিপির কাজ শুরু করি।’ এই গুণী শিল্পীর কাছে আমরা জানতে চেয়েছিলাম—এ পর্যন্ত নজরুলের কতটি গানের স্বরলিপি তিনি করেছেন? তাঁর উত্তর: স্বরলিপির সংখ্যা প্রায় ৭০০। ২২ খণ্ডে বেরিয়েছে। স্ত্রী নীলিমা দাশও কিছু কাজ করেছেন। নজরুলের প্রায় ৩-৪ হাজার গানের মধ্যে রেকর্ডেড গান ১৫-১৬শ’র মতো। এর মধ্যে অন্তত ১০০০ গানও যদি শিল্পীদের হাতের মুঠোয় থাকে-তাহলে নজরুলের গান বিকৃত করা সহজ হবে না। শুধু আন্তরিকতা দরকার। আমাদের দেশে নজরুল সঙ্গীতের নামকরা শিল্পীরা এখন বেশ দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছেন। তারা চেষ্টা করছেন শুদ্ধ নজরুল সঙ্গীত গাওয়ার। নজরুল ইনস্টিটিউট এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের শিল্পীদের স্বরলিপির চর্চা কম, স্বরলিপি থেকে গান তুলতে অনেক শিল্পীরই কষ্ট হয়। তাই নজরুল ইনস্টিটিউট আদি গ্রামোফোন রেকর্ডের প্রায় ৫০০ গান সিডি আকারে প্রকাশ করেছে। সাথে মূল গানের স্বরলিপি পাওয়া যাচ্ছে। নজরুলের সময়ে শিল্পীরা তাঁর গান যেভাবে গেয়েছে, নজরুল নিজে যেসব গানের সুর করেছেন, সে গানগুলো এই প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে প্রায় ১১টি সিডি আকারে বের করার উদ্যোগ নজরুল ইনস্টিটিউট সমপ্রতি নিয়েছে। এখন শুদ্ধভাবে নজরুল সঙ্গীত গাইতে কোন অন্তরায় আছে বলে আমি মনে করি না।
‘নজরুল সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ জগত্ ঘটকের সঙ্গে আপনার সাক্ষাত্ হয়েছিল বলে জানি?’ —প্রসঙ্গ ওঠতেই তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠলো, তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘আমার প্রথম কয়েকটি বই যখন বেরিয়েছে তখন এখানে একটি মহল আমার বিরূপ সমালোচনা করতে শুরু করল। বলতো—সুধীন দাশ রবীন্দ্র সঙ্গীতের শিল্পী, সে নজরুল সঙ্গীতের কি বুঝে? তার সব ভুল। কিন্তু কী ভুল সেটা বলত না। এরকম করে করে আমাকে বিভ্রান্ত করে তুলেছিল। আমাদের দেশে তো স্বরলিপির বিশেষজ্ঞ কম, তখন আমি বাধ্য হয়ে আমার ২-৩টা বই আমার এক বন্ধুকে দিয়ে সেই কিংবদন্তী শিল্পী ধীরেন চন্দ্র মিত্র ও জগত্ ঘটককে পাঠিয়েছিলাম। মাস দুয়েক পর আমি কোলকাতায় গেলাম। আমি ধীনের চন্দ্র মিত্রের দরজায় কড়া নাড়তেই একজন মহিলা দরজা খুলে আমার দিকে চেয়ে বললেন, ‘আপনি ঢাকা থেকে এসেছেন?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’; ‘আপনার নাম সুধীন দাশ’। আমি বোকা হয়ে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন—‘আসেন, আসেন, উনি আপনার জন্যে বসে আছেন।’ গিয়ে দেখলাম, ‘ভিতরের রুমে সেই সৌম্য মূর্তি। যিনি দরজা খুলেছিলেন, বললেন- ‘এই দেখো দেখো, সুধীন দাশ এসেছে’। ধীরেন চন্দ্র মিত্র বসা অবস্থা থেকে এগিয়ে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন- ‘এ আপনি কি করেছেন? নজরুলের গানতো শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে নজরুলের গান নিয়ে যে অনাচার হচ্ছে, আমাদের বয়স হয়ে গেছে, আমাদের তো কিছু করার নাই, একমাত্র জগত্ দা ছাড়া আর কেউ এ কাজ করতে পারেনি?’ এই যে এখন নজরুলের যে সমস্ত আসল গান আমরা পাই তা শুধু জগত্ ঘটকের কারণে। পশ্চিম বঙ্গের একমাত্র লোক যিনি নজরুল সঙ্গীতের শুদ্ধ স্বরলিপি করে গেছেন তিনি জগত্ ঘটক। আর সবাই নজরুলের নাম ভাঙ্গিয়ে ব্যবসা করেছে। ধীরেন মিত্রের মুখে এ কথা শুনে আমি আর চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। সেদিনের মতো আবেগ আমি আমার জীবনে আর অনুভব করিনি। আমার তখন মনে হলো, ‘জীবনে আমার আর কিছু পাওয়ার নেই।’ অনেকক্ষণ পরে তিনি আমাকে বললেন- ‘আপনি জগত্দার সঙ্গেও দেখা করে যাবেন।’
গেলাম সেই জগত্ দার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর বাড়ির তিন তলায় উঠে দেখি একটা ১০-১২ বছরের ফুটফুটে মেয়ে নজরুলের একটি গান গাচ্ছে। পাশেই জগত্ ঘটক পরিষ্কার জামা গায়ে একটা খাটের উপর বসে। খানিক পরে জগত্ দা মেয়েকে বলছে-‘এই! ওর থেকে শিখে নে গান’। জগত্দা নানা কথাবার্তার পর দুঃখ করে বলল – ‘আমি তো ওদের এখন আর স্বরলিপি দেই না।’ আমি বললাম – ‘কেন?’ ‘আমার স্বরলিপি নিয়ে ওরা ব্যবসা করছে—বাজে সব স্বরলিপির মধ্যে ঢুকিয়ে বই বের করছে; আমি আর দেব না।’ ‘আপনি না দিলে আমরা পাব কোথায়?’ আমি স্বরলিপির বইগুলো তাঁর হাতে দিয়ে বললাম- নজরুল ইনস্টিটিউট এই বইগুলো নিয়ে আপনার মতামত জানতে চায়’। তারা যে চিঠি নজরুল ইনস্টিটিউটকে লিখেছে সে চিঠি আমার বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে ছাপা হয়েছে। ধীরেন চন্দ্র মিত্র ও জগত্ ঘটক – আমাকে যে কমপ্লিমেন্ট দিয়েছে আমার জীবনে আর কিছু পাওয়ার দরকার নেই। তাঁদের চিঠির মূল কথাটা হচ্ছে- পশ্চিমবঙ্গে নজরুলের সঙ্গীতের কোন ভবিষ্যত্ নেই। একমাত্র বাংলাদেশেই নজরুল বাঁচবে এবং বাংলাদেশ সরকার উপযুক্ত লোককে নির্বাচন করে স্বরলিপি তৈরি করার দায়িত্ব দিয়েছে।’
আমার মতো একটা সাধারণ মানুষের জন্য তাদের এই যে কমপ্লিমেন্ট তা অতুলনীয় প্রাপ্তি। আর কি দরকার আমার? এই যে এত পদক, সম্মাননা এসব সে তুলনায় কিছুই না।

প্রথম প্রকাশ : ২৬ মে ২০১১, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৮

সিজারবাদঃ আন্তনিয় গ্রামসি

অনুবাদঃ তাহমিদাল  জামি

ceaser final

সিজার, প্রথম নাপোলেয়ঁ, তৃতীয় নাপোলেয়ঁ, ক্রমওয়েল, বগয়রহ। যেসকল ঐতিহাসিক ঘটনা শেষটায় গিয়ে এক ‘বীর’ চরিত্রের জন্ম দিয়েছে তার একটা তালিকা করা যায়। বলতে গেলে সিজারবাদের উদয় হয় সেই পরিস্থিতিতে যখন বিবদমান শক্তিগুলো এমন ভারসাম্যে পৌঁছে যে লড়াই চালিয়ে গেলে তার শেষ হবে প্রত্যেকের অবধারিত ধ্বংসে, ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’ – যায় যদি যাক প্রাণ। ‘ক’ নামের প্রগতিশীল শক্তি যদি ‘খ’ নামক পশ্চাৎমুখি শক্তির সাথে লড়ে, তখন ‘ক’ ‘খ’-কে কিংবা ‘খ’ ‘ক’-কে হারানোর বদলে এমনও হতে পারে যে দুই পক্ষ মারামারি করে করে নাস্তানাবুদ হল আর তৃতীয় এক পক্ষ এসে দুই কাহিলের উপর প্রাধান্য কায়েম করল। ইটালিতে দেখা গেছে বড় লরেঞ্জোর মরণের পর ঠিক এমনই হয়েছিল। কথা হলঃ যদিও সিজারবাদ দুই পক্ষের প্রাণপণ সর্বনাশা লড়াইয়ে উদিত ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধানে ত্রাতা হিসাবে কোন এক মহান চরিত্রের হাতে মধ্যস্থতার ভার সঁপে দিতে চায়, তবু সবক্ষেত্রে তার ঐতিহাসিক মর্ম এক দাঁড়ায় না। সিজারবাদ কোথাও হয় প্রগতির পথিক কোথাও হয় পশ্চাতগতির। কোথায় যে তার কি মর্ম দাঁড়াল তা শেষ বিচারে বোঝা যায় বাস্তব ইতিহাসের প্রেক্ষিতে, সমাজবিদ্যার ছকে ফেলে নয়। সিজারবাদ প্রগতিশীল হয় যখন তার হস্তক্ষেপে প্রগতিশীল শক্তির বিজয় হয়, যদিও কিছু আপোষ ও সীমার খচখচানি থেকে যায় সেই বিজয়ের মধ্যে। আবার তা পশ্চাৎপন্থি যখন তার হস্তক্ষেপে পশ্চাৎপন্থি শক্তির বিজয় হয়, এবং এক্ষেত্রেও ঐ আপোষ ও সীমার খচখচানি থাকে – যদিও এক্ষেত্রে তার মূল্য, পরিধি ও মর্ম ভিন্ন। সিজার স্বয়ং এবং প্রথম নাপোলিয়ঁ ছিলেন প্রগতিপন্থি সিজারবাদের নমুনা, আর তৃতীয় নাপোলিয়ঁ ও বিসমার্ক ছিলেন পশ্চাৎপন্থি সিজারবাদের নজির। দেখার বিষয় হল ‘বিপ্লব/পুনর্বহাল’ দ্বন্দ্বে বিপ্লব জয়ী হবে নাকি পুনর্বহাল জয়ী হবে। এটা পরিষ্কার যে ইতিহাসের গতিপথে পেছন ফেরা বলে কিছু নেই, ফলে বিশুদ্ধ পুনর্বহাল বলেও কিছু নেই। তাছাড়া সিজারবাদ তর্ক-বিচারে একটা সূত্র মাত্র, ইতিহাস ব্যাখ্যার কোন বাঁধাধরা কানুন নয়। সিজার ছাড়াও সিজারবাদ হতে পারে – মহান ‘বীর’ বা যুগন্ধর ব্যক্তি বাদেও সিজারবাদ সম্ভব। যেমন সংসদীয় ব্যবস্থা আপোষ রফার একটা কায়দা বের করেছে। ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে ‘লেবার’ সরকার এমনই এক আপোষ রফা, আর যখন ম্যাকডোনাল্ডকে নেতা করে যখন রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার হল তখন সিজারগিরির মাত্রা আরও এককাঠি চড়ল। একই ভাবে ইতালিতে ১৯২২-এর অক্টোবর থেকে ‘পপলারি’র পিঠটান পর্যন্ত, তারপর ধাপেধাপে ১৯২৫-এর ৩ জানুয়ারি অবধি এবং শেষে ১৯২৬-এর ৮ নভেম্বর তক এমন একটা রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক গতি চলল যাতে একেএকে নানা পদের সিজারবাদই কায়েম হল – আর শেষে তা এল একেবারে আসল ও পাকাপাকি রূপে – অবশ্য তাতেও ঠিক স্থির বা থিতু হল না । প্রতিটি জোট সরকারই সিজারবাদের প্রথম পর্ব, তবে প্রথম পর্বের পরের আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্বগুলি আসবে কি আসবে না তার ঠিক নেই (অবশ্য প্রচলিত মতে জোট সরকার হল সিজারবাদ ঠেকাতে সবচেয়ে ভাল রক্ষাকবচ)। আগে, তৃতীয় নাপোলিয়েঁর আমল পর্যন্ত সিজারবাদের কায়দা যা ছিল আজকের দুনিয়ায় যেখানে অর্থনৈতিক-শ্রমিক সংঘ আর দলীয়-রাজনৈতিক জোটের বাড়বাড়ন্ত সেখানে তা একেবারেই ভিন্ন। তৃতীয় নাপোলিয়েঁর আমল পর্যন্ত সিজারবাদের আগমনে নিয়মিত সেনাবাহিনী বা সৈনিকের ভূমিকা ছিল অবধারিত, আর আগমনটা সচরাচর ঘটত ক্যু কিংবা সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে। আধুনিক যুগে কিন্তু শ্রমিক সংঘ বা রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা বিষয়টি জটিলতর হয়েছে, এই যুগে এসে অল্প কিছু নাগরিকের হাতে অগাধ অর্থবিত্ত সঞ্চিত হয়। ফলে দল বা শ্রমিক সঙ্ঘের কর্মীদের কিনে ফেলা বা ভয়ভীতি দেখিয়ে কাবু করা আজকাল আর ব্যাপার নয়, ফলে সিজার কিংবা ১৮ই কুয়াশা মাসের (১৮ই ব্রুমের) কায়দায় বীরবিক্রমে সেনা হস্তক্ষেপের আর দরকার হয় না। জাকবিন/১৮৪৮ সালের ‘চিরস্থায়ী বিপ্লব’ বুলির বেলায় অনুসন্ধানে যে কথা বের হয়ে এসেছে এক্ষেত্রেও সেই কথা খাটে। ১৮৪৮ সালের পর আধুনিক রাজনীতির কায়দাকৌশল খোলনলচে সমেত পালটে গেছেঃ যার মূলে আছে সংসদীয় ব্যবস্থা এবং শ্রমিক সংঘ ও রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক সূত্রের প্রসার, প্রকাণ্ড রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের (তথা রাজনৈতিক কিন্তু অরাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্র, যা রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংঘে থাকে) বিকাশ, এবং ব্যাপক অর্থে নিয়মকানুনশৃঙ্খলের শক্তির গঠনে যে রূপান্তর এসেছে –খালি রাষ্ট্র কর্তৃক অপরাধ দমন নয়, বরং রাষ্ট্র ও ব্যক্তি পর্যায়ে শাসক শ্রেণীসমূহের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাধান্য কায়েম রাখতে যাবতীয় শক্তির সংগঠন। এই অর্থে গোটা রাজনৈতিক ও অন্যান্য সংগঠন –অর্থনৈতিক সংগঠন সমেত – সবই রাজনৈতিক হুকুমতের হাতে পরিণত হয়েছে, গোয়েন্দাগিরি এবং নিয়ন্ত্রণ এদের অন্যতম ভূমিকা। ‘ক’ ও ‘খ’য়ের মধ্যে সর্বনাশা দ্বন্দ্ব যাতে দুইয়ের কেউই জয়ী হবে না এবং সাম্যাবস্থা বহাল বা পুনর্বহাল করার এই দ্বন্দ্ব থেকে সিজারবাদের জন্ম – এইটি হল নিতান্তই একটি সাধারণ প্রস্তাবনা, সমাজতাত্ত্বিক ছক (তা রাজনীতি কলায় কাজে লাগতে পারে)। এই প্রস্তাব বা ছককে ঐতিহাসিক বাস্তবতার আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা যায়, যদি কয়েকটি মূল বিষয় বেঁধে দেওয়া যায়।   ধরা যাক, ক ও খ এর কথায় বলা হয়েছে যে একদল মোটের উপর প্রগতিশীল এবং আরেকদল মোটের উপর পশ্চাৎপন্থি। এখন চাইলে নির্দিষ্ট করে বলা যায় যে ঠিক কি ধরনের প্রগতিশীল বা কি ধরনের পশ্চাৎপন্থি শক্তি তারা – তাইলে প্রশ্নটা বাস্তবের আরও কাছে নিয়ে ধরা যাবে। যেমন সিজার ও নাপোলিয়েঁর বেলায় বলা যায় ক ও খ লড়াইরত থাকলেও তারা যে আলাদা আলাদা অণুর মত কিছুদূর চলার পর মিলতে এবং এক হয়ে যেতে ‘একদমই’ পারত না তা বলা যায় না। আদতে তাই কিন্তু হয়েছে – অন্তত কিছুটা হলেও (অন্ততঃ বিষয়টির ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হয়েছে; অর্থাৎ মূল যে লড়াই চলছিল তা থামাতে পেরেছে এবং সর্বনাশা পর্যায়টা অতিক্রম করতে পেরেছে)। এই গেল কাছাকাছি নির্দিষ্ট করে দেখার একটা দিক। আরেকটি দিক হলঃ সর্বনাশা পর্যায়ের সূচনা সনাতনী বা প্রথাগত কায়েমী প্রভু শক্তির ক্ষণিকের রাজনৈতিক দুর্বলতাতেই হতে পারে, দুর্বলতাটা অমোঘ বা গাঠনিক ত্রুটি হতে হবে এমন কোন কথা নেই। তৃতীয় নাপোলিয়েঁর ক্ষেত্রে ঠিক তাই। ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত ফরাশি দেশে প্রভুত্বকারী শক্তি রাজনৈতিক অর্থে (তথা দলাদলির অর্থে) চার দলে বিভক্ত ছিলঃ ঔরসপন্থি, অরলিয়ঁপন্থি, বোনাপারত পন্থি, আর জাকবিন-প্রজাতন্ত্রী। এদের ভেতরের অন্তর্গত কোন্দল এমন ছিল যে বিরোধী ‘খ’ শক্তির (প্রগতিশীল) আগাম উদয়ের পরিস্থিতি ঠিকই ছিল; কিন্তু বিদ্যমান সমাজের রূপটির বিকাশের সম্ভাবনা তখনও সম্পূর্ণ বা খতম হয় নি – পরের ইতিহাসে তা ভালমতই দেখা গেছে। তৃতীয় নাপোলিয়ঁ ঠিক এই ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোরই প্রতিনিধি ছিলেন (তার নিজের ধরনে; তার মাপে যেমন মানাত আর কি, এবং মাপটা বলাবাহুল্য বড় ছিল না); ফলে তার সিজারগিরি একটা বিশেষ চরিত্রের। সিজার স্বয়ং ও প্রথম নাপোলিয়ঁ-র বেলায় সিজারবাদটা ছিল বলতে গেলে একটা গুণগত/পরিমাণগত চরিত্রের – বা বলা যায় তাদের ক্ষেত্রে সিজারবাদটি এক ধরনের রাষ্ট্র থেকে অন্য ধরনের রাষ্ট্রে যাওয়ার ঐতিহাসিক পর্যায়টি ধারণ করেছিল – এবং এই পর্যায়ে এত বেশি বিচিত্র নোতুনত্ব ছিল যে সব মিলিয়ে একটা সত্যিকারের বিপ্লব ঘটে গিয়েছিল। তৃতীয় নাপোলিয়েঁর সিজারবাদে ছিল শুধু পরিমাণগত দিক – তাও কিছুটা, পুরাপুরি নয়; এক ধরনের রাষ্ট্র থেকে অন্য ধরনের রাষ্ট্রে যাত্রার কোন ব্যাপার সেখানে ছিল না, ছিল শুধু একই ধরনের রাষ্ট্রের ‘ক্রমবিবর্তনের’ টানা রেখা। আধুনিক দুনিয়ায় সিজারবাদী কাণ্ডকারখানা পুরা আলাদা, প্রগতিশীল সিজার/প্রথম নাপোলিয়ঁ থেকেও আলাদা আবার তৃতীয় নাপোলিয়ঁ থেকেও আলাদা – তবে আধুনিক সিজারবাদের ঝোঁকটা কিছুটা তৃতীয় নাপোলিয়ঁ মার্কা সিজারবাদের দিকেই। আধুনিক যুগে সর্বনাশা দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা এমন সব শক্তির ভেতর নয় যারা ক্লান্তিকর ও রক্তাক্ত প্রক্রিয়াতেও কখনও গিয়ে মিলতে পারে বা এক হয়ে যেতে পারে; বরং আধুনিক যুগে সর্বনাশা দ্বন্দ্বের সম্ভাবনা এমন শক্তির মধ্যে যাদের দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিক ভাবেই সব নিরাময়ের ঊর্ধ্বে, এবং সিজারবাদী উপাদানের আগমনে তা আরও খারাপ বৈ ভাল হয় না। তারপরও আধুনিক যুগে সিজারবাদের একটা জায়গা আছে – দেশভেদে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে তার ওজন ভেদে ছোট বড় হতে পারে। কারণ একটা সামাজিক রূপের ‘সবসময়ই’ আরেকটু বিকশিত ও সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায় বিশেষ করে যখন তা চরিত্র ও জীবনধারার কারণে বিরোধী প্রগতিশীল শক্তির তুলনামূলক দুর্বলতার উপর ভরসা করতে পারে। প্রভুত্বকারী সামাজিক রূপের স্বার্থের খাতিরে এই দুর্বলতাকে টিকিয়ে না রাখলেই নয়; এজন্যই বলা যে আধুনিক সিজারবাদ যত না সামরিক ব্যবস্থা তার চেয়ে বেশি পুলিশি ব্যবস্থা।

অনুবাদকের টীকাঃ বড় লরেঞ্জো – লরেঞ্জো লা মেদিচি (১৪৪৯-১৪৯৯) ইতালির ফ্লোরেন্সের রাষ্ট্রনায়ক। সিজারঃ জুলিয়াস সিজার (১০০ খ্রিঃপূঃ – ৪৪ খ্রিঃপূঃ) প্রজাতন্ত্রী রোমে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেন। একই সঙ্গে তিনি রোমান সাম্রাজ্য কায়েম করেন। প্রথম নাপোলিয়ঁ – নাপোলিয়ঁ বোনাপারত (১৭৬৯-১৮২১) ফরাশি বিপ্লব পরবর্তী আমলে ফ্রান্সের সেনাপতি যিনি পরে ফরাশি সাম্রাজ্য কায়েম করেন এবং নোতুন ধরনের রাজতন্ত্র পুনর্বহাল করেন। তৃতীয় নাপোলিয়ঁ – লুই-নাপোলিয়ঁ বোনাপারত (১৮০৮-১৮৭৩) ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের পর নির্বাচিত ফরাশি রাষ্ট্রপতি যিনি অচিরেই নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করেন। ১৮ই ব্রুমের – ১৭৯৯ সালে সেনাপতি নাপোলিয়ঁ-র ক্যু-র তারিখ যার দ্বারা তিনি সরকার উচ্ছেদ করেন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় শামিল হন। ফরাশি বিপ্লবের পর বিদ্যমান ক্যালেন্ডার পাল্টানো হয় এবং মাসের নামও বদলানো হয়। বছরের দ্বিতীয় মাসের নামটি ছিল ব্রুমের (ব্রুম’ বা কুয়াশার মাস)। ১৮১৫ – প্রথম নাপোলিয়ঁ ইউরোপের আদি রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার শেকড় ধরে নাড়া দিয়েছিলেন। প্রতিবিপ্লবী শক্তি ১৮১৫ সালে সম্রাট নাপোলিয়ঁকে পরাজিত করে এবং রক্ষণশীল ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ঔরসপন্থি – লেজিটিমিস্ট অর্থাৎ বৈধ ঔরস প্রসূত রাজতন্ত্র পন্থি। অরলিয়ঁ পন্থি – ১৮৩১-এ প্রতিষ্ঠিত জুলাই রাজতন্ত্রের পন্থি। বোনাপারত পন্থি – নাপলিয়েঁর বংশের রাজতন্ত্রের অধিকার পন্থি। জাকবিন-প্রজাতন্ত্রী – রাজতন্ত্র বিরোধী ফরাশি বিপ্লবের ধারাবাহী প্রজাতন্ত্রী রাজনৈতিক শক্তি। ১৮৪৮ – ইউরোপ ব্যাপী সামাজিক-রাজনৈতিক বিপ্লবের বছর যখন ইউরোপে বিদ্যমান রক্ষণশীল ক্ষমতা ধাক্কা খায়। শ্রমজীবী শ্রেণী দেখে বুর্জোয়া শ্রেণীর বেঈমানি। অক্টোবর ১৯২২ – মুসলিনি রোমের মুখে লং মার্চ করেন। নির্বাচিত সরকারের পতন হয়। রাজা ফ্যাসিবাদী মুসলিনিকে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেন। ১৯২৬ – মুসলিনি ইতালিতে স্বৈরাচারী ক্ষমতা সুসংহত করেন।