Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 25, 2013

সম্পাদকীয়

আন্দোলনের আশু করণীয়

 

শাহবাগের জল অনেক দূর গড়াইয়াছে। পক্ষ ও বিপক্ষের প্রচারে তাহা জাতীয় রূপে প্রস্ফুটিত হইয়াছে। এই আন্দোলনের একটি সাফল্যের দিক হইতেছে ইহা মুখ বুজিয়া থাকা অনেক জাতীয় প্রশ্নকে নিজের অজান্তেই ভাষা জুগাইয়াছে। এমনই একটি প্রশ্ন হইল বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বাঙ্গালি ও মুসলমান এই দ্বিবিধ পরিচয় একটি নিবিড় সূত্রে ঐক্যবদ্ধ করিবার উপায় কি? একাত্তরে পরাজিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও তার লেবাসধারী সমর্থকরা গত ৪২ বছরে নানাভাবে দেশি ও বিদেশি শক্তির প্রত্যক্ষ লালনপালনে পুষ্ট হইয়া পুনরায় বাঙ্গালি ও তার মুসলান পরিচয়ের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাহিতেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে এসলামের অবমাননার সাথে মিলাইয়া দিয়া প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ঘোলা জলে মৎস শিকারের পাঁয়তারা শুরু করিয়াছে।

কিন্তু তাহাদের রাজাকারি সহজেই উন্মোচিত হয় যখন তাহারা বলেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধ কোন ঔপনিবেশিক যুদ্ধ ছিল না। ছিল মাত্র ভাতৃঘাতী যুদ্ধ। আরো বলেন জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে একটি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই শুধু লইয়াছিল। তাহারা লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা, মা ও মাতৃভূমিকে ধর্ষণের দিকটি আড়াল করিতে চাহেন। কোণঠাসা হয়ে পড়া মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীকে বাঁচাইতে একদিকে তাহারা ন্যায়পরায়ণ ও শোষণবিরোধী এসলামকে অবমাননা করিয়াছেন অন্যদিকে ‘জাতীয় ঐক্যে’র রব তুলিয়া সাম্প্রদায়িক রাজনীতির গোড়ায় পানি ঢালিয়াছেন।

তাই চলমান আন্দোলনের লক্ষ্য হইবে জামায়াত-শিবিরের সাথে সাথে বিভিন্ন পরিচয়ে ঘাপটি মারিয়া থাকা তাহাদের দোসরদেরও পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা। স্বীকার করিতে হইবে এ এক কঠিন কাজ কিন্তু ইহা অত্যাবশ্যকীয়ও বটে। তাই আন্দোলনের নেতৃত্বকে আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেও ব্যাপক ভিত্তিতে ইহার সহিত যুক্ত করা দরকার।

বর্তমান আন্দোলন যাহারা পরিচালনা করিতেছেন তাহাদের সাথে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অংশ হইতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের — মুক্তিযোদ্ধা, শ্রমিক কৃষক পেশাজীবী সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব , ওলামা ও মাশায়েখগণ, বুদ্ধিজীবী ও অন্যান্য প্রগতিশীল অংশ — সমন্বয়ে একটি জাতীয় প্লাটফর্ম গঠন করা অতীব জরুরি। আন্দোলনকে আগাইয়া লইতে এই প্লাটফর্মে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে ভুল সংশোধন ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সকলের মতামতের প্রতিফলন ঘটাইতে হবে।

আন্দোলনকে শ্লোগান ও জমায়েত সর্বস্ব রাখা যাইবে না। মুক্তিযুদ্ধের মতন প্রত্যেকটি সমর্থক ও অংশগ্রহণকারীকে সুনির্দিষ্ট কাজের আহ্বান জানাইতে হইবে। প্রত্যেকে যেন যাহার যাহার নিজস্ব মেধা ও মনন দিয়া আন্দোলনকে বেগবান করিতে পারে সেই লক্ষ্যে সকল সমর্থককে পরিচালিত করিতে হইবে।

ব্লগার ফেনোমেনা ও সময়ের প্রশ্ন – মাহবুব রশিদ

আজ শাহবাগে যাবার সময় রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই কিছু মনে না করলে একটা কথা জিগাই… ব্লগার কাগো কয়?’

আমি বললাম, কম্পিউটারে যারা লেখালেখি করে তাদের ব্লগার বলে।

অকস্মাৎ ব্লগাররা একটা ফেনোমেনা হয়ে উঠেছেন। তারা কিন্তু সমাজের বাইরের কেউ না। ব্লগিং তাদের কারও পেশাও না। এদের কোন ক্লাস ইন্টেন্সিটিও নাই। একটা কমিউনিটিতেই তাদের পদচারণা। সে কমিউনিটিতে তাদের আলাদা নর্ম আছে, আলাদা ভাষা আছে, আলাদা আচরণবিধি আছে। সে কমিউনিটির বাইরে কোন আলাদা জাতীয় চেহারা তাদের ছিল না। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ দূরে থাক, নাগরিক অনেকেই তাদের চেনে না।

কিন্তু ঘটনা পরম্পরায় তারা আজ জাতীয় চরিত্র।

সে দায়দ্বায়িত্ব নেওয়ার জন্য এ কমিউনিটি কতটা প্রস্তুত?

ব্লগারদের ডাকে সারা ঢাকা শহর, সারা দেশ মোমবাতি জ্বালিয়েছে। অফিসের কেরানিকে পর্যন্ত ডাক দিয়েছে কিছু না জেনেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিন মিনিট নীরবতা পালন করেছে। কম করে হলেও ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ শাহবাগে এসেছে।

এসব মানুষের সাথে সেই ব্লগারদের কোন সংযোগ আদৌ আছে কি? তারা কি সেই সেনাপতি না যার সেনাবাহিনীর উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই? যে সেনাবাহিনীকে সে মবিলাইজ করতে পারে না?

তাই ব্লগারদের সব রকম সুচেতনা থাকা সত্ত্বেও তা রাজনীতির দখলে। তাই ব্লগারদের আন্দোলন আজ যে বেশি ক্ষমতাবান তার করতলগত।

সমাজের একটি ছোট অংশ হিসেবে সব মানুষের প্রতিনিধি হয়ে ব্লগাররা ন্যায় দাবি নিয়ে এসেছিল। সবাই সে দাবির সাথে সংহতিও জানিয়েছিল। ফলে পাই শাহবাগের প্রথম ১০ দিনের অসাধারণ গণজোয়ার।

কিন্তু সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় নাই ক্ষমতাবান রাজনীতির ইন্টারভেনশনের ফলে।

তাই অনবরত ক্রেডিবিলিট হারাচ্ছে শাহবাগ।

শাহবাগের শুরুর দাবি ছিল ক্ষমতাবানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে। কিন্তু সে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না। তার চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তার র‌্যাডিকাল হয়ে ওঠার সব সম্ভবনা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।

ইদানিং সে নানান রকম হাইকোর্টও দেখাচ্ছে।

ব্লগাররা আউট অভ নাথিং হয়ে উঠলেন ন্যাশনাল হিরো। কিন্তু তার কোন স্টেক নাই। এমন নির্বিষ প্রোটেস্টার বা আন্দোলনকারী আর কবে কে কোথায় পেয়েছিল?

অনলাইনে যারা এ্যাক্টিভিজিম করেন, সময় তাদের সামনে এক বড় প্রশ্ন নিয়ে এসেছে।

তারা ভার্চুয়ালি বুলিবাগিশ ক্যাচালপ্রিয় একটা কমিউনিটি হয়েই থাকবেন?

নাকি বুক টান টান করে দাঁড়াবেন?

ঘাস কলি যত গোপনে ফোটায় ছোট ছোট সাদা ফুল।

উঁকি দিয়ে ফুল ঝরে যাবে তুমি কেন?

সংঘবদ্ধ হোন। সংঘং সরনং গচ্ছামি।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

সম্ভাবনার শাহবাগ – উদিসা ইসলাম

(c) আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

(c) আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান

টানা অবস্থানের ১৯ দিনের মধ্যে ১৬ দিন আমি শাহবাগে গিয়েছি, রাত ১১টা পর্যন্ত আমি সেখানে অবস্থান করেছি। আমি আমার চোখে দেখা, এবং সেখানে অবস্থানরত মানুষের মুখের ভাষার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন দেখতে চেয়েছি। হাজারো মানুষ। প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন মত। কিন্তু কোথায় যেন এক সুরে বাধা। কোথায়? আমার সবসময় মনে হয়েছে — তারা এই আশা থেকে এসেছে — কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষ হয়ে তারা আসেনি, তারা ফাঁসির দাবি নিয়ে হাজির হয়েছে, যে দাবি তোলা তার অধিকার বলে সে বিশ্বাস করেছে।

শুরু থেকেই এটা কার প্ল্যাটফর্ম, কে দাঁড়াবে, কে দাঁড়িয়ে কতটা সুযোগ পাবে, এই আন্দোলনের নেতৃত্ব কার থাকবে, যে নেতৃত্ব দিচ্ছে সে কতটা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে সমর্থ, যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের সাথে কারা আছে, পিছনে কারা আছে, দড়ির শেষ মাথা কার হাতে আছে, আরো নানা কথা যে ওঠেনি তা কিন্তু না। কেউ কেউ দূরে থেকে, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এসব কথা  বলেছেন, কেউ বা শাহবাগে বসে থেকে, একটু দূরে ঘুরাঘুরি করে এসব কথা ভেবেছেন, বলেছেন।

জনতার কাতারে বসে রোজ যখন নতুন নতুন ফুলে নতুন ডিজাইনে বাংলাদেশের পতাকাকে উপস্থিত হতে দেখি তখন শিউরে উঠি। তখন আমার এই সংসয়বাদীদের মনে পড়ে না। আমি যখন পিজি হাসপাতাল আর বারডেম হাসপাতালের মধ্যবর্তী রাস্তার আকাশ একটা দীর্ঘ পতাকায় ছেয়ে ফেলতে দেখি, এত বড় যা আমি কল্পনাতেও দেখিনি, তখন আমি কেঁপে উঠি, তখন আমি মনের জানালা বন্ধ করা কথা শুনতে চাই না। যখন লক্ষ মোমবাতির একটা মোমবাতি আমার হাতে থাকে তখন আমি স্বপ্ন দেখতে শিখি। একে আমি আবেগ বলতে চাই না। রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির প্রথম ধাপ বলতে চাই। আমাদের তরুণদের আকাক্সক্ষার জায়গাগুলোকে নাড়া দিয়ে শাহবাগ সেটা করতে পেরেছে।

শাহবাগ নামটা আজ সবার আশা জাগানিয়া একটা স্থানে পরিণত হয়েছে। যে যাই বলুক না কেন, এই আশ্রয়টাকে সবাই চিনেছে তো! চিনিয়েছে যারা তাদের ‘নেতা’ মানতে সমস্যা দেখি না তো। এটাও মনে রাখতে চাই, আমরা নেতার পিছে থাকি বটে কিন্তু নেতা যদি ভুল করেন তাহলে পিছন ফিরে তিনি কিছু চাটুকার পাবেন, গণমানুষের সমর্থন নয়। ভুল করা, জনতার স্বার্থবিরোধী কাজ করা নেতার পিছে যে মানুষ দাঁড়ায় না সেটা তো এই শাহবাগ প্রমাণ করেছে।

যে হাজার হাজার মানুষ সেখানে প্রথমবারের মতো যান, প্রতিদিন যে নতুন নতুন মুখ, তারা কিন্তু জানেন না কে ছাত্রলীগ কে বাসদ বা কে সিপিবি বা ছাত্রমৈত্রী কে ফ্রন্ট ফেডারেশন। আর কেই বা ব্লগার। কিন্তু তারা সেখানে আসছেন, আছেন। কারণ সেই নেতাদের চাওয়ার সাথে আপাতত তারা একমত। আমি এই সম্ভাবনা দেখতে, সম্ভাবনা গড়তেই শাহবাগ যাই। বারবার আহ্বান জানাই, একবারের জন্য আমজনতার কাতারে দাঁড়ান, হিসেব নিকেশ ছাড়া। কেন বলছি? কারণ আমার সেই দলগত জায়গা, পরিচিত নেতারা তো আমাকে ডেকে রাস্তায় নামাতে পারেনি। আমি ঘি খাওয়া মধ্যবিত্ত, পথে থাকতে আমার নানা অসুবিধা, তারপরও গত ১৯ দিন ধরে আছি তো। শাহবাগের এই অর্জনকে যারা ছোট করে দেখার চেষ্টা করবেন বা কোন রাজনৈতিক মোড়কের সংশয় নিয়ে বিশ্লেষণ করবেন, আমার আশঙ্কা তারা রাজনীতির গন্ধ খুঁজতে গিয়ে গণমানুষের রাজনীতিবোধের সম্ভাবনার জায়গাগুলো থেকে দূরে সরে যাবেন। ক্রমশ।

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শাহবাগ গণজাগরণ

[শাহবাগ আন্দোলনের দিকে এখন উচ্ছ্বসিত দৃষ্টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার। স্বনামধন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে নানামুখী বিশ্লেষণের নানান প্রবন্ধ নিবন্ধ। সেসব রচনার অল্প কয়েকটির পরিচয় এখানে তুলে ধরা হল। — সম্পাদক]

(c) হামিদুর রহমান স্বরূপ

(c) হামিদুর রহমান স্বরূপ

সর্বশেষ বিশ্ববিখ্যাত ‘টাইম’ ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন। ‘র‌্যালিং ইন শাহবাগ স্কয়ার, ইয়ং বাংলাদেশ ফাইন্ডস ইটস ভয়েস’ (শাহবাগ সমাবেশ, তরুণ বাংলাদেশ খুঁজে পেল তার কণ্ঠস্বর) শীর্ষক ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনটি লিখেছেন সাংবাদিক জ্যাসন মটলাগ। এতে বলা হয়:

জনসমুদ্রের স্কয়ারে এক তরুণীর অনর্গল সেøাগান, আশেপাশে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড, শশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধের গলায় প্রতীকী ফাঁস, অসংখ্য অংশগ্রহণকারীর মাথায় রক্তলাল ফিতায় বজ্রকণ্ঠে তরুণীর দাবি ‘যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ চাই।’ এই তরুণী এবং তার সঙ্গে আন্দোলনে শরিক অনেকেই চার দশকের বেশি সময় আগে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের সময় জন্ম নেয়নি। মেগাফোন হাতে থাকা নিধি হোসাইন নামে ১৩ বছরের এক কিশোরীর দাবি ‘এই যুদ্ধাপরাধীদের থেকে চিরতরে মুক্ত হয়ে আমরা দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে হাজারো মানুষের সমাবেশ বড় কোন ঘটনা নয়। কিন্তু দুই সপ্তাহব্যাপী চলা শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে অন্যসব সমাবেশের তফাতটা হল এটা একেবারেই দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। যদিও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ আন্দোলন থেকে কিছু ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। বিরোধী দল আছে অনেকটাই বেকায়দায়। এই তরুণ প্রজন্মের জাগরণে সব দলই চলে গেছে পেছনের সারিতে। আর এই তরুণরা খুঁজে পেয়েছে নিজেদের কণ্ঠ।

টাইমের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান দিন দিনই সংকুচিত হয়ে আসছে। আগামী সপ্তাহগুলোতে দলটি আরো অনেক সংকটে পড়তে পারে।

এদিকে শুরু থেকে শাহবাগ আন্দোলনকে একটু আড়চোখে দেখা আল জাজিরা অনলাইন গতকাল প্রথমবারের মত এটাকে তাহরির স্কোয়ারের চেতনার সঙ্গে তুলনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘ঢাকা সিট-ইন ইনভোকস তাহরির স্কয়ার’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অনেক ঐতিহাসিক আন্দোলনের শিকড় ছিল এই শাহবাগ। ভাষা আন্দোলনের উত্থান, শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ডাক এবং পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘটনা ছিল এই শাহবাগের আশপাশ ঘিরেই। অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন, বর্তমান শাহবাগ আন্দোলনও বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে নির্ধারক।

এদিকে ‘দ্য ওয়ার বাংলাদেশ ক্যান নেভার ফরগেট’ শিরোনামে সাংবাদিক ফিলিপ হেনসহারের লেখা একটি নিবন্ধ গতকাল ব্রিটেনের দ্য ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর আলশামসদের নৃশংসতা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের ঐ নৃশংসতা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে এর বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের চোখের সামনে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে। আর আমরা যারা ওই নৃশংসতার কথা ভুলে যেতে বসেছি তাদের এখন উচিত হবে সেই সম্পর্কে নতুন করে জানা এবং খুনিদের আশ্রয় না দিয়ে নিজেদের দায়দায়িত্ব পালন করা।

‘ইন বাংলাদেশ এ জেনারেশন টার্নস ইটস পলিটিক্স টু দ্য অ্যাংগ্রি পাস্ট’ শিরোনামে ১৯ ফেব্রুয়ারি কানাডার গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকা প্রকাশ করেছে একটি প্রতিবেদন। সাংবাদিক ওয়েন লিপার্টের লেখা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দাবি করছে। তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য হওয়া উচিত চার দশকের রাজনৈতিক হানাহানির অবসান ঘটিয়ে দেশে সত্যিকার রাজনৈতিক সংস্কার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

শাহবাগ আন্দোলন নিয়ে মুখ খুলেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও। ‘দ্য বাংলাদেশি স্প্রিং: উইথ ঢাকা’স শাহবাগ প্রটেস্টস, দ্য কান্ট্রি কুড বি হ্যাভিং ইটস তাহরির স্কয়ার মুভমেন্ট’ এবং ‘বাংলাদেশ সিকস জাস্টিস ফর অ্যা বেটার টুমরো’ শীর্ষক দুটি প্রতিবেদন গতকাল প্রকাশিত হয়েছে ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়ার অনলাইনে। সুবীর ভৌমিকের লেখা প্রথম প্রতিবেদনে বলা হয়, আরব বসন্তে পতন হয়েছিল স্বৈরশাসকদের, আর বাংলাদেশের বসন্ত হবে সম্ভবত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনর্জাগরণের। প্রতিবেদনে ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, শাহবাগ আন্দোলনের দাবির মুখে শেখ হাসিনা সরকার দ্রুত ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করেছে। প্রতিবেদনে সুবীর ভৌমিক বলেন, ভারত একমাত্র দেশ যে যুদ্ধাপরাধের বিচারে সমর্থন দিয়েছে। শাহবাগ আন্দোলনের প্রশংসা করেছে ভারত সরকার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের কবরস্থানে পরিণত হয়েছিল। এখন জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে তা গোটা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির পক্ষে একটা নজির স্থাপন করবে।

(সংকলিত)

একটি জাতপাতহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে – শামসেত তাবরেজী

তরুণ প্রজন্মের শাহবাগ আন্দোলনকে লক্ষ্য করে একটি দৈনিক পত্রিকায় জনৈক ‘সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকে’র আশঙ্কা প্রচারিত হয়েছে। তার আশঙ্কা জনপ্রিয় আন্দোলন থেকেও ফ্যাসিবাদের উত্থান হতে পারে। আমরা বলব, তা তো পারেই। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে এও বলব, তখনো তরুণরাই আবার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ইতিহাস আমাদের বলছে, তরুণসমাজ সবসময়ই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। আমাদের বিশ্বাস উনি এই ইতিহাসটা ভালই জানেন। এই জাতীয় বুদ্ধিজীবীদের প্রসঙ্গেই মহাত্মা আহমদ ছফা মন্তব্য করেছিলেন যে এঁদের কথা শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না।

যাহোক, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে সশস্ত্র সংগ্রাম করে স্বাধীন হয়েছে। তবে, স্বীকার করতে হবে, সেই যুদ্ধ অসমাপ্ত। আজকের শাহবাগের লড়াই শেষ না হওয়া সেই লড়াইয়ের পরবর্তী অংশ মাত্র। এর বেশি শাহবাগ চত্বর থেকে একটা কথাও কানে আসে নাই।

জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া এই আন্দোলন সম্ভবপর ছিল না। তরুণদের নেতৃত্ব সেই আন্দোলনে আলো জ্বেলে দিয়েছে। এখন আপামর জনগণই তাদের কাম্য-রাষ্ট্রের চেহারা তৈরি করে দেবেন। বুদ্ধিজীবীদের যদি কোন দায়িত্ব এখানে থেকে থাকে তবে তা হল জনগণের অভিপ্রায়কে ভালভাবে বুঝতে পারা এবং সেইমত কাজ করে যাওয়া। নতুন কোন ফ্যাসিবাদের উত্থানের আশঙ্কা বাজারজাত করার আগে বিদ্যমান ফ্যাসিবাদের (ধর্মীয় ফ্যাসিবাদসহ) লড়াই করাটাই হবে ইতিহাসের ন্যায়। তত্ত্বকে জনগণের অভিপ্রায়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে না পারার দায় তো বুদ্ধিজীবীর, আন্দোলনকামী জনগণের না, গ্রামসির এই মর্মবাণীটুকু অনুধাবন করলেই যথেষ্ঠ।

মনে রাখা দরকার শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনে একটি মাত্র বিষয়ের উপর আলো ফেলা হয়েছে। তাকে নানার্থে ব্যাখ্যা করার চেষ্টাটি বুঝি আকাশবিহারী (টকশো-প্রধান) বুদ্ধিজীবীদেরই ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্যযাপন’!

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তরুণসমাজ একটি জাতপাতহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে এই আন্দোলন চালিয়ে যাবে।

অরাজনৈতিক নয়, রাজনৈতিক – আফরোজা সোমা

(c) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

(c) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

(গতকালের পর)

কি আছে এই আওয়াজে যা সন্তানকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান গাওয়া থেকেও দূরে টেনে আনতে পারছে অবলীলায়?

কি আছে এই আওয়াজে, যার রোমাঞ্চের টানে, কোনদিন মিছিলে না যাওয়া তরুণটিও এসে শ্লোগানে মিলিয়েছে গলা?

কি আছে এই আওয়াজে, যা রাজনৈতিক সকল হিসেব পাল্টে দিয়েছে?

কেন এই আওয়াজকে প্রতিহত করার জন্য মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে নাজুক, সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিশ্বাসের জায়গাটিকেই বেছে নিতে হল রাজনৈতিক হিসেব মেলানোর জন্য?

ডান-বাম-মধ্য-উগ্র কোন পক্ষই আজ এককভাবে এই আওয়াজকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে নিজেদের পক্ষে বা বিপক্ষে ভাবতে পারছে না।

অরাজনৈতিক নয়, রাজনৈতিক:

৫. স্বাধীনতা চাওয়া মানুষের জন্মগত অধিকার এবং স্বাধীনতার এ দাবি অরাজনৈতিকও বটে। কিন্তু সেই অধিকার বাস্তবায়ন করা অরাজনৈতিকভাবে সবসময় সম্ভব নয়।

অত্যাচারী জমিদার যখন কৃষকের ধান কেটে নেয়, যখন যুবতী মেয়েটিকে করে নির্যাতন, তখন পিতার বুকের যন্ত্রণা, কৃষকের বুকের ক্ষোভ, ভাইয়ের বোনের হতাশাটা ব্যক্তিগত এবং অরাজনৈতিক থাকে বটে।

কিন্তু যখন একই রকম হতাশা নিয়ে, দুঃখ, ক্ষোভ নিয়ে একসঙ্গে জমায়েত হয় সমব্যথী প্রজাসকল, যখন তারা প্রতিকারের আশায়, প্রতিহত করার মনোবল নিয়ে যূথবদ্ধ হয়ে ঘুরে দাঁড়ায় রাজা বা জমিদারের হুকুমের বিরুদ্ধে, যখন তারা মামুলি বাঁশের লাঠি বা ঘটিবাটিকেও প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরে, তখন তা আর ব্যক্তিক থাকে না; অরাজনৈতিক থাকে না, হয়ে ওঠে তুমুল রাজনৈতিক লড়াই।

তাই, শুধু দূর অতীত নয়, নিকট ইতিহাসে দেখা যায়, আমেরিকাবাসীর স্বাধীন হওয়ার অরাজনৈতিক দাবি বাস্তবায়ন হয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়; আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার অরাজনৈতিক স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়; একেক জন ভারতবাসী আলাদা আলাদাভাবে, বিচ্ছিন্নভাবে স্বাধীনতা প্রাপ্তির যে অরাজনৈতিক বাসনাটি পোষণ করেছিল মনের গহীনে তার বাস্তবায়ন করার চূড়ান্ত পথটিও ছিল রাজনৈতিক ।

১৯৪৭ সালে বাংলা ভূখণ্ড ভারত ছেড়ে পাকিস্তানের সাথে যোগ দিয়েছিল যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আশায় তাও অরাজনৈতিক ছিল না। পূর্ববঙ্গের ব্যথিত, বঞ্চিত মানুষের স্বাধীন দেশ প্রাপ্তির নিরীহ অরাজনৈতিক দাবিটিও তাই অরাজৈনিতকভাবে সফল করা সম্ভব হয়নি। রক্তের নদী পেরিয়ে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলা শেষে স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশ।

অতএব আজকের এই ‘শাহবাগ আন্দোলন’ শুরুতে যতই অরাজনৈতিক আন্দোলন থাকুক না কেন, তা আজ আর অরাজনৈতিক আন্দোলন নয়।

শাহবাগ যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে তা হল দর্শনের বিরুদ্ধে দর্শনের লড়াই। এই লড়াইয়ে কেবল ব্যক্তি নয় সংঘেরও  জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত।  তাই, এই শাহবাগ শুধু তো স্থানীয় রাজনীতি নয়, একইভাবে অনুমান করি অন্তর্জাতিক রাজনীতিরও অংশ হয়ে উঠেছে হয়তো।

শাহবাগ বুঝুক বা না বুঝুক, চাক বা না চাক, সে এখন রাজনৈতিক মঞ্চ।

স্বাধীন হওয়ার অরাজনৈতিক চেতনা ও দাবি যেমন করে একদিন অজান্তেই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, শাহবাগও আজ সেভাবেই হয়ে ওঠেছে রাজনৈতিক মঞ্চ। তাই, শাহবাগকে প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে রাজনৈকিত ঘাত প্রতিঘাত।

তাহলে, এই তুমুল রাজনৈতিক হিসেব-নিকেষের মধ্যে শাহবাগ তার দাবিকে আর কি করে অরাজনৈতিকভাবে সফল করতে পারবে?

অতএব, এই শাহবাগ যদি হেরে যায়, সে একা হারবে না; পুরো একটি প্রজন্মকে নিয়েই হবে তার পতন। শাহবাগ যদি হেরে যায়, সে পতন হবে দার্শনিক; আর সে পতন হবে রাজনৈতিকও।

প্রথম প্রকাশ: সামহোয়ারইন…ব্লগ

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩