Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 27, 2013

সম্পাদকীয়

সজ্ঞানে বজরং

উপনিবেশ মুক্তির তাত্ত্বিক ফ্রানৎস ফানোঁ তাঁহার ‘জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যাহত’ বহিতে উপনিবেশের অবসান কিরূপে ঘটে, উপনিবেশ কি ব্যবস্থা কায়েম রাখে এবং উপনিবেশের বিলোপ ঘটিলে সমাজের-রাষ্ট্রের কি চেহারা দাঁড়ায় এইসব বিষয়ে বহু মূল্যবান সাক্ষ্য দিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন উপনিবেশ হইতে যে সমাজ ও রাষ্ট্র মুক্তিলাভ করিবে সেখানে ‘প্রথম শেষ হইবে আর শেষ হইবে প্রথম’।অর্থাৎ সেই সমাজ হইবে নতুন সমাজ আর নতুন সমাজ মানেই বিদ্যমান কাঠামের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করিয়া গড়িয়া উঠা সমাজ।

জনগণের রাজনৈতিক অভ্যুদয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া যাহারা দখলদার বাহিনীর সঙ্গে সহযোগ করিয়াছে এবং হত্যা নির্যাতন লুটপাটে অংশ নিয়াছে তাহাদের বিচার না হওয়ার বিষয়টা কি প্রকারান্তরে জনগণের পরাজয়ের সহিত যুক্ত নহে? ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ উপমহাদেশে জাতিসমূহের কারাগার ভাঙ্গিবার জন্য প্রেরণা হিশাবে হাজির হইয়াছিল। আজ যাহারা রাজাকারদের বিচারের দাবিকে ভারতের চক্রান্ত বলিয়া প্রচার করিতেছে তাহারা সজ্ঞানে বজরং। তাহাদের কথায় বার বার ১৯৭১ সাল মনে পড়িয়া যায়। সেদিনকার যুদ্ধেও তো পাকিস্তানি হানাদারের সুরে সুর মিলাইয়া তাহাদের দোসর রাজাকার আলবদর আলশামসরা ভারতীয় চক্রান্ত খুঁজিয়াছিল। সেই দিনের মুক্তিকামী মানুষের বোধকে যেইভাবে অপমান করা হইয়াছে আজও তাহার কম করিতেছে না যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাইতে তৎপর এই নব্য রাজাকারেরা। ইহাদের ক্রমবর্ধমান অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়িয়া তোলা এই মুহূর্তের অন্যতম কর্তব্য।

ইসলামের আসল শত্রু কে – আবদুল করিম

সময়টা ছিল বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের কিছু কাল পূর্বের। রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হচ্ছে ‘মহারাজ শিবাজি’ নাটিকা। নাটিকা দেখে সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধে নাটিকাটি প্রচারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেন কলকাতার মঞ্চের শিবাজির সাথে ঐতিহাসিক শিবাজির কোন মিল নেই। বর্তমান শিবাজি যেন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়–য়া শিক্ষিত বর্ণহিন্দু। বর্তমানে মুসলমানদের ঠকানোর জন্যই  বর্ণহিন্দুরা তাদের মনগড়া শিবাজি মঞ্চে নামিয়েছে। এর ফল শুভ হবে না।

পরবর্তীকালে আমরা দেখি কাজী ইমদাদুল হকের কথা বৃথা যায় নাই। স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার বর্ণহিন্দুরা যে আবেগে প্রশাসনিক বাংলা ভাগ ঠেকিয়েছিল তারাই মাত্র ৩০ বছর পর ‘রাজনৈতিক বাংলা ভাগ’ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। বাংলার জন্য স্বদেশি আমলের সমস্ত ভালবাসা কর্পূরের মত উড়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের ন্যূনতম হক না দেওয়ার জন্যই সেদিন বর্ণহিন্দুরা পুরো দেশকে টুকরো করে দিয়েছিল।

১৯৪৭ সালের বঙ্গভঙ্গের বয়স আজ ছয় দশকের অধিক। ঢাকার শাহবাগকে কেন্দ্র করে পুরো বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের  সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে এক অভূতপূর্ব জাতীয় আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। কিছু যুদ্ধাপরাধ সমর্থক গোষ্ঠী জাতীয় এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে ইসলামবিরোধী আন্দোলন বলে প্রচারে নেমেছে। তাদের এই কর্মকাণ্ড কলকাতার ‘মহারাজ শিবাজি’ নাটিকাটির কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রকৃত বিচারে এই গোষ্ঠী নিজেরাই ইসলামবিদ্বেষী।

১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইসলাম রক্ষার রব তুলে খুন, ধর্ষণ, লুটপাট আড়াল করতে চেয়েছিল। কিন্তু বাংলার মানুষ ইসলামের প্রতি তাদের ভক্তি হারায় নাই। জামায়াতকেও ক্ষমা করে নাই। তাই তো স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও সুবিচারের দাবি জীবন্ত আছে। সুবিচার না পেলে শুধু ৪২ বছর কেন শত শত বছর তারা সুবিচারের জন্য লড়বে। সুবিচারের কোন বিকল্প নাই। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক গোষ্ঠী জামায়াতের বিচারকে ইসলামবিদ্বেষী বলে প্রচার করছে। মোনাফেকদের বিন্দুমাত্র ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সততা নাই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন কি কারণে ইসলামবিদ্বেষী আন্দোলন হবে?

আজ যারা ইসলামপ্রেমিক তাদের বুঝতে হবে যুদ্ধাপরাধের কলঙ্কের দায় ইসলাম নিবে না। আবার অন্যপক্ষে গুটিকয়েক নির্বোধ নাস্তিকের দায় যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনও কেন বহন করবে? তারা আন্দোলনের আগাছামাত্র। বাংলাদেশ এমনকি ভারতবর্ষে ইসলামের গর্বের ইতিহাস আছে। পূণ্যশ্লোক হযরত আমির খসরু কিংবা সুফি পরশমণি খাজা নিযামুদ্দিন আউলিয়া, হযরত শাহজালালের (রা:) ইতিহাস কি মানুষ জানে না? আর জামায়াতের ৬০ বছরের ইতিহাস উপমহাদেশের ফিৎনা-ফ্যাসাদের ইন্ধনকারীর ইতিহাস। ভারতবর্ষে ইলামের গৌরবজ্জ্বল ইতিহাসের সাথে জামায়াতের তুলনা করলে কেবল কলঙ্কই বাড়ে।

Fashiকাজী ইমদাদুল হকের পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা বলতে পারি, যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের জাতীয় আন্দোলনকে যারা ইসলামবিদ্বেষী আন্দোলন বলতে চান তারাই প্রকৃতপক্ষে ইসলামবিদ্বেষী। ন্যায়বিচারের ধারণার জন্যই নিপীড়িত বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মকে বরণ করে নিয়েছিল। আজ সেই ইসলামকেই যদি ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধে কূটচাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাহলে পরে দুঃখের সীমা থাকবে না।

ইসলামের তকমা ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার তাগিদে এই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী একটি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র গড়তে চায়। বর্ণহিন্দুরা যেমন প্রথম বঙ্গভঙ্গের সময়কার দেশপ্রেমকে স্বার্থসিদ্ধির প্রয়োজনে অচিরেই বর্জন করেছিল, তেমনি এই ফ্যাসিবাদীরাও আজ যতই ধর্মের জিগির তুলুক না কেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে একদিন ন্যায়ের ধর্ম ইসলামকে বর্জন করতেও তারা কসুর করবে না। তাদের সাথে পূর্ণ সহযোগিতা করবে পাশের হিন্দু ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ভারত ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। হক কথা বলা তাই অতি প্রয়োজন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলনের বিরোধীরা ইসলামের আসল শত্রু।

ধর্ম ও স্বাধীনতা – সলিমুল্লাহ খান

Deal Likhonযুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করিয়া গণ আন্দোলন শুরু হইবার পর কোন কোন মহল বলিতেছেন এই আন্দোলনটি পরিচালিত হইতেছে ধর্মবিশ্বাসের — বিশেষ এসলাম ধর্মের — বিরুদ্ধে আমরা এই মতের পোষকতা করি না আমরা বরং মনে করি এই আন্দোলন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের দমনকে লক্ষ্য রাখিয়াই শুরু হইয়াছে ইহার ফলাফল কি দাঁড়াইবে তাহা কয়েকটি মোটা দাগের উপর নির্ভর করিতেছে বাংলাদেশের জাতি ১৯৭১ সালে যদি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ না করিত তবে কি বর্তমান বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র আদপেই প্রতিষ্ঠা লাভ করিত প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলেও সেই প্রজাতন্ত্র এতদিনে নানান দিক হইতে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হইয়াছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যাহারা গণহত্যায় লিপ্ত হইয়াছিলেন কিংবা হত্যাকারীদের সহিত যোগসাজশে কাজ করিয়াছিলেন তাহাদের বিচার সম্যক না হওয়াকে সেই ক্ষয়রোগের আলামত বিশেষ বলিতেই হইবে এক্ষণে অনেকে বলিতেছেন এই বিচারটা না করিলে ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা হইবে আমাদের বিশ্বাস এই বিচারের অনুষ্ঠান হইলেই জাতীয় ঐক্য একধাপ আগাইয়া যাইবে

যুদ্ধাপরাধী পক্ষের উকিল মহোদয়েরা কহিতেছেন এই বিচার জাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করিতেছে। আমরা বলিব এই দাবি সত্য নহে। তাঁহারা বলিতেছেন এই বিভক্তিটা ধর্মের প্রশ্নে। আমরা বলিব কাঠগড়ায় ধর্ম দাঁড়ায় নাই। ধর্মের প্রশ্নে বাংলাদেশে কোন বিভক্তি দেখা দেয় নাই। কিছু কিছু লোক বা কোন কোন মহল অকারণে ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিতেছেন। তাহাতে — অস্বীকার করার উপায় নাই — বেশ রক্তপাত হইতেছে। কিন্তু কোন বিভক্তির প্রশ্ন উঠিতেছে না। বাংলাদেশে ধর্মের পক্ষে ও ধর্মের বিপক্ষে এমন কোন কুঠুরি নাই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও এই রকমের বিভাজনের প্রমাণ আকারে হাজির করার কোশেস হইয়াছিল বটে, কিন্তু সেই কোশেস সফল হয় নাই। গত চল্লিশ বছরে এমন কিছু ঘটে নাই যাহাতে ধর্মের কল নড়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে।

পরিবর্তনের মধ্যে আমরা দেখিতেছি বাংলাদেশের শহরে ও বন্দরে মধ্যবিত্ত সমাজেই মাত্র নহে, শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যেও নারীজাতির অনেক বেশি সদস্য এখন গণআন্দোলনে আগাইয়া আসিতেছেন। আজ আমি এই প্রশ্নে সামান্য আলোচনা করিতে চাহি। দোহাই আলজিরিয়ার বিপ্লব ১৯৫৪-১৯৬২।

ফরাশি ভাষার লেখক ফ্রানৎস ফানোঁর লেখা পড়িয়া আমরা জানিয়াছি ১৯৫৪-১৯৬২ সালের বিপ্লবে আলজিরিয়ার নারীজাতি একটা বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন। যুদ্ধের কারণে সে দেশে নারীজাতির সামাজিক চরিত্রেও বেশ নাটকীয় পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তনটা খানিক অন্য মাপের।

বিপ্লবের আগে আলজিরিয়ার নারীরা মাথায় একটা চাদর পরিতেন। তাহারা এই চাদর গায়ে দিয়া একদিকে নিজেদের একটা আলাদা জাতির পরিচয় দিতেন। আবার নিজেদের মধ্যে ঐক্যের নিশানা আকারেও এই চাদরের একটা পরিচয় দাঁড়াইয়াছিল। বিপ্লবী যুদ্ধের সময় এই চাদরকে যুদ্ধের হাতিয়ার আকারেও ব্যবহার করা শুরু হইল।

ফরাশি উপনিবেশবাদী সরকার ১৯৩০ সালের পর হইতে জোর চেষ্টা করিতেছিল কি করিয়া আলজিরিয়ার নারীজাতিকে এই চাদরের হাত হইতে মুক্ত করা যায়। তাহারা নানান ধরনের যুক্তি, লোভ এমনকি ভয় দেখাইয়াও সফল হয় নাই। শেষ পর্যন্ত যখন সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হইল তখন নারীজাতির সদস্যরা দলে দলে বিপ্লবে যোগ দিলেন। তখন ফরাশি সৈন্যরা কখনো কখনো নারীদের রাস্তাঘাটে ধরিয়া চাদর খুলিতে বাধ্য করিল, কখনো কখনো নারীর শরীরে তল্লাশিও চালাইল। লক্ষ্য একদিকে তাহাদের সম্ভ্রমে হাত দেওয়া, অন্যদিকে চাদরের তলায় কোন গ্রেনেড কিংবা স্টেনগান লুকান আছে কিনা খুঁজিয়া দেখা। সেই সময় নারী মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র সত্য সত্য লুকাইয়া আনা নেওয়া করিতে এই চাদরের ঘোমটাখানি ব্যবহার করিতেছিলেন। তাহারা গ্রেনেডের থলিয়া বা বোমার পুঁটুলি গায়ের সহিত দড়ি পরাইয়া বাঁধিয়া চলাফেরা করিতেছিলেন। চেকপোস্ট পার হইবার সময় শুধু দুইখানা খালি হাত দেখাইতেন। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরাও তখন কাজের বুয়া তথা ফাতেমার পোশাক পরিয়া চলাফেরা করিতেন যাহাতে দখলদার সৈন্যরা কোনপ্রকার সন্দেহ পর্যন্ত করিতে না পারে।

এইভাবে চাদরকে সামরিক সরঞ্জামে পরিণত করার পরিণতি ভাল হয় নাই। তখন ফরাশি সামরিক বাহিনী পথে ঘাটে যেখানে পায় নারীজাতির যে কোন সভ্যকেই তল্লাশির আওতায় লইয়া আসে। কোনরকম বাছবিচার না করিয়াই তাহারা সকল শ্রেণি ও পেশার আলজিরিয়াবাসী নারীর দেহ তল্লাশি শুরু করে। কাহাকেও ছাড় দেওয়া হয় নাই। ‘এই একটা সময় আসিয়াছিল যখন পুরুষ, নারী, শিশু নির্বিশেষে সারা আলজিরিয়ার জাতি বুঝিতে পারিল যে জাতি হিসেবে তাহাদের কর্তব্যটা কি। একই দিনে তাহারা আরো বুঝিতে পারিলেন আলজিরিয়ায় একটা নতুন জাতিও গড়িয়া উঠিতেছে,’ — কথাটা লিখিয়াছিলেন মহাত্মা ফ্রানৎস ফানোঁ।

তবে কিনা সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা নারীরা একসময় চাদর পরাটা বাদ দিতে শুরু করিলেন। একসময় অন্য কৌশলের প্রয়োজন দেখা দিল। আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা নারীটিকে এয়ুরোপিয়া নারীর বেশভূষা পরিয়া চলাফেরা করিতে হইবে বলিয়া সিদ্ধান্ত হইল। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হইত। কিন্তু শেষমেশ এই নারীরা এয়ুরোপিয়া পোশাক পরিলেন। চাদর পরা বাদ দিলেন। জাতীয় প্রয়োজনে, যুদ্ধের কৌশলজ্ঞানে, আলজিরিয়ার নারীজাতির অনেকে যুগযুগান্তরের প্রথাসম্মত চাদর পরা বাদ দিলেন। মাথায় চাদর না দিলে নারীর মর্যাদা থাকিবে না — এই ভয়ের হাত হইতে তাহারা ছাড়া পাইলেন। আলজিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম সেই অসম্ভবকে সম্ভব করিল যে অসম্ভব সম্ভব করিবার জন্য ফরাশি স্বাধীনতা ব্যবসায়ীরা শত চেষ্টা করিয়াও বিন্দুমাত্র সফল হইতে পারেন নাই।

একই ধরনের ঘটনা ঘটিল রেডিও নামক নতুন গ্রাহকযন্ত্রটি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। একদা ফরাশি উপনিবেশবাদীরা যখন রেডিও প্রযুক্তির প্রচলন করেন তখন আলজিরিয়ার মুসলমান জনগোষ্ঠী সে রেডিওতে মোটেও কান দিতেন না। মনে করিতেন উহা দখলদারদের অত্যাচারের আরেকটি হাতিয়ার বৈ নহে। ফরাশিদের রেডিও স্টেশনের নাম ছিল ‘রেডিও আলজের’। তাহাতে ফরাশি সংস্কৃতির প্রচারণা, ফরাশি গান বাজনা চলিত। অদূরের বা পাশের দেশ মিশরের রেডিও মাঝে মধ্যে শুনা হইলেও আলজিরিয়ায় বেতারযন্ত্র জিনিশটা বড় একটা জনপ্রিয় হইয়া উঠিতে পারে নাই।

কিন্তু ১৯৫৬ সালের পর একটা বিপ্লবী পরিবর্তন আসিল। চালু হইল ‘ভয়েস অব আলজিরিয়া’ অথবা স্বাধীন আলজেরিয়া বেতার কেন্দ্র। ১৯৫৬ সালের শেষাশেষি দেখা গেল বেতার গ্রাহক যন্ত্র বা ট্রানজিস্টর জিনিশটার চাহিদা অসম্ভব বাড়িয়া গেল। হেন পরিবার রহিল না যাহাদের ঘরে একটা ট্রানজিস্টর সেট নাই। সকলেই এখন ‘স্বাধীন আলজিরিয়া বেতার কেন্দ্র’ ধরে। ফানোঁ লিখিয়াছেন: ‘এতদিনে বুঝা গেল বেতার জিনিশটা আর পরদেশলোভীর সংস্কৃতি দিয়া পিটাইবার হাতিয়ার বিশেষ নহে।’

আরো অধিক কিছু। নতুন প্রবর্তিত এই বেতার যন্ত্র আলজিরিয়ার সকল এলাকার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করিতে সহায়ক শক্তি হইয়া দাঁড়াইল। আলজিরিয়ায় সকলেই আরবি জবানে কথা কহিতেন না। বিশেষ পাহাড়ি বা কাবিল এলাকায় কাবিল ভাষায় কথাবার্তার চল। কিন্তু ফরাশি পরদেশীদের হইতে ছাড়া পাইতে হইলে এক হওয়ার বিকল্প নাই। আলজিরিয়ার নতুন জাতীয় ভাব তৈরি করিতে বেতার বড় একটা কাজ করিয়া দিল। ফানোঁ লিখিতেছেন, ‘এই রেডিও জিনিশটাই গ্রামেগঞ্জে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে (আলজিরিয়ার) কণ্ঠস্বরটার শিকড় ছড়াইয়া দিল। একটা বেতার যন্ত্রের মালিক হওয়ার মানে দাঁড়াইল যুদ্ধে যাওয়া।’

আলজিরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ সে দেশে একটা নতুন জাতির সৃষ্টি করিল। শুদ্ধমাত্র চাদর কিংবা বেতারযন্ত্রের মধ্যেই এই বিপ্লব সীমিত ছিল না।

দোহাই

Frantz Fanon, A Dying Colonialism (London: Progressive Books,1970).

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

(চলবে)

জাতির পতাকা আজ খাঁমচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন – জহিরুল হক মজুমদার

Potakaএকটি দিন শুধু শাহবাগ খালি ছিল। পুরোপুরি খালি ছিল তাও বলা যাবে না। ২১ ফেব্র“য়ারি মহাসমাবেশের পর ভিন্নতর কর্মসূচি দেশব্যাপি পালনের উদ্দেশ্যে শাহবাগ নিজেকে সাজাচ্ছিল ভিন্ন আঙ্গিকে। কথা ছিল মূল চত্বরটি নগরবাসীর চলাচলের জন্য ছেড়ে দিয়ে আরেকটু ভিতরের দিকে জাতীয় জাদুঘর চত্বরে প্রতিবাদী সমাবেশ চলবে।

২১ ফেব্র“য়ারির মহাসমাবেশের পর শেষ রাতে আমি শাহবাগ চত্বরে দাঁড়িয়ে আছি। তখনো কিছু তরুণ শ্লোগান দিয়ে চলেছে অবিশ্রান্ত। অনেক দূর থেকে আসা একটি বাউলদল লোকগীতির সুরে ক্রমাগত বিচার চেয়ে চলেছে। কিছু তরুণ-তরুণী বিষণœভাবে ঘুরাফেরা করছে — তারা এ জায়গা ছেড়ে দিতে চাচ্ছে না। একজন অভিজাত মাকে তার ছোট্ট শিশুটিকে নিজের শীতের চাদরে ঢেকে বারবার চুমু খেতে দেখেছি। তিনি বসে আছেন একটি পলিথিনের উপর। তার অন্য সন্তানটি ঘুমাচ্ছে পলিথিনের উপর। গোটা পরিবারটির জন্য একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এই মা হয়তো ১৯৭১ সালে কিশোর বয়সে এভাবেই ঘুমিয়েছেন। আজ তার সন্তানদেরও সেই অভিজ্ঞতা হল।

শুক্রবার। সামান্য কয়েক প্রহরের শূন্যতার সুযোগে পবিত্র জুমার দিনে ধর্মের লেবাস পরা কিছু লোক (নাকি ইঁদুর) ঝাপিয়ে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞে। যে নামাজকে পবিত্র ইসলাম ধর্মে দরিদ্রের জন্য হজ্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই নামাজের পবিত্রতার রেশ খান খান হয়ে ভেঙ্গে পড়েছে তাদের হুঙ্কারে। সাধারণ মুসল্লিদের মোনাজাতের সুযোগ না দিয়ে নামাজের সালাম ফেরানো মাত্রই তারা আক্রমণ চালায় সংবাদকর্মীদের উপর। এর আগে তারা বায়তুল মোকাররমের খতিব প্রখ্যাত পণ্ডিত প্রফেসর মৌলানা সালাউদ্দিনকে লাঞ্ছিত করে, পবিত্র মসজিদের জায়নামাজ এবং কার্পেট পোড়ায়। তারা মসজিদের অভ্যন্তরের ধর্মীয় স্থাপত্য ভেঙ্গে ইট তৈরি করে গণমাধ্যমকর্মী এবং পুলিশের উপর হামলা চালিয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম কখনো এত অপবিত্র এবং লাঞ্ছিত হয়নি। এ সন্ত্রাস তারা চালিয়েছে সারা দেশের প্রায় প্রতিটি মসজিদকে কেন্দ্র করে। হামলা চালিয়েছে শহীদ মিনারে, একুশের শ্রদ্ধার ফুল তাজা থাকতেই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যে সীমাহীন ক্রোধ নিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার কামানের গোলায় ভেঙ্গেছিল সেই ক্রোধ এই হামলাকারীদের চোখেও ছিল। স্বাধীন দেশে শহিদ মিনার আক্রান্ত হওয়া এক বিরল ঘটনা — এক ব্যাখ্যহীন হিংস্রতা।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক হিংস্রতায় তারা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়েছে জাতীয় পতাকা। সবুজের মাঝখানে লালবৃত্ত খচিত রক্ত দিয়ে কেনা জাতীয় পতাকা তারা লাঞ্ছিত করেছে। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা অপমানে কুঁকড়ে গেছে।

তাই আজ জেগে ওঠার দিন আবারও। শাহবাগ আবার জেগে উঠেছে। জায়গা ছেড়ে যাবে না, তাহলে হায়েনার দল আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমাদের মা-বাবা ঘুমায়নি, আমরা প্রয়োজন হলে নয় বছর ঘুমাব না।

একাত্তরে তারা ছিল নরমাংশভোজী শকুন। গত ৪২ বছরে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে আজ তারা পরিণত হয়েছে হায়েনায়। আসুন জনপ্রতিরোধর মাধ্যমে এইসব হায়েনাকে ইঁদুরে পরিণত করি আর তাড়া করে বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে মারি। ওরা একবার শকুন, একবার হায়েনা এবং ভয় পেলে ইঁদুরের রূপ ধারণ করে। আর আমরা সব সময়ই মানুষ ।

পকেটমার হইতে সাবধান! – কাজী নিয়াজ আহমেদ

Potaka 1বাংলার ইতিহাসে বেইমান-দুশমনের কদাচ অভাব হয় নাই। বিশ্বাসঘাতকতা আর হত্যার সে এক ন্যাক্কারজনক অধ্যায়।

আসিল ১৭৫৭। পলাশীর আমবাগানে মীরজাফরের সাঙ্গপাঙ্গ আর চ্যালা চামুণ্ডার কমতি হয় নাই। ঠিক তাহার একশত বছর পরই শুরু হইলো ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম। কিন্তু তথায়ও দেখিতে পাই, একশ্রেণির দেশীয় বেনিয়া-মুৎসুদ্দি — হিন্দু-মুসলমান উভয়ই — ইংরাজের সহিত হাত মিলাইয়া বিপ্লবকে পিছন হইতে ছুরি মারিল।

দশ কম একশ বছর পর পুনরায় ভারতীয় উপমহাদেশ জুড়িয়া শুরু হইল আরেক ডামাডোল — দেশভাগ। এবারও কুমতিধারী লোক অনেক মিলিল। যাহারা ১৯০৫-১৯১১ সনে বাংলাকে দুই প্রদেশে ভাগ করা হইয়াছে বলিয়া ক্ষোভে অন্ন-জল স্পর্শ করা রদ করিয়াছিলেন, তাহাদেরই একটি অংশ মারোয়াড়ীদিগের টাকায় আর হিন্দু মহাসভার প্ররোচনায় একেবারে স্থায়ী রূপে বঙ্গমাতার অঙ্গহানী করিবার নিমিত্তে আদাজল খাইয়া লাগিলেন।

উহার পর ১৯৫২ সালে নাজিমুদ্দিন-নূরুল আমিনের গাদ্দারি, ১৯৬০ দশকে মোনায়েম খানের মোনাফেকি, আর ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী-মুসলিম লীগ-নেজাম-এ-এসলামের দেশদ্রোহিতা স্বচক্ষে দেখিয়াছেন এরূপ জীবিত বান্দা তো অদ্যবধি আকছার মিলিবে। ১৯৭৪-৭৫-৭৯-৮২-৮৬-৯৬-২০০১-২০০৭ ইত্যাদি বছরের কথা না হয় নাই পাড়িলাম। পাঁক ঘাটিয়া দুর্গন্ধ বাড়াইয়া কি লাভ?

এইবারও শাহবাগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইবার লোকের কোন অভাব পড়িবে না। ইহারা আন্দোলনকে ভেতর হইতে অন্তর্ঘাত করিতে চাহিবে, বাহির হইতে চাপ প্রয়োগ করিবে, চলিবে প্রকাশ্যে-গোপনে আতাঁত আর সংগ্রামের ফসল ছিনতাই করিবার অপচেষ্টা। ইহা নিয়া রাজনীতি, দর কষাকষি, হিসাব-নিকাশ, আর অপপ্রচারের কোন লাগাম দেখিতেছি না। সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেকেই ইহার ভেতরই ধর্মের সেই পুরাতন আফিমে বুঁদ হইয়া, বা ধর্ম-ব্যবসায়ীর ঘুলঘুলাইয়াতে পথ হারাইয়া, বা কম্যুনিস্ট কিংবা আওয়ামী লীগের প্রতি আদি বিদ্বেষবশত, অথবা বিএনপির অন্ধ আনুগত্যহেতু এই মহৎ জাগরণকে পিঠ দেখাইয়াছেন দেখিতে পাইতেছি।

তথাপি, মোদ্দা কথা এই যে, এই প্রায়-বিপ্লবকে যদি বা সঠিক হস্তে হাল-মাস্তুল ধরিয়া রাখিয়া যুদ্ধাপরাধীদের ন্যায়বিচারের পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে এক নবচেতনার উন্মেষ ঘটাইবার কার্যে না লাগানো যায়, তাহা হইলে এইবারও পূর্বের বহুবারের মতনই আন্দোলনের লাভের গুড় ডেয়ো-পিঁপড়ায় খাইয়া যাইতে পারে। তারুণ্য, পকেটমারদিগের ব্যাপারে তাই সাবধান।

ট্র্যাজেডি ও ইহার পর প্রহসন – মাও সাগর

যুদ্ধ হইল কিন্তু কি কারণে যুদ্ধ হইল?

যুদ্ধ কাহাকে বলে?
যুদ্ধ কি আকাশের উল্কাপাত!
না কি বাতাসের মত সার্বভৌম?
তুমি আমাকে হত্যা করিয়াছ,
আর ইতিহাস কি ভুলিবে ইহা?
যুদ্ধ কি আকাশ হইতে নাজিল হয়?
না কি শোষণের ভূতের আকাশের দিকে প্রতিবিম্বিত হয়?
অতয়েব ভূতের আকাশের দিকে প্রতিবিম্বিত তীর হইল ৭১,
আর আজ চলমান আন্দোলন হইল শাহবাগ ৭১!
অতঃপর কি ইহাই বলা যায় ৭১ হইল ট্র্র্র্যাজেডি,
আর শাহাবাগ ৭১ হইবে প্রহসন?
না, না মানুষই ইতিহাস গড়ে
কিন্তু তাহার মত ইতিহাস সে নির্মাণ করিতে পারে না।