Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 15, 2013

সম্পাদকীয়

‘ধর চোর ধর চোর’

আমাদের জাতীয় জীবনের সমস্যাগুলির সমাধান কিভাবে হইবে? যেনতেন কিংবা যেকোন একটি উপায়ে তাহা হইতে পারে না। এর জন্য কোন সহজসিদ্ধ পদ্ধতিও প্রস্তুত হইয়া নাই। জাতীয় জীবনের প্রধান প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি আমাদের হইতে হইবে। ইতিহাসে কোন কোন ফাঁক আমরা রাখিয়া দিয়াছি, কোন কোন প্রশ্নের উত্তর না দিয়া প্রশ্নগুলোকেই আমরা ছাইচাপা দিয়াছি — সেসব খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। এই যাত্রায় কেবলমাত্র সত্যই পারে আমাদের সহায়তা করিতে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনগণ আজ আন্দোলন করিতেছে। এখন দেখি শিল্পী, ডেপুটি, মুখচেনা বুদ্ধিজীবী, বিরোধীদল, সরকার সবাই বিচার চাহে। তবে যে এতদিন বিচার হইল না তাহা কোন রহস্যময় অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নহে। বিচার না হইবার জন্য যাহারা দায়ী তাহারা এখন সেই চোরের মতন চোরের পিছু ধাওয়া করা জনতার সাথে মিলিয়া ‘ধর চোর ধর চোর’ বলিয়া আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করিতেছে।
একাত্তরে যে প্রশ্ন মূর্ত হইয়া উঠিয়াছিল, সশস্ত্র যুদ্ধের ঘাত প্রতিঘাতে যে চেতনার স্ফূরণ ঘটিয়াছিল একাত্তরের পর অতি দ্রুত সেসব মাটি চাপা না পরিলে সেদিনই বিচার হইত। ৪২ বছর বিচার হয় নাই বলিয়া বিচারের দাবি পুরানা হয় নাই। তেমনি অতীতের প্রশ্নগুলো এখনো জীবন্ত। এই এই বিষয়ের মীমাংসা হওয়া জরুরি।

প্রবাসে শাহবাগ: ‘অসম্ভবে’র স্বপ্নে, বিপ্লবের প্রত্যয়ে – রায়হান শরীফ

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা সাংগঠনিক কাজে দেশের হানাদার-রাজাকার-আলবদর চক্র কর্তৃক সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা আমরা সবাই জানি। ২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের এই দ্বিতীয় পর্যায়েও আমরা আজকে প্রবাসীদের সেই চেতনাজাত উদ্দীপনা দেখতে পাই। শাহবাগ আন্দোলনের ঢেউ নিমিষেই হাজারো মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বাইরেও নানা দেশে। এই ছড়িয়ে পড়া আমাদের আসলে কয়েকটি প্রশ্নের পুনর্বিবেচনা করতে বলে।
‘ব্রেইন ড্রেইন’-‘ব্রেন গেইন’ বিতর্কের বাইরে, অনেকেই এমন একটি প্রায়-নিশ্চিত ধারণা নিয়ে ছিলেন যে, প্রবাসী নতুন প্রজন্ম বুঝি দেশ, দেশজ সংস্কৃতি, দেশের ইতিহাস — এসব বিষয়ে খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করেন না; কোন দায় বোধ করা তো দূরের কথা। কিন্তু এই ধারণা যে নিছক সরলীকরণ তা আবারো স্পষ্ট হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি শাহবাগ আন্দোলনের ঢেউ হাজার হাজার মাইল দূরে এসে তাদের হৃদয়েও ঘূর্ণি তুলছে। এই ঘূর্ণি শুধুই ফেসবুক আর ব্লগের পর্দায় আটকা পড়ার মত কিছু ক্ষণিকের অনুভূতির ঝাপটা হয়ে থাকছে না। বরং একে অতিক্রম করে লেগে পড়ছে উইকিপিডিয়া সহ গণমাধ্যমে চলমান আন্দোলনের প্রকৃত স্বরূপটি তুলে ধরতে। ধর্মব্যবসায়ী জামাত মিডিয়ায় বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে যে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সাজিয়েছিল সেগুলো প্রকৃত তথ্য দিয়ে প্রতিস্থাপন করা ও সেই নতুন ভুক্তিগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে রাখায় যেমন প্রবাসীদের অনেকেই তৎপর, আবার শাহবাগ আন্দোলনের জন্য অর্থ-তহবিল গড়ে তুলতে কিংবা রাজপথে মিছিল জুড়ে দিতে, অথবা পার্কে একেকটা মিনি শাহবাগ বানিয়ে ফেলতেও তারা পিছিয়ে নেই। এরকম নানা তৎপরতার মাধ্যমে তারা আসলে কিছু বার্তা দিয়ে চলেছেন বর্তমান বাংলাদেশকে তো বটেই, একই সঙ্গে আগামীর বাংলাদেশকেও।

প্রবাসীরা দেশ থেকে যত দূরেই থাকুন না কেন দেশকে মায়ের মতই বুকে ধারণ করেন। গত চার দশকের গণবিরোধী ও প্রতারণার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আস্থা না থাকলেও তাদের পাঠানো টাকাই যখন দেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস, তখন এ তো খুব স্পষ্ট যে তারা কি আশায় বুক বেঁধে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অংশীদার হতে চান। আবার এও সত্যি যে দেশের শাসকগোষ্ঠীর লুটতরাজ, হালুয়ারুটির, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির রাজনীতির লোলুপ শকুন যখন দেশের অস্থিমজ্জাকেও খুঁটিয়ে খেতে চায় নানা ভেক ধরে, তখন দেশের নিপীড়িত মানুষের মত তারাও রাগে দুঃখে, চাপা ক্ষোভে পুড়তে থাকেন। শাহবাগ যখন সেই কষ্টের ক্ষতে আশার প্রলেপ বুলাচ্ছে, তাঁরা আবেগে ফেটে পড়ছেন এত দূর থেকেও। এর মধ্যে সব বয়সের মানুষই আছেন। তবে বিশেষ করে তরুণদের উপস্থিতি দীর্ঘদিন পুষে রাখা কিছু সংশয়ের বুকে নির্ঘাত ছুরি চালিয়ে দিয়েছে।

এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই ইতিবাচক দিক। প্রসঙ্গত বলা যায়, হোমি কে ভাবা সহ অনেক তাত্ত্বিকই মনে করেন দেশত্যাগী ডায়াস্পরা মানুষজনের ইতিহাস ‘শুরু’ হয় তারা যে দেশে থিতু হলেন সেই দেশের জল-হাওয়ায়। কিন্তু এই ইতিহাসেরও যে ইতিহাস আছে, এই ‘শুরুর’ আগের মুহূর্তের সঙ্গে ‘শুরু’র পরের মুহূর্তেরও যে কিছু বোঝাপড়া, কিছু হিসেব নিকেষ থাকে, অন্তত সেই দুই প্রান্তের মধ্যকার যোগাযোগের স্থানটি যে সাদা পাতার মত শূন্য নয় এটি ভুলে গেলে — বা ভুলে দেওয়াতে পারলে — বিশ্বায়নের দোহাই পেড়ে সাম্রাজ্যবাদের যে চাষবাস তার জমি আরো প্রশস্ত হয়, আরো উর্বর হয়। একদিক থেকে এই তাত্ত্বিক জ্ঞান উৎপাদন ও একে প্রায় সাধারণ জ্ঞানে পরিণত করে ফেলা এই সব ধান্দাবাজি বুজরুকি তত্ত্বকেও এক অর্থে শাহবাগ আন্দোলন কাঁচকলা দেখিয়ে দিয়েছে।
নিজদেশ ও প্রবাসের এই বিনিময়, এই আদান প্রদান বাংলাদেশের মানুষদের আবারো জানান দিচ্ছে দেশ ছেড়ে যত দূরেই আমরা থাকি না কেন, আমাদের নাড়ীকে আমরা ভুলিনি। ভুলতে পারবও না কোন দিন। দেশের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়তে আমাদের এক মুহূর্তও দেরি সইছে না যেমন, তেমনি আগামীর বাংলাদেশকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে তুলতেও আমরা পিছপা হব না।
আজ শাহবাগ থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া দৃপ্ত তারুণ্যের এই আন্দোলন যেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে সকল অপশাসন থেকে মুক্তির দিশারী হয়ে ওঠে সেই অবিনশ্বর স্বপ্নকে চেতনায় গেঁথে আমরা তাই আপনাদের সঙ্গে আমাদের একাত্মতা জানাচ্ছি নানা ভাবে। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে বাংলাদেশের মত অমিত সম্ভাবনার একটি দেশের বিজয় রথ — আগ্রাসী বহির্শক্তি বা অভ্যন্তরীণ অপশক্তি — কেউ ঠেকাতে পারবে না। জয় বাংলা, জয় জনতা।

শাহবাগ অনেক প্রশ্নের জট খুলবে – অগণিতা বসন

প্রশ্ন উঠুক আর না উঠুক আজ বিপ্লব। তবে শাহবাগে তাকালে বুঝা যায় এটি বিনা ফুলের বসন্ত নয়। মুহুর্মুহু প্রশ্ন-ফুলের বসন্ত। আন্দোলনের শুরু থেকেই শাহবাগে খাই শাহবাগে ঘুমাই। সেই সুবাদে বাংলার এক মাঠ মনীষীর সাথে কথা পরকথায় বুঝলাম বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে প্রশ্নসম্ভার মাথায় নিয়ে আছে তার জট খুলতে এখনো অনেক সময় লাগবে। সবে তো শুরু। তবে এই শুরু দৈনিক মনমন্দিরের ঘণ্টা বাজার মত নয়। মনের গুণগত চেতনা পরিমাণগত বৃদ্ধির সাথে সাথে তার অবস্থান রাজপথে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র জন্মাবার প্রধান রাজনৈতিক প্রশ্ন মাথায় নিয়ে।
পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে উঠল বটে কিন্তু রাজাকাররা রাজাকার হয়ে ওঠেনি। এই যুদ্ধাপরাধ বৃক্ষটি একাত্তরে মৃত্যু হওয়ার পরিবর্তে ধর্ম ও ভোট ব্যবসার ফলবতী পুষ্ট বৃক্ষ হয়ে উঠেছে। আর স্বাধীন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল চামে চামে তা ভক্ষণও করেছে। অর্থাৎ একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের ধর্ম ব্যবসা আর দিকে প্রধান কয়েকটি দলের স্বাধীনতা ব্যবসা। বাংলাদেশ এই ব্যবসাদারির মুক্তবাজার।
তাই শাহবাগ অভ্যুত্থানের জনতা একহাতে ফাঁসির দড়ি আর হাতে বোতল ভোট নিয়ে উপস্থিত। এটি নতুন রাজনৈতিক ইঙ্গিত বৈ কিছু নয়। বাংলাদেশের কেন এই হাল, বেহালই? এর উত্তরে ফিরে যেতে হয় বাংলার আরেক মনীষীর কাছে। স্মৃতি যদি বেইমানি না করে তবে সে মহাত্মা ঠিক এমনটিই বলেছিলেন যে স্বাধীনতা পায়ে হেটে অন্য দেশে চলে গেছে। কোন দেশ স্বাধীনতাকে তারকাঁটার পিরিতি বেড়ায় আটকেছে, কোন দেশ ঈগলের দাসি বানিয়েছে। আর, পুরনো শকুনের কথা তো আগেই বলেছি।
আজ শাহবাগে দুটি শ্লোগানে মানুষ ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, শাহবাগের মোহনা’। পদ্মা মেঘনা যমুনায় পানি নেই, তোমার আমার ঠিকানায় তাহলে বাড়ি নেই? শাহবাগে এই প্রশ্নও আছে। পর্বে পর্বে তাও আসবে। কিন্তু শাহবাগের মোহনায় সত্যিই প্রাণ আছে, পানি আছে, নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইঙ্গিত আছে। এ রাজপথ বহুদূর যাবে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্কোয়াডের এস্তেহার

যুদ্ধাপরাধীর বিচার কর
বাংলার নাৎসি জামায়াতকে নিষিদ্ধ কর

শাহবাগ গণজাগরণ এক বিস্ফোরণের নাম — যা দশকের পর দশকের বন্ধ্যা, ব্যর্থ এবং প্রবল আপোষপ্রবণ নতজানু সময়ের বিরুদ্ধে সময়েরই এক দুর্বার হুঙ্কার, চিরন্তন তারুণ্যের গর্জন। তা একই সঙ্গে স্বাধীনতার লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েও জাতীয় জীবনে পরাধীনতার ক্রমবর্ধমান যে আবহ, এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না করার যে পাহাড়প্রমাণ গ্লানি; তা মুছে ফেলার প্রত্যয় এবং সফল করার দৃপ্ত শপথ। এই ক্রান্তিকাল গণমানুষকে দিক নতুন ভাষা, নতুন প্রাণ — শত-কোটি কণ্ঠে ধ্বনিত হোক নতুন নির্মাণের শ্লোগান।
শহীদ জননী জাহানারা ইমাম — জননী যুদ্ধাপরাধের বিচার আন্দোলনেরও; নতুন প্রজন্মের নির্মাণ শক্তিকে সংহত করে জননীর সেই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই আমরা।
যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়া এ সময়ের যুদ্ধ; এ যুদ্ধের সৈনিক ‘শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্কোয়াড’।

দাবিসমূহ
১. মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ নিশ্চিত করতে হবে।
২. জামায়াতে ইসলামীসহ বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী ও পাকিস্তানি বাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তাকারী সকল রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে নবম জাতীয় সংসদে বিল পাস করতে হবে।
৩. এ সংসদেই ট্রাইবুনালকে একটি স্থায়ী রূপ দিতে হবে এবং যুদ্ধাপরাধী-মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
৪. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে রাষ্ট্রীয় প্রসিকিউশনকে শক্তিশালী করার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে অর্থায়ন ও সহায়তাকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদন্তে জাতীয় কমিশন গঠন করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যক্তিকে যথোপযুক্ত বিচারের মাধ্যমে শাস্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ বা রাষ্ট্রের আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে।
৬. তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়তে সকল জাতি ধর্ম নৃগোষ্ঠীর সাংবিধানিক সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

হাইকোর্ট ও গণরায় – সাঈদ জুবেরী

হাইকোর্ট

উৎসর্গ: অমি রহমান পিয়াল

আল্লার কিরা আল্লার কিরা আল্লার কিরা
এই শেষবার, এই শেষবার
আমি জাতীয়তাবাদী বড়িটাই গিল্লাম
এই শেষবার
প্রিয় মসনদ প্রিয় রাজনীতি
তুমি শাহাবাগকে চিনায়োনা প্লিজ হাইকোর্ট…

গণরায়

উৎসর্গ: আজম খান

গণদাবিটাই রায় হয়ে যায়
বিচারক শিখে নেন
আইন কানুন অনেক জানেন
এবার গণরায় জেনে নেন

গণদাবিটাই রায় হয়ে যায়
বিচারক শিখে নেন

ওগো নেতা ওগো নেত্রী
ওগো মানবতাবাদী ধাত্রী
আর মিডিয়া কাতর বিপ্লবী
তুমি ঘুরতে পার নিজ ধান্দায়
দেখাও আইন কানুন আদালত

গণদাবিটাই রায় হয়ে যায়
আজ বিচারক শিখে নেন

শোন গণদাবি
শোন গগনবিদারি চিৎকার
ভেসে যাবে সব টকশো
ডিপলোম্যাটিক শীৎকার

গণদাবিটাই রায় হয়ে যায়
বিচারক শিখে নেন
আইন কানুন অনেক জানেন
আজ গণরায় জেনে নেন

(এই গানখানা বিস্কুট পরিবেশন করবেন)

প্রথম প্রকাশ: ফেসবুক, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

শাহবাগে কেন যাই – আল আসাদুল করিম

শুনে খুব উত্তেজিত হলাম যে যুদ্ধাপরাধের লোক দেখানো বিচারের প্রতিবাদে একদল তরুণ ব্লগার জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড় হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু প্রথমদিকে টিভিতে আওয়ামীপন্থী কিছু সাংস্কৃতিক কর্মীকে যেভাবে বক্তব্য দিতে দেখলাম তাতে মনে হয় তারাই যেন এই প্রতিবাদ কর্মসূচির হোতা। ভুল ভাঙতে দুইদিন সময় লাগল — যখন সশরীরে উপস্থিত হলাম। মনে দুঃখ নেই কারণ যেখানে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ছয়দিন লেগেছে এই আন্দোলন সম্পর্কে একটা বক্তব্য দিতে। ড. কামাল হোসেন, ড. আকবর আলি খান বা ড. মুহম্মদ ইউনুস সম্পর্কে বলার জন্য তার অবশ্য ১২ ঘণ্টাও লাগেনি। আর বর্তমান প্রধান বিরোধীদলীয় নেতার তো কথাই নেই। মাঝে মাঝে ভাবি কি এমন মধু আছে জামাতের ভাণ্ডারে যে তারা জামাতকে ছাড়তেই পারে না? এমনকি নিজেদের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়েও তাদের জামাতের তল্পি কেনই বা বহন করে যেতে হয়? মাঝে মাঝে ভাবি, এটা কি কোন রাজনৈতিক দল নাকি শুধুমাত্র কিছু সুবিধাভোগী লোকের আড্ডাস্থল? আর তাদের ভারোত্তলনকারীর কথা শুনলে খিস্তিবাজদের মত কিছু খিস্তি ঝেরে বলতে ইচ্ছা হয়, ‘দ্যাশটা তো আপনের বাপের রাজত্ব আর আমরা আইছি এইহানে আপনেরে মসনদে বসাইবার লেগা! ভোদাই পাইছেন আমগো, আপনেগো লোকরা যেই স্কটল্যান্ডের পানি গিলা খায় ২০০৭ সালে দেখছি যায়া দোস্তের লগে হেগিলি খান আর আমেেগা বাংলা লইয়া পইরা থাকবার কন!’
তোফায়েল ভাই, সংহতিই যদি জানাইবার আইছেন, তয় পাণ্ডা লগে কইরা আনোনের দরকার কি? নাকি ডরাইছেন, আগের হ্যারা তো বোতল খাইছেন, আপনি আরো ভারি কিছু খাইতে পারেন! এত ডর থাকলে আহনের কাম কি?
লাকি আপা, ছোটবেলা থেকে পড়াশুনার পাশাপাশি আরেকটা কথা শিখেছি, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।’ নতুন করে বলার কিছু নেই। মোটামুটিভাবে আমরা সবাই জানি ১৯৮৪, ১৯৮৬ সালে স্বৈরাচারীর সাথে, ১৯৯০, ১৯৯৬ সালে রাজাকারদের সাথে এবং ২০০৮ সালে সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাথে এই সরকারের ভূমিকা কি ছিল। সেই ধারাবাহিকতায়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ২০১২ সালেও যে এইসব রাজাকারের সাথে তাদের আতাত হয়নি তা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন। তাই আপনাদেরকে বলছি, এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ তাতে গুরুত্ব দিন।
গতকাল আমি একজন ড্রাইভারকে বলতে শুনেছি, ‘এ্যারা নিশ্চয় অনেক বড় কোন পাপ করছে নাইলে এত মানুষ এ্যাগো ফাঁসি চায় ক্যা?’ তাই বলছি, আমাদের এই আন্দোলনের চালক যদি এই দুই দলের কারও হাতে চলে যায় তার মানে হবে আমরা যাদের ফাঁসি চাইছি তাদের হাতেই আন্দোলন চলে যাওয়া। কয়েক দিনেই সাধারণ জনগণ আপনাকে এই সময়ের অগ্নিকন্যা বানিয়েছেন, তাই দয়া করে অন্যান্যদের নিয়ে খেয়াল রাখবেন আমাদের এই আন্দোলন যেন কোন ক্ষমতালোভী আর ক্ষমতার সুবিধাভোগীদের হাতে না চলে যায়।

পাক বাহিনীর গণহত্যা ॥ আরও অনেক দিনের কথা – সলিমুল্লাহ খান

নয়াবাজার কাটাইয়া আহমদ ছফা নওয়াবপুর রেলক্রসিং পার হইতেছেন। ক্রসিংয়ের কাছে, তাঁহার কথায়, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্য’ দেখিতে হইল। আমি হুবহু উদ্ধৃতি দিতেছি: ‘তেজগাঁ থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন প্রায় আট দশ মাইল হবে। রেললাইনের দুই পাশে গত ২৩ বছর ধরে অভাবের টানে গ্রামবাংলার মানুষ এসে ডেরা পেতেছিল। কেউ রিকশা চালাত, কেউ মোট বইত, আবার কেউ বা করত ফেরিওয়ালার কাজ। গতদিন দুপুর থেকে সেনাবাহিনী এই বস্তি এলাকা জ্বালানোর কাজ শুরু করেছে। একটি ঘরও সোজা নেই। পোড়া স্তূপের মধ্যে দেখা গেল কয়টি বীভৎস করোটি। গন্ধ ছুটছে ভুরভুর করে।’
নওয়াবপুরেই খবর পাইলেন ডেমরা নারায়ণগঞ্জ প্রভৃতি শিল্পাঞ্চলে সেনাবাহিনী দিনেরাতে হরদম গোলাবর্ষণ করিয়াছে। বাঙ্গালি অফিসারদের টানিয়া আনিয়া বেয়নেট দিয়া গুঁতাইয়া গুঁতাইয়া হত্যা করিয়াছে। রিকশা হইতে নামিয়া একজন খবর দিলেন, গতরাতে সমস্ত শান্তিনগর বাজারটাও জ্বালাইয়া দিয়াছে।
ঢাকা শহরের রাস্তায় মিলিটারি জিপ। এখানে সেখানে গুলি। সারারাত গুলি। গুলি করিয়া তাহারা বাংলাদেশের নতুন জাতীয় পতাকা নামাইয়াছে। কিন্তু তখনো ঘরের ছাদে ছাদে বাঁশের কঞ্চি দাঁড়াইয়া আছে। আহমদ ছফা এই পর্যন্ত আসিয়া আবার লিখিতেছেন, ‘সন্ধ্যে হওয়ার একটু আগেই সৈন্যরা মাইক দিয়ে ঘোষণা করল, নামিয়ে ফেল জাতীয় পতাকা। বাইতুল মোকাররমের পাশে ইসলামিক একাডেমির একজন হৃষ্টপুষ্ট দারোয়ান পতাকা নামাইয়া নেবার জন্য যেই হাত দিয়েছে, অমনি তার বুকে গিয়ে গুলি বেঁধে। বেচারা ঘুরে ঘুরে নিচে পড়ে গেল। ঝলকে ঝলকে রক্ত বেরিয়ে কালো রাজপথ লাল হয়ে এল।’
সন্ধ্যার পর বিচ্ছিন্নভাবে এইদিক ওইদিক গুলি চলিল। গুলি থামিতেছে না। মেশিনগানের আওয়াজ মাঝে মাঝে। রাইফেলের গর্জন ক্ষণে ক্ষণে। রাত যতই গভীর হইতেছে আওয়াজ ততই ঘন হইতেছে। সম্ভবত সৈন্যরা ঘরে ঢুকিয়া হত্যা করিতেছে। আহমদ ছফা দেখিতে পাইলেন আগুন। ২৭/২৮ মার্চ রাতের কথা। ছফা লিখিতেছেন, ‘ছাদের উপর উঠে দেখলাম ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ আগুনের আভায় লাল হয়ে উঠেছে। আজ রাতেও তারা জ্বালাচ্ছে।’ তিনি দেখিলেন সকাল বেলাও নওয়াবপুরের বাঙ্গালি দোকানপাট জ্বলিতেছে।
আমাদের সাক্ষী শুনিয়াছেন, আগের দিন — মানে ২৭ তারিখ — নাকি অবাঙ্গালি বাসিন্দারা বাঙ্গালি দোকানের মালপত্তর লুটিয়া লইয়াছে। আহমদ ছফার ভাষ্য এই রকম: ‘যে দেরাজ, বাক্সগুলোতে ভরে থাকত বাঙ্গালি ব্যবসায়ীর আশা আকাক্সক্ষা এখন সেখানে গাদা গাদা ছাই এবং অঙ্গার। সকলে শাঁখারীবাজারের কথা বলাবলি করছিল। এই ছোট্ট গলিটিতেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা ঘেঁষাঘেঁষি করে বাস করত। ঢাকা শহরের আর কোন অঞ্চলে এত হিন্দুর বাস ছিল না।’
গলিতে ঢুকিবার আগেই আহমদ ছফা নমুনা দেখিলেন। তাঁহার সাক্ষ্য — বড় জীবন্ত: ‘জগন্নাথ কলেজের পাশের একটা ঘরে চারজন মানুষ পাশাপাশি পড়ে আছে। গলি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার উপায় নেই। পোড়া আধপোড়া মানুষ আগুনের আঁচে বেঁকে গেছে।’
প্রতিটি ঘরই সেনাবাহিনী আগুন দিয়া জ্বালাইয়াছে। ঘরে ঘরে ঢুকিয়া হত্যা করিয়াছে। কেহ রেহাই পায় নাই । শিশু বৃদ্ধ নারী কেহই না। সকলেই মৃত্যু বরণ করিয়াছে। আহমদ ছফা শুনিলেন চন্দন শূরের বাড়িতে একত্রিশটি লাশ পড়িয়াছে। আহমদ ছফা বলিতেছেন, ‘তিনি ছিলেন প্রভাবশালী এবং ধনবান মানুষ। গত নির্বাচনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মুসলিম লীগ সমর্থক নবাব বাড়ির খাজা খয়েরউদ্দিন তাঁকে দলে টানতে চেষ্টা করলে তিনি কড়া কথা শুনিয়েছিলেন।’ ছফার জবানি অনুসারে ‘খাজা নিজেই নাকি সৈন্যদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।’
এই প্রথম আমরা ইঙ্গিত পাইলাম। শুদ্ধ অবাঙ্গালি বাসিন্দারা নহে, বাঙ্গালিদের মধ্যেও কেহ কেহ পাক সেনাবাহিনীর দোসর বা যুদ্ধাপরাধীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছে।
আহমদ ছফা শাঁখারীবাজারে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং নারীধর্ষণ কিভাবে চলিয়াছিল তাহার সামান্য বিবরণ দিয়াছেন। সঙ্গে যোগ করিয়াছেন, ‘চোখে না দেখলে তার বর্ণনা দেওয়া যাবে না।’ লিখিয়াছেন, ‘দেখছি শয়ে শয়ে বিকৃত পোড়া আধপোড়া মৃতদেহ। এর একটি দেখলেও অন্য সময় পেটের খিদে এবং চোখের ঘুম চলে যেত।’
দুপুরে তিনি বাসায় আসিলেন। দেখিলেন লোকজন সামরিক কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশে উর্দুতে লেখা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ জাতীয় শ্লোগান বাড়িতে দোকানে সাঁটিয়া রাখিতেছে। তাঁহার মনে হইল, ‘এতকাল মানুষ সম্পর্কে জীবন সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি সব যেন মিথ্যা হয়ে গেল।’
হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ আর ধর্ষণই এই কতদিনে স্বাভাবিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। তিনি সদরঘাটের দিকে গেলেন। আজ ২৯ তারিখ হইয়াছে। ছফা দেখিতেছেন, ‘ফুটপাতে ইতস্তত ছড়ানো লাশ পড়ে রয়েছে। বড় বড় মাছি ভন ভন করছে। বাংলাদেশে মানুষের লাশ শকুনেও খায় না। শেয়াল-কুকুরেও ছোঁয় না।’
তিনি সদরঘাট পঁহুছাইলেন। যে সদরঘাটে ‘অসংখ্য মানুষের মধুচক্রের মত অবিরাম গুঞ্জরণ’ রাত বারোটার পরও থামিত না সেই সদরঘাট — তিনি দেখিলেন — খালি। একদম খালি। ছফা লিখিতেছেন, ‘আইডব্লিউটিএর জেটিগুলোর দিকে তাকাইলেই বুক ছম ছম করে। এত সব মানুষ, এত নৌকা লঞ্চ হৈ-হল্লা চিৎকার এসব কোথায় গেল? এই যে রাস্তার দুইপাশে বসত রাশি রাশি ফেরিওয়ালা, বেচাকেনা সেরে রাস্তার উপর শুয়ে থাকত — তাদের কি হল? কানের কাছে কে একজন বলল, সকলেই গেছে। বিরাট গুদামঘরটি জ্বালিয়ে দিয়েছে। ঢাকা শহরে বসন খুলে একেবারে উলঙ্গ করে রেখেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।’
সদরঘাট এবং ইসলামপুরের রাস্তার মোড়ে একটি জুতার দোকান ছিল। সৈন্যরা এই দোকানে লুটপাট করাইল। দুই দফায়। পহিলা দফায় অবাঙ্গালি বাসিন্দাদের দিয়া। দ্বিতীয় দফায় কিছু বাঙ্গালিকে দিয়া। যাহারা লুট করিতে চাহে নাই তাহাদের বেয়নেটের গুঁতা দিয়া ঠাণ্ডা করিয়া দিয়াছে। অনেকেই বাধ্য হইয়া লুটের জিনিশ লইয়াছে। পাকিস্তানি ক্যামেরাম্যান এই লুটের দৃশ্যের ছবি তুলিয়াছে। তারপর মেশিনগানের গুলি। ছফার বিবরণ মোতাবেক, ‘বিআইএস দোকানের সামনেই বিশ পঁচিশটি মৃতদেহ চার পাঁচদিন ধরে পড়েছিল।’ এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ইসলামপুরেও ঘটিয়াছিল।
পরদিন — মানে ৩০ তারিখ দাঁড়াইতেছে — আহমদ ছফা শুনিতে পাইলেন বীভৎসতম হত্যাকাণ্ডের সংবাদ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী একরাতে ঢাকার অদূরের জিঞ্জিরাবাজারে ‘কমসে কম পাঁচ হাজার’ মানুষ হত্যা করে। জিঞ্জিরায় জড় হইয়াছিলেন অগণিত মানুষ। ‘রাতের অন্ধকারে শত্র“র ঘুমন্তপুরী আক্রমণ করার মত যখন বর্বর সেনাবাহিনী শহরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তার পরের দিন থেকেই নিরাপত্তার আশায় হাজার হাজার মানুষ স্রোতের মত এসে জিঞ্জিরাবাজারে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে।’
আহমদ ছফা খবর পাইলেন, ‘সন্ধ্যের সময় থেকে মেশিনগানে সজ্জিত মিলিটারি জিপগুলো সদরঘাটে জড়ো করে রাখে একদিকে। আবার অন্যদিকে বাজারের তিনদিকে তারের ঘেরা দেয় এবং তাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ চালিয়ে দেয়। রাত হলে নৌকা করে নদী পার হয় সৈন্যরা এবং তাদের জিপগাড়িগুলোও পার করানো হয়। এরোপ্লেন থেকে আলো দেখিয়ে জিপগুলোকে বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় বেপরোয়া গুলিবর্ষণ।’
ছফা অধিক লিখিলেন, ‘ঢাকা শহরের উপকণ্ঠের সুবৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্রটিতে রাতের অন্ধকারে রাইফেলের নল থেকে অবিরাম ঝলসাতে থাকে মৃত্যু। যারা আশ্রয় নিয়েছিল কেউ বাঁচতে পারেনি। যারা গুলি থেকে বাঁচবার জন্য পেছন দিকে পালাতে চেয়েছে তারা শক খেয়ে মরেছে।’

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩
[বাকি অংশ আগামীকাল]