Category Archives: শাহবাগ আন্দোলন বর্ষপূর্তি সংখ্যা

চুম্বন — মেহেদী হরিৎ

প্রথম চুম্বনে আগুন ধরে যায়
আগুন নিভে দমকলের জলে
তারপর বার্ন ইউনিট, মুখে প্লাস্টার।
দ্বিতীয় চুম্বনে জেগে ওঠে যৌবন
দম নেই আর দম ফেলি
ক্ষণিক পর লীলা ক্ষান্ত হয়।
পেট্রোল লিপস্টিক তোমায় মানিয়েছে বেশ
দাও দাও
আরও চুম্বন দাও
মস্তকগুলো যেন কর্পূর হয়ে যায়…

পথভরা আনন্দ সন্তান — রায়হান রাজু

 

বড় ভয় ধরে যায়
আঁতকে ওঠে মন
ভূকম্পন কাঁপুনি তুলে বত্রিশ পাটি দাঁতে দাঁত
তালে তালে বাড়ি খায়
যেভাবে মাটির বুকে হাজার টনি স্টিম রোলার
ঘ্যা ঘ্যা কাল ধোঁয়ায় ফোঁস ফোঁস করে
টুটি চেপে ধরে বুকের উপর ধিক ধিক নাচ তোলে
সবল রসালো মাটির দেহ
পিষে পিষে পাতলা ফির ফিরে রুটির মত
সুদীর্ঘ সটান বাঁধা জ্যন্ত মানুষ বাঁধানো দু পাড়
গোরসম উঁচু বুক আর মুখের পর ডিভাইডার
কনক্রিট বিদেশি পাথর পুঁতে জাহান্নামের তপ্ত গরল পোড়া লালিমায়
কাল পিচ ঢেলে সরল মুখে ঝামা
লাউডগা সাপের ঢেউ কোমরে ভাঁজ ভেঙ্গে
এই জিকজাক পাকারাস্তা কোথায় যায়?

বড় ভয় ধরে যায়
মাটির হাড়ের মাঝে কোমল ডাবের মাশে
গাইতি শাবলের চকচকে ক্ষুরধার ফলা
খুবলে খুবলে কেটে নেয়
মাটির মাশে ঢাকা মাটি
পাছার ছিদ্রে ঢুকে বত্রিশ পজাতির ক্যাবলের ছবি
ছেনালি বেচাবেচি মানুষের হাটবাজারি
এই পাকারাস্তা কোথায় যায়?
ডিভাইডারে দেবদারুর কচি পাতায় জমাট বাঁধা ধুলার
পর্দা ঝাড়ে পার্লারে কিশোরীর দৈনিক পরাজিত তৈলক্রিম
কিংবা বেড়িবাঁধ বস্তির জৈনক আমাশয় রোগীর ছলাৎ ছলাৎ
মাখন মাখামাখির ড্রেনে
সেও নাকি এই পাকারাস্তার তলে শিরার মত চলে
এই পথে দু পায়ের রাস্তা ভোজনে হোঁচট লাগে পেট পেতে শুয়ে থাকা
ড্যন্ডিখোরের দল কোথা হতে?
পাকারাস্তায় কাঁচা আলো
রগরগে আনন্দ ফসল
বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো
এরা কি লাশে লাশ সঙ্গমে…

কি বিবা! এই পাকারাস্তার গোড়া কই পাবা?

স্বাতিজল — মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

স্বাতিজল বিনে কিছুই খায় না চকোর
যে জলে মুক্তা ফলে সারস নায় রাতে
 

নবীনা, নেমেছ তোমরা প্রদোষ রাজপথে
ভৃঙ্গার দল ডানা ভেঙ্গেছে সাধকের ভাঙ্গাদ্বারে

 

শতবাট ঘুরে এক ফোঁটা তবে স্বাতিজল ফোটে যদি
তড়িৎ জীবনে চুচু পিয়ো তুমি শুষ্ক অধর ছুঁয়ে
দ্বারে থাকে না তো মণি মুক্তা অতল সাগর তলে
রতিদান সে তো প্রতি দোরে দোরে নয় খালি পরদ্বারে

 

কোলাহলে তুমি স্বাতিজল পাবে চকোর হয়ো না আর
মুণি ঋষি ঐ টুটে ছুটে চলে মানস পুকুর পাড়।

আয়নায় — ইচ্ছা কুমার

 

চোখভরা পরিপাটি বিকেলের অমিত আয়নায়
বিভোর খুঁটিয়ে দেখি নিজস্ব পোর্ট্রেইট
নাকের ডানপাশে নিবিষ্ট তিল আর হৃদয়ের কৃষ্ণবিবর

 

মুহূর্তেই মেশিন চালু অদ্ভুত সিনেমা শুরু
চরিত্র: কাক, বাদুর, চিল আর পাখিরা
লক্ষ শ্রমিকের মতো ধ্যানভাঙ্গা পাখিদের কুচকাওয়াজ
মসৃন আকাশে উড্ডীন প্রতিটি দুডানা স্বাধীন মৃত্যুহীন
দূরে আরো উঁচুতে সুদূরের দুঃসমুদ্রে ডানাওয়ালা সাবমেরিন
ড্রোন নাকি বিভ্রমের মতো কিছু রহস্যকাজল পাখির আনাগোনা

 

হঠাৎ ধূসর মেঘ ইখতিয়ারের ঘোড়া
অথবা মেঘেরা সব উড়ন্ত ট্যাঙ্ক এফ সিক্সটিন
নীল নীল রক্তপিচ্ছিল আকাশে বিচ্ছুরিত মেঘের মসলিন

 

একফালি দ্যুতি মোতি শুক্লাচাঁদ
আকাশের পবিত্র স্তন ভালোবাসার জেরুজালেম

 

তোমার শরীরের ঘ্রাণ পাই
তোমার প্রাণের অনলে জোয়ারে আমার রক্ত উত্তাপ
তুমি এসেছো কি এখন এখানে
দীর্ঘ দীর্ঘ অপেক্ষা তোমাকে দেখার
তোমার চোখের কুয়ায় আমাকে দেখার।

সর্বজনের চোখে শাহবাগ

 

সম্পাদকীয়: অভূতপূর্ব! নান্দনিক! (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ১ ।। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

শাহবাগের ভবিষ্যৎ কি? — সলিমুল্লাহ খান (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ১ ।। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

সম্পাদকীয়: শাহবাগের সাকার ও আকার (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৪ ।। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষা শাহবাগের নিশান — আ-আল মামুন (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৪ ।। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

সম্পাদকীয়: চক্ষু তো অন্ধ হয় না অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয় (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৫ ।। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

সম্পাদকীয়: স্বৈরতন্ত্রের বিকার (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৬ ।। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

বাংলা গারো/মান্দি কোচ ভাষায় শাহবাগ আন্দোলনের শ্লোগান (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৮ ।। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

এসলাম ও বাংলাদেশ — সলিমুল্লাহ খান (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ১৪ ।। ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

রাজনীতির বিনির্মাণ: শাহবাগের হাত ধরে — জোবাইদা নাসরীন (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ১৬ ।। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

 

ফ্যাসিবাদের জিঘাংসা — সামসুদ্দোজা সাজেন (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ২১ ।। ১ মার্চ ২০১৩)

 

শাহবাগ মোড়: আমরা পাকিস্তানিরা কেন জানি না এবং জানতে চাই না — পারভেজ হুদাভাই, তর্জমা: অগণিতা বসন (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ২১ ও ২২ ।। ১ ও ২ মার্চ ২০১৩)

 

শাহবাগ: ফেব্রুয়ারি ২০১৩ — তুষার হাসান মাহমুদ (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ২৩ ।। ৩ মার্চ ২০১৩)

 

সজাগ মানুষেরাই এখন একমাত্র বাতি — আনু মুহাম্মদ (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৩১ ।। ১১ মার্চ ২০১৩)

 

সম্পাদকীয়: যুদ্ধপরাধবিরোধী আন্দোলন ও রাষ্ট্র সভার বুলেটিন (সর্বজন বুলেটিন, সংখ্যা ৩৫ ।। ১৫ মার্চ ২০১৩)

‘আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই’– আহমদ ছফা

 

মহাত্মা আহমদ ছফার এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হইয়াছিল বাংলা ১৩৯৯ সালের ২৩ শ্রাবণ তারিখে ‘বাংলাবাজার পত্রিকা’ নামক একটি দৈনিকে। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিয়াছিলেন সাংবাদিক রাজু আলাউদ্দিন ও জুলফিকার হায়দার। ‘সর্বজন’ পত্রিকার জন্য ইহা সংগ্রহ করিয়াছেন সৈয়দ মনজুর মোরশেদ। আমরা তাঁহাদের সকলের ঋণ স্বীকার করিতেছি।

আহমদ ছফার তুলনা আহমদ ছফাই। তাঁহার লেখা যেমন অনন্য, বলাও তেমন অতুলনীয়। গোটা ছয়টি প্রশ্নের উত্তরে তিনি এখানে একটা জাতির সংকটের ছবি অনিন্দ্যসত্য ভাষায় তুলিয়া ধরিয়াছেন। তিনি গিয়াছেন সংকটের একেবারে মর্মমূলে। তিনি বলিয়াছিলেন আমাদের জাতীয় সংকটের মূলে আছে আমাদের দেশি বুদ্ধিব্যবসায়ীদের অন্তর্গত সংকট — তাঁহাদেরই চরিত্র ও দায়িত্বহীনতা। সত্যের অনুরাগে তাঁহারা অবিচল নহেন।

আহমদ ছফার মতে, ‘লেখকের কাজ হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা বিস্তৃত করা, চিন্তার সীমানাকে বিস্তৃত করা।’ তিনি মনে করেন সত্য উদঘাটনই লেখকের কাজ কারণ ‘সত্যই একমাত্র মানুষকে উদ্ধার করতে পারে।’ বাংলাদেশে একমাত্র আহমদ ছফার পক্ষেই বলা সম্ভব ছিল, ‘আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই’।

‘বাংলাবাজার পত্রিকা’য় প্রকাশের সময় এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম সরবরাহ করিয়াছিলেন সাংবাদিক বন্ধুরা। তাঁহাদের দেওয়া শিরোনাম ছিল কঠিন: ‘আহমদ ছফা: প্রজ্ঞার আলো’; আমরা নতুন কোমল নাম রাখিলাম: ‘আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই’; বলা বাহুল্য, আমরা আহমদ ছফারই মুখনিসৃত একটি অমৃত হইতে এই নামটি লইয়াছি।

সলিমুল্লাহ খান

১ ডিসেম্বর ২০১৩

বাংলাবাজার পত্রিকা: কম্যুনিজমের বিপর্যয়কে আপনি কিভাবে দেখেন?

আহমদ ছফা: যখন কম্যুনিজম ছিল তখন থার্ড ওয়ার্ল্ডের মানুষের সামনে একটা অপশন ছিল। এটা ছিল এরকম যে আমরা পশ্চিমা সমাজব্যবস্থার বাইরেও অন্যরকমভাবে আমাদের সামাজিক সমস্যাবলি সলভ করার চেষ্টা করতে পারি। এই বিশ্বাসটাকে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।

সুতরাং এখন আমাদের জন্য দরকার একধরনের বিকল্প উপায়। সমগ্র অবস্থাটাকে একেবারে অন্যরকম চিন্তাচেতনা দিয়ে ভাবতে হবে। এটা করতে না পারলে যা হবে [তা অভাবনীয়]। যেমন এই সন্ত্রাসের সৃষ্টি। এখন বাংলাদেশে এমন একটি অবস্থা এসেছে — আমি তো মনে করি এ সময়ে ঐসব এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনগুলো একেবারে দুই বছরের জন্য বন্ধ করে দেয়া উচিত। বন্ধ করে দেয়া হোক। বন্ধ করে দিয়ে এই মাস্টার এবং ছাত্র সবাইকে গ্রামে পাঠানো হোক। তাহলে এই সন্ত্রাসটা বন্ধ করা যাবে। আর ইউনিভার্সিটিগুলো তো এমনিতেই বন্ধ থাকে। মাস্টাররা তো না পড়িয়েই মাইনে পাচ্ছে। সুতরাং এইসব শিক্ষিত মাস্টার ও ছাত্রদেরকে গ্রামে পাঠিয়ে গণশিক্ষার কাজে ব্যবহার করা হোক। এক একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের পেছনে তাদের বাবা-মা প্রচুর টাকা খরচ করে, তার পরেও বছরে একটা ছেলের পেছনে সরকারের বিরাট অঙ্কের টাকা ব্যয় হয়। এই ছেলেরা যদি এভাবে মারামারি করতে থাকে — ব্যাটারা বন্ধ রাখুক এক বছর। বন্ধ রেখে সংশোধন করুক।

এখন এই রোগ এতই জটিল হয়ে গেছে যে, মাস্টাররাও সংক্রমিত হয়ে গেছে। সুতরাং এক বা দুই বছর বন্ধ রেখে সংস্কার করা হোক। এ সময়ের মধ্যে আমাদের এমফেসিস দিতে হবে প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি এডুকেশনের ওপর। কারণ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা যদি শক্ত না হয় তাহলে শিক্ষার কোন বুনিয়াদ সৃষ্টি হয় না। এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার প্রাইমারি স্কুল। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ কমিয়ে এটা প্রাইমারি খাতে ইনভেস্ট করা হোক। আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ঘটনা শুনলাম — এটা বন্ধ করে দিলে কি হয়? যদি ইউনিভার্সিটিতে জ্ঞানচর্চা না হয়, পবিত্রতা না থাকে, মানবতার মৌলিক শিক্ষাগুলোর চর্চা না হয় তাহলে এটা বন্ধ করে দিলে কি হয়! এমনিতেও তো পাঁচ বছরের জায়গায় বারো বছর লাগে। সুতরাং দুই বছর বন্ধ রেখে টেনশনটাকে ডিফিউজ করা হোক। ইটিজ দা বেস্ট সলুশন।

ভাস্কর: শামীম সিকদার

ভাস্কর: শামীম সিকদার

বাংলাবাজার পত্রিকা: মাঝে মাঝে তো সন্ত্রাসী ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় দুই বা তিন মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয় এবং খোলার পর আগের মতই সন্ত্রাস চলতে থাকে। সুতরাং বন্ধ করে দিলেই কি সন্ত্রাস দূর হবে?

আহমদ ছফা: এক বা দুই মাসের জন্য নয়, একদম দুই বছরের জন্য বন্ধ করে দিতে হবে। এখানে কোন ক্লাস হবে না, ইলেকশন হবে না, কোন পার্টি হবে না, নো ছাত্রলীগ, নো বিএনপি, নো জামাত এবং এই দেড় দুই লাখ ছেলেকে গ্রামে পাঠিয়ে গ্রামসংস্কার কাজে নিয়োগ করতে হবে।

বাংলাবাজার পত্রিকা: বর্তমান মুহূর্তে সরকার ও বিরোধী দল রাজনীতিতে কি ধরনের ভূমিকা রাখছে বা ভবিষ্যতে এরা দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়?

আহমদ ছফা: এটা আমি জানি না। রাজনৈতিক দলগুলো সে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যেই হোক তারা যে কাজটা করে, দেখতে হবে তার সামাজিক ডিমান্ড আছে কিনা। আজকে বিএনপি সরকারের রবীন্দ্রজয়ন্তী করার কথা না। খালেদা জিয়া রবীন্দ্রনাথ বোঝে না, [তবু তারা এটা] এ কারণেই করে যে, এটার সামাজিক ডিমান্ড আছে। সুতরাং সামাজিক ডিমান্ড হচ্ছে রাজনীতির চেয়ে বড়। আমাদের রাজনীতির বয়স কত? ৩০ বছর? কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের বয়স ১০০০ বছর।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের সবচাইতে বড় গুণ হল এই, অন্যান্য লেখকরা সব সময় চলমান রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন, তিনি লিখেছেন সমাজ নিয়ে। সমাজটা হাজার বছরের, পলিটিকসটা খুব রিসেন্ট। এখানে সবাই পলিটিকস করতে চায় কিন্তু সমাজকে বাদ দিয়ে। পলিটিকস যদি সমাজকে কন্ট্রোল করে তাহলে এর ফল শুভ হয় নয়। সমাজই পলিটিকসকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এখানে যে স্বর্গ থেকে এসে একটা [লোক] সবকিছু ঠিক করে দিয়ে যাবে তা না। আমাদের নিজেদের মধ্য থেকে একটা রেনেসাঁসের দরকার। এর আগেও একাজটি করা যে হয়নি তা না। এমনকি আকরম খাঁ বা মানিক মিয়া সাহেবও তাদের লিমিটেড ক্যাপাসিটি থেকে এটা করেছেন। এটা করার জন্য যা দরকার তা হলো মাটি ও মানুষের প্রতি আনুগত্য। কিন্তু এখন এই কাজটা কারা করবে? মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে প্রচণ্ড মানসিক শক্তি দরকার তা তো নেই।

আধুনিক মানের যে আর্ট এটা তো নেই কারো এবং সবাই তো লোভে [পড়ে] কাজ করছে। আমাকে কবি বলুক, আমাকে সাহিত্যিক বলুক — এই যে লোকের একটা আকাক্সক্ষা এটাও এক ধরনের লোভ। এর ফলে একজন লোক নিজেকে অতিক্রম করে যাবার স্পৃহাটা হারিয়ে ফেলে।

তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের দেশটা খারাপ দেশ নয়। আমাদের মানুষ খারাপ মানুষ নয়। কদিন আগে এক মার্কিন ভদ্রলোক এসেছিলেন, আমাদের ল এন্ড অর্ডার সিচুয়েশন নিয়ে অনুযোগ করলেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম নিউ ইয়র্কের পুলিশ বাজেট কত আর ঢাকার পুলিশ বাজেট কত? নিউ ইয়র্কের পুলিশ বাজেট আমাদের জাতীয় বাজেটের আড়াই গুণ বেশি আর ক্রাইমের পরিমাণ ১০ গুণ বেশি। আমাদের দেশে চুরি-ছিনতাই হচ্ছে কিন্তু লস এঞ্জেলসে যে ঘটনা ঘটে গেল — বন্যার মত লোকজন এসে সব লুটেপুটে নিয়ে গেল — তো এদেরকে আমরা সিভিলাইজড সোসাইটি বলি কেন? আমাদেরও তো একটা সভ্যতা আছে। আমাদের যে একেবারে আশা নেই এটা ঠিক নয়।

কিন্তু এই ভাল সমাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাবার দায়িত্ব যাঁদের ওপর তাঁরা কি করছে? এখানকার ইন্টেলেকচুয়াল ক্রাইমের পরিমাণ শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে। সুতরাং আমাদের ইন্টেলেকচুয়ালরা সমাজকে কিছু দিতে পারছেন না। একটা ক্রাইসিস চলছে। আমি নিজে চেষ্টা করে ছয়টি বাংলা উপন্যাস জার্মানিতে অনুবাদ করানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। আশ্চর্যের কথা হলো, ওখানে পাঠানোর মত ছয়টি উপন্যাস আমি পাইনি। বঙ্কিম বাংলা গদ্যে রেনেসাঁসের সূচনা করেছিলেন। কিন্তু তিনি গোঁড়া সাম্প্রদায়িক, তাঁর নাম উচ্চারণ করলেও অজু করতে হয়। তারপরও তিনি সমগ্র বাংলা গদ্যকে একটা স্টার্টিং দিয়েছিলেন। এটা আমাদের সাহিত্যে কেউ দিতে পারেননি।

বাংলাবাজার পত্রিকা: এটা কি বলা যায় যে মূল্যবান জিনিসটা পপুলারিটি পায় কিন্তু অনেক পরে?

আহমদ ছফা: মূল্যবান জিনিস পপুলার না হলেও কোন ক্ষতি নেই এবং কম লোক বোঝে বলেই এটা মূল্যবান। আমি জনপ্রিয় লেখকদের মত না লিখে কোন অন্যায় তো করিনি। লেখকের কাজ হচ্ছে মানুষের স্বাধীনতা বিস্তৃত করা, চিন্তার সীমানাকে বিস্তৃত করা। আর একজন লেখক তো নট নন, ফিল্ম একটর নন, রাজনৈতিক প্রচারক নন। তাঁর কাজ হচ্ছে সত্যকে উদঘাটন করা, সত্যই একমাত্র মানুষকে উদ্ধার করতে পারে। আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই।

বাংলাবাজার পত্রিকা: বাইরের সংস্কৃতির অবাধ অনুপ্রবেশকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

আহমদ ছফা: জীবনানন্দ বলেছেন, ‘দূর পৃথিবীর গন্ধে ভরে ওঠে আমার এই বাঙ্গালীর মন’। এখন তো বাইরের পৃথিবী আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এই যে ডিশ এন্টেনা আসলো, সারা [পৃথিবী] ঘরের কোণে চলে এসেছে, পৃথিবীর প্রবাহগুলো তরঙ্গের মত আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আমাদের উচিত এ সময় একটি জাতীয় মানস তৈরি করা, যাতে করে পৃথিবীর তরঙ্গগুলো আমরা রিসিভ করতে পারি। কিন্তু আনফর্চুনেটলি, আমাদের দুই প্রধান নেতা ভাসানী ও শেখ মুজিব — এ দুজনের যদি আধুনিক শিক্ষার আলো থাকত! মাওলানা সাহেব ছিলেন ট্রাডিশনাল লিডার এবং শেখ সাহেব ছিলেন একেবারে জননন্দিত ব্যক্তি। রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ মুজিবের অবদান খুবই মূল্যবান। তিনি হাজার বছরের সবচাইতে মূল্যবান ব্যক্তি কিন্তু একটা রাষ্ট্র চালানোর [জন্য] যেসব বিষয়ে আধুনিক শিক্ষা দরকার ছিল, [যেমন] আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি — এগুলো তাঁর দখলে ছিল না। এই অভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। এখন যাঁরা আছেন তাদেরকে সবদিক দিয়ে আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাবাজার পত্রিকা: গণ আদালতের বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?

আহমদ ছফা: গোলাম আযমের প্রতি জনগণ যে রায় দিয়েছে, এটা ঠিক আছে। খুবই ভাল হয়েছে। এটার দরকার ছিল। সরকারগুলো বছরের পর বছর যা ইচ্ছা তাই করবে! জনগণেরও একটা রায় আছে, জনগণ সেটা সাহসের সাথে জানিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একটা স্পষ্ট সীমারেখা সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু একটা বিষয়ে আমার ভয় হচ্ছে। এখন আমরা যেভাবে এগুচ্ছি তাতে গোলাম আযমকে একটা শহীদের মর্যাদা দিতে যাচ্ছি। জামাত-শিবিরকে মোকাবেলা করতে হলে একটু গভীরে যেতে হবে। এই যে পার্লামেন্টে জামাত এতগুলো সিট পেল — এটা কেন পেল? এটা তলিয়ে দেখতে হবে। যেসব অপকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে জামাত জনমনে প্রভাব বিস্তার করছে সেগুলোর পাশাপাশি পাল্টা মতামত ও বক্তব্য নিয়ে আমাদেরকে জনগণের কাছে যেতে হবে।

আমি একবার গ্রামে গিয়ে আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে দেখলাম যে সে ক্যাসেটে সাঈদীর বক্তৃতা শুনছে। আমার মনে হলো, গ্রামের অন্তঃপুর পর্যন্ত যে ব্যক্তির প্রভাব পৌঁছে গেছে তার এই জনপ্রিয়তার উৎসটা কি।

সাঈদী প্রতিটি মাহফিলে বক্তৃতার জন্য সম্মানী নেন পঁচিশ হাজার এক টাকা এবং এক বছরের আগে তাঁর শিডিউল পাওয়া যায় না। ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতা দিয়ে ও ক্যাসেটের রয়ালটি বাবদ সাঈদী যে অর্থ পায় তা বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মাইকেল জ্যাকসন [তুল্য] বলা যেতে পারে। সুতরাং এসব চিন্তা করে সাঈদীর বক্তৃতাগুলো আমি একদিন ভাল করে শুনলাম।

শুনে আমার যেটা মনে হলো তা এই। সাঈদী যদি ওয়াজ না করে গান গাইতেন, তাহলেও খুব জনপ্রিয় গায়ক হতেন। দ্বিতীয়ত তাঁর বলার মধ্যে তিনি একধরনের ড্রামাটিক সাসপেন্স তৈরি করেন। তিনি একজন ভাল অভিনেতা এবং শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখার ক্ষমতা রাখেন। তৃতীয়ত নাটক বা গান শুনতে পয়সা লাগে, ওয়াজ শুনতে পয়সা লাগে না। চতুর্থত যৌন আবেদনমূলক ছায়াছবি মানুষ যে কারণে এনজয় করে, সাঈদীর বক্তৃতায় তাও রয়েছে। ওঁর বক্তৃতায় আধুনিক ব্লু-ফিল্মের উপাদান রয়েছে।

তিনি যদি একঘণ্টা বক্তৃতা করেন তার মধ্যে অন্তত দশ মিনিট থাকবে যৌনতা। পঞ্চমত ব্লু-ফিল্ম দেখার পর দর্শকের মনে এক ধরনের পাপবোধ জাগে, অন্যদিকে ওয়াজ শোনার পর মনে পূন্যের সঞ্চার হয়। সুতরাং আমি দেখলাম যে সাঈদীর জনপ্রিয়তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অতএব আমাদের যেটা উচিত ছিল তা হলো এ বিষয়ে একটা পুস্তিকা লিখে জনগণকে সচেতন করে তোলা। আমরা এটা না করে সাঈদীর বক্তৃতাসভা পণ্ড করার লড়াইয়ে নেমেছি এবং এর ফলে তাঁকে একজন স্টার বানিয়ে দিয়েছি।

স্বদেশের জন্য অন্ধ হয়েছিল যে মুক্তিযোদ্ধারা–কাজী নূর-উজ্জামান

 

ডিসেম্বর ও মার্চ মাস এলে কিছু পত্রিকা থেকে আমার কাছে লেখার তাগিদ আসে। কি নিয়ে লিখব, জানতে চাইলে বলা হয়, সেক্টর কমান্ডার হিসাবে স্বাধীনতাযুদ্ধের বিভিন্ন অপারেশনের বর্ণনা, গেরিলা বাহিনীর কার্যপদ্ধতি প্রভৃতির স্মৃতি নিয়ে লেখার জন্য। সবাই স্বাধীনতাযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বের কথা জানতে চান, সক্রিয় যোদ্ধাদের কথা জানতে চান। কখনও কখনও এমনও মনে হয়, এই তাগিদের মধ্যে যেন এ কথাও প্রকাশ পায় যে, আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবজনক ঘটনা এই মুক্তিযুদ্ধে যেন কেবলমাত্র কিছু অস্ত্র সজ্জিত সদস্যই অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধে কোটি কোটি মানুষের বলীয়ান আত্মত্যাগের বাস্তবতা ধামাচাপা পড়ে যায়। বিগত ২৮ বছর ধরে যেন কতিপয়ের চর্বিত চর্বণ চলে আসছে লেখায়, শিল্পে, সাহিত্যে, নাটকে, চলচ্চিত্রে। গণমানুষের  জনযুদ্ধের বিশাল পটভূমি ও বিপুল অংশগ্রহণের অধ্যায় আজও অনুন্মোচিত।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কাল রাতে পাক বাহিনীর হিং¯্র আক্রমণের পূর্ব পর্যন্ত স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধ বা মুক্তিসংগ্রামের কোন প্রস্তুতি আমাদের ছিল না, চিন্তায়ও ছিল বলে দেখা যায়নি। প্রতিরোধের জন্য ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছিল বটে, কিন্তু পাশাপাশি চলছিল রাজনীতিকদের আপোস ফর্মুলার সন্ধান। রাজনীতিকরা সেদিন বিভ্রান্তির মধ্যে থাকলেও পাক সামরিক জান্তা কিন্তু মোটেও বিভ্রান্ত ছিল না। তারা কোন দ্বিধায়ও ভোগেনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে অন্তত আরও পাঁচ বছর কব্জায় রাখার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা সেনাবাহিনীকে প্রায় প্রকাশ্যেই ঢেলে সাজিয়েছে, পাশাপাশি চালিয়েছে আলোচনার ভাওতা। একাত্তরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তারা জাহাজ ও প্লেনে করে এখানে সামরিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি করেছে, বৃদ্ধি করেছে সেনাবল। সেদিন আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিক, আমলা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ কোন মহলই সামরিক শক্তি বৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, সন্দেহ করেনি, জাতিকে আসন্ন ভয়াবহ বিপর্যয় ও যুদ্ধের আশঙ্কার ইঙ্গিত দিতে পারেনি। যদি তা পারত, হয়ত প্রাণহানি ও ক্ষতির পরিমাণ আরও কম হতো। যাক সে কথা।

8.1১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে আমরা যখন আক্রান্ত হলাম, শুরু হল যখন ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা, পুলিশ, ইপিআর, জোয়ান, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন মোড় নিল। স্বাধিকারের আন্দোলন মুহূর্তে রূপ নিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। জনগণ হাতে তুলে নিল হাতিয়ার। হানাদার বাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতা ও হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে শুরু হল রাজনৈতিক, সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রাম। সেই মহতী যুদ্ধে আমরা বিজয় লাভ করেছি। কিন্তু আমরা আজকের আলোচ্য যুদ্ধের সামগ্রিক পটভূমি বা ইতিহাস নয়, একটি বিশেষ ঘটনা তুলে ধরা — যা আমাদের সামগ্রিক সাফল্য-ব্যর্থতার ধ্রুপদী উদাহরণ বলে আমার কাছে মনে হয়।

১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষ ভাগ থেকে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আমি আগরতলায় ছিলাম। তখনও আমাকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের রণাঙ্গনের জন্য কিছুদিন আগে জেনারেল ওসমানী এক বৈঠকে শফিউল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদ মোশাররফকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। জেনারেল ওসমানী আমাকে বললেন, যেহেতু আমি সবার সিনিয়র এবং ‘স্টাফ কোয়ালিফাইড’ সেহেতু বিশেষ কারণে আমাকে আসামের তুরায় জেতে হবে। আমি বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি সম্ভবত গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে আর বেশি কিছু বলেননি। এরপর তিনি কলকাতায় চলে যান।

তখন আমি আগরতলায় মুক্তিযোদ্ধা আর শরণার্থীদের কাছে আসা-যাওয়া করছি। বিএসএফ হেডকোয়ার্টারে বাংলাদেশের অফিসারদের যাওয়া-আসা ছিল। শফিউল্লাহ ও জিয়াউর রহমান মাঝে মাঝে আসতেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতাম। সামগ্রিক ব্যবস্থা নিয়ে শফিউল্লাহ ও জিয়া সন্তুষ্ট ছিলেন না। যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব তাদের দেয়া হলেও রিক্রুটিং, ট্রেনিং, অস্ত্র সরবরাহ, চিকিৎসা — সব ব্যাপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষই ছিল চূড়ান্ত এবং এসবের জন্য বার বার ধরনা দিতে হতো। সেক্টরগুলোর বিভিন্ন সমস্যা কলকাতায় আমাদের নিজস্ব হেডকোয়ার্টারে জানানো দুরূহ ছিল। এছাড়া জেনারেল ওসমানী ছিলেন মূলত দাফতরিকভাবে দক্ষ ও সচেতন, সেনাবাহিনীতে যাকে বলা হয় উদটধর ০ঠমরভণ [হুবহু] সৈনিক। তার পক্ষে বার বার পূর্বাঞ্চলে আসা ছিল অসম্ভব ও সময় সাপেক্ষ। আমরা সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে মতৈক্যে এলাম যে, বাংলাদেশের পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনের আলাদা দুটি হেডকোয়ার্টার করলে এবং ওসমানী সাহেবের দায়িত্ব বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে রণাঙ্গনে সক্রিয়তা বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আমাকে দায়িত্ব দেয়া হল। আমি তাজউদ্দীনের সাথে কথা বললাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে সব শুনে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য একটু সময় চাইলেন। আমার সন্দেহ হল, তাজউদ্দীন সাহেব হয়ত এই প্রস্তাবকে সামরিক বাহিনীর অফিসারদের উচ্চাভিলাষ বলে ধারণা করছেন। আঁচ করতে পেরে আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে বললাম যে, আমি এখনই তার কাছে আমার তারিখবিহীন পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে রাখছি, যদি কখনও তিনি প্রয়োজন মনে করেন, পদত্যাগপত্রে শুধু তারিখটি বসিয়ে নিলেই হবে। এর মাধ্যমে আমি এটাও বোঝাতে চেয়েছি যে, আমরা দেশমাতৃকার আহ্বানে স্বেচ্ছায় যুদ্ধ করতে এসেছি। যুদ্ধ সুষ্ঠু ও সফলভাবে পরিচালনাই প্রস্তাবের লক্ষ্য, অন্য কিছু নয়। যুদ্ধে যুদ্ধে কেটে গেল সময়- বিজয় না হওয়া পর্যন্ত। আমরা বিজয় অর্জন করলাম ১৬ ডিসেম্বর।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই নতুন দায়িত্ব এসে পড়ল। সেক্টর ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের গুটিয়ে এনে সমবেত করা এবং বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করা। সপ্তাহখানেক কেটে গেল। এরপর আমি আমার অঙ্গীকার রক্ষার জন্য কলকাতায় গেলাম। এছাড়া কলকাতায় আমার যাওয়ার কথা নয়। আজ ভাবি যদি না যেতাম মুক্তিযুদ্ধের একটি বড় দিকই আমার উপলব্ধির আড়ালে থেকে যেত।

8.2কলকাতায় বাংলাদেশ সরকারের অফিস তখন প্রায় খালি। অফিসে দেখা হলো ভারতীয় একজন কর্নেলের সঙ্গে। তার হাতে একটি তালিকা। তিনি বাংলাদেশের এমপি এবং এমএনএদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন। দমদম এয়ারপোর্টে প্লেন দাড়িয়ে আছে যাত্রীর অভাবে। কর্নেল সাহেবকে উ™£ান্ত দেখে আমি পরিস্থিতি হাল্কা করার জন্য বললাম, যাত্রীরা সবাই হেঁটে ভারতে এসেছিলেন, এখন মনে হয় হেঁটেই আবার স্বাধীন দেশে চলে গেছেন। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কোথায়? তিনি ইশারায় দেখিয়ে দিলেন।

যদ্দুর মনে পড়ে, সেদিন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবকে আমি একাই পেয়েছিলাম। তবে কয়েক বছর পরে তাজউদ্দীন সাহেবের প্রাইভেট সেক্রেটারি ডা: ফারুক আজিজ খান আমাকে বলেছেন যে, সেদিন তিনিও উপস্থিত ছিলেন। যা হোক, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেই সাক্ষাৎকারের স্মৃতি প্রকাশ করার ভাষা আমার নেই। প্রধানমন্ত্রীর কক্ষের অবস্থা দীনহীন। অনাড়ম্বর সেই কক্ষে প্রশান্ত মনে হাত বাড়িয়ে তিনি আমাকে স্বাগত জানালেন। আমাদের দুজনের আলোচনায় সুখ-দুঃখের স্মৃতিচারণার চেয়েও বেশি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। কথা শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি এখনও দেশে গেলেন না যে?’ উত্তর দিলাম, দেশ থেকেই আপনার কাছে এসেছি, আমার পদত্যাগপত্রে তারিখ বসিয়ে আপনার কাছ থেকে বিদায় নিতে। তিনি আবার প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আর কিছুদিন সময় কি আপনি আমাকে দেবেন না?’ তার কণ্ঠে আদেশের সুর ছিলই না, ছিল দেশের প্রতি কর্তব্য পালনের ইঙ্গিত। বের হয়ে আবার সেই ভারতীয় কর্নেলের সাথে দেখা। এবার তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ করলেন। ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, আপনারা কেমন স্বার্থপর বলেন তো। সবাই দেশে ছুটে যাচ্ছেন, কিন্তু আহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আপনাদের কোন কর্তব্য নেই? ব্যাপারটা খোলসা করে বললেন তিনি। ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার খবর শুনে তারা উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। কিন্তু দেশের কাউকে পাচ্ছেন না কথা বলার জন্য। এর মধ্যে সবচেয়ে করুন ঘটনা ঘটেছে কলকাতার আলীপুর হাসপাতালে। সেখানে আটজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যুদ্ধে অন্ধ হয়ে গেছেন। ডাক্তাররা চেষ্টা করছেন দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে। অনেক সময় লাগবে। এই অন্ধ মুক্তিযোদ্ধারা শুধুমাত্র দেশের খবর জানার জন্য হাসপাতালের কর্মচারীদের মাধ্যমে থিয়েটার রোডে খবরও পাঠিয়েছেন, কিন্তু কেউ দেখা করতে যাননি। এখন তাঁরা খুব বিচলিত। অবস্থা দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর কাছে খবর পাঠিয়েছে।

কথা শুনে ব্যথিত হলাম। ছুটলাম সেই হাসপাতালে। অন্ধ মুক্তিযোদ্ধারা চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন যার যার বেডে। হতাশ এবং অসহায় লাগছিল তাদের। ক্ষোভ ও অভিমানে বিমর্ষ। আমি এসেছি শুনে একজন আনন্দে চিৎকার করে বললেন, ‘ওরে, সবাই শোন, সেক্টর কমান্ডার এসেছেন। তোরা সবাই এখানে আয়।’ অন্ধরা হাতড়ে হাতড়ে একে একে সবাই জড়ো হলেন এক বেডে। আমি আবেগে বিমূঢ়। তাঁরা আমার কাছে কোন অভিযোগ করলেন না, কাঁদলেন না। সবার প্রশ্ন অভিন্ন, ‘স্যার দেশ থেকে এলেন? কেমন লাগল? স্বাধীন বাংলাদেশের চেহারা এখন কেমন স্যার? নিশ্চয় ভয়াবহ রূপ কেটে গিয়ে হাসি ফুটছে? কতটুকু বদলেছে? বলুন, বলুন।’

একজন অন্ধ মুক্তিযোদ্ধা আমার হাত দুটি নিয়ে তার মুঠোয় ভরে তার চোখে ছোঁয়ালেন, বললেন, ‘স্যার আমরা হয়ত আর কোন দিন দেখতে পাব না। আমাদের অন্তরের দৃষ্টি আপনার চোখে দিলাম। আমাদের হয়ে স্বাধীন দেশকে দেখবেন।’ সবাই পালা করে আমার হাত দুটি নিয়ে তাদের চোখেমুখে বুলাতে লাগলেন। অন্তরভেদী এই ছোঁয়া, হৃদয়ভেদী এই স্পর্শ। আমার কাছে মনে হল, আমার সারাজীবনে এর চেয়ে পবিত্র আর কিছুর স্পর্শ আমি পাইনি। তাঁরা বললেন, আমি যেন স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন রূপ দেখে তাদের কাছে গিয়ে বর্ণনা করে আসি। আমি তাদের কাছে ফিরে যেতে পারিনি। যাওয়ার মত মুখ আমার ছিল না। যে দেশ ও সমাজ পেলাম, সেটা তাদের কাক্সিক্ষত দেশ নয়, কাক্সিক্ষত সমাজ নয় — মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন-চেতনার দেশ নয়। আমি আজও খুঁজে ফিরি অন্ধদের স্বপ্ন-চেতনার সেই প্রত্যাশিত দেশকে। হয়ত এর জন্য একাত্তরের ২৫ মার্চের মতো আরেকটি বিস্ফোরণের অপেক্ষা করতে হবে।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক জনকণ্ঠ, বিজয় দিবস সংখ্যা

১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৯