Daily Archives: ফেব্রুয়ারি 13, 2013

সম্পাদকীয়

চক্ষু তো অন্ধ হয় না, অন্ধ হয়  বক্ষস্থিত হৃদয়

ঘটনাই ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন অনেক কিছুকে স্পষ্ট করিতেছে। বিচার প্রক্রিয়ায় কোথাও যে ফাঁকি ছিল অন্য হিসাব ছিল জনগণের তাহা বুঝিতে বাকি নাই। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী চক্র জামায়াতের ভিত সম্পূর্ণরূপে কাঁপিয়া উঠিয়াছে। তাদের অন্যতম সুহৃদ বিএনপি কি বলিতে কি বলিতেছে নিজেরাই জানে না। মনে হয় তাহারা প্রলাপ বকিতেছে।

জামায়াত বিএনপি লাইনের পত্রপত্রিকা ও কতিপয় বুদ্ধিজীবি এই আন্দোলনে ফ্যাসিজম তালাশ করিয়াছেন। তাহাদের জ্ঞাতার্থে বলি, যে দুনিয়াতে আমরা বসবাস করিতেছি তাহা ফ্যাসিবাদী মতে চলিতেছে। এক জার্মান মহাত্মা বলিয়াছেন, ‘আমরা জরুরি অবস্থার মধ্যে বসবাস করিতেছি। ইহা নিয়মের অতিক্রম নহে, নিয়ম মাত্র।’ জনগণের আজিকার আন্দোলন বরং বিদ্যমান ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলিতেছে। জনগণ সত্য দাবিতে আন্দোলন করিতেছে। এই বুদ্ধিজীবিরা তবে কি তাহা দেখিতেছেন না? নাকি তাহারা অন্ধ? অথবা তাহারা গাফেল ও গোমরাহিতে আচ্ছন্ন।

কথার পরেও কথা থাকে। এই গণজাগরণে মানুষে মানুষে নজিরবিহীন সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির উদ্ভব হইয়াছে। একে রক্ষা করিতে হইবে। ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে আমরা যেন সজাগ থাকি। বেঈমানির ইতিহাস মনে পড়িলে শরীর মন ভারাক্রান্ত হইয়া উঠে।

পাক বাহিনীর গণহত্যা: আহমদ ছফার ১৯৭১ – সলিমুল্লাহ খান

১৯৭১ সালের ২৫/২৬ মার্চের রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করে। সেই ভয়ঙ্কর রাত্রে আহমদ ছফা ঢাকা শহরের তোপখানা রোডের এক বাড়িতে অবস্থান লইয়াছিলেন। সেই রাত্রের হত্যাযজ্ঞের কিছু দৃশ্যও তিনি নিজ চোখে দেখিয়াছিলেন। পরদিন সকালে– কারফিউ শিথিল হইবার পর — কিছু দৃশ্য তিনি পায়ে হাঁটিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া দেখিয়াছিলেন। গণহত্যাযজ্ঞের আরো দৃশ্য তিনি দেখিতে পাইয়াছিলেন তাহার পরের দিন। শুনিতে পাইয়াছিলেন আরো অনেক কথা ও কাহিনী। দেখিতে পাইয়াছিলেন আগের দুই রাতের ধ্বংসাবশেষ, লাশের উপর লাশ– স্থলে ও জলে। তখনো আগুনের শিখা জ্বলিতেছে। কোথাও দাউ দাউ, কোথাও ধিকি ধিকি।

যাঁহারা প্রাণ হাতে লইয়া ঢাকা নগর ছাড়িতে পারিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফাও তাঁহাদের মধ্যে। ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল নাগাদ তিনি পূর্ব সীমান্ত ডিঙ্গাইয়া আগরতলা শহরে পঁহুছিয়াছিলেন। তাহার পর একসময় কলিকাতা। ১৯৭১ সালের জুলাই মাস নাগাদ কলিকাতা হইতে ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ নাম রাখিয়া  একটি পুস্তক প্রকাশ পাইল। সেই পুস্তকে আহমদ ছফাও আপনকার অভিজ্ঞতার একপ্রস্ত বিবরণ প্রকাশ করিলেন। নাম: ‘ঢাকায় যা দেখেছি যা শুনেছি’। ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে বইটি ঢাকায় পুনর্মুদ্রিত হয়। সেই বিবরণের কিছু অংশ লইয়া এই নিবন্ধ। কিস্তি যোগে।

আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, মার্চ মাসের পঁচিশ তারিখ সকালবেলা থেকেই আমরা একটি জিনিস সাগ্রহে লক্ষ করেছি। ঢাকা শহরের সমুদ্রতরঙ্গের মত মিছিলগুলোতে কেমন যেন একটা শান্তভাব এসেছে। রাস্তায় লোকজন পানের দোকানের সামনে রেডিও শোনার জন্য জটলা করছেন। সকাল সাতটা থেকে দুই তিনবার রেডিওর সংবাদ হয়ে গেল। আলোচনার ফলাফল প্রসঙ্গে কিছুই বলা হল না। ধাবমান মিছিলগুলো কেমন ঝিম মেরে গেল।’

আহমদ ছফার বিবরণ অনুসারে, ‘সন্ধ্যের দিকে খবর এল সামরিক বাহিনীর লোক শাদা পোশাকে গিয়ে পাক মটর্সের কাছে [এখনকার বাংলা মটর] দুজন এবং তেজগাঁ ফার্মগেটে তিনজন নিরীহ পথচারীকে গুলি করে হত্যা করেছে।’ এই ঘটনার কয়েকদিন আগেও দেশের নানান জায়গায়– যেমন জয়দেবপুরে– পাক সেনাবাহিনী এমন সকল হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করিয়াছিল যাহার প্রতিটির সহি, আহমদ ছফার জবানিতে, ‘জালিয়ানওয়ালা বাগের তুলনা’ করা যাইতে পারে। জালিয়ানওয়ালাবাগ জায়গাটা পাঞ্জাবে।

‘তবু,’ আহমদ ছফা লিখিতেছেন, ‘ঢাকা নগরীর মানুষ পঁচিশ তারিখের বিকেলবেলাতেও বিশ্বাস করতে পারেনি যে সেনাবাহিনীর লোক সাদা পোশাকে নিরীহ পথচারীকে হত্যা করতে পারে।’

পঁচিশে মার্চ রাত এগারোটার কিছু পরে ঢাকা নগরীর উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল পাকিস্তান রাষ্ট্রের বীর সেনাবাহিনী। আহমদ ছফার জবানি অনুসারে, ‘সৈন্যরা এল ঝাঁকে ঝাঁকে দলে দলে। ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলল। রাস্তার উপর দিয়ে মিলিটারি জিপগুলো ছুটে বেড়াতে লাগল। ট্যাঙ্কের প্রচণ্ড শব্দ কানে তালা লাগাবার উপক্রম করিল। কামানগুলো গুড়–ম গুড়–ম গর্জন করছে, মর্টার থেকে গুলি ছুঁড়ছে। দ্রুম দ্রুম আগুনবোমা ফুটছে আর ঠিকরে ঠিকরে লাল আগুনের লকলকে শিখা বেরিয়ে আসছে। কান পাতলে আওয়াজ– রাইফেলের, মেশিনগানের, মর্টারের, ট্যাঙ্কের। চোখ মেলে তাকান যায় না। ঢাকার আকাশ অজস্র নিক্ষিপ্ত গুলির আগুনে লাল হয়ে উঠছে। খৈ ফোটার মত ফুটছে গুলি।’

এই অবস্থায়ও আপন অক্ষরেখার চারিদিকে পৃথিবীর ঘুর্ণন থামিয়া নাই। এক সময় রাত কাবার হইয়া দিন ফুটিল। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘ফুটন্ত প্রভাতের আলোতে আমরা নগরীর চেহারা দেখলাম। চেনাই যায় না। ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, দেয়ালগুলো ক্ষত-বিক্ষত। কালো কালো ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে গেছে। গত রাতে যে সব বাড়িতে আগুনবোমা ছুঁড়ে মারা হয়েছে, সে সকল বাড়ি এখনো জ্বলছে।’

বেলা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে, আহমদ ছফার ভাষায় বলিতে ‘পিপীলিকার মতো পিলপিল’ মানুষ রাস্তায় বাহির হইয়া আসিল। ছফাও আসিলেন। দেখিলেন।’ শহরের অবস্থা দেখিয়া তাঁহার দুইচোখ পানিতে ভাসিয়া গেল। আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিতেছেন এইভাবে: ‘হাজারে হাজারে পশু যেন গোটা শহরকে খামচে কামড়ে থাবা দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলেছে। শহরের ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর চিকন সবুজ পাতাগুলো গুলির আগুনের আঁচে তামাটে হয়ে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে মেশিনগানের সংখ্যাহীনের গুলির চিহ্ন। তোপখানা রোডে বাসা। বায়তুল মোকাররম পর্যন্ত যেতে দুই দুইটি লাশ দেখলাম।’

শুরু হইল প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ।

‘একটু এগিয়ে গুলিস্তান সিনেমার সামনে,’ পঁহুছাইলেন আহমদ ছফা। অবস্থা দেখিয়া তাঁহার মুখের কথা আটকাইয়া গিয়াছে। তারপরও তিনি বলিতেছেন, ‘চিরনিদ্রায় নিদ্রিত রয়েছে অনেকগুলো মানব সন্তান। রক্ত ফুটপাথের উপর জমাট বেঁধেছে। রাতের বেলা যে সকল ফেরিওয়ালা, কুলি, শ্রমিক, ভিখারি এবং ভিখারিণী শ্রেণীর মানুষ রোজকার অভ্যাসমত ফুটপাতে ঘুমিয়েছিল, তাঁদের কেউই রেহাই পায়নি।

আহমদ ছফা একটু পরে গেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। দেখিতে দেখিতে গেলেন। দেখিতে হইল অনেক মরা। ‘কারো পিঠে লেগেছে গুলি, কারো বুকে। কোন মাথার খুলিতে খুব ছোট একটা ছিদ্র করে ঢুকেছে আর মগজ সমেত খুলির একটা বিরাট অংশ উড়িয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।’

রেলওয়ের হাসপাতালের পাশে একটি অতি করুণ দৃশ্য দেখিতে হইল। দৃশ্যটি এইরকম: ‘একটি মা, তাহার বামস্তনের পাশে গুলি লাগিয়াছে। অথচ তাহার কোলের শিশুটি তখনও জীবিত। আহমদ ছফার মন্তব্যটি অবিস্মরণীয়: ‘আমরা যেন জাতির গোরস্তানের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।’

আর সামান্য সামনে ঢাকা হল। এখন যার নাম শহীদুল্লাহ্ হল। ছফা লিখিয়াছেন, ‘ঢাকা হলের সামনে একটি বুড়ো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে উপুড় হয়ে। লম্বা দীর্ঘ দাড়ির দুই এক গোছা বাতাসে একটু একটু নড়ছে। চোখ একটু একটু নড়ছে। তার ওপাশে দুইজন গলাগলি করে মরে রয়েছে। চোখে মরা মাছের মত নিথর দৃষ্টি।’

এমন দুঃখের দিনেও আহমদ ছফা না জিজ্ঞাসা করিয়া পারেন নাই, ‘আচ্ছা, এরা দুইজনক কি সহোদর ভাই ছিল?’ অন্য কোন কবি হইলে তিনি হয়ত আরো আগাইতেন। জিজ্ঞাসা করিতেন, ‘এই লাশ দুইটির নাম কি পাকিস্তান?’

জিজ্ঞাসার অবকাশ হয় নাই তাঁহার। তিনি পুরানা বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সামনে দিয়া মেডিকেল কলেজ ছাড়াইলেন। আসিলেন শহীদ মিনার নাগাদ। দেখিলেন তখনো পাকিস্তানি সৈন্যরা মিনারটি একেবারে নিশ্চিহ্ন করিয়া ফেলে নাই, তবে তাহার মাথাটা কামান দাগাইয়া উড়াইয়া দিয়াছে। কলাপাতার মতন শতচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছে মিনারের সাক্ষাৎ বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ার প্রাচীরের উপর বাংলাদেশি শিল্পীদের আঁকা প্রাণবন্ত চিত্রমালা। ছবিগুলি মোটা তেরপালের উপর আঁকা ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা হইতে অবিশ্রাম কান্নার শব্দ কানে আসিতেছে। একজন চীৎকার করিয়া বলিতেছেন, এই ব্লকে একজন পুরুষও বাঁচিয়া নাই। অধ্যাপকদের মধ্যে যাঁহারা নিহত ও আহত হইয়াছেন তাঁহাদের তালিকা দীর্ঘ। ইংরেজি বিভাগের ডাক্তার জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কাঁধে গুলি লাগিয়াছিল। তাঁহাকে হাসপাতালেও নেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু সেখানে বিনা চিকিৎসায় তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল দুইদিন পর।

আরও করুণভাবে নিহত হইয়াছিলেন দর্শন বিভাগের ডাক্তার গোবিন্দচন্দ্র দেব। আহমদ ছফার বিবরণ নিচে লিখিলাম: ‘আগের রাতে বর্বর নেকড়ে বাহিনী জগন্নাথ হলের নিরীহ ছাত্রদের বেপরোয়াভাবে মেশিনগানের গুলির আঘাতে হত্যা করেছিল। ইে সংবাদ ড. দেবের কানে আসা মাত্রই তিনি বেরিয়ে একদম হলে চলে এলেন।’ ছফা জানাইতেছেন, ‘তিনি সৈন্যদের নাকি মিনতি করে বলেছিলেন: ‘বাবা, তোমরা আমার নিরপরাধ ছাত্রদের মের না, একান্তই যদি মারতে হয়, আমাকেই মার।’ সৈন্যরা তাঁকে মেরেছে। তাঁর বাড়িতে গিয়ে লোকজন সবাইকে মেরেছে। এমনকি ড. দেবের লাশটাও গোপন করে ফেলেছে।’

আহমদ ছফা এক্ষণে লিখিতেছেন, তেতো হাসি হাসলাম, ইয়াহিয়া খাঁর সৈন্যরা লাশ গোপন করে অপরাধ গোপন করতে চায়। এই মহান জীবন, এই মহান মৃত্যুর সন্নিধানে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। আবার খবর এল– মৃত্যু ছাড়া খবর নেই কোন– ঢাকা হলের ব্যাচেলার্স মেসে যে সাতজন অধ্যাপক থাকতেন তাঁদের একজনও বেঁচে নেই।’

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

 [বাকি অংশ আগামীকাল]

গণজাগরণ কণিকা

১৬ বছর পরে জাপান প্রবাসী আব্দুস সালাম চলমান গণআন্দোলনে শরিক হতে শাহবাগে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘দলীয় সরকারের যুদ্ধাপরাধীর বিচার করার মুরোদ নাই। জনগণের আন্দোলনই আমাদের একমাত্র জায়গা যেখানে  রাজাকারের বিচার করা সম্ভব।’

জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করার দাবি বাস্তবায়নে সংসদে বিল উত্থাপনের কথা বলেছেন আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের নেতারা।

শীর্ষ রাজাকার গোলাম আজমের পক্ষে বিদেশি সাফাই স্বাক্ষী হাজিরের আবেদন।

সাতক্ষীরা ও দাউদকান্দিতে জামায়াত- শিবিরের ১৭৭ কর্মী গ্রেফতার

কর্মীদের ঢাকায় জড় করার চেষ্টা করছে জামায়াত। আজ ভোরে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে জামায়াত-শিবির সন্দেহে ৩৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

ফেসবুক চিরকুট

আনু মুহাম্মদ: আমরা আরো শ্লোগান যোগ করতে পারি। যেমন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: যুদ্ধাপরাধী ছাড়বো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: ধর্ষকদের ছাড়বো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: লুটেরাদের ছাড়বো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: বাংলাদেশ ছাড়বো না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: মালিকানা ছাড়বো না ‘জবাই করা’ ‘চামড়াতোলা’, ‘নাশতা করা’ মার্কা শ্লোগান আমাদের হতে পারে না। (১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

আজফার হোসেন: Yes, the power of the people is stronger than the people in power! Long live the Shahbagh movement! (১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

শাহেদ আলম: সত্যিকারের বিপ্লব কখনো প্রটেকশন আর পুলিশি সহায়তায় হয় না। এটাই বিপ্লব বা জাগরণের শাশ্বত রূপ। প্রটেকশনে হয় তোষামোদি আর প্রপাগান্ডা। শাহবাগ তারুণ্য এখনো শাবক। কেবল আত্মার পর্দাগুলো খুলে দিয়েছে। বুঝতে শিখছে আমরা কি চাই। আমাদের চাওয়াগুলো না পেলেই এই শাহবাগ প্রটেকশনের বাইরে চলে আসবে। টগবগে তরুণের মত হুঙ্কার ছাড়বে তখনই তুলে নেয়া হবে যাবতীয় প্রটেকশন আর নিরাপত্তা। আসল লড়াইটা সেখান থেকেই শুরু হবে। আমাদের শাহবাগ গত ৭ দিনে সবেমাত্র কৈশোরে পা দিয়েছে। আরো ২/৪ দিন পর যৌবনে পা দেবে। চলুন আমরা শাহবাগের সাথে থাকি। এই শাহবাগ কখনো অপরাধের সাথে আপোস করবে না। আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, শুধু বলবো, শাহবাগকে একটু ছেড়ে দাও, ও যেন বাইরের দুনিয়াটা দেখতে পারে। না হলে বাস্তবতা শিখবে না। এখনো শাহবাগ আবেগী। আবেগ পূরণ না হলেই হবে আসল প্রতিবাদ। সেই প্রতিবাদেই আসবে মুক্তি। জয় শাহবাগ। (১১ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

শাকিলা সিমকি: উনিশ শ একাত্তরের বন্দুক

দুই হাজার তেরো সালে ফেসবুক। (১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

রফিকুল ইসলাম: ইসলাম আর জামাতরে এক কইরা দেখার যে সেকুলার প্রবণতা, সেইটাই উল্টাভাবে জামাতরে আরো সুবিধা কইরা দিছে।  সুতরাং, সাধু সাবধান! (১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

গেরিলা বসন্তের আমি বনফুল (জারি গান) – অরূপ রাহী

গেরিলা বসন্তের আমি বনফুল

ঠিকঠাক ফুটে উঠি না করিয়ে ভুল।

ইতিহাস গড়ে চলি ইতিহাসে মূল

জনতা সমুদ্রে জনতাই কূল।

গেরিলা বসন্তের আমি বনফুল

গেরিলা বসন্তের আমি বনফুল

নদী বন পাহাড়ে সমতলে যাই

শহর-নগর-রাজ-পাট বাকি নাই।

রাইফেলে গ্রেনেডে পাপড়ি ফোটাই

(শত) সহস্র বিমানের পাখনা গজাই ।

যদি দেখি ইতিহাস থমকায়ে রয়

ঘটনা ঘটায়ে দিতে কর্তার হয়।

শহর-নগর জুড়ে আমার সুবাস

রক্তে ফাগুন নাচে। রক্তবিলাস

ফুলে বাসর সাজায়ে চলি পরমের স্বাদ

নিয়ে ইতিহাস জেগে ওঠে করিয়ে নিনাদ।

গেরিলা বসন্তের আমি বনফুল

গেরিলা বসন্তের আমি বনফুল

জনগণ কোন অজ্ঞ আর বর্বর শক্তি নয় – জাক রঁসিয়ের

তর্জমা: নাজমুল সুলতান

এমন কোন দিন নাই যেদিন সব মহল থেকে জনতাবাদের (populism) গোষ্ঠী উদ্ধার করা হয় না। আধিপত্যশীল বয়ান জনতাবাদ দ্বারা মুখ্যত তিনটা জিনিশ বুঝায়: একটা বিশেষ রাজনৈতিক বক্তৃতাভঙ্গি যা মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিনিধিদের ডিঙ্গিয়ে সরাসরি জনতার সাথে বাতচিত করতে চায়; দ্বিতীয়ত, ঐ বয়ানের মতে, জনতাবাদ ধরে নেয় যে রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা জনগণের তোয়াক্কা না করে নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত। আর, তার আরেক উপাদান হচ্ছে জনতাবাদের গোষ্ঠীপরিচয়কেন্দ্রিকতা, যা যারপরনাই বিজাতিবিদ্বেষী। বলা বাহুল্য, জনতাবাদের এমন ধারণা কোন বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ বা শক্তি নির্দেশ করে না। এই ধারণা বরং জনতাকে একটা বিশেষ সত্তারূপে নির্মাণ করতে চায়।

উপরোক্ত আধিপত্যবাদী বয়ানের ‘জনতাবাদ’ জনতার কয়েকটা বিশেষ সক্ষমতা আর ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত।  জনতার সক্ষমতা হচ্ছে সংখ্যার পাল্লায় ভারীদের ‘বর্বর ধ্বংসাত্মক’ শক্তি। আর সাথে সাথে সেই বয়ান  জনতার সাথে জুড়ে দেয় এক মৌলিক অক্ষমতা: অগণিত জনতা বরাবরই অজ্ঞতায় বিরাজ করে। অর্থাৎ তাদের চিন্তা করবার ক্ষমতা নাই। জনতা রাজনৈতিক আর পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া বুঝতে পারে না বলে বিজ্ঞ শাসকদের প্রত্যাখান করে। আরেক দিকে, তাদের পরিবর্তনভীত জীবনধারা সকল বস্তুগত পরিবর্তনের দায় চাপায় বিজাতিদের ঘাড়ে। এই হেতু, আধিপত্যশীল বয়ান মতে, জনতাবাদ আবশ্যিকভাবে বিজাতিবিদ্বেষে ভোগে। জনতাবাদের এহেন ধারণার আদি কারিগর ছিলেন ঊনিশ শতকের পারি কমিউনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তকগণ (যথা: ইপ্পোলিত তেন, গুস্তাভ ল্য বন)। তাদের বয়ানে জনতাবাদ বলতে দাঁড়ায়: বিক্ষোভকারীদের উত্তেজনাকর বাক্যবাণে বিদ্ধ হয়ে– গুজব আর সংক্রমণশীল আতঙ্কের বলে — অজ্ঞ জনতা স্রেফ চরম সহিংসতায় লিপ্ত হতে চায়।

ফরাশিদেশে আজকাল যাকে জাতিবিদ্বেষ বলা হয় তা মূলত দুইটা জিনিশের যোগফল। দায়িত্বরত প্রশাসন  সচেতনভাবে চাকরি-বাকরিতে নিয়োগ আর সামাজিক বাসস্থান বণ্টনে বৈষম্য জিইয়ে রাখে; তার সাথে অভিবাসীবিরোধী সরকারি নীতিমালা– যেসব নীতিমালা কোনক্রমেই জনতাবাদী আন্দোলনের ফসল নয়– মিলে নিশ্চিত করে যে অভিবাসীরা অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক সমাধিকার পাবে না।

এই সকল রাজনৈতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য তথাকথিত ‘জনতাবাদ’ দায়ী নয়। এমনকি তার মূল কারণ নব্যনাৎসীবাদী রাজনৈতিক দলগুলাও নয়। বরং এই বর্ণবাদী প্রতিক্রিয়ার শুরু হয় কিছু বাম-দাবিকারী বুদ্ধিজীবীদের হাতে যখন তারা ঘোষণা করেন: যারা সেকুলার নয়, তারা ফরাশিও নয়।

উগ্র ডানপন্থা (যাকে জনতাবাদের লেবাসে মুড়ে দেওয়া হয়) যে জাতিবিদ্বেষ প্রকাশ করে তা জনতার মাঝে প্রোথিত নয়। এই উপগ্রহ-ন্যায় জাতিবিদ্বেষী ডানপন্থা বরং বৈষম্যমূলক সরকারি নীতিমালা আর যশস্বী বুদ্ধিজীবীদের তৈরি মূলধন পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটে। সরকারের নীতিমালায় আর বুদ্ধিজীবীর গদ্যে যে জাতিবিদ্বেষ বিরাজ করে উগ্র ডানপন্থা তাকেই ভাষা দেয়।

মানে দাঁড়াল এই: তথাকথিত ‘জনতাবাদ’ এবং রোজকার জনতা-নিন্দুক প্রতিষ্ঠানবাদীরা কেউই জনগণ কি জিনিশ বুঝতে পারে না। বোঝার ফুরসতও তাদের নাই। কেননা তাদের কাজই হচ্ছে মুক্তিকামী গণতান্ত্রিক জনগণের ধারণার সাথে বিপজ্জনক খেপা জনতার ছবি মিশিয়ে দেওয়া। বলা বাহুল্য ‘জনতাবাদ’ –সমালোচকদের উপসংহার দাঁড়ায় এই: জনগণের করণীয় হচ্ছে তাদের শাসকদের উপর আস্থা রাখা। কেননা এই যুক্তিমতে, শাসনব্যবস্থার ন্যায্যতা যদি জনগণের ন্যায্যতা দিয়ে প্রতিহত করা হয় তবে তার ফল কেবল একটাই হতে পারে: ফ্যাসিবাদ। ল্য পেন বিরোধী শ্লোগান–‘ফ্যাসিবাদী ফরাশিদেশের চাইতে ব্যর্থ রাষ্ট্র উত্তম’– তাই ক্ষতিকর। জনগণের অভ্যুত্থানের সাথে ফ্যাসিবাদ জুড়ে দেওয়া মানে আধিপত্যশীল বয়ানের ফাঁদে পা দেওয়া। জনতাবাদের বিপদ নিয়ে বর্তমান বাগাড়ম্বর যে রক্ষণশীল দাবিকে তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে তার সারকথাও তাই: বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া আমাদের আর কোন গতি নাই।

*জাক রঁসিয়ের (Jacques Ranciere)একালের সাম্যবাদী রাজনীতিতত্ত্বের অন্যতম পুরোধা। বর্তমান লেখাটি Libération পত্রিকায় প্রকাশিত (৩ জানুয়ারি ২০১১) কলামের একটা সংক্ষেপিত তর্জমা।

শোনা না শোনা শ্লোগান

কুৎসিত কুলাঙ্গার

জামাত জঙ্গি রাজাকার।

জামাত শিবির ধরা খাবি

এবার তোরা কোথায় যাবি।

ধ্বংস নয় সৃষ্টি

তরুণদের কৃষ্টি।

চারলক্ষ হায়েনা

আরো কত বায়না

ষোল কোটি উঠছে জেগে

আর না, আর না।

কুলাঙ্গার আর চরিত্রহীন

এবার তোরা হবি বিলীন।