Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 23, 2013

সম্পাদকীয়

কাণ্ডারী হুশিয়ার!

বাংলা সাহিত্যের অমর শিল্পী মীর মশাররফ হোসেন একদা ‘গো-জীবন’ পুস্তক প্রচার করিয়াছিলেন। তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল সর্বাগ্রে দেশের মুক্তির জন্য হিন্দু-মুসলমানের স¤প্রীতি। তিনি বলিয়াছিলেন, আপাতত বিরোধের সেই দিনে মুসলমানরা গো-মাংস ভক্ষণ বন্ধ রাখুক। হৃদয়বান মশাররফের ডাক সেইদিন ধর্মান্ধ মুসলমান নেতারা বুঝিতে চেষ্টা করেন নাই। জামায়াত-শিবির ভিন্ন নামে হরতাল ডাকিয়া তাহাদের দলের শিরোমনি রাজাকারদের রক্ষার্থে শেষ মরণকামড় বসাইতেছে। দেশের মানুষকে আস্তিক নাস্তিক দ্বন্দ্বে বিভক্ত করিয়া তাহারা তাহাদের রাজনীতি রক্ষার ভয়ঙ্কর চাল চালিয়াছে। এই মুহূর্তে তাহাদের তালে বিপরীত দিক হইতে তাল মিলাইতেছে কিছু নির্বোধ নাস্তিক ব্লগার।  যুগের এই সন্ধিক্ষণে মশাররফের শিক্ষা আমাদিগের পাথেয় হইতে পারে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেহ যদি নাস্তিক থাকিয়াও থাকেন, আপাতত তাহাদের ইসলামবিদ্বেষ কিংবা অপ্রয়োজনীয় নাস্তিকতার বাহাদুরি বর্জন করিতে হইবে।  বাংলাদেশে ইসলাম কোন বিপদের মধ্যে নাই। ধর্ম ব্যবসায়ীরা ইসলামের নামে জনগণকে জেহাদের ডাক দিয়া যাইতেছে তাহাদের রাজাকারির গদি বজায় রাখিতে। দেশের জনগণ আজ একতাবব্ধ। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবি হইতে তাহারা এক পাও  পিছু না হটুক। ইহাই আজিকে সবচেয়ে বেশি কাম্য।

শাহবাগ নিয়া কয়েকটা রাজনৈতিক প্রস্তাব – ইমরুল হাসান

Sloganশাহবাগের যেইটা সবচে শক্তির জায়গা সেইটাই শাহবাগের সবচে দুর্বল জায়গা হিসাবে চিহ্নিত হইতে যাইতেছে। শাহবাগের জমায়েত বিভিন্ন — আওয়ামী লীগ, সিপিবি, বাসদ, জাসদ, বিএনপি সমর্থক, ফিল্ম সোসাইটি, ক্যাডেট কলেজ, কবি, গায়ক, ছাত্র, কর্মজীবী, গৃহজীবী, প্রবাসী, জেলা শহর… এইরকম অসংখ্য ব্যক্তি, সংগঠন এবং আইডেন্টিটি।

এই যে ঐক্যের ভিত্রেও বিভিন্নতা, সেইটাই শক্তি। আবার এই যে বিভিন্নতা সেইটাই দুর্বলতা। কারণ, যে কোন একটা অংশরেই শাহবাগ বানাইয়া দেয়া যাইতেছে। যেমন ধরেন, নাস্তিকরাই শাহবাগ। আওয়ামী লীগরাই শাহবাগ। কমিউনিস্টরা শাহবাগ। মিডিয়ার শাহবাগ। ফ্যাসিস্ট শাহবাগ।

এর প্রত্যেকটা অংশই সত্যি হওয়ার সম্ভাবনার ভিতর থাকলেও এর কোনটাই শাহবাগ না। কিন্তু অংশরে সমগ্র কইরা তোলা যাদের চিন্তার অভ্যাস, তারা এইটা করতেই থাকবো। তাদের ইগনোরেন্সের কারণে না, তাদের রাজনৈতিকতার কারণেই। শাহবাগের এক হওয়ার জায়গাটারে বাদ দিয়া, শাহবাগের এই বিভিন্নতারে ‘এক’ বানানোর চেষ্টা, ব্রাকেটবন্দী করার চেষ্টা হইছে, হইতেছে এবং হবেও। এই যে শাহবাগের ‘এক’ হয়া উঠা এবং থাকা — এইটা সবার পেরেশানির কারণ। শক্তি এবং দুর্বলতা।

এই আন্দোলনের একজন সমর্থক হিসাবে শাহবাগের রাজনৈতিক কর্মসূচি কি হইতে পারে এইরকম একটা জায়গা থিকা কিছু চিন্তা আসছে, যেইটা হয়তো অনেকটাই ইরিলিভেন্ট এবং ইনসিগনিফিকেন্ট। তারপরও মনে হইলো শেয়ার করা যায়।

 ১. সংগঠন আকারে আন্দোলনরে ছড়াইয়া দেয়া দরকার। সংগঠন স্থায়ী কোন কিছু না হওয়াটাই ভালো, তাইলে ট্রাডিশনাল রাজনীতির খপ্পরে পইড়া যাওয়ার সম্ভাবনাই বাড়বো। আন্দোলনের সাফল্যের জন্য স্বল্পস্থায়ী এবং এফেক্টিভ একটা নেতৃত্ব খুবই জরুরি। দেখবেন যে মিডিয়া ‘নেতা’ আবিষ্কার করতে চাইতেছে, কিন্তু কেউ যে নেতা হইতে চায় নাই এইটা এখন পর্যন্ত আন্দোলনের ম্যাচুরিটি। আন্দোলনের আল্টিমেটাম ঠিক কইরাই এই বিষয়ে আগানোটা দরকার। টাকা ছাড়া সংগঠন চালানো সম্ভব না। সংগঠনের অর্থনৈতিক উৎস এবং এর ব্যবহার প্রকাশ্যে হওয়াটা জরুরি।

২. আন্দোলনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং কর্মপন্থা নির্দিষ্ট করা দরকার। রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ লক্ষ্য হইতে পারে না, কারণ আরো ২০ বছর পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা রাজাকার ছিল এমনিতেই মরবো। বরং পজিটিভ অর্থে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এর লক্ষ্য হইতে পারে। মানে, এইটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই ঠিক করা যাইতে পারে। একটা ওয়েব সাইটে এবং অফিসের ঠিকানায় সাজেশন চাওয়া যাইতে পারে সবার কাছ থিকা।

যদি আমার কথা বলেন এই মুহূর্তে এইরকম কিছু ভাবতেছি; লক্ষ্য: মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সকল যুদ্ধাপরাধের বিচার। উদ্দেশ্য: বাংলাদেশরে সামাজিকভাবে একটা ন্যায়বিচারমূলক রাষ্ট্রে উন্নীত করা। কর্মপন্থা: চিহ্নিত ৫/১০/২০ জন রাজাকার এবং ২/৫টা সংগঠনরে ৩/৬ মাসের মধ্যে নিষিদ্ধ করা। ৫০/১০০ জন রাজাকারের তালিকা তৈরি করা যাদের বিচার করা দরকার। এইরকম…

৩. রাজনৈতিক দলগুলারে ডরাইয়েন না। সংগঠনের ভিত্রে না নিলেও উনাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভিতর বরং কেমনে ইনক্লুড করা যায় সেইটার জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিতরে থাকাটা জরুরি। আওয়ামী লীগ শাহবাগরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করবো কিনা, বিএনপি এর সাথে জড়িত হইতে পারবো কিনা নাকি শাহবাগ রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিরে ডিটেক্ট করবো এইটা শাহবাগ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে কতটা সংগঠিত এইটার উপরেই নির্ভর করবো।

৪. আদালতের রায়ের চাইতে গণভোট বেটার অপশন। আইন-আদালত ত আছেই, কিন্তু আইন-আদালতের চাইতে গণরায় পলিটিকালি অনেক বেশি জাস্টিফাইড একটা ঘটনা হইতে পারে। এইটা নিয়াও আন্দোলন চিন্তা করতে পারে।

৫. উগ্র জাতীয়তাবাদের চাইতেও উদার মানবিকতা খারাপ জিনিস। অংহিস পন্থা অবশ্যই এখন পর্যন্ত শাহবাগের সাফল্যের কারণ। কিন্তু অহিংস থাকার মানে এই না যে ভোঁতা হয়া থাকা। আবার, এগ্রেসিভ থাকার মানেও সংহিস থাকা না। যেইসব ‘উদার মানবিকতার’ ধারণাগুলা আন্দোলনরে মডিফাইড করার মাধ্যমে ভোঁতা করতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য সর্ম্পকে সচেতন থাকাটা দরকার। কারণ এরাই বৈশ্বিক পুঁজির সাংস্কৃতিক দালালিটারে প্রমোট করে, গল্প-কবিতা-গানের মাধ্যমে অউন করতে চায়। লাতিন আমেরিকার উগ্র জাতীয়তাবাদ অন্তত তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা করতেছে। বাংলাদেশেরও যে সেইটাই করা লাগবো তা না। কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদের পক্ষে ফ্যাসিস্ট হওয়াটা যে সম্ভব না এইটা গ্লোবাল কনটেক্সটারে একটু আমলে নিলেই বোঝা যায়।

খুব তাড়াহুড়া কইরাই কইলাম। কিন্তু আন্দোলনের সাথে যারা আছেন, যারা সমর্থন করেন, এই আন্দোলনরে রাজনৈতিকভাবে কিভাবে সফল করা যায় এই বিষয়ে তাদের কথা-বলা দরকারি — এইরকম একটা জায়গা থিকাই  কথাগুলা বলা।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

এসলামের সংকট – সলিমুল্লাহ খান

কোন কোন পশ্চিমদেশীয় পণ্ডিত বলিয়া থাকেন জগৎ জুড়িয়া এসলাম ধর্ম প্রচারিত হইয়াছে তলোয়ারের জোরে। হজরত এসা নবীর সপ্তম শতকে এসলাম ধর্ম আরবদেশ হইতে বাহির হইয়া বিদ্যুতের গতিতে এশিয়া, আফ্রিকা ও এয়ুরোপ — তিন মহাদেশেই ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। এই গতিতে তলোয়ারের একটা ভূমিকা ছিল — কথাটা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিন্তু তাহার পরও স্বীকার করিতে হইবে পশ্চিমা পণ্ডিতদের দাবিটি পুরাপুরি সত্য নহে। বড়জোর অর্ধসত্য মাত্র। এসলাম শুদ্ধমাত্র তলোয়ারের জোরে প্রচারিত হয় নাই।

এসলামের শিক্ষা সেই জমানার দুনিয়ায় এক প্রকার সমাজবিপ্লবের পথ সুগম করিয়াছিল। সেই কারণেই পারস্যদেশের শ্রমজীবী জনগণ — আরব জাতির বিভিন্ন গোত্র যাহাদের ‘মাওয়ালি’ (অর্থাৎ মোওয়াক্কেল) উপাধি দিয়াছিল — দলে দলে এসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ইরানি শ্রমজীবীদের প্রভাবেই এসলাম সাম্যের ধর্ম বলিয়া নতুন পরিচয় লাভ করে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় আমরা যে সাম্যের গান শুনি — সরলতা যাহার ভূষণ — তাহা সেই ইরানি মাওয়ালিদের দান বলিয়াই এখন সকলে জানেন।

এই ইরানিদের কল্যাণেই আমরা বাংলায় এতদিন যাবৎ এসলামের সকল অনুষ্ঠানের নাম আরবির জায়গায় ফার্সিতে পাইয়া আসিয়াছি। আল্লাহর জায়গায় খোদা, সালাতের জায়গায় নামাজ, সাওমের জায়গায় রোজা, হাফিজের জায়গায় হাফেজ, ইসলামের জায়গায় এসলাম — এই ফার্সি প্রভাবেরই ফল।

এই সকল শব্দ সাক্ষ্য দেয় বাংলাদেশে এসলাম কোন পথে দলে দলে প্রবেশ করিয়াছিল। ইরানি মাওয়ালিদের নাহান বাঙ্গালি মাওয়ালিরাও এসলাম কবুল করিয়াছিলেন। আশা বর্ণাশ্রম সমাজ ও ধর্ম হইতে মুক্তিলাভ। এই সমাজবিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি এসলামই যোগাইয়াছিল। আল্লাহ বা খোদার উপর বিশ্বাসের গোড়ায় মনুষ্যজাতির একত্বই প্রকৃত প্রস্তাবে প্রকাশ পাইয়াছিল। এসলামের শিক্ষা এই নৈতিক নেতৃত্ব বা হেজিমনির কল্যাণে দুনিয়ার আর দশ দেশের নাহান বাংলা মুলুকেও আসন পাইয়াছিল। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতের মতন এসলামের অন্য চারি অনুষ্ঠান এই বিশ্বজনীনতার প্রকাশ রূপ বৈ নহে। ইহার পরও আরো অনেক অনুষ্ঠান ও বিশ্লেষণ এসলামের সহিত বিকাশ লাভ করিয়াছে। তাহাদের অনেকগুলি নিতান্ত আরব সংস্কৃতির উপাদান। এ কথা চতুর্দশ শতকের আরব মনীষী এবনে খলদুন আর অষ্টাদশ শতকের ভারতরতœ শাহ ওয়ালি আল্লাহ পর্যন্ত জানাইয়া গিয়াছেন। একই কারণে এসলামের কিছু কিছু আচার ও ভাষা ইরান হইতে আসিয়াছে। তুরস্ক, পূর্ব এয়ুরোপ আর মধ্য এশিয়াও স্ব স্ব শিশিরবিন্দু এসলামের দীঘিজলে যোগ করিয়াছে। বাংলায় এসলাম প্রচার করিলে এখন পূণ্যকর্ম বা সওয়াবের কাজ বলিয়া বিবেচিত হয়। পবিত্র কোরানের বাংলা অনুবাদ এখন একাধিক।

গত ২২ ফেব্রুয়ারির কোন কোন মিছিলে দেখা গিয়াছে এসলামি দলগুলোর সভ্যরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ছিঁড়িয়াছেন। কেহ কেহ শহিদ মিনার গুড়াইয়া দিয়াছেন। কেহ কেহ বলিতেছি এই জন্য যে এই দলগুলির নেতৃত্ব এখনো ঘোষণা করেন নাই বাংলাদেশের পতাকার বিরুদ্ধে তাঁহাদের আপত্তিটি কি। তাঁহারা কি শহিদ মিনার গুড়াইয়া দিবার দাবি উত্থাপন করিয়াছেন? আমরা আশঙ্কা করি ব্যবহারটা যদি তাঁহাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন হইয়া থাকে তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়িয়াছে।

তাহা হইলে আরো প্রশ্ন করিতে হইবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সহিত এসলামের দ্বন্দ্বটা কোথায়? ইতিহাসের সহিত যাঁহাদের অল্প হইলেও পরিচয় আছে তাঁহারই স্বীকার করিবেন এসলামের সহিত বাংলাদেশের কোন বিবাদ নাই। এসলাম বলিতে কেহ যদি মনে করেন শুধুমাত্র আরবাজতির ধর্ম — বিশ্বের অন্য দেশ বা জাতির ধর্ম নহে — তাঁহারাই এহেন ধারণার বশবর্তী হইতে পারেন। এই ধারণা পকিস্তানি, ভারতীয়, চিনা, বাংলাদেশি কেহই এসলাম অবলম্বন করিতেন না — করিতে পারিতেন না। যাঁহারা একদা বলিয়াছিলেন পাকিস্তান না থাকিলে এসলাম থাকিবে না তাঁহাদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করিয়া এসলাম আজও বাংলা মুলুকে টিকিয়া আছে। ভবিষ্যতেও থাকিবে, ইনশা আল্লাহ।

তাহা হইলে সংকটটা কোন জায়গায়? এসলাম সম্পর্কে তাঁহাদের ধারণায়। ইদানিং দেখা যাইতেছে কেহ কেহ ‘খোদা হাফেজ’ না বলিয়া ‘ আল্লাহ হাফেজ’ বলিতেছেন। ‘নামাজ’ না বলিয়া ‘সালাত’ আর ‘রোজা’ রাখ না বলিয়া ‘সিয়াম সাধনা’ করি বলিতেছেন। ইহা সেই সংকটেরই এক ধরনের প্রকাশ বিশেষ। কি এমন দরকার ছিল এই তর্জমা? বলিতেছি, পাল্টা তর্জমার বা ব্যাক ট্রান্সলেশনের? আরবি না হইলে আল্লাহ আমার কাতোরক্তি শুনিবেন না? তাহলে আমাদের শত সহস্র মোনাজাত যাহা বাংলায় হইতেছে তাহার পরিণতি কি হইবে?

একদা আমাদের ধর্মশিক্ষার অনুষ্ঠানে, মাদ্রাসায় লেখাপড়ার ভাষা শুদ্ধমাত্র উর্দু অর্থাৎ হিন্দুস্থানি ছিল। আমরা আশা করিয়াছিলাম বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য আমরা বুঝিতে পারিব। কিন্তু মনে হইতেছে তাহা পারি নাই।

আমাদের ওলামা মাশায়েকদের আমি শ্রদ্ধা করি। তাঁহাদের জ্ঞান ও গরিমার প্রতি যথোপযুক্ত ভক্তি জানাইয়া নিবেদন করিতেছি, একটা কথা ভাবিয়া দেখিবেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ ছিল। তাহার আগে ছিল ব্রিটিশের অধীন ভারতবর্ষের একটি প্রদেশ। তাহার আগে দিল্লির মোগল সাম্রাজ্যের একখানি সুবাহ। তাহার আগে স্বাধীন সুলতানদের রাষ্ট্র। এত রাষ্ট্র বদলাইয়াছে গত আটশত বছরে। এসলামের প্রগতি রুদ্ধ হয় নাই। বাংলা ভাষার গতিও থামিয়া থাকে নাই। আজ যাহারা বাংলায় কথা বলেন তাহাদের বেশির ভাগই এসলাম ধর্ম আমল করিয়া থাকেন। এই মুসলমানদের কি আপনারা এসলাম হইতে বাহির করিয়া দিতে চাহিতেছেন?

আমি আমার তরুণ মুসলমান ভাইদের বলিব, ভাবুন। শহিদ মিনারে হামলা করা বাংলা ভাষার ইতিহাসের উপর হামলা করা। আর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ছিঁড়িয়া ফেলা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করা। কাজটা ঠিক হইতেছে না।

ঘরে না ফেরার দিন – জহিরুল হক মজুমদার

(c) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

(c) মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

এ এক যুদ্ধ। তরুণদের যুদ্ধ। রণক্ষেত্র শাহবাগ। শাহবাগ ঘুমায় না। শাহবাগ জেগে থাকে। কিসের আশায়? বিচারের আশায় সুবিচার। মানব জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রার্থনা হচ্ছে সুবিচারের জন্য অপেক্ষা করা। এখানে অপেক্ষা চলছে। শ্লোগানমুখর অপেক্ষা। মোমের শিখার মিষ্টি আলোয় শহিদদের স্মরণ করে তাদের হত্যার বিচার চেয়ে অপেক্ষা। বেলুনের সাথে চিঠি লিখে শহিদদের জানান দেয়া যে আমরা তোমাদের জন্য জেগে আছি নিচে। তোমাদের স্বর্গের নিচে।

কারও কারও ক্ষেত্রে পথই ঠিকানা।শাহবাগে যখনই যাই — দিন কিংবা রাতের যে কোন প্রহরে — তাদেরকে দেখি শ্লোগানমুখর। কখনো ক্লান্তির ঘুমে রাস্তার পাশে তাঁবু ফেলে কাউকে কাউকে থাকতে দেখা যায়। পথ যেখানে ঘর, শ্লোগান যেখানে নিত্যদিনের কবিতা ও সংগীত, আকাক্সক্ষা যেখানে সুবিচারের সেখানে ঘুম কোন ভিন্ন রোমান্টিক স্বপ্ন উপহার দেয় না। স্বপ্ন এবং জাগরণ একই বাস্তবতায় মাখামাখি — যুদ্ধাপরাধীদের সর্Ÿোচ্চ শাস্তি, শহিদদের হত্যার বিচার।

বিচার চাওয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণেও, ‘আপনারা আসুন, দেখুন, বিচার করুন — কিভাবে আমার লোকদের হত্যা করা হয়েছে।’ বিচার হয়নি বরং আরো অবিচার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে শুরু হয়ে দীর্ঘ নয় মাসের গণহত্যার ভিতর দিয়ে। আর মুক্তিসংগ্রামী মানুষের রক্তের হোলিখেলায় মত্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যোগ দিয়েছিল বিপথগামী রাজাকার আলবদর আলশামসের কুকুররা। ভাইবোন আর মা-বাবার রক্ত চেটে খেতে সেসব কুকুরেরা কোন অপরাধবোধ, পাপবোধ জাগেনি।

স্বাধীনতা উত্তরকালে শাসকদের ব্যর্থতা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী চক্র ঐ মাতৃ-পিতৃ-ভ্রাতৃ-ভগ্নি রক্তের নেশাখোর রাজাকার, আলবদর এবং আলশামসদের রাষ্ট্রক্ষমতায় পুনর্বাসিত করে। কি নিদারুণ ঔদ্ধত্যে তারা এ দেশের মন্ত্রী হয় এবং লাল সবুজের পতাকা উড়ায় তাদের গাড়িতে। আরো চরম বিস্ময় জাতি দেখেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতৃত্বদানকারী দলের সঙ্গে তাদের আঁতাত।

সেই হতাশার দিন শেষ হয়ে আজ আলোর দিন সমাগত। বিলম্বে হলেও, আওয়ামী লীগ দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ঐ সমস্ত রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর কুখ্যাত জল্লাদদের বিচারের আওতায় এনেছে। কিন্তু তারপরও হতাশার দমকা বাতাসের প্রবাহ বন্ধ হয়নি। কুখ্যাত জল্লাদ কাদের মোল্লা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়নি। লঘুদণ্ড পেয়েছে। তাই আজ জনতা জেগেছে অষ্টপ্রহর বিচারকে পাহারা দিতে। সুবিচার না নিয়ে ঘরে ফিরবে না এ জনতা — আমি, আমার সন্তানেরা, আমার ভগ্নি, ভ্রাতারা। আমরা কেউ ঘরে ফিরব না। শহিদের রক্তের কসম — আমরা সুবিচার ছাড়া ঘরে ফিরব না।

শহীদ জননীর মূলধারা – আজফার হোসেন

শহিদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে দিনের পর দিন সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে যে পুরাতন কথাটা নতুন করে শিখেছিলাম এবং যে কথাটা পুরাতন হয়েও হয়ত পুরাতন হয় নাই, সেটা হচ্ছে এই: যে কোন প্রগতিশীল আন্দোলন কোন না কোনভাবে শাসকশ্রেণির খপ্পরে পড়লেই তা আর আন্দোলন থাকে না, তবে তা হয়ত হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের এনজিও।

মনে পড়ে, সেই গণআদালতকেন্দ্রিক গণজাগরণের বলকানো দিনগুলোতে ‘সময়’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সে পত্রিকায় আমাদের অনুরোধেই জাহানারা ইমাম ‘মুল ধারায় চলেছি’ নামে একটা সাপ্তাহিক কলাম লিখেছেন বহুদিন। সেই কলামে তিনি ‘মূল ধারা’ কথাটার একটা নতুন অর্থ তৈরি করেছিলেন। তাঁর মতে শাসকশ্রেণির রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেই জনগণ তৈরি করতে পারেন মূলধারার রাজনীতি।

এও বলা দরকার, ওই কলাম থেকেই আওয়ামী লীগ সম্পর্কে যে কথাটা বেরিয়ে এসেছিল সেটা ছিল এই যে বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির মতই আওয়ামী লীগ কখনই যুদ্ধাপরাধবিরোধী এবং জামায়াতবিরোধী জনগণের আন্দোলনের মিত্র হতে পারে না।

শহিদ জননী জাহানারা ইমামের কসম, জামায়াত-বিএনপির মতই আওয়ামী লীগও এই অভূতপূর্ব শাহবাগ আন্দোলনের বারটা বাজাতে চায়। এবং এমনকি বাজিয়েছেও। বেশ কিছু সাধারণ আন্দোলনকারীর এ-ই মত।

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

শাহবাগ তোমার আওয়াজ – রায়হান শরীফ

 

কিলোমিটারে বার হাজার আর
মাইলে হাজার সাত।
এত দূর থেকেও সাথে আছি
জেনো স্বপ্নের শাহবাগ।।

পাহারা দিচ্ছি তোমার শরীর
তোমার আত্মাটাও
শাহবাগ তুমি শত কুয়াশায়
এবার পথ দেখাও।

কত শোষণ আর কত অপমান
মুখ বুজে সয়ে সয়ে
তোমায় নিয়েই রুখতে আমি
দাঁড়াই নির্ভয়ে।

আশার যে দীপ জ্বেলেছো তুমি
নিভবে না তো আর
শাহবাগ তুমি প্রাণে প্রাণে আজ
খুলেছো নতুন দ্বার।

ভেদাভেদ ভুলে দলাদলি ভুলে
আমরা হয়েছি এক।
আমাদের নিয়ে খেলেছিলি যারা
তারা তাকিয়ে দ্যাখ!

শাহবাগ তুমি জ্বলে উঠো
আজ নতুন চেতনায়
গণবিমুখ রাজনীতি
আজ মরণ যন্ত্রণায়।

গণমাধ্যম ‘তুমি সর্প হইয়া দংশন কর, ওঝা হইয়া ঝাড়’ – খান আলামিন

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে মানবতাবিরোধী চরম অপরাধের দিকে পা বাড়ানো রাজাকার আলবদর আলশামসরা আইন ও রাজনীতির ফাঁক গলে এতদিন বেরিয়ে গেলেও ৪২ বছর পর তরুণ সমাজের কাঠগড়ায় তারা দুস্তরমতই আটকা পড়েছে। চলতি মাসের পাঁচ তারিখ থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে শাহবাগ মোড়ে একত্রিত হয়েছে বাংলার তরুণ সমাজ। সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্গী হয়েছে আবালবৃদ্ধবনিতা।

আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্লাটফর্ম শাহবাগস্থ ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ থেকে যুদ্ধাপরাধে জড়িত রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রশাখা ইমলামী ছাত্র শিবিরের মালিকানা বা পরিচালনার সকল ধরনের প্রতিষ্ঠান বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতীয় সংসদে পেশ করা স্মারকলিপির অন্যতম দাবিও ছিল এসব প্রতিষ্ঠানকে নিষিদ্ধ করা। অংশগ্রহণকারী নানান দল উপদল সেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে ঝুলিয়ে দিয়েছে; বিলি করেছে লিফলেট আকারেও। এমন আহ্বানের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জামায়াত-শিবিরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্জনের খবর পাওয়া যায়।

শুরু থেকেই আন্দোলনের সাথে এক ধরনের ‘একাত্মতা’ পোষণ করে একে বেগবান করতে সংবাদমাধ্যমগুলোকে — কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া — অগ্রণী ভূমিকায় দেখা গেছে। আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচি, প্রতিটি দাবি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতে দেখা গেছে দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমেই। জামায়াত-শিবিরের প্রতিষ্ঠানসমূহ বর্জনের আহ্বান এবং তাতে জনগণের সাড়াও গুরুত্ব সহকারে প্রচার করে পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেল।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা আন্দোলনকারীর ভূমিকায় নেমেছেন, শ্লোগান দিয়েছেন। ক্যামেরার বাইরে তো বটেই, এসব কাজ সামনে করতেও দ্বিধা করেননি তারা। এতটাই একাত্ম তারা ছিলেন। শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন ‘গণজাগরণ মঞ্চে’ এমন ঘটনা ঘটেছে।

এছাড়া আন্দোলনের প্রায় সব দিনই মধ্যরাত ও ভোরে কালের কণ্ঠ পত্রিকা বিনামূল্যে বিলি করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মাঝে খাবার বিতরণ করেছে কালের কণ্ঠ, সমকাল, ইত্তেফাক।

সর্বোপরি বলা যায়, গণমাধ্যমের সক্রিয় পাহারায় এই আন্দোলন ১৮ দিন পার করেছে।

কিন্তু এরই মাঝে, ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে — অর্থাৎ শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে — এসে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের’ পত্রিকাগুলোর ভূমিকা দেখে। প্রায় সকল পত্রিকা এই দিন জামায়াতের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংকের বড়সড় একটি বিজ্ঞাপন ছাপে। এই তালিকায় প্রথম আলো, সমকাল, কালের কণ্ঠ, যুগান্তর, ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, মানবজমিন, ভোরের কাগজ, নিউ এজ কার নাম নেই? একই বিজ্ঞাপন কেউ ছেপেছে প্রথম পৃষ্ঠায়, কেউ বা শেষ পৃষ্ঠায়, কেউ কেউ ৩য় পৃষ্ঠায়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সকল ভাষা শহিদ ও ভাষা সৈনিককে সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়েছে বিজ্ঞাপনটি।

বিজ্ঞাপন ও বিপণন বিশেষজ্ঞ ফিলিপ কোটলার বলেছিলেন, গণমাধ্যমগুলো অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন ছেপে কোন পণ্যের কাটতি বাড়নোয় সহযোগিতা করে থাকে। বোঝা যায়, গণমাধ্যমগুলোর দৃষ্টিকোণে ইসলামী ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপন প্রকাশের পিছনে বড় প্রণোদনা অর্থোপার্জন। অর্থের দাড়িপাল্লায় হেরে গেল বর্জনের আহ্বান। উপরন্তু, বিজ্ঞাপনের সংজ্ঞা যদি ঠিক ধরি, প্রকারান্তরে সংবাদপত্রগুলো ইসলামী ব্যাঙ্ক তথা জামায়াত-শিবিরের প্রচার ও প্রসারেই বরং ভূমিকা রাখল।

বিজ্ঞাপন প্রকাশের তারিখটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসবেত্তা আর রাজনীতিবিদ প্রায় সবাই বলে থাকেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল  ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই। আর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান তাৎপর্যপূর্ণ দিন ১৯৫২ সালের এই ২১ ফেব্রুয়ারি।

নিজ গরজেই যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে চলমান আন্দোলনের ‘মুখপাত্রে’র ভূমিকা নিয়েছিল গণমাধ্যমগুলো। মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার দিনটির বার্ষিকীতে যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করার লোভ সামলাতে না পেরে তারা মূলত আন্দোলনের প্রতি তাদের কমিটমেন্টের প্রকৃত রূপটিই প্রকাশ করে ফেলল।

মুখোশ কেবল সংবাদপত্রেরই খোলেনি। খুলেছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোরও। গাজী টিভি, ইনডিপেনডেন্ট টিভি, চ্যানেল আই প্রভৃতি চ্যানেল বার বার প্রচার করেছে ইসলামী ব্যাঙ্কের বিজ্ঞাপন।

হায়রে দ্বিমুখী নীতির কথিত ‘প্রগতিশীল’ গণমাধ্যম! ‘তুমি সর্প হইয়া দংশন কর, ওঝা হইয়া ঝাড়!’