Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 28, 2013

সম্পাদকীয়

লক্ষ্যভ্রষ্ট হইলে চলিবে না

মানবতাবিরোধী অপরাধ আদালত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় প্রদান করিয়াছেন। মাসের শুরুতে অপর জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাগারের সাজা ঘোষণার পর সেই রায়ের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া জাতীয় আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল ‘সকল যুদ্ধাপরাধীর’ সর্বোচ্চ শাস্তি — সোজা কথায় ফাঁসি। সাঈদীর বিরুদ্ধে রায়ে সেই দাবির সামান্য অংশ পূরণ হইয়াছে মাত্র।

ইহাতে আন্দোলনকারীদের মাতোয়ারা হইলে চলিবে না। অন্য যে পাঁচজন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা চলমান সেইসব মামলাতেও যেন একই ধরনের রায় আসে সেই ব্যাপারে সোচ্চার থাকিতে হইবে। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, সাঈদীর বিরুদ্ধে যে ২০টি অভিযোগে মামলা চলিতেছিল তাহার মধ্যে মাত্র ৮টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। ইহাতে মামলার তদন্তকার্য এবং প্রসিকিউশনের দুর্বলতাই আবারো সামনে আসিয়া পড়িল।

তদুপরি, কাদের মোল্লার মামলায় সরকারপক্ষ হইতে — বিশেষ আওয়ামী লীগ পক্ষে — আপোসরফা কি আঁতাতের অভিযোগে যে আন্দোলন শুরু হইয়াছিল সেই অভিযোগ নানান ঘাত প্রতিঘাতে অনেক আগেই কর্পুরের ন্যায় মিলাইয়া গিয়াছে। আমরা বলিব, আপোসরফার পথ পরিহারের কোন কার্যকর ইঙ্গিত এখনো আওয়ামী লীগ কি সরকার দিতে পারে নাই। সাঈদীর মামলার রায়ের পর, জনতার সাময়িক স্বস্তির সুযোগে, তলে তলে আরো কোন গভীর আঁতাতের আশঙ্কাও উড়াইয়া দেওয়া যাইবে না। রায় কার্যকর না হইবার পূর্ব পর্যন্ত তিলমাত্র তৃপ্তির কোন কারণ নাই। মুক্তিযুদ্ধের দায় শোধ করিতে সোচ্চার জনতাকে তাই আরো বেশি সোচ্চার, আরো বজ্রকণ্ঠ হইতে হইবে। সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে সমর্থনকারীদের আন্দোলনের মাঠে আরো বেশি বেশি অংশ লওয়াইতে হইবে। কোনভাবেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হইলে চলিবে না।

জনতার রায় সত্যি হল!

Fulজয়তু শাহবাগ! জয়তু বাংলাদেশ! সারাদেশ জুড়ে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে চলমান আন্দোলনের প্রথম বিজয়।

বিজ্ঞ মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ একাত্তরের ঘাতক দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায় দিয়েছে। ২০টি মামলার ৮টিতে সাঈদী দোষী সাব্যস্ত হন। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর মামলায়  সর্ব্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির রায় দেওয়া হয়।

ট্রাইবুনাল জানান, এই দুই অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়ায় বাকিগুলোতে আর সাজা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

এটি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তৃতীয় ও এই ট্রাইব্যুনাল থেকে দেওয়া প্রথম রায়। রায়টি ছিল ১২০ পৃষ্ঠার।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইবুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) ধারায় সাঈদীর বিরুদ্ধে যে ২০টি অভিযোগ গঠন করা হয় তার মধ্যে রয়েছে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও বিভিন্ন ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন এবং তাতে সহযোগিতা করা। মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে হত্যা, অপহরণ, আটক রাখা, নির্যাতন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও ধর্মান্তর করা এবং এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতা করা।

সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠন করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিন হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নয়জনের বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ১০০ থেকে ১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরকরণে বাধ্য করার ২০টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয়।

যে দুটি অভিযোগে ফাঁসি হল

৮ম অভিযোগ: ৮ মে ১৯৭১। দুপুর ৩টার দিকে তারা মানিক পশারীর বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে মফিজ উদ্দিন ও ইব্রাহিম কুট্টিকে আটক করে নিয়ে আসেন। এরপর মানিক পশারীর বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আটককৃত মফিজ উদ্দিন ও ইব্রাহিম কুট্টিকে নিয়ে এসে পাড়েরহাট বন্দরে ইব্রাহিম কুট্টিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর মফিজউদ্দিনকে রাজলক্ষী হাইস্কুলের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে পালিয়ে আসেন মফিজ উদ্দিন।

১০ম অভিযোগ: ২ জুন ১৯৭১। সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে সশস্ত্র দল উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাঈদীর ইন্ধনে বিসাবালী নামের একজনকে নারিকেল গাছের সাথে বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়।

মিছা তত্ত্বে লাভ শুন্য – শারমিন সুলতানা

(C) অনন্ত ইউসুফ

(C) অনন্ত ইউসুফ

১৯৩৫ সালে সাহিত্যিক ও সমালোচক, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সেনাপতি কাজী আব্দুল ওদুদ বিশ্বভারতীতে ‘হিন্দু-মুসলমান বিরোধ’ শিরোনামে ধারাবাহিক বক্তৃতা করেন। একাধিক কারণে এই বক্তৃতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার বিদ্বৎসমাজের মুকুট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে গভীর চিন্তাপ্রসূত এই বক্তৃতা সম্পাদিত হয়। আর তখন দিনকে দিন বাংলা তথা ভারতবর্ষের রাজনৈতিক নিয়তি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে রক্তাক্ত হয়ে উঠছে।

কাজী আব্দুল ওদুদের ‘হিন্দু-মুসলমান বিরোধ’ বক্তৃতার সারমর্ম করা সহজসাধ্য নয়। ইতিহাসের আলোকে তিনি হিন্দু-মুসলমান বিরোধের কারণ খুঁজতে চেয়েছেন। ওদুদের মতে ঐতিহাসিক কারণেই হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সদ্ভাব তৈরি হয় নাই। ইংরেজপূর্ব ভারতেও তিনি হিন্দু-মুসলমানের বিরোধের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। তাঁর মতে পারস্পরিক আস্থা ও সহানুভূতির অভাবই মূলত এই দুই সম্প্রদায়ের বিরোধের হেতু। কিন্তু আব্দুল ওদুদের ব্যাখ্যায় হিন্দু-মুসলমান বিরোধের মঞ্চে ঔপনিবেশিক ইংরেজের কোন ইন্ধন নেই বললেই চলে। উপরন্তু এই সেই দিন বর্ণহিন্দুদের চাপে হিন্দু-মুসলমান মিলনের শেষ আশ্রয় বঙ্গীয় চুক্তির (বা বেঙ্গল প্যাক্টের) অকাল নৌকাডুবির কোন হদিসই পাওয়া যায় না।

কাজী আব্দুল ওদুদ সত্যনিষ্ঠ হয়ে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে ভয়ঙ্করভাবে ব্যর্থ হন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের প্রশংসাধন্য ওদুদের এই বক্তৃতামালা দেশের গুরুতর সমস্যা সমাধানে কোন কাজে লাগল না। মিছা তত্ত্বে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ থাকলেও (১ম পৃষ্ঠার পর)


তাতে কাজ হয় নাই। ১৯৪৭ সালের করুণ দেশভাগ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে জাতীয় আন্দোলন দিনকে দিন বেগবান হচ্ছে। জাতীয় জীবনের এই মহৎ আন্দোলন সকল সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের বিপরীতে পরিচালিত হচ্ছে। সেই মুহূর্তে এই জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে কিছু সাধু পুরুষ ‘বিভেদ ও ইসলাম বিদ্বেষের’ খনি খুঁজে পেয়েছেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে কৃষক, শ্রমিকসহ আপামর জনসাধারণ বাদে বিশ্বের কোন পরাশক্তি কখনো চায় নি। ভারত, চীন কিংবা আমেরিকা কেউই না। ভারত এই যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ায় শুধু তার নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য।

মুক্তিযুদ্ধ কারও দান বা বকশিসের ব্যাপার ছিল না। বর্তমান এই যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধেরই ধারাবাহিক দাবি। কোন বিদেশি শক্তির ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ নয়। এদিকে আজ যারা যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনকে এসলামবিদ্বেষী বলছেন তারাও মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজাকারির ধারাবাহিকতা রক্ষা করছেন মাত্র। ১৯৭১ সালেও এসলাম রক্ষার নামে খুন-ধর্ষণ জায়েজ করেছিল এই সকল পুরুষোত্তমরা।

ইতিহাসের কাঠগড়ায় রবীন্দ্র মানসপুত্র মহাজ্ঞানী কাজী আব্দুল ওদুদরা আপনাপন খালাস মঞ্জুর করাতে পারেননি। যুদ্ধাপরাধ সমর্থক এই রাজা উজিররাও কি ছাড় পেয়ে যাবেন?

তারা বড়জোর কিছুকাল ইতিহাস রুদ্ধ রাখতে পারেন। যেদিন বর্তমান এই জাতীয় আন্দোলন দেশের ব্যাপক সংখ্যক কৃষক ও শ্রমিকের সমর্থনে আরো সংহত হয়ে বিজয় লাভ করবে সেই দিন বাংলাদেশ দিবে পৃথিবীকে তার শ্রেষ্ঠ সওগাত।

যে হিশাব গণিতে কুলায় না – আনহা এফ খান

মনে করি,

সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ঢ টি, প্রমাণিত হল (ঢ-ধ) টি;

কাদেরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ণ টি, প্রমাণিত হল (ণ-ন) টি;

নিজামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ত টি, প্রমাণিত হল (ত-প) টি;

ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা ব্লা…

আমার চিহারা খারাপ, আমার হাতের লেখা খারাপ, আমি স্টুডেন্ট খারাপ — এই ধরনের বীজগণিত, ইন্টিগেশন, ডিফারেনসিয়েশন আমি বুঝি না। আমি নিশ্চিত আমার মত অনেকেই এইটা বোঝে না। আমি যা বুঝি তা হইল, ১৯৭১ সালে জামাত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে, সাংঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়া তারা স্বাধীনতা ঠেকানোর জন্য নানাকিছু করছে — সেই নানাকিছুর অফিসিয়াল নাম ‘যুদ্ধাপরাধ’। আর যুদ্ধাপরাধের জন্য বাংলাদেশের প্রচলিত

আইনের সর্বোচ্চ শাস্তিই তাদের প্রাপ্য।

অতএব, জমিজমার বিরোধে জমিরউদ্দিনের ছোট পোলা কর্তৃক তার চাচতো ভাইরে মার্ডার করা আর সাঈদী-নিজামীর ‘যুদ্ধাপরাধ’ যদি একই প্রক্রিয়ায় মাপামাপি হয় তাইলে মুশকিল।

আমি যা বুঝি, আমার বড় ভাই কবীর সুমনও তাই বোঝে: ‘যার যা পাওনা তাকে সেটা দাও, গণদাবী একটাই।’ আর তো কিছু না, নাকি?

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ফরহাদ মজহারের টকশোর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া – লেভিন আহমেদ

সাংস্কৃতিক উপাদানকে রাজনীতির পরিসর থেকে উৎখাত করা কোন বিপ্লবী মতাদর্শের রাজনৈতিক লক্ষ্য হতে পারে না। কোন না কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে এবং স্বাভাবিকভাবেই যে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শ সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো থেকে তার রসদ সংগ্রহ করে। তাই মত-নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ধারণা আকাশ-কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।

বাঙ্গালির জাতিবোধ গোড়া থেকেই একটি রাজনৈতিক অভিব্যক্তি। এদেশে বাঙ্গালির জাতিবোধ কেমন করে আধিপত্যশীল ইসলামকেন্দ্রিক রাজনীতিকে টেক্কা দিয়ে পূর্ববাংলার জনতাকে রাজনৈতিকভাবে গ্রন্থিবদ্ধ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করল তা ইতিহাসের আলোয় না দেখলে বোঝা যাবে না।

কালের পরিক্রমায় একাত্তরের পরাজিত শক্তি আবার নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলামের নামে ফ্যাসিবাদী তৎপরতায় সামিল হচ্ছে এবং নব্য পুঁজিপতি ও দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল মিডিয়া তাদের এই প্রচেষ্টায় ঘৃতাহুতি দিচ্ছে। তথাকথিত বিপ্লবী ইসলামপন্থীরাও আজ জামায়াতে ইসলামী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে নীরব থাকায় বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির সবকটি ধারাই প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ফ্যাসিবাদের মোহনায় এসে আজ এক হয়েছে। তাদের এই অপতৎপরতা প্রতিরোধে আজ জেগে উঠেছে শাহবাগ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সংখ্যালঘু স¤প্রদায় ও ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর নারী-পুরুষগণও সেখানে সমানভাবে তৎপর। তারা এতদিনে বুঝে ফেলেছে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা যে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিকল্প নির্মাণ করেছে সেখানে কখনো তাদের ঠাঁই হবে না। কিন্তু বাঙ্গালি জাতিবোধের রাজনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেখানে তাদের পরিপূর্ণ অংশগ্রহণ করতে পারার সমূহ সম্ভাবনা এখনো জারি আছে।

সংখ্যাগুরুকে ভিকটিম বানানোর মধ্য দিয়েই সকল ফ্যাসিবাদের যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশে আজকে বলা হচ্ছে মুসলমানরা নাকি নির্যাতিত! কিন্তু কে না জানে আওয়ামী লীগের বিশুদ্ধ মুসলমানিত্ব! জামায়াত-শিবির নির্যাতনকে মুসলমান নির্যাতনের সমার্থক যারা বলছেন তারা এদেশে ফ্যাসিবাদের সদর রাস্তাটিকেই বরং প্রশস্ত করে দিচ্ছেন।

জনসম্পৃক্ত বাঙ্গালি জাতিবোধের শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারাটির (যাকে শহীদ জননী জাহনারা ইমাম বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারা হিশাবে চিহ্নিত করেছেন) উত্থানের প্রেক্ষিত আমাদের ইতিহাসের আলো ফেলে দেখতে হবে। বাঙ্গালি জাতি যুগ যুগ ধরে নিষ্পেষিত হয়েছে বিধায় যখন তারা দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র অর্জন করল তখন তা বাঙ্গালি জাতিবোধের রাজনৈতিক মতাদর্শের উপর নির্মিত হলেও এ রাষ্ট্র ভিন্ন জাতিসত্তার অংশীদারিত্বকে স্বীকার করতে সক্ষম যদি না রাষ্ট্রটিকে উগ্রজাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি গ্রাস করে ফেলে। শাহবাগ যেমন সা¤প্রদায়িক রাজনীতিকে প্রতিরোধ করেছে, ঠিক তেমনি উগ্রজাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির বিপক্ষেও সোচ্চার হয়েছে। তাই শাহবাগের রাজপথে আজ শুনতে পাই: ‘আমি কে তুমি কে, চাকমা মারমা বাঙ্গালি।’ অথবা ‘আমি কে তুমি কে, গারো চাকমা সাঁওতাল বাঙ্গালি।’

আরেকটা কথা বলা জরুরি। রাজীবকে নাস্তিকতার কারণে হত্যা করা হয়নি, বরং শাহবাগ আন্দোলনের সংগঠক হিশেবেই তাঁকে নিকেশ করা হয়েছে। কাজেই প্রজন্ম চত্বরে তাঁকে শহীদ ঘোষণা করা অন্যায় হয়েছে বলে মনে হয় না। নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রাজীবের নাস্তিকতা ও ইসলামবিদ্বেষকে ফলাও করে প্রচার করে প্রকারান্তরে তাঁর হত্যাকাণ্ডকেই বৈধতা দেয়া হচ্ছে। রাজীবের নাস্তিকতা শাহবাগের উপর আরোপ করার জন্যই পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। শাহবাগ ভীরুর মতন রাজীব প্রশ্নে সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি, বরং আন্দোলনের গায়ে কলঙ্কতিলক পড়বে জেনেও আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিশেবে রাজীবকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে ন্যায়বিচারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে।

আজকে যখন ফরহাদ মজহার রাজীবকে শহিদ ঘোষণা নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন আমাদের তা ব্যথিত করে। যে ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি দখলদারের হাতে মারা যায় সে কি শহিদ নয়? একজন দুষ্কৃতিকারী যদি একাত্তর সালে পাকিস্তানিদের হাতে মারা পড়ত, তবে কি তাকে আমরা শত্র“র হাতে প্রাণ হারানো এক নাগরিক না বলে নিছক দুষ্কৃতিকারী হিশেবে চিহ্নিত করতাম?

মিথ্যার রাজনৈতিক মঞ্চায়নে কপট যুক্তি থাকতে পারে, তাতে সত্যের প্রতিষ্ঠা হয় না। যারা এ ধরনের গুপ্তহত্যা এবং একাত্তরের রাজাকারদের গণহত্যা, ধর্ষণ এবং লুণ্ঠনকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছেন, তারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির স্বার্থেই ইসলামের রাজনীতিকরণ করছেন — ঠিক যেমনটি করেছিলেন পাকিস্তানের স্বৈরশাসকগণ।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ধর্ম ও স্বাধীনতা: দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত – সলিমুল্লাহ খান

Briddha(গতকালের পর)

মানুষ ধর্ম পালন করে কেন? বাহিরের চোখে দেখিলে মনে হইবে ধর্ম মানে তো আচার আর অনুষ্ঠান। কে না জানে আচার আর অনুষ্ঠানে থাকে নিয়মের বাধ্যবাধকতা। আর বাধ্য হওয়া মানেই তো এক ধরনের অধীনতা। অথচ একটু ভিতর হইতে দেখিলে দেখিবেন মানুষ এমনকি অধীনতাও মানিয়া লয় শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা লাভ করিবার আশায়। ধর্মের আচার বিচারও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নহে।

আলজিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম হইতে উদাহরণ টানিয়া ফ্রানৎস ফানোঁ দেখাইয়াছেন স্বাধীনতার বাসনা সে দেশের জনসাধারণের মধ্যে অনেক বিষয়ে নতুন আচার ব্যবহারের জন্ম দিয়াছিল। শুদ্ধমাত্র নারীজাতির গায়ের পোশাকের কিংবা বেতারযন্ত্রের উদাহরণেই তিনি আবদ্ধ থাকেন নাই। আধুনিক এয়ুরোপ হইতে আনীত চিকিৎসাশাস্ত্র আর ওষুধপত্রের ক্ষেত্রেও এই সত্য আবিষ্কার করিয়াছেন ফানোঁ। আমরা এখানে ওষুধপত্র আর চিকিৎসাশাস্ত্রের কাহিনীটা কহিতেছি।

ফরাশিরা আলজিরিয়া দেশটা দখল করিবার পর সেখানে অন্যান্য কাজের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসাসেবা, ফরাশি ডাক্তারবৈদ্য এবং সুন্দর সুন্দর হাসপাতাল আর ফার্মেসিও প্রবর্তন করেন। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনকে অপছন্দ করিবার কারণে এইসব ভাল ভাল জিনিশও আলজিরিয়ার মুসলমান সমাজ প্রত্যাখ্যান করেন। তাহারা শুদ্ধ ফরাশি ডাক্তার নহে, এয়ুরোপিয়া চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষাপ্রাপ্ত দেশীয় ডাক্তারদের পর্যন্ত এড়াইয়া চলিতেন। ফরাশি ডাক্তারদের বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাইত ডাক্তার আর পুলিশ-মিলিটারিতে ভেদটা সামান্যই। সকলেই পরদেশলোভে মত্ত ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা বিশেষ। ডাক্তারও প্রয়োজনে লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করিত।

কিন্তু যখন সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হইল, সব কিছুর মধ্যে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগিল। ফরাশিরা আলজিরিয়ার নাগরিকদের নিকট ওষুধপাতি বেচা বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে রেশনিং আর খানিক পরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা শুরু করিল। বিশেষ করিয়া অ্যান্টিবায়োটিক আর অ্যান্টি-টিটেনাস সিরাপ (এটিএস) নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হইল। আলজিরিয়ার অনেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এটিএস প্রতিষেধকের অভাবে ধনুষ্টঙ্কার রোগে মৃত্যুবরণ করিতে বাধ্য হইলেন।

ফরাশিরা যে ওষুধকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিশাবে ব্যবহার করিতেছে তাহা আলজিরিয়া হাড়ে হাড়ে টের পাইল। এই সময় ফরাশি সরকার নির্দেশ দিয়াছিল কোন ফার্মেসি যেন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আলজিরিয়ার লোকের কাছে না বেচে। আর বেচিলেও যেন নাম ঠিকানাসহ রোগীর তাবৎ বৃত্তান্ত লিখিয়া রাখে। যে ফার্মেসি আপনাকে বলিল ওষুধটা স্টকে নাই কারণ আপনি আলজিরিয়ার মুসলমান সেই ফার্মেসিই দশ মিনিটের মধ্যে আরেকজনের হাতে সেই ওষুধটা তুলিয়া দিল, কারণ সে বেটা ফরাশি। এই সময় আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা ফরাশি ডাক্তারের অপেক্ষায় বসিয়া না থাকিয়া নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা দিতে শুরু করিয়াছিলেন। সেই সময় ধর্মপরায়ণ আলজিরিয়ার লোকজন চোরাবাজারে ফরাশি ওষুধ কিনিতে শুরু করে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তো সংগ্রহ করিতেই হইবে।

আলজিরিয়ার ‘অশিক্ষিত’, ‘গোঁড়া’ মুসলমান মুক্তিযুদ্ধের দুর্মর দিনে এইভাবে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে ইমান আনিল। ব্যাপারটা বেশ মজার কারণ বহুদিন ধরিয়া চেষ্টা করিবার পরও ফরাশি ডাক্তাররা এই আলজিরিয়াবিদের ফরাশি ওষুধ গিলাইতে পারেন নাই। হাসপাতালে ডাক্তারের সহিত একদিন দেখা করিয়া পরের দিন তাহারা আর আসিতেন না — লাপাত্তা হইয়া যাইতেন।

এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ তীব্রতর হইল। মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন অনুসারে বিপ্লবী আলজিরিয়া আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই সুফলগুলি বর্জন না করিয়া গ্রহণ করিতে শিখিল। ঘটনা দুইটা — মুক্তিযুদ্ধ ও ওষুধশাস্ত্র — একসঙ্গে হাজির হইল। বিপ্লব ও স্বাধীনতা মানুষের ধর্মে বা আচার ব্যবহারে বিপুল পরিবর্তন আনিতে পারে। কয়েকটা উদাহারণের সহায়তায় ফানোঁ ইহা দেখাইতেছেন।

একদা ফরাশি ঔপনিবেশিক সরকার আলজিরিয়ার গ্রামেগঞ্জে মহল্লায় মহল্লায় আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা চালু করিতে চাহিয়াছিলেন। মানুষ সেই সুপরামর্শ তখন গ্রহণ করে নাই। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন বিপ্লবী সরকার বলিলেন এইসব পায়খানা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল তখন লোকে দলে দলে এইগুলি বসাইতে শুরু করিল। মানুষের অন্ত্র হইতে আগত পরজীবী কীট যে রোগজীবাণু ছড়ায় সেই শিক্ষাটা মানুষ অতি দ্রুতবেগে গ্রহণ করিল।

মানুষ হাজামজা পুকুর সংস্কার করিল। শিশুর জন্মের পর যে অপতালমিয়া রোগের প্রকোপ দেখা দিত তাহার বিরুদ্ধে সংগ্রামে দ্রুত অগ্রগতি দেখা দিল। মায়েরা বাচ্চার যতেœ ত্র“টি করিতেন না। এখন সমস্যা শুদ্ধ আরিওমাইসিনের অভাবে সীমিত হইল। এখন লোকে সুস্থ থাকিতে ব্যগ্র হইল, ডাক্তার-নার্সের সুপরামর্শে বেশি বেশি করিয়া কান দিতে লাগিল। নার্সিংবিদ্যায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিদ্যালয় খোলা হইল। দেখা গেল কয়েকদিন শিক্ষা লইবার পর এমনকি নিরক্ষর চাষীরাও ধমনীর মধ্যে কেমন করিয়া ইনজেকশনের সূঁচ ফুঁড়াইতে হয় শিখিয়া লইল।

একই কায়দায় দেখা গেল একদা যাহারা ঝাড়ফুঁকে, ওঝায়বৈদ্যে বিশ্বাস রাখিতেন তাহারও ধীরে ধীরে এইসব ছাড়িয়া দিলেন। একদা জিন পরিতে বিশ্বাস করাকে এসলাম ধর্মের অঙ্গ মনে করা হইত। বিপ্লবের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এইসব মোল্লাকি চিকিৎসার কবর রচিত হইল। মুক্তিযুদ্ধ আলজিরিয়ায় এসলাম ধর্মেরও নতুন ব্যাখ্যা হাজির করিল।

ফানোঁ দুই দুইটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা খোলাসা করিয়াছেন। যেসব সমাজে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষ বিকাশ ঘটিয়াছে সে সমাজেও কিছু কিছু শিক্ষা সর্বসাধারণের মধ্যে বিস্তারিত করা যায় নাই। বা গেলেও তাহা করা কঠিন প্রমাণিত হইয়াছে। কিন্তু আলজিরিয়ার সর্বস্তরের লোকজন এই শিক্ষা দ্রুত আত্মস্থ বা আমল করিয়াছেন। আর এসলাম মুক্তিযুদ্ধের পর নবজীবন লাভ করে — এই কথাটাও পুনরায় প্রমাণ লাভ করিল।

বিপ্লবের পক্ষের স্বদেশি ডাক্তারদের এখন আলজিরিয়া ‘আপন’ ডাক্তার বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে। তাঁহাদের নির্দেশ এখন সকলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। তখন একটা নিয়ম প্রচার করা হইয়াছিল এই রকম: কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি তলপেটে আঘাত পাইয়া আশ্রয়কেন্দ্রে আসেন তবে তাঁহাকে কোনক্রমেই পানি খাইতে দেওয়া যাইবে না। এই নিয়মের কোন ব্যত্যয় যাহাতে না ঘটে সেই নির্দেশ খুব কড়া আকারে প্রচার করা হয়। বাড়ির প্রত্যেকটি ছেলে ও মেয়েকে এই নিয়মটি জানাইয়া দেওয়া হইল। দেখা গেল আহত মুক্তিযোদ্ধা ‘পানি’ ‘পানি’ করিয়া চিৎকার করিতেছেন কিন্তু তাঁহার ছেলেও তাঁহাকে পানি দিবে না। ছেলে বাবাকে বলিল, ‘আব্বা, এই বন্দুকটা হাতে লইয়া আপনি ইচ্ছা করিলে আমাকে গুলি করেন। তবুও আমি আপনাকে পানি দিতে পারিব না।’ ডাক্তার আসিয়া অপারেশন করিলে রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা আছে। পানি দিলে সে সম্ভাবনা নষ্ট হইবে।

আরেক উদাহারণ। টাইফাস সংক্রমণের বেলায় রোগীকে কয়েকদিন কোন কঠিন খাবার দেওয়ার বিষয়ে নিষেধ ছিল। কোন পিঠাপুলি কিংবা মুরগীর মাংস দেওয়া একদম নিষেধ ছিল। আত্মীয়স্বজন যখন রোগীর বিছানার কাছে ভিড়িবার সুযোগ পায় তখন রোগীর অতি অনুরোধে তাহাকে এহেন খাবার আত্মীয়স্বজন দিতেও পারেন। তাই এই ধরনের রোগীর বেলা, বলা হইত পরিবারের লোকজন যেন তাহার দর্শনে না যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা গিয়াছে আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধার মায়েরাও ডাক্তারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছেন। বাচ্চাকে খাবার না দিয়া বসিয়া থাকিয়াছেন। কয়েক দিন। তাহার আশপাশেও ঘেঁষেন নাই।

ফানোঁ বলেন, ‘জাতির দেহে প্রাণের সঞ্চার হইলে, জাতি যদি এককাট্টা হইয়া চলিতে থাকে, তখন সকলই সম্ভবপর হয়।’

দোহাই

Frantz Fanon, A Dying Colonialism (London Penguin Books,1970).

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩