Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 17, 2013

সম্পাদকীয়

মিথ্যাচার করিয়া ন্যায্য আন্দোলন দমানো যায় না

একদিকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলন যেমন চলিতেছে অন্যদিকে আন্দোলন বিষয়ে অপপ্রচার ও মিথ্যাচারও থামিয়া নাই। বলাবাহুল্য জামায়াত শিবির ও নানান ধরনের বিভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ এইসব মিথ্যাচার করিতেছে। আমরা দেখিতেছি এই আন্দোলন বিষয়ক তাহাদের বক্তব্য দুই একটা খাত ধরিয়া চলিতেছে। তাহারা এই আন্দোলনে যে সমস্ত মানুষ জড় হইয়াছে এবং অকুস্থলে অবস্থান করিতেছে তাহাদের বিষয়ে নানান মিথ্যা গালগল্প বলিয়া দেশবাসীর মনে বিদ্বেষ ছড়াইতে সচেষ্ট আছে। যাহারা আরেকটু বেশি চালাক তাহারা জনগণের দাবি বিষয়ে স্পষ্ট কোন কথা না বলিয়া আশে পাশে এটা সেটা বলিতেছেন। ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানো’ বলিয়া যে একটি কথা প্রচলিত আছে তাহাদের কথাবার্তা শুনিলে সে কথাই মনে আসে। ইতিহাসে জনগণের ন্যায়দাবির বিপক্ষে মিথ্যাচারের নজির অল্প নহে। মনে পড়ে পূর্ব বাংলার ছাত্র জনতা যখন ভাষা আন্দোলন করিতেছিল ১৪৪ ধারা ভাঙিতেছিল — পাকিস্তান সরকার তখন বলিয়াছিল, এসব ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, কলকাতা থেকে হিন্দু ছেলেরা আসিয়া পায়জামা কুর্তা পরিয়া মিছিল করিতেছে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিটি একটি জাতীয় দাবি। এই দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের মধ্যে জাতীয় চেতনা গড়িয়া উঠিবার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু দাবিটি যৌক্তিক হইলেই তাহা এমনি এমনি কায়েমে মোকাম হইয়া উঠে না। ফ্রানৎস ফাঁনো, আহমদ ছফা প্রমুখ মহাত্মাদিগের বরাতে আমরা জানি, জাতীয় চেতনা লড়াই করিয়া প্রতিষ্ঠা করিতে হয়। এই লড়াইয়ে পথের চোরা ফাঁদগুলিকেও দূর করিতে হইবে। ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়া জাতীয় চেতনা গড়িয়া তুলিবার প্রাথমিক কাজ শুরু হইবে এবং মিথ্যাবাদীরা ভাসিয়া যাইবে।

যুদ্ধাপরাধবিরোধী জাতীয় আন্দোলনের গতি ও প্রগতি – সলিমুল্লাহ খান

শাহবাগের যুদ্ধাপরাধবিরোধী সমাবেশের বার দিন পার হইয়াছে। মাঝখানে দুই শুক্রবার সমাবেশ পরিণত হইয়াছিল মহাসমাবেশে। এই সমাবেশ যে জনসমর্থন লাভ করিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু সত্য কথা বলিতে এই আন্দোলন এখনো সারাদেশে, বিশেষ করিয়া গ্রামেগঞ্জে ছড়াইয়া পড়ে নাই। কেন পড়ে নাই তাহাও ভাবিবার বিষয়।
এই আন্দোলনকে কি ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সহিত তুলনা করা যাইবে? এখনো পর্যন্ত আন্দোলন মোটের উপর শান্তিপূর্ণই আছে। দুইদিন আগে সমাবেশের সহিত জড়িত একজন তরুণ নেতাকে তাঁহার বাসস্থানের কাছে, মিরপুরের পলাশনগর পাড়ায়, হত্যা করা হইয়াছে। এই হত্যাকে নৃশংস বলাই শেষ কথা নহে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে পরিচালিত জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন। বর্তমান আন্দোলনও এক অর্থে একই ধরনের জাতীয় গণতান্ত্রিক চরিত্র অর্জন করিতে পারে। কিন্তু পথে কিছু বাধা দেখা যাইতেছে।
এখন পর্যন্ত আন্দোলনের প্রধান দাবি একটিই — যুদ্ধাপরাধীচক্রের ন্যায্য বিচার ও উপযুক্ত শাস্তি। কেহ কেহ ইহার সহিত নতুন নতুন দাবিদাওয়া যোগ করিবার পরামর্শ দিয়াছেন। যথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ইহারা তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করিবার পরামর্শ পর্যন্ত দিতেছেন। কিন্তু শাহবাগের তরুণ আন্দোলন এখনো যুদ্ধাপরাধ বিচার ও তাহার সংশ্লিষ্ট দাবিতেই অটল।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার সরকার আন্দোলনকারীদের সহিত সামান্য একমত হইয়াছেন। কিছু আইন পরিবর্তনও করিতেছেন। এমতাবস্থায় কেহ কেহ প্রশ্ন করিতেছেন: এখন আন্দোলন কোন পথে যাইবে? সরকার কি এখন আন্দোলনকারীদের ঘরে ফিরিয়া যাইতে বলিবেন? না আন্দোলন ভিন্ন দাবিও তুলিবে? একদিন সিদ্ধান্ত হইয়াছিল আন্দোলনের সমাবেশ দৈনিক তিনটা-দশটার মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে। কিন্তু ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। সিদ্ধান্ত বদলাইয়াছে।
এখন পর্যন্ত যাহা দেখা যাইতেছে তাহাতে মনে হয় আন্দোলনে যাঁহারা আসিতেছেন তাঁহারা বিপুল সংখ্যায় শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্র যুবক ও পেশাদার তরুণ। ইহাতে গতি সঞ্চার করিতে হইলে অবশ্যই আরো বড় বড় সংখ্যায় দেশের সাধারণ মানুষকে জাগাইতে হইবে। অথচ আজ পর্যন্ত শহরের শ্রমিকশ্রেণিও এই আন্দোলনে বড় সংখ্যায় শামিল হয় নাই। ১৯৬৯ সালের নাহান গ্রামে গ্রামে কৃষক ও ক্ষেতমজুর শ্রেণির জনগণ জাগিয়া উঠে নাই। কেন জাগে নাই সেই প্রশ্ন না তুলিয়াও রেহাই পাওয়া যাইবে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করিয়া একটা ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক’ ঐকমত্য গড়িয়া উঠিবার লক্ষণ দেখা দিয়াছে। এই লক্ষণ প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান না ঘটিলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে ‘মহাসিন্ধুর কল্লোল’ শুনাইয়াছিল তাহা কি শুনা যাইত? মনে রাখিতে হইবে জাতীয় গণতান্ত্রিক ঐকমত্য ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা কঠিন।
শ্রমিকশ্রেণির জনগণ কেন এই আন্দোলনে শামিল হইবেন? দুই কারণে হইবেন। একটা কারণকে ‘জাতীয়’ বলা যাইতে পারে। অপরটাকে বলা যায় ‘গণতান্ত্রিক’ বা ‘প্রজাতান্ত্রিক’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে নতুন জাতি গঠনের সম্ভাবনা তুলিয়া ধরিয়াছিল। নানান কারণে ১৯৭১ বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব’কে সম্ভব করিয়া তুলিতে সক্ষম হয় নাই। সেই কাজ, সেই কর্তব্য আজও জারি আছে।
এই বছরের আন্দোলনের ‘ফাঁসি চাই’ চিৎকারের মধ্যে সেই ‘অসমাপ্ত’ অথবা ‘বেহাত’ জাতীয় বিপ্লবের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাই মূর্তি পাইয়াছে। কিন্তু ‘ফাঁসি চাই’ বলিলেই ফাঁসি হইবে না। আরো গলা খাকারি দিয়া কেহ কেহ বলিয়াছেন — যেমন আমার বন্ধু সেলিম রেজা নিউটন — ফাঁসিটাসি হইয়া গেলেও জনগণ দেখিবেন তাঁহাদেরই গলায় ফাঁস আটকাইয়াছে।
তাহা হইলে আমরা কি করিব? ইতিমধ্যেই দাবি উঠিয়াছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালকে স্থায়ী করিতে হইবে। তরুণেরা নিশ্চয় জানেন ১৯৪৫ সালের পর এয়ুরোপ ও জাপানে সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালকে স্থায়ী রূপ দিবার একটা দাবি কিন্তু উঠিয়াছিল। পাশ্চাত্য জগৎ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাহা সমর্থন করে নাই। তখন তাঁহারাই নতুন নতুন যুদ্ধাপরাধের সহিত জড়িত হইতেছিলেন। ভিয়েতনাম ও লাওস তাহার নিকৃষ্টতম উদাহরণ ছিল । সেই অপরাধ কি এখনো শেষ হইয়াছে? ইরাক বা আফগানিস্তান এখনো যুদ্ধে লিপ্ত।
আশা করি আমাদের তরুণেরা এই আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিষয়েও উক্তি করিবেন। হইয়া উঠিবেন শুদ্ধ জাতীয় কেন. সত্যকার অর্থে আন্তর্জাতিক ‘ব্যক্তি’। না হইয়া উপায় নাই।

১৯৬৭ সালে মহাত্মা জাঁ পল সার্ত্র ও বার্ট্রান্ড রাসেল প্রমুখ মনীষী যখন ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে বিশেষ ‘ট্রাইবুনাল’ গঠন করিলেন তখন তাঁহাদের প্রতীকী বিচারসভা বসাইবার অনুমতি পর্যন্ত দেয় নাই তদানীন্তন ফরাশি সরকার। কারণের মধ্যে খোদ ফরাশিদেশের যুদ্ধাপরাধও কম ছিল না। তাঁহারা কি করিয়া বিচারে সম্মতি দিবেন? অবশেষে বিচারসভা বসিয়াছিল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোল্ম নগরে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হইয়াছিল, তাহা দ্বিতীয় এয়ুরোপিয়া মহাযুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের তুলনায় কিছুই কম ছিল না। এয়ুরোপিয়া মহাযুদ্ধের তুলনায় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ — অন্যান্যে মধ্যে — নারী নির্যাতন সম্ভবত বেশিই হইয়াছিল। এয়ুরোপে যত নারীধর্ষণ হয়, তাহাকে ছাড়াইয়া গিয়াছিল বাংলাদেশে পাক বাহিনীর ধর্ষণ। জাতিগত অসুয়াই ইহার ভিত্তি।
বাংলাদেশের জন্য নহে, শুদ্ধ ভারতবর্ষ উপমহাদেশের জন্যও নহে, পৃথিবীর মানবসমাজের জন্যও ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের মুখামুখি করা দরকার ছিল। পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীরা ছাড়া পাইয়া গিয়াছে বলিয়া বাংলাদেশে তাঁহাদের সহযোগীদেরও ছাড়িয়া দিতে হইবে এমন সিদ্ধান্ত যুক্তিসহ হইতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের পূর্ণ নাগরিক বলিয়া স্বীকৃতি দেওয়ার যে অশুভ নজির স্থাপিত হইয়াছে তাহার নিরাকরণ করা দরকার।
শেষে আমরা এই প্রশ্নই তুলিতে চাই — যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন কেন জাতীয় আন্দোলন হইবে না? কেন তাহাকে কেবল তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন বলিয়া একঘরে করিতে হইবে? যদি পারি এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক করিয়াও তুলিতে হইবে।(১ম পৃষ্ঠার পর)
তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি করিবার পরামর্শ পর্যন্ত দিতেছেন। কিন্তু শাহবাগের তরুণ আন্দোলন এখনো যুদ্ধাপরাধ বিচার ও তাহার সংশ্লিষ্ট দাবিতেই অটল।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার সরকার আন্দোলনকারীদের সহিত সামান্য একমত হইয়াছেন। কিছু আইন পরিবর্তনও করিতেছেন। এমতাবস্থায় কেহ কেহ প্রশ্ন করিতেছেন: এখন আন্দোলন কোন পথে যাইবে? সরকার কি এখন আন্দোলনকারীদের ঘরে ফিরিয়া যাইতে বলিবেন? না আন্দোলন ভিন্ন দাবিও তুলিবে? একদিন সিদ্ধান্ত হইয়াছিল আন্দোলনের সমাবেশ দৈনিক তিনটা-দশটার মধ্যে আবদ্ধ থাকিবে। কিন্তু ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। সিদ্ধান্ত বদলাইয়াছে।
এখন পর্যন্ত যাহা দেখা যাইতেছে তাহাতে মনে হয় আন্দোলনে যাঁহারা আসিতেছেন তাঁহারা বিপুল সংখ্যায় শহরের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ছাত্র যুবক ও পেশাদার তরুণ। ইহাতে গতি সঞ্চার করিতে হইলে অবশ্যই আরো বড় বড় সংখ্যায় দেশের সাধারণ মানুষকে জাগাইতে হইবে। অথচ আজ পর্যন্ত শহরের শ্রমিকশ্রেণিও এই আন্দোলনে বড় সংখ্যায় শামিল হয় নাই। ১৯৬৯ সালের নাহান গ্রামে গ্রামে কৃষক ও ক্ষেতমজুর শ্রেণির জনগণ জাগিয়া উঠে নাই। কেন জাগে নাই সেই প্রশ্ন না তুলিয়াও রেহাই পাওয়া যাইবে না।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করিয়া একটা ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক’ ঐকমত্য গড়িয়া উঠিবার লক্ষণ দেখা দিয়াছে। এই লক্ষণ প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান না ঘটিলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে ‘মহাসিন্ধুর কল্লোল’ শুনাইয়াছিল তাহা কি শুনা যাইত? মনে রাখিতে হইবে জাতীয় গণতান্ত্রিক ঐকমত্য ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা কঠিন।
শ্রমিকশ্রেণির জনগণ কেন এই আন্দোলনে শামিল হইবেন? দুই কারণে হইবেন। একটা কারণকে ‘জাতীয়’ বলা যাইতে পারে। অপরটাকে বলা যায় ‘গণতান্ত্রিক’ বা ‘প্রজাতান্ত্রিক’। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে নতুন জাতি গঠনের সম্ভাবনা তুলিয়া ধরিয়াছিল। নানান কারণে ১৯৭১ বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক বিপ্লব’কে সম্ভব করিয়া তুলিতে সক্ষম হয় নাই। সেই কাজ, সেই কর্তব্য আজও জারি আছে।
এই বছরের আন্দোলনের ‘ফাঁসি চাই’ চিৎকারের মধ্যে সেই ‘অসমাপ্ত’ অথবা ‘বেহাত’ জাতীয় বিপ্লবের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাই মূর্তি পাইয়াছে। কিন্তু ‘ফাঁসি চাই’ বলিলেই ফাঁসি হইবে না। আরো গলা খাকারি দিয়া কেহ কেহ বলিয়াছেন — যেমন আমার বন্ধু সেলিম রেজা নিউটন — ফাঁসিটাসি হইয়া গেলেও জনগণ দেখিবেন তাঁহাদেরই গলায় ফাঁস আটকাইয়াছে।
তাহা হইলে আমরা কি করিব? ইতিমধ্যেই দাবি উঠিয়াছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালকে স্থায়ী করিতে হইবে। তরুণেরা নিশ্চয় জানেন ১৯৪৫ সালের পর এয়ুরোপ ও জাপানে সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালকে স্থায়ী রূপ দিবার একটা দাবি কিন্তু উঠিয়াছিল। পাশ্চাত্য জগৎ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাহা সমর্থন করে নাই। তখন তাঁহারাই নতুন নতুন যুদ্ধাপরাধের সহিত জড়িত হইতেছিলেন। ভিয়েতনাম ও লাওস তাহার নিকৃষ্টতম উদাহরণ ছিল । সেই অপরাধ কি এখনো শেষ হইয়াছে? ইরাক বা আফগানিস্তান এখনো যুদ্ধে লিপ্ত।
আশা করি আমাদের তরুণেরা এই আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিষয়েও উক্তি করিবেন। হইয়া উঠিবেন শুদ্ধ জাতীয় কেন. সত্যকার অর্থে আন্তর্জাতিক ‘ব্যক্তি’। না হইয়া উপায় নাই।

১৯৬৭ সালে মহাত্মা জাঁ পল সার্ত্র ও বার্ট্রান্ড রাসেল প্রমুখ মনীষী যখন ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধাপরাধের বিরুদ্ধে বিশেষ ‘ট্রাইবুনাল’ গঠন করিলেন তখন তাঁহাদের প্রতীকী বিচারসভা বসাইবার অনুমতি পর্যন্ত দেয় নাই তদানীন্তন ফরাশি সরকার। কারণের মধ্যে খোদ ফরাশিদেশের যুদ্ধাপরাধও কম ছিল না। তাঁহারা কি করিয়া বিচারে সম্মতি দিবেন? অবশেষে বিচারসভা বসিয়াছিল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোল্ম নগরে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যে যুদ্ধাপরাধ সংগঠিত হইয়াছিল, তাহা দ্বিতীয় এয়ুরোপিয়া মহাযুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের তুলনায় কিছুই কম ছিল না। এয়ুরোপিয়া মহাযুদ্ধের তুলনায় ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ — অন্যান্যে মধ্যে — নারী নির্যাতন সম্ভবত বেশিই হইয়াছিল। এয়ুরোপে যত নারীধর্ষণ হয়, তাহাকে ছাড়াইয়া গিয়াছিল বাংলাদেশে পাক বাহিনীর ধর্ষণ। জাতিগত অসুয়াই ইহার ভিত্তি।
বাংলাদেশের জন্য নহে, শুদ্ধ ভারতবর্ষ উপমহাদেশের জন্যও নহে, পৃথিবীর মানবসমাজের জন্যও ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের মুখামুখি করা দরকার ছিল। পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীরা ছাড়া পাইয়া গিয়াছে বলিয়া বাংলাদেশে তাঁহাদের সহযোগীদেরও ছাড়িয়া দিতে হইবে এমন সিদ্ধান্ত যুক্তিসহ হইতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের পূর্ণ নাগরিক বলিয়া স্বীকৃতি দেওয়ার যে অশুভ নজির স্থাপিত হইয়াছে তাহার নিরাকরণ করা দরকার।
শেষে আমরা এই প্রশ্নই তুলিতে চাই — যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন কেন জাতীয় আন্দোলন হইবে না? কেন তাহাকে কেবল তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন বলিয়া একঘরে করিতে হইবে? যদি পারি এই আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক করিয়াও তুলিতে হইবে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার সর্বশেষ

সাজাপ্রাপ্ত
আবুল কালাম আযাদ: ট্রাইবুনাল দুই। মৃত্যুদণ্ড। পলাতক।
আব্দুল কাদের মোল্লা: ট্রাইবুনাল দুই। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আটক।

শুনানি সম্পন্ন, রায়ের অপেক্ষায়
দেলোয়ার হোসেন সাঈদী: ট্রাইবুনাল এক। আটক।

শুনানি চলছে
মতিউর রহমান নিজামী: ট্রাইবুনাল এক। আটক।
গোলাম আযম: ট্রাইবুনাল এক। আটক।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী: ট্রাইবুনাল এক। আটক।
আলী আহসান মুজাহিদ: ট্রাইবুনাল দুই। আটক।
মো: আবদুল আলীম: ট্রাইবুনাল দুই। জামিনপ্রাপ্ত।
মো: কামারুজ্জামান: ট্রাইবুনাল দুই। আটক।

অনুসন্ধান চলছে
মীর কাসেম আলী: ট্রাইবুনাল এক। আটক।
আযহারুল ইসলাম: ট্রাইবুনাল এক। আটক।
মোবারক হোসেইন: ট্রাইবুনাল এক। জামিনপ্রাপ্ত।
আব্দুস সোবহান: ট্রাইবুনাল এক। আটক।

সংকলন: শামসুদ্দোজা সাজেন

জনতার কাছেই প্রশ্নের উত্তর – লেভিন আহমেদ

২০০৭ সালের আগস্ট মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক বাহিনীর অবস্থান ও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত ছাত্র বিক্ষোভের স্মৃতি ম্লান হওয়ার আগেই আবার কম্পিত হল শাহবাগের রাজপথ। সেই সাথে তারুণ্যের কণ্ঠে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে শোনা গেল মুহুর্মুহু উত্তপ্ত শ্লোগান। শাহবাগের এই আন্দোলন তবে কি রাজনীতির আকাশে নতুন সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস? এই প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখেই অভূতপূর্ব এই গণজাগরণ নানান দিক থেকে আমাদের কাছে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে।
প্রজন্ম চত্বরের এই আন্দোলন দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ভিত্তিমূলে নাড়া দিয়েছে এবং অসাম্প্রদায়িক জনতাকে একটি রাজনৈতিক পাটাতনে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছে। জনতা এখন তাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত হয়েছে। তারা রাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে ক্ষমতাসীন দলের আপোসকামী রাজনৈতিক চালকে ইতিমধ্যে বানচাল করে দিয়েছে। এই আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির জাতিবোধের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করে দিল, একই সাথে ভোগবাদী সংস্কৃতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত মধ্যবিত্ত তরুণদের নিয়ে আসল রাজপথে। তরুণদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে এই প্রথম ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোন রাজনৈতিক আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। শ্লোগানেও এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। যেমন অনেককে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘তুমি কে আমি কে, পাহাড়ি বাঙালি।’ তাছাড়া নারীর সামাজিক স্থানবণ্টন ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এই আন্দোলন। নারীরা যে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার আন্দোলনে তাদের ব্যাপক উপস্থিতির মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয়েছে।
এই আন্দোলন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হলেও বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উৎপাটিত করে নতুন সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলন যে বাংলাদেশে অসম্ভব নয় এই গণজাগরণ তারই ইঙ্গিতবাহী। আশার কথা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী দলগুলোর সামাজিক ও রাজনৈতিক তৎপরতাকে প্রতিরোধের দাবিও আন্দোলনকারীদের মধ্য থেকে উঠে এসেছে।
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মধ্যবিত্ত তরুণদের সংখ্যাই বেশি যারা তাদের শ্রেণিসত্তার নিগড়ে আবদ্ধ থাকলেও জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রশ্নে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে। এই আন্দোলন নজির দেখাল সঙ্কটে সম্ভাবনাময় পরিস্থিতিতে এই তরুণেরাই সাম্প্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ এবং ক্ষমতার যেকোন পুঞ্জিভবনের বিপরীতে অবস্থান নিতে সক্ষম। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা বাঙালির জাতিবোধ আওয়ামী লীগের একচেটিয়া কোন মতাদর্শ নয়। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবোধের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ধারা আমাদের সামনে হাজির হল যার পাটাতনে দাঁড়িয়ে সাম্যবাদী রাজনীতির জমিন উর্বর করার চিন্তা সম্ভব হয়ে উঠছে।
সমাজে শ্রেণিবৈষম্য থাকলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থানের সম্ভাবনা থেকেই যায়। শুধুমাত্র আইন করে একে দমানো সম্ভব নয়। আশার কথা এই যে তরুণ প্রজন্মের একাংশ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি সকল ধরনের নিপীড়নমূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিলোপের জন্যও ধীরে ধীরে সোচ্চার হচ্ছে। বাজারসেবী উদারনৈতিক গোষ্ঠী এবং তাদের ভাড়াটে সংস্কৃতিসেবী মিডিয়া এই আন্দোলনের রাজনৈতিক মেজাজকে প্রশমিত করে নিজেদের অনুকূলে নিয়ে আসার জন্য সচেষ্ট রয়েছে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদ শব্দটাকে মুড়িমুড়কির স্তরে নামিয়ে এনেছে দক্ষিণগামী অপশক্তি। তারা তারুণ্যের এই নবজাগরণকে গোড়াতেই ফ্যাসিবাদের উত্থান বলে রায় দিয়েছে। তাদেরও জনগণ ইতিমধ্যেই দুশমন হিশেবে চিহ্নিত করে ফেলেছে।
আন্দোলন বিচ্ছিন্ন মানুষকে গ্রন্থিবদ্ধ করে জনজীবনে রাজনীতির উন্মেষ ঘটায়। রাজনীতির গ্রন্থিতে সম্পৃক্ত জনতাকে অজ্ঞ কিংবা হুজুগে ভাবার কোন কারণ নেই। তাদের কাছেই রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান রয়েছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নতুন সময়ের মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ নির্ধারিত হবে। একবিংশ শতাব্দীর মুক্তিযোদ্ধা ও নব্যরাজাকারদের চেহারাও এই আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হবে। যারা এদেশের নাগরিক হয়েও বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সা¤্রাজ্যবাদী শক্তির পদলেহন করেছে তাদের প্রতীকী নামই রাজাকার। সা¤্রাজ্যবাদের দোসর পুরানো এবং নব্যরাজাকার উভয়কে গণআন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করার মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এই পুনরাবৃত্তি মানে পুরাতনের অধিষ্ঠান নয় বরং নতুনের মধ্য দিয়ে পুরাতনের উত্তরণ এবং সঞ্জীবন।

ভূগোল পরীক্ষার সময় অংক পরীক্ষা দেই না! – গোলাম নবী মজুমদার

হিসাব সোজা! তিন শতাধিক খুন প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি কাদের মোল্লার ফাঁসি না হয় তবে আর কত খুনে ফাঁসি হবে!
একাত্তরে যারা খুন, ধর্ষণ, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা আমজনতা — মন্ত্রীর আত্মীয় নন, নেতার বেয়াই নন, কিংবা খানদানি পরিবারের লতাপাতা নন। যদি হইতেন তাইলে তাদের খুনীদের ফাঁসিতে ঝুলাইতে শাসক-বিচারকরা হয়তো আসরের ওয়াক্ত বৈ মাগরেব করতেন না! লোকে বলাবলি করে শুনি, যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পুঁজি করে ব্যবসা করেন তারাই নাকি রাজাকার বাঁচাইতে আপোস করে সাজা ছোট করেছেন। কেলেঙ্কারি! রাগে ক্ষোভে লাখে লাখে মানুষ রাস্তায় নেমে পণ করেছেন যতক্ষণ পর্যন্ত না যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলানো হবে ততক্ষণ তারা রাস্তায় থাকবেন, রাস্তাকেই ঘরবাড়ি বানিয়ে শ্লোগান দিতে থাকবেন। তারা শুধু এক লোকের ফাঁসি দিয়াই ক্ষান্ত হবেন না, নষ্ট বিচার-রাজনীতিরও ফাঁসি চান। যেই নষ্ট রাজনীতি, বিচারের উপর মানুষের আস্থা নাই তার ফাঁসি চান। মানুষ ফাঁসিই চায় কারণ তারা জানে এই শাসক-বিচারক আঁতাত আলামত যতক্ষণ অক্ষত থাকবে, কাদের মোল্লাসহ সকল রাজাকারের দল, খুনী, ধর্ষকেরা আজ না হয় কাল আবার বেকসুর খালাস পাইয়া রাষ্ট্রের আসন কলঙ্কিত করবে! যে রাজনীতি, বিচার সুযোগ পাইলেই হয় দলকানা, ধনকানা, সময় সময় ভাবকানা, তারে কোন কারণে লোকে বাঁচায়ে রাখবে? তারে ফাঁসি দেয়াই ভাল। যত তাড়াতাড়ি হয় তত ভাল; নতুন আস্থাভাজন বিচার, রাজনীতির কাজ শুরু করা যায়।
কেবল এক নিজামী সাঈদীর ফাঁসি দিয়ে কাজ শেষ হবে না। পাকাপোক্ত একটা বন্দোবস্ত করা লাগবে যাতে ঐ রাজাকারদের ভাবশিষ্যরা, খুনী, ধর্ষকরা বাংলার মাটিতে হৃষ্টপুষ্ট হতে না পারে; তাদের নিঃশ্বাসের বিষবাষ্পে যেন বাংলার বাতাস দূষিত না হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছর পরও এই দেশের মাটিতে অনেক মানুষরূপী জানোয়ার ঘুরাফেরা করে, যারা বাংলদেশিদের ‘ডার্টি বাংগাল’ গালি দিয়ে ভিডিও করে বাজারে ছড়ায়। তাদের মুখ দিয়া বাংলা ভাষা আসে না — বাংলা কইতে তাদের দিলে সায় দেয় না। হয় ইংরেজি — সময় সময় উর্দু — চাপাইয়া রাখতে পারে না। তারা ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের জন্মকে হিন্দুর দাসত্ববরণ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না, মুসলমানিত্ব টিকাইয়া রাখা বলতে পাকিস্তানের দাসত্ব ছাড়া আর কিছু বুঝে না। তারা জঘন্যতম অপরাধের হোতা রাজাকারদের পূত-পবিত্র জ্ঞান করে ক্ষমতায় বসাইতে এক বিন্দু কুণ্ঠাবোধ করে না। ইসলাম আর রাজাকারির পার্থক্য ঘুচায়ে দিতে চায়। এইসব উঠতি রাজাকারদেরও একটা বিহিত করতে হবে। কিভাবে চিহ্নিত রাজাকারদের শায়েস্তা নিশ্চিত করতে হয় শাহবাগ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। আর ঐ নব্য রাজাকারগোষ্ঠী যারা হাজারে হাজারে পয়দা হইতেছে বাংলার আনাচে কানাচে তাদের একটা উচিত ব্যবস্থাও শাহবাগেরই করতে হবে। নাইলে এই নষ্ট সমাজ নষ্টদের কবল থেকে মুক্ত হবে না।
কার না এমন হয়, আচমকা ব্যথা পাইলে কিছু বুঝে উঠার আগেই মুখ দিয়ে আপনা আপনি বাহির হয়: ‘ওরে মারে’, ‘মাগো’ ইত্যাদি। হুঁশ হইলে পরে আল্লা-খোদা-ভগবানের নাম জপি। আর আমাদের রাজ পরিবারের বেগমদের একজন বিপদে পড়ে যুদ্ধবাজ আমেরিকারে ডাকে দেশটারে উদ্ধার করতে; আরেকজন দেশের খনিজ সম্পদেও লোভ দেখাইয়া প্রভুরে খুশি রাখতে চায়। আমাদের কোন বিদেশি প্রভু নাই; খুশি করার দায়ও নাই। আমাদের মা আছেন; তিনিই ভরসা। মায়ের কাছেই ফিরে যাই। বলি, ‘মা তুমি শুরু করেছ, আমরা এবার শেষ করব।’
একটা মজার আলাপ শোনেন:
প্রশ্ন: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যারা আন্দোলন করে তারা সাগর-রুনি, বিশ্বজিৎসহ অন্য খুন-ধর্ষণের বিচারের দাবি কেন তোলে না?
উত্তর: আমরা ভূগোল পরীক্ষার সময় অংক পরীক্ষা দেই না। এই দাবি আদায় কইরা লই; পরে যোগাযোগ কইরেন!
রসিক লোক! ঠিকই তো ভূগোল পরীক্ষার দিন কেউ অংক পরীক্ষা দেয় নাকি! প্রশ্নকর্তা কোন মতলবে এই আলাপ তুললেন জানা যায় নাই। পুরা আন্দোলনটা পণ্ড করার উদ্দেশ্যে বলতে পারেন; আবার পারেন আন্দোলনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যে। প্রথমটা হইলে ‘তুই রাজাকার!’ না হইলে কথা আছে। যদি পরীক্ষাই হয় তবে তো এক পরীক্ষায় পাস করলেই হবে না; সব পরীক্ষায় পাশ করলেই তবে ডিগ্রি মিলবে। এও তো ঠিক ভূগোলে ভাল করতে হইলে অংকেও ভাল হইতে হবে। যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে! সেই দিন জাফর স্যারও বললেন যারা প্রেমিক তারা বিদ্রোহীও, যেমন ছিলেন নজরুল। সকল খুনি, রাজাকার, ধর্ষক, গুম-হত্যাকারীর বিচার চাই। সব একসাথে করতে গিয়ে কোনটাই না করতে পারার আশঙ্কা না নিয়ে কিভাবে বিচক্ষণতার সাথে গোড়া ধরে টান দেয়া যায় তা খুঁজে দেখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

কমরেড – ইচ্ছা কুমার

জয় বাংলা এখন আমাদের শ্লোগান
সুশীল স্বর্গপুরীর গনগনে বর্ণমালা থেকে
ছিনিয়ে এনেছি এই যুথবদ্ধ অক্ষর

নিস্তব্ধতার নিয়তি ভেঙ্গে মহাজাগরণ এ কি কুদরতি
যেন এক জাদুকর এক অদৃশ্য হ্যামিলনের বাশুরিয়া
বাজায় বাঁশি বাজায় বাঁশি জয় বাংলা জয় বাংলা

সশস্ত্র রোদ্দুরের তলে অথবা কৃপাণ অমানিশার
ইস্পাতের মতো সুন্দর কমরেডের পবিত্র মুখ
ঝলমল করে ভালোবাসায় বিপ্লবে শ্রেণিহীন সমাজ স্বপনে।

শাহবাগ আন্দোলনের পরিণতি – শাহাদুজ্জামান

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে শাহবাগ আন্দোলনের পরিণতি কি? এর উত্তরে নিঃসন্দেহে অনিশ্চয়তা আছে। মুক্তিযুদ্ধে যখন এদেশে সাধারণ মানুষ জড়িয়ে পড়েছিল তখনো কেউ নিশ্চিত ছিল না কি এর পরিণতি। এই সংগঠনবিহীন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন পথ চলতে চলতেই এর পরিণতি নির্ধারণ করবে। এর আশু ফলাফল কি হবে তা স্পষ্ট করে বলা না গেলেও এটি নিশ্চিত যে এর একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌল পরিবর্তনের দাবির কথা বলা হচ্ছে। কৃত্রিমভাবে সামরিক পৃষ্ঠপোষকতায় এই রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কারের জনবিচ্ছিন্ন একটা চেষ্টা সম্প্রতি হয়েছিল। তা ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক একটা নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে আবির্ভূত হলেও এবার শাহবাগের এই অভিনব সমাবেশ একেবারে জনতার প্রাণের ভেতর থেকে সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সেই গুণগত পরিবর্তনের দাবিটা তুলছে। শাহবাগ আন্দোলনের অভিঘাতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সেই কাক্সিক্ষত পরিবর্তন ঘটবার একটা নতুনতর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
দূর দ্রাঘিমায় বসে অভিনন্দন জানাই শাহবাগ ছাড়িয়ে দেশের নানা প্রান্তে জেগে ওঠা এই অলোকসামান্য তারুণ্যকে।

(আংশিক)