Category Archives: সর্বজন: নবপর্যায় ০৯

সমাজতন্ত্র ও সংস্কৃতি – আন্তনিয়ো গ্রামসি

সমাজতন্ত্র ও সংস্কৃতি
আন্তনিয়ো গ্রামসি
তর্জমা: তাহমিদাল জামি

gramsci 1

বিশ শতকের সবচেয়ে মৌলিক ও অন্তর্ভেদী চিন্তাবিদের নাম আন্তনিয়ো গ্রামসি। শুদ্ধ তাহাই নহে, মৌলিকতায় ও অন্তদৃষ্টিতে তাঁহার স্থান কার্ল মার্কস, জিকমুন্ট ফ্রয়েড ও ভ­াদিমির লেনিনের কাতারে। কি উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে কি সাম্রাজ্যবাদের কবলগ্রস্ত অনুন্নত দেশে সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য ও সর্বহারা শ্রমিক কৃষকের সংগ্রামকে হৃদয়ঙ্গম করিতে গ্রামসি অপরিহার্য। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে গ্রামসি চর্চার বালাই নাই। গত বছর আহমদ ছফা বিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত গ্রামসি উৎসব চলাকালে মহাত্মার এই রচনাখানি তর্জমা করা হয়। গ্রামসির এই রচনা প্রথম প্রকাশিত হয় ‘Il Grido del Popolo’ পত্রিকায়, ১৯১৬ সালের ২৯ জানুয়ারি তারিখে। তর্জমার জন্য ব্যবহৃত প্রবন্ধটির উৎস: The Gramsci Reader: Selected Writings 1916-1935, ed. David Forgass (Nwe York: NY Press, 2000).

ম্প্রতি এনরিকো লেওনের একখানি প্রবন্ধ আমাদের নজরে এসেছে। লেওন মশায় হামেশা যে অতি জটিল ও ঘোরাল কায়দায় লিখে থাকেন এই প্রবন্ধেও তিনি তেমন ভাষায় সংস্কৃতি ও বুদ্ধিজীবিতার সাথে সর্বহারার সম্পর্ক নিয়ে কিছু চর্বিত চর্বণ করেছেন। অতঃপর এ দুইয়ের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন আমল ও ঐতিহাসিক সত্যকে; সে ঐতিহাসিক সত্য হল শ্রমিকশ্রেণি নিজ হাতে আপন ভবিষ্যৎ গড়ছে। আমাদের বিশ্বাস এই বিষয়ে আরেকবার আলাপ তোলাটা বৃথা হবে না। এর আগে ইল গ্রিদোতে এ আলাপ হয়েছে। আর যুব সঙ্ঘের ‘আভাঙ্গারদিয়া’ (অগ্রসৈনিক) পত্রিকায় নাপলির বোরদিগা আর আমাদের তাস্কার মধ্যে এ আলাপ নিয়ে এরই মধ্যে গোঁড়া মতাদর্শিক কায়দায় বাহাস হয়ে গেছে।
দুইটা লেখার দুইটা অংশ স্মরণে আনি। প্রথমটা জনৈক জর্মন রমণীয় লেখকের — নাম নোভালিস (জীবনকাল ১৭৭২ থেকে ১৮০১)। তিনি বলেছিলেন, ‘সংস্কৃতির আলোচনায় প্রধান প্রশ্নটা নিজের পরম আমির দখল নেওয়া নিয়ে, স্বয়ং নিজ হওয়া নিয়ে। তো পরকে পুরোপুরি বুঝতে বা উপলব্ধি করতে আমাদের যে ঘাটতি, তাতে আর আশ্চর্য কি! নিজেদেরই আমরা যদি পুরোপুরি বুঝে না উঠি তবে পরকে জানার আশা করা মিছা।’
দ্বিতীয় লেখাটি মহাত্মা জিয়াম্বাতিস্তা ভিকোর (১৬৬৮-১৭৪৪)। আমরা সারাংশ করব,  ভিকো (তাঁর নববিজ্ঞান গ্রন্থের ‘আদি জাতিগুলির কাব্যিক চরিত্র — ভাষা নিয়ে পয়লা অনুসিদ্ধান্তে’) সলনের প্রসিদ্ধ উক্তি ‘আত্মানং বিদ্ধি’র (যা পরে সক্রাতেস দর্শনের তরফে আপন করে নিয়েছিলেন) একটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। ভিকো বলছেন এ কথার মধ্যে সলন নিচুজাতকে মৃদু ভর্ৎসনা করতে চেয়েছেন, নিচুজাতের লোকেরা ভাবত তারা পশুর জাত আর উঁচুজাতের লোকেরা দেবতার জাত। সলন বলছেন তারা যেন নিজেদের নিয়ে ভেবে দেখে, তাহলে তারা বুঝতে পারবে তাদের সাথে উঁচুজাতের রক্তে স্বভাবে কোন সহজাত ফারাক নেই, তখন তারা রাষ্ট্রীয় আইনেও উঁচুজাতের সমকক্ষতা দাবি করতে শিখবে। অতঃপর ভিকো সাব্যস্ত করছেন: নিচুঁ উঁচু জাতের মানুষে মানুষে সাম্যের এই জ্ঞানই প্রাচীন আমলের গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রগুলোর ভিত্তি ও ঐতিহাসিক যুক্তি।
এই দুই টুকরা লেখা আমরা এলোপাতাড়ি বেছে নেইনি মোটেই। আমরা মনে করি এই দুই টুকরাতে লেখকদ্বয় ‘সংস্কৃতি’ ধারণাটা ঠিকঠাক বোঝার সূত্র ও সীমাগুলো ছুঁয়ে গেছেন — হোক তা অস্পষ্ট ও ঝাপসাভাবে। এমনকি সমাজতন্ত্রের সাপেক্ষে মিলিয়ে সংস্কৃতি ধারণাটা কিভাবে বোঝা যাবে সে সীমাসূত্রও এই দুই লেখা থেকে পাওয়া যেতে পারে।
সংস্কৃতি মানে যেন বিশ্বকোষের মত বিদ্যা, আর মানুষ যেন কতগুলো উপস্থিত অনুভূতি থেকে পাওয়া রাশিরাশি আলগা তথ্যের ভাণ্ডার যেগুলো অভিধানের মত সারি সারি আমাদের মগজে বোঝাই হয়ে আছে আর বাইরের দুনিয়ার নানা কাণ্ডে এই মগজের মালিক ভেতরে বোঝাই করা তথ্যের ভিত্তিতে সাড়া দিচ্ছেন — এমনভাবে ভাবার অভ্যাস আমাদের ছাড়তে হবে। যে সংস্কৃতি এমন তা তো আদতেই ক্ষতিকর, বিশেষ করে সর্বহারার জন্য। এমন সংস্কৃতি একদল খাপ না খাওয়া মানুষ তৈরি করে, যারা নিজেদের হামবড়া মনে করে বাদবাকি আদমিদের তুলনায়। তাদের এই বড়াইয়ের কারণ তারা একরাশ তথ্য মুখস্ত করেছে আর সুযোগ পেলেই সেগুলো উগরে দিতে তারা কার্পণ্য করে না। এভাবে পরের সাথে মেলার বেলায় তারা নিজেরাই নিজেদের বেড়া হয়ে ওঠে। এই সংস্কৃতি একরকম নীরক্ত ফ্যাকাসে বুদ্ধি ব্যবসায়ী তৈরি করে যাদের রোমা রোলাঁ তীব্র কষাঘাত করেছেন। যক্ষ্মা কি সিফিলিস দেহের স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্যের হানি যত করে, এই সংস্কৃতির পয়দা করা উদ্ধত বাকোয়াজ বুদ্ধিজীবীর দল সমাজ জীবনের ক্ষতি করে তার ঢের। যে তরুণ ছাত্র খানিক লাতিন, কিঞ্চিৎ ইতিহাস শিখেছে, যে তরুণ উকিল তার মাননীয় অধ্যাপকদের কুঁড়েমি আর গাছাড়ামির ভেতর থেকে ডিগ্রি নামক এক টুকরা কাগজ নিংড়ে নিয়ে সিদ্ধিলাভ করেছে — তারা সবাই মোটের উপর নিজেদের আলাদা মনে করে, বড় মনে করে এমনকি সবচেয়ে দক্ষ শ্রমিকটার তুলনায়ও — যদিও ঐ শ্রমিকের কাজটা জীবনের জন্য অনেক বেশি অপরিহার্য, সমাজের জন্য শতগুণ বেশি মূল্যবান। কিন্তু তাদের এই সংস্কৃতি তো সংস্কৃতি নয়, এ তো পণ্ডিতি; এ বুদ্ধি নয়, বুদ্ধির ভড়ং। এর বিরোধিতা করা একান্ত ন্যায্য।
প্রকৃত সংস্কৃতি একদমই অন্যরকম এক ব্যাপার। সংস্কৃতি হল নিজের ভেতরের আত্মাকে সংগঠিত করা, তাতে শৃঙ্খলা আনা। সংস্কৃতি হল নিজের ব্যক্তিসত্তার সাথে বোঝাপড়া করা। সংস্কৃতি হল এক উচ্চতর চৈতন্য লাভ যা দিয়ে মানুষ নিজের ঐতিহাসিক মূল্য বুঝবে, জীবনে নিজের কাজটা চিনবে, নিজের অধিকার ও কর্তব্য শনাক্ত করতে পারবে। এর কোনটাই স্বতঃস্ফূর্ত বা আপনা আপনি হয়ে ওঠে না। এমন নয় যে নিজের ইচ্ছা হোক আর না হোক কতগুলো ক্রিয়া বিক্রিয়া আপনা আপনি ঘটে যাবে আর মানুষ সংস্কৃতি লাভ করে ফেলবে। পশু কিংবা গাছের জগতে এটা স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারে, তাদের প্রত্যেকের অঙ্গ বিকাশ অজ্ঞানে ঘটে — সেখানে সব নিয়তি নির্ধারিত, নিয়তিই আইন। আর সব কিছুর চেয়ে বড় কথা: মানুষ মানে মনের ঊষ। সে প্রকৃতির নয়, ইতিহাসের কারখানায় তৈরি মাল। যদি তাই না হবে, তাইলে বলুক দেখি কেউ, এই যে চিরকাল শোষক আর শোষিতের ভেদ রইল, সম্পদের ¯্রষ্টা আর ভোক্তা আলাদাই রইল — এতকিছুর পরও সমাজতন্ত্র এল না কেন? মানুষের জাত যে ধাপে ধাপে একেক দফায় একটু একটু করে নিজের মূল্য চিনল, আর গত আমলের গুটিকয় শোষকের চাপিয়ে দেওয়া সমাজ গঠনের কানুনকে ছুঁড়ে ফেলার হক আদায় করে নিল, এ কি আপনা আপনি প্রাকৃতিকভাবে হয়েছে, শারীরবৃত্তীয় দরকারে  হয়েছে? না, এ ঘটেছে চিন্তাশক্তি খাটিয়ে ভেবে দেখার ফলে। বিদ্যমান ব্যবস্থা কেন চলছে, এই ব্যবস্থার টিকে থাকার শর্তগুলো কি আর ভেঙ্গে ফেলার সূত্রগুলোই বা কি, মানুষের দাসদশার যে উপস্থিত  সত্য বা তথ্য, তাই থেকে কিভাবে বিদ্রোহ ও সমাজকে ভেঙ্গে গড়ার আহবান তৈয়ার হবে তা মানুষ ভেবে দেখেছে। প্রথমে কয়জন ভেবেছে শুধু, তারপর ভেবেছে গোটা একটা শ্রেণি। তার মানে প্রতিটা বিপ্লবের পেছনে বিচার ও পর্যালোচনার এক কঠোর পরিশ্রমী পর্যায় থাকে, যখন সংস্কৃতি ও চিন্তা জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে যায়, জনগণ প্রথমে নতুন সংস্কৃতি নতুন চিন্তাকে নিতে পারে না, বাধা দেয়; তারা উপস্থিত আর্থিক রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর বেলায় শুধু নিজেরটাই সুরাহা করতে চায় খালি, একই দশায় থাকা অপরের সাথে কোন সংহতি বন্ধন রাখে না। এর সবশেষ নজির আমাদের একদম কাছের আর পরিচিত — ফরাশি বিপ্লব। ফরাশি বিপ্লবের অব্যবহিত আগের সাংস্কৃতিক যুগটার নাম বাতিজ্বলার যুগ। তাত্ত্বিক চিন্তার আলগা সমালোচকেরা বাতিজ্বলার যুগ বলতে বোঝায় যেন এমন এক যুগ যখন গুটিকয় বিশ্বকোষ-জান্তা বুদ্ধিজীবী জগতের তাবৎ ব্যাপার স্যাপার নিয়ে একই সমাহিত ভাব নিয়ে আলাপ পেড়ে যাচ্ছিলেন, কাউকে তারা সমসাময়িক বলে তখনি মানতেন যদি সে দ’আলেম্বারতের ও দিদেরোর বিশ্বকোষ পড়ে থাকে। কিন্তু বাতিজ্বলার যুগের এই চিত্রায়ন মিথ্যা। এ যুগ কেবল শুকনা পণ্ডিতি আর বুদ্ধিজীবীতার যুগ ছিল না, যেমন পণ্ডিতি আমরা আজকালকের সবচেয়ে বাজে পপুলার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিলক্ষণ দেখে থাকি। বাতিজ্বলার যুগ নিজেই ছিল এক মহৎ বিপ্লব: দ স্যাঙ্কতিস তার ‘ইতালীয় সাহিত্যের ইতিহাস’ বইয়ে এ খবর টুকে গেছেন। বাতিজ্বলার যুগ সমগ্র ইউরোপকে এক বুর্জোয়া রুহানি আন্তর্জাতিক এনে দিল, তা এল ইউরোপ সমাজব্যাপ্ত এক অখণ্ড চৈতন্যের রূপে, সাধারণ মানুষের সকল দুঃখে দুর্ভাগ্যে যে চৈতন্যে সাড়া জাগে, যে চৈতন্য ছিল ফরাশিদেশের রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের সবসেরা প্রস্তুতি।
ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি — সর্বত্র একই বিষয়, একই প্রথা-প্রতিষ্ঠান, একই নীতি নিয়ে আলোচনা চলছিল। একেকটা নতুন নাটক বেরুচ্ছে বলতেয়রের হাতে, একেকটা প্যাম্ফলেট ছাড়া হচ্ছে, আর ফুলকির মত ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশে, অঞ্চল থেকে অঞ্চলে। আর তাদের মধ্যে আগে থেকেই যোগরেখা আঁকা হয়ে গেছে। যে দেশেই যাই এসব নাটক প্যাম্ফলেট চিন্তা সমর্থন দিচ্ছে একইরকম লোকে, বিরোধিতাও করছে অন্য একদল লোকে। নাপলেয়ঁর সৈনিক দল সঙ্গিন বা বেয়নেট উঁচিয়ে যখন ইউরোপের পথে বের হল, দেখা গেল সে পথ আগে থেকেই মসৃণ করে গেছে বই আর প্যাম্ফলেটের অদৃশ্য সৈনিকের দল, যারা পারি নগর থেকে আঠার শতকের গোড়া থেকেই ইউরোপের অভিমুখে ছড়িয়ে পড়েছিল রাশি রাশি, আর কি মানুষ কি তার প্রথা-প্রতিষ্ঠান সবকিছুকে ভেতর থেকে প্রস্তুত করে তুলেছিল নতুনের জন্য। পরে যখন ফ্রান্সের ঘটনাবলি অখণ্ড এক চৈতন্য ঝালিয়ে তুলল, তারপর তো পারিতে একটা মিছিল নামলেই মিলান কি ভিয়েনা কি আর আর ছোট খাট হাটে শহরে তেমনি আন্দোলন লেগে যেত। যারা উপরি উপরি সবকিছু দেখে থাকেন, তারা মনে করবেন এসবই বুঝি স্বতঃস্ফূর্র্ত ঘটনা। কিন্তু যে সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো দানা বাধায় এই মানসিক প্রস্তুতি সম্ভব হল তা যদি না বুঝি তবে কিভাবেই বা বুঝব কি করে এক দাবিতে শত বিস্ফোরণ পাকিয়ে উঠল।
সমাজতন্ত্রের বেলায় আজ ঠিক তাই ঘটছে।  পুঁজির সভ্যতার বিচার করার মধ্য দিয়েই সর্বহারার ভেতর এক অখণ্ড চৈতন্যের উদয় হয়েছে, গঠন হচ্ছে; আজও হচ্ছে। এই বিচার তো সংস্কৃতি বৈ হয় না; এমনকি স্বতঃস্ফূর্র্ত বা প্রাকৃতিক ধারায় হওয়ার নয়। নোভালিস সংস্কৃতির উদ্দেশ্য বলে যাকে সাব্যস্ত করেছিলেন, বিচার সেই আত্মজ্ঞানের নাম। আত্মার জ্ঞান, যে আত্ম পর নয়, পরের বিপরীত, যে ভেদজ্ঞানে জ্ঞানী। এই আত্ম যখন সংকল্প খাড়া করে, তখন সে জগতের ঘটনা বা ব্যাপারাদিকে আর আলগা বা নিজ নিয়মে চলছে বলে দেখে না, বরং সেসবের ভেতর দিয়ে ইতিহাস এগোচ্ছে না পেছাচ্ছে সেই হুঁশও সে রাখে টনটনে। নিজকে জানা মানে নিজ হয়ে উঠা, নিজের মনিব নিজেই বনা, নিজেকে পরের থেকে ভেদ করা, পঞ্চভূতের সৃষ্টিছাড়া নৈরাজ্য থেকে মুক্তিলাভ করে শৃঙ্খলার পথে দাঁড়ানো — কিন্তু সে নিজেরই শৃঙ্খলা, নিজেরই নিয়ম, এক আদর্শের, আদলের সংগ্রামের জন্য সে শৃঙ্খলা। আর এই আত্মজ্ঞান তো হবে না যদি আমরা পরকে না জানি, পরের ইতিহাস, তারা কিভাবে একের পর এক হয়ে ওঠার সংগ্রাম করে গেছে, সভ্যতা গড়ার মেহনত করে গেছে, যে সভ্যতা আমরা আমাদের সভ্যতা দিয়ে খালাস করতে চাই। অন্যভাবে বলতে, মন যেসব নিয়মে বাঁধা সেগুলো জানতে হলে আমাদের প্রকৃতি ও তার নিয়মকানুনও কমবেশি জানা চাই। আর এসব জানতে হবে চূড়ান্ত লক্ষ্যটাকে সামনে রেখেই: পরের ভেতর দিয়ে নিজেকে জানা, আর নিজের ভেতর দিয়ে পরকে জানা।
সত্যই যদি নিখিল ইতিহাস এক সুতায় গাঁথা মালা হয়, যাতে জাতপাত-সংস্কার-পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রতিটা লড়াই-সংগ্রাম একটা একটা করে ফুল হয়ে মিলেছে, তাহলে সর্বহারাও যে এক নতুন ফুল নিয়ে এসেছে গাঁথবে তাই, তাকেও কি জানতে হবে না তার আগে কে কেন কিভাবে কি করে গেছে, আর এসব থেকে সে কি শিক্ষা নিতে পারে।

বাঙালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব- মুহম্মদ এনামুল হক

বাঙালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব
মুহম্মদ এনামুল হক

১৮৫৭ সালে শুরু হওয়া ভারতীয় জনতার বিপ্লব ব্যর্থ হইবার পর ভারতীয় রাজনীতিতে এক ভিন্ন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। অগ্রসর হিন্দু মধ্যবিত্তরা এক কাল্পনিক হিন্দু পুনরুত্থানের স্বপ্ন দেখে। নব্য হিন্দুত্বের আলোকে তাহারা তাহাদের জ্ঞান ও কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ভারতীয় মুসলমানেরা প্রথম রাজনৈতিক আন্দোলনে সংগঠিত হইয়াছিল তুরস্কের খেলাফত রক্ষার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে। কিন্তু নব্য হিন্দু আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ গলদ ছিল বিপুল। এই আন্দোলনের বিপরীতে বাংলায় আরেক ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। তুরস্কে কামাল পাশার নেতৃত্বে তুর্কী জনগণের উপনিবেশ বিরোধী জাতীয় আন্দোলনের বিজয় বাংলার সেই আন্দোলনকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। এই আন্দোলন নিছক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছিল না, বরং ইহা ফ্রানৎস ফানোঁ বর্ণিত জাতীয় চেতনার অভ্যুদয় ঘটাইয়াছিল তুরস্কসহ ভারতবর্ষ তথা তৎকালীন বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের মধ্যে। আমরা সেই অপূর্ব মুহূর্তের কিছু দৃশ্য মুহম্মদ এনামুল হকের এই রচনায় খুঁজিয়া পাই। বর্তমানে আমরা দেখিতেছি কিছু মহল আবার খেলাফত আন্দোলনের সদৃশ ধর্মীয় রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনায় মাঠে নামিয়াছে। মুহম্মদ এনামুল হকের লেখায় আমরা বুঝিতে পারি এই গোষ্ঠীদের আন্দোলন শুধুমাত্র অনৈতিহাসিকই নয় বরং ইতিহাসবিরুদ্ধও বৈ কি

মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক

মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক

১৯২৩ সালের ২৯ শে অক্টোবর প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামালের নেতৃত্বে ‘তুরস্ক প্রজাতন্ত্র’ ঘোষিত হয় এবং আঙ্কারা তুরস্কের রাজধানী মনোনীত হয়। অচিরেই তাঁর জাতীয়তাবাদী শ্লোগান, ‘তুরস্ক তুর্কীদের’, জনসাধারণের মূলনীতি হয়ে দাঁড়ায়। তুর্কী জনসাধারণ আধুনিক অর্থে একটি জাতিতে পরিণত হয়।
পর বৎসর, ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ, মুসলমানদের সুপ্রাচীন ধর্মীয় রাজনৈতিক খিলাফৎ প্রতিষ্ঠানটির বিলোপ সাধন করে খলিফাকে পদচ্যুত ও নির্বাসিত করা হয়। ধর্মীয় বিষয় সংক্রান্ত পদটিও বাতিল করে দেওয়া হয়। ‘ওয়াকফ’ বা ধর্মীয় কাজে উৎসর্গিত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এগুলো ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা বিভাগের আওতাভুক্ত করে নেওয়া হয়।
তারপর যে সমস্ত ধর্মীয় বিচারালয়ে তখন পর্যন্ত শরীয়ৎ মোতাবেক বিচারকার্য চলছিল, তার বিলোপ সাধন করা হল। এই সিদ্ধান্তকে সাংস্কৃতিক সংস্কারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। মুসলমানেরা এ সব সংস্কারকে সহজভাবে গ্রহণ করে নিতে পারেনি এবং তার প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কুর্দীস্তানে বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। এই বিদ্রোহ দরবেশদের ধর্ম সম্প্রদায়ের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছিল। অবশ্য শীঘ্রই তা যথোপযুক্তভাবে দমন করা হয়।
কুর্দ বিদ্রোহের পর পরই সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্ব আরম্ভ হল। কর্মে ও চিন্তায় তুরস্ক প্রজাতন্ত্রকে একটি সম্পূর্ণ আধুনিক এবং সুসভ্য রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রবল ইচ্ছা এই সময় কামালকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। সুতরাং পীরের সমাধিগুলোকে সাধারণের উপাসনার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করে দিয়ে এবং দেশ থেকে তাবীজ লেখকদের বিতাড়িত করে এক সরকারী নির্দেশ জারী করা হল। পোশাক সম্বন্ধীয় সংস্কারের প্রথমে আসে যাদু এবং ভোজবাজী ব্যবসায়ীদের পরিধেয় পোশাকাদির উপর নিষেধাজ্ঞা জারী। প্রায় একই মঙ্গে প্রচলিত গোঁড়ামি ও প্রাচীনতার প্রতীকরূপী ফেজ টুপীর ব্যবহারও নিষিদ্ধ করে দেওয়া হল। এবং তার পরিবর্তে হ্যাট পরার রীতি প্রবর্তন করা হল।
তারপর ১৯২৬ সালে নূতন বেসামরিক আইন (পরারষ পড়ফব) জারী করা হল। প্রসঙ্গত, এই আইন ব্যবস্থাই তুরস্কের নারীদের মুক্তির পথ সুগম করে দেয়। এতে বহু বিবাহ প্রথা এবং স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার রীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং নারীকেও চাকুরি ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ১৯৩১ সালে তাঁদেরকে মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে ভোট দানের অধিকারও দেওয়া হল এবং ১৯৩৪ সালে তাঁরা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দানের অধিকারও লাভ করলেন।
১৯২৮ সালের ৩রা নভেম্বর তারিখে তুরস্কের আর একটি বিরাট সাংস্কৃতিক সংস্কার প্রবর্তিত হল। কামাল আরবী বর্ণমালার পরিবর্তে ল্যাটিন বর্ণমালার প্রচলন করলেন। এই সংস্কারের ফলে তুর্কী মানস অতীতের সাংস্কৃতিক বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করে। এইভাবে মুস্তফা কামাল তুরস্কে এক নতুন সাহিত্যের গোড়াপত্তন করেন। এই নবজাত সাহিত্যকে সর্বতোভাবে তুর্কী সাহিত্য বলা যেতে পারে।
তুর্কী ভাষাকে রোমানীকরণের পর পরই দু’টি প্রতিষ্ঠান সংস্থাপিত হয়। প্রথমটির নাম ‘তুরস্ক ইতিহাস পরিষৎ’; ইহা ১৯৩১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়টির নাম ‘তুরস্ক ভাষা পরিষৎ’ এবং এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩২ সালে। প্রথম প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রতœতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, মুদ্রাতত্ত্ব ইত্যাদি নানা বিষয়ক গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাস চর্চা এবং সত্যিকারভাবে তুর্কী জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা। দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য ছিল তুর্কী ভাষাকেও ফার্সী ভাষার প্রভাবমুক্ত করা।
যা কিছু সেমিটিক বা আরবীয় তার মূলোৎপাটন করার জন্য ১৯৩৪ সালে আর এক অভিযান শুরু করা হয়। ভাষা ও সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি এবং সরকারী কর্মচারীদের খেতাব ও পদবি থেকে সেমীয় প্রভাব দূরীভূত এবং তার পরিবর্তে তুর্কী শব্দের প্রচলন করা হয়। কামাল নিজেই তাঁর আরবী নাম ‘মুস্তফা’ এবং আরবী উপাধি পরিত্যাগ করেন এবং তার পরিবর্তে ‘আতাতুর্ক’, অর্থাৎ তুর্কী জাতির পিতা, এই নাম ধারণ করেন।
১৯৩৫ সালে আতাতুর্ক ইউরোপীয় রীতিনীতি ও আচার ব্যবহারের সাথে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টির প্রয়াস পান। সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে ‘বল’ নৃত্যের প্রচলন করা হয় এবং শুক্রবার মসজিদে সঙ্গীতধ্বনি শ্রুত হতে থাকে। সমগ্র দেশে ইউরোপীয় পঞ্জিকা অনুসরণ ক’রে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়। রবিবার ছুটির দিন ও শনিবার সপ্তাহের শেষের দিন বলে ধার্য করা হয়। ইতিপূর্বে তুরস্কবাসীদের কোন গোত্রগত নাম ছিল না। এখন থেকে বিশেষ নির্দেশ জারী করে তাদেরকে গোত্রগত নাম ঠিক করে নিতে বলা হল। ফলে, ইসমেত তার বিজিত স্থানটির নামানুসারে নিজের নাম রাখেন ‘ইউনোনু’, সেলাল রাখেন ‘বায়ার’, ফেতাহি রাখেন ‘ওকায়ার’, কামালের পালক কন্যা সাবিহা রাখেন ‘গোকসেন’ ইত্যাদি, ইত্যাদি। একই সঙ্গে ‘পাশা’, ‘আফন্দী’, ‘হানিম’ এই সমস্ত পুরাতন পদবি, যা তুরস্কবাসীদের নামে ব্যবহৃত হত, সে সবই সরকারী নির্দেশক্রমে তুলে দেওয়া হল এবং তার পরিবর্তে ‘বে’ এবং ‘বায়ান’ অর্থাৎ মিষ্টার, ও ‘মিসেস’, এই শব্দ দু’টি নামের পূর্বে ব্যবহারের প্রচলন করা হল।

আতাতুর্কের জীবনের শেষ তিন বৎসরে (১৯৩৬-১৯৩৮) দেখা যায় যে তিনি তাঁর প্রবর্তিত সাংস্কৃতিক সংস্কারগুলোকে স্বাভাবিক, দ্রুত এবং দৃঢ়ভাবে প্রসার লাভ করার সুযোগ দিয়েছিলেন যাতে করে এগুলি দেশে চিরস্থায়ী হতে পারে। তাঁর আশা বাস্তাবে রূপায়িত হয়েছে এবং ১৯২৩ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল, মাত্র এই ১৫ বৎসরের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সমগ্র তুরস্ক দেশে এক যুগান্তকারী মহাবিপ্লব এসেছে।

দুই
আধুনিক তুরস্ক সৃষ্টির মূল কথা কামাল নিম্নলিখিত ভাষায় বর্ণনা করেছিলেন:

পর্বতের ভৃগু দেশে অবস্থিত একটি জরাজীর্ণ দেশ; শত্রুর সাথে তার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ; বছরের পর বছর অস্তিত্ব রাখার সংগ্রাম; অতঃপর এক নতুন দেশ, এক নতুন সমাজ ব্যবস্থা, এক নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে গিয়ে অবিশ্রান্ত বিপ্লব ঘটিয়ে দেশে ও বিদেশে সম্মান অর্জন; সংক্ষেপে এটাই হল তুরস্কের সাধারণ বিপ্লবের রূপ।

তুরস্কের এই ‘সাধারণ বিপ্লবের’ সঙ্গে বিজড়িত ছিল তার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বিপ্লব। রাজনৈতিক বিপ্লব জন্ম দিয়েছে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের; এটি পূর্বপর্তী তুরস্ক সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই রাজনৈতিক বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব সাধিত হয়েছে তা তুরস্ককে পরিণত করেছে নতুন সমাজ ব্যবস্থা সম্বলিত এক নবীন জাতিতে।
শুধু বাঙ্গালী মুসলমানেরা কেন, গোটা পাক ভারত উপমহাদেশের মুসলমানরাও কোন দিন তুর্কীদেরকে বিদেশী বলে মনে করেনি; বরং একই ধর্ম বিশ্বাস এবং আচারানুষ্ঠান অনুসারী ভাই বলে মনে করেছে। নিজেদেরকে তুরান বা তুর্কীস্থান থেকে আগত বলে মনে করেন এমন অনেক বাঙ্গালী মুসলমানও তুর্কীদেরকে তাদের জ্ঞাতি বলে বিশ্বাস করেন।
সেই সময়ে বাঙ্গালী মুসলমান বিদেশীয় রাষ্ট্রের শাসন থেকেও তাদের তুর্কী ভাইদের আশা আকাক্সক্ষায় উদ্দীপ্ত হয়েছে এবং নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামে তুর্কী ভাইদের আর্থিক ও নৈতিক সমর্থনের স্বপ্ন দেখেছে। কাজেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন খৃষ্টান শক্তি বর্গের কুচক্রে তুর্কী জাতি ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে প্রায় লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল তখন তাদের দুঃখ এবং মনোপীড়ার অবধি ছিল না। কিন্তু, বিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদ শেষ হতে না হতেই যখন আতাতুর্কের নেতৃত্বে তুর্কী জাতির পুনর্জাগরণ সূচিত হল তখন অতি স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের আনন্দের সীমা রইল না। ১৯২২ খৃষ্টাব্দে স্মার্নায় গ্রীকদের বিরুদ্ধে আতাতুর্কের চূড়ান্ত বিজয় সংবাদের আনন্দ তারা তাদের প্রিয় সৈনিক কবি নজরুর ইসলামের কণ্ঠে শুনতে পেল:

ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুরপুরে শোর উঠেছে জোর-সে সামাল
সামাল তাই।
কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই

তিন
এখন কামাল আতাতুর্কের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিস্তৃতি ও বহির্বিশ্বে তার প্রতিক্রিয়ার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাক। তুরস্কে তিনি যে সংস্কার সাধন করেছেন, তা ছিল অত্যন্ত দুঃসাহসিক, মৌলিক এবং বৈপ্লবিক। কেবল মাত্র মুষ্টিমেয় লোকই তা সহানুভূতির সাথে গ্রহণ করতে পেরেছিল। বিশ্বের মুসলমানদের পুরাতনের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি এবং তার সাথে একটা ধর্মহানির একটা ভ্রান্ত ভীতি ছিল বলে তাদের মনে এই সমস্ত সংস্কার কঠিন আঘাত হানল। তাঁদের নিকট কামাল এবং তাঁর জাতীয়তাবাদী দলের এহেন কার্যকলাপ ধর্ম বিরুদ্ধ বলে মনে হলো। তাদের ধর্মানুভূতি জাগ্রত হওয়ার ফলে মুসলমানদের মনে তুর্কীদের এসব অধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভের সৃষ্টি হল। বিশেষ করে পাক-ভারত উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মনে কামালের এরূপ কার্যকলাপ অসন্তোষ মিশ্রিত এক বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টি করল, কারণ তারা এতদিন খৃষ্টান জগতের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে তাদের স্বধর্মী তুর্কী জনগণের সাফল্যকে খোদার দান হিসাবেই সাগ্রহে লক্ষ্য করে আসছিল। এই মনোভাবের প্রত্যক্ষ ফল হিসাবে আলী ভ্রতৃদ্বয়ের (মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকৎ আলী) নেতৃত্বে পরিচালিত ‘খিলাফত আন্দোলন’ নামে একটি প্রবল ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হয়েছিল। পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের মধ্যে একটা প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করাই এই আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল। বাংলা দেশে মওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০) ও মওলানা আকরাম খানের (জন্ম ১৮৭৭) নেতৃত্বে এই খিলাফত আন্দোলন পরিচালিত হয়। এরা উভয়েই লেখক এবং সাংবাদিক। কিন্তু মাত্র কয়েক বৎসরের মধ্যেই এ আন্দোলনের বেগ মন্দীভূত হয়ে এল কারণ আস্তে আস্তে মুসলামদের নিকট এ কথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে পার্থিব ক্ষমতাচ্যুত খলিফা খৃষ্টান জগতের পোপের নামান্তর বৈ আর কিছু নয়। এ অবস্থা মুসলমানদের মোটেই কাম্য ছিল না।
যখন পাক-ভারত উপ-মহাদেশীয় মুসলমানদের মনে এ ধারণার উন্মেষ ঘটল তখন বর্তমান পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা নগরীর বুকে ১৯২৬ সালের জানুয়ারীতে একজন প্রখ্যাত সাহিত্যচিন্তাবিদ জনাব কাজী আবদুল ওদুদ একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য পরিষদ’ নামক একটি সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কাজী সাহেব যে প্রবন্ধ পাঠ করে শুনিয়েছিলেন তার শিরোনাম ছিল ‘মুস্তফা কামাল সম্পর্কে কয়েকটি কথা’। এই প্রবন্ধে তিনি মুস্তফা কামালের ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। পাণ্ডিত্যপূর্ণ তথ্যের অবতারণা ক’রে লেখক মুস্তফা কামালকে সৃজনশীল দৃষ্টি ও অসাধারণ প্রজ্ঞাসম্পন্ন সংস্কারক হিসাবে অভিনন্দিত করেন। উপসংহারে লেখক আশা প্রকাশ করেন যে তাঁর দেশবাসী এখন সম্ভবত মুস্তফা কামালের হানা আঘাত ভুলে যেতে সমর্থ হবেন এবং নিজেদেরকে কর্মে প্রবৃত্ত করতে পারবেন। আমার বক্তব্য প্রমাণ করার জন্যে আমি নিম্নে লেখকের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি, যার থেকে এ কথা পরিষ্কার হয়ে যাবে যে মুস্তফা কামালের ধর্মীয় সংস্কার বাঙালী মুসলমানের সাহিত্যের প্রকৃতি ও আঙ্গিক গঠনের বেলায়ও এক বিরাট অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।
‘সত্যের আঘাত বড় প্রচণ্ড। মুসলমানের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন গতানুগতিকতাকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়ে, নব-সৃষ্টির প্রয়োজন ও সম্ভাবনা দেখিয়ে, মুসলমান-সমাজের বুকে কামাল যে সত্যকার আঘাত দিয়েছেন, আশা করা যায়, এই আঘাতেই আমাদের শতাব্দীর মোহ নিদ্রার অবসান হবে। ধর্মে, কর্মে, জাতীয়তায়, সাহিত্যে, — সমস্ত ব্যাপারেই আমাদের ভিতরে স্থান পেয়েছে যে জড়তা, দৃষ্টিহীনতা, মনে আশা জাগছে, যেমন করেই হোক, এইবার তার অবসান আসন্ন হয়ে এসেছে। কামালের প্রদত্ত এই আঘতের বেদনাতেই হয়তো আমরা উপলব্ধি করতে পারবো, — সত্যকার ধর্মজীবন কি, জীবনের সাথে শাস্ত্রের সত্যকার সম্বন্ধ কি। হয়তো আরও উপলব্ধি করতে পারবো জীবন সমাধান কোন কালেই হয়ে যায় নাই; নতুন করে সে সমস্ত বিষয়ে সচেতন হওয়া আর তার মীমাংসা করতে চেষ্টা করা, — এই-ই জীবন।
আর, এই বেদনাময়, আনন্দময়, উপলব্ধির বহুরঙ্গিমচ্ছটায় অনুরঞ্জিত হবে আমাদের যে আত্মপ্রকাশ চেষ্টা, তার থেকে উৎসারিত হবে আমাদের সত্যকার সাহিত্য।’

চার
এখন তুরস্কের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের উল্লেখ করা যেতে পারে যা তুরস্ক এবং বহির্বিশ্বের উপর বিরাট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। এটা হচ্ছে তুরস্কের জাতীয়তাবাদের অধ্যায়। একে নিঃসন্দেহে তুর্কীদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ বলে বর্ণনা করা যেতে পারে। তাঁদের এ ধরনের জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ বিপ্লবেরই ফলশ্রুতি, যার সূচনা কামালের হাতে হয়েছিল। তখন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে তুর্কীদের মনে একটা অস্পষ্ট, অবাস্তব ও কাল্পনিক ধারণা ছিল। ১৯২১ সালের ১লা ডিসেম্বরে মুস্তফা কামাল এক বক্তৃতা প্রসঙ্গে এই ভাষায় সে ভুল ধারণাটি ভেঙ্গে দেন:

সুধীবৃন্দ, আমরা মরীচিকার পশ্চাতে ছুটে বেড়াবার লোক নই এবং মুখোস ধারণ করাও আমাদের পেশা নয়। যে কাজ আমরা করতে অসমর্থ তা করবার ভান করে আমরা এতদিন কেবল বিশ্ববাসীর ঘৃণা এবং বিদ্রুপই কুঁড়িয়েছি। বরং যে সমস্ত পরিকল্পনা আমরা বাস্তবে রূপ দিতে পারিনি, এমন কি রূপ দেবার চেষ্টাও করিনি, তার পশ্চাতেই আমরা ছুটে বেড়িয়েছি। আসুন, আমরা এখন আমাদের স্বাভাবিক, যথাযথ সীমায় ফিরে যাই, আমাদের ক্ষমতার সীমা সম্বন্ধে সচেতন হই। সুধীবৃন্দ, আমরা কেবল একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বেঁচে থাকবার আকাক্সক্ষাই পোষণ করি এবং কেবল মাত্র তার জন্যেই আমরা আমাদের জীবন উৎসর্গ করতে পারি।

এর থেকে এখন পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, বর্তমান তুরস্ক নামে অভিহিত যে সীমিত এলাকায় তুর্কী জনগণের বসবাস সে ধরনের সীমানা ভিত্তিক জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা তুর্কীদের নিকট সম্পূর্ণ নতুন ছিল; এবং এ ধারণা এত নতুন যে তুর্কী ভাষায় ‘জাতীয়তাবাদ’ বা দেশ-অর্থবোধক ‘তুর্কীয়ে’ নামে কোন শব্দই ছিল না। কামাল কর্তৃক প্রবর্তিত প্রজাতন্ত্রেই ‘তুর্কীয়ে’ অর্থাৎ তুরস্কবাসীদের দেশ, এই ধারণাকে প্রজাসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলে। এইভাবে আধুনিক অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ কথাটি তুরস্কে প্রসার লাভ করে এবং পরবর্তী আমলে সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও অনুপ্রবেশ করে।
তখন থেকেই নূতন অর্থে ‘জাতীয়তাবাদ’ কথাটি তুরস্কবাসীদের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে এই বিরাট শক্তি হয়ে রয়েছে। জাতীয়তাবাদের অপূর্ব শক্তি তুরস্কেও সাংস্কৃতিক জীবনে এনে দিয়েছে আমূল পরিবর্তন, বদলে দিয়েছে তার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক আচারানুষ্ঠান, শিক্ষা-দীক্ষা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, শিল্প এবং ভাষা ও সাহিত্য।
তুর্কী জাতীয়তাবাদের প্রভাব বহির্বিশ্বে কি রূপ ধারণ করেছে সে প্রসঙ্গে আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, তা সাধারণভাবে পাক-ভারত উপমহাদেশের এবং বিশেষভাবে বাঙালী মুসলমানের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। সমগ্র উপমাহাদেশ তখন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের জাঁতাকালে নিষ্পেষিত হচ্ছিল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে সংগ্রাম করে যাচ্ছিল। আসন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের ন্যায্য দাবীদাওয়া আদায়ের জন্যে মুসলীম লীগও জোর আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। এ ছাড়া, স্বধর্মাবলম্বী তুরস্ক সাম্রাজ্যের জনগণের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে খিলাফত আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছিল। এই সব আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ তুর্কীদের জাতীয়তাবাদী বিপ্লব থেকে প্রবল অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন এবং নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ফলে এ উপ-মহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বতর হচ্ছিল।
পাক-ভারত উপমাহাদেরে রূপ পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে তদানীন্তন বাংলা দেশ বিশেষভাবে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল এবং সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা নিষ্ফল, এ ধারণা এই সব সন্ত্রাসবাদীদের মনে বদ্ধমূল ছিল বলে তারা সুযোগ সুবিধে মত ইংরেজ হত্যা অভিযান আরম্ভ করল। অস্ত্রাগার এবং অফিস আদালত আক্রান্ত এবং লুণ্ঠিত হতে লাগল, রেলগাড়ি ধ্বংস করে এই সমস্ত বিক্ষোভকারী রেল বিভাগের কর্মচারীদেরও জীবন বিপন্ন করে তুলল। আতাতুর্কের অনুগামী তুর্কীদের মত এই সমস্ত সন্ত্রাসবাদী ছেলেমেয়ে দেশের মুক্তিপণে হাসিমুখে প্রাণ উৎসর্গ করার সংকল্প নিয়েছিল। এদের মধ্যে সকলেই ছিল শিক্ষিত এবং প্রতিভাবান তরুণ। তারা বিশ্বের সমসাময়িক ঘটনাবলি, বিশেষ করে তুরস্কের ‘ ইয়ং টার্কস’ (ণড়ঁহম ঞঁৎশং)-দের কাছ থেকে উদ্দীপনা ও সাহস সঞ্চয় করেছিল।
আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রেও কামালের নেতৃত্বে সংঘটিত সাংস্কৃতিক বিপ্লব অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছিল। তুর্কী বিপ্লবের মত আর কোন বিপ্লবই আমাদেরকে এত প্রবলভাবে প্রভাবান্বিত করতে পারে নি। এ বিপ্লবের প্রভাব যে আমাদের সত্তার অণুতে পরমাণুতে প্রবেশ করেছিল তার প্রতিফলন আমরা আমাদের শিক্ষা, সমাজ এবং সাহিত্যের প্রতি স্তরে দেখতে পাই।
আতাতুর্ক শিক্ষা বিভাগের যে সংস্কার আনয়ন করেছিলেন আমাদের কাছে তা ছিল দূর দিগন্তে এক খণ্ড মেঘের মত। তবু তা আমাদের যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করেছিল এবং অন্তত ছায়ার মত তাকে অনুসরণ করার প্রেরণা দিয়েছিল। আতাতুর্কের নামানুসারে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে লাগল, অশিক্ষিত ব্যক্তিদের জন্যে নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন এবং অবৈতনিক স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা শিক্ষা প্রদান অত্যন্ত উৎসাহজনক ভাবে এগিয়ে যেতে লাগল। অর্থাভাবের দরুন এই ধরনের বিদ্যালয়ের বেশীর ভাগই অবশ্য দুই এক বৎসরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল, কারণ দরিদ্রতাহেতু বাঙালী মুসলমানেরা তাদের ব্যয়ভার বহনে অপারগ ছিল; তা ছাড়া ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাও এব্যাপারে তাদের প্রতি তেমন সহানুভূতিশীল ছিল না। তবু এদের মধ্যে পূর্ব-পাকিস্তানের নোয়াখালী জেলার ফেনীতে অবস্থিত ‘আতাতুর্ক হাই স্কুল’ এই সমস্ত বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে বর্তমানের মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে। ‘আতাতুর্ক জুনিয়র ময়মনসিংহ জেলার জামালপুরে কিছু দিন আগেও চালু ছিল।
বাঙালী মুসলমানদের নিকট তখনও স্ত্রী শিক্ষা প্রায় অজ্ঞাত ছিল। প্রদেশের মুসলমানদের তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নানা প্রকার কুসংস্কার প্রচলিত থাকার ফলে কেহ তাদের কন্যাসন্তানদের বিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার দুঃসাহস করতেন না। আমাদের দেশের মহিলা সম্প্রদায় তখন পর্দাপ্রথা পালন করে বোরকা ব্যবহার করতেন। প্রধানত এই সকল সামাজিক বাধার জন্যেই আমাদের দেশের মহিলা সম্প্রদায় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে নি। কিন্তু যখন তুরস্কের এক সরকারী নির্দেশক্রমে মহিলা সম্প্রদায়ের সকল প্রকার সামাজিক অসামর্থ্য তুলে দিয়ে তাদেরকে মুক্তি দেওয়া হল, তখন বাঙালী মুসলমান মহিলাদেরও দৃষ্টি খুলে গেল। রংপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারের পর্দানশীন মহিলা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) নারীদের মুক্তির জন্যে প্রকাশ্যভাবে পর্দার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন। ‘অসির চেয়ে লেখনি শক্তিশালী’ ইসলামের এই মূলনীতি অবলম্বন করে তিনি একাদিক্রমে বাংলায় কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেন। পরবর্তী কালে এই সব বিষয়বস্তুর উপর ভিত্তি করে যথাক্রমে তাঁর ‘অবরোধবাসিনী’, ‘মতিচুর’ এবং ‘পদ্মরাগ’ এই তিনটি পুস্তক প্রকাশিত হয়। তদানীন্তন বাংলার রাজধানী কলিকাতায় তিনি একটি মহিলা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। মুসলিম নারী সমাজের মুক্তির অগ্রদূতী এবং নারী শিক্ষার একজন প্রধান সেবিকা হিসাবে তাঁকে বেশ কিছুকাল প্রবল বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু তুরস্কে ব্যাপক সমাজ সংস্কারের ফলে ‘পর্দা’ এবং ‘বোরকা’র মত এই সামাজিক বাধাগুলো বহুলাংশে শিথিল হয়ে পড়ল এবং বাংলার মুসলিম মহিলাদের জন্যে স্কুল কলেজের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল। শীঘ্রই বেগম এম, রহমান, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ (১৯০৯-১৯৬৪) এবং বেগম সুফিয়া কামাল (জন্ম ১৯১১) প্রমুখ সমাজ সেবিকাবৃন্দ বেগম রোকেয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে এগিয়ে এলেন। প্রথমোক্ত মহিলাদ্বয় সুবিখ্যাত সমাজ সেবিকা ছিলেন এবং বেগম সুফিয়া কামাল এখন বাঙলার অন্যতম প্রসিদ্ধ কবি।
আরবী বর্ণমালার স্থলে রোমান বর্ণমালার প্রবর্তন সম্ভবত তুরস্কের শিক্ষা বিভাগের সর্বাপেক্ষা বৈপ্লবিক সংস্কার। এর একটা আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল এবং গোটা সভ্য জগৎ এর কার্যকরিতা অতি কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ্য করেছিল। তখন বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনে বিক্ষুব্ধ এই উপ-মহাদেশের রাজনৈতিক ঐক্যবিধানে যে সমস্যা বাধাস্বরূপ হয়ে দেখা দিয়েছিল চিন্তানায়ক ও নেতৃবৃন্দ তার সমাধান খুঁজতে সচেষ্ট ছিলেন। বর্ণমালা সংস্কারে তুর্কীদের সাফল্য লক্ষ্য করে পাক-ভারত উপমহাদেশের পণ্ডিতদের মনেও এই পন্থা অবলম্বন করার উৎসাহ জাগল। ভারতের প্রধান ভাষাতাত্ত্বিকদের অন্যতম ড: সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় (জন্ম ১৮৯০) পাক-ভারতীয় বর্ণমালার রোমানিকরণকে ভারতের জাতীয় অনৈক্যের অন্যতম সমাধান হিসেবে গ্রহণ করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কয়েকজন সভ্য সেই সময় তুরস্ক সফর করেন। তাঁরাও সুনীতি কুমারের এই পরামর্শের প্রতি সমর্থন জানালেন। বাঙালী বৈজ্ঞানিকদের অন্যতম ড: মুহমমদ কুদরত-ই-খুদা (জন্ম ১৮৯৮) পাক-ভারতীয় বর্ণমালার রোমানীকরণ পরামর্শটিকে সমর্থন করেছিলেন। ভাষা সংস্কারের এই প্রচেষ্টার ফল কি দাঁড়াত তা নিয়ে আজ আর মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। তবে, সে যুগে চিন্তাধারার গতি কোন দিকে ছিল, এর থেকে তা জানা যায়।
তুরস্কের সামাজিক সংস্কারের প্রভাব বাংলা দেশের মুসলিম সমাজের উপরই সর্বাপেক্ষা বেশী পড়েছিল। মুসলমানেরা তাঁদের মধ্যে কামালের মত একজন বীর নায়কের আবির্ভাবের প্রতীক্ষা করছিলেন যিনি ইংরেজ ও ইংরেজ সাহায্য পুষ্ট হিন্দু শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্তি দেবেন। সেই সময় যে সব ছেলেমেয়ের জন্ম হয়েছে তাদের নামকরণের মধ্যে আমাদের এই ঐকান্তিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়। কেননা শীঘ্রই আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের নাম তুরস্কের বীর ও বীরাঙ্গনাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখার প্রথা অনুসরণ করতে শুরু করলাম। বর্তমান ঢাকা হাই কোর্টের একজন তরুণী পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী বেগম খালিদা খানুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ অধ্যাপক আনোয়ার পাশা এবং প্রদেশের আরো অনেকের নামে এ কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে।
বাংলায় ‘তুর্কী টুপী’ নামে পরিচিত ‘ফেজ’ তখন আভিজাত্যের ও পবিত্রতার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হত। সাধারণত: জুমার নামাজে, ঈদের দিনে অথবা মিলাদ অনুষ্ঠানে এই ‘ফেজ’ টুপীর ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করা হল। তখন আমাদের দেশেও ‘ফেজ’ টুপীর ব্যবহার প্রায় উঠে গেল। তখন জনসাধারণ কিছু দিন ‘কামালী টুপীর’ ব্যবহার করতে লাগল এবং এ ধরনের টুপী বিশেষ অনুষ্ঠানাদিতে পরিধান করার রীতি দাঁড়িয়ে গেল। ১৯২৪ সালে কামাল যে টুপী পরিধান করেছিলেন তার সাথে সাদৃশ্য রেখে এই টুপী প্রস্তুত করা হত। অবশ্য এই ধরনের টুপীর ব্যবহার আমাদের দেশে তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

পাঁচ
সাহিত্য, বিশেষ করে যে সমস্ত সাহিত্য চলতি শতাব্দীর বিশ থেকে ত্রিশ দশকে রচিত হয়েছে, সে প্রসঙ্গে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, এ সাহিত্য প্রধানত তুরস্কের সাংস্কৃতিক বিপ্লব থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছে। বলা বাহুল্য যে এই সবের সাথে সাথে ক্রুশেডের প্রখ্যাত বীর গাজী সালাহ উদ্দীনের ন্যায় আতাতুর্ক সম্বন্ধেও বাঙালী মুসলমানের মনে একটা মহৎ ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। মুসলমানদের জাতীয়তাবাদ, ইসলামবাদ ও যা কিছু তাদের কাম্য আতাতুর্ক তার একটা জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কিভাবে আতাতুর্কের ব্যক্তিত্ব আমাদের সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে কবি আবদুল কাদিরের (জন্ম ১৯০৬) একটি সুন্দর কবিতায় তার প্রকাশ ঘটেছে।

গাজী মুস্তফা কামাল পাশা,
তুমি নির্জিত জাতীর আশা
ঝলে সংগ্রামে তোমার অসি,
যত ভয়-মোহ পড়ুন খসি।
পুনঃ ইসলামী আগুন জ্বালো,
হবে এই ধরা উজল আলো।

মুসলমানদেরকে হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য ১৯১২ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ নামে যে প্রতিষ্ঠান গঠন করা তা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নাই। যখন বিভ্রান্ত মুসলমানেরা কোন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিল না ঠিক সেই সময়ে তদানীন্তন বাংলার দ্বিতীয় রাজধানী ঢাকা নগরীতে কয়েকজন প্রবীণ মুসলমান সাহিত্যিকের একটি দল ‘রেনেসাঁ সমিতি’ নামে একটি সমিতি গঠন করেন। আনোয়ারুল কাদির (১৮৮৯-১৯৫০), কাজী আবদুল ওদুদ (জন্ম ১৮৯৪), কাজী মোতাহার হোসেন (জন্ম ১৮৯৭) প্রমূখ ব্যক্তিবৃন্দ ছাড়া আরও অনেকে এ সমিতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন। অবশ্য তাঁদের সাহিত্যিক তৎপরতা কেবল মাত্র চিন্তার ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল, তবু তাঁরা সাহিত্যের মাধ্যমে তাঁদের অন্ধকারে আচ্ছন্ন স্বজাতির মানসিক জড়তা ও কুসংস্কারে আঘাত করে তাদের মোহনিদ্রা ভাঙাতে চেয়েছিলেন।
ঠিক এই সময়ে সৈনিক কবি কাজী নজরুল ইসলামের (জন্ম ১৮৯৯) নেতৃত্বে অপর একদল তরুণ সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটে। স্বদেশপ্রীতির এক নতুন জীবনাদর্শে এঁরা ছিলেন বিভোর। সমসাময়িক অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা দলের সঙ্গে এঁদের বিশেষ কোন সম্পর্ক ছিলনা। তাঁদের এই আদর্শবাদকে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ বলা যেতে পারে যার প্রকাশ হল সাহিত্যে। এবং এই আদর্শের জন্যে সর্বপ্রকার ত্যাগ, এমনকি জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে তাঁরা প্রস্তুত ছিলেন। ১৯২৪ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বিদ্রোহীর বাণী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই এই আদর্শবাদের ব্যখ্যা করেছেন:

যেথায় মিথ্যা ভণ্ডামি ভাই করব সেথাই বিদ্রোহ!
ধামাধরা! জামাধরা! মরণ ভীতু! চুপ রহো!
এই দুলালুম বিজয়-নিশান, মরতে আছি, –মরব শেষ।
নরম গরম পচে গেছে,আমরা নবীন চরম দল!
ডুবেছি না ডুবতে আছি,স্বর্গ কিংবা পাতাল তল!

নজরুল ইসলামের যুগ-বাণীর এটাই ছিল সারাংশ। প্রখ্যাত কবি ও সমালোচক আবদুল কাদির ‘নজরুল রচনাবলীর’ প্রথম খণ্ডে ভূমিকায় নিম্নলিখিত ভাষায় নজরুল ইসলামের আদর্শবাদ বিশ্লেষণ করেছেন:

নজরুলের দেশাত্ববোধের স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা নানা জনে নানা ভাবে করেছেন। রাজনীতিক পরাধীনতা ও অর্থনীতিক পরবশতা থেকে তিনি দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গীণ মুক্তি চেয়েছিলেন; তার পথও তিনি নির্দেশ করেছিলেন। সেদিনের তাঁর সেই পথকে কেউ ভেবেছেন সন্ত্রাসবাদ, — কারণ তিনি ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের উদাহরণ দিয়ে তরুণদের অগ্নিমন্ত্রে আহ্বান করেছিলেন; কেউ ভেবেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নিয়মতান্ত্রিকতা — কারণ তিনি ‘চিত্তনামা’ লিখেছিলেন; কেউ ভেবেছেন প্যান-ইসলামিজম কারণ তিনি আনোয়ার পাশার প্রশস্তি গেয়েছিলেন; আবার কেউ ভেবেছেন মহাত্মা গান্ধীর চরকা-তত্ত্ব কারণ তিনি গান্ধীজীকে তাঁর রচিত চরকার গান শুনিয়ে আনন্দ দিয়েছিলেন। কিন্তু, একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে, এ-সব ভাবনার কোনটাই সত্যের সম্পূর্ণ স্বরূপ উদঘাটনের সহায় নয়।
প্রকৃতপক্ষে নজরুল তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রথম যুগে ছিলেন কামালপন্থী, — কামাল আতাতুর্কের সুশৃঙ্খল সংগ্রামের পথই তিনি ভেবেছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য সর্বাপেক্ষা সমীচীন পথ। ১৩২৯ সালের ৩০ শে আশ্বিন তারিখের ১ম বর্ষের ১৪শ সংখ্যক ধূমকেতুতে তিনি ‘কামাল’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, — ‘সত্য মুসলমান কামাল বুঝেছিল যে ‘খিলাফত উদ্ধার ও দেশ উদ্ধার করতে হলে ‘হায়দরী হাঁক হাঁকা চাই’… ‘ওসব ভণ্ডামি দিয়ে ইসলাম উদ্ধার হবে না।’ …‘ইসলামের বিশেষত্ব তলোয়ার’। কামাল আতাতুর্কের প্রবল দেশপ্রেম, মুক্ত বিচার-বুদ্ধির ও উদার মানবিকতা নজরুলের এই যুগের রচনায় প্রভূত প্রেরণা যুগিয়েছিল।

মানবিকতায় নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী, বিশ্বাসে মুসলমান, প্রকাশ ভঙ্গিতে প্রচলিত নিয়ম বিরুদ্ধ, লিখন ভঙ্গিতে সম্পূর্ণ নতুন এবং সর্বোপরি পৃথিবীর সর্বহারাদের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম সহানুভূতি। অচিরেই আদর্শবাদী তরুণ সমাজ সে যুগের সাহিত্যের গতানুগতিক ভাবধারা পালটে দেওয়ার জন্যে নজরুল ইসলামের চতুষ্পার্শে এসে জড় হলেন। এঁদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদী কবি বেনজির আহম্মদ (জন্ম ১৯০৩), কবি মহিউদ্দিন (জন্ম ১৯০৬) প্রমুখ ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এঁরা আদর্শের জন্যে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের হাতে অকথ্য লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন। ফররুখ আহমদ নামে অপর একজন কবি মোসলমান আদর্শবাদে বিশ্বাসী তাঁর গুরু নজরুল ইসলামের প্রতি এখনও সশ্রদ্ধ রয়েছেন।
মোট কথা, মুসলিম বাংলা সাহিত্যের সম্পূর্ণ পরিধি — কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী  ইত্যাদির বিভিন্ন শাখা, একই সঙ্গে এমন এক জাতীয়তাবোধে প্রবুদ্ধ হয়েছিল যাতে বাঙালি মুসলমান তাদের  নিজেদের বলে গৌরব বোধ করতে পারে। অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার পাশা’ নাটক রচনা করেন তুরস্কের এই দুই বীর সেনানীর কৃতিত্ব ও আদর্শের ভূয়সী প্রশংসা করে। অধ্যাপক আবুল ফজল তাঁর উপন্যাস ‘চৌচির’ ও আরো কয়েকটি ছোট গল্পে এই প্রদেশের মুসলিম সমাজ জীবনের অন্যায় অবিচারগুলো ফুটিয়ে  তোলেন। ড. গোলাম মকসুদ হিলালী হালীদে এদিব হানুমের জীবনচরিত রচনা করেন। এছাড়া  আরও অনেকে কামাল আতাতুর্কের জীবনচরিত রচনা করেন। তুর্কিদের নিকট থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনুপ্রেরণা লাভের জন্যে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অবস্থার সাথে তুলনা করলে তুরস্কের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিভিন্ন দিকের উপরও অসংখ্য প্রবন্ধ রচিত হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে আতাতুর্কের মৃত্যু সংবাদে বাঙালি মুসলমান শোকে মুহ্যমান হয়ে পরে। বাড়িতে, রাস্তাঘাটে এবং শোকসভায় জনগণকে, বিশেষ করে যুবক সম্প্রদায়কে ফুঁপিয়ে কাঁদতেও দেখা গেয়েছিল। আতাতুর্কের জীবনী ও তাঁর বিভিন্নমুখী সংস্কারমূলক কার্যাবলির উপর ভিত্তি করে অনেক সাময়িক পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছিল। যারা তাঁর উপর শোকগাথা লিখেছিলেন তাদের মধ্যে কবি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯০-১৯৫৩), বেগম সুফিয়া কামাল, কবি তালিম হোসেন ও দিলীপ দাস গুপ্তের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

উৎস: মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, মনসুর মুসা সম্পাদিত, ৫ম খণ্ড, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭

মিথের নারী- তানিয়া সুলতানা

মিথের নারী
তানিয়া সুলতানা

ছোটবেলায় নানান গল্পে আমরা এক খামখেয়ালি রাজাকে পেয়েছি যে উদ্ভট সব চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে পুরস্কার ঘোষণা করত অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা। আর যে রাজকন্যাকে পাবার আশায় এত কাণ্ড ঘটে যেত গল্পে তার উপস্থিতি থাকত ‘অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ ধরনের বাণীর মধ্য দিয়ে। এখানে পরীক্ষাদাতা এবং গ্রহীতা কারও মনে ঘুণাক্ষরেও এ প্রশ্নটি হাজির হয়নি, এই সম্পর্ক স্থাপনে রাজকন্যা রাজি তো! হাজির হয়নি, তার কারণ খামখেয়ালি পিতার কাছে সে তো কোন সত্তা নয়, তার রাজত্বের মতই বস্তুগত সম্পদ মাত্র। বড়জোর দামি বস্তু। ভদ্রভাষায় রাজকন্যা রাজার কাছে সম্পদ। সত্যিকারের কামিয়াবের শ্রেষ্ঠ উপহার।
এই লেখায় মূল আলোচ্য অবশ্য রূপকথা নয় বরং মিথ। আলোচনার ক্ষেত্র দুইটি নারী চরিত্র, যারা অপরূপা হিসেবে নয়, বরং বর্ণিত হয়েছে কুরূপা বলে আর ধিকৃত হয়েছে প্রেমের দায়ে। এদের সাথে রূপকথার রাজকন্যাদের তেমন মিল নেই বললেই চলে।
মহাভারত এবং রামায়ণ পড়ার সময় আমার কেবলই মনে হয়েছে হাজারো চরিত্রের ভীড়ে কিছু নারী চরিত্র যেন ঠিক প্রস্ফুটিত হয়নি। রাক্ষুসি হিড়িম্বী আর শূর্পনখা এমনি দুই নারী। শেষ পাঁপড়িটি মেলে ধরার আগেই হাজারো কাহিনী-কথার ভীড়ে অগোচরে চলে যায় তারা। আতশ কাঁচে চোখ রাখার দরকার নেই, একটু ভাবুন, রামায়ণে ভগিণী শূর্পনখা না থাকলে কি সম্ভব হত রাবণবধ? আর করুক্ষেত্রকে ভাবুন দেখি একবার, হিড়িম্ব^াপুত্র ঘটোৎকচহীন!
এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তাদের উপস্থাপন এত কম কেন? এ শতভাগই হক প্রশ্ন তা আমি বলি না, তবে করলেই বা কি ক্ষতি? এর কারণ কি ক্ষমতার খেলা? নশ্বর এই পৃথিবীতে ক্ষমতা আদি এবং অবিনশ্বর। রাজসভার চিত্রশিল্পীর তুলিতে রাজার কদর্য রূপ কবে ফুটে উঠেছে? মহৎ কাব্য লিখিয়েরা তাদের কালিতে যুগ যুগ ধরে সন্তুষ্ট করে আসছে রাজাধিরাজদের। ক্ষমতার এই খেলায় এই দুজন যুগ যুগ ধরে অধঃস্তন — তাই কুরূপা।
মহাভারত এবং রামায়ণের দুই নিগৃহীত নারী শূর্পনখা এবং হিড়িম্বীর গ্রহণযোগ্যতাকে যুগ যুগ ধরে পুরোপুরি নষ্ট করেছে ক্ষমতাবানরা। তারা শাস্ত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। লুই আলথুসার ক্ষমতাবানদের সম্পর্কে এ কথা বলেছেন বহু আগেই। ধর্ম, মন্দির, পরিবার, গণমাধ্যম, শাস্ত্র, সবকিছুই ক্ষমতাবানদের দখলে। এর মাধ্যমে ক্ষমতাবানরা কিছু ছাঁচ তৈরি করে। এ ছাঁচে ফেলে পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে এরা।
হিড়িম্বী এবং শূর্পনখাকে পাঠ করা কেন জরুরি সে প্রশ্ন উঠতে পারে। এর উত্তর সোজা সাপ্টা — এই দুই চরিত্র দিয়ে আমাদের স্খলিত (কিংবা দলিত) নারীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে ঠিক যেভাবে সীতা আর দ্রোপদীরা হয়েছে আদর্শ নারীর উদাহরণ। তারা আদর্শ হলে স্বাভাবিকভাবেই হিড়িম্বী এবং শূর্পনখা হবেন ‘অন-আদর্শ’ বা অনাদর্শ। এখানে ‘অনাদর্শ’ শব্দটিকে আদর্শ মানার কারণ একটিই — আমরা দেখব যা সীতা তা আসলে শূর্পনখা নয় বরং ঠিক উল্টো আর দ্রোপদীর ঠিক বিপরীত হিড়িম্বী।
এদের সাথে ‘নায়িকা’র মিল নেই ঠিকই কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ‘নায়কোচিত’ ইশারা ছিল। কিন্তু এই ইশারা কবুল হয়নি। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা নারীর এই সম্ভাবনাময় চারিত্রিক গুণকে স্বীকৃতি না দিয়ে তাকে রাক্ষুসী বানিয়ে মনুষ্য সমাজ থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছে। কেবল তাই নয় তাকে পরাজিত করেছে — জ্ঞাতি, কুল সহকারে।  দ্রোপদী বা সীতাকে দিয়ে নারীর যে প্রেমিকা রূপ এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তাদের সাথে এদের মিল নেই যতটা আছে পুরুষের সাথে। দ্রোপদী আর সীতা এক কথায় বিজয়ীর জন্য তৈরি অমূল্য এক একটি মেডেল বা পরম আরাধ্য পুরস্কার। এই অমূল্য চিজ শেষ পর্যন্ত তাদের পিতা এক প্রতিযোগিতার  মাধ্যমে তার গলাতেই পরিয়ে দেন যিনি একে রক্ষা করতে পারেন। বাল্যে পিতা, যৌবনে ভর্তা, বার্ধক্যে পুত্রের অধীন — এমন পুতুলরূপেই নারীকে দেখানো হয় সতী নারীর এক উদাহরণ হিসেবে। এই সতীত্বে তার নিজস্বতা কতটুকু? সে প্রায় অপরিচিত এক লোকের গলায় মেডেল হয়ে ঝুলে পড়ে এবং তাকে বাস্তবিকই এক বস্তুর মত দেখা হয়। … তার শ্বাশুরি বলে সবাই মিলে ভাগ করে নে এবং সব ভাইয়ের এত সুসম্পর্ক যে বিবাদ এড়াতে সবাই ভাগে ভাগে ভোগ করে দ্রোপদীকে। বহু স্বামীর মাধ্যমে বহুগামিতায় দ্রৌপদীর মতামত কি ছিল তা জানা যায় না। বরং গুরুত্ব পায় দ্রৌপদী-অর্জনকারী অর্জুন তাতে রাজি কিনা সেই বিষয়টি। সতীত্বের ডিসকোর্স যে কতটা হাস্যকর হতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল দ্রোপদীর ‘বস্ত্রহরণ পর্ব’। এ পর্বের বর্ণনা দিয়েছেন প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ‘অচরিতার্থ দ্রোপদী’ প্রবন্ধে:

অপমান যারা করল তারা দস্যু নয়, রাক্ষস নয় — আপন জন। স্বামীদের জ্ঞাতিভ্রাতা। সভায় যারা বসেছিলেন তারাও  তাঁর পরিচিত। বিজ্ঞজনেরা ছিলেন। কন্যা ও পুত্রবধূদের যারা রক্ষক। ছিলেন দার্শনিক ভীষ্ম। ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় দ্রোণ। ছিলেন জ্ঞানী বিদুর। ছিলেন বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্র, সম্পর্কে যিনি দ্রৌপদীর শ্বশুর। ছিল দ্রোপদীর পাঁচ স্বামী। দ্রৌপদী বিখ্যাত তাঁর চুলের জন্য; সেই চুল ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসা হয়েছিল তাঁকে, পাশাখেলার আড্ডায়।… যুধিষ্ঠির  যতোই ধর্মপুত্র হোন, ঐ মুহূর্তে সামান্য জুয়াড়ী। তিনি পণ ধরেছিলেন দ্রোপদীকে। হেরে গেছেন তাই দ্রোপদী এখন দাসী।… কর্ণ বলেছে, কই, স্ত্রী তো দেখি না, তুমি তো একজন বেশ্যা, একসঙ্গে পাঁচ স্বামীর ঘর করো।

স্ত্রী যে স্বামীর জন্য মেডেল মাত্র এবং সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা
যে সুন্দরী স্ত্রী অর্জন তার আরেক নজির রাম। প্রতিযোগিতায় বীরত্ব প্রদর্শনের পুরস্কার হিসেবে সীতাকে অর্জন করেন রাম। দামি মেডেলের মতই তাই সীতার খাতির-যতœ। এই সতীত্বের কচকচানি আমরা রামায়ণে পাই। সতীত্ব সতীত্ব করতে করতে একসময় আমরা রামায়ণ থেকে সীতাকে হারিয়ে ফেলি।
‘… এর পরে সীতা যা শুনলেন তার জন্য সীতার প্রস্তুত থাকবার কথা নয়। শুনলেন স্বামী বলছেন, এই যুদ্ধ তোমার জন্য করা হয়নি। যুদ্ধ করেছি নিজের চরিত্র রক্ষা, অপবাদখণ্ডন এবং বংশগৌরব অক্ষণœ রাখার স্বার্থে।’ প্রত্যাখ্যানের অমন নিষ্ঠুর কথা রাম কেন বললেন, সীতাকে? যে সীতার জন্য থেকে থেকে বিলাপ করেছেন, যাকে না পেলে বাঁচবেন না বলে আর্তধ্বনি করেছেন, বহু কষ্টে তাঁকে পাবার পর এ কেমন আচরণ? কি এর কারণ? রাম বলেছেন, এর কারণ হচ্ছে লোকভয়। পাছে লোকে তাঁকে কামুক বলে তাই তিনি দ্বিধা করেছেন। কিন্তু লোকভয় একমাত্র ভয় ছিল না। অন্য ভয়ও ছিল। ভয় ছিল নিজের ভেতরেও; নিজেই তিনি আস্থা রাখতে পারছিলেন না সীতার লোক জিজ্ঞাসিত সতীত্বে।
আগেই বলেছি, শূর্পনখা এবং হিড়িম্বীর সাথে আমরা মিল খুঁজে পাই বরং নায়কদের সাথে। তারা বদ্ধ খাঁচায় বন্দি নয় বরং বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। ভীম এবং তার সহোদরদের প্রাণ রক্ষা করে হিড়িম্বী। ভীমের শারীরিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রস্তাব দেয় হিড়িম্বী। ভীম প্রথমে রাজিই হচ্ছিল না, শেষে মায়ের আদেশে দায়সারা গোছের বিয়ে করে।
মহাভারতের এই কুরূপার সাথে বিয়ের কিছুক্ষণ পরই তাকে ছেড়ে চলে যায় ভীম। এরপর থেকে হিড়িম্বী একা তাঁদের সন্তান ঘটোৎকচকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করে গড়ে তোলেন। ঘটোৎকচই কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধে চোখ ধাঁধানো রণকৌশল দেখান।
শূর্পনখাকেও অমরা বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে দেখি, এমনি এক সময়ে তিনি কুটিরনিবাসী রামের প্রেমে পড়েন কিন্তু রাম তার সাথে ব্যঙ্গ বিদ্রƒপে মগ্ন হন। বিয়ের প্রস্তাব যেন দিতে পারে কেবল পুরুষেরাই। যে নারী এর অন্যথা ঘটায় সে লজ্জাহীন। এমন লজ্জাহীন নারীর মাথা না কেটে নাক কেটে প্রতিশোধ নেয় লক্ষণ। আর এমন সব নারীকে কুরূপা আখ্যা দিয়ে রাক্ষুসী বা খল রূপ দেওয়া হয়েছে। তাদের রূপের যে বর্ণনা দেওয়া হয় তার সাথে আমাদের ধ্রুপদী নায়িকাদের দেহসৌষ্ঠবের কোন মিলই নেই। বরং উল্টো চিত্রই স্থাপিত হয়েছে।
সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা কাঠামোর উপর নির্ভর করে কে হবে নায়িকা আর কে চিত্রিত হবে রাক্ষুসী হিসেবে। পূজা দাস সরকার তাঁর ‘সিনেমা এন্ড সেক্সুয়ালিটি: অন দ্য ডেথ অব দ্য ডিসায়ারিং উম্যান’ প্রবন্ধে বলেন, যে নারীরা নিজেদের আকাক্সক্ষাকে প্রকাশ করে তারাই যতসব কূট চরিত্রে চিত্রিত হয় এবং সমাজের মূলধারা থেকে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার প্রচেষ্টা দেখা যায়। আর এই নায়িকা এবং রাক্ষুসী হওয়াটা নির্ভর করে কার শারীরিক সৌন্দর্যের উপর। শক্তি এখানে গৌণ মাত্র নয়, বরং নেতিবাচক গুণ হিসেবে আখ্যা পায়। চিত্রাঙ্গদা কাব্যেও আমরা দেখি সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে চিত্রাঙ্গদাকে তার নায়কোচিত ভূমিকা ত্যাগ করে ধারণ করতে হয় এক ‘নারীসুলভ’ কোমলতা এবং সৌন্দর্যকে। বিষয়গুলো কেবল মিথেই বাস্তবতা তৈরি করে যে তা নয়। মধ্যযুগে আমরা দেখেছি হাজার হাজার পণ্ডিত নারীর জ্ঞানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদের ডাইনী উপাধি দিয়ে পোড়ানো হয়। পোড়ানো হয় দেশপ্রেমিক জোয়ান অব আর্ককে।
নারী যতবারই তার কণ্ঠ উঁচুতে তুলে ধরেছে ততবারই তাকে বাকরুদ্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। ‘রিকাস্টিং উইম্যান’ গ্রন্থে দেখা যায় আধুনিক যুগে ‘আধুনিক’ বাঙালি বাবুরা তাদের স্ত্রীদেরকে অন্তজ শ্রেণির নারীদের সাথে মিশতে দিতেন না। কেননা তারা যেসব গান বাধত তাতে পুরুষশাসিত সমাজে নারীর দুঃখগাঁথা ফুটে উঠত। তাদের দরদি কণ্ঠগীতের মরমে মরমে ফুটে উঠত স্বামী শিবের উদাসীনতায় স্ত্রী পার্বতীর দুঃখের কথা। আধুনিক বাবুরা কেবল স্ত্রী-বোনদের সাথে তাদের মিশতে বারণই করেনি বরং এই সংস্কৃতিকে অশ্লীলতার আখ্যা দিয়ে তাকে বিলুপ্তির পথে নিয়ে যায়।
আজ এতদিন পর এসে আমাদের সামনে তারই আরেক রূপ দেখি। নারীরা কেন শাহবাগে — এই প্রশ্ন চলে এসেছে সবার সামনে। নারীর কণ্ঠকে তথাকথিত প্রগতিশীল প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। ধর্ম নিয়ে যারা অপপ্রচার চালাচ্ছেন তারা বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়েছেন ঠিকই কিন্তু তাদের দফাগুলোর অন্যতম নারীর ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান। নারী যে ধীরে ধীরে সাবজেক্ট হয়ে উঠছে তা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কেন সহ্য করবে?

শাহবাগনামা ১- সরদার

শাহবাগনামা ১
সরদার

ইহা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কর্তৃক রচিত হইতে পারে না। ইহা এমন এক আশ্চর্য জিনিশ দ্বারা তৈরি যাহা জনগণের অন্তরের অন্তঃস্থল হইতে উত্থিত। হে তথাকথিত রাজনৈতিক খোয়াড়ের সদস্যরা তোমাদিগের সাধ্য থাকিলে এমন একটা আন্দোলন রচনা কর, যাহাতে তোমাদিগের শত্রু পর্যন্ত বিস্মিত হইয়া যায়! নিশ্চয়ই তাহারা নব প্রজন্মের অভিনব দেশপ্রেম দেখিয়া ভয়ে দিগি¦দিক বাঁচিবার পথ খুঁজিয়া মরে, এবং অবশেষে সাধারণ জনগণকে পথভ্রষ্ট করিয়া লয় নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করিবার উদ্দেশ্যে। তাহারাই তো চরম অবমাননাকারী। সীমালঙ্ঘনকারী। এবং তাহাদিগের জন্য রহিয়াছে প্রত্যেকটি বিবেকের ভৎর্সনা, যাহা তাহাদিগের খড়কুটার মত ভাসাইয়া দিবে মহাকালের খেয়ায়।
ইহা তো তোমাদিগের নিকট অজানা নহে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর, যাহা তরুণদের বুকচেরা ক্ষোভ হইতে যাত্রা শুরু করিয়াছিল তাহা, আজ তোমাদিগের মধ্যে নানাবিধ বাগবিতণ্ডার উৎস হইয়া উঠিয়াছে। যাহারা শাহবাগকে লইয়া এরূপ বির্তকের জন্ম দিয়াছে তরুণ প্রজন্ম নিশ্চয় তাহাদিগের সম্পর্কে সম্যক অবগত। সুবোধ তো তাহারাই যাহারা এখনো স্বপ্ন দেখিতেছে নব কিরণের। তাহারাই পরম সৌভাগ্যবান যাহারা সকল ধরনের বির্তককে পিছনে ফেলিয়া সম্মুখ পানে পদযাত্রা শুরু করে। নিশ্চয় তাহাদিগের জন্য একটা সোনালি ভবিষ্যৎ অপেক্ষমান, যাহা তাহাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও সুফল বহিয়া আনিবে।
কসম আজ পবিত্র রণাঙ্গনের বধ্যভূমির যেখানে পবিত্র আত্মারা নিদ্রা যাইতেছে। অতঃপর পাকবাহিনী রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে কোন গত্যন্তর না দেখিয়া। নিশ্চয় সেদিনও অগ্রপথিক ছিল সেই সব তরুণেরা যাহাদিগের আজ তোমরা বৃদ্ধ বলিয়া থাক। এবং সেই দিনগুলিই তো পবিত্র দিন হিশাবে পালন করা হইয়া থাকে। অতএব তোমরা পালন কর আর স্মরণ কর সেইসব বীর শহিদদের দেশপ্রেমের কথা। তোমাদিগের মুক্তির জন্য ইহা কি যথেষ্ট নহে?
অথচ তোমাদিগের মধ্যে অনেকেই নিজস্ব ক্ষুদ্র স্বার্থ হাসিলের জন্যই অসাড় বাক্য ক্রয় করিয়া লয় ‘শাহবাগি’দের সর্ম্পকে। অভিশপ্ত সেই দল যাহারা সকল কিছু বুঝিয়াও নিশ্চুপ রহে এবং নিজেদের দাবিদাওয়ার সাথে উহাকে মিলাইয়া ফেলিবার বৃথা চেষ্টা করিয়া চলে। অতঃপর অলিখিতভাবেই উহাদিগের প্রচার বিষয়ক দায়িত্ব কাঁধে লইয়া শাহবাগিদের নাস্তিক জ্ঞান করে জনসভায়। ইহারা তো সেই দলভুক্ত যাহারা একদা তোমাদিগের আন্দোলন লইয়া নানারূপ মিষ্টি কথা বলিত। সম্প্রচার মাধ্যমগুলিতে বলিয়া উঠিত: শাহবাগে তরুণেরা জাগিয়া উঠিয়াছে। ক্রমশ সারা বাংলাদেশেই এই আন্দোলন ছড়াইয়া যাইবে।’ অতঃপর তাহাদের মিষ্টি কথা প্রগলভতায় পর্যবসিত হয়, ঠিক যেমনটি হইয়াাছিল বিপরীত ধুরন্ধর দলটির প্রগলভতায়।
পৃথিবীতে যত বিপ্লব সংঘটিত হইয়াছে তরুণেরাই তাহার অগ্রভাগে নিজেদের স্থাপন করিয়াছে। তাহাদিগের সেই বিপ্লব আর শাহবাগের মধ্যকার বড় ব্যবধান হইল আন্দোলনের প্রকৃতি। নিশ্চয়ই ধুরন্ধর রাজনৈতিক দল তোমাদিগের সমর্থন করিয়াছে কোন কিছু বুঝিয়া উঠিবার আগেই। সংসদে দাঁড়াইয়া প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়াছে: ‘মম হৃদয় আজিকে ক্রমেই ছুটিয়া যাইতেছে শাহবাগের তরুণ প্রজন্মের কাছে।’ কিন্তু অতঃপর তাহারা আন্দোলন বন্ধ করিবার জন্য দলীয় সভায় প্রস্তাব পর্যন্ত তুলিল। তাহা হইলে, উহারা কি আন্দোলনকে আপনার হস্তগত সম্পত্তি জ্ঞান করিয়াছে? অথবা সেভাবেই ডামাডোল পিটাইয়াছে? তোমাদিগের কর্তব্য হইতেছে তাহাদিগের হইতে সাবধান থাকা! উহারা তো এমন যে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাইবার লক্ষ্যে নেংটি পরিহিত অবস্থায় বরফের নহরে অবগাহন করিতে ইতস্তত বোধ করিবে না। বরং সাদা গাধাগুলির অসাড় বুলির সহিত একাত্মতা প্রকাশ করিয়া ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে সাক্ষাৎকার দিয়া থাকে বিবেচনা করিবার আশ্বাসে। আর ধৃষ্টতা দেখাইতেছে ব্লগারদের রাতের অন্ধকারে তুলিয়া লইয়া রিমান্ডে দিতে। তাহাদের এমন একটি কর্ম দেখাইতে বল যেখানে উহারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলিয়াছে কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাহার পুরা বিপরীতটি করে নাই! উহাদিগের স্থান পচা কোন ডাস্টবিনের সর্বনিম্ন স্থানে। উপরের সকল আবর্জনা তুলিয়া ফেলিলেও উহা ঐ স্থানেই পড়িয়া রহিবে চিরদিন। উহাদিগের দুর্গন্ধ একদিন পুরো পরিবেশকে বিষাইয়া তুলিতে শুরু করিবে। উহাদিগকে বিশ্বাস করা অপেক্ষা ফণা তোলা কোন সর্পকে বিশ্বাস করা ঢের নিরাপদ। আর উহাদের স্থান নিশ্চয় অন্ধকার কূপে যেখানে উহারা ইতিহাস কর্তৃক নিক্ষেপিত হইয়া থাকে।
তবু তাহারাই পরম সৌভাগ্যবান যাহারা নিজেদের অপরাধী মনে করিয়া তওবা করিয়া লয়। এবং তাহারা উত্তম পরহেজগার হইয়া ওঠে — শয়তানের ধোকা হইতে বিরত থাকিয়া নিজেদের ভুল শুধরাইয়া লওয়ার অভিপ্রায়ে। নিশ্চয় তরুণ প্রজন্ম যথেষ্ট সহনশীল ও ক্ষমাশীল।
নিশ্চয় তোমরা কাহারও মিষ্টি কথায় ভুলিয়া বিপথে যাইবে না। আর উহাদিগের যাহারা তোমাদিগকে অসৎ পথে পরিচালিত করিবার উদ্দেশ্যে নিজস্ব নীতিকেও কলঙ্কিত করিতে কসুর করে না তাহাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকিবে।
অতএব তোমরা পালন কর আর স্মরণ কর সেইসব বীর শহিদদের দেশপ্রেমের কথা যাহারা কোনরূপ স্বার্থতাড়িত না হইয়া লড়িয়াছিল মুক্ত বাতাস পাইবার উদ্দেশ্যে। তোমাদিগের মুক্তির জন্য ইহাই কি যথেষ্ট নহে? তোমাদিগের সমৃদ্ধির একমাত্র পথও উহাই যাহার মাধ্যমে তোমাদিগের পূর্বসূরিরা ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছিল দেশমাতৃকার প্রবল টানে। আর উহাদের ধ্বংস অনিবার্য — কেননা উহারা তো সেই শ্রেণি যাহারা তোমাদিগকে দীর্ঘ ২৪টি বছর শোষণ করিয়া

আসিয়াছে। মুখের ভাষা কাড়িয়া লওয়া হইতে শুরু করিয়া তোমাদের মুখের অন্ন পর্যন্ত তাহারা ছিনাইয়া লইয়াছে। অতঃপর তাহারা নানা ছলে ন্যায্যতা হইতে বঞ্চিত করিবার অভিপ্রায়ে ব্যর্থ হইয়া, যে কালরাত্রির জন্ম দিল তাহার কথা নিশ্চয় তোমাদিগের স্মরণ রহিয়াছে। তাহারা সশস্ত্র হামলা চালাইয়াছিল নিরীহদের উপর। ওরাই তো কাপুরুষ। নিশ্চয় ইহাই হইল দেশপ্রেম যাহার সম্মুখে সকল কিছু প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে উহারা নৈতিক সমর্থন হারাইয়া হেনস্থা হইয়া ঘরে ফিরিয়া যাইতে বাধ্য হয়। আর উহার ফলস্বরূপ উহারা চিরদিনই নিজেদের মধ্যে কলহ-বিবাদে লিপ্ত হইবে। এবং অপরের দ্বারা পর্যুদস্ত হইতে থাকিবে।
হে তরুণেরা, শোন, তোমাদিগের মাঝে যাহা বড় শক্তি তাহা হইল লাল-সবুজের পতাকা। তাহারাই সৌভাগ্যবান যাহারা ইহার ছায়াতলে দলে দলে ছুটিয়া আসিয়া নিজেদের তৃষ্ণা মিটাইবার চেষ্টা করে। উহারাই তো শহিদ মিনারে পদযাত্রা করে দলে দলে যে কোন সঙ্কট মুহূর্তে। উহাদিগের জন্য রহিয়াছে ইতিহাসের নোট বইয়ে স্বর্ণের তুলি দিয়া আঁকা নামসহি। আর তোমরা থেমে থেক না কখনো যখন তোমাদিগের এই শক্তিকে কেউ আঘাত করিবার অপচেষ্টা করে। আপসকামিতা নিশ্চয় ধ্বংস ডাকিয়া আনে।
তোমাদিগের মধ্যে ঐ ব্যক্তি উত্তম যে কোনরূপ দলীয় স্বার্থান্বেষণে না যাইয়া জাতীয় মুক্তির  জন্য শহিদ হয়। আর যাহারা আপনকার চিন্তা দ্বারা বা মতামত দ্বারা তাহাদিগের এই দেশপ্রেমকে উজ্জীবিত করিয়া থাকে তাহাদের রক্ত সেইসব শহিদের সমান পবিত্র। অতএব জ্ঞানার্জনের জন্য তোমরা ভালমন্দ ভয় করিও না। তোমরা পড় তোমাদিগের নিজের নিজের ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য। আয়ত্ত কর পূর্বসূরিদের মহৎ কীর্তিগুলি। ইহাই তোমাদিগকে বিবেকের শ্রেষ্ঠতম স্থানে সমাসীন করিবে। আর উহারা অবশ্যই মূর্খ যাহারা কোনপ্রকার বাছবিচার ছাড়াই তাহাদিগের পূর্বসূরিদের মুখনিঃসৃত বাণীকে একমাত্র সত্য জ্ঞান করিয়া থাকে। এবং সেই জ্ঞানের উপর ভিত্তি করিয়া আপন আপন দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করিয়া থাকে। বস্তুত, প্রকৃত জ্ঞান বলিতে যাহা বুঝাইয়া থাকে তাহার আলোকধারা হইতে তাহারা সম্যক বঞ্চিত। অতএব হে বাংলার জনগণ, তোমরা সাবধান হও। কান পাতিয়া শোন তরুণ প্রজন্মকে যাহারা তোমাদিগের মুক্তির দূত হিশাবে আবির্ভূত হয় যুগে যুগে।
আর তোমাদিগের জন্য এক মাহমুদুরই যথেষ্ট যাহাকে সকল প্রকার ক্ষমতার অধিকারী করা হইয়াছে সাংবাদিকতার নাম ভাঙ্গাইয়া। তোমরা জানিয়া রাখো তলোয়ারের যুদ্ধ শেষ। এখন আসিয়াছে কলমের যুদ্ধ। অতঃপর সরকারি আমলা হইতে মাহমুদুর হইয়া উঠিল এক তথাকথিত আজব জীবে — সাংবাদিকে। অবশ্য তোমরাই মাঝে মাঝে বিড়ালকে বাঘ মনে করিয়া থাক। অতঃপর সেই বিড়ালই একটু আধটু ভালমন্দ দাওয়াত আর নেমন্তন্ন পাইয়া বাঘ সাজিয়া বসে। আর নব্য সনাতনি আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা উহাকেই সর্বজ্ঞান করিয়া জীবন দিতেও দ্বিধা করে না। বরং তাহাকে শহিদের সমকক্ষ মনে করিয়া থাকে। কিন্তু উহার ‘মেও… মেও’ আওয়াজটা অলক্ষ্যে রহে সর্বসাধারণের। অতয়েব তোমরা কোন কোন ব্যক্তিকে সাংবাদিক বলিবে? আর কোন কোন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিশাবে চিহ্নিত করিবে?
হে নামজাদা এবং নাম না জানা তরুণগণ, তোমরা বিশ্বাস রাখ নিজের নিজের উপর। যে মহৎ কর্মযজ্ঞ তোমরা হাতে লইয়াছ তাহা হইতে পিছু হটিও না। নিশ্চয় তোমরাই তাহারা যাহারা যুগে যুগে আবির্ভূত হও ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন কিংবা ভগত সিং অথবা, রফিক, শফিক, সালাম আর মতিউর, রউফ, হামিদুর কিংবা রুহুল আমিন নামে। তোমাদিগের উপরই জাতির ভবিষ্যৎ। সংকীর্ণ স্বার্থে বা কোন মোহে পড়িয়া তোমাদিগের একটি ভুল কিংবা অদূরদর্শিতাই যথেষ্ট জাতিকে অন্ধকারে নিক্ষেপপূর্বক বাংলার গগনে অমবস্যা লইয়া আসিতে।
হে লাকি, সিনথিয়া, শাওন, তুলতুল অথবা আরো যাহাদের নাম আমাদের জানা নাই, তোমরাই যুগের সারথি, নারীমুক্তির কাণ্ডারী। তোমাদিগের দেহে তো তাহাদেরই রক্তস্রোত যাহারা প্রীতিলতা, রোকেয়া, জাহানারা ইমাম বা সুফিয়া কামাল নামে বাংলার বুকে নাজিল হইয়াছিলেন বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে। তোমাদিগের উপর উহাদের সকল অসমাপ্ত কর্ম সম্পাদনের দায়িত্ব। তোমরা আগাইয়া চল। তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ লেখকদের ভাষা কিংবা শীর্ষ দৈনিকে তোমাদিগের বিষয়ে অসাড় মন্তব্য লইয়া তোমরা বিচলিত হইও না। উহারা জাতীয় শত্রুদের সহিত এমন আঁতাতে আবদ্ধ যাহা খোলা চোখে দেখিবার উপায় নাই। আর তোমরা জানিয়া রাখ তোমাদের শত্রুগণ তোমাদের আশেপাশেই ঘুরিয়া বেড়ায় পরম বন্ধু হিশাবে কিন্তু তোমরা তাহাদের চিনিতে পার না। অতঃপর তাহাদের স্বার্থোদ্ধার হইয়া গেলে উহারা নিজেই আপন চরিত্র প্রকাশ করিয়া বসে সম্ভাব্য সর্বোত্তম সময়ে।
তোমরা তৈরি হও আরো বৈরী পরিবেশে টিকিয়া থাকিবার জন্য। তোমাদিগের জন্য রহিয়াছে সেই স্থানে উপনীত হইবার সুযোগ যেইখানে তোমাদিগের পূর্বপুরুষরা আঁচড় কাটিয়া যাইতেছে। তোমাদের জন্য রহিয়াছে পৃথিবীর ইতিহাসে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করিবার সুযোগ। পৃথিবীর সমস্ত জলকণাকে কালি করিয়া আর সমস্ত জমিন ও সাত সাতটি আসমানকে কাগজ বানাইয়াও ইহার পুরস্কারের বর্ণনা করা সম্ভব হইবে না।
অতএব, শাহবাগিরা তো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম বাগিচার ফুল যাহার সুবাসে সকল দুর্গন্ধ দূরীভূত হইবে। ইহারা তো সেইসব তরুণ যাহাদের জ্ঞানের আলোয় সকল মূর্খতা বা অজ্ঞতা খড়কুটার মতন ভাসিয়া যাইবে। অতঃপর মানবতাকে ধারণ করিয়া জাতির যে কোন দুর্যোগে তাহারা অগ্রবর্তী হইয়া ঝাঁপাইয়া পড়িবে। আর উহারা ধ্রুবতারার মতন আপন গতিতে নিজস্ব পথ রচনা করিবে অসীম দুঃসাহসিকতায় আর দূরদর্শিতায়। আমিন।

জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র্র- আবুল কাসেম ফজলুল হক

জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র্র
আবুল কাসেম ফজলুল হক

বাংলাদেশসহ উপনিবেশমুক্ত দেশসমূহ সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এখনও অর্জন করিতে পারে নাই। বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলি আমাদের দেশকে জিম্মি মনে করিয়া থাকে। তাই তাহারা বিভিন্ন সময়ে উপদেশ,পরামর্শের আদলে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপই করিয়া থাকে। তাহার কার্যকারণ খুঁজিয়া পাই এই প্রবন্ধে

কোন জাতির সভ্যতা কেবল তার অজ্ঞাতে হয়ে ওঠার ব্যাপার নয়, সজ্ঞানে নিজেকে সৃষ্টি করারও ব্যাপার। মানবজাতিকে আজ নতুন সভ্যতা সৃষ্টির প্রয়োজনে জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, বিশ্বায়ন ইত্যাদি বিষয়কে গভীরভাবে বুঝে নিতে হবে। সেই সঙ্গে বুঝতে হবে কথিত উদার গণতন্ত্রের বিপরীতে জনগণের গণতন্ত্রের রূপ ও প্রকৃতি। স্থির করতে হবে ভবিষ্যতের অভিপ্রেত — নতুন ব্যক্তিজীবন, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা, নতুন বিশ্বব্যবস্থার রূপ ও প্রকৃতি।
প্রথমেই লক্ষ করা দরকার যে দেশ ও রাষ্ট্র এক নয়। দেশ প্রকৃতির সৃষ্টি, রাষ্ট্র মানুষের। পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি ইত্যাদি দুর্লঙ্ঘ নানা কিছু দ্বারা পরিবেষ্টিত এক একটি সুবিশাল ভূভাগ হল এক একটি দেশ। শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপে যাতায়াত ও যোগাযোগ ক্ষুদ্র আঞ্চলিক গণ্ডি অতিক্রম করে দেশব্যাপী বিস্তৃত হয় এবং তাতে জাতীয়তাবোধ, জাতীয়তাবাদ ও জাতিরাষ্ট্র উদ্ভব হয়। এরই মধ্যে মানুষের অধিকারবোধ ও গণতান্ত্রিক আবেগও বিকশিত হয়। সেটা ফরাশি বিপ্লব (১৭৮৯) ও তার অব্যবহিত পরবর্তীকালের ঘটনা। সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারারও তখন উন্মেষ ও বিকাশ ঘটতে থাকে। ইউরোপ থেকে চিন্তাচেতনা ছড়িয়ে যায় সকল ভূভাগে। শিল্পবিপ্লবের আগে মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগ দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়নি। তখন মনুষের জীবনপ্রয়াস সীমাবদ্ধ ছিল ক্ষুদ্র অঞ্চলে। কোথাও কোথাও বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপিত হলেও সেকালে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে এই আঞ্চলিকতা কাটেনি।
আধুনিক যুগের ধারণা অনুযায়ী রাষ্ট্রের জন্য এক সঙ্গে দরকার হয় সুনির্দিষ্ট ভূভাগ, সেই ভূভাগের ঐক্যবোধসম্পন্ন (বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য) আত্মসচেতন জনগণ, সেই ভূভাগ ও সেই জনগণের সরকার এবং রাষ্ট্রের সকল ব্যাপারে সেই জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব। রাষ্ট্রের জন্য এই ব্যাপারগুলো এক সঙ্গে স্থায়ীভাবে দরকার হয়। রাষ্ট্র আপনিতেই হয় না — সংশ্লিষ্ট জনগণকে সজ্ঞানে সচেতন প্রয়াস দ্বারা রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হয়। রাষ্ট্র গঠন ও তার উন্নতি সংশ্লিষ্ট জনগণের নিরন্তর সাধনা ও সংগ্রামের ব্যাপার। ফরাশি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইউরোপে জনগণের মধ্যে জাতিরাষ্ট্র গঠনের আগ্রহ সূচিত হয়। জনমনে ধারণা সৃষ্টি হয়: আমরা যদি আমাদের দেশে আমাদের জন্য একটি ভাল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, তাহলে সেই রাষ্ট্রে আমাদের পক্ষে সবচেয়ে ভাল জীবন যাপন সম্ভব হবে। সামন্তযুগের অন্তিম পর্যায়ে, শিল্প বিপ্লবের সূচনাপর্বে সামন্তপ্রভু ও রাজার কর্তৃত্বকালেই ক্রমিক গতিতে দেখা দেয় এই চেতনা। এই অবস্থার মধ্যেই জাতিরাষ্ট্র গঠনের তাগিদ সৃষ্টি হয়। জাতিরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে জনগণের মধ্যে ঐক্য কমে গেলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায় এবং ঐক্য না থাকলে রাষ্ট্র টেকে না। রাষ্ট্র গঠনের জন্য জাতীয় সাধনা ও জাতীয় সংগ্রামের গভীরে দরকার হয় ব্যক্তি মানুষের আত্মপুনর্গঠন। কেবল স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ দিয়ে রাষ্ট্র হয় না। রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য বুদ্ধি, যুক্তি, জ্ঞান, বিচার-বিবেচনা, প্রজ্ঞা এবং সর্বোপরি নিরন্তর কাজ দরকার হয়।
দেশীয় জাতীয়তাবোধ কালক্রমে উন্নীত হয় জাতীয়তাবাদে, জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতবাদে ও আন্দোলনে। জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য আদর্শ হিসেবে জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত করতে হয় গণতন্ত্র কিংবা সমাজতন্ত্র। জাতিরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সাধারণত আঞ্চলিক, গোষ্ঠীগত, ভাষিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নানা জনসম্প্রদায় থাকে। জনসাধারণের মধ্যে এই বৈচিত্র্য বিরাজ করার ফলে জাতীয় ঐক্যের সমস্যা দেখা দেয়। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যে’র কিংবা ’বহুত্ববাদী সমন্বয়ে’র নীতি অবলম্বন করে এই সমস্যার সমাধান করতে হয়। বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী ঐক্যে যেমন গুরুত্ব দিতে হয়, তেমনি গুরুত্ব দিতে হয় বৈচিত্র্যে। জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও উন্নতি নির্ভর করে জনগণের ঐক্যের উপর।
অপর দিকে, জাতিরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে দেখা দেয় মিত্রতামূলক কিংবা শত্রুতামূলক আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিকতাবোধ। কার্ল মার্কস ও তাঁর সহযোদ্ধারা ১৮৪০ সালের দশক থেকেই শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রচার করতে আরম্ভ করেছিলেন। শিল্পবিপ্লবের যে পর্যায়ে তাঁরা ছিলেন, তাতে আন্তর্জাতিকতাবাধের ধারণা তাঁদের লেখায় স্পষ্ট রূপ পায়নি। জাতি, জাতীয় সংস্কৃতি, জাতিরাষ্ট্র ইত্যাদির স্বাভাবিক বিকাশের জন্যই দরকার আন্তর্জাতিকতাবাদ। জাতিরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আদানপ্রদান বৃদ্ধি, বিরোধ মীমাংসা, যুদ্ধের সম্ভাবনাকে তিরোহিত করা, যুদ্ধ লেগে গেলে যুদ্ধ থামানো, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি ইত্যাদি আন্তর্জাতিকতাবাদের লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিকতাবাদের বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ অপরিহার্য। আন্তর্জাতিকতাবাদের ধারণা স্পষ্ট হয় দুই বিশ্বযুদ্ধ এবং লিগ অব নেশনস এবং ইউএনও প্রতিষ্ঠার কালে। তখন আন্তর্জাতিক বা ফেডারেল বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ অনেকে উপলব্ধি করেন। এর অনেক আগেই দেখা দেয় জাতীয়তাবাদের বিকৃত বিকাশ — উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ। আন্তর্জাতিকতাবাদের বিকাশ এই বিকারের প্রতিকার সন্ধানের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে ১৯৯০ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলোপের পর দেখা দিয়েছে বিশ্বায়নের মতবাদ।
তথ্যপ্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি ও অন্যান্য প্রযুক্তির বিপ্লব পৃথিবীতে ঘটিয়েছে যুগান্তরকারী পরিবর্তন। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার উপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ও নতুন প্রযুক্তির অভিঘাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয় ঘটে এবং তারপর উদ্ভাবিত হয় বিশ্বায়নের বা এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মতবাদ (ইউনিপোলারিজম বা গ্লোবালিজম)। ১৯৯০ দশকে উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ধারা ধরে বিশ্বায়নের বা এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার মতবাদ দেখা দিয়েছে; আন্তর্জাতিকতাবাদের ধারা ধরে দেখা দেয়নি। বিশ্বায়ন দেখা দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদেরই উচ্চতর পর্যায় হিসেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আজকের বিশ্বায়ন, আর সাম্রাজ্যবাদ এক ও অভিন্ন। বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদেরই নতুন, উচ্চতর পর্যায়।
আন্তর্জাতিকতাবাদ ও বিশ্বায়ন এক নয়। আন্তর্জাতিকতাবাদ জাতি, জাতীয় সংস্কৃতি ও জাতিরাষ্ট্রকে বিকাশমান রূপে রক্ষা করতে চায়। জতিরাষ্ট্রসমূহের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা, আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসা করা, যুদ্ধের সমস্যার সমাধান করা, আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্প্রীতি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের মনোভাব সৃষ্টি করা ইত্যাদি এর উদ্দেশ্য। আন্তর্জাতিকতাবাদের ঐতিহাসিক প্রবণতা আন্তর্জাতিক বা ফেডারেল বিশ্বরাষ্ট্র গঠনের দিকে। বিশ্বায়নবাদীরা নিজেদের অভিসন্ধি গোপন রেখে, জাতিরাষ্ট্র বিলুপ্ত করে, ওয়াশিংটনকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
বর্তমান সময়ের নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে চালানো হচ্ছে বিশ্বায়নের কার্যক্রম। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাঙ্ক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, জিএইট (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান এবং পরে রাশিয়া) কাজ করছে বিশ্বায়নের উদ্ভাবক, বাস্তবায়নকারী ও কর্তৃপক্ষ রূপে। এসবের কেন্দ্রীয় পরিচালনায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকার। বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় তারা কাজ করছে সর্বশক্তি নিয়োগ কওে — নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে, সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করার আনন্দ ও নব-উদ্দীপনা নিয়ে। যাঁরা কেবল শতকরা পাঁচ ভাগের নয়, অবশিষ্ট পঁচানব্বই ভাগেরও মুক্তি ও উন্নতি চিন্তা করেন তাঁদের চিন্তাধারায় জোয়ার দেখা যায়না , দেখা যায় কেবল ভাটা ।

সম্পাদকীয়-এক সহায়হীন নিরাপত্তাহীনতার যুগ চলিতেছে যেন

সম্পাদকীয়

এক সহায়হীন নিরাপত্তাহীনতার যুগ চলিতেছে যেন

১৩ মে রানাপ্লাজার ধ্বংসাবশেষ হইতে উদ্ধারের কাজ শেষ হইয়াছে। কোনমতে জীবিত উদ্ধারের সংখ্যা ২,৪৩৮। তাহাদের মধ্যে এ পর্যন্ত ১২ জন আবার হাসপাতালে প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন। ফলে সরকারি হিশাব মতে উদ্ধারকৃত ১,১১৫ জনের লাশসহ মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়াইতেছে ১,১২৭। তাহার অর্থ হইতেছে ধসিয়া পড়িবার সময় রানাপ্লাজায় অন্তত ৩,৫৫৩ জন মানবসন্তান হাজির ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা যাইতেছে, নিদেনপক্ষে ৩,৭৮০ হইতে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিককে সেইদিন সেই যমপুরিতে ডাকিয়া আনা হইয়াছিল।
ইহা সত্য যে সেদিনের হাজিরা খাতাগুলি কোনদিন আর খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। এদিকে সরকার বাহাদুর বলিতেছেন বটে অশনাক্ত লাশের সংখ্যা প্রায় তিনশ। কিন্তু নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে সাভারে যে বহুসংখ্যক লোকের আগমন ঘটিয়াছে তাহার সহিত মিলাইলে বোঝা যায় রানাপ্লাজায় তখন ৩,৫৫৩ জাদুসংখ্যা হইতে আরো কয়েকশ বেশি মানুষ না থাকিয়া যায় না। ডিএনএ টেস্টের জন্য এ পর্যন্ত রক্তের নমুনা জমাই পড়িয়াছে প্রায় পাঁচশ। আর প্রতিদিন তাহা শুদ্ধ বাড়িতেছে।
শ্রমিকের এই লাশ হইয়া গুম হইবার ঘটনা একেবারে নতুন নহে। তাহাদের লড়াই সংগ্রাম গুম করিয়া রানাপ্লাজার কাঠামের ন্যায় খোদ যে রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিয়াছে, এমনি করিয়া তাহাও বা টিকিবে কতকাল? আমরা দেখিতেছি, শ্রম আইন ২০০৬ সংশোধন চলিতেছে। তাহাতে ম্নুাফার ৫ শতাংশ নাকি শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় হইবে। প্রচার মাধ্যমসমূহে এই খবর বেশ ‘মিষ্টি জিলাপি’ আকারে বিতরণ চলিতেছে। কিন্তু ইহাতে শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যার যে কানাকড়িও আসে না তাহা মুনাফার অপর ৯৫ শতাংশেই বরং বেশি জ্বলজ্বল করিতেছে।
এদিকে, সাভারে আশুলিয়ায় আরো বহুসংখ্যক কারখানায় ফাটল দেখা দিয়াছে। এই উদ্বেগজনক অবস্থায় মালিকপক্ষ যথারীতি নূতন নূতন কৌশল করিতেছেন। একদিকে তাহারা মঙ্গলবার হইতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশুলিয়া এলাকার সকল কারখানা বন্ধ ঘোষণা দিয়াছেন। বিজিএমইএ সভাপতি অজুহাত আকারে বলিতেছেন, রানাপ্লাজা ধসের পর শ্রমিকেরা নাকি কারখানায় আসিয়া কোন কাজই আর করিতেছে না। শুদ্ধ কার্ড পাঞ্চ করিয়া চলিয়া যায়। মালিকেরা কারখানা খুলিতে পারিতেছে না। তিনি শ্রম আইন ১৩(১) ধারা উল্লেখ করিয়া জানাইতেছেন, এই অবস্থায় কারখানা বন্ধ হইলে শ্রমিকেরাও কোন বেতন পাইবে না।
অপরদিকে দেখা যাইতেছে, সাভারে আশুলিয়ায় অধিকাংশ কারখানাই বরং খোলা। প্রশ্ন হইতেছে, সভাপতি সাহেবের বন্ধ ঘোষণার পরও এবং শ্রমিকেরা যদি কাজ না-ই করিবেন, মালিকেরা কারখানা খোলা রাখিতেছেন কেন? কাহার ভরসায়? ইহাতে বিজিএমইএ কর্তৃক প্রচারিত ‘কার্ড পাঞ্চ করিয়া চম্পট দেওয়ার’ তত্ত্বখানি যে নির্জলা মিথ্যাচার তাহা আর অপ্রমাণ থাকে না। কিন্তু এই মিথ্যাচারের কিছু উদ্দেশ্য নিশ্চয় রহিয়াছে।
একদিকে ইহাতে, মানে এই খোলা-বন্ধ চালাকিতে, ফাটল ধরা কারখানা ভবনে যেমন ফের শ্রমিকদের ঢুকাইতে বাধ্য করা হইতেছে; অপরদিকে কোন আন্দোলন যাহাতে গড়িয়া উঠিতে না পারে সেই বিষয়ে তাহারা যেন একটু আগাম চোখও রাঙ্গাইলেন।
সব থেকে আশ্চর্যের বিষয়, সামনে ক্ষমতাবদলের সুযোগ লইয়া বড় বড় দলগুলি ইদানিং বেশ মারকাটারি খেলিতেছে। কিন্তু তাহাদের ‘লড়াই সংগ্রামের ইশতেহারে’ কোথাও কৃষকের কি শ্রমিকের প্রতিদিনের অবিমিশ্র বঞ্চনা লইয়া কোন টু-শব্দটি পর্যন্ত নাই। দুর্জনেরা ঠাট্টা করিয়া বলিবেন, আর ঠিক এইখানে সরকার এবং বিরোধীদলীয় জোট সকল দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করিয়া একই বৃন্তে দুইটি কাঁটা হইয়া ফুটিয়াছে যেন। এই সকল বিষকাঁটা না উপড়াইতে পারিলে শ্রমিকশ্রেণির ফুল যে ফুটিবে না তাহা বলাই বাহুল্য।
যাহা হৌক, এক্ষণে আরেক নূতন আপদ আকারে হাজির হইয়াছে ঘূর্ণিঝড় মহাসেন। ইহার কারণেও বিস্তর ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা হইতেছে। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, প্রাকৃতিকসহ আরো কত না ভাবেই দেশের অধিকাংশ জনতা আজ সহায়হীন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগিতেছে!

সময় বহিয়া যায় – সর্বজন ডেস্ক:

সময় বহিয়া যায়
সর্বজন ডেস্ক:
শ্রমিকদের কি কল্যাণ হইল
সরকার মন্ত্রিসভায় সংশোধিত শ্রম আইন ২০১৩ পাশ করিয়াছেন। পত্রিকাগুলো ফলাও করিয়া প্রচার করিতেছে, এইবার শ্রমিকদের কল্যাণে সরকার মনোযোগী হইল। কিন্তু ইহা নিছক মতিভ্রম বৈ নহে। সাভারের ঘটনা ২০০৬ সালের শ্রম আইনের বিশেষ কিছুই বদলাইতে পারে নাই। সরকার কিংবা মালিকশ্রেণি কেহই শ্রমিকদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় নাই। সরকার বলিয়াছে তাহারা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার দিয়াছেন। ইহা নতুন কি? ২০০৬ সালের শ্রম আইনেও তাহা ছিল। হাঁ, পরিবর্তন একটা আছে অবশ্য। তাহা হইল আগে শ্রমিকরা ট্রেড ইউনিয়ন করিতে চাহিলে তাহাদের প্রতিনিধিদের তালিকা মালিকের কাছে পাঠাইতে হইত। মালিক অনুমোদন করিলে ট্রেড ইউনিয়ন হইত। এখন সরকার নিজেই এ বিষয়ে দেখভাল করিবে। মালিকের কাছে তালিকা পাঠাইতে হইবে না।
পূর্বে, মালিকের কাছে শ্রমিক প্রতিনিধিদের তালিকা পৌঁছাইলেই তাহারা এইসব শ্রমিক নেতৃবৃন্দদের চাকুরি হইতে বরখাস্ত করিতেন। যেহেতু নিয়মে আছে, চাকুরিরত না থাকিলে ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হওয়া যাইবে না তাই মালিকরা এই অস্ত্রই ব্যবহার করিতেন। কিন্তু মালিকের কাছ হইতে সরকারের হাতে দেখভালের দায়িত্ব গেলেও বিশেষ পরিবর্তন হইবে না। কারণ মালিক শ্রমিক প্রতিনিধিদের চাকরিচ্যুত করিলেই তাহারা আর সদস্য থাকিতে পারিবেন না। তাই শ্রমিকেরা দাবি জানাইয়া আসিতেছিল, চাকরিচ্যুত হইলে বা অবসর গ্রহণ করিলেও একজন শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য থাকিতে পারিবেন। সরকার মহাশয় এই দাবি মানিয়া লন নই। পাকিস্তানপর্বে ট্রেড ইউনিয়ন লইয়া নীতি আরো উদার ছিল। তখন নির্দিষ্ট কারখানার বাইরের লোকও শ্রমিকদের পছন্দের ভিত্তিতে ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য হইত পারিতেন। ফলে দেখিতেছি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের বাধা দূর হইল না। ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার কিতাবেই রইয়া গেল, কিংবা পত্রিকার পাতায় ফলাও শ্রমিকরা অধিকার বঞ্চিতই রহিলেন।
আরো বড় ফাঁকি হইল শ্রমিকরা নাকি মুনাফার পাঁচ শতাংশ শেয়ার পাইবেন। ফাঁকি রইয়াছে কিভাবে পাইবেন তাহার উত্তরে। শ্রমিকদের দাবি ছিল মজুরির সহিত জুড়িয়া দিবার। কিন্তু মালিকেরা চালাকি করিয়া একটি গালভরা নাম রাখিয়াছেন শ্রমিক কল্যাণ ফান্ড। সেইখান হইতে নাকি খরচ করা হইবে। সেইখানে নাকি মালিকেরা মুনাফার পাঁচ শতাংশ জমা দিবেন। তাহারা শ্রমিকদের নাচ গান দেখাইয়া, পিকনিকে লইয়া এই অশেষ কল্যাণ হাসিল করিবেন। এর ফলে নতুন সংশোধনীতেও শ্রমিকের কল্যাণের ভার সেই মালিকের হাতেই রহিয়া গেল। এই তত্ত্বই সব নষ্টের গোড়া। শ্রমিকশ্রেণি কারও দয়ায় বাঁচে না।

কচু বনে কালাচাঁদ
ইহার অর্থ অপদার্থ। আরেকটি অর্থ হইতে পারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই মাসের ৮ তারিখে বহিয়া যাওয়া ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে মংলা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ খোলা আকাশের নিচে দিনযাপন করিতেছেন। পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় আগাইয়া আসিলেও ঘটনার তিন দিন পরও কোন ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয় নাই। ইহা আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বেহাল দশারই চিত্র। প্রশ্ন উঠিতেছে এই মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা লইয়া। এই ব্যর্থতার বোঝা ষোলকলা পূর্ণ হইল যখন আমরা সাভারে এই মন্ত্রণালয়ের লক্ষণীয় কোন কার্যক্রম দেখিলাম না। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাথে ত্রাণ যুক্ত করিয়া দিয়াই এই প্রতিষ্ঠানটিকে খয়রাতি করিয়া দেওয়া হইয়াছে। মন্ত্রণালয়ের লোকবল ত্রাণ আত্মসাৎ করিতেই ব্যস্ত। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা অতি কৃশকায়।
মহাসেন নামের সাইক্লোন বহিয়া গেল বাংলাদেশের উপর দিয়া। ইহার হতাহতের পরিমাণ এখনো বিস্তারিত জানা যায় নাই। এই সাইক্লোনের প্রস্তুতির পর্যায়ে, উপকূলীয় এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রের অপ্রতুলতা ও বেহাল দশার চিত্র আরো একবার প্রকট আকারে সামনে আসিয়াছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সাথে যুক্ত। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উপাদানগুলিই সবচেয়ে কার্যকর। সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হইতেছে সুন্দরবন। গবেষণায় দেখা যায়, সুন্দরবন এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কমাইয়া লইয়া আসে। বন ঝড়ের বেগ কমাইয়া দেয় এবং জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ করে। কিন্তু এই সুন্দরবন ধ্বংসের পাঁয়তারা অব্যাহত রহিয়াছে। উন্নয়নের কথা বলিয়াই এই ধ্বংস সাধন করা হইতেছে। নব্বই দশকে চিংড়ি চাষের ও রফতানির মাধ্যমে উন্নয়নের যে তরিকা গ্রহণ করা হইয়াছিল তাহার ফলে ঐ অঞ্চলে অবস্থিত ২১ হাজারের বেশি বর্গকিলোমিটার জুড়িয়া বিস্তৃত দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন চকোরিয়া সুন্দরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হইয়া যায়। বর্তমানে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন করিবার ছুতায় সুন্দরবন ধ্বংসের নকশা চূড়ান্ত করিয়াছে। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষিয়া অবস্থিত রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লা দিয়া চালিত হইবে। সুন্দরবন এলাকার মধ্য দিয়াই ভারি যানবাহন সহযোগে এই কয়লা পরিবহন করা হইবে। ফলে বনের পরিবেশ ও প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। সুন্দরবন রক্ষায় সচেতন গোষ্ঠী সরকারকে রামপাল বিদ্্যুৎ প্রকল্পের পরিবেশ সমীক্ষা প্রতিবেদন (এনভায়রনমেনটাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট রিপোর্ট) জনসমক্ষে প্রকাশ করিবার দাবি জানাইলেও সরকার নানান টালবাহানা করিয়া এখন পর্যন্ত তাহা প্রকাশ করে নাই। অন্যদিকে এই প্রকল্পের আরেক অংশীদার ভারত বারংবার আশ্বাস দিয়া আসিতেছে বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু তাহারা করিবেন না। এই বাক্যবন্ধই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অমৃতবচন। এই বচনের বিপরীতে ফারাক্কা নীরব প্রতিবাদ হইয়াই রহিল।

‘হুজুর আফনে কই, আমি মায়ের কাছে যামু’
হুজুরেরা মাহফিলের কথা বলিয়া ঢাকায় আনিয়া ছাত্রদের অবরোধের সামনে ঠেলিয়া দেন। এমনকি অনেককে মৃত দেখাইয়া রাজনীতিও শুরু করিয়া দিয়াছেন তাহারা। হেফাজতে ইসলাম চাঁদপুরের সোহেলকে নিহত দেখাইয়াছিল। দিন কতক বাদে পত্রিকায় আসিল সোহেল সুস্থ অবস্থায় মাদ্রাসায় ক্লাস করিতেছেন। ৫ ও ৬ মের ঘটনার পর হেফাজতের গোমর খুলিতে শুরু করিয়াছে। শিশুদের লাশের উপর দিয়া তাহাদের কেহ ধর্মগুরু, কেহ ধর্মমন্ত্রী আবার কেহ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হইয়াছিলেন। বর্তমানে তাহাদের অন্তর্কোন্দল চরমে উঠিয়াছে। এখন এক দল আরেক দলকে মুনাফেক ডাকিতে শুরু করিয়াছেন। সাভারের ত্রাণের টাকা তসরুপ করিবার দায়ে দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হইয়াছে। তাহাদের ১৩ দফার অন্তরালে ভিন্ন অভিসন্ধির সত্যতা ফুটিয়া উঠিতেছে।
৬ মের ঘটনায় সরকারের পক্ষ হইতে একটি প্রেসনোট দেওয়া হইয়াছে। তাহারা দাবি করিয়াছেন, পথচারীসহ মোট ১১ জন নিহত হইয়াছে। কিন্তু পত্রিকা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির বিভিন্ন হিসাবে এই সংখ্যা ৫০ বা তাহার কাছাকাছি। হেফাজত সংবাদ সম্মেলন করিয়া বলিয়াছে শত শত। বিএনপি ও তার সহযোগীরা বলিতেছেন হাজার হাজার। সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায়ও খালেদা জিয়া বলিয়াছিলেন অসংখ্য লাশ গুম হইতেছে। এই রকম দায়িত্বহীন মন্তব্যের মানে কি? অধিকার নামক সংগঠন বলিয়াছে হাজার হাজার মানুষ নাকি নিহত হইয়াছে। তাহাদের সূত্র কি জিজ্ঞাসিলে তাহার উত্তর করেন ফেসবুক ও অনলাইন। তাহারা কি মানুষের সংখ্যা লইয়া পরিহাস করিতেছেন? নহিলে বলিতে হইবে তাহারা এত লোকের মৃত্যু হোক তাহাই চাহিয়াছিলেন। এত এত হত্যার সাক্ষী সাবুত কেহই দেখাইতে পারিতেছেন না — ইহাই আশ্চর্য।
যুগান্তর পত্রিকাটি লিখিয়াছে এই অভিযানে দেড় লক্ষাধিক গোলাবারুদ ব্যবহার করা হইয়াছে। সরাসরি অংশগ্রহণ করিয়াছে ৭,৫৮৮ জনের সম্মিলিত বাহিনী। অনেকে সাধারণ অনুমানের ভিত্তিতে বলিতেছেন এত বড় অভিযানে মৃতের সংখ্যা সরকারের দাবির চেয়ে বেশি হইবে। ইহা ছাড়া পুলিশের তদন্ত ও প্রেসনোট লইয়াও অনেক বিশেষজ্ঞ আপত্তি জানাইয়াছেন। তাহাদের বক্তব্য সংবিধান অনুযায়ী অভিযোগকারী, তদন্তকারী, ও বিচারক এক ব্যক্তি হইতে পারিবে না, হইলে ন্যায়বিচার হইবে না। এক্ষেত্রে পুলিশ একই সাথে গুলিবর্ষণকারী, তদন্তকারী ও রিপোর্ট দাখিলকারীর ভূমিকা লইয়াছে। তাই এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া মনে হইতেছে। প্রকৃত সংখ্যা কত, কোন পরিস্থিতিতে পুুলিশ গুলি চালাইয়াছিল, হেফাজত কেন তাহাদের প্রার্থিত সময়ের পরও চলিয়া যায় নাই, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কি ধরনের ইন্ধন ছিল সকলই তদন্ত করিতে হইবে।